Sunday, June 21, 2026
বাড়ি প্রচ্ছদ



নীল ধ্রুবতারা পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব

#নীল_ধ্রুবতারা [অন্তিম পর্ব]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

আমাকে যখন হাসপাতালে আনা হলো, তখন আমার অনাগত সন্তানের জীবনের সলতেটা মিটমিট করে জ্বলছে। গর্ভস্থ বাচ্চার কোনো নড়াচড়া টের পাচ্ছি না। বুকটা হাহাকার করে উঠছে ভয়ে। ডাক্তাররা এমন পরিস্থিতিতে সিজারের কথা ভাবছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, আমার ভয়ানক ডায়রিয়া হয়েছে। মুখটা শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। স্যালাইন চলছে। ডাক্তার ম্যাডাম আমার মা আর ওই ভদ্রলোক স্বামীকে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার দায়ে বেশ ভালোই ধমকালেন।

হাসপাতালে যতগুলো দিন ছিলাম, ওই তরুণী ডাক্তারটির মতো অমায়িক মানুষ খুব একটা দেখিনি। অসম্ভব রূপবতী, আবার কণ্ঠস্বরও চমৎকার। আমার ডায়রিয়াটা একদিনের মধ্যেই অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এল, বাচ্চাটাও টিকে গেল। কিন্তু বিপদ অন্য জায়গায়। প্রথম আল্ট্রাসনোগ্রাফির হিসাব অনুযায়ী, আমার প্রসবের তারিখ পেরিয়ে গেছে এক সপ্তাহ আগেই। ডাক্তাররা বেশ চিন্তিত। সি-সেকশন করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। আমার স্বামী মাহতাব অনেক ছোটাছুটি করে রক্ত জোগাড় করল। অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু হতেই আমি হঠাৎ বাধা দিলাম। ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে বললাম,
“সিজার করব না। ভুলেও না। আমার প্রচণ্ড ভয় করে।”

তরুণী ডাক্তার আমাকে ধমকে উঠলেন,
“নয় মাস এত কষ্ট করার পর কি মরা বাচ্চা প্রসব করতে চাও?”

কথাটা শুনে আমার বুকটা কেঁপে উঠল, কিন্তু জেদ কমল না। মাহতাব আমার হাত ধরে করুণ গলায় বলল,
“কী চাও নবনী? আমাদের বাচ্চাটা পৃথিবীর আলো দেখার আগেই শেষ হয়ে যাক?”

আমি কোনোমতে বললাম,
“মানুষের কি নরমালে বাচ্চা হয় না?”
“তোমার ডেলিভারি ডেট এক সপ্তাহ আগেই পেরিয়ে গেছে!”
“গেলে গেছে। সময় হলে আল্লাহর হুকুমে সে আসবেই। জোর করে টেনেহিঁচড়ে পৃথিবীতে আনার কী দরকার?”

মাহতাব আমাকে অনেক বোঝাল, ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলও করল—কিছুই আমার জেদ গলাতে পারল না। আমি পাথরের মতো অনড় হয়ে বললাম,
“যে আল্লাহ আমার বাচ্চাকে এত ঝড়-ঝাপটার পরেও বাঁচিয়ে রেখেছেন, তিনিই তাকে রক্ষা করবেন। ভুল ওষুধ খাওয়ার পরেও তার কিছু হয়নি, এক্সিডেন্টের পরেও সুস্থ ছিল, ডায়রিয়ার পরেও সে ঠিক আছে। শুধুমাত্র সময় হয়নি বলেই সে আসছে না। এর জন্য তাকে নিয়ে টানাটানি করব? না, কক্ষনো না।”
মাহতাব অসহায়ের মতো হাসল, বলল,
“বোকার মতো কথা বলো না। টানাটানি আবার কী?”
আমি শান্ত গলায় বললাম,
“টানাটানি নয় তো কী? সময় হলে সে নিজেই আসবে।”

ডাক্তারদের সামনে অবশ্য এসব যুক্তি ধোপে টিকল না। উনি শুনলেনই না আমার কথা। যুক্তির বাহারে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। বরং আমাকে ধমকে চুপ করিয়ে দিলেন। অত সুন্দর একটা মেয়ের গলায় যে এতটা কঠিন ধমক লুকিয়ে থাকতে পারে, তা আমার জানা ছিল না। ওনারা সিজারের সিদ্ধান্তে অটল। আমার খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হলো। কিন্তু সব ঠিকঠাক হওয়ার আগমুহূর্তে বিপত্তি ঘটল আমার রক্তচাপ নিয়ে। প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় প্রেশার বেড়ে গেছে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে তো আর সিজার করা যায় না। ডাক্তাররা আমার ওপর মহা বিরক্ত হলেন। মাকে ডেকে কঠিন গলায় বললেন,
“আপনার মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে যান। রিক্সে নিতে পারব না। রক্ত-পানি ভেঙে যন্ত্রণা সহ্য করতে করতে আবার হাসপাতালে যেন না আনা লাগে। জীবনে এমন রোগী দেখিনি!”

মা আমাকে অনেক বোঝালেন, কিন্তু প্রেশার তো মায়ের কথা শোনে না! বরং আমিই উল্টো মাকে বোঝাতে লাগলাম। শেষ পর্যন্ত ডাক্তার বিরক্ত হয়ে আমাকে ছাড়পত্র দিয়ে দিলেন। কিন্তু বের হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে তরুণী ডাক্তারটি বললেন,
“দাঁড়ান, একবার পেলভিসের মুখটা পরীক্ষা করে দেখি। সময় তো অনেক পার হয়েছে। একবার দেখে দিই।”

তিনি পরীক্ষা করলেন। সামান্য হলেও পেলভিসের মুখ খুলেছে। তিনি কোনো কথা না বলে ছাড়পত্রটা ছিঁড়ে ফেলে শান্ত গলায় বললেন,
“থাকুন। আজ-কালের মধ্যেই ডেলিভারি হবে।”

শুনে আমি স্বস্তি পেলাম। অযথা কাটাকুটির ঝামেলা নেই ভেবেই হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। আচ্ছা, বাচ্চা প্রসবে দেরি হলে মানুষ কেন এত ভয় পায়? কেন এত নিয়ম? প্রকৃতির নিজস্ব একটা ছন্দ আছে। সেই ছন্দেই তো গাছ বড় হয়, বৃষ্টি পড়ে, চাঁদ ওঠে। আমার সন্তানও সেই ছন্দে পৃথিবীতে আসবে। সিজারের ছুরি দিয়ে পেট কেটে তাকে পৃথিবীতে আনার কী দরকার?

পরদিন সকালে আরেকবার পরীক্ষা করা হলো। দেখা গেল আরও খুলেছে পেলভিসের মুখ। খুলেছে, তবে সামান্য। বিকেলের মাঝে না খুললে শেষ অবধি ব্যবস্থা সি-সেকশন। অবশ্য তার প্রয়োজন পড়ল না। দুপুর বারোটার দিকেই আমার চিনচিন করে কোমর ব্যথা করতে লাগল। তীক্ষ্ণ তীব্র ব্যথায় নীল হয়ে যেতে থাকলাম আমি। তলপেটে অনুভব করতে লাগলাম তীব্র টান। সময় যত গড়াল, যন্ত্রণা তত বাড়ল। মনে হলো, আমার শরীরের সমস্ত হাড়গুলো একেকটা খড়ের আঁটির মতো মড়মড় করে ভেঙে যাচ্ছে। যন্ত্রণার সংজ্ঞা যদি হয় তীব্রতা, তবে এই ব্যথা সেই সংজ্ঞা ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগে। আমি দাঁতে দাঁত চেপে আছি। মনে হলো, চোয়ালের হাড়গুলোও বুঝি ভেঙে গুঁড়িয়ে যাবে। ব্যথাটা একটু কমে এলেই আমার ঘুম পেতে লাগল ভীষণ করে। মনে হলো সহস্র বছর ধরে আমি ঘুমাই না। ঘুম নামক বস্তুটি চোখের পাতায় ধরা দেয় না বহু বহু কাল। আমি বেডে শুতে গেলাম। বিড়বিড় করতে লাগলাম,
“আমি ঘুমাব, একটুখানি ঘুমাব।”

মায়ের দিকে তাকিয়ে করুণ গলায় বললাম,
“মা, আমি ঘুমাই। বাচ্চা হওয়ার সময় আমাকে ডাক দিলেই হবে। আমি ঘুম থেকে উঠে যাব।”
আমার অতি দুঃখের মুহূর্তেও মা হেসে ফেললেন। কোমল গলায় বললেন,
“তোমাকে ডাকতে হবে না, মা। বাচ্চা হওয়ার কালে তুমি নিজেই উঠে যাবা। এখন তুমি ঘুমাও দেখি।”

কিন্তু ঘুম! সে কি আর আসে? ঘুম আসার আগেই তীব্র যন্ত্রণায় ছটফটিয়ে উঠতে হয়। আবার যখন ব্যথাটা চলে যায়, খুব করে ঘুম পায়। সে যে কী অসহ্য যন্ত্রণা!

সময়ের সাথে সাথে টের পেলাম, প্রচণ্ড ব্যথায়, চাপে কে যেন আমার পুরো অস্তিত্বকে পিষে ফেলছে। তলপেট থেকে উঠে আসা ব্যথাটা শিরদাঁড়া বেয়ে মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলোতে এক ধরনের বৈদ্যুতিক শকে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে লাগল। প্রতিটি হাড় যেন তার জায়গা ছেড়ে সরে গেল তীব্র বেগে। আমি তলিয়ে যেতে লাগলাম এক অতল গহ্বরে, যেখানে অক্সিজেনের বড্ড অভাব। যেখানে কেবল যন্ত্রণা আর যন্ত্রণা।
যন্ত্রণা সইতে না পেরে মাহতাবের হাতটা পিষে ফেলতে লাগলাম। হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালিও দিলাম বোধহয়।
যন্ত্রণার দাপটে আমার কপালে বিন্দু বিন্দু মরণঘাম জমতে শুরু করেছে। সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। প্রসবের ব্যথা বুঝি একেই বলে! খুবই অসহ্য! ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক!

হাড় ভেঙে যাওয়ার মতো এই কষ্ট সহ্য করার মতো ক্ষমতা মায়েদের শরীরে কোত্থেকে আসে, কে জানে! প্রসবের প্রতিটি সেকেন্ডকে একটা যুগের সমান মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এই যন্ত্রণা বুঝি অনন্তকাল ধরে চলবে। আচ্ছা, আমি কি মারা যাচ্ছি? নাকি এই ভাঙনের পরেই কোনো এক নতুন জন্মের শুরু হবে?

মাহতাব আমার শিয়রের কাছে দাঁড়িয়েছিল। মাগরিবের আজানের ধ্বনি শুনলাম তখন। হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম,
“যাও নামাজে যাও। আমার জন্য দোয়া করো। আমাদের সন্তানের জন্য দোয়া করো। যাও।”

মাহতাব চলে যাওয়ার পরপরই ব্যথার যে প্রচণ্ড ঝড়টা আমার শরীরের হাড়-মাংস সব চুরমার করে দিচ্ছিল, হঠাৎ করেই তা থেমে গেল। আমার কণ্ঠের তীব্র আর্তনাদ ঘরটাকে কাঁপিয়ে দিয়ে মিলিয়ে গেল বাতাসে। তারপরই শোনা গেল নবজাতকের প্রথম কান্নার স্বর। কী আছে এক কান্নার শব্দে? তা শুনেই ঘরের গুমোট আবহাওয়াটা সতেজ হয়ে উঠল কেন? আমার মনে হলো বাচ্চাটার কান্নার শব্দের প্রতিটি স্পন্দনে আমার শরীরের সব ভাঙা হাড় যেন জোড়া লেগে যাচ্ছে। মুহূর্তেই সমস্ত যন্ত্রণার ক্লান্তি ধুয়ে মুছে চলে যাচ্ছে দূর থেকে বহুদূরে।
নার্স আমার বুকের ওপর আলতো করে তুলে দিল বাচ্চাটাকে। তাকে জড়িয়ে ধরার মতো শক্তি আমার নেই। আমি নিজের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে তাকে অনুভব করতে লাগলাম। এই তো আমার সেই কোহিনূর হীরে। পৃথিবীর কোনো রাজকোষের ধনদৌলত দিয়ে যার মূল্য মাপা যায় না। কত কত রাজা-বাদশা কত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করেছে ওই এক টুকরো হীরের জন্য, অথচ বিধাতা আজ আমাকে তার চেয়েও দামি এক রত্ন দিয়েছেন। এই রত্ন আমার সন্তান। এই বাচ্চা আমার একান্ত। আমার নিজের। ওর ছোট্ট মুখটার দিকে তাকিয়ে মনে হলো, আমি পৃথিবীর সেরা ধনী, সেরা সুখী মানুষ। এই হীরের কোনো কাট নেই, কোনো পালিশ নেই, কিন্তু এর দ্যুতি আমার চোখের সামনে জগতটাকে উজ্জ্বল করে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে, সাগরের অতল গহ্বরে লুকানো কোনো দুষ্প্রাপ্য মুক্তো আজ আমার হাতের মুঠোয়। যার জন্য জগতের সকল মানুষ হাহাকার করে, পাহাড়ের চূড়ায় খুঁজে ফেরে মণি-মানিক্য, কিংবা মহাকাশের দূরতম নক্ষত্র থেকে টেনে আনে আলো—সেসবই যেন আজ ম্লান হয়ে গেছে ওর অস্তিত্বের কাছে।

মাহতাব নামাজ থেকে ফিরল দেরি করে। মোনাজাতে বোধহয় খুব কাঁদল সে, কারণ যখন এল দেখলাম বিন্দু বিন্দু জলকণা হয়ে জমে আছে তার চোখের পাতায়। কপালে গভীর একটা স্পর্শ করে আমার গায়ের উষ্ণতা পরখ করল মাহতাব। অবসন্ন শরীর নিয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি। সে অস্ফুটে বলল,
“কেমন আছো বৌ? জানো— আমাদের একটা চাঁদের মতো ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে।”

আমি চোখ বুজে নিলাম। শরীরের অবসাদ ছাপিয়ে মরে যাওয়ার মতো সুখ-সুখ অনুভূতি হচ্ছে আমার। মাহতাব বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে চুমু খেল, আজান দেওয়ার পর আমার আকাশ উজ্জ্বল করা ধ্রুবতারার কানের কাছে মুখ নিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে গোপন আর মধুর মন্ত্রের মতো ফিসফিস করে বলল,
“আম্মু… আমার আম্মু!”

আমি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটির দিকে। আমার ধ্রুবতারাটি মাহতাবের হাতের আলিঙ্গনে কেমন শান্ত হয়ে আছে, দীপ্তি ছড়াচ্ছে। অনিন্দ্য সুন্দর সেই দৃশ্যটি দেখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল আমার ঠোঁটের কোণে। আমি জগতের সকল যন্ত্রণা উপেক্ষা করে হাসলাম। একটুখানি হাসলাম।

—সমাপ্ত—
,

নীল ধ্রুবতারা পর্ব-১০

#নীল_ধ্রুবতারা [১০]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

শশুরবাড়ি যাবার সময় বাসে বসে আমি ডুব দিলাম আবার স্মৃতিমন্থনে। ভদ্রলোকের সাথে আমার দ্বিতীয় সাক্ষাৎ হয়েছিল আয়োজন ছাড়াই। আমি যে প্রেম করছি, সেই খবরটা ছোট বোনের কল্যাণে মা-বাবার কানে উঠে গিয়েছিল। আমার বোনকে সিআইডি অফিসার এসিপি প্রদ্যুমানের থেকে কম কিছু মনে হয় না। সে করল কী, ঘুমন্ত আমার আঙুলের ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে চুরি করে ফোন খুলে ফেলল, আর প্রেমের সব প্রমাণ উজার করে দিল মায়ের সামনে। আমাদের রক্ষণশীল পরিবারে প্রেম বস্তুটিকে খুবই অপরাধের নজরে দেখা হয়। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরে আমি হয়ে উঠলাম আমার পরিবারের ভয়ংকর আসামী। খুনের আসামীকে থানায় ধরে নিয়ে পুলিশ যেমন করে পেটায়, বাবা আমাকে চ্যালাকাঠ দিয়ে তেমন করে পিটালেন। আমার ফোন কেড়ে নেওয়া হলো। রাতভর কান্নাকাটি করে খুব ভোরে ফোন আর কিছু ক্যাশ টাকা চুরি করে বাড়ি থেকে পালালাম আমি। আমার সারা গায়ে তখন রাজ্যের ব্যথা। জ্বরের তোপে চোখ খুলে রাখা দায়। আমি প্রথমে সরকারি ক্লিনিকে গিয়ে ডাক্তার দেখালাম। ডাক্তার আমাকে জ্বরের ওষুধ দিলেন। সেই ওষুধ খেয়ে ঝিম ধরে অনেকক্ষণ বসে রইলাম হাসপাতালের বেঞ্চিতে। ঘণ্টাখানেক পরে একটু চাঙ্গা হয়ে কল লাগালাম মাহতাবের নাম্বারে। রিসিভ হতেই বললাম,
“আমাকে তোমার কাছে নিয়ে যাবে মাহতাব?”

সে খুব অবাক হলো। বেশ অনেকক্ষণ কিছু বলল না। নিজেকে কোনো রকমে ধাতস্থ করে নিয়ে এক সময় জানতে চাইল,
“কী হয়েছে? তুমি আমার কাছে আসবে মানে কী?”
“মানে বোঝো না! আমি তোমার কাছে চলে যাব। আমাকে বিয়ে করবে?”
“বিয়ে!”

মাহতাবের বিস্ময় দেখে আমিও বিস্মিত হলাম। বিয়ের কথা শুনে এমন আঁতকে ওঠার কী আছে? ড্যাংড্যাং করে প্রেম করেছে আর বিয়ে করবে না? রাগে শরীর জ্বলে গেল। বললাম,
“কেন? প্রেম করেছো কি সারাজীবন ঘাস কাটার জন্য? বিয়ের জন্য নয়?”
“আরে না। মানে এখন বিয়ে? হঠাৎ!”
“এমনি। তুমি স্পষ্ট করে বলো তো, বিয়ে করবে আমায়?”

মাহতাব আমতা-আমতা করতে লাগল। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,
“বাড়ি থেকে রাগ করে চলে এসেছি। কোথায় যাব জানি না। যদি তুমি আমাকে বিয়ে করতে রাজি থাকো, আমি তোমার কাছে চলে যাব। এখন ভেবে বলো। দশ মিনিট সময় দিচ্ছি।”

বলেই খট করে কল কেটে দিলাম আমি। মাহতাব বোধহয় বলতে চাচ্ছিল—বিয়ের মতো এতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দশ মিনিটে নেওয়া যায় না। আমি তার কোনো কথা শুনলাম না। রাগে-দুঃখে কেঁদে ফেললাম। এই পৃথিবী এতো নিষ্ঠুর কেন? কেনই বা আমার বাবা-মা এতো পাষাণ? ভাবতে ভাবতে চার মিনিটের মাথায় মাহতাব কল দিল। রিসিভ করে বললাম,
“এর মাঝেই ভাবনা শেষ? তা বলো, কী ভেবেছো?”
সে অসহায় গলায় ডাকল,
“নবনী…”
“হুঁ।”
“তুমি প্লিজ বাড়ি যাও। তোমার বাবা-মা চিন্তা করছেন।”
“করুক চিন্তা। উনারা আমাকে জানোয়ারের মতো পিটিয়েছেন। আমি ভুলেও আর বাসায় যাব না। এসব বাদ দিয়ে বলো, তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে? বিয়ের খরচ আমার কাছে আছে। বিশ হাজার টাকা নিয়ে বের হয়েছি।”

মাহতাব করুণ গলায় বলল,
“টাকা চুরি করেছো?”
“হ্যাঁ। আমাকে মেরেছে না! তার ক্ষতিপূরণ।”
“প্লিজ বাড়ি যাও। তোমার বাবা-মা চিন্তায় অস্থির হয়ে গিয়েছেন। এখানে-সেখানে খোঁজ করছেন।”

তার কথা শুনে আমার কপাল কুঞ্চিত হলো। আমার বাবা-মা কী করছে সেই খবর সে কীভাবে জানল? জিজ্ঞেস করলাম সে কথা—
“তুমি কীভাবে জানলে?”
“তোমার বান্ধবী ফোন করেছিল। উনারা ভাবছেন তুমি আমার সাথে পালিয়ে এসেছো। তোমাকে সাহায্য করেছে ওই মেয়ে।”
“বাহ, ভালো তো!”
“ভালো নয়। এলাকায় তাদের মানসম্মান নষ্ট হবে।”
“তাতে আমার কী?”
“উনারা কষ্ট পাবেন।”
“আমাকে মারার সময় তাদের মনে ছিল না, আমিও কষ্ট পাচ্ছি? তুমি ওদের হয়ে সাফাই গেয়ো না প্লিজ!”

মাহতাব শুনল না আমার কথা। সে আরও অনেকক্ষণ ধরে আমার বাবা-মায়ের সম্মান রক্ষার চেষ্টা চালাল। অনুরোধ-উপরোধের পর আমি মেনে নিলাম। সে আমাকে আশ্বস্ত করল, আগামীকাল সে আসবে আমার সাথে দেখা করতে। আজকে যেন আমি কোনো আত্মীয়ের বাড়ি চলে যাই। আমি তাই গেলাম। আমার দাদুর বাড়িতে আশ্রয় নিলাম সেদিন। বাবা-মা খবর শুনে নিশ্চিন্ত হলেন। ঘটনা যতটা সহজভাবে উল্লেখ করেছি, ততটা অবশ্য সহজ ছিল না। মাহতাবের আচরণে আমি খুব ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম। মনে সন্দেহ দানা বেঁধেছিল—এই লোক সত্যিই আমাকে বিয়ে করবে তো?
মাহতাব সত্যি সত্যি পরদিন আমার সাথে দেখা করতে এল। প্রথম সাক্ষাতের ঠিক এক মাস এগারো দিন পর। কলেজের কথা বলে দাদুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমি দেখা করলাম তার সাথে। আমার শরীরে বাবার করা আঘাতের অনেক চিহ্ন লক্ষ্য করল সে। সারাদিন একসাথে কাটিয়ে যাবার আগে সে বলল,
“এরপর তোমাকে আমার বউ হিসাবে দেখব।”

আমি বিশ্বাস করিনি। তবে সত্যিই আমাদের তৃতীয়বার দেখা হয়েছিল বিয়ের দিন। অবশ্য সম্পর্কটাকে বিয়ে অবধি নিয়ে যেতে খুব কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল আমাদের। মাহতাবের সাথে দেখা করে সেদিন বাড়িতেই এসেছিলাম আমি। এবং সাহস করে মাকে নিজের মুখেই মাহতাবের কথা বলেছিলাম। আমার নাছোড়বান্দা আবদারে, নির্লজ্জতার বাড়াবাড়ি দেখে মা কথাও বলেছিল মাহতাবের সাথে। শেষে যখন জানল ছেলেটার বাড়ি বহুদূর, তখনই বেঁকে বসল। আমাকে অন্য স্থানে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। আমি কিন্তু হার মানলাম না। তাদের গালাগাল, তিরস্কার, অবহেলা, তির্যক দৃষ্টি উপেক্ষা করে নিয়মিত উৎপীড়ন করতে লাগলাম সবাইকে। পাত্রপক্ষের সামনে গিয়ে হ্যাবলার মতো বসে থাকি, প্রশ্নের উল্টাপাল্টা জবাব দেই। মেরেও আমাকে সোজা পথে আনা যায় না। শেষে গিয়ে হতাশ হয়ে মেনে নিল তারা। ওদিকে মাহতাব নিজের বাড়িতে বলেছে তখন। আমার শ্বশুর-শাশুড়ির এখনই ছেলেকে বিয়ে দেওয়ার কোনো প্রবৃত্তিই ছিল না।

সুতরাং পুত্রের অন্যায় আবদার মেনে নিলেন না তারা। মাহতাবও নাছোড়বান্দা। শেষে তারাও হার মানল। পারিবারিকভাবে বিয়ের কথা এগোতে থাকল আমাদের। আমার বাবা-মা তাদের বাড়ি গিয়ে ছেলে দেখে এল। মোটামুটি পছন্দই হলো সব। তারাও এল আমায় দেখতে। সব দেখেশুনে আনন্দিত মনেই ফিরে গেল। যেহেতু এখানে আমাদের পছন্দকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, সেখানে বিয়ে আটনোর প্রশ্নই নেই। কিন্তু বিপত্তি বাঁধালেন উনারা। আমাকে উনাদের এক ফোঁটাও পছন্দ হয়নি। মাহতাবের বাড়ির সকলের গায়ের রঙ মারাত্মক ফর্সা। সেখানে আমি শ্যামবর্ণা এক কুশ্রী তরুণী। তাদের সুন্দর ছেলের পাশে আমাকে আদৌ মানায়?

উনারা বলে দিলেন, এই বিয়ে হবে না। মাহতাবের উপর কঠিন নির্দেশ জারি হলো যাতে আমার সাথে আর কোনোরূপ যোগাযোগ না রাখে। জেদী মাহতাব সেটা শুনল না। সে আমার সাথে আগের মতোই যোগাযোগ করল। আমিও বিচ্ছিন্ন হতে পারলাম না তার থেকে। সে আমাকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিল। ছেলে এখনো আমার সাথে যোগাযোগ রাখে জেনেই মাহতাবকে ওয়ার্ক পারমিটে দুবাই পাঠিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করল তারা। কিন্তু মাহতাব সেই পরিকল্পনায় জল ঢেলে একদিন ঘোর বর্ষার দিনে এসে আবার উপস্থিত হলো আমার শহরে, আমার বাড়িতে। সে এল একা একা। মা-বাবা তাকে দেখে মুখ কালো করে ফেলল। তার বাবা-মায়ের অপমান হজম করতে পারেনি বলেই হয়তো কঠিন স্বরে জানতে চাইল,
“তুমি! তুমি আবার কী চাও?”

