Tuesday, June 30, 2026







The Winter You left পর্ব-০১

#The_Winter_You_left
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#সূচনা_পর্ব

১.

মানুষের জীবনের কিছু কিছু হিসাব বড় অদ্ভুত। আমরা সবাই ভাবি আমরা একেকটা স্বাধীন নদী, নিজেদের ইচ্ছেমতো পথ তৈরি করে সাগরে গিয়ে মিশব। অথচ নিয়তি নামের একজন অত্যন্ত চতুর মালি আমাদের অজান্তেই একটা নির্দিষ্ট মাটির টবে বুনে রেখে দেয়। সেই টবের মাটির বাইরে যাওয়ার সাধ্য আমাদের কারোরই থাকে না। অথচ কী আশ্চর্য, টবের ভেতরের ওই সামান্য একমুঠো মাটিটুকু নিয়েই মানুষ কত স্বপ্ন দেখে! কত বড় বড় আয়োজন করে! জীবন এত জটিল কেন? কারণ, মানুষ সহজ জিনিস সহজে বুঝতে চায় না।

সিউলের ইনসা-দংয়ের এই পুরোনো অলিগলিগুলো শরতের শেষে এসে কেমন যেন রূপ বদলায়। চেরি ব্লসমের চঞ্চল বসন্ত কিংবা তপ্ত গ্রীষ্মের পর যখন শরৎ আসে, তখন শহরের বাতাস ভারী হতে শুরু করে। রাস্তার দুপাশে থাকা প্রাচীন জিংকো গাছগুলো থেকে টুপটাপ হলুদ পাতা খসে পড়ে ধূসর পিচঢালা রাস্তায়। পাতাগুলো দেখতে হুবহু ছোট ছোট হাতপাখার মতো। বাতাসে একটা চেনা গন্ধ ভাসে। হালকা কুয়াশা, ঝরে যাওয়া পাতা আর কোথাও ওলন্দাজ কায়দায় কড়া করে রোস্ট করা কফির গন্ধ।

এই গলির একদম শেষ মাথায়, যেখানে একটা ছোট ল্যাম্পপোস্ট রাত-দিন একলা দাঁড়িয়ে থাকে, ঠিক তার পাশেই ‘গিয়োউল’ নামের ছোট ক্যাফেটা। ক্যাফেটা কিম মিনহোর। মিনহো ছেলেটা একটু অন্যরকম। বয়স ছাব্বিশ-সাতাশ হবে, ফর্সা মুখাবয়বে সবসময় একটা উদাসীন, শান্ত ভাব। সে চট করে কারও সাথে কথা বলে না। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে মৃদু হাসে। সেই হাসির কোনো অর্থ হয় না। সে সারাদিন ক্যাফের জানালার পাশে কাউন্টারে বসে কফি বানায়, আর সময় পেলে কোরিয়ান ক্ল্যাসিক সাহিত্যের পুরোনো, পাতা-হলুদ হয়ে যাওয়া বইগুলোর পাতা উল্টায়। মিনহোর একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে। সে মাফলার পরতে খুব ভালোবাসে। এখনো তেমন শীত পড়েনি, শহরের তরুণ-তরুণীরা পাতলা জ্যাকেট গায়ে ঘুরছে, অথচ মিনহোর গলায় সবসময় একটা উলের মাফলার জড়ানো থাকে। যেন তার খুব শীত করছে, এক জন্ম-জন্মান্তরের শীত।

