Thursday, June 4, 2026







ভালোবাসার ভিন্ন রং পর্ব-১৭

#ভালোবাসার_ভিন্ন_রং
#সাইয়্যারা_খান
#পর্বঃ১৭

রাতুল রোদকে ক্যাফেতে যাওয়ার কথা বললেও রাজি হলো না রোদ ভয়ে। আদ্রিয়ান জানলে খবর ই বানিয়ে ছাড়বে। আবার রাতুলকে ও না করতে পারছে না। তাই ভদ্রতার খাতিরে বললো,

— আসলে ভাইয়া আমাকে নিতে আসবে একটুপরই।

— ওহ্ তাহলে চলো বাকি পথটুকু যেতে যেতে কথা বলি।

নাছর বান্দা রাতুল। অগত্যা রোদ আর রাতুল পাশাপাশি হাটতে হাটতে বাইরে এলো। রাতুল কথার মাঝে বললো,

— গত কাল রাতের জন্য আ’ম ভেরী সরি।

রোদ অপ্রস্তুত হলো। তবুও বললো,

— ইটস ফাইন ভাইয়া।

— ধন্যবাদ ও দেয়ার ছিলো।

— কেন?

— কাল রাদকে পাঠালে তাই। ও মে’বি আমাকে মাফ করে দিয়েছে। কাল রাতে তোমাদের বাসায় নিয়ে গিয়েছিলো। কেউ দেখেনি অবশ্য। বন্ধু ফিরত পেলাম অনেক দিন পর। ধন্যবাদ।

রোদ একটু হাসলো। যাক ভালো কিছু হয়েছে কাল। রাদ আর রাতুল খুবই ভালো বন্ধু ছিলো। এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে সব নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। এখন যেহেতু রোদ নিজেও স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে তাই এসব দেনা মোনা না করাই বেটার। ওরা গেটের কাছে আসতেই রাতুল বললো,

— যাক তোমাক বডিগার্ড আজ ব্যাস্ত নাহলে কথা বলতে দিত না।

রোদ ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করলো,

— বডিগার্ড?

— আর কে ড.ইয়াজ।

রোদ ফিক করে হেসে দিলো। রাতুলও হেসে দিলো। যথেষ্ট দূরে থেকে তাদের মধ্যে কথা হচ্ছিল তবুও কারো কাছে বিষের মতো লাগলো এই দৃশ্য। চক্ষু সূল মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে টেনে রোদকে নিয়ে আসতে। নিজেকে শান্ত করতে অপারগ হচ্ছে আদ্রিয়ান। গাড়ীর কাচ দিয়ে দেখা দৃশ্যটা যেন বুকে ব্যাথা দিচ্ছে। নিজেকে সান্ত্বনা দিলো আদ্রিয়ান। কথা বলা স্বাভাবিক। হাসা ও স্বাভাবিক। এখন তো রোদ আদ্রিয়ানের। তাহলে সমস্যা কি আর? এসব কিছু ভেবে ভেবে নিজেকে শান্ত করলো আদ্রিয়ান। ওমনি কাচে ঠক ঠক আওয়াজ হলো। তাকাতেই দেখলো রোদ দাঁড়িয়ে আছে। রোদ আবারও নক করে বললো,

— লক খুলুন।

আদ্রিয়ান লক খুলতেই রোদ বায়না করলো,

— চলুন না টি এস সি যাই।

আদ্রিয়ান ভেতর থেকেই বললো,

— বিকেল হয়ে আসছে রোদ।খাবে বাসায় চল।

— প্লিজ প্লিজ মোমস খাব।

— জেদ করে না। বাড়ী চলো।

রোদ মুখটা পেচার মতো করে গাড়ীতে ধুপ করে বসে ধাম করে ডোর লাগিয়ে ব্যাগটা পিছনে ছুড়ে মারলো। সিট বেল্ট বেঁধে মুখটা জানালার দিকে করে বসে রইলো।
কি হতো গেলে? আরে ভাই রোদতো এক প্লেট মোমস আর সাথে হয়তো এক প্লেট ফুচকাই খেত। তোর কি টাকায় টান পরতো? নাকি ব্যাবসা চাঙ্গে উঠতো? কি হবে তোর টাকা দিয়ে যদি বউকেই খাওয়াতে না পারিস?
কথাগুলো আদ্রিয়ানকে উৎসর্গ করলো রোদ। আদ্রিয়ান এতক্ষণ রোদকে পর্যবেক্ষণ করলো। গাড়ী স্টার্ট দিতে দিতে ভাবলো, কি হতো মেয়েটাকে নিয়ে গেলে? এমন টা না করলেও পারতাম? মনকে হাজার বুঝ দিলেও কেন জানি কিছু একটা বেঁধেই যাচ্ছে আদ্রিয়ানের মস্তিষ্কে। কোন ছেলের সাথে সহ্য হয় না রোদকে। বাজে চিন্তা ভাবনা এসে তাড়া করে। আদ্রিয়ান হাজার বার জানুক রোদ তেমন না। মন তা সহজে মেনেও যায় কিন্তু মানতে চায় না এই মস্তিষ্ক।

_____________

বাসায় লেগে গেল এলাহি কান্ড। জাইফ সোজা ভাবে বলে দিয়েছে জাইফাকে ও কিছুতেই বিয়ে করবে না। না মানে না। এ নিয়ে মামির আহাজারি। এ দিন দেখার জন্য বেঁচে ছিলেন উনি সহ আরো কত কি। জাইফও গলবার পাত্র না। সোজা ভাবে বললো,

— আম্মু এসব মেলোড্রামা করে লাভ নেই। আমার পছন্দ আছে। মেনে নিলে ভালো নাহলে আমার বউ নিয়ে ভেগে যাব আমি।

মামি হাহাকার করে বললো,

— বউ! তুই কি বিয়ে করে ফেলেছিস?

