8 C
New York
Saturday, December 7, 2019
Home Blog

ডুমুরের ফুল ১৭.

0

ডুমুরের ফুল ১৭.

হেমলতা আমতা আমতা করে বললো
– মোবাইল কবে পাবো তার কোনো ঠিক নেই। আ…. আমি এতক্ষণ অপেক্ষা কীভাবে করবো?
– তোমার এক ভুলে সারাজীবনের জন্য কথা বলা বন্ধ হবে।
– নানী কিছুই বুঝতে পারবেনা। বলবো, তুমি আমার ফ্রেন্ড।
– হেম শুনো, আমাদের কথাবার্তা কেউ শুনলে বিশ্বাস করবে আমরা ফ্রেন্ড?
জাদিদ হাসতে হাসতে বললো।
– হ্যাঁ সেটা তো ভেবে দেখিনি।
– শুনো হেম।
– হুম বলো।
– তোমার প্রতি ভালোলাগা বেড়েই যাচ্ছে। যতবারই ভাবছি ততবারই। মানে সমানুপাতিক সম্পর্ক। তোমাকে নিয়ে ভাবনাকে যদি V ধরি আর আর ভালোলাগাটাকে V… এরে এক হয়ে গেলো। ভাবনাকে T এবং ভালোলাগাকে L ধরি তাহলে,
L সমানুপাতিক T^3
বুঝতে পারতেছো? ভাবনার কিউবের সমানুপাতিক ভালোলাগা।
সমানুপাতিক আর সমান কিন্তু হেম এক না। সমানুপাতিক উঠিয়ে সমান দিতে গেলে ধ্রুবক আনতে হয়।

হেমলতা কী বলবে বুঝতে পারছেনা। এদিকে কীসের সাথে কী মিশাচ্ছে জাদিদ। এখন না থামালে জাদিদ আরো জটিল দিকে এগিয়ে যাবে। এমনিতেই ফিজিক্স তার মাথায় ঢোকে না। তারপর জাদিদ…..
এদিকে জাদিদ তার মতো ব্যাখ্যা করেই যাচ্ছে।
হেমলতা নরম স্বরে বললো
– জাদিদ।
– তুমি বুঝতে পারতেছো না?
– তুমি পাগল হয়ে গেলা নাকি?
– মনে হচ্ছে তাই হয়ে যাবো।
– বাসায় পৌঁছে প্রথমে ফ্রেশ হয়ে নিবা। তারপর পেট ভরে খেয়ে ঘুম দিবা।
– কী বলো? জিনিসপত্র না গুছিয়ে ঘুমাবো কীভাবে?
– জিনিসপত্র গুছানো যাবে আগে ঘুম।
– আমার কিছুই ভালো লাগছেনা হেম। ইচ্ছা করছে ফরিদপুরে ব্যাক করি।
– প্রথম দিকে খারাপ লাগবে। আস্তে আস্তে অভ্যাস হয়ে গেলে ফরিদপুরে আসতে ইচ্ছা করবেনা।
– ফরিদপুরে আমার আসতেই হবে। ১ দিনের জন্যও হলেও আসতে হবে।
– এখন রাখি।
– হুম। একটা কাজ করতে পারবে?
– বলো।
– মোবাইলটা আজকে রাতে তোমার কাছে রেখো।
– আচ্ছা চেষ্টা করবো। রাখি বাই।
জাদিদের ইচ্ছে করছে চুমু দিতে কিন্তু পাশের আন্টি কান পেতে বসে আছেন। এমনিতেই এতক্ষণ যা বলেছে তাতেই আন্টির চেহারা দেখার মতো। উনি কি চাচ্ছে তার মেয়ের সাথে আমার সেটিং করায় দিতে? তাহলে তো চুমু দেয়া মৌলিক অধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাদিদ মোবাইল ঠোঁটের কাছে নিয়ে জোরে শব্দ করে চুমু দিয়ে বললো
– দূরে চলে যাচ্ছি তাই বোনাস।
হেমলতার পুরো শরীর ঘিনঘিন করতে শুরু করেছে। হেমলতা রেগে বললো
– এসব না করলে কী হয়?
– আমার কষ্ট হয়।
জাদিদ হাসতে হাসতে বললো
– আচ্ছা রাখি।
ফোন কেটে দিয়ে মোবাইল পকেটে রেখে দিলো। আড়চোখে আন্টিকে একবার দেখে নিলো জাদিদ।
মহিলার চেহারা ভাবলেশহীন। হয়তোবা অতিরিক্ত শক খেয়েছে।

নাদিয়া ভাতের লোকমা মুখে পুড়ে দিয়ে বললেন
– হেমলতাকে বিয়ে দিয়ে দেন, খালাম্মা। আপনার টেনশন কমবে।
মিসেস জয়নাব অবাক হয়ে বললেন
– ও এখনো ছোটো আর আমি চাই ওর পড়াশোনা শেষ হোক।
– আজকালকার যে অবস্থা। ক্লাস সিক্স সেভেনের মেয়েরাও প্রেম করে।
– হেমলতা অমন না। আর এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে ওকে দিবোনা।
– ভালোর জন্য বললাম। এখন আপনার ইচ্ছা।
মিসেস জয়নাব আর কথা বাড়ালেন না।

মিম্মা ফেসবুকে গ্রুপ চ্যাটিং – এ জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। গ্রুপ চ্যাটিং এ টপার স্টুডেন্ট এড আছে। আর এরা এখানে কতোটা মজা করে কথা বলে, এড নাহলে জানা যায়না।
ম্যাসেজ পড়তে পড়তে একটা ম্যাসেজে চোখ আটকে গেলো। আটকানোর কারণ জাদিদ শব্দটা। জয়ী লিখেছে
– জাদিদ কইরে, তোরা কেউ জানিস?
জুবায়ের রিপ্লাই দিলো
– জাদিদ ঢাকার পথে।
– গ্রুপে একটু আড্ডা দিলেও তো পারে।
– দেখা গেলো বাসেও পড়াশোনা করছে। হাসির ইমো।
জয়ী আর জুবায়েরের মধ্যে এখন কথা হচ্ছে। মিম্মা ওদের মধ্যে একটা ম্যাসেজ দিল
– কে কে ঢাকায় কোচিং করতে যাবি?
অনেকেই রিপ্লাই দিলো। কিন্তু যুথির কোনো খোঁজ নেই। অনলাইনে আছে, ম্যাসেজ ও সিন করেছে কিন্তু রিপ্লাই নাই।
অবশ্য মেধাবীদের একটু মুড থাকবেই। তাহলে জাদিদের নেই কেনো? জাদিদ তো ওদের চেয়েও বেশি মেধাবী।
জাদিদের মতো ছেলে কীভাবে হেমলতাকে পছন্দ করলো? হেমলতা ভালো মেয়ে কিন্তু ওর টাইপের না। জাদিদ কি ওর সাথে মজা করছে?
মিম্মার কেনো যেন মনে হচ্ছে কিছু একটা ঝামেলা তো আছেই।

জাদিদ বাসায় পৌঁছালো সন্ধ্যায়। বাসায় যাওয়ার আগে রাতের খাবার আর ৫ লিটারের পানির বোতল, কোক, বিস্কুট কিনে নিলো। হেমলতার আদেশ পালনের জন্য প্রথমে গোসল করে নিলো। গোসল ছাড়া কোনোভাবেই ফ্রেশ হওয়া সম্ভব না।
গোসল সেরে পুরো ফ্ল্যাটটা ভালোভাবে দেখে নিলো জাদিদ। একটা মাস্টার বেডরুম, একটা নরমাল বেডরুম , একটা ছোট্ট ডাইনিং বা ড্র‍য়িং রুম যেকোনো একটা বললেই হয়। কারণ একটাই রুম আছে লম্বাটে টাইপের। ছোট রান্নাঘর আর মিনি বারান্দা। অর্থাৎ নতুন বিবাহিত দের জন্য পারফেক্ট ফ্ল্যাট বলা চলে।
জাদিদের বাবা প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র দিয়ে সাজিয়ে রেখেছেন ফ্ল্যাট। জাদিদের মনে হলো, তার বাবা ইচ্ছাকৃতভাবে এটা করেছেন। যেন ফ্ল্যাট সাজাতে ছেলেকে সময় ব্যয় না করতে হয়।
খাটের ওপর চাদর বিছানো দেখেই বোঝা যাচ্ছে, বিকালের দিকেই বিছানো হয়েছে। সবকিছুতে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয়েছে।
তবে জাদিদের জন্য ভালোই হয়েছে। তার একা থাকতে ভালোলাগে। ম্যাসে থাকলে একসাথে অনেক জন। নিজস্বতাই থাকতোনা। জুবায়ের, রিফাত, হোসেন আর কামরুল মিলে ছোটো বাসা ভাড়া নিয়েছে। ওরা অবশ্য জাদিদকেও বলেছিলো ওদের সাথে থাকতে কিন্তু জাদিদের কোনো ইন্টারেস্ট নাই দেখে। ওরা আর কিছুই বলেনি।
ভুনা খিচুড়ি আর ডিম ভাজা – আহ্! খাবার দেখে জাদিদের মনে পড়লো তার প্রচুর খিদে পেয়েছে।
এতোটা খিদে যে কীভাবে খেলো নিজেই বুঝতে পারলোনা।
খাওয়া শেষ করে হেমলতার আদেশ অনুযায়ী বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লো। ঘুম না আসলেও তাকে ঘুমাতে হবে। হেমলতার আদেশ বলে কথা।
হেমলতার সাথে কথা বললে ঘুমটা তাড়াতাড়ি আসতো কিন্তু তার মোবাইল আংকেলের কাছে।
দাদীর কথা মনে পড়লো জাদিদের। বৃদ্ধা রুক্ষ মেজাজের হলেও মাঝেমধ্যে ভালো ব্যবহার করতেন। যদিও নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য। কিন্তু দাদী তো।
এখন তো বিস্বাদ খাবার খেতে খেতে জিহবার স্বাদ কোরক বাদ করে ফেলতে হবে।
ভাবতে ভাবতেই জাদিদ গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো।

হেমলতা তোতলাতে তোতলাতে নানীকে বললো
– তোমার মোবাইল টা আমার কাছে আজকে থাকুক৷
মিসেস জয়নাব পান মুখে দিয়ে বললো
– আচ্ছা রাখিস। তোর শরীর কেমন?
– এখন ভালো। তুমি চিন্তা কম কম করবা। – একটা কথা বলি। তুই নাদিয়ার সামনে খুব একটা যাবিনা।
– কেনো?
– ও ঘটক হতে চাচ্ছে।
– উনি ঘটক হলে আমার কী?
– আরে গাধী তোকে বিয়ে দেয়ার কথা বলেছে আমার কাছে।
– এতো তাড়াতাড়ি?
– আমি না করেছি। কিন্তু নাদিয়া বললো আজকালকার মেয়েরা নাকি অল্পবয়স থেকে প্রেম করে। আমি বলে দিলাম, আমার হেমলতা অমন না।
হেমলতা অবাক হয়ে নানীর দিকে তাকিয়ে রইলো। কী বলবে সে ভাবতেই পারছেনা!

চলবে……!

© Maria Kabir

” লেখিকা মারিয়া কবির এর সকল লেখা দ্রুত পেতে অবশ্যই এ্যাড হোন তার ফেসবুক পেইজ ‘Maria Kabir – মারিয়া কবির’(এখানে পেইজ লিংক) এর সাথে।
২০২০ বই মেলায় প্রকাশ পেতে যাচ্ছে মারিয়া কবির এর প্রথম উপন্যাস ‘যেখানে সীমান্ত তোমার আমার’।
মারিয়া কবির এর নতুন সব গল্প উপন্যাস পেতে আমাদের।সাথেই থাকুন ধন্যবাদ।

অনুরাগ শেষ পর্ব

অনুরাগ
শেষ পর্ব
লেখিকাঃ #Israt_Jahan

কলারের থেকে হাত দুটো ছাড়িয়ে নিয়ে পুলক পকেট থেকে ফোন বের করে একটা ভিডিও প্লে করে দিলো।ভিডিও তে সেই মেয়েটি স্বীকারোক্তি দিচ্ছে।মেয়েটি কাঁদছে আর কথাগুলো বলছে।আর তার পাশেই ওই সর্দারনী।মাথায় ঘোমটা টেনে মাথা নিচু করে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে সেও স্বীকারোক্তি দিচ্ছে।
বোঝাই যাচ্ছে বেঢপ মার দেওয়া হয়েছে তাদের।শ্রুতি বলার মতো কিছু খুঁজে পাচ্ছে না।কাকে বিশ্বাস করবে সে? মন তো চাইছে পুলককে বিশ্বাস করতে।কিন্তু পুলক যদি নিরাপরাধ হয়ে থাকে তাহলে এই তিন বছরের মধ্যে কেনো ওকে জানালোনা? ও কিছু ভাবতে পারছেনা।

-‘ বোকা পেয়েছিস? তুই যে ওদের মারধোর করে স্বীকারোক্তি নিয়েছিস তা তো বোঝাই যাচ্ছে।’
-‘ ওয়েল।তাহলে প্রত্যক্ষদর্শী নিয়ে আসি।’ ঠান্ডা গলায় বললো পুলক।

পুলকের ফোন পেয়ে রিয়া আর ধ্রুব এসে হাজির হলো ওদের মাঝে।তারপর ধ্রুব বলতে শুরু করলো,-‘ এতকিছু তো পুলক একা করতে পারে নি।ওকে সাহায্য করেছি আমরা।ও তো মরেই যাচ্ছিলো শ্রুতি ওর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পর।কতভাবে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছে! তারপর ওর থেকে সবটা শুনে আমি আর রিয়া উদ্যোগ নিলাম সত্যিটা কী আর এর পেছনে আসল ঘটনাটা কী তা জানার জন্য।কিন্তু পুলক এতটায় ডিপ্রেশনে ভুগছিলো ওকে আগে সুস্থ করার প্রয়োজন বোধ করলাম।মাস ছয়েকের মধ্যে ওকে নিয়ে স্কটল্যান্ড চলে এলাম।আমার আর আমার বাবার সাথে ওকে শেয়ারে নিয়ে নিলাম আমাদের ব্যবসায়ে।শুধু ওকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর জন্য।তার ভেতর রিয়াকে শ্রুতির ব্যাপারে সব খোঁজ নিতে বললাম।পুলক অস্থির হয়ে থাকতো ওর খবর জানার জন্য।আস্তে আস্তে ডিসিশন নিলো ও আর কোনোদিনও শ্রুতির সামনে আসবেনা।ওকে বলবে না ও নির্দোষ।কিন্তু আমি বললাম,-‘ তোর জানা উচিত ওই মেয়েটা কেনো মিথ্যে বলেছিলো।শ্রুতির কাছে নিরাপরাধ সাজার জন্য নয়।সত্যটা জানা তোর প্রয়োজন।’ তার মধ্যেই রিয়া খবর জানালো ঈশাণ শ্রুতিকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে।ব্যাপারটা আমার কাছে খটকা লাগলেও পুলক নিশ্চিত হয়ে গেলো যে ওই ঘটনার সাথে ঈশাণ জড়িত কোনোভাবে।দেশে ফিরে এলাম ওকে নিয়ে।বহুকষ্টে ওই মেয়েটাকে খুঁজে বের করলাম। মেয়েটির সন্ধান পাওয়ার জন্য সর্দারনীকে কম ধোলাই খেতে হয়নি।আর যখন মেয়েটাকে খুঁজে পেলাম তখন তো সবটা রেকর্ড করেই রেখেছি।এরপরই পুলক আমি আর রিয়া প্ল্যান করলাম ইভেন্টের।নতুন করে আগমন ঘটালাম পুলকের। পুলক আমার ছোটবেলার বন্ধু।ওকে আমি চিনি ওর অতীতটা আমি জানি।তাই আমি বিশ্বাস রেখেছিলাম যে পুলক কখনো শ্রুতিকে ছাড়া পৃথিবীর সর্বত্তোম সর্বশ্রেষ্ঠা সুন্দরী মেয়ের দিকেও তাকাবেনা।আমি ওর বন্ধু হয়ে ওর প্রতি এমন বিশ্বাস রেখেছিলাম।আর শ্রুতি তুই ওর ভালোবাসার মানুষটা হয়ে ওর প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারলিনা?মেরেই তো ফেলেছিলি ওকে।’

-‘ এই তোরা চুপ কর।সবগুলো গল্পের ঝুড়ি নিয়ে বসেছিস? নাটক করতে শিখে গেছিস না?’ চিৎকার করে বলছিলো ইশাণ।

হঠাৎ করেই ঈশাণের গালে শ্রুতির পাঁচ আঙুল বসে গেলো। ঈশাণ থম মেড়ে দাঁড়িয়ে রইলো ওর দিকে চেয়ে।

-‘ সবাই তোর শত্রু তাই না?সবাই তোর বিরুদ্ধে নাটক সাজিয়েছে তাই না? কেনো এমনটা করলি তুই? কীভাবে পারলি আমাদের সাজানো সংসার টা ভেঙ্গে দিতে? কী ক্ষতি করেছিলাম আমরা তোর? বল?’

আরো কয়েকটা থাপ্পর পড়ল ঈশাণের গালে।হঠাৎ করে ঈশাণ শ্রুতিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো।তারপর হুংকার দিয়ে উঠল।

-‘ ক্ষতি তুই করিসনি।ক্ষতি করেছে ও।’ পুলকের দিকে তাকিয়ে বললো।

আবার বলতে শুরু করলো,-‘ পুলক আমাদের বন্ধুমহলে আসার আগেই আমি তোকে পছন্দ করতাম। ভালোবাসি কথাটা বলতে গিয়েও কখনো বলতে পারি নি। হঠাৎ করেই পুলক কোথা থেকে উড়ে এসে তোর মনে জায়গা করে নিলো।আমি বলতে গিয়েও কিছু বলতে পারলাম না। দেখলাম তুই অনেক হ্যাপি তোদের রিলেশনশিপে।আস্তে আস্তে তোদের থেকে দূরে সরে গেলাম।সহ্য হতোনা তোদের একসঙ্গে দেখলে।ভেতরটা পুড়ে জ্বলে যেতো।তোদের বিবাহবার্ষিকী তে তোকে ওইভাবে নতুন বউয়ের সাজে দেখে আমার সেই পুরোনো ঘা টা আবার তাজা হয়ে গেলো।তাও বহুকষ্টে নিজেকে সামলিয়েছি এই ভেবে তুই এখন অন্য কারো।তারপরও নিজেকে বেঁধে রাখতে পারি নি।তোকে আরো একবার দেখার লোভটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতো। চলে এলাম অন্য একদিন তোর সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু সেদিন পুলকের ব্যবহার আর আমাকে দেখিয়ে তোর সঙ্গে পুলকের ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে খাওয়া আমাকে একরকম পাগল করে দিচ্ছিলো।ভেতরে ভেতরে পুলককে খুন করে ফেলার একটা ঝোঁক কাজ করছিলো।কিন্তু সেই ঝোঁকটাও সামলে উঠলাম।নিজেকে একদম নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করতে শুরু করলাম।ভুলে যেতে চাইলাম পুলকের সেদিনকার ব্যবহার। তারপর যেদিন তোর বাসায় এসে তোর কাছ থেকে পুলকের অবহেলার কথাগুলো জানলাম মনে মনে খুব খুশি হচ্ছিলাম। ভাবতে থাকলাম এভাবে যদি তোদের সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে যায় তারপরই আমি তোকে আমার প্রতি কনভিন্স করার চেষ্টা করবো।আর রবিন যখন পুলকের ব্যাপারে ওই ঘটনাগুলো বললো প্রথমে আমার বিশ্বাস না হলেও আমি এতটায় খুশি হয়েছিলাম যে তখন আমি সব ভেবে নিলাম খুব বেশি সময় লাগবেনা তোদের সম্পর্কটা নষ্ট হতে।’

-‘ এরপরই তুই প্ল্যানগুলো করে ফেললি তাইনা?’ পুলক বললো।

-‘ তিনটা বছর নষ্ট করলি আমাদের জীবনের।কতোটুকু উপকার পেলি এগুলো করে?

কথাটা বলেই পুলক এসে ঈশাণের চোয়ালে একটা ঘুষি বসিয়ে দিলো।মার খেয়ে তাল সামলাতে না পেরে ঈশাণ টেবিলের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল।রেগে উঠে দাঁড়িয়ে স্যুটের ভেতর পকেট থেকে পুলিশের লাইসেন্সকৃত পিস্তল পুলকের দিকে তাক করে ধরে বললো, -‘ এতকিছু করে যখন উপকার পাইনি তাহলে তোকে খুনই করি।’

শ্রুতি,রিয়া আর ধ্রুব তিনজনই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে গেলো ভয়ে।পুলকের রাগ তখন আরো দ্বিগুণ হয়ে গেলো।পিস্তলকে তোয়াক্কা না করে ওর চোয়ালে আরো একটা ঘুষি মাড়ল।

-‘ আর কতো নিচে নামবি?আমাকে খুন করলে তুই নিজে এই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারবি?পুরো জীবনটায় তোর শেষ হয়ে যাবে।’

ঈশাণ টেবিলের ওপর হুমড়ি দিয়ে পরে রইলো।প্রচন্ড কান্না পাচ্ছে ওর।এভাবে কারো ক্ষতি করে নিজে কোনোদিন সুখী হওয়া যায় না।আর ভালোবাসা এ তো ঈশ্বর কতৃক দান। এই জিনিস ঈশ্বর যাকে দিবেন শুধু সেই তার অধিকার পাবে। জোর করে তা বা মিথ্যা দিয়ে তা কোনোদিনও অর্জন করা সম্ভব না। কাঁদতে কাঁদতে সে উঠে দাঁড়ালো।কোনো দিকে না তাকিয়ে টলতে টলতে বেরিয়ে গেলো শ্রুতির বাড়ি থেকে।
_______________________

-‘ কিছু বলছোনা যে? ক্ষমা করবেনা আমাকে?’

-‘ তুমি কী অপরাধ করেছো যে তোমাকে ক্ষমা করবো?’

-‘ এতটা অনুরাগ চেঁপে রেখোনা আমার প্রতি।মারতে ইচ্ছা করলে মারো, হাত পা বেঁধে যেমন খুশি তেমন শাস্তি দাও। তবুও মুখ ফিরিয়ে থেকো না।’

-‘ কী চাইছো তুমি?’

-‘ তুমি বুঝতে পারছোনা?’

-‘ বোঝার ক্ষমতা আজ কাল খুব কম।’

-‘ নিয়ে যাবেনা আমাকে তোমার সঙ্গে?’

-‘ গিয়ে কী করবে?’

শ্রুতি এতসময় পুলকের পাশে বসে ওর বাহু জড়িয়ে ধরে কথা বলছিলো।হুট করে ওর পাশ থেকে উঠে এসে ওর সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।

-‘ আমাকে একা ফেলে চলে যাবে?আমার ভুলের শাস্তি আমাকে এভাবে দেবে?’

কান্নার বেগ বেড়ে গেছে শ্রুতির।পুলক ওর দিকে না তাকিয়ে বললো, -‘ ভুলের শাস্তি তুমি আর পেলে কই?পেলাম তো আমি।আর ভবীষ্যতে যাতে না পেতে হয় তাই…..’

-‘ তাই কী?’
পুলক নিশ্চুপ।
-‘ বলো তাই কী?

পুলক এবার ওর দিকে তাকিয়ে চোখ মুখ শক্ত করে তেজী গলায় বললো,-‘ এরপর যদি কেউ আবার এমন কোনো নাটক তৈরি করে আমার বিরুদ্ধে তখনও যে তোমার বিশ্বাস নড়বড়ে থাকবে না আমার প্রতি তার কী গ্যারান্টি? আমি পারবোনা এত বার বার ধাক্কা খেতে।আমার এত্ত এনার্জি নাই ধাক্কা সামলানোর।’

-‘ দিবোনা তো আর।’ কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো শ্রুতি।পুলক ধমকে প্রশ্ন করলো, -‘ কী দিবা না?’

-‘ ধাক্কা।’

-‘ আমার জায়গায় থাকলে তুমি কী করতে বলো তো?’

-‘ অনেস্টলি বলি?’

পুলক দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে তাকিয়ে আছে।

-‘ আনলিমিটেড থাপ্পড় লাগাতাম তোমার গালে।’

-‘ ব্যাস! আর কিছুই না?’

-‘ বাজে স্ল্যাং ইউজ করতাম।’

-‘ এটুকুই?’

-‘ অবশ্যি আরো একটা কাজ করতাম।কিন্তু সেটা বলবোনা।’

-‘ আমি তো শুনতে চাইছি।’

-‘ বলা রিস্ক।’

-‘ রাত ন’টা বাজে।আমাকে যেতে হবে।কাল সন্ধ্যে ফ্লাইট। অনেক গোছগাছ বাকি আছে।’ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখে বললো।

-‘ না প্লিজ!’

-‘ না প্লিজ কী? আমাকে যেতে হবে না? তোমার রং তামাশা দেখবো বসে?’

-‘ আরে বললাম তো আমাকে যা শাস্তি দেওয়ার দাও।যা খুশি বলো, যা খুশি করো।তাও আমাকে ছেড়ে যেওনা।’

-‘ আমার আইডিয়া নেই কী করে শাস্তি দেওয়া যায়।’

-‘ আমি তো কিছু আইডিয়া দিলাম।’

-‘ শেষ একটা আইডিয়া দাওনি।’

মুখটা কাচুমাচু করে বসে আছে শ্রুতি।কী করে এমন একটা শাস্তির কথা বলবে সেটাই ভাবছে।তবুও ও তো বলেছে ও অনেস্টলি বলবে।মুখটা নিচু করে বললো, -‘ তোমাকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য সত্যি সত্যি কারো সাথে…..’

-‘ কারো সাথে কী? থেমে গেলে কেনো?’

পুলক বেশ এনজয় করছে শ্রুতির অবস্থাখানা।কথাটা ওর মুখ থেকে বের করে তবেই এখান থেকে যাবে ও।বললো, -‘ বলবে নাকি আমি উঠবো?’

-‘ না।সত্যি কারো সাথে প্রেম করে তোমার সামনে এসে দেখাতাম।’

-‘ তোমার আইডিয়া গুলো আমার পছন্দ হয়েছে।তার জন্য তোমাকে আমার সঙ্গে নিবো।তবে আমি শুধু প্রেম করবোনা। বিয়েও করবো তোমাকে চরম শিক্ষা দেওয়ার জন্য।’

তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললো, -‘ চলো এখন।’

-‘ বিয়ে করতে মানে? আমি কী বিয়ে করতাম?কখনোই না।’

-‘ আজকে কী করছিলে?’

-‘ এটা আমার ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।’

-‘ আর এটা আমার সঠিক সিদ্ধান্ত।’

-‘ আমার সামনে তুমি অন্য একটা মেয়ের সাথে…..’

-‘ শোবো, ঘুমাবো।’

-‘ যাবোনা।যাও তুমি।’ উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললো।

-‘ যেতে তোমাকে হবেই।আইডিয়া দিয়েছো শাস্তির।আর শাস্তি খাবে না? চলো……’

টানতে টানতে শ্রুতিকে নিয়ে চলে গেলো পুলক।হয়তো কিছু সময় বাদেই অনুরাগের পালা শেষ করে ভালোবাসার শাস্তির পালা শুরু হবে তাদের মাঝে।

_

অনুরাগ 11 পর্ব

অনুরাগ 11 পর্ব

লেখিকাঃ #Israt_Jahan

-‘ কী হয়েছে শ্রুতি?কোনো সমস্যা?’

দু চোখ বেয়ে পানির সঙ্গে আগুন ঝরছে শ্রুতির চোখে।ঈশাণের দিকে ভয়াবহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ও।ঈশাণ আবার ও প্রশ্ন করলো,-‘ কী হয়েছে? এভাবে দেখছিস কেনো? দেখি কাগজ টা দে তো আমার কাছে।’

শ্রুতির হাত থেকে কাগজটা নিয়ে ঈশাণ পড়তে আরম্ভ করলো।প্রথম অংশ পড়ে তেমন কিছুই মনে হলো না ওর কাছে।শেষের দিকে এসে যা পড়ল তা পড়ার পর ওর হাত কাঁপতে শুরু করলো।যে মেয়েটিকে পুলক ওর বোন ভেবে নিয়েসেছিল সে সত্যিই পুলকের বোন ছিল না ঠিকই। কিন্তু পুলকের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ দিয়েছিল মেয়েটি তা সম্পূর্ণ সাজানো কথা ছিল।আর এই কথাগুলো শিখিয়ে দিয়েছিল ওই পতিতালয়ের সর্দারনী।কেনো এই কথাগুলো শিখিয়ে দিয়েছিল সেটাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে ওখানে।সবকিছু পড়ার পর ঈশাণ জোর গলায় বললো,-‘ শ্রুতি তুই ওর এসব কথা বিশ্বাস করছিস?ও তোকে যে এসব মিথ্যা বলছেনা তার প্রমাণ কী? ওর কাছে শোন যে কথাগুলো এখানে লিখা আর তা যে সত্যিই ওই মেয়েটির আর তার সর্দারনীর জবানবন্দী তার সত্যতা কী?’

শ্রুতি এবার সত্যিই দ্বিধায় পড়ল।সত্যিই তো! পুলক যে সবটাই সত্যি বলছে তার প্রমাণ কী?ও যদি সত্যিই বলে থাকে তাহলে এই তিনটা বছর ও কেনো শ্রুতির সামনে এলো না?এই কথাগুলো এই তিন বছরের মধ্যে কেনো ওকে বললো না?
শ্রুতি প্রশ্নচোখে পুলকের দিকে তাকাতে পুলক একটু একপেশে হাসল।তারপর বললো,

-‘ মেয়েটাকে আমি ঢাকা নিয়ে আসার পূর্বেই ঈশাণ নিজে ভালোভাবে যাচাই করে দেখেছে।আমি যে মেয়েটির সঙ্গে ঘোরাফেরা করেছি তার পরিচয় আসলে কী?এবং অবশেষে জানতেও পারলো আমি তাকে নিজের বোন ভেবে ওই পতিতাবৃত্তি থেকে তাকে মুক্তি দিয়ে নিজের বোনের পরিচয় দিতে যাচ্ছি।ঠিক তখনই ঈশাণ ওখানকার সর্দারনীর সাথে আলাপ করলো।পরিষ্কার হওয়ার জন্য জানতে চাইলো মেয়েটি সত্যিই আমার বোন কিনা।তখন সে তো আরো একটি সত্যি ঈশাণকে জানিয়ে দিলো যে সত্যটা আমি তখন জানতাম না।
আমার মামা আমার বোন কে যেখানে রেখে এসেছিল সেখান থেকে তারা কোথায় মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে যে ওকে বিক্রি করে দিয়েছে তাও তাদের মনে নেই।শুধুমাত্র নিজের চিকিৎসার টাকার জন্য মামা এমন একটা নাটক করেছিলো।
অন্য একটা মেয়েকে আমার বোন বানিয়ে দিলো।আর ওই সর্দারনীকে শিখিয়েও দিলো আমি খোঁজ নিতে এলে যেনো সে এটাই বলে ওই মেয়েটিই আমার বোন। সে তাই ই করলো।এতগুলো মিথ্যা কথা সে এই আশাতেই বলেছিলো সে জানতো আমি টাকার মায়া না করে আমার বোনকে এখান থেকে মুক্ত করে নিয়ে যাবো।আর এই ব্যাপারটা সে এমনি এমনি ঈশাণকে বলে দেয়নি।ঈশাণ তাকে আমার চেয়েও টাকার পরিমাণ বেশি দিয়ে কথাগুলো জেনেছে।আর তারপর ও আরো কিছু টাকা দিয়ে একটা কাহিনী সাজিয়ে ফেললো আমি ওই মেয়েকে ঢাকায় নিয়ে আসার আগেই। মেয়েটাকে শিখিয়ে দেওয়া হলো আমার বাসায় তাকে আনার পর সে যেনো বলে আমি তাকে বোনের পরিচয়ে নয় নিজের ভোগের বস্তু করে নিয়েসেছি।মেয়েটি তাই ই করলো।এবং শর্তমোতাবেক মেয়েটিকে ও আরো কিছু টাকা দিয়ে ঢাকার শহর থেকে ভাগিয়ে দিলো।’

-‘ এই একদম চুপ।একদম বাজে কথা বলবি না।এতদিন পর এসে একটা মিথ্যা কাহিনী বানিয়ে এনে কী সুন্দর সাজিয়ে সাজিয়ে বলছিস।আর ভাবছিস খুব সহজেই তা শ্রুতি বিশ্বাস করে নিবে।আর কতো ক্ষতি করতে চাইছিস মেয়েটার? আর কত অমানুষ হবি?’ ঈশাণ পুলকের কলার চেপে ধরে হুংকার দিয়ে বললো।

অনুরাগ পর্ব ১০

অনুরাগ
পর্ব ১০
লেখিকাঃ #Israt_Jahan

-‘ কোথায় ঘাপটি মেরে ছিলি বল তো এই তিনটা বছর?’ (নিশাদ)
-‘ আমি কী আসামি নাকি যে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকবো?’

গ্লাসে ড্রিংক ঢেলে নিতে নিতে কথা বলছে পুলক।ওর দিকে কয়েক জোড়া চোখ বিস্ময় আর প্রশ্ন ভরা চোখে তাকিয়ে আছে। রিয়ার পাশে এসে বসলো পুলক।সবার দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে শ্রুতির দৃষ্টিকে লক্ষ্য করে বললো, ‘ কী সমস্যা?এভাবে তাকিয়ে দেখছো কেনো আমাকে? এ্যাম আই লুকিং আগলি?’

শেষ প্রশ্নটা রিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো পুলক।রিয়া ভ্রু জোড়া উঁচু করে একটা হাসি দিয়ে বললো, ‘ নো।মোর দ্যান ড্যাস্যিং।’

শ্রুতি একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলো।ঈশাণকে বললো, ‘ আমায় বাসায় ফিরতে হবে।আমি উঠছি।’
-‘ চল আমি তোকে নামিয়ে দিয়ে আসি।’
-‘ আরে আরে আজকে কে কখন ফিরবো তার ঠিক নেই। অনেক দিন বাদে সবাই একসাথে।কোনো উঠাউঠি নেই।আজ অনেক মজা হবে।’

ধ্রুবর কথার সঙ্গে পুলক একটা রহস্যভরা হাসি মেশালো। হাসিটা ঈশাণের চোখ এড়ালো না।এর মধ্যে অনেকেই পুলে নেমে পড়েছে।কেউ এখানে ডেট শুরু করে দিয়েছে, কেউ বা মিউজিকের তালে হেলছে-দুলছে।মোটামোটি যে যার মতো এনজয় করতে ব্যস্ত।শুধু একটা জায়গায় বসে আছে, পুলক,রিয়া, শ্রুতি,ঈশাণ,ধ্রুব,মেঘলা,তানিয়া,নিশাদ আর রবিন।রিয়া আর নিশাদ উঠে হাঁটতে হাঁটতে খানিকটা দূরে চলে গেলো।পুলক ড্রিংকের গ্লাস টা নিচে নামিয়ে রাখলো। হঠাৎ করেই চোখ পড়লো ঈশাণের হাতের দিকে।শ্রুতির হাঁটুর কিছুটা উপরে ওর হাতটা।শ্রুতি ও বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে ওর হাতটা গ্রহণ করে বসে আছে।একটা গম্ভীর নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো পুলকের মাঝ থেকে।কিন্তু ওদের দুজনকেই খুব অপ্রস্তুত লাগছে।

-‘ তো?’

পুলকের আওয়াজ পেয়ে চমকে তাকালো শ্রুতি।চোখে মুখে উচ্ছন্ন ভরা হাসি মেখে আছে পুলকের।মনে হচ্ছে খুব চিন্তামুক্ত আর হাস্যজ্জল মানুষ একটা।তিন বছর আগে তার জীবনে যে কোনো একটা অপ্রিয় ঘটনা ঘটে গেছে সেটা তাকে দেখে মনেই হচ্ছেনা।চোখের পলক পড়ছে না শ্রুতির।এদিকে পুলকও চেয়ে আছে তার প্রাণখোলা হাসি মুখে মেখে নিয়ে।ঈশাণ শুধু তাকিয়ে দেখছে ওদের দৃষ্টি বিনিময়।এক মিনিট, দু মিনিট পার হয়ে যাচ্ছে শ্রুতি হাজারো প্রশ্নভরা চোখে তাকিয়ে দেখছে ওকে।ঈশাণ হঠাৎ করে একটু কেশে উঠল।ভাবনাগ্রস্ত শ্রুতি হুঁশে এলো তখন।পুলক খানিকটা হেসে ফেলল।

-‘ হাসছিস যে?’
-‘ হুম? আমাকে বলছিস?’

পুলকের এমন উদাসীন ভাবটা নেওয়া ঈশাণের অসহ্যবোধ লাগলো খুব।চোখ মুখ শক্ত করে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো ওর থেকে।পুলক বললো, ‘ বিয়েতে কী ইনভাইটেশন পাচ্ছি?’
-‘ লজ্জা করছে না তোর?কোন মুখে এই প্রশ্নগুলো করছিস?’
-‘ অ…! লজ্জা পাওয়ার মতো কিছু বলেছি বোধহয়? এই ধ্রুব আমার প্রশ্নটা কী লজ্জা পাওয়ার মতো ছিল?’
-‘ আমি কী বলবো ভাই!’
-‘ তোরা বিয়ে করছিস এটা একটা ভালো কথা।আমি সেখানে দাওয়াত পাচ্ছি কিনা সেটা জানতে চাওয়া কী আমার অপরাধ?’
-‘ এতদিন কই ছিলি?’
-‘ স্কটল্যান্ড।’
-‘ মেয়েটাকে নিয়ে ওখানে পাড়ি জমিয়েছিস?’

