#অবহেলার_দিনগুলি
#অন্তিম -১
#ইলোরা_ফারদিন
জহির শরীর দিন দিন ভেঙ্গে যাচ্ছে। শরীর দুর্বল হয়ে পরেছে। এই তো এক বছর আগেই সুঠাম দেহের সুদর্শন একজন পুরুষ ছিল, কিন্তু আজ, আজ গলার নিচের হাড় বেরিয়ে এসেছে, মাথার চুল পরে যাচ্ছে, গালের চাবা বসে গিয়েছে। সব সময় জ্বর সর্দি লেগেই থাকে। অফিসের কাজ কর্মও আর আগের মতো করতে পারে না। তাই অফিস থেকে নোটিশ জারি করেছে তার জন্যে। যদি তিন মাসের মধ্যে সে আবার আগের মতো কাজের প্রতি মনোযোগী না হতে পারে, তবে তাকে নিচু পোস্টে ট্রান্সফার করা হবে। যদি সেখানেও সে নিজের কাজ দেখাতে না পারে তাহলে তাকে অফিস থেকে বরখাস্ত করা হবে। এসব চিন্তায় জহিরের মন ভালো নেই। তবে তার মন খারাপের আরো কিছু কারণ রয়েছে।
সেবার ডায়রিয়া থেকে সারার পর সে সুমনা আর তার বাচ্চাদের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। কিন্তু সুমনা দেখা করতে দেয় নি, নিজেও জহিরের সামনে আসে নি। তার কথা সে কোনো প্রতারকের সাথে দেখা করতে ইচ্ছুক না আর নাই বা ইচ্ছুক তার বাচ্চারা। বিচ্ছেদের সময় আদালতে জহির স্বেচ্ছায় বাচ্চাদের উপর নিজের সব অধিকার ছেড়েছিল। কিন্তু এখন অনুশোচনা হচ্ছে তার। বাধ্য হয় বাচ্চাদের স্কুলে যায় দেখা করতে। কিন্তু শিক্ষক যখন প্যারেন্টস রূমে নির্জন নাদিয়াকে ডেকে পাঠায়, তখন নির্জন নিজের বাবাকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তারপর শিক্ষককে কড়া কন্ঠে বলে,” আমার বাবা অনেক আগেই মারা গিয়েছে স্যার। ইনি আমার বাবা ইন। যেদিন থেকে ইনি আমার মাকে আমাদেরকে ছেড়ে আরেকটি আন্টির কাছে চলে গিয়েছিল সেদিন থেকে ইনি আমাদের কাছে মৃত।আর আপনি আমার মায়ের পারমিশন না নিয়ে কোন সাহসে এই লোকের সামনে আমাদের আনলেন। ইনি যদি আমাদের ক্ষতি করে। আমার বোনটার মানসিক অবস্থা ভালো নেই। এই মনস্টারটার জন্য আমাদের জীবনটাই এমনিতেই ট্রমাটাইজ। ইনাকে দেখে আমাদের ম্যান্টাল কন্ডিশন আরো খারাপ হয় যায়। তাই দয়া করে আর কোনোদিন এনার কথায় আমাদের সামনে আনবেন না। আমাদের মা ছাড়া আমাদের আর কোনো গার্ডিয়ান নেই।” বলেই বোনকে নিয়ে সে চলে যায়। এদিকে টিচারদের সামনে, অন্য প্যারেন্টস দের সামনে লজ্জায় মাথা নত করে জহির। তারপর আর সে সুমনা বা বাচ্চাদের সাথে দেখা করার চেষ্টা করে নি। তবে দু মাস আগে সুমনার বড় বোন রোমানা সুমনার বিয়ের ছবি দিয়েছে। সুমনার পাশে লোকটিকে মারাত্মাক মানিয়েছে। এমনকি বিচ্ছেদের পর সুমনার বয়স যেন দশ বছর কমে গিয়েছে। এতো সুন্দর লাগছিল সুমনাকে। জহির নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেছিল যে তার সংসারে সুমনার এই রূপ কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল?? কিন্তু উত্তর পায় নি। কিন্তু স্বার্থপর জহির বুঝলো না যে তার সংসারে সে সুমনার যত্ন নেয় নি বলেই সুমনা নিজের রূপ হারিয়েছিল।
জহিরের ভাবনার মাঝেই রিতা ঘরে আসলো। হিসহিসিয়ে বলল,” আমি আজ রাতে মৌনতাদের সাথে সিলেট যাচ্ছি। তুমি খেয়ে ঘুমিয়ে পরিও।”
” সিলেট যাচ্ছো মানে? আজ যাবে, আর তুমি এখন আমাকে বলছো? ফাজলামি পেয়েছো? আমার ১০৩ ডিগ্রি জ্বর। আমাকে এই অবস্থায় ফেলে তুমি ঘুরতে যাচ্ছো রিতা? একবারও মনে হচ্ছে না যদি রাতে আমার শরীর আরও খারাপ হয় তখন কি হবে? একটাবারও ভেবে দেখেছো?
