#গল্প_নয়_সত্যি
#অন্তিমপর্ব
#কলমে_প্রমা_মজুমদার
“কাকে ভালো লাগে”
কথাটা বলতে গিয়ে আদির গলা কেপে উঠে।
“আমাদের কলেজের সামনে প্রায়ই আসতো একটা ছেলে কালো রঙের বাইক নিয়ে।
আমি অবশ্য মুখটা দেখিনি, তবে পেছন থেকে দেখেই ভালো লেগেছে ছেলেটাকে।
ছেলেটা এখানেও আসে মাঝে মাঝে,ভাবছি একদিন নিজে থেকেই কথা বলবো।”
আদি আস্তে করে ধরে রাখা শ্বাস ছেড়ে একটু মুচকি হাসে তবে তা পিউয়ের আড়ালে।
“তোকে কি কলেজে ছেলে দেখতে পাঠানো হতো নাকি পড়াশোনা করতে?
এর জন্য রেজাল্টের এই হাল,বই রেখে ছেলেদের পেছন দেখাতেই বেশি সময় নষ্ট করেছিস।
তবে একটা কথা না বলে পারছি না
মানুষ সামনের চেহারা দেখে পছন্দ করে আর তুই পেছন দেখে পছন্দ করেছিস বাহ্ তোর পছন্দের তারিফ না করলেই নয়!”
পিউ মাথা নামিয়ে নেয়,কি আর বলবে,কথা বললেই অপমান করে,ওর সহজ সরল মন তাই মনের কথা বলে দেয় তাই বলে এভাবে কথা শুনাবে?
“ঠিক আছে কথা বলে দেখ তোর মতো মাথা মোটা বুদ্ধিহীন মেয়েকে কেউ নিতে চাইবে কি-না।
সব ঠিক ঠাক হলে আমাকে জানাস,আমি ব্যবস্থা করে দেব।”
পিউ একটু অপমানিত বোধ করলো কথাগুলো শুনে তবে এই ব্যাটার কথা শুনার অভ্যাস তার বহু পুরোনো তাই এতোটাও গায়ে লাগে না।
সে তো অন্য একটা হিসাব মেলানোর চেষ্টায় কথাগুলো বলেছে আজ বাইকটা দেখেই বুকটা কেপে উঠেছিল,দুজন ভিন্ন মানুষের মধ্যে এতো মিল!
“ও,তোমাকে তো বলাই হয়নি আমাদের পাশের বাসায় হিয়া আপু তোমার ফোন নম্বর চাইছিল।”
কথা ঘুরানোর জন্য পিউ অন্য প্রসঙ্গে কথা শুরু করে।
“হিয়া আপুটা আবার কে?”
“আমাদের বাড়ির পাশের বিল্ডিংয়ের দোতলায় এসেছে তোমাকে সেদিন বাড়ির সামনে দেখেছিল তাই ক্রাশ খেয়ে বসে আছে।তুমি চলে আসার পর আমাকে অনেক বার তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছে আমার সাদা মনে তো কোনো কাদা নেই তাই তোমার ডিটেইলস দিয়েছি।
চাইলে কিন্তু একবার কথা বলে দেখতে পারো মেয়েটা অনেক সুন্দরী আর পড়াশোনায় ও ভালো একদম তোমার টাইপ।”
দুনিয়ার যতো মেয়ে আছে সবাই আমার উপর ক্রাশ খায় কিন্তু এই মহিলা আমাকে বাঁশ দেয়।
ওর কি আমাকে চোখে পরে না?
এবার আর পারা যাচ্ছে না ওর বাদড়ামী বন্ধ করতেই হবে।
মনে মনে কথাগুলো ভেবে আদি করুন চোখে পিউয়ের দিকে তাকায়।
“সে তো তোর পুরোনো অভ্যাস আগেও কতো মেয়েকে আমার নম্বর দিয়েছিস আর সেই সব নম্বর ব্লক করতে করতে আমার হাত ব্যাথা হয়ে যেতো।
আমি খবর নিয়ে জেনেছি আমার নম্বর দেয়ার পরিবর্তে তুই ওই মেয়েদের কাছ থেকে ঘুষ খেয়েছিস।
এই তোর লজ্জা করে না এমন কাজ করতে?”