মাহতাব সেদিন কী বলেছিল জানি না। তবে বাবা-মা তাকে নিয়ে ঘরের দোর দিয়ে মিটিং করেছিল ঘণ্টাখানেক সময় নিয়ে। এরপর বেরিয়ে এসে আমাকে আদেশ করল,
“রেডি হয়ে কাজী অফিসে চল।”

এই আদেশের পেছনে, এতো সহজে মেনে নেওয়ার পেছনে একটাই ভয় ছিল তাদের—যদি আমরা পালিয়ে যাই! সামাজিক মর্যাদার কথা ভেবেই সেদিন সম্মতি দিয়েছিল তারা। এবং রাত নয়টার সময় পাঁচ লক্ষ এক টাকা দেনমোহরে বিয়ে হয়ে গেল আমার আর মাহতাবের। আড়ম্বরহীন বিয়ে। বিয়ের প্রথম রাত্রিটা ছিল বড্ড সাদামাটা। সারারাত পাশাপাশি গল্প করে ভোররাতের দিকে আলাদা আলাদা ঘরে ঘুমিয়েছিলাম আমরা, কারণ গ্রামে প্রচলিত নিয়ম—বিয়ের প্রথম রাত্রেই নবদম্পতিকে একসাথে ঘুমাতে নেই। এতে নাকি অকল্যাণ হয়। তবে দ্বিতীয় রাতে জগতের সমস্ত কল্যাণ নিয়ে মাহতাবের বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়েছিলাম আমি। ‘ঘুমিয়েছিলাম’ শব্দে অবশ্য ভুল আছে। মাহতাব সেদিন উন্মাদ প্রেমিক হয়েছিল। এক মুহূর্ত ঘুমাতে দেয়নি আমাকে। আদরে আদরে ভরিয়ে দিয়েছিল। কী মারাত্মক সুখের ছিল সে রাত্রি! এমন সুখের রজনী দ্বিতীয়বার আসেনি আমার জীবনে। অবশ্য মাহতাব আমাকে আদর করেছে আরও বহুবার, তবে সেই দিনের অনুভূতি ছিল ভিন্ন।

বিয়ের সপ্তাহ ঘুরতেই আমাদের এলাকায় একটা চাকরি জুটিয়ে ফেলল মাহতাব। বউ নিয়ে শ্বশুরের পয়সায় বসে বসে খাওয়া যায় না। বিয়ের দুদিন পরেই অবশ্য মাহতাবের আগের অফিসের কলিগের কাছ থেকে আমার শ্বশুর-শাশুড়ি ঘটনাটি জেনে যান এবং ফোন করে মাহতাবকে ত্যাজ্যপুত্র করেন। কান্নাকাটির অন্ত থাকে না তাদের। নির্বিকার মাহতাব আমাকে বুকে জড়িয়ে রাখেন সম্পূর্ণ ভরসা দিয়ে। শ্বশুর-শাশুড়ির ত্যাজ্যপুত্র করার ঘটনাটি অবশ্য স্মরণ থাকে না। এক মাসের মাথায় মাহতাব আর আমাকে ঘটা করে তুলে নিয়ে যান তারা। বেশ ঝড়ঝাপটা আসে আমার উপর। মাহতাব বরাবর সাংসারিক এসব পলিটিক্স থেকে গা বাঁচিয়ে চলেছে। তবে আড়ালে আমার যত্নও করেছে খুব। সেই যত্ন-আত্তির এক আনাও কারো চোখে পড়ে গেলে তীব্র তিরস্কার সইতে হয়েছে তাকে। শুনতে হয়েছে—
“এই কালী বউয়ের এতো খাতির? তাবিজ করে পোলাডারে শেষ করে দিল। বউ যেখানে যায়, এই পোলাও সেখানেই যায়। বউয়ের আঁচলের নিচে নিচে থাকে।”

তার নাম হয়ে গেল বউ পাগল। এর মাঝেই কতজনে কত কী বলল! আমার স্বামীকে আবার বিয়ে দেওয়ার জন্য পাত্রী দেখার কাজটা করল একজন আত্মীয়। আমি দেখলাম। কাঁদলাম। আর মাহতাব খুব যতনে আমার চোখের জল মুছে দিয়ে সান্ত্বনা দিল। শ্বশুরবাড়িতে আমরা মাস তিনেক থাকার পরে আবার আমাদের এলাকায় ফিরে আসি। কারণ চাকরির ঠিক সুবিধা পাচ্ছিল না মাহতাব। কারণ এটা দেখালেও আমি জানি, সে চাইছিল এসব যন্ত্রণা থেকে যেন আমি মুক্তি পাই। পেলাম মুক্তি। পূর্বের অফিসেই আবার যোগ দিল মাহতাব। আমরা কাছেই বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করি। এরপর এই সংসার! সুখী সুখী সংসার।

প্রতি ঈদের সময় ঈদ করতে চলে যাই আমরা। ঈদের ছুটি কাটিয়ে আবার হৃষ্টচিত্তে ফিরে আসি। এবারও যাচ্ছি। কিন্তু এবারের যাত্রায় কোনো আনন্দ নেই। আমার মনটা বড় বিষণ্ণ। শরীর ভীষণ খারাপ। দুর্বলতায় ঠিক করে দাঁড়াতে পারি না। সারাক্ষণ মাথা ঘোরে।
শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে আমার অসুস্থতা আরও বাড়ল। জ্বর-ঠান্ডায় কাহিল হয়ে গেলাম। যন্ত্রণা দিতে থাকলাম মাহতাবকে। ঈদের আগের রাতে মাহতাব একটা মেহেদী নিয়ে এসে আমাকে বলল,
“নবনী এসো, তোমাকে মেহেদী লাগিয়ে দেই।”

সে মেহেদী দিতে পারে না ঠিক করে। তবে আমার হাতে খুব শখ করে কাকের ঠ্যাং, বকের ঠ্যাং এঁকে দেয়। তার ওই চিত্রকর্ম দেখে আমিও ভীষণ খুশি হই। যতটা না হই, প্রকাশ করি তার চেয়েও বেশি। কিন্তু আচমকা আমার কী যেন হলো। জানালা দিয়ে ঢিল দিয়ে আমি মেহেদী ছুঁড়ে ফেললাম দূরের কাদামাটিতে। মাহতাব হতাশ হয়ে সেটা গিয়ে তুলে আনল। নিয়ে এসে আমার পাশে বসে মায়ের নাম্বারে ফোন দিয়ে নালিশ করল আমার নামে। আম্মা বলল,
“তুমি এক থাপ্পড় দিয়ে ওর দাঁত ফেলে দাও। এই মেয়ে চিরকালের বেয়াদপ। ফাজিলটাকে নিয়ে যাওয়াই ভুল হয়েছে তোমার। দাও, আমি কথা বলছি।”

মা আমাকে খুব করে বকে দিল। আমি পাত্তাই দিলাম না সেই সব। তারা তো আর জানে না আমার অস্থিরতা কোথায়! আজ কতদিন বাচ্চাটাকে দেখি না আমি! আমাকে এতো মানুষজনের ভিড়ে এনে আমার শান্তি নষ্ট করে দিয়েছে তারা।

ঈদের দিন থেকেই আমার প্রচুর বমি শুরু হলো। বমির কারণে কিছুই খেতে পারি না। রাতে ঘুম হয় না। ভোরের দিকের খারাপ লাগাটা বাড়ল খুব। কান্নাকাটি আর অস্থিরতায় বাড়ির সবাইকে তটস্থ করে রাখলাম আমি। ঈদের পরদিনই আমাকে নিয়ে গাজীপুর ব্যাক করল মাহতাব। ফিরে এসে বড় ডাক্তার দেখালাম আমি। উনি আমার পূর্বের রিপোর্টগুলো দেখে আমাকে ধমকালেন অনেকক্ষণ। সরকারি ডাক্তার না দেখিয়ে কেন ওখানে গিয়েছি, দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো কেন কাজ করি, উল্টাপাল্টা ওষুধ কেন খাচ্ছি ইত্যাদি। আমি বুঝলাম না নিজের ভুলটা। ডাক্তার আমাকে মধুর ভাষায় বললেন,
“মা, তুমি আরেকটা আল্ট্রা করে এসো।”

আমার আল্ট্রা করা হলো। রুমের সামনে অনেকটা সময় নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল মাহতাব। পায়চারি করতে লাগল এখান থেকে ওখানে। রিপোর্ট আসার পর আমি ডাক্তারকে দেখালাম এবং নিজের সমস্যাগুলো বললাম বিস্তারিত। খুব বমি হয় আজকাল সেটাও জানাতে ভুললাম না। ভদ্রমহিলা মুচকি হেসে বললেন,
“বমি ছাড়া কে কবে মা হয়েছে, শুনি?”

আমি উনার কথাটা প্রথমে বুঝতে পারলাম না। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম। মানে কী এই কথার? কেন বললেন বমি ছাড়া কেউ মা হয় না? এবং যখন কারণ বুঝতে পারলাম, তখন আনন্দে আমার চোখ ছলছল করছে। রিপোর্টে দেখা গেল আমার ওভারিতে সিস্ট এবং বাচ্চা—দুটোই আছে। আমার সাথেই কেবিনে ঢুকেছিল মাহতাব। খবরটা শোনার পর আমি দেখলাম সে আনন্দে লাফিয়ে উঠেছে। এটা শুধু কথা নয়, সত্যিকার অর্থেই সে লাফিয়ে উঠল। পুরোটা সময় কেমন যেন উজ্জ্বল, প্রফুল্ল দেখাল তাকে। ডাক্তার আমার ওষুধ বদলে দিলেন। শুকরিয়া আদায় করলেন ভুল ওষুধে বাচ্চার কোনো ক্ষতি হয়নি এটা জানিয়ে। নেক্সট টাইম যাতে ওই হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে না যাই, সেই নির্দেশও দিলেন।

বেরোনোর আগে আমি বললাম,
“ম্যাডাম, সিস্ট থাকলে নাকি বাচ্চা হয় না?”
“কে বলেছে হয় না? কার কাছে শুনেছো এসব ভুল কথা? যদি সিস্ট থাকলে বাচ্চাই না হবে, তবে তোমার গর্ভে যে ভ্রুণটি বেড়ে উঠছে সেটা কি?”

আমি আমতা-আমতা করতে লাগলাম। উনি আমাকে বুঝিয়ে বললেন,
“ওভারিতে সিস্ট থাকলে বাচ্চা হয়না এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা। বর্তমান সময়ে সিস্ট থাকা খুব সাধারণ একটি বিষয়। অধিকাংশ মেয়েদের সিস্টের সমস্যা থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো হরমোনের ছোটখাটো অসামঞ্জস্য ছাড়া আর কিছুই নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন কোনো নিয়ম নেই যে সিস্ট থাকলে কনসিভ করা যাবে না।
​আমরা শুধু দেখি সিস্টের ধরনটা কী এবং সেটি পেসেন্টের ওভুলেশনে (ডিম্বস্ফোটন) কতটা বাধা দিচ্ছে। প্রয়োজন হলে ছোট কিছু ওষুধ বা সামান্য লাইফস্টাইল পরিবর্তনে ডিম্বস্ফোটন স্বাভাবিক করা যায়। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে সিস্ট থাকা বহু মা এখন সুস্থ সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। তাই অযথা দুশ্চিন্তা করে নিজের মানসিক চাপ বাড়াবে না, এতে হরমোনের ভারসাম্য আরও নষ্ট হবে। শান্ত থাকো, হাসিখুশি থাকো। নিজের যত্ন নাও। বেস্ট অফ লাক!”

আমি মুগ্ধ হয়ে গেলার উনার বিশ্লেষণ শুনে। অনভিজ্ঞ চিকিৎসকের হাতে পড়া যে কোনো রোগীর জন্যই কত বড় আতঙ্ক সেটা হারে হারে টের পেলাম আমি। কেবিন থেকে বেরিয়ে মাহতাব শক্ত করে চেপে ধরে রইল আমার হাত। মা আনন্দিত হয়ে অনেকের কাছে ফোন করে নিজের নানি হওয়ার খবর জানালেন। আমি এবার আনন্দে কেঁদে ফেললাম। মনে হতে লাগল—পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ বোধহয় আমি। ইশ! এই পৃথিবী এতো ভালো কেন? বাড়ি ফিরতে ফিরতে মাহতাব আমাকে জ্ঞান দিল খুব। যার সারমর্ম এই—দেখেছো, শুধু শুধু চিন্তা করে এতো অশান্তিতে ভুগলে তুমি। এই জন্যই বলি, এতো অধৈর্য হয়ো না। আল্লাহর বিচার সবচেয়ে উত্তম।

আমি সন্তানসম্ভবা জানার পর থেকে আরও ভীষণ করে ডুবে গেলাম বাচ্চার সাথে সময় কাটানোতে। অবশ্য অবাস্তব পৃথিবীর সেই গোলগোল চোখের বাচ্চাটার সাথে নয়। আজকাল তাকে আর দেখতে পাই না। সে আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে বহু দূরে। এখন আমি কথা বলি আমার গর্ভের বাচ্চাটার সাথে। তাকে ফিসফিস করে ডাকি,
“সোনা, তুমি কি ভালো আছো? শুনতে পাচ্ছো মায়ের কথা?”

আরও অনেক কথা থাকে তার সাথে আমার। তবুও ওই গোলগোল আঁখিদুটির জন্য আমার মন কেমন করে। সে এখন কেন আসে না? কেন দেখতে পাই না তাকে? তার কি খুব অভিমান হয়েছে? মনের কথাগুলোই মাহতাবকে বলে বলে অতিষ্ঠ করে তুলি। একদিন খুব বুঝিয়ে সাইক্রিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে গেল আমায়। তিনি অনেক অনেক প্রশ্ন করলেন। আমি জবাব দিলাম। শেষে তিনি আমাকে বললেন—
“শুনুন, ওই বাচ্চাটা স্রেফ আপনার মনের কল্পনা। আপনার কোনো বাচ্চা ছিলই না। অনেক মেয়েদের মাতৃত্বের প্রতি দুর্বলতা থাকে। বিয়ের পরপরই তারা মা হতে চায়। হয়তো আপনার মাঝেও ছিল। এরপর যখন আপনি শুনলেন মা হতে পারবেন না, আপনার মন সেটা মানতে পারেনি। আপনমনে একা একা এক অবাস্তব কল্পনায় আপনি খুঁজে নিলেন সন্তান সুখ।”

“কিন্তু আমি তো তাকে সত্যি সত্যিই দেখতাম। তার খিলখিল হাসির শব্দ আজও আমার কানে বাজে।”

আমার কথায় উনি একটুখানি হাসলেন মনে হলো। আমি বিব্রত বোধ করতে লাগলাম। মাহতাব নেই আশেপাশে কোথাও। আমার অসহ্য লাগতে শুরু করেছে। ভদ্রলোক সামান্য ঝুঁকে এসে বললেন,
“এগুলোও সব আপনার কল্পনা। ডিপ্রেশন থেকেই এইসব অলীক ভাবনার সৃষ্টি। শুনুন, কখনো একা থাকবেন না। যখন একা থাকবেন, নিজের গর্ভের বাচ্চার সাথে অনেক কথা বলবেন। ভালো লাগবে।”

কতটুকু কী বুঝেছিলাম তা জানি না। সামান্য কিছু মেডিসিন দিয়েছিলেন তিনি আমায়। সাথে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন আমার দায়িত্বশীল স্বামীর দায়িত্বের ভার। সেদিনের পর থেকে মাহতাব আমাকে এক মুহূর্তের জন্যও একা ছাড়েনি। আমাকে দেখাশোনা করার জন্য মাকে নিয়ে এল। যখন মা থাকে না, তখন মাহতাবের কল্যাণে ছোট বোন হলো আমার সঙ্গী। আরও কয়েকবার ডাক্তার দেখানোর পর ধীরে ধীরে আমার স্মৃতি থেকে মিলিয়ে যেতে লাগল পরাবাস্তব ওই বাচ্চাটা। যার চোখ বড় মায়াবী। বড় মায়াবী যার চোখ!
অনেকের গর্ভাবস্থার সময়টা চোখের পলকে কেটে যায়। আমার কিন্তু কাটল না। দিন দিন নানা সমস্যায় নানান রোগে আক্রান্ত হলাম আমি। বমির সমস্যা মিটে গিয়ে বুক জ্বালাপোড়া শুরু হলো। ঘুমের সমস্যা বাড়ল। সর্বোপরি বাড়ল আচমকা মেজাজের গতিবিধির পরিবর্তন। এই কাঁদি, এই হাসি। মাহতাব আমাকে সামলে নেয়। ক্ষমা চায়। তবে রাগ করে না একবারও। গর্ভাবস্থার পাঁচ মাসের মাথায় আমার অনার্স-এর প্রথম পরীক্ষা শুরু হলো। সেন্টার বেশ দূরে। তৃতীয় পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে গুরুতর এক্সিডেন্ট করলাম আমি। আমাদের অটোরিকশা উলটে পড়ে গেল ধানখেতের মাঝে। অচেতন হয়ে পড়ে রইলাম কিছুক্ষণ। যখন হুঁশ ফিরল, খেয়াল করলাম কপাল বেয়ে নামতে শুরু করেছে রক্তের ধারা। আমার তখন সে রক্ত দেখে আতঙ্কিত হওয়ার কথা। আমি হলাম না। আমি নিজের পেটে হাত রেখে গলা ছেড়ে কাঁদতে লাগলাম। বলতে লাগলাম,
“আমার বাচ্চা! আল্লাহ গো, আমার বাচ্চা!”

আমার চিৎকারে সচকিত হয়ে উঠেছিল আশেপাশের সকল মানুষ। আমাকে ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। বাড়িতে খবর দেওয়া হলো। মা-বাবা এসে আমার অবস্থা দেখে আঁতকে উঠল। মা ভেজা গলায় বলল, “কীভাবে কী হইল মা?”

আমি বললাম,
“মা, আমার বাচ্চাটা বাঁচব তো!”
“আল্লাকে ডাকো মা। আল্লাহকে ডাকো।”

আমার আল্লাহর আমার প্রতি দয়ার শেষ নেই। এতো ঝড়ঝাপটার পরেও আমার বাচ্চার কোনো ক্ষতি হলো না। সৃষ্টিকর্তার এই মেহেরবানির কথা স্মরণ করে আজও শুকরিয়া আদায় করি আমি। কী দয়াময় তিনি!
এমনি করেই আমার জীবনের পাতা থেকে ঝরে গেল নয়টি মাস। ধরণীতে তখন শীত নেমেছে। জেঁকে বসেছে হিম। ঘরে ঘরে উঠেছে নতুন ধান। সোনালী ধান থেকে গৃহিণীরা খেটেখুটে বের করে নিচ্ছে চাল। আমার হঠাৎ নতুন চালের পিঠা খেতে ভীষণ ইচ্ছে হলো। ভাড়া বাসা ছেড়ে নিয়ে ততদিনে আমাদের বাড়িতে চলে এসেছি আমরা।

সেই এক্সিডেন্টের পর থেকেই নিজেদের বাড়িতে থাকি। মাহতাব বাবার হাতে খাওয়া বাবদ কিছু টাকা-পয়সা দেয়। মাঝে মাঝে বাজার করে। পিঠার প্রতি এতো আগ্রহ দেখে মা বাজার থেকে উপকরণ কিনে আনালেন। বানিয়ে দিলেন আমার আরাধ্য খাদ্যদ্রব্যটি। খেজুরের গুড়ের তৈরি তেলে ভাজা পিঠা খেলাম পেট ভরে। সন্ধ্যায় পেট ভরে পিঠা খাওয়ার শখ মিটল মাঝরাতে। পিঠার দল আমার পেটের মধ্যে নৃত্য করতে লাগল। এবং একই সাথে শুরু হলো বমি। লক্ষণ বুঝে মা বললেন,
“নবনীর তো মারাত্মক ডায়রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। ওকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে।”

আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো সকালে। ততক্ষণে আমার অবস্থা শোচনীয়। সিরিয়াস অবস্থা দেখে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আমাকে রাখল না। তারা ট্রান্সফার করে দিল ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে। নিজের উঁচুপেটটা নিয়ে আমি চড়ে বসলাম সিএনজিতে। আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো ময়মনসিংহ।

—চলমান—

নীল ধ্রুবতারা পর্ব-০৯

#নীল_ধ্রুবতারা [৯]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

“খোকা ঘুমাল
পাড়া জুড়াল,
বর্গি এল দেশে
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে
খাজনা দেব কিসে?”

আমি বাচ্চাটার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বিড়বিড় করে কবিতা আওড়াচ্ছি। ঘুমন্ত বাচ্চাটার মাথা আমার কাঁধের উপর। সে পরম নিশ্চিন্তে আমার কোলে ঘুমাচ্ছে। আমার বুক ভরে উঠছে খুশিতে। আজকাল আমার দিন কাটছে বড় আনন্দে। ওই যে সেদিন স্বপ্নে দেখলাম, একটা বাচ্চার মা আমি। সেদিন থেকেই সময়ে-অসময়ে ঘুমানোর অভ্যাস হয়েছে আমার। ঘুমালেই দেখতে পাই আদুরে বাচ্চাটাকে। কী যে দারুণ বাচ্চাটা! আমার কোলে সে খুব করে হাসে। আজকাল অবশ্য বাচ্চাটাকে দেখার জন্য ঘুমাতেও হয় না। যখন খুব একা থাকি, তখনই আবিষ্কার করি বাচ্চাটা আমার আশেপাশেই আছে। বাচ্চাটাকে সাথে নিয়ে দারুণ দিন কাটে আমার। সারাদিন ঘরে দোর দিয়ে বসে থাকি। বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেই। গোসল করিয়ে দেই। দেখতে পাই, লাল টকটকে বাথটাবের পানিতে হাত-পা ছুঁড়ে খেলা করছে বাচ্চাটা। কতবার যে বললাম তাকে, বাচ্চার এটা লাগবে, ওটা লাগবে—মানুষটা ভুলে যায় খালি। মাঝে মাঝে বলে,
“তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে নবনী। দিনদিন মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে যাচ্ছো তুমি!”

আমি তখন হাসি। চিরকাল এই এক কথাই বলে গেল মানুষটা। আমি নাকি পাগল! এতোদিন ঠাট্টা করে বললেও, আজকাল সে কেমন করে যেন আমার দিকে তাকায়—যেন সত্যি সত্যি আমাকে পাগল ভাবছে সে। বিশেষ করে যখন বাচ্চার কথা বলি। আশ্চর্য! মাহতাব এমন করে কেন? আমি বুঝতে পারছি, মাহতাব দায়িত্বশীল স্বামী হলেও চমৎকার বাবা হতে পারেনি। আমার বাচ্চাটার প্রতি সে বড্ড উদাসীন। আমার পুচকে সোনা তার বাবাকে একদম সহ্য করতে পারে না। তাই তো মাহতাব ঘরে এলে সে লুকিয়ে যায়। ঘরময় খুঁজেও কোথাও পাই না আমি তাকে। এজন্যই মাহতাবকে দেখলেই আমার খুব রাগ লাগে। আমি খুব ঝগড়া বাঁধাই তার সাথে। সে যতক্ষণ ঘরে থাকে, অহেতুক চিল্লাতে থাকি। আমি আজকাল কারো সাথেই কথা বলি না। আমার ভালো লাগে না কিছু। শুধু আমার সোনা বাচ্চার সাথে সময় কাটাতে ইচ্ছে করে। আমার এখনো পিরিয়ড হয়নি। নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছি, অথচ সুস্থতার বদলে শরীর আরও খারাপ হয়েছে। মাথার সব চুল পড়ে যাচ্ছে। খাবারের রুচি উঠে গেছে। মাহতাব আমাকে নিয়ে বড়ই চিন্তিত। আমি তার চিন্তাকে কোনো পাত্তা দেই না, আপনমনে থাকি। সে যখন ঘরে থাকে, আমি বারান্দায় গিয়ে বসে বসে আকাশ দেখি। যখন সামান্য টু শব্দটিও করতে আসে, আমি খুব করে ঝগড়া করি তার সাথে। তার চোখ দেখে বোঝা যায়, সে হৃদয়ে চাষ করছে অসহ্য যন্ত্রণা আর বেদনা।

অনেক ঝগড়াঝাটির পর যখন তার বিষাদগম্ভীর মুখটা দেখি, আমার বুকটা তখন হু হু করে ওঠে। পরক্ষণেই কেঁদে-কেটে হাতে-পায়ে ধরে ক্ষমা চাই। মানুষটা আমাকে ক্ষমা করে দেয় কিনা জানি না। তবে মুখে বলে, “আচ্ছা, আচ্ছা, করলাম ক্ষমা। তবুও প্লিজ কেঁদো না।”

আমিও তবুও কাঁদি। ফিরে আসি বাস্তবতায়। বুঝে নেই আমার ঘরে কোনো বাচ্চা নেই। কোনো পুচকে সোনার হাসির শব্দে মুখরিত হয় না আমার ঘর। সত্যটা উপলব্ধি করতেই যেন আরও বাড়ে আমার পাগলামি। সারাক্ষণ উল্টাপাল্টা চিন্তা করি, কান্নাকাটি করি। মোবাইলে তখন রিলস, ইউটিউব সবখানে শুধু এই জাতীয় নাটকগুলোই আসতো যে—বাচ্চা না হওয়ায় বউয়ের সাথে ছাড়াছাড়ি, কিংবা পরকীয়া, লুকিয়ে বিয়ে ইত্যাদি। স্বপ্নেও তাই দেখতাম। আর উন্মাদের মতো কাঁদতাম। আমার তখন হিতাহিতজ্ঞানশূন্য অবস্থা।
রান্না করলে একদিন লবণ হয় না তো আরেকদিন লবণে তিক্ত। তেল, ঝাল, মসলার অপ্রতুলতার পরিমাণ এতোটাই বাড়ে যে সেই খাবার মুখে তোলা যায় না। ভদ্রলোক অফিস থেকে ফিরে সেই অখাদ্য সোনামুখ করে খেয়ে নেয়। কারণ ভালো-মন্দ কোনো মন্তব্য করলেই যে আমি ফনা ধরা ফণা ধরানো ফণিনীর মতো ফোঁস করে উঠব, সেই তথ্য ততদিনে বুঝে গিয়েছেন তিনি। আমাদের সংসারের অবস্থা তখন—কখনো আমরা চিরশত্রু বা কখনো চির অচেনা। কিন্তু এভাবে কত দিন? একই ছাদের নিচে এমন অপরিচিতের মতো বাস করা যায় না। আবার দুজন চিরশত্রুও একই বিছানায় ঘুমাতে পারে না। অবশ্য সবসময় অশান্তির সূচনা আমিই করতাম। সমাপ্তি ঘটতো তার, “আচ্ছা, আমার-ই ভুল। প্লিজ ক্ষমা করে দাও” বাক্যে।

একদিন পাশের ফ্ল্যাটের এক আন্টি আমার কাছে এলেন। ভদ্রমহিলা সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা। দারুণ মার্জিত কথাবার্তা, নমনীয় ব্যবহার, বাচনভঙ্গি চমৎকার। উনার সাথে কথা বললে খুব শান্তি শান্তি লাগে। শান্তিপ্রিয় মানুষটি আমার ঘরে এসে মুচকি হেসে প্রশ্ন করলেন,
“কেমন আছো নবনী? কী হয়েছে তোমার? এমন শুকিয়ে গিয়েছো কেন?”

আমি সত্যিই জানি না আমার কী হয়েছে? কেন বাস্তব আর অবাস্তবের মাঝে বসবাস করছি আমি? কেন ভুলে যাই নিজের অস্তিত্বের কথা? কেন অবাস্তব এক পৃথিবীতে খুঁজে বেড়াই সন্তান সুখ? অপার্থিব ওই জগৎ যে আমার নয়! বুঝেও কেন অবুঝের মতো কাজ করছি? কেন আমার সুখের সংসারে স্বেচ্ছায় বপন করছি অশান্তির বীজ?

আন্টির প্রশ্নের জবাবে ছোট করে বললাম, “ভালো।”
“তোমাদের মাঝে কী হয়েছে বলো তো! যদিও কারো দাম্পত্য জীবনে হস্তক্ষেপ করার অধিকার আমার নেই, তবুও রোজ রোজ তোমার চিৎকার কানে লাগছে। তুমি রাগ কোরো না নবনী, তোমার স্বামীর কন্ঠ তো কখনোই আসে না। একা একা তুমিই চিল্লাতে থাকো। কারণ কী নবনী?”

কারণ যে আমি নিজেও জানি না। তবে এটা জানি, ভদ্রমহিলা আমার স্বামীকে অতিমাত্রায় পছন্দ করেন। আমার স্বামীর ভদ্রতা, নমনীয়তা, যত্নশীল স্বভাবের কারণে উনি প্রায়ই গুণগান করেন। তার উপর সে রূপবান পুরুষ। এমন সৌন্দর্য আর মধুর ব্যবহার কোনো মানুষের মাঝে একসাথে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এই কারণেই সকলে তাকে পছন্দ করেন ভীষণ। করেন কারণ, আশেপাশের অন্য ভাড়াটে পুরুষরা যখন অবসর সময়ে বাসায় থেকে এখানে ওখানে উঁকিঝুঁকি মারেন, প্রকাশ্যে সিগারেট ফোঁকেন, মেয়েদের আড্ডায় কেমন হ্যাংলামি করে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন আমার স্বামী ঘরে বসে আমার সাথে খোশমেজাজে গল্প করেন। রান্নায় সাহায্য করেন। ঘরদোর পরিষ্কার করেন। আজ অবধি সে ভিন্ন কোনো মেয়ের দিকে চোখে চোখ রেখে কথা বলেনি, মাহতাব। নত মস্তকে সে চলাফেরা করে সবসময়। ওর এই ভদ্রতার কারণে সকলের কাছেই উনি প্রশংসিত। এই আন্টি যে আমার স্বামীকে নিপাট ভদ্রলোক ভেবে প্রগাঢ় এক স্নেহ অনুভব করেন তা আমি জানি। তাই উনার কথার কোনো সদুত্তর দিতে পারলাম না।

আন্টি আবারও বললেন,
“সংসারে রোজ রোজ অশান্তি করা উচিত নয় নবনী। তোমার হাজবেন্ড খুবই ভালো ছেলে। ওর সাথে কেন ঝগড়াঝাটি করো? ও পুরুষ মানুষ, সারাদিন বাইরে খেটেখুটে আসে। বাসায় এসেও যদি একটু শান্তি না পায় তবে ওর কী ভালো লাগে? এমন চলতে থাকলে একটা সময় পর ওর ঘর থেকে মন উঠে যাবে। একটি সুন্দর সংসার কিন্তু এমনি এমনি গড়ে ওঠে না; এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, সহনশীলতা এবং একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধার মাধ্যমে। তোমাকে এটা বুঝতে হবে।”

ভদ্রমহিলা একটু থামলেন। আমি মন দিয়ে উনার কথা শুনছি। উনার কথা শুনতে আমার ভালো লাগে। দারুণভাবে উনি সামান্য বিষয়কেও অসাধারণভাবে উপস্থাপন করেন। উনি আবার বললেন,
“দেখো নবনী, আমি জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে এইটুকু বুঝেছি—সংসার আসলে একটা ফুলের বাগানের মতো। প্রতিদিন একটু করে যত্ন না নিলে সেখানে আগাছা জন্মাতে দেরি হয় না। স্বামী হচ্ছে মেয়েদের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই সম্পদকে অবহেলা বা ঝগড়া দিয়ে নষ্ট কোরো না। দিনশেষে কিন্তু ক্ষতি তোমারই হবে। শোনো, ভালোবাসা দিয়ে যা আদায় করা যায়, তা ঝগড়া করে কোনোদিন হয় না। ও পুরুষ মানুষ, ওর উঁচু গলা আজ অবধি শুনলাম না আমি, অথচ তুমি মেয়ে মানুষ, তোমার গলার স্বর আশেপাশের সবাই চেনে। অদ্ভুত না! ও কি চাইলেই তোমার সাথে চিৎকার করতে পারে না?”

