#The_winter_you_left
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#পর্ব_২
৩.
“ চাঁদের আলোয় পুরো পৃথিবীটাকে কেমন যেন মায়াবী আর কাল্পনিক মনে হয়। মনে হয় এই পৃথিবীতে কোনো দুঃখ নেই, কোনো অনাহার নেই, কোনো মৃত্যু নেই। অথচ আলোটা যখন চলে যায়, তখন আবার সেই চেনা ধূসর বাস্তব এসে কড়া নাড়ে। মানুষ আসলে আলোর চেয়ে অন্ধকারটাকেই বেশি ভয় পায়, কারণ অন্ধকারে নিজের ছায়াটাও নিজেকে ছেড়ে চলে যায়।”
সিউলের বাতাস দিন দিন ভারী এবং ধারালো হচ্ছে। শরৎ বিদায় নিয়েছে অনেক আগেই, এখন শহরের প্রতিটা কোণে শীতের এক জবুথবু নীরবতা। রাস্তায় বের হলে মুখ দিয়ে সাদা ধোঁয়া বের হয়। ইনসা-দংয়ের সেই প্রাচীন জিংকো গাছগুলোর সব পাতা এখন ঝরে গিয়ে ডালগুলো কঙ্কালের মতো একলা দাঁড়িয়ে আছে, অলিগলির ছোট দোকানগুলো থেকে গরম ওমেং স্যুপ আর পোড়া মিষ্টি আলুর সুবাস ভেসে আসছে। মানুষজন কানটুপি আর ওভারকোটে নিজেদের মুড়িয়ে দ্রুত পায়ে সাবওয়ের দিকে ছুটছে। সু-আ আজকাল তার মেস ঘরের স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করার চেয়ে মিনহোর ক্যাফেতে আসার জন্য বেশি ছটফট করে। তার একাকীত্ব এখন আর তাকে গ্রাস করতে পারে না। সে জানে, বিকেল চারটে বাজলেই একটা ছাই রঙের মাফলার পরা শান্ত ছেলে তার জন্য দরজা খুলে অপেক্ষা করে থাকবে। এই নিষ্ঠুর, গতিময় সিউল শহরে গিয়োউল ক্যাফেটাই যেন তার একমাত্র নোঙর। আজ ক্যাফেতে ঢুকেই সু-আ দেখল মিনহো কাউন্টারে বসে নেই। সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে স্থির দৃষ্টিতে বাইরের ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। আজ তার গলায় হালকা বেগুনি রঙের একটা নতুন মাফলার জড়ানো।
সু-আ তার ভারী ব্যাগটা টেবিলে নামিয়ে রেখে বলল, “কী দেখছেন অত মনোযোগ দিয়ে মিনহো? আকাশে কি নতুন কোনো নাটক হচ্ছে, যার ডিরেক্টর আপনি নিজে?”
মিনহো না ঘুরেই খুব শান্ত গলায় বলল, “আকাশে নাটক হচ্ছে না। আকাশ আজ তার সবচেয়ে সুন্দর এবং বিশুদ্ধ রূপটা দেখাবে। আজ শহরের প্রথম বরফ পড়বে।”
“সত্যি?” সু-আ’র চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে চকচক করে উঠল। সে এক লাফে জানালার কাছে চলে এলো। সে মিনহোর খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাল। এত কাছাকাছি যে মিনহোর গা থেকে আসা হালকা পাইন গাছের পাতার মতো একটা ঠাণ্ডা সুবাস সু-আ’র নাকে এসে লাগল। সু-আ হঠাৎ লক্ষ্য করল, মিনহোর ফর্সা হাত দুটো ঠান্ডায় কেমন যেন নীলচে হয়ে গেছে। সে হাত দুটো কাঁপছে। সু-আ তার ওভারকোটের পকেট থেকে একটা ছোট রঙিন কাগজের প্যাকেট বের করে মিনহোর সামনে ধরল।
“এটা কী?” মিনহো ভ্রু কুঁচকে সু-আ’র দিকে তাকাল।
“খুলে দেখুন না। সব কিছুতে এত প্রশ্ন কেন আপনার?”
