#The_winter_You_left
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#শেষ_পর্ব
আজ বুধবার। প্রিমিয়ার শোর আর মাত্র দুদিন বাকি। সু-আ’র আজকে দুপুরের পর রিহার্সাল ছিল না। সে ডিরেক্টরের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে সোজা চলে এলো ইনসা-দংয়ের সেই চেনা গলিতে। গলির মুখটায় আসতেই সু-আ’র বুকটা ধক করে উঠল। ‘গিয়োউল’ ক্যাফের দরজার সেই ‘ক্লোজড’ সাইনবোর্ডটা উল্টে দেওয়া হয়েছে। সেখানে এখন লেখা ‘ওপেন’। জানালার কাঁচের ওপাশে একটা আবছা আলো জ্বলছে। সু-আ এক প্রকার দৌড়ে গিয়ে ক্যাফের দরজাটা ঠেলল। দরজা খোলার সাথে সাথে সেই চেনা কফির সুবাস তার নাকে এলো। কিন্তু কাউন্টারের পেছনে কিম মিনহো দাঁড়িয়ে ছিল না। সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক, মাথায় হালকা পাকা চুল, পরনে কালো রঙের কোট। সে খুব মন মরা হয়ে ক্যাফের টেবিলগুলো একটা সাদা কাপড় দিয়ে মুছছিল। সু-আ ভেতরে ঢুকে চারপাশটা একবার দেখে নিল। ক্যাফেটা কেমন যেন নিঝুম, প্রাণহীন। সে কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল, “শুভ দুপুর। আচ্ছা… মিনহো কোথায়? কিম মিনহো?”
ভদ্রলোক কাপ মোছা থামিয়ে সু-আ’র দিকে তাকালেন। তার চোখে গভীর ক্লান্তি আর বিষাদ। সে সু-আ’র মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল, যেন কিছু একটা চেনার চেষ্টা করছে। তারপর খুব নিচু স্বরে বলল, “আপনি কি হান সু-আ?”
সু-আ চমকে উঠল, “হ্যাঁ, আমি সু-আ। আপনি আমার নাম জানলেন কী করে? মিনহো কোথায়? ওর শরীর কি খুব খারাপ?” ভদ্রলোক একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। কাপড়টা টেবিলের ওপর রেখে বললেন, “আমি মিনহোর চাচা। এই ক্যাফেটার আসল মালিক আমিই। মিনহো গত তিন বছর ধরে এই ক্যাফেটা চালাচ্ছিল।”
“ও কোথায়? ও ক্যাফেতে আসছে না কেন? ওর কি সেই ধুলোর অ্যালার্জিটা বেড়েছে?” সু-আ’র গলার স্বর কাঁপতে শুরু করল। বুকের ভেতর একটা কালো মেঘ জমছে। মিনহোর চাচা সু-আ’র দিকে একটা চেয়ার ইশারা করে বললেন, “বসুন মা। আপনার সাথে মিনহোর অনেক কথা ছিল, কিন্তু ছেলেটা কোনোদিন মুখে কিছু বলতে পারল না। ও বড় বেশি অন্তর্মুখী ছিল।”
সু-আ বসল না। সে টেবিলের ওপর দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলল, “আমাকে দয়া করে পরিষ্কার করে বলুন, মিনহো কোথায়?” ভদ্রলোক তার পকেট থেকে একটা চাবির গোছা বের করলেন। তারপর কাউন্টারের পেছনের সেই ছোট ড্রয়ারটা খুললেন, যেখান থেকে মিনহো নীল রঙের বড়ি বের করে খেত। ড্রয়ারের ভেতর থেকে সে একটা নীল রঙের প্লাস্টিকের ফাইল আর একটা সাদা খাম বের করে সু-আ’র সামনে রাখলেন। ফাইলে বড় বড় করে লেখা ‘সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হসপিটাল’।
“মিনহো এখন হাসপাতালে। সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হসপিটালের আইসিইউ-তে। ও লাইফ সাপোর্টে আছে।” ভদ্রলোকের গলাটা ভেঙে এলো।
