#গল্প_নয়_সত্যি
#পর্ব_২
কলমে_প্রমা_মজুমদার
সায়ান নামের একটা ছেলে নিজের ঘরে শুয়ে ফোন দেখছে আর তার ঘরের বারান্দায় বসে একমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে এক যুবক।
ঘুটঘুটে অন্ধকারেও তার চোখগুলো জ্বলজ্বল করছে।
কারণ টা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
যুবকের গায়ে একটা আকাশী রঙের টিশার্ট আর বাদামী ট্রাউজার।
কিছুক্ষণ আগে তার বিয়ে হয়েছে এই পোষাকে ব্যাপারটা অদ্ভুত না?
হ্যাঁ অবশ্যই অদ্ভুত।
আরও অদ্ভুত ব্যাপার হয়েছে তার স্ত্রী এর সাথে কারণ বেচারির বিয়ের পোশাক ছিলো একটা কালো রঙের সাধারণ থ্রিপিস।
তাকে মা আর হবু শাশুড়ি অনেক বার বলার পরও সে জামা পরিবর্তন করে শাড়ি পরেনি কারণ টা যদিও সবার জানা।
মেয়েটার এই বিয়েতে মত নেই,তাকে প্রায় জোর করেই বিয়ে দেয়া হয়েছে।
মেয়েটার চোখে মুখে ছিলো রাজ্যের বিরক্তি আর অস্বস্তি।যেন তাকে কেউ ধরে বেধে পানিতে নামিয়ে দিচ্ছে, আর সে সাতার জানা সত্বেও ডুবে যাচ্ছে।
যুবকটার সেই কথা মনে করেই রাগ হচ্ছে।
মন চাইছে বাবা আর তার বন্ধুকে গিয়ে কয়েকটা কড়া কথা শুনিয়ে আসতে আর মেয়েটাকে বলে আসতে যে ভুল কিছু হয়নি।
কিন্তু ওদের সামনে যেতে পারছে না।
এবার যুবকের পরিচয় দেয়া প্রয়োজন তাই না?
যুবকের নাম আদিয়ান খান,সবার কাছে সে আদি নামে পরিচিত।
ছেলেটা একটু বদরাগী, একটু জেদি আর অনেকটা চাপা স্বভাবের।
আদি পড়াশোনায় তুখোড় ছিলো সবসময় তাই তো স্কুল কলেজে আর সমান নম্বর কেউ তুলতে পারেনি।
বর্তমানে কম্পিউটার সাইন্স নিয়ে পাশ করে ইন্টার্নশিপ করছে একটা বেসরকারি কোম্পানিতে।
আর যে মেয়েটাকে নিয়ে এতো কথা সে পিউ,আদির বাবা মায়ের বন্ধুর একমাত্র মেয়ে।যাকে ছোট থেকে চোখের সামনে বড় হতে দেখেছে যার সব দুষ্টুমি, পাগলামি দেখে দেখে আদি বিরক্ত হতো এক সময়।আবার এই মেয়েটাকেই কয়েকদিন না দেখলে অস্থির লাগে!
সায়ান বারান্দায় এসে বসেছে আদির পাশে।
ছেলেটা কিছুক্ষণ আগে এসেছে তার বাসায়,কাল বিকেলেও দেখা হয়েছে কিন্তু আজ যে এতো কিছু হয়ে যাবে এটা সে ভাবতেও পারেনি।
আদি আর সায়ান খুব ভালো বন্ধু,সেই স্কুল জীবন থেকে একসাথে আছে আদি ঢাকায় পড়াশোনা করলেও সায়ান এই শহরেই একটা কলেজ থেকে অনার্স শেষ করে বাবার ব্যাবসায় যোগ দিয়েছে।
আদির খুটিনাটি সব ওর জানা তাই আজকের ঘটনা শুনে ওর কেমন একটা মিশ্র অনুভুতি হচ্ছে।
এই যে এখন ওর মুখে একটা দুষ্টুমি হাসি,ছেলেটার মন চাইছে শব্দ করে হাসতে কিন্তু বন্ধুর ভয়ে সেটা পারছে না ছেলেটার মাথা আজ ভিষণ গরম।
“ভাবছি আমার ভবিষ্যৎ বাচ্চাদের তোর প্রেম কাহিনী শোনাবো।
কি স্পেশাল লাভ স্টোরি বল, নিজের ভালোবাসার মানুষের সাথেই বিয়ে দেয়া হয়েছে তাও আবার জোর করে!”