শুনতে খারাপ লাগলেও আমার সত্যি মনে হচ্ছে তুমি আমাকে কোনোদিন ভালোই বাস নি রিতা। এই যে আমি এতোগুলো মাস ধরে অসুস্থ, একটা দিনও আমাকে এক গ্লাস পানিও এগিয়ে দাও নি, সেবা তো আমার কল্পনা। এই যে আজ দুপুরেও আমি সব খাবার বমি করে ফেলেছি। কিন্তু সে সময় তুমি আমার পাশে থেকেও এগিয়ে আসো নি। উলটো আমার বমি দেখে নাক চেপে খাবার ফেলে বারান্দায় চলে গিয়েছিল। এরপর আমার আশেপাশেও আসো নি। এই যে আমার অসুস্থ শরীর, পেট খালি খোজ নিয়েছো? নাও নি?
এটাকে কি ভালোবাসা বলে রিতা? এই তোমাকে ভালোবেসে আমি আমার বারো বছরের সংসার, স্ত্রী, সন্তান সব ছেড়েছি। কিন্তু বিনিময়ে কি পেলাম? নিজের অসুস্থতায় তোমার নির্লিপ্ততা, তোমার উদাসীনতা?
এই আমি যখন সুমনার সাথে ছিলাম, আমার সামান্য হাচিতে সে বিচলিত হয়ে যেত। আমার জ্বর হলে সারারাত সে পাশে বসে থাকত, সময়মতো আমাকে ওষুধ দিত, আমার জন্য আলাদা করে খাবার রান্না করতো। এখন তো মনে হয় সুমনাই আমাকে ভালোবাসতো।”
জহিরের কথায় চটে গেল রিতা। রাগে ফুল দানিটা হাতে নিয়ে ফিকে মারলো মিররের দিকে। মুহুর্তের মাঝে ফুলদানিটা ভেঙে গুড়োগুড়ো হয়ে গেল। তারপর হিসহিসিয়ে বলল,” ভুলেও তোমার প্রথম স্ত্রীর সাথে আমার তুলনা করবে না জহির। আমি সুমনা নই। সুমনা যদি এতোটাই ভালো হতো, তাহলে ছাড়লে কেনো? ওহ তখন তো তোমার আমার সুন্দর শরীরের প্রতি লোভ জেগেছিল। তাই না? ”
” রিতা, মুখ সামলে কথা বলো।”
” পারব না। আমি সুমনা না, আমি রিতা। তাই আমার সাথে সুমনার তুলনা করতে এসো না। এতো খারাপ লাগলে যাও সুমনার কাছে চলে যাও।” রেগে বলল রিতা
রিতার কথায় তাচ্ছিল্য হাসলো জহির। তারপর বলল,” এই আমাকে নিজের কাছে রাখার জন্য সুই*সাইড করতে চেয়েছিলে তুমি। আর সেই তুমি আজ আমাকে চলে যেতে বলছো? আজ আমার বড্ড বেশি অনুশোচনা হচ্ছে জানো তো রিতা। নিজের সুখকে আমি নিজের হাতেই কবর দিয়েছি। আর সেটার শাস্তিই বুঝি আজ পাচ্ছি।”
জহিরের কথায় রিতা কি উত্তর দিবে খুজে পেল না। আসলেই তো, এই জহিরকে পাওয়ার জন্য কত কিই না করেছে, কত পাগলামিই না করেছে। অতীতের দিনগুলো কত সুখেরই না ছিল। কিন্তু হুট করে যে কি হলো। সব এলোমেলো হয়ে গেল। জহিরের অসুস্থতা যত বাড়তে লাগলো, জহিরের প্রতি রিতার বিরক্তিগুলোও নাড়তে লাগলো। তার উপরে আবার ধীরে ধীরে জহির কেমন জানি হয়ে গেল। সব কিছুতেই জহিরের অনুমতি নিতে হয়। দম বন্ধ লাগে রিতার। রিতা আর কিছু না বলে নিজের ব্যাগটা নিয়ে বাসার বাহিরে চলে গেল।