সু-আ’র মনে হলো তার চারপাশের পুরো পৃথিবীটা হুট করে থমকে গেছে। দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দটা বন্ধ হয়ে গেছে। জানালার বাইরের বরফ পড়াটা থমকে গেছে। সে অবশ হাত বাড়িয়ে ফাইলটা হাতে নিল।
ফাইলটা খুলতেই সু-আ’র চোখের সামনে ভেসে উঠল মেডিকেল টার্মগুলো, ‘Advanced Stage Small Cell Lung Carcinoma’। ফুসফুসের শেষ পর্যায়ের ক্যান্সার। নিচে তারিখ দেওয়া আছে, আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগের। ক্যান্সারটা মিনহোর পুরো ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়েছিল। ডাক্তাররা তাকে তিন বছর আগেই বলেছিল, তার হাতে সময় খুব কম। কোনো চিকিৎসা বা কেমোথেরাপি তাকে বাঁচাতে পারবে না। মিনহো কোনো চিকিৎসা নেয়নি। সে হাসপাতাল ছেড়ে এই ছোট্ট ক্যাফেতে এসে শান্তভাবে নিজের মৃত্যুর দিন গুনছিল। সু-আ’র চোখ দিয়ে টুপটাপ করে জল গড়িয়ে পড়ল ফাইলের পাতার ওপর। হসপিটালের সিলের ওপর সু-আ’র চোখের জল পড়ে লেখাগুলো লেপ্টে যেতে লাগল। সে অস্ফুট স্বরে বলল, “ক্যান্সার? ও তো বলেছিল ওর ধুলোয় অ্যালার্জি… ও তো শুধু একটু কাশছিল…”
মিনহোর চাচা চোখ মুছে বললেন, “ও কাউকেই জানতে দেয়নি মা। আমাকেও ও বারণ করেছে। ও বলছিল, মানুষ যখন জানে কেউ মরে যাচ্ছে, তখন তারা তাকে অন্য চোখে দেখে। করুণা করে। মিনহো করুণা সহ্য করতে পারত না। ও চেয়েছিল ওর শেষ দিনগুলো যেন খুব স্বাভাবিক মানুষের মতো কাটে। কিন্তু গত সপ্তাহে… সেই যে যেদিন প্রথম বরফ পড়ল… ও রাতে ক্যাফে বন্ধ করে বাসায় ফেরার পর প্রচণ্ড রক্তবমি করে অজ্ঞান হয়ে যায়। তারপর থেকে ও আর চোখ খোলেনি।” সু-আ ফাইলটা বুকে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে পড়ে গেল প্রথম বরফপতের সেই রাতের কথা। মিনহো তার নীল দস্তানা পরা হাত দিয়ে সু-আ’র কোটের বরফ ঝেড়ে দিয়েছিল। মিনহো তাকে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল। সু-আ তখন খুশিতে আত্মহারা ছিল, সে টের পায়নি তার জড়িয়ে ধরা মানুষটা তখন নিজের শেষ নিঃশ্বাসটুকু দিয়ে মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করছিল।
“এই চিঠিটা ও আপনার জন্য রেখে গেছে মা। ও বলেছিল, যদি ও কোনোদিন হুট করে হারিয়ে যায়, তবে এই ফাইল আর চিঠিটা যেন আপনাকে দেওয়া হয়।” ভদ্রলোক সাদা খামটা সু-আ’র দিকে এগিয়ে দিলেন। সু-আ কাঁপতে কাঁপতে খামটা নিল। খামটা খুলতেই মিনহোরপরিষ্কার হাতের লেখা ভেসে উঠল,
সু-আ,
“তুমি যখন এই চিঠিটা পড়বে, তখন হয়তো আমি আর গিয়োউল ক্যাফের কাউন্টারে বসে থাকব না। তোমার তিতো কফি খাওয়ার মানুষটা সিউল শহরের এই ঘন কুয়াশার মাঝে কোথাও হারিয়ে গেছে।
