#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_০৫
সকাল গড়িয়ে এগারোটা বেজে চলেছে ঘড়ির কাঁটায়। ঢাকা এখন পুরোপুরি জেগে ওঠা এক অস্থির শহর। রাস্তাজুড়ে হর্নের অবিরাম শব্দ, যানবাহনের ধোঁয়ায় ভারী হয়ে উঠেছে বাতাস, মানুষের ভিড়ে ফুটপাতগুলো নিজেদের সীমানা ভুলে গেছে। এই শহরে থেমে থাকার যোগাড় নেই। সবাই কোথাও না কোথাও ছুটছে, জীবন ও জীবিকার তাড়নায়।
হাসপাতালের লবিতে লিফটের সামনে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে মম। কাঁধের ব্যাগটা শক্ত করে চেপে ধরে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে বারবার। অস্বস্তিতে ঘামছে সে। পাখি ঠিক তার সামনে দাঁড়ানো, আর মুহূর্ত পেছনে। ঘোস্ট বসে আছে একটা হুইলচেয়ারে। চেয়ারের হাতল ধরে রেখেছে পাখি। কেন সেটা বুঝতে পারছে না মম। তার বোনের ভাবখানা এমন যেন ছেড়ে দিলেই কেউ নিয়ে পালাবে তার জামাইকে।
অথচ, পাখিকে এক সেকেন্ডের জন্যেও একা ছাড়তে রাজি না ঘোস্ট। অনেক বুঝিয়ে শুনিয়েও কাজ হয়নি। তাই না পারতে ওকে নিয়েই হাসপাতালে এসেছে পাখি। মুহূর্তকে তো আর একা ফেলে আসতে পারে না, তাই সে-ও এসেছে পিছু পিছু। দুজনকেই মাথায় মাঙ্কি ক্যাপ, চোখে গগলস, মুখে মাস্ক পরিয়ে আপাদমস্তক ঢেকে এনেছে। দেখতে জ*ঙ্গি জ*ঙ্গি লাগছে তাদের।
ঘোস্ট এমনিতেই অসুস্থ, রেস্টে থাকার কথা তার। উপরন্তু, দুজন সাড়ে সাত ফুটের শক্ত পোক্ত পুরুষ ঢাকা শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়ালে, সেটা দৃষ্টি আকর্ষন করতে বাধ্য। ভেবে চিন্তে তাই হুইলচেয়ারে বসিয়ে দিয়েছে ঘোস্টকে পাখি। কাকে ফোন করে যেন একটা গাড়ি ও হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করে ফেলেছে ফটাফট।
পাখি যে বেশ ভালো চাপের মধ্যে পরে গেছে, সেটা বুঝতে পারছে মম। একের পর এক ফোনের উপর আছে সে সকাল থেকে। কথাবার্তায় যা বুঝলো মম তাতে, এই দুই বান্দা কাউকে না জানিয়ে স্বর্গভূমি থেকে প্রাইভেট জেট নিয়ে কোনরকম ল্যান্ডিং পারমিট ছাড়াই বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। তারপর এয়ারপোর্টে বেশ ভালো রকমের ঝামেলা পাকিয়ে জেট ফেলে পালিয়ে এসেছে। এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ বিমানটি শনাক্তের চেষ্টায় আছে। কোথা থেকে এসেছে, মালিকানা কার, কি উদ্দেশ্য এসব জানার তোড়জোড় চলছে। এয়ারপোর্ট এরিয়ায় রেড এলার্ট জারি করেছে তারা। লোকাল অথরিটি খুঁজছে দুজনকে। এ অবস্থায় স্বর্গভূমি থেকে বাংলাদেশ এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু ঝামেলা আছে সেখানেও।
স্বর্গভূমি ও বাংলাদেশের মাঝে আছে চীনের সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ। অনুমতি ছাড়া বৃহত্তর চীনের বাইরে উড্ডয়ন নিষিদ্ধ হাইব্রিডার্সদের জন্য।
মোটকথা, এক ফ্লাইটেই বেশ কিছু আন্তর্জাতিক আকাশসীমা আইনকে উড়িয়ে দিয়ে এসেছে এরা।
“শোনো, তোমার পরিচিত ছেলেটা?”
লিফটের লাইনে দাড়ানো এক মধ্যবয়স্ক মহিলা ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলেন মমকে। কৌতূহলী মহিলা বেশ অনেক্ষণ ধরেই লক্ষ্য করছিল ওদেরকে। শুধু উনি কেন, আরো অনেকেই ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। আর এটাই মমর অস্বস্তির কারণ। মহিলার ফিসফিসানো কথা ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না মম হুট করে। তাই কপাল কুঁচকে তাকালো সে।
“জ্বি?”
“ঐযে তোমার পাশের লম্বা ছেলেটা। কি হয়েছে ওর? এরকম চোখ মুখ ঢেকে রেখেছে কেন?”
মহিলার প্রশ্নের উত্তরে একপলক মুহূর্তের দিকে তাকিয়ে মম বললো,
“অসুস্থ।”
“ওহ্! কি হয়েছে?”
“ইনফেকশন।”
“ওহ্, তাই ডাক্তার দেখাতে এসেছো বুঝি?”
মাথা নেড়ে সায় জানালো মম। কথা বাড়াতে চাইলো না সে। কিন্তু মহিলার সে উদ্দেশ্য নেই। উনি আবারো জিজ্ঞেস করলেন,
“কি হয় ছেলেটা তোমার?”
মহিলার কথা শুনে তার দিকে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইলো মম। কি বলবে ভেবে পেল না সে। মহিলা তখনও উত্তরের অপেক্ষা করছেন অধির আগ্রহে। না পারতে মম বলে উঠলো,
“ভাই।”
মমর উত্তর শুনে হাসি ফুটে উঠলো মহিলার চেহারায়। ঠিক ওনার মনমত উত্তরই পেয়েছেন উনি। স্মিত হেসে উনি বললেন,
“এত লম্বা চওড়া ছেলে আজকাল দেখা যায়না। আমার বড় মেয়েটার জন্যে ছেলে খুজছি। আমার মেয়েটাও লম্বা। ৫ ফুট ৮। কিন্তু লম্বা ছেলে পাচ্ছিনা। তোমার ভাইয়ের কি বিয়ে শাদী হয়েছে?”
মহিলা যে সহজে থামবেন না সেটা বুঝতে পারলো মম। কথা কোনদিকে আগাতে পারে বোঝা হয়ে গেছে তার। তাই এবার সে মুচকি হেসে মাথা নেড়ে বললো,
“জ্বি হয়েছে। তিনটা। তিন নম্বর বউয়ের ডেলিভারি আজকে। দোতলার কেবিনে আছে। বাকি দুই বউ এসে চুলোচুলি করে নাক ফাটিয়ে দিয়ে গেছে দুদিন আগে। সেই থেকেই তো ইনফেকশনটা হলো!”
