Thursday, June 4, 2026







ভালো লাগে ভালোবাসতে-পর্ব ৮

#ভালো লাগে ভালোবাসতে
#পর্ব-৮
Writer: ইশরাত জাহান সুপ্তি

মাঝে মাঝে স্ব-ইচ্ছায় আমি আলসেমিকে নিজের উপর চড়াও হতে দেই।পৃথিবীর যাবতীয় সংস্পর্শ থেকে মুক্ত হয়ে আলসেমির পুকুরে ডুব দেওয়াটা মন্দ লাগে না।দুই দিন যাবৎ ভার্সিটি যাই না।গভীর ঘুমের রাজ্যে এখন আমার যোগাযোগ।ফোনের ব্যাটারি নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।আলসেমি ভেঙে সেটা ঠিক করারও ভেতর থেকে কোনো তাড়া আসছে না।সোমা আপু গ্রামের বাড়ি বেড়াতে যাওয়ায় কিছু বলার মতও কেউ নেই।

তৃতীয় দিনের দিন যেতে হলো,কারণ অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার আজ লাস্ট ডেট।
কিন্তু যাওয়ার পর যা আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।
ভার্সিটি যাওয়ার পর নিদ্র ভাইয়া আমাদের ক্লাসে যাদের যাদের অ্যাসাইনমেন্ট কমপ্লিট হয় নি তাদেরগুলো আমার হাতে দিয়ে দিল।আমার অপরাধ দু দিন সে ফোন দিয়ে,ভার্সিটি এসে আমাকে পায়নি।প্রথমে উদ্বিগ্ন মুখে আমার আলসেমির গল্প শুনে রাগে গজগজ করে আমার মাথার উপর এই শাস্তি তুলে দিল।
নিজের ত্যানা ত্যানা জীবন নিয়ে আক্ষেপ করতে করতে লাইব্রেরীতে বসে বসে একগাঁদা কাগজপত্র নিয়ে ঘাটাঘাটি শুরু করে দিলাম।নিজেরটা করেছি দুই তিনদিন ধরে আর এতগুলো আধো আধো করে রাখা অ্যাসাইনমেন্ট আমি কিভাবে ভার্সিটি আওয়ার শেষ হওয়ার আগে কমপ্লিট করব?
আপনমনেই বিড়বিড় করতে লাগলাম,’ঐ নিদ্র আর কতদিন এই ভার্সিটিতে থাকবে!সময় যেন শেষও হচ্ছে না।আমি তার খপ্পর থেকে রেহাই পাবো কিভাবে?আল্লাহ্ একটু দয়া করো।
মাথা চুলকে,চোখ কঁচলে,কলম কামড়ে শুধু পাগলই হতে লাগলাম,অ্যাসাইনমেন্ট আর আগাচ্ছে না।
ঠিক সেই সময় নিদ্র ভাইয়া এসে চেয়ার টেনে আমার বাম সাইডের কর্ণারে বসে পড়ল।বই খাতা টেনে ভ্রু কুঁচকে নিচের ঠোঁট আলতো কামড়ে ধরে নিজে নিজে করে দিতে লাগলো।আমি তো শকড হয়ে তাকিয়ে রইলাম।যে শাস্তি দিয়েছে সেই আবার পূরণ করছে।যাক!আমার রাগটাও এখন পরে গেছে।