এই,এক সেকেন্ড এইবার কি ঘুষ খেয়েছিস?
“আমি নিজে থেকে কিচ্ছু চাইনি সে নিজেই তো দিয়েছে এতে আমার কি দোষ?”
“কি দিয়েছে?”
“বেশি কিছু না একটা দামী পারফিউম আর একটা বড় ডেইরি মিল্ক সিল্ক ক্যাডবেরি।”
“এই ঘুষ খাওয়ার অভ্যাস তুই ছাড়বি না?”
“নাহ্ ঘুষের হেব্বি টেস্ট তুমি বুঝবা না।”
“আরে গাধী এতোদিন তো বাপের বন্ধুর ছেলে ছিলাম তাও মানা যেতো এখন তো তোর বিয়ে করা জামাই এবার অন্তত আমাকে রেহাই দিতি!”
“নিজের স্বামীর ফোন নম্বর দেয়ার বিনিময়ে ঘুষ খাচ্ছিস এটা শুনলে মানুষ কি বলবে একবার ভেবে দেখেছিস?”
পিউ মুখ কাচুমাচু করে বসে আছে সত্যিই এভাবে তো ভেবে দেখেনি,কিন্তু পারফিউম আর চকলেটের লোভ কি ছাড়া যায়!
পিউ আর কিছু বলে না আদি মুখটা লাল করে ওর দিকে চেয়ে আছে বোঝাই যাচ্ছে রাগে বোম হয়ে আছে,যে কোনো সময় ফেটে যেতে পারে।
“তোর বাপ মায়েরা আমাকে নিয়ে কাবাডি খেলেছে আর তুই আমাকে নিয়ে ফুটবল খেলছিস বলদ মহিলা!
নিজের জামাইকে বর্গা দিতে চায় এমন বলদ মেয়েকে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছে আমার সহজ সরল মা বাবা।
আমার ইচ্ছা করছে এক্ষুণি তোর মাথাটা দুই ভাগ করে দেখতে আসলেই কি এখানে গোবর আছে নাকি একদম খালি।
এই তোর মা বাবারা কি জানে তোর এই গুণের কথা, বলবো তাদের আদরের বাদর মেয়ের কীর্তিকলাপের কথা?”
পিউ মাথা নিচু করে বসে আছে নাহ্ এবার একটু বেশিই হয়ে গেছে,কাল বাড়ি গিয়ে হিয়া আপুকে একটা কিছু বুঝিয়ে কাটাতে হবে।পিউ কিছু বলার জন্য মাথা তুলে কিন্তু আদির কথা শুনে চুপ হয়ে যায়।
“চার বছর অনেক জ্বালিয়েছিস, বিয়ের পরও জ্বালাচ্ছিস অনেক হয়েছে অপেক্ষা,আর পারছি না।
আগামী মাসেই আনুষ্ঠানিক বিয়ে হবে আজ থেকেই কেনাকাটার লিস্ট করা শুরু করবি।আর তুই কতো গিফট নিতে পারিস আমিও দেখবো!
মাথামোটা,বেয়াদব,রামছাগল তুই জীবনেও মানুষ হবি না!
ভালোবাসা কতো প্রকার আর কি কি তোকে হারে হারে বোঝাবো।
আমার জীবনটা ভাজাভাজা করে এখন আসছে বাইক ওয়ালার সাথে প্রেম করতে,আরে বলদ মেয়ে বাইকের নম্বরটা যদি মাথায় রাখতি তাহলে তো এতোদিনে সব বুঝতে পারতি।
এতোদিন খালি আমার পেছন দেখে গেছে গরু!