মমর এহেন কথা শুনে ভ্যাবাচেকা খেলেন মহিলা। একবার মম তো আরেকবার মুহূর্তের দিকে তাকালেন অবাক হয়ে।
“বুঝলেন আন্টি, ভাইটার আমার কপালটাই খারাপ। একটা বউও ভালো পরেনি। ভাবছি, এবার বিয়ে করানোর আগে বাড়িতে এনে আগে কদিন লিভ টুগেদার করাবো মেয়েকে। যদি দেখি মেয়ে সাংসারিক, মানিয়ে নিতে পারছে, তাহলেই কথা আগে বাড়ানো হবে, নইলে ক্যান্সেল।”
মমর কথা শুনে চোখমুখ কুচকে তাকালেন মহিলা। মেয়েটা তার সাথে মজা করছে কিনা, সেটা বুঝতে না পারলেও, মনে মনে তাকে বেয়াদব উপাধি দিয়ে দিলেন। মুখে আর কিছু না বললেও, দৃষ্টি দেখে সেটা ঠিক স্পষ্ট বোঝা গেল। মম সেটা বুঝেও, আবার প্রশ্ন করলো,
“আপনার মেয়েটা কি সাংসারিক আন্টি?”
মহিলা কোন উত্তর না দিয়ে উল্টো ঘুরে চলে গেলেন কিছুটা দূরত্বে। হাসি পেল মমর মহিলাকে বিব্রত করতে পেরে। ঠোঁট চেপে রেখে হাসি আটকালো সে। লিফটও এসে পড়েছে ততক্ষণে। ওরা চারজনই উঠে গেল। ধীরে সুস্থে প্রতি এক ফ্লোর পরপর থেমে, লিফট অবশেষে পৌঁছালো এগারো তলায়। ওরা চারজন ছাড়া আর কেউ নামার নেই। প্রাইভেট ফ্লোর এটা। খুব বেশি লোকজন দেখা যায়না এখানে।
লিফট থেকে বের হয়ে এসে নিচু গলায় মুহূর্ত মমকে বললো,
“আমি কিন্তু সব শুনেছি।”
শিউরে উঠলো মম ওর ভারী কর্কশ কন্ঠ শুনে। এখনো অভ্যস্ত হয়নি সে এই রুক্ষ কর্কশ কণ্ঠস্বরে। কি বলছে সে বুঝতে না পেরে ভ্রু কুঁচকে তাকালো মম।
“আমি ঐ মহিলার মেয়েকে বিয়ে করবো না মোমো।”
রাশভারী গলায় বলে উঠলো মুহূর্ত। কি বিষয়ে কথা হচ্ছে বুঝতে পেরে মাথা নেড়ে মম জানালো,
“ঐ মহিলার মেয়েও আপনাকে বিয়ে করবে না। আর আমার নাম মম, মোমো না।”
বলেই দ্রুত পা চালিয়ে কেবিনের দিকে চলে গেল মম। সাড়া সকাল এদের দেখতে দেখতে, ভয় কমে এসেছে তার। এখন কিছুটা বিরক্ত সে শুধু। সকাল থেকে মমর সাথে কথা বলার চেষ্টা করে গেছে মুহূর্ত। এই প্রথম সফল সে। মোমোটা কথা বলেছে তার সাথে! সেই বিজয়ের আনন্দে মাস্কের আড়ালে হাসি ফুটে উঠলো তার ঠোঁটে।
দরজা খুলে কেবিনের ভেতরে ঢুকে মম দেখলো, ঝিনুক বসে আছে মামুন সাহেবের বেডের পাশে। পাখিকে ঘোস্ট ও মুহূর্তসহ ঢুকতে দেখে ভ্রুদ্বয়ের মাঝে ভাঁজ পড়লো ঝিনুকের। মমর উদ্দেশ্যে সে জিজ্ঞেস করলো,
“এরা কারা?”
মম বুঝতে পারলো না কি উত্তর দেবে সে। পাখির দিকে আড়চোখে তাকালো সে অস্বস্তিতে। কিন্তু পাখির কোন ভাবান্তর নেই। যেন সে দেখেইনি ঝিনুককে। ঘোস্টের চেয়ারটা একপাশে রেখে সে এগিয়ে গেল বাবার দিকে। ওপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেইল নার্সটিকে সে জিজ্ঞেস করলো,
“বাবার কি অবস্থা এখন?”
“ডাক্তার এসে সকালে চেকাপ করে গেছে ম্যাডাম। স্যুপ খেয়ে একটু আগে ঘুমিয়েছেন।”
“মেডিসিন?”
“জ্বি, দিয়েছি।”
ক্লান্ত দেখাচ্ছে মামুন সাহেবকে। জীবনের ভারে ক্লান্ত উনি। স্ত্রী মারা যাবার পর বহু কষ্টে মেয়েদের একটু একটু করে বড় করেছেন কাঁপা হাতে। আর কত!
“তোকে কিছু জিজ্ঞেস করেছি মম। শুনতে পাসনি?”
গলার স্বর কঠিন করে জিজ্ঞেস করলো ঝিনুক এবার। মম আমতা আমতা করে কিছু বলার আগেই পাখি শান্ত স্বরে জানালো,
“ওরা আমার পরিচিত।”
চোখমুখ শক্ত করে ঝিনুক ফিরে তাকালো পাখির দিকে। তারপর আবারো ঘুরে মমকে গলা চড়িয়ে বললো,
“বাড়ি হাসপাতাল সব জায়গায় নাটক শুরু করেছিস? তোরও উচ্ছন্নে যাবার শখ জেগেছে? কথা নেই, বার্তা নেই, বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোথায় না কোথায় যার তার সাথে চলে যাস! পেয়েছিসটা কি?”
মেজাজ খারাপ হলো মমর। বাবার ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে দেখলো, ঘুমের মধ্যে সামান্য কেঁপে উঠেছেন উনি। ঝিনুকের কি বিবেক বুদ্ধি সব গেছে? সে দেখছে না বাবা অসুস্থ। এখানে এসব নিয়ে ক্যাচাল করাটা কি খুব জরুরি?
মম কিছু বলবে ঝিনুককে, তার আগেই পাখি ঝিনুকের এক বাহু চেপে ধরে ওকে কেবিনের বাইরে নিয়ে গেল। চোখজোড়া বড় বড় হয়ে গেল মমর। পাখিকে একদম শান্ত দেখালেও, ভয় পেল সে। ছুটে গেল তাদের পেছনে পেছনে।
“নাটক কে করছে ঝিনুক? যার তার সাথে বলতে কাকে বুঝাচ্ছিস? কে কি পেয়েছে শুনি একটু।”
কেবিনের বাইরে এনে ঝিনুককে প্রশ্ন করলো পাখি। কেবিনের বাইরে খালি করিডোরে এসে দাঁড়িয়েছে তারা। পেছনে তাকিয়ে মম দেখলো ভেতরে থাকা মেইল নার্সটা উঁকি দিচ্ছে খোলা দরজা দিয়ে। হাইব্রিডার্স দুজন কোথায় তাকিয়ে আছে তা বোঝার উপায় নেই, তবে ঘাড় দুটো এদিকেই ঘুরিয়ে রেখেছে তারা। মম বুঝলো আজ ভালো একটা ঝামেলা হবে পাখি ও ঝিনুকের মাঝে। সে চাইলো না, বাইরের কেউ এসব দেখুক। দরজাটা বন্ধ করে দিল সে বাইরে থেকে।
“সেটা তো তুমি বলো। নিজেকে কি মনে করো তুমি? যখন যা খুশি তাই করছো! আজ সকালে আমার বাড়িতে এক ট্রাক পঁচা ডিম পাঠিয়েছ কোন সাহসে? জোর করে সব ডিম বাড়ির ভেতরে রেখে গেছে তোমার লোকেরা। দুর্গন্ধে টিকতে পারছি না। তোমার কোন ধারণা আছে কি পরিস্থিতি সেখানে?”
