#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_০১
“বোনের শ্বশুরবাড়িতে এসে চুরি করে খাচ্ছো? ছিঃ ছিঃ! এই শিক্ষাই দিয়েছে তোমার বাবা? কেমন হাভাতে ঘরের মেয়ে গো তুমি!”
অমলেটের একটু অংশ ছিঁড়ে ঠান্ডা ভাতের সাথে মেখে সবে মুখে পড়েছিল মম। তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো এক কর্কশ কন্ঠস্বর। চিনতে অসুবিধা হলো না মমর কণ্ঠের মালিককে। শুকনো ভাত গলাতেই আটকে গেলো। সেটা আর গেলা হলো না মমর। তার আগেই পাশ থেকে যোগ হলো আরেকটা পরিচিত কন্ঠ।
“মা ছাড়া বড় হলে যা হয় আরকি! বড় বোনের তো কেলেংকারীর শেষ নেই। এখন দেখছি ছোটটার স্বভাবেও দোষ আছে। যত্তসব জ্বালা হয়েছে আমার! সব আপদ আমার ঘাড়েই এসে জুটলো!”
জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে তাতে চুমুক দিল মম। এই ভাত আর তার খাওয়া হবে না, সেটা সে বুঝে গেছে। মম পানিটা শেষ করার আগেই প্রথমজন আবারো বলতে শুরু করলো,
“আমরা ভালোমানুষি দেখাতে গিয়েই ফেঁসে গেছি আম্মা! বড় বোন তো মান ইজ্জত সব পাটায় বেটে খেয়ে সেরেছে। সেই ধকল সামলাতে না পেরে বাপটা গিয়ে ভর্তি হলো হাসপাতালে। আর আমরা এখন বাড়িতে এসব ছোটলোক জায়গা দিয়ে ঝামেলা পোহাচ্ছি।”
চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো মমর। কথাগুলো হজম করা কষ্টসাধ্য হলেও বোনের কথা চিন্তা করে শান্ত রইলো সে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে গম্ভীর আওয়াজে বললো,
“সরি আন্টি। আমি আসলে মাংস খেতে পারিনা। তাই একটা ডিম ভেজে নিয়েছিলাম। আমি বুঝতে পারিনি, এই সামান্য একটা ডিমের জন্যে আপনারা আমাকে চোরের অপবাদ দিয়ে বসবেন।”
মমর কথা শুনে চোখ বড় বড় করে তাকালেন জান্নাতী। সম্পর্কে মমর মেঝ বোন, ঝিনুকের জা হয় সে। আর তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন ঝিনুকের শ্বাশুড়ি।
মুমতাহিনা আহমেদ মম।
বয়স সবে সতেরোর গণ্ডি পেরিয়ে আঠারোতে পড়েছে। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শেষ হয়েছে এইতো কিছুদিন। এই বয়সটা সাধারণত অন্যরকম থাকে। সদ্য তারুণ্যে প্রবেশ করা কিশোরীরা বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে হাওয়ায় ভাসে এসময়। তবে মমর ক্ষেত্রে স্বপ্নগুলো ঠিক ধরা ছোঁয়ার নাগালে আসার সুযোগ পায়নি।
জন্মলগ্নে মাকে হারিয়ে বড় দুই বোনের ছায়ায় বড় হয়েছে মম। সেই ছায়াটা শুধু মমতার ছিল না, ছিল অভ্যাসেরও। কিন্তু বাস্তবতার প্রচন্ড তেজী রোদের সামনে টেকেনি সেই ছায়াটা। বড় বোন, পাখি ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজের জীবনে, আর ঝিনুক ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজের সংসারে।
মম, আর মামুন সাহেব অনেকটাই একা হয়ে যান এরপর। মম দেখে তার দুই বোনকে। গর্ব করার মত দুই মেয়ে মামুন সাহেবের। তবে কোথাও না কোথাও অপূর্ণতা, অসম্পূর্ণতা ঠিক ঘিরে রেখেছে তাদের।
পাখি আপুর নাম এখন সর্বত্র। টিভিতে, অনলাইনে, পত্রিকার হেডলাইনে, এখন শুধু একটাই নাম শোনা যাচ্ছে, অনামিকা আহমেদ পাখি। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, সমাজসেবী, উইমেন আইডল, আরও কত বিশেষণ যোগ হয়েছে তার আপুর নামে! অনামিকা আহমেদ পাখি সেই নাম, যেটা নেবার আগে দুবার ভেবে কথা বলতে বাধ্য আন্তর্জাতিক মিডিয়া।
