#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_০৭
রাতের আকাশটা বিশাল কালো মখমলের পর্দার মত মনে হচ্ছে। দূর দূরান্তে জ্বলছে অসংখ্য নক্ষত্র। মেঘেদের দেখাচ্ছে রূপালী ধোঁয়ার মত।
আকাশের এই নীরব সৌন্দর্য্য জানালার পাশে বসে উপভোগ করছে মম। একটা শান্ত, নীরব প্রশ্বাস ফেলে সে চোখ ঘুরিয়ে তাকালো। কিছুটা সামনে, অন্য পাশের রো-তে বসে আছে পাখি। তার মুখোমুখি বসেছে ঘোস্ট। মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপে কিছু করছে পাখি। কানে ইয়ারফোন, চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। বাংলাদেশ থেকে সাংহাই পুডং ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর পুরোটা সময় ঠিক এভাবেই কাজে মগ্ন ছিল সে। দীর্ঘ ছয় ঘণ্টার ফ্লাইট কেটেছে নীরবে। ভূত ভাইয়া তখন বেঘোরে ঘুমিয়েছে। সাংহাই এয়ারপোর্টে নেমে চোখ খুলেছে সে। এখন অবশ্য আর ঘুমাচ্ছেন না ভূত ভাই। ব্যস্ত পাখিকে প্লেটে সাজানো ফল একটু একটু করে মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছেন।
বিরক্ত হয় মম। এই লোকটা সবসময় তার বোনের সাথে চিপকে থাকে কেন? পাখির সাথে যে আলাদা করে দুটো কথা বলবে তারও সুযোগ নেই। এই লোক যদি বাংলাদেশে এসে ঝামেলাটা না বাঁধাতো, তবে তো আর এভাবে তাড়াহুড়ো করে দেশ ছাড়তে হতো না তাদের। ওদের সিকিউরিটি নিয়েই তো মূল বিপত্তি। দু দুটো হাইব্রিডার্স ঢাকার রাস্তায় উন্মুক্ত ঘুরে বেড়াচ্ছে! পাবলিক টের পেলে খবর হয়ে যেত। দেখা যেত, ইনফ্লুয়েন্সাররা এসে হামলা করে দিত। ব্লগ বানাতো এদের ধরে ধরে। মুখের সামনে কাঁচা মাংস ধরে বলতো, একটু চিবিয়ে দেখান দেখি!
কি এমন হয়ে যেত দুটো দিন পাখিকে একা ছাড়লে? বিয়ে হয়েছে বলে কি তাকে নিয়েই থাকতে হবে চব্বিশ ঘণ্টা? ন্যাকামি যত্তসব!
ঘাড় ঘুরিয়ে আবার জানালার বাইরে তাকায় মম। বাংলাদেশ থেকে সাংহাইয়ের জন্যে রওনা দিয়েছিল তারা আজ সকালে। সাংহাই এয়ারপোর্টের ঝামেলা মিটিয়ে এখন পাখির প্রাইভেট জেটে রওনা দিয়েছে শেংসী দ্বীপের উদ্দেশ্যে। মাত্র ত্রিশ মিনিটের ছোট্ট যাত্রা শেষে সোজা গিয়ে ল্যান্ড করবে তারা স্বর্গভূমিতে।
বাংলাদেশে এই মুহূর্তে তাদের থাকাটা নিরাপদ নয় বলে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাখি। তাকে তো ফিরতেই হবে ঘোস্টের সাথে। মামুন সাহেবকেও চিকিৎসার জন্যে দেশের বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে সে। রইলো মম। আপাতত ওকে নিয়ে স্বর্গভূমিতে ফেরা ছাড়া অন্য রাস্তা দেখেনি পাখি।
বাবার কথা মনে পরতেই মনটা খারাপ হয়ে যায় মমর। আসার আগে বাবাকে ইমার্জেন্সী এয়ার এম্বুলেন্সে উঠিয়ে দিয়ে এসেছে তারা দুই বোন। ইংল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মামুন সাহেবকে। সেখানকার বেস্ট মেডিক্যাল টিমের হাতে ওনার চিকিৎসার ভার দেওয়া হয়েছে। একা ছাড়তে ইচ্ছে না করলেও উপায় ছিল না। বাবার কোন অযত্ন হবে না জানে মম। সেখানে লোক আছে ওনার দেখাশোনার। তবুও মনটা মানতে চাইছে না।
“মন খারাপ করে আছো কেন মোমো? আমরা স্বর্গভূমিতে ফিরে যাচ্ছি। দেখবে, ওখানে কোন বিপদ নেই। তুমি সুরক্ষিত থাকবে ওখানে।”
পাশ থেকে মুহূর্তের গলার আওয়াজ পেয়ে মাথা তুলে তাকালো মম। মমর মুখোমুখি সিটটায় এসে বসেছে সে। কিছুক্ষন চুপ করে থেকে মম তাকে জিজ্ঞেস করলো,
“আচ্ছা, স্বর্গভূমি কেমন?”
“ঠিক স্বর্গের মত।”
ঠোঁটজোড়া প্রশস্ত করে একটা হাসি দিয়ে বললো মুহূর্ত। সতর্ক থাকলো যেন তার দাঁত দেখা না যায়। মোমো ভয় পায় ওগুলো দেখলে। কিন্তু তারপরও মোমোটা কপাল কুঁচকে তাকালো তার দিকে। উত্তরটা বিশ্বাস হচ্ছে না হয়ত তাই। মুহূর্ত আবারো জোর দিয়ে বললো,
“আরে এটা আমার কথা না। মানুষরা বলে। ওখানে যারা থাকে, তারা।”
শেংসী দ্বীপপুঞ্জ মূলত তিনশো চৌরানব্বইটি ছোট ছোট দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত। এরমাঝে মাত্র আঠারোটি দ্বীপে রয়েছে মানুষের বাস। হাইব্রিডার্সদের পুনর্বাসনের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল শেংসান দ্বীপের মূল ভূখণ্ডের কিছু অংশ, কিছু পরিত্যক্ত ভূতুড়ে গ্রাম এবং কয়েকটি অব্যবহৃত দ্বীপ। মূল ভূখণ্ড থেকে পুল বা টানেল তৈরির মাধ্যমে সংযোগ স্থাপন করা হয় দ্বীপগুলোর মাঝে। আর এভাবেই গড়ে ওঠে স্বর্গভূমি।
“কিন্তু ওখানে না শুধু হাইব্রিডার্সরা থাকে? আমি তো শুনেছি স্বর্গভূমিতে মানুষদের প্রবেশ নিষেধ?”
