#ভেজা_বর্ষায়
#পর্ব-১
#সারা মেহেক
” আমি চলে গেলে তোমার বাবাকে বলো তোমার জন্য ছোট মা নিয়ে আসতে। ছোট মা তোমাকে অনেক ভালোবাসবে সোনা।”
রোগাক্রান্ত মায়ের মুখে এহেন কথা শুনে তাজ্জব বনে গেলো আফরা। তার চোখেমুখে কৌতূহলের দেখা মিললো। এমন অদ্ভুত কথার ভিত্তি জানার জন্য সে জিজ্ঞেস করলো,
” তুমি কোথায় যাবে মা?”
শিরিন বেগম দুর্বল চিত্তে হাসলেন। ছোট্ট আফরার প্রশ্নে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
” আল্লাহর কাছে চলে যাবো মা। আমার হাতে সময় বেশি নেই। ”
আফরা কিছুক্ষণ সময় নিলো। মায়ের কথার অর্থোদ্ধার করতে তার ছোট্ট মস্তিষ্কে জোর দিলো। এর আগে পাশের বাসার চাচির কাছে শুনেছিলো, যে মা* রা যায় সে-ই আল্লাহর কাছে চলে যায়। এই ভেবে আঁতকে উঠলো আফরা। ঠিক সেসময় প্রচণ্ড বজ্রপাতে কেঁপে উঠলো এলাকা। ক্ষণেই মা’কে জাপটে ধরলো সে। মা’কে হারানোর ভয়,বজ্রপাতের ভয় একসাথে গ্রাস করলো তাকে।
শিরিন বেগমের বুকে গুটি-শুটি মেরে শুয়ে কম্পিত গলায় বললো,
” না মা। তোমাকে আল্লাহর কাছে যেতে দিবো না। তুমি মা’ রা গেলে আমাকে দেখবে কে!”
শিরিন বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। নম্র গলায় ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,
” আমি মা’ রা যাবো কে বললো তোমাকে?”
” আমি জানি মা। যারা মা’ রা যায় তারাই আল্লাহর কাছে চলে যায়।
” আচ্ছা! কে বললো তোমাকে এটা?”
“পাশের বাসার চাচি বলেছে। শুনো মা, আমি তোমাকে একা আল্লাহর কাছে যেতে দিবো না৷ আমিও তোমার সাথে যাবো।”
ছোট্ট আফরার অবুঝ কথায় শিরিন বেগমের বুকটা ধক করে উঠলো। তিনি পরম যত্নে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন৷ দু চোখ বেয়ে তখন অঝোর অশ্রু ঝরলো। আফরা মায়ের কান্না দেখে কিছু বললো না। বরং চুপচাপ বিড়ালের ন্যায় মায়ের বুকের সাথে আরোও মিশে রইলো।
কিছুক্ষণ পর সে শিরিন বেগমের বুক থেকে মাথা তুলে সেখানে থুঁতনি ঠেকালো। ছোট হাত দিয়ে অশ্রুসিক্ত মায়ের গাল দুটো মুছে আদুরে গলায় বললো,
” কান্না করো না মা। আমি আছি তো! আমি থাকতে কান্না করবে না একদম। আর বৃষ্টিটা কমলেই বাবা চলে আসবে। ”
শিরিন বেগম দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। আফরার কথায় মন গললো না তার। স্বামীর আচরণ সম্পর্কে তিনি ভালো মতো অবিহিত। এই এক মরণব্যাধি রোগই তাকে স্বামীর আসল রূপ চিনিয়ে দিয়েছে। আজ পাঁচ মাস যাবত যক্ষ্মা ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত তিনি। শুরুতে মোর্শেদ সাহেব অর্থাৎ তার স্বামী বেশ ভালো যত্ন নিয়েছে। ভেবেছিলেন সাধারণ শ্বাসকষ্ট হয়েছে তার স্ত্রীর। একজন ডাক্তার দেখিয়ে কয়েকটা ওষুধ কিনে খাওয়ালে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এই রোগ আর ঠিক হলো না। বরং কয়েকবার ডাক্তার বদল হলো, ওষুধ বদলালো। সাধারণ শ্বাসকষ্ট থেকে নিউমোনিয়া অতঃপর যক্ষ্মা ধরা পরলো শিরিন বেগমের। মা বাপ মরা মেয়েটার প্রতি তখন আর মোহসেন সাহেবের মায়া-মমতা,দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা কিছুই