#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_০৩
রাতের গহীন অন্ধকারকে ভেদ করে নির্মল, শীতল আলো ছড়াচ্ছে রূপালী চাঁদ। ব্যস্ত নগরীর ব্যস্ত সড়কে চলছে পায়ে ঠেলা রিকশাটা। তাল মিলিয়ে সাথে সাথে চলছে চাঁদটাও। আপুর হাত জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রেখে সেই চাঁদ দেখছে মম। একরাশ ক্লান্তি ঘিরে রেখেছে তাকে। একই সাথে এসেছে স্বস্তিও।
হাসপাতালে পাখিকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে মম। এতদিনের জমিয়ে রাখা অভিমান, অভিযোগ, আতঙ্ক, সব উগড়ে দেয় সে। ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদে মেয়েটা। নাকের পানি, চোখের পানি এক করে কাঁদে ঠিক ছোটবেলার মত। প্রথমে পাখির সাথে অভিমান করে, এতদিন তাদের ছেড়ে দূরে দূরে থাকার কারণে। তারপর মান ভাঙলে ঝিনুকের নামে একগাদা বিচার দেয়। কাঁদতে কাঁদতে ঠোঁট উল্টে বলে, ঝিনুক একটুও ভালো না। তাকে এত্ত জোরে মেরেছে যে মনে হচ্ছে গালটাই থেতলে গেল!
সর্বোপরি সে কেঁদেছে বাবার অসুস্থতার জন্যে। অসহায়ত্বের মোটা মোটা অশ্রুকণা গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে তার। বাবা মানে মাথার উপর সেই বটবৃক্ষ, যে সব ঝড়, তুফান, সুনামী থেকে আগলে রেখেছে মেয়েদের। তার এই অবস্থা কি মেনে নেয়া যায়!
পাখি মনোযোগ দিয়ে শোনে ছোট বোনের অভিযোগগুলো। পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। ঠিক ছোটবেলার মত। কোমল গলায় শান্ত হতে বলে তাকে, সান্ত্বনা দেয়। বলে যে, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে, চিন্তা করিস না।’
ব্যস! এই আশ্বাসটুকুই যথেষ্ট ছিল মমর জন্যে। গত নয়দিনে এই ভরসার হাতটাই খুঁজে বেরিয়েছে সে। ঝিনুকের বাড়িতে রাতের পর রাত জেগে থেকেছে। নিঃসঙ্গতা, দুশ্চিন্তা, আর হাহাকার গলা চেপে ধরেছে তার। কেউ জিজ্ঞেস করেনি কেমন আছিস। কেউ মাথায় হাত রাখেনি, একটু সান্ত্বনা দেবার প্রয়োজন বোধ করেনি। সবাই ধরেই নিয়েছে, পরিস্থিতি বোঝার মত যথেষ্ট বড় হয়েছে মম। তাকে মিছি মিছি সান্ত্বনা দেবার প্রয়োজন নেই। কিন্তু সব বুঝলেও, মাঝে মাঝে একটু সান্ত্বনার উষ্ণতাই যে বুকের ভেতরে জমা হতাশার বরফকে গলিয়ে আশা দিতে পারে, সেটা বুঝতে চায়নি কেউ।
মাঝখানে অল্প সময়ের জন্যে জ্ঞান ফিরেছিল মামুন সাহেবের। পাশ ফিরে পাখিকে দেখে একদৃষ্টিতে তাকিয়েই ছিলেন উনি। কিছুটা স্বস্তি ফুটে উঠেছিল চেহারায়, তবুও দৃষ্টিতে ছিল অসহায়ত্ব। কিছু বলার মত অবস্থায় ছিলেন না উনি। চোখের কোণ থেকে গড়িয়ে পড়ে দুফোঁটা অশ্রু। পাখি কোমল হাতে সে অশ্রুকণা মুছে দিয়ে ফিসফিস করে কি যেন বলে তাকে। শুনে ঠোঁটের কোণটা সামান্য কেঁপে ওঠে ওনার। হালকা হাসার চেষ্টা করেন মেয়ের সাথে তাল মিলিয়ে।
এরমধ্যে একজন প্রবীণ ডাক্তার দেখতে আসেন মামুন সাহেবকে। এর আগে তাকে দেখেনি মম। তাকে ঘিরে অন্য ডাক্তারদের ব্যস্ততা ও আচরণ বলে দেয়, এই হাসপাতালের রেগুলার ডাক্তার নন উনি। পাখিই বিশেষভাবে ডেকে এনেছেন ওনাকে মামুন সাহেবের চেকআপের জন্যে।
ডাক্তারের সাথে আলাদাভাবে কথা বলে পাখি বাবার অবস্থা সম্পর্কে। দূর থেকে দেখে মম।
রাতে থাকার নিয়ম নেই হাসপাতালে। এতদিন মামুন সাহেবকে কর্তব্যরত নার্সদের ভরসায় ছেড়ে আসলেও, আজ একজন মেইল নার্সের ব্যবস্থা করেছে পাখি। সে-ই থাকবে রাতে পুরোটা সময় মামুন সাহেবের সাথে।
সবশেষে হাসপাতাল থেকে বের হয়েছে দু’বোন বাড়ির উদ্দেশ্যে। কিন্তু মমরা যেখানে থাকতো সে বাড়ি এখনো বিদ্ধস্ত দশায় পরে আছে। তাই পাখির সাথে ওর বাড়িতেই যাচ্ছে মম।
মম ভেবেছিল, পাখি বোধহয় একগাদা বডিগার্ড নিয়ে, চকচকে কোন দামি গাড়িতে করে চলাফেরা করবে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে হাসপাতালের বাইরে বের হয়ে রিকশা ভাড়া করে সে। চোখে গগলস, মাথায় পেঁচানো স্কার্ফ আর মুখে লাগানো মাস্কের বদৌলতে পাখিকে চেনার উপায় নেই যদিও। হাসপাতালের লবিতে লাগানো টিভিতে পাখিকে নিয়েই আলোচনা চলছে। আর এই মেয়ে নিশ্চিন্তে সবার সামনে দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে আসে হাসপাতাল থেকে।
মিনিট তিরিশেক পর রিকশাটা এসে থামে পাখির বাড়ির সামনে। ভাড়া মিটিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে তারা।
“তুই দাড়া। আমি লাইট জ্বালিয়ে দিচ্ছি।”
ফোনের টর্চ জ্বেলে পাখি তালা খুলে ভেতরে চলে যায়। মম দাঁড়িয়ে থাকে দরজার বাইরে। দরজা থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে পুরোনো একতলা দালানটার দিকে ভালো করে নজর বুলায় মম।
এই সেই বাড়ি, প্রায় আট বছর আগে যেখানে নিজেদের ছোট্ট সংসার সাজিয়েছিল পাখি ও সৌবীর আজওয়াদ। হাতে গুনে তিনবার এসেছে এই বাড়িতে মম। প্রথমবার এসে দেখে গিয়েছিল পাখির ভালোবাসায় কানায় কানায় পূর্ণ সংসার জীবন।
আর এরপর দু’বার এসেছিল তখন, যখন সৌবীর নিখোঁজ। বিদ্ধস্ত পাখি দরজার সামনে বসে থাকতো অপেক্ষায়। ওকে বুঝিয়ে শুনিয়ে নিজেদের সাথে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন মামুন সাহেব। কিন্তু পাখি রাজি হয়নি। পাছে সৌবীর ফিরে এসে যদি তাকে না পায়, সেই ভয়ে!
