#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_৯(১)
চপারের নিরন্তর ঘূর্ণন কম্পন সৃষ্টি করছে বাতাসে। সেই ভারী কম্পনে সৃষ্ট আওয়াজ সুর তুলছে নীরব শান্ত প্রকৃতির মাঝে। মাঝ আকাশে স্থির হয়ে আছে হেলিকপ্টারটা। উপরে নীল অম্বর, নীচে শেংসী দ্বীপ। ঘন সবুজে ঢাকা, কুয়াশার চাদরে মোড়া। বন এতটাই ঘন যে উপর থেকে এক চুল পরিমাণ ফাঁকা জায়গা দেখা যাচ্ছে না।
চপারের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো একটি অবয়ব। রোটরের তীব্র আওয়াজ ও বাতাসের ঝাপটা, দুটোই একসাথে আছড়ে পড়ে তার উপর। কিন্তু তাকে নড়াতে পারে না এক চুলও। খোলা দরজায় স্থির দাঁড়িয়ে আছে সে হ্যান্ডেল ধরে।
মাঝ আকাশে স্থির হয়ে আছে চপারটা এখন। সেখান থেকে একটা মোটা শক্তপোক্ত দড়ি ঝুলে পড়ে হারিয়ে যায় বনের ভেতর। কয়েক সেকেন্ড পর দড়িটা ধরে স্লাইড করে নীচে নামতে শুরু করে সে। মাঝ রাস্তায় ঠিক জঙ্গলের উপরে কিছুটা সময়ের জন্য থামে সে।
মুহূর্তের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে দড়িটা। শরীর দুলছে বাতাসের তোড়ে। কিন্তু কোন তাড়াহুড়ো নেই তার মাঝে। বরং আছে অদ্ভুত এক স্থিরতা। মুহূর্তটা ভয়ের হতে পারতো, কিন্তু মুহূর্ত শুধুই স্বাদ পায় মুক্তির।
কোন দেয়াল নেই, কোন শেকল নেই, নেই কোন অসহায়ত্ব। আছে শুধুই মুক্ত হাওয়া।
নিচের দিকে তাকায় মুহূর্ত। গাছগুলো অদৃশ্য রহস্যের হাতছানি দিয়ে ডাকছে যেন! দড়িটা ছেড়ে দিলেই সে হারিয়ে যাবে তাদের রহস্যের মাঝে। কিন্তু মুহূর্ত ছাড়ে না। বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ, রোটরের ঘূর্ণন, দুলতে থাকা অস্থির দড়ি, সবকিছু চোখ বন্ধ করে অনুভব করে সে কিছুক্ষণের জন্য। তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে তুলে ছেড়ে দেয় দড়িটা।
তার বুট শক্ত মাটি স্পর্শ করা মাত্র, সে দড়িটা ছেড়ে দেয়। সিগন্যাল পেয়ে হেলিকপ্টারটি দিশা বদলায়। আস্তে আস্তে দূরে মিলিয়ে যায় সেটার শব্দ।
কাঁধে ভারী ব্যাগ ঝুলিয়ে মুহূর্ত হাঁটতে শুরু করে। নীচে ভেজা পাতার গন্ধ, আর উপরে অচেনা পাখির ডাক, এছাড়া নিস্তব্ধ চারদিক। সতর্ক দৃষ্টি মেলে এগিয়ে যেতে যেতে একটা হালকা শব্দ ভেসে আসে তার কানে। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। কিছুক্ষন পর আবারো ভেসে আসে শব্দটা। এবার সেটাকে অনুসরণ করে এগিয়ে যায় সে। গাছের শেকড়, ভেজা শুকনো পাতা ও ঝোপঝড়ের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে পৌঁছায় একটি ছোট্ট খাদের পাশে। খাদের নীচে আটকা পড়েছে একটা ছোট্ট ক্লাউডেড লেপার্ড কাব। এক পা কাঁটাযুক্ত শেকড়ে জড়িয়ে আছে। কাদা ও শুকনো রক্ত লেগে আছে শরীরের নরম পশমে। চোখদুটোতে ফুটে আছে ভয় ও যন্ত্রণার ছাপ।
হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে মুহূর্ত। মুখ থেকে নিচু স্বরে কিছু শব্দ বের করে সে। ভয় দেখানোর জন্য নয়, বরং বাচ্চাটাকে শান্ত করার জন্যে। বাঘের বাচ্চাটা হিসহিস করে ওঠে। মুখ খুলে ছোট ছোট দাঁতগুলো দেখায়। ভয় দেখানোর চেষ্টা করলেও তার অসহায়ত্ব ও আতঙ্ক স্পষ্ট ফুটে ওঠে জ্বলজ্বল করতে থাকা ভেজা চোখ দুটোতে।
মুহূর্ত ধীরে ধীরে হাত বাড়ায়। শেকড়টা সরিয়ে পা-টা ছাড়ানোর চেষ্টা করে। বাচ্চাটা ব্যথায় মৃদু শব্দ করে ওঠে।
“আর একটু লিটল কাব। এইতো হয়ে গেছে।”
নিচু স্বরে বাচ্চাটাকে সান্ত্বনা দিতে থাকে মুহূর্ত। কথাগুলো বুঝতে না পারলেও, আওয়াজের কম্পন অনুভব করতে পারে বাচ্চাটা। বুঝতে পারে আগন্তুক শত্রু নয় তার।
শেষমেষ পা-টা ছাড়াতে সক্ষম হয় মুহূর্ত। বাচ্চাটা নড়ে না। স্থির বসে থাকে সেখানে। মুহূর্ত দুহাতে সাবধানে কোলে তুলে নেয় বাচ্চাটাকে। পায়ের ক্ষতটা পর্যবেক্ষণ করে সে। খুব গভীর নয় সেটা। সেরে যাবে কদিনেই। মুহূর্ত তার ব্যাগ থেকে একটা পানির বোতল বের করে জায়গাটা ধুয়ে পরিষ্কার করে দেয়। বাচ্চাটা উষ্ণতা পেয়ে লেপ্টে থাকে তার বুকে।
বাচ্চাটার মাথায় দু কানের মাঝের জায়গাটায় আঙুল বুলিয়ে আদর করে দিতে থাকে মুহূর্ত। সেসময়ই পাশের ঝোপের আড়াল থেকে ভেসে আসে একটা চাপা গর্জন। বেরিয়ে আসে একটা পূর্ণবয়স্ক ক্লাউডেড লেপার্ড। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে মুহূর্তের কোলে থাকা বাচ্চাটার দিকে। সতর্ক, তীক্ষ্ম সে দৃষ্টিতে লুকিয়ে আছে স্নেহ। সেটা লক্ষ্য করে স্মিত হাসে মুহূর্ত। বাচ্চাটাকে আদর করতে করতে বলে,
“কি লাকি তুমি! মা আছে তোমার। ঐ যে তোমার খোঁজে এসেছে, দেখো!”