— উফ বিয়ে করি নি। করব সামনে।

এসব নিয়েই লেগে গেল ঝামেলা। আদ্রিয়ান বাসায় এসে সব শুনে শুধু বাঁকা হাসলো। জাইফকে ও ই উস্কে দিয়েছিলো। পছন্দ আগে থেকেই আছে। আদ্রিয়ান শুধু আগুনে হাওয়া দিয়েছে।
.
রোদ ফ্রেশ হয়েই জারবার রুমে ডুকে মিশিকে দেখে আসলো। ঘুমাচ্ছে মে’য়েটা। রোদ ওর কপালে চুমু খেয়ে রুমে ডুকলো। আদ্রিয়ান খাবার নিয়ে বসে আছে কাউচে। দীর্ঘ শ্বাস ফেললো রোদ। কার সাথে রাগ করবে? এই আদ্রিয়ানের সাথে? যাকে ছাড়া ইদানীং নিজেকেও কল্পনা করা যায় না। যত রাগ ই করুক না কেন রোদ দিন শেষে তো এই আদ্রিয়ানের বুকেই ঠাই হয়। ছোট আবদার টা চাইলেই তো আজ আদ্রিয়ান পূরণ করতে পারতো কিন্তু করলো না। রোদ ভাবলো হয়তো কিছু নিয়ে টেনসড আদ্রিয়ান তাই যেতে চায় নি। এখন আবার খাবার নিয়ে বসে আছে। নিশ্চিত রোদ গেলেই নিজ হাতে খায়িয়ে দিবে। ঠিক হলোও তাই। যেই না রোদ সামনে এসে বসলো আদ্রিয়ান ভাত মেখে মুখে তুলে দিলো। রোদ মুখ খুলে খেয়েই পটর পটর শুরু করলো। যেন খেয়ে ওর শক্তি ফিরে এসেছে। আদ্রিয়ান খেতে খেতে শুনছে ওর কথা। এক চিলতে মেঘের আড়ালে যেন সূর্য রুপের হাসি ফুটলো আদ্রিয়ানের ঠোঁটে। খাওয়া শেষ হতেই রোদ সব গুছিয়ে রেখে এসে বললো,

— আমি কিন্তু রাগ করেছি। নিয়ে যান নি আজ।

আদ্রিয়ান ওকে টেনে কাছে এনে বললো,

— অন্য দিন নিয়ে যাব।

— প্রমিজ।

— প্রমিজ।

আদ্রিয়ান রোদের ভেজা চুলের এক গোছা চুল হাতে নিয়ে ঘ্রাণ নিতে লাগলো। রোদ অপলক তাকিয়ে রইলো। আদ্রিয়ানের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে রোদের ভেজা চুলের ঘ্রাণ নেয়া। রোদ চোখ বুজে নিলো। আদ্রিয়ান ঠোঁট ছোঁয়ালো ভেজা চোখের পলকে। ভুলে গেল সকল ঘটনা। অজাচিত সকল চিন্তা। রোদকে জড়িয়ে নিয়ে শুয়ে বললো,

— একটু রেস্ট নাও।

— আপনি কি চলে যাবেন এখন?

— উহু। মিটিং সব সকালেই শেষ আজ।

— ওহ।

আদ্রিয়ান বুকে মুখ গুজে ঘ্রাণ নিয়ে রোদ আরামে শুয়ে রইলো। আদ্রিয়ান ও ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। মেয়েটা একদম আদুরে। নাদুসনুদুস রোদটাকে অনেক ভালোবাসে আদ্রিয়ান।

আদ্রিয়ানেরও চোখ বুজে আসছিলো ওমনিই মেসেজ টোন বেজে উঠলো রোদের ফোনে। আদ্রিয়ান কি মনে করে হাতে নিতেই দেখলো রিতায়া নামের একজন ম্যাসেজ করেছে,” রুদ্রিতা বাসায় পৌঁছেছো? খেয়েছো?”

আদ্রিয়ানের খটকা লগলো। রোদের এই নামের কোন বন্ধুবী আছে বলে তো জানে না আদ্রিয়ান। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো। মনের খচখচনাতিতে রিসিভ করলো আদ্রিয়ান। ওমনি কানে এলো,
” রুদ্রিতা। কাল একটু দেখা করবে। কিছু কথা ছিলো।”

উত্তর দিলো না আদ্রিয়ান। ওপর পাশের ব্যাক্তি আরো কিছু বললেও তা শুনতে পেল না আদ্রিয়ান। কল্পনায় ভেসে উঠলো অতীতের কিছু জঘন্য স্মৃতি।

অতীত~

মাত্রই সাওয়ার থেকে বের হলো আদ্রিয়ান। ছোট্ট মিশান খেলনা দিয়ে খেলতে ব্যাস্ত। আদ্রিয়ানকে দেখেই আওয়াজ করে ডাকতে লাগলো,

— বাবা। বাবা।

আদ্রিয়ান হেসে কাছে যেতেই মিশানের বায়না খেলতে হবে। নতুন নতুন কাজ করে তখন আদ্রিয়ান। অফিসে যেতে হবে জরুরি মিটিং এ। তাই মিশানকে কোলে তুলে ডাকলো,

— ইশা? ইশা?