রবিনের প্রশ্নে পুলকের পায়ের রক্ত মাথায় উঠে আসার মতো অবস্থা।কিন্তু না, ও এখন এই মুহূর্তে কোনো সিনক্রিয়েট করবে না।রবিনের প্রশ্ন শুনে শ্রুতি চেয়ে আছে পুলকের দিকে।অবশ্যই পুলক কী উত্তর দেয় তা শোনার আশায়।ওর বুকের ভেতরটা যে তোলপার হয়ে যাচ্ছে।পারছেনা এভাবে চুপচাপ ওর সামনে বসে থাকতে। ইচ্ছে করছে ওর কলারটা চেঁপে ধরে ওর দু’গালে বিরতিহীন চড় বসাতে।জানতে ইচ্ছা করছে এমনটা কেনো করলো ওর সাথে।শ্রুতির চোখে চোখ পরতেই পুলক দেখতে পেলো শ্রুতির চোখের আগুন।শুধু একটু হাসলো।তারপর উঠে চলে গেলো পুল সাইডে অন্যসব ফ্রেন্ডদের মাঝে।প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলো পুলক।কিন্তু শ্রুতি যে খুব আগ্রহ নিয়ে বসে ছিল উত্তরটা শোনার আশায়।মনে মনে ভেবেই নিলো আজ ও সবকিছু পুলকের থেকে জেনে তারপর এখান থেকে যাবে।

-‘ শ্রুতি! চল আমরা ফিরি।’
-‘ না।’

অনেকটা গম্ভীর হয়ে বললো শ্রুতি।

-‘ একটু আগেই না বললি বাসায় ফিরবি?’
-‘ এখন যেতে ইচ্ছে করছে না।’

উঠে চলে এলো ঈশাণের পাশ থেকে।দূরে দাঁড়িয়ে শুধু পুলককে লক্ষ্য করছে শ্রুতি।কী সুন্দর না দেখাচ্ছে আজ পুলককে। শ্যামলা বর্ণ ছিলো গায়ের রং টা।তিন বছর পর দেখে মনে হচ্ছে গায়ের রং টা আরো পরিষ্কার হয়েছে।চশমার ফ্রেমটাও চেইঞ্জ করেছে,চুলগুলো স্টাইলিশ ব্রাশ করা।দু একটা চুল লম্বা হয়ে পরে আছে কপালে ওপর।রেড টি শার্টের ওপর ব্ল্যাক স্যুট। হাতা কনুই অবদি গুছিয়ে রাখা।এত পরিবর্তন! কে বলবে দেখে এই মানুষটার জীবনে কিছু ঘটে গেছে যা একটা মানুষের জীবন শেষ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।এত ভালো থাকতে দেখে পুলকের প্রতি শ্রুতির ঘৃণাবোধ টা আরো বেড়ে গেলো।ও দেখতে চেয়েছিল পুলক যেদিন ওর সামনে আসবে সেদিন ওর চেহারা হবে অপরাধবোধ আর অনুশুচোনার আগুনে দগ্ধ হয়ে যাওয়া একটা মানুষের চেহারা।আজ ওর সামনে এসেছে ঠিকই তবে যা ভেবে রেখেছিল একদম তার বিপরীত কিছু হয়ে ওর সামনে এসেছে।পুলক কানে ফোন নিয়ে পুল সাইড থেকে একটু দূরে সরে এলো একটু ফাঁকা জায়গাতে।শ্রুতি সেখানে দ্রুত হেঁটে গেলো।ও অপেক্ষাতে ছিল কখন ফাঁকা স্পেসে পাবে পুলককে।

-‘ হ্যাঁ প্রজেক্টটা আমিই কমপ্লিট করবো সমস্যা নেই।এ মাসের সাতাশ তারিখেই আমি ব্যাক করছি।টেনশান নিতে হবে না আপনাকে।’

কথার মধ্যেই দেখল শ্রুতি ওর দিকে এগিয়ে আসছে।অনেকটা কাছে চলে এসেছে ওর।ফোনের ওপাশের ব্যক্তিকে বিদায় জানিয়ে ফোনটা পকেটে ভরে নিলো।ওর দিকে তাকিয়ে সুন্দর একটা প্রাণখোলা মুচকি হাসি দিলো।

-‘ হ্যালো।’

শ্রুতি নিশ্চুপ হয়ে গম্ভীর চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।চোখ দুটো উপচে পানি নেমে আসবে আসবে ভাব।পুলক বললো,
-‘ কী দেখছো এভাবে?’
-‘ একজন প্রতারক কে।’
-‘ কে প্রতারক এখানে?’
-‘ নামটা কী শুনতে ইচ্ছা করছে আমার মুখ থেকে?’
-‘ হ্যাঁ।’
-‘ কতোটা পাথর হৃদয়ের মানুষ হলে কেউ এত বড় অপরাধ করার পর ও….’
-‘ চুপ।’

ঠোঁটের ওপর অনামিকা আঙুল রেখে চোখে মুখে কঠোরতা এনে বললো পুলক।

-‘ এখনো যে আমার সামনে তুমি এভাবে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারছো সেটাই তোমার কপাল।ধৈর্য ধরে বসে আছি শুধু।’
-‘ কী বোঝাতে চাইছো তুমি?’
-‘ কিছুনা।এখন বলো তো এঙ্গেজমেন্টের দিন ইনভাইটেশান পাচ্ছি কিনা?’
-‘ খুব শখ আসার?’
-‘ খুব।’
-‘ ঠিক আছে।চলে এসো।’
-‘ কী চায় তোমার আমার থেকে?’
-‘ অবাকের চূড়ান্ত পর্যায়ে আমি।’
-‘ ওমা অবাক হওয়ার কী হলো?কিছু চায়না তোমার?ডিভোর্স? এটাও চায়না?’

আর পারলোনা আটকে রাখতে।অশ্রুর বাঁধ ভেঙ্গে পড়লো দু চোখ থেকে।আরো বেশি কান্না পাচ্ছে পুলকের এক্সপ্রেশন গুলো দেখে।শ্রুতি কান্না করলে পুলক সেই কান্না ভেজা চোখে আর মুখে হাজারো চুমুর প্লাবন বইয়ে দিতো।আজ সেই পুলক ওর কান্না দেখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেমন একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসছে। এ কেমন পুলক?এই পুলককেই কী শ্রুতি সবটা উজার করে ভালোবেসেছিলো?এত বড় স্বার্থবাদী একটা প্রতারককে বিশ্বাস করে নিজের বাড়ি ছেড়েছিল?পুলক আজ শ্রুতির চোখের পানি নিয়ে যে খেলাটা খেলল তা শ্রুতি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভুলবেনা। ওর কাছে এগিয়ে এসে গাল থেকে এক ফোটা পানি অনামিকা আঙুলের ডগার ওপর তুলে নিলো পুলক।তারপর বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে সেটা ঝেড়ে ফেলল।টিস্যু পেপাড় দিয়ে সেই আঙুল দুটোও মুছে নিলো।সবশেষে শ্রুতির পাশ কাটিয়ে চলে গেলো।মরে যেতে ইচ্ছে করছে শ্রুতির।এর থেকে তো সারাজীবনে দেখা না হলেও ভালো হতো।তক্ষণি শ্রুতি ছুটে চলে আসে হোটেলের বাহিরে।আর সে দেখতে চাই না এই বিশ্বাসঘাতক,প্রতারক মানুষটাকে।
_____________________

তিন বছর আগের সবকিছুকে দুঃস্বপ্ন ভেবে সামনের জীবনে এগিয়ে যাবে শ্রুতি।এমন কিছু ভেবেই সে নিজের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে।ভাববে না সে আর ওই প্রতারকের কথা।

-‘ কিরে আজকের দিনে অনন্ত এভাবে মুখটা কালো করে রাখিস না।এমনিতেই তোদের নিয়ে সমালোচনার শেষ নেই।তারউপর মুখটা এভাবে কালো করে রাখলে আরো বেশি বলার সুযোগ পাবে সবাই।’

মেঘলার কথাগুলো কানে আসতেই শ্রুতি ভাবলো, -‘ সত্যিই তো! কেনো আমি মনমরা হয়ে থাকবো? আমার তো আজ থেকে জীবনের নতুন একটা অধ্যায় শুরু হতে চলেছে।আমি আজ থাকবো সবার থেকে খুশি হয়ে।’

কথাগুলো ভেবে নিজেকে একদম স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলো শ্রুতি।আজকে ঈশাণের সঙ্গে শ্রুতির এঙ্গেজমেন্ট।শ্রুতির বাড়িতেই পার্টিটা এ্যারেঞ্জ করা হয়েছে।শ্রুতি আর ঈশাণের আশপাশ দিয়ে ওদের সকল বন্ধু-বান্ধব গিজগিজ করছে। কেউ ই আসতে বাকি নেই।শুধু একজন বাদে।সে তো নিজে যেচে এসে দাওয়াতটা নিয়েছিল।আসবে কী সে? সবার সাথে হেসে হেসে গল্প করছে ঠিকই।কিন্তু মনের মধ্যে সেই মানুষটার ভাবনাও ভাবছে শ্রুতি।সবশেষে এঙ্গেজমেন্টটা হয়েই গেলো। প্রত্যেকেই খুব খুশি।কিন্তু খুশি হতে পারছে না শ্রুতি।এত ঘেন্নার পরও ইচ্ছা ছিল ওই মানুষটা আসবে এখানে, একটাবার দেখবে তাকে।কিন্তু কই?সে তো এলোনা।আর আসবেই বা কোন মুখ নিয়ে।আত্মসম্মানবোধ না থাকলে ঠিকই আসতো। নিচে গার্ডেন সাইডে বসে শ্রুতি আর ঈশাণ সব ফ্রেন্ডদের সঙ্গো আড্ডাই ব্যস্ত ছিলো।এরই মাঝে পুলক এসে উপস্থিত হলো।

-‘ আড্ডা তো বেশ জমেছে।আমি কী জয়েন করতে পারি?’

সবাই ফিরে তাকালো ওর দিকে।বাহ্ বেশ তো লাগছে আজ দেখতে পুলককে।পুলকের পরনে আজ শ্রুতির দেওয়া শেষ উপহারের হোয়াইট স্যুট এন্ড প্যান্ট।তার সঙ্গে স্যুটের নিচে হালকা পিংক কালার একটা শার্ট।পকেটে দু’হাত পুরে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি বজায় রেখে দাঁড়িয়ে আছে সে।নজরটা রয়েছে শ্রুতির দিকে।শ্রুতিও আজ হোয়াইট আর পিংক কালার মিক্সড একটা ল্যাহেঙ্গা পরেছে।যার জন্যই সবাই একবার শ্রুতিকে দেখছে আবার পুলককে দেখছে।পুলকের আগমন সবাইকে অবাক করে দিয়েছে শুধু ধ্রুব ছাড়া।সে এসে ওকে বললো,
-‘ আমি তো ভাবলাম তুই বোধহয় রুমে বসে কাঁদছিস আর টিসু পেপাড়ে চোখ মুছছিস।’
-‘ কী যে ভাবিস না আমাকে তোরা!’
-‘ তুই এখানে?’

ঈশাণ রাগে গম গমে ভাব নিয়ে প্রশ্নটা করলো পুলককে।ভদ্রতা বজায় রেখে পুলক উত্তর দিলো,-‘ তোর হবু বউয়ের কাছ থেকে সেদিন ইনভাইটেশান পেলাম।অবশ্য আমিই যেচে পড়ে নিয়েছিলাম।খুশি হোস নি বুঝি?’

শ্রুতির নজর মাটির দিকে।সে না পারছে পুলকের দিকে তাকাকে আর না পারছে ওর সঙ্গে কথা বলতে।চোখ ফেটে ভেতরে সব কান্না বেরিয়ে আসতে চাইছে।এতটা কষ্ট তো ওর হওয়া উচিত না।পুলক তো বেশ আছে।তাহলে ও কেনো এত কষ্ট পাবে?

-‘ আমি এসেছি তার কারণটা তুই না বুঝলেও তোর বউ বুঝে গেছে।’

পুলকের কথায় শ্রুতি এতক্ষণে টের পেলো।পুলক এসেছে ওকে ডিভোর্স পেপাড় টা দিতে।কাগজে কলমে সারাজীবনের জন্য আজই ওদের বিচ্ছেদ ঘটবে।পারবে কী শ্রুতি ওই কাগজে একটা সই করে সারাজীবনের জন্য ওকে ত্যাগ করতে?হুহ্ মনের বিচ্ছেদটা তো কবেই ঘটে গেছে।তাহলে কাগজে কলমে বিচ্ছেদটা মেনে নিতে আর সমস্যা কোথায়?নিজেকে সামলে একদম স্বাভাবিক করে উঠে এলো পুলকের সামনে।

-‘ কই? কাগজটা দাও।’

পুলক কাগজটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।শ্রুতির চোখের দিকে তাকিয়ে কাগজ ওর দিকে এগিয়ে ধরলো।
_________________

বাগানের ভেতরটায় যেখানে নিরিবিলি বসার জন্য একটা ছোট টেবিল আর দুটো চেয়ার সেখানে গেল ওরা দুজন।সাথো এলো ঈশাণও।কাগজটা হাতে নিয়ে টেবিলের ওপর রেখে শ্রুতি যখন সই করতে গেলো তখন পুলক বললো,-‘ অন্ততপক্ষে একবার চোখটা বুলিয়ে নাও।পড়ে দেখো কাগজে কী লেখা আছে।এত তাড়া কিসের?বিয়েটা তো আর আটকে দিচ্ছি না।’

ঈশাণ এগিয়ে এসে বললো,-‘ শ্রুতি কাগজটা দে তো দেখি।’
-‘ ডিভোর্সটা আমার আর তোর শ্রুতির হচ্ছে।তোর ভূমিকা এখানে না থাকলেও চলবে।স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাক।’

ঈশাণ ক্রুদ্ধ চোখে চেয়ে আছে পুলকের দিকে।পুলকের চাহনি ও ঠিক একই রকম।শ্রুতি কাগজটা হাতে নিয়ে যখন পড়তে শুরু করলো তখন পুলক আবার বললো,-‘ চেয়ারটাতে বসো তারপর পড়ো।’

শ্রুতি একটু সময় ওর দিকে চেয়ে থেকে চেয়ারে বসল।তারপর পড়তে আরম্ভ করলো।শুরুর দিকে আইনীভাবে কাগজে যা লেখা থাকে সেগুলোই লেখা।তারপর নিচে নামতে নামতে যে লিখাগুলো ছিল তা পড়তে পড়তে শ্রুতির গলা শুকিয়ে আসছিলো।মনে হচ্ছিল ওর পায়ের নিচের জমিন কেঁপে উঠছে বার বার।এর জন্যই বোধহয় পুলক ওকে বসে পড়তে বলেছে।

_

অনুরাগ ৯ম পর্ব

অনুরাগ
৯ম পর্ব
লেখিকাঃ #Israt_Jahan

 

-‘ বিয়েটা কেনো করছিস না বল তো?ঈশাণ কিন্তু সত্যি খুবই পছন্দ করে তোকে।আর সেটা ভার্সিটি টাইম থেকেই।ও এখনো তোর জন্য অপেক্ষা করে বসে আছে।আর তুই অপেক্ষা করে আছিস ওই বেঈমানের জন্য?’

শ্রুতি নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে।এই তিনটা বছর শ্রুতি কীভাবে কাটালো তা নিজেরও অজানা।এর মাঝে অনেকবার মনে হয়েছে যে পুলকের সাথে একটাবার কথা বলা উচিত।কিন্তু রাগ অনুরাগ তাকে আটকে ধরে রেখেছিলো।আর যখন সেই রাগ অনুরাগকে ভুলে গিয়ে পুলকের খোঁজ নিতে গেলো তখন আর পুলককের অস্তিত্ব পাওয়া গেলো না।সবাই বলছে পুলক হয়তো সেই বাবলী মেয়েটার সঙ্গে দূরে কোথাও সংসার পেতেছে কিংবা অন্য কাউকে নিয়ে।কিন্তু শ্রুতির মনে হচ্ছে পুলক ভালো নেই।

-‘ শ্রুতি?কথা বলছিস না কেনো?

মেঘলার ডাকে শান্ত চোখে ওর দিকে ফিরে তাকালো।

-‘ তোর কী মনে হয় পুলক সত্যিই কাউকে….?’
-‘ শ্রুতি!’
-‘ প্লিজ বল না?’
-‘ আমি জানিনা কিছুই।ওর ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে নামা প্লিজ।ও যদি কোনো অপরাধ করে না থাকে তাহলে তোর সাথে কেনো আর যোগাযোগ করলোনা বল।ও তোকে একসময় এমনিতেই ছেড়ে চলে যেতো।কিন্তু তার আগেই তো…..’

মেঘলার কথার মাঝে ওর ফোন বেজে উঠলো।ফোনে কথা বলা শেষে শ্রুতিকে বললো, ‘ঈশাণ আসছে এখানে।তোর ফোন রিসিভ হচ্ছেনা বলে আমাকে ফোন করেছে।’

-‘ ও এখানে এসে কী করবে?’
-‘ কী করবে আবার?কফি খাবে আমাদের সঙ্গে।শোন আজ সবকিছু তোদের মাঝে ক্লিয়ার করে নে।ঈশাণ সত্যি তোকে ভালোবাসে রে।ও তোকে অনেক ভালো রাখবে।’

সেদিনের কথার পর শ্রুতি আর ঈশাণ কে ফিরিয়ে দিতে পারে নি।ঈশাণের ওর মুখ থেকে হ্যাঁ শব্দটি না শোনা পর্যন্ত জায়গা থেকে এক চুল পরিমাণ ও নড়েনি।শ্রুতির হাতটা ধরে বসেই ছিল শুধুমাত্র ওর মুখ থেকে হ্যাঁ শব্দটি শোনার জন্য।অবশেষে শ্রুতি আর ফিরিয়ে দিতে পারে নি ওকে।সেদিন রাতেই ঈশাণ ওর বাবা-মা কে নিয়ে শ্রুতির বাড়িতে যায় শ্রুতিকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিতে।ঈশাণের মতো ছেলের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার মতো ইচ্ছা কোনো বাবা-মায়ের ই নেই।শ্রুতির বাবা-মা ও পারে নি।সবশেষে রিসেন্ট মান্থেই ওদের এঙ্গেজমেন্টের ডেট ফিক্সড করেছে তারা।
.
.
.
-‘ আচ্ছা তোরা এ্যারেঞ্জমেন্ট কর। ওকে নিয়ে আসার দায়িত্ব আমার।ওকে রাখছি।’
-‘ ঈশাণ আমি কোথাও যাবোনা। প্লিজ আমাকে জোড় করিস না।’
-‘ কেনো যেতে চাইছিস না তুই?আচ্ছা তুই কী আমাকে মেনে নিতে পারছিস না এখনো?’
-‘ তেমন কোনো বিষয় না।আমার ভালো লাগছে না।’
-‘ ভালো লাগাতে হবে শ্রুতি।২-৩ বছর আগেও আমরা সব ফ্রেন্ডরা এমন কতো ইভেন্ট তৈরি করেছি।কতো এনজয় করেছি সেইসব ইভেন্টগুলো।তাহলে আজ কেনো করবি না?এভাবে লাইফটাকে থামিয়ে রাখার কোনো মানেই হয়না।’

শ্রুতি ঈশাণ কে কী করে বোঝাবে যে এমন ধরনের ইভেন্টে জয়েন করা মানেই পুলকের স্মৃতিগুলো ওকে চারপাশ থেকে ঘিরে রাখে।সেইসব ইভেন্টগুলোর মূল ইভেন্ট প্ল্যানার ছিল যে পুলক।সেই সময়গুলোতে দুজন কতো মিষ্টি মধুর সময় কাটিয়েছে ওরা।আর আজ এখন সেই ইভেন্টে সবাই থাকবে শুধু থাকবে না পুলক।

-‘ তুই নিশ্চই পুলকের কথা মনে করে ইভেন্টে যেতে চাইছিস না?’
-‘ (নিশ্চুপ)’
-‘ যদি এটাই তোর না যাওয়ার মূল কারণ হয় তাহলে আমি তোকে বাধ্য করবো ইভেন্টে জয়েন করতে।কারণ আমি চাই না তুই ওই প্রতারকের স্মৃতি মাথায় রেখে সব আনন্দ খুশি থেকে নিজেকে দূরে রাখবি।এখন তুই কী চাস বল?আমি তোকে বাধ্য করবো আমার সঙ্গে যেতে নাকি তুই নিজেই যাবি?’

অগত্যা শ্রুতি পুলকের সঙ্গে একটি হোটেলে গেলো ওদের ফ্রেন্ডদের গেট টুগেদার পার্টিতে।সেখানে তানিয়া,মেঘলা,নিশাদ,রবিন ছাড়াও ভার্সিটির আরো কিছু ফ্রেন্ড এসেছে।পার্টিটা হচ্ছে হোটেলের মধ্যে সুইমিং প্লেসের সাইডে।চারপাশ অসম্ভব আলো আর মিউজিকের জোরালো শব্দে শ্রুতির মাথা ধরে আসছে।সবাই ইতোমধ্যে শ্রুতি আর ঈশাণের বাগদানের কথা জেনে গেছে।খুব ইয়ারকি মজা করছে সবাই ওদের সঙ্গে।এর মধ্যে ওদের একটি ফ্রেন্ড ধ্রুব এসে ঈশাণকে বললো, ‘ সেই তো ওকে ভাগিয়েই নিলি।তো পুলকের সঙ্গে বিয়েটা হওয়ার আগেই ভাগিয়ে নিতি।বিয়ের পরে কেনো দোস্ত?’
-‘ ভাগিয়ে নিয়েছি এটা কেমন কথা ধ্রুব?কথা সংযত হয়ে বল।’
-‘ অদ্ভুত!রেগে যাচ্ছিস কেনো?কথাটা কী শুধু আমি একা বলছি? এখানে যারা উপস্থিত সবাই একই কথা বলছে।’
-‘ সবাই বলছে মানে?সবাই কী বলছে?’
-‘ আচ্ছা থাক বাদ দে।যা বলেছি তো বলেছি।ওসব কথা থাক। এসেছি এনজয় করতে।ভাগাভাগি প্রসঙ্গ থাক।চল ওদের কাছে যাই।’
-‘ দাঁড়া শ্রুতিকে ডাকি।’
-‘ আরে ও তো আছে মেঘলাদের সঙ্গে।তুই আয় আমার সাথে।’

হাতে সফ্ট ড্রিংকসের গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে ঈশাণ সবার সঙ্গে কথা বলছে।কথার এক পর্যায়ে ঈশাণ জানতে চাইলো আজকের ইভেন্টের মূল প্ল্যানার কে?শুভ নামের একটি ফ্রেন্ড বললো, ‘ কেনো তুই জানিস না?’
-‘ না তো।কে?’
-‘ কী যে বলিস।এতকাল ধরে ইভেন্টগুলো কে তৈরি করে? সেই ই করেছে।’

ঈশাণ কিছুটা গম্ভীর হয়ে গেলো শুভ’র কথা শুনে।চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ।বললো, ‘কার কথা বলছিস।ভালো করে বল।’
-‘ থাক আর জানতে হবে না।একটু পর নিজের চোখেই দেখে নিস।’

-‘ এই শ্রুতি তোদের কী আকদটা হয়ে গেছে?’
-‘ আরে না।এ মাসের ছাব্বিশ তারিখে এঙ্গেজমেন্ট।তারপরই বিয়ের ডেট ফিক্সড হবে।’
-‘ আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করি?কিছু মনে করবি না তো?’
-‘ রিয়া তুই কী জিজ্ঞেস করতে পারিস তা আমি জানি। না, আমার আর ওর ডিভোর্সটা এখনো হয়নি।ও কোথায় আছে আমি নিজেও জানিনা।’
-‘ তাহলে ডিভোর্স ছাড়া……’

রিয়ার কথা শেষ হওয়ার আগেই ইভেন্ট প্ল্যানার এসে উপস্থিত। সবাই তার সঙ্গে জাপ্পি নিতে ব্যস্ত।

-‘ এবারের ইভেন্ট প্ল্যানার কে?’
-‘ গিয়ে দেখে আয় কে।’

রিয়ার মুখের দিকে চেয়ে দেখলো শ্রুতি।রিয়া ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে।রিয়ার থেকে চোখ ফেরাতেই ঈশাণের দিকে চোখ পড়লো শ্রুতির।কেমন বিষণ্নতার ছাপ চেহারায় দেখতে পাচ্ছে ও।

-‘ চল দেখা করে আসি ওর সাথে।অনেকদিন বাদে দেখা হচ্ছে।’

রিয়ার সাথে এগিয়ে গেলো সকলের মাঝে সেই ইভেন্ট প্ল্যানারের সাথে দেখা করতে।বুকের ভেতরটা কেমন যেনো ছটফট করছে।মানুষটা কে হতে পারে এটা ভেবেই বড্ড অস্থির লাগছে শ্রুতির।শ্রুতির পাশে এসে দাঁড়ালো ঈশাণ।সে নিজেও এক্সাইটেড মানুষটা কে হতে পারে তাকে দেখার জন্য।

_

অনুরাগ ৮ম পর্ব

অনুরাগ
৮ম পর্ব
লেখিকাঃ #Israt_Jahan

-‘আমি কী তোমার বাসায় যাচ্ছি?’
-‘হ্যাঁ।’
-‘সত্যি?’
-‘মিথ্যা হবে কেনো?’
-‘আমি কী আজ থেকে তোমার সঙ্গেই থাকবো?’
-‘অবশ্যই।আমার সঙ্গে থাকবেনা তো কার সঙ্গে থাকবে তুমি?’
-‘ওখানে আর আমাকে ফিরে যেতে হবেনা? ওরা যদি আমাকে কখনো নিতে আসে আবার?’
-‘আর আসবেনা ওরা বাবু।তুমি এত চিন্তা করছো কেনো?এখন তো আমি আছি তোমার সঙ্গে তাইনা?’

গাড়িতে বসে পুলক বাবলীর সঙ্গে কথা বলতে বলতে বাড়িতে পৌঁছে গেলো।বাবলী ছোট বাচ্চাদের মতো পুলকের বাহু জড়িয়ে ধরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।শ্রুতি কলিংবেলের আওয়াজ শুনে দরজা খুলে ওদের দুজনকে একসাথে দেখে না চাইতেও চমকে গেলো।
পুলকের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি।আর বাবলী মেয়েটা খুব ভীত চোখে তাকিয়ে দেখছে শ্রুতিকে।
শ্রুতি দরজার মুখের সামনে থেকে সরে দাঁড়াতে ওরা ভেতরে ঢুকলো।ড্রয়িংরুমে তানিয়া,মেঘলা, ঈশাণ,রবিন,নিশাদ সবাই বসে আছে।সবারই মুখের ভাবটা গম্ভীর।পুলকের সঙ্গে ছবিতে দেখা ওই মেয়েটিকে দেখে সবাই বেশ চমকে উঠলো। কেউ কিছু বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছেনা।শুধু তাকিয়ে দেখছে দুজনকে।

-‘বাহ্ তোরা সবাই আছিস দেখছি।ভালোই হয়েছে।সবটা সবার সামনেই পরিষ্কার হবে।’
রবিন বললো, ‘ও কে পুলক?’
-‘ও বাবলী।’
-‘সেটা তো ওর নামের পরিচয়।’

শ্রুতি শান্ত ভঙ্গীতেই বললো পুলককে।পুলক বললো, ‘ও আমার ছোট বোন শ্রুতি।আমার একমাত্র ছোট বোন।যাকে আমি সেই এগারো বয়স হারিয়েছিলাম।’

পুলকের উত্তরে সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেলো।শ্রুতিও একদম চুপ হয়ে গেলো।ওরা দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে শুধু।ঈশাণ হঠাৎ এর মধ্যে খিক করে হেসে উঠল।বললো, ‘কারো কোনো কমেন্ট আছে?’

সবাই নিশ্চুপ।এ্যাটেনশন এখন সবার ঈশাণের দিকে।পুলকও চেয়ে আছে ওর দিকে।কী বলতে চাই তা শোনার আশায়।ঈশাণ উঠে এসে পুলকের সামনে দাঁড়াল পকেটে হাত গুজে।বললো, ‘এত লো ক্লাসেস বুদ্ধি পাস কই?’

-‘তোর সমস্যা কোথায় বল তো ঈশাণ?’
-‘এটা তো আমি জিজ্ঞেস করবো আমি?কেনার সময় কী বোন বলে কিনেছিস?’
-‘ঈশাণ….!’

চিৎকার করে উঠলো পুলক।ঈশাণ আবারো বললো, ‘কিনেই তো এনেছিস।মিথ্যে বলেছি কী?রবিন স্বাক্ষী আছে এখানে।আর সব থেকে বড় স্বাক্ষী ওখানকার সর্দারনী।ফোন দিই?কী বলিস?তুই দিবি নাকি আমি দিবো?’

ঈশাণ পুলককে সর্দারনীর নাম্বারটা দেখিয়ে কল করলো তাকে।কলটা স্পীকার করে সবাইকে শুনালো পুলক কীভাবে কত দামে বাবলীকে ওখান থেকে কিনে নিয়েসেছে।আর সব থেকে বড় যে কথাটা সেটা হলো সর্দারনী জানিয়েছে বাবলীকে পুলক বিয়ে করবে বলে সে ওকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে কিনে এনেছে।কোন বোন পরিচয়ে আনেনি এখানে।শ্রুতি ধপ করে ফ্লোরে বসে পরলো।মেঘলা,তানিয়া ওকে দ্রুত গিয়ে ধরে বসল।পুলক ঈশাণের কাছ থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে সর্দারনীকে বললো, ‘এই কী বলছেন আপনি?এসব কী বলছেন?বাবলীকে আমি বিয়ে করবো বলে…..।ছিঃ ও আমার বোন।আমি কত কষ্টে ওর সন্ধান পেয়েছি আপনি জানেন।হ্যালো হ্যালো…..?’

ওপাশ থেকে ফোনটা কেটে গিয়েছে।পুলক ঘুরে তাকিয়ে দেখলো শ্রুতি মেঘলার বুকে মাথা রেখে ফ্লোরে পাথরের মতো বসে আছে।তাকে খুবই অস্বাভাবিক লাগছে।ওর কাছে গিয়ে পুলক বললো, ‘তুমি আমাকে বিশ্বাস করছোনা,হ্যাঁ? এই শ্রুতি?তোমার বিশ্বাস হচ্ছেনা আমার কথা? বাবলী আমার বোন।ছোট থাকতে আমার মামা একদিন রাতে ঘুমের মধ্যে ওকে চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলো আমার কাছ থেকে।ও তখন খুব ছোট ছিলো।আমি ওকে কোথাও খুঁজে পাইনি।সপ্তাহ খানেক আগে আমার সেই মামা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকার জন্য।আমাকে জানায় সে ক্যান্সারে আক্রান্ত।এডিক্টেড ছিলো খুব সে।আমি তাকে টাকা দিতে রাজি না হলে সে আমাকে বাবলীর কথা জানায় বাবলীকে সে কোথায় চুরি করে রেখে এসেছিলো।আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পারি বাবলী এখন টাঙ্গাইল।আর আমি সেদিনই তোমাকে অফিসের কাজের কথা জানিয়ে টাঙ্গাইল যাই ওকে ফিরিয়ে আনতে।আমি……’

-‘থাম ভাই।অনেক তো বললি।এবার তোর বাবলীকে কিছু বলতে দে।’

পুলক থম মেড়ে দাঁড়িয়ে আছে।শ্রুতিকে কিছু বলবে তখনই ঈশাণ ধমকে বাবলীকে জিজ্ঞেস করলো, ‘এই মেয়ে তোর সাথে পুলকের পরিচয় কী করে?তোর সাথে ওর সম্পর্ক কিসের?’

এরকম আরো নানারকম প্রশ্ন করলো ঈশাণ বাবলীকে।বাবলীর উত্তর যা ছিল তা শোনার পর পুলক আর এক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। শ্রুতি ওর মুখটা অবদি তাকিয়ে দেখেনি।শ্রুতি বাসা থেকে বেরিয়ে এসেছে মেঘলা আর তানিয়ার সাথে।বাবলী কী করে বলতে পারলো পুলক তার দেহ ভোগের জন্য বাড়িতে নিয়েসেছে পতিতালয় থেকে?নিজের বোন হলে এমন কথা সে কখনো বলতে পারতোনা।এসব ভেবে পুলকের মাথা এলোমেলো হয়ে গেছে একদম।এর মধ্যে কখন যে শ্রুতি মেঘলা আর তানিয়ার সাথে বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে পুলক তা লক্ষ্যও করেনি।একে একে বাসাটা পুরো খালি হয়ে গেছে।পুলক মেঝেতে বসে আছে।

-‘জীবন টা আবারও আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেললো।’

এটায় ছিলো পুলকের শেষ কথা।এরপর প্রায় তিন বছর কেটে যায়।পুলকের কোনো সন্ধান মিলেনি।শ্রুতি যখন নিজের বাড়িতে ফিরে যায় তার কিছুদিনের মাথায় ওর ফ্যামিলি শ্রুতিকে বাধ্য করে পুলককে ডিভোর্স লেটার পাঠাতে। পুলকের ঠিকানাতে ডিভোর্স লেটার পৌঁছালেও পুলককে আর পাওয়া যায় না।তার আগে পুলক বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছিলো শ্রুতির সঙ্গে যোগাযোগ করতে।কিন্তু পারেনি আর তার এক সপ্তাহ পর থেকেই পুলক হারিয়ে গেছে কোথাও।কেউ ই তার কোনো সন্ধান দিতে পারেনি।

_

অনুরাগ ৭ম অংশ

অনুরাগ
৭ম অংশ

লেখিকাঃ #Israt_Jahan

-‘ তোর সাহস কতখানি তুই আমাকে থ্রেট করছিস?অবশ্য এমন একটা বাজে কাজ করার মতো সাহস যে দেখাতে পারে তার তো…..।তুই বেরো আমার বাসা থেকে।যাহ্ বেরো……বেরো।’

একরকম ঘাড় ধাক্কা দিয়েই বের করে দিলো ঈষাণকে পুলক।শ্রুতি বেলকোনির এক কোণে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে।চোখের পানিতে গাল চিকচিক করছে তার।আবছা আলোতেই পুলক দেখতে পাচ্ছে শ্রুতি আর শ্রুতির ভেজা গাল।তখন ঈষাণের সাথে অমন ক্লোজড হয়ে বসে থাকতে দেখে ক্ষণিকের জন্য মাথা খুব গরম হয়ে গিয়েছিল।নিজের রাগকে কন্ট্রোল করতে পারেনি তখন।ওইভাবে শ্রুতিকে আঘাত করা পুলকের একদমই উচিত হয়নি।সম্পর্কের এতগুলো বছরে এভাবে হুট করেই শ্রুতিকে অবিশ্বাস করাটা পুলকের কাছে খুব অন্যায় বলে মনে হচ্ছে।তবুও মনকে মানাতে পারছেনা সে।

-‘ কেনো এমনটা করলে?’

পুলকের প্রশ্নে শ্রুতি চোখের পানি মুছে চোখ মুখ শক্ত করে ওর দিকে এগিয়ে এলো।

-‘ আমাকে করছো এই প্রশ্ন?প্রশ্নটা তো আমার করার কথা ছিলো তাইনা?’

পুলক খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছে কিছু একটা হয়েছে।শ্রুতি যদি অন্যায় কিছু করে থাকে তাহলে ওর চোখে মুখে কঠোরতা নয় আতংক থাকার কথা।কিন্তু না তাকে খুবই আপসেট লাগছে।ওপর থেকেই বোঝা যাচ্ছে ভেঙ্গে চুড়ে পরেছে সে।ব্যাপারটা আগে জানা প্রয়োজন পুলকের।

-‘ কী করেছি আমি বলো তো?কী হয়েছে তোমার?’
-‘ আমার মুখ থেকেই শুনতে চাইছো?’
-‘ প্লিজ আমি এভাবে তোমাকে দেখতে পারছিনা।’
-‘ তাই?’
-‘ তখন তুমি কী বললে আমাকে?আমি তোমার সতীন আনছি।নারী পিপাসু আমি।এগুলো কী ভাষা ছিলো শ্রুতি?এমনো কথা তোমার থেকে আমাকে কখনো কোনোদিন শুনতে হবে……।’
-‘ কী করেছি আমি বলো?’

শ্রুতি কিছুক্ষণ পুলকের মুখের দিকে চেয়ে থেকে রুমে চলে গেলো।পুলকও ওর পিছু পিছু রুমে এলো।বিছানার ওপর থেকে ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে ফটো গুলো পুলকের সামনে মেলে ধরলো শ্রুতি।ফটোগুলো দেখে চোখদুটো বন্ধ করে হতাশার ভঙ্গীতে মুখ ঘুরিয়ে নিলো পুলক। অনেক সময় ধরে শ্রুতি পুলকের মুখের দিকে চেয়ে আছে কিছু শোনার আশায়।ও শুনতে চায় পুলক বলুক, ‘ তুমি যা ভেবেছো সব ভুল সব মিথ্যা।’ কিন্তু পুলক এমন কিছুই বললোনা। কিছুক্ষণ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকলো।গলা থেকে টাই টা খুলে নিচে ফেলে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পরলো সে।শ্রুতির ইচ্ছা করছে চিৎকার করে কাঁদতে।হেঁটে হেঁটে বেলকোনিতে চলে গেলো সে।
————————————————–

মাথাটা প্রচন্ড ভার হয়ে আছে শ্রুতির।কেমন যেনো চোখ মেলে তাকাতেও কষ্ট হচ্ছে।মাথাটা চেঁপে ধরে উঠে বসে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো সে।সকাল ১০ বেজে ৩৫ মিনিট।

-‘ অনেক দিন পর এতো বেলা অবদি ঘুম হলো।’

পুলকের কথা শুনে ফিরে তাকালো শ্রুতি ওর দিকে।হাতে দু কাপ কফি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। খুব খোশ মেজাজে আছে বলে মনে হচ্ছে শ্রুতির কাছে।ব্ল্যাক টি শার্ট আর হাফ কোয়ার্টার প্যান্ট সাথে ভেজা চুল গুলো কপালের ওপর এলোমেলো হয়ে পরে আছে।খুবই স্বচ্ছ লাগছে তাকে দেখতে।
ওর এতো অতী স্বাভাবিক ভাব দেখে শ্রুতির নিজেকে আরো বেশি এলোমেলো লাগছে।

-‘ আমি তো রাতে বেলকোনিতে ছিলাম।’
-‘আমি তো আপনাকে বিছানাতে নিয়েলাম।’

কফি হাতে শ্রুতির পাশে এসে বসল।শ্রুতি ফোলা চোখে একটু বিস্ময় চোখে তাকিয়ে দেখছে পুলককে।হাতে কফির মগটা ধরিয়ে দিয়ে শ্রুতিকে বললো, ‘ ভেবেছিলাম কোলে তুলে নিয়ে আসার সময় আপনি সিনক্রিয়েট করবেন।কিন্তু ম্যাডাম তো একদম ঘুমে কাদা ছিলেন।যখন বিছানাতে শুইয়ে দিলাম একদম গলা টেনে ধরে সারারাত গলা জড়িয়ে বেঘোরে ঘুমালেন।’

একটু আবেগমাখা কন্ঠে পুলক আবারো বললো, ‘ পারবেনা তো আমাকে ছেড়ে থাকতে।তাহলে খামোখা এই দূরে থাকার ব্যার্থ চেষ্টা কেনো?’
-‘ কী চাইছো বলো তো তুমি?কী চাইছো?সবকিছু স্বাভাবিক রেখে আমার সামনে তাকে নিয়ে সংসার করতে?কীভাবে পারছো তুমি এমন জিনিস ভাবতে?’