অনেকক্ষণ পর সব কমপ্লিট করা হলে সে বই থেকে মুখ তুলে চেয়ারে হেলান দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,’তোমার ফোন দাও।’
আমিও চুপচাপ বের করে দিলাম।সে পুরাতন ব্যাটারী চেন্জ করে একটি নতুন ব্যাটারী লাগিয়ে দিল।
আমি খাতাগুলো চেক করে বললাম,’আপনি ফিজিক্স এর স্টুডেন্ট হয়েও আমাদের সেকশনের অ্যাসাইনমেন্ট কিভাবে করলেন?’
-‘না পাড়ার কি হল!অবশ্য সেম সেকশনের হলে আরো তাড়াতাড়ি হয়ে যেত।’
-‘অ্যাসাইনমেন্ট কমপ্লিট তো আপনিই করলেন।তাহলে শুধু শুধু আমাকে এই পানিশম্যান্ট দিলেন কেনো?’
-‘তুমি যে পারবে না এটা তো আমি আগেই জানি।তোমাকে যে এগুলো নিয়ে টেনশন করে করে মরতে হল এটাই তোমার পানিশম্যান্ট।
আমি উৎসুক চোখে তাকিয়ে বললাম,’কিন্তু মেইন কষ্ট তো শেষমেষ আপনাকেই করতে হলো!’

কথাটি বলে আমি মুখ টিপে হাসতে লাগলাম।সে কিছুক্ষণ অসহায় ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকিয়ে গম্ভির মুখে বলল,’তোমাকে না বলেছি আমার সামনে এভাবে হাসবে না।’
তার কথা শুনে আমার মনটাই খারাপ হয়ে গেল।আমি মুখ টিপে হাসলেই সে সব সময় এই কথা বলে কেনো?আমাকে এভাবে হাসলে কি এত খারাপ লাগে?

তার পরেরদিন ভার্সিটি যাওয়ার পথে তামিম ভাইয়ার সাথে দেখা।সে আমার হাতে একটি বই ধরিয়ে দিয়ে বলল ভার্সিটি গিয়ে নিদ্র ভাইয়ার কাছে দিয়ে দিতে।আমি রিকশা থেকে নামতেই চোখ পড়ল নিদ্র ভাইয়া আমার একটু সামনে দিয়েই ভার্সিটির গেটের ভেতরে ঢুকতে যাচ্ছে।
হাতের মাঝে বই রেখে আমি তার পেছনে দৌড়ে চেঁচিয়ে নিদ্র ভাইয়া নিদ্র ভাইয়া বলে ডাকতে লাগলাম।আমি তার কাছে পৌঁছাতেই এক অচেনা অ্যান্টি নিদ্র ভাইয়াকে থামিয়ে বলল,’তোমার বোন তোমাকে ডাকছে কতক্ষণ ধরে।’
ততক্ষণে আমিও তার নাগালে পৌঁছে গেছি।
অ্যান্টি তো বলেই পগারপার।আর নিদ্র ভাইয়া যে
দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো মনে হচ্ছে আজকে আমাকে নির্ঘাত গিলে ফেলবে।আমি মুখটা কাচুমাচু করে রাখলাম।সে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,’তোমার এই ভাইয়া ডাকের জন্য আর কেউ যদি আমাদের ভাই বোন ভাবে তাহলে আই স্যয়ার, তোমাকে আমি জাস্ট শেষ করে ফেলব।’

আমি ভয়ার্ত গলায় বললাম,’তাহলে আর কি বলে ডাকব?সিনিয়রকে তো মানুষ ভাইয়া বলেই ডাকে!’
-‘আমার মাথা বলে ডেকো!এই তোমার বয়স কি সত্যিই ১৮+?আমার তো একদমই মনে হয় না।ভার্সিটিতে পড়ো বিয়ে হয়ে গেছে তবুও মাথায় এতটুকু বুদ্ধি বলতে নেই।’