ভদ্রমহিলা আরও অনেক অনেক জ্ঞানের কথা বিতরণ করলেন। আমি শুনলাম মন দিয়ে। কোনো কথা বললাম না। যাবার আগে উনি বললেন,
“তুমি কিন্তু আর ঝগড়া করবে না মাহতাবের সাথে। আজ বাসায় ফিরলে হাসিমুখে কথা বলবে। বুঝেছো?”

আমি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলাম। বুঝালাম হাসিমুখেই কথা বলব। অশান্তি করব না আর। কিন্তু দেখা গেল আমি অশান্তি না করে থাকতে পারলাম না। চাপাস্বরে অশান্তি করলাম সেদিন। কারণ সে আসার কিছুসময় আগেই বাচ্চাটাকে ঘুম পাড়াচ্ছিলাম আমি। হঠাৎ সে এসে যাওয়ায় আমার ঘুমন্ত বাচ্চাটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। প্রাণভরে দেখতেও পেলাম না। আর তখন থেকে মাথায় তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করতে লাগলাম আমি। তীক্ষ্ণ এক ধরণের ব্যথায় আচ্ছন্ন হয়ে যেতে লাগল আমার পৃথিবী। মাহতাবকে খুব করে গালি দিলাম সেদিন। একপর্যায়ে তুই-তুকারি করে পরিস্থিতি করে তুললাম আরও জটিল। আশ্চর্য, আমার সব অন্যায় মেনে নিলেও মাহতাব তুই সম্বোধন মেনে নিতে পারল না। চাপা আক্রোশে আমার বাহু চেপে ধরে বলল,
“এই যে এতো ঝগড়াঝাটি করি দুজনে। বিবাহিত জীবনের এতো বছরে খুব রাগ করেও কখনো তোমাকে তুই বলে ডেকেছি আমি?”

তার কন্ঠস্বর খুব অচেনা ঠেকল। আমি বুঝতে পারি মানুষটা ভয়ংকর রেগে গিয়েছে। এতোবছরের বিবাহিত জীবনে এতোটা রাগ করতে তাকে কখনোই দেখিনি। আমি ভয় পেলাম। মাহতাবের এই রূপ বড্ড অচেনা লাগল আমার। আমি এই মাহতাবকে চিনি না। আমি যাকে চিনি, সে আমার উপর চিৎকার করতে পারে না। সে আমার হাত এতো জোরে চেপে ধরার এখতিয়ার রাখে না। তার লাল টকটকে চোখের দিকে তাকিয়ে আমি কেঁদে ফেললাম। মাহতাব আমার হাত ছেড়ে দিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। আমি তখন কাঁদলাম। ভীষণ করে কাঁদলাম। আমার কান্নায় ভিজে গেল বালিশ।

মানুষটা ঘরে ফিরল অনেক রাত করে। দরজা ভিড়িয়ে ঘর অন্ধকার করে আমি জানালা দিয়ে আকাশ পানে তাকিয়ে ছিলাম তখন। সে এসে গলা খাঁকারি দিল। অন্ধকারেও কীভাবে যেন টের পেল আমি বসে আছি জানালার ধারে। ভারিক্কি কন্ঠে বলল,
“ঘুমাওনি কেন?”

আমি জবাব দিলাম না। তার সন্ধ্যার ব্যবহার আমি ভুলতে পারি নি। আমার মনটা তীব্র অভিমানে দ্রবীভূত হয়ে আছে। তীব্র অভিমান প্রকাশের ভাষা থাকে না। তাই তো নির্লিপ্ত ভাব নিয়ে আমি বসে রইলাম নির্বিকার। মাহতাব এগিয়ে এসে বিছানায় পা তুলে আমার সামনে বসল। তার গা থেকে ভদভদ করে সিগারেটের গন্ধ আসছে। এই মানুষটা সিগারেট খেয়েছে? রাগে, ঘৃণায় আমার শরীর কাঁপতে লাগল। সিগারেটের গন্ধ আমার একদম সহ্য হয় না এটা সে জানে। তবুও? সে কাছে এগিয়ে আসায় আমি নাকে ওড়না চাপা দিলাম। তীব্র বিতৃষ্ণায় মুখ ঘুরিয়ে থাকলাম অন্যদিকে। মাহতাব জোরপূর্বক আমার হাত টেনে নিয়ে কোমল গলায় বলল,
“তখনকার ব্যবহারের জন্য সরি নবনী। আসলে আমার মাথা ঠিক ছিল না। তুই ডাকটা আমি সহ্য করতে পারি না। তুমি তো আমার বৌ, ভালোবাসি তোমায় আমি। তুমি আমাকে তুই করে ডেকেছো দেখে আমার মাথাটা হুট করে গরম হয়ে গিয়েছিল।”

আমি ছোট করে শ্বাস ফেলে বললাম,
“ওহ আচ্ছা।”
“দেখো নবনী, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হবে সম্মানের। সেখানে তুই ডাকটা মানায় না। যতই ঝগড়া হোক, ঝামেলা হোক তবুও তুমি প্লিজ কখনো তুই করে ডাকবে না আমায়।”
এই প্রসঙ্গে কথা বাড়ালাম না। বরং বললাম,
“তুমি সিগারেট খেয়েছো?”

সে লজ্জায় মাথা নত করে নিল। অন্ধকারের মাঝেও স্পষ্ট দেখলাম তার অপরাধীর মতো নামিয়ে নেওয়া মুখ। ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে তার দিকে ধরতেই আশ্চর্য হয়ে গেলাম। টকটকে লাল হয়ে আছে চোখ। বোঝা যাচ্ছে খুব কেঁদেছে। কিংবা সিগারেটের ধূম্রজালের কারণে জ্বলছে চোখ-মুখ। সিগারেটের গন্ধে আমার বমি বমি লাগছে। আমি করুণ গলায় বললাম,
“তুমি প্লিজ গোসল করে আসো। সিগারেটের গন্ধে আমার মাথা ঘুরছে।”

মাহতাব গোসল করে এল। এবং শুয়ে শুয়ে সারারাত এপাশ-ওপাশ করল সে। সকালে উঠে হঠাৎ বলল,
“ভাবছি তোমাকে একজন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যাব। এমন করে তো চলতে পারে না!”
আমি অবাক হয়ে বললাম,
“কেন? পাগলের ডাক্তারের কাছে গিয়ে আমার কী কাজ? আমি কি পাগল?”
সে কিছু বলল না। তবে চোখ-মুখ দেখে ধারণা করলাম সে আমাকে সত্যিকার অর্থেই পাগল ভাবছে। আচ্ছা, আমি কি সত্যি সত্যিই পাগল হয়ে যাচ্ছি? ভাবতে গিয়েই মাথায় তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করলাম। আমার সমস্ত বোধ অসাড় হয়ে গেল। লোপ পেতে থাকে স্বাভাবিক চিন্তাভাবনার ক্ষমতা। আমার জগৎ জুড়ে ঘুরে বেড়ায় একটা বাচ্চা। গোলগাল চেহারার সুন্দর একটা বাচ্চা।

পরবর্তী কয়েকদিন মাহতাব খুব চেষ্টা করল আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার। কিন্তু আমি তো পাগল নই। কেন যাব পাগলের ডাক্তারের কাছে? বরং মাহতাব আমাকে পাগলের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চায় ভেবেই আমার কান্না পায়। শেষ অবধি আমাকে পাগল প্রমাণের জন্য এমন উঠেপড়ে লাগল মাহতাব? অবশ্য লাগবেই তো! আমাকে পাগল প্রমাণ করে কোনোভাবে দায়মুক্ত হতে পারলেই তো আবার বিয়ে করতে পারবে সে। তীব্র আর প্রচন্ড একটা দম বন্ধ করা অনুভূতি বয়ে চলে আমার বুক জুড়ে। কী করব, কোথায় যাব? আমার ভবিষ্যৎ কী ভেবেই অস্থির হই। আর সংসারে বাধাই অশান্তি।

পনেরো দিন কেটে যাবার পরেও যখন পিরিয়ড হলো না, তখন মাহতাব চিন্তায় পড়ে গেল। আমাকে আবার নিয়ে যেতে চাইল ডাক্তারের কাছে। কিন্তু আমার ভয় হলো, ভুলিয়ে মিথ্যে বলে সে যদি আমাকে পাগলের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়? আমি ডাক্তারের কাছে যাবার প্রসঙ্গে নিমরাজি হলাম। শত চেষ্টা করেও মাহতাব আমার সংকল্পে কিঞ্চিৎ ফাটল ধরাতে পারল না। বুঝাতে পারল না, আমাকে নিয়ে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নয়, গাইনি চিকিৎসকের কাছে যাবে সে।

তবে মাহতাব নিজেও তো রক্তে-মাংসে গড়া মানুষ। তারও তো ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। একদিন প্রচন্ড ঝগড়ার পর আমার অপ্রকৃতিস্থ অবস্থা দেখে আমাকে মায়ের কাছে রেখে গেল সে। এছাড়াও আরেকটা কারণ বোধহয় ছিল। কোনো এক বজ্জাত পাগলের ডাক্তার সব শুনে তাকে বলেছে,
“আপনার স্ত্রীর থেকে কয়েকদিন দূরত্ব বজায় রাখুন আপনি। দেখুন তার মানসিক অবস্থা কী হয়। হতে পারে একা একা থাকার কারণে ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছেন। উনাকে সবসময় লোকসমাগমের মাঝে রাখা দরকার।”

মাহতাব আমাকে রেখে চলে গেল। এখানে আমার খুব সমস্যা হয়েছে। বাড়ি ভর্তি লোকজন। আমার তিন চাচার পাশাপাশি বাড়ি। সুতরাং জায়গা সংকুলান থাকলেও মানুষের সংকট নেই। সারাদিন বাচ্চাকাচ্চা-র ক্যাঁচক্যাচ। আমার এসব বাচ্চাকে ভালো লাগে না। আমার ভালো লাগে নিজের ওই সোনা বাচ্চাকে। অথচ তাকে দেখতে পাই না আমি। ওই যে বললাম, খুব যখন একা থাকি তখন সে আসে। এখানে একা থাকার পরিবেশ কোথায়? তাছাড়া আরেক যন্ত্রণা হয়েছে আমার। আমি কিছুই খেতে পারি না। শুধু লেবু আর মরিচ দিয়ে পান্তা ভাত খাই। চেহারা শুকিয়ে শেষ। নিয়মিত ডাক্তারের ওষুধ খাবার পরেও আমার পিরিয়ড হচ্ছে না দেখে মা আবার ভালো বড় ডাক্তার দেখাবেন বলে ভাবলেন। এদিকে কোরবানির ঈদ আসন্ন। জেলা শহরের বড় গাইনি ডাক্তারের সিরিয়াল পাওয়া গেল ঈদের পর। আমি সন্দেহের সুরে মাকে ডেকে বললাম,
“আচ্ছা মা, তুমিও আমাকে মিথ্যে বলে পাগলের ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাবে না তো!”
মা কঠিন মুখে জবাব দিল, “পাগলের ডাক্তার কেন দেখাব, তুই কি পাগল? আশ্চর্য! আর শোন, আজকে জামাই আসবে। ওর শ্বশুরবাড়ি গিয়ে ঈদ করবি।”

আমি বাধ্য মেয়ের মতো মেনে নিলাম। এবং ওর অফিস ঈদের ছুটি হবার দিনেই চলে গেলাম শ্বশুরের ভিটেতে ঈদ করতে। কিন্তু আনন্দের ঈদ তো সকলের জন্য আনন্দ বয়ে আনে না, কারো কারো জন্য বয়ে আনে বিষাদ!

—চলমান—

নীল ধ্রুবতারা পর্ব-০৮

#নীল_ধ্রুবতারা [৮]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

“তোমায় দেখতে দেখতে আমি,
যেন অন্ধ হয়ে যাই।
দুনিয়াতে তুমি ছাড়া,
কিছু দেখার তো আর নাই।”

গোসল সেরে বের হয়ে ওয়াশরুমের দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়াল মাহতাব। গুনগুনিয়ে গাইতে লাগল প্রিয় গানটি। আয়নায় তার প্রতিবিম্ব দেখে আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। ওর মুগ্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলাম। বুকে হাত দিয়ে মাহতাব বলে উঠল,
“এমন করে হেসো না, নবনী। তোমার হাসি যে আমার মরণাস্ত্র।”

এই লোকটা বরাবর অতিরিক্ত প্রশংসা করে। কখনো যদি সামান্য মাথায় ঘোমটা দিয়েও তার সামনে গিয়ে দাঁড়াই, সে বলবে,
“কী আশ্চর্য, আজ তোমাকে এতো সুন্দর লাগছে কেন, নবনী?”

আমি কৃত্রিম অভিমান করে বলি,
“শুধু আজ লাগছে? অন্য সময় লাগে না?”
“সবসময় লাগে।”— দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দেয় সে।

কোনো খাবার রান্না করলে প্রশংসায় ভাসায় আমাকে। এমন একটা ভাব করে যেন এতো সুস্বাদু খাবার সে জীবনেও খায়নি। কে জানে— এটা হয়তো আমাকে খুশি করার একটা টেকনিক। তার এই অতিরিক্ত প্রশংসা শুনে আমি ফুলে-ফেঁপে বেলুন হয়ে যাই। আজও হলাম। এগিয়ে গিয়ে তার সদ্য মেদ জমতে থাকা পেটে একটু গুতো দিয়ে কপাল কুঁচকে শুধালাম,
“সারাক্ষণ ফ্লার্টিং! আমাকে পটানোর জন্য এতো পাম দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি তোমার বিয়ে করা বউ।”
“আমি তোমাকে পাম দেই? এটাই মনে হয় তোমার?”

মাহতাব ভারী বিস্মিত হয়। যেন এমন মিথ্যে দোষারোপ শুনে সে খুবই মর্মাহত হয়েছে। আমি হতাশ হয়ে তার কাঁধের তোয়ালে কেড়ে নিয়ে বারান্দায় চলে গেলাম। দড়িতে ভেজা তোয়ালে মেলে দিয়ে ফিরে আসার সময় টের পেলাম মাহতাব আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার উন্মুক্ত বুকে ধাক্কা খেলাম আমি। নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম,
“ভূতের মতো চুপিচুপি পেছনে এসে দাঁড়িয়ে আছো কেন? চলো, খাবে চলো।”

মাহতাব আমাকে কায়দা করে ঘুরিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। নাক ডুবাল আমার ঘাড়ে। তার উষ্ণ নিশ্বাস তোলপাড় তুলল আমার বুকে। ফিসফিস করে বললাম,
“কী করছ, কেউ দেখে ফেলবে।”
“কেউ দেখবে না। আর দেখলেই বা কী? আমি আমার বউকে জড়িয়ে ধরেছি। তাতে কার কী?”

চারদিকে গাঢ় অন্ধকার নেমেছে বহু আগে। দেখাদেখির কোনো বিষয় নেই। তবুও আমি করুণ গলায় বললাম,
“ছাড়ো।”
“কেন ছাড়ব? ছাড়ার জন্য ধরেছি নাকি?”
“তোমার না খিদে পেয়েছে। এসো, ভাত দিই।”
“যার বউ রাত দুপুরে পরী সেজে বসে থাকে, তার খিদে ভাতে মিটে না।”

আমি জোর দিয়ে ওর হাত ছাড়িয়ে নিলাম। ঘুরে দাঁড়িয়ে নাক টেনে দিয়ে বললাম,
“কিসে মিটে তবে?”
“বোঝো না?”
“না।”
“ঘরে চলো, বুঝাচ্ছি।”
মানুষটা আমাকে কোলে তুলে নিল। আকস্মিক আক্রমণে আমি আঁতকে উঠে বললাম,
“আরে, পড়ে যাব তো!”

মানুষটা আমাকে পড়ে যাওয়ার সুযোগ দিল না। সেই রাতে খুব করে ভালোবাসল সে আমায়। রাতের খাওয়ার চিন্তা বেমালুম ভুলে গিয়ে মত্ত হলো আমাতে। মধুর মিলন শেষে তার বুকে মাথা রেখে আহ্লাদী গলায় বললাম,
“আচ্ছা, একটা সত্যি কথা বলবে?”
“আমি কি তোমাকে কখনো মিথ্যে কথা বলি?”
“না, বলো না। কিন্তু আজ খুব সত্যি করে একটা কথা বলো তো…”

মাহতাব কান খাড়া করে রইল। আমি আলতো হাতে আঁচড় কাটতে লাগলাম তার বুকে। কথাটা কীভাবে গুছিয়ে বলা যায়, সেটাই ভাবতে লাগলাম। মাহতাব আমার মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বলল,
“চুপ করে আছো কেন? বলো, কী জানতে চাইছ?”

আমি শুকনো ঢোক গিললাম। অন্ধকারে আমার চোখ ছলছল করে উঠল। বিড়বিড় করে বললাম,
“আচ্ছা, আমার যদি বাচ্চা না হয়, তবে কি তুমি আরেকটা বিয়ে করবে?”

মাহতাব তার বুক থেকে আমাকে সরিয়ে দিল। তার দিকে তাকিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে রইলাম আমি। সে দুই হাতে আমার গাল চেপে ধরে আক্রোশ নিয়ে বলল,
“পাগলের মতো কথা বলছ কেন, নবনী? বাচ্চা না হলে আমি আবার বিয়ে করব কেন? একটা সংসারে বাচ্চাই কি সব? আল্লাহ যদি আমাদের বাচ্চা না দিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন, তবে তাই সই। আল্লাহ তায়ালার পরিকল্পনার ওপর অখুশি হবার তুমি-আমি কে? এসব আজাইরা কথা ভেবো না। এই যে আমি তোমাকে এতো ভালোবাসি, তুমি আমায় ভালোবাসো—এসব কি কিছুই নয়?”

আমি চুপ করে রইলাম। মাহতাব গাল ছেড়ে কপালের এলোমেলো চুল সরিয়ে দিল। করুণ গলায় জানতে চাইল,
“নবনী, আমাদের এতো ভালোবাসার পরেও কি একটা সংসার পূর্ণতা পায় না? এই ভালোবাসা নিয়ে আমরা কাটিয়ে দিতে পারি না গোটা জীবন?”

আমি নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলাম। এই মানুষটার সাথে গোটা জীবন কাটিয়ে দেওয়ার মতো সৌভাগ্যের আর কী-ই বা আছে? সে আমাকে যতটা ভালোবাসে, এতো ভালো আর কেউ কখনোই বাসে নি। তবুও আমার ভয় লাগে। সেই ভয় থেকেই চোখের কোণ বেয়ে নামে অসহায়ত্বের অশ্রু।

আমার কান্না দেখে হতাশ হলো মাহতাব। বলল, “বোকার মতো কাঁদছ কেন? এই কান্না যদি বাচ্চার জন্য হয়, তাহলে বলব—বিয়ের এতোদিন পরেও তুমি এখনো আমাকে চিনতে পারোনি, নবনী।”

আমার কান্না বাড়ল। তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হেঁচকি তুলে কাঁদতে লাগলাম। মাহতাব আমাকে আগলে নিয়ে সান্ত্বনা দিল,
“শোনো, বাচ্চা হচ্ছে আল্লাহর দেওয়া আমানত। এখন আমার মালিক যদি আমাকে সেই আমানত না দিয়ে খুশি থাকেন, তবে আমাদের কি উচিত নয় ভাগ্যকে মেনে নেওয়া? তুমি জানো, আমার দূরসম্পর্কের এক আপুর বিয়ের বিশ বছর পর বাচ্চা হয়েছে। উনি একটা মেয়েকে দত্তক নিয়েছিলেন। সেই মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার পর, যখন মেয়ের বাচ্চা হবে, তখন দেখা গেল এতো বছর পর উনিও প্রেগন্যান্ট। তাহলে বোঝো, আল্লাহর বিচার কত চমৎকার!”

মাহতাব আরও অনেক হাদিস, কুরআনের কথা বলল। নিজের জানা এমন অনেক ঘটনার বিস্তারিত জানাল আমাকে। শেষে আমাকে এটা বলেও আশ্বস্ত করল যে—সিস্ট থাকলেও বাচ্চা হয়। শুধু নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন করা প্রয়োজন। তার এসব ছেলেভুলানো কথায় অবশ্য আমার হৃদয় তৃপ্ত হলো না। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়লাম আমি। এবং ঘুমের ঘোরে অদ্ভুত সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখলাম।

একটা ফুটফুটে বাচ্চা আমার কোলে বসে আছে। বাচ্চাটা ছেলে না মেয়ে বোঝা যাচ্ছে না। সে খুব হাসছে। কী যে সুন্দর হাসি! মায়াবী মুখ। গোল গোল চোখ। সেই চোখ চকচক করছে খুশিতে। আমার এতো ভালো লাগল বাচ্চাটাকে। আমি তাকে খুব করে আদর করলাম। স্বপ্নে মনে হলো এটা আমারই বাচ্চা। আমি নিজের বাচ্চার গালে অসংখ্য চুমু খেলাম। চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিলাম তার ছোট্ট মুখ। অনেকক্ষণ খেলার পরে বাচ্চাটা কাঁদতে লাগল। আমি তাকে কোলে তুলে নিয়ে ঘরময় হাঁটতে লাগলাম। একসময় তার কান্না থামল। আমি নিঃশব্দে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিলাম।

“বউ!”
আমার ঘুম ভাঙল মাহতাবের ডাকে। ঘুম ভাঙলেও ঘোর কাটল না আমার। মাহতাবের ‘বউ’ ডাকে মেজাজ হারালাম হঠাৎ। কঠিন চোখে তাকিয়ে মুখ চেপে ধরে চাপা স্বরে বললাম,
“হুশ! দেখছ না, বাবু ঘুমাচ্ছে। একদম শব্দ করবে না।”

সে অবাক হয়ে গেল আমার ব্যবহারে। অবশ্য পরপরই নিজেকে সামলে নিলাম আমি। খেয়াল করলাম—মসজিদের মাইকে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ভেসে আসছে নামাজের আহ্বান। তার মানে ভোর হয়ে এসেছে। শুনেছি ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়। যদিও আমার এই স্বপ্নটা সত্যি হওয়ার নয়। ইশ! আফসোসের অনলে দ্রবীভূত হলো আমার মন।

মাহতাব বলল,
“স্বপ্ন দেখছিলে নাকি?”
“হুঁ।”
আমি মাথা ঝাঁকালাম। আমার জীবনে এই স্বপ্নটা ভয়ংকর সুন্দর। ইশ! এমন সুন্দর স্বপ্ন যদি রোজ দেখতে পেতাম। গোসল করে মাহতাব নামাজে চলে গেল। আমিও গোসল সেরে এসে চা বানালাম। রান্না করলাম। এরপর স্বাভাবিক নিয়মে দিনের কাজকর্ম গুছিয়ে নিলাম আমি। মাহতাব অফিসে চলে গেলে অখণ্ড অবসর নিয়ে ভাবতে বসলাম। ভাবতে লাগলাম আমাদের প্রেম থেকে বিয়ের ঘটনাগুলো। মাহতাব আমাকে প্রথম সাক্ষাতের দিন কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। অথচ আমি ভেবেছিলাম সে বোধহয় হাঁটু মুড়ে বসে আমাকে গোলাপফুল বাড়িয়ে দিয়ে বলবে,
“নবনী, আই লাভ ইউ। ডু ইউ লাভ মি?”

কিন্তু সে দাঁড়িয়ে থেকে ফুল বাড়িয়ে দিয়ে ফটাফট বলে দিল, “আই লাভ ইউ।”

তার গলা কাঁপল। দৃষ্টি এলোমেলো হলো। আশ্চর্য! কথাটা বলার সময় সে একটা বার আমার দিকে চোখ তুলে তাকাল না। তার চোখ ঘুরে বেড়াচ্ছিল দূরের সুপারি গাছ, উড়ন্ত পাখি, দূরের পাঁচতলা বিল্ডিং ইত্যাদি ইত্যাদিতে। তখন আমার মনে হলো, ইশ! কী গাধা ছেলের প্রেমেই না পড়েছি। গাধা ছেলের আমাকে প্রেম নিবেদনের মাঝেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামতে শুরু করল। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই বৃষ্টি। ঝকঝকে সূর্যের আলো সরে গিয়ে হঠাৎ আকাশ ঢেকে গেল কালো মেঘে। আমাদের ভালোবাসা-বাসির দৃশ্য বদলে গেল তখন। দুজনে প্রাণপণে ছুটতে লাগলাম আমরা। দিঘির মাঝে যে সুন্দর ছাতাটা আছে, তার নিচেই দৌড়ে গিয়ে দাঁড়ালাম। মাহতাব অপূর্ব ব্যবস্থা দেখে বিড়বিড় করে বলল,
“বাহ, এটা খুব দারুণ তো!”

বলতে বলতে সে অপার মুগ্ধতা নিয়ে চারপাশে দেখতে লাগল। আমি এক দৃষ্টিতে অন্যমনস্ক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আকাশ থেকে রুপোলি সুতোর মতো টিপটিপ করে বৃষ্টি নামছে। বিরামহীন বৃষ্টি। আমরা দুজনে একসাথে দাঁড়িয়ে অনেকটা সময় বৃষ্টি দেখলাম। কোনো কথা বললাম না। আমি বোধহয় বৃষ্টি নয়, এক নজরে পলক না ফেলে তাকেই দেখছিলাম। আর অনুভব করছিলাম অসম্ভব সুপুরুষ একজন মানুষের সাথে আমার প্রেম হয়েছে।
সুদর্শন পুরুষটি একসময় আমাকে বলল,
“তোমার হাতটা দেবে, নবনী?”

তার এই আবদার শুনে আমার শরীর ঝিমঝিম করে উঠল। সে আমার হাত ধরতে চাইছে? কী আশ্চর্য কথা! জীবনে কখনো পুরুষের সংস্পর্শে না যাওয়া আমি ভীষণ দ্বিধায় পড়ে গেলাম। নিজের হাত দুটো পেছনে লুকিয়ে দুপাশে মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানালাম। সে অনুরোধের স্বরে বলল,
“প্লিজ দাও।”

আমি আরও গুটিয়ে নিলাম নিজেকে। পিছিয়ে গেলাম দু কদম। মানুষটা আমার দিকে দু কদম এগিয়ে এল। তীব্র অধিকারবোধ থেকে আমার হাত টেনে নিয়ে পকেট থেকে আঙটি বের করে পরিয়ে দিল অনামিকায়। আমি এক ঝটকায় নিজের হাত সরিয়ে নিতে পারলাম না। আমার সমস্ত বোধ, শক্তি অসাড় হয়ে গিয়েছে। আমি টের পাচ্ছি, যতটা সাহস নিয়ে উনি আমার হাত ধরেছিলেন, সেই সাহস কর্পূরের মতো উবে গিয়েছে আকাশে। তিরতির করে তার হাত কাঁপছে। আমার তখন খুব হাসি পেল। ফিক করে হেসে দিয়ে বললাম,
“ওরে আমার সাহসী রে! এমন ইঁদুরের কলিজা নিয়ে প্রেম করলেন কীভাবে আপনি?”

মানুষটার সাথে সেই আমার বাস্তবে বলা প্রথম কথা। মেসেজে সারাক্ষণ ‘তুমি’ বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলা আমি, ‘আপনি’ বলেই সম্ভোধন করেছিলাম তাকে। আমার কথা শুনে লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিয়েছিল সে। আমতা আমতা করে বলছিল,
“আসলে নার্ভাস লাগছে খুব।”
“আমারও।”
সে আমার কথা শুনে মুচকি হাসল। আমি তার হাসি দেখে অভিভূত হয়ে গেলাম। মানুষটা কি জানে হাসলে তাকে কতটা সুন্দর লাগে? সে কি জানে—তার হাসি দেখে একটা রমণীর হৃদস্পন্দন থমকে গিয়েছে? এবং সে একজন ভয়ানক সুপুরুষ! জানে মানুষটা? কী ভীষণ রূপবান সে!