বড্ড তেজী গলায় কথাগুলো বললো শ্রুতি।পুলক শুধু শূণ্য দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ওর দিকে।শ্রুতি ওর এমন ব্যবহার কিছুতেই মেনে নিতে পারছেনা। পুলকের দিকে আর তাকিয়ে থাকতে পারলোনা। চোখের পলক নামিয়ে মাথা নিচু করে আবার কেঁদে ফেললো।ও পারবেনা এভাবে থাকতে। মরেই যাবে ও পুলককে ছাড়া।পুলক শ্রুতির মাথাটা নিজের কাঁধের ওপর টেনে নিলো।শ্রুতি মাথা উঠিয়ে নিতে চাইলে পুলক জোর করেই ধরে রাখলো ওকে।

-‘ ছাড়ো।’
-‘ না।’
-‘ উফ্ আমার অসহ্য লাগছে খুব।ছাড়ো।’
-‘ আমি সারাদিন তোমাকে এভাবে ধরে রাখলেও তোমার যে অসহ্য লাগবেনা তা আমি জানি। তোমাকে জানতে হবে, শুনতে হবে আমার সব কথা। কে বা কারা এমন একটা ব্যাপারকে ভুলভাবে তুলে ধরেছে তোমার সামনে তা আমি শুনবোনা। কারণ সেই তথ্য আমি নিজেই অনুসন্ধান করবো।কিন্তু তুমি যে ব্যাপারটাকে ঘিরে একটা বিশ্রি ঘটনা তৈরি করে নিয়েছো নিজের মনে সেটা আমায় ক্লিয়ার করতে হবে তোমার কাছে। তবে শুধু মুখে বলে নয়।স্ব-চোক্ষে দেখিয়ে ক্লিয়ার করবো সবকিছু।একটু ওয়েট করো।’
__

অনুরাগ ৬ষ্ঠ পর্ব

অনুরাগ
৬ষ্ঠ পর্ব
লেখিকাঃ #Israt_Jahan

ঈশাণ শ্রুতির হাত থেকে ফোনটা নিয়ে দেখল পুলকের সঙ্গে একটি মেয়ের বেশ কিছু ছবি।একটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে পুলক ওই মেয়েটাকে আইসক্রিম খাইয়ে দিচ্ছে, মেয়েটাও ওকে আইসক্রিম খাইয়ে দিচ্ছে আবার ওর নাকেও জড়িয়ে দিচ্ছে।দুজন মিলে শপিং করে বের হচ্ছে,রিক্সায় ঘুরছে।ছবিগুলো দেখে ঈশাণ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।তারপর শ্রুতিকে বলল,
-‘ রবিনকে ফোন কর।’

শ্রুতির শরীর থরথর করে কাঁপছে তখন। মাথাটাও কেমন ঘুরছে মনে হচ্ছে ওর কাছে।আজকে শ্রুতির পুলকের বলা ওই কথাটা মনে পরছে,
-‘ জীবনের সব থেকে বড় খুশিটা ফিরে পেয়েছি।’

তাহলে কী এটাই ছিল ওর জীবনের সব থেকে বড় খুশি?হ্যাঁ ছবিতে পুলককে খুব খুশি দেখাচ্ছে।এই খুশির জন্যই হয়তো ও এতদিন অপেক্ষা করেছে।এমনটাই মনে হচ্ছে ছবিগুলো দেখে।শ্রুতি আর নিজেকে সামলাতে পারলোনা।মাথা ঘুরে নিচে পরে গেল।ঈশাণ দ্রুত ধরে ওকে কোলে তুলে বিছানায় নিয়ে এল।চোখ মুখে পানি ছিটানোর পর ওর জ্ঞান ফিরলে ঈশাণের বুকে মাথা রেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল শ্রুতি।ঈশাণ তখন ধমকে বলল,
-‘ ছবিটার মেয়েটা কে তুই কী জানিস? না জেনেই এরকম পাগলের মত কান্নাকাটি করছিস কেন?ওর তো কোনো রিলেটিভ…..’

শ্রুতি ঈশাণের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-‘ ওর কোনো রিলেটিভ নেই ঈশাণ ওর কোনো রিলেটিভ নেই।’
-‘ তুই কান্না থামা।আগে রবিনকে ফোন কর।ও মেসেজ করেছে তুই ওই মেয়েটাকে চিনিস কিনা?’

কোনরকমে নিজেকে সামলে শ্রুতি রবিনকে ফোন করল।

-‘ হ্যালো শ্রুতি?’
-‘ তুই এই ছবিগুলো কোথায় পেয়েছিস?’
-‘ এই ছবিগুলো আমি নিজে তুলেছি। গতকাল আমি টাঙ্গাইল এসেছি মামার বাড়িতে।তারপর বিকালে আমি মামার সাথে শহরে ঢুকতেই পুলককে একটা দোকানের সামনে দেখলাম।ওকে দেখে ছুটে ওর কাছে যাব তখন দেখি ওর পাশে ওই মেয়েটা।তারপর ওরা ওখান থেকে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকল।আমিও গেলাম সেখানে।ওরা পাশাপাশি বসে যেভাবে গল্প করছিল আর খাচ্ছিল এভাবে আমি বাইরে কখনো তোর সাথে বসেও করতে দেখিনি।ব্যাপারটা তখনই আমার কাছে বেশ খটকা লাগল।তাই আমি ছবিগুলো তুলে ফেলি।ভেবেছিলাম ওই সময়ই তোকে ফোন দিব।পরে ভাবলাম আগে আমি নিজে ক্লিয়ার হই।পুরোটা বিকাল ও ওই মেয়েটাকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছে।আর সন্ধ্যার সময় ওই মেয়েটাকে নিয়ে এমন একটা জায়গায় ঢুকল যে তখন আমি মাথা ঠান্ডা করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না।’

শ্রুতি কাঁপা কন্ঠে প্রশ্ন করল, ‘ কোথায় ঢুকেছিল ওরা?’

রবিন একটু চুপ থেকে নিচুস্বরে বলল, ‘ নিষিদ্ধ পল্লিতে।’

শ্রুতি তখন একদমই চুপ।রবিন আবার বলতে শুরু করল,
-‘ আমি পিছু পিছু মামাকে নিয়ে ওখানে ঢুকলাম।তারপর দেখলাম মেয়েটাকে নিয়ে ওই পল্লির সর্দারনীর বিল্ডিং এ ঢুকতে।মিনিমাম দু ঘন্টা পর পুলক বেশ মন ভার করে বেরিয়ে এল ওখান থেকে।আমি ভাবলাম তখনই ওর সাথে গিয়ে কথা বলব।কিন্তু মামা বারণ করল।ওর পিছে পিছে তখন ওই সর্দারনী বেরিয়ে এসেছে।ওকে বলল,
‘ কাল রাতেই তুমি ওকে এসে নিয়ে যেতে পারবে।কিন্তু আজকে নয়।কথা দিচ্ছি ওর কাছে আজকে রাতে আর কেউ আসবে না।তুমি নিশ্চিন্তে ফিরতে পারো।’

-‘ আমার হাত পা নিশপিশ করছিল তখন। কোনোরকমে নিজেকে সামলে চলে এসেছি আমি।তারপর মনে হল ব্যাপারটা তোকে জানানো উচিত।’
-‘ অনেক বড় উপকার করেছিস।তুই কোথায় এখন?’
-‘ আমি এখনো মামার বাড়িতে।কাল ঢাকা ফিরব।’
-‘ কাল রাতে আমাদের বাসায় আসিস।’
-‘ পুলক বাড়িতে ফিরেনি?’
-‘ না।কাল আসবে।’
-‘ আচ্ছা তুই নিজেকে সামলা।ওর থেকে আগে পরিষ্কার ভাবে জানতে চাইবি মেয়েটা কে ছিল?’
-‘ হুম।রাখছি।’

ফোনটা হাত থেকে নিচে পরে গেল। শ্রুতির চোখ থেকে ঝরঝর করে পানি পরছে।এখন ওর কী করা উচিত,কীভাবে নিজেকে সামলানো উচিত ও কিচ্ছু বুঝতে পারছেনা।ওর কী এগুলো বিশ্বাস করা উচিত নাকি উচিত না ওর মাথায় কিছুই কাজ করছেনা।ঈশাণ বার বার জিজ্ঞেস করছে,”কী বলল রবিন?” সেই প্রশ্নেরও উত্তরও দিচ্ছেনা শ্রুতি।বিছানা থেকে উঠে দৌড়ে ডাইনিং এ চলে গেল।তারপর টেবিল থেকে ছুড়িটা নিয়ে হাতে আঘাত করতে গেলে ঈশাণ ছুটে এসে জোড় করে ওর হাত থেকে ছুড়িটা নিয়ে নিচে ফেলে দিল।টানতে টানতে ওকে বেডরুমে নিয়ে বসাল।

-‘ কী করছিলি তুই?নিজেকে কেন মারতে চাইছিস?তুই কোনো অপরাধ করিসনি তাহলে তুই কেন সাজা পাবি?আমাকে খুলে বল রবিন কী বলল?আর ওই মেয়েটি কে ছিল?’

শ্রুতি চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-‘ আমার পুলক একটা বেশ্যার প্রেমে পরেছে ঈশাণ।’

শ্রুতিকে সামলাতে খুব কষ্ট হচ্ছে ঈশাণের।এভাবে ওকে একা ফেলে গেলে নির্ঘাত কোনো একটা অঘটন ঘটিয়ে বসবে।বাধ্য হয়ে ঈশাণকে থেকে যেতে হচ্ছে শ্রুতির কাছে।শ্রুতিকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে ঈশাণ।আর শ্রুতি ঈশাণের কাঁধে মাথা রেখে কেঁদে যাচ্ছে।কাঁদার এক পর্যায়ে শ্রুতি ঈশাণের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পরে।ঈশাণ তখন ঘড়িতে দেখল রাত ১১:৩০ টা বাজে।এখন শ্রুতিকে শুইয়ে দিয়ে চলে যাওয়া যায়।কিন্তু তারপরেই মনে হল ঘুম ভেঙে যদি আবার কিছু করার চেষ্টা করে।তাই ঈশাণ সিদ্ধান্ত নিলো আজকের রাতটা এখানেই থেকে যাবে।ব্যাপারটা খারাপ দেখালেও কিছু করার নেই এখন।রাত দুটোর সময় পুলক বেশ হাসিখুশিভাবে বাসায় ফিরে এল।অনেক কিছু কিনে এনেছে পুলক শ্রুতির জন্য।আজকে অবশ্য আসার কথা ছিলনা পুলকের।এটাই বলেছিল শ্রুতিকে। কিন্তু ওকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য না বলেই চলে এল।রুমে ঢুকে দেখল ডাইনিং রুমের লাইট জ্বলছে।নিজেদের রুমের ও লাইট জ্বলছে।শ্রুতি কী এখনো জেগে আছে?রুমে ঢুকেই পুলক একটা ধাক্কা খেল।স্বপ্নেও কখনো কল্পনা করেনি শ্রুতিকে ও এইভাবে ঈশাণের সঙ্গে দেখবে।হাতের প্যাকেটগুলো ফ্লোরে ছুড়ে মাড়ল।তার শব্দ শুনেই ওদের ঘুম ভেঙ্গে গেল।পুলকের চোখে তখন আগুন জ্বলছে।শ্রুতিও একটু ঘৃণাভরা আর বিস্ময় চোখে তাকিয়ে দেখছে পুলককে।তারপরই খেয়াল হলো ও ঈশাণের কাঁধে মাথা রেখে বসে আছে। দ্রুত সোজা হয়ে বসল শ্রুতি।ঈশাণের দৃষ্টি তখন স্বাভাবিক।এই মুহূর্তে কার কী বলা উচিত কিছুই ভেবে পাচ্ছেনা কেউ। পুলক হঠাৎ ঈশাণের দিকে তেড়ে আসে ওর কলার চেঁপে ধরে দাঁড় করিয়ে বলল,
-‘ জানুয়ারের বাচ্চা তোর রুচিতে একটুও বাঁধলোনা রে?আমার ঘরে বসেই তুই আমার বউয়ের সঙ্গে রাত কাটাচ্ছিস? এভাবেই দাম দিলি বন্ধুত্বের?’
-‘ পুলক কলাড় ছেড়ে কথা বল।কিছু না জেনে না শুনে আগেই কোনো ব্লেম দিবিনা।’

পুলক ওর কলাড় চেঁপে ধরে ঠেলতে ঠেলতে দেয়ালের সঙ্গে মিশিয়ে বলল,
-‘ কী জানাবি তুই?রাত দুটোর সময় তোরা কাঁধে মাথা রাখা রাখি করে ঘুমিয়ে আমাকে কী জানাতে চাস?’

শ্রুতি চোখদুটো চোখে মুখে রাগ নিয়ে পুলকের পিছে দাঁড়িয়ে চিল্লিয়ে বলল,
-‘ নিজের নোংরা মনের সাথে সবার মনের তুলনা করবেনা তুমি।ঈশাণকে ছাড়ো।ছাড়ো ওকে।’

শ্রুতির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ওর গালে কষে একটা চড় মাড়ল পুলক।শ্রুতির ঠোঁট কেটে একটু রক্ত গড়িয়ে পরল।

-‘ লজ্জা লাগছেনা গলা উঁচু করে কথা বলতে?নোংরামি করে এখনো এত জোড় আসছে কোথার থেকে?নাকি ধরা পরে গেছো বলে আর কোনো লুকোচুরি রাখছোনা?এখন নিশ্চই বলবে তুমি আমাকে তালাক দিয়ে ওর সঙ্গে ঘর বাঁধতে চাও?এমন সিদ্ধান্ত নিলে আমাকে খুন করে তবেই মুক্তি পাবে আমার থেকে।কী ভেবেছো?আমাকে বলবে আর আমি তোমাদের সেই সুযোগ দিয়ে দিব?’
-‘ ছিঃ লজ্জা তো তোমার করা উচিত। আমাকে ঠঁকিয়ে যাচ্ছো দিনের পর দিন। এই ঘরে আমার সতীন এনে সংসার করার চিন্তা করছো?এতটা নারী পিপাসু তুমি?একজনকে রেখে তোমার মন জুড়াবেনা।আর আমাকে বলছো আমি নোংরামি করছি।আজকে ও না থাকলে আমার মৃতদেহ দেখতে পেতে এই ঘরে। ঈশাণ তুই যা। আমি চাইনা তুই আর অপমানিত হ।কাল ওদের সবাইকে নিয়ে চলে আসিস।যা হবে সকলের সামনে হবে।সবাই জানবে এই মানুষটা একটা মুখোশধারী শয়তান।সবাই ওকে ফেরেশতা ভাবতো না?সবাই জানবে ও কীভাবে আমার সঙ্গে ধোঁকাবাজি খেলা খেলছে।’

ঈশাণ পুলকের সামনে এসে ওকে থ্রেট করে বলল,
-‘ ওর যদি কোনো ক্ষতি হয় একমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া তোকে কেউ আমার হাত থেকে রক্ষা করতে পারবেনা।’

__

অনুরাগ ৫ম পর্ব

অনুরাগ
৫ম পর্ব
লেখিকাঃ #Israt_Jahan

 

শ্রুতি বেশ চমকে উঠে তাকাল পুলকের দিকে।আর ঈষাণ অনেকটা ঘাঁবড়ে গেল পুলকের এই ব্যাপারটাতে।গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছে পুলক ঈষাণের দিকে। শ্রুতির বাহু চেঁপে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।তারপর আচমকা ঈষাণের পেটে ঘুষি দিয়ে বলল,
-‘ এই শালা তুই আমার বউয়ের হাত ধরে কী করছিলি রে? ‘

শ্রুতি বুঝতে পারল যে পুলক ব্যাপারটা সিরিয়াসলি নেয়নি।তখন শ্রুতি ওর কনুই দিয়ে পুলকের পেটে গুতা দিয়ে বলল,
-‘ তুমি যে কী ভয়ানক কাজ করো আজকাল!এভাবে কেউ টেনে ধরে?ফাজিল ছেলে।ফ্রেশও তো হওনি।যাও ফ্রেশ হয়ে এসো।আমি তোমাদের ডিনার রেডি করছি।’
-‘ আরে না।আগে দু কাপ কফি পাঠাও। আজ আমি আর ঈষাণ একটু আড্ডা দিই।’
-‘ মাত্রই তো খেলাম আমরা কফি।আবার?’
-‘ তোমরা দুজন খেয়েছো।আমি তো আর খাইনি।তোমাকে আর খেতে হবেনা।তুমি বরং আমাদের দুজনের জন্য পাঠাও।’
-‘ আচ্ছা ঠিকআছে।বসো নিয়ে আসছি।’

ঈষাণ মুখটা শুকনো করে বলল,
-‘ নারে… আমাকে এগারোটার আগে ফিরতে হবে।আজ আর গল্প নয়।অন্য কোনোদিন আসব।’
-‘ অন্য কোনোদিন?তার মানে বর্তমান একটু ফ্রি সময় পাচ্ছিস তাই তো?আরে কাল তো তোদের সাথে কথাই হয়নি ঠিকমত।একটু বস তারপর না হয় ডিনার করে চলে যাস।’
-‘ এই ঈষাণ বস না?আমার কফিটা কিন্তু মন্দ না সেটা নিশ্চই খেয়ে বুঝেছিস। তাই আর এক মগ যে খাওয়া অসাধ্যকর এমনটা কিন্তু নয়।’

ঈষাণ শুকনো মুখের একটা মুচকি হাসি দিল মাত্র।সেটা দেখে পুলক বলল,
-‘ থাক জোড় করে বেচারাকে কফি গেলানোর কোনো মানে হয়না।ও যে এত ব্যস্ততার মাঝে এটুকু সময় বের করে আমার বাসায় আসতে পেরেছে এতেই আমার ভালো লেগেছে।চল ডিনার করে যাবি।’
-‘ হুম চল।’

ডিনার শেষ করেই ঈষাণ আর এক সেকেন্ডও বসেনি।বিষয়টা দেখে শ্রুতি বেশ অবাক হলো।
**************
-‘ আজ এত জলদি জলদি শুয়ে পড়লে যে?’
-‘ খুব ক্লান্ত গো।তাড়াতাড়ি এসো তো।ঘুম আসছেনা তোমাকে ছাড়া।’

পুলকের কথা শুনে মুচকি হেসে দিল শ্রুতি।চুলটা বিনুনি করে পুলকের পাশে এসে শুয়ে পরল।পুলক বলল,
-‘ তুমি বসে আগে আমার চুলগুলো নেড়েচেড়ে দাও।আমি তোমার কোলের ওপর মাথা রেখে শুবো।’

শ্রুতি সেটাই করল।পুলক ওর কোমড় জড়িয়ে ধরে ওর কোলের ওপর মাথা রেখে বুকে ভর দিয়ে শুয়ে আছে।আর শ্রুতি ওর চুলগুলো নেড়েচেড়ে দিচ্ছে।

-‘ ঘুমিয়ে পরলে? ‘
-‘ উহু।চোখ বন্ধ করে আছি।তবে না ঘুমানো পর্যন্ত তুমি শুবেনা। ‘
-‘ এই তখন খেয়াল করেছিলে ঈষাণকে? ডিনার করে আর একটা মুহূর্তও বসলোনা।কিরকম তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল। ‘

শ্রুতির কথা শুনে পুলক চোখ খুলল। কিছুক্ষন চুপ থেকে বলল,
-‘ পুলিশ মানুষ।কোন আসামির কথা মনে পরেছে তাই তাড়াহুড়া করে বেরিয়ে গেছে। ‘
-‘ হুম।হয়তোবা। ‘

পুলক খুব ভালো করেই জানে ঈষাণ কেন ওভাবে চলে গেল।ঈষাণের সামনে যখন পুলক শ্রুতিকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে আসে তখন ঈষাণের মুখটা একদম শুকিয়ে যায়।পুলকের ব্যবহারটা শ্রুতির কাছে ওইসময় স্বাভাবিক মনে হলেও ঈষাণ ঠিকই বুঝতে পেরেছে পুলকের চোখের চাহনি দেখে।তাই ওর আর ইচ্ছা করেনি পুলকের সামনে থাকতে। তারপর খেতে বসে যখন পুলক শ্রুতিকে টেনে নিজের কোলের ওপর বসিয়ে বলছিল,
-‘ আজ আর আমি হাত দিয়ে খেতে পারবোনা।তোমাকে খাইয়ে দিতে হবে এভাবে আমার কোলে বসেই।’
এই দৃশ্যগুলো দেখে ঈষাণের ভাত হজম করতে প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছিল।তাই খাওয়া শেষ করে আর এক সেকেন্ডও বসেনি।এর সবটাই পুলক ইচ্ছে করে করেছে।আর ঈষাণ নিজেও তা বুঝতে পেরেছে।পুলক হঠাৎ শ্রুতির দিকে তাকিয়ে বলল,
-‘ এই তুমি আজ হোয়াইটটা পরেছো কেন? ‘
-‘ তো কী হয়েছে?একটা পরলেই হলো। ‘
-‘ না একটা পরলেই হলোনা।তুমি আজকে ব্ল্যাকটা পরবে।যাও এটা খুলে ব্ল্যাকটা পরে এসো।’
-‘ কী অদ্ভুত!নাইটি তো নাইটিই।সেটা ব্ল্যাক আর হোয়াইট কী? ‘
-‘ উফ তুমি কী যাবে নাকি আমি গিয়ে নিয়ে আসব? ‘
-‘ আমি নিজেই যাচ্ছি।আচ্ছা নাছোড়বান্দা তুমি। ‘

নাইটি চেইঞ্জ করে পুলকের সামনে এসে দাঁড়াতেই পুলক হ্যাঁচকা টানে ওর বুকের মধ্যে নিয়ে নিলো শ্রুতিকে।তারপর চেঁপে ধরে শ্রুতির ঠোঁটে চুমু খেয়ে বসল।

-‘ তুমি যে কত বড় লুচু…. ‘
-‘ লুচুর মত কী করলাম তোমার সাথে? ‘
-‘ আমি বুঝিনি কিজন্য তুমি এটা পরতে বলেছো? ‘
-‘ বলো কিজন্য পরতে বলেছি? ‘
-‘ এটা যে খুব শর্ট।হাঁটুর উপরে উঠে থাকে একদম। ‘

শ্রুতিকে বুকের ওপর নিয়ে শুয়ে পরে বলল,
-‘ এখন আর হাঁটুর ওপরেও থাকবেনা।ওয়েট…..’

এমনকরেই সুখে দিনগুলো পার করছিল ওরা।ছোট্ট সংসারে দুটি মানুষের মধ্যে ভালোবাসার কোনো কমতি ছিলনা। ওদের দুজনের ভালোবাসা নিজেদের কাছে সবসময় কম মনে হতো।পুলক ভাবত শ্রুতির তুলোনায় পুলক হয়তো ওকে কম ভালোবাসে।আর শ্রুতি ভাবত পুলক ওকে বেশি ভালোবাসে নিজের ভালোবাসার তুলনায়।পরিবারের অমতে বিয়ে করেছিল বলে শ্রুতির বড় বোন ইতি ওকে অভিশাপ দিয়েই বলেছিল, ‘যে ভালোবাসার জন্য নিজের পরিবার ত্যাগ করলি সেই ভালোবাসায় একদিন তোর কাছে বিষ মনে হবে।সেই বিষ সহ্য করতে না পেরে ফিরে আসতে হবে আব্বা আম্মার পায়ের কাছে।’
এই কথাগুলো যখন পুলক শুনেছিল তখন শ্রুতিকে সে বলেছিল, ‘আমার ভালোবাসা যদি কোনোদিন সত্যি বিষে পরিণত হয় তাহলে আর কিছু ভাববেনা শেষ করে দেবে আমাকে।’ কথাগুলো তখন শ্রুতির কাছে আবেগী মনে হলেও পুলক যে কথাগুলো অনেক কষ্ট পেয়ে মন থেকেই বলেছে তার প্রমাণ শ্রুতি তার কিছুদিন পরই পেয়ে গিয়েছিল।পুলক যত ব্যাংক ব্যালেন্স তৈরি করেছে তার চাকরি জীবনে তার সবটায় শ্রুতির নামে ট্রান্সফার করে দিয়েছে।আর ভবিষ্যতেও যা হবে তার সবটাই শ্রুতি পাবে।যদিও তা শ্রুতির বাবার বাড়ির সম্পত্তির তুলনায় কম। তবুও শ্রুতি অনেক অবাক হয়েছিল।রেগে গিয়ে পুলককে বলেছিল,
-‘ ব্যাংক ব্যালেন্স প্রপাটি এইসব হাবিজাবি দিয়ে তুমি ভালোবাসার প্রমাণ দিচ্ছো? এগুলোর জন্য আমি তোমাকে বিয়ে করেছি? ‘

পুলক সেদিন শ্রুতিকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে ওর কপালে একটা চুমু দিয়ে বলেছিল,
-‘ সবটাই যদি আবেগ দিয়ে বিচার করা যেত তাহলে তোমার আমার সম্পর্কটাও তোমার বাবা-মা আবেগ দিয়ে বিচার করে আমাদের মেনে নিতো।তারা আমাকে কেন মেনে নেয়নি সেটা তো তুমি জানোই।শুধুমাত্র আমার সামর্থ্যের জন্য। তাই ভালোবাসাতে যেমন আবেগটাও খুব জরুরি তেমন ভালোবাসাকে আর নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে নিয়ে সমাজের বুকে মাথা উঁচু করে বাঁচার জন্য এই টাকা পয়সাটাও জরুরি।তুমি যতই সবার সামনে নিজেকে সুখি প্রমাণ করো তবুও তারা জানতে চাইবেই আমি তোমাকে কী দিয়েছি?তোমার দেনমোহর কত দিয়েছি? বিবাহবার্ষিকীতে আমি তোমাকে কী উপহার দিয়েছি তাছাড়াও আমি ইনকাম করে তোমাকে কতটুকু কী খরচ দিই আরো নানানরকম কথা জিজ্ঞেস করবে তোমাকে।তখন যদি তুমি বলো শুধু ভালোবাসা দিলেই হবে তখন সেটা তোমার কাছে মিষ্টি শোনালেও ওদের কাছে তেঁতো লাগবে।আড়ালে তোমাকে নিয়ে তোমার স্বামীকে নিয়ে ওর কানাকানি করবে অপমানজনক কথা বলবে।তখন তুমি ভেতরে ভেতরে কতটা কষ্ট পাবে তোমার আইডিয়া নেই।আর এমন কিছু জায়গা থেকেই শত ভালোবসার মাঝে দুজনের মধ্যে ছোট খাটো বিষয় নিয়ে ঝামেলার সৃষ্টি হয়।’
-‘ তার মানে তুমি বলতে চাইছো আমি এগুলো নিয়ে তোমার সাথে ঝামেলা করব?’
-‘ নারে বাবা আমি কী সেটা বলেছি? এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে আপনাআপনিই নিজেদের মধ্যে ঝুট ঝামেলা তৈরি হয়ে যায়।এসব পরিস্থিতির মাঝে না পরলে তুমি বুঝতে পারবেনা আমি তোমাকে কেন এগুলো বলছি।আর আমাদের বিয়েটা তো বাকিসবার মত স্বাভাবিকভাবে হয়নি।তাই এমন বিয়েতে মেয়েদের বাবার বাড়িতে বন্ধুবান্ধবদের কাছে নানানরকম কথা শুনতে হয়। তুমি কিছুটা শুনেওছো।আর যাতে এমন কিছু না শুনতে হয় তার জন্য এই ব্যবস্থা। তুমি যেমন চাইবেনা তোমার স্বামীকে কেউ ছোট করে কথা বলুক তেমন আমিও চাইনা আমার বউটাকে কেউ অপমান করুক।’

এতকিছুর পর এই মানুষটার ভালোবাসা যে কখনো বিষ হতে পারেনা শ্রুতি তা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে।এর মাঝে হঠাৎ শ্রুতি খুব অসুস্থ হয়ে পরে।প্রচুর পরিমাণে ব্লিডিং শুরু হয় ওর।সেটা দেখে শ্রুতি চিৎকার করে কান্না শুরু করে।পুলক ওকে দ্রুত হসপিটালাইজড করে জানতে পারে শ্রুতি কনসিভ করেছিল কিন্তু বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে গেছে।পরে জানতে পারল শ্রুতির জড়ায়ুতে সমস্যা হয়েছে।মাসখানেকের মত ওদের ফিজিকালি এটাচ্ড হওয়া যাবেনা। বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে যাওয়াতে শ্রুতি খুব উদাস হয়ে পরে।ওর খালি বারবার মনে হচ্ছে ওর বাবা-মায়ের দেওয়া অভিশাপ গায়ে লেগেছে হয়তো।মেন্টালি সিক হয়ে পরছে দিন দিন শ্রুতি।এদিকে পুলকটাও আজকাল খুব কম সময় দিচ্ছে শ্রুতিকে। যতটুকু সময় ওর পাশে থাকে ততটুকু সময় খুব কেয়ার করে ওকে।কিন্তু আজকাল আগের মত আর পুলক বাইরে থাকলে তেমন কথা বলেনা ফোনে। আবার বাড়িতেও ফিরে রাত বারোটা একটার সময়।মাঝে মাঝে রাতে খাওয়া দাওয়া না করেই এসে ঘুমিয়ে পরে। আবার খুব সকালে উঠে বেরিয়ে যায়। পুলকের এমন পরিবর্তনটা শ্রুতি ঠিক মেনে নিতে পারছিলোনা।দেখতে দেখতে প্রায় এভাবেই দুটো মাস কেটে যায়। শ্রুতির চেহারাও দিন দিন ভেঙে পরছিল। পুলকটাও আজকাল শ্রুতিকে সেই আগের মত হূরপরীও বলে ডাকেনা।ও সুস্থ হওয়ার পর পুলক নিজে থেকে কখনোই শ্রুতির সঙ্গে মিলিত হওয়ার চেষ্টা করেনা।যার জন্য শ্রুতিও কখনো ওর কাছে যেচে পরে যায়না।কিন্তু মনের মধ্যে তোলপার হয়ে যায় ওর।একদিন সকালে খেতে বসে পুলক শ্রুতিকে বলে,
-‘ তুমি বাসায় একা থাকতে পারবে তো? ‘
-‘ একা থাকতে হবে কেন?তুমি কী কোথাও যাবে? ‘
-‘ হুম।অফিসের কাজে দুদিনের জন্য একটু ঢাকার বাইরে যেতে হবে।’
-‘ ও কোথায় যাবে?’
-‘ টাঙ্গাইল।তোমার যদি অসুবিধা হয় তো মেঘলাকে এসে থাকতে বলি তোমার সঙ্গে দুদিনের জন্য।’
-‘ খারাপ লাগলে আমি নিজেই বলব।তুমি কী আজই যাবে?’
-‘ হ্যাঁ।অফিস করেই চলে যাব।বাসায় আর আসব না।’
-‘ আচ্ছা সাবধানে যেও।পৌঁছে ফোন দিও একটু।’

শেষের কথাটা শুনে পুলক শ্রুতির দিকে তাকাল।ওর হাতের ওপর হাতটা রেখে একটা মুচকি হাসি দিল।আজকাল খুব কম সময় দিচ্ছে শ্রুতিকে সে সেটা পুলকের আজ খেয়াল হলো।আজ সারাটা রাত শ্রুতি বেলকোনিতে বসে কেঁদে পার করেছে।তার কাছে যেন আর কিছুই ভালো লাগছেনা।দম বন্ধ লাগছে এই ঘরের পরিবেশটাকে।আগে তো এমন কখনো লাগেনি।পুলকটা এভাবে পাল্টে যাবে সেটাও কখনো ভাবেনি শ্রুতি। পরেরদিন রাত নয়টার সময় ঈষাণ এসে হাজির হলো।বিস্ময় চোখে তাকিয়ে শ্রুতিকে দেখে ঈষাণ প্রশ্ন করল,
-‘ এটা কে? ‘
-‘ কেমন আছিস? ‘
-‘ আমি যে খুব ভালো আছি তা আমাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে।তোর শরীরের কী অবস্থা এটা?ওয়েট লস করছিস নিশ্চই? তাই বলে এরকম শুকনা কাঠির মত শরীর বানানোর কোনো মানেই হয়না শ্রুতি।চেহানার কী অবস্থা দেখেছিস?পুলক কিছু বলেনা তোকে? ‘
-‘ এই তুই এত কথা একসাথে বলিস কীভাবে রে?আয় বস আগে। ‘
-‘ সিরিয়াসলি তোকে দেখে আমার একটুও ভালো লাগছেনা।কী হয়েছে বল তো? চোখ মুখ একদম শুকিয়ে গেছে।মনে হয় কতকাল খাসনা ঘুমাসনা। ‘
-‘ আরে এমনিতেই।বয়স হচ্ছে তো।
চিরকালই কী একইরকম থাকব? ‘
-‘ একটা থাপ্পর খাবা।তুমি আমাকে বয়স দেখাচ্ছো।আমাকে বল কী হয়েছে?শরীর ঠিক আছে তোর? ‘
-‘ হুম একদম ঠিক আছি।তো এতদিন পর মনে পরলো আমাদের কথা? ‘
-‘ আমাদের কথা না শুধুমাত্র তোর কথা। পুলককে তো আজকাল ফোন করলেও পাওয়া যায়না।তোর কথা আর জিজ্ঞেস করবো কীভাবে?তাই তোকে দেখতে চলে এলাম।আজ নিশ্চই ওর এমন সময় বাইরে থাকার কথা নয়।আজ তো ফ্রাই ডে। ‘
-‘ অফিসের কাজে টাঙ্গাইল গেছে।আজ ফেরার কথা ছিল।কাল ফিরবে।একা মানুষ তাই আর তেমন কিছু রান্না করিনি।বল কী খাবি? ‘
-‘ এই থাম তো আসলেই শুধু খাওয়া খাওয়া।আমি তোর দিকে তাকাতে পারছিনা। ‘
-‘ তোকে তাকাতে হবেনা।তুই বস আমি আসছি। ‘

শ্রুতি উঠে রান্নাঘরে চলে গেল।তখনই শ্রুতির ফোনটা বেজে উঠল।পুলক ফোন করেছে।ঈষাণ ডাকতে গিয়েও শ্রুতিকে ডাকলনা।তার বদলে ফোনটা সাইলেন্ট উল্টে রাখল।এর মধ্যে মিনিমাম চারবার ফোন করেছে পুলক।শ্রুতি এসে ঈষাণের হাতে কফির মগ ধরিয়ে দিয়ে বলল,
-‘ তো বল বিয়ে কবে করছিস? ‘
-‘ চল্লিশ পার হোক তারপর ভেবে দেখব। ‘
-‘ এসব পাগলামী বাদ দিয়ে জলদি একটা বিয়ে টিয়ে কর। ‘

ঈষাণ শ্রুতির কথার উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে বসল ওকে।
-‘ তুই ভালো নেই তাইনা? ‘
-‘ কী শুরু করেছিস বল তো আসার পর থেকে। ‘
-‘ তুই কিছু হাইড রাখতে চাইছিস।আচ্ছা বলতে না চাইলে থাক।জোড় করবনা। আমি তাহলে উঠি।পুলকের সাথে তো আর দেখা হলোনা। ‘
-‘ উঠবি মানে?ডিনার করে তারপর যাবি। ‘
-‘ ফরমালিটিস পালন না করলেও চলবে। আসি, নিজের খেয়াল রাখিস। ‘

ঈশাণ যাওয়ার জন্য বসা থেকে উঠে দাঁড়ালে শ্রুতি বলল,
-‘ তোর সাথে আমি ফরমালিটি করব কেন?আমার সাথে কী তোর ফরমালিটির সম্পর্ক?বসে যা না। ‘

ঈশাণের নিজেরও যেতে ইচ্ছা করছিল না।খুব মায়া লাগছে শ্রুতির মুখটা দেখে ওর।শ্রুতির পাশে গিয়ে বসল ঈশাণ।

-‘ মনে তো হচ্ছেনা ঠিকমত খাওয়া-দাওয়া করিস।আমারও খিদে পেয়েছে চল তো খেয়ে নিই। ‘

এক চিলতে হাসি দিয়ে শ্রুতি ডিনার রেডি করতে চলে গেল।দুজনে একসঙ্গে বসে খাবার শেষ করে আবার গল্প জুড়ে বসল।গল্পে গল্পে শ্রুতি ওর সংসার জীবনে নানারকম গল্পও করল।আজকাল পুলকের পরিবর্তনের বিষয়টাও শ্রুতি ঈশাণকে জানাল।

-‘ পুলককে যতদূর জানি সেই হিসাবে ওর এমন পরিবর্তনের কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছিনা।ওর কাছের বন্ধু বলতে তো জানি আমরা পাঁচজনই।আর অফিস কলিগদের সাথে তো এত ভালো সম্পর্ক কারো সাথে আছে বলে মনে হয়না।কারণ ও সবসময় কম মিশুক ছিল মানুষের সাথে।আর সবসময় নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সবসময় সচেষ্ট।তাহলে আড্ডাবাজি নিয়ে মেতে থাকার কোনো কোনো কারণ দেখছিনা আমি।তুই ওর সঙ্গে এই বিষয়ে ক্লিয়ার করে কথা বল। ‘
-‘ ইচ্ছে করেনা রে। ‘
-‘ শ্রুতি তোর সমস্যা কী বল তো।তুই একটু বেশিই চাপা।এত চাপা স্বভাব নিয়ে পুরুষ মানুষের মন জুগিয়ে চলা খুবই কষ্টকর।তোকে তো শক্ত থাকা উচিত। তোদের সম্পর্ক নিয়ে অনেকেই এখনো কানাঘুষা করে।সেখানে পুলকের এমন পরিবর্তন দেখা দিলে তোর বাবা-মাও বলা বাদ রাখবেনা।তারা আরো সুযোগ পাবে এটা নিয়ে। ‘

ওদের কথার মাঝেই শ্রুতির মেসেঞ্জারে মেসেজ আসার শব্দ পেল শ্রুতি।ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল পুলক বেশ কয়েকবার ফোন করেছিল।অনেকটা খুশি হয়ে কল করতে গেল কিন্তু হোমস্ক্রিণে রবিনের কনভার্সেশন দেখে আগে সেখানে ঢুকল। কিছুক্ষণ পরই শ্রুতির চোখ থেকে টুপ টুপ করে পানি পরতে থাকল।স্তব্ধ হয়ে বসে আছে শ্রুতি।