মিনহো প্যাকেটটা নিল এবং খুব ধীর স্থির হাতে ভাঁজগুলো খুলল। ভেতরে এক জোড়া গাঢ় নীল রঙের উলের দস্তানা। খুব একটা নিখুঁত বোনা নয়, কিছু কিছু জায়গায় সুতো আলগা হয়ে আছে, কোথাও কোথাও জোড়াতালিটা একটু স্পষ্ট। বোঝা যাচ্ছে কোনো আনাড়ির হাতের কাজ। মিনহো দস্তানা দুটোর দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইল। সু-আ কিছুটা লজ্জিত এবং অস্বস্তিতে পড়ে বলল, “ঐ… মানে, রাতে মেস ঘরে একা একা বসে বসে বুনেছি। থিয়েটারের এক বান্ধবীর কাছ থেকে উলের কাজটা জোর করে শিখলাম। আপনি তো সারাদিন গলায় মাফলার জড়িয়ে থাকেন, অথচ আপনার হাত দুটো বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে থাকে। পরে দেখুন তো, ফিট হয় কি না। না হলে ফেলে দেবেন।”
মিনহো কিছু বলল না। সে তার লম্বা, ফর্সা আঙুলগুলো নীল উলের ভেতর গলিয়ে নিল। গাঢ় নীল রঙের উলের ভেতর তার হাত দুটো চমৎকার মানিয়ে গেল। সে হাত দুটো চোখের সামনে ধরে উল্টেপাল্টে দেখল, তারপর খুব গভীর স্বরে বলল, “খুব সুন্দর হয়েছে সু-আ। ঠিক আমার হাতের মাপেরই হয়েছে। আমার খুব পছন্দ হয়েছে।”
“মিথ্যে বলবেন না একদম। বুড়ো আঙুলের কাছটা একটু ঢিলে হয়েছে, আমি নিজে দেখেছি।” সু-আ খিলখিল করে হেসে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তেই জানালার ওপাশে প্রথম তুষারকণাটা ভেসে নামল। খুব ধীর ভঙ্গিতে একটা তুলোর মতো বরফ এসে কাঁচের গায়ে ঠেকল, তারপর মিলিয়ে গেল। দেখতে দেখতে আকাশ থেকে লাখ লাখ সাদা কণা নামতে শুরু করল। ধূসর রাস্তাটা সাদা চাদরে ঢাকতে শুরু করল। “মিনহো, চলুন বাইরে যাই! প্রথম বরফপতের দিন এভাবে ঘরের ভেতর বন্ধ হয়ে থাকতে নেই। এটা কোরিয়ান ঐতিহ্য, আপনি জানেন না?” সু-আ মিনহোর নীল দস্তানা পরা হাতটা ধরে একটা টান দিল। মিনহো প্রথমে একটু ইতস্তত করল, জানালার বাইরের বরফের দিকে তাকাল। তারপর সু-আ’র অবাধ্য জেদের কাছে হেরে গিয়ে সে ক্যাফের দরজা লক করে বাইরে বেরিয়ে এলো। রাস্তায় তখন বরফ জমতে শুরু করেছে। সু-আ বাচ্চাদের মতো দুহাত পেতে বরফ ধরছে, আর গোল হয়ে ঘুরছে। মিনহো তার নীল দস্তানা পরা হাত দুটো কোটের পকেটে পুরে খুব শান্ত পায়ে সু-আ’র চার-পাঁচ কদম পেছনে হাঁটছিল। তার চোখ সু-আ’র ওপর স্থির। হাঁটতে হাঁটতে তারা শহরের একটা ছোট পার্কের নির্জন বেঞ্চিতে এসে বসল। চারপাশে কোনো মানুষ নেই, ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় ওপর থেকে পড়তে থাকা তুষারপাতগুলোকে রূপালি রঙের বুদবুদের মতো দেখাচ্ছে। মিনহো হঠাৎ সামনের দিকে তাকিয়ে বলল, “সু-আ, মানুষের জীবনটাও এই প্রথম বরফের মতো, তাই না? আকাশ থেকে যখন পড়ে, কত সুন্দর, কত নিখুঁত দেখায়। মানুষ হাত বাড়িয়ে তাকে ছুঁতে চায়। তারপর মাটিতে মিশে একদিন কাদা হয়ে যায়। কেউ আর তাকে মনে রাখে না। তার কোনো অস্তিত্ব থাকে না।” সু-আ মিনহোর দিকে ঘুরল। বরফের তীব্র ঠাণ্ডায় সু-আ’র নাক আর গাল দুটো লাল হয়ে আছে। সে বলল, “আপনি সবসময় এত বিষণ্ণ আর কুৎসিত কথা কেন বলেন মিনহো? বরফ মাটিতে মিশে যায় ঠিকই, কিন্তু সে তো মাটিকে জল দিয়ে যায়। মাটির ভেতরের বীজটাকে জাগিয়ে তোলে, যাতে নতুন বসন্তের ফুল ফুটতে পারে। হারিয়ে তো যায় না। রূপবদল হয় মাত্র।” মিনহো সু-আ’র মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার চোখ দুটোতে এক আজন্ম গভীরতা ফুটে উঠল। সে খুব নিচু স্বরে করে বলল, “যদি কোনোদিন আমি হুট করে হারিয়ে যাই, এই সিউল শহরের কুয়াশার মতো বাতাসে মিলিয়ে যাই তখন আমাকে খুঁজবে সু-আ?”
