Saturday, June 27, 2026







শরতের কাশফুল পর্ব-১০+১১

#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_১০

বুকচিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো মমর। কোলের উপর রাখা বইটা শব্দ করে বন্ধ করলো সে। এই এক পড়াশুনা না থাকলে, জীবনটা কত সুন্দরই না হতো!

অলস দৃষ্টি মেলে সে আশপাশটা পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো। বড় বড় কাঠের বুকশেলফ, আর তাতে সারিবদ্ধভাবে সাজানো বই। ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, দর্শন শাস্ত্র, সব ধরনের বইয়ের মেলা এখানে। জায়গাটা হাইব্রিডার্সদের লাইব্রেরি এন্ড কালচারাল সেন্টার। তিনতলা বিশিষ্ট আধুনিক স্থাপনা। শ্রেয়ার বাড়ি থেকে বিশ পঁচিশ মিনিট সময় লাগে হেঁটে আসতে। শ্রেয়ার বাড়িতে মোটেই মন বসেনা মমর। তাই হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছে এখানে। পাখি আগেই দেখিয়ে দিয়েছিল জায়গাটা। তাই অসুবিধা হয়নি রাস্তা চিনে পৌঁছাতে। ভেবেছিল, এখানে এসে জম্পেশ পড়াশুনা হবে। কিন্তু ঘন্টাখানেকের মধ্যেই মমর সব ভাব ছুটে গেছে। শত চেষ্টা করেও আর বইয়ের পাতায় মন বসাতে পারছে না সে।
বেশ সাজানো গোছানো পরিপাটি লাইব্রেরি। বড় বড় কাঁচের জানালা দিয়ে সোনালী রোদ এসে আলোকিত করে রেখেছে পুরো রুম। ছাদ অবধি লম্বা শেলফগুলোর মাঝখানে আছে ছোট ছোট টেবিল ও দু তিনটা করে চেয়ার। অনেকটা জিগজ্যাগ প্যাটার্নে সাজানো শেলফগুলো। বই দিয়ে এমনভাবে ঠেসে রাখা যে একপাশ থেকে অন্যপাশের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে না। রুমের মাঝখান থেকে দুটি শেলফের মাঝে অনেকটা আড়াল হয়ে রয়েছে উপরে ওঠার সিঁড়ি। দরজার পাশে জায়গা পেয়েছে একটা ডেস্ক। ডেস্কে বসা এক মধ্যবয়স্কা নারী। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা পড়ে একটা মোটা বইয়ের পাতায় চোখ বুলাচ্ছেন। একমাত্র এই মহিলা ছাড়া পুরো ভবনটি জনমানবহীন। মম আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাড়িয়ে গেল মহিলাটির কাছে। ডেস্কের সাথে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে ওনার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলো সে। তবে মহিলা বইয়ের পাতা থেকে চোখ সরালেন না। যেন মমর অস্তিত্ব টেরই পাননি!

মম সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে মহিলার উদ্দেশ্যে বললো,
“হ্যালো! আমার নাম মম।”

নিস্তব্ধ লাইব্রেরিতে মমর আস্তে বলা কথাটাও বজ্রপাতের মত শোনালো। মহিলা বিরক্তি নিয়ে চোখ তুলে তাকালেন ওর দিকে।

“তো আমি কি করতে পারি?”

মহিলার কাছ থেকে এরকম ত্যাড়া উত্তর একেবারেই আশা করেনি মম। সে মুখে একটা মেকি হাসি টেনে এনে জিজ্ঞেস করলো,

“নাহ্, কিছু করতে হবে না। আমি সৌজন্যতা দেখাচ্ছিলাম আরকি। মনে হচ্ছে, আপনার সেটা হজম হচ্ছে না।”

মহিলা ভ্রু কুঁচকে তাকালেন সামনে দাঁড়ানো মমর দিকে। মম মুখের হাসিটা হুট করেই ছেড়ে দিলো। চেহারা গম্ভীর করে এবার সে জিজ্ঞেস করলো,

“উপরে কি আছে?”