অবশিষ্ট রইলো না। ধীরেধীরে স্ত্রীর অজান্তে জড়িয়ে পড়লেন অন্য এক সম্পর্কে। তার ধ্যানজ্ঞান সবকিছু সেখানেই জড়িয়ে পড়লো। পরনারীর মোহে স্ত্রী ও এক মাত্র কন্যার উপর হতে মন হারালেন তিনি। তবুও মনুষ্যত্বের জন্য শিরিন বেগমের চিকিৎসায় যৎসামান্য খরচ করেন তিনি। আর বাকি টাকাটা দেন শিরিন বেগমের নামে বেচা জমি হতে পাওয়া অর্থ দিয়ে। যদিও সে অর্থের অর্ধেক সুযোগ পেয়ে নিজের পকেটে ভরেছেন তিনি। এখন অপেক্ষায় আছে শিরিন বেগমের অন্তিম দিনের।
বাইরে তুমুল ঝড় উঠেছে। কালবৈশাখী ঝড় বোধহয়। থেকে থেকে বজ্রপাতের ধ্বনিতে কেঁপে উঠছে এলাকা। ঝুম বৃষ্টিতে ঝাপসা হয়ে এসেছে প্রকৃতি। শিরিন বেগমের বাড়ির টিনের চালে ধুমধাম আম পড়ছে। কচি ডালগুলোও সব ভেঙে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। এমন ঝরঝর বর্ষায় ভীষণ খিচুড়ি খেতে মন চাচ্ছে। শেষ কবে আয়োজন করে খিচুড়ি খেয়েছিলো মনে পড়ছে না৷ আজ মোর্শেদ সাহেব বাসায় থাকলে একটু খিচুড়ি খাওয়ার আবদার করতেন৷ ভালোবেসে না,হয়তো মনুষ্যত্বের খাতিরে একটু খিচুড়ি রাঁধতেন তিনি!
অনেকক্ষণ যাবত বৃষ্টি হচ্ছে৷ শিরিন বেগমের মুখে অক্সিজেন মাস্ক। ডাক্তার বলেছে তার হাতে আর বেশি সময় নেই। যেকোনো সময় এ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমাবেন তিনি। তাই শেষ সময়টুকু বাসায় এক নার্সের সহায়তায় চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন নার্সটিঁ পাশের রুমে ঘুমাচ্ছেন। ঘড়িতে বাজে ১০টা। রাত ১০টা। মোর্শেদ সাহেব বাসায় নেই। বাজারের একটা বড় কাপড়ের দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন তিনি। পাঁচ মাস আগে এ সময়টায় বাসায় থাকতেন তিনি। কিন্তু এখন রাত ১১টা পার হয়ে গেলেও বাসার ধার ঘেঁষেন না তিনি।
এ রোগেও শিরিন বেগমের বাঁচবার প্রচণ্ড ইচ্ছা ছিলো। নিজের মেয়ের জন্য,নিজের স্বামীর জন্য। কিন্তু স্বামীর পরকীয়ার খবর জানতে পেরে বেঁচে থাকার শেষ আশাটুকুও হারিয়েছেন তিনি৷ তবুও এখনও মেয়েটার জন্য বাঁচতে ইচ্ছে করে। কারণ তিনি আজ মারা গেলে কালই মেয়ের বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে আনবেন। মেয়েকে সৎ মায়ের সাথে থাকতে হবে তখন৷ তিনি ভালোভাবেই জানেন সৎ মায়ের জ্বালা কি। তিনি নিজেও যে সৎ মায়ের অবহেলায় বড় হয়েছেন! তাই সেই একই কষ্ট মেয়েকে দেন কীভাবে! কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা বোধহয় অন্য। তিনি নিজে যে কষ্টে মানুষ হয়েছে, তার মেয়েটাও বোধহয় সে কষ্টে মানুষ হবে।
আফরার নীরবতা দেখে শিরিন বেগম টের পেলেন,মেয়ে তার বুকে ঘুমিয়ে পড়েছে। ক্যানুলাসহ হাতটি তিনি মেয়ের মাথায় বুলিয়ে দিতে থাকেন৷ এর মধ্যেই হঠাৎ ঘুম ভাঙে আফরার। ঘুমুঘুমু চোখে মাথা তুলে মায়ের মৃদু হাসিময় চেহারাটা দেখে। মুচকি হেসে বলে,
” আমি ভেবেছি,আমাকে রেখেই তুমি চলে গিয়েছো মা। আমাকে একা রেখে যাবে না কিন্তু। ”
শিরিন বেগম হাসলেন। বললেন,
” সব জায়গায় বাচ্চাদের যেতে হয় না সোনা। কিছু জায়গায় বড়দের একা যেতে হয়।”
” একা কেনো যেতে হয় মা?”