আমি তার দিকে নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে রইলাম। আমার এই উনিশ বছরের জীবনে এমন সুদর্শন পুরুষ কখনোই দেখিনি আমি। একসময় সে বলল,
“তারপর বলো, কেমন আছো?”
“ভালো। আপনি?”
“আগে শুধু ভালো ছিলাম। এখন খুব বেশি ভালো আছি।”
“কেন? বেশি ভালো কেন?”
“কারণ নবনী নামের এক সুন্দরী মেয়ের সাথে আজ আমার দেখা হয়েছে। তাকে দেখার পর থেকে আমি ভীষণ ভীষণ ভালো আছি।”

আমার ভীষণ লজ্জা লাগল। আমি সুন্দরী নই। তবুও মানুষটা কেমন গর্বের সহিত ‘সুন্দরী’ দাবি করছে আমাকে! যেন আমি বিশ্বসুন্দরী। আচ্ছা, এই মানুষটা এতো ভালো কেন? কেন এতো ভালো সে? আমার খুব কাঁদতে মন চাইল। সুখের কান্না। নিজের হাতের চিকন সোনার আঙটির দিকে আমি একমনে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। অতঃপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেটা খুলতে খুলতে তাকে বললাম,
“এটা আমি নিতে পারব না, মাহতাব। আপনি এটা নিজের কাছে রাখুন।”

মাহতাব আঙটিটা নিল না। মর্মাহত হয়ে জানতে চাইল, “কেন?”
“কারণ, মা আমার হাতে আঙটি দেখলে সন্দেহ করবে। এটা আবার স্বর্ণের আঙটি। আমাকে জিন্দা দেখতে চাইলে এইটা আপনি সাথে নিয়ে যান।”

মাহতাব জোর দিয়ে বলল,
“আমি এটা তোমার জন্য এনেছি। তিন মাসের স্যালারি থেকে অল্প অল্প টাকা জমিয়ে কিনেছি আঙটিটা। প্লিজ ফিরিয়ে দিও না।”

অনেক জোরজবরদস্তি করেও আমি তাকে হারাতে পারলাম না। শেষ অবধি এই আঙটির সৎগতি করলাম বান্ধবীর কাছে গচ্ছিত রেখে। সে লুকিয়ে রাখল তার বাড়িতে নিয়ে। তার আরও অনেক দিন পরে সেটা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বললাম,
“মা, একটা আঙটি পেয়েছি। দেখো তো এটা স্বর্ণের কিনা!”

মা হাতে নিয়ে দেখেছিলেন। জিজ্ঞেস করেছিলেন কোথায় পেয়েছি। আরও অনেক জেরার পরেও যখন সন্দেহের অবকাশ রইল না, তখন স্বর্ণের আঙটি বলেই ঘোষণা দিলেন। এবং যেহেতু এটা কুড়িয়ে পেয়েছি আমি, সেহেতু এই বস্তুর আসল উত্তরাধিকারীও আমি। আঙটিটা সেভাবেই হস্তগত হয়েছিল আমার।

যা ভাবছিলাম—সেদিন বৃষ্টিভেজা দুপুরে হুড়তোলা রিকশায় সারা শহর ঘুরেছিলাম আমরা। বসেছিলাম নামী-দামী রেস্টুরেন্টে। অবশ্য কাবাবের মাঝে হাড্ডি হয়েছিল আমার প্রিয় বান্ধবী। একা একা একটা ছেলের সাথে ঘুরে বেড়ানোর সাহস আমার কোনো কালেই ছিল না। সেদিন আমাদের আরও অনেক মধুর আলাপ হয়েছিল। হাস্যরসের সাথে সুন্দর সময় কাটিয়েছিলাম তিনজন। এরপর সন্ধ্যার ঠিক আগে বিষণ্ণ মনে সে বিদায় নিয়েছিল আমার থেকে। আমার শহর থেকে। দিনের আলো মিলিয়ে গিয়ে ধরণীতে যখন আয়োজন করে সন্ধ্যা নামছে, তখন মাহতাবকে বিদায় দেওয়ার উদ্দেশ্যে আমরা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি। সে এখন চলে যাবে! সারাদিনের এতো মধুর ঘটনাগুলো কেবলই স্মৃতি হয়ে রবে আমার মনে। এই পৃথিবী কী ভীষণ নিষ্ঠুর! যে পৃথিবীতে মাহতাব নেই, সেই পৃথিবী কী ভীষণ জঘন্য!
মানুষটার দিকে তাকিয়ে আমার বুকটা হু হু করে উঠল। মনে মনে হাজারবার তাকে প্রশ্ন করলাম, কেন এলে মাহতাব? কেনই বা চলে যাচ্ছো? আমাকে এতো কষ্ট দেওয়ার কী-ই বা প্রয়োজন ছিল? সে শুনল না আমার প্রশ্ন। বরং অতলান্ত বিষাদের ছায়া মুখে মেখে এগিয়ে এল আমার দিকে। চোখের চপল চাহনি মিলিয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগে। সেথায় বাসা বেঁধেছে এক পৃথিবী বিষাদ। তার ওই আর্দ্র চোখের দিকে তাকিয়ে আমার বড় মায়া হলো। চোখের জলকে বাঁধন দেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলাম আমি। মাহতাব ভেজা কণ্ঠে, নিচু স্বরে শুধাল,
“আবার কবে দেখা হবে, নবনী?”

তার কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়া নিবিড় আকুলতা আমার বুকের ভেতরে তীক্ষ্ণ তীরের মতো বিঁধল। মনে হলো মরণবাণ কেউ ছুঁড়ে দিয়েছে আমার হৃদয়ে। চোখের কোণায় এসে জমা হয়েছে এক পৃথিবী কান্না। কিন্তু এখন আমি কাঁদলে মাহতাবও যে কেঁদে ফেলবে। ভরা বাজারে পুরুষের কান্নার মতো লজ্জার দৃশ্যের অবতারণা করতে পারি না আমি। নিজের ভেতরের সবটুকু হাহাকার এক ম্লান, করুণ হাসির আড়ালে চেপে রেখে নির্লিপ্ত গলায় বললাম,
“তুমি যখন চাইবে…”

কথাটা বলেই চোখ নামিয়ে নিলাম। এর বেশি কিছু বলার অধিকার বা শক্তি—কোনোটাই তখন আমার ছিল না। আমি তাকে চাইলেও বলতে পারতাম না, ‘আরেকটু থেকে যাও!’ কিংবা, ‘যেও না, মাহতাব।’ সেই অধিকারটুকু পেতে আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরও কিছু মাস।
সেই বিদায়ের লগ্নে মাহতাব আর একটি কথাও বলেনি। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, নিজের বিষণ্ণ অবয়বটা টেনে নিয়ে সে বাসের দিকে পা বাড়িয়েছিল। আমিও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম এক মহাসমুদ্র শূন্যতা বুকে নিয়ে। দূরপাল্লার বাসটা আমার প্রিয় পুরুষকে বুকে টেনে নিয়ে ছেড়ে গেল আমার শহর। আচ্ছা, আমি কেন বাস হলাম না? কেন হলাম না, প্রিয় মানুষ বুকে নিয়ে বেড়ানো যান?

—চলমান—

নীল ধ্রুবতারা পর্ব-০৭

#নীল_ধ্রুবতারা [৭]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

মাহতাব মসজিদ থেকে ফেরার আগেই আমি চা বসালাম। আজ অনেক দিন পরে মাহতাবের জন্য তার প্রিয় আদা দিয়ে লিকার চা বানালাম। পিরিচের এক পাশে দিলাম দুটো নোনতা বিস্কুট। স্বাস্থ্যসচেতন স্বামী আমার। নিজের রাজকীয় ভুঁড়ি নিয়ে বড্ড বিপাকে পড়েছেন বেশ। এমনিতে ভদ্রলোকের শরীরে মেদ নেই। কিন্তু বেশ কয়েক মাস ধরে পেটের দিকটা সামান্য উঁচু হয়ে উঠেছে। বোঝা যায় না। তবে আমি তাকে এই সমস্যাটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিই। তখন তার মন্তব্য থাকে—
“ভুঁড়ি হচ্ছে রাজা-বাদশাহদের প্রতীক। সিক্স প্যাক থাকে প্রহরীদের। রাজা-বাদশাহদের সিক্স প্যাক থাকে না, বোকা।”

আমি অবাক হয়ে তার যুক্তির বাহার দেখি। অতঃপর শরীর দুলিয়ে হেসে ফেলি। আমার হাসি দেখে সে গম্ভীর হয়। বলে,
“এমন করে হাসছ কেন?”
“কেন, হাসলে কী সমস্যা?”
“অনেক সমস্যা।”
“আমি তো তাহলে আরও বেশি করে হাসব।”

বলেই আমি আরও খিলখিল করে হাসি। উনি চোখ-মুখ কঠিন করে বলেন,
“ইস! কী বিশ্রী হাসি তোমার। দেখলেই প্রেমে পড়ে যেতে ইচ্ছে করে।”
আমি সলজ্জ হেসে বলি,
“বহু আগেই তো পড়েছ।”
ভদ্রলোক আমার কাছাকাছি এগিয়ে এসে মুচকি হেসে বলেন,
“রোজ নতুন করে আবার প্রেমে পড়ছি।”
“তাহলে বলতে হয়, তোমার চরিত্রে সমস্যা দেখা দিয়েছে। এটা খুবই খারাপ লক্ষণ। বুঝলে?”
“বুঝলাম।”

আমার দেওয়া অপবাদ মাথা পেতে নেন ভদ্রলোক। তার মহানুভবতায় মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। মেনে নিয়ে আরও একটু কাছে এগিয়ে আসেন। চোখে চোখ রেখে গাঢ় স্বরে বলেন,
“নবনী, তুমি বড্ড জ্বালাও আমায়।”
“বেশ করি।”
“আমি তোমার একমাত্র স্বামী। আমাকে এভাবে জ্বালাতন করা কি ঠিক?”
আমার আর জবাব দেওয়ার পরিস্থিতি থাকে না। হাসি কেবল। অতঃপর গভীর চুম্বনের আবেশে বুজে আসে চোখ। মানুষটা আমাকে যত্ন করে টেনে নেয় কাছে। আলতো আদর আর দুষ্টুমিতে সুন্দর হয়ে ওঠে আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত।

চা বানিয়ে মানুষটার অপেক্ষা করতে করতে সুখস্মৃতি কল্পনা করতে থাকি আমি। যখন অনুভব করি অনেক বেলা হয়েছে, তখন সচকিত হয়ে আশেপাশে তাকাই। ফোন হাতে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে সময় দেখি। একি! বেলা তো অনেক হলো! মাহতাব কোথায়? মাহতাবের অফিস টাইম শুরু হয়েছে আরও ঘণ্টাখানেক আগে। নামাজ পড়তে মসজিদে গিয়ে আর বাসায় এল না সে? কিন্তু কেন? রাতের ঝগড়াঝাটির কারণে? আমি চিন্তায় অস্থির হয়ে একের পর এক কল দিতে থাকলাম তার নম্বরে। কিন্তু সে ধরল না। আমি হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারে ক্রমাগত মেসেজ করলাম তাকে। সে সিন করে রেখে দিল।
এক প্রহর অপেক্ষায় কাটানোর পর মাহতাবের কল এল দুপুরে। রিসিভ করতেই গম্ভীর গলায় বলল,
“কল দিয়েছিলে?”
“হুঁ।”
“কেন?”
“কেন মানে কী? আমি তোমায় কল দিতে পারি না?”
“পারো, অবশ্যই পারো। কিন্তু তোমার যা মেজাজ! তাই…”

তার গলার স্বর বড্ড অচেনা লাগে আমার। কঠিন গলায় জানতে চাই—
“তাই কী?”
“অবাক হলাম কল দিয়েছ দেখে।”
“তুমি আমার সাথে এমন রূঢ়ভাবে কথা বলছ কেন?”

আমার অপ্রস্তুত ভঙ্গিমায় করা প্রশ্ন শুনে সে বোধহয় অবাক হলো। বিস্মিত কণ্ঠে ভেসে এল—
“আমি রূঢ়ভাবে কথা বলছি?”
আমি কঠিন গলায় বললাম,
“হ্যাঁ, বলছ। বাই দ্য ওয়ে, এখন কোথায় তুমি?”
“অফিসে।”
“অফিসে! অফিসে মানেটা কী? তুমি তো সকালে নামাজে গিয়েছিলে, সেখান থেকে অফিসে গেলে কী করে?”
“যেভাবেই আসি। সেটা জেনে তুমি কী করবে? গতকাল রাতেই তো বলেছ, আমাকে তোমার সহ্য হয় না।”

নিজের এহেন কথায় অপরাধবোধ হলো আমার। রাগের মাথায় ভালোবাসার মানুষকে এত বড় কথাটা বলা উচিত হয়নি। বড্ড ভুল হয়ে গেল। আমি তাকে সরি বলতে যাব, তখনই সে বলল,
“অসহ্য আমিটা তোমার আশেপাশে না ঘেঁষার চেষ্টা করছি। তোমাকে কষ্ট দেওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। তুমি ভালো না বাসলে কী হবে? আমি তো বাসি।”

আমি তখন সশব্দে কেঁদে উঠলাম। আমার প্রিয় পুরুষ এত কঠিন করে আমার সাথে কথা বলতে পারে? কী আশ্চর্য! এমন অপরিচিতের ভঙ্গিতে মাহতাব কখনো আমার সাথে কথা বলেনি। আমার হেঁচকি তুলে কান্নার শব্দে মাহতাব অস্থির হয়ে উঠল। এতক্ষণ ধরে বহু কষ্টে যেই কঠিন খোলস গায়ে জড়িয়ে রেখেছিল, সেটা খুলে গেল দমকা হাওয়ায়। ব্যস্ত হয়ে শুধাল,
“এই নবনী, কাঁদছ কেন? কী হয়েছে তোমার?”
আমি জবাব দিলাম না। কেনই বা দেব? যেই মানুষটা আমাকে কিঞ্চিৎ পরিমাণ আঘাত দিয়ে কথা বলে না, সেই মানুষটা আমাকে কঠিন কথা বলেছে ভেবেই— আমার অভিমানী মন নিশ্চুপ রইল। মাহতাব অপরাধীর স্বরে বলল,
“আচ্ছা, সরি। আমার ভুল হয়েছে। প্লিজ নবনী, কেঁদো না। তুমি কাঁদলে আমার কষ্ট হয়। সেটা তুমি জানো না?”

আমি জানি। খুব জানি। কিন্তু তার এই আহ্লাদি ধরনের কথাবার্তা আমার সহ্য হলো না। এই বিষয়ে বললাম না কিছুই। বরং কাঁদো কাঁদো কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব কঠিন করে বললাম,
“তুমি এক্ষুনি বাসায় এসো। এক্ষুনি মানে এক্ষুনি।”
“আচ্ছা, দেখছি।”

বলেই মাহতাব কল কেটে দিল। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম তার ফেরার। সারাদিন অপেক্ষার পরেও সে এল না। সন্ধ্যার সময় বিষণ্ণ মনে বিছানায় শুয়ে রইলাম আমি। ঘরের লাইট বন্ধ। অন্ধকার ভীষণ ভালো লাগে আমার। মন চায় আজন্মকাল ধরে আঁধারের সাথে সম্পর্ক করে মুখ ফিরিয়ে নিই আলোর থেকে। আমার জীবনে এমনিতেও তো কোনো আলো নেই। এই নিদারুণ অন্ধকারে বসে একটা বিষয় খেয়াল করেছি— মা হতে পারব না এই সংবাদটা শোনার পর থেকে যখন খুব একা থাকি, তখনই আমার গাঢ় মন খারাপ হয়। কোনো মানুষের সাথে থাকলে মন খারাপ কিছুটা কমে। তবে সেই মানুষটা আমার ঘরের ভদ্রলোক নয়। তাকে দেখলেই কেন যেন ঝগড়া করতে ইচ্ছে করে আমার। আজ সেই ইচ্ছে হলো না।

ভরসন্ধ্যায় অন্ধকারে শুয়ে থেকে আমার মনে হলো— আজ বহুদিন ভদ্রলোক আমাকে ভালোবাসেন না, আদর করেন না। আমি বহুদিন তার বুকে মাথা রেখে ঘুমাই না। মাত্র একদিনের দূরত্ব যেন সহস্র বছর মনে হলো আমার।

ভদ্রলোক বাসায় ফিরলেন মাগরিবের পর। ঘরে এসে লাইট জ্বালালেন। আমার অন্ধকারে সয়ে আসা চোখজোড়া হঠাৎ আলোর ঝলক সহ্য করতে পারল না। তীব্র গতিতে চোখ-মুখ খিঁচে নিলাম আমি। ভদ্রলোক গায়ের শার্ট খুলতে খুলতে বললেন,
“সন্ধ্যাবেলায় ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছ কেন? শরীর খারাপ নাকি?”

আমি টের পেলাম ওর গলার স্বরে প্রচুর ক্লান্তি মিশে আছে। তাকিয়ে দেখলাম চোখ-মুখ উদভ্রান্ত, চুল এলোমেলো, তাকানোর ভঙ্গি ক্লান্তিময়। ভদ্রলোক এগিয়ে এসে আমার কপালে হাত রাখলেন। আমি সেই হাত সরিয়ে দিয়ে উঠে বসলাম। আমার দৃষ্টিতে প্রশ্ন। সে কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল,
“বিশ্বাস করো, খুব চেষ্টা করেছিলাম চলে আসার। বসকে বারবার ছুটির কথা বলেছি, দেয়নি। আসলে আজ প্রচুর কাজের চাপ ছিল।”

আমি করুণ চোখে তার দিকে তাকালাম। তার মুখটা শুকনা। ঘামে ভেজা দেহটা নিয়ে ইতোমধ্যে সে বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়েছে। মাথার উপর ফুল স্পিডে ফ্যান ঘুরছে। সে সেদিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“কিছু রান্না করেছ নবনী? আসলে খুব খিদে পেয়েছে।”

একটু থেমে আমার দিকে তাকিয়ে আবার বলল, “আসলে প্রচুর টায়ার্ড লাগছে। না হলে আমিই রান্না করতাম। আর যেহেতু আজ আমি সকালে না খেয়েই বেরিয়ে গেছি— ভাবলাম তুমি হয়তো রান্না করেছ। না করলেও সমস্যা নেই, আমি হোটেল থেকে নিয়ে আসব।”
আমি শীতল গলায় বললাম,
“তার প্রয়োজন নেই। আমি রান্না করেছি।”
মাহতাব চকচকে চোখে উঠে বসল। বলল,
“মেনু কী?”

আমি ভর্ৎসনা করে বললাম,
“গরিবের আবার মেনু!”
“কে বলেছে আমরা গরিব? নিজেদের সুস্থ-স্বাভাবিক হাত-পা আছে। সেটা কাজে লাগিয়ে যা রোজগার করছি সেটাই আমাদের রিজিক। আলহামদুলিল্লাহ। সব সময় শুকরিয়া আদায় করবে, বুঝলে?”

আমি মাথা ঝাঁকালাম। সে হেসে আমার এলোমেলো খোলা চুল আরও এলোমেলো করে দিল। অতঃপর আমার কাঁঁধে মাথা রেখে বলল,
“এবার বলো কী রান্না করেছ?”
“করলা ভাজি আর কচুর লতি দিয়ে চিংড়ি মাছ রান্না করেছি।”
“বাহ! আমি তাহলে চট করে গোসল সেরে আসছি। একসাথে খাব।”

আমি মাথা মৃদু ঝাঁকিয়ে সম্মতি দিলাম। বিছানা থেকে নামার আগে মাহতাব তীব্রভাবে শুষে নিল আমার চুলের ঘ্রাণ। অতঃপর প্রশ্ন করল,
“শ্যাম্পু করেছ নাকি?”
“হুঁ।”
“ভালো।”
ভালো যে, আমি তো তা ভালো করেই বুঝি। মানুষটা আমাকে পরিপাটি দেখতে খুব পছন্দ করে। তোয়ালে আর লুঙ্গি হাতে নিতে নিতে বলল,
“শোনো, তেল নিয়ো চুলে। দিন দিন আমার বউটা কেমন অগোছালো হয়ে যাচ্ছে। এসব দেখতে আমার ভালো লাগে না। রাতের খাওয়ার পর আমি তেল দিয়ে দেব তোমার চুলে।”

বলেই মাহতাব বাথরুমে ঢুকে গেল। আমি অল্প হাসলাম সেদিকে তাকিয়ে। বিয়ের পর থেকেই সে আমার চুলে তেল দিয়ে দেয়। প্রথম প্রথম অনেক তেল চুলে ঢেলে দিয়ে একটা বিশ্রী কাণ্ড ঘটাত। পরদিন শ্যাম্পু না করলে তেল চুইয়ে চুইয়ে পড়ত কপাল দিয়ে, কানের পাশ ঘেঁষে। একদিন ঠাট্টা করে পাশের রুমের ভাবী বলেছিল,
“বোতলের সব তেল এক দিনেই কি নিয়ে নিয়েছেন নাকি?”

আমি কিছু বলিনি। হেসেছি কেবল। কী আর বলব? বলব— আমার স্বামী শখ করে রাতে তেল দিয়ে আমার গোসল করান! বলা যায় এসব? না বললেও তার এসব যত্ন লোকের চোখে পড়ে। আশেপাশের লোকেরা তার নাম দিয়েছে ‘বউসোহাগি’ পুরুষ। তা আমার ভদ্রলোক বউসোহাগিই বটে। অতিরিক্ত সোহাগ করেন বলেই তো যত্ন করে এলোমেলো করে বিনুনি গেঁথে দেয় আমার চুলে। আবার আফসোস করে বলে,
“তুমি যে কী নবনী! চুলগুলো দিন দিন সব ঝরে যাচ্ছে। একটুও যত্ন নাও না।”
আমি তখন গম্ভীর হয়ে বলি—
“ঝরে গেলেই বরং ভালো। মাথায় চুলও থাকবে না, আর এত ঝামেলাও থাকবে না। টাকলু হয়ে ঘুরে বেড়াব। লোকে তোমাকে বলবে— ওই যে টাকলু বেডির জামাই যাচ্ছে। ভাবতেই ভীষণ এক্সাইটেড লাগছে।”
“আলু লাগছে। যত সব বাজে কথা।”
“কেন বাজে কথা কেন হতে যাবে? নাকি আমি টাকলু হলে তোমার আর আমাকে ভালো লাগবে না?”

মাহতাব হেসে ফেলত। বলত,
“যত রাজ্যের আজগুবি চিন্তা তোমার মাথায়, তাই না? পাগল তুমি!”
“না, সত্যি করে বলো তো, আমি টাকলু হলে আমাকে আর ভালোবাসবে না?”

মাহতাব হতাশ গলায় বলল,
“কেন বাসব না? অবশ্যই বাসব।”
“তবে একটা খুব চিন্তার বিষয় আছে।”
“কী বিষয়?”
“একই ঘরে, একই বিছানায় দুজন মানুষের একজন টাকলু, একজন চুলওয়ালা— বিষয়টি কেমন না? তার চেয়ে আমার সাথে সাথে তুমিও টাকলু হয়ে যাবে। এটাই বরং ভালো। আমি তোমাকে ডাকব— ওগো টাকলা মুরাদ, এদিকে শুনে যাও।”

মাহতাব কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল—
“এই টাকলা মুরাদ আবার কে?”
“কুখ্যাত অপরাধী। আওয়ামী লীগের লোক।”
“কী আশ্চর্য! তুমি আমাকে অপরাধীর সাথে কেন মেলাচ্ছ? আমি কি অপরাধী নাকি?”
“নাহ! কিন্তু তবুও আমি তোমাকে এই নামেই ডাকব। নাম যাই হোক, তুমি তো সত্যি সত্যি টাকলা মুরাদ হয়ে যাবে না।”

মাহতাব তখন হতাশ হয়ে আমার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। আমি ভেবে পাই না আমার মতো অসহ্য এক নারীকে সে কেমন করে সহ্য করে! এসব যে অতিরিক্ত ন্যাকামি, সেটা আমি খুব ভালো করেই বুঝি। তবুও এসব আহ্লাদি ধরনের কথাবার্তা, ন্যাকামি করতে আমার বেশ লাগে। এসবে সম্পর্কে উজ্জ্বলতা ফিরে আসে। ঝলমলে হয়ে ওঠে সংসার। সংসারের সুখ সুখ মুক্তোটা তো হাসি-ঠাট্টার মাঝেই লুকিয়ে আছে।

আজ কত দিন মাহতাবের সাথে হাসি-ঠাট্টা করি না আমি। গলা জড়িয়ে ধরে অযথা আহ্লাদে জর্জরিত করি না তাকে। আমার ইচ্ছে হলো আজ একটু আহ্লাদ করব মাহতাবের সাথে। মাহতাব বাথরুম থেকে বের হওয়ার আগেই কাবার্ড থেকে একটা টকটকে লাল রঙের শাড়ি বের করলাম আমি। কালো গায়ের রং আমার। কালো অঙ্গে এই লাল রঙের শাড়িটি বড্ড কটকটে লাগে। কিন্তু তবুও এটাই পরব আমি। দামি বসন। বিদেশ থেকে আমার এক আঙ্কেল শাড়িটি পাঠিয়েছে। দেখলেই বোঝা যায় খুব দামি বস্ত্র, খুব ভারী।

মাহতাব বেরোনোর আগেই আমি গুছিয়ে শাড়ি পরলাম। একটু কাজল লাগালাম চোখে। হালকা লিপস্টিক দিয়ে রাঙালাম ঠোঁট। আয়নায় দেখলাম সুন্দরই লাগছে আমাকে। ওই সুন্দর মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম— মাহতাব এই মেয়েকে দেখে মুগ্ধ হবে তো? আমার এই চেহারায় মুগ্ধ হওয়ার মতো কিছু কি আছে?

—চলমান—

নীল ধ্রুবতারা পর্ব-০৬

#নীল_ধ্রুবতারা [৬]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

আমাদের যেদিন প্রথম দেখা হয়েছিল, সেদিন খুব বৃষ্টি নেমেছিল শহর জুড়ে। অদেখা প্রেমের সাত মাসের মাথায় আমাদের মন একে অপরকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল। দিনের প্রায় অধিকাংশ সময় আমরা কল্পনা করি— দুজনার দেখা হবার দিনটা ঠিক কেমন হবে? কেমন হবে সামনাসামনি ভালোবাসি শোনার মুহূর্ত? মানুষটাকে সামনে থেকে দেখে বুকে কি উথাল-পাতাল ঝড় বয়ে যাবে?

এইসব সুখ কল্পনার মাঝেও একটা ভয় ভীষণ ভাবে আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। এই ভয় নিজের রূপহীন, লাবণ্যহীন চেহারাটা নিয়ে। দেখা করার পর যদি মানুষটা আমাকে পছন্দ না করে? কি হবে তখন? এতো মাসের পরিচয়ের পরেও যেই মানুষটা শুধুমাত্র আমাকে সামনে থেকে দেখার আশায় ছবি দেখার দাবি তুলেনি, এখন আমি যদি তার পছন্দমতো না হই? সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ আমি সুন্দরী নই।

ছেলেবেলা থেকে আমার ডায়েরি লেখার ভীষণ শখ। ভদ্রলোক আমার কাছে একটা পুরনো ডায়েরি দাবি করেছেন। বিনিময়ে উনি আমার জন্য নতুন ডায়েরি নিয়ে আসবেন। আমি বুঝতে পারলাম না, পুরাতন ডায়েরি চাওয়ার কারণ কি? কে জানে, হয়তো আমাকে পুরোপুরি জানার ভীষণ শখ তার। আমারও খুব শখ নিজেকে উত্তমরূপে তার সামনে তুলে ধরার। কিন্তু ময়ূরের পালক লাগালেই তো কাক ময়ূর হয়ে যায় না। এটা অবশ্য আমার ভাষ্য নয়। শিশুকালের চৌকাঠ মাড়িয়ে আমি যখন বয়ঃসন্ধিতে পা দিয়েছিলাম, তখন সামান্য লাবণ্যময়ী দেখাত আমাকে। ওই কালো রঙের মাঝেও অদ্ভুত এক রহস্য ছিল বোধহয়। মায়ের তখন ইচ্ছে হলো আমার বাড়ন্ত শরীরের বাড়তি যত্ন নেবার। আমি তখনো অগোছালো রমণী। মাথার খোলা চুল উড়িয়ে চড়ে বেড়াই গোটা গ্রাম। এ বাড়ির আমগাছের মগডালে চড়ি তো ও বাড়ির বরই গাছে ঢিল ছুঁড়ি। আমড়া গাছের কচি পাতা চিবিয়ে খাই ছাগলের মতো। সে কি অন্যরকম স্বাদ! কি আনন্দ! বাদ দিতে পারি না লিচু পাতাও। লিচু পাতা চিবিয়ে রঙ ফেলে দেই। ঠোঁট জোড়া তখন টকটকে লাল হয়। সমবয়সী বাচ্চাদের কাছে গল্প করি,
“এই দেখ, আমি লিপস্টিক দিয়েছি।”

তখন অবশ্য লিপস্টিককে বড্ড আরামে লিবিস্টিক বলেই চালিয়ে দিতাম। মূল কথা উড়নচণ্ডী, দামাল মেয়ে ছিলাম আমি। লক্ষ্মী বাচ্চাটি হবার চেষ্টাও কোনো কালে ছিল না আমার মাঝে। আমার দুরন্তপনায় মা অস্থির ছিল। সেই আমার শরীরে যখন বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তনগুলো ঘটতে শুরু করল, তখন মা নিয়মিত মুখে লাগানোর জন্য কাঁচা হলুদ বেটে দিতেন। চুলগুলোকেও নিয়মিত তেল মেখে শাসনের বেড়াজালে বন্দি করে ফেলেছেন। মায়ের অলঙ্ঘনীয় আদেশ ছিল— নিয়মিত শ্যাম্পু করা এবং গোসলের আগে রোজ হলুদের প্রলেপ মেখে বসে থাকা। এমনি করে একদিন মুখে হলুদ মেখে সমবয়সীদের প্ররোচনায় নেমে গেলাম দস্যিপনায়। এ বাড়ি, ও বাড়ি ঘুরতে গিয়ে একজনের মা আমাকে বলে বসল,
“কিরে নবনী, মুখে কি মেখেছিস?”