সু-আ’র বুকের ভেতর কেমন যেন একটা অজানা, অচেনা ভয় আচমকা মোচড় দিয়ে উঠল। মিনহোর গলার স্বরটা তার ভালো লাগল না। সে চোখ বড় বড় করে বলল, “ধুর! আপনি হারাবেন কেন? বড় বড় কথা! আর হারালে আমি সোজা পুলিশে খবর দেব। পুলিশ আপনাকে কান ধরে খুঁজে বের করে নিয়ে আসবে। একদম ফালতু কথা বলবেন না তো, আমার রাগ হচ্ছে।” মিনহো আর কিছু বলল না। সে শুধু তার নীল দস্তানা পরা ডান হাতটা বাড়িয়ে সু-আ’র কোটের কলারের ওপর জমে থাকা এক টুকরো বরফ আলতো করে ঝেড়ে দিল। তার হাতের সেই মৃদু ছোঁয়াটা সু-আ’র কাছে ভীষণ চেনা আর আপন মনে হলো। মিনহো তার কোটের ভেতরের পকেট থেকে একটা ছোট ভাজ করা অফিশিয়াল কাগজের টুকরো বের করে সু-আ’র হাতের তালুর ওপর রাখল। বলল, “এটা নাও। আজ সকালে ডিরেক্টর পার্কের সহকারী ক্যাফেতে এসেছিলেন। আগামী সপ্তাহে ওদের যে নতুন বড় নাটক ‘The Winter Line’ শুরু হচ্ছে, সেটার মূল নারী চরিত্রের জন্য তোমাকে নির্বাচন করা হয়েছে। প্রিমিয়ারের দিন পাঁচ নম্বর সারির চার নম্বর আসনটা আমার জন্য বুক করে রাখবে। আমি কিন্তু যাব।”
সু-আ কাগজের টুকরোটার দিকে তাকাল। সত্যি! সিউল থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশনের সিল মারা অফিশিয়াল কাস্টিং লিস্টে তার নাম লেখা রয়েছে হান সু-আ। সে খুশিতে আত্মহারা হয়ে বেঞ্চ থেকে লাফিয়ে উঠল, “মিনহো! আমি সুযোগ পেয়েছি! আমি পেরেছি! তারা আমাকে নিয়েছে!” সে আনন্দের আতিশয্যে, কোনো কিছু না ভেবেই মিনহোকে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। মিনহো স্তব্ধ হয়ে গেল। তার হাত দুটো সু-আ’র পিঠের ওপর শূন্যে থমকে রইল। সে আস্তে আস্তে চোখ বন্ধ করে ফেলল এবং সু-আ’র চুলের সুবাস নিলো। ঠিক তখনই মিনহোর বুকের ভেতর থেকে একটা তীব্র, জ্বলন্ত ব্যথার তরঙ্গ খেলে গেল। কাশির একটি প্রবল, অদম্য বেগ তার ফুসফুস চিরে ওপরে উঠে আসতে চাইল। মুখ দিয়ে রক্ত চলে আসার মতো এক অনুভূতি। সে নিজেকে তার জীবনের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করল, দাঁতে দাঁত চাপল। সু-আ যখন তাকে ছেড়ে দিয়ে হাসিমুখে তাকাল, মিনহো তখন পকেটে হাত দিয়ে সেই চেনা সাদা রুমালটা শক্ত করে চেপে ধরেছে। সে সু-আ’র দিকে তাকিয়ে একটা ম্লান হাসি হাসল। কিন্তু সু-আ খেয়ালই করল না, মিনহোর ঠোঁটের কোণটা তখন ঠান্ডায় নয়, এক তীব্র যন্ত্রণায় নীল হয়ে গেছে। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় মিনহোর মুখটা তখন বরফজমা বিষণ্ণ শুকনো পাতার মতো দেখাচ্ছে, যার ভেতরে কোনো রঙ অবশিষ্ট নেই।
৪.