কিন্তু এবারের সমালোচনার ঝড়টা ভিন্ন। সেই ঝড় যখন ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়লো তাদের ছোট্ট পরিবারে, তখন বিশেষণগুলো কোনো কাজে আসেনি। দুর্বৃত্তরা দরজা ভাঙল, বাড়িঘর তছনছ করলো। মামুন আহমেদ সব দেখলেন, সব সহ্য করলেন। পাখির সাথে ও তার ব্যাপারে কথা বলা অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছেন উনি। বুকের ভেতরে একরাশ ভয়, অপারগতা ও ক্লান্তি এসে জমেছিল ওনার। এই ঘটনার পর আর শেষ রক্ষা হলোনা।
হাসপাতালের বেডে এখন শুয়ে আছেন তিনি। হার্টে ব্লক, রিং পরানোর মতো অবস্থা নেই। চব্বিশ ঘণ্টা অবজার্ভেশনে রাখা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে একা থাকাটা নিরাপদ নয়। সেকথা ভেবেই ঝিনুক নিয়ে এসেছে ছোট বোনকে নিজের কাছে। ঢাকার একটা স্বনামধন্য কলেজে অধ্যাপনা করে ঝিনুক। শ্বশুরবাড়িতে আলাদা কদর আছে তার।
এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। বাড়ির ছোট বউ হিসেবে সে নিজেকে গড়ে নিয়েছে যত্নে, বুদ্ধিতে, ধৈর্যে। কিন্তু পাখির কথা উঠলে এই বাড়ির লোকেদের জিভ একটু আলগা হয়ে যায়। সমালোচনা করেন বাইরের লোকেদের সাথে তাল মিলিয়ে, তবে শব্দ মেপে, নিপুণ দক্ষতার সাথে। যতটুকু বললে গা বাঁচিয়ে হাসি ঠাট্টায় কথা উড়িয়ে দেয়া যায় ততটুকুই। কারণ অনামিকা আহমেদ নামের একটা ওজন আছে, যা সময়ে সুযোগে বেশ ভালোভাবেই ব্যবহার করে আসছে এই পরিবার।
মম এই সমীকরণের কোথাও পড়ে না।
সে পাখি নয়, ঝিনুকও নয়। সে শুধু একটা আঠারো বছরের তরুণী মেয়ে, যার বাবা হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায়, যার বাড়িতে হামলা হয়েছে, যার যাওয়ার জায়গা এই মুহূর্তে নেই। এই বাড়িতে সে এসেছে আশ্রয় নিতে। কিন্তু সেটা যে ঝিনুকের শ্বশুরবাড়ির কেউ পছন্দ করছে না, সেটা উঠতে বসতে টের পায় সে।
এই যেমন এখন! সারাদিন ডাক্তারদের পেছনে পেছনে দৌড়েছে মম। কিছু টেস্ট করিয়ে, রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারকে দেখিয়ে, আবার নতুন করে টেস্ট করাতে নিয়ে যেতে হয়েছে মামুন সাহেবকে। ঝিনুক ব্যস্ত কলেজে, আসার সময় করে উঠতে পারেনি। দৌড় ঝাঁপ, ধকল যা যাবার মমর উপর দিয়েই যাচ্ছে। সকালে নাস্তাটাও করা হয়ে ওঠেনি। দিনশেষে বাড়ি ফিরে তাই সাতপাঁচ না ভেবেই খেতে বসে পরেছিল সে। ভুলে গিয়েছিল, এটা তার নিজের বাড়ি নয়। এখানে ভাতের হাঁড়িতে হাত দেবার আগে, অনুমতির প্রয়োজন।
“কথা শুনেছেন আম্মা! বলি এই মেয়ে, তোমার কি চক্ষুলজ্জাও নেই? বাপটা হাসপাতালে মরতে বসেছে, তোমার গলা দিয়ে খাবার নামে কি করে? আমরা হলে তো পানিও গিলতে কষ্ট হতো। আর তুমি? নবাবী হালে থাকছো, খাচ্ছো-দাচ্ছো, ঘুমাচ্ছো, বেড়াচ্ছো। তারউপর আবার এটা না সেটা চাই। ফরমায়েশের শেষ নেই! কেমন মেয়ে জন্ম দিয়েছে তোমার বাবা!”
ঝাঁঝালো গলায় ধিক্কার জানিয়ে বললেন জান্নাতী বেগম। বড় ছেলের বউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে এবার ঝিনুকের শ্বাশুড়িও বলে উঠলেন,
“ওকে বলে আর কি হবে? বড়টাকে দেখেই শিক্ষা নিচ্ছে। দেখছো না? বাপ যে হাসপাতালে ভর্তি, মেয়ের কোন হুশ আছে? না কোন ফোন, না কোন খবর! কোন দেশে, কার সাথে গিয়ে পড়ে আছে কে জানে! এইজন্যেই বলে মেয়ে মানুষ অনেক সাবধানে পালতে হয়। এত ছুট দিতে নেই। দুনিয়া চষে বেড়ানো মেয়েছেলেরা কি ভালো হয় নাকি! আগে কেউ মুখ খোলার আগেই গায়ে ফোস্কা পড়তো ওর বাপের। কিন্তু এখন? এখন তো পুরো দুনিয়া দেখছে, বলছে, থু থু ছিটাচ্ছে! টাকার নেশায় পরে উচ্ছন্নে গেছে মেয়ে, এখন ঠেলা সামলাও!”