আমার মন পৃথিবীর নিষ্ঠুরতার সাথে ইতোমধ্যে পরিচিত হয়েছে। তবুও সরল আমার কাছে ঘরের খবর পরের কাছে বিলানো ছিল খুবই আনন্দের কাজ। উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে উঠলাম,
“কাঁচা হলুদ বাটা মেখেছি, কাকী। আম্মা মাখিয়ে দিয়েছে। রোজ মাখি।”

“ওহ!”

উনার বলার ভঙ্গিতে ব্যাঙ্গাত্মক ভাবটা স্পষ্ট হলো। এতো চমৎকার করে ব্যাঙ্গের হাসি হাসতে এ জীবনে কাউকে দেখেনি আমি। আমার ধারণা— কুটিল হাসির প্রতিযোগিতায় এই মহিলা প্রথম হবেন। শুধু হাসিতেই ক্ষান্ত হলেন না তিনি। ঠোঁট বাঁকিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিমায় বললেন,

“ময়ূরের পেখম লাগালেই তো আর কাক ময়ূর হয়ে যায় না!”

না, কোনো লুকোছাপা নয়। নয় কণ্ঠের আওয়াজের তীব্রতা কম। আমার সামনে আমার চেহারা নিয়ে কটূক্তি করেছিলেন তিনি। ছোট্ট আমি অনেকদিন বুঝিনি উনার ব্যাঞ্জনধর্মী উত্তর। যখন বুঝেছি তখন আমি সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে পারি নির্দ্বিধায়। কেউ আমাকে কালো বললেও মন খারাপ করি না হুট করে। তবুও গভীর রাতে কিংবা অসহ্য একাকিত্বের সময় নিজের গায়ের রঙ নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগি আমি। শুধু গায়ের রঙ নয়, গোটা আমাকে নিয়েই মনস্তাপের শেষ নেই আমার। যেই চেহারা নিয়ে আমি হীনমন্যতায় ভুগি সেই চেহারাটা অন্য কেউ কেন পছন্দ করবে? কেউ কেউ প্রশ্ন করবেন, কালো মেয়েদের কি বিয়ে হয় না? হয়। তবে নিম্ন মধ্যবিত্তের ঘরের মেয়েদের ক্ষেত্রে ঝামেলা কিছু আছে বৈকি। সেই ঝামেলা মেটানোর উত্তম অস্ত্র যৌতুক। মুখে অবশ্য যৌতুক শব্দটা উচ্চারিত হয় না। পাত্রপক্ষ মধুর গলায় বলে,
“ছেলের ভীষণ শখ, শ্বশুরবাড়ি থেকে একটা মোটরসাইকেল উপহার দিবে।”
যৌতুক শব্দের নতুন প্রতিশব্দ হচ্ছে উপহার। এমন বাহারি উপঢৌকনের সাথে সাথে কালো রঙের মেয়েটা শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছে যায় পণ্যের মতো। তবুও যায়। আমিও যাব। তবে এই যে অদেখা ভদ্রলোকের সাথে আমার প্রেম, তাকে কি পাব জীবনসঙ্গী হিসাবে? যাকে হৃদয় উজাড় করে ভালোবেসেছি আমি তার বউ হবার সৌভাগ্য কি আমার আছে?

জীবনের উপর আমার ভীষণ অভিযোগ। জীবনের প্রথম যেই মানুষটাকে নিজের সম্পূর্ণ আবেগ অনুভূতি নিয়ে ভালোবাসলাম সেই মানুষটার সাথে দেখা হবার পর কি হবে সেই শঙ্কায় আমার ঘুম হয় না। এক জীবনে এতো যন্ত্রণা আমি রাখব কোথায়? সৃষ্টিকর্তা কি পৃথিবীর সব যন্ত্রণা আমার ভাগ্যেই লিখেছেন?
আতঙ্ক, ভয়, শঙ্কা নিয়েই আমার দ্বারে সেই দিন এল যেদিন আগন্তুকের সাথে আমি দেখা করব। তার আগের রাত্রিটি নির্ঘুম কাটলো আমার। কালো চোখজোড়ার নিচে পড়ল ডার্ক সার্কেল। এলোমেলো আমি নিজেকে যথাসম্ভব পরিপাটি করে খুব ভোরে একটা চিঠি লিখতে বসলাম। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি আজন্ম টান আমার। প্রেমের কথা বহুত জানা আছে। সেই কথামালা গুছিয়ে ক্লাস এইট থেকেই প্রেমের কবিতা লেখা শুরু করেছিলাম। নিজের সাহিত্যিক প্রতিভার সবটাই ঢেলে দিয়েছিলাম সেই চিঠিটিতে। চিঠির মূল ভাষা এই—

প্রিয় প্রেমিক,
এখন তোমার হাতে আমার লেখা সর্বপ্রথম কিংবা শেষ চিঠিটি। কারণ, আজকের পর আমাদের দুজনের প্রণয় কোন দিকে মোড় নিবে তা জানি না। হয়তো আমাকে তোমার মনের মতো দেখতে না হলে এখানেই আমাদের সম্পর্কের ইতি ঘটবে। কারণ আমি জানি, অপছন্দের কিছু নিয়ে দীর্ঘদিন সুখী জীবন কাটানো যায় না। তবুও এই নির্মম সত্যটা ভাবতে গেলেই আমার দুচোখ জলে ভরে উঠে। তোমাকে ভিন্ন নিজের আশেপাশে অন্য কাউকে কল্পনা করতে পারি না আমি। না পারি তোমার পাশে অন্য কোনো রমণীর ছায়াও সহ্য করতে। প্রেম বিয়োগের কথা ভাবতে গেলে একটা শাণিত তলোয়ারের আঘাতে আমার হৃদয় ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। বুঝবে কি তুমি, বেদনায় নীল হয়ে যাওয়া সেই রমণীর ব্যথা?

আমি অপরূপা নই। নই মহাকালের পাতা থেকে উঠে আসা অপ্সরা। যার আঁখিযুগল প্রেমিকের হৃদয়ে মায়াবাণ নিক্ষেপ করতে পারে। যার অঙ্গের লীলায়িত গতিছন্দ প্রেমিকের হৃদয়মন হরণ করে প্রাণে প্রেমের মূর্ছনা জাগাতে সক্ষম। আমি সূর্যের আলোর মতো প্রখর, গ্রীষ্মের মতো শুষ্ক, বন্যার মতোই ভয়াবহ, সাইক্লোনের মতো ধ্বংসাত্মক। কি ভাবছো, নারীর সহজাত বৈশিষ্ট্য, নমনীয়তা বুঝি আমার মাঝে নেই? হয়তো সামান্য একটুখানি ভুল ভাবছো তুমি। কেন বলছি?

বলছি কারণ, আমি খুব বাজে ভাবে প্রেমে পড়েছি। গুছিয়ে ভালোবেসেছি একজন পুরুষকে। আজকাল রাতে দামাল মেয়ে নবনীর ঘুম হয় না। না সে উত্তাল সমুদ্রের মতো ছুটে চলে এলাকার এ মাথা থেকে ও মাথা। এই নবনী গভীর রাতে, যখন খুব জোছনা হয় তখন অপার্থিব আলো অঙ্গে মেখে স্নান করে। প্রেমের কবিতা আওড়ায় চাঁদের দিকে চেয়ে। এতোকিছুর পরে আমাকে কি শুধুই একটা কুৎসিত মেয়ে বলেই মানা যায়? মনে হয় না, আমি সুন্দরী! আমি প্রেমিকা? নাকি, তুমিও বাকিদের মতোই গায়ের রঙ দিয়ে মানুষ বিচার করো? বর্ণবাদে বিশ্বাস করো, মাহতাব?

অবশ্য, আমি জোর করব না। জোর করে হৃদয় বাঁধা যায় না। আর না, চোখের অশ্রুকে বানাব আমার প্রেমের হাতিয়ার। যদি তোমার আমাকে ভালো না লাগে, একান্তই অপছন্দ করো তবে আমি নিঃশব্দে দূরে সরে যাব তোমার থেকে। যেতে যেতে হয়তো বলব,
আবার আসিব ফিরে, আবার আসিব ফিরে…

আচ্ছা শোনো, যদি আমাদের সম্পর্ক আর বেশিদূর না এগোয়— তবুও প্লিজ, আমার এ চিঠি মূল্যহীন কাগজের স্তূপে ফেলে দিও না। রেখে দিও পুরনো বইয়ের ভাঁজে। যদি অদূর ভবিষ্যতে কোনোদিন এই চিঠি ফের হস্তগত হয় তবে পড়ে একটু হেসে ফেলো তুমি। মনে করো, নবনী নামের এক পাগল প্রেমিকা ছিল তোমার। মাহতাব, তোমার স্মৃতিতে কি তখনও থাকব আমি? দেখো, উন্মাদের মতো ভবিষ্যতের চিন্তায় এখুনি বিভোর হয়েছি আমি। তবে বলো, কি করে তোমার থেকে আলাদা হবো? কোন উপায়ে?
এখন বলো, কেমন আছো? এখনো বাসো ভালো?

—ইতি
নবনী
১৫.০৩.২০২২

চিঠিটা লিখে স্কচটেপ দিয়ে ডায়েরির ভাঁজে লুকিয়ে রাখলাম আমি। অতঃপর খুব সুন্দর করে গিফটের কাগজে মুড়িয়ে নিলাম আমার যৌবনের সবটুকু আবেগ। যা তুলে দেব— প্রিয়জনের হাতে। অতঃপর নিজেকে যথাসম্ভব গুছিয়ে চলে গেলাম মানুষটার সাথে দেখা করতে। বাড়িতে বলে গেলাম— কলেজে যাচ্ছি। ফিরতে দেরি হবে।

ওর সাথে একা একা দেখা করতে যাওয়ার মতো সৎ সাহস আমার কখনোই ছিল না। শুনেছি, বদ লোকেরা প্রেমের প্রলোভন দেখিয়ে নির্জনে ডেকে নিয়ে মেয়েদের সাথে অসভ্যতা করে। সেই ভয় থেকে আমি সঙ্গে নিলাম বান্ধবীকে। ধড়ফড় বুকে প্রিয় বান্ধবীর হাত চেপে ধরে অপেক্ষা করতে লাগলাম মানুষটার আগমনের। আমরা দেখা করলাম উপজেলা ভবনে। সেখানটায় বিশাল মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে রইলাম জড়োসড়ো হয়ে। বহুক্ষণ পরেও মানুষটা যখন এল না আমরা হাঁটতে লাগলাম। উপজেলা ভবনের মধ্যিখানে অসংখ্য সুপারি গাছ লাগিয়ে পায়ে চলার পথ তৈরি করা হয়েছে। বিশাল চত্বরটির চারিদিকে শোভা পাচ্ছে বাহারি ফুলের গাছ।

কিছুক্ষণ হাঁটার পর দেখা মিলে মস্ত বড় ঘাট বাঁধানো এক পুকুরের। পুকুরের চারিদিকে বুক অবধি গ্রিল দিয়ে বেষ্টনী দেওয়া হয়েছে। এবং এই মস্ত পুকুরের মাঝখানে গিয়ে মাছ ধরার জন্য ইট-সিমেন্ট দিয়ে তৈরি হয়েছে সেতু। সেই সেতুটি ধরে এগিয়ে গেলে পাওয়া যায় মস্ত গোলাকার ইট-সিমেন্টের বৃত্ত। সূর্যের আলো থেকে বাঁচার জন্য মাথার উপর একইভাবে তৈরি করা হয়েছে সিমেন্টের ছাতা। সেই ছাতার উপর আবার ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়েছে খাবার। অসংখ্য পায়রা এসে খাচ্ছে তা। কি যে সুন্দর দৃশ্য! আমার চোখ জুড়িয়ে গেল।

আমরা দুজন মুগ্ধ হয়ে সেখানটায় দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম স্বচ্ছ পানিতে মাছের খেলা। কি সুন্দর আপনমনে মাছগুলো সাঁতার কাটছে। একসময় মেয়েটা বিরক্ত হয়ে বলল,
“আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব নবনী? তোর ফেসবুক প্রেমিকের তো দেখা নেই। ওই ব্যাটা সত্যিই আসবে তো?”

প্রভার সন্দেহ প্রকাশ দেখে আমিও ভুগলাম দ্বিধাদ্বন্দ্বে। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক সময় ধরে অপেক্ষা করছি। বরাবর অধৈর্য আমার ধৈর্যের বাঁধ সেদিন ভাঙল না। হঠাৎ করেই অনুভব করলাম আমিও কারো জন্য অপরিসীম ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করতে পারি।

মানুষটা এল ঝিম ধরা দুপুরে। আমরা তখন হতাশ হয়ে বসে বসে ঝালমুড়ি চিবুচ্ছি। কাঁচা মরিচের ঝালে লাল হয়ে উঠেছে ঠোঁট জোড়া। মানুষটার কল এল তখন। এতকাল সিমে টেক্সট করা মানুষটা আচমকা কল করে বসল আমায়। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিল মানুষটা এসে গেছে। সে আছে আমার আশেপাশে। আমি হঠাৎ হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে গেলাম। লজ্জায় আড়ষ্টতায় চেপে ধরলাম প্রভার হাত। বললাম,
“ও কল করছে! কি করব?”

প্রভা বিস্মিত হয়ে বলল,
“কে কল করছে?”
“মা- মাহতাব।”
“ধর। ধরে বল, আমরা শিমুল গাছের নিচে বেঞ্চিতে বসে ঝালমুড়ি খাচ্ছি।”

আমি কল ধরলাম না। আতঙ্কে তখন আমার হাত-পা কাঁপছে। বুকের ভেতর উত্তাল ঝড় উঠেছে। অচল হয়ে গেছে স্নায়ু। আমি তাকালাম উপজেলা ভবনের মূল ফটকের দিকে। দেখলাম একটা কালো পাঞ্জাবি পরিহিত ভদ্রলোক চারিদিকে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে কানে ফোন চেপে এগিয়ে আসছে। আমি তাকালাম আমার হাতে অবিরত বাজতে থাকা ফোনের দিকে। কেটে দিলাম। দেখতে পেলাম কালো পাঞ্জাবি পরিহিত ভদ্রলোক ফোনটা নামিয়ে এনে মুহূর্তের ব্যবধানে আবার কানে চেপে ধরলেন। দূর থেকে ওই অস্ফুট মুখ আর ব্যাকুল ভাব দেখেই আমি টের পেলাম এই সেই ব্যক্তি। উনিই সেই পুরুষ। মাহতাব। আমার প্রেমিক মাহতাব। তাকে দেখেই স্তব্ধতায় ছেয়ে গেল আমার গোটা পৃথিবী। চারিদিকের সব কোলাহল ছাপিয়ে, দৃষ্টির সম্মুখের অসংখ্য দৃষ্টি এড়িয়ে একমাত্র মাহতাব নামের মানুষটিতে কেন্দ্রীভূত হলো আমার হৃদয়মন।

মাহতাব এগিয়ে আসছে। কি আছে ওর ধীর পদক্ষেপে পা ফেলা ওই মৃদু ছন্দের হাঁটায়। কেন তার প্রতিটি কদম নাড়িয়ে দিচ্ছে আমার অস্তিত্বের ভিত? মানুষটা একবার আমার দিকে তাকাল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কি বুঝল কে জানে? তবে সে এগিয়ে আসতে লাগল এদিকেই। আমার মনটা বিক্ষিপ্ত হলো। এতক্ষণ যেই আমি মাহতাবের কল ধরিনি সেই আমি ক্রমাগত কল করতে লাগলাম তার নাম্বারে। মনে দুরন্ত ইচ্ছে, কল ধরলেই তাকে বলব,

“মাহতাব শোনো, আজ তোমার সাথে দেখা করতে পারব না আমি। প্লিজ আজ তুমি চলে যাও। আমরা অন্যদিন দেখা করব। আমার খুব ভয় করছে মাহতাব। প্লিজ আজ তুমি দেখা করতে চেও না। যাও। ফিরে যাও।”

কিন্তু তা আর বলতে পারলাম কই? মাহতাব আমার কল ধরল না। বরং যত এগিয়ে এল ততই হাঁটার গতি মন্থর হলো তার। একহাতে একটা শপিং ব্যাগ আর এক হাত পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকিয়ে, ঠোঁটের কোণে সর্বভাব ব্যঞ্জনাময় হাসি ফুটিয়ে এগিয়ে এল সে। আমার গোটা পৃথিবী দুলে উঠল তখন। প্রভার হাত চেপে ধরলাম আমি। তাড়া দিলাম,
“চল প্রভা। আর এখানে থাকা যাবে না। আয় আয়..”

বলা বাহুল্য এক প্রকার ছুট লাগালাম আমি। বোকার মতো মেয়েটা আমার পেছন পেছন আসতে লাগল। ঝালমুড়ি বিক্রেতা তখন চেঁচিয়ে বলল,
“ও আফা টাকা না দিয়া কই যান?”

কিসের টাকা, কিসের কি? আমি পাত্তাই দিলাম না সেসব। ছুটলাম শুধু। দৌড়াতে দৌড়াতে একবার পেছনে ফিরে দেখলাম মানুষটা ঝালমুড়ি বিক্রেতার টাকা দিয়ে দিচ্ছে। তার এই কাজে ভীষণ লজ্জিত হলাম আমি। প্রথম সাক্ষাতই ঋণী হয়ে গেলাম তার কাছে। শতবার বলেও কি এই বিশ টাকা তাকে আর দিতে পারব কখনো? উফ! এই মানুষটা বিল মিটিয়ে আবার এদিকেই আসছে কেন? সে কেন চলে যাচ্ছে না? আমার অসহ্য লাগতে শুরু করল। আমি দেখা করব না তার সাথে। কোনো ভাবেই না। আমি ভীষণ বোকা তাই না? আমার সাথে দেখা করার জন্য যে লোকটা সুদূর রাজশাহী থেকে গাজীপুর চলে এসেছে তার সাথে দেখা করব না? তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি? পরে অবশ্য ভেবেছিলাম— মানুষটা যদি ফিরে যেত আমি কি খুশি হতে পারতাম? আমার ব্যাকুলতাটা তো আমি ভিন্ন আর কেউ জানে না।
ছুটতে গিয়ে যখন হাঁপিয়ে উঠেছি তখন হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল প্রভা। কড়া চোখে তাকাল আমার দিকে। এরপর আমাদের পিছু পিছু আসা মানুষটার দিকে। বলল,
“ছুটছিস কেন?”
“এমনি। চল পেছনের গেট দিয়ে বাড়ি চলে যাই।”
“আগে বল, দৌড়ানোর কারণ কি?”

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,
“ঘূর্ণিঝড় আসছে।”
“সেই ঘূর্ণিঝড়ের নাম কি মাহতাব?”
“হুঁ।”
“ঘূর্ণিঝড়কে তো রাজশাহী থেকে গাজীপুর এনে ফেলেছিস। এখনো কেন ঘুরাচ্ছিস? যা কথা বল।”

আমি আতঙ্কিত গলায় বললাম,
“পাগল হয়েছিস! আমি যাব না।”
“কেন?”
“আমার ভয় করছে।”
“প্রেম করার সময় ভয় করেনি?”
“না।”
“তাহলে এখন কেন করছে?”

আমি তাকিয়ে দেখলাম মাহতাব অনেকটা এগিয়ে এসেছে। তার ঠোঁটের কোণের ওই মিটিমিটি হাসিটি আমি এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। আমার মস্তিষ্ক এলোমেলো হয়ে গেল। উত্তেজিত হয়ে উত্তর দিলাম,
“জানি না প্রভা প্লিজ চল, ও এসে পড়েছে।”

আমি প্রভার হাত ধরে টানতে লাগলাম। প্রভা নড়ল না নিজের স্থান থেকে। আমার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। এরপর উলটো আমার হাত ধরল খপ করে। রূঢ়ভাবে বলল,
“আসুক। উনার আসার জন্যই তো অপেক্ষা করছি সকাল থেকে। আসার পর পালাই পালাই করছিস কেন? আশ্চর্য! গাধা নাকি তুই?”

এত কিছু আমি বুঝি না। আমার মাথায় ঢুকে না প্রভার কোনো কথা। আমি ছাড়িয়ে নিতে চাই নিজের হাত। মেয়েটা শক্ত করে ধরে রেখেছে আমায়। আমি পালাতে চেয়েও পারছি না। ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকি। একসময় মানুষটা আমাদের পাশাপাশি এসে দাঁড়ালো। সালাম দিল,
“আসসালামু আলাইকুম।”

সালামের জবাব দিল প্রভা। আমি ততক্ষণে নিজের নখের আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত করেছি মেয়েটির হাত। মানুষটার সাথে প্রভার কুশলাদি বিনিময়ের পর্ব শেষ হবার পর প্রভা আমার হাত ছেড়ে দিল। কিন্তু এবার আর আমি ছাড়লাম না। খামচে ধরলাম তার বাহু। ছাড়াতে চেষ্টা করতেই শিল্পীর আঁচড়ের মতো আবার দাগ তার বাহুতে। সে দাঁত কিড়মিড় করে ফিসফিস করে বলল,
“মেরে ফেলবি নাকি? এতো চিমটি কাটতে মন চাইলে প্রেমিককে চিমটি কাট। আমাকে কেন? যা সর!”

সে জোরপূর্বক আমার হাত সরিয়ে দিল। মাহতাবকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আচ্ছা ভাইয়া, আপনারা কথা বলুন। আমি ফুসকা খাই গিয়ে। বিলটা কিন্তু আপনি দিবেন।”

মাহতাব হাসলো। যেন বুঝাল— বিল কেন? আপনার এই বান্ধবীটির জন্য আমি নিজের প্রাণটাও নির্দ্বিধায় বলিদান দিতে পারি। মাহতাবের থেকে সম্মতি পেয়ে প্রভা হাঁটা ধরল। একা একা একটা ছেলের সাথে আমাকে রেখে মেয়েটা চলে যাচ্ছে? আমি তার নিষ্ঠুরতায় কাঁদো কাঁদো মুখ করে আবার তার পিছু নিলাম। চেপে ধরলাম হাত। জোরপূর্বক আবার ছাড়িয়ে নিল সে। কটমট করে বলল,
“গাধা নাকি তুই? ছাড় তো!”

সে যে আমার ব্যবহারে চরম বিরক্ত হয়েছে তা টের পেলেও তাকে ছাড়তে আমার যত রাজ্যের আপত্তি। আচমকা একটা কণ্ঠ আমার সকল তৎপরতা থামিয়ে দিল। রাশভারী মানুষটির কণ্ঠে উচ্চারিত হলো আকুল বাক্য—
“চলে যাচ্ছ কেন নবনী? কথা বলবে না আমার সাথে?”

থেমে গেল আমার পা। থেমে গেল হাত। ছি ছি! যাকে দেখার জন্য আমার এতো উচ্ছ্বাস, যার সাথে সাক্ষাতের আশায় আমার এতো ব্যাকুলতা তার সাথে কথা বলব না? ছি! কি ভয়ানক ভুলটাই না করেছি। মরমে মরে যেতে মন চাইল আমার। আর ব্যস্ত হলাম না প্রভাকে আগলে রাখার চেষ্টায়। সে চলে গেল আপন কাজে। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম পাথরের মূর্তির ন্যায়। আচমকা এই মানুষটির কণ্ঠ আমার সবটুকু চপলতা কেড়ে নিল। জমে গেলাম আমি। তাকালাম না অবধি তার দিকে। ইটের রাস্তার দিকে অপলক নয়নে চেয়ে রইলাম। এভাবে কত সময় ব্যয় হলো আমি জানি না। আমার সে খেয়াল নেই। তবে বুঝলাম মানুষটা আমাকে এই পুরোটা সময় মুগ্ধ চোখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছে। পুরুষের মুগ্ধ দৃষ্টির খোঁজ তার দিকে না তাকিয়েও পাওয়া যায়। এক সময় সে বলল,

“বুঝলে নবনী, মানুষ হয়ে বড্ড ভুল হয়ে গেল।
আমি যদি প্রেয়সীর হেঁটে যাওয়া পথের বালুকণা, কিংবা কংক্রিট হতাম তবে বোধহয় এমন করেই চেয়ে দেখত সে আমায়। মুগ্ধ হতো, প্রেমের কবিতা শোনাত, তাই না?”

কি আশ্চর্য! আমি আবার সামান্য ইট, বালুর উপর মুগ্ধ হলাম? কখন তাদের প্রেমের কবিতা শোনালাম? ফ্যালফ্যাল চোখে চাইলাম আমি তার মুখের দিকে। আশ্চর্য কাণ্ড, তার মুখের দিকে তাকালেও আমি তাকে দেখতে পেলাম না। তার মুখ, চোখ ছাপিয়ে আমার চোখ আটকে গেল দূরের ওই কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালে। আমি তার দিকে শত চেষ্টা করেও তাকাতে পারছি না। কোনো ভাবেই পারছি না।

“আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম।”

আজান শেষে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠ থেকে ভেসে আসা এই শেষ ধ্বনিটুকুই কানে এল আমার। ঘুম ভেঙে গেল তখন। এখন ভোর। খুব ভোরে এখন আমার আর শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে না। প্রতিদিন একটা না একটা সমস্যা হচ্ছে। খুব যে উল্লেখযোগ্য কিছু তাও নয়। অকারণেই ভোরবেলাটা আমার অসহ্য কাটে। আমি ঘুম থেকে উঠে বসলাম। রাতের তীব্র তমসা কেটে গিয়ে ভোর হয়েছে। বিছানার একপাশে তাকিয়ে দেখলাম মাহতাব নেই। নিশ্চয়ই নামাজ পড়তে গিয়েছে। আমি অস্বীকার করতে পারি না মাহতাব খুব ভালো মানুষ। সে ধর্মভীরু দায়িত্বশীল স্বামী। তার মতো একজন ভালো মানুষকে নিয়ে কেন আমার এতো সমস্যা? আমি কেন তৃপ্ত হতে পারি না? আমার মন কি অতিরিক্ত আশাবাদী?

কিন্তু কিই বা আশা করব আর? মাহতাব আশা করার আগেই আমাকে সবটা দিয়েছে। নিজেকে উজাড় করে ভালোবেসেছে। তবে কেন আমি এমন করছি? গতকাল রাতের ঝগড়ার জন্য আমার মন খারাপ হলো। না আমি আর মাহতাবের সাথে ঝগড়া করব না। অশান্ত মনকে শান্ত করার জন্য অজু করে নামাজ পড়লাম। মোনাজাতে খুব কাঁদলাম আমি। আমার মনে তখনো ওই ভ্রান্ত ধারণা গাঁট হয়ে আছে— আমি কখনোই মা হতে পারব না। ধ্রুব সত্য হিসাবে এটাই মেনে নিয়েছি আমি।

—চলমান—

নীল ধ্রুবতারা পর্ব-০৫

#নীল_ধ্রুবতারা [৫]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

এরপর কেটে গেল তিনটে দিন। ভদ্রলোকের সাথে আমার সম্পর্ক খুব ঠান্ডা যাচ্ছে। আজকাল আমার কোনো কাজেই হাত লাগাতে ইচ্ছে করে না। চুপচাপ এক স্থানে বসে কাটিয়ে দিতে পারি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কখনো বা আকাশ দেখে, কখনো বা জানালা দিয়ে বাতাসে দুলতে থাকা ছাতিম গাছটা দেখে। আমার মোটেও ক্লান্ত লাগে না। বিরক্তি আসে না। গতকাল রাতে মাকে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বিস্তারিত জানিয়েছি। বলা বাহুল্য, এই সিস্ট নামক রোগের কথা আমার মা নাকি জীবনে কখনো শোনেননি। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করেছেন, এমন আজেবাজে চিন্তা না করতে। ওষুধ খেয়ে পিরিয়ড হবার পর আমাকে বাড়ি যেতে বললেন। কোনো কবিরাজের থেকে হারবাল ওষুধ এনে দেবেন। এই ওষুধ খাবার নাকি আবার নিয়মও আছে অনেক। ঋতুস্রাবের দ্বিতীয় দিন ভোরবেলা, অভুক্ত পেটে, ভেজা কাপড়ে খেতে হয় গাছগাছালির শেকড়বাকড়ের রস। আমি এসব বিশ্বাস করি না। তবে এসবের ওপর আমার মায়ের অগাধ ভরসা। হতাশ হয়ে কল কেটে দিয়েছি। এরপর থেকে আমার মনে হচ্ছে এই পৃথিবীতে এমন কেউ কি নেই, যে আমার কথা মন দিয়ে শুনবে? বুঝবে আমাকে?