-‘ কী হয়েছে শ্রুতি?কাঁদছিস কেন? ‘
‘(নিশ্চুপ)’
-‘ কী হয়েছে বলবি তো? ‘

শ্রুতি নিশ্চুপ হয়ে ফোনের স্ক্রিণের দিকে তাকিয়ে আছে।চোখদুটো ঝাপসা হয়ে আসছে ওর রবিনের মেসেজগুলো দেখে।

 

অনুরাগ ৪র্থ পর্ব

অনুরাগ
৪র্থ পর্ব
লেখিকাঃ #Israt_Jahan

শ্রুতিঃ আমি তখন বললাম আমি আমার ভ্যালেন্টাইন গিফ্ট পেয়ে গেছি আমার কলিজাটা। ও আমায় তখন বলল, ‘ যা এটা কী কোনো গিফ্ট হতে পারে?এটা তো আমার জীবনের একটা মহামূল্যবান উপহার। আচ্ছা তোমার তো আগরা যাওয়ার খুব শখ।এ বছর বসন্তঋতুতে আমরা দীর্ঘসময়ের জন্য ভ্রমণে বের হবো।ধরো দার্জিলিং আর আগরা দুটো জায়গাতেই আমরা ঘুরে আসব।আর বেঁচে থাকলে পরের বছর তোমার পৃথিবীর ভূস্বর্গতে নিয়ে যাব কাশ্মীরে। ‘

তানিয়াঃ ওয়াও সো এক্সেলেন্ট গিফ্ট দোস্ত।

শ্রুতিঃ মোটেও না তানিয়া।কারণ আগে আমাকে ওর এবিলিটির দিকে নজর দিতে হবে।ও চাকরিতে জয়েন করেছে মাত্র দু বছর হলো।আমি এখনি ওকে ফিন্যান্সিয়াল ভাবে এত চাঁপ দিতে চাইনা।আমি তো ওর ওই খুশিটাকে গিফ্ট হিসেবে চেয়েছি।

মেঘলাঃ ওর ওই খুশিটা কী আমাদের বল।

শ্রুতিঃ জানিনা এখনো।বললো পরে জানাবে।

বেলা দুপুরের সময় শ্রুতি লাঞ্চ শেষ করে পুলক কে কয়েকবার ফোন করল।কিন্তু ওপাশ থেকে ফোনটা আর রিসিভ হলোনা।মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল শ্রুতির।পুলক শত ব্যস্ততার মাঝেও শ্রুতির সঙ্গে ফোনে কথা বলতে না পারলেও টেক্সট করে কথা বলে।তবু শ্রুতির ফোন কখনো ইগনোর করেনা। কিন্ত এখন তো অফিসে লাঞ্চের সময়। এখন তো ওর কোনোভাবেই বিজি থাকার কথা নয়।এতকিছু ভাবনার মাঝে শ্রুতি নিজের মনকে এটা বলে বুঝ দিলো হয়তো ফোনের কাছে নেই কিংবা সত্যি খুব বিজি বলেই ফোনটা রিসিভ করছেনা।ব্যস্ততা শেষ হলেই পুলক ওকে ফোন দিবে।এটা ভেবে বিছানায় শুয়ে অপেক্ষা করতে করতে কখন যেন ঘুমিয়ে গেল শ্রুতি।ঘুম ভাঙলো সন্ধ্যার সময়। নিজের ঘুম দেখে শ্রুতি নিজেই অবাক। ও কখনোই এতসময় অবদি ঘুমায়না তাও আবার দিনের বেলাতে।বিছানা ছাড়তেই পুলকের ফোনের কথা মনে পড়ল।দ্রুত ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল পুলকের কোন ফোন কলস আসেনি।একটু অবাক হলো শ্রুতি।সেই সাথে চিন্তাও হতে লাগল। কোনো সমস্যাই পরলো কিনা কে জানে। সঙ্গে সঙ্গে আবার ফোন করলো পুলককে। এবার ফোনটা কেটে দিয়ে পুলক টেক্সট করলো,
‘ Byasto achi my heart. ‘ মেসেজটা পেয়ে অনেকটা স্বস্তি পেল শ্রুতি।রাতের রান্না চাঁপিয়েছে চুলায় এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠল।গ্যাস অফ করে দরজা খুলতেই ঈষাণকে দেখল শ্রুতি।

-‘ আরে বাবা আজ কাল সূর্য কোনদিকে উঠছে এস.পি সাহেব। ‘
-‘ এই তুই আমাকে আমার নাম ধরে ডাকবি।এইসব প্রফেশোনাল নাম ধরে ডাকবিনা একদম। ‘
-‘ ভয় করে তো। ‘
-‘ ভয় তোর পিঠের ওপর দিবো।আগে ঢুকতে দে। ‘
-‘ ও স্যরি স্যরি।ভেতরে আসুন মি.ঈষাণ রাজ। ‘

ঈষাণ ভেতরে এসেই ঠাস করে সোফায় বসে পরল।তারপর বলল, ‘ ফ্যানটা একটু ছেড়ে দে কষ্ট করে। ‘

শ্রুতি ফ্যান ছেড়ে দিয়ে ঈষাণের মুখোমুখি বসল।

-‘ এত পরিমাণ ব্যস্ত যিনি যে টয়লেটে আরাম করেও পাঁচটা মিনিট বসতে পারেনা।আর সেই ব্যক্তিই আজ আমার সামনে বসে ফ্যানের বাতাস খাচ্ছে। আমি কী সত্যি দেখছি? ‘

ঈষাণ ধুম করে শ্রুতির পাশে বসে ওর হাতে জোড়ে একটা চিমটি কাটল।

-‘ উহ্ কীরে তুই।এভাবে চিমটি কাটলি কেন?দেখেছিস কী করলি? ‘
-‘ কই দেখি কী করলাম? ‘
-‘ থাক আর দেখতে হবেনা। ‘
-‘ বিশ্বাস করছিলিনা বলেই তো চিমটি কাটলাম। ‘
-‘ বল কী খাবি? ‘
-‘ কী খাওয়াবি? ‘
-‘ যা খেতে চাস।রান্না করছিলাম।কী খেতে চাস বল এক্ষণি রান্না করে দেব। ‘
-‘ রান্না খাবার নয়। ‘
-‘ তাহলে কী কোল্ড ড্রিংকস? ‘
-‘ না রেডিমেড। ‘

শ্রুতি হেসে দিয়ে বলল, ‘ রেডিমেড কী জিনিস আবার? ‘
-‘ আছে।খাওয়াতে পারবি তো? ‘
-‘ বলেই দ্যাখ।সামর্থ্যে কুলালে অবশ্যই খাওয়াবো। ‘
‘ সামর্থ্য না?তাহলে থাক বাদ দে। ওটা তোর আর সামর্থ্যে কুলাবেনা। ‘
-‘ এতটা গরীব ভাবিস না। ‘
-‘ তাই?তাহলে একটা চুমু খাওয়া। ‘

বলেই ঠোঁট টিপে হাসছে ঈষাণ।আর শ্রুতির মুখটা তখন দেখার মত ছিল।বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে আছে ঈষাণের দিকে।তারপর ঈষাণ হো হো করে হেসে ফেলল।সেটা দেখে শ্রুতি ওর গায়ে চাপড় দিয়ে বলল, ‘ তোকে না আমি সাত দিনের রিমান্ডে নিব।শয়তনা একটা।এখনো এত মজা করতে পারিস তুই কীভাবে কে জানে? ‘
-‘ আমি তো এমনই ছিলাম তাইনা? ‘
-‘ বুঝেছি তোর এখন কী প্রয়োজন। ‘

ঈষাণ হাসি থামিয়ে মুখটা মলিন করে জিজ্ঞেস করল, ‘ সত্যি বুঝেছিস? ‘
-‘ হুম।দাঁড়া কালই আন্টিকে ফোন করব। ‘
-‘ আরে এর মধ্যে আবার আন্টি কেন? ‘
-‘ বিয়ে টিয়ে দেওয়ার বিষয়ে তো কথা বলতে হবে।না হলে তো তুই খুব তাড়াতাড়িই পাগল হয়ে যাবি। ‘
-‘ ঠিকই বলেছিস। তোকে আজকাল দেখলে সত্যি পাগল পাগল লাগে।ভালোই ছিলাম এতদিন তোকে না দেখে। ‘

শ্রুতি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ মানে? ‘

ঈষাণ নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলল, ‘ মানে তোর মত একটু কিউট বউ দরকার আমার।পুলক শালা তো ঝোপ বুঝে কোপটা মাড়ল।আমাদের বন্ধুমহলে একরকম সবার ক্রাশ ছিলি যে তুই। ‘
-‘ আচ্ছা তুই বস আমি তোর জন্য কফি করে নিয়ে আসি।টিভিটা চালিয়ে দিচ্ছি টিভি দ্যাখ বসে।রান্না বন্ধ করে এসেছি তো।আমি ততক্ষণে রান্নাটা করে আসি।রাতের খাবার খেয়ে যেতে হবে কিন্তু তোকে। ‘
-‘ হুম।পুলক কখন ফিরবে? ‘
-‘ এক দেড় ঘন্টার মধ্যে চলে আসবে। ‘
-‘ অনেক দেরী তো। ‘
-‘ তো কী হয়েছে?ডিনার না করে তোকে যেতে দিচ্ছিনা।’
-‘ তাহলে চল তোর রান্নাতে হেল্প করি। ‘
-‘ আরে না।তুই বসে টিভি দ্যাখ আমি চট করে রান্নাটা সেড়ে আসছি। ‘
-‘ কথা বলিসনা তো।চল। ‘



-‘ ইলিশ মাছের দোপেয়াজা রাইট? ‘
-‘ হুম।ওর ভীষণ পছন্দের খাবার। ‘
-‘ আমারও খুব পছন্দ এটা। ‘
-‘ পোলাও আর তার সঙ্গে ইলিশের দোপেয়াজা পেলে ঈদের চাঁদ দেখার মত খুশিতে লাফিয়ে উঠে। ‘

রান্না শেষে ডাইনিং এ বসে শ্রুতি আর ঈষাণ গল্প করছে।এর মধ্যে পাঁচবার ফোন করেছে পুলক শ্রুতির ফোনে।কিন্তু শ্রুতি ফোনটা বেডরুমে রেখে চলে এসেছে।

-‘ এই শ্রুতি তোদের বেডরুমটা কিন্তু আমার খুব পছন্দ হয়েছে। ‘
-‘ আমার আসার আগেই ও আমার থেকে শুনে শুনে নিজেই বেডরুমটা সাজিয়েছে। আর সবথেকে বেশি সুন্দর আমাদের বেলকোনিটা।ওটাও ও নিজেই সাজিয়েছে। ‘
-‘ আমাকেও তো সাজিয়ে রাখতে হবে আমার বউয়ের জন্য।চল তো তোদের বেলকোনিটা দেখে আসি।”
“আয়। ‘

ঈষাণ ওদের বেডরুমটা ঘুরে ঘুরে দেখছে। বেডরুমে দেখার মত সব থেকে আকষর্ণীয় জিনিস হলো পুলক আর শ্রুতির ছবিগুলো।সেগুলোই দেখছিল ঈষাণ। তারপর বেলকোনিতে গিয়ে দাঁড়াল ওরা।

-‘ আচ্ছা বেলকোনিটার সৌন্দর্যটা কী আমি এখনো বুঝতে পারলাম না। ‘
-‘ দেখবি সৌন্দর্যটা? ‘
-‘ দেখব বলেই তো এলাম। ‘
-‘ ওয়েট। ‘

বেলকোনির গ্রিলে সাদা পর্দাটা টেনে দিল শ্রুতি।তারপর রুমে গিয়ে রুমের লাইট অফ করে নীল ড্রিম লাইটটা জ্বালিয়ে দিল।অন্য একটা সুইচ অন করতেই সারা বেলকোনি বিভিন্ন রঙের মৃদু আলোতে ভরে গেল।ঈষাণ ওপরে তাকিয়ে দেখল বেলকোনির ছাদ জুড়ে বিভিন্ন রঙের ছোট ছোট কালারফুল প্রজাপতি জ্বলছে।অন্ধকার ঘরে এই প্রজাপতিগুলো খুব সুন্দরভাবে জ্বলে ওঠে। এখন সত্যিই বেলকোনিটাকে স্বপ্নেররাজ্য বলে মনে হচ্ছে ঈষাণের কাছে।সেখানে দাঁড়িয়ে দুজন গল্প করছে। গল্প করতে করতে কখন যে ঘড়ির কাটাতে রাত দশটা বেজে গেল শ্রুতির তা খেয়ালই নেই।পুলক বাসায় ফিরে কলিংবেল চাঁপার আগেই দেখল দরজা ভেজিয়ে রাখা।দরজা লক করে ড্রয়িংরুমে ঢুকে দেখল সোফার ওপর একটা ফোন। যেটা শ্রুতির নয়।সোজা বেডরুমে ঢুকে গেল।বেডরুমের লাইট অফ শুধু ড্রিম লাইট জ্বলছে।আর বেলকোনি থেকে শ্রুতি আর একজন পুরুষের কথা আর হাসির শব্দ আসছে।ব্যাগটা বিছানার ওপে রেখে বেলকোনিতে চলে গেল পুলক। শ্রুতির হাতের তালুতে ঈষাণ আঙুল দিয়ে কী যেন লিখছে আর কথা বলছে। আর শ্রুতি সেটা দেখে হাসছে।পুলক বেলকোনিতে এসে দাঁড়িয়েছে সেটা ওদের কারোরই খেয়াল হলোনা।ঈষাণ শ্রুতির হাত নিয়ে নাড়াচাড়া করছে তার মধ্যেই পুলক এক ঝটকায় শ্রুতিকে টেনে নিয়েলো নিজের কাছে।

 

অনুরাগ ৩য় পর্ব

অনুরাগ
৩য় পর্ব
লেখিকাঃ #Israt_Jahan

সিঁড়ি ভেঙে ওঠার সময় শ্রুতি বার বার কথা বলার চেষ্টা করছে পুলকের সঙ্গে। মুখটা বেঁধে রাখার জন্য মুখের শব্দটা কেমন যেন গোঙানির শব্দের মত শোনাচ্ছে।
পুলক ধমক দিয়ে বলল,
-‘ এই চুপ এত কথা কিসের? একদম নিচে ফেলে দিব কিন্তু।এমনিতেই জানটা বেরিয়ে আসার উপক্রম।দিন দিন খেয়ে আটার বস্তা হচ্ছে।বাপরে বাপ মিনিমাম পঞ্চান্ন কেজি তো হবেই।শরীরের অনেক মেদ জমে গেছে না?এর জন্য স্বামীকে স্বামী বলে গ্রাহ্য করতে ইচ্ছে করেনা।আজকেই মেদ একদম কমিয়ে দিব। ‘

পুলকের কথাগুলো শুনে শ্রুতি একদম চুপ করে গেল।বুকটা ফেঁটে কান্না আসছে ওর। পুলক এত বাজে ব্যবহার ওর সঙ্গে করতে পারছে?ও না হয় একটু রাগ দেখিয়ে তুই তুকারি একটু গালাগাল দিয়েছে।তাই বলে পুলক ওর সঙ্গে এত নোংরা ব্যবহার করবে।এমন ব্যবহার সহ্য করার থেকেই ওর মরে যাওয়াই ভালো।ছাদে উঠে চিলেকোঁঠার ঘরে চলে এল পুলক।তারপর শ্রুতি কে কাঁধ থেকে নামিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিল।দুজনেই প্রচন্ড ঘেমে গেছে। চিলেকোঁঠার জানালাটা খুলে দিল আগে। চাঁদের আলোর জন্য ঘরের অর্ধেকটাই আলোকিত লাগছে। তারপর ফ্যানটা ছেড়ে রুমের লাইট অফ করে দিয়ে ছাদের মাঝে গিয়ে দাঁড়াল।চাঁদনিরাত তাই বিছানাতে বসেই শ্রুতি পুলককে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে।বাহিরে কিছুটা ঝিরিঝিরি বাতাসও বইছে।কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে পুলক ঘরে ঢুকল।শ্রুতি বিস্ময় চোখে তাকিয়ে আছে পুলকের দিকে।দরজাটা বন্ধ করে পুলক শ্রুতির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলল, ‘ তো তুমি রেডি? ‘

শ্রুতি মুখের ভঙ্গিতে বোঝাচ্ছে, ‘ কিসের জন্য রেডি হবো? ‘

পুলক বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, ‘ কী বলো?বুঝিনা তো। ‘

চোখ লাল করে তাকিয়ে আছে শ্রুতি পুলকের দিকে।অবশ্য সেটা পুলক ঠিক বুঝতে পারছেনা।

-‘ ওউ স্যরি।ওয়েট। ‘

তারপর মুখের বাঁধনটা খুলে দিয়ে পুলক বলল, ‘ এবার বলো। ‘

শ্রুতি মুখের বাঁধন খোলার সাথে সাথে জোড়ে জোড়ে শ্বাস নিতে থাকল।সেটা দেখে পুলক বলল, ‘ সিড়ি ভেঙে কাঁধে করে নিয়েলাম আমি। আর হাঁপাচ্ছো তুমি?সে যাই হোক তুমি রেডি তো? ‘

ঝাঁঝালো কন্ঠে জিজ্ঞেস করল শ্রুতি, ‘কিসের জন্য?মরার জন্য? ‘
-‘ না। ‘
-‘ এই তুমি কী করতে চাইছো বলো তো?”
-‘ রেপ করব। ‘
-‘ কীহ্? ‘
-‘ হুম।হাত পা বেঁধে জোড় করে ধর্ষণ করে দেখোনি টিভিতে?আমিও তাই করব। তারপর উঁচু করে ছাদ থেকে ফেলে দিব। ‘

কথাগুলো শেষ করে পুলক পাঞ্জাবীটা খুলে ফেলল।সেটা দেখে শ্রুতি চিল্লিয়ে বলল, ‘ দেখো তুমি কিন্তু বেশি বেশি করছো। আমার হাত পা খুলে দাও বলছি। ‘

কে শোনে কার কথা।পাঞ্জাবীটা খুলেই শ্রুতিকে একরকম ধাক্কা দিয়েই বিছানায় শুইয়ে দিল।শ্রুতির হাত দুটো সামনের দিক করেই বেঁধে রেখেছিল পুলক।বাঁধা হাতের ফাঁকা দিয়ে শ্রুতির উপর উঠে এল।তখন শ্রুতির বাঁধা হাতদুটো পুলকের ঘাড়ের ওপর পড়ল।মনে হচ্ছে পুলকের ঘাড় দুহাত দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে।পুলক জিজ্ঞেস করল, ‘ গরম লাগছে খুব? ‘

ইনোসেন্ট মুখ করে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁবোধক উত্তর দিল শ্রুতি।

-‘ বলবে তো সেটা। ‘

পুলক শ্রুতির হাতের ফাঁক বেরিয়ে এসে শাড়ির আঁচলটা টেনে খুলে ফেলল ওর গা থেকে।তারপর ওকে বলল, -‘ দু’মিনিট সময় দিচ্ছি শাড়িটা খোলার জন্য।কোথায় কী ব্রুজ না সেফটিপিন লাগিয়েছো।সেগুলো তাড়াতাড়ি খুলো। আমি খুললে কিন্তু টেনে টুনে ছিড়ে ফেলব। ‘

শ্রুতি রাগ দেখিয়ে আর উঠলোনা।
ওভাবেই শুয়ে থাকল।পুলক ওকে টেনে উঠিয়ে দাঁড় করিয়ে শাড়ি খুলতে শুরু করল।শ্রুতি একদম তাজ্জব বনে গেল পুলকের কান্ড দেখে।এত ভদ্র ছেলেটা এই এক রাতের ভিতর এত অসভ্য হয়ে গেল কী করে?

-‘ তুমি কী পাগল হয়ে গেলে?ছিড়ে যাবে তো শাড়ি। ‘
-‘ ছিড়ুক। ‘
-‘ রেপিস্টদের মত করছো কেন? ‘
-‘ আমি এই মুহূর্তে একজন প্রফেশোনাল রেপিস্ট।শুনেছো তুমি?’

শাড়িটা খুলে নিচে ফেলে দিল।তারপর শ্রুতির কোমড় টেনে ধরে একদম কাছে নিয়ে এল।শ্রুতি কিছু বলতে গেলে পুলক ও ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে বলল,
-‘ অনেকক্ষণ ধৈর্য রেখেছি।আর পারছিনা রাখতে। ‘
-‘ কিসের ধৈর্য্য? ‘

কথার জবাব না দিয়ে শ্রুতির লাল ঠোঁটজোড়া একদম টেনে নিল ওর ঠোঁটজোড়ার মাঝে।কতসময় ধরে যে শ্রুতির ঠোঁটজোড়া চেঁপে রেখেছিল তা ঠিক খেয়াল নেই পুলকের।ঠোঁটজোড়াকে নিজের ঠোঁটের মাঝ থেকে মুক্তি দেওয়ার পর শ্রুতিকে বলল, ‘ এটার জন্য।সেই এক ঘন্টা আগে থেকে নিজেকে কন্ট্রোল রেখেছি। ‘

শ্রুতি দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল, ‘ তাই? ‘
-‘ হুম। ‘
-‘ হয়ে গেছে? ‘
-‘ না এখনো বাকি। ‘
-‘ তাহলে শুরু করো। ‘
-‘ আল্লাহ্! এই মেয়ে কী যেচে পড়ে… ‘
-‘ খাল্লাস হতে এসেছি। ‘

পুলকের গলা জড়িয়ে ধরে বলল শ্রুতি। পুলক ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি রেখে বলল, ‘ আজ তো তুই সত্যিই শ্যাষ। ‘




তানিয়াঃ হা হা হা…কী দুর্দান্ত একটা ঘটনা।উহ্ আমি হাসতে হাসতেই একদম শ্যাষ।

মেঘলাঃ ইশ আমাদের এই ইনোসেন্ট পুলকটা এত্ত রোমান্টিক সেটাই তো বিশ্বাস হচ্ছেনা।তোদের বিয়ের পর ভেবেছিলাম যে গাঁধাটাকে রোমান্স শেখাতে গিয়ে তুই বুড়িই হয়ে যাবি।

তানিয়াঃ আর এটাও মজা করে বলেছিলাম যে শেষমেশ দেখা গেল পুলকটাই না প্রেগনেন্ট হয়ে যায়।

শ্রুতিঃ এই শয়তানের ডিম চুপ কর।আমি গতকাল রাতে ওর ব্যবহারে কতটা অবাক হয়েছিলাম জানিস?আর ভয়টাও পেয়েছিলাম খুব।

মেঘলাঃ তো ভ্যালেন্টাইন আর বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষ্যে কী গিফ্ট পেলি?

শ্রুতিঃ বিবাহবার্ষিকীর গিফ্টটা সিক্রেট আপাতত।ওটা কিছুদিন পর জানাবো তোদের।আর ভ্যালেন্টাইনের গিফ্টটার কথা আমি সারাজীবনেও ভুলব না।

তানিয়াঃ এই কী গিফ্ট রে? বল না।

মেঘলাঃ হুম,তুমি তো শুধু পারো কম্পেয়ার করতে।তোমার রবিনের থেকে বড় বা দামী কোনো গিফ্ট দিলো কিনা।

তানিয়াঃ মেঘলা তুই কিন্তু….

শ্রুতিঃ জানিনা এই গিফ্টটা বড় বা দামী কোনো গিফ্টের সঙ্গে কম্পেয়ার করা যাবে কিনা।ইভেন আমি কম্পেয়ার করতেও চাইনা।ছোটবেলা থেকে যে ছেলেটা বাবা-মা আপনমানুষ গুলো ছাড়া একা একাই বড় হয়েছে জীবন যুদ্ধে একাই সংগ্রাম করে এতদূর এসেছে।সেই মানুষটার জীবনে আমি একটু সুখের আভাস দিতে চেয়েছি সবসময়।বিয়ের পর ভেবেছিলাম আমার বাবা-মা’র আদর,স্নেহ আর ভালোবাসা পেয়ে নিজের বাবা-মায়ের ভালোবাসার ঘাটতি পূরণ হবে।কিন্তু বিধাতা সেই কপাল বোধহয় ওর রাখেনি। কিন্তু এই বিষয় নিয়ে ওর একটুও আক্ষেপ নেই যে ও ওর শ্বশ্বুড়বাড়ি আদর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত।আমি কখনো মন খারাপ করে থাকলে ও কেমন যেন ভয় পেয়ে যেত।ভাবত আমি যদি আমার বাবা-মা কে ছেড়ে না থাকতে পারলে ওকে ছেড়ে যদি চলে যাই?তার জন্য কখনো ইমোশোনাল হয়েও আমাকে বলেনি, ‘ শ্রুতি প্লিজ আমাকে ছেড়ে কখনো চলে যেয়োনা। ‘ তার পরিবর্তে সবসময় আমার সামনে শক্ত মনের মানুষ হয়ে চলাফেরা করত।আর আমার মাথায় হাত রেখে বলত, ‘ এই বাচ্চাটা খুব মন খারাপ করছে বাবা-মায়ের জন্য?তাহলে যাও বাবা-মায়ের কাছ থেকে ঘুরে এসো।যেদিন ইচ্ছা হয় সেদিন আমার কাছে এসো।আমি এগুলো নিয়ে কখনোই অভিযোগ করবোনা।’

তানিয়াঃ তুই যে তোর বাবা-মায়ের কাছে কখনো ফিরে গেলে তারা যে তোকে কোনোদিনও ওর কাছে ফিরে আসতে দিতোনা সেটা কী ও বুঝতোনা?

শ্রুতিঃ বুঝতো।আর বুঝেও এই কথাগুলো বলতো শুধু আমার ভালো থাকার জন্য। নিজের ভালো থাকার জন্য ও কখনো অন্য কারোর ভালো থাকা বা সুখকে কেড়ে নিতে পারেনা।কথাগুলো হাসিমুখে বললেও ওর চোখে যে কী পরিমাণ ভয় থাকত আমাকে হারিয়ে ফেলার সেটা কেবল আমিই দেখেছি।জানিস আমাদের মাঝে এত ভালোবাসা থাকার পরেও আমি ওকে মাঝে মাঝেই রাতে বেলকোনিতে বসে কাঁদতে দেখেছি।আর তারপর আমার কাছে এসে ঘুমের মধ্যে আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেঁদে বলত,
‘ এই হৃদপিন্ডটা কে আমার বুক থেকে ছিনিয়ে নিওনা মাবূদ।আমি আর সইতে পারবোনা।
একজনকে আমার থেকে চিরতরের জন্য কেড়ে নিয়েছো।আমি চুপচাপ সয়ে গেছি।কিন্তু ও আমার থেকে দূরে চলে গেলে আমি অন্ধকারে তলিয়ে যাব। ‘
এই কথাগুলো শোনার পর আমার বুকের বা পাশটাতে কী পরিমাণ ধাক্কা লাগে তা তোদের বোঝাতে পারবোনা।

তানিয়াঃ তার মানে তুই ওর জীবনে আসার আগে ও আরো একজনকে ভালোবাসতো?

শ্রুতিঃ হ্যাঁ।

মেঘলাঃ কিন্তু এমন কারো কথা তো আমরা কখনো শুনিনি।আর ভার্সিটিতে ওকে অনেক মেয়েই পছন্দ করতো।কিন্তু সম্পর্কের ব্যাপারটাতে এগিয়েছিল শুধুমাত্র তোর সঙ্গেই।আর তার একটামাত্র কারণ ছিল শুধু তোর গান।

তানিয়াঃ তুই এরপর জানতে চাসনি যে সে কে ছিল?

শ্রুতিঃ না।কেন জানতে চাইব?ও আমাকে যখন নিজে থেকে কিছু বলতে চাইছেনা তখন আমি কেন ওকে অযথা ফোর্স করব।ও তো কখনোই কোনোকিছুতে আমাকে ফোর্স করেনা।আর সব থেকে বড় কথা যদি এমন কেউ থেকেও থাকে ওর জীবনে সেটা ওর অতীত।আর আমি ওর বর্তমান।এমন তো না ও আমাকে ঠঁকিয়ে যাচ্ছে।আর যে ছিল সে ওর জীবন থেকে চিরতরের জন্য চলে গেছে।

মেঘলাঃ হুম বুঝলাম।জানিস তো শ্রুতি, মাঝে মাঝে তোদের দুজনের এত বোঝাপড়া এত বিশ্বাস,ভরসা আর ভালোবাসা দেখলে বড্ড হিংসে হয় আমার।তোরা দুজন দুজনের কাছে কতোটা পরিষ্কার।খুব সুখে থাকরে তোরা।

তানিয়াঃ কিন্তু তোর গিফ্টটা কী ছিল? সেটা তো বললিনা।

শ্রুতিঃ অনেকদিন পর ওর পুরোনো খুশিটা।
তানিয়াঃ মানে?

শ্রুতিঃ কাল রাতে ও আমাকে বলল, ‘ অনেকদিন পর আমার জীবনের একটা পুরোরো খুশি ফিরে পেতে চলেছি। ‘

 

অনুরাগ ২য় পর্ব

অনুরাগ
২য় পর্ব
লেখিকাঃ #Israt_Jahan

 

” বলনা কি এমন হয়?
যদি আর একটু চায় হৃদয়।
বলনা কি এমন হয়?
যদি হই আমি স্বপ্নময়।
নাহয় পেলাম সে স্বপ্নকে তোর দু-চোখের নীল তারায়।
নাহয় পেলাম সে সুখ ছোঁয়া হিম বাতাসের আশকারায়। বলনা কি করি হায়?
যদি স্বপ্নরাই তোকে চায়।
বলনা কি করা যায়?
যদি আনমনেই মন হারায়। ”

ঘুমটা জেঁকে বসার আগেই মোহকর কন্ঠসুর শুনে শ্রুতি ঘুম ছেড়ে লাফিয়ে উঠে বসল।গানের কন্ঠটা আসছে বেলকোনি থেকে।গানটা খুব মনযোগ দিয়ে শুনতে শুনতে শ্রুতি খাটের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে চোখ বন্ধ করে নিল।ও জানে এই মোহকর সুর শুধুমাত্র একজনেরই। এই সুরকে ভালোবেসেই তো পুলককে কাছে টেনে নিয়েছিল সে।

” ঘুম জাগা চিলেকোঠায়,
মন ভেজা অমানিশায়,
মান করে,কখনও ভান করে তোকে আপন করে হারাতে চায়।
স্বপ্নরা উড়ে পালায়,
আনকোরা খেয়ালে হায়,
দূর থেকে,হৃদয় পুর থেকে অচেনা সুর থেকে কি করে পাই?
মন চাইছে ভীষণ,হারাতে………
তোর মন নজরে আড়াতে,
নাহয় থাক পড়ে খেয়ালে,
অভিমান গুলো গোপনে।
নাহয় পুরনো আশারা আজ ছোট্ট এই জীবনে।
বলনা কি হবে তাই?
যদি আর একটু কাছে পাই।
বলনা কি হবে তাই?
যদি দূর থেকেই হাত বাড়াই। ”

পুলকের সুরে সুর মিলিয়ে নিজেও দু লাইন গেয়ে উঠল শ্রুতি।
” হুম… স্বপ্নরা কেন আজ ঘড় ছাড়া? হুম… তুই হীনা কেন দিন আনমনা? ”

শ্রুতি সুর ছেড়ে দিতে তাল হারানোর আগেই পুলক আবার গেয়ে উঠল,
” নাহয় কাটালি এক জীবন,
কিছু ছন্নছাড়া ঢঙে,
নাহয় রাঙ্গালি স্বপ্ন তোর,
ওই রংধনুর সাত রঙে।
বলনা কি আসে যায়?
যদি আর একটু পাশে পাই।
বলনা কি ক্ষতি হয়?
যদি একটু বুঝিস আমায়। ”

দুজনের মোহকর কন্ঠ একত্র হয়ে মনের মাঝে যত মেঘের ঘনঘটা সৃষ্টি হয়েছিল শ্রুতি’র, সবটা নিমিষের মধ্যে ভ্যানিশ হয়ে গেল। এই মানুষটার গানের কন্ঠস্বর আর সুরগুলো এত পাগল করা কেন?যত বড় অন্যায় করুকনা সে।এমনভাবে যদি শ্রুতি’র সামনে কিছুসময় পার করে দেয় গান গেয়ে তাহলে শ্রুতি পুরো পৃথিবীকে ভুলে গিয়ে পুলকের বুকে ঝাঁপিয়ে পরবে। আর পুলকটাও সেটা খুব ভালোভাবেই বুঝে গেছে।এই কন্ঠে সারাজীবন গান শুনেও পার করে দিতে পারবে সারাটা সময়। এর জন্যই তো এই ছন্নছাড়া মানুষটিকে নিজের জীবনের সঙ্গে বেঁধে নিয়েছে শ্রুতি সবকিছুর মায়া ত্যাগ করে।আর কী থাকা যায় মুখ ঘুরিয়ে?বেলকোনির গ্রিলের সঙ্গে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে চোখদুটো বন্ধ করে গানটা গাইছিল পুলক।শ্রুতি যে ওর সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে সেটা পুলক বুঝেও চোখদুটো খুলছেনা।শ্রুতি নিজেই কথা বলল।

-‘ তখন রুম থেকে বেরিয়ে গেলে কেন? ‘
(পুলক নিশ্চুপ)

পুলক কোনো কথা বলছেনা দেখে শ্রুতি’র খুব অভিমান হলো।এভাবে পালাক্রমে দুজন রেগে থাকলে ভালোবাসাটা কখন হবে?এটা ভেবেই অথৈ আবার রেগে গেল। আর কিছু না বলে পুলকের গলা চেঁপে ধরতে গেলে পুলক চোখ খুলে শ্রুতি’র হাতদুটো ধরে নিজের কাঁধের দুপাশে রাখল।তারপর ওর কোমড় জড়িয়ে ধরে একদম কাছে টেনে নিয়েলো ওকে।দাঁত কিটকিট করে শ্রুতি বলল, ‘ ভাবটা তো কম শিখোনি।এতসময় কথা বলছিলেনা কেন? ‘
-‘ ভাব নিচ্ছিলাম।সবসময় তো তুমিও একশোতে একশো ভাব নিয়ে চলো।তাই আজ আমিও একটু দেখালাম “ভাব”। ‘
-‘ বদমাইশ পোলা।ভাব নেওয়ার রাইট অনলি আমার।তুই কেন নিবি?তাও আবার আমার কাছে নিবি?পাঁজি,বজ্জাত, শয়তান,খারাপ ছাড় আমাকে।আমার এখানে আসাই ভুল হয়ে গেছে।আমার কাছে ভাব নিতে আসে।কত বড় সাহস? ‘

পুলক আরো শক্ত করে চেঁপে ধরে বলল, ‘ এই ছুকড়ি তুই সবসময় আমাকে তুই তুকারি করে গালাগাল দিস কেন রে,হুম? আমি তোর বয়সে কত বড় জানিস? ‘
-‘ মাত্র আড়াই বছর। ‘
-‘ আড়াই বছর কম মনে হল তোর কাছে না?আ…ড়াই বছর আগে আমি দুনিয়াতে এসেছি।তখন তুই কই ছিলি তার কোনো খবরই নেই।আড়াই বছরের ছোট হয়ে তুই আমাকে গালাগাল দিস আবার তুই তুকারি করিস।আজ তোকে আমি শিক্ষা দিয়েই ছাড়ব। ‘
-‘ ওই ব্যাটা কী করবি তুই আমাকে?তার আগে আমি তোকে দুটো ঘুষি মেরে তোর নাক ভোঁতা করে দিব। ‘

বলা শেষ হতেই পুলকের নাকে শ্রুতি ঘুষি লাগাতে গেল।পুলক তখন ওর হাতটা ধরে বলল, ‘ স্বামীর নাক ফাটাতে আসছিস তুই?আজ তো তুই পুরো খাল্লাস। ‘

শ্রুতি কে কাঁধে তুলে রুমে নিয়ে চলে এল পুলক।তারপর ঠাস করে বিছানায় ফেলে দিল।

শ্রুতিঃ উহ্ঃ অসভ্য বেয়াদব ছেলে।তুই আমাকে এভাবে ফেলে দিলি কেন?
পুলকঃ আবার?আবার গালাগালি দিয়ে কথা বলছিস?তোকে তো আমি….