চোখমুখ বিকৃত করে বলা ঝিনুকের শ্বাশুড়ির কথাটা গরম সিসার মত ঠেকলো মমর অন্তকর্নে। মা সমতুল্য বোনকে নিয়ে এধরনের বাজে মন্তব্য একদম নিতে পারে না সে। তবুও নিজেকে সংযত রেখে সে থমথমে মুখে বললো,
“আন্টি, দয়া করে একটু ভেবে চিন্তে কথা বলুন। আমার কোন আচরণে যদি আপনাদের সমস্যা হয় বা খারাপ লেগে থাকে, তার জন্যে আমি ক্ষমা চাইছি। তবে আমার আপুকে নিয়ে আমি কোন কথা সহ্য করতে পারবো না। ওনাকে নিয়ে কোন কথা বলবেন না, প্লীজ।”
“ওরে বাবা রে! ওনার বোনকে নিয়ে কিছু বলা যাবেনা! কেন গো? তোমার বোন জাত-পাত ভুলে আকাম কুকাম করে বেড়াবে, আর আমরা বলতেও পারবো না? তোমার বোনের কারণে মানসম্মান তো আমাদেরও থাকলো না। মানুষ তো আমাদেরকেও কথা শুনাচ্ছে। আর এমন তো না যে কিছু মিথ্যে! তোমার বোন নিজের মুখে স্বীকার করেছে সব। টিভিতে লাইভ দেখেছে সবাই। রাস্তা ঘাটের বে*শ্যারাও তোমার বোনের চেয়ে ভালো হয়। অন্তত টাকার জন্যে পুরুষ মানুষের বিছানায় যায়। তোমার বোন তো উল্টো টাকা দিয়ে একটা পশুর সাথে…..”
লাগামছাড়া হয়ে উঠলো জান্নাতী। চোখজোড়া বড় হয়ে গেল মমর। সে শুনতে পারলো না এসব। তেজী গলায় জান্নাতীকে থামিয়ে দিয়ে সে বলে উঠলো,
“চুপ করুন! আমার আপুর নামে আর একটাও বাজে কথা বলবেন না! নইলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে।”
“কি বললি, কি বললি তুই! আমাদের খেয়ে, আমাদের বাড়িতে থেকে আমাদেরকেই শাসাচ্ছিস!”
তেড়ে এসে বললো ঝিনুকের জা। মমরও সহ্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। সে দমে না গিয়ে এবার উল্টো ঝাঁঝালো গলায় বললো,
“কি আমাদের বাড়ি, আমাদের বাড়ি করছেন? এই বাড়িটা করার সময় যে ধারের নাম করে আমার আপুর কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা খসিয়েছেন সেটা ভুলে গেছেন? আপনার রুমের এসি, রান্নাঘরের ডাবল ডোরের ফ্রিজ, ড্রয়িং রুমের মাল্টিপ্লেক্স টিভি, বড় ছেলের বাইক, ছোট ছেলের চাকরি, এমনকি আপনার মেয়ের বিয়ের সময় যৌতুকের টাকাটা পর্যন্ত নিয়েছেন আমার আপুর কাছ থেকে! এসব হাত পেতে নেবার সময় মানসম্মান যায়নি, এখন হঠাৎ আপনার মান সম্মান জেগে উঠেছে, না?”
“মম!”
অকস্মাৎ সজোরে একটা থাপ্পর পড়লো মমর গালে।
“তোর সাহস কি করে হয় আমার শ্বাশুড়ির সাথে এভাবে কথা বলার!”
অভিমানী চোখজোড়ায় মুহূর্তেই ভিড় জমালো অশ্রুরা। নাহ্, গালে পাঁচ আঙুলের ছাপ বসে যাবার ব্যথায় নয়। বরং বোনের একতরফা পক্ষপাতিত্বে। তবুও কাঁপা কাঁপা গলায় সে অভিযোগের সুরে জানাতে চাইলো,
“ঝিনুক আপু! আপু তুই জানিস না, উনি কিসব আজেবাজে কথা বলছিল পাখি আপুর নামে…”
“তোকে কতবার বলেছি, ঐ স্বার্থপর মহিলার নাম নিবি না আমার সামনে! কি বলেছে আমার শ্বাশুড়ি? নিশ্চয়ই মিথ্যে কিছু বলেনি। ঐ মহিলা যা করেছে, সেটাই হয়ত বলেছে। চুপ চাপ শোন, আর হজম করা শেখ!
নিজে তো দিন দুনিয়া ভুলে, নোংরামি করে বেড়াচ্ছে। জ্বালা হয়েছে যত আমাদের। এখন শুনতে তো হবেই!”
“আপু!”
গলা জড়িয়ে আসলো মমর।
পরিবর্তনটা ঠিক কখন এসেছে, জানা নেই মমর। তবে কোন এক ফাঁকে মিষ্টতার জায়গায় তিক্ততা এসে ভর করেছে পাখি ও ঝিনুকের সম্পর্কে। আর সেই তিক্ততা এখন এতটাই চরমে যে, নিজের আপন বোনকে নিয়ে কটুক্তিতে নীরব অবস্থান ঝিনুকের।
“সত্যি কথা যতই তেতো লাগুক, হজম তো করতেই হবে। তুই পাল্টা জবাব দেবার সাহস কোথায় পাস? আমার সংসারে ঝামেলা করতে এনেছি আমি তোকে?”
ঝিনুকের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো মম। চিনতে চেষ্টা করলো তাকে। এই কি সেই ঝিনুক যার সাথে ছোটবেলায় এক বিছানায় ঘুমাতো সে? সেই ঝিনুক যার হাত ধরে স্কুল থেকে আসা যাওয়া হতো? রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফুচকা খেত? পাখির চোখ ফাঁকি দিয়ে ছাদে চড়ে এক বয়াম আচার ভাগাভাগি করে, এক বসাতেই শেষ করে ফেলতো?