মিথ্যে বলার জন্য ক্ষমা চাইছি। আমার ধুলোয় কোনো অ্যালার্জি ছিল না। আমার ভেতরটা অনেক আগেই ফুরিয়ে গিয়েছিল। ডাক্তাররা আমাকে বলেছিল আমি আর বড়জোর কয়েক মাস বাঁচব। আমি নিয়তিকে মেনে নিয়েছিলাম। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে ভাবতাম, আজই বুঝি আমার শেষ দিন। জীবনটা আমার কাছে একটা সাদা, রঙহীন ক্যানভাসের মতো বিষাদময় হয়ে উঠেছিল। ঠিক তখনই, এক বৃষ্টির দিনে তুমি আমার ক্যাফেতে এলে। চোখভর্তি জল আর একবুক অবাধ্যতা নিয়ে তুমি যখন আমার সামনে বসলে, আমি প্রথমবার অনুভব করলাম বেঁচে থাকার আকুতি কাকে বলে। তোমার সেই ফেলে যাওয়া হলুদ খামটা যখন আমি পড়লাম, আমার মনে হলো, ঈশ্বর আমাকে এই পৃথিবীতে আরও কয়েকটা দিন অতিরিক্ত সময় দিয়েছেন শুধু তোমার এই ভাঙা ক্যানভাসে কিছু রঙ ছড়ানোর জন্য। আমি থিয়েটার ডিরেক্টর ছিলাম না সু-আ। আমার মা একজন বড় থিয়েটার অভিনেত্রী ছিলেন। ছোটবেলা থেকে মায়ের রিহার্সাল দেখতে দেখতে আমি অভিনয়টা শিখেছিলাম। মা বলতেন, আসল অভিনয় থিয়েটারের মঞ্চে হয় না, আসল অভিনয় হয় জীবনে। আমি গত তিন বছর ধরে এই সিউল শহরে বেঁচে থাকার একটা নিখুঁত অভিনয় করছিলাম। আর তুমি এসে আমার সেই অভিনয়টা সত্যি করে দিলে। আগামী শুক্রবার তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় দিন। তুমি মঞ্চে দাঁড়াবে। আমি তোমাকে কথা দিয়েছিলাম, আমি অডিটোরিয়ামের পাঁচ নম্বর সারির চার নম্বর আসনে বসে তোমার অভিনয় দেখব। আমি আমার কথা রাখব সু-আ। আমি যদি সশরীরে সেখানে নাও থাকতে পারি, আমার আত্মা ঠিক ওই আসনটায় বসে থাকবে। তুমি যখন ডায়লগ বলবে, ‘তুমি চলে গেলে এই আকাশটা কার হবে?’ তখন একদম কাঁদবে না। ডিরেক্টর পার্ক কিন্তু কাঁদুনি মেয়েদের পছন্দ করেন না। ভালো থেকো সু-আ। আমার এই ঠান্ডা, একাকী জীবনটায় এক চিলতে বসন্তের রোদের মতো আসার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।
ইতি,
কিম মিনহো।
সু-আ চিঠিটা হাতের মুঠোয় চেপে ধরে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে এলো। বাইরের কনকনে ঠান্ডা বাতাস তার মুখে এসে লাগছে, কিন্তু তার কোনো অনুভূতি নেই। সে একটা ট্যাক্সি ডেকে সোজা চলে এলো সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হসপিটালে। হাসপাতালের ঠান্ডা করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় সু-আ’র মনে হচ্ছিল সে কোনো এক অন্তহীন সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে হাঁটছে। আইসিইউ-র ১২ নম্বর কেবিনের বাইরে গিয়ে সে দাঁড়াল। কাঁচের ওপাশে শুয়ে আছে কিম মিনহো।
তার চেনা সেই ছাই রঙের বা হালকা নীল রঙের মাফলারটা এখন গলায় নেই। তার বদলে মুখে লাগানো আছে একটা বড় অক্সিজেনের মাস্ক। তার ফর্সা মুখটা এখন আরও ফ্যাকাশে, রক্তের কোনো চিহ্ন নেই। কতগুলো নল তার শরীরে গোঁজা। পাশে একটা মনিটরে মিনহোর হৃদস্পন্দনের গ্রাফটা খুব ধীর গতিতে উঠছে আর নামছে টিপ… টিপ… টিপ… করে। সু-আ কাঁচের গায়ে হাত রাখল। সে চিৎকার করে কাঁদতে চাইল, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। মিনহো