কি পাগলামিটাই না করতো পাখি সৌবীরের জন্যে! একটা সময় পরে বাড়িটাতে এসে ঘুরে গেলেও, এখানে থাকতো না আর পাখি। স্মৃতিরা গলা চেপে ধরতো তার। পাখির অনুপস্থিতিতে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য লোক ঠিক করে রাখা আছে। যার দরুন আজো এই বাড়ির প্রতিটি কোণা ঠিক আগের মতই রয়ে গেছে। প্রতিটি দেওয়াল আজো বহন করছে পাখি ও সৌবীরের ভালোবাসার চিহ্ন।
মমর ভাবনার মাঝেই হুট করে আলো জ্বলে উঠলো বাড়ির ভেতরে। অন্ধকারাচ্ছন্ন বাড়িটা প্রাণ ফিরে পেয়ে জেগে উঠলো পুনরায়। মম ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। চারপাশটা দেখতে দেখতে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করলো সে। ছিমছাম গোছানো ঠিক সাত বছর আগের মতই। সময়টা যেন থমকে গেছে এই বাড়ির ভেতর। পাখির নিজ হতে সাজানো সংসার, রয়ে গেছে সেভাবেই। সোফার ওপাশে দেওয়ালে আজও শোভা পাচ্ছে পাখি ও সৌবীরের বড় করে বাঁধাই করা ছবিটা। হুইলচেয়ারে বসা সৌবীরের পাশেই বসে আছে পাখি। দুজন দুজনার দিকে তাকিয়ে আছে একরাশ মুগ্ধতা ও ভালোলাগা নিয়ে, ঠোঁটে লেগে আছে হাসি।
“মম, তুই ফ্রেশ হয়ে নে। আমি অনলাইনে খাবার অর্ডার করে দিয়েছি। এসে পরবে এক্ষুনি। কাপড় চোপড় কিছু এনেছিস?”
পেছন থেকে এসে ডাক দিলো মমকে পাখি। তার জিজ্ঞাসু দৃষ্টির উত্তরে মাথা নেড়ে না জানালো মম।
“আমার পুরোনো কিছু জামা কাপড় থাকার কথা আলমারিতে। চল, তোকে পড়ার মত কিছু খুঁজে দিচ্ছি।”
পাখি মমকে নিয়ে চলে গেল তার পুরনো শোবার ঘরটায়। সেখানে আলমারি খুঁজে একটা শুভ্র সাদা ও আকাশী রঙের মিশেল সালোয়ার কামিজ বের করে দিল তাকে। মম সেটা নিয়ে চলে যায় বাথরুমে। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে দেখে পাখি একটা হলুদ রঙের কামিজ নিয়ে ভ্রু কুঁচকে উল্টে পাল্টে দেখছে। মমকে আসতে দেখে পাখি বিরক্তি সূচক ‘চ’ শব্দটা বের করে জিজ্ঞেস করলো,
“আশ্চর্য! জামাটা গায়ে লাগছে না কেন? আমি কি মোটা হয়ে গেছি মম?”
পাখির প্রশ্নে এক সেকেন্ড থমকে তার দিকে তাকালো মম। মোটা তো পাখি হয়েছে। তবে এটা নাদুসনুদুস টাইপের মোটা না, আগের চেয়ে একটু ভরাট হয়েছে শরীর, এই যা! কিন্তু সেটা পাখি কেন, পৃথিবীর কোন মেয়েকেই বোঝানো সম্ভব হবে না। তাই মম একগাল হেসে বললো,
“কই? নাতো! তুমি তো আগের মতোই আছো আপু।”
“তাহলে কামিজটা লাগছে না কেন?”
বছর সাতেক আগের জামা গায়ে কেন লাগছে না, সে প্রশ্নের কি উত্তর দেওয়া উচিত, ভাবতে লাগলো মম।
“কয়েক বছর ধরে আলমারিতে ছিল তো, না পরতে পরতে মনে হয় ছোট হয়ে গেছে আপু।”
মমর কথায় চিন্তিত পাখি একটু স্বস্তি পেল। কিন্তু পরক্ষণেই সে বুঝতে পারলো, মম তাকে ঢপ দিচ্ছে।
সরু চোখে তাকিয়ে সে বললো,
“জামা ছোট হয়ে গেছে, না? পাম দিস আমাকে?”
“আরে না! থাকে না কিছু কাপড়, ধোয়ার পর ছোট হয়ে যায়? সেরকমই কিছু কাপড় অযথা ফেলে রাখলে ছোট হয়ে যায়। এটা মনে হয় সেই কাপড়ের তৈরি কামিজ।”
মমর বানিয়ে বলা কথা শুনে হেসে দিল পাখি। ছোট বোনটাকে যে কি সাংঘাতিক মিস করেছে সে!
এরপর এক অদ্ভুত কাণ্ড করলো পাখি। নিজের কাপড় বাদ দিয়ে সৌবীরের ভাঁজ করে রাখা পুরোনো একটা টিশার্ট পরে নিল সে। মম অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলো বোনকে। আয়নার সামনে নিজেকে ঘুরে ফিরে দেখছে পাখি। গলার কাছ থেকে টিশার্টটা উঁচু করে ধরে দু একবার জোরে জোরে শ্বাস টেনে নিল সে। যেন এখনো সৌবীরের গন্ধ মিশে আছে তাতে।
মম শুধু অবাকই হয়নি, বিভ্রান্ত সে। এই পাখিকে সে মেলাতে পারছে না সেদিন টিভিতে দেখা অনামিকার সাথে। যেখানে সে কণ্ঠে আবেগ ও বিশ্বাস নিয়ে বলেছিল,
‘আমি প্রেমে পড়েছি এমন এক পুরুষের, যার কাছে জীবনকে ঘৃণা করার হাজারটা কারণ থাকা সত্ত্বেও, সে ভালোবাসাকে বেছে নিয়েছে। আমি ভালোবেসেছি তাকে, দিনশেষে যার কাঁধে আমি নির্দ্বিধায় মাথা রেখে জীবনের সবটুকু সুখ বা কষ্ট ভাগ করে নিতে পারবো।
আমি তাকেই বিয়ে করেছি, যে সব রকম পরিস্থিতিতে শক্ত করে আমার হাত আঁকড়ে রাখার সামর্থ্য রাখে।’
***
ঘড়ির কাঁটা একটা ছুঁই ছুঁই করছে। খাবারের পার্সেল এসেছে আরো ঘন্টাখানেক আগে। দু’বোন মিলে সোফায় বসে টিভিতে নাটক দেখতে দেখতে খাচ্ছে আর টুকটাক কথা বলছে। মাঝখানে ঝিনুক একবার ফোন করেছিল মম কোথায় আছে জানতে। পাখির কথা শুনেই টুস করে কল কেটে দিয়েছে সে।
“আপু?”
কিছুক্ষন নীরব থেকে ডেকে উঠলো মম। অনেক বদলে গেছে পাখি। সাত বছর আগের সেই পাখি আর এখনকার অনামিকার মধ্যে বিস্তর তফাৎ। তখনকার পাখি হলে এতক্ষণে ডিটারজেন্ট ছাড়াই ঝিনুকের শ্বশুরবাড়ির লোকেদের ধুয়ে শুকিয়ে ফেলতো।
“হুম?”
