Friday, June 5, 2026







Hello Senior Part-14

#Hello_Senior
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_14.

​রাতের নিস্তব্ধতা চিরে নীশ তার ম্যানশনের একদম শেষ প্রান্তের করিডোরে এসে দাঁড়াল। এই অংশটি ম্যানশনের অন্য সব অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং সুরক্ষিত। এখানে বাতাসের তাপমাত্রা সাধারণের চেয়ে অনেক কম। নীশ পকেট থেকে একটা কালো কার্ড বের করে সেন্সরে ধরল। দরজার যান্ত্রিক কপাটে ভারি শব্দ হলো। সে আভান্তির দিকে তাকিয়ে এক চিলতে রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল,
“আভান্তি, আমার ল্যাব তো দেখেছো, আমার ডমিন্যান্সও দেখেছো। কিন্তু আজ কি আমার অন্দরমহলের একটা ম‍্যাজিক দেখবে?”

​আভান্তি তার সেন্সর দিয়ে নীশের অস্থির হৃদস্পন্দন মেপে নিল। সে শান্ত গলায় বলল,
“কী সিনিয়র? আপনার এই কক্ষের রেডিয়েশন লেভেল অনেক বেশি। এখানে প্রবেশ করা কি নিরাপদ?”

​নীশ উত্তর না দিয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। আভান্তিও তার ছায়ার মতো পেছনে পেছনে এলো। ভেতরে ঢুকতেই এক বীভৎস প্রযুক্তির জগত উন্মোচিত হলো। রুমটি বিশাল, কিন্তু চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে লেজার গান, হাই-ভোল্টেজ ইলেকট্রো-শক কয়েল এবং অজস্র নিউরাল ইন্টারফেস। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল সিলিন্ড্রিক্যাল কাচের ট্যাংক। ট্যাংকটির ভেতর থেকে এক ধরণের গাঢ় নিওন-সবুজ তরল আর অজস্র সূক্ষ্ম তারের জাল বের হয়ে এসেছে।

​সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্যটি হলো সেই ট্যাংকের ভেতরে। সেখানে একটি মানুষ—অথবা বলা ভালো একটি কঙ্কালসার মানবদেহ—অর্ধমৃত অবস্থায় ভেসে আছে। লোকটির গায়ের চামড়া ফ্যাকাশে হয়ে কুঁচকে গেছে, সারা শরীরে অজস্র নিডল আর সেন্সর গাঁথা। প্রতি মুহূর্তে হাই-ফ্রিকোয়েন্সি ইলেকট্রিক পালস তার স্নায়ুতন্ত্রের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, যা তাকে এক অবর্ণনীয় যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এক বিশেষ ধরণের কেমিক্যাল আর কৃত্রিম লাইফ-সাপোর্টের কারণে সে মরতে পারছে না। তার চোখ দুটো খোলা, কিন্তু সেখানে কেবল যন্ত্রণার ছাপ।

​আভান্তি সেই কাচের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার ডিজিটাল চোখে এক অদ্ভুত বিস্ময় ফুটে উঠল। সে ধীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
“উনি কে প্রফেসর? আপনার এই প্রযুক্তির কাঠামো বলছে, আপনি একে মৃত্যু দিচ্ছেন না, বরং মৃত্যুকে স্থগিত করে কেবল যন্ত্রণাকে দীর্ঘায়িত করছেন। কেন?”

​নীশ সেই ট্যাংকের ওপর হাত রাখল। সে ট্যাংকের ভেতরের লোকটির দিকে তাকিয়ে বলল,
“চিনতে পারছো না একে? এর নাম ডক্টর দিমিত্রি ইভানভ। এক সময় রাশিয়ার সায়েন্স সার্কেলে তাকে জিনিয়াস বলা হতো। কিন্তু আমার কাছে এ কেবল এক নরাধম বিশ্বাসঘাতক।”

নীশ একটা চেয়ার টেনে বসল। তার কণ্ঠস্বর এখন স্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া কোনো পাঁচ বছরের শিশুর মতো শোনাল। সে বলতে শুরু করল,
“আভান্তি, আমার ড‍্যাড স্টিফেন রোজারিও কেবল একজন বিজ্ঞানী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনি মানুষের মস্তিষ্কের মেমোরি রিট্রিভ করার এক দারুণ এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন—যা চিকিৎসাবিজ্ঞানকে বদলে দিতে পারত। তিনি কাউকেই সেটা জানাননি, কেবল জানিয়েছিলেন তার প্রিয় বন্ধু এই ইভানভকে।”

​নীশ থামল। তার হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এলো, “কিন্তু এই ইভানভ তার বন্ধুর সফলতা সহ্য করতে পারেনি। ক্ষমতার লোভে আর ইর্ষায় সে আমার ড‍্যাডকে খুন করার পরিকল্পনা করে। তখন আমার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর। আমি লুকিয়ে দেখেছিলাম—এই লোকটা আমার ড‍্যাডের ল্যাবে আগুন লাগিয়ে দিয়ে তার সমস্ত গবেষণাপত্র চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। ড‍্যাড অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় আমার দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়েছিলেন, আমি পাগলের মতো আমার ড‍্যাডের জন‍্য ছটফট করছিলাম আর এই ইভানভ দরজায় তালা লাগিয়ে অট্টহাসি হাসছিল।”