আজ সকাল থেকেই সিউলের আকাশটা মেঘলা ছিল। দুপুর গড়াতেই ঝুমঝুম করে বৃষ্টি নামল। কোরিয়ান শরৎকালের বৃষ্টি মানেই বাতাসে এক ঝটকায় হিমেল ঠাণ্ডা নেমে আসা। রাস্তার মানুষজন ছাতা মাথায় দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটছে সাবওয়ে স্টেশনের দিকে। গলিটা দেখতে দেখতে একদম ফাঁকা হয়ে গেল। শুধু জিংকো পাতাগুলো বৃষ্টির তোড়ে রাস্তায় লেপ্টে রইল। ঠিক তখনই ক্যাফের দরজাটা প্রচণ্ড শব্দে খুলে গেল। সাথে নিয়ে এলো একঝলক বুনো ঠাণ্ডা বাতাস আর একটা অবাধ্য মেয়েকে।
মেয়েটার নাম সু-আ। কাঁধ পর্যন্ত ছাঁটা চুলগুলো বৃষ্টিতে ভিজে কপালে লেপ্টে আছে। পরনের ওভারকোটটা ভিজে একসা, সেখান থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ছে ক্যাফের কাঠের মেঝেতে। সে প্রচণ্ড হাপাচ্ছে, আর তার বড় বড় চোখ দুটো বেয়ে বৃষ্টির পানির সাথে চোখের জলও মিশে গড়িয়ে পড়ছে। সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। ক্যাফেতে ঢুকেই সে একটা কোণার টেবিলের চেয়ার টেনে ধপাস করে বসে পড়ল। তারপর টেবিলের ওপর দুহাত রেখে, মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার কান্নার শব্দে ক্যাফের শান্ত আবহটা কেমন যেন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল।

মিনহো একটা কাঁচের কফির মগ সাদা কাপড় দিয়ে মুছছিল। সে কাজ থামাল। খুব শান্ত, নিস্পৃহ চোখে মেয়েটির দিকে তাকাল। ক্যাফেতে কোনো কাস্টমার নেই, শুধু এই একলা মেয়ের কান্নার শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজও নেই। মিনহো কোনো তাড়াহুড়ো করল না। সে খুব ধীরস্থির পায়ে কাউন্টার থেকে বের হয়ে এলো। তার হাতে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ গরম ‘আমেরিকানো’। সে কাপটা সু-আ’র সামনে নামিয়ে রেখে নিচু স্বরে বলল, “মেয়েরা কাঁদলে তাদের দেখতে ভালো লাগে না। বিশেষ করে যাদের চোখ দুটো এত বড় বড়, তাদের তো একদমই না। চোখ ফুলে আলুর মতো হয়ে যায়।”

সু-আ চমকে মুখ তুলল। চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল। সে চোখ মুছে প্রচণ্ড ঝাড়ি দিয়ে উঠল, “আপনার কাছ থেকে রূপের প্রশংসা শোনার জন্য আমি এই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে এখানে আসিনি। কফি আমি অর্ডার করিনি, নিয়ে যান এখান থেকে।”

মিনহো হাসল না, রাগও করল না। সে সু-আ’র মুখোমুখি চেয়ারটায় টেনে বসে পড়ল। অত্যন্ত সহজ ভঙ্গিতে বলল, “টাকা দিতে হবে না। বৃষ্টির দিনে আমাদের এই ক্যাফেতে বসে কাঁদলে কফি ফ্রি পাওয়া যায়। এটা ক্যাফের নিয়ম। তাছাড়াও, গরম কফিটা পেটে গেলে ভেতরের কান্নাটা একটু কমে আসে। খেয়ে দেখুন।”

সু-আ অবাক হয়ে মিনহোর দিকে তাকাল। এই সিউল শহরের বুকে এমন অদ্ভুত, সহজ কথা কেউ বলে? মানুষ তো এখানে অন্যের দিকে তাকানোর সময় পায় না। সে একটু ইতস্তত করে কফির কাপটা দুহাতে জড়িয়ে ধরল। গরম কাপের ওমটা তার ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া হাতের তালুতে লাগতেই ভেতর থেকে একটা দীর্ঘনিশ্বাস বের হয়ে এলো।

“আজকে নিয়ে ঠিক তেইশবার।” সু-আ কফিতে চুমুক না দিয়েই শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল।

মিনহো কপালে মৃদু ভাঁজ করল, “তেইশবার কী?”

“রিজেকশন। সিউলের প্রতিটা থিয়েটার ডিরেক্টর আসলে অন্ধ। তারা কেউ আমার ভেতরের অভিনয়টা দেখতে পায় না। আজকে ডিরেক্টর পার্ক তো স্ক্রিপ্ট রিডআউটের মাঝপথেই আমাকে থামিয়ে দিলেন। সবার সামনে খাতাটা টেনে নিয়ে বললেন হান সু-আ, তোমার এক্সপ্রেশন ঠিক নেই। তুমি আসলে অভিনয়টাই বোঝো না, বাড়ি গিয়ে রান্নাবান্না শেখো। মানুষের সামনে এভাবে অপমান করার কোনো মানে হয়?” বলতে বলতে সু-আ’র গলা আবার ধরে এলো, চোখ ফেটে পানি বের হতে চাইল।