“তুমি কি… মানে সেদিন টিভিতে…”
ইতস্তত করতে থাকে মম। বুঝতে পারেনা কিভাবে জিজ্ঞেস করবে পাখিকে এ ব্যাপারে। সব ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাঝেই একটা স্পষ্ট অদৃশ্য দেওয়াল টানা থাকে। সেই গণ্ডি পেরিয়ে উকি ঝুঁকি দেওয়া মোটেও সভ্যতার লক্ষণ নয়। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে কৌতূহল দমিয়ে রাখাও সম্ভব হচ্ছে না। তাই একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে মম জিজ্ঞেস করেই ফেললো পাখিকে।
“তুমি কি সত্যিই ওদের একজনকে বিয়ে করেছো?”
“হুম।”
টিভির দিকে চোখ রেখে সংক্ষেপে হ্যাঁ-বোধক উত্তর দিল পাখি। ভাবান্তর নেই তার। কিন্তু মম ভীষণ অবাক হলো। অথচ তার তো অবাক হওয়ার কথা না। সে তো সবটাই শুনেছে এবং দেখেছে টিভিতে। তবুও অবাক হতে বাধ্য হলো সে। আমতা আমতা করে বলতে শুরু করলো,
“কিন্তু… ওরা…ওরা তো আমাদের মত না! তুমি কি করে…তাছাড়া সৌবীর ভাইয়া? তুমি তো এত বছরেও তার আশা ছাড়ো নি, তবে এখন কেন? আর ওদের একজনকেই কেন? মানুষ কত রকম কথা বলছে। এই সম্পর্ককে কি সমাজ গ্রহণযোগ্যতা দেবে? এটা কি আদোও বৈধ?”
পাখি টিভির পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে কিছুক্ষন নীরবে তাকিয়ে রইলো মমর দিকে। কোন উত্তর দিল না সে মমর প্রশ্নগুলোর। উল্টো গা ছাড়া ভাবে বললো,
“এসব ছাড় তো! তুই আমাকে এটা বল, চীনের গ্রেট ওয়াল সম্পর্কে কি জানিস?”
“কি?”
প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলায় ভ্রু জোড়া কুচকে তাকালো মম। সে বুঝতে পারলো এই ব্যাপারে পাখি কোন কথা বলতে চাইছে না। কিন্তু মমর ভালো লাগলো না বিষয়টা। পাখির এই সিদ্ধান্তের বড় একটা প্রভাব তাদের সবার জীবনে পড়েছে। সেদিন পুলিশ এসে উদ্ধার না করলে, হয়ত জান হারাতো অথবা, মান। এতকিছুর পর এর কোন দায়ভার কি পাখি নেবে না?
“হুম, বল তো দেখি। খুব তো হাতে পায়ে বড় হয়েছিস। বুদ্ধিতেও কিছু বেড়েছিস নাকি এখনো ঢেঁড়সই আছিস? তোকে বলেছিলাম না তোর পরীক্ষার পর বেড়াতে নিয়ে যাবো। এই প্রশ্নটার উত্তর দিতে পারলে, সত্যি নিয়ে যাবো।”
হাসিহাসি মুখে জানালো পাখি। তর্ক করতে ইচ্ছে করলো না মমর। হয়ত পরে নিজে থেকেই সব খুলে বলবে সে। তাই মম আর ঘাটালো না তাকে। বিরস মুখে সে উত্তর দিলো পাখির প্রশ্নের।
“চীনের গ্রেট ওয়াল মানুষের হাতে তৈরি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্থাপত্য। পাথর ও মাটি দিয়ে তৈরি দীর্ঘ এই প্রাচীরের উচ্চতা প্রায় ৫ থেকে ৮ মিটার এবং দৈর্ঘ্য ৮৮৫১.৮ কিলোমিটার। এটি শুরু হয়েছে সাংহাই পাসে এবং শেষ হয়েছে লোপনুর নামক স্থানে। এগুলি খ্রিস্টপূর্ব ৫ম থেকে খ্রিস্টীয় ১৬শ শতক পর্যন্ত চীনের উত্তর সীমান্ত রক্ষা করার জন্য তৈরি করা হয়।”
একনাগাড়ে গরগর করে বলে গেল মম। বোনের মুখস্ত বিদ্যের বাহার দেখে, মুচকি হাসলো পাখি। ফোনে কিছু একটা বের করে মমকে কাছে এনে দেখালো সে।
“ভেরি গুড! এবার এটা দেখ।”
পাখির ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে প্রথমে মম বুঝতে পারলো না সে কি দেখাতে চাইছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই চোখজোড়া বড় বড় হয়ে গেল তার।
চীনের গ্রেট ওয়ালের গুগল রিভিউ বের করে দেখাচ্ছে তাকে পাখি। অনেকেই সেখানে এক স্টার রিভিউ দিয়ে রেখেছে। কারো যেতে সমস্যা হওয়ায়, তো কারো গাইড ঠিকঠাক না পাওয়ায়। তবে এর মধ্যে কিছু হাস্যকর রিভিউও আছে। যেমন, একজন লিখেছে,
‘আসলে এত বড়াই করার মতো কিছু দেখলাম না। সবাই বলে, এটা নাকি মহাকাশ থেকে দেখা যায়। আমি গিয়েছিলাম, কিছুই দেখতে পেলাম না।
এমনকি বসার জন্যে কোন চেয়ারও নেই সেখানে।
কোন বলদ যে এটা বানিয়েছে, কে জানে। যখন ফাইটার জেট ব্যবহার করা যায়, তখন দেয়াল বানানোর দরকার কী ছিল? smh.’
রিভিউটা পড়ে হাসতে শুরু করলো দু’বোন। রিভিউদাতার মাথায় নির্ঘাত সমস্যা আছে। হাসি থামিয়ে পাখি অবশেষে বললো,
“চিনের গ্রেট ওয়াল পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের মধ্যে প্রথম স্থানে আছে। আজ থেকে ২২০০ বছরেরও বেশি পুরোনো স্থাপত্য শিল্পকে মানুষ গুগলে এক স্টার রিভিউ দিয়ে রেখেছে।
আর সেই মানব সমাজের কাছ থেকে আমরা গ্রহণযোগ্যতা খুঁজি! ব্যাপারটা বোকামি হয়ে যায় না? smh!”
হাসি থামিয়ে বোনের দিকে তাকালো মম। পাখি কি বুঝাতে চাইছে, সেটা উপলব্ধি করতে পারলো সে। আসলেই তো! কোনভাবে, যেকোন কিছু করেও কি সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া সম্ভব? আমরা যাই করিনা কেন, যত নিখুঁতভাবে, নিয়ম মেনেই করিনা কেন, সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া দুঃসাধ্য। দিনশেষে, কেউ না কেউ ঠিক সেখানে খুঁত বের করবেই। তাহলে কেন আমরা সমাজকে প্রাধান্য দিয়ে জীবনের সিদ্ধান্তগুলো নেব? সেটা তো বোকামিই।
চুপ করে রইলো মম বেশ অনেকটা সময়। ভাবলো বিষয়টা নিয়ে। সমাজের চিন্তা বাদ দিলে প্রশ্ন থাকে, পাখি সুখী কিনা। সেটাই তো মুখ্য, নয় কি? পাখি যদি সমাজের বাইরে গিয়ে নিজের ব্যক্তিগত জীবনে সুখী হতে পারে, তবে তাতে কি দোষের কিছু আছে?
টিভির স্ক্রিনে চোখ পাখির। মমকে নিজের মত করে ভেবে সিদ্ধান্তে পৌঁছাবার সময় দিচ্ছে সে। মম পাশ ফিরে দেওয়ালে টাঙানো পাখি ও সৌবীরের ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন। কম তো কষ্ট পায়নি পাখি। এখন নয়ত নিজের শর্তেই একটু সুখ খুঁজে নিল।
“নতুন ভাইয়ার নাম কি আপু?”