সায়ান কথাটা বলে হেসে ফেলে।
আদি ভ্রু কুচকে রাখে,
“হেসে নে আমার অবস্থায় আসলে তোর কি হবে সেটাও দেখবো।”
“আমার অবস্থা জীবনেও তোর মতো হবে না, আমি কাউকে ভালোবাসলে সাথে সাথেই জানিয়ে দেবো তোর মতো সঠিক সময়ের অপেক্ষার নাম করে বসে থাকবো না।”
“আমি ওর চোখে আমার জন্য ভালোবাসা দেখতে চেয়েছিলাম কিন্তু সেখানে আজ বিরক্তি দেখেছি।আমি তো বিয়েতে না করিনি শুধু সময় চেয়েছিলাম তা-ও সেই মাথা মোটা মেয়েটাকে আমার অনুভূতি বোঝানোর জন্য।
কিন্তু ওই মেয়ে সেই সুযোগটা পর্যন্ত দিলোনা।বাপের কথায় ঢ্যাং ঢ্যাং করতে করতে বিয়ে করে নিলো একবার আমার সাথে কথা পর্যন্ত বলার দরকার মনে করলো না!
আমার জায়গায় অন্য কেউ হতো কি হতো একবার ভাবতে পারছিস?”
“মেয়েটার কি দোষ?
কখনও নিজের কথা ওকে বলেছিস?
যখনই সামনে আসতো হয়তো ওকে বকাবকি করতিস নয়তো জ্ঞান দিতিস, মেয়েটা কিভাবে বুঝবে তোর মনে কি আছে?
তোর মতো গোমড়া মুখের বদরাগী ছেলেকে কোনো মেয়ে নিজে থেকে পছন্দ করবে না।
যদিও বাইরে থেকে সুন্দর বলে মেয়েরাও ক্রাশ নামক বাঁশ খায় কিন্তু পিউ তো তোর আসল রুপটা জানে কে জেনে শুনে বিষ খেতে চায় বল?”
“তুই আমার বন্ধু নামের কলঙ্ক, আজ থেকে আমার সাথে তোর সব সম্পর্ক শেষ,কোথায় আমাকে সান্তনা দিবি তা না করে আমার সামনে আয়না ধরে বসে আছিস।
নিজের দোষ এভাবে শুনতে একদম ভালো লাগছে না
সর আমার সামনে থেকে।”
কথাটা বলে আদি ঘরে চলে যায় সায়ান ঠায় দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায়।
আদি বিছানায় গা এলিয়ে দেয়,
আদির জীবনে একটা খোলা হাওয়ার নাম পিউ আবার বলা যায় একটা মন খারাপ করা অনুভূতির নাম পিউ।
আদির এখনো মনে আছে পিউয়ের জন্য সে জীবনে প্রথম আর শেষ বার তার বাবার কাছে থাপ্পড় খেয়েছিল।
ঘটনাটা এমন,,,,
পিউ তখন পাঁচ বছরের হবে,আদি স্কুল থেকে ফিরে দেখে পিউ দুই হাত ভরিয়ে ক্যাডবেরি খাচ্ছে তাদের বসার ঘরের সোফায় বসে।
যা দেখে আদি চরম বিরক্ত হয়, তাই সে একটু জোরে বলে,
“যা এখান থেকে,নোংরা মেয়ে”
কথাটা বলতে দেরি কিন্তু পিউয়ের সাইরেন বাজাতে দেরি হয়না।ওর গলা শুনে পাশের ঘর থেকে দৌড়ে আসে আদির বাবা মা।
আদি পিউয়ের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলো তাই ওকে শান্ত করার জন্য মাথায় হাত দেয় কিন্তু ভুলে ওর চুলে টান লেগে যায় আর এর জন্য সে আরও জোরে কান্না শুরু করে
যা আদির বাবা মা দেখতে পায়।
নীলা পিউকে নিজের বুকের কাছে আগলে ধরে কিন্তু রায়হান খান কিছু না বলে আদির গালে একটা চড় বসিয়ে দেয়।
আদি হতবাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে,বুঝতে পারেনা দোষটা কোথায়?
কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো আদিকে চড় খেতে দেখে পিউ কান্না ভুলে যায়। তবে নীলার আচলের আড়ালে থাকলেও ওর মুচকি হাসিটা আদির চোখের আড়াল হয় না।
পরে অবশ্য জেনেছিল সেদিন পিউয়ের দাদু অসুস্থ ছিল তাই ওর বাবা মা ওকে আদিদের বাসায় রেখে হসপিটালে গিয়েছিল।
সেই থেকেই শুরু ওর জ্বালাতন।
আদি বিকালে পড়তে বসে আর সেই সময় পিউ ছাদে দড়ি লাফ খেলে,মাথার উপর এমন ধুপধাপ শব্দে কি পড়া হয়!
আদির পছন্দ বীথি আন্টির হাতের চিংড়ি মাছ কিন্তু পিউ তার থেকে একটুও ভাগ দিতে চায় না, ওকে লুকিয়ে দিয়ে গেলেও সে ঠিকই গন্ধ শুকে শুকে আদিদের ঘরে চলে এসে আদির ভাগের টাও খেয়ে যায়।
আদিও কম যায়না, ঘরের মধ্যে এই মেয়েকে কিছু বললে তার মা বাবা তেড়ে আসে কিন্তু বীথী আন্টি তো ওকে বকা দেয় না তাই আন্টির সামনে মেয়ের নামে হাজারটা বিচার দেয় সামনে পেলেই বকা দেয়।
পিউও তেমনই আদির নামে ভুলভাল কথা বানিয়ে বলে নীলার কাছে,আদিও প্রায় দিনই বকা খায় মায়ের কাছে।
আদির নামে নালিশ পিউয়ের মুখে সব সময় তৈরি থাকতো।
পিউ সবার সামনে ভালো মেয়ে হলেও বাড়ির মানুষের আড়ালে চরম দুরন্ত।
তাই ওকে শায়েস্তা করা বেশ কঠিন তবুও আদি হার মানে না ওর পেছনে লেগে থাকাটাই আদির স্বভাব।
এভাবে কেটে যাচ্ছিল দিন গুলো
কিন্তু সব পরিবর্তন ঘটে আদির ঢাকা চলে যাওয়ার পর,পিউও ততোদিনে একটু বড় হয়।
আদি সবসময় ওকে বকা দেয় সদ্য সদ্য আত্মসম্মান জন্ম নেয়া মেয়েটার এটা খুব খারাপ লাগে।
তাই আদিকে এড়িয়ে যাওয়া শুরু করে, পারতপক্ষে সামনে পরতে চায় না।আদি বাসায় আছে শুনলে ঘরেও আসে না।
সবার সাথে হেসে খেলে কথা বললেও আদির সামনে মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে আসে।
স্কুল থেকে ফেরার পথে পাড়ার ছেলেদের সাথে গল্প করতে করতে হেটে আসে কিন্তু আদিকে যদি দেখে তাহলে চুপচাপ রিক্সা নিয়ে নেয়।
এগুলোই আদির জন্য ঝামেলা হয়ে যায়।
প্রথম প্রথম পাত্তা দেয়নি কিন্তু দূরে গিয়েই বুঝতে পেরেছে পিউ নামের জঞ্জাল টা তার পিছু ছাড়ছে না।
মাথার নিউরনে এমনভাবে ঢুকে গেছে যে চাইলেও বেড় করতে পারছে না।
পিউকে না দেখলে কেমন পাগল পাগল লাগে কিন্তু সেই গাধা মেয়েটা কিছুই বুঝতে পারেনা। অন্ধ কি-না!