মিনহো জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো কাঁচের গায়ে লেগে অদ্ভুত সব নকশা তৈরি করে গড়িয়ে পড়ছে। সে শান্ত গলায় বলল, “ডিরেক্টররা অন্ধ নয়, সু-আ। তারা আসলে নিখুঁত জিনিস খোঁজে। কিন্তু পৃথিবীতে নিখুঁত বলে কিছু নেই। চড়ুই পাখিটার ডানায় একটু খুঁত থাকে বলেই সে এত সুন্দর করে ওড়ে। ভাঙা ক্যানভাসেই আসল রঙ চেনা যায়। আপনি বুঝতে পারছেন না।” সু-আ হঠাৎ সোজা হয়ে বসল। তার চোখের কান্না উধাও, সেখানে একরাশ বিস্ময়। “আপনি আমার নাম জানলেন কী করে? আমি তো আপনাকে বলিনি!”

মিনহো টেবিলের একপাশে লম্বা আঙুল দিয়ে ইশারা করল। সু-আ’র এতক্ষণে খেয়াল হলো, সে তাড়াহুড়োয় তার থিয়েটারের ডায়েরি আর স্ক্রিপ্টটা টেবিলের ওপর ফেলে রেখেছে, যার কভারে মোটা কালো কালিতে লেখা ‘হান সু-আ’।

সু-আ লজ্জায় আর অপমানে লাল হয়ে ঝটপট ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল। স্ক্রিপ্টটা টেবিল থেকে এক হ্যাঁচকায় টেনে নিয়ে সে হনহন করে উঠে দাঁড়াল। “আপনার কফির জন্য ধন্যবাদ। তবে মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এরকম সস্তা দার্শনিক কথাবার্তা বলাটা বেশ বাজে অভ্যাস। কোরিয়ান পুরুষদের এই এক দোষ, সুযোগ পেলেই জ্ঞান দিতে আসে।” বলেই সু-আ ক্যাফের দরজাটা জোরে ঠেলে আবার বাইরের বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে গেল। মিনহো তাকে ডাকল না, থামানোর চেষ্টাও করল না। সে শুধু তার চেয়ারটায় চুপচাপ বসে রইল। বাইরে বৃষ্টির বেগ আরও বাড়ছে।

খানিক বাদে মিনহো টেবিলটা পরিষ্কার করার জন্য কাপড় হাতে নিয়ে এগোতেই থমকে দাঁড়াল। সু-আ স্ক্রিপ্টটা নিয়ে গেলেও তাড়াহুড়োয় তার ডায়েরির ভেতর থেকে একটা হলুদ রঙের খাম টেবিলের নিচে পড়ে গেছে। মিনহো নিচু হয়ে খামটা কুড়িয়ে নিল। খামটার ওপর কোনো নাম লেখা নেই, শুধু একটা ছোট জলছাপের মতো দাগ। সে আলতো করে খামের ভেতর থেকে একটা ভাঁজ করা সাদা কাগজ বের করল। কাগজে সু-আ’র কাটাকাটি করা, অগোছালো হাতের লেখায় কিছু কথা লেখা। মিনহো মনে মনে পড়তে লাগল,

“যদি আর কোনোদিন এই থিয়েটারের মঞ্চে দাঁড়াতে না পারি, তবে এই রঙহীন পৃথিবীতে আমার থাকাটাই ব্যর্থ। হে ঈশ্বর, তুমি মানুষকে এত বড় বড় স্বপ্ন কেন দাও, যদি তা পূরণ করার ক্ষমতা বা ভাগ্য কোনোটিই না-ই দাও? স্বপ্ন ভাঙার শব্দ কি তুমি শুনতে পাও না? আমার বড্ড একা লাগে।” মিনহো কাগজের লেখাগুলোর ওপর নিজের ফর্সা আঙুলটা বোলাল। ঠিক সেই মুহূর্তে তার নিজের বুকের গভীর থেকে একটা তীব্র ব্যথা মোচড় দিয়ে উঠল। এত তীব্র ব্যথা যে সে কিছুক্ষণের জন্য চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার কপালে হালকা ঘাম জমে উঠল। সে রুমাল বের করে মুখটা চেপে ধরল, তারপর ক্যাফের কাউন্টারে রাখা একটা ছোট ড্রয়ার থেকে দুটো নীল রঙের বড়ি বের করে পানি ছাড়াই গিলে ফেলল। কয়েক মিনিট পর মিনহো আবার শান্ত হলো। সে কাগজটা ভাঁজ করে তার মাফলারের ভেতরের পকেটে রেখে দিল। জানালার বাইরে তখন সিউল শহরটা কুয়াশা আর বৃষ্টিতে ধোঁয়াটে দেখাচ্ছে।