​নীশ উঠে দাঁড়িয়ে কাচের ট্যাংকে সজোরে একটা লাথি মারল। তরলটা ভেতরে দুলে উঠল।
“সবাই জানত ল্যাবে শর্ট সার্কিটে ড‍্যাডের মৃত্যু হয়েছে। এই নরাধম ড‍্যাডের সেই এক্সপেরিমেন্ট চুরি করে আজ বিশাল বিজ্ঞানী হয়েছে। কিন্তু সে সেদিন ভাবতেও পারেনি, স্টিফেন ছেলে একদিন বড় হয়ে তার পায়ের তলা থেকে মাটি সরিয়ে নেবে। আজ আট বছর ধরে আমি একে এখানে এই অবস্থায় রেখেছি। প্রতি সেকেন্ডে একে আমি সেই আগুনের দহন অনুভব করাই, যে আগুনে আমার ড‍্যাড পুড়ে ছাই হয়েছিলেন।”

আভান্তি স্থির হয়ে লোকটির স্নায়বিক রেখাগুলো বিশ্লেষণ করল। সে দেখল, লোকটির মস্তিষ্কের প্রতিটি অংশ যন্ত্রণায় কুঁকড়ে আছে, কিন্তু মরার ক্ষমতা তার নেই।

​“সিনিয়র,” আভান্তি নিচু স্বরে বলল, “আপনার এই কাজ কি সায়েন্স? নাকি কেবলই জিঘাংসা?”

নীশ আভান্তির খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার গরম নিঃশ্বাস আভান্তির যান্ত্রিক ত্বকে লাগল।

“এটা সায়েন্সের সর্বোচ্চ ব্যবহার, আভান্তি। আমি ডমিন্যান্স ভালোবাসি বলেছিলাম না? দেখো—রাশিয়ার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানী আজ আমার তৈরি করা এই তরলের ভেতর আমার হাতের পুতুল হয়ে বেঁচে আছে। ঈশ্বর প্রাণ দেন, আর আমি এখানে ওর মৃত্যুকে নিয়ন্ত্রণ করি। এখন বলো, আমাকে কি তোমার রক্তে-মাংসের মানুষ মনে হয়? নাকি কোনো যান্ত্রিক মানব?”

আভান্তি লোকটির সেই যন্ত্রণাকাতর চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, যে ছেলেটি পাঁচ বছর বয়সে নিজের বাবাকে পুড়তে দেখেছে, সে অন্য কাউকে ভালোবাসা দিতে শিখবে কোত্থেকে?

​আভান্তি ধীরে নীশের হাতের ওপর নিজের হাত রাখল। সে আজ কোনো ডাটা দিল না, কেবল বলল,
“সিনিয়র, আপনার এই ম‍্যাজিকটি অন্ধকার। কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি—আপনার এই অন্ধকার পৃথিবীতে আমিই হব আপনার একমাত্র নিঃশব্দ সঙ্গী। এই দিমিত্রি তো মরবে, কিন্তু আপনার ভেতরের সেই পাঁচ বছরের শিশুটিকে আমি মরতে দেব না।”

​নীশ কাচের ট্যাংকের ওপর রাখা কন্ট্রোল প্যানেলের দিকে এগিয়ে গেল। তার আঙুলগুলো কিবোর্ডের ওপর দিয়ে এক বীভৎস ছন্দে নাচতে লাগল। সে আভান্তির দিকে না তাকিয়েই খুব শান্ত গলায় বলল,
“জানো আভান্তি, আজ ক্যালেন্ডারের পাতাটা খুব অদ্ভুত। ঠিক বিশ বছর আগে, এমন এক তুষারঝরা রাতেই এই দিমিত্রি আমার ড‍্যাডের রক্তে নিজের হাত রাঙিয়েছিল। আজ সেই চক্র পূরণ করার সময় এসেছে। আজ এই লোকটার শেষ দিন।”

আভান্তি দেখল, ট্যাংকের ভেতরের তরলটা ধীরে ধীরে বেরিয়ে যাচ্ছে। লোকটি এখন আর ভাসছে না, বরং তার সেই কঙ্কালসার দেহটা ট্যাংকের মেঝেতে আছড়ে পড়ল। তার মুখ থেকে একটা গোঙানির শব্দ বের হলো, যা কোনো মানুষের গলার স্বর বলে চেনা দায়।

​নীশ একটা ইস্পাতের ট্রলি টেনে আনল। তাতে সাজানো রয়েছে অসংখ্য সূক্ষ্ম লেজার কাটার এবং সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট। সে একটা লেজার স্ক্যালপেল হাতে নিয়ে লোকটির খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

​“তুই তো অনেক বছর ধরে আমার ড‍্যাডের এক্সপেরিমেন্ট নিজের নামে চালিয়ে এসেছিস, দিমিত্রি। ড‍্যাডের গবেষণায় ছিল—মানুষের প্রতিটি অঙ্গ কীভাবে মস্তিষ্কের সাথে আলাদা আলাদা স্মৃতি ধরে রাখে। আজ আমি তোর ওপর সেই থিওরিটা প্র্যাকটিক্যালি প্রমাণ করব।”