অবাক হয়ে একপলক তাকালো মম পাখির দিকে। এসব আবার পাখি কখন করলো!
“আমি তো বেছে বেছে ভালো ডিমই পাঠিয়েছিলাম। তোর শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে পচে গেল কীকরে, বুঝলাম না!”
পাখি বুকের উপর দুহাত ভাঁজ করে দাঁড়ালো। চেহারায় একটা ভাবুক ভঙ্গি এনে সেকেন্ড কয়েক পর সে বলে উঠলো,
“ওহ্! আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। সেখানকার লোকগুলোর তো ভেতরটাই পঁচা, দুর্গন্ধযুক্ত। সেজন্যেই হয়ত ডিমগুলোও পচে গেছে।”
তেঁতে উঠলো ঝিনুক। ঝাঁঝালো কণ্ঠে সে কিড়মিড় করে বললো,
“আমার বাড়ির লোকগুলো পঁচা, দুর্গন্ধযুক্ত? আর তুমি? তুমি খুব সাধু, তাইনা? তোমার কীর্তি কারখানার দুর্গন্ধ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে, সেটা দেখছ না? বাবার এই অবস্থা আজ কার জন্যে? কার কারণে বাড়িতে হামলা হয়েছে? সবকিছুর জন্য দায়ী তুমি! এত কিছুর পরও বড় গলায় কথা বলতে লজ্জা করছে না তোমার?”
বাবার অসুস্থতার কথা টেনে আনায় রাগ উঠে গেল মমর।
স্ত্রী মারা যাবার পরপরই মামুন সাহেবের স্নায়বিক রোগটা ধরা পড়ে। হাঁটাচলা ধীর হয়। শরীরের কাঁপন ও ভারসাম্যহীনতার কারণে দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজকর্মগুলোই করা কষ্টকর হয়ে পড়ে তার জন্যে। সেসময় পাখি হয়েছিল বাবার লাঠি। ছোট দুবোনের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল ছোট্ট পাখি। নিজের শৈশব বিসর্জন দিয়ে তাদের পরিবারটাকে আগলে রেখেছে। কত শত ছোট ছোট শখ আহ্লাদ ভুলে গেছে হাসতে হাসতে!
সেই পাখিকে এখন বাবার অবস্থার অবনতির জন্যে দায়ী করা কি উচিত? সব দায় কি তার একার?
“নাহ্! একদম করছে না। একটু নির্লজ্জ না হলে, পৃথিবীতে টেকা খুব মুশকিল। যেমন, নিজের কথাই ধর !”
ঝিনুকের কথায় মম রেগে গেলেও, শান্ত রইলো পাখি। মুচকি হেসে সে ঝিনুককে বললো,
“নির্লজ্জের মত তোর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আমার কাছ থেকে সব সুযোগ সুবিধা হাত পেতে নিয়েছে। আর তুই আরেক নির্লজ্জ, আমার করা সব উপকার ভুলে, আমার দিকেই থু থু ছিটাচ্ছিস। কত বড় নির্লজ্জ তুই, যে আমার করা উপকারকে নিজের প্রাপ্য ধরে নিয়েছিস।”
“কিসের এত বড়াই তোমার? টাকার গরম দেখাও আমাকে? কে চেয়েছে তোমার টাকা? আমি চেয়েছি? কে বলেছে তোমাকে উপকার করতে? আসলে টাকা ছিটিয়ে মানুষকে নিজের আনুগত্যে রাখতে চাও বলেই, এসব করেছো। আমার ভালোর জন্য করোনি কিছু! নিজের স্বার্থে করেছো!”
এবার আর চুপ থাকতে পারলো না মম। পাশ থেকে কটাক্ষের সুরে বলে উঠলো,
“তাই নাকি ঝিনুক আপু? তোমার কোন স্বার্থ নেই, না? তোমার চাকরির জন্য যে ত্রিশ লক্ষ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছিল, সেটা কোথা থেকে এসেছিল, বলো তো?
গত কোরবানেও যে বাবাকে বললে, তোমার শ্বশুরবাড়ির লোকদের দাওয়াত দিয়ে খাওয়াতে হবে। শুধু তাই না, নিজের জায়ের সাথে পাল্লা দিতে বাবার কাছে আবদার করলে, জামাইকে আস্ত খাসির রেজালা করে খাওয়ানো চাই। নইলে নাকি তোমার সম্মান থাকবে না। তখন স্বার্থটা কার ছিল, বলো? বাবার অসুস্থতার জন্য তুমি আপুকে দায়ী করছো। অথচ, নিত্যনতুন এসব আবদার করে তুমি নিজেই বাবাকে মানসিক চাপের মধ্যে রেখেছো। একবার ভেবে দেখেছো, আমাদের অসুস্থ বাবা এসব কীকরে যোগাড় করবে? টাকাটা আসবে কোথা থেকে বা আয়োজন করতে খাটাখাটনিটা কে করবে?
কিন্তু তুমি ভাবোই নি। কারণ তোমার আবদারগুলো বাবার কাছে ছিলনা, বরং ইন্ডাইরেক্টলি আপুর কাছে ছিল। তুমি জানতে, আপুর কানে কথা গেলে, সে বিনাবাক্যে সব ব্যবস্থা করে ফেলবে। সুযোগ নিয়েছি তুমি ঠিকই। কিন্তু ঝিনুক আপু, একবার বাবার মনের অবস্থার কথা ভেবেছো তুমি? তোমার এসব আবদার পূরণে নিজেকে অক্ষম ভেবে, যে কষ্টটা সে পেয়েছে, সেটা চোখে পড়েনি কেন তোমার?”
“বড্ড বেড়েছিস তুই মম! বড়দের মাঝে কথা বলতে তোকে কে বলেছে?”
মমকে চোখ পাকিয়ে ধমকে উঠলো ঝিনুক। আরো কয়েকটা কথা বড়দের মাঝে বলার ইচ্ছে ছিল মমর। তবে পাখির ইশারায় থেমে গেল সে। পাখি গলার স্বর তীক্ষ্ম করে এবার বললো,
“আমি বলেছি। বড়রা ভুল কথা বললে, চুপ না থেকে প্রতিবাদ করতে বলেছি। তোকেও শিখিয়েছিলাম, কিন্তু তুই সেসব ভুলে গেছিস।”
“আপু, তুমি কিন্তু…”
“যা আমিও সব ভুলে গেলাম। তুই মানসম্মানওয়ালী মানুষ হয়েছিস এখন, আমার কাজ কারবারে লজ্জা পাস। ঠিকাছে।
এখন থেকে আর আমার জন্য তোর লজ্জিত হতে হবে না। টাকার গরম এখন থেকে আমি নিজের কাছেই রাখলাম নয়ত। আমাকে কোথাও বোন হিসেবে পরিচয় দিসনা আর।
এখন তোর মানসম্মান নিয়ে তুই বিদায় হ। অনেক তামাশা করেছিস। আর চাচ্ছি না আমি।”
“আমি তামাশা করছি নাকি তুমি….”