কোন তাড়াহুড়ো না করে, নিচু হয়ে বাচ্চাটাকে ধীরে ধীরে মাটিতে নামিয়ে দেয় সে। তারপর মা লেপার্ডটার চোখে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বাচ্চাটাকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে ঠেলে দেয় কিছুটা। ফিসফিস করে বলে,
“যাও, তোমার মায়ের কাছে যাও। আমাদের মধ্যে অন্তত একজনের ভাগ্যে তো মায়ের আদর জুটুক।”
বাচ্চাটা কিছুক্ষন থমকে থাকলেও, তারপর এক ছুটে চলে যায় মায়ের কাছে। মা লেপার্ডটা বাচ্চাটাকে পেয়ে গর্জন করে ওঠে। তবে এবারের গর্জনটা হিংস্রতার ছিল না, ছিল স্বস্তির। বাচ্চাটার চেহারা ও শরীর জিভ বের করে চেটে দিতে থাকে মা লেপার্ড। বাচ্চাটাও মা-কে পেয়ে আদুরে আওয়াজ তোলে। মিশে যেতে চায় মায়ের বুকে।
মুহূর্ত কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে দেখে তাদের। এরপর ধীরে ধীরে নিঃশব্দে পিছিয়ে যায়। মিলিয়ে যায় জঙ্গলের সবুজ স্রোতে। বড় বড় গাছপালা ও উঁচু ডালপালার ছায়ায় ঘেরা সরু পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মুহূর্ত পৌঁছায় কাঙ্ক্ষিত জায়গাটায়। দূর থেকে দেখলে এটাকে মাটির টিবি বলে মনে হয়। কিন্তু কাছে এলে বোঝা যায় এখানে আছে একটা বাড়ি। পুরনো, শক্ত, পাথরের তৈরি। বাড়িটার উপর দিয়ে ঘন সবুজ আইভি লতাগাছ এমনভাবে ছড়িয়ে গেছে যে, দেয়াল আর গাছ আলাদা করা যাচ্ছে না। জানালাগুলোও অর্ধেক ঢাকা পড়ে গেছে। লতাগাছের ফাঁক দিয়ে কাচের অংশ দেখা যাচ্ছে কোথাও কোথাও। বাড়িটা বাইরে থেকে দেখতে ভূতুড়ে মনে হলেও, ভেতরে পরিষ্কার, আধুনিক ও বসবাসযোগ্য। এরকম আরো অনেক কাঠামো আছে এই বনে। জঙ্গলের ভেতর লুকিয়ে থাকা এই পাথরের বাড়িগুলোকে বলা হয় ডোম।
“লিও!!!”
বাড়িটির সীমানায় দাঁড়িয়ে ডাক দেয় মুহূর্ত। পাথরের ভাঙ্গা একটা বাউন্ডারি লতাপাতায় ঢাকা পড়েছে। তবে সেটা বাড়ির সীমান নির্ধারণ করে না। নির্ধারণ করে গন্ধ। বাড়ির মালিক নিজের সীমানা নির্ধারণ করে রেখেছে নিজের ঘাম ও ইউরিনের গন্ধ দিয়ে। সাধারণ মানুষের নসিকারন্ধ এই গন্ধ আবিষ্কারে ব্যর্থ হলেও প্রাণীকুল ও হাইব্রিডার্সদের কাছে সেটা স্পষ্ট।
“লিও!!!!!”