আর জহির বারান্দায় থম মেরে বসে থাকলো।
—————-
অস্ট্রেলিয়ায় একটি ছিমছাম বাড়িতে সুমনার নতুন সংসার। হ্যা, সুমনা বিয়ে করেছে। তবে বিয়েটা ছিল নিজের আর তার সন্তানদের জন্য। কারণ আমরা মেয়েরা যত বড় বড় কথা বলিই না কেনো, আমাদের একজন অভিভাবকের খুব প্রয়োজন, কারণ আমরা মেয়েরা খুবি আবেগ প্রবণ, তাই বিপদ আমাদের পিছনে ঘুরে। এই অভিভাবক আপনার বাবা, ভাই, স্বামী বা ছেলে। যেহেতু সুমনার বাবা বেচে নেই, তার ভাইও নেই, স্বামীও নেই, ছেলেটার বয়স কম, তাই তার একজন অভিভাবকের প্রয়োজন ছিল। তাই তো দ্বিতীয় বারের মতো বিয়ে করেছে মিনহাজ আহমেদকে। দুই বছর আগে তার স্ত্রী মারা যায়। তারপর থেকেই দেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ায় থিতু হয়।
নিজের ঘরের জানালার পাশে বসে চা খাচ্ছে সুমনা। মনে পরে গেল মিনহাজ আর তার প্রথম দেখা।
অতীত,
ঢাকার একটি ব্যস্ত রেস্টুরেন্টে মুখোমুখি বসে আছে মিনহাজ আর সুমনা।
নিরবতা সুমনাই নিজের কথা শুরু করলো,” মিনহাজ সাহেব, আমি বেশি লুকোচুরি পছন্দ করি না। আমি বিয়েটা করছি শুধুমাত্র আমার আর আমার বাচ্চাদের মেরুদণ্ড শক্ত করতে, আমাদের একজন অভিভাবক দরকার। স্ত্রী হিসেবে আপনার সব চাহিদাও মেটাব। কিন্তু আমার কাছে ভালোবাসার আশা করবেন না। বারো বছর একটা কাপুরষকে শয়তান জানো*য়ার প্রতারককে ভালোবেসে ঠকেছি। তাই আর এইসব অনুভূতি নিজের মনে জাগানোর সাহস নেই। এখন দেখেন আমাকে বিয়ে করলে আপনার পোষাবে কি না।”
মিনহাজ হালকা হেসে বললো,” আপনি আমার সাথে মানিয়ে নিতে পারলে আমার সমস্যা নেই। আমার একটি পরিবার দরকার। তাই আপনাকে আপনার বাচ্চা সহ বিয়ে করতে চাই। আমার বাবা মা নেই। দুটো বোন আছে, তারা যে যার সংসারে ব্যস্ত। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আমি অস্ট্রেলিয়ায় একাকীত্বের জীবন কাটাচ্ছি। কিন্তু দু মাস আগে আমার হার্ট অ্যাটাক হয়। আমি বাসায় একা ছিল। ভাগ্যক্রমে সেদিন আমার পিএ অফিসিয়াল কাজে আমার বাসায় এসে আমাকে অজ্ঞান অবস্থায় পায়। সময়ের মধ্যে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ায় এবং সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় সেই যাত্রায় আমি বেচে যাই। কিন্তু সেদিন আমি অনুভব করি আমার একটি পরিবার দরকার। আপনার দুলাভাই আমার বন্ধু হওয়ায়, সে আপনার কথা আমাকে বলে।”
সুমনা কি মনে করে জিজ্ঞেস করলো, ” আপনার স্ত্রী কিভাবে মারা গিয়েছে?”