“আমাকে তুই খুব ভালো করে চিনিস ঝিনুক। ভালো ব্যবহার করছি, মেনে নে। চুপচাপ কেটে পড় এখান থেকে।”
“তোমার কথায় তো আমি যাবো না। ভুলে যেওনা, বাবা যতটা তোমার, ততটা আমারও।”
পাখি আর কিছু বললো না ঝিনুককে। মাথা নেড়ে ঝিনুকের পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
মম বিরক্তি নিয়ে ঝিনুককে বললো,
“বাবা অসুস্থ আপু! এখানে এই মুহূর্তে ঝগড়া করাটা কি খুব জরুরি?”
“আমি ঝগড়া করছি? নাকি তুই আর তোর বোন মিলে সিনক্রিয়েট করছিস? শুরুটা তো তোর বোনই….”
বলতে বলতে থেমে গেল ঝিনুক। মমও চমকে উঠলো। করিডোরে থাকা ময়লা পানির বালতিটা ঝিনুকের মাথায় ঢেলে দিয়েছে পাখি।
খালি বালতিটা একদিকে ছুঁড়ে ফেলে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে পাখি নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো,
“শেষটাও আমিই করলাম। আরো থাকবি এখানে?”
রাগে দুঃখে কাঁপছে ভেজা ঝিনুক। চোখে পানি চলে এসেছে তার। এরকম ব্যবহার আগে কখনো করেনি পাখি তার সাথে। মমও তাকিয়ে আছে হতভম্ব হয়ে।
ঝিনুক আর কিছু বললো না। চুপচাপ বেরিয়ে গেল সেখান থেকে। সেদিকে তাকিয়ে পাখি মমকে বললো,
“এভাবেই জীবন থেকে ফালতু মানুষগুলোকে ধুয়ে ফেলতে হয়, বুঝলি?”
***
চলবে…
#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_০৬
ফার্মেসীর সামনে মানুষের ভীড় জমে আছে। সবাই হাতে প্রেসক্রিপশন নিয়ে অপেক্ষা করছে। কাঁচের কাউন্টারের ওপর পাশে তিনজন লোক ব্যস্ত হাতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বাক্স খোলা, স্ট্রিপ গোনা, বিল লেখা, সব চলছে একসাথে।
ভীড় ঠেলে ভেতরের লোকগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে মম। হাতে প্রেসক্রিপশন। মাস্কের আড়ালে মুহূর্ত চোখমুখ কুঁচকে তাকিয়ে আছে সেদিকে।
কিছুক্ষন আগেই নার্স এসে জানায়, মামুন সাহেবের জন্যে বাইরে থেকে একটা মেডিসিন আনানো প্রয়োজন। পাখি তখন ফোনে ব্যস্ত। মম নিজে গিয়ে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিলে, মুহুর্তও রওনা দেয় তার পিছু পিছু। মানা করলেও, পাত্তা দেয়নি সে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, মোমোটার কথা মেনে নিলেই বোধহয় ভালো হতো।
জঘন্য পরিবেশ এখানকার। হাসপাতাল থেকে বেরোতেই বিশাল বড় এক ময়লার স্তুপের সামনে পড়েছে তারা। মুহুর্তের অত্যধিক সংবেদনশীল নাকে তীব্রভাবে হানা দেয় সে দুর্গন্ধ। কোনমতে পা চালিয়ে সেটা পার হয়ে এসে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নেবার আগেই যানবাহনের বিষাক্ত ধোঁয়া এসে আঘাত করে ফুসফুসে।
কোথায় স্বর্গভূমির নির্মল, বিশুদ্ধ বাতাস, আর কোথায় ঢাকা শহরের দূষিত বায়ু!
ফুটপাত ধরে একটু এগোতেই রাস্তার পাশে দেখা যায় কিছু খাবারের দোকান। পঁচা-গলা খাবারের দুর্গন্ধে নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসার যোগাড় মুহূর্তের। তার সাথে আবার মিশে আছে অত্যধিক মশলাযুক্ত খাবারের গন্ধও। ছোট খুপড়ির মত দোকানগুলোর সামনে ময়লা নোংরা পানি ও উচ্ছিষ্টের ঢের। সেখানে ঘুরঘুর করছে কয়েকটা কুকুর। পোকা মাকড় ও মাছি ভনভন করছে দোকানের সামনে সাজানো খোলা খাবারের উপর। হতভম্ব হয়ে দেখে মুহুর্ত, এসব দোকানের ভেতরেও মানুষের ভীড় লেগে আছে। মানুষরা টাকা দিয়ে কিনে খাচ্ছে এসব খাবার!
“ভাইজান কি দিমু? খাইবেন না লইয়া যাইবেন? পার্সেল দিমু?”
দোকানের সামনে দিয়ে ভীড় ঠেলে আসার সময় একটা ছেলে জিজ্ঞেস করে মুহূর্তকে। মুহূর্ত চশমার আড়াল থেকে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে না বোঝায়। ছেলেটা সাথে সাথে অন্য আরেকজন লোককে ধরে দোকানের ভেতরে নিয়ে বসায়। ঘামে ভেজা হাতটা পশ্চাৎদেশে জড়ানো নোংরা গামছাটায় মুছে, সেই হাত দিয়ে একটা হাফপ্লেট ধরে গরম ভাতের পাতিলে ঢুকিয়ে দিলো ছেলেটা।
মুহূর্ত আর দাঁড়ালো না। চলে এলো মমর পিছু পিছু। কিছুদূর হেঁটে এসে রাস্তা পার হয়ে ফার্মেসিতে পৌঁছালো তারা। সেখানে এসে আরো বেশি অস্বস্তিতে পড়ে গেল সে। বিভিন্ন ধরনের ঔষধ ও কেমিক্যালের গন্ধটা হাসপাতালের চাইতেও এখানে বেশি তীব্রতর। সেই সাথে বাতাসে ছড়িয়ে আছে ফিনাইল ও অ্যালকোহলের স্মেল।
হুট করেই চোখের সামনে ঝাপসা দেখতে শুরু করলো মুহূর্ত। কানে বাড়ি দেওয়া আশপাশের তীক্ষ্ম শব্দগুলো মিলিয়ে একটা যন্ত্রণাদায়ক বিপবিপ শব্দ মস্তিষ্কে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। অস্পষ্ট দৃষ্টিতে ভেসে উঠলো পুরোনো কিছু স্মৃতি।
সংকীর্ণ, ঠান্ডা, অন্ধকার কুঠরিতে জ্বলে ওঠা আবছা লাল আলো।
মোটা লোহার শেকলের ঝনঝন শব্দ।
দেওয়ালে লেগে থাকা শুকনো রক্তের দাগ।
সিরিঞ্জের সূচালো ধাতব সূচ বেয়ে গড়িয়ে পরা তরল।
মাথার উপর জ্বলতে থাকা উজ্জ্বল সার্জিক্যাল লাইট।
তাজা রক্তে ভেজা সাদা গ্লাভসে আবৃত হাত।
শ্বাস প্রশ্বাস ভারী হয়ে আসে মুহূর্তের। কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে এক ফোঁটা ঘাম। বাম হাতটা কাঁপছে মৃদু। গলাটা শুকিয়ে এসেছে। যেন কেউ তুলো গুঁজে দিয়েছে সেখানে। অতীত ও বর্তমানের মাঝে আটকে যাচ্ছে সে। বারকয়েক চোখের পলক ফেলে দৃষ্টির ভ্রম দূর করার চেষ্টা করলো মুহূর্ত। সামনে দোকানের ভীড় ঘুরছে।
নাহ্, মাথাটা ঘুরছে তার। গলা থেকে একটা চাপা গর্জন বেরিয়ে আসতে চাইছে হিংস্র হুংকার হয়ে। কিন্তু না। মানুষের ভিড়ে নিজেকে সামলাতে হবে। পইপই করে বলে দিয়েছে পাখি, বাইরে মানুষের সামনে যেন কথাও না বলে, গর্জে ওঠা তো দূরের বিষয়। তাদের রুক্ষ, ভারী কন্ঠস্বর মানুষদের চাইতে আলাদা। কথা বললে, ধরা পড়ে যাবার সম্ভবনা বাড়বে বৈ কমবে না।
কয়েক কদম পিছিয়ে গেল মুহূর্ত। ফুটপাতের এক কিনারে এসে থামলো। গলা থেকে গরগর শব্দ বের হচ্ছে তার। জোরে জোরে শ্বাস টেনে নেবার চেষ্টা করছে সে। পাশে থাকা লোহার রড দিয়ে বানানো গেটটা দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরলো। হাতের চাপে রড বেঁকে যাচ্ছে, কিন্তু ছাড়লো না মুহূর্ত। ঘাড়টা কাত করে উপরের খোলা আকাশের দিকে তাকালো সে। মাথার উপর প্রকাণ্ড সূর্যটা আলো ছড়াচ্ছে পূর্ণ তেজে। অন্ধকারে অভ্যস্ত সংবেদনশীল চোখজোড়ায় জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছে সে আলো। তবুও চোখ ফেরালো না মুহূর্ত। এই জ্বলন তাকে মনে করায়, মুক্ত সে এখন।
“শুনছেন? আপনি ঠিক আছেন?”