আজকাল আমার ভালো লাগছে না কিছু। প্রায়ই তলপেটের বাম পাশে চিনচিন ব্যথা হয়। ওষুধ খেয়েও পিরিয়ড হলো না। তবুও খাচ্ছি।
ভদ্রলোক আমার খুব যত্ন করছেন। রোজ সকালে সে রান্নাবান্না করে অফিসে যায়। ফিরে এসে আবার রান্না করে। আমার মন ভালো করার জন্য উদ্ভট সব গল্প করে। সেই সবের কিছুই আমি মনোযোগ দিয়ে শুনতে পারি না। আমার সামনের দৃশ্য, মানুষ—সব ঝাপসা হয়ে আসে। আমার খালি সারাক্ষণ কাঁদতে মন চায়। ভীষণ জানতে ইচ্ছে করে, ঠিক কতটুকু কাঁদলে মনের পাষাণভার হালকা হবে? আমার যত্ন করে গুছিয়ে রাখা সংসারটার পরতে পরতে জমেছে ধুলোর আস্তরণ। অতি কষ্টে কেনা টাকার জিনিসগুলো অবহেলিত হয়ে তিন দিনেই বিবর্ণ হয়েছে। যেন হারিয়ে গেছে তাদের রূপ, সৌন্দর্য। আজ সকালে সে হঠাৎ খেতে খেতে বলল,
“তুমি এমন রসকষহীন হয়ে গেছ কেন নবনী? এমন ম্যারম্যারে সম্পর্ক ভালো লাগে না আমার। আগে আমরা কত হাসিখুশি ছিলাম। অথচ এখন?”

তার কণ্ঠে আক্ষেপের সুর টের পেলাম। সে কি ভাবছে আমি ইচ্ছে করেই এমন করছি? বিবর্ণ আমাকে ভালোবাসতে ভীষণ বিরক্ত লাগছে তার? আমার মনটা বিক্ষিপ্ত হলো। মেজাজ বিগড়ে গেল। চেঁচিয়ে উঠে বললাম,
“তোমার জন্য সারাক্ষণ হা হা-হি হি করব আমি? আমার হি হি দেখলে তোমার খুব ভালো লাগবে? মনে সুখ না থাকলেও দাঁত কেলিয়ে হাসতে হবে আমায়? আমি কি রোবট? মানুষের চামড়া নেই আমার শরীরে? রক্ত-মাংসের মানুষ হয়ে এমন অমানুষের মতো ব্যবহার করব কী করে?”

সে আশ্চর্য হয়ে গেল আমার ব্যবহারে। খাওয়া থামিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল কয়েক পল। চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছে ইতিমধ্যে। বিয়ের পর প্রায়ই তার সাথে ঝগড়াঝাঁটি করেছি আমি। সেই ঝগড়ার স্থায়িত্ব ছিল সর্বোচ্চ মিনিট দশেক। এরপর সব স্বাভাবিক। রাতে প্রচণ্ড ঝগড়ার পর কান্নাকাটি করে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছি তাকে। সেই আলিঙ্গনের বাঁধন এতটাই তীব্র থাকত যে—ভাষায় সেটার প্রকাশ বাহুল্য মাত্র। অতঃপর রাতটা পরম শান্তিতে তার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়েছি। ঝগড়াঝাঁটি হলে সে প্রতিবাদ অবশ্য কখনোই করেনি। আমিই করেছি ভিত্তিহীন অভিযোগ। কখনো বাজারের ফর্দে যা লিখেছিলাম তা আনেনি বলে। কখনো বা বাড়তি জিনিস নিয়ে এসেছে বলে। কখনো আবার কিনে আনা মাছ নরম বলে। আবার কখনো খেতে বসে ফোনে অতিরিক্ত কার্টুন দেখার কারণে। মানুষটার প্রতি আমার অভিযোগের শেষ নেই। এসবই ঝগড়াঝাঁটির প্রধান কারণ। আরও আছে বহু অকারণ। দিনশেষে সে পরাজিত সৈনিকের ন্যায় মাথা নত করে নিত। আমার তীব্র তিরস্কারে যখন লাল হয়ে উঠত মুখ, তখন সে কেঁদে ফেলত। লোকটা একদম বাচ্চাদের মতো। হাউমাউ করে কাঁদতে জানে। কাঁদলে চোখ, নাক, গাল টকটকে লাল হয়ে যায়। ওহ! এখনো বোধহয় বলিনি, আমার ভদ্রলোক মারাত্মক সুদর্শন পুরুষ। মেয়েদের গায়ের রঙকে দুধে-আলতা উপমা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। পুরুষেরও কি যায়? গেলে এই উপমাটি একদম মানানসই আমার ভদ্রলোকের ক্ষেত্রে।

আমার আজও মনে পড়ে সেদিনের কথা, যেদিন আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল।
সেদিন ঝুম বৃষ্টি নেমেছিল শহর জুড়ে। দেখা হবার ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যায় পরে যাই। আগে বলি প্রণয়ের সূচনার কথা। ভদ্রলোকের সাথে আমার মধুর আলাপন চলছিল আপন গতিতে। পরিচয়ের তখন পাঁচ মাস। ততদিনে আমাদের সম্বোধনে পরিবর্তন এসেছে। আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছি দুজনেই। মনের কথা কেউ এখনো স্পষ্ট করে বলিনি যদিও। তবে দুজনেই ব্যাকুল, দুজনেই উদগ্রীব দুজনার মুখ থেকে ‘ভালোবাসি’ শব্দটা শোনার অপেক্ষায়। যা বুঝলাম, এই ছেলে আমাকে প্রপোজ করতে পারবে না এ জন্মে। ভিতুর ডিম। গম্ভীরমুখো। মন চায় কানটা ছিঁড়ে হাতে ধরিয়ে দিই। অসহ্য! আমাদের তখন রাত-দিন কথা হয়। ভালোবাসি শব্দটা কি অতিরিক্ত কঠিন কিছু? সে কেন একবার বলে না আমায়? রাত-দিন কী যে কথা হতো আমি জানি না। আজও বিয়ের এত বছর পর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তা যদি প্রশ্ন করি,
“প্রেমের সময় দিন-রাত এত কী কথা বলতাম আমরা? এত কী কথা ছিল আমাদের?”

সে বলে,
“জানি না। আমার মনেই পড়ে না কিছু।”

তার যে মনে পড়বে না তা আমি জানি। সে খুব ভুলোমনা মানুষ। এই গম্ভীর স্বভাবের ভুলোমনা মানুষটার নাম দিয়েছিলাম, ‘মিস্টার গুরুগম্ভীর মশাই’। সে আমায় নাম দিয়েছিল, ‘অপরিচিতা’।

একজন অপরিচিতার সাথে একজন গুরুগম্ভীর মশাইয়ের প্রেমের পর্বটার সূচনাই হচ্ছে না কোনোভাবে। একবার সূচনা হয়ে গেলে চুটিয়ে প্রেম করা কোনো ব্যাপার না। সূচনাতেই সমস্যা যত। কিন্তু কী আর করা! সমস্যার একটা সমাধান বের তো করতেই হবে। একদিন কথা বলতে বলতে গভীর রাতে তাকে বললাম,
“আসো গানের কলি খেলি।”

সে ইনোসেন্ট ইমোজি দিয়ে বলল,
“সেটা আবার কেমন খেলা?”
“আমি একটা গানের প্রথম লাইন বলব, তুমি বলবে দ্বিতীয় লাইন। এভাবে খেলব, বুঝেছ?”

সে আমার প্রস্তাব নাকচ করার উদ্দেশ্যে বলল,
“আমি বেশি গান জানি না। তার চেয়ে এসো, আমরা লুডু খেলি।”
“না, আমি লুডু খেলব না।”
“তাহলে ক্যারামবোর্ড চলবে?”
“না।”

বলেই আমি অফলাইন হলাম। লুডু খেলায় আমরা দুজনে শেয়ানে শেয়ানে টক্কা দিতে পারলেও ক্যারামে আমি তাকে কোনোভাবেই হারাতে পারি না। সে জিতে যায় বলেই ওই খেলায় তার খুব আগ্রহ। আমি বিষণ্ণ মনে বেরিয়ে এলাম। তখন নাম্বার চালাচালির পর্বও শেষ হয়েছে। সে সিমে টেক্সট দিল,
“আরে অফলাইনে গেলে কেন? আচ্ছা, এসো গানের কলি খেলব।”

আমি অনলাইনে গেলাম আবার। সে লিখল,
“অপরিচিতা, তুমি বন্ড অভিমানী।”

আমি হাসলাম। একটা ঠোঁট বাঁকানো রিয়েক্ট দিয়ে বললাম, “শুধু আমি নই, মিস্টার গুরুগম্ভীর মশাই নিজেও মেয়েদের মতো অভিমানী পুরুষ। তার প্রমাণ আমি কয়েকবার পেয়েছি।”
“আচ্ছা, এসব কথা বাদ। খেলা শুরু করো।”

আমি খেলা শুরু করলাম আমার খুব প্রিয় একটা গান দিয়ে—
“আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাবো।
হারিয়ে যাবো তোমার সাথে…”

এরপরের লাইন সে লিখল,
“সেই অঙ্গীকারের রাখি পরিয়ে দিতে,
কিছু সময় রেখো তোমার হাতে।”

আমি লাভ রিয়েক্ট দিলাম সেথায়। সে সঙ্গে সঙ্গেই অবশ্য লিখল,
“দূর! এভাবে গানের কলি খেলায় মজা আছে নাকি? তার চেয়ে তুমি গাইবে, আমি শুনব—সেটাতেই শান্তি।”
“এ্যঁহ! আমি কেন তোমাকে গান গেয়ে শোনাব?”
“শোনাবে না?”
“নাহ!”
“কেন শোনাবে না?”
“দূর! এত কথা রাখো তো। খেলায় ফোকাস করো। পরবর্তী গান লিখছি।”

সে একটা থামস আপ দিল। আমি আবার লিখলাম,
“একটা ছেলে মনের আঙিনাতে,
ধীর পায়েতে, এক্কা-দোক্কা খেলে…”
“বন পাহাড়ি ঝর্ণা খুঁজে;
বৃষ্টি জলে একলা ভিজে।”

পরবর্তী চরণ সঙ্গে সঙ্গেই লিখল সে। আবার বলল,
“সেই ছেলেটা কে জানতে পারি?”
“না, পারো না।”
“কেন পারি না?”
“কারণ, আমি চাই না আমার মনে লুকায়িত মানুষটা সম্পর্কে সবাই সব কিছু জেনে যাক।”
“সবাই জানবে না তো! শুধু আমি জানব।”
“তোমাকেও জানাতে চাই না আমি। আর প্লিজ, তুমি বারবার ফোকাস থেকে সরে যাচ্ছ। এই খেলাটা মন দিয়ে খেলো প্লিজ। তোমাকে একটা চমৎকার জিনিস দেখাব তাহলে।”

কে জানে চমৎকার জিনিস দেখার লোভেই নাকি কেন, সে পরপর অনেকগুলো গানের চরণ মিলিয়ে দ্বিতীয় লাইন লিখে গেল। আমাদের এই গানের কলি চলল বহুক্ষণ। একটা সময় আমি লিখলাম,
“আমার সোনার বাংলা…”

সে দ্বিতীয় চরণ লিখল,
“আমি তোমায় ভালোবাসি।”

আমার ঠোঁট ভরে হাসি ফুটে উঠল। পৈশাচিক আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম। কী আছে এই তিন শব্দের সংযোগে তৈরি এ বাক্যে? কেন আমার বুকটা অমন করে ধুকপুক করে? ধুরুধুরু বুক নিয়ে লিখে ফেললাম কঠিন কথা,
“কিন্তু আমি তো তোমাকে ভালোবাসি না।”

সে বোধহয় থতমত খেল প্রথমটায়। সঙ্গে সঙ্গে আনসেন্ট করে দিল বাক্যটা। আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল হঠাৎ। এটা কি এমন কোহিনূর হিরে? ভালোবাসার একটা স্বীকারোক্তিমূলক বাক্য মাত্র। এটাকে এমন করে মুছে ফেলতে হবে কেন? তবে কি আমি ধরেই নেব সে আমাকে ভালোবাসে না? এজন্যই নিজের সবটুকু ভালোবাসা যক্ষের ধনের মতো আগলে রেখেছে আমার হস্তক্ষেপের ভয়ে। সে লিখল,
“আমি তো গানের দ্বিতীয় লাইন বলেছি।”

আমি জোর দিয়ে লিখলাম,
“না। তুমি আমাকে ভালোবাসো, এটাই বলেছ। আমি স্পষ্ট দেখেছি।”
“গানের লাইন তো এটাই!”
“তা বলে কোনো মেয়ের ইনবক্সে এসে এটা লিখবে তুমি?”
“তুমিই যে বললে!”
“আমি তো তোমাকে শুধুমাত্র এই লাইন লিখতে বলিনি। তোমার উচিত ছিল একসাথে এর পরের লাইনসহ লেখা। যেমন,
আমার সোনার বাংলা,
আমি তোমায় ভালোবাসি।
চিরদিন তোমার আকাশ…”

সে একসাথে অনেকগুলো ইমোজি সেন্ট করল আমায়। লোকটার কি মাথাটা খারাপ হয়ে গেল? এরপর লিখল,
“সত্যিই ভালোবাসো না?”
“না।”

লিখেই আমি হাসতে লাগলাম প্রাণ খুলে। মানুষটা কি জানে, আমি তাকে ঠিক কতটা ভালোবাসি? জানে না। সে এটাও জানে না, তার সাথে অপার্থিব এক জগতে সুখী সংসার সাজিয়েছি আমি। সে সংসারে সুখ আর সুখ। সে একটা স্যাড রিয়েক্টের সাথে লিখল,
“আমার ভুল হয়েছে। প্লিজ ফরগিভ মি ফর এভার।”
“এত সহজে তো তোমাকে ক্ষমা করা যাবে না। তুমি একটা অপরিচিত মেয়েকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছ। জানো এটা অন্যায়?”

সে আবারও স্যাড রিয়েক্ট দিল। সে আমার “অপরিচিতা” নিকনেম মুছে দিল। নতুন নাম দিল, ‘মাই লাইফ লাইন’। আমি অবাক হয়ে লিখলাম,
“মানেটা কী? আমি তোমার লাইফ লাইন কেন হতে যাব?”
“অপরিচিত মেয়েকে যেহেতু প্রেমের প্রস্তাব দেওয়া যায় না, তাই লাইফ লাইনকে দিচ্ছি। এখন কি প্রেমের প্রস্তাবটাকে ন্যায়ের তালিকায় ফেলা যায়?”
“না, যায় না। তুমি এত বাজে ছেলে! আগে জানলে কখনো তোমার সাথে কথা বলতাম না। তুমি আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিচ্ছ? ছিঃ!”

আমার কথার ধরনে সে বোধহয় খুব অবাক হলো। সেই অনুভূতির জানান দিল আধুনিক যুগের আবিষ্কার রিয়েক্টের মাধ্যমে। বিস্ফোরিত চোখের একটা গোল মাথা। বিস্ময়ে দু-চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে যেন। সে লিখল,
“কেন, ছিঃ কেন? প্রেম তো ভালো জিনিস, এখানে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার কোনো বিষয় তো দেখছি না।”
“তুমি না দেখলেও আমি দেখছি। তুমি দয়া করে আর এই বিষয় নিয়ে কথা বলো না।”
“আচ্ছা, বলব না। তুমি তাতে খুব খুশি হবে, লাইফলাইন?”

আমি এংরি রিয়েক্ট দিয়ে লিখলাম,
“খবরদার! এই নামেও আমাকে ডাকবে না। অসহ্য ডং!”

এর উত্তরে ও ঠিক কী বলেছিল মনে নেই। কিন্তু হ্যাঁ, প্রেমটা হয়েছিল আমাদের। এর অনেক পরে আমি জেনেছিলাম, সে আমাকে আরও অনেক আগেই ভালোবেসে ফেলেছিল। শুধুমাত্র ভয়ে বলতে পারেনি। যদি আমি মানা করে দিতাম! তবে যখন মজার ছলে আমি তাকে দিয়ে ‘ভালোবাসি’ বলিয়ে নিলাম, তখন সে আমার মনের খবর জেনে গেল। আর বলে দিল মনের লুকায়িত কথা। প্রকাশ করল নিজের মনের সমস্ত প্রেম। জানালা দিয়ে বাইরে দৃষ্টি রেখে স্মৃতিচারণ করতে করতে খেয়াল করলাম পরিচিত অবয়বটাকে দেখা যাচ্ছে। তাকে দেখেই খেয়াল হলো, সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। ভদ্রলোক ফিরছেন নিজের নীড়ে। দেখতে পেলাম তার হাতে দুটো পলিথিন ব্যাগ। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম ব্যাগে কী আছে জানার জন্য।

সকালে ভদ্রলোকের সামান্য আবদারে যখন বাঁকা কটাক্ষে তীক্ষ্ণ মন্তব্য করেছিলাম, ভদ্রলোক তখন ব্যস্ত হাতে ভাতসুদ্ধ প্লেটে পানি ঢেলে দিয়েছিল। চুপচাপ চলে গিয়েছিল অফিসে। আমি শুধু নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে চেয়ে থেকেছিলাম আধখাওয়া ভাতের প্লেটের দিকে। বলিনি কিছুই। এরপর স্বাভাবিক নিয়মে সারাটা দিন চলে গেল। এখন ভদ্রলোক ফিরছেন। ওনার চোখ-মুখ স্বাভাবিক। মনে হয় না সকালের ঘটনার আহত ভাবটা এখনো আছে।

ভদ্রলোক ঘরে এসে পলিথিনের ব্যাগটা টেবিলের ওপর রেখে আমার দিকে তাকালেন। আমিও তাকালাম তার দিকে। চোখাচোখি হলো আমাদের। পরনের শার্ট খুলতে খুলতে বললেন,
“কী অবস্থা? এমন উজবুকের মতো চেহারা করে বসে আছ কেন? চুলের এই অবস্থা কেন? দেখে মনে হচ্ছে পাবনা থেকে পালিয়ে এসেছ! গোসল করোনি?”

আমি কড়া চোখে তাকালাম। গোসল কিংবা চুল আঁচড়ানোর মতো জাগতিক কোনো কাজে আমার আজকাল আগ্রহ কাজ করে না। এমনকি খাওয়ার কাজেও আমার প্রচুর অবহেলা। আমার শুধু বসে থাকতে মন চায়। ভদ্রলোক ফ্যানের সুইচ দিয়ে এসে আমার পাশে বসলেন। বললেন,
“কথা বলছ না কেন? শরীর খারাপ?”

আমি এবারেও কিছু বললাম না। নিজেই বললেন,
“আসার সময় দেখলাম সাত্তার চাচা সিঙাড়া ভাজছে। তোমার জন্য নিয়ে এলাম। একটায় সিঙাড়া আর আরেকটায় রাতের জন্য পরোটা আর আলুভাজি নিয়ে এসেছি। আজকে আর রান্না করতে পারব না।”

আমি তাকিয়ে রইলাম। রাতের জন্য আনা পরোটা কিংবা প্রিয় সিঙাড়ার কথা শুনেও আমার মন প্রফুল্ল হলো না। হাসি ফুটল না ঠোঁটের কোণে। আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম আমার প্রিয় স্বামীকে। এই পৃথিবীতে তার চেয়ে প্রিয় আমার আর কী আছে? কে আছে? অথচ তাকে আজকাল সহ্যই হয় না। রাগ লাগে তার ওপর। এই যেমন এখন লাগছে। কারণ সে এসেই আমার এলোমেলো অবস্থা দেখে একটা মন বিষণ্ণ করে দেওয়ার মতো কথা বলেছে। আমাকে আজকাল তার উজবুকের মতো লাগে? এই চেহারাটা দেখেই তো বিয়ে করেছিল। তবে আজ এই মন্তব্য কেন? অফিসের সুন্দরী কলিগদের দেখে আমার আর ভালো লাগছে না? আর লাগবেই বা কী করে, তাকে তো সন্তান সুখ দিতে পারব না আমি। তবে কেন ভালো লাগবে? কেন ভালোবাসবে?

এসব কারণ উল্লেখ করেই তার সাথে সেই রাতে প্রচণ্ড ঝগড়া করলাম আমি। বিবাহিত জীবনে এতবড় ঝগড়া আগে কখনোই করিনি। সেই প্রথম রাত্রি, যেদিন স্বামীর বুকে মাথা রাখা ছাড়া পার করলাম আমি। রাতভর কিছুক্ষণ পরপর আমাকে তার বুকে মাথা রাখার জন্য টেনেছিল সে, আমি বড় অবজ্ঞায় তাকে ফিরিয়ে দিয়েছি। আমার অভিমান হয়েছে। খুব বেশী অভিমান হয়েছে…

—চলমান—

নীল ধ্রুবতারা পর্ব-০৪

#নীল_ধ্রুবতারা [৪]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

স্ত্রীকে নিয়ে একটা মানুষ কতটা চিন্তাশীল হলে এতো ব্যাকুল হতে পারে? ভদ্রলোকের প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়ে চোখ পিটপিট করলাম কেবল। ভদ্রলোক আবারও অস্থির হলেন,
“এই নবনী, আর ইউ ওকে? এ্যাঁই, কথা বলছো না কেন?”
আমি ম্রিয়মাণ কণ্ঠে বললাম,
“ঠিক আছি।”

মনে হলো ভদ্রলোক আমার গলার স্বর শুনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। ‘আমি ঠিক আছি’ এই কথাটায় স্বস্তিদায়ক কিছু কি আছে? তবে সে এমন করে নিশ্চিন্তের শ্বাস ত্যাগ করলেন কেন? সে উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
“কখন থেকে কল দিচ্ছি ধরছিলে না কেন?”
“খেয়াল করিনি।”
“আজও নিশ্চয়ই ফোন সাইলেন্ট করে রেখেছো? একা একা বাসায় থাকো। ফোন সাইলেন্ট করে রাখার কি দরকার, নবনী? তুমি কল না ধরলে আমার দুশ্চিন্তা হয়, জানো না?”
“জানি।”

বলেই ছোট করে নিশ্বাস ফেললাম। আমি কল না ধরলে তার যে খুব দুশ্চিন্তা হয় তা আর জানব না? মানুষটা যে আমাকে নিয়ে কতটা ভাবে তা তার গলার স্বর শুনেই টের পাই। তবুও ফোন সাইলেন্ট করে রাখার বদভ্যাস ত্যাগ করতে পারি না। তবে আজ তো ফোন সাইলেন্ট করে রাখিনি। আজ আমি ভাবনায় এতোটাই বিভোর হয়ে মত্ত ছিলাম যে— কখন সে কল করেছে টেরই পাইনি।
সে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“শোনো, আর কখনো ফোন সাইলেন্ট করে রাখবে না, প্লিজ। অনুরোধ করছি তোমায়।”

আমি সত্যটা বললাম না। কোনোরূপ প্রতিবাদ বিহীন মেনে নিলাম তার কথা। ক্ষীণস্বরে বললাম,
“আচ্ছা আর রাখব না।”
“আমি জানি তুমি আবার ফোন সাইলেন্ট করে রাখবে। আর আমাকে সারাদিন চিন্তায় অস্থির করবে।”

বলেই সে শব্দ করে একরাশ হতাশা মিশ্রিত শ্বাস ফেলল। বলল,
“এখন বলো কি করছো?”
“কিছু করছি না।”
“তোমার গলাটা এতো ভারী শোনাচ্ছে কেন, ঘুমাচ্ছিলে?”
“নাহ।”
“তাহলে?”
“এমনি, কিছুই ভালো লাগছে না। ভীষণ মন খারাপ করছে আমার।”
“কেন? ভালো লাগছে না কেন? আর মনই বা কেন খারাপ করছে?”

আমি এই প্রশ্নের জবাব দিলাম না। ভারী পল্লব আচ্ছাদিত চোখের কোণ বেয়ে নিঃশব্দে নামল নোনাপানির ধারা। না, শব্দ করে কাঁদা যাবে না। আমার সশব্দ কান্না শুনলে মানুষটা আরও চিন্তা করবে আমাকে নিয়ে। মাঝে মাঝে আমি আশ্চর্য হয়ে ভাবি— আমাকে নিয়ে এতো চিন্তার কি আছে? আমি কি বাচ্চা মেয়ে? আমার সামান্যতম অসুবিধায় সে এতো উদ্বেগ প্রকাশ কেন করে? এমনও নয় যে পরিস্থিতি সামান্য অনুকূল হলেই আমি কেঁদেকেটে বুক ভাসাই। তবে ওর কেন এতো চিন্তা আমাকে নিয়ে?

আমাকে নিশ্চুপ দেখে সে বলল,
“সকালে খেয়েছো?”
“নাহ।”
সে করুণ গলায় বলল,
“কেন খাওনি?”
“খিদে পায়নি।”
“নবনী, এখন সকাল এগারোটা বাজে। এখনো তোমার খিদে পায়নি? কাল রাতেও তো কিছু খাওনি তুমি। কেন এমন করছো? আমাকে কেন জ্বালাতন করছো, কি করেছি আমি। কিসের শাস্তি দিচ্ছো বলতো?”

আমি না খেয়ে তাকে কোনো উপায়ে জ্বালাতন করছি ভেবে পেলাম না। তাকে যে আমি একেবারেই জ্বালাতন করি না তা নয়। আমি তাকে খুব জ্বালাতন করি। যখন মাঝরাতে বাথরুমে যায় সে, আমি তখন বাথরুমের সুইচ বন্ধ করে এসে বিছানায় চুপচাপ শুয়ে থাকি। প্রথম প্রথম সে খুব আশ্চর্য হতো। এরপর বুঝতে পারল মাঝরাত হোক বা খুব গভীর ঘুমের সময়— সে যখন আমার পাশ থেকে উঠে চলে যায় আমার ঘুম তখুনি ছুটে যায়। এরপর থেকে সে নিজেও প্রায় সময় আমি বাথরুমে গেলে লাইট বন্ধ করে দেয়। আবার জ্বালায়। এ আমাদের এক মজার খেলা। ছাব্বিশ বছরের এক ভদ্রলোক পুরুষ এবং একুশ বছর বয়সী এক দুষ্টু নারীর এই রসায়নের কথা বহুদিন অবধি কেউ জানতো না।

কিন্তু এই গোপন খেলার কথা ফাঁস হয়ে গেল হঠাৎ। গতবার রোজার ঈদে শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে গিয়েছি। সেখানে একটাই বাথরুম। গণহারে সেটা সকলে ব্যবহার করে। রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর ভদ্রলোক হঠাৎ বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। বেরিয়ে যাবার কিছুক্ষণ পরে আমার মনে হলো, উনি বোধহয় বাথরুমে গিয়েছেন। আমার বুদ্ধিমান মাথায় চমৎকার একটা আইডিয়া খেলে গেল। গতকাল মাঝরাতে তাকে ডেকে বললাম,
“এই আমি বাথরুমে যাব। একটু এসো না আমার সাথে।”

আমি ভীতু মেয়ে। অন্তত ভূত নামক এক বস্তুকে আমি ভয় পাই ভীষণ। সে জানে সে কথা। তাই সঙ্গে গিয়েছিল। তবে কিছুক্ষণ পরেই বাথরুমের লাইট বন্ধ করে দিয়েছিল নির্মমভাবে। আমি কাঁপা কণ্ঠে তখন “অ্যাঁ” করে মৃদু চিৎকার দিয়েছিলাম। সে লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে বিশ্রী রকম শব্দ করে হেসেছিল তখন। এমনিতে তার হাসির শব্দ চমৎকার। মাঝরাতেই হঠাৎ খুব বিশ্রী লেগেছিল আমার কাছে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসার পর নিজের বাহুডোরে আগলে নিতে চেয়েছিল সে আমায়। আহ্লাদ করে বলেছিল,
“খুব ভয় পেয়েছো? আচ্ছা, এরপর থেকে আর ভয় পাবে না এমন একটা উপায় বলে দেই তোমাকে? তুমি বাথরুমে গেলে তোমার সাথে আমিও যাব। তুমি আরামে সুখ কর্ম করবে আর আমি দেখব।”

ছিঃ কি নোংরা মজা। আমি কটমট করে তার দিকে তাকিয়েছিলাম। আমার অগ্নিদৃষ্টি দেখে সে আবার হেসেছিল। হাত ধরতে চেয়েছিল শক্ত করে। তার বাঁধন গাঢ় হবার আগেই নিজের দন্তপাটি দিয়ে জোরছে এক কামড় বসিয়েছিলাম আমি। দাগটা এখনো জ্বলজ্বল করছিল বহুদিন। কিন্তু তাতেই বা কি? বাথরুমে যাওয়ার পর এখনো লাইট অফ করাটা তো বাকি। আমার মনটা হঠাৎ প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠল। দ্রুত ছুটে গেলাম বাথরুমের সামনে। আমি নিশ্চিত, রাতে খাওয়ার পরে সে বাথরুমেই গিয়েছে। বাথরুমের লাইট বন্ধ করে দিয়ে পৈশাচিক আনন্দে খিলখিল শব্দে হেসে উঠলাম আমি।

হাসতে হাসতে বললাম,
“কি খবর কালামের পুত? অন্ধকারে পায়খানা ঠিকঠাক ক্লিয়ার হচ্ছে তো? গতকাল রাতে তুমি লাইট বন্ধ করছিলা না, আজ আমি করে দিলাম। হু হা হা!”