“দেখো, দেখো, তোমার ছোটবোনের কীর্তি দেখো! এক রত্তি মেয়ের জবান একহাত লম্বা হয়েছে। আমাকে কথা শোনায়! আমার বাড়িতে এই মেয়েকে আমি আর রাখতে পারবো না বাপু। তুমি তোমার বোনকে বিদায় করো দেখি।”
চেয়ার টেনে বসে বিরক্তি নিয়ে বললেন ঝিনুকের শ্বাশুড়ি। মমর দিকে চোখ তুলে তাকালেন না আর। হাত নেড়ে নিজের কথার গুরুত্ব বোঝালেন। যেন অনেক অত্যাচার চালাচ্ছে মেয়েটা তাদের উপর। ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন এখন।
“আম্মা, মম ছোট মানুষ। না বুঝে বেয়াদবি করে ফেলেছে। আমি তার জন্যে ক্ষমা চাইছি।”
নরম গলায় শ্বাশুড়ীকে বোঝাতে চাইলো ঝিনুক। মম অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো শুধু। ঝিনুকের চেহারায় একরাশ বিরক্তি এসে ভর করেছে। এই বাড়িতে তার অবস্থান বোনেদের কারণে নড়বড়ে হয়ে উঠছে, এটা সে মানতে পারছে না।
“আর কত ঝিনুক? কত আর সহ্য করবো বলো! তোমার বোনেদের কীর্তি কারখানার জ্বালায় ঘরে বাইরে কোথাও টেকা মুশকিল। এইযে তোমার ছোটবোন, ওকে কি কম যত্নআত্তি করছি আমরা, তারপরও আম্মার সাথে কি খারাপ ব্যবহারটাই না করলো!”
আগুনে ঘি ঢালতে আফসোসের সুরে বলে উঠলো ঝিনুকের জা, জান্নাতী।
“জানো, ফ্রিজে একটাই ডিম ছিল। আমি বলেছিলাম বাবুর জন্যে রেখেছি। কিন্তু তোমার বোন মানা করা সত্ত্বেও চুরি করে সেটা ভেজে খেয়ে নিল! আচ্ছা, ও যদি বলতো, আমরা কি ওকে বাজার থেকে ডিম এনে খাওয়াতাম না, বলো? সেটাই বোঝাচ্ছিলেন আম্মা ওকে। কিন্তু এই মেয়ে উল্টো আমাদেরকেই যা নয় তাই বলে যাচ্ছে! যদি আমার বোন হতনা, তবে আম্মার পায়ে ধরে মাফ চাওয়াতাম!”
বিরক্তি নিয়ে তাকালো ঝিনুক তার জায়ের দিকে। এই মহিলা থাকেই তক্কে তক্কে। কীকরে শ্বাশুড়ীকে ঝিনুকের বিরুদ্ধে কানপড়া দেওয়া যায়! এখন সুযোগ পেয়েছে আরকি।
“মম, ক্ষমা চা আম্মার কাছে।”
মম ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। যেন বোনের কথা তার কর্নগোহরে পৌঁছাতেই ব্যর্থ। সেটা দেখে ঝিনুকের মেজাজ আবার বিগড়ে গেল। সে ধমকে বলে উঠলো,
“কি হলো, কথা কানে যায়নি?”
“আমি ক্ষমা চাইতে পারবো না আপু। তুমি আমাকে ক্ষমা করো।”
মমর নির্লিপ্ত কণ্ঠের উত্তর শুনে তেঁতে উঠলো ঝিনুক।
“এত বেয়াদব হয়েছিস কবে তুই! বড়দের মুখে মুখে তর্ক করিস! তোকে বললাম না ক্ষমা চাইতে?”
“আমি ক্ষমা চাইবো না। কারণ আমি কোন অন্যায় করিনি। বরং উনি অসম্মান করেছেন বড়াপুকে। আমি যা বলেছি সত্যিই বলেছি।”
“মম, তুই কিন্তু বাড়াবাড়ি করছিস!”
“করলে করছি। আজকে বাড়াবাড়ি হয়েই যাক। এই নয় দিনে, তোমার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তো কম করেনি। এখন শেষটা আমিই করে যাচ্ছি।
কি যেন বলছিলে তুমি? পাখি আপু স্বার্থপর। আর তুমি? আজ তুমি নামকরা কলেজের লেকচারার হয়েছো, শ্বশুরবাড়িতে ছড়ি ঘোরাচ্ছো। এসব কার বদৌলতে? বিয়ের সময় তোমার রান্নাঘরের রুটি বেলার মেশিন থেকে শুরু করে, বিছানার চাদরটা পর্যন্ত কিনে পাঠিয়েছে আপু। আর সেই পাখি আপুকে তুমি আর তোমার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা মিলে যা ইচ্ছে শুনাচ্ছো। আজ তার নাম শুনতেও তুমি রাজি না। কারণ লোকে আপুকে নিয়ে আজেবাজে কথা বলছে। অথচ, বোন হয়ে একটাবার তুমি আপুর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা পর্যন্ত করোনি। জানতে চাওনি একবারো, আসলে কি হয়েছে, কেন হয়েছে, কেমন আছে সে এসবের মাঝে!
নাহ্, তুমি শুধু আছো নিজেকে নিয়ে। তোমার চিন্তা লোকে কি বলছে সেটা নিয়ে। তোমার শাশুড়ি, জা, ননদ কি চাইছে সেটা তোমার প্রায়োরিটি। নিজের বাবা বা বোনকে নিয়ে ভাববার মত সময় কোথায় তোমার?”