কথা শেষ না করে আলমারি থেকে তিনটা ওড়না বের করে নিয়ে শ্রুতি’র হাত পা বাঁধতে শুরু করে দিল।শ্রুতি চিৎকার করে বলল, ‘ এই তুমি কী করছো এগুলো? ‘

কথার জবাব দিল না পুলক।ওকে চেঁপে ধরে হাত পা বেঁধে চলেছে।শ্রুতি ভয় পেয়ে গেল।পুলক প্রচন্ড রেগে গেছে হয়তো।এতটা বেশি করা উচিত হয়নি ওর।নিজের দোষে এখন ওকে উত্তম মধ্যম না খেতে হয়।শ্রুতি কাঁদো কাঁদো কন্ঠে আবার জিজ্ঞেস করল, ‘ এই শোনোনা তুমি আমার হাত পা বাঁধছো কেন?হাত পা বেঁধে মারবে নাকি তুমি? কথা বলোনা কেন?সো স্যরি আমার কলিজাটা।আর কখনো এমন ছোটলোকদের মত ব্যবহার করবোনা। ‘
-‘ কলিজাটা?কলিজাতে বার বার লাথি মারার সময় মনে ছিলনা? ‘
-‘ আচ্ছা ভুল হয়ে গেছে তো।হাত পা বাঁধছো কেন?আমি কিন্তু চিৎকার করে ওদের ডাকব। ‘
-‘ মাইক এনে দিই?না হলে তো কানে যাবেনা ওদের।এমন সময় চিৎকার করলে ওরা কেন তোর আব্বাজানও দরজার কাছে আসবেনা। ‘
-‘ আচ্ছা তুমি আমাকে মারতে চাইলে মারো।তাই বলে হাত পা বেঁধে কেন? ‘
(পুলক নিশ্চুপ)
-‘ আরে আমার ভাই হাত পা বাঁধছিস কেন রে? ‘
-‘ ছাদ থেকে ফেলে দিব হাত পা বেঁধে। বুঝেছিস?যে বউ স্বামীকে তুই তুকারি করে গালাগাল দেয় সেই বউকে আজ চরম শিক্ষা দিব।তারপর সকাল হলে সবাই যখন তোকে রক্তাক্ত অবস্থায় নিচে পড়ে থাকতে দেখে আমাকে জিজ্ঞেস করবে এমনটা কী করে হল?তখন বলব আমার বউ আস্ত একটা গালিবাজ ছিল। তার জন্য ওকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে শাস্তি দিয়েছি। ‘

কথাটা বলেই শ্রুতি’র মুখটা বেঁধে দিয়ে ওকে আবার কাঁধে তুলে নিয়ে ছাদের দিকে রওনা হল।শ্রুতি ভয়ে ঘেমে একদম চুপসে গেছে।পুলক রেগে গেলে যে কতটা সাংঘাতিক হয় তা তো একবার দেখেছিল যখন ওদের মাঝে প্রেম ছিল।রেগে গেলে ছেলেটা একদম হিতাহিত জ্ঞানবোধ হারিয়ে ফেলে।

 

অনুরাগ (১ম অংশ)

অনুরাগ (১ম অংশ)
লেখিকাঃ #Israt_Jahan

ঘড়িতে রাত ১১ টা বেজে ১৫ মিনিট। বিছানার মাঝ বরাবর বধু বেশে বসে আছে শ্রুতি।কখন যে পুলক বাসায় ফিরবে আর কখন যে শ্রুতি কে দ্বিতীয়বারের মত বধু সাজে দেখে চমকে উঠবে সেই অপেক্ষাতে বসে প্রহর গুণছে মেয়েটা।আজ তাদের প্রথম বিবাহ বার্ষিকী।বিয়ের আগে থেকেই শ্রুতি ভেবে রেখেছিল প্রতি বছর ঠিক এই দিনে নতুন বউ সেজে বাসরঘর সাজিয়ে পুলককে সে চমকে দেবে।আর পুলক মুগ্ধ নয়নে তার প্রেয়সীর মুখটা দেখবে।আর তারপর ঠিক প্রথম বাসররাতে পুলক ওকে যেভাবে কাছে টেনে নিয়ে খুব খুব ভালোবেসেছিল আজও ঠিক সেইভাবেই ওর কাছে আসবে।উফ! ভাবতেই শ্রুতি লজ্জায় কেঁপে উঠছে।বিছানা থেকে নেমে দেয়ালে টাঙানো ছবিগুলো দেখছে।সেন্টমার্টিনে তোলা ছবিগুলো, যখন ওরা বিয়ের পর মধুচন্দ্রিমাতে গিয়েছিল তখনকার ছবি। আরো কিছু ছবি রয়েছে যেগুলো ওদের ভার্সিটি পড়াকালীন দুজন চুটিয়ে প্রেম করত সেই সময়কার ছবি।একটা ছবিতে শ্রুতি ক্যাম্পাসের মাঠে বসে মনযোগ দিয়ে একটা বই পড়ছে আর পুলক পলকহীন ভাবে ওকে দেখছে।পাশ থেকে নিশাদ ফোন থেকে টুপ করে ছবিটা ক্লিক করে ফেলে।আজকে নতুন করে শ্রুতি ওদের সাজানো রুমটা ঘুরে ঘুরে দেখছে। সারা রুমে নীল দ্যুতি ছড়িয়ে একটা অন্যরকম পরিবেশ তৈরি করেছে।শ্রুতির খুব আনন্দ হচ্ছে।মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব থেকে সুখী মানুষটা ওই।সাদা চাদরের ওপর লাল গোলাপের পাপড়িগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।ইচ্ছা করছে এখনই পুলকটাকে কান ধরে টেনে নিয়ে আসতে। আজ এত সময় নিচ্ছে কেন বাসায় ফিরতে কে জানে?তারউপর আজ চাঁদনিরাত।এমন রাতে আর কতক্ষণ একা বসে থাকা যায়?ছেলেটা যে কী পরিমাণ জ্বালায় আজ কাল!রুমে এলে প্রথমে জোড়ে দুটো ঘুষি দিবে পুলকের পেটে।
তারপর জড়িয়ে ধরে ওর কানে কানে বলবে,
-‘ শুভ বিবাহবার্ষিকী পুলক সাহেব।শুভ হোক তোমার আর তোমার বউ এর বিবাহিত জীবন। ‘
এসব ভাবনার মাঝে দরজায় নক পড়ল। হঠাৎ দরজার নক শুনে শ্রুতি চমকে উঠল।হার্টবিট ওঠানামা করতে শুরু করেছে ওর।ধুকধুকানি শব্দটা নিজের কানেই শুনতে পাচ্ছে মনে হচ্ছে।এত লজ্জা লাগছে কেন?সেই প্রথমবারের মত অনুভূতিটা।মৃদু ঘাম সৃষ্টি হয়েছে শ্রুতি’র নাকে আর কপালে।ধুত্! অনেক নাটক হয়েছে।গিয়ে তো দরজাটা খুলতে হবে। নতুন বউ সেজেছে বলে তো সে আর নতুন বউ নয়।তবু সে লজ্জাটাকে আড়াল করতেই পারছেনা।দ্রুত পায়ে হেঁটে ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি রেখে দরজাটা খুলল শ্রুতি।

ঈষাণঃ শুভ বিবাহবার্ষিকী ম্যাম।

হাসিমাখা মুখে ঈষাণ ফুলের তোড়াটা এগিয়ে দিল শ্রুতি’র দিকে।তোড়াটা হাত থেকে নিয়ে শ্রুতি বলল,
-‘ বাব্বাহ্ তাহলে আপনি শেষ পর্যন্ত এসেছেন এস.পি সাহেব? ‘
-‘ নাহ্ আসিনি তো।আমার ভূত এসেছে। ‘
-‘ আচ্ছা ড্রয়িংরুমে গিয়ে বস আমি আসছি।তানিয়া,নিশাদ,রবিন,মেঘলা ওরা সবাই সোফাতেই ঘুমিয়েছে নাকি? ‘
-‘ না আড্ডা চলছে এখনো।আমি তো ভাবলাম পুলক বোধহয় রুমেই আছে। আর এতক্ষণে আপনাদের….। ‘
-‘ এই যাহ্ কিসব বলিস!যা আমি আসছি। ‘

ঈষাণ চলে যেতে গিয়েও থেমে গেল।
তারপর বলল,
-‘ একবার রুমে ঢুকতেও দিলিনা? ‘
-‘ ওহ্ স্যরি ভাই।আয় আয় ভেতরে আয়। ‘
-‘ মাই গড!এত চমৎকার করে সাজিয়েছিস রুমটা।ইচ্ছে তো করছে বাসরটা আমিই সেড়ে যাই। ‘
-‘ এই কী যে বলিস না তুই।তোর মুখে কিছুই আটকায়না।বদের হাড্ডি আছিস এখনো। ‘

ঘোর লাগানো চোখে তাকিয়ে আছে ঈষাণ শ্রুতি’র পানে।ধীর পায়ে হেঁটে এসে শ্রুতি’র সামনে দাঁড়াল।তারপর বলল,
-‘ খুব সুখে আছিস তাইনা? ‘
-‘ হ্যাঁ রে খুব।জানিসই তো পাগলটা কী পরিমাণ ভালোবাসে আমায়। ‘
-‘ বাই দ্যা ওয়ে।দানুণ লাগছে তোকে। ‘
-‘ থ্যাংক ইউ মহাশয়। ‘
-‘ আয়…ড্রয়িংরুমে আছি। ‘
————————
মেঘলাঃ কী ব্যাপার বল তো?রাত বারোটা বাজতে চলল প্রায়।আমরা কত প্ল্যান করেছিলাম পুলক কে সারপ্রাইজ দেওয়ার।ব্যাটার এখনো আসার নাম গন্ধ নেই?
শ্রুতিঃ বুঝতে পারছিনা।এমন তো কখনো করেনা ও।

পুলকের নাম্বার ডায়াল করছে শ্রুতি আর কথাগুলো বলছে।

ঈষাণঃ পেলি?
শ্রুতিঃ না।রিসিভ করছেনা তো ফোন।

নিশাদ গর্জনরত কন্ঠে শ্রুতিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
-‘ ধ্যাত্তেরিকা।মেয়ে মানুষগুলো এমন ন্যাকা স্টাইলের কেন?টেনশানের ঝুড়ি খুলে বসেছিস একদম।প্রাইভেট কোম্পানির জব। কাজের চাঁপ বেশি থাকলে দেরী হতেই পারে।আর তাছাড়া ঢাকার রাস্তা তো আর তোর বেডরুমের ফ্লোর না। ‘

মেঘলা নিশাদের গায়ে চাপড় দিয়ে বলল,
-‘ এই বাজে বকিস না তো।টেনশান হওয়ারই বিষয় এটা।যেহেতু ও এমন লেট করে বাসায় কখনোই ফিরেনা।আর ওদিকে তানিয়া আর রবিনকে দ্যাখ।যেন প্রেম করার জন্য ডেকে আনা হয়েছে ওদের। দুজনে এক সাইডে বসে সেই তখন থেকে গুজুর গুজুর করে চলেছে। ‘

শ্রুতির কারো কথাই কানে ঢুকছেনা। এক নাগাড়ে কল করে যাচ্ছে পুলকের ফোনে।

ঈষাণঃ শ্রুতি?
শ্রুতিঃ হ্যাঁ বল।
ঈষাণঃ তাহলে আমি উঠি।আমার ডিউটি আছে বারোটার পর থেকে।পুলক আসলে বলিস আমার কথা।আর মন খারাপ করিস না হয়তো জরুরি কোনো কাজে আটকে পরেছে।চলে আসবে এক্ষণি।
মেঘলাঃ থেকে যা না আজ আমাদের সাথে।রাতে আমরা পাঁচজন আমাদের ঘরোয়া পার্টি ইনজয় করব।আর ওরা বাসরঘর।
শ্রুতিঃ হ্যাঁ।আজকে রাতে এখানেই থেকে যা।আর ডিনারও তো করলিনা।

শ্রুতি কথাটা কেবল বলার প্রয়োজন তাই বলল।ওর ধ্যান তো রয়েছে হাতের ফোনটার ভিতর।পুলকের জন্য বড্ড চিন্তা হচ্ছে ওর।ঈষাণ এক নজরে তাকিয়ে দেখছে শ্রুতি কে।কী মিষ্টিই না লাগছে মেয়েটা কে আজ।ঈষাণ নিজেই চোখ সরাতে পারছেনা।পুলক আজ তাহলে কী করবে?

মেঘলাঃ কীরে থাকবি তো?

মেঘলার ডাকে ঈষাণ স্তম্ভিত থেকে বেরিয়ে এল।বলল,
-‘ শ্রুতি যখন বলেছে।তখন তো থাকাই যায়। ‘
-‘ ওয়াও গ্রেট।আমরা আজ অন্নেক মজা করব সারারাত।তোকে তো ফ্রি পাওয়া বর্তমান সো টাফ। ‘

রাত ১ টা ২০ মিনিটে পুলক বাসায় ফিরল।ঈষাণ তখন ডাইনিং এ পানি খেতে এসেছে।পুলক ঈষাণকে দেখে থেমে গেল।

ঈষাণঃ কীরে এই তোর আসার সময় হলো?
পুলকঃ তুই?
ঈষাণঃ কেন?আসা কী অন্যায়?
পুলকঃ আরে না না।অন্যায় কেন হবে? হঠাৎ করে দেখলাম তো।কেমন আছিস বল?আর কী মনে করে এই গরীবের বাসায় পা রাখলি তাও আবার এত রাতে?

ঈষাণ পুলকের কাছে এগিয়ে এসে ঘড়ি দেখে বলল,
-‘ এক ঘন্টা বিশ মিনিট আগে তোর আর শ্রুতি’র প্রথম বিবাহ বার্ষিকী পার হলো।শুভ বিবাহবার্ষিকী। ‘
-‘ ওহ্ স্যরি দোস্ত।এক্সট্রিমলি স্যরি।আমার আসলে খেয়াল ছিলনা।রাতে খেয়েছিস তো?রবিন নিশাদ ওরা সবাই এসেছে না? ‘

ঈষাণ পুলকের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর ভাবে বলল,
-‘ হুম।সবাই এসেছে। ‘
-‘ চল ওদের সাথে দেখা করে আসি।অনেক অপেক্ষা করতে হলো তোদের।স্যরি রে। ‘

পুলক সবার সাথে দেখা করার জন্য সামনে এগোতেই ঈষাণ পুলকের বাহু ধরে বাঁধ সাধল।তারপর ওর সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
-‘ এই মুহূর্তে আমাদের অপেক্ষার থেকে শ্রুতি’র অপেক্ষার দামটা বেশি।আর স্যরিটাও ওকেই আগে বলা উচিত।ওদের সাথে সকালে দেখা করলেও চলবে। ‘

পুলক শুধু মাথা নাড়াল।ঈষাণ আবার বলল,
-‘ তোকে কেমন যেন এলোমেলো লাগছে। তুই কী আজকাল স্মোক করছিস নাকি? ‘
-‘ স্মোক?কই না তো। ‘

ঈষাণ ওর কাঁধ হাত রেখে ঠোঁটের বাঁকা হাসিটা দিল।পুলক আজ কাল শুধু স্মোক না মাঝে মধ্যে কলিগদের সঙ্গে ড্রিংকস ও করে সেটা ঈষাণ ভালো করেই জানে। রুমে ঢুকে পুলক শ্রুতি কে দেখতে পেলোনা।নিশ্চই বেলকোনিতে বেতের চেয়ারটাতে বসে ওর জন্য অপেক্ষা করছে আর না হয় ঝিমুচ্ছে।পুলকের শরীরটা বড্ড ক্লান্ত।রুমে ঢুকে নীল আভা দেখে মনে হচ্ছে এখনি বিছানার ওপর ঠাস করে শুয়ে পড়তে।বাসরঘরের সাজসোজ্জার দিকে ওর একদমই কোনো মনযোগ নেই। কিন্তু শ্রুতি যে খুব আশা করে বসে আছে ওর ফেরার অপেক্ষাতে।একটু সময় না দিলে মেয়েটা খুব কষ্ট পাবে।ওয়াশরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে শ্রুতি’র দেওয়া সাদা পাঞ্জাবী টা পরে বেলকোনিতে চলে গেল। চাঁদের আলোতে শ্রুতি কে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে পুলক।বেতের চেয়ারটাতে হেলান দিয়ে ঘাড়টা কাঁত করে ঘুমিয়ে আছে। বিয়ের শাড়িটা পড়েছে আজ।এই শাড়িটাতে শ্রুতি কে একদম হূরপরী লাগে পুলকের কাছে। সাদা জমিনে লাল পার আর লাল পারের ভিতর গোল্ডেন সুতার কাজ।পুরো শাড়িটার ভিতর গোল্ডেন সুতার হালকা কাজ।আর সেই সাথে শ্রুতি’র ব্রিডাল সাজটাও চোখ ধাঁধানোর মত।গলায় সাদা পাথরের একটি নেকলেস আর কানেও সাদা পাথরের বড়দুল। ডায়মোন্ডের মাঝারি নোসপিনটাও চিক চিক করছে হালকা আলোতে।চুলটা সুন্দর করে খোপা করা।ঠোঁটে লাল খয়েড়ি মিক্সড লিপস্টিকটাও খুব আকর্ষণীয়।পুরো সাজটাই অস্থির করা একদম।শ্রুতি’র লাল ঠোঁটদুটো যেন পুলকের শরীরের ক্লান্তি একদম দূর করে দিয়েছে। সেই সাথে চোখের ঘুমও কেড়ে নিয়েছে।পাশ থেকে বেতের অন্য একটি চেয়ার টেনে নিয়ে শ্রুতি’র কাছে গিয়ে বসল। খুঁটে খুঁটে বউটার সাজ দেখছে।সত্যিই খুব সারপ্রাইজড হয়েছে পুলক।বিয়ের পর থেকে শ্রুতি’র সৌন্দর্য যেন দিন দিন উপচে পড়ছে।ইশ!কত অপেক্ষাটা না করালো মেয়েটাকে আজ।আরো আগে আসা উচিত ছিল তার।মনে মনে নিজেকেই গালাগাল দিচ্ছে সে।ঠোঁটদুটোর দিকে নজর পরতেই ঠোঁটে ঠোঁটে কথা বলতে ইচ্ছা করল ওর।শ্রুতি’র ঠোঁটজোড়ার খুব কাছাকাছি পুলকের ঠোঁটজড়া।শ্রুতির থুতনিতে আর ঠোঁটের ওপর পুলকের ঘন ঘন নিঃশ্বাস পরছে।দুজনের ঠোঁট মিলিত হওয়ার আগেই শ্রুতি নড়েচড়ে বসল।লাল চোখে তাকিয়ে আছে পুলকের দিকে শ্রুতি।
একগাল হেসে পুলক বলল,
-‘ শুভ বিবাহবার্ষিকী আমার হূরপরী। ‘

ছোট্ট করে পুলকের নাক বরাবর ঘুষি লাগাল শ্রুতি।

পুলকঃ আআহ্….।এটাই কী ছিল আমার সারপ্রাইজ গিফ্ট?

শ্রুতি আরো একদফা রেগে গিয়ে বলল,
-‘ এতক্ষণেও তোর চোখে পড়েনি আমার সারপ্রাইজটা? ‘
-‘ এই এটা কী হচ্ছে?আবার তুই তুকারি করছো কেন? ‘
-‘ হ্যাঁ তুই তুই তুই।তোর বাপ দাদা চৌদ্দ গুষ্টিকে আমি তুই তুকারি করব। ‘
-‘ ছিঃ ছিঃ। আমাকে তুই তুকারি করো আমি মেনে নিব তাই বলে আমার বাপ দাদা কে না প্লিজ। ‘
-‘ হাজার বার করব।কোথায় ছিলি তুই এত রাত?তোর ওই নাবিলা ম্যামের কাছে?ওই মহিলা কী তোকে…..। ‘
-‘ এই একদম বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু। তুমি সবসময় ঝগড়ার মাঝে আমার বাপ দাদা আমার অফিস কলিগ এদের কে টেনে আনতে পারোনা। ‘
-‘ কোনো কিছুই টেনে আনবোনা আর। যা দূর হ আমার চোখের সামনে থেকে। ‘
-‘ এমনভাবে বলতে পারলে?সত্যি চলে যাবো কিন্তু।”
-‘ আসার কী প্রয়োজন ছিল? ‘
-‘ আচ্ছা আজকে না হয় একটু লেট হয়েছে।অন্যান্য দিন তো আমি ১০ টা থেকে ১১ টার মাঝে চলে আসি,না? ‘
-‘ হ্যাঁ।বেছে বেছে আজকে রাতেই তোকে দেরী করে ফিরতে হল।বেশ করেছিস খুবই মহৎ কাজ করেছিস।এখন আমার চোখের সামনে থেকে চলে যা।একদম সহ্য হচ্ছেনা তোকে আমার। ‘

পুলক গম্ভীরস্বরে বলল, ‘ একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না? ‘

শ্রুতি আর কোনো জবাব না দিয়ে উঠে রুমে চলে গেল।তারপর খুব শব্দ করে ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ করে দিল।মেজাজ খুব বিগড়ে গেছে আজ।কী এমন কাজ পরে গিয়েছিল যে নিজের বিবাহবার্ষিকীর কথা পর্যন্ত মনে ছিলনা ওর।রাগে সারা শরীর কাঁপছে শ্রুতি’র।পুলক বুঝতে পেরেছে শ্রুতি এখন ওয়াশরুমে বসে কান্না করছে।ডেকেও কোনো লাভ নেই।মেয়েটার মাঝে ভালোবাসার কমতি না থাকলেও রাগের পরিমাণটাও অসীম।পুলক রুম থেকে বেরিয়ে গেল।পনের মিনিট পর চোখ মুখ লাল করে শ্রুতি ওয়াশরুম থেকে বের হল।রুমে ঢুকে যখন দেখল পুলক নেই মেজাজ তখন আরো গরম হয়ে গেল। কোনো কিছু চেইঞ্জ না করেই বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।এপাশ ওপাশ করেই চলেছে।মাথা গরম থাকলে তো ঘুমও চোখে নামতে ভয় পায়।শ্রুতি ভাবছে এই বুঝি পুলক রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে ওকে জড়িয়ে ধরে আদর করে মান ভাঙাবে।কিন্তু না ওর তো আসার কোনো খবরই নেই।বিছানা থেকে উঠে কড়া ডোজের একটু ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে দিল।কারণ যতক্ষণ অবদি ঘুম না আসবে ততক্ষন অবদি ভেতরে ভেতরে জ্বলতে থাকবে।কিছুক্ষণের ভেতর ঘুমের ভাবটা প্রায় চলে এসেছে।ঘুমে চোখের ঝাঁপি দুটো নেমে গেছে।ঠিক তখনই কেউ একজন শ্রুতি’র রুমে এসে দাঁড়াল।
শ্রুতি’র চোখের সামনে হাত নেড়ে দেখল ঘুমিয়ে পরেছে কিনা।

 

বা‌লিকা বধূ ৫ম পর্বঃ-শেষ পর্ব

0

বা‌লিকা বধূ ৫ম পর্বঃ-শেষ পর্ব

#লেখাঃ_শার‌মিন_আক্তার_(#সাথী____)

———-তনয়‌াঃ আজ থে‌কে আমি মুক্ত মা! আয়াত না‌মের কেউ আর আমার জীব‌নে অধিকার খাটা‌তে পার‌বে না।

মাঃ বু‌কে হাত রে‌খে বল‌তো তনয়া আয়াত কি কখ‌নো তোর উপর অধিকার খা‌টি‌য়ে‌ছে? ওর য‌দি অধিকার খাটা‌নোরই থাক‌তো তাহ‌লে সেটা অনেক আগেই খাটা‌তে পার‌তো ! কিন্তু ছে‌লেটা সেই ছোট বেলা থে‌কে তো‌কে পাগ‌লের মত ভা‌লোবা‌সে। আর ওর ভা‌লোবাসার প্র‌তিদান হিসা‌বে তোর কা‌ছে ঘৃনা ছাড়া কিছু পায়‌নি। তারপরও তো‌কে ভা‌লো‌বে‌সে গে‌ছে। একবার চিন্তা ক‌রে দেখ‌তো আয়াত চাই‌লে তোর থে‌কে হাজার গুন ভা‌লো মে‌য়ে বি‌য়ে কর‌তে পা‌রে কিন্তু কেন ক‌রে‌নি? তোর জন্য? তোর প্র‌তি ওর ভা‌লোবাসা এতটা যে তোর ঘৃনাটা‌কেও ও ভা‌লো‌বে‌সে গে‌ছে। কিন্তু তুই কি কর‌লি?

তনয়াঃ আমার এখন এসব শুন‌তে ভা‌লো লাগ‌ছে না। আমার মাথাটা প্রচন্ড ব্যাথা কর‌ছে। তনয়া নি‌জের রু‌মে গি‌য়ে চুপচাপ ব‌সে রই‌লো। কা‌রো সা‌থে কোন কথা বল‌ছে না।

প‌রের দিন বিকা‌লে——
তনয়া নি‌জের রু‌মে শু‌য়ে ছি‌লো। তখন তনয়ার ভা‌বি (রি‌মি) আস‌লো। তারপর তনয়ার সা‌থে টু‌কিটা‌কি কথা বলতে বল‌তে একসময় ব‌লে?

‌রি‌মিঃ তনয়া তু‌মি কি অন্য কাউ‌কে ভা‌লোবা‌সো!

তনয়াঃ ছিঃ ভা‌বি তেমন কিছু না!

‌রি‌মিঃ না মা‌নে আমার বি‌য়ের বয়স দুবছর কিন্তু তু‌মি ব‌রিশাল থা‌কো কেবল একবছর ধ‌রে। এর আগে‌ তো তোমার মামার কা‌ছে চট্টগ্রাম থাক‌তে তাই‌তো? শু‌নে‌ছি গত ছয় বছর যাবত তু‌মি সেখা‌নেই থাক‌তে। লেখা পড়াও সেখা‌নে ক‌রে‌ছো। খুব বে‌শি জর‌ু‌রি কারন ছাড়া ব‌রিশাল আস‌তে না। আর ছয় বছ‌রে তু‌মি আয়া‌তের সা‌থে তেমন কথা ব‌লো‌নি। যখন ব‌রিশাল আসতে তখন। তাও বে‌শির ভাগ টাইমই খারাপ ব্যবহার কর‌তে। গত বছর মামা মারা যাবার পর তোমা‌কে জোড় ক‌রে ব‌রিশাল ক‌লে‌জে ট্রান্সফার ক‌রে আনা হয়। তাও প্রায় একবছর। তার মাসখা‌নেক পরে মা মিথ্যা ব‌লে তোমার আর আয়া‌তের বি‌য়ে দি‌য়ে দেয়। বাধ্য হ‌য়ে তু‌মি গত ছয় মাস ধ‌রে আয়া‌তের সা‌থে সংসার কর‌লে। আ‌মি বল‌তে চা‌চ্ছি চট্টগ্রাম থাকাকালীন তোমার কি কাউ‌কে——? দে‌খো নিসং‌কো‌চে বল‌তে পা‌রো। আমি মা আর তোমার ভাইয়ার সা‌থে কথা বল‌বো।

তনয়াঃ তেমন কিছু না ভা‌বি। আয়াত‌কে যে ম‌নে জায়গা দি‌য়ে‌ছিলাম কেন যে‌নো সে ম‌নে প‌রে কেউ জায়গা কর‌তে পা‌রে নি। কোন একটা কিন্তু থে‌কে যে‌তো। ওকে মন থে‌কে যত ঝে‌ড়ে ফেল‌তে চাইতাম ও শাকচু‌ন্নি ভ‌ূ‌তের মত ম‌নের ম‌ধ্যে তত ‌বে‌শি ব‌সে থাক‌তো। তাই চে‌য়েও নি‌জের ম‌নে কাউ‌কে বসা‌তে পা‌রি‌নি। ইনফ্যাক্ট কোন ছে‌লে বন্ধু দুষ্ট‌মি হাত ধর‌লেও মেজাজ গরম হয়ে যে‌তো।

‌রি‌মিঃ তাহ‌লে তু‌মি আয়াত‌কে ছাড়‌লে কেন?

তনয়াঃ ভা‌বি এটা জর‌ু‌রি না যে বিবাহ বিচ্ছেদ কেবল নি‌জে‌দের ম‌ধ্যে তৃতীয় পক্ষ আসার কার‌নে হ‌বে?

‌রি‌মিঃ কি জা‌নি বাপু! তোমা‌দের এত মোটা মোটা কথা আমার ছোট মাথায় ঢু‌কে না।

এর ম‌ধ্যে তনয়ার রু‌মে তনয়ার ভাই (তামিম), আর ওর মা এলো।

তা‌মিমঃ তনয়া তোর সা‌থে কিছু কথা ছি‌লো!

তনয়াঃ হ্যা ভাই ব‌লো?

তা‌মিমঃ আজ তোর কা‌ছে কিছু জান‌তে চাই‌বো বল না কর‌বি না। তো‌কে আজ বল‌তেই হ‌বে?

তনয়াঃ আমি কেন আয়াত‌কে ঘৃনা ক‌রি? এটাই তো?

তা‌মিমঃ হুমমম।

তনয়াঃ ভাইয়া তোমরা সবাই জা‌নো বাবার মৃত্যু একটা এক‌সি‌ডেন্ট কিন্তু না? বাবাকে খুন করা হ‌য়ে‌ছে আর খ‌ুনটা আয়াত ক‌রে‌ছে!

তা‌মিমঃ কি! (সবাই যে‌নো বড়সড় ধাক্কা খে‌লো।) তনয়া তুই এটা কি বল‌ছিস? তোর মাথা ঠিক আছে?

তনয়াঃ হ্যা ভাইয়া আমি স‌ত্যি বল‌ছি। সে‌দিন বাবা যখন ছাদ থে‌কে প‌ড়ে যায় তখন ছা‌দে আয়াতও ছি‌লো। বাবা ঠিক যেখানটা দি‌য়ে প‌ড়ে যায় ঠিক সেখানটায় দাড়া‌নো। ও বাবার প‌ড়ে যাওয়ার দি‌কে তাকি‌য়ে ছি‌লো । তু‌মিই ব‌লো বাবা শুধু শুধু ছাদ থে‌কে কি ক‌রে পড়‌বে? কেউ ধাক্কা না দি‌লে এমনি প‌ড়ে যাওয়া সম্ভব?

তা‌মিম, ‌রি‌মি, তনয়ার মা আশ্চর্য্য হ‌য়ে তনয়ার দি‌কে তা‌কি‌য়ে রই‌লো।

মাঃ এই কার‌নে তুই আয়াত‌কে ঘৃনা কর‌তিস? এই কারনে তুই আয়াতের থে‌কে দূ‌রে চ‌লে এলি?

তনয়াঃ হ্যা মা!

তনয়া মা তনয়ার কা‌ছে গি‌য়ে তনয়ার গা‌লে ক‌ষে একটা চড় মা‌রে। তনয়া গা‌লে হাত দি‌য়ে চোখ বড় বড় ক‌রে ওর মা‌য়ের দি‌কে তা‌কি‌য়ে ছি‌লো।

মাঃ এ কি কর‌লি হতভাগী? নিজের সাজা‌নো গোছা‌নো সংসারটাকে নিজের হা‌তে এভা‌বে ভে‌ঙে দি‌লি? নিজের সর্বনাশ এভা‌বে নি‌জে কর‌লি? তাও একটা মিথ্যা ভুল ধারনার জন্য!

তনয়াঃ মিথ্যা না মা এটাই স‌ত্যি।

মাঃ কি স‌ত্যি বল! সে‌দিন তুই ছা‌দে আয়াত‌কে দেখ‌লি আর আমাকে দেখ‌লি না? সে‌দিন ছা‌দে তোর বাবা, আমি আর আয়াত তিন জনই ছি‌লাম। তোর বাবা পা স্লিপ ক‌রে প‌রে যায়। নি‌চে প‌রে মাথাটা পাথ‌রের উপর পড়ায় তা‌কে বাঁচা‌নো সম্ভব হয়‌নি। আয়াত দৌ‌ড়ে তোর বাবা‌কে বাঁ‌চা‌তে গি‌য়ে‌ছি‌লো। তোর বাবা‌কে ধাক্কা দি‌তে নয়।

তনয়াঃ মা আমি স্পষ্ট দে‌খে‌ছি আয়াত বাবা‌কে ধাক্কা দি‌য়ে স‌রি‌য়ে দি‌য়ে‌ছে। তাল সামলাতে না পে‌রে বাবা ছাদ থে‌কে নি‌চে প‌ড়ে গে‌ছে।

মাঃ তুই এটা দেখ‌লি আয়াত তোর বাবা‌কে ধাক্কা দি‌য়ে স‌রি‌য়ে দি‌য়ে‌ছে কিন্তু কেন স‌রি‌য়ে‌ছে সেটা দেখ‌লি না।

তনয়াঃ কি বল‌তে চাই‌ছো মা তু‌মি?

মাঃ ছোট বেলা থে‌কে তোরা তো‌দের বাবা‌কে খুব ভা‌লো জে‌নে এসে‌ছিস তাই না? কিন্তু তোরা ভুল জান‌তিস! হ্যা তো‌দের বাবা তো‌দের খুব ভা‌লোবাস‌তো। কিন্তু আমার সা‌থে জা‌নোয়া‌রের মত ব্যবহার কর‌তো। উঁচু‌তে ওঠার স্বপ্নটা তার বরাব‌রেই। তার জন্য সে যে কোন কাজ কর‌তে পার‌তো। আয়া‌তের সা‌থে তোর বি‌য়েটাও সে জন্যই দি‌য়ে‌ছে যা‌তে আয়া‌তের বাবার থে‌কে সবরকম সু‌ব‌িধা পে‌তে পা‌রে। সে‌দিন খুব সকা‌লে তোর বাবা ছা‌দে গি‌য়ে ফো‌নে কার সা‌থে যে‌নো কথা বল‌ছি‌লো যে, সে আয়া‌তের বাবার সব কিছু নি‌জের না‌মে ক‌রে নি‌বে। আরো কিছু কথা। কথ‌া গু‌লো আমি শু‌নে ফে‌লি। তোর বাবার সব কথা আয়া‌তের বাবা‌কে ব‌লে দেয়ার কথা বল‌তেই তি‌নি অনেক ভা‌বে আমা‌কে ভয় দেখায়। যখন তার কথা শু‌নি‌নি তখন ছা‌দে ব‌সেই তি‌নি আমার গলা চে‌পে ধ‌রে। তখন আয়াত ওদের বা‌ড়ির ছাদ থে‌কে আমা‌দের বা‌ড়ির ছা‌দে আসে। হয়‌তো তোর সা‌থে দেখা কর‌তে আস‌ছে। এসে দে‌খে তোর বাবা ছা‌দে পাতা চেয়া‌রে সাথে আমা‌কে চে‌পে ধ‌রে আমার গলা চে‌পে ধ‌রে রে‌খে‌ছে। আমার প্রান তখন যায় যায় অবস্থা। আয়াত তোর বাবা‌কে ছাড়া‌নোর চেষ্টা ক‌রে কিন্তু তার সা‌থে পে‌রে উঠে না। তারপর কোন রকম তা‌কে ধাক্কা দি‌য়ে আমার থে‌কে দুরে ঠে‌লে দেয়। তোর বাবা ব্যা‌লেন্স ঠিক রাখ‌তে না পে‌রে প‌ড়ে যায়। আয়াত দৌ‌ড়ে ছা‌দের পা‌শে যায়। কিন্তু ততক্ষ‌নে অনেক দে‌রি হ‌য়ে যায়। সে‌দি‌নের ঘটনাটা একটা এক‌সি‌ডেন্ট ছি‌লো।

আয়াত য‌দি সে‌দিন তোর বাবা‌কে আমার থে‌কে দূরে না কর‌তো তাহ‌লে সে‌দিন তোর বাবা আমা‌কে মে‌রে ফেল‌তো। তোর বাবা প‌ড়ে যাবার পর আয়াত মানু‌ষিকভা‌বে ভিষন ভে‌ঙে পরে। ও নি‌জেই পু‌লিশের কা‌ছে সব ব‌লে। পু‌লিশ সব তদন্ত ক‌রে দে‌খে আয়াত স‌ত্যি বল‌ছে। আর আমিই পু‌লিশ ক‌মিশনার‌কে অনু‌রোধ ক‌রে‌ছিলাম যে‌নো বিষয়টা নীরবভা‌বে তদন্ত ক‌রে। এ কথা গু‌লো আমরা সবাই জা‌নি। তো‌দের জানাই‌নি কারন আমি চাই‌নি তুই আর তা‌মিম তোর বাবা‌কে ঘৃনা ক‌রিস। চাই‌নি তোরা যখন তোর বাবা‌কে ম‌নে কর‌বি তখন ঘৃনা স‌হিত ম‌নে ক‌রিস। অনেক বছর তো‌দের কথা ভে‌বে তোর বাবার অত্যাচার মুখ বুঝে সহ্য কর‌ছি। কিন্তু সেই তুই কিছু না বু‌ঝে শু‌নে আয়াত‌কে——। আয়াত এখ‌নো আমার কা‌ছে এসে কাঁ‌দে। কারন ও এখ‌নো নি‌জে‌কে অপরধী ম‌নে ক‌রে। যে অপরাধটা ও ক‌রে‌নি তার জন্য ও রোজ অনুতপ্ত হয়। আমরা তোর বাবার কবর জেয়ারত কর‌তে যে‌তে ভুল কর‌লেও আয়াত ক‌রে‌ না। তোর বাবার কব‌রের পা‌শে গি‌য়ে পাগলের মত কাঁ‌দে ছে‌লেটা। তো বাবা মারা যাবার পর আমাদের প‌রিবা‌রের সব কিছু আয়াত আর আয়া‌তের বাবা দে‌খে‌ছে। তোর ভাই তা‌মিম যে আজ এত বড় ব্যবসায়ী তাও কেবল আয়া‌তের কার‌নে।

যাক এসব কথা না হয় বাদ দিলাম। তোর শত ঘৃনা অপমান সহ্য ক‌রেও নিঃশ্বার্থভা‌বে তো‌কে ভা‌লো‌বে‌সে গে‌ছে। তো‌কে আয়াত অনেক আগেই স‌ত্যিটা বল‌তে চে‌য়ে‌ছি‌লো। আমিই ওকে কসম দি‌য়ে‌ছিলাম ও যে‌নো তো‌কে না জানায়। আমি কখ‌নো ভাব‌তে পা‌রি‌নি যে তুই এই কার‌নে আয়াত‌কে ঘৃনা ক‌রিস। জান‌লে অনেক আগেই তো‌কে স‌ত্যিটা জানাতাম। আজ আমার ভু‌লের কার‌নে তুই আয়া‌তের মত ছে‌লে‌কে হা‌রি‌য়ে ফেল‌লি। এটা তুই কি কর‌লি তনয়া? একটা কথা কি জা‌নিস তনয়া সবসময় চোখ যা দে‌খে কান যা শো‌নে তা কিন্তু সত্যি হয় না। চো‌খের আড়া‌লেও একট‌া সত্যি থা‌কে । কিন্তু সবসময় আমরা সেটা দেখ‌তে পা‌বো এমন কোন কথা নাই।

মা‌য়ের কথা শু‌নে তনয়া যে‌নো বোবা হ‌য়ে গে‌লো। কথা বলার মত কোন ভাষা পা‌চ্ছে না। কি বল‌বে? কিই বা বলার আ‌ছে? সব কিছু তো শেষ! নি‌জের হা‌তে নিজে শেষ ক‌রে দি‌ছে। অতি‌রিক্ত শো‌কে যেমন মানুষ পাথর হ‌য়ে যায় তনয়াও তেমন হ‌য়ে গে‌ছে। চোখ থে‌কে কোন জল পড়‌ছে না। চো‌খে শুধু দেখা যা‌চ্ছে একরাশ আফসুস। এখন শুধু পা‌রে আয়া‌তের কা‌ছে মাফ চাই‌তে। খুব কষ্টে তা‌মিম‌কে বল‌লো

তনয়াঃ ভাইয়া আমাকে একটু আয়া‌তের কা‌ছে নি‌য়ে যা‌বে?

সবাই মি‌লে আয়াত‌দের বা‌ড়ি গে‌লো। আয়া‌তের মাকে দে‌খে তনয়া বল‌লো

তনয়াঃ মা আয়াত কোথায়?

আয়া‌তের মাঃ নি‌জের রু‌মে আছে। তো‌দের মা‌ঝে কি কিছু হ‌য়ে‌ছে? কাল অনেক রা‌তে আয়াত বাসায় ফির‌ছে। সেই থে‌কে রু‌মে ব‌সে আছে। কা‌রো সা‌থে ঠিকভা‌বে কথা বল‌ছে না। কাল থে‌কে এখন কিছু খায়‌নি। কি হ‌য়ে‌ছে তো‌দের মা‌ঝে?

