#গল্প_নয়_সত্যি
#পর্ব_৩
#কলমে_প্রমা_মজুমদার
সকাল প্রায় আটটা,পিউ প্রতিদিন এই সময় এক কাপ চা নিয়ে ছাদে যায় সকালে খোলা হাওয়া গায়ে না লাগানো পর্যন্ত ওর দিন শুরু হয় না।
কিন্তু আজ ব্যতিক্রম হলো পিউ সোফায় শুয়ে আছে ওর পাশের সোফায় চা হাতে বসে আছে নীলা আন্টি আর তার মা।
কাল রাতে দুই ম্যাচ খেলার পর খবর আসে আদি ভাইয়া তার বন্ধুর বাড়ি আছে আর এই কথা শুনে নীলা আন্টি একটু শান্ত হয় তারপর নিজের ঘরে শুতে যায়।
কিন্তু পিউ আর আলসেমি করে নিজের ঘরে যায় না সোফাতেই গা এলিয়ে দেয়।
পিউ ওঠে বসে,নীলা আন্টি ওর দিকে তাকিয়ে বলে ফ্রেশ হয়ে আয় কাল থেকে তো অনেক ধকল গেছে।
একটু কিছু খেয়ে নে বীথি গরম গরম খিচুড়ি রান্না করেছে।
পিউ নিজের ঘরের দিকে যায়,আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে,সে এখনো কালকের জামাটা পরে আছে।
এটা পরেই কাল তার বিয়ে হয়েছে,
সে হেসে ফেলে নিজের দিকে তাকিয়ে।
এই জামাটা যত্ন করে রেখে দিতে হবে। সবাই বিয়ের বেনারসি তুলে রাখে সে বিয়ের জামা তুলে রাখবে!
যে লোকটা উঠতে বসতে তাকে বকা দেয় তার সাথে সারাজীবন থাকতে হবে এটা কিভাবে সম্ভব?
এই লোক নিশ্চয়ই এবার তাকে কথায় কথায় তুলে আছাড় মারবে!
জামাটা একটু কোণায় ছিড়ে গেছে হায়রে তার কপালের মতো জামাও ছেড়া ফাটা।
সে ফ্রেশ হয়ে সে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায় ছাদ না হোক বারান্দার হাওয়া খেয়েই দিন শুরু করা আরকি।
নিচের দিকে তাকিয়ে মুখ হা হয়ে যায়।
তার একদিন পুরোনো স্বামী দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির সামনে,সাথে তার পরানের বন্ধু সায়ান ভাই।
পিউ একটু মনোযোগ দিয়ে আদিকে দেখে,প্রায় দুই বছর পর দেখছে সে আদিকে।আগে প্রতিদিন দেখা হলেও চার বছর ধরে বেশি একটা দেখা সাক্ষাৎ হয় না।
লোকটা দেখতে খারাপ না সুন্দর বলা যায়।এই এলাকার অনেক মেয়েই তো আড়ালে তাকে পছন্দ করে।পিউ নিজেই তো কতো মেয়ের চিঠি এনে দিতো আদিকে কিন্তু সে চিঠি খুলে দেখার বদলে তাকে বকেই শান্তি পেতো।
আর প্রেম পত্র গুলো ভাজ করা অবস্থাতেই ড্রেনের জলে সলীল সমাধি নিতো!
ইশশ এই লোকটার মাথায় একটুও বুদ্ধি নেই যদি থাকতো তাহলে সেই মেয়েগুলোর মধ্য থেকে যে কেউ একজন আজ তার জায়গায় থাকতো।
তাহলে নিশ্চয়ই তাকে নিয়ে এই বাবা মায়েরা টানাটানি করতো না!
আহারে আমার তিন চারটা প্রেম করার স্বপ্ন সব ভেঙে খানখান হয়ে গেলো।
আমার মতো একটা কিউট বাচ্চা মেয়ের সাথে কিভাবে এই লোককে মানায়।ব্যাটা সুন্দর হলে কি হবে স্বভাব তো হরিবোল!
আমার দিকে তাকালেই কপালে দুইটা ভাজ পরে যায়।
কোথায় চেয়েছিলাম রণবীর কাপুর এর মতো কিউট জামাই আর কপালে জুটলো ঋত্বিক রোশানের মতো ভাবওয়ালা গম্ভীর জামাই।তারচেয়ে তো এডলফ খান হলেও ভালো হতো একটা পুকি পুকি ভাইভ আসতো!