কত শান্তভাবে শুয়ে আছে, যেন সে কোনো গভীর নাটকের শেষ দৃশ্যের রিহার্সাল দিচ্ছে। সু-আ পকেট থেকে তার নিজের বোনা সেই নীল রঙের উলের দস্তানা দুটো বের করল। মিনহোর চাচা এটাও তাকে দিয়েছিল। সে ডিউটি নার্সকে অনেক অনুরোধ করে কেবিনের ভেতরে ঢুকল। মিনহোর বিছানার পাশে গিয়ে সে বসল। মিনহোর সেই ঠান্ডা অবশ ডান হাতটা সে নিজের দুই হাতের ভেতর নিল। তারপর খুব আলতো করে সেই নীল দস্তানাটা মিনহোর হাতে গলিয়ে দিল।
“মিনহো…” সু-আ ফিসফিস করে বলল, “আমি এসেছি। আপনার সু-আ এসেছে। আপনি চোখ খুলুন। আপনি না বলেছিলেন আমার কফিটা কালকে আরেকটু কম তিতো বানাতে হবে? আমি কালকে খুব সুন্দর কফি বানিয়ে নিয়ে আসব। আপনি শুধু একবার চোখ খুলুন।” মনিটরের গ্রাফটা একই রকম ধীর গতিতে চলতে লাগল। মিনহো চোখ খুলল না। তার ফর্সা কপালে জমে থাকা এক ফোঁটা ঘাম সু-আ নিজের আঙুল দিয়ে মুছে দিল। সু-আ মিনহোর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “আমি শুক্রবার মঞ্চে দাঁড়াব মিনহো সাহেব। আপনি যে আসনটা বুক করতে বলেছিলেন, ওটা আমি কারও জন্য দেব না। আপনি কিন্তু আসবেন। আপনাকে আসতেই হবে।”
সে কেবিন থেকে বের হয়ে এলো। তার চোখে আর জল নেই। পাথর হয়ে গেছে সে।
শুক্রবার রাত। ‘আর্ট সেন্টার সিউল’-এর বিশাল অডিটোরিয়াম এখন দর্শকে ঠাসা। নিয়ন আলোগুলো জ্বলছে, ব্যাকস্টেজে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ব্যস্ততা। সু-আ মেকআপ রুমে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে নাটকের ওভারকোট।
ঠিক তখনই নাটকের এক সহকারী এসে সু-আ’র হাতে একটা ছোট প্যাকেট দিয়ে বলল, “সু-আ আপা, ক্যাফে গিয়োউল থেকে এক ভদ্রলোক এই প্যাকেটটা একটু আগে আপনার জন্য রেখে গেছেন। বলেছেন মিনহো সাহেব এটা আপনাকে দিতে বলেছিলেন।”
সু-আ প্যাকেটটা খুলল। ভেতরে একটা মাঝারি সাইজের সাদা ক্যানভাস। ক্যানভাসটা একদম ফাঁকা, কিচ্ছু আঁকা নেই। শুধু ক্যানভাসের একদম নিচে, কোণায় মিনহোর হাতের লেখায় ছোট করে লেখা, “আমার জীবনটা একটা সাদা ক্যানভাসের মতো শূন্য ছিল সু-আ। তুমি এসে তাতে তোমার হাসির রঙ ছড়িয়ে দিয়েছ। এবার নিজের ইচ্ছেমতো রঙ দিয়ে তোমার বাকি জীবনটা সাজিয়ে নাও।” সু-আ ক্যানভাসটা মেকআপ টেবিলের ওপর রাখল। তারপর চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘনিশ্বাস নিল। মঞ্চের ঘণ্টা পড়ল। অডিটোরিয়ামের সব আলো নিভে গেল। শুধু মঞ্চের মাঝখানে একটা নীলচে আলো এসে পড়ল। নাটক শুরু হয়েছে। সু-আ ধীর পায়ে মঞ্চের আলোয় এসে দাঁড়াল। হাজার হাজার দর্শক সামনে বসে আছে, কিন্তু সু-আ’র চোখ শুধু একটি জায়গাতেই স্থির। পাঁচ নম্বর সারির চার নম্বর আসন। আসনটা সম্পূর্ণ খালি। চারপাশের সব আসনে মানুষ বসে আছে, শুধু ওই একটা নির্দিষ্ট আসন শূন্য। সু-আ নাটকের প্রথম ডায়লগটা শুরু করল। তার গলার স্বর আজ অন্য সব দিনের চেয়ে আলাদা। তাতে কোনো কৃত্রিমতা নেই, কোনো বোঝানোর চেষ্টা নেই। সে যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটা উচ্চারণ করছে।
