#ভেজা_বর্ষায়
#পর্ব-২(শেষ পর্ব)
#সারা মেহেক
ঘনঘোর বর্ষায় শিরিন বেগমকে দাফন করা হলো। প্রথম কবরে প্রচুর পানি জমে যাওয়ায় কিছুদূর পর গিয়ে আরেকটা কবর খুঁড়া হয়। সেখানেই যতদ্রুত সম্ভব তাকে দাফন করা হয়। দাফন কাফনের পুরোটা কাজে মোর্শেদ সাহেবকে পূর্ণ সহযোগিতা দিয়েছেন এলাকার লোকজন। ওদিকে বাড়িতে আফরাকে সামলাচ্ছেন পাশের বাড়ির মহিলাগুলো।
আফরা এখন কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে। মায়ের খাটিয়া সে কিছুতেই নিতে দিবে না। এ নিয়ে ভীষণ জিদ দেখিয়েছে সে। কাদাযুক্ত উঠোনে শুয়ে কাঁদতে কাঁদতে গড়িয়ে পড়েছে। মোর্শেদ সাহেব মেয়েকে রেখে বেশ কষ্টে স্ত্রীর খাটিয়া কাঁধে তুলেছেন৷
শিরিন বেগমের মৃ’ ত্যু’ র খবর নার্স ফোন করে জানায় মোর্শেদ সাহেবকে। তিনি গিয়েছিলেন বন্ধুর বাড়িতে। সেখান থেকে মায়ার সাথে দেখা করার কথা ছিলো। মায়া তার মা নিয়ে দু রুমের বাসায় ভাড়া থাকে। অভাবের সংসার তাদের। মায়া একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে জয়েন করেছে কয়েক মাস হলো। এই এক স্কুলের বেতন দিয়েই বাসা ভাড়া,খাওয়াদাওয়া, মায়ের চিকিৎসা,সবকিছু চালাতে হয়।
শিরিন বেগম যখন অসুস্থ তখন বন্ধুর বিয়ে খেতে গিয়ে মায়ার সাথে দেখা হয় মোর্শেদ সাহেবের। সেই থেকেই পরিচয় দুজনের। মোর্শেদ সাহেব শুরু থেকেই মায়াকে জানান যে তিনি অবিবাহিত। অথচ এদিকে যে তার আট বছরের একটি মেয়ে আছে,স্ত্রী অসুস্থ সে খবর তিনি জানানোর প্রয়োজন বোধ করেননি । মোর্শেদ সাহেব মোটামুটি সুদর্শন দেখে মায়াও তাঁর প্রেমে পড়ে যায়, তাঁর কথার ছলে নিজেকে হারায়।
মায়া গত রাতে অনেকক্ষণ যাবত মোর্শেদের জন্য অপেক্ষা করেছিলো। সে বারবার ফোন করে। কিন্তু মোর্শেদ ফোন রিসিভ করেন না। পরে মোর্শেদ ম্যাসেজে জানায় সে অতি জরুরী কাজে ব্যস্ত। তাই মায়া আর কিছু বলেনি।
..
আফরা কিছুতেই বাবার সঙ্গ ছাড়ছে না। সেই যে তার ঘুম ভেঙেছে তখন থেকেই ‘মা মা’ করে কাঁদতে কাঁদতে বাবার কাঁধে লেপ্টে পড়ছে। ছোট্ট জীবনে প্রথম ট্রমা পেয়ে মেয়েটা রাত আসতে না আসতেই তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হলো। মোর্শেদ সাহেব সব ভুলে তখন মেয়ের সেবায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
সবে মাত্র ওষুধ খেয়ে শুয়েছে আফরা। জ্বর এখনও কমেনি। মোর্শেদ সাহেব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন,রাতেও এমন জ্বর স্থায়ী হলে তৎক্ষনাৎ মেয়েকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবেন। ততক্ষণে মেয়ের শিয়রেই রাত কাটাবেন।
শুয়ে থাকার বেশ কিছুক্ষণ পর আফরা অস্পষ্ট স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
” বাবা? মা কি সত্যিই আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে? আর ফিরবে না মা?”
