#গল্প_নয়_সত্যি
#কলমে_প্রমা_মজুমদার
বসার ঘরে মুখ কালো করে বসে আছে দুজন ভদ্রমহিলা।সম্পর্কে তারা প্রাণের বান্ধবী হলেও ঘন্টা তিনেক আগে তাদের সম্পর্ক বদলে গেছে।কিন্তু সমস্যা হলো সেই সাথে তাদের মুখের দশ ওয়াটের হাসিটা হঠাৎ করে নিভে গিয়ে সেখানে অমাবস্যার আধার ভিড় জমিয়েছে!
আমি রান্নাঘর থেকে তাদের দেখছি আর মনে মনে খুশি হচ্ছি।
আমার জীবন নিয়ে পুতুল খেলার জন্য এই শাস্তি তো ওদের প্রাপ্য!
আমার পরিচয় টা আগে দেয়া দরকার তাই না?
আমি পিউ,পড়াশোনায় যদিও লবডঙ্কা তারপরও টেনেটুনে এইচএসসি টা পাশ করেছি এইবার।
সামনে আমার ভর্তি পরীক্ষা কিন্তু সমস্যা হলো আমি নিশ্চিত কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি সুযোগ পাবোনা কারণ আমি পড়াশোনা করতেই ভালোবাসি না। স্কুল কলেজের গণ্ডী না পেরোলে ভার্সিটি পর্যন্ত যেতে পারবো না তাই অনেক কষ্ট করে এই পর্যন্ত এসেছি।
তাই বাবা সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমাকে ঢাকায় কোনো একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাবে।
শুনে আমিও খুশিতে বাক-বাকুম করছিলাম।
আমার কতোদিনের স্বপ্ন ভার্সিটিতে পড়বো,মা বাবার থেকে দূরে একটা স্বাধীন জীবন থাকবে কয়েকটা প্রেম করবো,দুই একটাকে ছ্যাঁকা দিয়ে একটা সুন্দর রণবীর কাপুর টাইপের ছেলেকে বিয়ে করবো তারপর ছানাপানা নিয়ে সুখের সংসার করবো।
আমার স্বপ্নগুলো সত্যি হওয়ার দিকে চার পা এগিয়ে গিয়েছিল কিন্তু আজ সন্ধ্যায় ঘটনাটা আমার সব স্বপ্ন দশ কদম পিছিয়ে দিয়েছে।
এবার আসি আসল ঘটনায়,,,
বসার ঘরে বসে থাকা দুইজন মহিলার একজন আমার মা আর একজন তার প্রাণের সই,আমার মায়ের নাম বীথি আর তার বান্ধবীর নাম নীলা।
তাদের আবার আরেক কাহিনী তারা বিয়ে করেছে দুইজন কলিজার বন্ধুকে।
একজন আমার বাবা আরমান রহমান আর একজন নীলা আন্টির স্বামী রায়হান খান।
তাদের এই বন্ধুত্বের গল্প এই শহরের আকাশে বাতাসে উড়ে।এই যেমন তারা একসাথে আছে আজ অনেক বছর তবুও ওদের মধ্যে কোনো মনোমালিন্য হয়নি কখনও।
দুই বন্ধু একসাথে বাড়ি করেছে দুইজন একসাথে বাজারে যায় একসাথে আড্ডা দেয় আবার একসাথেই সব জায়গায় ঘুরাঘুরি করে।
তাদের বউয়েরাও তেমনই একই রকম জামা কাপড় পরে,এক সাথে শপিং করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে একসাথেই ফুচকা খায় আবার সবজি কিনতে গিয়ে দোকানদারের সাথে একসাথেই ঝগড়াঝাটি করে!