একটু পর জানতে চাইলো মম। কিছুটা কৌতূহল থেকে, তো কিছুটা জড়তা কাটাতে। তার এই প্রশ্নে রয়েছে নীরব স্বীকৃতি। সেটা বুঝতে পেরে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো পাখির ঠোঁটে।
“ঘোস্ট”
“হ্যাঁ? এটা আবার কেমন নাম? মানুষের নাম আবার ঘোস্ট হয় নাকি?”
কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো মম। পাখি আড়চোখে তাকালো বোনের দিকে। কয়েক সেকেন্ড পর কপালের ভাঁজ মসৃণ হলো মমর। জিভে কামড় দিয়ে সে নিজেই নিজেকে ফিসফিসিয়ে বললো,
“রাইট, মানুষদের হয়না।”
পাখি হালকা হেসে মাথা নাড়লো শুধু। মমর চেহারাই বলে দিচ্ছে, তার মস্তিষ্ক এই সময় ফুল স্পিডে ঘুরছে।
“দেখতে কিরকম সে?”
একটুপর আবার জিজ্ঞেস করে উঠলো মম। পাখি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই দেওয়ালে টাঙানো ছবিটার দিকে আঙুল তাক করে বললো,
“ঐরকম।”
“সৌবীর ভাইয়ার মত?”
পাখি দু’কাঁধ সামান্য ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ-না এর মাঝামাঝি কিছু একটা বোঝালো। কপাল কুঁচকে আসে মমর আবারো। সে আরো কিছু প্রশ্ন করবে, তার আগেই ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেল আচমকা। পুরো বাড়ি অন্ধকারে ডুবে গেল মুহুর্তেই।
“এই লাইটের আবার কি হলো?”
“আর বলোনা আপু! ইলেক্ট্রিসিটি যে কি বিরক্ত করে আজকাল! জেনারেটর ছাড়া তো চলাই মুশকিল।”
“তুই বস। রান্নাঘরে মোমবাতি আছে, আমি খুঁজে নিয়ে আসছি।”
“আমাকে ফেলে যেওনা আপু! চলো, একসাথে যাই।”
“দরকার নেই। তুই অন্ধকারে ঠুসঠাস এটা সেটার সাথে বাড়ি খেয়ে চিল্লাবি, আর আমার কানের পর্দা ফাটাবি। তুই বস, আমি আসছি।”
পাখি নিজের ফোনের টর্চ জ্বেলে রেখে চলে গেল রান্নাঘরের দিকে। মমর কাছে বাবার ফোনটা থাকে এখন। কিন্তু সেটার টর্চ কাজ করে না।
ফোনের টর্চ একটু পরেই বন্ধ হয়ে গেল। চার্জ শেষ পাখির ফোনের। ঘন আঁধার নেমে এলো চারদিকে। এমনিতেই অন্ধকারে ভয় পায় মম। তার উপর এই পুরোনো বাড়িতে এবং অচেনা পরিবেশে গা ছমছম করতে শুরু করলো তার।
চারদিকে এক অস্বাভাবিক নীরবতা! এর মাঝেই বাইরে থেকে আসা আলোতে সামনে দিয়ে একটা ছায়ার নড়চড় টের পেল সে। মনে হলো, এখানে সে একা নেই, আরো কেউ আছে। শিউরে উঠলো মম।
“কে?”
কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলো মম। কোন উত্তর এলো না। পিনপতন নীরবতা ঘিরে রেখেছে ঘরটাকে। এমনকি পাখিরও কোন সাড়া শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। ভয়ার্ত গলায় মম জোরে ডাকলো,
“আপু!!!”
কিন্তু এবারও কোন উত্তর এলো না। উল্টো অন্ধকারে কিছু একটা আছে, সেই ধারণা আরো প্রগাঢ় হলো। সোফা থেকে উঠে দাড়ালো মম।
“কে ওখানে? চোর নাকি?”
কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে মম আপনমনে বিড়বিড় করে বললো,
“চুরি করতে এসে থাকলে ফিরে যান ভাই। আমার কাছে নিজের বলতে একপাটি জুতো ছাড়া কিছু নেই।”
অন্ধকারে পা টিপে টিপে রান্নাঘরের রাস্তা খুঁজতে লাগলো মম। কিন্তু দু’কদম না যেতেই বাড়ি খেলো দেওয়ালের সাথে। হাত দিয়ে কপাল ঘষতে ঘষতে মমর মনে হলো, রুমের মধ্যিখানে তো কোন দেওয়াল নেই! তবে তার সামনে এটা কি?
চোখ পিটপিট করে সামনে তাকালো সে। বাইরে থেকে আসা আলোতে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলো একটা অবয়ব। নীচ থেকে মাথা তুলে আস্তে আস্তে উপরের দিকে তাকালো মম। ইয়া লম্বা চওড়া অবয়বটি। ঘাড় বাঁকাতে বাঁকাতে বেঁকেই যাচ্ছে। খুঁজতে খুঁজতে মমর চোখ দুটো গিয়ে ঠেকলো অস্বাভাবিক, অতিপ্রাকৃত একজোড়া নিষ্ঠুর চোখে।
বাঘের মতো সরু, তীক্ষ্ম, মধুরঙা একজোড়া চোখ। চোখের মণির চারপাশে লালচে এক বৃত্ত, অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে।
বুকের ভেতরটা ভয়ে শুকিয়ে এলো মমর। কলিজা তখন পানিশূন্য হয়ে গেছে। শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল আতঙ্কের শীতল স্রোত। কোনকিছু আর চিন্তা করতে পারলো না মম। চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে জোরে হাঁকিয়ে উঠলো সে,
“ভূত!!!!!”
***
চলবে…
#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_০৪
“ভূত!!!!!”
চোখজোড়া খিচে বন্ধ করে নিয়ে চেচাচ্ছে মম। অন্ধকার নিস্তব্ধতায় প্রচন্ড কর্কশ শোনালো সে ধ্বনি। সামনের অবয়বটি বিরক্ত হলো এতে। তার সংবেদনশীল শ্রবণেন্দ্রিয় সহ্য করতে পারছে না এই অত্যাচার।
“চুপ!”
রুক্ষ স্বরে এক ধমক দিলো অবয়বটি মমকে। সাথে সাথে মমর গলার আওয়াজ ফুরিয়ে এলো। ভারী, কর্কশ গলার স্বর তার। ঠিক যেন শিকারী বাঘের চাপা গর্জন! কোন স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে মুখ থেকে এরকম শব্দ বের করা সম্ভব নয়। মম কি তবে অন্ধকারে ভুল শুনলো?