এখানে উল্লেখ্য, আমার শ্বশুরের নাম আবুল কালাম। মজা করে মাঝে মাঝে তাকে কালামের পুত বা শাশুড়ীর পোলা সম্বোধন করি আমি। ভেতর থেকে একটা ভারী পুরুষ কণ্ঠ গলা খাঁকারি দিয়ে “উহুহু!” শব্দ করল কেবল। আমি বললাম,
“তুমি যতই উহুহু করো লাইট আমি জ্বালাব না। আজ অন্ধকারেই তোমার শিল্পকলা শেষ করো তুমি।”

এরপর সুর ধরে বিড়বিড় করলাম,
“তুমি থাকো গো কালামের পুত,
অন্ধকারে বইয়্যা…
আমি জ্বালাব না লাইট যতোই
তুমি থাকো চাইয়্যা।”

অশ্রুতপূর্ব এই গান শুনে ভেতরের মানুষটা আরেকবার গলা খাঁকারি দিল। আমি পাত্তাও দিলাম না সেসব। দাঁড়িয়ে রইলাম গাঁট হয়ে। রিনরিনে চাপা হাসিতে মুখরিত হতে লাগল রাতের বাতাস। বেশ অনেকক্ষণ পরে ভেতর থেকে একটা কণ্ঠ আমাকে বলল,
“মা, লাইট জ্বালাও। আমি বাশারের পুত কালাম। কালামের পুত ভেতরে নাই। ভেতরে তার বাপ আছে।”

ভেতরে আমার শ্বশুরের পুত্র নয়, দাদাশ্বশুরের পুত্র আছে জেনে লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে মন চাইল আমার। এ কি এক আকাম করে বসলাম? লজ্জায় লাইট না জ্বালিয়েই ফিরে এলাম ঘরে। ততক্ষণে শাশুড়ী এসে গিয়েছিলেন। ঘটনা জানাজানি হলে বাড়ি হাসিতে মুখরিত হলো।

শাশুড়ী মুখ ভার করে আমার ভদ্রলোক স্বামীকে বলল,
“তোর বউয়ের আর আক্কেল হবে না। ছি, কি লজ্জার কথা! শ্বশুর বাথরুমে গিয়েছে আর ছেলের বউ লাইট বন্ধ করে দিয়েছে, লোকে শুনলে কি বলবে? তুই বাথরুমে গেলেও তোর বউ এই কাজ করে?”

আমি কি করি কি না করি সেই ব্যাখ্যা শাশুড়ী মাকে সে দিল না। আমি কান পেতে শুনলাম, সে কেবল বলল,
“আরে সে কি জানত আব্বু ভেতরে? হয়েছে মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং। এতে এতো কাহিনীর কি আছে?”

কাহিনীর কিছু না থাকলেও সবাই বিস্তর ইতিহাস খুঁজে পেল সেই ঘটনায়। স্বামী ঘরে এসে হাসতে হাসতে আমায় বলল,
“তোমাকে কি এমনি এমনি গাধা বলি আমি? এখন তো মনে হচ্ছে এতোকাল তোমাকে গাধা বলে বেচারা ওই গাধা জাতটাকে অপমান করেছি আমি। তুমি হচ্ছো উন্নত জাতের লেজবিহীন ছাগল।”

সেদিন নীরবে অপমান সহ্য করে নিয়েছিলাম আমি। তবে সময়ে অসময়ে সেটা ফেরতও দিয়েছিলাম সুনিপুণভাবে। তবুও এই টম অ্যান্ড জেরির সম্পর্ক কখনো মন্দ লাগেনি। মনে হতো এই খুনসুটিতে আমরা বেশ আছি। সেবার ওই ঘটনার পর আমি লজ্জায় শ্বশুর মশাইয়ের সামনে গেলাম না আর। শুধু ফিরে আসার সময় মাথা নত করে বলেছিলাম,
“আব্বু যাই, আমাদের জন্য দোয়া করবেন। আসসালামু আলাইকুম।”

শ্বশুর মশাই সিক্ত কণ্ঠে বলেছিলেন,
“আচ্ছা, সাবধানে যেও।”

এসেছিলাম সাবধানেই। সংসারও করছিলাম ভীষণ গুছিয়ে। সে সংসার জীবনে নিত্যদিনের সঙ্গী হয়েছিল এইসব হেঁয়ালি, দুষ্টুমি, ছেলেমানুষী কাণ্ড, মিষ্টি সব প্রেমের ঝগড়া। দিনকাল কাটছিল খুব চমৎকার। স্বামীকে জ্বালিয়ে যে শান্তি আমি পেতাম তা শান্তিনিকেতনেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তাকে জ্বালাতন করার মতো মানসিক অবস্থা আমার নেই। ভঙ্গুর এই মন নিয়ে উচ্ছ্বলিত আবেগে কাউকে বিরক্ত বা জ্বালাতন করা যায় না। তাই অসহায়ের মতো বললাম,
“সরি।”
“সরি, সরি কিসের জন্য?”
“তোমাকে খুব জ্বালাচ্ছি যে! তুমি তো খুব বিরক্ত হচ্ছো। তার জন্য সরি।”
সে হতাশ কণ্ঠে বলল,
“আমি সরি চেয়েছি তোমার কাছে?”
“না, চাওনি।”
“তবে কেন সরি বলছো?”
“এমনি। মনে হলো সরি শুনলে তুমি খুশি হবে।”

আমার নিষ্প্রভ গলার স্বর শুনে সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। এরপর খুব ধীরে সময় নিয়ে বলল,
“নবনী, একটা সত্যি কথা বলবে?”
“কি কথা?”
“আমার সাথে তুমি এমন করে কথা বলছো কেন? কি করেছি আমি?”

আমি ভারী বিস্মিত হলাম। তার সাথে আমি কোনো খারাপ ব্যবহার করিনি। রাগারাগি করিনি। কড়া, কঠিন স্বরেও ঝগড়াঝাটিও বাঁধাইনি। তবুও সে কেন এমন করে বলছে? ফোনটা শক্ত করে কানে চেপে ধরে অসহায়ের মতো জানতে চাইলাম,
“তোমার সাথে কেমন করে কথা বলছি আমি?”
“এমন পর পর করে৷ যেন আমি তোমার খুব অচেনা কেউ।”

লোকটার ছেলেমানুষী দেখে আমার ভীষণ হাসি পেল। কিন্তু বিষণ্ণ মনের তাড়নায় ওই হাসিটা ঠোঁটের কোণে চড়াও হলো না। মানুষটা আমাকে ভালোবাসে। তাই তো আমার একটু নির্লিপ্ততা তাকে বড্ড যাতনা দেয়। কিন্তু আমিই বা কি করব? জোরপূর্বক আগের নবনীকে ফিরিয়ে আনা আদৌ কি সম্ভব? চাইলেই কি মনের হতাশা দূর করে মানুষ খুব স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে? কেউ কেউ হয়তো পারে। অধিকাংশ মানুষই পারে না। যারা পারে তারা খুব দক্ষ অভিনয়শিল্পী। জীবনের প্রতিটি বাঁকে তারা কেবল সুখী থাকার অভিনয়, হাসি হাসি মুখ করে রাখার অভিনয় করে নিপুণভাবে। আমি তো দক্ষ অভিনেত্রী নই। সুতরাং মনের খেদ বাহ্যিক আচরণে প্রকাশ পাওয়া খুব স্বাভাবিক। তাই বর্তমানে, জীবনের এই সংকটপূর্ণ মুহূর্তে বিষণ্ণতার চাদরে আমার কণ্ঠ জড়িয়ে থাকবে এটাই অবধারিত নিয়ম। নিয়ম মেনেই আমি শুধালাম,
“তোমাকে পর ভাবার মতো কাজ আমি কখনোই করতে পারব না, মাহতাব। তুমি সেটা জানো তবুও কেন অযথা কথা বাড়াচ্ছো?”

মাহতাব দীর্ঘ সময় চুপ করে রইল। আমিও কানে ফোন চেপে ধরে শুনে গেলাম তার নিশ্বাসের শব্দ। আমার বুকে ধাক্কা দিতে লাগল তার প্রতিবারের শ্বাস-প্রশ্বাসের আনাগোনা। একটা সময় পর আমার মনে হলো মাহতাবের বোধহয় খুব শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। অক্সিজেনের অভাব বোধ করছে ভীষণ।

আমি ভীত হলাম। শুধালাম,
“কথা বলছো না কেন?”
“কি বলব বুঝতে পারছি না।”
“চুপ করেই থাকবে?”
“না। আসলে নবনী আমার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে।”
আমি অপার বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করলাম,
“কেন?”
“তোমার এতো বেশি মন খারাপের সময় তোমাকে সান্ত্বনা দেবার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। তোমার মনটা ভালো করতে পারছি না। এই ব্যর্থতার পুরো দায়টাই তো আমার। আমার এতো খারাপ লাগছে কি বলব তোমায়।”

অপরাধবোধের প্রগাঢ়তায় তার স্বর ভারী হয়ে এল। আমি জানি আমার ভদ্রলোক এখন নিঃশব্দে কাঁদছে। মানুষটা যখন প্রচণ্ড অসহায় বোধ করে তখন সে খুব করে কাঁদে। একদম শব্দহীন কান্না। যেই কান্নায় ভারী হয় ঘরের গুমোট হাওয়া। মানুষটা ভরা মজলিসে কাঁদছে? কলিগরা কি ভাববে তাকে? আমি চিন্তিত হয়ে বললাম,
“তুমি শুধু শুধু নিজেকে দায়ী করছো। কোনো মানে হয় এসবের? আচ্ছা, ছাড়ো এসব। কোথায় আছো তুমি? এতোক্ষণ ধরে ফোনে কথা বলছো কেউ দেখছে না?”

“না, আমি একটা কাজে অফিসের বাইরে বেরিয়েছি। তোমার জন্য চিন্তা হচ্ছিল। এরপর ভাবলাম তোমাকে কল করে একটু কথা বলি। মনটা হালকা লাগবে। চিন্তাটা কমবে।”

সে আবারও শব্দ করে নিশ্বাস ফেলল। আমি স্বাভাবিক স্বরে বললাম,
“চিন্তা কমেছে?”
“না।”
“কেন কমেনি কেন? কথা তো হলোই।”
“তবুও কমেনি। তুমি কেন খাওনি এখনো? ফোন রাখার সাথে সাথে নাস্তা করবে। ওষুধ খাবে। আর হ্যাঁ, গোসল করে জামাকাপড় সব ডিটারজেন্ট দিয়ে ভিজিয়ে রাখবে। আমি রাতে এসে ধুয়ে দেব।”
“আচ্ছা।”
“গুড গার্ল। আচ্ছা, এখন তাহলে রাখি?”
“হুঁ।”

আমি মেনে নিলাম তার কথা। মানুষটা এতো চমৎকার কেন যে! এতো ভালো যে কেন আমাকে বাসে! সে কল কাটার আগে বলল,

“শোনো বউ, ভালোবাসি তোমায়।”

আমি শুনলাম। অন্য সময় হলে আমিও নিজের ভালোবাসার স্বীকৃতি দিতাম অবলীলায়। আজ নিজের ভালোবাসার উপর বিশ্বাস খুঁজে পেলাম না। কেন পেলাম না তা আমি জানি না। শুধু জানি, আমার ভয় লাগছে। এই মানুষটাকে হারানোর ভয়। এতো যত্নশীল পুরুষটিকে আমি হারাতে পারব না। অথচ সন্তানহীন একটা সংসার টিকিয়ে রাখার মন্ত্র যে আমার জানা নেই। আমি আকাশের দিকে তাকালাম। ঘন কালো মেঘে ছেয়ে আছে আকাশ। খুব জোরে হাওয়া দিচ্ছে। আমার মাথার এলোমেলো চুলগুলো বাতাসে উড়ছে অবাধ্যতার সহিত। মনটাও বিক্ষিপ্ত হচ্ছে সমানতালে। গতকাল থেকে এতো কেন মন খারাপ হচ্ছে আমার? মাতৃত্বের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হবো, এই কি তার কারণ?

—চলমান—

নীল ধ্রুবতারা পর্ব-০৩

#নীল_ধ্রুবতারা [৩]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

অন্যদিন ভদ্রলোক অফিসে যাবার পরে আমার তিলতিল করে গড়ে তোলা সংসারটা মন দিয়ে গুছিয়ে রাখতাম আমি। বাসি জামাকাপড়গুলো ধুয়ে রোদে শুকোতে দিতাম। এলোমেলো বিছানার চাদর একটু পরপর টানটান করে বিছিয়ে রাখতাম। কাজ করতে আমার ভীষণ ভালো লাগতো। আমার সংসার। আমি গুছিয়ে রাখব না? তাছাড়া আমার শুচিবায়ুর সমস্যা আছে। আমার সুপুরুষ স্বামী খুব পরিপাটি হলেও একটা বিষয়ে ভীষণ বেখেয়ালি। সবসময় ভেজা তোয়ালে বিছানার উপর রেখে দেয় সে। বিয়ের পর থেকে এই ব্যাপারে কথা বলতে বলতে আমি অতিষ্ঠ। আজ হঠাৎ আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করলাম সে ভেজা তোয়ালে বারান্দার দড়িতে মেলে দিয়েছে। তা দেখে আমার কেন যেন ভীষণ কষ্ট হলো। মানুষটা এতো দ্রুত বদলে গেল কি করে? যেই কাজটা আমার করার কথা তা কেন সে করছে? এমন তো কথা ছিল না। বিয়ের আগে তো আমি এসব বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইনি। তবে কেন এই রদবদল?

চোখ বন্ধ করলে আজও দেখতে পাই বছর তিনেক আগে তিনদিন আলাপহীন থাকার পরে মানুষটা কতটা মুষড়ে পড়েছিল। অসহায়ের মতো দীর্ঘ মেসেজ করেছিল,
“আচ্ছা, আপনার সাথে কথা বলতে না পারলে আমার এতো অস্থির লাগে কেন? মনে হয় দম বন্ধ হয়ে আসছে। জানেন, এই তিন দিন আমি ঠিক করে কিছুই খেতে পারিনি। খালি মনে হয়েছে, আমার কাছের কিছু একটা যেন আমার থেকে দূরে সরে গিয়েছে। আমি হারিয়ে ফেলেছি কোনো প্রিয় বস্তু। কিংবা প্রিয়জন। আপনি কি জানেন কি সেটা? অথবা আমার কি হয়েছে?”

আমি উনার দেওয়া এই একটা ক্ষুদে বার্তা একবার দুবার করে বহুবার পড়ে ফেললাম। অজান্তেই ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল দারুণ সলজ্জ হাসি। কি আশ্চর্য! আমার নিজের সমস্যার সবটুকুই কি শোষণ করে নিয়েছে ভদ্রলোক? নয়তো এমন কঠিন অসুখে কি করে পড়লেন তিনি? আকস্মিক তীব্র এক আবেগে আমার চোখে জল চলে এল। অদেখা মানুষটার প্রতি তীব্র প্রেমে দ্রবীভূত হয়ে গেল আমার সদ্য যৌবনা মন। এসব ভাবতে ভাবতে মেসেজের উত্তর দিতে দেরি হলো।

অধৈর্য ভদ্রলোক ফের লিখলেন,
“কোথায় হারালেন?”
“হারাইনি, এখানেই আছি।”
“কি করছেন?”
“ভাবছি।”
“কি ভাবছেন?”
“আপনার অসুখটা নিয়ে ভাবছি।”
“ভেবে কি পেলেন? উত্তর মিলল কিছু?”

আমি একগাল হাসলাম। উত্তর তো অনেকই মিলেছে। কোনটার ব্যাখ্যা দেব আমি উনাকে? উনাকে কি বলব, এই রোগ কেবলমাত্র আপনাকেই কাবু করেনি। এই রোগ আমাকেও বড্ড বাজে ভাবে আহত করেছে। না, তা বলা যায় না। ওই যে বলে না, মেয়ে মানুষের বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না।

আমি লিখলাম,
“জটিল প্রশ্নের উত্তর কি সহজে মেলে?”
“আমার কি খুব জটিল কোনো অসুখ করেছে?”
“শুধু জটিল নয়। ভয়াবহ একটা অসুখ হয়েছে আপনার। যেই রোগে আপনি আক্রান্ত হয়েছেন, এই পৃথিবীতে কোনো ডাক্তার নেই যে এই রোগ সারাবে।”

ভদ্রলোক বোধহয় সামান্য শঙ্কিত বোধ করলেন। জবাব দিলেন না কিছু। আমার কেমন যেন ভয় ভয় করতে লাগল। মানুষটা কি আমার এমন করে বলায় রাগ করল? আমার ইঙ্গিতপূর্ণ কথা অনুধাবন করেই চুপ হয়ে গেছেন? আমার বুক ধুকপুক করতে লাগল। মানুষটাকে যে আমার জীবনের আলোকবর্তিকা মেনেছি আমি। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম উনার জবাবের। দীর্ঘসময় ব্যয় করলাম উনার ইনবক্সে। কিন্তু দেখা গেল একটা সময় নামের পাশে জ্বলজ্বল করতে থামা সবুজ বাতিটা নিভে গিয়েছে। সেখানে ভেসে উঠেছে পনেরো মিনিট পূর্বে উনার সক্রিয় থাকার বার্তা। আমি ক্ষুণ্ণ মনে বেরিয়ে এলাম ফেসবুক ছেড়ে। কিন্তু মিনিট খানেক পরেই আবার উঁকিঝুঁকি দিলাম একটিবার সবুজ বাতি দেখার আশায়। কিন্তু না, সেদিন বারবার আইডি ঘুরেও সবুজ বাতির সাক্ষাৎ পেলাম না। মনটা আঁকুপাঁকু করতে লাগল। অবসাদে ছেয়ে গেল বুক। সেদিন সারারাত আমার ঘুম হলো না। মাঝরাতে উঠে গিয়ে কিছুক্ষণ পরপর দেখতে লাগলাম উনার আইডিটা।

ভদ্রলোক জবাব দিলেন ভোরবেলা। এখানে উল্লেখ্য, আমার গৃহকর্তা নিয়মিত ফজরের নামাজ পড়েন। নামাজের পর দুটো নোনতা বিস্কিটের সাথে চা খান। বিয়ের আগে থেকেই উনার এই অভ্যাস। নামাজের পর আয়েশ করে চায়ে চুমুক বসিয়ে আমাকে ভদ্রলোক লিখেছিলেন,
“কেমন আছেন নবনী? রাতে ভালো ঘুম হয়েছে?”

সারারাত ঘুম হয়নি বিধায় আমার চোখ ভোরের দিকে লেগে এসেছিল। গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিলাম। সেই ঘুম ভাঙল দিবসের মধ্যভাগে। ঘুম থেকে উঠে ক্লান্ত, অবসন্ন শরীরটা নিয়ে বাথরুমে চলে গেলাম। দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল সেরে বের হয়ে ঘরে এসে আয়নায় দাঁড়িয়ে অনেক সময় নিয়ে দেখলাম নিজেকে। দেখতে আমি গড়পড়তা আর পাঁচটা বাঙালি মেয়ের মতোই। শ্যামলা গায়ের রঙ, বোঁচা নাক, বিশ্রী মোটা এক জোড়া ঠোঁট, যুক্ত ভ্রু যুগল, ডার্ক সার্কেল যুক্ত চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, মাথায় একগাছি লম্বা কেশ। এই। এইতো আমি। মুগ্ধ হবার মতো বিশেষত্ব কিছু নেই আমার মাঝে। না আমি মোটেও রূপবতী নই। এমন রূপহীন একটা মেয়েকে কেউ কেন উজাড় করে ভালোবাসবে? নিজেকে দেখে আমার ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল। বরাবর নিজের এই বাজে চেহারাটা নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগি আমি। চেহারা সুন্দর না হবার কারণে সমাজের অনেকে অনেক কথাই বলে। তদ্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, আমার বিয়ে হবে না।

গ্রামাঞ্চলে পরনিন্দা আর পরচর্চার বিষয়টি অধিক প্রচলিত কি না! আমার জন্মধাত্রীরও আমাকে নিয়ে চিন্তার অন্ত নেই। কে জানে, উনি হয়তো মানুষের কথা সত্য হয়ে যায় এই ভয়ে তটস্থ থাকেন। আয়নায় নিজেকে দেখে আমি বিড়বিড় করলাম,
“আমাকে কেন আরেকটু রূপসী বানালে না, আল্লাহ! কেন আমার গায়ের রঙ আরেকটু সুন্দর হলো না? কেন আল্লাহ? কেন?”

বলতে বলতে আমি কেন যেন কেঁদে ফেললাম। আমাকে দেখে অপছন্দ করে ভদ্রলোক আমার মেসেজের জবাব দিচ্ছেন না এমনটা নয়। কারণ তিন মাসের পরিচয়ে এখনো আমরা কেউ কাউকে দেখিনি। তবুও কেন যেন এইটাকে প্রধান কারণ দাঁড় করাতে চেষ্টা করলাম। হয়তো আমার আইডি ঘেঁটে আমার ছবি দেখেছেন তিনি। সন্দেহী মনে ফোন হাতে নিয়ে একবার ঘুরে এলাম নিজের আইডি। মুখ উন্মোচন করা কোনো ছবি নেই আমার আইডিতে। যা আছে সবই মুখ ঢাকা। তবে কেন আমার মেসেজের উত্তর দিচ্ছেন না তিনি? ইনবক্সে গিয়ে দেখলাম ভদ্রলোক মেসেজ দিয়েছেন। আমার মনে হলো দূরে বহুদূরে পালিয়ে যাওয়া আমার প্রাণ পাখিটি খাঁচায় ফিরে এসেছে। দ্রুত লিখলাম,
“ভালো আছি। আপনি রাতে আমার সাথে কথা বলতে বলতে কোথায় হারিয়ে গেলেন?”
মিনিটখানেক সময়ের ব্যবধানে সে লিখল,
“কেন? মিস করছিলেন বুঝি?”

আমি ধরে ফেললাম তার কথার সুর। আমিও তো একই ভঙ্গিমায় এই প্রশ্নটা করেছিলাম তাকে। তবে কি সে প্রতিশোধ নিচ্ছে? তার সাথে তিন দিন কথাহীন থাকার শাস্তি? শুকনো ঢোক গিলে আমি লিখলাম,
“মোটেও মিস করছিলাম না। কিন্তু কথা বলতে বলতে হুট করে হারিয়ে যাওয়াটা ভদ্রতা নয়, নিশ্চয়ই?”
সে লিখল,
“আমি কি খুব অভদ্র?”
“হুঁ।”
“আমাকে সহ্য করা যাচ্ছে না একদম?”
“না, ঠিক তা নয়।”
“তবে কি?”
“কিছু না।”

তিন অক্ষর সংবলিত শব্দটা লিখে আমি চুপ করে রইলাম। আমার বুকের ভেতর তখন একটা অচেনা পাখি ডানা ঝাপটাচ্ছে। সে কি আমাকে ভালোবাসে? পছন্দ করে সিকিভাগও? কথার টোন এমন অন্যরকম কেন? হাজারো প্রশ্ন আমাকে ঘিরে রইল। ভদ্রলোক নিজেই লিখল,
“আমার রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত বললে না তো!”
আমি লিখলাম,
“কেউ নিজেই জানতে আগ্রহী নয়। তাছাড়া আমি তো ডাক্তার নই।”

সঙ্গে জুড়ে দিলাম ঠোঁট বাঁকানো ইমোজি। যেন আমি তাকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবছি না মোটেও। অথচ তার গুরুত্ব আমার জীবনে অক্সিজেনের থেকেও কম কিছু নয়। মানুষটাকে যে আমি কতটা তীব্র ভাবে চাই তা সৃষ্টিকর্তা ভিন্ন আর কেউ জানে না। ভদ্রলোক একটা হাসির রিয়েক্ট দিল আমার কথায়।

এরপর লিখল,
“আমার রোগ বোঝার জন্য অভিজ্ঞ ডাক্তার প্রয়োজন বুঝি?”
“হুঁ।”
“আপনি কি কিছুই বুঝতে পারছেন না?”
আমি কম্পিত হস্তে লিখলাম,
“বুঝতে পারছি।”
“কি বুঝতে পারছেন? নাম কি এই রোগের?”
“প্রেম রোগ।”

এই সামান্য দুটো শব্দ লিখতে অনেকটা সময় নিলাম আমি। অনভিজ্ঞ রোমাঞ্চে সারা শরীর শিরশির করতে লাগল। খোলা জানালা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করা দক্ষিণা হাওয়া যেন সেই শিরশিরে অনুভূতিকে জোরালো তুলল। কপালে জমল বিন্দু বিন্দু ঘাম। আমার সমস্ত সত্তা হিম হয়ে গেল তার পরবর্তী কথা শোনার আগ্রহে। তার লেখার পূর্বাভাস যখন তিনটে ডট আকারে অবিরত নৃত্য করে চলে চোখের সামনে, তখন একই রকম তালে নৃত্য করে আমার হৃদপিণ্ড। সে লিখল,
“শুনেছি এই রোগ খুব খারাপ। যাকেই এই রোগ একবার ধরেছে মৃত্যু বিনা তার মুক্তি মেলেনি।”

আমি হতচকিত হয়ে লিখলাম,
“এ আবার কেমন কথা? বাজে কথা যত।”
“মোটেও বাজে কথা নয়। এটাই সত্যি কথা।”

আমি গোঁয়ারগোবিন্দ হলাম তখন। বাজে কোনো কথা উদ্ভট কোনো যুক্তি চাপিয়ে দিলেই আমি মেনে নেব? মোটেও না। লজিকের সাথে কোনো কমপ্রোমাইজ আমি কস্মিনকালেও করব না। তিনটে অ্যাংরি ইমোজির সাথে তাকে বললাম,
“প্রমাণ দিন দেখি। এটা কেমন সত্যি কথা।”
“প্রমাণ তো দূর থেকে দেওয়া যায় না। সেজন্য ভালোবাসতে হয়, কাছে আসতে হয়।”

আমার কেন যেন ‘কাছে আসা’ শব্দটিতে বড্ড সমস্যা হয়ে গেল। কাছে আসা আবার কি ধরনের আলাপ? উনার সাথে এমন কথা বলার মতো কোনো সম্পর্ক এখনো আমার হয়নি। যদিও তাকে সম্পূর্ণ উজাড় করে ভালোবেসে ফেলেছি। তা বলে এমন একটা কথা? মানতে আমার বড্ড বিবেকে বাঁধল। মনে কিঞ্চিৎ সন্দেহ হলো, স্বল্প পরিচিত বা অপরিচিত মেয়েদের ইনবক্সে গিয়ে কি উনি এসব কথাই লিখে বেড়ান? ছি! এ কেমন মানুষের প্রেমে পড়লাম আমি? গা গুলিয়ে উঠল হঠাৎ। বিক্ষিপ্ত মেজাজ নিয়ে উত্তর দিলাম,

“হোয়াট ডু ইউ মিন? কাছে আসা আবার কি? আমি কেন আপনার কাছে যাব?”

সঙ্গে সঙ্গেই সে লিখল,
“সরি, সরি আপনি কি আমার কথায় রাগ করলেন? আমি কাছে আসা বলতে দেখা সাক্ষাতের কথা বলেছি। অন্য কিছু নয়। প্লিজ, ভুল বুঝবেন না। আমি খুব সরি। এমন করে বলা উচিত হয়নি।”

আমি বুঝতে পারলাম না কি করব। মানুষটাকে কি বিশ্বাস করা যায়? শুধুমাত্র আমার বোঝার ভুল এই যুক্তিতে কি ক্ষমা করা যায় উনাকে? আমার অসহ্য লাগল খুব। দূর!প্রেম-ভালোবাসা নামক বস্তুটি এতো জটিল? হুটহাট মন খারাপ বা মন ভালো করে দেওয়ার জন্য এই জটিল শব্দ এতোটা ভূমিকা কেমন করে রাখে?

“ভাবী, এই ভাবী? কল ধরেন না কেন?”