মোর্শেদ সাহেব নীরব রইলেন অনেকক্ষণ। তিনি নিজেও সত্যটা জানেন। তবে আফরার প্রশ্নে যেনো নতুন করে সত্যের মুখোমুখি হলেন। সত্যিই তবে শিরিন ফিরে আসবে না? শিরিন কি সত্যিই তাদের দুজনকে একা রেখে চলে গিয়েছে?
আফরা ফের প্রশ্ন করলো,
” বলো না বাবা। ”
মোর্শেদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“ঘুমাও মা। আমার শরীরটা অনেক ক্লান্ত। এ নিয়ে কাল কথা বলি? লক্ষী বাচ্চারা ঘুমানোর সময় এত কথা বলে না।”
আফরা আর টু শব্দটুকুও করলো না। মনের মধ্যে বয়ে চলা উসখুস নিয়েই ঘুমানোর চেষ্টা করলো।
এদিকে আফরা ঘুমিয়ে গেলেও মোর্শেদ সাহেবের দু চোখের পাতা এক হলো না। ঘণ্টাখানেক বিছানায় শুয়ে নির্ঘুমভাব কাটিয়ে উঠলেন। ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালেন। আজ বড্ড একা লাগছে। মনে হচ্ছে কিছু একটা নেই। খুব কাছের জিনিস হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মোর্শেদ সাহেব।
বাইরে তুমুল বৃষ্টি। বজ্রপাতসহ বৃষ্টিতে ঝাপসা হয়ে আসছে প্রকৃতি। মোর্শেদ সাহেব সিগারেট ধরালেন। এমন একলা মুহূর্তে এই সিগারেটের সুখ টানই একমাত্র ভরসা। সিগারেট ধরিয়ে তিন টান দিলেন। অথচ নিঃসঙ্গ ভাবটুকু কাটলো না তার। বুকের ভেতরটা ভার ভার লাগছে। সত্যি বলতে এই মুহূর্তে শিরিনকে বড্ড মনে পড়ছে তার। একসময় ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন তিনি। কালের পরিক্রমায় সে ভালোবাসা ফিকে হতে হতে একদম ‘নেই’ এর পর্যায়ে এসে ঠেকলো। ততদিনে শিরিন বেগম এতিম হয়েছেন,রোগ ধরা পড়েছে তার। মোর্শেদ সাহেবও ততদিনে অন্য নারীর প্রতি ঝুঁকেছেন,নিজের সত্য গোপন করে। শিরিন বেগমের প্রতি নূন্যতম দায়িত্ববোধটুকুও শেষ সময়ে এসে ‘নাই’ হয়ে গিয়েছে তার। কিন্তু এখন কেনো যেনো সেই ‘নাই’ হয়ে যাওয়া দায়িত্বের বোঝায় কাঁধ ভারী হয়ে আসছে তাঁর। অথচ তার দায়িত্ব নামক স্ত্রীটি পরপারে পাড়ি জমিয়েছে।
মোর্শেদ সাহেব অনেকক্ষণ ভাবলেন। অতঃপর সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন এই বৃষ্টির মধ্যেও। আত্মগ্লানি কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে তাঁকে। যে কাজটা তিনি স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় করেননি তা স্ত্রী মৃত অবস্থায় করতে যাচ্ছেন।
রাত বাজে ১২টা। চারপাশ জনমানবশূন্য। বৃষ্টির তেজ পূর্বের তুলনায় কিছুটা কমেছে, পুরোপুরি নয়। মোর্শেদ সাহেব সাবধানে ছাতা নিয়ে কবরস্থানের বেড়া খু্লে ভেতরে ঢুকলেন। টর্চ লাইট জ্বালিয়ে ঘাসযুক্ত কর্দমাক্ত মাটিতে বেশ সাবধানে পা ফেলে শিরিন বেগমের কবরের কাছে আসলেন৷ শিরিন বেগমের কবর নীল রঙের বড় এক পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা। তীব্র বৃষ্টিতে যেনো মাটি না সরে যায় তাই এমনটা করা হয়েছে। মোর্শেদ সাহেব এক ঘোরে চেয়ে রইলেন শুধু সেদিকে। কখন যে অশ্রুতে দু চোখ ভিজে উঠলো তা টের পাননি তিনি।