চোখের ভাষা বোঝার বদলে রাগের কথাগুলোই শুধু বুঝতে পারে।
ওর সামনে কথা বলতে গেলেই সব এলোমেলো হয়ে যায় আদির, কিভাবে মনের কথা বলতে হয় তার জানা নেই।কিন্তু মেয়েটা তো পারতো বিয়ের আগে ওর সাথে একবার কথা বলতে।
তাহলে হয়তো একবার চেষ্টা করা যেতো।
যেই মেয়েটার জন্য আদির জীবনটা এলোমেলো হয়ে আছে
সেই মেয়েটাই এখন তার বিবাহিত স্ত্রী!
জীবন এমন কেন?
এই মাথা মোটা মেয়ের উপর কি রাগ করবে আসল দোষী তো এই
বাবা মা গুলোই।
নতুন জায়গায় গিয়ে যদি খারাপ কিছু করে বসে এই ভয়েই জোর করে বিয়ে দিয়ে দিল!
এতোদিন দূরে থেকেও তাদের মেয়ের খেয়াল রেখেছি আর এখন তো আমার কাছাকাছি থাকবে সাহস পাবে নাকি ওই মেয়ে কিছু করার একদম হাত পা ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখব।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ঘুমের দেশে পাড়ি জমায় আদি।
পিউকে আদি ভালোবাসে কথাটা যেদিন প্রথম জেনেছিল সেদিন সত্যিই বিশ্বাস করতে পারেনি সায়ান।
ওরা একই বাড়িতে থাকে ছোট থেকে একসাথে বড় হয়েছে যদিও দুজনের বাবার বন্ধুত্বের সম্পর্ক কিন্তু বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় এক পরিবার।
পিউ একটু চঞ্চল হলেও বেশ মিষ্টি স্বভাবের।দেখতেও যেমন সুন্দরী ব্যবহারও তেমন ভালো।
কিন্তু সেই মেয়েটার সাথে আদির সাপে নেউলে সম্পর্ক, ওকে সারাক্ষণ বকার উপর রাখে
পিউও কম যায়না পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করা ওর স্বভাবে পরিণত হয়।
এটা অবশ্য ছোট বেলার কথা পিউ একটু বড় হওয়ার পর আদি চলে যায় ঢাকায়।
তখন একটু দূরত্ব হয় দুজনের মধ্যে তবে সেই সময়টাতেই আদি অনেক কিছু বুঝতে পারে।
পিউ শুধু মাত্র ওর বাবা মায়ের বন্ধুর মেয়ের চেয়ে অনেক বেশি কিছু ওর জীবনে।
পিউকে দেখার জন্য কতোদিন যে এই শহরে এসেছে তা গুণে শেষ করা যাবে না।
সবাইকে না জানিয়ে আসতো বাইকে করে মাথায় হেলমেট থাকতো যার জন্য কেউ চিনতে পারতো না।
সায়ানের কাছে লুকিয়ে রাখতে পারেনি বেশিদিন তাই সে সব জানতো প্রথম থেকেই।
পাগলের মতো ভালোবাসে মেয়েটাকে আদি তাই ওর আশে পাশে কোনো ছেলেকে ভিড়তে দেয়নি আজ পর্যন্ত।
বোকা পিউ অবশ্য তার কিছুই জানতো না,কিভাবে জানবে মুখ ফুটে কিছু জানালে তো জানবে।
সায়ান কথাগুলো ভেবে মনে মনে হাসে।
আদি ফোন বন্ধ করে রেখেছে আরমান আংকেলকে সে কিছুক্ষণ আগে টেক্সট করে জানিয়েছে আদি তার এখানে আছে।
সায়ান ঘরে ঢুকে দেখে আদি বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে আছে।
সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে জীবনে প্রথম এমন জামাই দেখলাম যে বিয়ের প্রথম রাত বউকে রেখে বন্ধুর সাথে কাটাচ্ছে।
আহারে ভালুপাশা!
চলবে?