তনয়া ম‌নে ম‌নে বল‌ছে তার মা‌নে আয়াত ডি‌ভো‌র্সের ব্যাপা‌রে কাউ‌কে কিছু ব‌লে‌নি।

তনয়াঃ আমি দেখ‌ছি মা।

তনয়া রু‌মে গি‌য়ে দে‌খে আয়াত বেলকু‌নি‌তে দাড়া‌নো। তনয়া দৌ‌ড়ে গি‌য়ে আয়াতের পা‌য়ের কাছে ব‌সে পরে পা দু‌টো জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে কান্না কর‌তে শুরু কর‌লো। তনয়ার এমন করায় আয়াত অনেকটা হতবাগ হ‌য়ে গে‌লো। তারাতা‌ড়ি তনয়া‌কে ধ‌রে দাড় করা‌লো। তারপর বল‌লো

আয়াতঃ কি কর‌ছো তনয়া! আমার পা‌য়ে হাত দি‌ছো কেন?

তনয়াঃ কারন আমি তোমার পা‌য়েরও যোগ্য নই। এতটা বছর একটা মিথ্যা কার‌নে আমি তোমা‌কে ঘৃনা ক‌রে এসে‌ছি। আজ স‌ত্যিটা জানলাম কিন্তু স‌ত্যিটা জান‌তে বড্ড দেরী ক‌রে ফেললাম। বড্ড দেরী। আমা‌কে মাফ ক‌রে দাও আয়াত। তু‌মি মাফ না করা পর্যন্ত আমি যে শা‌ন্তি পা‌বো না।

আয়াতঃ এখন মাফ চে‌য়ে কি লাভ তনয়া? সব তো শেষ! ইউ ডিসট্রয় এভ‌রিথিংক। এখন ফেরার কোন পথ নাই।

তনয়াঃ কেন নাই আয়াত! ব‌লো? আমরা আবার বি‌য়ে ক‌রে নি‌বো!

আয়াতঃ সেটা সম্ভব নয় তনয়া। তু‌মি জা‌নো ইসলা‌মের বিধা‌নে স্ত্রী‌কে তালাক দেয়ার পর তা‌কে আবার বি‌য়ে কর‌তে হ‌লে ঠিক কি কি নিয়ম মান‌তে হয়? সেটা কি তু‌মি মান‌তে পার‌বে?

তনয়াঃ তনয়া কোন কথা বল‌ছে না শুধু বল‌লো কেন আই হাগ ইউ?

আয়াতঃ নো! ইউ লস্ট দ্যা রাইট।

আর কোন কথা না ব‌লে তনয়া চুপ ক‌রে শুধু নীরব কান্না কর‌ছে।

আয়াতঃ আমি ছাড়া অন্য কা‌রো সা‌থে কবুল বল‌তে পার‌বে? অন্য কেউ তোমায় ষ্পর্শ কর‌বে তা মে‌নে নি‌তে পার‌বে? ব‌লো?

তনয়াঃ আমি কিছু জা‌নি না আয়াত। আমি শুধু জা‌নি আমি তো‌মা‌কে ছাড়া থাক‌তে পার‌বো না। আর এটাও জা‌নি তুমি ছাড়া অন্য কেউ আমাকে ষ্পর্শ করার আগে আমি নি‌জে‌কে শেষ ক‌রে দি‌বে‌া। আয়াত প্লিজ কিছু ক‌রো। আমি আর নি‌তে পার‌ছি না। আমার ম‌রে যে‌তে ইচ্ছা কর‌ছে।

আয়াতঃ আমার কিছু করার নাই তনয়া। নিজের ধ‌র্মের বিরু‌দ্ধে আমি কি ক‌রে যা‌বো? আল্লাহর কা‌ছে কি জবাব দি‌বো? ধর্ম যেমন সত্য ঠিক তেম‌নি তুমি ছাড়া আমার জীব‌নে আর কেউ কখ‌নো আস‌বে না। কিন্তু ডি‌ভোর্স পেপা‌রে সাইন ক‌রে তু‌মি সব শেষ ক‌রে দি‌ছো। ফেরার সব পথ বন্ধ তু‌মি নি‌জেই শেষ ক‌রে দি‌ছো।

মা‌টি‌তে লু‌টি‌য়ে কাঁদছে তনয়া। কাঁদ‌ছে আয়াতও।

আয়াতঃ তোমার ভুলটা য‌দি দুদিন আগে ভাঙ‌তো ত‌বে কিছু করার ছি‌লো। কিন্তু এখন সব শেষ তনয়া সব।

তা‌মিমঃ কিছুই শেষ হয়‌নি আয়াত!

তা‌মি‌মের কথায় তনয়া আয়াত অবাক দৃষ্টি‌তে তাকা‌লো।

আয়াতঃ কি বল‌ছেন ভাইয়া!

তা‌মিমঃ আয়াত কাল‌কে দুজন যে ডি‌ভোর্স পেপা‌রে সাইন ক‌রে‌ছি‌লে সেটা কি একবার প‌ড়ে দেখবা?

তনয়াঃ মা‌নে?

তা‌মিমঃ প‌ড়ে দেখনা কি লেখা তাতে !

আয়াত আলমা‌রি থে‌কে পেপারটা বের ক‌রে পড়া শুরু ক‌রে। পড়‌তে গি‌য়ে চোখ দু‌টো বড় বড় ক‌রে তা‌মি‌মের দি‌কে তাকায়। আর ব‌লে

আয়াতঃ এটা কি ভাইয়া। এটা‌তো ডি‌ভোর্স পেপার না। উপ‌রের কাগজটা নকল। আর প‌রের কাগজ গু‌লো তো——? তাহ‌লে?

তামিমঃ হ্যা ওটা ডিভোর্স পেপার না। তোরা দুজন গত কাল ডি‌ভোর্স‌ পেপারে না। আমার বানা‌নো এগ্রি‌মেন্ট পেপা‌রে সাইন ক‌রে‌ছিস। যেখা‌নে লেখা তুই আয়াত চাই‌লেও কেউ কাউ‌কে ছে‌ড়ে যে‌তে পার‌বি না। আর উপ‌রের একটা নকল ডি‌ভোর্স পেপা‌রের মত কাগজ দেয়া। আমি জানতাম তোরা দুজন মানু‌ষিক ভা‌বে অনেক ক‌ষ্টে থাক‌বি যার করে‌নে পেপার পড়া‌তো দূ‌রে থাক ঠিক ভা‌বে দেখ‌বিও না যে, কি‌সে সাইন কর‌ছিস।

তনয়ার চো‌খে মু‌খে আনন্দ ফু‌টে উঠ‌লো। চোখ মুছ‌তে বল‌লো

তনয়াঃ ভাইয়া তার মা‌নে আমা‌দের ডি‌ভোর্স হয়‌নি?

তা‌মিমঃ না‌রে পাগ‌লি। তিন মাস আগে যখন তুই বাসায় এসে তোদের ডি‌ভোর্স এর ব্যাপা‌রে সব খু‌লে বল‌লি তখন তোর কথায় সায় মিলা‌লেও প‌রে গি‌য়ে উকি‌লের কা‌ছে সব ব‌লে কাগজ বদ‌লে দি। কেউই চায় না একটা সংসার ভাঙুক। আর তুই তো আমার বোন। আর ভাই হ‌য়ে নিজের বো‌নের এত সুন্দর সংসার ভাঙ‌তে কি ক‌রে দে‌খি বল?

আয়াত তা‌মি‌মকে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে বল‌লো

আয়াতঃ স‌ত্যিই ভাইয়া আজ আপ‌নি বড় ভাই‌য়ের মত কাজ কর‌ছেন।

আয়াত তা‌মিম‌কে ছাড়‌তেই তনয়া ঝ‌ড়ের বে‌গে আয়াত‌কে শক্ত ক‌রে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে বল‌লো

তনয়াঃ এখন তোমা‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধরার অধিকার আমার আছে।

তা‌মিমঃ সব কাজ আমি করলাম আমা‌কে এক‌লিস্ট একটা ধন্যবাদ‌তো দি‌বি তনয়া?

তনয়াঃ ভাই তুই এখান থে‌কে য‌া‌বি? বোন বোনাই প্রেম কর‌ছে আর ও র্নিল‌জ্জের মত দা‌ড়ি‌য়ে দেখ‌ছে যা ভাগ!

তা‌মিমঃ তাই‌ তো ব‌লে উপ‌রের দাম নাই। হায়‌রে পৃ‌থিবী! আমি দরজা বন্ধ ক‌রে গেলাম। নয়‌তো আবার অন্য কেউ আস‌তে পা‌রে।

অ‌কেক্ষন পর——

আয়াতঃ তনয়া!

তনয়াঃ হুমম

আয়াতঃ অনেকক্ষন ধ‌রে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে আছে‌া! এবার‌ তো ছা‌ড়ো!

তনয়াঃ এত বছর পর তোমায় কা‌ছে পেলাম এত সহ‌জে ছাড়‌ছি না।

আয়াতঃ ঘন্টার বে‌শি সময় ধ‌রে তুমি জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে আছো। আমার পা ব্যাথা কর‌ছে?

তনয়াঃ করুক।

আয়াতঃ আর ভুল বুঝ‌বে না‌তো?

তনয়াঃ কখ‌নো না। আয়াত!

আয়াতঃ হুমমমম

তনয়াঃ আই লাভ ইউ!

আয়াতঃ আই লাভ ইউ মোর দ্যান ইউ।

তনয়াঃ আগে করতা এখন না।

আয়াতঃ রি‌য়ে‌লি! #বা‌লিকা_বধূ

তনয়াঃ ইয়েস!

একে অপর‌কে আ‌রো শক্ত ক‌রে জ‌ড়ি‌য়ে ধর‌লো। ম‌নে হয় একে অপ‌রের মা‌ঝে মি‌লে যা‌বে।

সমাপ্ত

ভুলত্রু‌টি ক্ষমার চো‌খে দেখ‌বেন

গল্পটা কেমন লাগ‌লো জানা‌বেন

বা‌লিকা বধূ ৪র্থ পর্বঃ

0

বা‌লিকা বধূ ৪র্থ পর্বঃ

#লেখাঃ_শার‌মিন_আক্তার_(#সাথী_____)

——–আয়াতঃ প্লিজ তনয়া ব‌লো কি হ‌য়ে‌ছে? প্লিজ—–?

তনয়াঃ আয়াত আজ পর্যন্ত আমাকে কেউ এত নোংড়া কথা ব‌লে‌নি। ঘৃনায় আমার ম‌রে যে‌তে ইচ্ছা কর‌ছে।

আয়াতঃ তনয়ার মাথায় হাত বুলা‌তে বুলা‌তে প্লিজ আগে শান্ত হও তারপর ব‌লো কে তোমায় নোংড়া কথা ব‌লে‌ছে? ব‌লো?

তনয়াঃ তখনও বাচ্চা‌দের মত কাঁদ‌তে কাঁদ‌তে বল‌লো বা‌ড়ি আসার সময় রাস্তার মো‌ড়ে কিছু ছে‌লে আমাকে দে‌খে খুব বা‌জে নোংড়া কথা বল‌ছে। আমার সা‌থে নোংড়া‌মি করার——- কিন্তু আমি কোন রকম সি এন জি তে উঠে চ‌লে আস‌ছি। আমি কখ‌নো এমন নোংড়া কথা শু‌নি‌নি।

তনয়ার কথা শু‌নে আয়া‌তের মাথায় রক্ত উঠে গে‌লো। তনয়া‌কে উঠি‌য়ে হাত ধ‌রে রাস্তার মো‌ড়ে নি‌য়ে গি‌য়ে বল‌লো কোন ছে‌লেটা।

তনয়া ক‌য়েকটা ছে‌লে‌কে দে‌খি‌য়ে বল‌লো ওরা। আয়াত কোন কথা না ব‌লে গি‌য়ে ছে‌লে গু‌লো‌কে মার‌তে শুরু কর‌লো। তনয়া দে‌খে হতবাগ হ‌য়ে গে‌লো। কারন ও চিন্তাও কর‌তে পা‌রে‌নি আয়াত এমন কর‌বে! তিন চারটা ছে‌লের সা‌থে আয়াত পে‌রে উঠ‌লো না। ওরাও আয়াত‌কে মার‌তে শুরু কর‌লো। কে যে‌নো পু‌লিশ‌কে খবর দি‌লো। পু‌লিশ এসে ব্যাপারটা থামা‌লো। স্থানীয় সবাই ছে‌লে গু‌লোর বিরু‌দ্ধে না‌লিশ কর‌লো। পু‌লিশ ছে‌লে গু‌লো‌কে ধ‌রে নি‌য়ে গে‌লো। আয়াত মোটামু‌টি আঘাত পে‌য়ে‌ছে তাই তনয়া ওকে হাসপাতা‌লে নি‌য়ে গে‌লো। পু‌রো রাস্তায় তনয়া আয়া‌তের সা‌থে একটাও কথা বল‌লো না। ডাক্তার আয়াত‌কে দে‌খে ভা‌লোভা‌বে ট্রিট‌মেন্ট ক‌রে ঔষধ দি‌য়ে দি‌লো। আয়া‌তের ডান হা‌তের অনেকটা কে‌টে গে‌ছে। পা‌য়েও বেশ ব্যাথা পে‌য়ে‌ছে। তনয়া আয়াত‌কে নি‌য়ে বা‌ড়ি ফির‌লো। আয়া‌তের কথা শু‌নে সবাই বেশ চি‌ন্তিত ছি‌লো। হাসপাতা‌লে যে‌তে চে‌য়ে‌ছি‌লো। কিন্তু তনয়া নি‌ষেধ করায় যায়‌নি। আয়াত‌কে নি‌য়ে ঘ‌রে ফির‌তেই সবাই বি‌ভিন্ন প্র‌শ্নের সমাহার খু‌লে বস‌লো। সবার প্র‌শ্নের উত্তর দি‌য়ে তনয়া আয়াত‌কে ধ‌রে রু‌মে নি‌য়ে আস‌লো। তখ‌নও তনয়া চুপ ক‌রে আছে। তাই আয়াত জি‌গেস কর‌লো

আয়াতঃ কি হ‌য়ে‌ছে তনয়া? সেই কখন থে‌কে চুপ ক‌রে আছিস? কিছু বল‌ছো না যে?

তনয়াঃ (রা‌গি চো‌খে তা‌কি‌য়ে) কি বল‌বো তোমা‌কে? বলার মত কিছু রাখ‌ছো?

আয়াতঃ মা‌নে?

তনয়াঃ কে ব‌লে‌ছে তোমায় ঐ ছে‌লে গ‌ু‌লোর সা‌থে মারামা‌রি কর‌তে? হি‌রোগি‌রি কর‌তে কে ব‌লে‌ছে? আমার সা‌থে একদম এসব ন্যাকা‌মো দেখাবা না বলে দিলাম।

আয়াতঃ ওরা তোমার সা‌থে নোংড়া‌মি কর‌তে চে‌য়ে‌ছি‌লো তনয়া। তাহ‌লে কি ওদের ছে‌ড়ে দি‌বো!

তনয়াঃ আমার সা‌থে নোংড়া‌মি কর‌লে তা‌তে তোমার কি? কি সমস্যা তোমার? তোমার সা‌থে তো কিছু ক‌রেনি?

আয়াতঃ তনয়া তু‌মি ভু‌লে যা‌চ্ছো তু‌মি আমার স্ত্রী।

তনয়াঃ আর তু‌মিও ভু‌লে যা‌চ্ছো আমা‌দের সম্প‌র্কের মেয়াদ আর তিন মাসও নাই। তারপর তোমার আমার পথ আলাদা। না থাকবে সম্পর্ক, না থাক‌বে অধিকার, আর না থাক‌বে কোন ভা‌লোবাসা। এফ‌রি‌থিংঙ্ক ইজ ফি‌নিস।

আয়াত আর কোন কথা বল‌লো না। তনয়ার কথা গু‌লো শু‌নে স্তব্ধ হ‌য়ে গে‌লো।
কিছুক্ষন পর অনু ওদের খাবার নি‌য়ে রু‌মে ডুক‌লো।

অনুঃ ভা‌বি তোমরা বরং এখা‌নে ব‌সেই খাও। আর খাবার পর ভাইয়ার ঔষধ ‌খে‌তে দিও।

তনয়াঃ ঠিক আছে।

অনু চ‌লে যাবার পর

তনয়াঃ খে‌য়ে নাও। আয়াত কোন কথা না ব‌লে খাবার প্লেটটা তুল‌লো। কিন্তু ডান হাতটা অনেকটা কে‌টে যাওয়ায় খে‌তে পার‌ছে না। তনয়া প্লেটটা আয়া‌তের হাত থে‌কে নি‌য়ে নি‌জে আয়াত‌কে খাই‌য়ে দি‌চ্ছিলো। আয়াত কোন কথা না ব‌লে বাধ্য বাচ্চা‌দের মত চুপচাপ ‌খে‌য়ে নি‌লো। তনয়া আয়া‌তে‌কে ঔষধ খাই‌য়ে দি‌য়ে নি‌জে অন্য রু‌মে ঘুমা‌নোর জন্য চ‌লে যায়। আয়াত ভেজা চো‌খে ওর দি‌কে তা‌কি‌য়ে থা‌কে। রাতে তনয়ার কেন যে‌নো ঘুম আস‌ছি‌লো না। কেন যে‌নো মনটা খুব অস্থির লাগ‌ছে। তাই রুম থে‌কে বে‌রি‌য়ে হাটাহা‌টি করার জন্য যা‌চ্ছি‌লো। কা‌রো গোঙা‌নোর শ‌ব্দে থম‌কে দাড়া‌লো। শব্দটা আয়াতের রুম থে‌কে আস‌ছে। তনয়া আস্তে গি‌য়ে দড়জাট‌া খুল‌লো। দেখ‌লো আয়াত বিছানায় শু‌য়ে ছটফট কর‌ছে আর কি যে‌নো বিড়‌বির কর‌েছে। তনয়া গি‌য়ে আয়া‌তের মাথায় হাত রে‌খে চমকে উঠ‌লো। কারন গা‌য়ে প্রচন্ড জ্বর। হয়‌তো ব্যাথায় আর ঔষ‌ধের সাইড এ্যা‌ফেক্ট এর কার‌নে গা‌য়ে জ্বর আস‌ছে। তনয়া ত‌রিঘ‌রি ক‌রে বাল‌তি ভ‌রে পা‌নি এনে আয়া‌তের মাথায় দিলো। কপা‌লে জলপ‌ট্টি দি‌লো। হাত পা মা‌লিশ ক‌রে দিলো। আয়া‌তের গা টা মু‌ছে দেয়া দরকার। কিন্তু আয়া‌তের শার্ট খুল‌তে তনয়ার খ‌ুব লজ্জা লাগ‌ছে। কিন্তু তবুও কি করার? আয়া‌তের শার্ট খু‌লে যখন মুছ‌তে নি‌লো তখন আয়া‌তের বু‌কের বাম পাশটা দে‌খে চম‌কে উঠ‌লো। সেখা‌নে কেঁ‌টে তনয়ার নাম লেখা । তনয়া আয়া‌তের বুকের বাম পা‌শের লেখাটা নি‌জের হাত দিয়ে আল‌তো ক‌রে স্পর্শ কর‌লো। কোন এক অজানা কার‌নে তনয়ার বু‌কের বাম পাশটায় প্রচন্ড ব্যাথা শুরু হ‌লো। তনয়া ম‌নে ম‌নে ভাব‌ছে

তনয়াঃ স‌ত্যিই কি আয়াত আমায় এত ভা‌লোবা‌সে? হ্যা আমি জা‌নি আয়াত আমায় পাগ‌লের মত ভা‌লোবা‌সে আর সারাজীবন ভা‌লোবা‌সবে। ওর ভা‌লোবাসার প্রনয় আমি প্র‌ত্যেক মুহূ‌র্তে অনুভব কর‌তে পা‌রি। কারন আমিও তে‌া ওকে—–! কিন্তু যখনই ওর করা কাজটার কথা ভা‌বি তখনই ওর প্র‌তি মনটা ঘৃনায় বি‌ষি‌য়ে ওঠে। ‌কেন আয়াত সেদিন ওমন কাজটা করলা? য‌দি না কর‌তে তাহ‌লে আজ আমা‌দের মা‌ঝে এতটা দূরত্ব আর ঘৃনা থাকতো না। থাক‌তো শুধু ভা‌লোবাসার মাদকতা। কিন্তু তু‌মিই নি‌জেই সব উল্টে দি‌লে। আয়া‌তকে ধ‌রে ব‌সি‌য়ে ওর গা টা মু‌ছে দি‌লো। আয়াত‌কে যখন বসা‌লো তখন আয়াত জ্ব‌রের ঘো‌রেই তনয়া‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধর‌লো। আয়া‌তের স্প‌র্শের উষ্ম পরশ পে‌য়ে তনয়া কিছুক্ষন ভু‌লে গে‌ছি‌লো আয়াতের প্র‌তি ওর তিক্ততা। শক্ত ক‌রে জ‌ড়ি‌য়ে ধরে‌ছি‌লো আয়াত‌কে। জ‌্বরের ঘো‌রে আয়াত বির‌বির ক‌রে প্রলাপ কর‌তে ছি‌লো তনয়া স‌ত্যিই আমি কোন অন্যায় ক‌রি‌নি। খুব ভা‌লোবা‌সি তোমায়। প্লিজ তনয়া আমায় ভুল বু‌ঝো না। আয়াতের কথা শু‌নে তনয়া আরো শক্ত ক‌রে আয়াত‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধর‌লো ।অনেকক্ষন এভা‌বে জ‌ড়ি‌য়ে ধরার পর তনয়া আয়াত‌কে শু‌ইয়ে দি‌লো। আয়াত জ্ব‌রের ঘো‌রে বারবার নি‌জের মাথা চে‌পে ধর‌ছি‌লো। তনয়া বুঝ‌তে পার‌লো ওর খুব মাথা ব্যাথা কর‌ছে তাই কিছুক্ষন আয়া‌তের মাথাটা টি‌পে দি‌লো। আয়া‌তের মাথায় হাত বুলা‌তে বুলা‌তে তনয়া আয়া‌তের বু‌কেই ঘু‌মি‌য়ে পর‌লো।

খুব সকা‌লে আয়া‌তের ঘুম ভাঙ‌লো। মাথাটা এখ‌নো বেশ ভারী হ‌য়ে র‌য়ে‌ছে। কিন্তু বু‌কের উপর কা‌রো চাপ অনুভব ক‌রে বু‌কের দি‌কে তাকা‌তেই ভুত দেখার মত চম‌কে ওঠে। কারন তনয়া‌কে এভা‌বে নি‌জের বু‌কে ঘু‌মিয়ে থাক‌তে আয়াত কেবল তার স্ব‌প্নে দেখ‌ছে। কিন্তু স্বপ্নটা‌ স‌ত্যি হবার আশাটা‌তো ছে‌ড়েই দি‌য়ে‌ছি‌লো আয়াত। তনয়ার নিঃশ্বা‌সের গরম ভাবটা আয়া‌তের বু‌কে লাগ‌ছে । আয়া‌তের মনটা মুহূ‌র্তেই চনম‌নে হ‌য়ে গে‌লো। খুব পা‌নির তৃষ্না পে‌য়ে‌ছে কিন্তু ভাব‌লো নড়বো না নড়‌লেই তনয়া জে‌গে যা‌বে। নি‌চের দি‌কে তাক‌া‌তে দে‌খে ফ্লো‌রে পা‌নি ভ‌র্তি বাল‌তি, পা‌‌শের টেবি‌লে বা‌টি‌তে জলপ‌ট্টির পা‌নি। ওর শার্টটাও পা‌শেই রাখা। আয়া‌তের বুঝ‌তে বা‌কি রই‌লো না কাল রা‌তে ওর জ্বর আস‌ছি‌লো আর তনয়া সারারাত ওর সেবা ক‌রে ক্লান্ত হ‌য়ে ওর বু‌কে ঘু‌মি‌য়ে প‌রে‌ছে। আয়াত চুপচাপ তনয়ার মাথায় হাত বু‌লি‌য়ে দি‌চ্ছে।

তনয়া একটু ন‌ড়েচ‌ড়ে ওঠ‌তেই আয়াত ঘ‌ুমের ভান ধ‌রে প‌রে রই‌লো। তনয়া ওঠে নি‌জে‌কে আয়া‌তের বু‌কে পে‌য়ে খুব বিব্রত বোধ কর‌লো। তারপর আয়া‌তের মাথায় হাত দি‌য়ে দেখ‌লো জ্বরটা এখ‌নো ক‌মে‌নি। আরেকবার শরীরটা মু‌ছি‌য়ে দি‌তে হ‌বে। ওর ঘুম ভাঙার আগে মুছে দেই নয়‌তো কিনা কি ভা‌বে? তনয়া তারাতা‌ড়ি পা‌নি এনে আয়া‌তে‌কে ধ‌রে কোন রকম বসা‌লো। তারপর শরীরটা ধী‌রে মু‌ছে দি‌তে লাগ‌লো। আয়াত চোখ বন্ধ ক‌রে র‌য়ে‌ছে । তনয়ারক বুঝ‌তে দি‌চ্ছে না যে ও জে‌গে আছে। কিন্তু তনয়ার চ‌ু‌লের ঘ্রা‌নে পাগল করার মাতালতা ছি‌লো। ‌নি‌জে‌কে তনয়ার থে‌কে দূ‌রে রাখাটা ক‌ঠিন থে‌কে ক‌ঠিনতম হ‌য়ে দাড়া‌লো। নি‌জে‌কে কিছু‌তেই আটকা‌তে না পে‌রে তনয়ার ঘা‌ড়ে নি‌জের ঠোঁট ডু‌বি‌য়ে দি‌লো। তনয়ার পু‌রো শরীর কেঁ‌পে উঠ‌লো। কিছুক্ষন স্তব্ধ হ‌য়ে রই‌লো। প‌রোক্ষ‌নেই আয়াত‌কে ধাক্কা দি‌য়ে নি‌জের থে‌কে দূ‌রে স‌রি‌য়ে বললো—-

তনয়াঃ তোমার মত নোংড়া মানু‌ষের কাছ থে‌কে নোংড়া‌মি ছাড়া আর কিই বা আশা করা যায়! আমার জন্য তোমার এই অবস্থা হ‌য়ে‌ছে ভে‌বে তোমাকে সুস্থ করার চেষ্টা কর‌ছিলাম। কিন্তু তু‌মি তো——–? ছিঃ—– তনয়া রাগ ক‌রে চ‌লে গে‌লো।

আয়াত চুপ ক‌রে রই‌লো। কারন ভুলটা ওরই ছি‌লো। নিজের প্র‌তি নি‌জের খুব রাগ হ‌চ্ছি‌লো। কেন নি‌জে‌কে আটকা‌তে পার‌লো না। কিছুক্ষন পর তনয়া যখন ওকে খাওয়া‌তে আস‌লো তখন আয়াত বললো——

আয়াতঃ তনয়া প্লিজ মাফ ক‌রে দাও। প্লিজ—–
আ‌মি নিজেই জা‌নি না কেন এমনটা করলাম? আসলে তোমার প্র‌তি ভা‌লোবাসাটা দিন দিন শুধু বাড়‌ছে। যার কার‌নে তোমার থে‌কে নি‌জে‌কে দূ‌রে রাখ‌তে খুব কষ্ট হয়। স্য‌রি তনয়া। প্লিজ—–

তনয়াঃ ইট’স ওকে।

তনয়ার সেবায় আয়াত খুব শিগ্রই সুস্থ হ‌য়ে ওঠে। কিছু‌দিন পর বা‌ড়িতে বি‌য়ের শানাই বা‌জে। অনুর বি‌য়েও হ‌য়ে যায়। কিন্তু ওদের সম্পর্ক ঠিক হয় না।

আজ জজ এর দেয়া ছয় মাস সময় পূর্ন হ‌লো। আজ ওদের ডি‌ভোর্স। তনয়ার ঘ‌রের কেউ জা‌নেনা আজ ওদের ডি‌ভোর্স। কারন তনয়া কাউ‌কে জানায়‌নি। আয়াত অঝো‌রে কাঁদ‌ছে কারন ওর ভা‌লোবাসা আজ তনয়ার ঘৃনার কা‌ছে হে‌রে গে‌লো। ও তনয়া‌কে ব‌লে‌ছি‌লো ছয় মাসের ম‌ধ্যে তনয়ার ম‌নে নি‌জের প্র‌তি ভা‌লোবাসা তৈরী কর‌বে কিন্তু তনয়া প‌রিষ্কার ক‌রে ব‌লে দি‌য়ে‌ছে তনয়া আয়াত‌কে শুধু ঘৃনা ক‌রে। তাই নি‌জের ভা‌লোবাসার কা‌ছে হে‌রে বাধ্য হয়ে ডিভোর্স পেপা‌রে সাইন ক‌রে দি‌লো। আয়াত বিষন্ন ম‌নে হে‌ঁটে যা‌চ্ছে অজানার প‌থে। তনয়া নিজের সব কিছু নি‌য়ে নি‌জের মা‌য়ের বাসায় গে‌লো। মা এত বড় সুট‌কেস দে‌খে বল‌লো

মাঃ কি রে অনেক দিন থাক‌বি না‌কি এবার!

তনয়াঃ নাহ!

মাঃ তাহ‌লে এত বড় সুট‌কেস?

তনয়াঃ এখন থে‌কে এখা‌নেই থাক‌বো।

মাঃ মা‌নে?

তনয়াঃ আজ আমার আর আয়াতের ডি‌ভোর্স ক‌ম‌প্লিট হ‌য়ে‌ছে। আজ থে‌কে আমরা দুই তী‌রের বা‌সিন্দা। আজ থে‌কে আমি আয়া‌তের সা‌থে জড়ানো সব সম্পর্ক থে‌কে মুক্ত।

চল‌বে———

ভুলত্রু‌টি ক্ষমার চো‌খে দেখ‌বেন

বা‌লিকা বধূ ৩য় পর্ব

0

বা‌লিকা বধূ ৩য় পর্ব

#লেখ‌াঃ_শার‌মিন_আক্তার_(#সাথী____)

———তনয়ার ঘুমোন্ত মুখটার দি‌কে তা‌কি‌য়ে দেখ‌তে দেখ‌তে ওখা‌নেই ঘু‌মি‌য়ে প‌ড়ে। সকাল বেলা যখন তনয়ার ঘুম ভা‌ঙলে দে‌খে আয়াত ওর পা‌শে আধ শোয়া অবস্থায় ঘু‌মি‌য়ে আছে।

তনয়া ভাব‌ছে কি নিঃষ্পাপ মুখ! চো‌খে সারা রা‌জ্যের মায়া ভরা। কিন্তু তোমার মনটা কি তোমার মু‌খের মত এত সুন্দর। সে‌দিন য‌দি তু‌মি অমন না কর‌তে তাহ‌লে হয়‌তো আজ আমা‌দের সম্পর্কটা এমন হ‌তো না। বিশ্বাস ক‌রো আয়াত সে‌দিন সকা‌লে তোমার কাছ থে‌কে আসার পর বারবার ভাব‌তে ছিলাম কেন তোমায় তখন ব‌লি‌নি যে,
হ্যা আয়াত আমি তোমার সা‌থে সারা জীবন থাক‌তে চাই। তোমার সা‌থে স্বপ্ন সাজা‌তে চাই। আমা‌দের কি‌শো‌রের স্বপ্ন গু‌লো‌কে একটু একটু ক‌রে বড় ক‌রে গড়তে চাই স্ব‌প্নের আশিয়ানা।
পাগ‌লের মত সে‌দিন থে‌কে শুক্রবা‌রের অপেক্ষা কর‌তে ছিলাম। কিন্তু শুক্রবারটা ঠিকই আস‌লো কিন্তু আমা‌দের সম্প‌র্কের কাল হ‌য়ে। মাতাল হ‌য়ে তোমার কা‌ছে যাবার প্রসু‌স্তি নি‌চ্ছিলাম। কিন্তু তু‌মি শুক্রবারটা‌কে আমার জীব‌নের সব‌চে‌য়ে বিষাদময় দি‌নে রূপান্তরীত কর‌লে।

আয়া‌তের ডা‌কে ‌ঘোর কাট‌লো তনয়ার। রা‌গি চো‌খে আয়া‌তের দি‌কে তা‌কি‌য়ে বল‌লো—-

তনয়াঃ তু‌মি এ রু‌মে কেন আস‌ছো? ঘু‌মের মা‌ঝে আমার সা‌থে নোংড়া‌মি কর‌তে? লজ্জা ক‌রে না তোমার বারবার অপমান করার পরও আমার কা‌ছে আস‌তে? কেন মু‌ক্তি দি‌চ্ছো না তুমি আমায়। বে‌রি‌য়ে যাও আমার রুম থে‌কে। র্নিলজ্জ, বেহায়া , ইতোর, নোংড়া লোক কোথাকার!

তনয়ার কথা শু‌নে আয়াত প্রচন্ড কষ্ট পে‌লো। সা‌থে প্রচুর রাগও উঠলো। তাই তনয়া‌কে নি‌জের সা‌থে চে‌পে ধ‌রে বল‌লো

আয়াতঃ হ্যা আমি র্নিলজ্জ বেহায়া, কিন্তু কেন জা‌নো?তোমার জন্য! আর কি বল‌লে ঘু‌মের মা‌ঝে নোংড়া‌মি কর‌তে আস‌ছি? ভু‌লে যেও না আমি তোমার স্বামী আর তোমার উপর জোড় খাটা‌নোর অধিকার আমার আছে! আর শোন তোমার এই অহংকার ভাঙ‌তে আমার বে‌শি সময় লাগ‌বে না! আর আমি নোংড়া লোক ভু‌লে যে‌ও না আমাদের বি‌য়ের দশ বছর বে‌শি সময় হ‌য়ে গে‌ছে। অনেক আগেই তু‌মি আমি প্রাপ্ত বয়ষ্ক হ‌য়ে‌ছি। দশ বছ‌রে প্রথমবার গত কাল রা‌তে তোমা‌কে জাস্ট একটা কিস ক‌রে‌ছি। তাও তোমার জে‌দের কার‌নে। আমি য‌দি নোংড়া লোক হতাম তাহ‌লে এত‌দিনে তোমার নি‌জের ব‌লে কিছু থাক‌তো না। কিন্তু আমি তোমার উপর জোড় খাটা‌তে চাই না। আমি তোমার ম‌নের ঘৃনার প্র‌লেপটা স‌রি‌য়ে ভা‌লোবাসা ফুল ফোটাতে চাই। কিন্তু আফসুস তু‌মি তো নি‌জেই ঘৃনার সাগ‌রে ডু‌বে যে‌তে চাও। যা ইচ্ছা ক‌রো তু‌মি। কিন্তু ম‌নে রে‌খো তনয়া যখন তোমার ভুলটা ভাঙ‌বে হয়‌তো তখন অনেক বে‌শি দেরী হ‌য়ে যা‌বে। আর তোমার করার মত কিছু থাক‌বে না।

তনয়াঃ ভুল কি‌সের ভুল? য‌দিও ভুল হয়ও ত‌বে তার দায় আমি নিজে নি‌বো। আমাকে নি‌য়ে তোমার ভাব‌তে হ‌বে না। তু‌মি শুধু ডি‌র্ভোস পেপা‌রে সাইন ক‌রে দাও।

আয়াতঃ হুমমম । সাইন! দেখা যাক! এখ‌নো তিন মাস আছে তনয়া। ম‌নে রে‌খো।

তনয়া নিজে‌কে ছা‌ড়ি‌য়ে র‌ুম থেকে বে‌রি‌য়ে গে‌লো। আয়াত তনয়ার যাবার পা‌নে কতক্ষন তাকি‌য়ে রইল।
তনয়া ‌ফ্রেস হ‌য়ে গি‌য়ে আয়া‌তের মা‌য়ের সা‌থে নাস্তা বানা‌তে লাগ‌লো। এ বা‌ড়ি‌তে তনয়া সবার সা‌থে মি‌শে থা‌কে। সবাই‌কে ভা‌লোবা‌সে শুধু আয়াত‌কে ছাড়া। ওদের ভিত‌রের কথা আয়া‌তের বাবা মা তেমন না জান‌লেও আয়া‌তের বোন অনু মোটামু‌টি জা‌নে। অনু সবসময় চেষ্টা ক‌রে আয়াত আর অনুর সম্পর্ক যা‌তে সুন্দর হয়। কিন্তু যতবারই চেষ্টা ক‌রে‌ছে ততবারই তনয়ার জে‌দের কা‌ছে ব্যার্থ হ‌য়ে‌ছে। কিছু‌দিন পর অনুর বি‌য়ে। সবাই মোটামু‌টি বি‌য়ের তোর‌জোড় শুরু ক‌রে দি‌য়ে‌ছে। অনু সবসময় চায় ওর বি‌য়ের আগে যা‌তে আয়াত আর তনয়ার সম্পর্কটা ঠিক কর‌তে পা‌রে। কারন নি‌জের ভাই‌য়ের এমন কষ্ট কোন বোনই দেখ‌তে পার‌বে না।

আয়াত তনয়ার জন্য কোন জি‌নিস কিন‌লে সেটা অনুর মাধ্য‌মে দেয়। কারন জা‌নে আয়াত দি‌য়ে‌ছে জান‌লে তনয়া তা কখ‌নো নি‌বে না।

প‌রের দিন বিকা‌লে তনয়া ওর মা‌য়ের কা‌ছে গে‌লো। তনয়ার বাবা নাই। তনয়ার বড় ভাই আছে। সে আর তনয়ার মা আর ভাই‌য়ের বউ একসা‌থে থা‌কে। তনয়া তনয়ার মা‌য়ের উপর ভিষন রা‌গের কার‌নে তার সা‌থে তেমন কথা ব‌লে না। তনয়াকে দে‌খে তনয়ার মা বল‌লো

মাঃ কেমন আছিস মন‌া?

তনয়াঃ তু‌মি যেমন দেখ‌তে চে‌য়ে‌ছি‌লে তার থে‌কে ভা‌লো।

তনয়ার ভা‌বিঃ তনয়া তু‌মি মা‌য়ের সা‌থে সবসময় এভা‌বে ব্যবহার ক‌রো কেন?

তনয়াঃ ভা‌বি এই ম‌হিলার কার‌নে আজ আমার এই অবস্থা। আমি ওনা‌কে কখ‌নো ক্ষমা কর‌তে পার‌বো না।

তনয়ার ভা‌বিঃ জাস্ট সেটাপ তনয়া। দিন দিন তু‌মি খ‌ুব বেয়াদপ হ‌য়ে যা‌চ্ছো। ভু‌লে যা‌চ্ছো ওনি আমা‌দের মা!