নাটকের ক্লাইম্যাক্স দৃশ্যে সু-আ যখন মঞ্চের একদম সামনে এসে দাঁড়াল, তখন তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরছে। দর্শকরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখছে এক অসাধারণ অভিনয়। সু-আ শূন্য আসনের দিকে তাকিয়ে তার শেষ ডায়লগটা বলল,
“তুমি চলে গেলে এই আকাশটা কার হবে? এই সিউল শহরের এত এত আলো তখন কাকে পাহারা দেবে? তুমি তো চলে গেলে… কিন্তু আমার এই একলা মনটা কার কাছে রেখে গেলে?” ঠিক সেই মুহূর্তে, সু-আ’র চোখের ভ্রম নাকি নিয়তির কোনো খেলা সে দেখল, অডিটোরিয়ামের পাঁচ নম্বর সারির চার নম্বর শূন্য আসনটার ওপর হুট করেই একটা মৃদু, রূপালি আলো এসে পড়েছে। আর সেই আলোর মাঝে বসে আছে কিম মিনহো। তার গলায় সেই ছাই রঙের মাফলার, আর হাতে সু-আ’র বোনা সেই গাঢ় নীল রঙের উলের দস্তানা। সে সু-আ’র দিকে তাকিয়ে খুব সুন্দর, শান্ত একটা হাসি হাসল। যেন সে বলতে চাইছে, “খুব সুন্দর হয়েছে সু-আ। আজ তোমার এক্সপ্রেশনটা একদম নিখুঁত হয়েছে।”
ঠিক সেই মুহূর্তেই, সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হসপিটালের আইসিইউ-র ১২ নম্বর কেবিনের মনিটরটা একটা দীর্ঘ, সোজা শব্দ করে উঠল পিপ পি-ই-ই-ই…। কিম মিনহোর হৃদস্পন্দনের গ্রাফটা চিরকালের জন্য সোজা হয়ে গেল। তার নীল দস্তানা পরা হাতটা বিছানার ওপর আলতো করে খসে পড়ল। সে পৃথিবীর সব মায়া, সব দীর্ঘনিশ্বাস কাটিয়ে এক চিরন্তন শীতের দেশে পাড়ি জমাল। মঞ্চে তখন নাটকের শেষ দৃশ্য নেমে এসেছে। সু-আ বুঝতে পারল মিনহো আর নেই। তার বুকের ভেতরটা যেন এক নিমিষে ফাঁকা হয়ে গেল। কিন্তু সে অভিনয় থামাল না। সে শেষ ডায়লগটা শেষ করে দর্শকদের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে কুর্নিশ করল। পুরো অডিটোরিয়াম তখন করতালি আর হাততালিতে ফেটে পড়ছে। ডিরেক্টর পার্ক দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছেন। সবাই ভাবছে হান সু-আ আজ ইতিহাস তৈরি করেছে। ঠিক তার কিছুক্ষণের মধ্যেই তার কাছে একটা ফোন কল এলো। সে চোখের জল ফেলল না, কাঁদল না। সে সবাইকে দেখল কেবল। সু-আ জানে, এই হাততালি, এই আলো, এই সাফল্য সব কিছুই আসলে একলা ক্যানভাসের ওপাশে থাকা সেই কিম মিনহোর জন্য। সু-আ মঞ্চের আলো থেকে ধীর পায়ে অন্ধকারের দিকে হেঁটে গেল। তার মনে হচ্ছে মিনহো চলে গেছে ঠিকই, কিন্তু সে সু-আ’র চারপাশের বাতাসটাকে চিরকালের জন্য ঠান্ডা করে রেখে গেছে। এক আজন্ম শীতকাল সু-আ’র জীবনে নেমে এসেছে, যা কোনোদিন, কোনো বসন্তের রোদেও আর গলবে না।
৫.