“স্বর্গভূমি দু’ভাগে বিভক্ত। মূল এন্ট্রেন্সের কাছাকাছি মানুষরা থাকে। ওখানে ওদের অফিস, হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও অন্যান্য ভবন আছে। স্টাফ ও গেস্টরা সেখানে থাকার অনুমতি পায়। আমাদের কেউ সেখানে থাকে না। এই এরিয়া থেকে কয়েক মাইল ভেতরে শুরু হয় হাইব্রিডার্স জোন। ওটা আমাদের কমিউনিটি। আমাদের এরিয়া পুরোপুরি আমরা কন্ট্রোল করি। সেখানে আমাদের অনুমতি ছাড়া মানুষদের প্রবেশ নিষেধ।”
“আপু কোথায় থাকে?”
“পাখি আগে হাইব্রিডার্স জোনের বাইরেই থাকতো। স্টাফ কোয়ার্টারে। কিন্তু এখন ঘোস্টের সাথে কলোনীতে থাকে।”
কথা বলতে বলতে একটা কমলার খোসা ছাড়িয়ে মমর দিকে একটা কোয়া বাড়িয়ে দিল সে। রুদ্ধশ্বাসে মুহূর্ত অপেক্ষা করলো। মম অবশ্য অতকিছু না ভেবে সেটা নিয়ে নিল। তার সম্পূর্ণ মনোযোগ নিজেদের কথপোকথনে। কমলার কোয়াটা নেবার পর মুহূর্তের ঠোঁটে যে লাজুক হাসিটা খেলে গেল, সেটা সে খেয়ালই করলো না।
“কলোনী?”
“কলোনী…” একটু থেমে ভাবলো মুহূর্ত।
“এটাকে আবাসিক এলাকা বলতে পারো। বিভিন্ন রঙের ছোট ছোট একতলা বা ডুপ্লেক্স বাড়ি সারিবদ্ধভাবে সাজানো সেখানে। বড় খোলামেলা এরিয়া নিয়ে বানানো বাড়িগুলো। মাঝখানে প্রশস্থ রাস্তা। তবে গাছপালা ও সবুজে ঘেরা এই অঞ্চল। আমরা প্রকৃতি ও খোলামেলা পরিবেশ পছন্দ করি। তাই যতটা সম্ভব প্রকৃতি সংরক্ষণ করেই সংস্করণ করা হয়। তোমার পছন্দ হবে।”
“আমি তাহলে কোথায় থাকবো? আমাকে কি কলোনীতে থাকার অনুমতি দেবে?”
চিন্তিত দেখালো মমকে। কিন্তু মুহূর্ত দু’কাঁধ ঝাকিয়ে জানালো,
“না। তোমাকে সম্ভবত হোটেলে রাখবে পাখি।”
“আমি হোটেলে একা থাকবো কিভাবে? আপু আমাকে তার সাথে রাখবে না?”
“প্রথমত, তোমাকে হাইব্রিডার্স জোনে থাকার অনুমতি দেবে না। তুমি পাখির বোন বলে স্পেশাল ট্রিটমেন্ট পাবে ভাবলে সেটা ভুল। আমাদের মধ্যে এসব চলেনা।
দ্বিতীয়ত, অনুমতি পেলেও, ঘোস্ট তোমাকে নিজের বাড়িতে রাখবে না। ওর অসুবিধা হবে।”
“আশ্চর্য! আমি আমার বোনের সাথে থাকবো, তাতে তার কি সমস্যা? আমি তো আর তাদের বেডরুমে ঢুকে বসে থাকবো না।”
“আমরা এরকমই। নিজেদের সীমানাতে আমরা কাউকে ঢুকতে দেই না। এমনকি অন্য কোন হাইব্রিডার্সকেও না। আমাদের অসুবিধা হয়।”
মুহূর্ত বিষয়টাকে কোন গুরুত্ব না দিলেও, মমর কাছে এটা খুবই গম্ভীর ঠেকলো। সে কেন তার বোনের সাথে থাকতে পারবে না? কি ক্ষতি করেছে সে ঐ ভূতটার যে তাকে তার বোনের থেকে আলাদা করে দিতে চায়? সম্পূর্ণ নতুন, অচেনা পরিবেশে সে একা কীকরে থাকবে? পাখি কি সত্যিই তাকে একা ছেড়ে দেবে? মমর মস্তিষ্কে যখন এসব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, তখনই মুহূর্ত উৎসাহের সাথে বলে উঠলো,
“আহ্, এসে গেছি।”
ল্যান্ডিং এর সময় হয়ে গেছে। মম তেতো মুখে ওর দিকে তাকালেও, মুহূর্ত একটু ঝুঁকে এসে নিচু স্বরে বললো,
“ওয়েলকাম টু স্বর্গভূমি, মাই মোমো!”
***
“এটা হচ্ছে তোমার রুম। দেখো তো পছন্দ হয় কিনা।”
উৎসাহের সাথে মমকে গেস্ট রুমটা দেখিয়ে দিয়ে বললো ডক্টর শ্রেয়া। একটা পানির বোতল রাখলো সে বেডসাইড টেবিলে। মম মাথা নেড়ে বোঝালো ঠিক আছে, তার পছন্দ হয়েছে। যদিও মুখ ভার করে রেখেছে সে।
“ঠিকাছে, তাহলে। তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি কিছু খাবারের ব্যবস্থা করছি।”
মম আবারো মাথা নাড়লো শুধু। শ্রেয়া বেরিয়ে গেল রুম থেকে। মম আরেকবার রুমটার চারদিকে চোখ বুলালো। মাঝারি আকারের ছিমছাম, গোছানো একটা রুম। প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ছাড়া তেমন কিছু নেই এখানে। মাঝারি আকৃতির একটা কুইন সাইজ বেড, একপাশে একটা এক পার্টের আলমারি, বেডের একপাশে ড্রয়ারসহ একটা ছোট টেবিল, তার উপরে রাখা একটা টেবিল ল্যাম্প, আর বেডের ঠিক মুখোমুখি এক সিটের বড়সড় একটা সোফা। ব্যস, গুণে গুণে এই আছে রুমটিতে। দেয়ালে হালকা লেমন ইয়েলো কালারের রং করা। বেডের উপরে দেয়ালে শোভা পাওয়া জলরঙের ছবিটা রেখেছে রুচিশীলতার ছাপ। আলো বাতাসের জন্যে দুটো বড় বড় জানালা আছে রুমটিতে। বেডের একপাশের দেয়ালের অর্ধেকটায় জায়গা করে নিয়েছে বিশাল এক জানালা। আর অন্য জানালাটা সোফার পেছনে। দুটোতেই ক্রীম কালারের মোটা ভারী পর্দা টানা।
পাদুটো ভেঙে আসছে মমর। ক্লান্তিতে আর দাঁড়িয়ে থাকার জো নেই। সে ধীর পায়ে গিয়ে বেডের একপাশে বসলো। বড় জানালাটা দিয়ে বাইরের দিকে চোখ রাখল সে। সামনে কিছুটা দূরে একটা লেক দেখা যাচ্ছে। গাছপালায় ঘেরা। লেকের চারদিকে বিভিন্ন রঙের আলো জ্বলছে। মম ঠাঁয় তাকিয়ে থাকে সেদিকে।
ডক্টর শতাব্দী শ্রেয়া।