তনয়াঃ না ভা‌বি ভু‌লি‌নি ওনি আমার মা। যে কি না আমার সা‌থে ধোকা ক‌রে‌ছে। ওনি য‌দি সে‌দিন আমার সা‌থে ঐ কাজটা না কর‌তো তাহ‌লে আজ আমা‌কে আয়া‌তের সা‌থে থাক‌তে হ‌তো না। ওর সা‌থে ডি‌ভোর্স এর জন্য ঘু‌রে বেড়া‌তে হ‌তো না। যতটা দোষী আয়াত ততটাই ওনি দোষী।

তনয়ার কথা শু‌নে তনয়ার মা নিঃশব্দে কাঁদ‌ছেন। মে‌য়ের সু‌খের জন্য সে‌দিন তি‌নি মিথ্যার আশ্রয় নি‌য়ে‌ছি‌লেন। কিন্তু সেই থে‌কে তনয়া তার সা‌থে এমন ব্যবহার কর‌ছেন যে‌নো তি‌নি অনেক বড় পাপ ক‌রে ফে‌লে‌ছেন। তি‌নি বল‌লেন—–

মাঃ তনয়া আজ তুই আমা‌কে যতটা কথা শোনা‌চ্ছিস এক‌দিন এর জন্য ঠিক ততটাই আফসুস কর‌বি। সব থে‌কে বে‌শি কি‌সের জন্য আফসুস কর‌বি জা‌নিস? তুই আয়া‌তের সা‌থে ঠিক যে যে ব্যবহার গুলো ক‌রে‌ছিস তার কথা ভে‌বে তুই এত অনুতাপ কর‌বি যে সারাজীবন কেঁ‌দেও কুল পা‌বি না।

তনয়াঃ সেটা দেখা যা‌বে। আমি তোমার ফালতু কথা শুন‌তে আসি‌নি। ভা‌বি ভাইয়া কোথায়? তার সা‌থে কিছু কথা ছি‌লো।

তনয়ার ভা‌বিঃ বাই‌রে গে‌ছে। কিছুক্ষন পর চ‌লে আস‌বে। তু‌মি একটু ব‌সো।

তনয়া গি‌য়ে ছা‌দে বস‌লো। খুব কান্না কর‌তে ইচ্ছা কর‌ছে। নি‌জের মা‌য়ের সা‌থে এত খারাপ ব্যবহার কর‌তে কোন মে‌য়েরই বা ভা‌লো লা‌গে। কিন্তু মা যা ক‌রে‌ছে সেটাও তো খুব অন্যায়। তাই না? তনয়া ভাব‌ছে—–

তনয়াঃ মা কিভা‌বে আয়াত‌কে এত ভরশা কর‌তে পা‌রে? যে অন্যায় আয়াত ক‌রে‌ছে তা‌তে ও ক্ষমা পাবারও যোগ্য না। কিন্তু মা কত সহ‌জে সেটা ভু‌লে ওকে মাফ ক‌রে দি‌লো। আর আমা‌কে মিথ্যা বলে ম্যা‌রেজ রে‌জি‌ট্রি পেপা‌রে সাইন ক‌রি‌য়ে নিলো। হ্যা আমার আর আয়া‌তের ছে‌লে‌বেলার বি‌য়ের কোন মূল্য ছি‌লো না আইনে দৃ‌ষ্টি‌তে। কিন্তু আট মাস আগে মা আমা‌কে অন্য পেপা‌রে সাইন করা‌তে গি‌য়ে ম্যা‌রেজ সা‌র্টি‌ফি‌কে‌টে সাইন ক‌রি‌য়ে আমা‌দের বি‌য়েটা‌কে আইনের দৃ‌ষ্টি‌তে লিগাল ক‌রে দিলো। নয়‌তো এখন ডি‌ভো‌র্সের জন্য আমা‌কে আয়া‌তের সা‌থে থাকতে হ‌তো না। বু‌ঝি না সবাই আয়া‌তের কি দে‌খে ওকে এত বিশ্বাস ক‌রে? এত ভা‌লোবা‌সে? নিশ্চই ছে‌লেটা সবাই‌কে হিপ‌নোটাইস ক‌রে‌ছে। যেমনটা আমারও মা‌ঝে মা‌ঝে ম‌নে হয় আয়াত খারাপ নয়। কিন্তু যেটা আমি নিজ চো‌খে দে‌খে‌ছি তা আমি কি ক‌রে ভু‌লি? সেটা‌কে কি ক‌রে ইগ‌নোর ক‌রি? নাহ আমি ওর মায়ায় নিজে‌কে জরা‌বো না। কখ‌নো না।

তনয়া ভা‌বিঃ সেটা কি পার‌বি তনয়া?

ভা‌বির কথায় চম‌কে উঠে তনয়া।

তনয়াঃ বুঝলাম না ভা‌বি!

তনয়ার ভা‌বিঃ যখনই কা‌রো মায়া থে‌কে বের হ‌য়ে আস‌তে চাই‌বি তখনই তার মায়ায় বে‌শি ক‌রে জ‌ড়ি‌য়ে যা‌বি।

তনয়াঃ কখ‌নো না।

তনয়া ভা‌বিঃ আচ্ছা! চোখ বন্ধ কর! বু‌কে হাত দে আর আয়া‌তের কথা ভাব ঠিক কি দেখ‌তে পার‌ছিস?

তনয়াঃ ভা‌বি লাইফ ইজ নট মু‌ভি

তনয়ার ভা‌বিঃ যেটা বললাম সেটা কর না!

তনয়া চোখ বন্ধ কর‌লো! বু‌কে হাত রে‌খে আয়া‌তের কথা ভাব‌তে শুরু কর‌লো। চো‌খের সাম‌নে‌ ভে‌শে উঠ‌ছে আয়া‌তের সা‌থে কাটা‌নো হাজা‌রো সুখময় স্মৃ‌তি। ছোট বেলা থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত প্র‌ত্যেকটা সময় আয়া‌তের সা‌থে কাটা‌নো সুন্দর মুহূর্তগু‌লো ভাশ‌ছে। তনয়া ‌চোখ বন্ধ ক‌রে ভাব‌ছে কৈই কোথাও‌ তো আয়াতের কোন খারাপ রূপ দেখ‌তে পার‌ছি না। সব ক্ষে‌ত্রে সব সাজা‌নো গুছা‌নো স্বপ্নে আর আয়া‌তের ভা‌লোবাসায় ঘেরা। তনয়া নি‌জে নি‌জে মিট মিট হাস‌ছে। ফি‌রে যে‌তে চাই‌ছে সেই শৈশ‌বে। যেখা‌নে আছে ওর আর আয়া‌তের জীব‌নের সব চে‌য়ে সুন্দর মুহূর্ত। হঠাৎ কিছু কা‌লো আঁধারের ঝাপটায় ধ্যান ভা‌ঙে তনয়ার। চম‌কে উঠে তনয়া। চোখ থে‌কে ঝড়তে থা‌কে অশ্রু কণা। তনয়া কিছু না ব‌লে ছাদ থে‌কে নে‌মে গে‌লো।

তনয়ার ভা‌বিঃ তুই উপ‌রে উপ‌রে যতই আয়াত‌কে ঘৃনা ক‌রিস না কেন তনয়া। ম‌নে ম‌নে তোর থে‌কে বেশি ভা‌লো আয়াত‌কে কেউ বা‌সে না। সমস্যা হ‌চ্ছে তো‌দের মা‌ঝে ভুল বোঝাবু‌ঝির একটা দেয়াল তৈরী হ‌য়ে‌ছে। সেটা ভে‌ঙে গে‌লে তো‌দের মত সু‌খী দম্প‌ত্তি আর কেউ হ‌বে না।

তনয়া ওর ভাই‌য়ের সা‌থে সব কাজ শেষ ক‌রে। বাসায় গে‌লো। বাসা পুরো খা‌লি। কেউ নেই। ম‌নে হয় সবাই অনুর বি‌য়ের শ‌পিং এ গে‌ছে। রাস্তায় ঘটা কিছু ঘটনায় তনয়ার ‌ভিষন কান্না পা‌চ্ছে। ভে‌বে‌ছি‌লো ঘ‌রে এসে অনু‌কে জ‌ড়ি‌য়ে খুব কান্না ক‌রে মনটা হালকা করবে। কিন্তু বাসায় কা‌জের খালা বা‌দে কেউ নেই। নি‌জের রু‌মে গি‌য়ে কান্নায় ভে‌ঙে প‌রে তনয়া। আয়াত তখন ওয়াশরু‌মে ছি‌লো। বের হ‌য়ে দে‌খে তনয়া নিচে ব‌সে কান্না কর‌ছে।

আয়াত তারাতা‌রি তনয়ার কা‌ছে গি‌য়ে জি‌গেস কর‌লো

আয়াতঃ কি হ‌য়ে‌ছে তনয়া?

তনয়া কান্নায় এতটা বি‌ভোর ছি‌লো যে সাম‌নে আয়াত সেটা না ভে‌বেই আয়াত‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে হাউমাউ ক‌রে কেঁ‌দে দি‌লো। এই প্রথমবার তনয়া নিজ থে‌কে আয়াত‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধর‌লো। আয়াত তনয়াকে শক্ত ক‌রে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে বার বার ‌জি‌গেস কর‌ছে

আয়াতঃ কি হ‌য়ে‌ছে তনয়া? ব‌লো? প্লিজ!

চলবে———

ভুলত্রু‌টি ক্ষমার চো‌খে দেখ‌বেন।

বা‌লিকা বধূ ২য় পর্বঃ

0

বা‌লিকা বধূ ২য় পর্বঃ

লেখাঃ_শার‌মিন_আক্তার_(#সাথী_____)

———তনয়া ঘুমা‌চ্ছে আর আয়াত তা‌কি‌য়ে আছে তনয়ার মায়া‌বি মুখটার দি‌কে। ভাব‌ছে নি‌জেদের অতী‌তের কথা। কত সুন্দর দিন ছি‌লো সেগু‌লো।

আয়াত ম‌নে ম‌নে বল‌ছে আচ্ছা তনয়া তোর কি ম‌নে আছে আমা‌দের ছোট‌বেলার সেই দুষ্ট‌মির কথা? ম‌নে আছে কাজীদের বাগা‌নের পেয়ারা চ‌ু‌রির কথা! সে‌দিন তু‌মি আমি ধরা পর‌তে পর‌তে বেঁ‌চে গে‌ছিলাম। তোর কি ম‌নে আছে যে‌দিন তুই পা‌শের বাসার কা‌কির রো‌দে শুকা‌তে দেয়া আচার চুরি ক‌রে খে‌য়ে‌ ছি‌লি! কিন্তু দোষটা আমার ঘা‌রে প‌রে‌ছি‌লো। বাবা আমায় সে‌দিন মেরে‌ছিলো ব‌লে তুই আমায় জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে খুব কেঁ‌দে‌ছি‌লি। আজও তুই কাঁ‌দিস কিন্তু তনকার চো‌ঁখের জ‌লে ছি‌লো আমার জন্য ভা‌লোবাস‌া আর এখনকার চো‌খের জলে আমি ভা‌লোবাসা না শুধু ঘৃনা দে‌খি।

‌তোর ম‌নে আছে আমা‌দের বি‌য়ের কথা? তখন তুই পঞ্চম শ্রেনী‌তে প‌ড়িস আর আমি সপ্তম! তখন তো আমরা বুঝতামি না বি‌য়ে কি? শুধু জানতাম বি‌য়ে মা‌নে খুব মজা। হুমমম তাও দা‌দি ভুলভাল বু‌ঝে‌‌ছি‌লো ব‌লে। বাবা আর তোর বাবা খুব ভা‌লো বন্ধু থাকায় তারা তা‌দের বন্ধুত্বের নতুন নাম দি‌তে চে‌য়ে‌ছি‌লো। আমাদের বি‌য়ে দি‌য়ে। আমার বাবা অবশ্য চে‌য়ে‌ছি‌লো আমরা বড় হবার পর বি‌য়ে দি‌বে। কিন্তু তোর বাবা বল‌লো ছে‌লে মে‌য়ে বড় হ‌য়ে য‌দি অন্য দি‌কে মন দেয়। তার থে‌কে বরং এখন কাজী ডে‌কে কবুল ব‌লি‌য়ে কা‌বিন ক‌রে রে‌খে দি। ব‌ড়ো হ‌লে ধুমধাম ক‌রে রে‌জি‌ট্রি ক‌রে বি‌য়ে দি‌বো

যখন তুই আর আমি শুনলাম আমা‌দের বি‌য়ে হ‌বে তখন নি‌জে‌দের অজা‌ন্তেই দুজন লজ্জা পে‌য়ে‌ছিলাম। ছু‌টে দা‌দির কা‌ছে গি‌য়েছিলাম এটা জানার জন্য যে বি‌য়ে হ‌লে কি হয়? হা হা হা । দা‌দি যা ব‌লেছি‌লো বি‌য়ে মা‌নে কিন্তু তার উল্টাটা। হা হা। কি ব‌লে‌ছি‌লো ম‌নে আছে তোর তনয়া? দাদি আমা‌দের দুজনকে কো‌লে ব‌সি‌য়ে বল‌লো

দা‌দিঃ দাদু ভাই বি‌য়ে মা‌নে হ‌চ্ছে খুব মজা! সারা দিন দুজন মি‌লে খেলাধুলা করা। আর তোমরা দুজন সারা জীবন একসা‌থে থাক‌তে পারবা খেল‌তে পারবা। আর বি‌য়ে‌তো তোমরা কবুল বলার পর তোমা‌দের অনেক খেলনা আর জামা কাপড় কি‌নে দি‌বো।

আমরা তখন সারা জীবন এক সা‌থে থাক‌তে পার‌বো ব‌লে খুব আন‌ন্দে ছিলাম। আর খেলনা আর নত‌ুন জামার লোভটাও তো সামলা‌তে পা‌রিনি। তাই কাজী কবুল বলতে বলার সা‌থে কবুল ব‌লে দিলাম। কিন্তু বি‌য়ে বৌ শব্দ দু‌টো শুন‌লেই কেন যে‌নো খুব লজ্জা লাগ‌তো। তারপর থে‌কে তোর সা‌থে খেলাতাম, ঘুরতাম, তোর পছ‌ন্দের জি‌নিসগু‌লো তো‌কে কি‌নে দিতাম। কিন্তু পাড়ার বাচ্চারা আমা‌দের বর বৌ ব‌লে মজা করতো। তুই খ‌ুব রাগ কর‌তিস কিন্তু আমি স‌ত্যি বল‌তে আমার খুব মজা লাগ‌লো হি হি। তারপর ম‌নে আছে তোর আম‌ার প্রথম প্রেম নি‌বেদ‌নের কথা! ভাব‌লে খুব লজ্জা লা‌গে। আয়াত তনয়ার ঘুমান্ত মুখটার দি‌কে তা‌কি‌য়ে মিট‌মিট ক‌রে হাস‌তে থা‌কে আর অতী‌তের ছে‌লেমানু‌ষির ভাবনায় ডুব দি‌তে থা‌কে।

‌বি‌য়ের তিন বছর পর
দেখ‌তে দেখ‌তে বি‌য়ের তিন বছর কে‌টে যায়। ছে‌লেমানু‌ষি গু‌লো নতুন অনুভু‌তি‌তে রূপ নি‌তে থা‌কে। নাম‌ মিল‌তে থা‌কে সম্পর্কটার। প্রানহীন খুনসু‌টিময় সম্পর্কটা হঠাৎ ক‌রে কিছু অনুভু‌তি‌কে আক‌ড়ে ধ‌রে। তৈরী ভালোবাসা নামক শব্দটা।

তনয়া তখন অষ্টম শ্রেনী‌তে প‌ড়ে আর আয়াত দশম। আয়াত তখন ভা‌লোবাসা, বি‌য়ে, বৌ শব্দটার মা‌নে বুঝ‌তে গি‌য়ে‌ছি‌লো। আয়াতের ম‌নের মা‌ঝে ভা‌লোবাসা নামক বীচ থে‌কে তৈরী হয় ছোট্ট এক‌টি ভা‌লোবাসার চাড়া গাছ। যেটার নাম দেয় তনয়া। তনয়াও যে আয়াত‌কে নি‌য়ে অনুভব ক‌রে না তা কিন্তু না! তনয়ার ভাবনা‌তেও এক‌টি আবছায়া চেহারা আসে। স্ব‌প্নে যার সা‌থে কথা হয়। ম‌নের কো‌নে যা‌কে নি‌য়ে বিন্দু বিন্দু ক‌রে তৈরী হ‌চ্ছে মেঘময় সাদা কা‌লো ধূসর স্বপ্ন। যা‌কে নি‌য়ে ম‌নের আকা‌শে রচনা হ‌চ্ছে হাজা‌রো রঙিন অা‌ঁকিবু‌কি করা অগোছা‌লো স্বপ্ন। তনয়ার কি‌শো‌রী মনটায় রং লাগ‌তে শুরু ক‌রে। সে র‌ঙে আবছায়ায় থাকা সে চেহারা প‌রিষ্কার হ‌তে থা‌কে। র‌ঙিন হ‌তে থা‌কে স্বপ্নে দেখা সে স্বপ্ন পুরুষ‌টি। এক‌দিন নি‌জের অগোচ‌রের তনয়া ম‌নের কো‌নে পুরুষ‌টির ছ‌বি দে‌খে ফে‌লে। সে যে আর কেউ নয় সে তার একান্তই তার আয়াত।

আর আয়াত সেও কম যায় না তনয়া‌কে নি‌য়ে রোজ কল্পনার মেঘাল‌য়ে আঁকে ভা‌লোবাসার আল্পনা। মেঘাল‌য়ে খ‌ুলে ব‌সে ভালোবাসার যত জল্পনা। বুন‌তে থা‌কে আকাশ মা‌ঝে রং ধনুর সাত র‌ঙে মেশা স্বপ্ন। লিখ‌তে থা‌কে ম‌নের মাধু‌রী মি‌শি‌য়ে, কল্পনার রং তু‌লি দি‌য়ে, জল্পনার শব্দ দি‌য়ে নি‌জের ম‌নের কো‌নে হাজা‌রো ভা‌লোবাসাময় গল্প । ম‌নের র‌ঙে মে‌ঘের রা‌জ্যে তনয়া না‌মের পা‌শে এক‌টি নাম লি‌খে #বা‌লিকা_বধূ । হারা‌তে থা‌কে প্রে‌মের এক অতল সমু‌দ্রে। খুজ‌তে থা‌কে সে সমুদ্র থে‌কে ভা‌লোবাসার ঢেউ মেশা‌নো রঙ। সমু‌দ্রের অতল গহব্ব‌রে কোন এত তালাবদ্ধ সিদ্ধু‌কে খুজতে থা‌কে অপ‌রিসীম মূল্যবান রত্ন যার নাম ভা‌লোবাসা।

আয়াত অনুভব কর‌তে পা‌রে তনয়া ভা‌লোবাসাটা‌কে। গত এক বছরের বে‌শি সময় ধ‌রে দুজ‌নের মা‌ঝের সে চাঞ্চল্য স্বভাবটা‌কে অনেকটাই লজ্জার আড়া‌লে ঢে‌কে ফে‌লে‌ছে। দুজন দুজনার থে‌কে যথা সম্ভব লুকি‌য়ে বেড়াতে চায়। কারন কা‌ছে আস‌লে চো‌খে চোখ রে‌খে কথা বলার মত ভাষা হা‌রি‌য়ে যায়। আয়াত প্র‌তিনিয়ত তনয়ার ভা‌লোবাসাটা‌কে অনুভব ক‌রে। তনয়া‌কে এতটা ভা‌লো‌বে‌সে‌ছে যে সেটা নি‌জের মা‌ঝে চে‌পে রাখ‌তে পার‌ছে না। কিন্তু তনয়া‌কে বল‌তে ভয় হয় বড্ড ভয়। প‌রোক্ষ‌নেই আয়াত ভা‌বে তনয়া‌তো তার শুধুই তার। সয়ং আল্লাহ তা‌দের সম্পর্কটা‌কে জু‌ড়ে দি‌য়ে‌ছে। তা‌দের বাবা মা‌য়েরা সম্প‌র্কের নাম দি‌য়ে দি‌য়েছে। তাহলে ভয় কি‌সের? ওকে হারা‌নোর কোন ভয়‌ তো আমার ম‌নে থাকা উচিৎ না। আচ্ছ তনয়া কি বুঝ‌বে আমার ভা‌লোবাসাটা? নাহ কালকেই তনয়া‌কে ব‌লে দিবো আমি ওকে খুব ভালো‌বে‌সে ফে‌লে‌ছি।

প‌রের দিন খুব সকা‌লে । আযা‌নের কিছু সময় বাদ। আয়াত নামাজ প‌ড়ে এসে দে‌খে তনয়া ছা‌দে দা‌ড়ি‌য়ে ফু‌লের ট‌বে পা‌নি দি‌চ্ছে। সূর্যটা এখ‌নো উঠ‌তে শুরু ক‌রে‌নি। কিন্তু তারপরও আলো ফু‌টে‌ছে। শী‌তের দিন তাই কুয়াশায় ঢাকা প‌রি‌বেশ। সকা‌লে পা‌খিরা কি‌চির‌মি‌চির ক‌রে ডাক‌ছে, ফুলগু‌লো ফুট‌তে শুরু ক‌রে‌ছে। সকা‌লের নির্মল প‌রি‌বে‌শে তনয়া‌কে দে‌খে আয়া‌তের মনটা খু‌শি‌তে ভ‌রে উঠ‌লো। ভাব‌লো নি‌জের ম‌নের ভাব প্রকাশ করার এর থে‌কে সুন্দর আর রোমা‌ঞ্চিত সময় আর হ‌তে পা‌রে না। আয়াত তনয়া‌কে ডাক দি‌লো।

আয়াতঃ তনয়া শোন!

তনয়াঃ হুমম ব‌লো!

আয়াতঃ নদীর পা‌ড়ে ঘুর‌তে যা‌বি? সকাল বেলায় নদীর ধা‌রের প্রকৃ‌তিটা খুব সুন্দর। দেখ‌বি?

তনয়া আয়া‌তের সা‌থে এমন সময় কাটানোটা‌কে মিস কর‌তে চায় না। তাই তারাহু‌রো ক‌রে নি‌চে নে‌মে আস‌লো। আয়া‌তের সা‌থে হাট‌তে শুরু কর‌লো। স‌বে শীত কাল শুরু হ‌য়ে‌ছে। নদীর ধ‌া‌রে বেশ কুয়াশা । হালকা শীতল হাওয়ায় শরীরটা হিম ধ‌রে যা‌চ্ছে। দুজন চুপচাপ হাট‌ছে। কা‌রো মু‌খে কোন কথা নাই। তাড়াহুরো ক‌রে আস‌তে গি‌য়ে তনয়া নি‌জের চাদড়টা নি‌য়ে আসে‌নি। সকা‌লের হিম ধরা বাতাসটা যে‌নো শী‌তের প্রভাবটা বা‌ড়ি‌য়ে দি‌য়ে‌ছে। শী‌তের কার‌নে তনয়ার নিঃশ্বাস ভারী হ‌য়ে যা‌চ্ছে। আয়াত নি‌জের চাদরটা তনয়ার গা‌য়ে জ‌ড়ি‌য়ে দি‌লো। হঠাৎ আয়া‌তের পর‌শে তনয়ার সারা শরী‌রে যে‌নো একটা শিহরন ছে‌ঁয়ে গে‌লো। চোখটা লজ্জায় নে‌মে এলো। কাছাকা‌ছি দু‌টো লোক নিঃশব্দে হাট‌ছে, বাকহীন ভাবে। কা‌রো কা‌ছে যে‌নো কোন কথা নাই। পাশাপা‌শি হাটার কার‌নে একে অপ‌রের হা‌তে হা‌তে স্পর্শ লাগ‌ছে। কেঁ‌পে কেঁপে উঠ‌ছে দুজন। উঠ‌তি বয়‌সে ভা‌লোবাসার এক আলাদা শিহরন থা‌কে।

আয়াত ম‌নে ম‌নে বল‌ছে বছর খা‌নিক আগেও তনয়া কথা ঝু‌ড়ি খু‌লে বস‌তো। আর এখন কথা বিহীন কি ক‌রে থা‌কে। আয়াত হয়‌তো বুঝ‌তে পার‌ছে না মে‌য়ে‌দের কি‌শোরী ম‌নের ভা‌লোবাসার অনুভু‌তি গু‌লো এমনই বাকহীন হয়। নী‌রবতা ভে‌ঙে আয়াতই বল‌লো——

আয়াতঃ কেমন লাগ‌ছে তোর?

তনয়াঃ খুব ভা‌লো!

আয়াতঃ তনয়া!

তনয়াঃ হুমমম ব‌লো!

আয়াতঃ তুই কি আমার উপর রাগ ক‌রে আছিস?

তনয়াঃ কে‌নো?

আয়াতঃ না মা‌নে আগের মত কথা ব‌লিস না, দুষ্ট‌মি ক‌রিস না, তেমন কা‌ছে আসিস না কেন? কি হ‌য়ে‌ছে তোর?

তনয়াঃ মৃদু হে‌সে। সেটা কি তু‌মি স‌ত্যিই বোঝ না? না‌কি বুঝ‌তে চাও না।

আয়াতঃ উমম—-! না মা‌নে—-! ইয়ে—-

তনয়াঃ একটা সময় পর মে‌য়ে‌দের ম‌নে প‌রিবর্তনের হাওয়া লাগে। সময় পাল্টায়, রং পাল্টায়, ছে‌লেমানু‌ষি মনটা পা‌ল্টে সেখা‌নে এক কিশ‌রো ম‌নের জন্ম নেয়। আর সে ম‌নে জন্ম নেয় কিছু ভা‌লোলাগা। যার সে ভা‌লোলাগা দেখার মত চোখ আ‌ছে বোঝার মত মন আছে সে দে‌খে বো‌ঝে। সবাই কি তোমার মত অবুঝ না‌কি?

তনয়ার কথাটা আয়া‌তের খুব লাগ‌লো। ভাবলো

আয়াতঃ পুচ‌কে একটা মে‌য়ে আমা‌কে কিনা অবুঝ ব‌লে। দাড়া মজা দেখা‌চ্ছি কিন্তু কিছু বল‌তে যে‌য়েও তনয়ার চো‌খের দি‌কে তা‌কি‌য়ে হা‌রি‌য়ে যায়। সকা‌লের ঠান্ডা বাতাসটায় আয়া‌তের শরীরটাও কেঁ‌পে উঠ‌লো।

তনয়াঃ তোম‌ার বোধয় ঠান্ডা লাগ‌ছে চাদরটা নাও।

আয়াতঃ না না লাগ‌বে না।

তনয়াঃ নাও নয়‌তো ঠান্ডা লে‌গে যা‌বে।

আয়াত কি একটা ভে‌বে চাদরটা নি‌লো। তারপর অর্ধেক চাদর নি‌জে গা‌য়ে জ‌ড়ি‌য়ে বা‌কিটা তনয়া‌কে জ‌ড়ি‌য়ে দি‌লো। তনয়া আয়া‌তের এমন কা‌জে হতভম্ব হ‌য়ে গেলো। এক চাদ‌রে ম‌ধ্যে দ‌ুজন । আয়াত নি‌জের হাতটা তনয়ার কা‌ঁধে রাখ‌লো। হাতটা ঠকঠক ক‌রে কাঁপ‌ছে ভ‌য়ে। তনয়া কিছু না ব‌লে লজ্জায় চোখ না‌মি‌য়ে ফেল‌লো।

আয়াতঃ তনয়া তো‌কে কিছু বল‌লে রাগ কর‌বি না‌তো?

তনয়াঃ মাথা না‌ড়ি‌য়ে না বোধক সম্ম‌তি দি‌লো।

আয়াতঃ তনয়া এটা‌তো আগে থে‌কেই ঠিক হ‌য়ে গে‌ছে যে তুই আমি সারা জীবন একসা‌থে থাক‌বো। নি‌জে‌দের লাইফ শেয়ার কর‌বো। কিন্তু আমি চাই নতুন ক‌রে শুরু কর‌তে। আমরা বরাবরই বেস্ট ফ্রেন্ড। তাই আমি আগে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক না বন্ধুত্ব আর ভা‌লোবাসার সম্পর্ক কর‌তে চাই। আর সারা জীবন তোর পা‌শে থাক‌তে চাই। সারা জীবন এক চাদ‌রে দুজ‌ন দুজন‌কে জ‌ড়ি‌য়ে রাখ‌তে চাই। তোর জন্য কি‌নে আনা চ‌ু‌ড়ি গু‌লো তো‌কে নিজ হা‌তে প‌রিয়ে দি‌তে চাই। তোর প‌া‌য়ে নপুড় পরি‌য়ে দি‌তে চাই। তোর ভেজা চুলগুলো মু‌ছে দি‌তে চাই, নিজ হা‌তে তোর চুল বাঁধ‌তে চাই তুই কি আমা‌কে সেই অধিকার দি‌বি? জা‌নি আমরা এখন খুব ছোট! তুই‌তো তার থে‌কেও ছোট। তোর কোন তাড়া নাই সময় নি‌য়ে ভে‌বে উত্তর দিস। তোর জন্য বছ‌রের পর বছর অপেক্ষা কর‌তে রা‌জি আছি। তুই প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত তোর উপর নি‌জের স্বামী হবার বা ভা‌লোবাসার অধিকার খাটা‌বো না। না নি‌জে ভুল কর‌বো না তোকে ভুল কর‌তে বাধ্য কর‌বো। শুধু কথা দে তুই তোর ম‌নের যে জায়গাটা আছে সেটা আমায় দিবি। সেখা‌নে কাউ‌কে প্র‌বেশ কর‌তে দি‌বি না।

তনয়া চুপ ক‌রে মা‌টির দি‌কে তা‌কি‌য়ে আছে। এক অসাধারন ভা‌লোবাসা মনটা‌কে ছু‌য়ে যা‌চ্ছে। কিন্তু মুখ থে‌কে সেটা বের হ‌চ্ছে না। ম‌নে হ‌চ্ছে কোন শ‌ক্তি মুখটা‌কে বেঁ‌ধে ফে‌লে‌ছে। মু‌খের কথা গু‌লো যে‌নো কেউ কে‌ড়ে নি‌য়ে‌ছে। তারপরও কষ্ট ক‌রে বল‌লো

তনয়াঃ আগাম‌ী শুক্রবার ঠিক এখা‌নে এসে ব‌লি।

আয়াতঃ ঠিক আছে। তারপর কোন কথা হয়‌নি দুজ‌নের মা‌ঝে। চো‌খে চোখ পর‌তেই তনয়া লজ্জায় পা‌লি‌য়ে যে‌তো।

প‌রের সপ্তা‌হে শুক্রবার ঠিকই আস‌লো কিন্তু তনয়ার না বলা কথা গু‌লো বলা হ‌লো না। একটা ঘটনা সব কিছু ঘূ‌র্নিঝ‌ড়ের ম‌তো উল্টে পা‌ল্টে দি‌লো। ঘৃনা কর‌তে লাগ‌লো আয়াত‌কে।

‌কে‌টে যায় সাত বছর

আয়াত এখ‌নো প্র‌ত্যেক সপ্তা‌হে শুক্রবার অ‌পেক্ষা ক‌রে হয়‌তো তনয়া সাত বছর আগের না বলা কথাগু‌লো বল‌বে। কিন্তু প্র‌ত্যেক শুক্রবারই আয়াত নিরাশ হ‌য়। আয়াত এখ‌নো বুঝ‌তে পা‌রে না কেন তনয়া ওকে ঘৃনা ক‌রে। যখনই জানার চেষ্টা ক‌রে‌ছে তখনই তনয়ার কাছ থে‌কে ঘৃনা ছাড়া কিছু পায়‌নি। আয়াত জা‌নে তনয়া আয়া‌তের কা‌ছে কেবল এসে‌ছে ডি‌ভোর্স পেপা‌রে সাইন করা‌নোর জন্য। হ্যা ওদের ডি‌ভোর্স হ‌চ্ছে। কোট থে‌কে ওদের ছয় মাস একসা‌থে কাটা‌নোর জন্য টাইম দি‌ছে যার তিন মাস অল‌রে‌ডি শেষ। আয়া‌তের কা‌ছে মাত্র তিন মাস সময় অাছে তনয়া‌কে নি‌জের ক‌রে রাখার।

তনয়ার ঘুমান্ত মুখটার দি‌কে তা‌কি‌য়ে আয়াত ভাব‌ছে দশ বছ‌রের সম্প‌র্কে এভা‌বে ভাঙ‌তে পার‌বে তনয়া?
এতটা নির্দয় তু‌মি?
তু‌মি কি স‌ত্যিই অনুভব ক‌রে‌ানি আমার ভা‌লোবাসা?

চল‌বে——–

ভুলত্রু‌টি ক্ষমার চো‌খে দেখ‌বেন।

বা‌লিকা বধূ ১ম পর্ব

0

বা‌লিকা বধূ ১ম পর্ব

লেখাঃ_শারমীন_আক্তার_সাথী_(#সাথী____)


*****আ‌মি তো‌কে নি‌জের বউ হিসা‌বে মা‌নি না!

——-‌তো‌কে বর হিসা‌বে মান‌তে আমারই ব‌য়ে গে‌ছে! হারা‌মি, লাল বাদর, কলা চোর উল্লুক।

——–‌কি বল‌লি তুই আমা‌কে? তুই‌ তে‌া নি‌জেই একটা সাদা গে‌ছো ফি‌মেইল বাদর!

——–‌কি বললি তুই আমায়? মুখ সাম‌লে কথা বল‌লি আয়াত ! নয়‌তো তোর বাঁকা ম‌ুখ ঘু‌ষি মে‌রে আমি আরো বাঁকা ক‌রে দি‌বো

——-‌দেখ তনয়া মে‌য়ে আছিস মে‌য়ের মত থাক‌বি! বে‌শি কিছু বল‌লে আমিও কিন্তু আমার ছে‌লে‌গি‌রি দেখা‌বো।

তনয়াঃ কি? কি কর‌বি তুই আমায়? কান কাটা হনুমান!

আয়াতঃ দেখ‌বি কি কর‌বি ? আমায় কান কাটা হনুমান বলা দাড়া তো‌কে হনুমান গি‌রি দেখা‌চ্ছি!

তনয়াঃ কি আর দেখা‌বি তুই! কোন কাঁচকলা পা‌রিস? রাঙামা‌টির রাঙা বাদর!

আয়াতঃ কি বল‌লি দাড়া তো‌কে বাদর‌গি‌রি দেখা‌চ্ছি ব‌লে তনয়া‌কে শক্ত ক‌রে দেয়া‌লের সা‌থে চে‌পে ধ‌রে তনয়া ঠোটে ঠোট চে‌পে ধর‌লো। তনয়া নি‌জে‌কে ছাড়া‌নোর আপ্রান চেষ্টা কর‌ছে কিন্তু আয়া‌তের শ‌ক্তির সা‌থে পে‌ড়ে উঠ‌তে পার‌ছে না। তবুও আয়া‌তে‌কে ক‌য়েকা কিল দি‌লো। পাক্কা পাঁচ মি‌নিট পর আয়াত ছে‌ড়ে দিলো। দুজনই হাপা‌চ্ছে।

তনয়াঃ ঐ রাম ছাগল তুই এটা কি কর‌লি? তুই আমার অনু‌মো‌তি না নি‌য়ে আমাকে—–,?

আয়াতঃ নি‌জের বি‌য়ে করা বৌ‌য়ের কা‌ছে কি অনু‌মো‌তি নিতে হয়? পাঁপ হয় পাঁপ।

তনয়াঃ তোর পাঁ‌পের গু‌ষ্টি কিলাই। আর কে তোর বৌ? আমি এ বি‌য়ে মা‌নি না!

আয়াতঃ সেটা‌তো আমিও মা‌নিনা। আমরা মা‌নি আর না মা‌নি তবুও আমরা স্বামী স্ত্রী।

তনয়াঃ তোর স্বামীর****টুট ট‌ুট।

আয়াতঃ ছিঃ ছিঃ তনু তুই এসব বা‌জে কথা কোথায় শিখ‌ছিস? নি‌চের বর‌কে কেউ এভা‌বে ব‌লে?

তনয়াঃ তোর সা‌থে আমার কোন কথা নাই। আমি গেলাম। হে‌রে গি‌য়ে বেচারি কি কর‌বে ভে‌বে পা‌চ্ছে না।

আয়াতঃ তনু শোন!

তনয়াঃ হ্যা বল?