ভেতর থেকে কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে আবারো কিছুটা বিরক্তি নিয়ে ডেকে উঠলো মুহূর্ত। সে জানে, ঠিক ওর উপর নজর রাখছে লিও ভেতর থেকে, কিন্তু তবুও ইগনোর করা হচ্ছে তাকে। এজন্যই এই রেস্ট্রিক্টেড জোনে কেউ আসতে চায় না। এখানকার হাইব্রিডার্সদের কাছ থেকে সাড়া পেতে, দাঁতে দাঁত লেগে যায়।
অগণিত শিশু বলি হয়েছিল প্রজেক্ট পাওনের নিষ্ঠুরতার। বাচ্চাদের শারীরিক গঠন বড়দের মত পাকা পোক্ত নয়। তাদের বাড়ন্ত শরীরে পরিবর্তন আনা সহজ ছিল। ছোট থেকে তাদের ট্রেনিং দিয়ে নিজেদের উদ্দেশ্য পূর্তির হাতিয়ার বানাতে চেয়েছিল শিনহোর ডাক্তাররা। তাদের এই লোভের শিকার হয়ে কেউ মরেছে, কেউ বেঁচেছে, কেউবা বেঁচে থেকে মরেছে ধুকে ধুকে। হাজারো বন্দীদের মাঝে কিছু কিছু বন্দী এমনও ছিল, যাদের শারীরিক, মানসিক ও প্রবৃত্তিগত বৈশিষ্ট্য মানুষের চেয়ে পশুসদৃশ্য বেশি। তাদেরকে ডাক্তাররা অসফল পরীক্ষার ফল হিসেবে চিহ্নিত করতো। তবে মুক্তি দিতো না। সবচেয়ে শক্তিশালী, ঝুঁকিপূর্ণ ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ ঔষধগুলোর পরীক্ষা হতো তাদের উপর। ইচ্ছে হলেই, মনোরঞ্জনের জন্য পিটিয়ে বা টর্চার করে মেরে ফেলা হতো এদের। বন্দীদের মধ্যেও সবচেয়ে করুন জীবন ছিল তাদের। রেস্ট্রিকটেড জোন ঐ সব হাইব্রিডার্সদেরই আবাসস্থল। মুক্ত হাওয়া ও খোলা প্রকৃতির মাঝে মিশে থাকতে পছন্দ করে তারা। স্বর্গভূমির অন্যান্য জায়গায় মানুষদের আনাগোনা থাকলেও, এই এরিয়ায় প্রবেশ সম্পূর্ণরুপে নিষিদ্ধ। মানুষদের দেখলে হিংস্র হয়ে ওঠে রেস্ট্রিকটেড জোনের হাইব্রিডার্সরা। এমনকি অনেক সময় নিজেদের লোকেদের দেখলেও হুংকার তোলে।
এই যেমন এখন! এতবার ডাকার পরও সাড়া দিচ্ছে না লিও। সাধারণত ওদেরকে ওদের মতোই থাকতে দেওয়া হয়। শুধু নিয়মিত খোঁজ খবর রাখা হয়, তারা ঠিক আছে কিনা। রেষ্ট্রিকটেড জোনের অসামাজিক এসব হাইব্রিডার্সদের সামলানো খুবই ঝামেলার কাজ যা পারতপক্ষে কেউ করতে চায় না। মুহূর্তেরও ইচ্ছে ছিল না এখানে আসার। কিন্তু আসতে হয়েছে দুটো কারনে। এক, ঘোস্টের সাথে মিলে প্লেন হাইজ্যাক করে বাংলাদেশে যাবার শাস্তিস্বরূপ ডিউটি পড়েছে এখানে। দুই, সপ্তাহখানেক ধরে লিও বের হচ্ছে না বাড়ি থেকে।
“আমি জানি তুমি ভেতরে আছো! বাইরে বের হও বলছি!”
“যাও এখান থেকে!”
এতক্ষণে ভেতর থেকে ভেসে আসে লিওর রুক্ষ, কর্কশ হুংকার।
“তোমার জন্য খাবার এনেছি।”
হাতের ব্যাগটা উঁচু করে শূন্যে তুলে ধরে রাখে মুহূর্ত। এখানে বেঁচে থাকার জন্য যা যা প্রয়োজন সবকিছুর ব্যবস্থা করা আছে। মাসের শুরুতে নিয়ম করে রসদসহ সব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয় প্রতিটি ডোমে। এছাড়াও অন্য যেকোন কিছুর প্রয়োজনে একটা ফোন কলই যথেষ্ট। সমস্যা শুধু একটাই। রেস্ট্রিকটেড জোনের হাইব্রিডার্সদের স্বাভাবিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত করানো।
ভেতর থেকে লিওর আর কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো মুহূর্ত। আশেপাশে তাকিয়ে একটু দূরে গিয়ে কিছু খড়কুটো জোগাড় করে জ্বালানির ব্যবস্থা করলো আগে সে। তারপর লিওর বাড়ির গেটের বাইরে একটা গাছের গুঁড়ির উপর বসে পড়লো। ব্যাগ থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করে রান্না শুরু করলো মুহূর্ত। সবকিছু আগে থেকে তৈরি করেই এনেছিল। তাই বেশি একটা বেগ পেতে হয়নি। কিছুক্ষন যেতেই হালকা মশলামেশানো ঝলসানো মাংসের সুবাস ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে। সেই সাথে বড় একটা ব্রেড বের করে সেটা আগুনে হালকা ছেঁকে মাখন লাগিয়ে নিল।
“তোমার খাবারের গন্ধ শিকারি প্রাণীদের আকৃষ্ট করবে।”
রাগী গলায় গজগজ করতে করতে বললো লিও। মাংসের গন্ধে বেরিয়ে এসেছে সে। চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে আছে সে মুহূর্তের দিকে। মুহূর্ত সে দৃষ্টিকে পাত্তা না দিয়ে বললো,
“অবশ্যই, সেটা তো করবেই। একজনকে তো সামনেই দেখতে পাচ্ছি।”
লিও আর কিছু বললো না। মুহূর্তের পাশে মাটিতে হাঁটু ভাঁজ করে বসে দেখতে লাগলো তাকে। মুহূর্ত হাতের কাজ করতে থাকলো চুপচাপ। রান্না শেষে মাংসের ঝলসানো বড় একটা টুকরো, আর রুটি এগিয়ে দিলো সে লিওর দিকে। লিও সেটা ছোঁ মেরে নিয়ে এমনভাবে খাওয়া শুরু করলো, যেন একটু দেরি করলেই কেউ এক্ষুনি ছিনিয়ে নিয়ে যাবে তার খাবার।
মুহূর্ত কিছুক্ষন নীরবে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। হাইব্রিডার্সদের ভিন্ন শারীরিক গঠন আরো কঠোরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে লিওর মাঝে। গালের হাড়ের গঠন অনেকটা অস্বাভাবিক তার। চেপ্টা উঁচু নাক ও মুখের চারপাশে গজানো পশমের কারণে চেহারার সাদৃশ্য অনেকটা সিংহের সাথে করা যায়। এটুকুও যেন যথেষ্ট ছিল না। তাকে আরো ভালোভাবে বিচ্ছিন্ন করতে, কোমড়ের পেছন দিক থেকে বেরিয়েছে একটা লেজ। প্রথম প্রথম এই লেজ নিয়ে বেশ বিপাকে পড়েছিল লিও। অন্তর্বাস বা প্যান্ট পরতে চাইতো না। পরে বিশেষভাবে পোশাক তৈরি করে দেওয়া হয় তাকে, যাতে লেজ নিয়ে অসুবিধা না হয়। লিওর পোশাকবিহীন এক গাছ থেকে আরেক গাছে লাফিয়ে বেড়ানো দিনগুলোর কথা মনে করে হেসে ফেলে মুহূর্ত।
“হাসছো কেন?”