“বই ছাড়া কি থাকবে?”

“আপনার জানাজার কাপড়ও তো থাকতে পারে।”

“কি!”

“হুম। যেরকম শক্ত করে চুলগুলো খোপায় আটকে রেখেছেন, দেখে মনে হচ্ছে যেকোন সময় খুলি ভেঙে মগজের ঘিলু বেরিয়ে আসবে। তখন তো কাজে লাগবে , তাই না?”

“কি বললে তুমি?”

“এত কি কি করার কি আছে? আপনার মোটা ফ্রেমের আন্টি টাইপ চশমার আড়ালে থাকা শেয়ালের মত ধূর্ত চোখগুলো দেখে মনে হলো, আপনি হয়ত দূরদর্শী হবেন। তাই আগে ভাগেই হয়ত নিজের ব্যবস্থা করে রেখেছেন, সেজন্যেই বললাম।”

মহিলা কড়া চোখে মমর দিকে তাকিয়ে ফুঁসছেন এখন। হয়ত কি বলে ওকে শায়েস্তা করবেন, সেটাই ভাবছেন। মম তাকে পাত্তা না দিয়ে আবারও বললো,

“যাকগে! আমার ল্যাপটপ নীচে রেখে যাচ্ছি। পাহারা দেবেন। চুরি করার মত এখানে আপনি ছাড়া তো কেউ নেই, তাই আপনার দায়িত্বেই রেখে গেলাম।”

বলেই ঘুরে দাঁড়ালো মম। মহিলাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সে হনহন করে সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। মহিলা ডেস্ক ছেড়ে দে কদম মমর পিছু পিছু এলেন। কিন্তু দেবার মত উপযুক্ত কোন জবাব না থাকায়, ওখানেই থেমে গেলেন। এদিকে, উপরে উঠে এসে নিচের দিকে একবার উকি দিয়ে তপ্ত শ্বাস ছাড়লো মম। আরেকটু দাঁড়ালে হয়ত মহিলা তাকে তুলে এক আছাড় মারতো!

এবার চারদিকে নজর বুলালো মম। এখানেও বইয়ের সমাহার। তবে নিচতলার চেয়ে এখানকার চিত্র বেশ ভিন্ন। দেয়ালের সাথে লাগোয়া শেলফগুলোতে ঠাঁই পেয়েছে নানা রং বেরঙের প্রচ্ছদের বই। বিশাল বড় রুমটির একপাশে ছোট ছোট অর্ধচন্দ্রাকৃতির কিছু শেলফ রয়েছে। সেখানে বইয়ের সাথে ঠাঁই পেয়েছে কিছু শো পিস। আরেকপাশের দেয়াল পুরোটা কাচের। তারপাশে আড়াআড়িভাবে একটা ডেস্ক এবং ডেস্কের সামনে সারিবদ্ধভাবে কতগুলো চেয়ার সাজানো। দেখে মনে হচ্ছে এটা লাইব্রেরি নয়, বরং খোলা মিলনায়তন। দলবেধে আড্ডা দেবার জন্য উপযুক্ত জায়গা।

“কে তুমি? এখানে কি করছো?”