” মারা যায় নি, আমি নিজেই তাকে মে*রেছি।”
হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো সুমনা, কথার খেই যেন হারালো।
চলবে….
#অবহেলার_দিনগুলি
#অন্তিম -২
#ইলোরা_ফারদিন
“আমার আর ভালো লাগছে না চৈতী। দম বন্ধ লাগছে এই সম্পর্কটাতে। এখন মনে হচ্ছে বিয়ে করেই ভুল করেছি।” হতাশ কন্ঠে বলল রিতা
” কি বলিস? নিজেই তো ওই বুইড়াটাকে নাচতে নাচতে বিয়ে করলি। ও নাকি তোর ট্রু লাভ। ” হাসতে হাসতে বলল চৈতী
“সত্যি বলতে বিয়ের আগে তাই ই মনে হতো। জহির সব সময় আমাকে সব বিপদ থেকে প্রোটেক্ট করতো। আমাকে আগলে রাখতো। আমার ছোট খাটো বিষয় খেয়াল রাখতো। ধর কখনো কাজের মাঝে যদি আমার বিরক্তি লাগলো, সাথে সাথে সে আমার মন ভালো করতে আমার পছন্দের বার্গার অর্ডার দিত। সব সময় আমাকে স্পেশাল ফিল করাতো। ও যখন আমার পাশে থাকতো আমার নিজেকে অনেক বেশি নিরাপদ মনে হতো। ও আমার পছন্দ অপছন্দ সব কিছুর প্রতি দৃষ্টি রাখতো। আমি বলেছিলাম আমার সমুদ্র পছন্দ। সে আমার জন্মদিনে আমাকে সেন্ট মার্টিন নিয়ে যায়। সৈকতে স্পেশাল ডেটের আয়োজন করে। চারপাশে কি সুন্দর লাইটিং করা ছিল। এরকম হাজার হাজার বার সে আমাকে স্পেশাল ফিল করিয়েছে। একদম বাচ্চাদের মতো কেয়ার করতো। তার চলাচল, তার গোছানো কথাবার্তা সব কিছুই আমাকে মুগ্ধ করতো। আমি তার প্রতি ভয়ংকর ভাবে আসক্ত হয়ে পরেছিলাম।
বিয়ের পর কয়েকমাস সব ঠিক থাকলেও ধীরে ধীরে সব এলোমেলো হতে লাগলো। আমি আবিষ্কার করলাম যেই গোছানো মানুষকে আমি ভালোবেসেছিলাম ওটা মোটেও জহিরের আসল রূপ ছিল না।
তুই জানিস চৈতী, টয়লেট করে ও ফ্লাশ করতে ভুলে যায়। পরে আমি গেলে দেখি পুরা কোমডে ময়লা। আর গন্ধ তো আছেই। মাঝে মাঝে সে মনের ভুলে আমার ব্রাশ দিয়ে ব্রাশ করে। তাই এখন আমি নিজের ব্রাশ লুকিয়ে রাখি। গোসল করে ভেজা গামছা বিছানায় ফেলে রাখে। ঘর অগোছালো করে রাখে। বিছানায় বসে টিভি দেখতে দেখতে খায়, আর পুরো ঘর নোংরা করে রাখে। দিনে নাহয় বুয়া এসে কাজ করে দেয়। রাতে আমাকেই করতে হয়। তার উপর আবার দুই দিন পর পর তার শরীর খারাপ হচ্ছে। সারাদিন নাক দিয়ে ফ্যাস ফ্যাস করে সর্দি পরে আর জ্বরে কোকায়। ঘেন্নায় আমার গা গুলায়। কয়েকমাস আগে তো আবার ডায়রিয়া হলো। ভাইরে ভাই সেই কি গন্ধ ঘরে। ওর দেখতে এখন সত্তর বছরের বুড়া মনে হয়। আমি শারীরিক ভাবেও স্যাটিসফাইড না। আর ঘোরাঘুরি? সেটা আমার জন্য স্বপ্ন। অফিসেও ওর ডিমোশন হয়েছে। মে বি চাকরিটাও থাকবে না। পরের মাস থেকে একটি বুয়াও আসবে না। কারণ টাকার সংকট।