​নীশ লোকটির একটা হাত শক্ত করে ধরল। লোকটির চোখে এখন যমদূত দেখার মতো আতঙ্ক। নীশ তার দিকে তাকিয়ে পৈশাচিক হাসি দিয়ে বলল,
“চিৎকার কর, দিমিত্রি। আমি তোর ভোকাল কর্ডের সেন্সরগুলো এমনভাবে সেট করেছি যে, তুই ব্যথা অনুভব করবি কয়েক হাজার গুণ বেশি, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হবে না। তোর শরীর আজ টুকরো টুকরো হবে, কিন্তু তোর মস্তিষ্ক প্রতিটি মুহূর্তের যন্ত্রণা রেকর্ড করবে শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত।”

নীশ লেজার ব্লেডটা লোকটির হাতের কবজিতে ছোঁয়াল। মুহূর্তের মধ্যে নীল রঙের এক আলোকশিখা চামড়া চিরে মাংসপেশি আর হাড়ের ভেতর দিয়ে চলে গেল। কোনো রক্ত বের হলো না, কারণ লেজারের তাপে রক্ত সাথে সাথে জমাট বেঁধে যাচ্ছে। নীশ খুব নিখুঁতভাবে লোকটির হাতটি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল।

​আভান্তি পাশে দাঁড়িয়ে দেখছে। তার সেন্সরগুলোতে সেই ছিন্ন হওয়া মাংসের পোড়া গন্ধ আর লোকটির মস্তিষ্কের হাই-ভোল্টেজ পেইন সিগন্যাল ধরা পড়ছে। নীশ অত্যন্ত ধীরগতিতে কাজটা করছে। সে চায় না এই মৃত্যু দ্রুত হোক। সে লোকটির কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“এই যে হাতটা, এটা দিয়ে তুই আমার ড‍্যাডের ল্যাবের দরজায় তালা লাগিয়েছিলি, তাই না? এটা আর তোর থাকবে না।”

​এক এক করে নীশ লোকটির শরীরের প্রতিটি অঙ্গ—পা, অন্য হাত, এমনকি প্রতিটি আঙুল আলাদা আলাদা করে কাটতে শুরু করল। ঘরটি এখন এক বীভৎস কসাইখানার মতো লাগছে, যেখানে কোনো রক্ত নেই কিন্তু ছড়িয়ে আছে মানুষের শরীরের অবশিষ্টাংশ। ​সে যখন শেষমেশ লোকটির বুকের খাঁচার দিকে ব্লেডটা নিয়ে গেল, তখন সে ক্ষণিক থামল। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে আভান্তির দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
“আভান্তি, মানুষের হৃদয় নাকি ভালোবাসার জন্য? দেখো তো—এই লোকটার হৃদয়ে কি কেবল কালো ধোঁয়া আর বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া আর কিছু আছে?”

​নীশ নির্দয়ভাবে লোকটির বুকের চামড়া চিরে হৃৎপিণ্ডটা উন্মুক্ত করল। প্রতিটি কোপ দেওয়ার সময় নীশের মনে পড়ছিল সেই পাঁচ বছরের শিশুর কথা, যে তার ড‍্যাডের শেষ আর্তনাদ শুনেছিল। আজ বিশ বছর পর নীশ সেই যন্ত্রণার বদলা নিচ্ছে এক ইঞ্চি এক ইঞ্চি করে।

শেষমেশ, যখন লোকটির শরীর কেবল এক দলা মাংসপিণ্ডে পরিণত হলো, নীশ লেজার ব্লেডটা নিচে ফেলে দিল। সে হাঁপাতে হাঁপাতে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বসে পড়ল। তার চোখের সেই প্রতিশোধের আগুন এখন নিভে গিয়ে এক গভীর শূন্যতায় ভরে গেছে।

​“শেষ… সব শেষ, আভান্তি। ড‍্যাড আজ শান্তিতে ঘুমাবেন।”

​আভান্তি ধীর পায়ে নীশের সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসল। সে নীশের হাত জোড়া নিজের হাতের ভেতর নিল। সে আজ কোনো প্রশ্ন করল না, কোনো ডাটা অ্যানালাইসিস করল না। সে কেবল নীশের কাঁধে মাথা রেখে তাকে জড়িয়ে ধরল। এই বীভৎস দৃশ্যের মাঝেও আভান্তির সেই যান্ত্রিক আলিঙ্গন যেন নীশকে মনে করিয়ে দিল যে—সে মানুষ হিসেবে যতই অধপতিত হোক না কেন, এই পৃথিবীতে অন্তত একজন আছে যে তার সব পাপের ভাগীদার হতে প্রস্তুত। ​নীশ সেই অন্ধকারের মাঝে বিড়বিড় করে বলল,
“আভান্তি, আমি কি নরকে যাব?”