ফোনের সুরেলা রিংটোন অনেকক্ষণ ধরেই কেউ আমাকে স্মরণ করেছে সেই বার্তা দিয়ে যাচ্ছিল। ভাবনায় বুঁদ হয়ে থাকা আমি টের পেলাম না কিছুই। স্মৃতিচারণ করছিলাম আমার প্রণয়ের কথা। আচানক পাশের রুমের ভাড়াটিয়ার কথায় আমার ধ্যানভঙ্গ হলো। কাটল স্মৃতির ঘোর। দেখলাম আমি বসে আছি জানালার ধারে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম অদূরের ওই ছাতিম গাছের দিকে। মাঝখানে একটা মেয়েলি গলার স্বর এবং পরবর্তীতে সেই স্বরের অধিকারিণী এসে আমার নিচ্ছিদ্র মনোযোগে বাধা দিল। দৃষ্টি সরিয়ে একবার ফোনের দিকে তাকালাম। আমার নিদারুণ অবহেলায় বাজতে বাজতে ক্লান্ত হয়েছে বস্তুটা। ফোনের স্ক্রিনে দেখতে পেলাম ভদ্রলোকের কল। পারতপক্ষে তার নাম্বারটাও সেভ করেছি ‘ভদ্রলোক’ নাম দিয়ে। আমি ফোনটা হাতে নিলাম না। তাকালাম আমার ভাবনার জাল ছিন্ন করা মহিলার দিকে। উনার নাম শায়লা। দেখতে রূপবতী। মোটামুটি স্বাস্থ্য। লম্বায়ও বেশ। শুধু যে উনি দেখতে সুদর্শনা তা ঠিক নয়। শায়লা ভাবীর স্বামীও যথেষ্ট জেন্টলম্যান। ভদ্রলোকের একটাই সমস্যা, প্রচুর কৃপণ। ছেলে-মেয়ে কিছু নেই। তবুও এই অতিশয় মিতব্যয়ী স্বভাব কিসের জন্য আমি বুঝতে পারি না।

শায়লা ভাবী আমার বিমূঢ় চেহারাটা দেখে জানালার গ্রিলের খুব কাছে মুখ এনে প্রশ্ন করলেন,
“হঠাৎ এমন ঝিমিয়ে গেলেন কেন? সমস্যা কি? হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে হঠাৎ এমন মরা কান্না জুড়ে দেওয়ার কি কারণ? অনেকরাত অবধি আপনার কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম।”

কথা সত্যি। গতকাল অনেক রাত অবধি জ্বরের মাঝেও বালিশে মুখ গুঁজে গুনগুনিয়ে কেঁদেছি। আমি যে পিরিয়ডের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছি সেই তথ্য জানত শায়লা ভাবী। উনারও ধারণা ছিল আমি বোধহয় মা হতে চলেছি। বোধকরি এই সম্ভাবনার সংবাদ উনার স্বামীর কর্ণগোচরও করেছিলেন তিনি। ফলশ্রুতিতে একটা বাজে ঝগড়া হয়েছিল উনাদের মাঝে। সমস্যা দুজনেরই আছে। তবে ঝগড়ার সময় উনারা একে অপরের দিকে খুব বাজে ভাবে আঙুল তুলেন। মা-বাবা না হতে পারার সম্পূর্ণ ব্যর্থতা একজন চাপিয়ে দেন অন্যজনের ঘাড়ে।
আমি বললাম,
“এমনি। শরীর ভালো না।”
“কেন? শরীরে আবার কি হইলো?”

শায়লা ভাবীর বড় কৌতূহলী প্রশ্ন। অবশ্য এই মরা কান্না দেখে যে কারো কৌতূহল হওয়া স্বাভাবিক। আমি বিষণ্ণ মুখে জানালাম,
“কিছু হয়নি।”
“কিছু হয়নি, নাকি মিষ্টি খাওয়ানোর ভয়ে শুভ সংবাদটা দিবেন না?”

আমার চোখ ছলছল করে উঠল। গতকালের পর থেকে আমার চোখ অকারণেই হুটহাট ছলছল করে উঠছে। না, কোনো লোকসমাগমের ভয়ে বাঁধন দিতে পারছি না চোখের জলে। এই থৈ থৈ জলের মাঝে যেন ভেসে উঠছে এক আকাশ পরিমাণ দুঃখ। আমি ভেজা গলায় বললাম,
“যদি শুভ সংবাদই হতো তবে কি এমন করে কাঁদতাম ভাবী? আমার সুখের অন্ত থাকত না তাহলে। অথচ দেখুন আমি কাঁদছি। সুখে কেউ এমন করে কাঁদে?”

শায়লা ভাবী অপ্রস্তুত হলেন। হকচকিয়ে আমার দিকে তাকালেন। দেখে নিলেন আমাকে পূর্ণ দৃষ্টিতে। এরপর গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“কি হয়েছে? বাচ্চা পেটে না?”
“না।”

শায়লা ভাবী খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর আমাকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বললেন,

“বিয়ের মাত্র এই কয়দিন। এর মাঝেই বাচ্চা পেটে না দেখে এমনে কাঁদতে হবে? আমার বিয়ের যে আট নয় বছর হয়ে গেল, আমি কি এমন করে কাঁদছি? পা-গ-ল হইছেন?”

আমি ধীর লয়ে জবাব দিলাম,
“আমার খুব বড় অসুখ করেছে ভাবী। এই অসুখ হইলে নাকি জীবনে কখনো বাচ্চা হয় না। আমার জীবনে কোনোদিন বাচ্চা হবে না ভাবী।”

শায়লা ভাবী ঝট করে আমার দিকে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
“কি সব উল্টাপাল্টা কথা বলেন?”
“উল্টাপাল্টা না ভাবী। এসব সত্যি কথা। ডাক্তার বলেছে।”

বলতে বলতে আমি ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেললাম। ঝাপসা চোখে দেখলাম শায়লা ভাবী জানালার গ্রিল শক্ত করে চেপে ধরেছে। বোঝা যাচ্ছে এমন করুণ খবরে সে খুবই মর্মাহত। শায়লা ভাবী নিশ্চুপ সেখানে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। একটা সময় পর বলল,

“কি রোগ হয়েছে?”
“ওভারিতে সিস্ট হয়েছে।”
“এটা আবার কি রোগ? জীবনে তো নামই শুনিনি।”

এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে আমি আটকে গেলাম। আমি জানি না ওভারিয়ান সিস্ট মানে কি? এমনকি অনার্স প্রথম বর্ষে পড়া আমি ওভারি সম্পর্কেও ঠিকঠাক জ্ঞান রাখি না। শুধু যে এই বিষয় তা নয়, আমি তেমন করে কোনো বিষয়েই জ্ঞান রাখি না। আমার মাঝে মাঝে খুব আশ্চর্য লাগে এই ভেবে— আমি কি করে এসএসসি, এইচএসসিতে ভালো নাম্বার পেয়ে পাস করলাম? বিদ্যের ঝুলি যে একেবারেই ফাঁকা। আমি নিজের অজ্ঞতা গোপন করলাম। ডাক্তার যা বলেছে তা সাতপাঁচ ঘুরিয়ে বললাম,

“সিস্ট হচ্ছে পানির ছোট ছোট ফুটকা। সেগুলো বাচ্চা হবার পথ বন্ধ করে রাখে। মাঝে মাঝে এসব বড় হয়ে ফেটে যায়। তখন মানুষ মারা অবধি যেতে পারে। আবার এই সিস্টের কারণেই মেয়েদের পিরিয়ড অনিয়মিত হয়। আর..”

শায়লা ভাবী মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনছিলেন। কিন্তু আমি আরও বিস্তারিত জানানোর আগেই আমার ফোনটা আবার কর্কশ শব্দে বেজে উঠল। যদিও বিস্তারিত সবই অজানা আমার তবুও আরও বোধহয় বলতে যাচ্ছিলাম। বলা হলো না। শায়লা ভাবী চলে গেলেন। আমি অনিচ্ছায় স্বামীর কল রিসিভ করলাম। রিসিভ করতেই ভদ্রলোকের চিন্তিত স্বর ভেসে এল প্রশ্নের ঝুড়ি নিয়ে,

“নবনী, কি করছো তুমি? ঠিক আছো? সেই কখন থেকে কল দিচ্ছি ধরছো না কেন? ঘুমাচ্ছিলে নাকি? নাস্তা খেয়েছো? ওষুধ খেয়েছো? তোমার জ্বর এসেছে আবার?”

—চলমান—

নীল ধ্রুবতারা পর্ব-০২

#নীল_ধ্রুবতারা [২]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

আমাদের প্রেমের বিয়ে। ভদ্রলোকের সাথে আমার পরিচয় ফেইসবুকে। ফেইসবুক নামক একটা প্ল্যাটফর্মেও যে এহেন রত্ন খুঁজে পাওয়া যায় সেই সম্পর্কে আমার ধারণাও ছিল না। তবে আমি পেলাম একটা খাঁটি রত্ন খুঁজে। ঘটনা হচ্ছে, এসএসসি পরীক্ষার পর বাবা আমাকে একটা ফোন কিনে দিলেন। মোটামুটি দামী ফোন। মানুষ বহু আকাঙ্ক্ষিত বস্তু পাবার পর যেমন খুশি হয় আমিও তেমন খুশি হলাম। বন্ধুদের সাথে নানা ভাবে যোগাযোগ করে এই আনন্দের সংবাদটা প্রচার করে দিলাম তাদের কাছে। সহপাঠীদের অনেকেই তখন এই যন্ত্রের স্বাদ নিচ্ছে হৃষ্টচিত্তে। ফোন কিনে দিলেও নিয়মিত ফোনে টাকা পাঠানোর ব্যাপারে বাবার আপত্তি ছিল। সুতরাং বন্ধুদের সাথে যোগাযোগের বিকল্প মাধ্যম খোঁজা আমার প্রয়োজন ছিল ভীষণ।

একজন আমাকে জানাল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে কথা। এতে নাকি ফ্রী-তে মেসেজ করা যায়। আমি আনন্দিত মনে ফেইসবুক ডাউনলোড করলাম। একাউন্ট খুললাম। আমার কাছে উন্মোচিত হলো পৃথিবীর নতুন দ্বার। এতো আশ্চর্য লাগতো সব! যদিও অতশত বুঝতাম না। গণহারে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতাম এবং এক্সেপ্ট করতাম। কপি পেস্ট করে করে অন্যের পোস্ট গ্রুপে গ্রুপে ছড়িয়ে দিতাম। বিধাতা জানেন এতে আমার এতো আনন্দ কেন হতো!

একদিন একটা নতুন গ্রুপে পোস্ট করেছি কিন্তু তিনদিন পরেও সেই পোস্ট এপ্রুভ হলো না। রাগে দুঃখে স্ক্রিনশট নিয়ে সেই গ্রুপের এডমিনকে ইনবক্স করলাম, “ভাইয়া, আপনি কি এই গ্রুপের এডমিন? দেখুন আমি তিন দিন আগে একটা পোস্ট করেছি। এখনো এপ্রুভ হচ্ছে না।”

ভদ্রলোক আমাকে রিপ্লাই দিলেন আরও তিন দিন পর। আমি বারবার উনার আইডিতে গিয়ে চেক করি উনি আমার কথার উত্তর দেয় কিনা। কিন্তু বারবার হতাশ হই। তিন দিন পর প্রায় রাত নয়টার দিকে তিনি উত্তর দিলেন,

“জ্বী আপু। আমি এই গ্রুপের এডমিন। আপনি দাঁড়ান, আমি এপ্রুভ করে দিচ্ছি।”
“আচ্ছা।”

আমি আনন্দিত মনে ভদ্রলোকের মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম। ফেইসবুক গ্রুপের এডমিনকে তখন আমি বোধহয় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো বিরাট কেউ মনে করতাম। উনার মতো বিরাট পর্যায়ের লোক আমার মতো নগণ্য মানুষের কথার উত্তর দিয়েছেন তা তো হাতে চাঁদ পাওয়ার মতোই আনন্দের। এরপর থেকে ওই গ্রুপে নিয়মিত পোস্ট করতাম আমি। পোস্ট করে সাথে সাথে গিয়েই উনাকে বলতাম,

“ভাইয়া, আমার পোস্টটা প্লিজ এপ্রুভ করে দিন।”

বলার সাথে সাথে ব্যস্ততা ভুলে ভদ্রলোক আগে আমার পোস্ট এপ্রুভ করতেন। দিনে বিশটা পোস্ট করলেও তিনি সাথে সাথেই সেগুলোর হিল্লে করতেন। কখনো বিরক্ত হতেন কিনা জানি না। তবে আমি খুবই আনন্দিত হতাম। আমাদের পরিচয়ের সেই শুরু। এরপর নিয়মিত পোস্ট করার সাথে সাথে নিয়মিত তাকে ইনবক্সে নক করাও যেন আমার অভ্যাসে হয়ে দাঁড়াল। তার সাথে কথা না বললে, আমার অস্থির লাগে। দম বন্ধ হয়ে আসে। দিন কাটে না। একটা সময় পর মনে হলো আমার বোধহয় মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ভয়াবহ এক অসুখের পূর্ব লক্ষণ এসব। একদিন তাকে মেসেজ করলাম,

“আপনার সাথে আজ থেকে আর কোনো যোগাযোগ করব না। আমার ফোনটা আব্বাকে দিয়ে দিচ্ছি।”

না। আদতে ফোন আব্বাকে দিচ্ছি না। মূলত নিজের মাঝে যেই অস্থিরতা লক্ষ্য করেছি সেই অস্থিরতার ছিঁটেফোঁটাও ভদ্রলোককে স্পর্শ করেছে কিনা সেটা জানার জন্যই আমার এই ছলচাতুরী। আমার চতুরতা সে ধরতে পারল না। লিখল,

“কেন?”
“আসলে আব্বার ফোনটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এখন কিছুদিন আমার ফোন ব্যবহার করবে।”

সে লিখল, “আচ্ছা।”

তার ‘আচ্ছা’ দেখে আমার ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল। আমার অনুপস্থিতি তাকে যন্ত্রণা দেবে না, একাকিত্ববোধ করাবে না এটা ভেবেই যেন কান্না পেল আমার। কেন? আমাকে সে কেন একটুও মিস করবে না? কেন আমাকে মনে করে মন পুড়বে না তার? অথচ এক বেলা তার সাথে কথা না হলে আমার ভীষণ পাগল পাগল লাগে। তবে কেন, একই অনুভূতির যাতাকলে পিষ্ট হবে না সে? আপনমনে এই প্রশ্নগুলো করতে করতে নিজেকে বোকা বলে ধিক্কার দিলাম হাজারবার। এক পাক্ষিক একটা ভালোবাসায় আমার মন জড়িয়ে গেছে সেটা বুঝতে বাকী রইল না কিছু। অভিমানে তিন দিন অফলাইনে ছিলাম।

দিন তিনেক পরে অনলাইনে গিয়ে দেখি অপরিচিত, অদেখা ভদ্রলোক মেসেজের বন্যা বইয়ে দিয়েছেন। কতশত কথা! কতশত মেসেজ! কয়েকবার অডিও কলও দিয়েছেন। উনার উদ্বিগ্নতা দেখে খুশিতে আমার মনটা চনমনে হয়ে উঠল। আমি লিখলাম,
“বাবাহ, এতো মেসেজ! খুব মিস করছিলেন বুঝি?”

ভদ্রলোক লাইনেই ছিলেন। জবাব এল,
“খুব বেশী।”
“তিনদিনেই এতো? যেদিন নীল-সাদার দুনিয়া থেকে চিরতরে হারিয়ে যাব, সেদিন কি করবেন?”

আমার কথার প্রেক্ষিতে ভদ্রলোক তিনটে রাগের ইমোজি দিল। বহু সময় নিয়ে টাইপ করতে লাগল কি যেন। উনার দীর্ঘ টাইপিংয়ে কোন বার্তা ভেসে আসে সেটা দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে রইলাম আমি। অনেকটা সময় পর বিরক্ত হয়ে ঘুরে এলাম তার আইডি থেকে। বেচারা তিন দিনেই অসংখ্য দুঃখের কথায় ভর্তি করে ফেলেছে নিজের প্রোফাইল। উনার স্যাড পোস্টগুলোর কমেন্ট বক্সে ঘুরে এলাম আমি। কয়েকজন বন্ধু লিখেছে,

“কি ব্যাপার মাহতাব, ছ্যাঁকা খেয়েছো নাকি?”

এসব কমেন্টেও দেখা মিলল ভদ্রলোকের রাগের রিয়েক্ট। জবাব কিছু দিলেন না তিনি। প্রায় প্রতিটি পোস্টেই কেউ না কেউ এ জাতীয় মন্তব্য করেছে। এসব দেখে আমার ভীষণ হাসি পেল। আহারে বেচারা! একটা উপযুক্ত প্রেম না করেও ছ্যাঁকাখোর ট্যাগ সহ্য করতে হচ্ছে উনাকে। তার এক বন্ধু লিখল,

“জীবনে প্রথমবার ছ্যাঁকা খাইলে যা হয়! দুঃখ করিস না বন্ধু। মেয়েরা হচ্ছে ছলনাময়ী। এদের বিশ্বাস করাটাই ভুল। মেয়েদের সাথে প্রেম করলে এমনই হয়।”

ভদ্রলোক এই কমেন্টের উত্তর দিয়েছেন। তিনি জবাবে লিখেছেন, “তুই তাহলে একটা ছেলের সাথে প্রেম করিস বন্ধু।”

জবাব দেখে আমার পেটে খিল দেওয়ার মতো হাসি পেল। বুঝলাম অতি শান্ত, ভদ্র যেই মানুষটার সাথে আমার পরিচয় ঘটেছে তিনি এতোটাও ভদ্র নয়। একই মুদ্রার আরেকটা পিঠ আছে তবে। মুদ্রার উল্টো পিঠের মানুষটা ভারী দুষ্টু। এর সাথে আমার প্রেম হলে ভারী দুষ্টু একটা প্রেমিক পাব আমি। আমি ফের ফিরে গেলাম ইনবক্সে। বহুক্ষণ ধরে ভদ্রলোক কি লিখেছে সেটা দেখার উত্তেজনায় আমার হাত-পা অবশ হয়ে এল। আমি বোধহয় এই ভাবনায় নিশ্চিত ছিলাম, ভদ্রলোক এখন আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিবে। কিন্তু দেখতে পেলাম আমাকে অবাক করে দিয়ে ভদ্রলোক একটা আশ্চর্য কথা লিখেছে। জানতে চেয়েছে কারণ।

“নবনী, এই নবনী?”

শরীরে একটা মৃদু ঝাঁকুনি অনুভব করে আমার ঘুম ছুটে গেল। ছিন্ন হলো আমার স্বপ্নের ঘোরের জাল। আমাদের অতীতের একটা দৃশ্যপট সুনিপুণ বিন্যাসে ধরা দিয়েছিল ঘুমন্ত চোখের পাতায়। আহা! আমার সেই সোনালী অতীত। চোখ বুজলেই যেই অতীতের স্নিগ্ধতা শরীর মন শীতল করে দেয়। কি দিন ছিল সেই সব। প্রেমে যে কি অপার সুখ সেটা তো এই ভদ্রলোকের থেকে জেনেছি আমি। ঘুম ঘুম চোখে আমি নির্বাক হয়ে চেয়ে রইলাম তার দিকে। ওই তো আমার সেই প্রেমিক পুরুষ। যাকে প্রথম দেখেছিলাম বৃষ্টিস্নাত এক দুপুরে। না, একগুচ্ছ কদম হাতে নয়। একগুচ্ছ গোলাপ হাতে এসেছিল সে। বিভিন্ন রঙের গোলাপ। আমি বিমুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম তাকে দেখে। যেমন আজও হচ্ছি।

ঘনঘোর বর্ষার এই দিনেও ভদ্রলোকের কানের পাশ ঘেঁষে নামছে সরু ঘামের ধারা। অন্য সময় ঘুম থেকে উঠে এমন ঘর্মাক্ত মুখশ্রী দেখলে ব্যস্ত হয়ে পরনের ওড়নার কোণ দিয়ে মুছে দিতাম সেই নোনাপানি। আজ আর ইচ্ছে করল না। শরীর ও মনে কোথাও সেই তাড়না নেই। সে আমার বিমূঢ় চোখে চেয়ে থাকতে দেখে সামান্য হকচকিয়ে গেল বোধহয়। নিজের বাম হাত দিয়ে কপালে মুক্তোর বিন্দুর ন্যায় জমে থাকা ঘামটুকু মুছে নিয়ে অদ্ভুত কায়দায় ছুঁড়ে ফেলল দূরে। মেঝেতে গড়িয়ে পড়া ওই একবিন্দু জলের দিকে চেয়ে রইলাম আমি। এমন করেই হয়তো সে কোনো একদিন আমাকে ছিঁড়ে ফেলবে নিজের জীবনের পাতা থেকে। সে আমার পাশে বসে কপালে হাত রাখল। না, জ্বর নেই। অস্ফুটে সে বলল,

“আলহামদুলিল্লাহ, জ্বর কমে গেছে। শোনো, আমি খিচুড়ি রান্না করেছি। তুমি খেয়ে ওষুধ খাও। সকালের ওষুধ আমি গুছিয়ে রেখেছি ওখানে।”

তার ইশারাকৃত স্থানের দিকে একবার তাকালাম আমি। টেবিলের ওপর রাখা ট্যাবলেটগুলো দেখে আমার বুকটা আবার হু হু করে উঠল। আস্ত ট্যাবলেটের পাতা থেকে সকল ট্যাবলেট কাঁচি দিয়ে একটা করে কেটে রেখেছেন তিনি। কেন আমাকে এতো আদর আহ্লাদ করতে হবে? এই আহ্লাদ যখন শেষ হয়ে যাবে আমি তখন সহ্য করতে পারব না। একদম পারব না। আমার চোখ ভরে উঠল জলে। গতকাল সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরেছি। এসে থেকে বর্ষার অবিরাম ধারার মতো কেঁদেছি যতক্ষণ জেগে ছিলাম ততক্ষণ। আমাকে নিভৃত করার অনেক চেষ্টা করেছেন ভদ্রলোক। পারেনি। শেষটায় হতাশ হয়ে বললেন,

“ডাক্তার কি বলেছে আমাকে তো ঠিক করে জানালেও না। একা একা কেঁদে অস্থির কেন হচ্ছো? তুমি না আমার লক্ষ্মী বউ। লক্ষ্মী মেয়েরা তো এমন করে কখনোই কাঁদে না।”

অন্য সময় হলে, কয়টা লক্ষ্মী মেয়ের সাথে তার পরিচয় আছে সেই প্রশ্ন করে তাকে জর্জরিত করে ফেলতাম আমি। বাচাল নামক একটা বিশেষণ আমার সাথে খুব যায়। আজ হঠাৎ নিজের সাথে সেই বিশেষণের যোজন যোজন দূরত্ব টের পেলাম। কোনো নাটকীয়তা ছাড়াই রাতে তাকে সবটা খুলে বলেছিলাম আমি। বলা বাহুল্য সন্তান হবে না এই বিষয়টি থেকে আমার ওভারিতে থাকা সিস্ট উনার চিন্তার প্রধান বিষয়বস্তু ছিল। সে অনেক রাত অবধি আমার রিপোর্টগুলো নিয়ে ঘাটাঘাটি করেছে। অনলাইনে রিসার্চ করেছে বিস্তারিত। পরিচিত একটা গাইনী ডাক্তারের সাথে ফোনে কথাও বলতে শুনেছি। তবে পাত্তা দেইনি সেসব।

কাঁদতে কাঁদতে একটা সময় গা কাঁপিয়ে জ্বর এল আমার। শীত শীত করতে লাগল খুব। ফ্যান বন্ধ করে দিয়ে এসে কাঁথা-কম্বল মুড়ি দিয়ে ঝরাতে লাগলাম চোখের জল। বর্ষাকালের শীত শীত ভাব বিরাজমান প্রকৃতিতে। তা বলে ফ্যান বন্ধ করে কাঁথা মুড়ি দিয়ে নাক মুখ ঢেকে রাখার মতো মাঘমাসের শীত নামেনি। ভদ্রলোক বাগ্র হয়ে ছুটে এলেন। ব্যাকুল গলায় প্রশ্ন করলেন,
“এ্যাঁই কি হয়েছে তোমার?”

আমি জবাব দিলাম না। ভদ্রলোক আমার শরীর থেকে কাঁথা সরাতেই শিউরে উঠল সর্বাঙ্গ। লোমকূপ অবধি খাড়া হয়ে উঠল শীতের তোপে। গায়ে হাত দিয়ে চমকে উঠলেন তিনি। অতি চিন্তিত স্বরে বললেন,
“একি! গা তো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।”

এরপর উনি নিজের একটা গেঞ্জি ভিজিয়ে এনে খুব গুছিয়ে আমার কপালে জলপট্টি দিলেন। আমরা হসপিটালে যাবার আগে দুপুর আর রাতের রান্না করে গিয়েছিলাম। ওহ, আমি না বলে আমরা বলছি কেন? কারণ ছুটির দিনে ভদ্রলোক রান্নায় আমাকে খুব সাহায্য করেন। সাহায্য না, উনার চাওয়া ছুটির দিনে উনি নিজে আমাকে রান্না করে খাওয়াবেন। প্রথমে কয়েকবার উনার এই চাওয়াকে সম্মান করেছি আমি। তবে কয়েক সপ্তাহ দেখার পর আর সেই প্রবৃত্তি হয়নি। বলা বাহুল্য, উনার ব্যঞ্জনে তেল, ঝাল মশলার এতো অপ্রতুলতা থাকে যে সেই খাবার মুখে তোলা যায় না। আবার মুখের উপর বলাও যায় না, তোমার রান্না খেতে পারি না আমি। তাই কসরত করে ছুটির দিনে আমি আর ও মিলে রান্না করি। সে যদি সবজি কাটে আমি সেই সবজি রান্না করি। সে মাছে নুন হলুদ মাখায় আমি ভেজে দেই। আবার আমি পেঁয়াজ কাটি সে গরম তেলে সেই কাটা পেঁয়াজ বেশী করে দিয়ে পিয়াজু ভাজে। এই তো আমার সুখ। তবে যেই সুখী সংসারের গল্প আমি করেছি তাতে মিথ্যে কি আছে বলুন?

ভদ্রলোক খাবার গরম করে নিয়ে এলেন। কিন্তু আমি খেলাম না কিছু। রুচি হলো না। হাজার অনুরোধ উপরোধের পর ব্যর্থ হয়ে একটা আপেল কেটে দিলেন তিনি। আমি সেটাও ফিরিয়ে দিলাম অবহেলায়। হতাশ হয়ে শেষ অবধি আমাকে খালি পেটেই একটা নাপা ট্যাবলেট খাওয়ালেন তিনি। যেহেতু খালি পেট সেহেতু আজকে ডাক্তার যেসব ওষুধ দিয়েছেন সেসব আর দিলেন না। আমিও আগ্রহ দেখালাম না। বরং চোখ বন্ধ করে নিলাম। কপালের জলপট্টি থেকে আমার নাকে আসতে লাগল আমার স্বামীর গায়ের গন্ধ। পৃথিবীর সবচেয়ে দামী পারফিউমের মাঝেও বোধহয় এতো সুগন্ধ নেই। এই গন্ধে ঘোর লাগে। চোখ বুজে আসে। ঘুম পায় ভীষণ। খুব গাঢ় ঘুম।

এরপর সকাল হলো। একটা অন্যরকম সকাল। আমার জীবনের পাতা বদলে দেওয়া একটা সকাল। ভদ্রলোক গোসল শেষ করে ফিটফাট হয়ে অফিসের জন্য বেরিয়ে গেলেন। যাবার আগে মারাত্মক সুদর্শন পুরুষটি আমার মতো এলোমেলো নারীর কপালে গাঢ় চুম্বন করলেন। কপালের এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে বললেন,

“আসি হ্যাঁ? তুমি কিন্তু ঠিক করে ওষুধ খাবে।”

বরাবরের মতো আমি নির্বাক রইলাম। সে আমাকে আবারও বারবার করে ওষুধ খাবার কথাটা স্মরণ করিয়ে দিল। কিন্তু আমি? আমি কানেও তুললাম না সেসব। ভদ্রলোক বেরিয়ে যেতেই গতকালের অসহ্য যন্ত্রণা ফিরে এল আবার। নিদারুণ এক একাকিত্ব আমাকে গ্রাস করে নিল তখন। আমি কল্পনা করতে লাগলাম আমার ভাঙা সংসারের প্রতিচ্ছবি। যেখানে আমার এই দায়িত্বশীল স্বামী বদলে গিয়ে হয়ে উঠেছেন একজন হবু বাবা। যিনি একটিবার নিজের সন্তানের মুখে বাবা ডাক শোনার জন্য মরিয়া। আমার কানে বাজতে লাগল কল্পপুরুষের তাচ্ছিল্যের স্বর,

“যে নারী কোনোদিন মা হতে পারবে না, তার সাথে সারাজীবন কেন থাকব? কোন আশায়? তোমার ব্যর্থতার জন্য কেন বাবা ডাক শোনা থেকে বঞ্চিত থাকব আমি? নবনী প্লিজ, এবার এই সংসার সংসার খেলার সমাপ্তি হোক। আমাদের দুজনের ভালোর জন্য এবার একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেই হবে।”

—চলমান—