স্বর্গভূমিতে কর্তব্যরত অন কলে থাকা রেসিডেন্ট ডক্টর, সেই সাথে পাখির খুব ভালো বন্ধু। মেয়েটা বাঙালি। কলকাতায় বাড়ি। এখানে এসে যে বাঙালি কাউকে পাবে, ভাবেনি মম। তবে পেয়ে মন্দ হয়নি। যখন থেকে স্বর্গভূমিতে ল্যান্ড করেছে কারো কোন কথা বুঝতে পারছে না সে। সবাই চাইনিজ ভাষায় কি সব বলছে। এমনকি পাখিও! পাখি যে চাইনিজ ভাষায় কথা বলতে পারে, সেটাই জানা ছিল না মমর।
মনটা প্রচন্ড খারাপ হয়ে আছে তার। মুহূর্ত ঠিকই বলেছিল। পাখি তাকে নিজের সাথে রাখেনি। তাকে বলেছে, কিছুদিন শ্রেয়ার সাথে থাকতে। ডক্টর হওয়ার সুবিদার্থে একটা একতলা ছোট বাড়ি বরাদ্দ করা শ্রেয়ার জন্যে। হাইব্রিডার্স জোনের কাছাকাছি বাড়িটা। সেখানেই থাকবে মম আপাতত কয়দিন। পাখির এতটাই ব্যস্ততা যে প্লেন থেকে নামার পর মমকে শ্রেয়ার কাছে পৌঁছে দিয়ে সে আবার কোথায় যেন ছুটেছে। মমর সাথে বসে দুদণ্ড কথা বলার সময় হয়নি তার। তাকে যদি নিজের সাথে নাই রাখবে, তবে এখানে নিয়ে আসার দরকার কি ছিল? জিজ্ঞেস করতে পারেনি মম। বোনের মনে যে অভিমানী মেঘেরা জড়ো হয়েছে, সে খবর অজানাই রয়ে গেছে পাখির।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাড়ায় মম। সারাদিনের ধকলে হাত পা নাড়ানোর শক্তিটুকু অবশিষ্ট নেই তার। কিন্তু শরীরটা কেমন আঠালো আঠালো লাগছে। ধুলো বালি লেপ্টে আছে শরীরের সাথে। শাওয়ার না নিয়ে স্বস্তিতে ঘুমাতে পারবে না মম। নিজের ছোট্ট ব্যাগটা থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করে নিয়ে হলরুমের বাথরুমটায় চলে গেল সে। অল্প কিছু জরুরী জিনিসপত্র নিয়ে এসেছে মম। পাখি বলেছিল, যা প্রয়োজন সব স্বর্গভূমিতেই আছে।
শাওয়ার নিয়ে রুমে ফিরে এসে খটকা লাগে মমর। যাবার সময় লাইট তো অন করাই ছিল। তবে এখন রুমটা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে আছে। বাইরে থেকে আসা আলো পর্দা ভেদ করে হালকা আলোছায়া তৈরি করলেও, তেমন কিছু ঠাহর করতে পারছে না মম। রুমের ভেতরে ঢুকে হাতড়ে হাতড়ে সুইচবোর্ড খুঁজতে থাকে সে।
খুঁজতে খুঁজতে অন্ধকারে খট করে একটা অপ্রত্যাশিত শব্দ ভেসে আসে মমর কানে। একদম স্থির হয়ে যায় সে। একটা উপস্থিতির আভাস পায়, ঠিক তার পেছনে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে মমর। পেছনে ফিরে তাকালো না সে। বরং মনোবল জোগাড় করে দেয়াল হাতড়ে লাইটের সুইচটা চেপে ধরলো। সাথে সাথে পুরো রুমটা আলোতে ভরে যায়। সেই আলোতে আড়চোখে তাকিয়ে মম দেখলো, ঠিক তার পেছনে দাড়িয়ে আছে কেউ। লম্বা দীর্ঘদেহী কারো ছায়া পড়েছে মাটিতে। এটা যে কোন হাইব্রিডার্সই হবে, সেটা বুঝতে বাকি নেই তার।
চোখজোড়া একবার শক্ত করে বন্ধ করে নিয়ে চট করে ঘুরে দাঁড়ালো সে। চোখ খুলে দেখলো সত্যি সত্যিই এক হাইব্রিডার্স দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। দীর্ঘ, শক্তপোক্ত গড়ন তার। মুখটা আপনাআপনি ঈষৎ ফাঁক হয়ে গেল মমর। এখন পর্যন্ত মমর দেখা সবচেয়ে ভারী গঠনের হাইব্রিডার্স সে। বেশ রুক্ষ ও কর্কশ চেহারার। কপালের এক পাশে একটা গভীর দাগ। তীক্ষ্ণ সন্দেহ মেশানো ধূসর রঙের চোখ। কালো লম্বা চুলগুলো বেঁধে রেখেছে মাথার পেছনে।
মম মিনিটখানেক নীরবে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তারপর চোখ বন্ধ করে গলা ছেড়ে একটা চিৎকার দিয়ে উঠলো সে।
আচমকা মমর চিৎকার শুনার জন্য প্রস্তুত ছিল না ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকা সেই হাইব্রিডার্স। তার সংবেদনশীল কানে সেই প্রচণ্ড শব্দ ভীষণভাবে আঘাত করলো। চোখমুখ কুচকে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল সে। রাগে তার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো হাড় হীম করা এক হিংস্র চাপা হুংকার।
“আক্রোশ!!!”
মমর চিৎকার শুনে দৌড়ে ছুটে এসেছে শ্রেয়া। আক্রোশকে দেখে পরিস্থিতি বুঝে নিল সে। দ্রুত এগিয়ে এসে মমর সামনে ওকে আড়াল করে দাঁড়ালো শ্রেয়া। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“তুমি এখানে কি করছো?”
“এই মেয়েটা কে? এখানে কেন?”
রাগে গরগর আওয়াজ করতে করতে জিজ্ঞেস করলো আক্রোশ।
“ও পাখির বোন। আমার সাথে থাকবে কিছুদিন।”
“তোমার সাথে কেন থাকবে?”
“তাতে তোমার কি সমস্যা? তুমি এখানে কেন এসেছো?”
বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো শ্রেয়া। উত্তরে নাকমুখ খিঁচে ঝাঁঝালো গলায় আক্রোশ বললো,
“সমস্যা আছে। স্বর্গভূমির সুরক্ষার দায়িত্ব আমার। এই মেয়েকে বিদায় করো এখান থেকে।”
“আশ্চর্য! ও এখানে থাকলে কি এমন সুরক্ষা ঝুঁকি আছে?”