মিনহো ক্যাফের লাইটগুলো একটা একটা করে নিভিয়ে দিল। পুরো ক্যাফেতে তখন শুধু জানালার বাইরের ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো এসে পড়েছে। সেই আলোয় মিনহোকে একটা একাকী ছবির মতো দেখাচ্ছে।

২.

“মানুষ যখন কোনো কিছুর জন্য তীব্রভাবে অপেক্ষা করে, তখন সময়টা কেমন যেন জমে বরফ হয়ে যায়। এক-একটা সেকেন্ডকে মনে হয় এক-একটা যুগ। অথচ যখন সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটা সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন সময় আবার হরিণের মতো ছুটতে শুরু করে। প্রকৃতির এই এক অদ্ভুত রসিকতা। মানুষ সুখের সময়টুকু ধরে রাখতে পারে না, আর দুঃখের সময়টুকু কিছুতেই ফুরোতে চায় না।

পরদিন দুপুরবেলা সিউলের আকাশটা অদ্ভুত রকমের পরিষ্কার। গতকালের সেই মুষলধারে বৃষ্টির পর আজকে ইনসা-দংয়ের রাস্তাগুলো ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেছে। জিংকো গাছের ভেজা পাতাগুলোর ওপর শরতের মিষ্টি রোদ পড়ে চিকচিক করছে। অলিগলির ছোট ছোট খাবারের দোকানগুলো থেকে ‘তদবোকি’ আর গরম ‘অদেন্দাং’ এর ধোঁয়া ওঠা গন্ধ বেরোচ্ছে। সিউলের মানুষজন পাতলা জ্যাকেট গায়ে দিয়ে ব্যস্ত পায়ে হেঁটে চলেছে। হান সু-আ যখন ‘গিয়োউল’ ক্যাফের সামনে এসে দাঁড়াল, তখন তার বুকের ভেতর একটা মৃদু কম্পন। কাল রাতে ডায়েরির ভেতর থেকে সেই হলুদ খামটা যে কীভাবে পড়ে গেল, সে কিছুতেই মাথায় ঢোকাতে পারছে না। ওই খামে তার জীবনের সবচেয়ে গোপন, সবচেয়ে দুর্বল কথাগুলো লেখা ছিল। সিউলের মতো একটা শহরে নিজের ব্যর্থতার কথা কোনো এক ক্যাফে মালিকের কাছে ফাঁস হয়ে যাওয়াটা ভীষণ লজ্জার। সে তিনবার ক্যাফের দরজার হ্যান্ডেলটা ধরল, আবার ছেড়ে দিল। শেষ পর্যন্ত একটা গভীর নিশ্বাস নিয়ে সে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। ভেতরে ঢুকতেই কড়া কফির সুবাস আর সাথে হালকা একটা জ্যাজ মিউিকের সুর তার কানে এলো। ক্যাফেটা বেশ ছিমছাম, কাঠের তৈরি টেবিল-চেয়ারগুলো খুব সুন্দর করে সাজানো। মিনহো কাউন্টারের পেছনে দাঁড়িয়ে একটা সাদা সিরামিকের কাপ মুছছিল। আজ তার গলায় হালকা নীল রঙের একটা উলের মাফলার জড়ানো। সে সু-আকে দেখে অবাকও হলো না, আবার খুব আহ্লাদিতও হলো না। অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বলল, “আসুন। আমি জানতাম আপনি আজ ঠিক এই সময়েই আসবেন। ডায়েরিটা কাউন্টারের ডান পাশে রাখা আছে।” সু-আ দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে ডায়েরিটা হাতে নিল। সে ডায়েরিটা বুকের কাছে চেপে ধরে একটু ইতস্তত করে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “এখানে একটা… মানে একটা হলুদ রঙের খাম ছিল। আপনি কি ওটা পেয়েছেন?” মিনহো কাজ থামিয়ে সু-আ’র দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো এত শান্ত আর গভীর যে সু-আ’র অস্বস্তি আরও বেড়ে গেল। মিনহো কাউন্টারের নিচের ড্রয়ার থেকে খামটা বের করে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর খুব নির্বিকার গলায় বলল, “পেয়েছি। এবং দুঃখিত, আমি ওটা পড়েও ফেলেছি।” সু-আ’র মুখটা মুহূর্তে অপমানে আর রাগে লাল হয়ে গেল। সে খামটা এক ঝটকায় টেবিল থেকে তুলে নিয়ে বলল, “আপনি অত্যন্ত অভদ্র একটা মানুষ! অন্যের ব্যক্তিগত জিনিস পড়ার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে বলুন তো? কোরিয়ান যুবকদের কি ন্যূনতম ভদ্রতাবোধও নেই? স্রেফ কিছু মানুষদের জন্য আমি নিজ দেশের পুরুষদেরকে দুই চক্ষে দেখতে পারি না।”