জানালার ধারে এসে দাঁড়িয়েছিল মম। হঠাৎ পেছন থেকে কারো আওয়াজে চমকে তাকায় সে। দেখে, দুটো মেয়ে দাড়িয়ে আছে। একজন বেশ লম্বা চওড়া, চেরীর মতই দেখতে। তবে চুলগুলো সোনালী রঙের। পরনে একটা সাদার মধ্যে লাল লাল ডোরা কাটা ড্রেস। অন্য মেয়েটা অবশ্য বেশ খানিকটা খাটো। উচ্চতায় মমর কাছাকাছি হবে। কিন্তু মেয়েটা দেখতে ঠিক পুতুলের মত। মনে হচ্ছে যেন জ্বলজ্যান্ত একটা পুতুল দাঁড়িয়ে আছে সামনে। মাথাভর্তি গোলাপী রঙের চুলগুলো মাঝখান থেকে সিঁথি করে, দুপাশে দুটো ঝুঁটি করে রেখেছে। চোখের মণিগুলো স্বচ্ছ, নীল রঙের। গোলগাল দুটো গালে চোখের ঘন পাপড়িগুলোর ছায়া পড়েছে। ছোট্ট সরু নাক, কোমল হার্ট শেপের ঠোঁট। শুধু কান দুটো উপরের দিকে সরু, চোখা, তীক্ষ্ম। ঝুঁটির ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আছে তাদের অগ্রভাগ। মেয়েটা একটা অফ শোল্ডার টপের সাথে লেদারের স্কার্ট পরে আছে। গলায় কালো একটা চোকার, হাতে কতগুলো ব্রেসলেট, আর পায়ে আছে এঙ্কেল বুট।

“নতুন রেখেছে নাকি তোমাকে লাইব্রেরিতে? আমাদেরকে ঝাড়ু দেওয়া শেখাতে এসেছো?”

মম যখন হাইব্রিডার্স মেয়ে দুটিকে পা হতে মাথা অবধি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে, তখন সোনালী চুলের মেয়েটা আবারো বিদেশী ভাষায় কিছু জিজ্ঞেস করে তাকে।

“নো চাইনিজ…”

মাথা নেড়ে হতাশার সাথে জানায় মম। নাহ্! এবার তাকে দু’চারটা চাইনিজ শব্দ শিখতেই হবে। এভাবে কি ভাষা না বুঝে চলে!

“আরে, এটা দেখি কথাও বলতে জানে না।”

“দেখতে কিন্তু কিউট।”

“হ্যাঁ, দেখো! চুলগুলো কি কুচকুচে কালো! ঠোঁটগুলোও চিকচিক করছে।”

“আরে না। কিছু লাগিয়েছে মনে হয় ঠোঁটে।”
সোনালী চুলের মেয়েটা এগিয়ে এসে মমর দিকে ঝুঁকে নাক কুচকে দু বার শ্বাস টেনে গন্ধ শুঁকে পাশেরজনকে জানালো,
“হুম, ক্যামিকেলের গন্ধ আসছে।”

“এই মানুষের মেয়ে, ঠোঁটে ক্যামিকেল কেন দিয়েছো?”

“দেখো! কিরকম বড় বড় চোখে তাকাচ্ছে! দেখতে একদম কুকুরের বাচ্চার মত লাগছে।”

“আমি এটাকে নিয়ে যাই? এটাকে কথা বলা শেখাবো।”

বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে মম ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। দুজন কি বলাবলি করছে কিছুই বুঝতে পারছে না সে। তবে গোলাপী চুলের মেয়েটা তার দিকে মুখে প্রশস্ত একটা হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে। আগ্রহ নিয়ে দেখছে তাকে।

“ওটা পাখির বোন।” পরিচিত গলার স্বর শুনতে পেল মম। মেয়ে দুটোর পেছনে তাকিয়ে দেখলো সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে চেরী। অপরিচিত দুজনের উদ্দেশ্যে সে জানালো,
“বলেছিলাম না, সেদিন আমাকে বাঁচিয়েছিল? এই মেয়েটাই। ও চাইনিজ ভাষা বোঝে না। ইংরেজিতে কথা বলে।”

চেরীর কথায় যেন চিন্তামুক্ত হলো সোনালী চুলের মেয়েটা। এক গাল হেসে সে হাত নাড়িয়ে মমকে সম্ভাষণ জানালো এবার।

“ওহ্! হাই!”

“হাই!”