বিয়ের পর আমি চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম জহির তো আছেই। কিন্তু এখন দেখি আমি নিজের মেকাপের জিনিসপত্রও ঠিকভাবে কিনতে পারছি না। বিয়ের আগে জহির আমাকে কেয়ার করতো, আর এখন আশা করে যে আমি ওর দাসী হয়ে থাকব, ওর সেবা যত্ন করব, ওর জন্য তিন বেলা খাবার বানাবো।
পারবো না এসব করতে চৈতী। আমার দ্বারা এসব সম্ভব না।” মন খারাপ করে বলল রিতা
“বিয়ের এই কয়েক মাসেই এই অবস্থা, তাহলে ভাব জহিরের প্রথম স্ত্রী বারো বছর কিভাবে সংসার করলো। কত সেক্রিফাইস করেছিল সে নিজের সংসারের জন্য। আর তুই তার হাতে গড়া সেই সংসারটাই কেড়ে নিল। এমনকি তার হাতে সাজানো বাসাটাও নিয়ে নিলি। আর এখন বলছিস জহিরকে ভালো লাগে না?” তাচ্ছিল্য স্বরে বলল চৈতী।
সুমনার কথা উঠতেই তেতে উঠলো রিতা। হিসহিসিয়ে বলল,” খবরদার ওই মহিলার সাথে আমার তুলনা করতে আসবি না। ওর নিজের স্বামী আটকানোর মূরদ ছিল না বলেই ওর স্বামী আমার পেছনে আসছে। এমন কি আমি যদি জহিরকে লাথিও মারি, তবু ও এসে আমার পা চাটবে। কোনোদিন আমাকে ছেড়ে যাবে না। এটা আমার যোগ্যতা। আর ওই সুমনার ব্যর্থতা। এখানে আমার কোনো দোষ নেই।” বলেই উঠে চলে গেল রিতা
রিতার চলে যাওয়া দেখলো চৈতী। বিরবিরিয়ে বলল,” আমি দোয়া করি রিতা তোর এই অহংকার ভাঙ্গুক। একটা মেয়ের সাজানো সংসার ভাঙার শাস্তি তুই যেন পাস, দুটো বাচ্চা থেকে তাদের বাবা কেড়ে নেয়ার শাস্তি যেন তুই পাস। মন থেকে দোয়া করি আমি।”
____________
“আমার স্ত্রী রুপন্তির সাথে আমার পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়। ওর বয়স কম ছিল। সবে ১৭… কিন্তু পড়াশুনার প্রতি ছিল তার প্রবল আকর্ষণ। আমিও ওকে সেই সুযোগ দিলাম। এরই মধ্যে আমাদের মেয়ে প্রিয়া পৃথিবীতে আসলো। প্রিয়ার ভালো ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমি অস্ট্রেলিয়া চলে আসলাম। সময় যেতে লাগলো।