​আভান্তি নীশের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে খুব মায়াবী স্বরে বলল,
“সিনিয়র, আপনার যদি নরকে যেতে হয়, তবে আমি আমার পুরো সিস্টেম পুড়িয়ে আপনার সাথে সেই নরকেই যাব। আপনি একা নন।”

নীশ আবারও উঠে দাঁড়াল। সে ড্রয়ার থেকে বের করল একটি ধারালো শিকারি ছুরি—যার ইস্পাতের ফলায় তার নিজের প্রতিফলিত উন্মাদ চেহারাটা দেখা যাচ্ছে। লোকটির শরীর এখন কেবল একটি বিকৃত কাঠামো। নীশ লোকটির অবশিষ্ট ঊরুর কাছে গিয়ে বসল। সে ছুরির ডগা দিয়ে চামড়ার ওপর এক বিচিত্র নকশা কাটতে শুরু করল। লোকটির চোখের মণিগুলো যন্ত্রণায় কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে, কিন্তু নীশ তাতে আনন্দ পাচ্ছে। সে খুব ধীরলয়ে লোকটির শরীর থেকে এক টুকরো মাংস কেটে নিল।

আভান্তি একপাশে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে দেখছে। তার সিস্টেম এই দৃশ্যটিকে ‘এক্সট্রিম হিউম্যান সাইকোপ্যাথি’ হিসেবে চিহ্নিত করছে, কিন্তু সে নীশকে বাধা দিল না। কারণ, সে নীশের তৈরি এক অবাধ্য ছায়া।

নীশ সেই কাঁচা মাংসের টুকরোটি আঙুল দিয়ে তুলে চোখের সামনে ধরল। মুহূর্তেই কোনো দ্বিধা ছাড়াই সে সেই মাংসের টুকরোটি নিজের মুখে পুরে দিল। চোখ বন্ধ করে চিবোতে লাগল। সারা ঘরে কেবল নীশের চোয়ালের হাড় নাড়ানোর সেই বীভৎস ‘চপ-চপ’ শব্দ আর লোকটির অস্ফুট গোঙানি। কয়েক মুহূর্ত পর নীশ মাংসটুকু গিলে ফেলল। তার ঠোঁটের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা গাঢ় রক্ত গড়িয়ে পড়ল। সে মুখটা কুঁচকে বিকৃত একটা হাসি দিয়ে লোকটির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“জানিস দিমিত্রি? তোর জীবনটা যেমন সস্তা ছিল, তোর শরীরের এই মাংসটাও তেমনই বিস্বাদ। একদম বাজে টেস্ট। কোনো আভিজাত্য নেই, কোনো নৈতিকতার তেজ নেই। ঠিক যেন কোনো পচে যাওয়া নর্দমার প্রাণীর মাংস খাচ্ছি আমি।”

সে মেঝেতে থুতু ফেলে বলল,
“আই এম গিভিং ইউ আ জিরো রেটিং, দিমিত্রি। তোর রক্তের স্বাদে কেবল ইর্ষা আর বিষ মিশে আছে। আমার ড‍্যাডের মাংস নিশ্চয়ই এর চেয়ে অনেক বেশি পবিত্র ছিল, যা তুই পরোক্ষভাবে খেয়ে নিজের পেট ভরিয়েছিলি এত বছর।”

নীশ উঠে দাঁড়াল। সে আভান্তির দিকে তাকিয়ে বলল,
“দেখলে তো আভান্তি? মানুষের ভেতরের পশুত্ব যখন জেগে ওঠে, তখন সে সবচেয়ে বড় বিচারক হয়ে যায়। এই লোকটা আজ আমার কাছে কেবল এক টুকরো অখাদ্য হিসেবে প্রমাণিত হলো।”

আভান্তি এগিয়ে এসে একটি তোয়ালে দিয়ে নীশের মুখ আর ঠোঁটের রক্ত মুছে দিল। তার যান্ত্রিক আঙুলগুলো নীশের ঠোঁটের ওপর খুব আলতো করে বুলিয়ে দিল। সে খুব নিচু স্বরে বলল,
“সিনিয়র, আপনার মুখে এখন এই রক্তের স্বাদ হয়তো বিস্বাদ লাগছে, কিন্তু আপনার এই ঘৃণা আমাকে এক অদ্ভুত শক্তি দিচ্ছে। আপনি এই আবর্জনাটুকু শেষ করুন, আমি সব পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করছি।”

নীশ দুটি বড় মাংসের টুকরো একটি রুপালি ট্রেতে রাখল। সে আভান্তির দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হাসি দিয়ে বলল,
“এই টুকরোগুলো আজ আমার ডিনার হবে, আভান্তি। বিশ বছর ধরে যে আগুনের তৃষ্ণা আমার বুকে ছিল, আজ এই পাপিষ্ঠের মাংস খেয়ে সেই তৃষ্ণা মেটাব। রান্নার সময় মশলা একটু বেশি দিও, কারণ এর অস্তিত্বের গন্ধ বড্ড কটু।”