মিনহো কাপটা উপুড় করে রাখতে রাখতে বলল, “কেউ দেয়নি। তবে জিনিসটা গোপন রাখতে চাইলে ওটা মেঝেতে ফেলে যেতে হয় না। আর ওটা কোনো চিঠি ছিল না সু-আ, ওটা ছিল একটা তীব্র হাহাকার। বৃষ্টির দিনে মানুষ যখন ক্যাফেতে বসে অত করে কাঁদে, তখন তার হাহাকারটা একটু পড়ে দেখতে ইচ্ছে করে।” সু-আ কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। সে বড় বড় চোখ করে মিনহোর দিকে তাকিয়ে রইল।
মিনহো কাউন্টার থেকে বের হয়ে সু-আ’র মুখোমুখি একটা টেবিলের পাশে এসে দাঁড়াল। সে জানালার বাইরের ল্যাম্পপোস্টটার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার রিজেকশনের কারণ আমি জানি। আপনি যখন ডায়লগ বলেন, তখন আপনি ডিরেক্টরকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে আপনি কত বড় অভিনেত্রী, আপনি কত ভালো অভিনয় করতে পারেন। অভিনয় তো বোঝানোর জিনিস না সু-আ, ওটা যাপনের জিনিস। চরিত্রটাকে নিজের ভেতরে নিতে হয়।”

সু-আ ভ্রু কুঁচকে বলল, “আপনি খুব বড় ডিরেক্টর, তাই না? জ্ঞান দিচ্ছেন যে বড় বড়!”

মিনহো মৃদু হাসল। এই প্রথম সু-আ তার ঠোঁটের কোণে একটা পরিষ্কার হাসির রেখা দেখল। মিনহো বলল, “আমি ডিরেক্টর নই, ক্যাফেতে কফি বানাই। তবে আপনি যদি চান, আমার এই ফাঁকা ক্যাফেতে বসে রোজ রিহার্সাল করতে পারেন। বিকেল চারটের পর এখানে কোনো কাস্টমার থাকে না। চারপাশের গোলমাল কমে যায়।”

সু-আ চোখ বড় বড় করে বলল, “আপনার এখানে? কেন? আপনার লাভ কী? সিউল শহরের মানুষ তো বিনা লাভে একটা সুতোও কাউকে দেয় না।”

মিনহো বলল, “লাভ একটা আছে। রিহার্সালের ফাঁকে আমাকে রোজ এক কাপ করে কফি বানিয়ে খাওয়াতে হবে। আপনার হাতের কফি কেমন, সেটা একটু পরীক্ষা করে দেখা দরকার। আমার কফি বানাতে বানাতে ক্লান্তি এসে গেছে। রাজি?”