নিজের ভাবনায় পিউ নিজেই হেসে ফেলে,লোকটা যদি শুনতে পায় তাহলে আজকেই তার জীবনের শেষ দিন হবে এটা নিশ্চিত।
নাহ্ বিয়ের পর দিন স্বামীর হাতের মার খাওয়ার রেকর্ড সে করতে চায় না তারচেয়ে খিচুড়ি খাওয়াই ভালো।
আদিকে অনেক বুঝিয়ে শুঝিয়ে এই বাড়িতে নিয়ে এসেছে সায়ান।
শত হলেও নতুন বিয়ে করা বউ আছে এখন তার।
“অনেক বেলা হয়ে গেছে এবার বাড়ি চল সবাই চিন্তা করছে।”
“আমার ভালো লাগছে না,চুপ কর।”
“দেখ এমনিতেই কাল সারা রাত আমার সাথে ছিলি এই কথা জানাজানি হলে পরে দেখা যাবে আমার আর বিয়ে হবে না তার চেয়ে ভালো যার আমানত তার হাতে বুঝিয়ে দিয়ে যাই।”
আদি কপালে চারটা ভাজ ফেলে সায়ানের দিকে তাকায়।
“তুই আজ একটু বেশি বলে ফেলেছিস এক্ষুনি আমার সামনে থেকে যা।”
সায়ান মুখটা ছোট করে বলে,” রাগ করিস না সরি,তোর বিয়ের গরম গরম খাবার তো খেতে পারিনি বাসি খাবার টা অন্তত খেতে দে।
এমনিতেও তোর চিন্তায় কাল থেকে তেমন কিছু খাওয়া হয়নি।”
কথাগুলো বলে সায়ান আদির হাত ধরে বাড়ির ভেতর চলে যায়।
রায়হান সাহেব বাড়ি ফিরলে দুই বাড়ির রান্না এক সাথেই হয় এই যেমন আজ সকালে বীথি খিচুড়ি আর মাংস রান্না করেছে তেমনই দুপুরে নীলা সবজি,ইলিশ মাছ আর ডাল ভুনা রান্না করবে।
এটাই হয়ে আসছে কয়েক বছর ধরে।
পিউ খাবার টেবিলে বসেছে, নীলা আন্টি ওর জন্য আলাদা করে ডিম ভেজে নিয়ে এসেছে সাথে তার বানানো আমের আচার।
এমন সময়ই কলিং বেল বেজে ওঠে আদি ড্রইংরুমে এসে দাঁড়াতেই সবাই ওর দিকে তাকায়।
আদিকে দেখে নীলা একটু রাগ করে বসে থাকে।
কিন্তু বীথি আন্টি ছেলেটাকে এক হাতে আগলে নিয়ে বলে,”আর রাগ করে থাকিস না,অনেক বেলা হয়েছে খেতে আয়।
আজ আমি তোর প্রিয় ভুনা খিচুড়ি আর ঝাল মাংস রান্না করেছি।”
“হ্যা খেতে তো হবেই এই বাড়ির নতুন জামাই বলে কথা তাড়াতাড়ি খেতে দাও।
নাহলে এই বাড়ির কর্তাদের তো বিশ্বাস নেই আবার কি হুকুম জারি করে বসে।”
আদির কথা শুনে সায়ান একটু হেসে ফেললেও বাকিদের মুখ হা হয়ে যায়।
আদি এমন কিছু বলবে কেউ আসা করেনি।
আরমান আর রায়হান সাহেব একে অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন,ছেলের মাথা এখনো ঠান্ডা হয়নি বুঝে চুপ করে রইলেন।
বীথি কথার ধাক্কাটা সামলে নিয়ে আদিকে টেবিলে নিয়ে বসায় যেখানে আগে থেকেই পিউ বসা।
নীলা এবার ছেলের দিকে সরাসরি তাকায় তবুও মুখে কিছু বলে না।
কিন্তু বীথি শুধু বসিয়েই শান্ত হয় না আদির সামনে প্লেট ভরে খাবার সাজিয়ে দেয়।
সায়ানকেও পাশে বসিয়ে খাবার তুলে দেয়।
পিউ সব দেখে যায়,কিছুক্ষণ আগেও নীলা আন্টি তাকে যত্ন করে খাবার দিচ্ছিলো কিন্তু এখন সবার নজর ওই আদি নামের শিম্পাঞ্জিটার দিকে।
এর জন্যই গুরুজনেরা বলে,বাপের বাড়ি শশুর বাড়ি কাছাকাছি থাকতে নেই কদর থাকে না।
কিন্তু তার তো শুধু কাছাকাছি না একতলা আর দোতলা, মাঝে মাঝে আবার এক ঘর!
ছেহ্ জীবন মানেই বেদনা!