মাইশা বারান্দায় ফোনে কথা বলছিলো। বিরক্ত হয়ে রুমে ডুকে বললো,

— কি হয়েছে?

— একটু মিশানের সাথে খেলো। অফিসে যাব আমি।

— কথা বলছি আমি এখন। তুমি যাও। আমি দেখছি।

আদ্রিয়ানকে রেডি হতে দেখেই মিশান কেঁদে উঠলো। মাইশার ঐ দিকে খেয়াল নেই। বারান্দায় কথা বলছে ফোনে। আদ্রিয়ান রেডি হয়ে মিশানকে কোলে তুলে বের হলো। ভাবলো নিচে মায়ের কাছে দিয়ে যাবে। কিন্তু নিচে মাকে না পেয়ে রুমে আসতেই দেখলো মাইশা ওয়াসরুমে। আদ্রিয়ান দরজায় নক করে বললো,

— ইশা মিশানকে রেখে গেলাম।

— যাও।

মিশানকে আদর করে রেখে যেতেই হঠাৎ মাইশার কল আসে যেটাতে একটা মেয়ের নাম লিখা। আদ্রিয়ান রিসিভ করতেই একটা ছেলের কন্ঠ কানে আসে। ছেলেটা কিছুটা অপ্রীতিকর কথা বলতেই পেছন থেকে মাইশা ফোন কেড়ে নিলো। আদ্রিয়ান কিছু বলার আগেই মাইশা কিছুটা রেগে মিশানকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। যা বুঝার আদ্রিয়ান বুঝে যায়। ঐ দিন নির্বাক ছিলো আদ্রিয়ান। কিছুই বলতে পারে নি।
.
বর্তমানে~

রোদ আদ্রিয়ানের বুকে ঘুমন্ত। অতীত মনে পরতেই আদ্রিয়ান যেন হিংস্র হয়ে উঠলো। কোনমতেই নিজের ভেতরের হিংস্রতা দমিয়ে রাখতে পারলো না। বুক থেকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো রোদকে। ঘুমন্ত রোদ কিছু বুঝার আগেই আদ্রিয়ান টেনে দাঁড় করালো রোদকে। হঠাৎ এমন হওয়ায় কিছুই বুঝতে পারলো না রোদ শরীর শুধু থরথর করে কাঁপতে লাগলো। চোখ খুলেছে ঠিকই কিন্তু সব ঝাপসা মনে হচ্ছে। ঘুমন্ত কাউকে হঠাৎ করে দাঁড় করিয়ে দিলে যা হয় আর কি। আদ্রিয়ান কম্পমান রোদের এক বাহু চেপে ধরে ফোনের মেসেজ বের করে ধমকে জিজ্ঞেস করলো,

— কে করেছে এই ম্যাসেজ?

রোদ তখনও কাঁপছে। কিছু বলার অবস্থায় নেই ও। আদ্রিয়ান এবার চিৎকার করে বললো,

— এই বল কে ও?

রোদ চোখ ঝাপটালো বারকয়েক। তখনও কেঁপে যাচ্ছে। আদ্রিয়ান চাপ বাড়াতেই রোদ অস্পষ্ট দেখে বললো,

— রা.ত.তুল ভাই।

কথাটা বলতে দেড়ী কিন্তু রোদের গালে সজোরে থাপ্পড় পড়তে দেড়ী হয় নি। এমনিতেই ঘুমন্ত রোদের শরীর কম্পমান ছিলো। শক্ত পুরুষের এমন থাপ্পড়ে ছিটকে পড়লো খাটের সাইডে। সাইড টেবিলের কোনা যেয়ে বিধলো কপালে। ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠলো রোদ। আদ্রিয়ান যেন ভিন্ন রুং ধারণ করলো। রোদের ঘাড় চেপে ধরে রাগে গজরাতে গজরাতে বললো,

— এই তোকে বলেছিলাম না ওই ছেলের সাথে কথা বলবি না। শুনিস নি আমার কথা। আজ? আজও হেসে হেসে কথা বলছিলি। মেয়েদের নাম দিয়ে সেফ করে কথা বলিস? এই তোর সাহস কত? ওই রাতুলের কাছে যাবি? ভালো মনে করেছিলাম তোকে কিন্তু তুই ও..ওর মতো৷ স্বামী রেখে অন্য ছেলের সাথে ঢলাঢলি তোদের। আজ দেখ কি করি তোকে। বলেছিলাম না ছাড়ব না জোর খাটাবো।

রোদের অবস্থা এমনিতেই খারাপ হয়ে গিয়েছে। জীবনে প্রথম কেউ গায়ে তুললো। তারমধ্য এমন ঘুম থেকে টেনে তুলায় ওর মাথা ঘুরাচ্ছে, বমি বমি পাচ্ছে। অঝোর শুধু চোখ দিয়ে পানি পরছে। কোনমতে কপাল চেপে বসে আছে। আদ্রিয়ান হেচকা টানে দাঁড় করিয়ে বিছানায় ছুঁয়ে মারলো রোদকে। রোদের হাতে তখন কপালের র*ক্ত দিয়ে ভরা। আদ্রিয়ান ঐ হাতে চাপ দিতেই আদ্রিয়ানের হাতের র*ক্ত লেগে গেল। কিন্তু হুস নেই আদ্রিয়ানের। রোদকে নিজের কাছে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠলো আদ্রিয়ান। দিক বিদিক ভুলে গেল যেন। রোদকে নিজের করে নিতে চাইছে। একান্ত নিজের করে নিতে যাতে রোদ আর কখনও ওকে ছেড়ে না যেতে চায়। পুরুষত্ব ফলাতে চাইলো আদ্রিয়ান। ওর শুধু মনে হচ্ছে এটাই একমাত্র মাধ্যম রোদকে নিজের কাছে আটকে রাখার।