আবারও ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো। পলিথিনের উপর বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে তীব্র শব্দ তৈরী করলো। কিন্তু মোর্শেদ সাহেবের কান অব্দি সে শব্দ যেনো পৌঁছালোই না! তিনি ধপ করে বসে পড়লেন সদ্য খুঁড়া কবরের স্যাঁতস্যাতে মাটির পাশে। দুর্বল হাত হতে ছাতাটা পড়ে রইলো ঠিক পাশে। ঝুম বৃষ্টিতে তিনি ভিজছেন। চাহনির নেই কোনো পরিবর্তন। নীরব দৃষ্টি জোড়া স্ত্রীর কবরের উপর স্থির হয়ে আছে। প্রকৃতির তুফানের সাথে পাল্লা দিয়ে তার ভেতরেও বিশাল তুফান চলছে।
অনেকক্ষণ এভাবে বসে থাকার পর মোর্শেদ সাহেব আলতো হাতে শিরিন বেগমের কবরের উপর হাত বুলিয়ে দিলেন৷ অতি সযত্ন,অতি মমতার সে হাত! অতঃপর সিক্ত গলায় আধো আধো কণ্ঠে বললেন,
” আমাকে ক্ষমা করে দিও শিরিন৷ দয়া করে ক্ষমা করে দিও।আমি জানি তোমার সাথে যে অন্যায় করেছি তা ক্ষমার অযোগ্য। যে সময়ে তোমার পাশে সবচেয়ে বেশি থাকার কথা ছিলো, সে সময়েই আমি অন্যকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। নিজের উপর ঘৃণা হচ্ছে আমার। এই চিন্তাটুকু যদি সময়মতো হতো তাহলে আজ তোমার এ করুণ পরিণতি হতো না। আমার জন্য আজ তোমার এই অবস্থা শিরিন৷ তোমার খু* * নী আমি। কোন মুখে ক্ষমা চাইবো আমি! তুমি কি আদৌ ক্ষমা করতে পারবে আমায়? শেষ সময়ে মনে কষ্ট নিয়ে গিয়েছো তুমি। ”
বলতে বলতেই হু হু করে কেঁদে উঠলেন মোর্শেদ সাহেব। বিলাপ করে কাঁদতে লাগলেন এ পর্যায়ে। কান্নার মাঝেই ফের বললেন,
” আমি যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন এ পাপের ভার বয়ে বেড়াবো। আমি কখনই নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না শিরিন। আমার উচিত ছিলো শেষ সময় পর্যন্ত তোমার হাতটা ধরে রাখা। যে আমাকে ভরসা করে তুমি এতদূর এসেছো সে আমিই তোমার সঙ্গ ছেড়ে পরনারীতে আসক্ত হয়েছিলাম। আমি জানি না তুমি কীভাবে সহ্য করেছো এসব৷ জানো,শিরিন? তোমার প্রতি ভীষণ কষ্ট হচ্ছে আমার। আফসোস হচ্ছে এই ভেবে যে আমার মতো দুশ্চরিত্র এক পুরুষ তোমার জীবনে এসেছিলো। যে তোমার অসুখের সময়টাতে নিজের বিবেকবোধ হারিয়ে পাপের রাস্তায় হেঁটেছিলো। এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত ইহকালে কীভাবে করা সম্ভব জানি না। তবে আল্লাহর কাছে দোয়া করবো,তিনি যেনো তোমার কবরের সকল আজাব মুক্ত করে দেন এবং তোমাকে জান্নাতবাসী করেন। ”
বলে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। নীরব অশ্রু ফেলে এক ঘোরে চেয়ে রইলেন কবরের পানে।
.