‘সুপ্তির বিয়ে হয়ে গেছে?’
আমি চমকে উঠে পাশে তাকালাম দেখলাম আমারই এক ক্লাসমেট তিশা।ওর প্রশ্ন শুনে আমার গলা শুকিয়ে গেল।বুঝে ফেলল না তো আমার আর নিদ্র ভাইয়ার ব্যাপারে!
প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি আবারো করা হলে বুঝতে পারলাম ও শুধু নিদ্র ভাইয়ার শেষের কথাটিই শুনেছে।তিশার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি এবার নিদ্র ভাইয়ার দিকে।নিদ্র ভাইয়ার চেহারায় রাগ উড়ে গিয়ে শয়তানী হাসি ভেসে উঠেছে।আমি ঘাড় নাড়িয়ে প্রবল বেগে নিদ্র ভাইয়াকে না বলতে বললাম।
নিদ্র ভাই বলল,’হ্যাঁ,সুপ্তির তো বিয়ে হয়ে গেছে।’
তিশা বলল,’সত্যি সুপ্তি।’
আমি তো না বলতেই যাবো কিন্তু তার আগেই নিদ্র ভাইয়া আমার পেছনে এসে ফিসফিস করে দুষ্টমি ভঙ্গিতে বলল,’তোমার হাতে কিন্তু বই।বই ছুঁয়ে মিথ্যা কথা বলতে হয় না!’

আমি নিশ্চুপ হয়ে মুখ ফুলিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম।আর তিশা মুখ টিপে হাসি দিয়ে চলে গেল।কি বুঝলো কে জানে!
নিদ্র ভাইয়াও মুচকি হেসে পকেটে দু হাত ঢুকিয়ে গুন গুন করতে করতে গেট পেরিয়ে ভেতরে চলে গেল।
আমার এই মুহূর্তে ইচ্ছে করছে নিদ্র ভাইকে খুন করে ফেলি।সে এটা কেনো করলো?
এখন যদি সব জানজানি হয়ে যায় তবে আমার জীবনে আর ভালোবাসার মানুষ কচু আসবে!’

ভার্সিটি আওয়ার শেষ হতে না হতেই দেখলাম এই খবর সবাই জেনে গেছে।একটু পরপর প্রশ্নের ঝুড়ি নিয়ে আমার কাছে একেকজন উপস্থিত হচ্ছে।সাফা চোখ কপালে তুলে আমার কাছে এসে বলল,’তোর নাকি বিয়ে হয়ে গেছে আর তুই আমাকেই জানালি না।কার সাথে হয়েছে?’
আমি কোনো জবাব না দিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে চলে আসলাম।প্রচন্ড রাগ লাগছে নিদ্র ভাইয়ার উপর।সেদিন সারারাত রাগে আমি ঘুমাতেও পারলাম না।
শেষে ঠিক করলাম আর না!ঐ নিদ্র ফিদ্র আমাকে অনেক জ্বালিয়েছে।আর আমিও চুপচাপ সহ্য করেছি।এবার আমি তাকে জব্দ করবো।

একটি বিশাল সাদা দালান বিশিষ্ট বাড়ির সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি।বাড়িটির সামনে একটি নীল মাছের মূর্তির পানির ফোয়ারা।মাছের মুখ থেকে জল ছিটকে আশেপাশে পড়ছে।কাঠের মেইন দরজার সম্মুখ থেকে একটি প্রশস্ত রাস্তা ফোয়ারার চারিদিক বৃত্তাকার ন্যায় ঘুরে সামনের লোহার গেটের দিকে অগ্রসর হয়ে গেছে।রাস্তার দুপাশেই বাহারী রঙের ফুলের বাগান।বাগানের মাঝে হলুদ রঙের কিছু নাম না জানা ফুল নজর কেড়ে রেখেছে।