_______________

কিছু দূর এগিয়েও থেমে গেল আদ্রিয়ান। এ যেন পথভ্রষ্ট কেউ হঠাৎ পথ খুজে পেল। প্রায় অজ্ঞান রোদের উপর থেকে উঠে এলো। কি করতে যাচ্ছিলো মাত্রই ভাবতেই গায়ে কাটা দিয়ে উঠলো আদ্রিয়ানের। নিজের উপর ঘৃণা জন্মালো। ও কি না এমন জঘন্য কাজ করতে চাইছিলো। হাজার হোক স্ত্রী। বিয়ে করা বউ। সবার আগে সে একটা মেয়ে। তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু করা মানেই রেপ। আর বিয়ের পর এটাকে মেরিট্যাল রেপ করা হয়। আদ্রিয়ান কি না এতোটা নিচে গেল। ভাবতেই নিজেকে শেষ করে দিতে মন চাইলো। রোদের দিকে ফিরেও তাকালো না। ফ্লোর থেকে টিশার্ট তুলে পরে নিলো। আলমারি থেকে কম্ফোডার বের করে রোদের অনাবৃত শরীর ঢেকে দিলো। তাকানোর সাহস হলো না রোদের দিকে। এসির টেম্পারেচার কমিয়ে ফোন নিয়ে বেরিয়ে গেল আদ্রিয়ান। বাহির হতে দরজা লাগিয়ে চলে গেল।

.
এদিকে প্রায় অর্ধজ্ঞান রোদ পড়ে রইলো বেডে। কপালের র*ক্ত এখনও চুয়ে চুয়ে পরছে। গলায়,ঘাড়ে, পেটে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে যার দাতা স্বয়ং আদ্রিয়ান। শক্ত কামড়গুলোতে যেন রোদের শরীর নিংড়ে নিতে চাইছিলো। কাঁদতে ও পারছে না রোদ। অসহ্য যন্ত্রণায় গুমরে কেঁদে উঠলো রোদ।
মা-বাবার আদরের মেয়েটা আজ বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে আছে যাকে ধরার মতো ও কেউ নেই আজ। পড়ে রইলো রোদ। একসময় আস্তে করে চোখটা বুজে নিলো।

#চলবে…

#ভালোবাসার_ভিন্ন_রং
#সাইয়্যারা_খান
#পর্বঃ১৭(বর্ধিতাংশ)

বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোদের খবর না রাখলেও সন্ধ্যার পর থেকে বাড়ির সবাই একটু চিন্তিত হলো। মিশি এদিকে কেঁদে যাচ্ছে। আদ্রিয়ানের রুম ও বাইরে থেকে লক করা তাই কেউ আর ঐ দিক মূখী হলো না। ফোন করেও লাভ হলো না আদ্রিয়ান রিসিভ করছে না।
.
রোদের এখন অতিরিক্ত ঠান্ডা লাগছে। আস্তে আস্তে উঠার চেষ্টা করলো। এসির রিমোট পাশেই রাখা ছিলো। হাত বাড়িয়ে নিয়ে অফ করে দিলো। মাথাটা প্রচন্ড ভার হয়ে আছে সাথে ব্যাথা। অনেক কষ্টে বেড ধরে উঠে বসলো। ঘুটঘুটে অন্ধকার রুম জুড়ে। হাতরে হাতরে নিজের ফোন নিয়ে ফ্লাস জ্বালায় রোদ। দেয়াল ধরে ধরে লাইট অন করে বেড থেকে টিশার্ট পড়ে নিলো। ওয়াসরুমে ডুকে আয়নায় তাকাতেই দেখলো কপালের কাটা জায়গায় ঠান্ডায় র*ক্ত জমে গিয়েছে। সাথে চেহারায় ও কানের দিকেও র*ক্ত জমে আছে। পানি ছেড়ে ডলে ডলে নিজের চেহারা পরিষ্কার করলো রোদ। চোখ গুলো কেমন ফুলে আছে। মুখ মুছে রুমে এসে ড্রয়ার থেকে এনটিসেপটিক লাগিয়ে ছোট একটা ব্যান্ডেজ লাগিয়ে নিলো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো মাগরিবের সময় শেষ। মিশির কথা মনে পরতেই দরজা খুলে বের হতে চাইলো কিন্তু বাইরে থেকে লক করা। ফোন নিয়ে জারবাকে বলতেই জারবা দৌড়ে এসে বাইরে থেকে লক খুলে ডুকে বললো,

— আল্লাহ ছোট ভাবী তুমি বাসায়? তাহলে বাইরে থেকে লক কেন? আমরা আরো টেনশনে ছিলাম। মিশি তো কেঁদে কেটে অস্থির।

রোদ একদম স্বাভাবিক ভাবে উত্তর দিলো,

— মাথায় ব্যাথা পেয়েছিলাম তাই ঘুমাচ্ছিলাম। তাই হয়তো বাইরে থেকে লক করে গিয়েছে।

জারবা রোদের কাপলে ছোট ব্যান্ডেজ দেখে আরো প্রশ্নের ঝুলি খুলে বসলো। চোখ কেন এত লাল হয়ে ফুলে আছে সহ কত কি? রোদ ঠান্ডা স্বরে বললো,

— জারবা বোন আমার মাথা ব্যাথা করছে। মিশিকে একটু এনে দাও আর ওর খাবারটাও একটু দিয়ে যাও।