“তুই কি নির্বোধ? কিচ্ছু বুঝিস না? দেখিসনি কিছু, কানে ঢোকেনি তোর বোন নিজের মুখে কি বলেছে মিডিয়ার সামনে?”
“হ্যাঁ, শুনেছি। আর দেখেছিও। দেখেছি কিভাবে এতগুলো লোকের সামনে আমার বোনের উপর হামলা চালানো হয়েছে! দেখেছি কিভাবে তোমরা যাকে পশু বলো, সেই লোকটাই আমার বোনের জীবন বাঁচাতে নিজেকে ঢাল বানিয়েছে। আপুকে বাঁচাতে নিজে গুলি খেয়েছে। এসবের মাঝে তোমার মনে একটাবারও প্রশ্ন জাগেনি, যে আপু ঠিক আছে কি না? আপুর কোন ক্ষতি হয়নি তো?”
ঝিনুকের চোখ যেখানে শুধু পাখির অধঃপতন দেখছে, সেখানে মম প্রার্থনা করছে বড় বোনের সুস্থতার।
“তুমি তোমার মান সম্মান নিয়েই থাকো ঝিনুক আপু। আরামে সম্মানজনক জীবন কাটিয়ে যাও। তবে আমাকে এসবে টেনো না। নিজের মা সমতুল্য বোনের অপমানে, তোমার সম্মান অক্ষুণ থাকলেও, আমার থাকবে না। আমি সহ্য করতে পারবো না চুপচাপ।”
“কোথায় যাচ্ছিস তুই? মম!”
“আপাতত হাসপাতালে যাচ্ছি, বাবার কাছে।”
বলেই বেরিয়ে গেল মম। মনে মনে ঠিক করে নিল সে, দরকার হয় হাসপাতালের সামনে ফুটপাতে ঘুমাবে, তবুও আর ফিরবে না এ বাড়িতে।
***
#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_০২
রিকশা থেকে নামতে নামতে মম একবার আকাশের দিকে তাকালো। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে এসেছে। শীতের আকাশ একরকম গুমোট আকার ধরে রেখেছে। যেন শত ব্যথা, অভিমান, অভিযোগ নিজের বুকে ধারণ করে আছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর সেই অব্যক্ত অভিযোগগুলো ব্যক্ত করা হয়ে ওঠেনা। চাপা পড়ে রয় মেঘেদের আড়ালে।
হাসপাতালের গেটের সামনে চেনা সেই বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে। মানুষের ভিড়, অ্যাম্বুলেন্সের তীক্ষ্ণ সাইরেনের শব্দ, বাতাসে ভেসে থাকা ফিনাইলের তীব্র গন্ধ, অদ্ভুতভাবে, সবটাই এখন পরিচিত মনে হয় মমর। নয়দিনের ব্যবধানে সবকিছুই চেনা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে তার। মনে পড়ে যায় আজ থেকে দশদিন আগের কথা।
*
অন্যান্য দিনের মতোই মামুন সাহেব মাগরিবের নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরে বসেছিলেন টিভির সামনে। নিউজ চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছিল পাখির প্রেস কনফারেন্স। মেয়ের সাথে মনোমালিন্য থাকলেও, নিউজ চ্যানেলে পাখিকে নিয়ে করা প্রতিটি সংবাদ মনোযোগ দিয়ে শোনেন তিনি। পাখির মনোবল ও অদম্য সাহস গর্বিত করে ওনাকে ঠিকই। তবে প্রচলিত সামাজিক নিয়মের মধ্যে মেয়েকে টেনে না আনতে পারাটাকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখেন উনি। আর দশজন বাবার মতোই পাখির ছন্নছাড়া জীবনটাকে গুছিয়ে দিতে চান মামুন সাহেব, কিন্তু পাখি চায় বাঁধনহারা হয়ে বাঁচতে।
বাবার সাথে বোনের এই নীরব সংঘাত ব্যাহত করে মমকে। সে বুঝতে পারে না, কেন বিয়ে করে সংসার সামলানোটাই মেয়েদের জীবনে মুখ্য হতে হবে। কেন এর বাইরে গিয়ে জীবনটাকে সাজানো অপরাধ? ভালোই তো আছে পাখি স্বামী সংসার ছাড়া। যদিও বা এটা সে নিজে থেকে বেছে নেয়নি, কিন্তু সে যখন নিজেকে সামলে বাঁচতে শিখে গেছে, তখন কেন তাকে জোর করতে হবে পুনর্বিবাহের জন্যে?
বাবা, আর নিজের জন্যে দু কাপ গরম গরম চা নিয়ে এসে বসেছিল মম সোফায়। প্রশস্ত হাসি ছিল ঠোঁটে। থাকবে নাই বা কেন? চিনের গুয়াংঝু শহরে আয়োজিত হয়েছে বিশাল বড় এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন। সেখানেই আছে পাখি। এত বড় একটা ইভেন্টের মুলহোতাদের মাঝে তার বোন একজন। এটা কি কম!