“আছে, ওকে বের করো।”
এবার মেজাজ খারাপ হলো শ্রেয়ার। সাধারণত সে নিজেও ভয় পায় আক্রোশকে। কিন্তু এভাবে বাড়াবাড়ি সহ্য হলো না তার আজ। আক্রোশের জেদের পরিবর্তে সেও উল্টো রাগ দেখিয়ে বললো,
“ঠিকাছে, তাহলে আমি ন্যায়কে ফোন করছি। ও এসে আগে বলুক, কি সমস্যা হবে মম এখানে থাকলে। ততক্ষণ ও কোথাও যাবে না।”
বলতে বলতে নিজের ফোনটা ট্রাউজারের পকেট থেকে বের করে হাতে নিল শ্রেয়া। তবে ন্যায়ের নম্বর ডায়াল করতে পারার আগেই ছোঁ মেরে সেটা নিয়ে গেল আক্রোশ। শুধু নিলোই না, হাতের মুঠোয় চেপে ফোনটা ভেঙে গুড়ো গুড়ো করে ফেললো সে।
বিস্ময়ে চোখজোড়া বড় বড় হয়ে গেল মমর। জীবনে এই প্রথম সে কাউকে একটা শক্তপোক্ত স্মার্ট ফোন হাতের মুঠোয় চেপে ভাঙতে দেখলো। শ্রেয়াকে দেখে মনে হলো না সে অবাক হয়েছে। কিন্তু ভয়ে গলা শুকিয়ে আসছে মমর। দুজনের মধ্যে কি কথা হচ্ছে, ভাষাগত কারণে সেটা বুঝতে পারছে না মম। তবে এটা বুঝতে পারছে, তাকে নিয়েই কথা কাটাকাটি চলছে।
“খুব খাতির হয়েছে দেখছি ন্যায়ের সাথে। কথায় কথায় ওকে সবকিছুর মাঝে টেনে আনা চাই!”
দাঁতে দাঁত চেপে বললো ন্যায়। শ্রেয়াও দমে না গিয়ে একই তেজে বললো,
“হ্যাঁ, চাই তো। কারণ তোমার সাথে কথা বলা বৃথা। তুমি কিছু বোঝোনা, পারো শুধু রাগে গজগজ করতে!”
“আর ন্যায় তোমাকে বোঝে? কখন এত ভালো বোঝাপড়া শুরু হলো তোমাদের?”
“যখন তুমি আমার গলা চেপে ধরে মারতে চাইছিলে, আর ও আমাকে বাঁচিয়েছে, তখন থেকে।”
জ্বলন্ত চোখে চেয়ে আছে আক্রোশ। একটু আগেও ধূসর রঙের চোখগুলো এখন গলিত লাভার ন্যায় দেখাচ্ছে। চোখের মণির চারপাশে সেই লাল রঙের রিং চকচক করছে ধারালো ছুরির ফলার মত।
শ্রেয়ার দিকে ঝুঁকে এসে ওর গলাটা একহাতে আলতো করে চেপে ধরলো সে। ঘাড়ের পেছনে মৃদু চাপ প্রয়োগ করে গমগমে ভারী আওয়াজে বললো,
“মারতে তো তোমাকে আমি এখনও পারি ডক্টর। তুমি কি ভেবেছো, আমাকে কেউ আটকাতে পারবে?”
হালকা একটু কেঁপে উঠলো শ্রেয়ার চোখের কোণটা। তবে আজ আর ভয় তাকে কাবু করতে পারলো না। আক্রোশের ঐ জ্বলন্ত চোখে চোখ রেখে সে ফিসফিস করে বললো,
“কাউকে এতটাও ভয় দেখিও না আক্রোশ, যে ভয়টাই মরে যায়। পাখি আর ঘোস্টের বিয়ের রাতে তুমি কি করেছো জানি আমি। আমি নেশায় ছিলাম, কিন্তু এতটাও নির্বুদ্ধ আমি না যে নিজের শরীরের খবর রাখবো না।”
একমুহুর্তের জন্য থমকালো আক্রোশ। হাতটা আলগা হয়ে এলো কিছুটা। সরু হয়ে এলো চোখজোড়া। তবে পরক্ষণেই ফিচেল এক হাসি ফুটে উঠলো তার ঠোঁটের কোণে। ঝিলিক দিয়ে উঠলো ধারালো দাঁতের অগ্রভাগ। শ্রেয়ার দিকে আরো বেশি করে ঝুঁকে এলো সে। তার গরম নিঃশ্বাস অনুভব করতে পারছে শ্রেয়া। দুজনার মাঝে ইঞ্চিমাত্র দূরত্ব এখন।
“ভালো তো। জানার পর কেমন লাগছে ডক্টর? সুখসুখ লাগছে, নাকি নোংরা লাগছে?”
নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করে সে। কথাগুলো কান দিয়ে শোনার চেয়ে বেশি যেন উপলব্ধি করছে শ্রেয়া। জিভের ছোঁয়ায় শুকনো ঠোঁটটা ভিজিয়ে নিয়ে শ্রেয়া উত্তরে তাচ্ছিল্যের সাথে বললো,
“করুণা হচ্ছে তোমার উপর। আমি তোমার গলায় বিধে আছি, তাইনা? না গিলতে পারছো, আর না পারছো উগড়ে দিতে।”
আক্রোশের হাতের বাঁধন শক্ত হতে শুরু করে। চোয়াল শক্ত করে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয় সে শ্রেয়ার দিকে। এদিকে শ্রেয়ার দম বন্ধ হয়ে আসছে। শ্বাস নিতে না পেরে চোখে জল জমে যায় মেয়েটার। তবুও টু শব্দটি করেন সে। আক্রোশের ঘৃণাভরা অগ্নিদৃষ্টি টলাতে পারে না তাকে। মুখটা রক্তিম বর্ন ধারণ করতে শুরু করেছে তখন শ্রেয়ার। পাশ থেকে চকিত এবং আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয় মম। ঠিক যখন সাহস করে এগিয়ে যেতে চায় সে শ্রেয়ার দিকে, তখনই শ্রেয়াকে এক ঝটকায় ছুঁড়ে ফেলে আক্রোশ। শ্রেয়া গিয়ে বিছানায় আছড়ে পড়ে। কাশতে কাশতে জোরে জোরে শ্বাস টেনে নেয় সে ফুসফুসে। মম দ্রুত ওর কাছে গিয়ে বসে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। বেডসাইড টেবিল থেকে পানির বোতলটা নিয়ে শ্রেয়ার হাতে তুলে দেয়। একটু শান্ত হয়ে মাথা তুলে যখন তাকায় শ্রেয়া, তখন আর আক্রোশকে চোখে পড়েনা রুমে।
***
“ভয়ে পেয় না। ভয় দেখানো ছাড়া ও কিছু করবে না। হাইব্রিডার্সরা মেয়েদের কোন ক্ষতি করে না।”
মমকে নিয়ে কিচেন কাউন্টারে বসে আছে শ্রেয়া। কিছু স্প্রিং রোল, স্যুপ আর ফিস চিপস সামনে নিয়ে বসেছে তারা। এটাই আজ রাতের খাবার।
একটা আইসব্যাগ গলার কাছে ধরে রেখেছে শ্রেয়া। লাল হয়ে ফুলে আছে জায়গাটা। ব্যথা শুরু হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। ঢোক গিলতেও কষ্ট হচ্ছে। শ্রেয়া নিঃশব্দে দুটো ট্যাবলেট মুখে গুজে গিলে ফেললো। মম ওকে দেখতে দেখতে কিছুটা সংকোচের সাথে জিজ্ঞেস করলো,
“উনি কে? এত রেগে ছিল কেন?”