জারবা বুঝলো কিছু একটা। তাই আর বেশি কথা না বলে চলে গেল। রোদ বড় করে ঘোমটা দিয়ে ছিলো বলে গালের আঙুলের ছাপ জারবার নজরে পরে নি। একটু পরই মিশি দৌড়ে আসলো। মাকে দেখেই কান্না বাড়লো মেয়েটার। রোদের হাটু ঝাপটে ধরে কেঁদে কেঁদে অভিযোগ করছে,

— মাম্মা তুমি ছিলে না কেন? মিশি মিসড মাম্মা।

রোদ ওকে কোলে তুলে নিয়ে বেডে বসে একটু হেসে বললো,

— মাম্মা মিসড মিশি। আমার বাচ্চা কি খেয়েছে?

— বিকেলে খালামনি খায়িয়েছে নুডুলস।

— এখন ডিনার খাবে আমার বাচ্চা।

ওদের কথার মাঝেই জারবা হাতে খাবার নিয়ে এলো। রোদ মিশিকে গল্প শুনাতে শুনাতে খায়িয়ে দিলো। সব রেখে এসে মিশিকে ঘুম পাড়াতে চাইলো কিন্তু দুষ্ট মিশি দুষ্টামি করতে ব্যাস্ত। রোদ উঠে ব্যাগ থেকে একটা ব্যাথার ঔষধ খেয়ে নিলো। প্রচুর পরিমাণ ব্যাথা হচ্ছে কপালে। লাইট অফ করে মিশিকে বুকে নিয়ে কিছুক্ষণ গল্প শুনাতেই ঘুমিয়ে গেল মিশি।

রোদ ওমনিই শুয়ে রইলো। ঘড়ির কাটা ও থেমে নেই। দশটা বাজতেই জারবা ডিনারের জন্য ডাকতে এলে রোদ আস্তে করে বললো,

— এখন খাব না জারবা। আজকে লাঞ্চ দেড়ীতে করেছি। পরে ক্ষুধা লাগলে খেয়ে নিব।

জারবা চলে গেল। রোদের চোখ দিয়ে অনেকক্ষণ পরে টুপ করে কয়েক ফোটা পানি পরলো। যেই মেয়েকে আজ পর্যন্ত কেউ ধমকায় অবদি নি জোরে সেখানে গায়ে হাত তুলা তো অসাধ্য প্রায়। আজ সেই অসাধ্য সাধন করেছে আদ্রিয়ান। রোদ ভেবে পেল না আসলে এমন কি দোষ করেছে ও। রাতুলের নাম্বার ঐ ভাবে সেফ করেছিলো যাতে কল আসলে এভয়েড করতে পারে আর আদ্রিয়ান দেখলেও ঝামেলা না হয়। ব্লক করলে রাতুল বুঝে যেত। তাই রোদ ব্লক করে নি। কথা কি কাল রোদ ইচ্ছে করে বলেছিলো। মোটেও না তাহলে কেন? আর এখন রাতুলের সাথে কথা বললেও কি? রোদ তো আর চলে যাচ্ছে না রাতুলের কাছে। এত সুখ ছেড়ে কোন পাগল যাবে? এই যে ছোট্ট মিশি সারাক্ষণ মাম্মা মাম্মা ডাকে,আদও এই ডাক রোদের কপালে ছিলো কি না জানা নেই। মিশানটা যখন “রোদ মা” ডাকে নিজেকে বড় বড় আর দায়িত্বশীল মনে হয় রোদের। মা মা লাগে নিজেকে। অথচ এই একটা মা ডাক কে কেন্দ্র করে রোদের জীবনটা কেমন হয়ে গিয়েছিলো। আর সেই অন্ধকার জীবনে আদ্রিয়ান এসেছিলো ভোরের আলো হয়ে। যেই আলো ধীরে ধীরে রোদের পুরো পৃথিবীটাকে আলোকিত করে দিয়েছিলো এমনকি এখনও দিচ্ছে।
ভাবতেই মিশিকে আরেকটু বুকে চেপে নিলো। ওদের কে কখনও ছাড়তে পারবে না রোদ। তাই বলে আদ্রিয়ানকেও মাফ করবে না রোদ। থাপ্পড় নাহয় মারলো সে। রাগ উঠেছে মেরেছে তাই বলে তখন ওমন জঘন্য ব্যাবহার করার অধিকার নেই আদ্রিয়ানের। এতদিনের আদ্রিয়ানের প্রতি জন্মানো সকল ভালোলাগা,ভালোবাসা, সম্মান, অনুভূতিগুলো কেমন যেন মুহূর্তেই ফিকে পড়ে গেল।
একবার মন চাইলো বাসায় ফোন করতে কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলো রাদ আর বাবা জানলে এ বাড়ী এসে সবাইকে ঝামেলা করবে। নিজের ভাইকে চিনে রোদ। ঘূর্ণাক্ষরেও যদি টের পায় যে আদ্রিয়ান হাত তুলেছে তাহলে এ বাড়ীতে আর পা রাখতে দিবে না রোদকে। তাই কল করার চিন্তা বাদ দিলো। মিশিকে বুকে নিয়ে শুয়ে রইলো। মাথা ব্যাথার কারণে আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে গেল রোদ।

__________________

জাইফা আজও কল করেছে রাদকে। রাদ কথা বলতে বলতে একসময় ছাদে এলো। ওর কথা বলা মানেই হলো হু হা বলে রেখে দেয়া৷ জনাবের মন হয় তো আজকে ভালো তাই তো দীর্ঘ পাঁচ মিনিট ধরে কথা বলছে। কথা আসলে জাইফা বলছে রাদ শুধু শুনছে। দুই এক সময় হয়তো হু হা করছে। জাইফা অবশেষে একটু অনুরোধের সুরে বললো,

— রাদ শুনছেন?