কঠোর আত্ম সংকল্প নিয়ে এলেও এখন আমার রীতিমত ঘাম ছুটে যাচ্ছে।নিদ্র ভাইয়ার মা যদি আমার গালে থাপ্পড় টাপ্পর মেরে বসে।নাহ!ভয় পাওয়া যাবে না,মারলে মারুক।নিদ্র ভাইয়ার অবস্থাও তো খারাপ হবে।তার বড়লোক বাবা মা নিশ্চয়ই মেনে নিবে না ছেলের এমন হুটহাট গোপন বিয়ে।তারপর নিশ্চয়ই আলাদা করার জন্য তারাই মরিয়া হয়ে উঠবে।আর আমিও রেহাই পাবো।সিনেমাতে তো তাই হয়।আমি যদি একটা থাপ্পড় খাইও নিদ্র ভাইয়া খাবে পাঁচটা।
এই ভেবে মনটাকে একটু শান্ত করলাম।প্রশস্ত কাঠের দরজাটি খুলে গিয়ে গোলগাল মুখের একজন অতি সুন্দরী মহিলা হাসিমুখে আমাকে জিজ্ঞাসা করল,’কাকে চাই?’
তার মায়া মায়া মুখের দিকে তাকিয়ে কেন জেনো মনে হল ইনিই নিদ্র ভাইয়ার মা।আমি একটু ঢোক গিলে চোখ নামিয়ে এক নিঃশ্বাসে বলে দিলাম,’আপনার ছেলে আমাকে গোপনে বিয়ে করেছে।’
কথাটি বলে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে মাথা উঠিয়ে দেখলাম সেই মহিলাটি আমার দিকে চোখ বড় বড় করে হা করে তাকিয়ে আছে।
আমি ভাবলাম কাজ হয়েছে।
কিন্তু তখনই সে আমার হাত টেনে ভেতরে নিয়ে উৎফুল্ল হয়ে কাজের লোকদের বলতে লাগল,’কইরে তোরা দেখ,তোদের নিদ্র ভাই বিয়ে করে ফেলেছে।নিদ্রর বউ এসেছে।’
নিদ্র ভাইয়ার মাকে দেখে মনে হচ্ছে এই মুহুর্তে তিনি এই পৃথিবীর সব থেকে সুখী মহিলা।আমাকে সোফায় বসিয়ে বাচ্চাদের মত খুশিতে গদগদ হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
‘হ্যাঁ রে মা,তোরা কিভাবে বিয়ে করেছিস আমাকে সব বলতো।আমার অনেক ইচ্ছা ছিল আমিও পালিয়ে বিয়ে করবো,কিন্তু তোমার শ্বশুর একদম ভীতু,প্রেম করা সত্ত্বেও আমার বাবাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়ে তারপর বিয়ে করলো।আমি তো নিদ্রকে বলেই রেখেছিলাম পালিয়ে বিয়ে করতে।ও তো দেখি সত্যিই করে ফেলেছে।’

আমি তো শুধু বিস্ময় ভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকে দেখে যাচ্ছি।প্রথম আলাপেই সে আমাকে কত কথা বলে দিচ্ছে।আমি কি ভেবেছিলাম আর কি হচ্ছে।
এবার এক অন্য ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে আসছে।
এরই মাঝে নিদ্র ভাইয়া দোতলা সিড়ির মুখে এসে দাড়ালো।তার পড়নে এখন একটি অরেঞ্জ টি শার্ট আর ব্লাক থ্রি কোয়ার্টারের প্যান্ট।সে আমাকে দেখে একটুও চমকালো না।যেনো আমার এখানে থাকাটাই স্বাভাবিক।
নিদ্র ভাইয়া সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলে তার মা তার কান ধরে বলল,’কিরে বিয়ে করেছিস আর এখনও আমাকে জানাতে পারলি না।’
নিদ্র ভাইয়া মৃদু হাসি দিয়ে কান ছাড়িয়ে তার মাকে জড়িয়ে ধরলো।
অ্যান্টি হেসে বলল,’যাহ!মাফ করে দিলাম।এত মিষ্টি মেয়েকে আমার বৌমা বানানোর জন্য।’
আমি কি করবো কিছুই বুঝতে পারছি না।নিজের করা গর্তে নিজেই পড়ে গেলাম না তো!
এরপর কিছু ঘটনা ঘটলো অতি দ্রুত।নিদ্র ভাইয়ার বাবাকে ফোন করে অফিস থেকে আনা হলো।তার থেকেও আমার কাঙ্খিত প্রতিক্রিয়া পেলাম না।তাকে দেখেও মনে হচ্ছে তার ছেলের কাজে সে গর্বিত।