আমাদের এই জীবনে কিছু কিছু মানুষের আগমন ঘটে নদীর তীব্র বান ডাকের মতো। তারা যখন আসে, চারপাশের চেনা জগৎটাকে এক নিমেষে ওলটপালট করে দিয়ে যায়। তারপর একদিন নদী শান্ত হয়, জল নেমে যায়, কিন্তু তীরের পলিমাটিতে রেখে যায় এক গভীর ক্ষতের দাগ। মানুষ ভাবে সময় সব ক্ষত নিরাময় করে দেয়। এটা মানুষের চরম ভুল ধারণা। সময় আসলে ক্ষত নিরাময় করে না, সে শুধু ক্ষতটাকে বুকে নিয়ে বেঁচে থাকার এক ধরণের নিষ্ঠুর অভ্যাস তৈরি করে দেয়।
সিউল শহরের ওপর দিয়ে আরও পাঁচটি বছর কেটে গেছে। কোরিয়ার আবহাওয়ার কোনো পরিবর্তন হয়নি। যথানিয়মে প্রতি বছর চেরি ব্লসমে ছেয়ে যায় শহরের বুক, তারপর আসে গ্রীষ্মের তপ্ত দিন, হেমন্তের পাতাঝরা দিন পার হয়ে আবার নেমে আসে সেই জবুথবু শীত। সিউলের মানুষজন এখনও সেই একই গতিতে সাবওয়ে স্টেশনের দিকে হন্তদন্ত হয়ে ছোটে, ডংদেমুন বা মেইয়ং-দং এর নাইট মার্কেটগুলোতে এখনও শীতের রাতে ধোঁয়া ওঠা গরম ওদেং স্যুপ আর মুচমুচে মাছের আকৃতির মিষ্টি কেক বিক্রির ধুম পড়ে। এই শহরের কোথাও কোনো কিম মিনহো নামের ছেলে ছিল কি না, তা মনে রাখার মতো অবসর এই ব্যস্ত সিউলের নেই। শুধু একজন মানুষের জীবনে সময়টা যেন সেই পাঁচ বছর আগের এক শুক্রবারের রাতেই থমকে দাঁড়িয়ে আছে। সে হান সু-আ। সু-আ এখন আর সেই মেস ঘরের অনাহারী, ব্যর্থ মেয়েটি নয়। ‘The Winter Line’ নাটকের সেই ঐতিহাসিক প্রিমিয়ার শোর পর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সে এখন কোরিয়ার থিয়েটার জগতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এবং অত্যন্ত সম্মানিত এক অভিনেত্রী। সিউলের বড় বড় বিলবোর্ডে এখন তার গম্ভীর, মায়াবী চেহারার ছবি শোভা পায়। কত শত তরুণ ডিরেক্টর তার সাথে একটা নাটকে কাজ করার জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করে থাকে। মানুষের ভালোবাসা, অর্থ, খ্যাতি সব কিছু এখন সু-আ’র হাতের মুঠোয়। কিন্তু এই বিশাল আলো আর জাঁকজমকের আড়ালে সু-আ’র একটা নিজস্ব অন্ধকার জগৎ আছে। সে সিউলের কোনো জমকালো পার্টিতে যায় না, থিয়েটারের কাজ শেষ হলেই নিজেকে গুটিয়ে নেয়। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই পাঁচ বছরে কোরিয়ার কত বিখ্যাত, সুদর্শন এবং সফল পুরুষ সু-আ’র সান্নিধ্য চেয়েছে, কতজন তাকে ভালোবেসে আগলে রাখতে চেয়েছে, কিন্তু সু-আ কাউকেই নিজের মনের দরজার ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেয়নি। তার জীবনের ক্যানভাসে সে আর নতুন কোনো রঙ লাগাতে চায়নি। তার মনের ঘরে কিম মিনহো নামের সেই শান্ত ছেলেটি এক চিরস্থায়ী, অবিনশ্বর তালা ঝুলিয়ে দিয়ে গেছে, যার চাবিটা সে মিনহোর সাথেই সেই হাসপাতালের ১২ নম্বর কেবিনে কবর দিয়ে এসেছে।