— হু।

— আম্মু আমার বিয়ের কথা বলছে আবারও। জাইফকে করাতে চেয়েছিলো কিন্তু ভাই না করে দিয়েছে।

— হুম।

— রাদ হুম মানে কি বুঝব আমি?

— কি বুঝতে চাইছো?

— আম্মু বিয়ের কথা বলছে?

— ওহ।

— রাদ আ’ম সিরিয়াস।

এবারের কন্ঠটা কান্নারত ছিলো জাইফার। চেয়েও আর ছন্নছাড়া উত্তর দিতে পারলো না রাদ। নরম স্বরে বললো,

— প্রস্তাব পাঠাতে বলছো?

জাইফা চমকালো। প্রস্তাব? মানে বিয়ের প্রস্তাব? জাইফা তো চাইছিলো রাদ শুধু জানাক ওর পরিবারকে সেখানে রাদ প্রস্তাব পাঠালে তো সোনায় সোহাগা। রাদকে নিয়ে জাইফার এতদিন ডাউট ছিলো। আদও ভালোবাসা আছে কি না জানা ছিলো না জাইফার। আজ যেন খুশিতে কেঁদে দিবে দিবে ভাব। মেয়েটা কান্না করেই দিলো। রাদ গম্ভীর কণ্ঠে বললো,

— এখানে কান্নার কি হলো?

— আমি ভাবি নি রাদ।

— ভাবার কি আছে?

— ভালোবাসেন?

— প্রেম পিরিতি করার মতো রুচি আমার নেই। এতদিন কথা যতটুকু বলেছি তাতেই খুশি থাক। বিয়ের পর সব চুকিয়ে দিব৷ আর নো কথা এখন। আল্লাহ হাফেজ।

বলেই কল কেটে দিলো রাদ। বিয়ের আগে এসব প্রেম ট্রেম সাপোর্ট করে না ও। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ জড়িয়ে ধরলো ওকে। কপালের শিরা গুলো নিমিষেই ফুলে উঠলো রাদের। ঝটকা মেরে সরিয়ে দিলো রাদ। দিশা যেয়ে পরলো ছাদের মেঝেতে। রাদ ওর বাহু ধরে টেনে নিচে নিচ্ছে। দিশা কান্না করতে করতে বললো,

— রাদ ভাই প্লিজ। কোথায় নিচ্ছেন? আমি সত্যি ভালোবাসি আপনাকে। শুনুন না আমি ভালোবাসি রাদ ভাই।

রাদ ছাদ থেকে ডিরেক্ট চাচার বাড়িতে ডুকলো। সবাই খাচ্ছিলো তখন। রাদ দিশাকে চাচার হাতে দিয়ে ঝাঁঝাঁলো কন্ঠে বললো,

— মে সামলে রাখুন। এখানে সেখানে মুখ মারতে যায়। বাকিটা বুঝে নিয়েন ইশান ভাই থেকে। আর আমার সামনে যদি আসে আর আপনার হাতে তুলে দিব না সোজা থাপ্পড়ে মাথা ঠিক করে দিব।

দিশা একাধারে কেঁদেই যাচ্ছে। চাচি তারাতাড়ি রাদকে ধরে বললো,

— কি ওইছে বাবা? দিশা কি করছে? তুমি বছো। মাথা ঠান্ডা করো। ওই তিশা খাওন বার বাবার লিগা।

রাদ চাচির দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বললো,

— খেয়েছি চাচি। এখন যাই। ইশান ভাই থেকে শুনে নিয়েন কি হয়েছে।

বলেই চলে গেল রাদ। চাচা তো রেগে আগুন সব শুনার পর থেকে। দিশাকে রাগের মাথায় চড় মেরে দিলেন। ভয়ে সবাই সিটিয়ে গেল। দিশা দৌড়ে ছাদে চলে গেল। রাদকে ও ভীষণ ভাবে ভালোবাসে। সেই ছোট থেকে পছন্দ করত। এই রাগ চটা রাদটাকে নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসে দিশা। দিন শেষে এক তরফা ভালোবাসা হয়ে রয়ে গেল। মানে হয় তো একটু বেশি কথা বলে দিশা,কিছুটা ছেঁচরামি করে কিন্তু সবটুকু তো রাদকে পেতেই। রাদের এত অপমান এত থাপ্পড় খেয়ে ও ভুলে যায় নি দিশা বরং বেহায়ার মতো ঘুরেছে পিছুপিছু।
কোন ছেলে যখন কোন মেয়ের জন্য পাগলামি করে তখন সেটাতে প্রেমিক বলে পাগলকরা প্রমিক আর যদি কোন মেয়ে সেই পাগলামি করে তাহলে তাকে ছেঁচরামি অথবা নোংরামি বলে।

রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ালো দিশা। এই তিন তলার ছাদ থেকে পড়ে সর্বোচ্চ হাত, পা ভাঙবে মরবে না দিশা। এতে যদি রাদের একটু মন গলে। উঁকি ঝুঁকি দিয়ে ভালোমতো আশে পাশে দেখে নিলো দিশা। এখনই ঝাঁপ দিবে।

_______________

রাত তখন প্রায় ১টা। অফিসে নিজের কেবিনে বসে হাতের থাকা র*ক্তের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আদ্রিয়ান। এটা তার রোদের র*ক্ত। যাকে এতটা ভালোবেসে আগলে আগলে রাখে ঐ ভালোবাসার র*ক্ত। কতটাই না নিকৃষ্ট আদ্রিয়ান ভাবলো নিজে নিজে। কিভাবে রোদের সামনে যাবে? রোদ কি আদও মাফ করবে? যদি চলে যায়? আদ্রিয়ান কি করবে তাহলে?
এতসব ভাবনার মাঝেই একজন গার্ড এসে নক করলো। আদ্রিয়ান, “কাম ইন” বলতেই লোকটা নিচু স্বরে বললো,

— স্যার সব স্টাফ অনেক আগেই চলে গিয়েছে। আমার ডিউটির টাইম….