এখনই তোকে নিয়ে মায়ের কাছে যাব।”
পিউ গোলগোল চোখ করে আদির দিকে তাকায় ওর ফর্সা মুখ রাগে লাল হয়ে আছে।
পিউ এখন কিছু বুঝতে পারছে ইশশ এতো বড় ভুল কিভাবে করলো?
যতই যা হোক ওর আজ খুব মন খারাপ হয়েছে। একটু নাহয় ভুল করেছে তাই বলে এমন করবে?ভালোভাবে বুঝিয়ে বললেই তো হয় এভাবে গাধা,গরু,ছাগল বলে ওদের অপমান করার কি আছে!
“এই মেয়ে এতো বেলা পর্যন্ত আমার বিছানায় শুয়ে আছিস কেন?”
পিউ আধ শোয়া হয়ে ফোন দেখছিল,আদির কথা শুনে ওর দিকে ভ্রু কুচকে তাকায়।
লোকটা একটা আস্ত গিরগিটি, সারারাত অক্টোপাসের মতো পেচিয়ে ধরে রাখে আর সকাল হলেই ভোল পাল্টে যায়।মনে হয় সে পাশের বাড়ির বউ!
বেয়াদব লোক রাতের বেলায় হয় হিন্দি সিনেমার রোমান্টিক হিরো আর সকাল বেলায় বাংলা সিনেমার ভিলেন!
গিরগিটিও এর স্বভাব দেখে লজ্জা পাবে।
মনে মনে কথাগুলো বললেও মুখে কিছু বলে না সে শান্তি প্রিয় মানুষ কিনা।
“সকালেই উঠেছিলাম মামনি বলেছে এতো তাড়াতাড়ি উঠতে হবে না,শুয়ে থাক।”
“মা বললো আর তুই চলে এসেছিস,এই বুদ্ধি নিয়ে তুই সংসার করবি?শশুর বাড়িতে কি শুয়ে বসে থাকার জন্য এসেছিস?
এই বয়সে তোর বিয়ে দেয়াটাই ঠিক হয়নি।
তোর বাবা মা আমার মতো ভালো মানুষের সাথে এতো বড় অন্যায় কিভাবে করতে পারলো?
তোকে সব শেখাতে শেখাতেই আমি বুড়ো হয়ে যাবো।”
এই লোকের এই এক সমস্যা মুখ খুললে রেলগাড়ীর মতো চলতেই থাকে।ব্যাটা শিম্পাঞ্জির যত্তসব আজাইরা প্যাচাল!
ও বলাই তো হলো না, পিউ আর আদির আনুষ্ঠানিক বিয়ে হয়েছে আজ একমাস হয়ে গেছে।
পিউ আদির জীবনে পাকাপাকি ভাবে চলে এসেছে।
খুব জাক জমক ভাবে ওদের বিয়ের অনুষ্ঠান করা হয়েছিল,অন্যান্য বিয়েতে কনের মা বাবা মন খারাপ করে কিন্তু ওদের ক্ষেত্রে সবার মুখেই হাসি ছিলো। নিজেদের মেয়ের জন্য আদির থেকে ভালো হয়তো আর কেউ হবে না আর তাদের সবার বন্ধুত্বের সম্পর্কটা আত্মীয়তার সম্পর্কের নাম পেয়েছে এতেই হয়তো সবাই আরও বেশি খুশি ছিলো।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিলো পিউ নিচতলা থেকে বিয়ের পর দোতলায় গিয়েছিল সবাই এই নিয়ে খুব হাসাহাসি করে।
আদি অবশ্য অন্য একটা কাজ করেছিল সেদিন,পিউকে নিয়ে সেই কালো বাইকটা দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ঘুরিয়ে নিয়ে পরে বাড়িতে আসে তারপর নীলা খুব যত্ন করে ছেলে আর বউকে বরণ করে নেয়।
পিউ বিয়ের পর থেকে নীলা আন্টিকে মামনি আর রায়হান আংকেলকে বাবাই বলে ডাকছে তবে আদি ডাকের পরিবর্তন করতে পারেনি ওর নাকি লজ্জা লাগে।
এবার পিউয়ের সংসারে ফেরা যাক,
পিউ রাগে গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বের হয়ে যায় আদির কফি আনার জন্য।
সকাল সকাল এমন স্নিগ্ধ সুন্দরী বউকে বিছানায় দেখা যে একটা ছেলের জন্য কতো বড় বিপদ এটা কি এই মেয়ে বোঝে!