“ওর নাম আক্রোশ। হাইব্রিডার্সদের কমান্ডার-ইন-চিফ। ও সবসময়ই রেগে থাকে। বিশেষ কোন কারণের প্রয়োজন পড়েনা।”
নির্লিপ্ত চেহারায় উত্তর দিল শ্রেয়া। গরম স্যুপ নেড়ে চেড়ে সামান্য একটু মুখে তুললো সে। মম চিন্তিত স্বরে আবারো জিজ্ঞেস করলো,
“আমাদের কি কাউকে জানানো উচিত না? সে যদি আবার আসে?”
“আপাতত আর আসবে না। আর কাউকে জানানোর প্রয়োজন নেই। তুমি চিন্তা করো না। হাইব্রিডার্সরা মেয়েদের কোন ক্ষতি করে না। মেয়েদের ব্যাপারে ওরা বেশ সেনসিটিভ।”
কথাটা সত্যি। হাইব্রিডার্সরা বন্দিদশায় মেয়েমানুষ দেখেছে খুব কম। আবার অনেকে কখনো দেখেইনি। মেয়েদের ওরা ভঙ্গুর ও কোমল প্রকৃতির বলে মানে। প্রকৃতিগতভাবেই ওদের মধ্যে মেয়েদের প্রতি সুরক্ষামূলক প্রবৃত্তি কাজ করে। তাই সহজে ওরা মেয়েদের উপর আক্রমণ করে না। কিন্তু আজ আক্রোশকে দেখার পর সেসব মিথ্যা মনে হচ্ছে মমর। কেমন হিংস্র, বুনো আচরণ ছিল লোকটার! শ্রেয়ার ফুলে ওঠা গলার দিকে তাকিয়ে মম বিরস মুখে বললো,
“সেটা তো দেখতেই পারছি।”
“বিষয়টা তুমি যেরকম ভাবছো তেমন নয় মম। আমি…..”
মুখের কথা মুখেই আটকে রইল। কিভাবে মমকে বোঝাবে ভেবে পেল না শ্রেয়া। মম বাচ্চা একটা মেয়ে। নতুন এসেছে স্বর্গভূমিতে। হাইব্রিডার্সদের বিষয়ে বিশেষ তেমন কিছু সে জানেনা। আবার তাকে জানতে দেওয়াও যাবে না। যতই পাখির বোন হোক না কেন, বহিরাগতই থাকবে সে। কিন্তু আক্রোশ কোন ঝামেলায় পড়ুক, সেটাও চায়না শ্রেয়া। একটু ভেবে চিন্তে সে মমকে বললো,
“আমার আর আক্রোশের হিসেবটা আলাদা। আমাদের কিছু পুরোনো অসমাপ্ত ইতিহাস আছে, যার প্রভাব পড়ছে বর্তমানে। সমাপ্তি খুঁজে পাচ্ছি না আমরা।”
কপালে হালকা ভাঁজ পড়লো মমর। শ্রেয়ার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সে। শ্রেয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অনুরোধ করলো,
“আমি চাইনা আমাদের মধ্যকার বিষয়টায় অন্য কেউ হস্তক্ষেপ করুক। তুমি প্লীজ কাউকে বিষয়টা জানিয়ো না।”
মনে মনে বিরক্ত হলো মম। তাদের মধ্যকার বিষয় নিয়ে একটু আগেই শ্বাস আটকে মরতে বসছিল মেয়েটা। তারপরও কি করে বলছে কাউকে না জানাতে? যাক গে। মম ভাবলো, এতকরে যখন বলছে এবারের মত বিষয়টা চেপে যাওয়াই ভালো। তাছাড়া এমনিতেও ওদের কথোপকথন কিছুই বুঝতে পারেনি মম। ঠিক করে কিছু বলতেও পারবে না সে কাউকে। সেটা ভেবে মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে খাবারে মনোযোগ দিল মম।
ঝেড়ে ফেললো মাথা থেকে আক্রোশের ব্যাপারটা।
***
চলবে…
#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_০৮
বিকেলের সূর্য তখন হেলে পড়তে শুরু করেছে। বড় বড় গাছেদের পাতার ফাঁক গলে সোনালী আলোরা খেলা করছে নরম সবুজ ঘাসে। সমুদ্রের দিক থেকে আসা দমকা হাওয়া কোন এক গোপন আলাপচারিতায় ব্যস্ত সেই পাতাগুলোর সাথে। পাখিরা ডানা ঝাপটে বিকেলের শেষ আলোটুকু গায়ে মেখে ফিরছে নিজেদের নীড়ে।
স্বর্গভূমির বাতাসে এক অদ্ভুত স্থিরতা আছে। কোন শোরগোল নেই, নেই কোন দূষণ, নেই ব্যস্ত কোলাহল। আছে শুধু শান্ত নীরবতা।
সরু পথ ধরে হাঁটছে মম। দুপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছায়া দিচ্ছে গাছগুলো। পথের পাশে, গাছগুলোর নীচে ছোট করে ছেঁটে রাখা সবুজ ঘাসের গালিচা বিছানো। সেটা পেরিয়ে শুরু স্বচ্ছ পানির লেকের পাড়। আলোর প্রতিফলন ঘটে চিকচিক করছে লেকের পানি। কিছুটা দূরত্ব পর পর সাজানো ছোট ছোট অচেনা ফুলের গাছ। সুন্দর, কিন্তু নিস্তব্ধ। পাখিদের কিচির মিচির ছাড়া আর কোন শব্দ নেই চারপাশে।
এরকম পরিবেশ প্রকৃতি প্রেমীদের কাছে স্বর্গ হলেও, মমর কাছে বিরক্তিকর ঠেকছে। ঢাকার কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা মম, তার আঠারো বছরের জীবনে কখনও এতটা শূন্য, নীরব, স্তব্ধ পরিবেশ দেখেনি; যেখানে কথা বলে তো শুধু প্রকৃতি। গত তিনদিনে বিরক্তি এসে গেছে তার এই পরিবেশের উপর। ডক্টর শ্রেয়া নিয়ম করে সকালে বেরিয়ে যায় হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। দুপুরে ফিরে লাঞ্চ করে আবার চলে যায়। তারপর ফিরতে ফিরতে রাত। লাঞ্চ বা ডিনার টাইমে দু চারটা কথা হলেও হয়, নইলে সারাদিন অনেকটা গৃহবন্দি দশায় কাটে মমর। সময় কাটানোর মত কিছুই খুঁজে পায় না মম।