১০ বছর পর,
আজ থেকে আফরার এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হলো। আজ বাংলা পরীক্ষা। সকাল থেকে মোর্শেদ সাহেবের সে কি তোড়জোড়! কখনও আফরার কলেজ ড্রেস ইস্ত্রি করছেন,কখনও আফরার এক্সাম ব্যাগে চেক করছেন,সবকিছু ঠিকঠাক রেখেছে কি না,কখনও বা পাউরুটি টোস্ট করছেন। সকাল থেকে এসব নিয়েই পড়ে আছেন তিনি। ওদিকে আফরা টেবিলে বসে ঢুলছে আর পড়া রিভাইস দিচ্ছে।
মোর্শেদ সাহেব ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলেন পৌনে ৯টা বাজে। ৯.১০ এর মধ্যে না বের হলে এক্সাম হলে পৌঁছাতে পারবে না। তাই আফরার ড্রেস ইস্ত্রি শেষ হলে চটপট করে পাউরুটিতে জ্যাম লাগিয়ে আফরার মুখের সামনে ধরলেন। আফরা বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে একটা কামড় বসালো তাতে। এই ফাঁকেই মোর্শেদ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,
” রিভাইস পুরোপুরি কমপ্লিট হয়েছে মা?”
সে পাউরুটি চিবুতে চিবুতে বললো,
” হ্যাঁ বাবা,প্রায় কমপ্লিট।”
এ পর্যায়ে আফরার খাওয়া শেষ হলে মোর্শেদ সাহেব হাত ধুয়ে ইস্ত্রি করা ড্রেস নিয়ে বললেন,
” যা রেডি হয়ে নে। হাতে সময় কম। আর ১০ মিনিটের মধ্যে বের না হলে কলেজে পৌঁছাতে কষ্ট হয়ে যাবে। আর প্রথমদিন তো,তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে হবে। ”
আফরা দ্রুত রেডি হয়ে ব্যাগ নিলো। সবকিছু রিচেক করে দেখলো ঠিকঠাক আছে কি না। ইতোমধ্যে মোর্শেদ সাহেবও রেডি হয়ে গেলেন৷ বের হওয়ার পূর্বের দোয়া পড়ে মেয়ের মাথায় ফুঁ দিয়ে দিলেন।
সময়মতো এক্সাম হলে পৌঁছালো দুজনে। হলে ঢুকার পূর্বে মোর্শেদ সাহেব মেয়েকে সাহস দিয়ে বললেন,
” যা মা,ভালোভাবে পরীক্ষা দিস। ইন শা আল্লাহ ভালো হবে। মনে সাহস নিয়ে পরীক্ষা দিস। আর বাবা আছি তো! টেনশন করিস না৷ যা। ”
আফরা মৃদু হেসে তাকে ‘থ্যাংকইউ বাবা’ বলে এক্সাম হলে ঢুকলো। আর তিনিও পিছন থেকে সাহস জুগিয়ে ফিরতি হাসি দিলো।
মেয়ের পরীক্ষার পুরোটা সময় মোর্শেদ সাহেব হলের বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন। সম্পূর্ণ সময় তার কাটলো দুশ্চিন্তায়। কখনও ঘড়ি দেখছেন,কখনও দোয়া পড়ছেন। এভাবে করে কখন যে তিন ঘণ্টা সময় কেটে গেলো!
আফরা পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়েই বাবাকে জড়িয়ে ধরলো। উচ্ছ্বসিত গলায় বললো,
” পরীক্ষা অনেক ভালো হয়েছে বাবা৷ একদম ফুল এন্সার দিয়েছি। ”
মোর্শেদ সাহেব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। মেয়েকেও জড়িয়ে ধরে বললেন,
” আলহামদুলিল্লাহ। এবার তাহলে বাসায় চল। রান্নাবান্না করতে হবে তো!”