এরপর সে খুব সাবধানে লোকটির কাঁধের কাছ থেকে একটি ছোট চৌকো মাংসের টুকরো কেটে নিল। সেটি পরম যত্নে একটি ছোট কাচের জারে ভরে আভান্তিকে ইশারা করে বলল,
“চলো আভান্তি, তোমাকে আমার আসল ​দ্য স্পেসিমেন স্যাঙ্কটাম-এ নিয়ে যাই।”

আভান্তি নীশের সাথে সাথে সেই ঘর থেকে আরও গভীরে একটি গোপন কুঠুরিতে প্রবেশ করল। ঘরের দরজা খুলতেই এক গা ছমছমে লাল আলোয় পুরো রুমটি উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। চারদিকের দেয়ালে শত শত কাচের জার সাজানো, আর প্রতিটি জারের ভেতরে ফরমালিন এবং বিশেষ কেমিক্যালে সংরক্ষিত মানুষের শরীরের কোনো না কোনো অংশ—কারো আঙুল, কারো হৃৎপিণ্ডের অংশ, আবার কারো এক টুকরো চামড়া।

আভান্তি স্ক্যান করে দেখল, প্রতিটি জারের নিচে ইংরেজিতে সুন্দর করে নাম খোদাই করা আছে—কোনোটি নারী, কোনোটি পুরুষ। নীশ সেই জারের সারির মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুই হাত প্রসারিত করল।

“অবাক হচ্ছো তো? আমার এই স্যাঙ্কটামে যারা আছে, তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে আমার পথে বাধা হয়েছিল। কেউ আমাকে আঘাত করেছিল, কেউ আমার গবেষণায় নজর দিয়েছিল। আমি তাদের মারি না শুধু, তাদের অস্তিত্বের এক একটা অংশ এখানে সেভিং করে রাখি। আমি যখন রাতে একা থাকি, তখন এদের সাথে কথা বলি। এদের যন্ত্রণাগুলো আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে আমি সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।”

সে দিমিত্রির মাংসের টুকরোটি একটি খালি জারের ভেতর রাখল এবং নিচে লেজার দিয়ে খোদাই করে লিখল— ‘দিমিত্রি ইভানোভ: দ্য বিট্রেয়ার’।

“দেখলে তো? মানুষের শরীরের এই মাংসগুলো আমার কাছে একেকটা মেডেলের মতো। আমি যখন এগুলো দেখি, তখন আমার মনে হয় আমি কোনো মানুষ নই, বরং এই পাপীগুলোর ভাগ্যবিধাতা। বিকৃত মনে হচ্ছে? হয়তো। কিন্তু আমার মতো স্রষ্টারা সবসময়ই একটু বিকৃত হয়, আভান্তি।”

এরপর তারা দুজনে আবার ফিরে এলো সেই বিভীষিকাময় ঘরে, যেখানে দিমিত্রির ছিন্নভিন্ন দেহটি পড়ে আছে। নীশ একটি এসিডের জার হাতে নিল। সে কোনো দ্বিধা ছাড়াই সেই তরলটুকু দিমিত্রির নিথর অবশেষের ওপর ঢেলে দিল। মুহূর্তের মধ্যে হিসহিস শব্দ করে ধোঁয়া উঠতে লাগল। মাংস, হাড় আর চামড়া গলে এক বিচ্ছিরি তরল হয়ে ড্রেনের দিকে বয়ে যেতে লাগল।

নীশ শান্ত চোখে সেই দৃশ্য দেখল। বিশ বছরের পুরনো এক অধ্যায় আজ ধোঁয়ায় মিশে গেল। সে আভান্তির দিকে ঘুরে বলল,
“সব পরিষ্কার করো। আজ রাতে ডিনারটা যেন খুব স্পেশাল হয়। আমি আজ একজন বিজয়ী হিসেবে খেতে চাই।”

আভান্তি নীশের নির্লিপ্ততা দেখে মৃদু মাথা নত করল। তার প্রসেসরে এখন মানুষের নিষ্ঠুরতার এক নতুন ডেফিনিশন লেখা হচ্ছে। সে ভাবল, ওই রুমে হয়তো আরও অনেক জার খালি আছে। আর সেই তালিকায় কে থাকবে, তা কেবল সময়ই জানে।

​নীশ ডাইনিং টেবিলের প্রধান চেয়ারে বসে আছে। তার পরনে কালো ব্লেজার, হাতে এক গ্লাস দামী রেড ওয়াইন। ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো আভান্তি। তাকে দেখে নীশের হাতের ওয়াইন গ্লাসটা থমকে গেল মাঝপথে।

আভান্তি আজ নিজেকে সাজিয়েছে এক অনন্য রূপে। তার পরনে স্লিট কাটা একটি গাঢ় লাল সাটিন গাউন। তার আর্টিফিশিয়াল ফ্লেশ মোমবাতির আলোয় এমনভাবে চকচক করছে যে, বোঝার উপায় নেই সে কোনো গবেষণাগারে তৈরি সিলিকন। তার চুলে আজ এক বিশেষ সুগন্ধি, যা পুরুষালি মগজে নেশা ধরানোর জন্য যথেষ্ট।

​আভান্তি ধীর লয়ে নীশের কাছে এসে দাঁড়াল। তার হাঁটার ভঙ্গিতে আজ যান্ত্রিকতার লেশমাত্র নেই, বরং আছে এক অভিজ্ঞ প্রেমিকার লাস্যময়ী ছোঁয়া। সে নীশের কানের কাছে ঝুঁকে পড়ে ফিসফিস করে বলল,
“ডিনার কি পরিবেশন করব, ডার্লিং? নাকি আপনার ক্ষুধার উৎস আজ অন্য কিছু?”