আর বলতে হলো না আদ্রিয়ান উঠে দাঁড়িয়ে গেল। ফোনটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
বাসায় এসে রুমের দরজা বাহির থেকে খোলা দেখেই যেন আদ্রিয়ানের আত্মা শুকিয়ে গেল। রোদ কি তাহলে চলে গেল? তারাতাড়ি রুমে ডুকে লাইট অন করতেই কলিজায় পানি এলো। না যায় নি রোদ মিশিকে বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে আছে। দরজা লাগিয়ে ডুকলো আদ্রিয়ান। পাশে যেয়ে তাকিয়ে রইলো অপলক। গালে আঙুলের ছাপ স্পষ্ট। কপালের ব্যান্ডেজের উপর দিয়েই লাল হয়ে আছে। হয়তো ক্ষতটা গভীর। আস্তে আস্তে বিড়াল পায়ে রোদের সামনে এসে বসলো আদ্রিয়ান। রোদের মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলো। কি থেকে কি হয়ে গেল? ভালোই তো ছিলো সব তাহলে কেন আদ্রিয়ান নিজেকে সামলাতে পারলো না? ওর অতীত জঘন্য হতে পারে তাই বলে তো তার রোদ খারাপ না। অনুশোচনায় জর্জরিত আদ্রিয়ান আস্তে করে মিশিকে রোদকে থেকে সরিয়ে নিলো। উঠে জারবার রুমে দিয়ে আসলো।

রোদ তখনও বেভুর ঘুমে। আস্তে একটা অয়েন্টমেন্ট নিয়ে বেডে বসলো। গলায় লাল হয়ে আছে। আস্তে করে আঙুলের সাহায্য অয়েন্টমেন্ট লাগিয়ে দিলো। পরপর ঘাড়ের দিকে। টিশার্ট উঠাতেই কিছুটা আঁতকে উঠল আদ্রিয়ান। সাদা নরম পেটটায় লাল হয়ে আছে। লাল দাগে অয়েনমেন্ট লাগালো আদ্রিয়ান। যতক্ষণ ধরে এসব করছে ততক্ষণ শুধু ওর চোখ দিয়ে পানি পরছে। অপরাধবোধ যেন কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে আদ্রিয়ানকে। ঠোঁট লাগিয়ে চুমু খেল পেটে। ঘুমের মধ্যেই কেঁপে উঠল রোদ। আদ্রিয়ান কপালের ব্যান্ডেজটাও চেঞ্জ করে দিলো। রোদের মাথায় হাত দিয়ে আস্তে করে ভাঙা আওয়াজে ডাকলো,

— রোদ? র..রোদ?

এত মৃদু আওয়াজে রোদের কানেও হয় তো গেল না। আদ্রিয়ানের গলা দিয়েও যেন আওয়াজ বের হতে চাইছে না। কেমন কান্না আসছে ভেতর ফেটে। কান্নারত কন্ঠে অপরাধনবোধ মিশিয়ে আদ্রিয়ান আবারও কানের কাছে মুখ নিয়ে ডাকলো,

— এই সোনাপাখি। রোদ? উঠো না একটু।

আদ্রিয়ান এমন ডাকে প্রথমে নড়েচড়ে উঠলো রোদ। আস্তে আস্তে ঘুম ছুটে গেল। আদ্রিয়ানকে দেখেই আস্তে করে উঠে বসলো দূরত্ব বজায় রেখে। এতেই যেন বুকে চিনচিন ব্যাথা করলো আদ্রিয়ানের বুকে। আস্তে করে এগিয়ে আসলো রোদের কাছে। রোদ নিজের মতো বসে আছে। তাকাচ্ছেও না। আদ্রিয়ান রোদের গোল মুখটা নিজের কম্পমান দুই হাত দিয়ে আঁজলায় নিয়ে নিলো। মুখটা উঁচু করতেই রোদের নজর গেল আদ্রিয়ানের দিকে। কোন আওয়াজ ছাড়া কান্না করছে আদ্রিয়ান। চোখ দিয়ে শুধু পানি পরছে। আদ্রিয়ান নিজের মুখ এগিয়ে আনলো রোদের দিকে। লাল হওয়া ফুলে যাওয়া গালে ঠোঁট লাগাতে যেয়েও যেন দ্বিধা কাজ করলো। যদি ব্যাথা পায়? তবুও সাহস করে আস্তে করে ঠোঁট ছোঁয়ালো রোদের গালে। রোদ তখনও ঠাই বসে। আদ্রিয়ানের কিছু বলার ভাষা নেই। দুই হাতে রোদের নরম হাত দুটো পুরে নিলো। অসংখ্য চুমু খেলো তাতে। আদ্রিয়ান রোদকে নিজের কাছে জড়িয়ে ধরতে নিলেই ঝাকটা মে’রে সরিয়ে দিলো রোদ। চমকে আহত নজরে তাকালো আদ্রিয়ান। রোদ উঠে দাঁড়িয়ে চোখ ভর্তি পানি নিয়ে শক্ত গলায় বললো,