কোমল চিন্তিত কন্ঠস্বর মুহূর্তের কানে ভেসে এলো। সেই সাথে নাকে এসে ঠেকলো খুব ক্ষীণ হালকা নোনা এক সুবাস। খুব পরিচিত না হলেও, অল্প সময়েই তার মনে গেঁথে গেছে এই সুবাসটা। ঠোঁটজোড়া ঈষৎ ফাঁক করে গভীরভাবে শ্বাস নিলো সে। এতসব বিষাক্ত, ধোঁয়াশে দুর্গন্ধের ভিড়ে সূক্ষ্ম সে ঘ্রাণটায় মনোনিবেশ করলো সে শুধু।
ভ্রু কুঁচকে চিন্তিত চোখে তাকিয়ে আছে মম মুহূর্তের দিকে। দোকানের ভীড় ঠেলে মেডিসিন কেনার পর মুহূর্তকে আর সেখানে দেখতে পায়না সে। এক সেকেন্ডের জন্য বুকটা ধ্বক করে ওঠে মমর। কোথায় যেতে পারে মুহূর্ত ভেবেই আত্মা শুকিয়ে আসে। চারদিকে নজর ঘুরিয়ে তাকাতেই অবশ্য দেখা মেলে পুরুষটির। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে এগিয়ে আসে মম তার দিকে। ফুটপাতের একটু নিরিবিলি জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। কাছাকাছি আসতেই মমর মনে হয়, কিছু একটা গড়বড় আছে। কেমন যেন অস্বাভাবিক ঠেকে লোকটার ভাবভঙ্গি। এই কড়া রোদে আকাশের দিকে ঠাঁয় তাকিয়ে আছে ঘাড় বেঁকে। মৃদু গরগর আওয়াজ বের করছে থেমে থেমে।
“কি হয়েছে? এভাবে উপরের দিকে তাকিয়ে আছেন কেন?”
ঘাড় নামিয়ে মমর দিকে তাকালো মুহূর্ত। মাস্ক ও রোদ চশমার আড়ালে বোঝা যাচ্ছে না তার অভিব্যক্তি। চিন্তিত চোখে তাকিয়ে মম যখন উত্তরের অপেক্ষা করছে ঠিক তখনই, অকস্মাৎ ওর বাহু ধরে টেনে ওকে নিজের একদম কাছে নিয়ে এলো সে। চকিত মমর দুহাত গিয়ে ঠেকলো তার প্রশস্ত বুকে। বিস্ময়ের রেশ কাটবার আগেই, আরেকবার ঝটকা খেল সে। অনুভব করলো মাথাটা ঝুঁকিয়ে এনে তার গলার কাছে নাক ঠেকিয়েছে সে।
“তোমার ঘ্রাণটা অনেক সুন্দর। একদম সমুদ্রের হালকা নোনাধরা হওয়ার মত। মুক্ত, উষ্ণ, প্রশান্তির গন্ধ।”
নিচু স্বরে, ঘোর লাগানো নেশাক্ত কণ্ঠে বললো সে। মূর্তির মত জমে গেল মম। মাস্কের পাতলা আবরণ ভেদ করে তার গরম নিশ্বাস ছুঁয়ে যাচ্ছে মমর ঘাড়ের উন্মুক্ত ত্বক। উষ্ণতা ছড়িয়ে দিচ্ছে জায়গাটায়। অজানা এক অদ্ভুত শিহরন বয়ে গেল অষ্টাদশীর কোমল কায়া জুড়ে।
“আপ- আ….পনি ঠিক আছেন?”
কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলো মম। গলাটলা শুকিয়ে আসছে তার হঠাৎ। মুহূর্তকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইলেও, হাতে খুব একটা বল পেল না সে। তার কোমল হাতের মৃদু ধাক্কা মুহূর্ত খেয়ালই করলো না।
“মুহূর্ত।”
মমর কানের কাছে ফিসফিস করে উচ্চারণ করলো সে শব্দটা।
“হুম?”
“আমার নাম।”
“জানি।”
জানে? হ্যাঁ, জানারই তো কথা। তবে কেন সে ডাকে না তাকে? কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো মুহূর্তের। তবে কি নামটা পছন্দ হয়নি মোমোটার? সেজন্যেই ডাকে না?
“মুক্ত হবার আগে আমাদের কোন নাম ছিলনা। নাম তো মানুষের হয়। ওরা আমাদের মানুষ মনে করেনি কখনো মোমো, হতে দেয়নি মানুষ।”
ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো মম মুহূর্তের দিকে। রোদ চশমার আড়ালে থাকা ঐ মধুরঙা চোখগুলোকে নিজের অজান্তেই দেখতে ইচ্ছে করছে তার।
“মুক্তির পর আমরা নিজেরাই নিজেদের নাম রেখেছি, জানো?”