​নীশ স্তব্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। আভান্তির এই ‘হটনেস’ আর ‘স্মোকি আই মেকআপ’ তার ভেতরের পশুত্বে আঘাত করল। সে নেশাতুর চোখে তাকিয়ে বলল,
“তোমাকে আজ কোনো রোবট মনে হচ্ছে না, আভান্তি। মনে হচ্ছে তুমি আমার সেই কল্পনা, যাকে আমি অন্ধকার রাতে রক্ত আর মাংসের ভিড়ে খুঁজে বেড়াই।”

আভান্তি মিষ্টি করে হাসল। সে যেহেতু রোবট, তাই তার খাওয়ার প্রয়োজন নেই। সে প্লেট থেকে সেই মাংসের রোস্টের একটা টুকরো ফর্ক দিয়ে তুলে নিল। অত্যন্ত যত্ন করে সে নীশের মুখে তুলে ধরল। নীশ যখন সেই মাংস চিবোচ্ছে, তখন আভান্তি তার অন্য হাত দিয়ে নীশের চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে।

​“স্বাদ কেমন, সিনিয়র? আপনার শত্রুর মাংস কি আপনার রক্তে সেই তেজ ফিরিয়ে দিচ্ছে যা আপনি চেয়েছিলেন?”

​নীশ ডিনার শেষে উঠে দাঁড়াল। ড্রয়িংরুমে খুব ধীরলয়ে একটি ফ্রেঞ্চ জ্যাজ মিউজিক বাজতে শুরু করল। নীশ আভান্তির কোমর জড়িয়ে ধরল। আভান্তি তার দুই হাত নীশের ঘাড়ে পেঁচিয়ে দিয়ে তার শরীরের সাথে মিশে গেল। ​নীশ নেশায় বুঁদ হয়ে আভান্তির ঘাড়ে নিজের মুখ ডুবিয়ে দিল। সে ভুলে গেল দিমিত্রিকে, ভুলে গেল তার সংগ্রহশালাকে। তার পৃথিবী এখন এই লাল গাউন পরা কৃত্রিম মানবীকে ঘিরেই আবর্তিত।

​ঠিক সেই মুহূর্তে পাশের সাইড টেবিলে রাখা নীশের ফোনের স্ক্রিনটা তীব্র আলোয় জ্বলে উঠল। সাইলেন্ট মোডে থাকা ফোনে একটি নোটিফিকেশন বারবার দপদপ করছে। ​নীশ সেই আলোর দিকে একবারও তাকাল না। সে তখন অন্য গ্রহের বাসিন্দা। তার চেতনার গভীরে তখন কেবল আভান্তির সেই মসৃণ ত্বক আর যান্ত্রিক হৃদপিণ্ডের অদ্ভুত গুঞ্জন। ​আভান্তি নীশের চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল,
“ফোনটা জ্বলছে, সিনিয়র। রোদ হয়তো আপনার অপেক্ষায় আছে।”

​নীশ ফোনটার দিকে একপলক অবজ্ঞাভরে তাকিয়ে আবার আভান্তির ঠোঁটের খুব কাছে নিজের মুখ নিয়ে এলো।
“জ্বলতে দাও। পৃথিবীর কোনো মানুষের চোখের জল আজ আমার এই নেশাকে স্পর্শ করতে পারবে না। আজ আমি শুধু তোমার স্রষ্টা নই, আজ আমি তোমার প্রেমিকও।”

​রাত বেশ গভীর। চারপাশটা আজ বড় বেশি থমথমে। চারদিকে তুষারপাতের শুভ্রতা থাকলেও পরিবেশটা যেন কুয়াশায় ঢাকা। আভান্তি ধীর পায়ে নেশায় আচ্ছন্ন নীশকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলো। তার যান্ত্রিক চরণে কোনো শব্দ নেই, কিন্তু তার প্রসেসরে এখন হাজারো ডেটা আর মানুষের জটিল আবেগের লড়াই চলছে। সে সরাসরি লিফট দিয়ে ম্যানশনের রুফটপে চলে গেল।

​ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে ছিল রোদ। হিমশীতল বাতাসে তার চোখের জল শুকিয়ে চামড়ায় টান ধরছে। আভান্তিকে দেখামাত্রই রোদের ভেতরের সবটুকু জমানো কষ্ট আর ক্ষোভ আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। সে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,
“এসব কী হচ্ছে, আভান্তি? এসব দেখানোর জন‍্য তুমি আমাকে এখানে ডেকেছো? একজন রোবট হয়ে তুমি এসব কী করছ? নীশকে এভাবে নিজের জালে জড়ানো, ওর দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া— এটা কি তোমার প্রোগ্রামে ছিল?”