খাওয়া বন্ধ করে মুহূর্তের দিকে সরু চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে লিও।
“কিছু একটা মনে পরে গেল। তুমি বাড়িতে ঘাপটি মেরে থাকো কেন কদিন পর পর? বাইরের এত সুন্দর খোলা প্রকৃতি ছেড়ে ভেতরে থাকতে ভালো লাগে?”
লিও উত্তর দেয় না। আগুনের তাপে ধীরে ধীরে ঝলসাতে থাকা মাংসগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। মুহূর্ত আরেক টুকরো মাংস এগিয়ে দেয় তার দিকে। মিনিটখানেক চুপ থাকে সে। খাওয়া শেষ করতে দেয় লিওকে। তারপর ধীর গলায় জিজ্ঞেস করে,
“বলতে পারো আমাকে। কি হয়েছে?”
“ভয় করে। ওরা যদি আবার এসে নিয়ে যায়…”
মাংসের টুকরোটা চিবুতে চিবুতে লিও চাপা স্বরে উত্তর দেয়। মুহূর্ত মাথা নেড়ে একটু পর বলে,
“আমারও ভয় করতো, নতুন নতুন মুক্তি পাবার পর। এখনো হয়ত করে। আমাদের সবারই করে। কিন্তু নিজেকে গুটিয়ে রাখলে কি সেই ভয় শেষ হবে কখনো? মুক্তি পাবার পরও যদি আমরা নিজেদের বন্দী করে রাখি, তবে এই মুক্তির কি কোন মানে হয়?”
“তুমি ঐ মাথামোটাইদের মত কথা বলছো!”
চাপা গর্জন ছেড়ে অভিযোগের সুরে বলে লিও। চেহারা বিকৃত করে তাকায় মুহূর্তের দিকে। হাসে মুহূর্ত সেটা দেখে। আসলেই সে মাথামোটাইদের মত কথা বলছে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের হাইব্রিডার্সরা মাথামোটাই বলে ডাকে, অর্থাৎ যাদের মাথা মোটা। শিনহো থেকে ছাড়া পাবার পর হাইব্রিডার্সদের জন্য থেরাপি সেশনের ব্যবস্থা করা হয়। বাধ্যতামূলক সব হাইব্রিডার্সদের মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানো হয় চিকিৎসার জন্যে। শুধুমাত্র তারা ক্লিয়ারেন্স দিলেই হাসপাতাল ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনের অনুমতি পায় হাইব্রিডার্সরা।
বলাবাহুল্য, এসব বিশেষজ্ঞদের বিশেষ একটা পছন্দ করেনি হাইব্রিডার্সরা। তারা একটা সবজান্তা ভাব নিয়ে এমনভাবে কথা বলতো যেন তারাই সঠিক, বাকি সব ভুল, যেন হাইব্রিডার্সরা ছোট অবুঝ বাচ্চা বৈ কিছু নয়। যেন মুখ ফুটে নিজেদের দুঃখ প্রকাশ করে, দু’দণ্ড কেঁদে নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। হাইব্রিডার্সরাও বুঝে যায়, এদের মোটা মাথার বুদ্ধির সাথে তর্কে গিয়ে লাভ নেই। তাই এই মাথামোটাইদের সব কথা মেনে নিয়ে, হ্যাঁ তে হ্যাঁ মিলিয়ে ছাড়পত্র আদায় করে নেয় তারা।
কাজের কাজ ধরতে গেলে কিছুই হয়নি। তবে হওয়ার আশা করাটাও বোকামি। যাদের সারাজীবন কেটেছে আলোবিহীন অন্ধকূপে, শেকলে বন্দী ছিল যাদের ভাগ্য, জীবনের প্রতিটি মূহুর্ত যারা জেনে এসেছে বিভীষিকাময় নরকের উপাখ্যান, তাদের ঠিক কি বলে সান্ত্বনা দেয়া যায়? ঠিক কিভাবে স্বাভাবিক করে তোলা যায় তাদের?
“কথাগুলো কিন্তু সত্যি। আচ্ছা, তোমার যখন ভালো লাগছে না, তখন আর বলবো না। এখন শোনো, একটা কাজে এসেছি আমি। তোমার এদিকটায় আসার সময় দেখলাম, একটা ফাঁদে আটকা পড়েছিল একটা বাচ্চা লেপার্ড। পুরোনো শেকড়, বাকর আর জংলায় ভর্তি চারপাশ। তুমি আশপাশটা একটু পরিষ্কার করতে পারবে?”
লিও আশেপাশে নজর বুলায় একবার। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। আবারো মুচকি হাসে মুহূর্ত। সে জানে, কথায় কাজ হবে না, কিন্তু কাজে কাজ হলেও হতে পারে।
“তাহলে কাজ শুরু করো। তোমার ডোমের চারপাশটাই আগে পরিষ্কার করো। আমি তোমাকে সব সরঞ্জাম এনে দেব, ঠিকাছে?”