সংকোচ নিয়ে মাথাটা সামান্য নাড়লো মেয়েটা। বোঝালো জানে সে। শুনেছে পাখির কাছে। শিনহোতে বন্দী থাকাকালীন ওদেরকে দেওয়া হত শুধু একটা নম্বর। কারো নাম ছিল না।
নাম মানুষের নিজস্বতা বহন করে। নামের সাথে জড়িয়ে থাকে আবেগ, স্নেহ, সম্মান, আশা, স্মৃতি। এ পৃথিবীতে সবচেয়ে শূন্য, ব্যর্থ, খারাপ মানুষটারও একটা নাম থাকে। কিন্তু সেটুকুর অধিকারও দেয়া হয়নি হাইব্রিডার্সদের বন্দীদশায়।
মুক্ত হবার পর নিজেরা নিজেদের পছন্দ মত নাম বেছে নেয় ওরা। যেই শব্দ দিয়ে ইচ্ছা, অনুভূতি, ভালোলাগা, কিংবা মন্দলাগা প্রকাশ করা যায়, প্রকাশ করা যায় নিজেকে, সেটাই নাম হিসেবে বেছে নেয় ওরা।
“আমার বিশ্বাস হয়নি, আমরা মুক্ত হয়েছি। মনে হয়েছে, এটাও কোন নতুন এক্সপেরিমেন্ট। শিনহোর নতুন কোন খেলা। আমি ভাবতাম, ওরা যেকোন সময় আবার আমাদের শেকল পরিয়ে পরীক্ষাগারে ঢোকাবে। মুক্তির এই ছলনা শেষ হবে নিমিষেই।
হাতে ছিল, তো শুধু কিছুটা সময়, কয়েকটা মুহূর্ত।”
গমগমে গলায় কথাটা বললো সে। হঠাৎ করেই মনটা খারাপ হয়ে গেল মমর। একটু একটু কষ্ট অনুভব করছে সে হৃদয়ে। মুহূর্ত একটু থেমে আবারো বললো,
“আমি সেই প্রতিটা মুহূর্তে বাঁচতে চেয়েছিলাম, উপভোগ করতে চেয়েছিলাম। সেই সাথে এটাও স্মরণে রাখতে চেয়েছিলাম, সময় ক্ষীণ। হাতে আছে, তো কেবলই এই মুহূর্ত।
না অতীতের স্মৃতি, না ভবিষ্যতের ভয়, জীবন তো এই মুহূর্তেই।”
মম তাকিয়ে রয় তার দিকে। কল্পনা করে নেয় তার রুক্ষ চেহারায় গভীর বেদনার ছাপ। ঠিক যার ধ্বনি সে উপলব্ধি করছে তার শব্দে।
“সেজন্যেই আমি এই শব্দটাকে বেছে নিয়েছিলাম নিজের জন্যে। বুঝতে পেরেছো?”
মম মাথা নাড়ে আবারো। জানায় বুঝেছে সে।
“তাহলে বলো, মু-হূ-র্ত।”
ঝুঁকে এসে দাবি জানায় সে। মমর দুই বাহু এখনো ধরে রেখেছে মুহূর্ত। দুজনার মধ্যে কিঞ্চিৎ মাত্র দূরত্ব।
শুকিয়ে থাকা ঠোঁটজোড়া জিভের ডগা ছুঁইয়ে ভিজিয়ে নিয়ে মম মৃদু স্বরে উচ্চারণ করে,
“মুহূর্ত!”
রোদের তেজকে উপেক্ষা করে ঠিক সে সময়টাতেই শীতলতা ছড়িয়ে দিয়ে যায় দিগন্ত কাঁপানো দখিনা হাওয়া।
চাপা স্বরের গভীর এক সন্তুষ্টির আওয়াজ ভেসে আসে মুহূর্তের বুক থেকে। সে আওয়াজের কম্পন নিজের হাতজোড়ার নীচে অনুভব করতে পারে মম। তৎক্ষণাৎ সেদিকে চোখ চলে যায় তার। ক্ষণেই মুহূর্তের বুকের গহীনের সে কম্পন ছড়িয়ে পড়ে মমর সারা অঙ্গে। আঠারো বছরের জীবনে এই প্রথম তার অন্তর্লীন নারীসত্ত্বা নিজের উপস্থিতির জানান দেয়। চমকে উঠে তাকিয়ে থাকে মেয়েটা।
মমর বাহুদ্বয় ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায় মুহূর্ত। ডান হাতটা উঁচু করে মমর মাথায় বুলিয়ে দিতে দিতে সে বলে,
“গুড গার্ল।”
মম থমকে তাকিয়ে রয় আরো কিছুক্ষন। ছেলেটা এমনভাবে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে যেন সে কোন পোষা বিড়ালছানা।
হালকা কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নেয় মম। সেই সাথে পরিষ্কার করে নেয় নিজের ধোঁয়াশে হয়ে থাকা মস্তিষ্ককে। হাত দুটো তড়িৎ গতিতে নামিয়ে আনে মুহূর্তের বুকের জমিন থেকে। উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে সে বলে,
“আমাদের যাওয়া উচিত এখন।”
এরপর আর অপেক্ষা করে না সে। কোনদিকে না তাকিয়ে সোজা হাঁটা শুরু করে দেয় হাসপাতালের দিকে।
***
হাসপাতালে ফিরে লিফট থেকে নামতেই আবারো সেই নীরবতা ঘিরে ধরলো তাদের। ফাঁকা করিডোরে হালকা প্রতিধ্বনি তুলছে মমর পায়ের শব্দ। মুহূর্ত হাঁটছে একদম নিঃশব্দে। ভ্রু কুঁচকে তার পায়ের দিকে তাকায় মম। আশ্চর্য! এরকম আস্ত একটা জলহস্তীর আকারের লোক বিনা কোন শব্দছাড়া হাঁটে কীকরে? এতবড় শরীরটা কি হাওয়ায় ভাসিয়ে চলে নাকি?
তপ্ত শ্বাস ফেলে মম এগিয়ে যাচ্ছিলো কেবিনের দিকে।আচমকা, পাশ থেকে মুহূর্ত তার কব্জি চেপে ধরলো।
মম কিছু বোঝার আগেই এক ঝটকায় তাকে নিজের দিকে টেনে আনে সে। করিডোরের দেয়ালের সাথে চেপে ধরে তাকে। মমর পিঠ ঠেকেছে ঠান্ডা দেয়ালে, আর সামনে মুহূর্তের লম্বা দেহের ছায়া পুরোপুরি ঢেকে দিয়েছে তাকে।
বিরক্ত হয় মম। সেই সাথে রাগও ওঠে। সেসময় কিছু বলেনি বলে কি তাকে পেয়ে বসেছে? ভীষন বেয়াদব তো ছেলেটা! নাহ্, এবার তাকে দু চার কথা শুনিয়ে ছাড়বে সে।
কিছু বলার জন্যে মুখ খুলতে নিয়েছিল সে। কিন্তু তার আগেই মুহূর্ত এক আঙুল তুলে তার মুখের সামনে ধরে চুপ থাকার ইশারা করে। ঘাড় ঘুরিয়ে রেখেছে সে অন্যদিকে।
মুহূর্তের দৃষ্টি তখন ফাঁকা করিডোরের একদম শেষ প্রান্তে স্থির। চশমার আড়ালে থাকা চোখদুটো সরু হয়ে এসেছে। মম কিছু বুঝতে পারছে না, তবে অনুভব করতে পারছে মুহূর্তের শরীরের টানটান সতর্ক ভাব।
কয়েক মিনিট কেটে যায় নীরবতায়।
মুহূর্তের দৃষ্টি যেখানে স্থির ছিল, সেখান থেকেই বেরিয়ে এলো দু’জন লোক। দৌড়ে এদিকেই আসছে তারা। মমর চোখজোড়ায় এসে ভিড় করলো বিস্ময় ও আতঙ্ক। কি হচ্ছে বোঝার সময়টাও পেল না সে।
সে শুধু শুনলো মুহূর্ত ফিসফিস করে বলছে,
“পেছনে থাকো।”
কথাটা শেষ হতেই সবকিছু চোখের পলকে একসাথে ঘটে গেল। লোকদুটোর হাতে ঝিলিক দিয়ে উঠলো ধারালো কিছুর অস্তিত্ব। মমর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো ভয়ে। দেয়াল ধরে সিটিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সে।
কিন্তু মুহূর্ত?