— আমার থেকে দূরে থাকবেন। আমি তো চরিত্রহীন। আমাকে ছুঁবেন না আপনি। কাছেও ঘেঁষবেন না। শুধু মাত্র আমার বাচ্চাদের জন্য নাহলে আজ আপনি যা করেছেন তার ফলস্বরূপ আমি চলে যেতাম। থাপ্পড় না হয় মারলেন তাই বলে জা*নো*য়া*রের মতন নিজের পুরুষত্ব ফলাতে চাইছিলেন? রোদকে দূর্বল ভাবার চেষ্টা করবেন না আদ্রিয়ান। আপনার আদর পেয়ে আপনার কাছে থাকতে পারলে আমাকে অসম্মান করলে দূরে যেতে দ্বিতীয় বার ভাববো না।

রোদের থেকে এমন সব কড়া কথা শুনে অভস্ত্য নয় আদ্রিয়ান। হবে কিভাবে জীবনে প্রথম হয়তো রোদ এমন উঁচু গলায় এমন শক্ত কথা বলেছে। নিজের সম্মানের উপর আসলে ছেড়ে দেয়ার পাত্রী রোদ না। এতক্ষণের শক্ত হওয়া রোদকে অবাক করে দিয়ে হঠাৎ আদ্রিয়ান ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলো। ভিষণ ভাবে চমকালো রোদ। আদ্রিয়ান ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে যাচ্ছে। রোদ বুঝলো কিছুটা। হারানোর ভয় হয়তো এটাকেই বলে। তবুও রোদ হাত বাড়িয়ে ধরলো না আদ্রিয়ানকে। আদ্রিয়ান রোদের মাথাটা বুকে চেপে কেঁদে দিয়ে বললো,

— আম..আমি জানি না কি হয়েছিলো তখন। তোমাকে কারো সাথে সহ্য হয় না আমার রোদ। আমি আ..আজ জঘন্য অপরাধ করতে যাচ্ছিলাম।আমি ঐসব কিছুতেই ভুলতে পারছি না রোদ। কি করব বলো? প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও। আ..আমি আর কখনো এমন করব না।আমাকে ছেড়ে যেও না। এই রোদ মাফ করবে না?

রোদের কেমন যানো লাগলো। তীব্র ভালোবাসা থেকেই এই ভয়। নিজের কাছে রাখার জন্যই এতসব আকুতি কিভাবে ফিরিয়ে দিবে রোদ? আদ্রিয়ানের পিঠে আলত করে হাত রাখতেই আদ্রিয়ান কিছুটা শান্ত হলো। রোদকে উঁচু করে বিছানায় চলে গেল। কপালে, গালে অসংখ্য আদর দিতে দিতে বললো,

— এই রোদ শুনছো? তুমি কোন ছেলের সাথে কথা বলবে না ঠিক আছে? শুধু আমার কাছে থাকবে। আমি আদর দিব অনেক। সব দিব। কোন ছেলের আশে পাশে ঘেঁষবে না। শুধু আমার হয়ে যাও না রোদ। এই রোদ আমার হবে শুধু? যা চাইবে সব দিব। অনেক ভালোবাসা দিব।অনেক আদর দিব। একদম এই বুকে ভরে রাখবো। কখন কষ্ট দিব না।আমার অতীত আমার পিছু ছাড়ছে না রোদ। তুমি আমার বর্তমান। তোমাকে নিয়ে সুখে থাকতে দাও আমায়।

পাগলের মতো প্রলাপ করতে লাগলো আদ্রিয়ান। রোদ শুধু অবাক হয়ে শুনেই গেল। থাক না। দিক না একটা সুযোগ। অতীতের বিষাক্ততা দূর হোক আদ্রিয়ানের জীবন থেকে। আর তা যদি রোদ ওর কাছে থাকাতে হয় তাহলে রোদ কাছেই থাকবে। বলবে না অন্য পুরুষের সাথে কথা। কিছু সময় দোষ ছেলে বা মেয়ের থাকে না। দোষ থাকে সময়ের। রোদ আর আদ্রিয়ানেরও ঠিক তাই।
ওভাবেই আদ্রিয়ানের বুকে কাত হয়ে শুয়ে রইলো রোদ। নড়লো না আর না ই কোন কথা বললো।

#চলবে….

[ সব মানুষেরই ভালো, খারাপ দুটা দিক থাকে। আদ্রিয়ানের ও আছে। রোদের দিক থেকে ধরলে রোদ ঠিক আবার আদ্রিয়ানের দিক থেকে ধরলে আদ্রিয়ান ঠিক। কাউকেই দোষ দেয়া যায় না। এবার সবাই সুন্দর সুন্দর কমেন্ট করুন]

{ একটু সুন্দর সুন্দর কমেন্ট করুন }

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

1 মন্তব্য

  1. অসাধারণ। অনেক ভালো লেগেছে। খুশি হয়েছি অনেক দুইটা পর্ব একসাথে পড়তে পেরে৷ পরের পার্টিগুলোও একটু তারাতাড়ি দিবেন প্লিজ অনেক খুশি হবো তাহলে।অপেক্ষায় থাকবো,আমরা পাঠকেরা আশাবাদী আপনারা যতদ্রুত সম্ভব পরবর্তী পর্ব গুলো দিয়ে দিবেন

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