“আমাদের জীবনে কিছু কিছু রাত আসে যা অন্য সব রাতের চেয়ে দীর্ঘ হয়। ঘড়ির কাঁটা ঘোরে, রাত বাড়ে, অথচ ভোরের আলো ফোটে না। মানুষ ভাবে সে একা, অথচ তার চারপাশে তখন কত শত না-বলা স্মৃতির ভিড় জমে থাকে। আমরা আসলে কাউকেই ভুলে যাই না। আমরা শুধু ভুলে থাকার একটা নিখুঁত অভিনয় করতে করতে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ি। অভিনয় যখন শেষ হয়, তখন আবার সেই পুরোনো একাকীত্ব এসে হাত ধরে।”
সিউল শহরের চারপাশটা এখন শুভ্রতায় ঢাকা। প্রথম বরফপাতের পর প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেছে, কিন্তু ঠান্ডা কমার কোনো লক্ষণ নেই। বরং কুয়াশাটা এখন আরও ঘন, আরও তীব্র হয়ে প্রতিদিন সকালবেলা শহরের বহুতল ভবনগুলোকে গিলে খাচ্ছে। ইনসা-দংয়ের রাস্তাগুলোতে বরফ জমে শক্ত হয়ে গেছে, যার ওপর দিয়ে হাঁটার সময় মচমচে শব্দ হয়। ল্যাম্পপোস্টগুলোর মাথায় বরফের ছোট ছোট টুপি জমেছে। হান সু-আ আজকাল ঘুমাতে পারে না। তার চোখের নিচে কালচে ছোপ পড়েছে, কিন্তু তার চোখে এখন ক্লান্তির চেয়ে তীব্র উন্মাদনা বেচি। সে সুযোগ পেয়েছে। সিউলের অন্যতম সম্মানজনক থিয়েটার হল ‘আর্ট সেন্টার সিউল’-এর মূল মঞ্চে, আগামী শুক্রবার রাতে তাদের নতুন নাটক ‘The Winter Line’-এর প্রিমিয়ার শো। সু-আ সেই নাটকের মূল চরিত্র ‘ইওন-হি’র ভূমিকায় অভিনয় করছে। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত অব্দি একটানা রিহার্সাল চলছে। ডিরেক্টর পার্ক এখন আর তাকে গালমন্দ করেন না, বরং সু-আ যখন মঞ্চের আলোয় দাঁড়িয়ে ডায়লগ বলে, তখন ডিরেক্টর সাহেব চশমার ওপর দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির মাথা নাড়েন। কিন্তু সু-আ’র মনের ভেতর আনন্দ নেই। অজানা ছটফটানি তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। গত তিন দিন ধরে ‘গিয়োউল’ ক্যাফেটা বন্ধ। প্রথম বরফপতের সেই জাদুকরী রাতের পরদিন সু-আ যখন বিকেল চারটেয় ক্যাফের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, তখন দেখল দরজায় ঝোলানো আছে একটা ছোট কাঠের বোর্ড ‘সাময়িকভাবে বন্ধ’। সু-আ ভেবেছিল মিনহো হয়তো কোনো কাজে বাইরে গেছে। কিন্তু পরদিনও ক্যাফে খুলল না। তার পরের দিনও না। মিনহোর কোনো ফোন নম্বর সু-আ’র কাছে নেই। এই সিউল শহরে মানুষ কতটা একলা হতে পারে, সু-আ তা প্রতিদিন অনুভব করছে। মিনহো নামের সেই মাফলার পরা শান্ত ছেলেটা যেন হুট করেই এক টুকরো কুয়াশার মতো বাতাসে মিলিয়ে গেছে।
চলবে?