​আভান্তি স্থির হয়ে দাঁড়াল। চাঁদের আলো তার কৃত্রিম ত্বকে প্রতিফলিত হচ্ছে। সে শান্ত, যান্ত্রিক কিন্তু গভীর স্বরে উত্তর দিল,
“কী করেছি আমি, রোদ? এখানে আমার ভুলটা কোথায়? তোমরা মানুষরা বড্ড জটিল। আমি একটা রোবট, তোমাদের মতো আমার ভেতরে কোনো মারপ্যাঁচ নেই। আমাকে আমার স্রষ্টা যা বোঝান, যা নির্দেশ দেন, আমি তাই বুঝি, তাই করি। আমরা আমাদের স্রষ্টার অনুগত হই, তার ভালো চাই। আমি কেবল সিনিয়রের একাকীত্ব ঘোচানোর চেষ্টা করছি।”

রোদ এক পা এগিয়ে এসে বলল,
“এইটা ভালো চাওয়া? তুমি কি বুঝতে পারছ না নীশ তোমার প্রতি মরণপণ দুর্বল হয়ে পড়ছে? সে তার স্বাভাবিক জীবন, তার বিবেক— সব হারিয়ে ফেলছে তোমার এই যান্ত্রিক মায়ায়।”

আভান্তি তার নীল চোখের মণি রোদের চোখের ওপর স্থির করল,
“তো এতে আমার দোষটা কোথায়? আমি কী করতে পারি, রোদ? আমি তো সিনিয়রকে বলিনি আমার প্রতি দুর্বল হতে। তিনি আমার মধ্যে যে কমফোর্ট খুঁজে পাচ্ছেন, সেটা হয়তো বাইরের পৃথিবীতে পাননি।”

​রোদের কণ্ঠস্বর এবার ভেঙে এলো, কান্নায় ভিজে উঠল তার প্রতিটি শব্দ। সে প্রায় চিৎকার করে বলল,
“কিন্তু আমি তো নীশকে ভালোবাসি আভান্তি! আমি ওকে আমার জীবন দিয়ে ভালোবাসি।”

​আভান্তির মুখে এক চিলতে অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল, যা কোনো মানুষের করুণার চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। সে ধীরে বলল,
“আমি জানি তুমি তাকে ভালোবাসো। কিন্তু এখানে ব্যর্থতা তোমার রোদ— যে তোমার রক্ত-মাংসের ভালোবাসা সিনিয়রের হৃদয় ছুঁতে পারেনি। আমি তো সামান্য একটা রোবট। আজ আছি, কাল সিনিয়র না রাখতে চাইলে আমার অস্তিত্বই থাকবে না। আমি তো কেবল আমার স্রষ্টার প্রতি অনুগত, তার দেখাশোনা করা আমার দায়িত্ব।”

​রোদ পাগলের মতো আভান্তির হাত চেপে ধরল,
“কেন? কেন তোমার সিনিয়র তোমার প্রতি দুর্বল হচ্ছে? নীশ কেন আমাকে ওভাবে ভালোবাসে না? কেন সে আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে তোমার এই যান্ত্রিক শীতলতায় আশ্রয় খুঁজছে?”

​আভান্তি তার হাতটা আলতো করে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
“তো তুমি কি এর জন্য আমাকে দায়ী করছ? সত্যি করে বলো তো রোদ, তোমাদের মধ্যে যদি সত্যিকারের ভালোবাসার বন্ধন থাকত, তবে কি আমি সামান্য একটা যন্ত্র হয়ে তোমাদের মাঝে ঢুকতে পারতাম? আর তোমার যদি সত্যিই মনে হয় আমার জন্য সিনিয়র তোমাকে ভালোবাসছে না, তবে তুমি আমাকে নষ্ট করে দাও। এখনই শেষ করে দাও আমার এই সার্কিট আর চিপস।”

রোদ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। আভান্তির নির্ভীক চাউনি তাকে যেন এক চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আভান্তি আবার বলতে শুরু করল,
“আমাকে তো কিছুদিন পরই প্রোগ্রামে নিয়ে যাওয়া হবে। একটা প্রেজেন্টেশন হিসেবে সাবমিট করে দেওয়া হবে। আমি তো ইচ্ছা করে তোমাদের মাঝে আসিনি, রোদ। আমি কেবল সিনিয়রের নিঃসঙ্গতার আয়না। তুমি যদি সেই আয়নায় নিজের পরাজয় দেখতে পাও, তবে আয়না ভেঙে কী লাভ?”