***
“স্বর্গভূমি কেমন লাগছে?”
মমর দিকে একপলক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো পাখি।
“বাড়ি আর গাড়ির জানালা দিয়ে যতটা দেখেছি, তাতে তো ভালোই মনে হলো।”
“কোন অসুবিধা হচ্ছে শ্রেয়ার বাড়িতে?”
“না, আমার আবার কি অসুবিধা হবে? অসুবিধা তাদের হওয়া জায়েজ, যাদের অসুবিধা নিয়ে কারো মাথা ব্যথা আছে। আমাকে নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় আছে নাকি কারো?”
মমর এহেন উত্তরে এবার সামনের ফাইলটা বন্ধ করে তার দিকে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকালো পাখি। ইদুরের মত কুট কুট করে চিপস চিবুচ্ছে মম আর জানালার ফ্রেমের সাথে হেলান দিয়ে তাকিয়ে আছে বাইরে। উদাস চেহারা। যেন কালো মেঘেদের ঘনঘটায় ছেয়ে আছে তার মনের আকাশ।
“এভাবে বলছিস কেন? কোন সমস্যা হলে আমাকে বল!”
পাখির অফিসে নিয়ে এসেছে সে আজ মমকে। শ্রেয়ার বাড়ি থেকে পনেরো মিনিটের দূরত্বেই অফিস। দোতলায় পাখির অফিস, আর চারতলায় বসেন স্বর্গভূমির ডিরেক্টর দেনিজ ইলকার। তিনতলা ব্যবহৃত হয় কনফারেন্সের জন্যে, আর নিচতলায় রিসেপশন ও গেস্টদের ওয়েটিং রুম। এতটুকুই ঘুরে ফিরে দেখেছে মম। এখন পাখির রুমে বসে আছে একগাদা স্ন্যাকস নিয়ে। মনের দুঃখে খেতে খেতে জানালা দিয়ে আসা সোনালী রোদে দুঃখবিলাস করছে সে।
“কি বলবো তোমাকে? তুমি তো নিজের কাজ আর জামাইকে নিয়েই হিমশিম খাচ্ছো। আমি শুধুই তোমার কাছে উটকো ঝামেলা।”
“কে বলেছে তুই আমার কাছে উটকো ঝামেলা?”
“বলতে হয় নাকি, আচরণেই বোঝা যায়। আমাকে এখানে এনে সম্পূর্ণ অচেনা একজনের বাড়িতে ফেলে রেখেছো। দায় সারাতে কোনমতে দিনে একবার দেখা দাও। আগে ঝিনুক আপুর বাড়িতে আশ্রীতা ছিলাম, এখন তোমার ঘাড়ে চেপেছি। সব বুঝতে পারি আমি।”
“একটু বেশীই বুঝে ফেলছিস না?”
সরু চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করে পাখি। মম সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে মুখভার রেখে বলে,
“বিয়ের পর যে বোনরা আর আপন থাকে না এটুকু বোঝার মত যথেষ্ট বুদ্ধি হয়েছে আমার। তখন জামাই নিয়েই তুলুতুলু করতে ব্যস্ত থাকে তারা। আমি বুঝিনা, কি এমন মজা আছে জামাইয়ের মাঝে যে, পেলেই তাকে কোলে নিয়ে বসে থাকতে হবে!”
বিরক্ত হয় পাখি। কিছু বলতে নিয়েও মুখ বন্ধ করে নেয় সে। তারপর মুখে একটা মেকি হাসি ঝুলিয়ে বলে,
“আয়! তোকে কোলে নিই, আয়। সাথে একটা ফিডারও মুখে তুলে দেই?”
মুহূর্তেই মমর টনক নড়ে। বেশি বলে ফেললো না তো আবার? পাখির মেজাজ চড়লে খবর আছে। কান টেনে লম্বা করে দেবে পাখি। আহ্লাদীপনা একদম পছন্দ না পাখির। সে নিজে যেমন শক্ত চরিত্রের, বোনদেরও সেরকমই পরিপক্ব হতে শিখিয়েছে। তাই তার কাছ থেকে আহ্লাদের আশা করাও বৃথা।
“আমি কি সেটা বলেছি!”
মিনমিনে স্বরে বললো মম।
“তাহলে কি বোঝাতে চাইছিস? দেখছিস, বুঝছিস যে, পরিস্থিতি কেমন। তাহলে এসব ফালতু প্যাচালের মানে কি? এটা কি পিকনিক স্পট? ভ্যাকেশনে নিয়ে এসেছি আমি তোকে?”
পাখির ধমক খেয়ে চুপসে গেল মম। ডেস্কে রাখা গ্লাস থেকে কয়েক ঢোক পানি পান করলো পাখি। এরপর যে প্রশ্নটা সে মমকে করলো, সেটা শুনে মমর মান অভিমান সব হাওয়ায় উড়ে গেল। বুকটা ধ্বক করে উঠলো তার!
“তোর এইচ.এস.সি-র রেজাল্ট যেন কবে দেবে?”
***
চলবে…
#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_০৯(২)
“তোর এইচ.এস.সি-র রেজাল্ট যেন কবে দেবে?”
পাখির প্রশ্নে বুকটা ধ্বক করে উঠলো মমর। রেজাল্টের সময় নিকটে। বেশিদিন বাকি নেই। আগামী সপ্তাহের মধ্যে না দিলেও, তার পরের সপ্তাহে পাক্কা। কিন্তু কথাটা চেপে গিয়ে মম হেঁয়ালি করে বললো,
“দেবে ঐ আরকি। মাসখানেকের মধ্যে।”
“রেজাল্ট ভালো হবে তো? পরীক্ষা তো বলেছিল ভালোই দিয়েছিস।”
সরু চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো পাখি। গলা শুকিয়ে এলো মমর। সে মাথা উপর নীচে দুলিয়ে কোনমতে শুধু শব্দ করে জানালো,
“হুম…”
“তারপরের কি প্ল্যান?”