ইয়া মোটা মোটা বইয়ে ভর্তি শ্রেয়ার বুকশেলফ। ম্যাগাজিনও আছে। কিন্তু সেসব শুধু জ্ঞানের কথায় ভর্তি। বেশিরভাগ বই চিকিৎসাশাস্ত্র বিষয়ক, নয়ত মনোবিজ্ঞানের। আর টেলিভিশন? প্রথমদিনই আবিষ্কার করে মম সেটা কোন কাজের না। বসার ঘরে একটা চকচকে কালো টিভি থাকলেও, তাতে কোন বিনোদন নেই। আছে শুধু কয়েকটা ডকুমেন্টারি চ্যানেল, যেখানে সারাদিন চলে বোরিং সব প্রোগ্রাম। শ্রেয়া অবশ্য সেগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে দেখে। এইযে! আজকেও লাঞ্চ টাইমে বাড়িতে এসে চপস্টিক দিয়ে ভাত খেতে খেতে হা করে শ্রেয়া দেখছিল, কিভাবে একজন আগুনে পুড়ে যাওয়া লোকের দগ্ধ শরীরে তেলাপিয়া মাছের চামড়া লাগিয়ে তাকে সুস্থ করে তোলা হয়েছে। অন্যদিকে, এই দৃশ্য দেখে মমর খাবারে অরুচি এসে গেছে। ভাতগুলো আর গিলতে পারেনি সে।
পাখি নিয়ম করে তাকে একবার দেখে যায় সন্ধ্যায়। অভিমানী মম তার সাথে খুব একটা কথা বলেনি। কিন্তু ব্যস্ত পাখি, এখনো সেটা লক্ষ্যই করেনি। সে আসে, দ্রুত দু চারটা প্রয়োজনীয় কথা বলে চলে যায়। শ্রেয়ার কাছে মম শুনেছে, আজকাল নাকি দম ফেলারও ফুরসৎ পায়না পাখি। হাইব্রিডার্সদের নিয়ে হওয়া আন্তর্জাতিক সম্মেলন, হাইব্রিডার্স কালেকটিভ অর্গানাইজেশন (সংক্ষেপে HCO) এর বিশ্বের মঞ্চে আত্মপ্রকাশ, ন্যায়কে HCO-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, পাখি ও ঘোস্টের সম্পর্কের খোলাসা এবং প্রেস ব্রিফিংয়ে হামলা, সবকিছু মিলিয়ে এখন প্রচন্ড প্রেশার যাচ্ছে। তার উপর ঐ ভূতটাও বেশ জ্বালাচ্ছে তাকে। অসুস্থ শরীর নিয়েও রেস্টে থাকতে নারাজ সে। যে সময়টুকু পাখি ধরে বেঁধে রাখে, সেই সময়টুকুই বিশ্রামে থাকে সে।
শ্রেয়ার কাছে মম আরো জানতে পারে ভূত ভাইয়াটার তার বোনকে জ্বালানো ছাড়াও আরো একটা কাজ আছে। HCO এর চিফ সিকিউরিটি অফিসার সে। পুরো স্বর্গভূমির টেকনিক্যাল সিকিউরিটি তার আয়ত্ত্বে। নিজের বাড়ি থেকে এক চুল না নড়েও, সে যেকোন সময় যেকোন জায়গায় নজর রাখতে পারে। এজন্যই নাকি তার নাম পড়েছে ঘোস্ট। আর ঠিক এই কারণেই স্বর্গভূমি থেকে এত সহজে প্লেন হাইজ্যাক করে বাংলাদেশে উড়াল দিতে পেরেছিল সে।
বিরক্তি কাটাতে হাঁটতে বেরিয়েছে মম। চারপাশটা খানিকটা ঘুরে দেখছে। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তার কানে একটা শব্দ ভেসে আসে। কৌতূহলী মম ঘুরে তাকিয়ে দেখে একটা ইলেকট্রিক বগি দ্রুতবেগে হেলতে দুলতে এগিয়ে আসছে লেকের দিকেই। এসব বগি সাধারণত গলফ কোর্ট বা রিসোর্টে যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত হয়। স্বর্গভূমিতেও কাছাকাছি দূরত্বে যাতায়াতের জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় ছোট বড় বিভিন্ন আকারের এসব ইলেকট্রিক বগি।
অস্বাভাবিক বেগে এগিয়ে আসা বগিটার স্টিয়ারিং ধরে আছে একটা মেয়ে। নিয়ন্ত্রন হারিয়ে বগিটা সোজা গিয়ে পতিত হয় লেকের পানিতে। ভারী ওজনের বগিটা ধীরে ধীরে ডুবে যেতে থাকে মমর চোখের সামনে। সে ছুটে এগিয়ে যায় লেকের পাড়ে। দেখে, ভেতরে থাকা মেয়েটা আটকা পড়েছে। হাত পা ছোড়াছুড়ি করে বের হবার চেষ্টা করছে। কিন্তু বগির নীচে চাপা পড়ে যাচ্ছে সে। না পারছে বের হতে, না পারছে উপরে উঠে আসতে।
আতঙ্কিত দৃষ্টিতে চারদিকে তাকিয়ে চিৎকার করতে শুরু করে মম সাহায্যের আশায়।
“হেল্প! হেল্প! কেউ আছেন? বাঁচাও!!!! পানিতে ডুবে যাচ্ছে!!!”
কিন্তু মমর সাহায্যের আবেদন কারো কানে পৌঁছায় না। পৌঁছাবে কি করে, সে ছাড়া তো সেখানে আর কেউ নেই। এদিকে বুক ধড়ফড় করছে মমর। কি করবে সে এখন? সে তো সাঁতারও জানে না। এখন উপায়?