“আমি ভূত না। ভূত ওঘরে আছে, তোমার বোনের সাথে।”
নাহ্! একদম ভুল শোনেনি মম। ঠিকই শুনেছে সে প্রথমবার। অদম্য কৌতূহল পরাজিত করলো ভয়কে। চোখজোড়া ধীরে ধীরে মেলে তাকালো মম সামনে দাঁড়ানো অবয়বটির দিকে।
কিন্তু অন্ধকারে সেই জ্বলজ্বল করতে থাকা তীক্ষ্ম দৃষ্টি ছাড়া কিছুই নজরে এলো না।
কারো কারো বিশ্বাস, সৃষ্টির সূচনা থেকেই নাকি প্রতিটি ঘটনা পূর্বনির্ধারিত ও প্রকৃতি কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। যদি সেটা মেনে নেওয়া হয়, তবে এই ক্ষনটাকেও প্রকৃতির কারসাজিই বলা চলে।
মম যখন ভয় ও বিভ্রান্তি নিয়ে দাড়িয়ে আছে অন্ধকারে, ঠিক তখনই জ্বলে উঠলো আলো। বিদ্যুৎ ফিরে এসেছে। আর সেই সাথে স্পষ্ট করেছে সামনে থাকা অবয়বটিকে। মমর চিন্তা চেতনা সে সময়টাতে শূন্য হয়ে গেল। ঠোঁটজোড়া আপনাআপনি ঈষৎ ফাঁক হয়ে গেল তার। চারপাশে নেমে এলো কঠোর নীরবতা। শুধু বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
দীর্ঘকায় এক ছেলে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চির মমর মাথা থেকে কমপক্ষে দুই-আড়াই ফুট উঁচু ছেলেটা। কালো পোশাকে আবৃত তার সারা শরীর। মাথার কালো চুলগুলো আড়াল হয়ে আছে একটা বেসবল ক্যাপের নীচে। তবে সামনের দিকে কিছু চুল বেরিয়ে এসে ঢেকে রেখেছে ললাটের সিংহভাগ।
এ পর্যন্ত মেনে নেওয়াই যায়। কিন্তু সমস্যাটা হলো যখন ছেলেটির চেহারার দিকে ভালো করে তাকালো মম।
মুখখানি তীক্ষ্ণ রেখায় গঠিত তার। চোয়ালের হাড় স্পষ্ট, অনমনীয়। সেই গঠনে কোমলতার কোনো স্থান নেই। বরং প্রকাশ পাচ্ছে শুধুই রুক্ষতা। ত্বক মসৃণ, কিন্তু অস্বাভাবিক। সোনালী রঙের চামড়ায় আলো পড়তেই ভেসে উঠছে ক্ষীণ নীলচে আভা। কান দুটো কিছুটা লম্বাটে ও সরু ধাঁচের। শার্টের কলার ভেদ করে দৃশ্যমান গলার দুপাশে থাকা রেখা। যেন হাড়ের অস্বাভাবিক গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কিন্তু এরপরই বাঁধলো বিপত্তি! ঘন কালো ভ্রুজোড়ার নীচে থাকা শিকারি বাঘের ন্যায় ঐ মধুরঙা চোখগুলো সহ মাথাটা হালকা নিচু করে হাসলো লোকটা! দাঁত দেখিয়ে হাসলো! সরু সূচালো দাঁত উঁকি দিলো তার প্রশস্ত ঠোঁটের ফাঁক থেকে। ডানহাতটা উঁচু করে তুলে হালকা নেড়ে সে বললো,
“হাই! কেমন আছো মানবকন্যা?”
***
সকালের মিষ্টি রোদ চেহারায় এসে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেল মমর। আড়মোড়া দিয়ে, উবাসী নিতে নিতে উঠে বসলো সে। মাথাটা ভার হয়ে আছে। ঘুমঘুম ভাবটা কাটেনি এখনো। কিছুক্ষন ঝিম ধরে বসে থাকার পর আস্তে আস্তে মস্তিষ্ক সচল হলো তার।
রাতের কথা মনে পরতেই এক ঝটকা খেল সে।
মধুরঙা চোখের লোক!
কে ছিল ওটা? কি ছিল? কেন ছিল? কোথা থেকেই বা এসেছিল? আচ্ছা, সে স্বপ্ন দেখছিল না তো?
না, না! স্বপ্ন এতটা সুস্পষ্ট হতে পারে না কখনো।
একসাথে অনেক প্রশ্ন মনে এসে জড়ো হলেও, তাদের উত্তর খুঁজে পেল না মম। আশেপাশে তাকিয়ে বুঝলো শোবার ঘরে আছে সে। কিন্তু এখানে এলো কি করে? রাতে ঐ লোকটার চকচকে ধারালো দাঁতের দিকে তাকিয়ে এমন ভয় পেয়েছিল মম যে, ওখানেই জ্ঞান হারিয়ে মূর্ছা যায় সে। এরপর আর কিছু মনে পড়েনা তার।
বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়ায় মম। পাখিকে আগে খুঁজে বের করা দরকার। সে হয়ত কিছু বলতে পারবে। সেটা ভেবে নিয়েই দরজার দিকে পা বাড়ায় মম। সাবধানে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে সে।
পুরো বাড়িটা স্তব্ধ হয়ে আছে। গা ছমছম করে ওঠে মমর। পাখি আবার তাকে একা ফেলে কোথাও চলে যায়নি তো? পরমুহুর্তেই আশঙ্কাটা মন থেকে মুছে ফেললো সে।
নাহ্! পাখি তাকে ফেলে যাবেনা।
পা টিপে টিপে ড্রইং রুমের কাছাকাছি এলো মম। ভেতর থেকে পাখির গলার স্বর ভেসে আসছে। দরজার আড়াল থেকে উঁকি দিলো সে ভেতরে। সোফায় বসে আছে পাখি। আর ঠিক তার পাশের সিঙ্গেল সোফাটায় আছে কেউ একজন। পেছন থেকে কে সেটা বুঝতে পারলো না মম। তবে পাখির কথাগুলো ভেসে এসে পৌঁছালো তার কানে।
“কি করছো তোমরা এখানে? এখানে আসার অনুমতি আছে? বেআইনিভাবে বাংলাদেশে ঢুকেছো, এটা নিয়ে কি পরিমান ঝামেলা হতে পারে, সেই ধারণা আছে তোমাদের?”
“তুমি আমাকে না বলে এসেছো।”
গমগমে আওয়াজ তুলে উত্তর দিল পাখির পাশে বসা পুরুষটা। মম চমকে উঠলো।
এইতো! সেরকমই তো!
কাল রাতে ওই মধুরঙা চোখের লোকটা যেভাবে ভারী কর্কশ গর্জন তুলে কথা বলছিল, সেরকম আওয়াজ এই লোকটারও। ভ্রু কুঁচকে ভাবলো মম, তবে কি এই লোকটাকেই দেখেছিল সে কাল রাতে? কিন্তু এই লোকটার স্বর তো কিছুটা ভিন্ন। কেমন নির্লিপ্ত, যান্ত্রিক শোনাচ্ছে তাকে। আওয়াজটা রুক্ষ হলেও, কথাগুলো শান্ত, সাবলীল।
“তো? আমার বাবা হাসপাতালে ভর্তি আছেন ঘোস্ট, অবস্থা ক্রিটিক্যাল! আমি আসবো না?”
“আমি কি তোমাকে আসতে মানা করতাম? একসাথে আসতে পারতাম আমরা।”
“এই জন্যেই তোমাকে বলিনি। তিন তিনটা গুলি লেগেছিল তোমার শরীরে। এখনো পুরোপুরি সুস্থ নও তুমি। বেডরেস্টে থাকতে বলেছে ডক্টর। আর তুমি? এই শরীরে স্বর্গভূমি ছেড়ে বাংলাদেশে এসে পড়েছো!”
গুলি? স্বর্গভূমি?
মমর মস্তিষ্কে শব্দগুলো ঘুরতে থাকে।
চোখজোড়া বড় বড় হয়ে যায় তার। স্বর্গভূমি থেকে কেউ এসেছে? মানে, হাইব্রিডার্স?