বিকাল প্রায় চারটা,দুপুরের খাওয়ার সময় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে,আনুষ্ঠানিক বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত পিউ ঢাকায় ভার্সিটির হোস্টেলেই থাকবে।
তারপর সময় সুযোগ মতো দুই পরিবার মিলে বড় করে বিয়ের অনুষ্ঠান করবে।
সায়ান সকালে আর যায়নি, দুপুরের খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ আগে চলে গেছে।
আদিরাও সন্ধ্যায় চলে যাবে ঢাকা যেতে দুই ঘন্টা লাগবে তাই একটু পর রওনা হবে কাল থেকে সবার অফিস আছে।
পিউ এখন একটু শান্তি পাচ্ছে, বিয়ে হয়ে গেলেও সে এখানেই থাকবে আরও কিছুদিন।
পিউয়ের কিছু কাগজ পত্র ফটোকপি করাতে হবে যা আদি সাথে নিয়ে যাবে।
ওর ভর্তির সব কাজ আদি করেছে তাই কিছু কাগজ পত্র এখনো বাকি আছে এখন দুজন বেরিয়েছে ফটোকপির দোকানের উদ্দেশ্যে।
পিউ চুপচাপ আদির পাশে হেটে যাচ্ছে,লোকটার উপর সে যথেষ্ট বিরক্ত কাল এমন ভাবে চলে গিয়ে সে পিউকে অপমান করেছে তারপরও একবার সরি বলেনি।
আর এখন রোবটের মতো হেটে যাচ্ছে।
আরে বাবা বিয়ে যখন করেছিস ভদ্রতা করে টুকটাক কথা তো বলতে পারিস,আজ সারাদিন একই বাড়িতে ছিলো কিন্তু মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের হয়নি।
নাহ্ এই ব্যাটার মুখে মনে হয় করলা ঢুকানো আছে মুখ খুললেই তিতা শব্দ বের হয়।
এমন সময় দেখা হয় এই এলাকার প্রেমিক পুরুষ নিলয়ের সাথে।
নিলয় এই এলাকার প্রায় সব মেয়েকেই প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে ফেলেছে।ছেলেটা দেখতে যেমন সুন্দর কথা বলার ধরন।ওর কথা শুনেই মেয়েদের গায়ে পিপড়া উঠে যায় যা মিষ্টি করে কথা বলে ছেলেটা!
কিন্তু আফসোস সেই ছেলেটা কোনোদিন পিউকে একটাও প্রেমপত্র দেয়নি বরঞ্চ তাকে দেখে উল্টো পথে হাটে।
এই এখন পিউয়ের দিকে চোখ তুলে তাকায়নি কিন্তু আদি ভাইয়াকে দেখে দশবার মাথা নিচু করে সালাম দিয়েছে।
আর তাড়াতাড়ি পাশ কাটিয়ে চলে গেছে আদি ভাইয়া কেমন শকুনের মতো ওর দিকে তাকিয়ে আছে ব্যাপার টা পিউ ঠিক বুঝলো না!
পিউ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনে যায়।
“এখন থেকে টাকা পয়সার প্রয়োজন হলে আমাকে জানাবি আমার কাছ থেকে নিবি”
আদি কথাটা বলে পিউয়ের দিকে তাকায়।
“কোন দুঃখে তোমাকে জানাতে যাব আমার বাপের কি কম আছে?”
পিউ আদির কথার জবাব দিয়ে ওর মুখের দিকেই তাকিয়ে থাকে।
“রামছাগল কি সাধে বলি!
মাথায় বুদ্ধির বদলে আছে শুধু গোবর,কোনো কাজে আসে না তারচেয়ে ভালো মাথায় চারাগাছ লাগিয়ে রাখ কয়েকটা যদি ফল ফুল হয়!
তোকে যে আমার গলায় তো ঝুলিয়ে দিয়েছে তোর বাপেরা সেটা ভুলে গিয়েছিস?এখন যদি বউয়ের দায়িত্ব না নেই তাহলে তো আবার বিচার সভা বসবে।আর বিচার দেয়াতে যে একজন এক্সপার্ট তা আমার চেয়ে ভালো আর কি জানে?
আস্ত একটা মাথামোটা রামছাগল!”
গলা চুলকাচ্ছে কিছু বলার জন্য কিন্তু বুকে সাহস পাচ্ছি না।
বাড়ির ভেতরে হলে গলা ফাটিয়ে কয়েকটা কথা শুনিয়ে দিতাম কারণ সেখানে আংকেল আন্টি আছে যারা আমার দলে কিন্তু এখন তো আমি বাইরে এই লোক আমাকে তুলে আছাড় মারলেও কিছু বলতে পারবোনা।
তাই একটু কষ্ট করে হজম করে নিলাম কথাগুলো।
নতুন নতুন বিয়ের পর স্বামীরা বউদের কতো সুন্দর সুন্দর নামে ডাকে এই যেমন জান,প্রাণ,আত্মা, কলিজা আরও কতো কিউট কিউট নাম।
কিন্তু আমার এই অদ্ভুত স্বামী আমাকে ডাকছে আরও ইউনিক নামে “রামছাগল ”
থাক ব্যাপার না মানিয়ে নিয়েই চলতে হবে।কিন্তু মনের মধ্যে একটা বিরাট প্রশ্ন আমি তো মেয়ে মেয়েরা কিভাবে রামছাগল হয়!
ভালো হচ্ছে কি?
চলবে?