বড় বিপত্তিটা তো বাধলো তখন যখন আমি হোস্টেলে ফিরে যাওয়ার কথা বললাম।আমার কথা শুনে নিদ্র ভাইয়ার বাবা মা এত অবাক হল যেন এমন আজগুবি কথা তারা কখনো শুনে নি।
তাদের মতে তাদের এত বড় বাড়ি থাকতে তাদের ছেলের বউ হোস্টেলে থাকবে এটা হতেই পারে না।আমাকে তারা কিছুতেই যেতে দিল না।ধরে বসিয়ে দিয়ে গেল নিদ্র ভাইয়ার রুমে।

সকাল গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল।আমার এখন শুধু কাঁদাটাই বাকি।ঠোঁট ফুলিয়ে আমি মুখটা কাঁদো কাঁদো করে মনে মনে কপাল চাপড়াতে লাগলাম।এ আমি কোথায় ফেসে গেলাম!তার বাবা মা তো দেখি তার থেকেও ফাস্ট।তাকে জব্দ করতে এসে নিজেই জব্দ হয়ে রয়েছি।
আমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ন্যাকাচ্ছি আর ওদিকে নিদ্র ভাইয়া হাসতে হাসতে শেষ।রীতিমতো গড়াগড়ি খাচ্ছে।হাসির চোটে যেন কথাই বলতে পারছে না।
তার হাসি দেখে আমার গা আরো জ্বলে গেল।
তাকে তো আবার এখন ভাইয়া বলা নিষেধ!তাই কিছু না ডেকেই রাগ করে বললাম,’আপনি এভাবে হাসছেন কেনো?’
সে হাসি থামানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে বলল,’তোমার দেখি শ্বশুরবাড়ি আসার বড্ড তাড়া!কিভাবে ম্যানেজ করলে?’
‘আমি মুখটা কাঁদো কাঁদো করে বললাম,’আমি তো এসেছি আপনাকে ফাসাতে,কে জানতো যে এমন হয়ে যাবে!আপনি গিয়ে আপনার বাবা মাকে বোঝান।আপনার ঐ মেয়ে যদি শুনে এতকিছু তাহলে তো আর জিন্দেগীতেও আপনাকে মেনে নেবে না।’
-‘স্যরি,আমার বাবা মাকে আর থামানোর ক্ষমতা আমার নেই।এবার তো আর আমি কিছু করিনি।’

-‘আর আমার বাবা মা বুঝি নেই?তারা যখন শুনবে তখন আমাকে কি করবে জানেন?’
আমার কথা শেষ হতেই এই বাড়ির এক কাজের মেয়ে এসে মুখ টিপে নিদ্রকে বলল,’ভাই,ভাবীর বাপ মা আসছে।’
এই কথায় আমি আকাশ থেকে পড়লাম।তারা আমার এড্রেস জানলো কিভাবে?বাবা মাকে ডেকে এনেছে!
বিস্মিত দৃষ্টি নিয়ে নিদ্রর দিকে তাকালাম।সে দু হাত নাড়িয়ে ঠোঁট বাকিয়ে বোঝাল এখানে তার কোনো হাত নেই সে কিছু জানে না।

সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে দেখলাম আব্বুর সাথে আঙ্কেল কোলাকুলি করে খোশ গল্পে মেতে উঠেছে।দেখে মনে হচ্ছে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুকে তারা খুঁজে পেয়েছে।নিদ্র আমার পেছন থেকে এসে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল।আমিও তার পিছনে পিছনে নিচে গেলাম।নিদ্র আব্বুকে সালাম দিলে আব্বু নিদ্রকে বুকে টেনে নিল।
আমি তখন নিদ্রকে মিথ্যা বলেছিলাম যে আমার আব্বু আম্মু জানলে আমাকে শেষ করে ফেলবে।
আমার আব্বু আম্মু আমাকে খুব ভালোবাসে।আমি যদি একটি রিকশাওয়ালাকেও বিয়ে করে তাদের সামনে নিয়ে যেতাম তবুও তারা হাসি মুখে মেনে নিত আর এদিকে তো নিদ্রর মত পারফেক্ট ছেলে পেয়ে কোনো কথাই নেই!
এবার আব্বু আমার কাছে এসে আমাকে বুকে টেনে বলল,’আমার সোনা আম্মু মামণিটা এত শুকিয়ে গেছে কেনো!’
তারপর নিদ্রকে বলল,’নিদ্র আমাদের মেয়েকে আমরা খুবই আদর যত্নে বড় করেছি।আমার মেয়েটা অনেক সহজ সরল।ওর মনে যেমন কোনো প্যাচ নেই তেমনই ও কোনো প্যাচ বোঝেও না।ওকে দেখেশুনে রেখো।আমার একটাই মেয়ে।’
নিদ্র ভাইয়া আব্বুর হাতের উপর হাত রেখে আশ্বাস দিয়ে বলল,’চিন্তা করবেন না বাবা।আপনার মেয়ের সমস্ত দায়িত্ব এখন থেকে আমার।আমি ওকে সবসময় আগলে রাখবো।’

শুধু শুধু নিদ্রর নাটক করে এত কথা বলার কি দরকার আমি বুঝি না।চুপ করে থাকলেই তো হয়।
এই দুই পরিবারের এত সখ্যতার কারণ শেষমেষ জানতে পারলাম।নিদ্র আর আমার বাবা হাইস্কুল ফ্রেন্ড ছিল।এত দিন যোগাযোগ হারিয়ে গিয়েছিল।আমার ঠিকানা বের করে নিদ্রর বাবা গাজীপুর থেকে আমার বাবা মাকে আনিয়ে দেখতে পেল তার ছেলে আর অন্য কাউকে নয় তারই পুরোনো বন্ধুর মেয়েকেই বিয়ে করেছে।

গল্পে আনন্দে দুই পরিবার পুরো মেতে উঠল।এতকিছুর মাঝে শুধু আমি একাই অস্থিরতায় ভুগছি।এতো পুরো দেখি সত্যি সত্যি বিয়ের বাঁধনে রূপান্তর হয়ে যাচ্ছে।এরপর কি হবে?
দুই পরিবার মিলে ঠিক করলো আমাকে আর হোস্টেলে পাঠানো হবে না।আর কয়মাসের মধ্যেই যেহেতু নিদ্রর গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট হয়ে যাবে আর বিজনেসে যোগ দিবে তাই তার কিছু সময় পরেই বড় করে অনুষ্ঠান করা হবে।ততদিন আমি এখানেই থাকব নিদ্রর সাথে।
আমার হোস্টেলে একা একা থাকা আর সেখানের বিশ্রী খাওয়া নিয়ে আগে থেকেই আমার বাবা মার চরম আপত্তি ছিল।তারা তো এখন আরো নিশ্চিন্ত হতে পারলো।

রাত এখন অনেক।আমার আব্বু আম্মু সন্ধ্যার পরেই গাজীপুরে ফিরে গেছে।অাঙ্কেল অ্যান্টি থাকার জন্য অনেক বলেছিল।
আমার ইচ্ছে করছে নিজের চুলগুলো টেনেটুনে সব ছিড়ে ফেলি।কাল এই সময় হোস্টেলে ছিলাম আর আজ নিজের বোকামীতে ফেঁসে গিয়ে নিদ্রর রুমে বসে আছি।নিদ্রর বিছানার কর্ণার ঘেঁষে বসে বসে ঠোঁট ফুলিয়ে ফুঁপিয়ে যাচ্ছি।নিদ্রর বাবা মা তো দেখি তার থেকেও বেশি ফাস্ট।আমাকে একবারের জন্যও হোস্টেলে ফিরে যেতে দিল না।নিদ্রকে দিয়ে আমার জিনিসপত্র আনিয়ে নিল।আর ঐ পলিটিক্যাল লিডারের কাছে তো এসব কোনো ব্যাপারই না।
এখন আমি তার সাথে একরুমে থাকব কিভাবে।ভাবতেই তো কেমন যেন লাগছে!
বাথরুমের দরজা ফাঁক করে নিদ্র একটি হোয়াইট টি শার্ট আর ব্লাক ট্রাউজার পড়ে টাওয়েল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলো।
তার মুখে এখনো সেই স্মিত হাসি।আজকে সারাদিন ধরেই তার ঠোঁটে এই হাসি ঝুলে রয়েছে।
আমার যন্ত্রণাতেই তো তার খুশি!