এসবে পাখি কখন, কিভাবে, কেন জড়িয়েছে সেটা জানা নেই মমর। সে শুধু জানে, তার বোন ভুল কিছু করতেই পারে না! অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো অবশ্যই ভুল কিছু নয়। তারা নয়ত একটু ভিন্নই, তাতে কি? অসহায় তো। তার বোন ঠিক কাজই করছে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে।
বাবার সাথে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বড় বোনকে টিভিতে দেখছিল মম। ঠিক তখনই সাংবাদিকদের আক্রমণাত্মক প্রশ্নের মুখে পড়তে দেখা যায় পাখিকে। দ্বিধান্বিত দৃষ্টিতে তাকায় মম বাবার দিকে। দেখে, মামুন সাহেবের কপালেও ফুটে উঠেছে অসন্তোষ ও উদ্বেগের ছাপ। দুরুদুরু বুকে দেখে মম, কি নির্দ্বিধায় পুরো বিশ্বের মিডিয়ার সামনে শান্ত হয়ে বসে পাখি অকপটে স্বীকার করে নেয় নিজের ভালোবাসা ও বিয়ের কথা!
পাখির বলা কথাগুলো যখন মস্তিষ্কে বাড়ি খাচ্ছে, সেই রেশ কেটে ওঠার আগেই টিভিতে দেখা যায় বিশৃংখলাকারীদের। ভীড় থেকে গুলি ছোঁড়া হয় পাখির উদ্দেশ্যে!
“পাখি!”
অস্পষ্ট সুরে ডেকে ওঠেন মামুন সাহেব। চোখজোড়া আতঙ্কে লাল হয়ে উঠেছে তার। বুকের বা পাশটা চেপে ধরেন উনি। ঘোরে থাকা মম ছুটে যায় বাবার কাছে।
দুঃস্বপ্নের মত কেটে যায় সে রাতটা। পাখিকে বার বার ফোন করে মম। কিন্তু একবারও ওপাশ থেকে ফোনটা রিসিভ করা হয়নি। সারারাত দু চোখের পাতা এক করতে পারেননি মামুন সাহেব। পায়চারি করতে থাকেন একটু পরপর। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মামুন সাহেবকে জোর করে হালকা কিছু খাইয়ে একটা ঘুমের ঔষধ দেয় মম পরদিন সকালে। পাখির ফোন তখন বন্ধ দেখাচ্ছে। তবুও কিছুক্ষন পর পর যোগাযোগের চেষ্টা করেই যাচ্ছিলো মম। মিডিয়া হাউজগুলো তখন উত্তাল! ভাইরাল হয়ে গেছে প্রেস কনফারেন্সের ঘটনা।
মম বিশ্বাস করতে পারে না। প্রেস কনফারেন্সে দেওয়া পাখির নিজের মুখের বিবৃতির পরও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে তার। কীকরে সম্ভব এটা? যেই পাখি আপু দীর্ঘ সাতটা বছর ধরে নিজের ভালোবাসার মানুষটির স্মৃতি বুকে আগলে বেঁচে আছে, যেই মানুষটিকে হারিয়ে ঘর ছেড়ে বিবাগী হয়েছে সে, যাকে পাগলের মত অলিতে গলিতে খুঁজে বেরিয়েছে এত বছর, তাকে ভুলে হঠাৎ কি করে অন্য কাউকে আপন করে নিতে পারে সে?
ঘড়ির কাটায় এগারোটা বাজে তখন। সোশ্যাল মিডিয়াতে পাখিকে নিয়ে করা একের পর এক সংবাদ দেখতে ব্যস্ত মম। তখনই প্রচন্ড শব্দে ঝনঝন করে ভেঙে যায় ড্রয়িং রুমের কাচের জানালাটা।
চমকে উঠে মম। হাত থেকে পড়ে যায় ফোনটা। একটা বড় ইটের টুকরো এসে পড়েছে তার পায়ের কাছে। সেটার দিকে বিভ্রান্তি নিয়ে তাকিয়ে থাকে মম কয়েক সেকেন্ড। বাইরে থেকে ভেসে আসে মানুষজনদের চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ। কি হচ্ছে দেখার জন্য দু কদম এগিয়ে যেতে চায় মম। তবে তার আগেই প্রকাণ্ড শব্দে কেঁপে উঠলো বাড়ির সদর দরজাটা।
চমকে উঠে উল্টো পিছিয়ে যায় মম।
অজানা আশংকায় কেঁপে ওঠে মন। সাহস করে জানালার দিকে উঁকি দেয় সে। ভাঙ্গা জানালা দিয়ে দেখতে পায় বাইরে দাঁড়ানো ক্ষুব্ধ মানুষগুলোকে।
তাদের ঘৃণায় বিকৃত রাগান্বিত চেহারা দেখে আঁতকে ওঠে মেয়েটা। কয়েকজন মিলে বিশ্রী ভাষায় গালাগাল দিতে দিতে জানালার মোটা লোহার গ্রীল ধরে এমনভাবে টানছে, যেন গায়ের জোরেই খুলে ফেলবে সেটা।
আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে মম দেখলো ভাঙ্গা জানালা দিয়ে একটা লোক আবারো একটা ইটের টুকরো ছুঁড়ে মারছে তাকে উদ্দেশ্য করে। উড়ে আসা ইটের টুকরোটাকে পাশ কাটিয়ে মম ছুটে যায় তার বাবার কাছে। মামুন সাহেব ঔষুধের প্রভাবে তখনও ঘুমাচ্ছিলেন। ভেতরে ঢুকেই মম দরজা জানালা সব বন্ধ করে দেয়। বাইরে চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ আরো তীব্র হচ্ছে। জানালার ভারী পর্দা টেনে দরজার সামনে চেয়ার টেবিল জড়ো করে যথাসম্ভব আটকে দেয় মম।
ইতিমধ্যে সদর দরজা ভেঙে লোকজন ঢুকে পড়েছে বাড়ির ভেতরে। ভাংচুরের শব্দ শোনা যাচ্ছে ড্রয়িং রুম থেকে। এত শব্দে ঘুম ভেঙে গেছে মামুন সাহেবের। বুক চেপে ধরে উঠে বসেন উনি। ছোট মেয়েটাকে রুমের ভেতর হন্তদন্ত হয়ে ছুটাছুটি করতে দেখে বিভ্রান্ত হয়ে যান। ধীর গলায় ডেকে ওঠেন,
“মম,”
বাবার দিকে ফিরে তাকায় মম। কি বলবে ভেবে পায়না সে। শব্দ শুনে বুঝতে পারে, লোকগুলো পুরো বাড়ি তছনছ করছে। তাদেরকে হাতের নাগালে পেলে রক্ষা থাকবে না আর। কি করবে ভাবতে গিয়ে মমর মনে হয় পুলিশকে ফোন করা দরকার। কিন্তু নিজের ফোনটা তো ড্রয়িং রুমেই ফেলে এসেছিল, তবে এখন?