নাহ,একদম বোঝেনা,আমার জীবনটা একদম ভাজা ভাজা করে দিচ্ছে আজকাল।
আদি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে,বিছানা থেকে ওঠে যায়।
“পিউ তুই আজকেও আমার তোয়ালে ব্যবহার করেছিস,
এতো চুল কেন বাথরুমে?”
পিউ মাত্রই ঘরে ঢুকেছে কথাগুলো কানে আসতেই মুখে হাসি ফুটে ওঠে।
“তুমি যেমন আমাকে কথা শোনাও আমিও তেমনই তোমাকে শিক্ষা দেই,ইচ্ছে করেই তোমার অপছন্দের কাজ করি।”
পিউয়ের মুখে একটা শয়তানি হাসি।কফি টেবিলে রেখে অন্য কাজ শুরু করে।
তবে পিউয়ের বাবার বন্ধুর ছেলেটা খুব একটা খারাপ না,একটু রাগারাগি করে ঠিকই আবার অনেক ভালবাসে।
বিয়ের পরই সায়ান ভাইয়ার কাছ থেকে পিউ সব জেনেছিল এর জন্য অবশ্য তাদের দুই বন্ধুর মধ্যে রাগারাগি হয়েছে কয়েকদিন দুজনের ডিভোর্স পিরিয়ড চলেছে
এখন অবশ্য সব ঠিকঠাক চলছে।
পিউ কথাগুলো ভেবে হাসে।
বিছানা গোছানো হয়ে গেছে ততোক্ষণে আদিও বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসেছে,ও অফিসে যাবে ওর ইন্টার্নশিপ শেষ হয়ে গেছে গত সপ্তাহে নতুন চাকরিতে জয়েন করেছে।
“এখন আর তুমি ব্যাচেলর নও,তোমার সাথে একটা জলজ্যান্ত বউ আছে।এই ঘরে আর তোমার সব জিনিসে তোমার মতো আমারও সমান সমান অধিকার আছে।
এতোদিন তো আমাকে বিয়ে করার জন্য নিজেই লাফিয়েছিলে এখন বুঝো ঠেলা।
এটা বিয়ের সাইড এফেক্ট তোমাকে মেনে নিতেই হবে!”
আদি অসহায় চোখে পিউয়ের দিকে তাকায়,বিয়ের পর মেয়েটার সাহস বেরে গেছে,মুখের উপর কথা শুনিয়ে দেয় আর তার বাবা মা তো আছেই এই মেয়েকে লাই দেয়ার জন্য।
এই বাড়ির পরিবেশ এখন এমন যে সে বাড়ির ছেলে না ঘর জামাই।
মেয়েকে কিছু বললে সবাই তেড়ে আসে।
থাক ব্যাপার না,একটা মাত্র বউ তাও আবার ফ্রি তে পাওয়া!
আদি পেছন থেকে পিউকে জড়িয়ে ধরে সামনের আয়নায় দুজনের প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে একজনের লজ্জায় রাঙা মুখ অন্যজনের মুখে প্রাপ্তির হাসি।আদি পিউয়ের কানের কাছে ফিসফিস করে বলে,
“মেনেই তো নিয়েছি, তুই আমার জীবনের একমাত্র ভালোবাসা। আমাদের ভালোবাসার গল্পটা শুধু “গল্প নয় সত্যি”
সমাপ্ত