সু-আ কিছুটা সময় চুপ করে রইল। সিউল শহরে তার কোনো বন্ধু নেই, থাকার মধ্যে আছে একটা ছোট মেস ঘর, কিছু স্ক্রিপ্টের পাতা আর একবুক একাকীত্ব। এই অদ্ভুত ছেলেটার প্রস্তাবটা তার কেন যেন খারাপ লাগল না। সে মাথা নিচু করে ব্যাগ থেকে স্ক্রিপ্টটা বের করতে করতে বলল, “ঠিক আছে। তবে আমি কিন্তু খুব বাজে কফি বানাই। তিতো হয়ে গেলে আমায় দোষ দিতে পারবেন না।”

“তাতে অসুবিধা নেই। জীবনে মাঝে মাঝে তিতো কফি খাওয়ারও একটা আলাদা আনন্দ আছে।” মিনহো বলল।

সেই থেকে শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়। প্রতিদিন বিকেল চারটে বাজলেই সু-আ তার নাটকের স্ক্রিপ্ট আর বড় ব্যাগটা নিয়ে গিয়োউল ক্যাফেতে হাজির হতো। মিনহো নিজেই ক্যাফের সামনের ‘ওপেন’ সাইনবোর্ডটা উল্টে ‘ক্লোজড’ করে দিত। তারপর ভেতরের টেবিল-চেয়ারগুলো সরিয়ে তারা একটা কৃত্রিম মঞ্চের মতো ফাঁকা জায়গা বানিয়ে নিত।

সু-আ যখন স্ক্রিপ্ট দেখে হাত-পা নেড়ে ডায়লগ বলত, “তুমি চলে গেলে এই আকাশটা কার হবে? এই সিউল শহরের এত এত আলো তখন কাকে পাহারা দেবে?” মিনহো তখন কাউন্টারে দুই হাত ঠেকিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত। সে খুব সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম জায়গায় সু-আ’র ভুলগুলো ধরিয়ে দিত। কোথায় গলার স্বর একদম নিচু করে ভাঙতে হবে, কোথায় চোখের পলক একটু দেরিতে ফেলে সামনের মানুষটার দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে মিনহো খুব সহজ করে সব বুঝিয়ে দিত।
সু-আ একদিন রিহার্সাল করতে করতে ক্লান্ত হয়ে একটা চেয়ারে বসল। সে মিনহোকে এক কাপ কফি বানিয়ে দিয়েছে। কফিটা দেখতে বেশ কালো আর ধোঁয়াটে হয়েছে। মিনহো কফিতে একটা ছোট চুমুক দিয়ে মুখটা কেমন যেন করল। সু-আ হেসে ফেলে বলল, “বলেছিলাম না, আমি একদম ভালো কফি বানাতে পারি না!”

মিনহো কাপটা টেবিলের ওপর রেখে বলল, “না, খারাপ না। এর মধ্যে একটা বুনো স্বাদ আছে। আচ্ছা সু-আ, আপনি যখন ডায়লগটা বলেন, তখন কার কথা ভাবেন?” সু-আ একটু থমকে গেল। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “কারও কথা ভাবি না। ডিরেক্টরের থিয়েটারের কথা ভাবি। একটা সুযোগ পাওয়ার কথা ভাবি।”

মিনহো মাথা নাড়ল, “সেজন্যই ডিরেক্টর পার্ক আপনাকে বাদ দিয়েছে। যখন বলবেন ‘তুমি চলে গেলে’, তখন ভাববেন আপনার খুব প্রিয় একজন মানুষ চিরকালের জন্য হারিয়ে যাচ্ছে। তাকে আপনি আর কোনোদিন, কোনো জন্মেই ছুঁতে পারবেন না। তখন বুকের ভেতর যে শূন্যতাটা তৈরি হবে, সেটা মুখে নিয়ে আসবেন। অভিনয় এমনিই হয়ে যাবে।” সু-আ অবাক হয়ে মিনহোর দিকে তাকাল। এই ছেলেটার বয়স তো খুব বেশি না, অথচ তার কথার মধ্যে এত একাকীত্ব কোত্থেকে আসে? সু-আ হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা মিনহো, আপনি কি আগে থিয়েটার করতেন? নাকি কোনো বড় নাটকের দলে ছিলেন?”