“কারণ বাচ্চারা সেখানে গেলে ভয় পাবে এজন্য বড়দের একা যেতে হয়। ”
” কিন্তু আমি ভয় পাবো না মা। আমি তো অনেক সাহসী। বাবা বলেছে আমি একদম তোমার মতো সাহসী। ”
” বাবা ঠিক বলেছে সোনা৷ কিন্তু আমি যেখানে যাবো সেখানে একা যেতে মানা৷ ”
এই বলতে বলতে শিরিন বেগমের হঠাৎ করেই তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। শ্বাসকষ্টে হাপরের মতো তার বুক উঠানামা করছে। এই দেখে আফরা ভয়ে মায়ের কোল থেকে সরে এলো। এক দৌড়ে গিয়ে পাশের রুম থেকে নার্সকে ডেকে আনলো৷
নার্স দ্রুত এসেছে অক্সিজেন সিলিন্ডার চেক করলো। কিছু করার পূর্বেই দেখলো শিরিন বেগমের অক্সিজেন স্যাচুরেশন তীব্র গতিতে কমছে,সাথে পালসও কমছে মারাত্মকভাবে।
কয়েক মিনিট,মাত্র কয়েক মিনিটের মাঝে শিরিন বেগমের সব ভাইটাল সাইন নিল হয়ে এলো। শ্বাসপ্রশ্বাস থেমে গেলো ক্ষণেই। মনিটরের বিইপপপ শব্দে রুমজুড়ে নেমে এলো নিস্তব্ধতা।
ছোট্ট আফরা তার মায়ের ছটফটানো দেখতে দেখতে হঠাৎ টের পেলো তার মা সম্পূর্ণরূপ নিশ্চল হয়ে শুয়ে আছে৷ তার চোখের সামনেই নার্স তার মায়ের খোলা চোখটা হাত দিয়ে বন্ধ করে দিলো৷ অক্সিজেন মাস্কটা মুখ থেকে সরিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলো।
আফরার মনে তখন আতঙ্কের জন্ম নিলো। তার মা কি তবে তাকে রেখেই আল্লাহর কাছে চলে গিয়েছে? সে গিয়ে নার্সকে জিজ্ঞেস করলো,
” আন্টি? মায়ের মুখ থেকে ওটা সরালে কেনো? মায়ের কি হয়েছে?”
আফরা দেখলো নার্সের দু গাল অশ্রুজলে ভিজে উঠেছে৷ নার্স বললো,
” তোমার মা চলে গিয়েছে আফরা। তোমার মা আল্লাহর কাছে চলে গিয়েছে। ”
ক্ষণেই আফরা চিৎকার দিয়ে মায়ের বুকে লুটিয়ে পড়লো। ছোট্ট দু হাতে মায়ের মুখ ধরে কা়দতে কাঁদতে বললো,
” মা,ও মা, মা! আমাকে একা ছেড়ে গেলে কেনো মা? আমিও তোমার সাথে যাবো। আমাকেও তোমার সাথে আল্লাহর কাছে নিয়ে যাও মা। ”
#চলবে