একদিন হুট করেই বাংলাদেশ থেকে খবর এল আমার মেয়ে নিখোঁজ। আমি আর দেরি না করে দেশে ফিরে গেলাম। সাত দিন পর আমার মেয়ের খন্ডিত দেহ পাওয়া গেল। সেদিন আমি পাগলের মতো কেদেছিলাম। তারপর নিজেকে ঘিরবন্দি করে ফেললাম। এভাবে পুরো একটা মাস কেটে গেল। কিন্তু আমি অবাক হয়ে দেখলাম আমার স্ত্রী একদম স্বাভাবিক। তার মাঝে কোনো কষ্ট নেই। উলটো সে আমাকে বোঝাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া ফিরে যাওয়ার জন্য। আমার সন্দেহ লাগলো। আমি গোপনে পুলিশকে এ বিষয়ে জানালাম। তারপর তদন্ত করে পাওয়া গেল আমার স্ত্রীর পর*কীয়া বিষয়ে আমার মেয়ে জেনে গিয়েছিল। মেয়ে আমাকে সব জানাতে চেয়েছিল বলে আমার স্ত্রী আর তার প্রেমিক নির্মম ভাবে আমার বাচ্চাটাকে মে*রে ফেলে। পেপারেও উঠেছিল এই ঘটনা। রুপন্তিকে জেলে নেওয়ার পরেও আমার রাগ কমে নি। তাই আমার ওই পুলিশ বন্ধুর সহায়তায় জেলে ঢুকি। এরপর নিজের হাতে ওর মু*খে বি*ষ ঢে*লে দিই। পরবর্তীতে টাকা দিয়ে মিথ্যে রিপোর্ট বানানো হয় যে রুপন্তি হার্ট অ্যাটাক করেছে।
এখন আপনিই বলুন সুমনা, আমি কি ভুল করেছি?” সুমনার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো মিনহাজ
সুমনা মিনহাজের দিকে তাকিয়ে, হালকা হেসে উত্তর দিল,” মোটেও না। এর চেয়েও করুন মৃ*ত্যু হলে আমার আত্মাটা শান্তি পেত। যেই মা নিজের স্বার্থে, নিজের গর্ভজাত সন্তানকে এতো হিং*স্রভাবে মে*রে ফেলতে পারে, সেই মা কোনো ক্ষমা ডিজার্ভ করে না মিনহাজ।”
চলবে…
#অবহেলার_দিনগুলি
#অন্তিম
#ইলোরা_ফারদিন
“জহির তোমার এইচ আই ভি পজিটিভ। ”
কথাটি শোনা মাত্রই জহিরের গলা শুকিয়ে গেল। কিভাবে কি হল, তার মাথা কাজ করছে না। কাপা কাপা গলায় ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলো, ” এটা কিভাবে সম্ভব ডক্টর। ”
” যদি আপনি কোনো এইডস রোগীর ব্যবহৃত ব্লেড, রেজার, সুচ ব্যবহার করেন, বা আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত গ্রহণ করেন, আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে শা*রিরীক সম্পর্ক স্থাপন করেন , তবে আপনিও এই রোগে আক্রান্ত হবেন।”
” কিন্তু আমি তো এসব করি নি।”
“তা তো জানি না আমি।”
ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এসেছে জহির। কিন্তু পা যেন তার চলছেই না। কি থেকে কি হয়ে গেল। কিভাবে হলো এসব? মাথা কাজ করছে না তার! আর রিতা? সে তো এই কথা জানতে পারলে সাথে সাথেই তাকে ছেড়ে দিবে। একেবারে নিঃস্ব হয়ে যাবে জহির। প্রথম স্ত্রী সন্তানরা নেই, চাকরি নেই, টাকা নেই, এখন যদি রিতাই না থাকে। ঘামতে শুরু করলো জহির।