মিনহো জবাব দিল না। সে হুট করেই খুব জোরে কেশে উঠল। এমন একটা শুকনো, গভীর কাশি, যা শুনলে মনে হয় বুকের পাজর ছিঁড়ে আসছে। সে কাশির তোড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। ঝটপট পকেট থেকে একটা সাদা রুমাল বের করে মুখটা চেপে ধরল সে। তার কান দুটো মুহূর্তের মধ্যে লাল হয়ে গেল। সু-আ কিছু বুঝে ওঠার আগেই মিনহো দ্রুত পায়ে পেছনের স্টোর রুমের দরজা ঠেলে ভেতরে চলে গেল। ক্যাফেতে আবার সেই জ্যাজ মিউজিকের সুরটা ফিরে এলো। সু-আ একা একলা দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত সটান হয়ে রইল স্ক্রিপ্টের ওপর। বেশ কিছুক্ষণ পর মিনহো যখন স্টোর রুম থেকে ফিরে এলো, তখন তার মুখটা চুন। কপালে ছোট ছোট ঘামের বিন্দু জমেছে। সে কাউন্টারে এসে দাঁড়াল, কিন্তু সু-আ’র দিকে সরাসরি তাকাল না। সে তার ছাই রঙের মাফলারটা হাত দিয়ে একটু টেনে ঘাড়ের কাছে শক্ত করে জড়িয়ে নিল। সু-আ স্ক্রিপ্টটা টেবিল ছেড়ে একটু এগিয়ে এলো। তার চোখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তা। সে নিচু স্বরে বলল, “আপনার শরীর কি খুব খারাপ, মিনহো? ইদানীং আপনার কাশিটা কেমন যেন অদ্ভুত শোনায়। কোনো ডাক্তার দেখিয়েছেন?”

মিনহো একটা খুব স্বাভাবিক হাসির চেষ্টা করে বলল, “অদ্ভুত শোনায় কারণ এটা সাধারণ কাশি না। এটা হলো সিউলের কুয়াশা আর ধুলোবালির কাশি। আমার ধুলোয় তীব্র অ্যালার্জি আছে। শরৎ শেষ হয়ে শীত যখন আসে, তখন এই সমস্যাটা বাড়ে। আপনি কি কফিটা শেষ করবেন, নাকি আমি কাপটা নিয়ে নেব?” সু-আ আর কথা বাড়াল না। সে বুঝল মিনহো এই বিষয়ে আর কোনো প্রশ্ন পছন্দ করছে না। সে কফির কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল। দরজা খোলার আগে সে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “আগামীকাল চারটেয় আসব। ওই দৃশ্যটা আবার করতে হবে, ‘তুমি চলে গেলে এই আকাশটা কার হবে?’’ আমার কেন যেন মনে হচ্ছে কালকে এক্সপ্রেশনটা ঠিকঠাক চলে আসবে।”

মিনহো মৃদু হেসে মাথা নাড়ল, “আচ্ছা, আসবেন। কফিটা কালকে আরেকটু কম তিতো বানানোর চেষ্টা করবেন।” সু-আ চলে যাওয়ার পর ক্যাফেতে আবার সেই পুরোনো নীরবতা নেমে এলো। ঘড়ির কাটার টিকটিক শব্দটা এখন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। বাইরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে, সিউলের নিয়ন আলোগুলো একটা একটা করে জ্বলছে। মিনহো কাউন্টারের পেছনের মেইন সুইচটা বন্ধ করে দিল। পুরো ক্যাফেতে তখন শুধু জানালার বাইরের ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো এসে পড়েছে। সে ধীর পায়ে তার বসার টেবিলটার কাছে এলো। ড্রয়ারটা টেনে সে একটা নীল রঙের প্লাস্টিকের ফাইল বের করল। ফাইলে ‘সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হসপিটাল’ বড় বড় করে লেখা। মিনহো ফাইলের পাতাগুলো উল্টাল না। সে ফাইলটার ওপর নিজের ফর্সা, ঠাণ্ডা হাতটা রেখে কিছুক্ষণ চুপচাপ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। জানালার কাঁচের ওপাশে জিংকো গাছের একটা বড় হলুদ পাতা বাতাসের তোড়ে এসে আটকে রইল। মিনহো পাতাটার দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে একা একাই বলল, “আকাশটা আসলে কারোর একার হয় না, সু-আ। আকাশ সবার জন্য একভাবে থাকে। মানুষটাই শুধু একসময় থাকে না।” সে কুয়াশা জড়ানো জানালার বাইরে তাকিয়ে একটা লম্বা, ভারী নিশ্বাস ফেলল। তার সেই নিশ্বাসের শব্দটুকু ছাড়া পুরো ফাঁকা ক্যাফেতে আর কোনো শব্দ রইল না।

চলবে?

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