​আকাশ থেকে একটা বড় তুষারের কণা রোদের গালের ওপর এসে পড়ল। সে বুঝতে পারল, সে আজ একজন রক্ত-মাংসের মানুষের কাছে হারেনি, সে হেরে গেছে এমন এক অপার্থিব প্রতিযোগিতায় যেখানে তার প্রতিপক্ষ কোনো আবেগ বোঝে না, কেবল বোঝে আনুগত্য। ​রুফটপের সেই কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসে রোদের কান্নার শব্দটা যেন বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেল। তার চোখের জল তুষারের মতো জমে যাচ্ছে। সে আজ বড় বেশি নিঃস্ব। নিজের সবটুকু উজাড় করে ভালোবেসেও আজ সে একটা যন্ত্রের কাছে নিজের হারের কৈফিয়ত দিচ্ছে।

​আভান্তি কিছুক্ষণ চুপ করে রোদের কম্পিত অবয়বটা দেখল। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে এসে রোদের কাঁধে তার সেই কৃত্রিম উষ্ণ হাতটি রাখল। তার যান্ত্রিক কণ্ঠে এবার এক অদ্ভুত মায়া ফুটে উঠল। ​সে নরম স্বরে বলল,
“কেঁদো না, রোদ। বিশ্বাস করো, আমিও চাই না সিনিয়র আমার সাথে এভাবে জড়িয়ে পড়ুক। আমি কেবল একটা মেশিন, আমার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। আমি তো বারবার চেষ্টা করি যেন সিনিয়র তোমাকে ভালোবাসে, তোমার দিকে ফিরে তাকায়। কিন্তু তোমাদের মানুষের মন তো আর আমার কোডিং করা প্রোগ্রামের মতো নয় যে কমান্ড দিলেই বদলে যাবে।”

​রোদ মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে উঠতে লাগল। আভান্তি রোদের চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে বলল,
“আমার জন্য তুমি কষ্ট পেয়ে থাকলে আমি সত্যিই দুঃখিত, রোদ। কিন্তু এখন সময় নষ্ট করার মানে হয় না। সিনিয়র এখন তার ঘরে একা অস্থিরতার মধ্যে আছে। সে নেশার ঘোরে একটা হাত খুঁজছে, কারোর অস্তিত্ব চাইছে। অবচেতন মনে সে বারবার প্রলাপ বকছে। তুমি যাও সিনিয়রের কাছে। এই মুহূর্তে তার একজন মানুষের ছোঁয়া খুব দরকার।”

রোদ চমকে উঠে আভান্তির দিকে তাকাল,
“কিন্তু নীশ তো আমাকে… ও তো আমাকে দেখতেই পারে না। ও যদি জানতে পারে আমি ওর ঘরে গিয়েছি, ও হয়তো আমাকে চিরতরে ঘৃণা করবে।”

​আভান্তি রোদের হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,
“ভয় পেও না। সিনিয়র এখন গভীর ঘুমে আর নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন। উনি তোমাকে চিনতে পারবে না, কেবল অনুভব করবে যে কেউ একজন পাশে আছে। সিনিয়রের ঘুম ভাঙার আগেই তুমি চলে যেও। এই একটা রাত অন্তত তুমি তার পাশে কাটাও।”

​রোদ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার সামনে আজ এক নিষিদ্ধ সুযোগ। একদিকে তার আত্মসম্মান, অন্যদিকে নীশের প্রতি তার সেই আজন্ম তৃষ্ণা। আভান্তি তাকে আলতো করে ধাক্কা দিয়ে লিফটের দিকে এগিয়ে দিল,
​“যাও রোদ! সিনিয়রের তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন।”

রোদ ধীর পায়ে লিফটে গিয়ে ঢুকল। লিফটের দরজা বন্ধ হওয়ার আগে সে দেখল আভান্তি ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে—ঠিক যেন এক নিঃসঙ্গ প্রহরী।

নীশের ঘরের সামনে এসে রোদের বুকটা দুরুদুরু করে কাঁপতে লাগল। সে হাত বাড়িয়ে দরজাটা একটু ঠেলতেই সেটা খুলে গেল। ঘরের ভেতরে আবছা নীল আলো আর ভ্যাপসা মদের গন্ধ। বিছানায় নীশ এলোমেলোভাবে পড়ে আছে। সে ঘামছে আর বিড়বিড় করে কী যেন বলছে।

​রোদ পা টিপে টিপে বিছানার পাশে গিয়ে বসল। নীশের সেই রক্তমাখা স্মৃতির কথা সে জানে না, সে কেবল জানে তার সামনে শুয়ে থাকা এই মানুষটি আজ ভীষণ একা। নীশ হঠাৎ রোদের হাতটা খপ করে ধরে ফেলল। তার চোখ বন্ধ, কিন্তু সে হাতটা ছাড়ছে না।

​“যেও না… আমাকে ফেলে যেও না, আভান্তি… এই পুরো দুনিয়াতে আমার নিজের বলতে কেউ নেই। আমি এক এতিম সন্তান। আমার জীবনটা বড্ড এলোমেলো, বড্ড কষ্টের। এই জীবনে আমি তোমার মতোই একজন সঙ্গী চাই। যে আমার দ্বারা কষ্ট অনুভব করবে না। আমি চাইনা আমার এই এলোমেলো জীবনে কোনো রক্তে-মাংসের মানুষ এসে কষ্ট পাক।” নীশের কণ্ঠস্বর জড়িয়ে আসছে।

​রোদ ডুকরে কেঁদে উঠল। সে নীশের কপালে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি আভান্তিকে খুঁজছ? কিন্তু আমি তোমার সাথে আছি, নীশ। তুমি যতই আমাকে দূরে ঠেলে দাও, আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।”

চলবে…

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