“মম? কি হচ্ছে বাইরে?”
অসুস্থ বাবার প্রশ্নগুলোকে উপেক্ষা করে অস্থির দৃষ্টিতে চারদিকে নজর ঘুরিয়ে মামুন সাহেবের ফোনটা খুঁজে বের করে মম। দ্রুত ডায়াল করে পুলিশের ইমার্জেন্সী নম্বরটিতে। ফোনে কথা বলার সময়ই মম দেখে রুমের দরজায় জোরে জোরে আঘাত করা শুরু করেছে লোকগুলো। খুব বেশি সময় লাগবে না তাদের দরজা ভাঙতে। আতঙ্কিত মম ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বসে পড়ে।
মামুন সাহেবের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। মুখটা কেমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে তার। চোখজোড়া ফুলে লাল হয়ে আছে। বহু বছর ধরে পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত মামুন সাহেব অস্থিরতা ও উদ্বেগের কারণে থরথর করে কাঁপতে শুরু করেন। শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে তার। কথা বলতে চাইছেন, কিন্তু জিভটা নাড়াতে পারছেন না ঠিকমত। মুখ দিয়ে লালা ঝরা শুরু হয় তার। বাবাকে এই অবস্থায় দেখে মমর ভয় বাড়লো বৈ কমলো না।
“মম? ওরা…ওরা কি আমাদের মারতে এসেছে?”
বহু কষ্টে ঠোঁট নেড়ে জিজ্ঞেস করলেন মামুন সাহেব। তারপর আর সহ্য করতে পারলেন না। চোখ উল্টে গেল ওনার। বিছানায় কাত হয়ে পড়ে গেলেন মামুন সাহেব।
বাবার এই অবস্থা দেখে শব্দ করে কেঁদে উঠলো মম। ওনাকে ধরে ঝাঁকিয়ে বেশ কয়েকবার ডেকেও কোন সাড়া পেলনা সে। ভয়ে হাত পা কাঠ হয়ে আসে মমর। এই মুহূর্তে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন বাবাকে। কিন্তু কিভাবে? দরজায় শব্দ বাড়ছে। চৌকাঠ আলগা হয়ে এসেছে প্রায়। ওরা ভেতরে ঢুকে পড়বে যেকোন সময়ে! সেদিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে মম।
কিন্তু না! পরক্ষনেই মনে পড়ে এভাবে বসে থাকলে হবেনা। কিছু করতেই হবে! বাঁচতে না পারলেও, বাঁচার চেষ্টা তো করতে হবে। দ্রুত হাতে চোখমুখ মুছে বাবার আলমারি খোলে মম। ভেতরে পেয়ে যায় কাঙ্খিত জিনিসটা। একটা প্লাস্টিকের বাক্স। টুকটাক রিপেয়ারিংয়ের কাজের জন্যে এতে প্রয়োজনীয় কিছু যন্ত্রপাতি রাখেন মামুন সাহেব। বাক্সটা খুলে সেখান থেকে একটা বড় সাইজের প্লায়ার্স ও কেঁচি হাতে তুলে নেয় মম।
শুকনো একটা ঢোক গিলে বাবার অচেতন পরে থাকা শরীরটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সে। ছোট থেকে বাবা বুকে আগলে মানুষ করেছেন তাদের। আজ মমর পালা। বাবাকে আগলে রাখতে না পারলেও, শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত চেষ্টা করে যাবে সে। আড়াল করে রাখবে তাকে। দেবেনা কাউকে এই মানুষটার ক্ষতি করতে। দু হাতের মুঠোয় শক্ত করে জিনিস দুটো চেপে ধরে ভয়ংকরভাবে কাপতে থাকা দরজাটার দিকে তাকিয়ে রয় মম।
হঠাৎ করে থেমে যায় কম্পন। তবে দরজার বাইরে এখনো শোনা যাচ্ছে ক্ষুব্ধ লোকেদের আওয়াজ। অপেক্ষা করতে থাকে মম। শ্বাস প্রশ্বাস চলছে দ্রুত গতিতে। চোখের পলক ফেলে না সে। একটাই কথা মাথায় ঘুরছে, বাঁচতে হবে! বাঁচাতে হবে!