এক ঝটকায় সামনে এগিয়ে গিয়ে প্রথম লোকটার কব্জি চেপে ধরে নামমাত্র বল প্রয়োগ করে হাতটা বাঁকিয়ে দিলো। নিস্তব্ধ করিডোরে প্রচণ্ড শোনালো হাড় ভাঙার মৃদু শব্দ। সেই শব্দের রেশ কাটার আগেই লোকটার হাত মুড়িয়ে এনে তার গলার কাছে এক টান দিল মুহূর্ত। হাতে থাকা ধারালো ছুরির ফলা চিরে দিয়েছে অস্ত্রধারীর নিজেরই চামড়া। গলগল করে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে সেখান থেকে। সেকেন্ড খানেকের মধ্যে মুখ থুবড়ে ফ্লোরে পরে গেল লোকটার মৃতদেহ।
দ্বিতীয়জন তখন ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত। কাছাকাছি এসে পড়েছে সে। মুহূর্ত পা দিয়ে সজোরে লাথি মারলো লোকটার পেটে। লোকটা ছিটকে গিয়ে আছড়ে পড়লো পাশের দেয়ালে। পেট চেপে ধরে পড়ে রইলো ফ্লোরে।মুখ থেকে কাশির সাথে বেরিয়ে এলো রক্তের স্রোত। মুহূর্ত অলস পায়ে হেঁটে লোকটার কাছে গিয়ে টেনে তুললো তাকে। লোকটার মাথার একপাশ হাতের থাবায় খামচে ধরে, ওপর পাশটা সজোরে দেয়ালে বাড়ি মারলো সে। চুনপাথর খসে রক্ত ও মগজের সাথে মিশে সাদা দেয়াল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো।
পুরো ঘটনাটা ঘটে গেছে ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে। মমর মানব মস্তিষ্কের জন্যে এই সময়টা পর্যাপ্ত নয়। সে বুঝতেই পারলো না কি থেকে কি হয়ে গেল, কিভাবেই বা হলো। সে শুধু দেখলো একটা লোকের গলাকাটা লাশ পড়ে আছে সামনে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে সাদা টাইলসের ফ্লোর। কালো খয়েরী পিচ্ছিল তরল খুব বিচ্ছিরিভাবে ছিটিয়ে পড়েছে সাদা দেয়ালে। নিচে পড়ে আছে আরেকজনের নিথর দেহ। মাথাটা ফেটে বেরিয়ে আছে মগজের অংশবিশেষ।
এমন বিভৎস দৃশ্য জীবনে প্রথমবার দেখছে সে। থরথর করে কাঁপতে লাগলো মম। চোখজোড়া তার ছলছল করছে আতঙ্কে। পেট থেকে নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসতে চাইছে। মুখে হাত দিয়ে চেপে ধরলো সে। কিন্তু নিজেকে সামলাতে পারলো না। ঝুঁকে পরে হরহর করে বমি করে দিল। কাশতে কাশতে গলা জ্বলছে তার। মাথাটা প্রচন্ড ঘুরছে। কতক্ষন এভাবে ঝুঁকে ছিল সে জানা নেই। একপর্যায়ে দূর্বল শরীরটা ভর ছেড়ে দিতে চাইলে, একটা বলিষ্ঠ পেশীবহুল হাত আঁকড়ে ধরে তাকে পাশ থেকে।
খানিকটা সময় পর মম ঘোলাটে দৃষ্টিতে দেখলো মুহূর্ত তাকে কোলে তুলে নিয়ে হাটা শুরু করেছে। মাথা তুলে তাকাতে পারছে না মম ঠিকভাবে। মনে হচ্ছে আবার বমি করে দেবে। মুহূর্তের কাঁধে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে রইলো সে।
মুহূর্ত এক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইলো। সতর্ক দৃষ্টি মেলে তাকালো চারদিকে। পেছনে ঘুরে লিফটের অপেক্ষা করা বোকামি হবে। এদের সাথীরা নিশ্চয়ই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুরো ভবনে। যত দ্রুত সম্ভব এখান থেকে বেরোতে হবে।
করিডোরের শেষ মাথায় থাকা কেবিনটার দিকে তাকালো সে। ওখানে এখন কেউ নেই। অন্তত জীবিত কেউ নেই। রক্তের তীব্র গন্ধ হাসপাতালের ফিনাইলের গন্ধকে ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বাতাসে। সাধারণ মানুষের নাকে সেটা ধরা না পড়লেও, সে করিডোরে পা রাখা মাত্রই বুঝতে পারে।
ইমার্জেন্সী ডোরটার দিকে চোখ পড়লো তার। বেরোবার সময়টাতেও সেখানে বড় একটা তালা ঝুলছিল। কিন্তু এখন নেই। দরজাটা ঠেলে মুহূর্ত ঢুকে পড়লো আধো আলো আঁধারে আবৃত গুমোট সিঁড়ির ঘরটায়। আবদ্ধ বাতাসে স্পষ্ট মিশে আছে কিছুক্ষন আগে এই পথে এগিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের উষ্ণ গন্ধ। সেটা অনুসরণ করে ধাপের পর ধাপ পেরিয়ে নেমে যেতে থাকে মুহূর্ত।
মুহূর্তের কাঁধের কাছটা খামচে ধরে মম। এত দ্রুত গতিতে সে নামছে সিঁড়ি দিয়ে যে, মমর মনে হয় সে উপর থেকে শূন্যে পড়ে যাচ্ছে। আবারো গা গুলিয়ে এলো তার। চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে নিজেকে সামলে নেবার চেষ্টা করতে থাকে মম। মুহূর্ত কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তাকে, আপাতত সেই চিন্তা করার অবস্থায় নেই সে।
নামতে নামতে ছয় তলায় এসে মুহূর্ত টের পেল দুদিকে ভাগ হয়ে গেছে গন্ধগুলো। উপরে দরজা খোলার মৃদু শব্দে বুঝলো মৃত মানুষগুলোর সাথীরা এসে গেছে। খোঁজ চালাচ্ছে তাদের। সময় নষ্ট না করে ছয় তলার দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লো সে মমকে নিয়ে। কিছুদূর গিয়ে দেখলো সামনেই লিফট। ভাগ্যক্রমে লাইনে দাড়াতেই খুলে গেল লিফটের দরজা।
মমকে কোলে নিয়ে দাড়ালো মুহূর্ত লিফটের ভেতর। লিফটে দাঁড়ানো লোকগুলো আড়চোখে দু একবার তাকালেও কিছু বললো না। এরকম দৃশ্য সচরাচর না দেখা গেলেও, একেবারে অস্বাভাবিক কিছু নয়। তারা ধরে নিল, মেয়েটা নিশ্চয়ই অসুস্থ।
মমর ব্যাগের ভেতর ফোনটা বেজে উঠলো শব্দ করে। মুহূর্তের কাঁধ থেকে মাথা তুলে সে সেটা ব্যাগ থেকে বের করে আনলো। হাতটা কাপছে মৃদু। সেটা উপেক্ষা করে বাজতে থাকা ফোনটা কানের কাছে ধরলো সে।
“হ্যালো?”
“মম! কোথায় তুই? মুহূর্ত কোথায়?”