এই পরিবারের একমাত্র অবলা মেয়ে আমি তবে আর একটা ছেলে আছে নীলা আন্টির নাম আদিয়ান খান যদিও সবাই আদি নামেই ডাকে।
নীলা আন্টিরা তিনবছর হলো ঢাকা চলে গেছে,রায়হান আংকেলের বদলি হওয়ায় বাধ্য হয়ে যেতে হয়েছে কিন্তু প্রায় প্রতি মাসে দুই এক দিনের জন্য তারা দুজন চলে আসে আমাদের শহরে তবে তাদের ছেলে আসেনা প্রায় বছর দুই হবে।
তিনি বুয়েটে পড়াশোনা করতেন,ছুটির সময়ও বইয়ের সাথে প্রেম করার জন্য খালি বাসায়
রয়ে যায়।
এই লোকটার জন্য আমার কৈশোরের সময়টা এক্কেবারে জঘন্য রকম খারাপ কেটেছে
তাই সে আমার চক্ষুশূল!
এই যেমন আদি স্কুলের ফার্স্ট বয়,সব বিষয়ে এ প্লাস পায়,আর তুই ছয়ের কোঠা পেরোতে পারিস না।আদির সিজিপিএ এতো ভালো আর তুই পাশ নম্বরটাও তুলতে পারিস না?
আদি বইয়ের থেকে মুখ তুলে না আর তুই বইয়ের মুখও দেখিস না।
আরে বাবা বইয়ের এই ছোট ছোট লেখাগুলো আমার চোখে ঠিকঠাক ধরা পরে না এটা কি আমার দোষ!
আদি নামের মানুষটাকে আমি দুই চোক্ষে সহ্য করতে পারিনা।
তার পেছনের অন্য আরেকটা কারণ হলো সে সব সময় আমকে ছোট করে কথা বলতো আমার পড়াশোনা নিয়ে নাক না গলালে তার পেটের ভাত হজম হতো না।
আমি কোথায় যাই না যাই কার সাথে মিশি সব কিছুতে সে নজরদারি করতো তার বকা শুনে আমি বড় হয়েছি বলতে গেলে।
সে আসলে একটা আস্ত উগান্ডার শিম্পাঞ্জি!
ঢাকা চলে যাওয়ার পর মনে মনে কে যে শান্তি পেয়েছিলাম তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না কিন্তু আমার জীবন আবার সেই শিম্পাঞ্জির সাথে জুড়ে গেল এটা মানতেই পারছিনা।
আদি ভাইয়ার জন্ম আমার থেকে গুণে গুণে পাঁচ বছর আগে হয়েছে,যদিও রায়হান আংকেল আর নীলা আন্টির বিয়েটা আমার মা বাবার বিয়ের কয়েক বছর আগে হয়েছিল তাই সে একটু তাড়াতাড়ি পৃথিবীতে এসেছে।
আর আমি বয়সে তার একটু ছোট বলে আমাকে এমন অপমান করতো এটাই আমার সহ্য হতো না।
কিন্তু আজ কি থেকে কি হয়ে গেল,
সেই ব্রিলিয়ান্ট সুন্দর রাজপুত্র আদির সাথে ঘন্টা তিনেক আগে আমার মতো মাথামোটা পিউয়ের জীবন একসাথে বেধে দেয়া হয়েছে
মানে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে আমাদের!
যেমন তেমন বিয়ে না আবার কাজি আর উকিল ডেকে একদম পাকাপোক্ত বন্দোবস্ত যাকে বলে।
আমি অবাক হয়ে সব দেখছিলাম কিন্তু আমার মা বাবার চোখে মুখে তেমন কোনো ভাবাবেগ নেই মনে হচ্ছে এমনটা হওয়ারই ছিলো।
আমি একটা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কিন্তু তারা আমার মতামত নেয়ার প্রয়োজন পর্যন্ত মনে করলো না,কি আশ্চর্য ব্যাপার!
আমি অবশ্য একটু গাইগুই করেছি দুই একবার না বলেছি আস্তে করে কিন্তু আমার মা জননী রণচণ্ডী রুপ ধারণ করে বলেছে,
“ঢাকা গিয়ে যেনো আমার পাখনা না গজায় তাই আমার পায়ে শিকল পরানোর ব্যবস্থা করেছেন।”
ভাবা যায়,আমাকে এভাবে আটকে রাখার ফন্দি করে রেখেছে তারা!