এদিক ওদিক তাকিয়ে মম দেখলো কাছাকাছি একটা রাবারের হোস পাইপ পড়ে আছে। সে চট করে পাইপখানা তুলে সেটা ছুঁড়ে মারলো পানিতে মেয়েটার দিকে। মেয়েটা প্রথমে বুঝতে পারলো না, পাইপটাও ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গেল। সেটা টেনে এনে মম আবার ছুঁড়ে দিল মেয়েটার দিকে। সেই সাথে চেচিয়ে মেয়েটাকে বললো সেটা ধরতে। তৃতীয়বারের সময় মেয়েটা ঠিক বুঝতে পারলো। বগিটা এখন সম্পূর্ণ ডুবে গেছে। মেয়েটাও তলিয়ে যাচ্ছে সাথে। কোনমতে পাইপটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো সে। মম লম্বা পাইপটা নিয়ে দৌড়ে গিয়ে একটা গাছের গুড়িতে পেঁচিয়ে দিল কয়েকবার। তারপর আবার লেকের কাছে গিয়ে পাইপটা টেনে তোলার চেষ্টা করতে লাগলো সে। অন্যদিকে পাইপটা আঁকড়ে ধরে মেয়েটাও প্রাণপণে উঠে আসার চেষ্টা করছে।
দুজনের মিলিত প্রচেষ্টা সফল হলো শেষমেষ। পাড়ে পৌঁছাতেই ওকে হাত ধরে টেনে উপরে তুলে আনলো মম। এই কসরতের পর শরীরের ভর ছেড়ে দিলো মম। হাঁপিয়ে উঠেছে সে। ঘাসের উপর শুয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে।
মিনিটখানেক পর উঠে বসে মেয়েটার দিকে ভালো করে তাকালো মম। মেয়েটার ত্বক মসৃণ, একেবারে নিখুঁত। গোলাপি আভা ফুটে আছে ফর্সা চামড়ায়। ফর্সা ত্বকে ঘষা দিলে রক্তের আভা ভেসে উঠে যেমনটা হয়, তেমনই। পিঠে ছড়িয়ে আছে ঝলমলে রেশমের মত লালচে খয়েরী রঙের চুল। আর মেয়েটার চেহারা? সে যেন কোন শিল্পীর হাতে গড়া নিখুঁত কারুকাজ। সরু নাক, সুগঠিত চোয়াল, সামান্য ফোলা গাল, পরিপাটি একদম মেপে বসানো ভ্রু, ঘন চোখের পাপড়ি!
অদ্ভুত সুন্দর ও নিখুঁত এই মেয়েটির মাঝে কিছু একটা খটকা আছে। সেটা কি, মম ওর চোখের দিকে তাকিয়েই ঝট করে বুঝে গেল।
হাইব্রিডার্স!
বড় বড় টানা দুটো চোখ মেয়েটার। নীলচে ধূসর চোখের মনি ও তার চরপাশে লাল রঙের রিং। কান দুটো পাতলা লম্বাটে গড়নের, ঠিক ছেলেদের মতোই। তবে কিছুটা ছোট।
“তোমাকে ধন্যবাদ। আমাকে বাঁচিয়েছ তুমি। নইলে ওই বগিটার সাথে ডুবে যেতাম, কেউ টেরও পেত না।”
কিছুটা অস্বস্তি ও সংকোচ নিয়ে বললো মেয়েটা। কিন্তু মম ওর চাইনিজ কথাবার্তা কিছুই বুঝলো না। সে ভ্রু দ্বয় কপালে তুলে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে শব্দ করলো,
“হু?”
মেয়েটা সরু চোখে তাকালো মমর দিকে। দৃষ্টিতে তার সন্দেহ, কিন্তু কিসের সন্দেহ সেটা বুঝলো না মম। সে আমতা আমতা করে বললো,
“নো চাইনিজ। বাংলা বা ইংলিশ প্লীজ!”
মেয়েটা মমর ভাঙ্গা ভাঙ্গা কথা বুঝতে পেরে এবার ইংরেজিতে বললো,
“আমি শুধু তোমাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি, আমাকে বাঁচানোর জন্য।”
“ওহ্, ধন্যবাদ।”
“না, তোমাকে ধন্যবাদ।”
“ধন্যবাদ, ওকে।”
দুহাত তুলে দুই বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মম বোঝালো সে ধন্যবাদ স্বীকার করে নিয়েছে। মেয়েটা আর কিছু বললো না। ডান পায়ের বুট জুতোটা খুলে গোড়ালির কাছের ক্ষতটা দেখতে লাগলো সে। মম দেখলো মেয়েটার পায়ের বেশ খানিকটা অংশ কেটে গেছে। হয়ত পানির নীচে ধারালো কিছুর সাথে আটকে গিয়েছিল বগি থেকে বেরোবার সময়।
“তোমার পা তো অনেকখানি কেটে গেছে।”
“দেখেছি আমি।”
মেয়েটার রসকসহীন উত্তরে কিছুটা দমে গেল মম। ভাবলো এবার তার ফিরে যাওয়া উচিত। কিন্তু এভাবে মেয়েটাকে ফেলে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? একটু ভেবে মম আবারো তার ভাঙ্গা ভাঙ্গা কাজ চালিয়ে নেবার মত ইংরেজি দক্ষতা খাটিয়ে বললো,
“আমি কাছাকাছিই থাকি। তুমি যাবে আমার সাথে? ফার্স্ট এইড আছে ওখানে।”
মেয়েটা প্রথমে বিরক্তি নিয়ে তাকালেও, একটু ভেবে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। নিজে নিজে উঠে দাঁড়াতে পারলেও, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে সে। কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পেরে, মম ওর একটা হাত চেপে ধরে সাহায্য করতে লাগলো। মেয়েটা প্রথমে কপাল কুঁচকে তাকালেও, পরে আর কিছু বললো না।
দুজনে মিলে পৌঁছালো শ্রেয়ার বাড়িতে। আশেপাশে জনমানবহীন এই স্বর্গভূমিতে দরজা লক করার প্রয়োজন দেখেনি মম। বাইরে থেকে শুধু তালা টালা ছাড়া এমনি আটকে রেখেছিল। মেয়েটাকে নিয়ে বসার ঘরের সোফায় বসালো সে। তারপর একটা টাওয়াল নিয়ে এসে মেয়েটাকে ধরিয়ে দিলো। মেয়েটা চুলগুলো মুছে নিতে নিতে সে কিচেন কেবিনেট থেকে ফাস্ট এইড বক্সটা নিয়ে এলো। রান্নার সময় দেখেছিল মম সেটা ওখানে। তাই আর খুঁজে পেতে অসুবিধা হলোনা। মেয়েটার কাছে বসে ওর পায়ের ক্ষতে ঔষধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল মম।
“হয়ে গেছে!”
“ধন্যবাদ।”
“ধন্যবাদের প্রয়োজন নেই। আমার নাম মম, আর তুমি?”
“চেরী”
“চেরী! সুন্দর তো।”
তৎক্ষণাৎ মেয়েটার চুলের দিকে নজর গেল মমর। মেয়েটার নাম ওর চুলের সাথে মিলিয়ে রাখা মনে হয়। আচ্ছা, মেয়েটা কি চুলে রং করেছে, নাকি এটাই ওর চুলের আসল রং? মনে প্রশ্ন জাগলেও, সেটা চেপে গেল মম। পাছে আবার মেয়েটা প্রশ্ন শুনে রাগ করে! এমনিতেই মেয়েটিকে গম্ভীর, নিরস স্বভাবের মনে হচ্ছে।
“তুমি কিছু খাবে? আমি এই সময়টাতে চা না খেয়ে থাকতেই পারি না। ওহ্, ভালো কথা! তোমার ড্রেস তো ভিজে আছে। এভাবে থাকলে ঠান্ডা লেগে যাবে। চেঞ্জ করবে?”