“কিসের প্ল্যান?”
“কোথায় ভর্তি হবি? কোন বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করতে চাস?”
“কোথায় আর ভর্তি হবো? যেখানে আমাকে ঢুকতে দেবে, ঢুকে যাবো। আর বিষয়? ওরা যেটাতে পড়তে দেবে, সেটাই পড়বো।”
বোনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন পাখি। মম পটাপট কয়েকটা চিপস মুখে গুজে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে চিবুতে লাগলো। জানালার বাইরের দৃশ্যটা একটু বেশীই সুন্দর লাগছে তার হঠাৎ।
স্টুডেন্ট মম খারাপ না। তবে দুইটা সমস্যা আছে তার। প্রথমটা, মারাত্মক কিছু না। কমবেশি সবারই থাকে। সেটা হচ্ছে ‘ভাল্লাগেনা’। পড়তে বসলে মমর কিছুই ভালো লাগে না। কোনমতে চেপে ধরে পড়াতে হয় তাকে। ছোটবেলায় ওকে পড়াতে বসিয়ে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতো পাখি। পাহাড়া দিত, চোখ কি বইয়ে আছে, নাকি অন্যদিকে ঘুরঘুর করছে।
দ্বিতীয় সমস্যাটা অবশ্য গম্ভীর। পরীক্ষার হলে ঢুকলে মমর আর লিখতে মন চায় না। কেন চায় না, এর সুনির্দিষ্ট কোন ব্যাখ্যা বের করা যায়নি আজ অবধি। সব উত্তর জানা থাকা সত্ত্বেও, সে পরীক্ষার খাতা শূন্য রেখে আসে। এ নিয়ে প্রচুর বকা খেয়ে এসেছে সে ছোটবেলা থেকে। কিন্তু বিশেষ একটা পরিবর্তন আসেনি তার মাঝে। স্কুলে পড়াকালীন বিশেষভাবে মমর সামনে চেয়ার টেনে বসে স্যাররা ওকে লিখতে বাধ্য করতো। এমনকি মাধ্যমিকেও হলে গিয়ে খাতা চেক করে দেখেছে স্যাররা। কলেজেও মোটামুটি একই হাল ছিল মমর। ঝিনুকের কড়া নজরদারিতে কেটেছে কলেজজীবন। সেই বদৌলতেই টেনেটুনে ইন্টার পরীক্ষায় বসতে পেরেছে সে।
“এডমিশন টেস্টের প্রস্তুতি কেমন?”
আবারো জিজ্ঞেস করলো পাখি।
“প্রস্তুতি? নিচ্ছি তো! আগে ঐ রিপন স্যারের কোচিং করতাম না? স্যার পড়াতেন ভালোই।”
“তোর জন্যে আমি অনলাইন টিউটরের ব্যবস্থা করেছি। কাল একটা টেস্ট নেবে তোর। প্রগ্রেস কতটুকু, কি পড়েছিস এ পর্যন্ত সেটা দেখার জন্যে।”
“আবার পড়াশুনা!”
বিরক্তি নিয়ে বলে উঠলো মম। পরক্ষনেই পাখিকে তার দিকে ভ্রু উঁচু করে তাকাতে দেখে আমতা আমতা করে জানালো,
“মানে, করতে তো হবেই। কিন্তু আপু এখানে তো আমার বইখাতা কিচ্ছু নেই।”
ডেস্কের নিচ থেকে দুটো ব্যাগ বের করলো পাখি। মমকে ইশারায় কাছে ডেকে, সেগুলো খুলে দেখতে বললো সে। প্রথম ব্যাগটা কিছু প্রয়োজনীয় বই, নোটবুক, পেন, পেন্সিল, মার্কার ইত্যাদি জিনিসপত্রে ভর্তি।
“ল্যাপটপ!!!”
দ্বিতীয় ব্যাগের ভেতর একটা চকচকে নতুন ল্যাপটপ দেখে খুশিতে লাফিয়ে উঠলো মম। এর আগে কত বলেছে সে পাখিকে একটা ল্যাপটপের কথা। কিন্তু পাখি বলেছে পরীক্ষার পর। সত্যি সত্যি যে পরীক্ষার পর ল্যাপটপ হাতে পাবে, ভাবেনি মম। জানা সত্ত্বেও বিস্ময়ের সাথে সে প্রশ্ন করলো,
“আমার জন্যে?”
পাখি উত্তর না দিয়ে আরেকটা বক্স এগিয়ে দিলো তার দিকে।
“আইফোন!!!!!”
বক্স খুলে ফোনটায় পটাপট কয়েকটা চুমু খেয়ে নিল মম খুশির চোটে। সেটা দেখে না হেসে থাকতে পারলো না পাখি।
“ল্যাপটপ কিন্তু শুধুমাত্র পড়াশুনার জন্যে। আর মনে রাখিস, ইন্টারনেটে যা ঘাটাঘাটি করবি, ফোনে যা কথা বলবি, সব ডাটা কিন্তু রেকর্ড হয় এখানে। উল্টোপাল্টা কিছু করতে যাস না।”
সতর্ক করে দিল পাখি। তবে তাতে মমর উৎসাহে ভাটা পড়লো না। সে লাফাতে লাফাতে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো পাখিকে।
“ওকে! থ্যাঙ্কু আপু! আমার লক্ষি ময়না পাখি!”