কাপা কাপা শরীরে বসে পরলো ফুটপাতে। চোখের সামনে ভাসতে লাগলো তার জীবনের শুরু থেকে এখন অব্দি ঘটা পুরো ঘটনা।
নিজে পছন্দ করেই বিয়ে করেছিল সুমানাকে। সংসারে তখন অনেক অভাব। কিন্তু সুমনা কিভাবে যেন সব মানিয়ে নিয়েছিল। কোনো আলাদা চাহিদা ছিল না তার। কোনোদিন মুখ ফুটেও বলতো না আমাকে একটি শাড়ি কিনে দেও। উলটো জহিরের যখন প্রথম চাকরিটা চলে যায় তখন তার মায়ের দেয়া এক ভরির গলার চেনটি বিনা বাক্যে বেচে দিল। সেই চেন বিক্রির টাকায় ছয় মাস চলেছিল। খুজে দেখলে এরকম হাজারটা ঘটনা সামনে চলে আসবে যেখানে সুমনা নিজের হাজার হাজার শখ-আহ্লাদ-শখের জিনিস বিসর্জন দিয়েছে শুধুমাত্র সংসারের পেছনে। তার ইনকাম বাড়ার পরেও সুমনা কোনোদিন বারতি খরচ করে নি। টাকা জমিয়েছে, একটি নিজের সুন্দর বাসা বানাতে। কতই না সুখের সংসার ছিল তার।কিন্তু জহির কি করলো নিজের স্ত্রী সন্তানদের সাথে প্রতারণা করলো। রিতাকে পেতে স্ত্রী সন্তানকে ছাড়লো, এমনকি সুমনা আর বাচ্চাদের উপর থেকে আশ্রয়ও কেড়ে নিল। বাবা হিসেবেও সে ব্যর্থ। তার আপন সন্তানরাও তাকে ঘৃণা করে। কিন্তু যেই রিতার জন্য সে এতো অন্যায়, এতো পাপ করলো সেই রিতা তাকে কোনোদিনও ভালোবাসে নি। সে ছিল রিতার চাহিদা পুরণের মেশিন। যখন দেখলো সেই মেশিনটা আর কাজে দিচ্ছে না, টাকা-বিলাশিতা দিতে পারছে না তখনি তার আসল রূপ বেরিয়ে আসলো।
জহির মনে মনে ভাবলো, পাপ তো সে একা করে নি। রিতাও সে পাপের সমান ভাগিদার। একজন নারী হয়ে আরেকজন নারীর ঘর ভেঙেছে, ইচ্ছে করে মাথার আশ্রয় কেড়ে নিয়েছে, সন্তানদের থেকে তাদের বাবাকে আলাদা করেছে। শাস্তি তো রিতারও প্রাপ্য। মনে মনে নতুন খেলার ছক কষলো জহির।
————–
” জহির তোমার সাথে আমার জরুরি কথা আছে।” নির্লিপ্ত কন্ঠে বলল রিতা
” ডিভোর্স চাও?” তাচ্ছিল্য হেসে বলল জহির
” বুঝতে পেরেছো যেহেতু, ভালো। আমার দমবন্ধ লাগছে তোমার এই সংসারে। আমি একটু শান্তিতে বাচতে চাই জহির।”
অট্টস্বরে হেসে উঠলো জহির। তারপর বলল,” শান্তি চাও? যাও চলে, কিন্তু আমার প্রথম স্ত্রী আর সন্তানদের ফিরিয়ে দিতে পারবে যাদের আমি তোমার জন্য ছেড়েছিলাম?”
” তুমি কোনো দুধ খাওয়া বাচ্চা নও জহির। যা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে নিজে নিয়েছিলে। আমি জোর করি নি।”
” আত্মহ*ত্যার হুমকি কে দিত রিতা? আমাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল কে করতো?”