কথাটা বলে নিজেই ভাবনায় পড়ে গেল মম। হাইব্রিডার্স ছেলেদের মত অত পেশীবহুল ও ভারী না হলেও মেয়েটা লম্বায় প্রায় ছয় ফুটের কাছাকাছি তো হবেই। কিন্তু শরীরের গড়ন ছিমছাম, হালকা। অনেকটা বলিউডের অভিনেত্রী ক্যাটরিনা কাইফের মত। ফ্লোরাল প্রিন্টের একটা মিডি ড্রেস পরে আছে সে। ভেজা থাকায় শরীরের প্রতিটি ভাঁজ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।সেদিকে থেকে চোখ সরিয়ে একবার নিজের গোলগাল তুলতুলে পেটটার দিকে তাকায় মম। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসতে চায় তার অন্তর থেকে। চোখের সামনে এমন নিখুঁত মেয়েটাকে দেখে, নিজেকে বড্ড বেক্ষাপ্পা লাগছে মমর।
“দরকার নেই। আমরা তোমাদের মত অত দূর্বল নই। এইটুকুতে অসুখে পরবো না।”
ভাবনার সুতো কেটে বেরোতে সেকেন্ড খানেক সময় লাগে মমর। বুঝতে পারে ড্রেস চেঞ্জ করার ইচ্ছে নেই চেরীর। আর কথা না বাড়িয়ে কিচেনে গিয়ে চায়ের বন্দোবস্ত শুরু করে মম। কিছুক্ষন পর মেয়েটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এসে বসে কিচেন কাউন্টারে। চারদিকে তাকিয়ে জোরে জোরে কয়েকবার শ্বাস টেনে নেয় সে। তারপর সন্দেহের চোখে তাকিয়ে মমকে প্রশ্ন করে,
“তুমি এখানে নতুন? আগে তো দেখিনি।”
“হ্যাঁ। এইতো তিনদিন হলো এসেছি।”
“কেন এসেছো? কি কাজে? ন্যায় জানে?”
“সেটা তো বলতে পারছি না। আমাকে আমার আপু নিয়ে এসেছে।”
“কে তোমার আপু?”
“পাখি…” মম ভাবে এই নামে হয়ত তাকে চিনবে না। ভালো নামটা বলা দরকার।
“মানে অনামিকা আহমেদ।”
কিন্তু তাকে কিছুটা অবাক করে দিয়ে মেয়েটা জানায়,
“আমি জানি পাখি কে। স্বর্গভূমিতে সবাই চেনে ওকে।”
“ওহ্।”
অযথাই মাথা নাড়ে মম। চায়ের পানি ফুটতে শুরু করেছে। দুটো কাপ নিয়ে সেটা সাবধানে ঢেলে নেয় মম। তারপর একটা কাপ চেরীর দিকে এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“তুমি পানিতে পরে গিয়েছিলে কীকরে? কোথায় যাচ্ছিলে?”
চেরী তখন নিজের ড্রেসের গোপন পকেটে রাখা স্যাটেলাইট ফোনটা বের করে কাকে যেন কল করছে। ওপর পাশ থেকে ফোনটা রিসিভ করা হলে, তাকে এসে নিয়ে যেতে বলে ফোনটা কাটে সে। এরপর মমর দিকে ফিরে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তার প্রশ্নের উত্তর দেয়।
“আমি বগি চালানোর ট্রেনিং নিচ্ছি। আজকে ভালোই চালাচ্ছিলাম। ভাবলাম এদিকে একটা চক্কর দিয়ে যাই। কিন্তু পরে স্পিড সামলাতে না পেরে ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলেছিলাম।”
“আচ্ছা।”
“তোমার সাথে পাখির অনেক মিল আছে।”
“তাই?”
“হুম। বিপদ দেখলে ওর মাথাও ভালোই কাজ করে। একবার জুতো মেরে আমাদের এক হাইব্রিডার্সকে বেঁহুশ করে দিয়েছিল। হোস্টেলে সবাই ওকে মোটামুটি পছন্দ করে।”
“জুতো মেরে বেঁহুশ করে দিয়েছিল?”
চোখ পিট পিট করে তাকায় মম। জীবনে পাখির বহু গুণকীর্তন সে দেখেছে এবং শুনেছে। কিন্তু এটা সম্পূর্ণ তার মাথার এক হাত উপর দিয়ে গেল। চেরী হয়ত বুঝতে পারলো সেটা। মেয়েটার ঠোঁটের কোণটা সামান্য কেঁপে উঠলো। চেহারায় ধরা পড়লো কৌতুকের আভাস।
“লম্বা কাহিনী। অন্য কোন একদিন শোনাবো। এখন আমাকে বেরুতে হবে। সন্ধ্যা গড়িয়ে গেলে হোস্টেল সুপার আবার ঝামেলা শুরু করবে।”
“তুমি হোস্টেলে থাকো? মানে হাইব্রিডার্সদের হোস্টেলে?”
“হ্যাঁ। মেয়েদের হোস্টেল। পাখি কিছুদিন ছিল আমাদের সাথে, ওর বিয়ের আগে।”
“আপু তোমাদের সাথে থাকতো?”
আরেকচোট অবাক হলো মম।
“হুম, ছিল কিছুদিন। পরে ঘোস্ট ওকে তেরামি করে নিয়ে গেছে।”
কথাটা বলে একটু থমকালো চেরী। তারপর ভ্রু কুঁচকে তাকালো মমর দিকে। প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“আচ্ছা, তোমরা মানুষের মেয়েরা বিয়ের পর নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে ছেলেগুলোর কাছে চলে যাও কেন? কি দরকার? শারীরিক সম্পর্কের জন্যে নির্দিষ্ট একটা শিডিউল মেনটেইন করলেই তো হয়। কতটুকু সময়ই বা লাগে! এভাবে একা একটা দূর্বল মেয়ে একটা ছেলের সাথে সবসময় থাকা, কি ভয়ংকর ব্যাপার!”
শেষ কথাটা বলতে গিয়ে কিছুটা শিউরে উঠলো সে। যেন ভাবতেই গা গুলিয়ে আসছে তার। চেরীর প্রশ্নের কি প্রতিক্রিয়া দেবে ভেবে পেলনা মম। তবে ভাবার খুব বেশি সময়ও পেল না সে। বাইরে জোরে জোরে হর্ন বাজাচ্ছে কেউ। নতুন একটা বগি নিয়ে এসেছে চেরীকে নিয়ে যেতে। চায়ের খালি কাপটা রেখে উঠে দাড়ালো চেরী।
“আচ্ছা, আজ আমি আসি। তোমার সাথে পরে দেখা হবে।”
***
চলবে…