” হুম চলো। ”
বাসায় যাবার পথে মেয়েকে একটা কোন আইসক্রিম কিনে দিলেন মোর্শেদ সাহেব। পথিমধ্যে বাসায় গিয়ে কি কি রান্না করবেন তাই চিন্তা করলেন।
.
রাতের খাবার খেয়ে আফরা ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু মোর্শেদ সাহেব এখনও জেগে। ফ্রিল্যান্সিং এর কাজ করেন তিনি। সেই সুবাদেই জেগে থাকা হয়। তবে আজ কাজে মন বসছে না৷ তাই রুমের লাইট অফ করে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালেন। রাতের আকাশটাও কুচকুচে কালো হয়ে আছে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে বেশ মেঘ জমেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো বৃষ্টি নামবে।
এই ভাবতে ভাবতেই বৃষ্টি নেমে এলো। একদম ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামছে। এই বৃষ্টি এলেই মোর্শেদ সাহেব অতিতে চলে যান৷ আজ থেকে ১০ বছর পূর্বে এমনই এক দিনে শিরিন বেগমকে কবরে শুইয়ে এসেছিলেন। ঠিক সেদিনই নিজেকে
বদলে ফেলার নিয়ত করেছিলেন। নিজের সময়, ধ্যান সবটুকু একমাত্র আফরার উদ্দেশ্যে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেদিনের পরেরদিন মায়ার সাথে দেখা করে নিজের সম্পর্কে সকল সত্য জানিয়েছিলে এবং অবৈধ সম্পর্কের ইতি টেনে এসেছিলেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তিনি বিয়ে করেননি। তার পরিবারের লোকজন,কলিগ,পাড়াপ্রতিবেশি সকলে বলেছিলো,অন্ততপক্ষে ছোট আফরার দিকে চেয়ে হলেও একটা বিয়ে করতে,ওকে নতুন মা এনে দিতে। কিন্তু মোর্শেদ সাহেব ওয়াদা করেছিলেন,মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কোনো পরনারী তার জীবনে আসবে না। আফরাকে সে একাই মানুষ করবে। তিনি তার ওয়াদা রেখেছেন। নিজ হাতে আফরাকে এতদূর পর্যন্ত মানুষ করেছেন। পড়িয়েছেন,খাইয়েছেন,অসুখে দেখভাল করেছেন। যে সময়ে মেয়েদের মায়ের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিলো সেসময় মোর্শেদ সাহেব একজন মায়ের ভূমিকা পালন করেছে আফরার জীবনে।
মোর্শেদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মৃদু শব্দে বললেন,
” শিরিন? আমাকে কি ক্ষমা করতে পেরেছো? বোধহয় না। আচ্ছা থাক,ওসব কথা বাদ দাও। তুমি আমাদের আফরাকে দেখেছো? ও কত বড় হয়ে গেছে না! এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে ও। ক’দিন পর কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে ভার্সিটিতে পড়বে। মনে হচ্ছে মেয়েটা চোখের পলকে বড় হয়ে গেলো। ও এখন মাঝেমধ্যে তোমার কথা বলে৷ তবে আমার মন খারাপ হবে বিধায় নিজে থেকেই কথা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়। মেয়েটা কত বুঝদার হয়েছে! একদম তোমার মতো শিরিন। ”
মোর্শেদ সাহেব বাকি রাতটা বেতের চেয়ারে বসে ব্যালকনিতেই কাটালেন। স্ত্রীর স্মৃতিতে ডুবে রইলেন কতক্ষণ! ১০ বছর আগে যে স্ত্রীর উপর থেকে মন সরিয়ে নিয়েছিলেন,সেই স্ত্রীর স্মৃতিতেই এখন তার বসবাস।
~সমাপ্ত~