বছর তিনেক আগের কথা।
বৃহত্তর চীনের একটি গোপন পরীক্ষাগারে অভিযান চালায় ইউ.এন. সিকিউরিটি কাউন্সিল ম্যান্ডেট ও চীনের বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার যৌথ টিম। উদ্ধার করে আনে কয়েক শত টেস্ট সাবজেক্টকে।
না, পরীক্ষাগারগুলোতে কোন পশু পাখি ছিলনা। বন্দী ছিল জ্বলজ্যান্ত মানুষ। বিভিন্ন দেশ থেকে ছোট ছোট বাচ্চা ও শিশু-কিশোরদের পাচার করে নিয়ে যাওয়া হতো এসব পরীক্ষাগারে। মাটির নীচে গড়ে তোলা এই গোপন পরীক্ষাগারে তাদের উপর চলতো অমানবিক নির্যাতন ও নৃশংস পরীক্ষা নিরীক্ষা।
প্রথমে ড্রাগের মাধ্যমে তাদের স্মৃতিশক্তি মুছে ফেলা হতো। তারপর ঔষধ ও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ডিএনএ মিউটেশন করে স্থায়ীভাবে বদলে ফেলা হতো তাদের। উদ্দেশ্য ছিল মানুষের ডিএনএ-র সাথে বিভিন্ন প্রাণীর ডিএনএ-র ক্রসলিঙ্কিং এর মাধ্যমে একটা শক্তিশালী সুপার পাওয়ার তৈরি করা। এমন একটা আর্মি তৈরি করা, যার উত্তর পৃথিবীর কোন সৈন্য-সামন্ত বা অস্ত্র দিয়ে দেওয়া অসম্ভব!
শিনহো ফার্মাটিক্যাল কর্পোরেশন নামক চীনের একটি বিখ্যাত ড্রাগ কোম্পানি প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে গোপনে এই বর্বরতা চালিয়ে যায়। কড়া নিরাপত্তায় রাখা বন্দীদের জীবন নিয়ে নোংরা খেলা খেলে তারা বাজারজাত করে নতুন নতুন ঔষধ, স্টেরয়েড ও প্রতিষেধক। এছাড়াও তদন্তে উঠে আসে বড় বড় ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, গবেষক ও রাজনীতিবিদদের নাম, যারা জড়িত ছিলেন শিনহোর সাথে এই কাজে।
বর্বরতার এই অধ্যায়ের নাম দেওয়া হয়েছিল #প্রজেক্ট_পাওন। এ পর্যন্ত চীনের বিভিন্ন জায়গায় এরকম পাঁচটি পরীক্ষাগার থেকে উদ্ধার করা হয়েছে কয়েক হাজার বন্দীকে।
নিজেদের মানুষ বলে পরিচয় দিতে নারাজ তারা, অন্যদিকে মানুষ বলে তাদের গ্রহণযোগ্যতা দিতে নারাজ সভ্যসমাজ। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙেছে ঠিকই, তবে মানব সমাজের জন্যে তাদের উপস্থিতি নিয়ে এসেছে শুধুই আতঙ্ক ও অস্বস্তি। তাই প্রজেক্ট পাওনের বন্দীদের পরিচয় হয়ে ওঠে হাইব্রিডার্স নামে।
চীনের শেংসী দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত একটি পরিত্যাক্ত মিলিটারি বেস ক্যাম্পে পুনর্বাসিত করা হয় হাইব্রিডার্সদের। স্বতন্ত্রতা দেওয়া হয় তাদের। চীনের বুকে একটুকরো স্বতন্ত্র, সার্বভৌম ভূখণ্ড হয়ে ওঠে এই মিলিটারি ক্যাম্প।
হাইব্রিডার্স দ্বারা চালিত এই ভূখণ্ডেরই নাম স্বর্গভূমি।
মুক্তির পর পৃথিবীর দ্বার হাইব্রিডার্সদের জন্যে সাদরে খুলে দেওয়া হয়নি, বরং খুলেছিল শুধু অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের দিন। শুরু হয় অস্তিত্বের লড়াই। সেই লড়াইয়ে তাদের পাশে দাঁড়ায় HFT।
হাইব্রিডার্সদের পুনর্বাসন ও অধিকার রক্ষার্থে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্যোগে সাতজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নিয়ে গঠন করা হয় হাইব্রিডার্স ফিউচারস্ ট্রাস্ট (HFT)। আর এই সাতজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত, সবচেয়ে দুঃসাহসী নামটিই,
অনামিকা আহমেদ পাখি।
অনামিকা শুধু হাইব্রিডার্সদের পাশে দাঁড়ায়নি, সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিয়েই দায়িত্বের ইতি টানেনি, বরং সহযোদ্ধা হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নেমেছে এই লড়াইয়ে। স্বর্গভূমিকে বেছে নিয়েছে নিজের নতুন ঠিকানা হিসেবে।
শুধু সেখানেই থেমে থাকেনি সে। সমাজের বেঁধে দেওয়া নিয়ম, লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, ভয়, প্রশ্ন, অস্বস্তি, সবকিছুকে উপেক্ষা করে মাসখানেক আগে এক হাইব্রিডার্সকে বিয়ে করে অনামিকা।
হাইব্রিডার্সদের ইতিহাসেও প্রথম, একমাত্র এবং অবিশ্বাস্য ছিল এই ঘটনা। তাদের নিজেদেরও মেনে নিতে কষ্ট হয়েছে যে, যেই মানব জাতিকে তারা বর্বর ও ঘৃণ্য হিসেবে জেনে এসেছে, সেই জাতেরই একটা মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে তাদের একজন। কৌতূহলী দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে তারা এই জুটিকে। বুঝতে চায়, কেন একটা মানুষের মেয়ের জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছে ঘোস্ট।
আর উত্তরটা হয়ত এতটা স্পষ্ট আগে কখনোই ছিল না, যতটা হয়েছে দিন দশেক আগে।
অনামিকা ও ঘোস্টের সম্পর্ক ও বিয়েটা গোপন রাখা হয়েছিল স্বর্গভূমিরে বাইরে। এমনকি পাখির পরিবারও জানত না কিছু। কিন্তু খবরটা মিডিয়ায় লিক করে দেওয়া হয় দশদিন আগে। ঠিক হাইব্রিডার্সদের নিয়ে করা আন্তর্জাতিক সম্মেলনের পর, প্রেস কনফারেন্সে। পরিকল্পিতভাবে পাখিকে হেনস্তা ও হত্যার চেষ্টা করা হয় সেদিন।
কিন্তু যেটা পরিকল্পনায় ছিল না, সেটা ছিল পাখির সাহসী স্বীকারোক্তি। পরিকল্পনায় ছিল না, পাখিকে বাঁচাতে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঘোস্টের নিজেকে ঢাল বানানো।
একদিকে, মিডিয়ার আক্রমণাত্মক ও কুরুচিপূর্ণ প্রশ্নবানের বিপরীতে, পাখি দৃঢ় থেকে হাইব্রিডার্সদের পক্ষে কথা বলে অর্জন করে নেয় তাদের চোখে সম্মান। অন্যদিকে, গুলি লাগা সত্ত্বেও নিজের শরীরকে ঢাল বানিয়ে পাখিকে সুরক্ষিত কনফারেন্স হল থেকে বের করে আনার দৃশ্য মন ছুঁয়েছে মানব সমাজের।
“এখানে কি করছো মানবকন্যা?”