এক একটা সেকেন্ড যেন এক এক যুগের মত দীর্ঘায়িত হয়। বাইরের শোরগোল কমে এসেছে। ভাংচুরের আওয়াজ এখন আর শোনা যাচ্ছে না। কি হচ্ছে বুঝতে পারে না মম। সে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে বাবাকে আড়াল করে। সেখান থেকেই কান পেতে শোনার ও বোঝার চেষ্টা করে বাইরের পরিস্থিতি। আচমকা দরজায় কড়া নাড়ে কেউ। ভেসে আসে জোরালো আওয়াজ।
“কেউ আছেন ভেতরে? আমরা পুলিশের লোক। পরিস্থিতি এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণে। আর ভয় নেই, বেরিয়ে আসুন!”
*
শিউরে উঠলো মমর ভঙ্গুর কায়া। সেদিন সঠিক সময়ে পুলিশ না এলে যে কি হতো!
মানুষ সমাজের নির্মাণ করেছে জীবনের তাগিদে। আমরা ভাবি, সমাজ মানে আশ্রয়। ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে নিশ্চিন্ত বোধ করি আমরা। ভাবি, এত মানুষের মাঝে কাউকে না কাউকে তো পাশে পাওয়া যাবে বিপদে। কিন্তু না।
ভিড় কোন সত্ত্বা নয়। বিবেক, আবেগ বা দ্বিধা মানুষের থাকে, ভিড়ের নয়। ভিড় শুধুই একটা শক্তি, নিরপেক্ষ ও অন্ধ শক্তি। এই শক্তিকে যেদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়, সেটা সেদিকেই চলে। সত্য-মিথ্যা বা ন্যায়-অন্যায়ে বিভেদ করে না। যুক্তি শুধু একটাই। আমরা সংখ্যায় বেশি, তাই আমরাই সঠিক। এই ভয়ংকর সরলতা নিয়ে এগিয়ে যায় ভিড়। যদি সেটা আমাদের পক্ষে হয়, তবে আমরা সুরক্ষিত। আর যদি বিপক্ষে হয়,
তবেই আমরা উপলব্ধি করতে পারি, সমাজ আমাদের আশ্রয় নয়, কেবলই একাকিত্বকে ঘুম পাড়িয়ে রাখার মাধ্যম।
মাথাটা হালকা ঝাঁকিয়ে সেই ভয়ংকর স্মৃতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে মম। ফাঁকা করিডোর ধরে হাঁটতে থাকে সে। একদম কর্ণারের শেষ কেবিনটায় আছেন মামুন সাহেব। পুলিশ এসে উদ্ধার করার পরপরই তাকে এনে এডমিট করা হয় ইমার্জেন্সী বিভাগে। ডাক্তার জানিয়েছেন, ওনার বহু বছরের পারকিনসন্স রোগটা এখন এডভান্সড স্টেজে চলে গেছে। বারবার শরীর শক্ত হয়ে আসছে। শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই তার। হার্টে ব্লক ধরা পড়েছে। সেদিক থেকেও কন্ডিশন ভালো না। অপারেশন করা জরুরি হলেও, সেই ধকল সামাল দেবার মত শারীরিক স্থিতি ওনার নেই।
অলস পায়ে হাঁটতে হাঁটতে বাবার কেবিনের সামনে পৌঁছায় মম। আনমনে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ে সে। ভেতরে নজর বুলাতেই থমকে যায় মম। পা জোড়া থেমে যায় আপনাআপনি।
মামুন সাহেবের বেডের পাশে একটা টুল টেনে ওনার হাত ধরে বসে আছে এক রমণী। নীল জিন্সের প্যান্টের সাথে সাদা ট্যাংক টপ পরনে তার। সেটার উপর পা অবধি লম্বা একটা মিক্সড প্রিন্টের শ্রাগ ঝুলছে কাঁধে। পায়ে শোভা পাচ্ছে স্টিভ ম্যাডেনের উঁচু হিলের পাম্প সু। পরিপাটি, অভিজাত এবং আত্মবিশ্বাসী এই রমণীটির চেহারা অবশ্য আড়াল করে রেখেছে মাথায় জড়ানো লম্বা একটা স্কার্ফ এবং চোখের বাদামি শেডের গগলস।
কিন্তু মমর সেকেন্ড মাত্র সময় লাগে তাকে চিনতে। চোখজোড়া ভরে উঠলো তার মুহূর্তেই। গলায় কিছু একটা যেন এসে আটকে গেছে। এতদিনের দুশ্চিন্তা, আতঙ্ক, অসহায়ত্ব, সব একসাথে বুক ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে। পা দুটো অসাড় হয়ে গেছে মমর। চাইলেও নাড়াতে পারছে না সে। হাঁটু ভেঙে আসছে মমর। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিও যেন ফুরিয়ে এসেছে। এতদিন যে সাহস শরীরে শক্তির যোগান দিয়েছে, এই মুহূর্তে তারাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে পিছিয়ে যায়। অস্পষ্ট স্বরে মম কোনমতে ডেকে উঠলো পাখিকে।
“আপু…”
***
চলবে…