আর আমার শশুর শাশুড়ি তারা তো বরাবরই আমাকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসতো তাই তাদের মুখের হাসি আর ধরেনা।
পরে জানতে পারি আমার জন্মের পরেই নাকি তারা ঠিক করেছিলেন আমার আর তাদের ছেলের বিয়ে দিয়ে বন্ধুত্বের সম্পর্কটা আরও মজবুত করবে।
কিন্তু আমার কথা হলো সম্পর্ক মজবুত করতে হলে তারা আরও কয়েকটা বাচ্চাকাচ্চা জন্ম দিতে পারতো আমার মতো নিরীহ মেয়ের জীবনটা নিয়ে টানাটানি করে কি লাভ হলো!
তাছাড়া যার গলায় আমাকে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে সে নিজেই তো আমাকে মেনে নেয়নি, রাগ করে কিছুক্ষণ আগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে।
সেই দুঃখে তার নিজের মা আর শাশুড়ি মা মনমরা হয়ে বসে আছে।
আমার চা হয়ে গেছে যাই পুত্র বধু হিসেবে প্রথম আপ্যায়ন করে আসি।
মা আর আন্টি এখন শোয়ার রুমে গেছেন সেখানে বাবা আর রায়হান আংকেল দাবা নিয়ে বসেছেন।
তাদের মনের মতো রোগেরও মিল আছে দুজনেরই ডায়বেটিস তাই তাদের জন্য দুধ চিনি ছাড়া রঙ চা।
অন্যদিকে আমার মা আর নতুন শাশুড়ি মা দুধ ছাড়া চা খেতেই পারে না।
তাই তাদের জন্য স্পেশাল দুধ চা নিয়ে মায়ের রুমের দিকে যাই।
“আদি তো ফোন ধরছে না,কি করি বলতো?”
“আমিও ভাবছি,ছেলেটার মনে কি চলছে বুঝতে পারছি না,আমরা কোনো ভুল করলাম নাতো?”
“আরে ভুল কেন হবে,আদিকে তো কাল জানিয়েছিলাম পিউকেই ওর বিয়ে করতে হবে অন্যায় যদি করে থাকি তা তো করেছি বাচ্চা মেয়েটার সাথে ও তো কিছুই জানতো না,বেচারার মুখের দিকে তাকাতে পারছি না,এভাবে বিয়ে হয়?
কোনো সাজসজ্জা নেই কোনো আড়ম্বর নেই শুধুমাত্র আমাদের এক কথায় মেয়েটা রাজি হয়ে গেছে আর আমার ছেলেটাকে দেখ কেমন রাগ করে বাড়ি থেকে চলে গেল।
আমার ছেলেটা যে কেন এমন টা করলো কিছুই মাথায় আসছে না।”
“ওর কোনো দোষ নেই আমিই মনে হয় একটু বেশি করে ফেলেছি,জানিসই তো মেয়েটা কেমন চঞ্চল।
এখানে সব সময় চোখের সামনে রেখেছি কিন্তু অচেনা শহরে যাবে পড়াশোনা করতে একদম নতুন পরিবেশ যদি ভুল কিছু করে ফেলে এই ভয়েই তোদের কে সব বলেছিলাম কিন্তু তার জন্য যে ওরা দুই বন্ধু আজকেই বিয়ে করিয়ে দেবে তা ভাবতেই পারিনি।
এখন আমার নিজেরই খুব খারাপ লাগছে।”
দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে কথা শোনা ঠিক না কিন্তু কথাগুলো যদি নিজে থেকেই এসে কানে ঢুকে যায় এতে আমার কি দোষ?