” আমি কে ছিলাম? কেনো তুমি আমার ওসব হুমকিকে পাত্তা দিয়েছিলে। কেনো হুমকিতে নিজের সংসার ভেঙেছো। দোষী তুমি। আমি না। যাই হোক। কাবিনের ত্রিশ লাখ টাকা দিয়ে দিও।”
” তুমি জানো রিতা আমার কাছে ত্রিশ লাখ কেনো, পঞ্চাশ হাজার টাকাও নেই।” করুণ কন্ঠে বলল জহির
“সেটা আমার ব্যাপার না। এই বাসাটা আছে, এটা বিক্রি করে দিও।”
” আচ্ছা দিব, কিন্তু তার বিনিময় চাই।” বাকা হেসে বলল জহির
” কি চাও?” অবাক কন্ঠে বলল রিতা
” আজকের রাতটা।”
“রাজি আমি।”
জহির আর কিছুই বলল না। এগিয়ে গেল রিতার দিকে।
——————-
আজ এক বছর হলো জহির আর রিতার ডিভোর্সের। রিতা এখন ব্যস্ত তার নতুন অফিসের বসকে পটাতে। কিন্তু রিতার শরীরের অবস্থা ভালো নেই। শরীর ধীরে ধীরে ভেঙে পরছে। জ্বর সর্দি লেগেই থাকে।
রিতা আজ ছুটি নিয়েছে। জ্বরটা বেরেছে। হুট করেই কলিং বেল এর শব্দে সে তড়িঘড়ি যেয়ে দরজা খুললো। তার নামে পারসেল এসেছে। পারসেল খুলতেই একখানা মেডিকেল রিপোর্ট চোখে পরলো। নাম দেখলো জহিরের। তারপর রিপোর্ট এ চোখ বুলাতেই হাত পা কেপে উঠলো তার। এক বছর আগের রিপোর্ট। এউচ আই ভি পজিটিভ। তার মানে!!! বুঝতে বাকি রইলো না রিতার। সেদিন জহির বিনিময়ে তার কাছে একটা রাত চেয়েছিল বটে, কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল নিজের রোগ রিতার মাঝে দেয়ার। আর সেটাই হয়েছে। রিতা ভয়ে, আতংকে হাউমাউ করে কাদতে লাগলো। এখন কি হবে তার?
__________
বাড়ি বিক্রির পর জহির তার গ্রামের বাসায় ফিরে গিয়েছে। বাসা বিক্রির ভালোই টাকা পেয়েছিল। ওখান থেকে ত্রিশ লাখ রিতাকে দিয়ে বাকি পঞ্চাশ লাখ জহিরের কাছে ছিল। ওগুলো ব্যংকে রেখেছে। প্রতিমাসে যা মুনাফা আসে ওটা দিয়েই দিব্যি চলে যায়। কিন্তু শরীরটা দিন দিন আরও ভঙ্গুর হয়ে যাচ্ছে। দেখলে মনে হবে আশি বছরের বৃদ্ধা। তবু চলছে জীবন। চলুক। পাপ করেছে, শাস্তি তো পাবেই।
———-
সাত মাসের গর্ভবতী সুমনা। জীবনটা বেশ চলছে তার। মিনহাজ চমৎকার একজন মানুষ। বাচ্চারাও এখন খুব সুখী। মিনহাজকেই তারা নিজের বাবার মতো ভালোবাসে।
ধীর পায়ে সুমনা জানালার পাশে এসে দাড়ালো। মনে মনে বলল,” তুমি কোনোদিন জানতেই পারবে না জহির তোমার শরীরে ওই মরণব্যাধির ভাইরাস প্রবেশের মূল কারিগর আমি। সেদিন তোমার চায়ে ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পারিয়ে রেখেছিলাম নিজের কার্য সিদ্ধির জন্য। তারপর জানোই তো একজন মানুষ কিভাবে ওই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়!!!!”
আমি সুমনা। আমি যেমন ভালোবাসতে জানি, ভালোবেসে জীবন দিতে জানি, তেমনি ভাবে যাদের ঘৃণা করে তাদেরকে তাদের প্রাপ্যটা বুঝিয়ে দিতেও জানি।”
সমাপ্ত।