ফোনের ওপর পাশ থেকে ভেসে এলো পাখির দুশ্চিন্তা মেশানো কন্ঠস্বর।
“আমি…”
“আমার কথা মন দিয়ে শোন। হাসপাতালের পাঁচ নম্বর গেটের বাইরে একটা এম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে। তুই মুহূর্তকে নিয়ে সোজা এদিকে চলে আয়। সাবধানে আসিস। আর ভুলেও হাসপাতালের ভেতরে ঢুকবি না। বুঝতে পারছিস আমার কথা?”
মমর উত্তরের অপেক্ষা না করে তাড়া দিয়ে বললো পাখি। মম একপলক তাকালো মুহূর্তের দিকে। কানে ধরে রাখা ফোনসহ মাথাটা গুঁজে রাখলো সে মুহূর্তের বুকে। তারপর ধীর কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে সে ফোনে জিজ্ঞেস করলো,
“ওরা কারা আপু?”
ওপাশে নেমে এলো নীরবতা। কয়েক সেকেন্ড পর স্থির কণ্ঠে পাখি জানতে চাইলো,
“তুই কোথায় মম?”
“লিফটে।”
“মুহূর্ত আছে সাথে।”
“হুম।”
“গ্রাউন্ড ফ্লোরে নেমে সোজা বাইরে চলে আয়। আমরা অপেক্ষা করছি।”
“বাবা?”
“বাবা ঠিক আছেন। চিন্তা করিস না। তুই আয় জলদি।”
ফোনটা কেটে গেল। শুকনো ঠোঁটজোড়া ভিজিয়ে নিয়ে মম মুহূর্তকে জানাতে চাইলো পাখির নির্দেশনা।
“আমাদেরকে….”
“শুনেছি।”
মমকে থামিয়ে দিয়ে ছোট্ট করে বললো সে। লিফট তখন দোতলা পার করে নীচে নেমে যাচ্ছে। ঝিমুতে থাকা লিফটম্যান ছাড়া আর কেউ নেই ভেতরে।
নীচ তলায় এসে লিফটের দরজা খুলতেই মমকে নিয়ে নেমে গেল মুহূর্ত। স্বাভাবিক গতিতে কদম ফেলে আগাচ্ছে সে। নেই কোন তাড়াহুড়ো।
হাসপাতালে ঢোকার পথে মূল এনট্রেন্সের পাশে বড় করে একটা ম্যাপ আঁকা আছে পুরো ভবনটার। সকালে পাখি গাড়ি নিয়ে ভেতরে ঢোকার সময়টাতেই সেটাতে চোখ বুলিয়ে নিয়েছিল মুহূর্ত। তাই পাঁচ নম্বর গেটটা কোনদিকে, সেটা আর তাকে বলে দিতে হলো না।
দিনের আলোতেও এই দিকটা নির্জন। দু চারজন পরিচ্ছন্নকর্মী জটলা পাকিয়ে গল্প জুড়েছে গেটের কাছে। তাদের কৌতূহলী দৃষ্টিকে পার করে গেটের বাইরে বেরিয়ে এলো মম ও মুহূর্ত। সোজা কিছুদূরে দাঁড়ানো সাদা এম্বুলেন্সের দিকে এগিয়ে গেল দুজনে। কাছাকাছি যেতেই এম্বুলেন্সের পেছনের দরজাটা খুলে গেল। উদ্বিগ্ন পাখির চেহারা উকি দিল ভেতর থেকে। মমকে কোলে নিয়েই ভেতরে ঢুকে গেল মুহূর্ত। বসিয়ে দিল পাখির পাশে।
“আপু…”
বোনকে দুহাতে আগলে নিল পাখি। উৎকণ্ঠায় ভারী হয়ে আসা গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“মম! ঠিক আছিস তুই?”
মম মাথা নেড়ে বোঝালো সে ঠিক আছে। এম্বুলেন্সের ভেতরে ঘোস্টও আছে। সামনে ড্রাইভিং সিটে বসে আছে দুজন অপরিচিত মানুষ। মুহূর্ত উঠে এসে দরজা বন্ধ করে দিতেই গাড়ি স্টার্ট হয়ে গেছে।
সকালে বাড়ি থেকে বেরোনোর আগেই নিজের ব্যক্তিগত সিকিউরিটি গার্ডদের এলার্ট করে দিয়েছিল পাখি। যেখানে কিছুদিন আগে তার বাড়িতে হামলা চালিয়েছে হাইব্রিডার্সদের জন্য ঘৃণা পোষণকারী হেটার্স গ্রুপ, সেখানে যে যেকোন সময়, যেকোন দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে, সেটা আন্দাজে ছিল পাখির। তাই সাদা পোশাকে গার্ডদের হাসপাতালের ভেতরে ও আশেপাশে পাহারারত রেখেছিল।
পাখির ধারণাই সঠিক হয়েছে। মামুন সাহেবের উপর নজর রাখছিল ওরা। মম ও মুহূর্ত ঔষধ আনতে বেরিয়ে যাবার কিছুক্ষন পরপরই কেবিনে ঢুকে হামলা করে দুজন লোক। লিফটের কাছে পাহারায় ছিল বাকি দুজন। অচেতন মামুন সাহেবকে ঘোস্টের হুইলচেয়ারে বসিয়ে মেইল নার্সটিসহ ওরা পালিয়ে আসে ইমার্জেন্সী এক্সিট দিয়ে। একসাথে থাকা বিপজ্জনক, তাছাড়া মামুন সাহেবকে এভাবে টেনে নিয়ে যাওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ।তাই ছয় তলায় এসে নার্সের সাথে ওনাকে ভেতরে ঢুকে রোগীদের ভিড়ে লুকিয়ে পড়তে বলে পাখি। ওর গার্ডদের ইনফর্ম করে দিতেই মামুন সাহেবকে নিরাপত্তা দিয়ে সরিয়ে নেওয়া হয় অন্যত্র। এদিকে সে ঘোস্টকে নিয়ে বেরিয়ে আসে পাঁচ নম্বর গেটের কাছে। সেখানে নির্দেশমত এম্বুলেন্স নিয়ে অপেক্ষায় ছিল দুজন গার্ড।
“আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
প্লাস্টিকের বোতল থেকে ডকডক করে বেশ অনেকখানি মিনারেল ওয়াটার গলায় ঢেলে শান্ত হলো মম। গাড়ি ছুটে চলেছে ঢাকার রাস্তায়। তবে গন্তব্য কোথায়, সেটা অনিশ্চিত।
মমর প্রশ্নে পাখি তাকালো সামনে বসা ঘোস্টের দিকে। চশমা থাকলেও মাস্ক ও মাঙ্কি ক্যাপটা খুলে রেখেছে সে আপাতত। গরমে ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা তার। ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে মুখটা। টু শব্দটি মুখ থেকে বের না করলেও, ডান পাশের ক্ষতের জায়গাটা চেপে ধরে রেখেছে সে। খুব খারাপ ধকল যাচ্ছে তার অসুস্থ শরীরের উপর।
সিদ্ধান্ত পাখি নিয়ে ফেলেছে বহু আগেই, এখন শুধু তাতে অটল থাকার পালা। যে পথ সে নিজের জন্য বেছে নিয়েছে, সেটাই এখন তার একমাত্র আশ্রয়স্থল।
মমর দিকে এবার শান্ত, অবিচল দৃষ্টিতে তাকালো পাখি। জানালো নিজেদের গন্তব্যের নাম।
“স্বর্গভূমি।”
***
চলবে…