আমি এখন হালকা গোলাপি রঙের সুতি কামিজ আর সাদা রঙের ধুতি সেলোয়ার পড়ে আছি।সে বিছানার কাছে এসে টাওয়ালটা সোফায় ছুঁড়ে মেরে বিছানায় শুয়ে পড়লো।আমি মুখ ভার করে বললাম,’আমি কোথায় ঘুমাবো?’
সে চোখ বন্ধ করেই বলল,’যেখানে ইচ্ছা।চাইলে আমার পাশেও ঘুমাতে পারো।কিন্তু এই আশা করো না যে আমি এখন ফিল্মের হিরোর মতো তোমায় পুরো বিছানা ছেড়ে দিয়ে নিচে গিয়ে ঘুমাবো।’

আমি মনে মনে তাকে একটা গালি দিয়ে হাত বাড়িয়ে বিছানা থেকে বালিশ নিয়ে রাগে কষ্টে নিজের পাতলা ওড়নাটাই আষ্টেপিষ্টে গায়ে পেচিয়ে নিচে ফ্লোরে শুয়ে পড়লাম।
নিদ্রও সাথে সাথে লাইট অফ করে দিল।আমি চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টায় আছি।হঠাৎ কানে ভেসে এলো কেমন একটা অদ্ভুত মৃদু আওয়াজ।যেমনটা হরর মুভিতে কেমন একটা ভয়ংকর গা ছমছমে সাউন্ড হয়।
আমি চোখ মেলে তাকালাম।পুরো রুমে ঘুটঘুটে অন্ধকার।বাইরে থেকে সোডিয়ামের হালকা আলো যেন অন্ধকারকে আরো ভয়ংকর করে তুলেছে।আওয়াজটা এখন আর আসছে না।নিস্তব্ধ চারিপাশ।নিঃশ্বাসের শব্দও যেন প্রকট শোনা যাচ্ছে।আমার গা ছমছম করতে লাগল।নিদ্রর দিকে তাকিয়ে মনে হলো পুরো বেঘোরেই ঘুমিয়ে আছে।আমি চোখ বন্ধ করে নিলাম।আবারো সেই আওয়াজ।চোখ খুলে ভয়ে আমি ঢোক গিলতে লাগলাম।একে একে সবগুলো হরর মুভির ভয়ংকর সিন গুলো আমার চোখে ভাসতে লাগলো।মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম আর কখনো ভুতের ছবি দেখবো না।প্রচন্ড ভয় আমার উপর জেঁকে বসেছে।এখন এভাবে নিচে একা একা ঘুমানো আমার পক্ষে অসম্ভব।আমি কাঁপতে কাঁপতে ধীরে ধীরে বালিশ হাতে নিয়ে বিছানার অপর প্রান্তে নিদ্রর পাশে শুয়ে পড়লাম।নিদ্র এক হাত মাথার নিচে দিয়ে চিৎ হয়ে ঘুমাচ্ছে।আমিও চোখ বন্ধ করে নিলাম।এবার আবারো সেই সাউন্ড হলো,আরো জোরে।আমি ভয়ে নাক মুখ কুঁচকে নিদ্রকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম।

চলবে,,

RELATED ARTICLES

2 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