আজ শীতের তীব্রতা অন্য সব দিনের চেয়ে অনেক বেশি। সকাল থেকেই সিউলের আকাশটা কেমন যেন মেঘলা আর ধূসর হয়ে আছে। ঠিক যেমনটা ছিল আজ থেকে পাঁচ বছর আগের সেই প্রথম বরফপাতের দিনে। সু-আ তার দামি কালো মার্সিডিজ গাড়িটা ইনসা-দংয়ের সেই গলির মুখে এসে পার্ক করল। তার পরনে একটা ওভারকোট, গলায় জড়ানো আছে হালকা নীল রঙের সেই পুরোনো, সাধারণ উলের মাফলারটি। এই মাফলারটা মিনহোর ছিল। মিনহোর মৃত্যুর পর তার চাচা সু-আকে মিনহোর ব্যবহৃত কিছু জিনিস দিয়ে দিয়েছিলেন, যার মধ্যে এই মাফলারটাও ছিল। সু-আ গাড়ি থেকে নেমে ধীর পায়ে অলিগলি পেরিয়ে সেই পরিচিত ল্যাম্পপোস্টটার সামনে এসে দাঁড়াল। ল্যাম্পপোস্টের পাশেই সেই ছোট্ট ক্যাফে, ‘গিয়োউল’। মিনহোর মৃত্যুর পর তার চাচা ক্যাফেটি বিক্রি করে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সু-আ নিজের জমানো সব টাকা দিয়ে ক্যাফেটি কিনে নেয়। সে ক্যাফের ভেতরের কোনো আসবাবপত্র বদলায়নি। কাউন্টারের সেই কাঠের টেবিল, জানালার ধারের সেই চেয়ার, এমনকি পেছনের স্টোর রুমের সেই ছোট ড্রয়ারটাও ঠিক আগের মতোই আছে। সু-আ নিজে এখন আর নিয়মিত এখানে বসতে পারে না, তবে একজন বিশ্বস্ত বৃদ্ধ কর্মচারীকে রেখেছে ক্যাফেটা দেখভাল করার জন্য। সে শুধু প্রতি বছরের এই বিশেষ দিনটায় একা একা এখানে এসে বসে।
সু-আ ক্যাফের কাঁচের দরজাটা ঠেলল। ভেতরে ঢুকতেই কড়া কফির সেই পরিচিত, তীব্র সুবাস তার নাকে এসে লাগল। ঠিক যেন পাঁচ বছর আগের সেই বিকেল চারটে। ক্যাফেতে কোনো কাস্টমার ছিল না। বৃদ্ধ কর্মচারীটি সু-আকে দেখে মাথা নিচু করে কুর্নিশ জানাল। সু-আ মৃদু হেসে বলল, “আজকের মতো ক্যাফেটা বন্ধ করে দিন। আমি একটু একা থাকতে চাই।”
ভদ্রলোক মাথা নেড়ে ধীর পায়ে বাইরে বেরিয়ে গেলেন এবং দরজার সাইনবোর্ডটা ‘ক্লোজড’ করে দিলেন। ক্যাফেতে এখন শুধু সু-আ। সে কাউন্টারের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। সে মিনহোর সেই সাদা সিরামিকের কাপটা হাতে নিল। তারপর খুব মন দিয়ে, পরম যত্নে নিজের জন্য এক কাপ কফি বানাল। কফিটা দেখতে একদম কালো আর ধোঁয়াটে হলো।
সে কফির মগটা হাতে নিয়ে জানালার ধারের সেই নির্দিষ্ট টেবিলটায় এসে বসল। টেবিলের ঠিক ওপাশটায় সু-আ’র মেকআপ রুমের সেই ‘সাদা ক্যানভাস’টা একটা কাঠের স্ট্যান্ডের ওপর সাজানো আছে। ক্যানভাসটা এখন আর ফাঁকা বা শূন্য নেই। এই পাঁচ বছরে সু-আ প্রতি শীতে এখানে এসে নিজের হাতে সেই ক্যানভাসে অল্প অল্প করে রঙ লাগিয়েছে। ক্যানভাসে এখন ফুটে উঠেছে একটা স্কেচ একটা ছাই রঙের মাফলার পরা ছেলে একলা দাঁড়িয়ে আছে একটা বরফে ঢাকা জিংকো গাছের নিচে, আর তার হাত দুটো ঢাকা গাঢ় নীল রঙের এক জোড়া উলের দস্তানায়। সু-আ কফির কাপে একটা ছোট চুমুক দিল। কফিটা ভীষণ তিতো হয়েছে। এত তিতো যে চোখ বন্ধ করে ফেলতে হয়। সু-আ’র ঠোঁটের কোণে একটা বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল। সে ক্যানভাসের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল, “মিনহো, দেখুন… আমি আজও একদম ভালো কফি বানাতে পারি না। কফিটা আজকেও ভীষণ তিতো হয়েছে। আপনি থাকলে নিশ্চয়ই মুখটা কেমন যেন করে কাপটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখতেন, তাই না?”