আয়াতঃ মি‌ষ্টিটা কিন্তু সেই লে‌ভে‌লের মি‌ষ্টি।
আয়া‌তের কথা শু‌নে তনয়া অগ্নি দৃ‌ষ্টি‌তে ওর দি‌কে তাকা‌লো। তারপর রাগ দে‌খি‌য়ে চ‌লে গে‌লো। ওর যাওয়া দে‌খে আয়াত হাস‌ছে আর বল‌ছে—

আয়াতঃ চিন্তা ক‌রো না #বালিকা_বধূ তোমায় আমি নিজের ক‌রে নি‌বোই। যতই তু‌মি আমা‌কে বাদর ব‌লো। এ বাদ‌রের বাদরা‌মি তোমা‌কে সারা জীবন সহ্য কর‌তে হ‌বে। কারন আমি তোমায় ভিষন ভা‌লোবা‌সি বাদ‌রের ফি‌মেইল বাদর। আর আমার বা‌লিকা বধূ। আচ্ছা তনু তু‌মি কেন আমার সা‌থে এমন ক‌রো? তু‌মি তো জান‌তে আমারা সম্প‌র্কে সেই ক‌বে থে‌কে আমরা স্বামী স্ত্রী। তাহ‌লে এত বছ‌রে আমার প্র‌তি‌ কি তোমার এতটুও অনুভু‌তি জন্ম হয়‌নি? কেন তনু? কেন তু‌মি আমায় সহ্য কর‌তে পা‌রো না? আমিতো প্র‌তি মূহু‌র্তে তোমা‌কে এটা বুঝা‌তে চাই যে তোমায় কত ভা‌লোবা‌সি। কিন্তু তু‌মি বু‌ঝেও আমায় কেন দূ‌রে ঠে‌লে দাও? আচ্ছা তনু তু‌মার ম‌নে‌ তো অন্য কেউ নাই তাহ‌লে তু‌মি কে‌নো আমা‌কে তোমার ম‌নে জায়গা দি‌তে পা‌রো না? ব‌লো? কিভা‌বে বল‌বে তু‌মি? ত‌ু‌মি‌তো নিজের মনটা‌কে বদ্ধ সিন্ধু‌কে রে‌খে চা‌বি ফে‌লে দি‌য়ে‌ছো অথৈই সাগ‌রে। সেখান থে‌কে চা‌বি খোঁজাটা একরকম অসম্ভব। কিন্তু আমি সেই অসম্ভব‌কে সম্ভব কর‌বোই! আমার ভা‌লোবাসার জোড় যে অনেক। সে জোড় দি‌য়ে তোমার ম‌নের বদ্ধ সিন্ধুকটা‌কে ভে‌ঙে ফেল‌বো।

এ‌দি‌কে তনয়া রাগ ক‌রে ওয়াশরু‌মে গি‌য়ে শাওয়ারটা ছে‌ড়ে ফু‌পিয়ে ফু‌পি‌য়ে কান্না কর‌তে থা‌কে। নি‌জে‌কে নি‌জে দোষ দি‌তে থা‌কে। আর বল‌তে থা‌কে।

তনয়াঃ আমি তোমায় ঘৃনা ক‌রি আয়াত। প্রচন্ড ঘৃনা। তুমি শত চেষ্টা ক‌রেও আমার ম‌নে তোমার প্র‌তি ভা‌লোবাসা তৈরী কর‌তে পার‌বে না। পার‌বে না আমার ম‌নের ভা‌লোবাসা নামক বন্ধ সিন্ধুক খুল‌তে। শুন‌ছো আয়াত আই হেট ইউ। হ্যা আমি তোমায় ভা‌লোবা‌সি কিন্তু আমি তোমায় ঘৃনা কর‌তে ভা‌লোবা‌সি। শুধুই ঘৃনা। সাবান দি‌য়ে নি‌জের ঠোঁট দু‌টো বার বার ঘস‌ছে। যা‌তে আয়া‌তের ছোয়াটা উঠে যায়। কিন্তু যে ছোয়া ম‌নে ‌লে‌গে আছে তা কোন সাবান দি‌য়ে তুল‌বে? আয়াত ওয়াসরু‌মের কা‌ছে এসে দড়জায় টোকা দি‌লো

আয়াতঃ তনু তনু! আই এ্যাম স্য‌রি। প্লিজ মাফ ক‌রে দে । আর কখ‌নো এমন ভুল হ‌বে না। দে‌খ এটাই প্রথম আর শেষ ভুল। প্লিজ বের হ। বে‌শি ভিজ‌লে তোর ঠান্ডা লাগ‌বে প্লিজ।

তনয়া দড়জা খু‌লে মাথা নিচু ক‌রে দা‌ড়িয়ে আছে। সারা শরীর ভিজা। আয়াত তাড়াতা‌ড়ি টাওয়ালটা দি‌য়ে তনয়ার মাথা মুছাতে শুরু কর‌লো। তনয়া টাওয়ালটা হাত থে‌কে টে‌নে নি‌য়ে বল‌লো।

তনয়াঃ বে‌শি স্বামী স্বামী ভাব দেখা‌বি না। ডিজগাস‌টিং।

আয়াতঃ আমার ভা‌লোবাসাটা তোর কা‌ছে ডিজগাস‌টিং লা‌গে তনু?

তনয়াঃ হ্যা লা‌গে। কারন আমার তো‌কে ডিজগাসাটিং লা‌গে।

আয়াত আর কিছু বল‌লো না। চুপচাপ চ‌লে গে‌লো। আর ওর চোখ থে‌কে বে‌রি‌য়ে আস‌তে চাই‌ছে কিছু অবান্তর নোনা তরল। অবান্তর কেন বললাম? যে তর‌লের মায়া, মায়ার মানুষটা বো‌ঝে না তাকে অবান্তর বলাই উচিৎ। তনয়া আয়াত‌কে চোখ মুছ‌তে দে‌খে বল‌লো

তনয়াঃ কাঁদ আয়াত কাঁদ। এত বছর ধ‌রে যে কষ্ট সাগ‌রে আমি হাবুডু‌বো খা‌চ্ছিলাম সে সাগ‌রে এখন আমি তো‌কে ডুবা‌বো। আমি এখা‌নে তোর বা‌লিকা বধূ হতে আসি‌নি। তো‌কে তি‌লে তি‌লে কষ্ট দি‌তে এসে‌ছি। গত নয় বছর ধ‌রে যে যন্ত্রনা আমি সহ্য কর‌ছি তা এবার তোর সহ্য করার পালা। তোর কান্না দে‌খে আমার কষ্ট হয়। স‌ত্যিই অনেক কষ্ট হয়। কারন শত হ‌লেও তুই স্বামী। তার ওপর ছোট‌বেলার বি‌য়ে। কষ্ট হওয়াটা স্বাভা‌বিক। কিন্তু কি জা‌নিস আয়াত?যখন তোর দেয়া আঘাতটা ম‌নে প‌রে। হৃদয়টা তখন ক্ষত‌বিক্ষত হ‌য়ে যায়। তোর প্র‌তি ভা‌লোবাসাটা মূহু‌র্তেই বি‌লিন হ‌য়ে যায়। তখন তোর কষ্ট দেখ‌লে শা‌ন্তি লা‌গে।

‌হ্যা তনয়া আর আয়া‌তের বি‌য়ের বয়স দশ বছর। ওদের যখন বি‌য়ে হয় তখন তনয়া ক্লাস ফাই‌বে প‌ড়ে আর আয়াত সে‌ভেন এ। ওদের দু প‌রিবা‌রের সম্মত‌িতে হয় ওদের বি‌য়ে। কিন্তু বি‌য়ের এক বছর পর একটা ঘটনা ওদের সম্পর্কটা‌কে তিক্ত ক‌রে দেয়। পা‌রিবা‌রিক সম্পর্কগু‌লো ঠিক থাক‌লেও ঠিক নেই ওদের সম্পর্ক। তিক্ততায় ভরা ওদের হৃদ‌য়ের বাধঁন। আয়াত প্র‌তি‌নিয়ত চেষ্টা কর‌ছে সম্পর্কটা ভা‌লোবাসাময় করার। কিন্তু আয়াত দু পা এগোলে তনয়া চার পা পি‌ছি‌য়ে নেয়।

আয়াত সবসময় চেষ্টা ক‌রে নি‌জের ভালোবাসা দি‌য়ে ওদের বিষাক্ত অতীতটা‌কে বিষ মুক্ত কর‌তে। কিন্তু কথায় আছে না বিষ যখন মাথায় উঠে যায় তখন সেটা নামানো একরকম অসম্ভব হ‌য়ে দাড়ায়। য‌দিও সম্ভব হয় কিন্তু তার জন্য অনেক কাঠখড় পুড়‌তে হয়। আয়াত নামাজ প‌ড়ে প্র‌তি‌নিয়ত এই দোয়ই ক‌রে যাতে তনয়ার ম‌নের বিষাক্ত ভাবটা কা‌টি‌য়ে ওর ম‌নে ভা‌লোবাসার ফুল ফোটা‌তে পা‌রে।

তনয়া ঘুমা‌চ্ছে আর আয়াত অপলক দৃ‌ষ্টি‌তে তা‌কি‌য়ে আছে তনয়ার দি‌কে। ম‌নে হ‌চ্ছে পৃ‌থিবীর সব মায়া, সব আর্কষন, সব মোহ, মমতা এসে ভির করে‌ছে তনয়ার মু‌খে। আয়া‌তের খুব ক‌রে ইচ্ছা কর‌ছে তনয়ার কপা‌লে ভা‌লোবাসার পরশ বু‌লি‌য়ে দি‌তে। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। আয়াত তনয়ার দি‌কে তা‌কি‌য়ে ভাব‌ছে ওদের জীব‌নের সুন্দরতম মূহুর্ত গু‌লো‌কে।

চল‌বে——-

ভুলত্রু‌টি ক্ষমার চো‌খে দেখবেন

বইমেলা ২০২০ এর সেরা বই কোনগুলো হতে যাচ্ছে?

0

বইমেলা ২০২০ এর সেরা বই কোনগুলো হতে যাচ্ছে?

সেরা দামে প্রিয় লেখকের বই পেতে আমাদের সাথেই থাকুন!

( এই পোষ্টে আপনার বন্ধুতালিকার যেকোনো তিনজনকে ট্যাগ করার মাধ্যমে Maria Kabir এর নতুন বই ক্রয়ে আপনি পাবেন সবার চেয়ে সেরা অফারঃ ৪০% ছাড়ে ফ্রি ডেলিভারি! )
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=802003866912357&id=232215307224552

 

অবিশ্বাসী ও গোলাপী অন্তর্বাস

0

অবিশ্বাসী ও গোলাপী অন্তর্বাস

স্ত্রী কে চকলার উদ্দেশ্যে গাড়িতে তুলে দিয়ে বেশ খুশী মনে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে একটা পিজ্জা আর বিয়ারের কয়েকটা ক্যান নিয়ে বাড়িতে ঢোকে সিজার।
তিয়াশ আসবে একটু পরেই, ওর সাথে দারুন প্ল্যান করা আগে থেকেই।
সিজারের স্ত্রী একটি বেসরকারি সংস্থায় ডাটা কালেক্টরের কাজ করে।
তাই মাঝে মাঝেই তাকে দুর্গম সাওতাল পুঞ্জিতে যেতে হয়।
সে সময় গুলো সিজার তিয়াশকে নিয়ে কাটায়, বাইশ বছরের তিয়াশা সিজারের অফিসের জুনিয়র কলিগ।
মেয়েটা শরীর তো নয় যেন একটা আগুনের আস্তানা!
বিছানায় ঝড় তোলে কত সহজে, সিজার নিজের হারিয়ে ফেলে বারবার। কত রকম নখরাই না মেয়েটা জানে!!

সিজারের স্ত্রী দশ বছর সংসার করার পরে এখন ফ্রিজিড হয়ে গিয়েছে, স্থূল শরীর, না সিজারকে জাগাতে পারে না নিজে উত্তেজিত হয়!
সিজারের ভালো লাগে না একদম, তবু সিজার বুঝতে দেয় না একদম।
প্রতিদিনই ভালোবাসি বলে মেকি আদরে ঢেকে রাখে সম্পর্ক।
মেয়েটাও বোকা, কিচ্ছু টের পায় না।
এই যে প্রায়ই সিজার অফিস শেষে তিয়াশের ফ্ল্যাটে সময় কাটিয়ে ফেরে, সেটাও ধরতে পারেনা।
নিজের মতো ব্যস্ত থাকে।
দশ বছরেও কোন ইস্যু না হওয়ায় মেয়েটা নিজের জগতে ব্যস্ত থাকে।
সারাদিন অফিস শেষে বাসায় ফিরে কিচেনে চলে যায়, দারুন সব রান্না করে সিজারের জন্য। নতুন নতুন রেসিপি, কি দারুণ স্বাদ!
এসবের জন্য সিজার যেন মেয়েটাকেও ছাড়তেও চায় না।
থাকুক তিয়াশ যেমন আছে, ও তো বিয়ে করতে চায় না।
শুধু লিভিং করতে চায়, কয়েকদিন পরে হয়তো নতুন সঙ্গী খুঁজবে, আপাতত সিজারের সাথে সময় উপভোগ করছে।

কি দারুন শরীরের গাঁথুনী, ভাজে ভাজে রহস্য, নিজেকে দারুন উত্তেজক পোশাকে সাজিয়ে সিজারের সামনে চলে আসে।

আজ সারারাত থাকবে, ভাবতেই উত্তেজনা হচ্ছে।
নিষিদ্ধ প্রণয় অনুভূতি বুঝি এমন হয়!
সসেজ গুলো ভেজে ফেলে সিজার।
তিয়াশ আসলে আর সময় নষ্ট করা যাবে না।
বেডরুমটা গুছিয়ে পরিস্কার করে রাখে।

কলিংবেল বাজলো, সিজার দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দেয়।
ওয়াও, কালো গাউন পরে কি মোহময় ভঙ্গিতে তিয়াশ দাঁড়িয়ে আছে।ঘরে ঢুকেই গভীর ভাবে চুমু খেলো সিজারকে জড়িয়ে ধরে।

সিজার গাউনের পেছনের চেইনটা খুলে দিলো!
কালো গাউনের নিচে গোলাপী অন্তর্বাস, আরো মোহময় করে তুলেছে তিয়াশকে।

তিয়াশ জানালো সে আগে।শাওয়ার নেবে, তারপর আসছে।
সিজার তিয়াশকে নিজেদের ওয়াশরুম দেখিয়ে দেয়।
দরজা খোলাই রাখে তিয়াশ, গভীর আহবান।
সিজার কিচেন থেকে একটা জুসের গ্লাস নিয়ে এসে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যায়, তখনই কলিংবেলটা বাজে।
উফ, কে এলো এখন আবার! ভীষণ বিরক্ত হলো সিজার। জুসের গ্লাসে চুমুক দিয়ে ওটা বিছানার সাইড টেবিলে রেখে দেয়।
এটা কি কোন আসার সময় হলো কোথাও!

সিজার ড্রয়িং রুম ছাড়িয়ে বারান্দায় গিয়ে দরজা খুলে দিয়ে ভীষন অবাক হয়ে গেলো!

★★★

ব্রেকিং নিউজ দেখাচ্ছে স্থানীয় টিভি চ্যানেলে, নিউ ডমিনো রেসিডেন্সিয়াল এরিয়ার বাইরে ঝুলন্ত ব্রীজের নিচে একটা বিশ একুশ বছরের মেয়ের বডি পাওয়া গিয়েছে।
মেয়েটাকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
বডিটা একটা সাদা টাওয়েল প্যাচানো ছিলো, মনে হচ্ছে যেন শাওয়ার নিচ্ছিলো তখন আঘাত করা হয়েছে।

★★★

চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে ভীষন অবাক হয়ে গেল সিজারের স্ত্রী ক্লারা।
অনেকক্ষণ ডোর বেল বাজিয়েছে, কিন্তু সিজার দরজা খুললো না।
অথচ দরজা ভেতর থেকে লক করা।
ভাগ্যিস চাবিটা ছিলো ব্যাগে।
ক্লারার এমনিতে চাবি নিতে মনে থাকে না খুব একটা।
সিজার না থাকলে কি যে হতো, ভাবতে পারে না ক্লারা।
ওর সব কিছু সিজার গুছিয়ে দেয়।
ক্লারাকে এতো ভালোবাসে সিজার।
কোন বাচ্চাকাচ্চা নেই বলে কখনো অভিযোগও করে না।
বরং স্বান্তনা দেয় যাতে ক্লারা মন খারাপ না করে।
ক্লারার ট্রিটমেন্ট করায় নিজ দায়িত্বে, প্রতিমাসে ডক্টরের কাছে নিয়ে যায়।
ভাবতেই মনটা ভালো হয়ে যায় ক্লারার।
কিন্তু সিজার কই!
দরজা খুলে বেডরুমে গিয়ে অবাক হয়ে গেলো ক্লারা সিজার বিছানায় কেমন অসংযত ভাবে পরে আছে!
এলোমেলো, আগোছালো, ক্লারার বুক কেঁপে ওঠে।
কাছে গিয়ে দেখে বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে।
মাই গড, হি ইজ ডেড!!

(চলবে)

শানজানা আলম

অবিশ্বাসী ও গোলাপী অন্তর্বাস

( প্রিয় পাঠক আপনাদের যদি আমার গল্প পরে ভালোলেগে থাকে তাহলে আরো নতুন নতুন গল্প পড়ার জন্য আমার facebook id follow করে রাখতে পারেন, কারণ আমার facebook id তে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন গল্প, কবিতা Publish করা হয়।)
Facebook Id link 👇👇👇
https://www.facebook.com/shanjana.alam

অবিশ্বাসী ও গোলাপী অন্তর্বাস -২

0

অবিশ্বাসী ও গোলাপী অন্তর্বাস -২

ক্লারার ফোনে পুলিশ এলো বাড়িতে।
আগেরদিন থেকে সাঁওতাল পুঞ্জিতে কাজ করেছে ক্লারা, নিজের বাসায় ফিরেছে বেলা এগারোটায়।
পুলিশ আসতে আসতে সাড়ে বারোটা বেজে গেলো।
ক্লারা বিপর্যস্ত, তিয়াশের মৃত্যুর বিষয়ে কিছুই জানে না সে।
স্বভাবতই দুটো মৃত্যু একই দিনে আবার তারা অফিস কলিগ, পুলিশ সংযুক্ত করার চেষ্টা করলো, কিন্তু রিলেট করতে পারলো না।
তিয়াশকে উপর্যপরি ছুড়িকাহত করা হয়েছে।
মনে হয় বুকের বা পাশে নৃশংসভাবে কোপানো হয়েছে। তিয়াশের বডিতে জড়ানো সাদা টাওয়েল রক্তে ভেজা, টাওয়েল ফরেনসিকে পাঠানো হয়েছে।
তিয়াশের জামাকাপড় কোথাও পাওয়া যায়নি।

সিজার এর শরীরে কোন আঘাত পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে প্রাথমিকভাবে, তার মৃত্যু হয়েছে বিষক্রিয়ায়।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এলে প্রকৃত কারণ জানা যাবে।

সিজারের অফিস থেকে দেওয়া স্টেটমেন্টে কয়েকজন জানিয়েছে সিজার এবং তিয়াশকে একসাথে ডেটে যেতে দেখেছে তারা।
কিন্তু এর বেশি তারা জানে না।

ক্লারাকে কিছুতেই বিশ্বাস করানো গেলো না সিজার একটা অনৈতিক অ্যাফেয়ারে জড়িয়েছিল তিয়াশের সাথে।

ফরেনসিক রিপোর্টে এসেছে সিজারের পেটে পয়জন পাওয়া গিয়েছে। তবে পয়জনটা সনাক্ত করতে পারেনি
এক্সপার্টরা। এটা নন পেপটাইড জাতীয় একটা রাসায়নিক, বিষ মেশানো ছিল জুসে।
এই গ্লাসে শুধু একটাই হাতের ছাপ পাওয়া গিয়েছে।
তার মানে সুইসাইড হতে পারে।

তিয়াশ খুন হওয়ার আগের রাতে সেজেগুজে তার ফ্ল্যাট থেকে বের হয়েছে, এটা তার এপার্টমেন্টের সিসিটিভি ক্যামেরায় দেখা গিয়েছে কিন্তু কোথায় গিয়েছিলো কেউ বলতে পারেনি।
সেই কালো ড্রেসও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

মাসকতক ধরে তদন্ত চললো, ক্লারা যেন বুড়িয়ে গেল কয়েকমাসে।
একরকম আনসলভড কেস হিসেবে কেসটা পরে রইলো।
যেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ক্লারা কিছুতেই বিশ্বাস করলো না, সিজার তিয়াশের সম্পর্কের কথা।

সিজারের ফোনের টেক্সট চেক করে পুলিশ জানিয়েছিলো ক্লারাকে, সিজার এবং তিয়াশের ঘনিষ্ঠতার কথা।
ক্লারা বিশ্বাস করেনি।
পুলিশ সন্দেহটা একবার ক্লারার দিকে দিতে গিয়ে তারপর আর দিলো না, কারণ ক্লারা সে রাতে সাঁওতাল পল্লীতে ছিলো।

ক্লারা একা একা থাকতে পারবে না ওর বাড়িতে।
তাই বাড়িতে এলো মিস মার্গারেট।
মার্গারেটের বয়স চল্লিশের বেশি, ডিভোর্সি।
ক্লারার বাড়িতে ক্লারার সাথে থাকবে সাথে ঘরের কাজকর্মও দেখবে।

কয়েকমাস পরে সবাই ভুলে গেলো এই ছোট্ট শহরে দুটো অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে কিছুদিন আগে।

ক্লারার কিছু অস্বাভাবিকতা দেখা দিলো, সে সারাক্ষণ মনে করে সিজার তার সাথেই আছে।
একা একা সে সিজারের সাথে কথা বলে।
মার্গারেট বিষয়টা খেয়াল করলো।
দুয়েকবার দেখে, সে ক্লারাকে বললো, ইউ মাস্ট নিড টু কনসাল্ট উইথ এ সাইকিয়াট্রিস্ট।
প্লিজ, গো সিস্।
প্রথম দিন ক্লারা ভীষণ রেগে গেলো।
তারপর ভাবলো, সে যাবে।
সে সারাক্ষণ সিজারকে তার আশেপাশে দেখতে পায়, এটা কেমন অস্বস্তিকর বিষয়!
★★★
একদিন ক্লারা ফিরছিলো অফিস থেকে।
হুট করে তার মনে হলো সিজার সামনে হাঁটছে।
ও ডাকতে শুরু করলো, সিজার…… সিজার হানি, বলে।
একটা পিক আপ এর সামনে পড়তে যাচ্ছিলো, হঠাৎ নন্দিনী তাকে টেনে সরিয়ে নিলো।

ক্লারার বাড়ি থেকে কিছু দূরেই ডমিনো রেসিডেন্সিয়ালের আরেক প্লটে থাকে নন্দিনী, নন্দিনী তার মাকে নিয়ে থাকে।
প্রচুর পড়াশোনা করা নন্দিনীর কোন চাকরি করতে ভালো লাগে না।
তাই শহরের এপার্টমেন্ট রেন্টে দিয়ে সে মা কে নিয়ে পাহাড়ে চলে এসেছে বছরখানেক হলো।
নন্দিনীর সাথে ক্লারার হালকা আলাপ আছে।
নন্দিনী ক্লারাকে জিজ্ঞেস করলো, তুমি ঠিক আছো ক্লারা?
ক্লারার মানবিক বিপর্যয়ের কথা সবাই জানে এই শহরের।
সবাই তাই সহানুভূতির চোখে দেখে তাকে।
ক্লারা মাথা নাড়লো, সে ঠিক নেই।
নন্দিনী ক্লারাকে নিয়ে গিয়ে তার বাড়িতে বসালো।
নভেম্বরের শুরু হয়েছে, পাহাড়ী এলাকা বলে শীত পরে গিয়েছে।
ফায়ারপ্লেসের সামনে বসে এক কাপ ব্ল্যাক কফি খেতে খেতে নন্দিনী কিছুক্ষণ গল্প করলো ক্লারার সাথে, হালকা আলাপে ক্লারা কিছুটা স্বাভাবিক বোধ করলো সেদিনকার মতো।
তারপর ফিরে চললো, তার কটেজে।
নন্দিনীকে তার খুব মনে ধরলো, যেতে যেতে ক্লারা মনে মনে ঠিক করলো মাঝে মাঝে নন্দিনীর সাথে আলাপ করতে যাবে।
নন্দিনীর মা ও ভীষণ অমায়িক ও আলাপি।
ভীষণ পছন্দ হয়েছে মা আর মেয়েকে।

(চলবে)

শানজানা আলম

অবিশ্বাসী ও গোলাপি অন্তর্বাস ৩

0

অবিশ্বাসী ও গোলাপি অন্তর্বাস ৩

সিজারের মৃত্যুর পরে ওর অফিসে ওর চেয়ারে বসেছে টমাস।
টমাস এন্ড্রু একটু চুপচাপ মানুষ।
সিজার তার বস ছিলো, তিয়াশ আর টমাস সিজারের সাথে একটা প্রজেক্টে কাজ করছিলো।
এর মধ্যে তিয়াশ কিভাবে যেন সিজারের খুব পছন্দের হয়ে যায়।
প্রজেক্ট বিষয়ে ডিটেল আলোচনার নামে সিজার তিয়াশের ফ্ল্যাটে যাওয়া শুরু করেছিল।
তিয়াশের রুমমেট স্নিগ্ধা বলেছে, সিজার প্রায়ই অফিস শেষে তিয়াশের সাথে ওর রুমে আসতো, দু তিন ঘন্টা কাটিয়ে তারপর বাড়িতে ফিরতো।
ক্লারা যদিও বিশ্বাস করেনি।
কারণ সিজার সবসময় বলতো, ওর প্রজেক্টের কাজ করতে তিয়াশের সাথে আলাপ করা প্রয়োজন।
ক্লারা কয়েকদিন বলেছেও, বাড়িতে নিয়ে এসো তিয়াশ আর টমাসকে।
কিন্তু সিজার বাড়িতে অফিসের কাজ কারতে পছন্দ করেনা।
একটা টিমের তিন জনের দুজন নেই, অপঘাতে মারা গেলো, হেড অফিস থেকে বলেছিলো, এই প্রজেক্ট বন্ধ করে দিতে।
টমাস রিকোয়েস্ট করেছে, কাজটা ওরা গুছিয়ে এনেছিলো, এখন অফ করা মানে টমাসের ক্যারিয়ারের জন্য একটা ধাক্কা।
দুজন জুনিয়র এপয়েন্ট করে টমাস লিড দিতে চায় টিমে।
একটা সুযোগ যেন ওকে দেওয়া হয়।
হেড অফিস থেকে টমাসের কথা রাখা হয়েছে।
এখন টমাস মূল প্রজেক্টের দায়িত্বে।

এজন্যই বলে, রোম যখন পুড়ছিলো, নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিল।
সিজারের মৃত্যুতে যদি সবচেয়ে বেশি কারো লাভ হয়, তাহলে সেটা টমাস।
এটা নিয়ে অফিসে কানাঘুষো হয়েছে।
আরো সিনিয়র থাকতে টমাসকেই কেন দায়িত্ব দেওয়া হলো এ নিয়ে কথাও কম হয়নি।
কর্পোরেট পলিটিক্স খুব খারাপ জিনিস, টমাস জানে।
তবু এখানেই টিকে থাকতে হবে।
টমাস খুব মন দিয়ে প্রজেক্টের কাজ করে।
রাত ভোর হয়, টমাসের খেয়াল থাকে না।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সিজার শেয়ার করেনি।
ফাইনাল রিপোর্টের এড করবে বলেছিল, সেগুলো রিপোর্ট ঘেটে বের করার চেষ্টা করে টমাস।

তিয়াশকে খুব ভালো লাগতো, তিয়াশের শরীরটা খুব আকর্ষণীয়, তিয়াশও তার সাথে ফ্লার্ট করতে ছাড়তো না।
তিয়াশের স্বল্প বসনা ছবি দেখে টমাসের একাকী রাত কেটে যেত!
তবে টমাস ভাবতো, তিয়াশকে বিয়ে করা যেতে পারে।
কয়েকবার জানিয়েছেও, কিন্তু তিয়াশ কেন যেন টমাসের মত ইয়াং অফিসারকে রেখে, চল্লিশ বছরের সিজারের প্রতি ঝুঁকে গিয়েছিলো।

এখন সে সব কিছু অতীত হয়ে গিয়েছে।
ক্লারার জন্য খারাপ লাগে, মেয়েটা অনেক ভালো, সহজ সরল।
কিছুতেই সিজারকে অবিশ্বাস করতে পারছে না এখনো।
কি ভালোটাই না বাসে সিজারকে।
সিজাট একটা শুকর ছানা, ক্লারা শুধু দেখতে ভালো নয় বলে, অফিসের জুনিয়র কলিগের সাথে অস্বাস্থ্যকর সম্পর্কে জড়িয়েছে।
প্রকৃতি তার নিজস্ব বিচার করেছে।
ক্লারার জন্য নিশ্চয়ই ভালো কিছু অপেক্ষা করে আছে।

আজ একবার ক্লারার সঙ্গে দেখা করতে যেতে হবে।
বসের স্ত্রী ক্লারা, একটু দায় তো থাকেই।

টমাস অফিস থেকে বেরিয়ে পরলো একটু তাড়াতাড়ি।
ক্লারার জন্য রজনীগন্ধা নিয়ে নিলো।
একবার শুনেছিলো, ক্লারা সাদা ফুল পছন্দ করে, মেয়েটার জীবনটাই সাদা হয়ে গেলো।

টমাস ডোরবেল বাজালো, দরজা খুলে দিলো মার্গারেট।
ক্লারা গিয়েছে নন্দিনীর কটেজে।
উফ, একটা ফোন করে এলেই হতো!
মার্গারেট ডমিনো রেসিডেন্সিয়ালের ইন্টারকমে ফোন করলো নন্দিনীর বাড়িতে।
টমাস এসেছে শুনে ক্লারা ফিরছে জানালো।

একটু পরে নন্দিনীকে নিয়ে ক্লারা ফিরলো।
টমাসকে নন্দিনীর সাথে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার পরে ওরা তিনজন লিভিংরুমে বসে গল্প করলো কিছুক্ষণ।
অনেক দিন পরে ক্লারার খুব ভালো লাগলো, টমাস ছেলেটাকে সে পছন্দ করে।
সিজারও পছন্দ করতো বলেই টিমে নিয়েছিলো, কিন্তু পরে বলতো, তিয়াশ অনেক শার্প, কাজকর্ম ভালো বোঝে।

টমাস এবং নন্দিনীকে ডিনার করে যেতে বললো মার্গারেট।
সে একটা টার্কি রোস্ট করেছে, অতিথিদের দেখে।
জমজমাট আড্ডা আর সুস্বাদু ডিনারের পরে টমাস উঠলো।
নন্দিনীও বের হবে বলে জানালো।
ক্লারা টমাসকে বললো, নন্দিনীকে বাড়িতে ছেড়ে দিতে।

ওরা দুজন ক্লারার বাড়ি থেকে বের হয়ে হাঁটতে লাগলো।
-সত্যি আজকের সন্ধ্যাটা দারুন ছিল, আপনার সাথে আলাপ হয়ে ভালো লাগলো, টমাস নন্দিনীর উদ্দেশ্যে বললো।
-আপনিও খুব ফ্রেন্ডলি, এই পাহাড়ের দেশে এসে আমার তেমন কারো সাথে বন্ধুত্ব হয়নি, আপনার সাথে গল্প করে ভালো লাগলো।
– সত্যি আমি ভেবেছিলাম ক্লারা হয়ত কাঁদবে, ওকে স্বান্তনা দিতে হবে, কিন্তু দেখলাম ও অনেক ভালো আছে এখন!
– ক্লারার বিষয়টা দুঃখজনক, সে সিজারকে সত্যি খুব ভালোবাসে।
-হুম, সিজারই বুঝলো না ক্লারার ভালোবাসা, তিয়াশের সাথে জড়িয়ে গেল!
-আপনার তো অফিস কলিগ ছিল ওরা, আপনি ক্লারাকে জানান নি?
-আসলে ওরা মিশতো প্রজেক্টের দোহাই দিয়ে, আর ক্লারাকে বলে কি লাভ হতো বলুন তো, দেখছেন তো, কিছুতেই অবিশ্বাস করছে না সিজারকে।
বেচারা ক্লারা!
-হুম, আপনার কি মনে হয়, তিয়াশকে কে মারতে পারে, সিজার কি হতে পারে?
– আমি আসলে বিষয়টা নিয়ে খুব শকড, কখনো ডিটেলে ভাবিনি!

নন্দিনীর বাড়ি চলে এসেছে।
টমাসকে একদিন নিমন্ত্রন করে, নন্দিনী ভেতরে চলে যায়।
টমাস এন্ড্রু দাঁড়িয়ে থাকে নন্দিনীর ঘরে ঢোকা পর্যন্ত।
নন্দিনী দরজায় গিয়ে পেছন ফিরে হাত নাড়ে।
তারপর টমাস হাসি দিয়ে ফিরতি উত্তর দিয়ে, নিজের বাড়ির পথে হাঁটে।

(চলবে)

শানজানা আলম

( প্রিয় পাঠক আপনাদের যদি আমার গল্প পরে ভালোলেগে থাকে তাহলে আরো নতুন নতুন গল্প পড়ার জন্য আমার facebook id follow করে রাখতে পারেন, কারণ আমার facebook id তে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন গল্প, কবিতা Publish করা হয়।)
Facebook Id link 👇👇👇
https://www.facebook.com/shanjana.alam

অবিশ্বাসী ও গোলাপী অন্তর্বাস ৪

0

অবিশ্বাসী ও গোলাপী অন্তর্বাস ৪

গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায় মার্গারেটের ।নিজের ঘর থেকে উঠে ডাইনিং এ আসে জল খাবে বলে।
ক্লারার ঘরে আলো জ্বলছে।
দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করা।
মার্গারেট ফিসফিস আওয়াজ শুনতে পায়, প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেও না। উমমম্….
ইদানীং ক্লারার মানসিক সমস্যাটা বাড়ছে।
একা একা কথা বলে, গভীর রাতে আলো জ্বালিয়ে ফিসফিস করে কথা বলে।
মেয়েটাকে অনেকবার বলেছে, দরজা খোলা রাখতে, কিন্তু দরজা খোলা রাখবে না।
নন্দিনীর সাথে আলাপ হওয়ার পরে তো একটু মিশছে কারো সাথে, আগে একা একাই গুমরে থাকতো।

মার্গারেট জল খেয়ে ড্রয়িং রুমে গেলো।
রাত দেড়টা বাজে।
ড্রয়িং রুমে একটা ওয়ালেট পরে আছে, কার ওয়ালেট এটা!
জেন্স মনে হচ্ছে, গত সন্ধ্যায় নিশ্চয়ই টমাস রেখে গিয়েছে। কই ঘুমুনোর আগে তো চোখে পড়েনি, একবার ড্রয়িংরুমে এসেছিলো, জানলা বন্ধ করতে।
তখন তো খেয়াল করেনি!

ওয়ালেটটা হাতে নেয় মার্গারেট, ভেতরে কিছু টাকা আছে, কাগজ পত্র নেই, একটা সিঙ্গেল চাবি!
মার্গারেট আবার ওয়ালেটটা জায়গা মতো রেখে দেয়, সকালে ক্লারাকে জিজ্ঞেস করা যাবে।
ঘরে যাবার আগে আবার কান পাতে ক্লারার ঘরে।
এখন কোন আওয়াজ নেই, মার্গারেট চলে যাচ্ছিলো,
হঠাৎ শুনতে পেলো, লাভ ইউ হানি!

মার্গারেট নিজের রুমে চলে গেলো।

সকাল সকাল ঘুম ভাঙলো মার্গারেট এর। উঠে এসে দেখে ক্লারা চা খাচ্ছে।
মার্গারেট ওয়ালেটটার কথা বলতে গিয়ে তাকালো টেবিলের ওপরে।
-ওহ আচ্ছা, তুমি পেয়েছো তাহলে!
-কিসের কথা বলছো তুমি মার্গারেট?
– এই যে এখানে একটা ওয়ালেট ছিলো?
আমি ভাবলাম টমাস রেখে গিয়েছে!
-কোথায়? আমি তো কোন ওয়ালেট দেখিনি!
-আমি সিওর, নিজে ধরে দেখলাম। জল খেতে এসেছিলাম এখানে।
– ঘুমের মধ্যে কি না কি দেখেছো!

সত্যিই কি তাই, আমি এতোটা সেন্স হারাইনি এখনো, মার্গারেট সিরিয়াস হয়ে যায়।
ক্লারা হেসে বললো, বেশ তাহলে খুঁজে দেখি!
সারা ঘর তন্নতন্ন করে খোঁজা হলো, কোথাও নেই।

মার্গারেট এর কনফিউশান গেলো না।
তার মানে দাঁড়াচ্ছে, ক্লারার ঘরে গতরাতে কেউ এসেছিলো সত্যি সত্যি।
তাহলে কে সে!
ক্লারার কথা মতো সিজারের ভুত!
ভুত তো ওয়ালেট নিয়ে আসবে না।

ক্লারা অফিসে বের হয়ে গেলো।
সন্ধ্যায় নন্দিনীর সাথে আড্ডা দেওয়ার কথা আছে।
নন্দিনী কি নিয়ে কথা বলবে বলেছিলো!
জিজ্ঞেস করা হয়নি।

অফিস থেকে ক্লারা সরাসরি নন্দিনীর বাড়িতে গেলো।
নন্দিনী শাওয়ার নিচ্ছিলো।
নন্দিনীর ওয়ালে একটা ছবি ঝোলানো।
নন্দিনী, ওর মা আর একটা ছেলে।
মুখের আদলে বোঝা যায় নন্দিনীর ভাই হতে পারে।
ওর টেবিলে একটা বই রাখা, A Study on Tribal Community : How to survive in Nature
পৃষ্ঠা উল্টে দেখলো ক্লারা, অনেক গুলো আর্টিকেল, অনেক গবেষকের লেখা।

নন্দিনী বের হলো।
ক্লারা জিজ্ঞেস করলো, নন্দিনী এটা কে?
নন্দিনী তাকিয়ে বললো, আমার ভাই!
কোথায় এখন সে?
শহরে থাকে? ক্লারা আবার জানতে চাইলো!
নন্দিনী বলল, সে কোথায় থাকে আমি জানি না এখন, স্বর্গে বা নরকে হতে পারে।
আমি আর মা তাকে সেন্ট পলস গীর্জার সিমেট্রিতে রেখে এসেছিলাম, যেহেতু সে খুব ভালো মানুষ ছিলো, তাই সে স্বর্গে যেতে পারে, আবার শুনেছি, সুইসাইডাল কেসে নাকি গড স্বর্গে জায়গা দেয় না, তাই নরকেও থাকতে পারে!

ক্লারা মুখ কালো করে ফেললো।
এই পৃথিবীটা খুব নিষ্ঠুর বুঝেছো তো ক্লারা!
ভালোবাসায় বাঁধা যায় না সবাইকে।
চলে যেতে হয়! চলে যায়।
ক্লারার হাতে বইটা দেখে নন্দিনী আবার বললো, ওহ এই বইটা দেখছো!
তোমাকে এটার কথাই বলবো ভেবেছিলাম।
এই বইয়ে একটা আর্টিকেলে পেলাম বাট্রাসোটক্সিনের কথা, এটা এক ধরনের বিষাক্ত নন পেপটাইড।
জঙ্গলে থাকা আদিবাসীরা তীরের ফলায় এই বিষ মাখায়।
ওরা সংগ্রহ করে এক প্রজাতির ব্যাঙের চামড়া থেকে।
আচ্ছা সিজারের স্টমাকে কি এ জাতীয় পয়জন ছিলো?
এটা পাহাড়ী এলাকা বলে আমার মনে হলো!

ক্লারা মুখ থমথমে করে ফেললো, বললো আমি জানি না। আজ আর ক্লারা বসতে চাইলো না!

নন্দিনী বুঝলো, সিজারের বিষয়ে ক্লারা কথা বলতে চায় না।

নন্দিনীর মা কফি নিয়ে এলো, কফি খেয়ে উঠলো ক্লারা।
নিজের বাড়িতে গিয়ে ক্লারা রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো!

বিছানার পাশে সাইড টেবিলে, সিজারের ছবিটা।
মুখ হাসিহাসি!

ক্লারা ছবির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো, আনফেইথফুল!

(চলবে)

শানজানা আলম

( প্রিয় পাঠক আপনাদের যদি আমার গল্প পরে ভালোলেগে থাকে তাহলে আরো নতুন নতুন গল্প পড়ার জন্য আমার facebook id follow করে রাখতে পারেন, কারণ আমার facebook id তে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন গল্প, কবিতা Publish করা হয়।)
Facebook Id link 👇👇👇
https://www.facebook.com/shanjana.alam

MOST POPULAR

HOT NEWS