মমর কান্ড দেখে হাসছে পাখি। ফোনে সব সেট করাই ছিল। সেটা চালু করে এটা সেটা ঘেঁটে দেখা শুরু করলো মম। সে সাথে পাখিকেও দেখাচ্ছে। দু’বোন যখন হেসে কুটিকুটি হচ্ছে, তখনই বজ্রপাতের মত শব্দ করে সজোরে খুলে গেল পাখির অফিসের দরজাটা। চকিত দৃষ্টিতে দু’বোন তাকালো সেদিকে।
ইয়া লম্বা চওড়া এক হাইব্রিডার্স প্রবেশ করলো দরজা দিয়ে। সেটা ব্যাপার না। ব্যাপার হচ্ছে সে একা আসেনি। তার কাঁধে চালের বস্তার মত ঝুলছে কমপক্ষে সত্তর কি আশি বছরের এক ছোটখাট এশিয়ান বৃদ্ধা মহিলা।
“ছা…ড়ো…! ব…লছি…ছা…ড়ো……!!!”
বৃদ্ধা শক্ত করে ধরে রেখেছেন ছেলেটিকে। কিন্তু কাঁপা কাঁপা, আতঙ্কিত গলায় চেচিয়ে যাচ্ছেন একটানা। তাতে অবশ্য ছেলেটির কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। সে হেলে দুলে ভেতরে এসে কর্ণারের সোফাটার উপর ছেড়ে দিলো বৃদ্ধাকে। বৃদ্ধা হাঁপাতে হাঁপাতে ভয়ংকর বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইলেন ছেলেটার দিকে। পাখি চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে দাড়ালো মহিলার সামনে। একটা গ্লাসে পানি ঢেলে এগিয়ে দিলো হাঁপাতে থাকা মহিলার দিকে। ওনার হাঁপানি একটু কমলে সে জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে মিস সু?”
বৃদ্ধা কটমট করে তেজী গলায় বললেন,
“এই ছেলেটার কান মলে দেবো কিন্তু আমি মিসেস অনামিকা। আমি বললাম আমি সিঁড়ি দিয়ে উঠতে পারি। কিন্তু ও তারপরও আমাকে কাঁধে তুলে নিল! আমি কি চালের বস্তা?”
মহিলার কথা শুনে হাসি পেল পাখির। যেভাবে ওনাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকেছে তাতে চাল কম, তুলোর বস্তা বেশি মনে হচ্ছিলো।
“রিলাক্স, মিস সু! এমনিতেও আপনার কাঁধে ওঠার বয়স হয়েছে। আগে পরে আপনাকে কাঁধে উঠতেই হবে। ওঠার তো কথা চারজনের কাঁধে, শ্বাস চলছে বলে আমি একা উঠিয়েছি।”
ছেলেটার হেঁয়ালি করে বলা কথা শুনে মিস সু’র চোখজোড়া কোটর থেকে প্রায় বেরিয়েই এলো! রাগে থরথর করে কাপছেন মহিলা। সেটা দেখে পাখি চোখ রাঙিয়ে ধমকালো ছেলেটাকে।
“স্বাধীন!”
“চিন্তা করো পাখি, এই ভাঙাচোরা শরীর নিয়ে এই মহিলা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে চেয়েছিল! দেখা যেত অর্ধেক সিঁড়িতে তার পার্থিব শরীর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে গেছে। আমি ভাবলাম, ওনার হাড়গোড় সিঁড়ি থেকে কুড়িয়ে তোলার বদলে, ওনাকে আস্ত তুলে নিয়ে আসাই শ্রেয়।”
চোখ বন্ধ করে ব্যর্থ হওয়ার ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো পাখি। এই ছেলের মুখে কোন ফিল্টার নেই। যা মুখে আসে, তাই বলে দেয়। দুর্ভাগ্যবশত, HCO- এর ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বাধীন। আর বেচারি মিস সু হচ্ছেন ন্যায়ের এসিস্ট্যান্ট। মহিলার বয়স সত্তরের কম হবে না। কাঁপা কাঁপা শরীরে রুমের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতেই ওনার দম বেরিয়ে যায়। কিন্তু তবুও ওনাকে রেখে দিয়েছে ন্যায়। দরকারি কাজ সে সব চাপিয়ে দেয় স্বাধীনের ঘাড়ে। সেই বদৌলতে এই প্রৌঢ়া ও স্বাধীনের টম এন্ড জেরী শো চলতেই থাকে নিত্যদিন।
পাখি যখন বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে স্বাধীনের দিকে, তখন মিস সু রাগটাগ রেখে মিষ্টি হেসে হাতের ইশারায় কাছে ডাকলেন স্বাধীনকে। স্বাধীন সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকালেও, ঝুঁকে এলো তার দিকে। মিস সু সাথে সাথে খপ করে ওর কান টেনে ধরলেন সর্বশক্তি দিয়ে।
“মিস সু! ব্যথা পাচ্ছি তো!”
“তোমাকে বলেছিনা, আমাকে নিয়ে মজা করবে না! এই ভাঙাচোরা হাত দিয়েই তোমার কান টেনে নেব আমি!”
“সরি, মিস সু! এবার তো ছাড়ুন!”
মিস সু ছেড়ে দেওয়ার পর কানে হাত বুলাতে বুলাতে মমর জন্যে এনে রাখা স্ন্যাক্সের পাকেটগুলোর দিকে এগিয়ে যায় স্বাধীন। সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে পাখি মিস সু-কে জিজ্ঞেস করে,
“আপনি এখানে কেন মিস সু? কোন দরকার ছিল?”
বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া মিস সু এদিকটায় আসেন না। ন্যায়ের অফিসেই টুকটুক করে যা পারেন, যেটুকু পারেন করেন এই প্রৌঢ়া।
“ইয়েস, ইয়েস। মিসেস অনামিকা চাইনিজ নিউ ইয়ার আসছে। আপনি বিদেশী, হয়ত জানেন না। কিন্তু এখানে আমরা এটাকে অনেক ধুমধাম করে পালন করি। আমারা নতুন বছরকে স্বাগত জানাই, সৌভাগ্য, সমৃদ্ধি ও শান্তির জন্য। পুরোনো সকল মলিনতা ও অশুভ শক্তিকে বিদায় জানাই। আমাদের সংস্কৃতির একটা গুরুত্বপূর্ন অংশ এই উৎসব।”
এত লম্বা বিবৃতির পর থেমে একটু জিরিয়ে নিচ্ছেন মিস সু। একসাথে বেশি কথা বলতে পারেন না উনি। হাঁপিয়ে ওঠেন তাড়াতাড়ি।
“ওকে। বুঝতে পেরেছি। আপনি কি নিউ ইয়ার সেলিব্রেশনের জন্যে ছুটি চাইতে এসেছেন?”
“না, না। এখানে চাওয়ার কি আছে, ওটা তো আমি এমনিতেই নেব। আমি অন্য একটা ব্যাপারে আপনার সাথে কথা বলতে এসেছি। আসলে আমি চাইছি, স্বর্গভূমিতে একটা বারবিকিউ পার্টির আয়োজন হোক। সবাই মিলে একসাথে সেলিব্রেট করবো আমরা নিউ ইয়ার।”
পাখি একটু ভেবে কাঁধ ঝাঁকালো। হাইব্রিডার্সদের নিজস্ব কোন ধর্ম বা সংস্কৃতি নেই, নেই কোন নির্দিষ্ট সামাজিক রীতি নীতি। নিজেদের একটু একটু করে গুছিয়ে নেবার চেষ্টায় আছে তারা। যখন যেখানে যেটুকু প্রয়োজন, তারা জেনে, বুঝে, শিখে নেয়।
“আইডিয়া খারাপ না। আপনি চাইলে পার্টির আয়োজন করতেই পারেন!”
“না, আমি না। আপনি করবেন।”
“সরি?”
চোখ কপালে উঠলো পাখির। সে করবে পার্টির আয়োজন? এত সময় আছে নাকি তার হাতে?
“আমার কি আর পার্টির আয়োজন করার বয়স আছে? এই শরীর নিয়ে এসব ধকল আমাকে দিয়ে হবে না। তাই পার্টির সব দায়িত্ব আপনার তত্ত্বাবধানেই হোক।”
পাখি হতভম্ভ হয়ে চেয়ে রইলো মিস সু-র দিকে মিনিটখানেক। তারপর আমতা আমতা করে বললো,
“মিস সু, আমি তো আপনাদের কালচার সম্পর্কে কিছুই জানি না। আমি কিভাবে কি করবো?”
“না জানলে, জেনে নেবেন। সমস্যা নেই, আমি তো আছি। তাহলে ঐ কথাই রইলো। আমি এখন আসি।”
পাখিকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন মিস সু। এদিকে মিস সু ও পাখির কথপোকথনের মাঝে ফোনেই ব্যস্ত ছিল মম। চোখ তুলে সে যখন সামনে তাকালো, তখন দেখলো তার জন্যে আনা স্ন্যাক্সের প্যাকেটগুলো আছে, কিন্তু ভেতরের খাবার কিছুই অবশিষ্ট নেই। মিস সু-র সাথে আসা ঐ হাইব্রিডার্স সব সাবার করে ফেলেছে। মুখটা ঈষৎ ফাঁক হয়ে যায় মমর। হাতের প্যাকেটটাও খালি করে ফেলেছে স্বাধীন। এখন অবশিষ্ট শেষ চিপসের প্যাকেটটার দিকে হাত বাড়াতে যাবে সে। তার আগেই লাফিয়ে ঝাপিয়ে এসে ছোঁ মেরে সেটা নিয়ে নিল মম। বড় বড় চোখে স্বাধীনের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে প্যাকেটটা বুকের সাথে আগলে ধরে রাখলো, যেন এটার ভেতরে তার কলিজা ঢুকানো আছে। মমর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে স্বাধীন পাখিকে জিজ্ঞেস করলো,
“এটা কে?”
“আমার বোন। মুমতাহিনা আহমেদ মম।”
“ওহ্, এটাই মুহূর্তের মোমো?”
“কি? কিসের মোমো?”
স্বাধীনের কথা শুনে ছ্যাত করে উঠলো পাখি। সেটা দেখে ঠোঁট চেপে একটা প্রশস্ত হাসি দিয়ে স্বাধীন বললো,
“নাহ্, কিছু না। ওকেও নিয়ে এসো পার্টিতে, কেমন?”
বলেই মমর দিকে ঘুরে তাকিয়ে ঠোঁট খুলে দাঁতগুলো বের করলো স্বাধীন। জানালা দিয়ে আসা বিকেলের রোদে ঝিলিক দিয়ে উঠলো তার ধারালো দাঁত। সেই ঝিলিকদেখে মমর হাত থেকে আপনাআপনিই পরে গেল চিপসের প্যাকেট। তবে মাটি ছোঁয়ার আগেই সেটা ক্যাচ করে নিল স্বাধীন। তারপর দরজার দিকে কচ্ছপের গতিতে টলমলে পায়ে এগিয়ে যেতে থাকা মিস সু-কে কোলে তুলে নিয়ে হাটা দিল। করিডোর থেকে আবারো ভেসে এলো মিস সু-র চিৎকার,
“ছাড়ো! ছেড়ে দাও বজ্জাত ছেলে! ছাড়ো আমাকে!”
***
চলবে…