ক্যানভাসের সেই আঁকা মিনহো কোনো উত্তর দিল না। সে যেমন শান্ত ছিল, তেমনই শান্ত রইল। ঠিক সেই মুহূর্তেই জানালার বাইরে তুষারপাত শুরু হলো। বছরের প্রথম বরফ। বড় বড় সাদা তুলোর মতো বরফকণাগুলো আকাশ থেকে নেমে এসে জানালার কাঁচের গায়ে আটকে যাচ্ছে। সিউল শহরটা আবার সেই শুভ্র চাদরে ঢাকতে শুরু করেছে। সু-আ জানালার বাইরে তাকাল। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় ওপর থেকে পড়তে থাকা বরফগুলোকে দেখতে ঠিক পাঁচ বছর আগের সেই রাতের মতোই রূপালি বুদবুদের মতো দেখাচ্ছে। সু-আ’র চোখ দুটো হুট করেই জবা ফুলের মতো লাল হয়ে গেল। এই পাঁচ বছরে সে মানুষের সামনে কখনো কাঁদেনি, কিন্তু এই একলা ক্যাফেতে মিনহোর মুখোমুখি বসলে তার ভেতরের সব পাথর গলে জল হয়ে যায়। সে তার ওভারকোটের পকেট থেকে এক জোড়া গাঢ় নীল রঙের উলের দস্তানা বের করল। দস্তানা দুটোর কিছু কিছু জায়গায় সুতো আলগা হয়ে আছে, কিন্তু সেগুলো খুব সুন্দর করে ধুয়ে পরিষ্কার করে রাখা। সু-আ দস্তানা দুটো নিজের বুকের কাছে চেপে ধরল। মিনহোর গায়ের সেই হালকা পাইন গাছের পাতার মতো ঠান্ডা সুবাসটা সে যেন আজও এই দস্তানা দুটোর ভেতর থেকে স্পষ্ট খুঁজে পায়। সু-আ দস্তানা দুটো টেবিলের ওপর রাখল। তারপর নিজের দুই হাত মাফলারের ভেতর লুকিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে মনে মনে বলতে লাগল,
“মিনহো … আপনি চলে গেছেন আজ পাঁচ বছর হলো। থিয়েটারের ডিরেক্টররা এখন আর আমাকে বাদ দেয় না। তারা এখন আমার অভিনয়ের প্রশংসা করে। কিন্তু তারা কেউ জানে না, আমার এই অভিনয়ের পেছনে কার হাত ছিল। তারা সবাই আমাকে বলে নতুন করে জীবন শুরু করতে, অন্য কাউকে মন দিতে। মানুষের মন কি এতই সস্তা জিনিস মিনহো সাহেব, যে একজনকে দেওয়ার পর আবার অন্য কাউকে দেওয়া যায়?” সু-আ একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল। তার নিশ্বাসের উষ্ণতায় জানালার কাঁচের ওপর একটু বাষ্প জমে উঠল। সে আঙুল দিয়ে সেই বাষ্পের ওপর খুব ছোট করে লিখল, ‘মিনহো’।
“আপনি আপনার চিঠিতে লিখেছিলেন, আমি যেন নিজের ইচ্ছেমতো রঙ দিয়ে বাকি জীবনটা সাজিয়ে নিই। আমি তো আপনার কথা অমান্য করিনি মিনহো। আমি আমার জীবনটাকে খুব সুন্দর করে সাজিয়েছি। তবে কোনো চঞ্চল বসন্তের রঙ দিয়ে নয়। আপনি আমার জীবনে যে শান্ত, শীতল আর বিষাদময় শীতকালটা রেখে গিয়েছিলেন… আমি সেই শীতকালটাকেই আমার জীবনের একমাত্র বসন্ত বানিয়ে নিয়েছি। এই শীতের কুয়াশা, এই প্রথম বরফপাত, আর এই তিতো কফির মাঝেই আমি আপনাকে নিয়ে রোজ বাঁচি। আমাদের গল্পটা অপূর্ণ থেকে গেছে ঠিকই, কিন্তু এই অপূর্ণতার মাঝেই আপনি আমার কাছে চিরন্তন হয়ে আছেন।” বাইরে তখন বরফপতের বেগ আরও বেড়েছে। পুরো ইনসা-দংয়ের গলিটা এখন বরফের সাদা চাদরে ঢাকা। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোটা একা একলা দাঁড়িয়ে সেই বরফ পড়া দেখছে। ক্যাফের ভেতরে সু-আ তখন টেবিলের ওপর দুই হাত রেখে, জানালার বাইরে চোখ রেখে শান্ত হয়ে বসে আছে। তার চোখে আর কোনো ছটফটানি নেই। স্থিরতা তার পুরো অবয়বে ছড়িয়ে পড়েছে। সে জানে, এই সিউল শহরে সে হয়তো একলা হাঁটবে, কিন্তু তার ছায়ার সাথে সবসময় একটা নীল দস্তানা পরা শান্ত ছেলে ছায়ার মতোই মিশে থাকবে।
ক্যাফের ভেতরের জ্যাজ মিউজিকের সুরটা তখন খুব ধীর গতিতে বাজছে। আর সেই সুরের সাথে তাল মিলিয়ে জানালার বাইরে পড়তে থাকা বরফকণাগুলো যেন একলা সু-আ’র চারপাশে কিম মিনহোর রেখে যাওয়া এক অনন্ত শীতের রূপকথা বুনে চলেছিল। যে শীতকাল সু-আ’র জীবনে আর কোনোদিন শেষ হবে না, যা চিরকাল তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর বসন্ত হয়েই থেকে যাবে।
(সমাপ্ত)