নিজ জায়গায় জমে যায় মম। ভাবনার সুতো কাটা পরে আচমকাই। ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে চেয়ে সে দেখে, রাতের সেই মধুরঙা চোখের ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে। তখন না বুঝলেও, এখন ঠিকই বুঝতে পারছে মম। ছেলেটা মানুষও নয়, ভূতও নয়।
সে আসলে হাইব্রিডার্স।
গলা দিয়ে আওয়াজ বের হয় না মমর, নিজের সামনে এই দানবাকৃতির ছেলেটাকে দেখে। গোলগোল চোখে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে পিছিয়ে যাবার চেষ্টা করে মম। কিন্তু ঠিক তখনই পায়ে পা জড়িয়ে পড়ে যায় সে ধপাস করে।
“মম! ঠিক আছিস তুই?”
মমর মাটিতে পড়ার আওয়াজ শুনে ছুটে আসে পাখি। পাখির হাত ধরে উঠে দাড়ায় সে। কিন্তু এক সেকেন্ডের জন্যেও চোখ সরায়নি সে সামনে থাকা ছেলেটার দিক থেকে। ভয়ে ভয়ে পাখির হাত শক্ত করে চেপে ধরে তার পেছনে লুকায় সে।
“আপু!”
“মোমো? এটাই তাহলে সেই মোমো, যে তোমাকে ফোন করে বারবার?”
ঘন ভ্রূজোড়া উঁচু করে জিজ্ঞেস করলো ছেলেটা পাখিকে। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবারো করুন কণ্ঠে ডেকে উঠলো মম,
“আপু?”
“শান্ত হ। ভয়ের কিছু নেই।”
পাখি তাকে আশ্বস্ত করলে কি হবে, রাতে তাকে যে ধারালো দাঁতের ঝিলিক দেখিয়েছে মুহূর্ত, সেটা মস্তিষ্কে গেঁথে আছে মমর।
“আপু!”
“তুমি কি এই একটা শব্দ ছাড়া অন্য কিছু বলোনা মোমো?”
সরাসরি তার সাথে কথা বলায়, ভয়ে আরো গুটিয়ে গেল মম। আরো শক্ত করে চেপে ধরলো সে পাখিকে। কাঁদো কাঁদো স্বরে সে আবার ফিসফিস করে ডাকলো,
“আপু,”
“এক মিনিট! মুহূর্ত? তুমি বাংলা বলা শিখলে কবে?”
কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলো পাখি সামনে দাঁড়ানো ছেলেটাকে। উত্তরে ছেলেটা তার সূচালো দাঁত দেখিয়ে প্রশস্ত একটা হাসি দিয়ে জানালো,
“যখন জেনেছি তোমার একটা অবিবাহিত বোন আছে, তখন থেকে।”
“মানে কি?”
সরু চোখে তার দিকে তাকালো পাখি। কিন্তু ছেলেটা সে দৃষ্টিকে পাত্তা দিল না। উল্টো জানালো,
“মানে বাংলাটা জানা থাকলে তোমার বোনকে পটাতে সুবিধা হবে, তাই শিখেছি।”
“আমার বোনকে পটাবে মানে? তুমি ওকে কেন পটাবে?”
“ঘোস্ট তোমাকে কেন পটিয়েছিল?”
“তুমি এখানে আমার বোনকে পটাতে এসেছো?!”
“অবশ্যই! নইলে স্বর্গভূমির সিকিউরিটি ফাঁকি দিয়ে, তোমার এই ভাঙাচোরা জামাইটাকে নিয়ে আমি বাংলাদেশে আসবো কেন?”
পাখি কিছু বলার আগেই এবার পেছনে বসা পুরুষটি গম্ভীর আওয়াজে বলে উঠলো,
“আমি তো তোমাকে আসতে বলিনি।”
ছেলেটা আবারো ভাবান্তরহীন উত্তর দিল,
“আমিও তো সেটাই বলছি। তুমি না বলা সত্ত্বেও আমি এসছি তো এই জন্যেই।”
“মুহূর্ত! আমার বোনের থেকে দূরে থাকবে তুমি!”
কড়া গলায় সতর্ক করে দিল পাখি। কিন্তু মুহূর্ত নামের ছেলেটা সেটা শুনে চোখজোড়া সরু করে তাকিয়ে বললো,
“কৃতজ্ঞতা বলতে কিছু নেই মানুষদের মধ্যে! দু দুবার তোমার জীবন বাঁচিয়েছি আমি পাখি, আর তুমি তোমার বোনটাকে দিতে পারবে না? তোমার আর ঘোস্টের মিষ্টি প্রেম দেখতে দেখতে আমি তেতো হয়ে গেলাম! আমারও তো ইচ্ছে করে একটা বিয়ে করতে, নাকি?”
মুহূর্তের কথা কর্ণগোচর হতেই মুখটা ঈষৎ ফাঁক হয়ে গেল মমর। বলে কী এই ছেলে! মাথায় সমস্যা আছে নাকি? সে কোন দুঃখে তাকে বিয়ে করতে যাবে? পৃথিবীতে কি মানুষের ছেলেদের অভাব পড়েছে? আর পড়লেও বা কি? এরকম জলহস্তীর মত বিশালকায় দেহের ছেলেকে সে কোনদিনই বিয়ে করবে না। এর নিচে চাপা পড়লে সোজা স্বর্গে যেতে হবে!
“দুবার বাঁচিয়েছ মানে?”
পেছন থেকে আবারো ভেসে এলো সেই কণ্ঠস্বর। তবে এবার সেটা একটু বেশীই স্থির ও শীতল শোনালো মমর কানে। পাখি হঠাৎ করেই তটস্থ হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। তবে হেলদোল হলো না শুধু মুহূর্তের।
“একবার, স্বর্গভূমির গেটে। হেটার্স গ্রুপের হাত থেকে। আরেকবার, দশদিন আগে যখন তুমি অপারেশন থিয়েটারে….”
বলতে বলতে থেমে গেল মুহূর্ত। এতক্ষণে তার খেয়াল হলো, মুখ ফসকে ভুল কথা বলে ফেলেছে সে। পাখি কটমট করে তাকিয়ে আছে মুহূর্তের দিকে তখন। কোনমতে জান নিয়ে ফিরেছে ঘোস্ট অপারেশন থিয়েটার থেকে। এরপর কারো সাহস হয়নি তাকে এটা জানানোর যে, যেই পাখিকে বাঁচাতে সে নিজের জীবন বিপন্ন করেছে, অপারেশন চলাকালীন সেই পাখির উপর আবারো হামলা করা হয়েছিল।
“আমি যখন অপারেশন থিয়েটারে ছিলাম, সে রাতে পাখির উপর আবার হামলা করা হয়েছিল?”
গরগর আওয়াজ করতে করতে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলো ঘোস্ট।
একটা শুকনো ঢোক গিললো মম। এরকম হিংস্র হুংকার সে জীবনে শোনেনি। রক্ত হীম করা সে কন্ঠ। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে পেছনে তাকিয়ে সে উঁকি দেবার চেষ্টা করলো সোফায় বসা লোকটার দিকে। পেছন ফিরে বসে থাকায় এখনো দেখা যাচ্ছে না তাকে।
“আমার কোন দোষ নেই। ন্যায় ওকে একা বাথরুমে যেতে দিয়েছিল। যা বোঝার, ফিরে গিয়ে ন্যায়ের সাথে বুঝে নিও।”
চওড়া দু কাঁধ সামান্য ঝাকিয়ে বললো মুহূর্ত। পাখি আরো একবার চোখ রাঙিয়ে তাকালো মুহূর্তের দিকে। দিলো তো ন্যায়কে ফাঁসিয়ে! বেচারা ন্যায় কি যে যন্ত্রণায় আছে হাইব্রিডার্সদের প্রেসিডেন্ট হয়ে! যে যেভাবে পারে তার ঘাড়ে বন্দুক রেখে চালিয়ে দেয়।
“আর তুমি এতসবের পরও, একা একা বাংলাদেশে এসেছো?”