মা আর আন্টির কথায় বুঝতে পারলাম তাদের ভয় আর চিন্তা দুটোই হচ্ছে এদের আবার আরেক রোগ দুজনেরই হাই প্রেশার।
তাই নিজের জীবন নিয়ে কষ্ট পাওয়া বাদ দিয়ে হাসি মুখে মায়ের ঘরে ঢুকি।
“আমার হাতের চা তো তোমার খুব পছন্দ তাই তোমার জন্য স্পেশাল চা নিয়ে এলাম।”
আমার কথা শুনে নীলা আন্টি চায়ের মগ টা নিয়ে নেয়।মা ও কেমন করে তাকিয়ে চায়ের মগে চুমুক দেয়।
আমি চা বেশি পছন্দ করি না কিন্তু তাদের সঙ্গ দেওয়ার জন্য একটু নেই।
রাত বাজে একটা,চায়ের আড্ডা শেষ হয়েছে ঘন্টা খানেক হলো।
রাতের খাবার খাওয়ার নামে সবাই একটু টেবিলে বসেছিল কিন্তু খাওয়া হয়নি কারণ আমার কয়েক ঘন্টা আগে হওয়া স্বামী!
তিনি ফোন সুইচ অফ করে রেখেছেন কেউ তার সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন না।
তিনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন এটা জানার জন্য তার দুই মা ব্যাকুল হলেও নিশ্চিন্ত আছেন তার নিজের এবং শশুর বাবা।
তারা বউদের সান্ত্বনা দেয়ার জন্য বলেছেন,”হঠাৎ করে বিয়ের ধাক্কাটা ও নিতে পারছে না তাই হয়তো একটু মাথা গরম হয়ে গেছে।বাইরে গেলে মাথা ঠান্ডা হবে,চিন্তা করোনা কাল সকালে নিশ্চয়ই চলে আসবে।”
কিন্তু আমার মাথায় ঢুকছে না মাথা ঠান্ডা করার জন্য বাড়ির বাইরে যাওয়ার কি দরকার, আমাদের দুই দুইটা ফ্রিজ আছে বরফ ঠান্ডা পানি সব আছে আমাকে বললেই ব্যবস্থা করে দিতে পারতাম।শুধু শুধু এই মানুষগুলোকে টেনশনে ফেলে কি শান্তি পাচ্ছে এই লোক।
এর জন্যই এই ব্যাটা কে আমি দেখতে পারিনা।
যদিও এই বিয়েতে আমার মত ছিলোনা কিন্তু তারপরও মা বাবাকে কষ্ট দেয়ার মতো সাহস বা ইচ্ছা কোনোটাও আমার নেই তাই একটু খারাপ লাগলেও মেনে নিয়েছি।
তবে জানিনা আমার ভবিষ্যতে কি আছে।
আদি ভাইয়ার মাথায় পড়াশোনা ছাড়া আর কিচ্ছু নেই।
ও হ্যা আছে তো অনেক রাগ আছে শরীর ভর্তি ব্যাটা মাথামোটা শিম্পাঞ্জি আবার আমাকে বলে গাধা!
বাবা বেশি রাত জাগতে পারে না তাই মা তাকে নিয়ে শোয়ার ঘরে চলে গেছে।
কিন্তু ছেলের চিন্তায় নীলা আন্টির চোখে ঘুম নেই।আমি বাধ্য হয়ে তার পাশে বসে আছি আর আছে রায়হান আংকেল।
“আজ রাতে মনে হয় ঘুম আসবে না তারচেয়ে ভালো গেইম খেলি।”
আমার কথাটা শুনে তারা আমার দিকে তাকায়।
আমি তাদের মাঝখানে মোবাইল নিয়ে বসলাম।
লুডু কিং খেলায় তারা দুজনেই এক্সপার্ট তাই আমিও তাদের সাথে খেলা শুরু করলাম।
ইতিহাসে আমিই হয়তো প্রথম বউ যে বিয়ের রাতে শশুর শাশুড়ির সাথে বসে লুডু খেলছি!
কিন্তু আমার কয়েক ঘন্টা পুরোনো স্বামীটা আছে কোথায়?
তার মাথা কি ঠান্ডা হয়েছে নাকি এখনো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে!
চলবে?