এবারের কথাটা পাখির উদ্দেশ্যে বলা। পাখি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে তারপর পা বাড়ালো তার দিকে। সোফায় বসা পুরুষটির পাশে হাঁটু মুড়ে বসে তার এক হাত নিজের দুহাতের মুঠোতে পুড়ে নিয়ে অনুরোধের সুরে বলে,
“বাথরুমে কি কেউ দলবল নিয়ে যায় নাকি! বোঝার চেষ্টা করো, এখানে কারো দোষ নেই। ঐ সময় পরিস্থিতি কারো নিয়ন্ত্রণে ছিল না ঘোস্ট।”
পাখি সরে যাবার পর একপলক মুহূর্তের দিকে তাকায় মম। মুহূর্তের দৃষ্টি তখন তার দিকেই নিবদ্ধ। ঐ বাঘের ন্যায় তীক্ষ্ম মধুরঙা চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে আরেকটা ঢোক গিললো মম। চোখ সরিয়ে নেবার সময়টাও নিল না সে। ওভাবেই ছুটে গেল পাখির কাছাকাছি। মাটিতে বসে থাকা পাখির পেছনে দাঁড়িয়ে এবার সে তাকালো সোফায় বসে থাকা পুরুষটির দিকে।
প্রথমবারের মত তাকে দেখে মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো মমর।
পুরুষটির চামড়া একদম ফ্যাকাশে। কিছুটা ধূসর ভাব বিদ্যমান সেখানে। মুখে কাটা দাগের মতো সরু সরু রেখা আছে কিছু জায়গায়। বিশেষ করে কপালের বাম পাশে এবং গলার নিচে। ডান চোখটা স্বাভাবিক, কিন্তু বাম চোখটা? ধূসর এক আবরণের মাঝখানে নীল রঙের লেন্সের মত অংশ রয়েছে চোখের জায়গায়। বসে থাকলেও এই পুরুষটিও যে মুহূর্ত নামক হাইব্রিডার্সের মতোই দীর্ঘদেহী, সেটা বোঝা যাচ্ছে খুব। দুজনের শরীরই শক্ত পোক্ত পেটানো গোছের, তবে ইনি বেশ অনেকটা শুকনো শাকনা গড়নের।
চেনা চেনা লাগছে লোকটাকে। কিন্তু কোথায় দেখেছে তাকে মম, সেটা মনে পড়ছে না। একজন হাইব্রিডার্স কে সে কোথায়ই বা দেখতে পারে? টিভি বা সোশ্যাল মিডিয়ায়? ভাবতে ভাবতে মাথাটা ঘুরিয়ে সামনের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে একটা ঝটকা খেল মম। চোখ পিটপিট করে তাকালো সে দেওয়ালে টাঙানো ছবিটার দিকে। তারপর আবারো ঘুরে তাকালো সোফায় বসা পুরুষটির দিকে। বারকয়েক মাথা এদিক ওদিক ঘুরিয়ে নিশ্চিত করলো সে যা দেখছে তা ভুল দেখেনি।
পরিবর্তনগুলো সরিয়ে নিলে, পুরুষটি দেখতে ঠিক দেওয়ালে টাঙানো ছবিটার মত। ঠিক সৌবীর আজওয়াদের মত! তবে কি…
আর ভাবতে পারলো না মম। তার আগেই এতক্ষণ নরম গলায় ঘোস্টের সাথে কথা বলতে থাকা পাখি উঠে দাড়িয়ে ঘোষণা দিলো,
“ওকে, অনেক হয়েছে। তোমরা আজই চুপচাপ স্বর্গভূমি ফিরে যাচ্ছো। কোন ঝামেলা চাচ্ছি না আমি এখানে।”
“আমি তোমাকে ছেড়ে যাচ্ছি না কোথাও।”
শান্ত স্বরে জানালো ঘোস্ট। পাখি এবার তাকে বিরক্তি নিয়ে বললো,
“ঘোস্ট! জেদ করোনা প্লীজ। আমার এখানে থাকাটা জরুরি।”
পাখির দিকে একপলক তাকিয়ে পুরুষটি বসা থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাড়ালো এবার। পাখির হাতটা ধরে সেটা নিয়ে বুকের বাম পাশে রেখে মাথাটা ঝুঁকিয়ে নরম সুরে সে বললো,
“তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারিনা সুকন্যা। আমার কষ্ট হয়।”
কপাল কুঁচকে এলো মমর। এতক্ষণ পাখির চেহারায় বিরক্তির ভাঁজ থাকলেও, এখন আর তার ছিটে ফোঁটাও নেই। বরং গালে লাল আভা ও ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি নিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে লোকটার অস্বাভাবিক চোখের দিকে।
নিশ্চিত এবার মম। নির্ঘাত এই লোক সৌবীর আজওয়াদই হবে! সে-ও ঠিক এরকমই করতো। আলাভালা সেজে মিষ্টি কথায় মন ভোলাতো পাখির। অথচ ভেতরে ছিল জিলাপির চেয়েও কঠিন প্যাঁচ।
সবে দশ বছর ছিল মমর যখন পাখির বিয়ে হয়। ছোট্ট মমর সাথে সৌবীরের দু’দণ্ড ভালো করে কথাও হয়নি কখনো। মম শুধু দেখেছে, লোকটা নবাবী হালে চেয়ারে বসে তার বোনের উপর ছড়ি ঘোরাতো। সৌবীর আসার আগে সব ঠিক ছিল। কিন্তু সে এসেই পাখিকে সবার কাছ থেকে দূরে করেছে। পঁচা দুলাভাই!
হাতে পায়ে বড় হলেও, মমর সেই ধারণা খুব একটা বদলায়নি এখনও।
মিনিটখানেক পেরিয়ে গেলেও হুশ এলোনা পাখির। সে এখনো ঘোস্টের সাথে হারিয়ে আছে নিজেদের দুনিয়ায়। মমর আর সহ্য হলনা। সে গলা হাঁকিয়ে নাকী সুরে ডেকে উঠলো,
“আপু!”
“আবার আপু? মোমোটাকে কথা বলা শিখাওনি তোমরা পাখি?”
একদম ঘাড়ের উপর থেকে মুহূর্তের আওয়াজ পেয়ে সেদিকে চমকে উঠে তাকালো মম। আশ্চর্য! সে তো টেরই পায়নি কখন এই ছেলেটা এসে ঠিক তার পেছনে দাঁড়িয়েছে। এক লাফে পিছিয়ে গিয়ে পাখির উপর পড়লো সে। আর পাখির পিঠ গিয়ে ঠেকলো অসুস্থ ঘোস্টের বুকের উপর।
“আপু!”
করুন স্বরে আবারো বোনকে ডেকে উঠলো মম। সেটা শুনে পাখি চোখ রাঙিয়ে সাবধান করলো,
“মুহূর্ত!”
“আচ্ছা সমস্যা নেই। আমি শিখিয়ে নেব। ঠিকাছে, মোমো? বলো, ঠি-কা-ছে।”
“আপু….”
“মুহূর্ত! ওকে জ্বালানো বন্ধ করো! মম, তুই আয় তো আমার সাথে।”
***
চলবে…