“আমি রূপ, ও হচ্ছে হাওয়াই।”

ভাষা পরিবর্তন করে এবার ইংরেজিতে নিজেদের পরিচয় দিল তারা। মম স্বস্তি পেল কিছুটা মনে মনে। সে-ও পাল্টা মুচকি হাসি উপহার দিয়ে জানালো,

“আমি মম। মুমতাহিনা আহমেদ মম।”

“সবগুলো নাম তোমার একার?”

গোলাপী চুলের মেয়ে, অর্থাৎ হাওয়াই জিজ্ঞেস করলো তাকে। বিস্ময়ে বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে সে মমর দিকে। তবে মমকে উত্তর দিতে হলো না। তার আগেই চেরী বলে উঠলো,

“মানুষদের নাম এরকমই হয়। একটায় ওদের পোষায় না। লোভী জাত!”

“আমাকে মম বলেই ডাকতে পারো। সবাই তাই ডাকে।”

“তুমি এখানে কি করছো?”

চেরীর প্রশ্নের উত্তরে মম কাঁধ ঝাকিয়ে বললো,

“আমি…আসলে একা একা ভালো লাগছিল না। তাই ভাবলাম একটু ঘুরে ফিরে দেখি।”

“এখানে দেখার কি আছে? মোটা মোটা কতগুলো বই দিয়ে ঠাসা!”

“আমার কিন্তু বই পড়তে ভালোই লাগে। বিশেষকরে ছবি থাকে যে বইগুলোতে! এইযে দেখো! সুন্দর না?”

উৎসাহী হাওয়াই লাফিয়ে এগিয়ে এসে একটা কার্টুন আঁকা বই দেখালো মমকে। মেয়েটার ঠোঁটে হাসি যেন আর ধরে না!

“কমিক? আমি ছোটবেলায় পড়তাম।”

“আমি ছোটবেলায় পড়িনি। তখন তো খাঁচায় ছিলাম। ওরা আমাকে ছবিওয়ালা বই দিত না।”

হাওয়াইয়ের কথা ঝট করে বোধগম্য হলো না মমর। সে কপাল কুঁচকে বোকার মত প্রশ্ন করলো,

“খাঁচায়?”

“হাওয়াই গিফট আইটেম ছিল। ওকে এক বুড়ো লোকের কাছে গিফট করেছিল শিনহোর ডাক্তাররা।”

রূপের কথাও বুঝলো না মম। আগের মতই বিভ্রান্তির স্বরে প্রশ্ন করলো,

“গিফট?”

“হ্যাঁ, ও সাব-স্পেসিস তো।”

“সাব-স্পেসিস?”

মমর বিভ্রান্তি দেখে এবার চেরী গম্ভীর নির্লিপ্ত কণ্ঠে জানালো,

“প্রজেক্ট পাওনের জন্যে প্রচুর ফান্ডের প্রয়োজন ছিল। ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সেজন্যে খুশি রাখা হতো। সাব-স্পেসিস বিশেষভাবে তাদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। ওদের ডি.এন.এ ছোট ছোট প্রাণীদের সাথে কম্বাইন্ড করা হতো। এমন প্রাণী যারা গঠনে ছোটখাট, সাবমিসিভ, প্রভুভক্ত। যারা শিকারী নয়, বরং নিরীহ শিকার।
এসব প্রাণীদের বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলা হতো সাব-স্পেসিসদের মধ্যে। ছোট ছোট খাঁচায়, গলায় কলার পরিয়ে দাসত্বের ট্রেনিং দেওয়া হতো ওদের। বিভিন্ন ধরনের হরমোন ইঞ্জেক্ট করে ওদের শারীরিক গঠনকে আকর্ষণীয় করে তোলা হতো। যেমনটা ইনভেস্টররা চায়, সে হিসেবে আনা হতো পরিবর্তন। তারপর গিফট হিসেবে পাঠানো হতো তাদের কাছে। তারা হতো মালিক। মালিকরা ওদের যেভাবে খুশি ব্যবহার করতে পারতো। নিজেদের আনন্দের জন্য মেরে রক্তাক্ত করতো, শারীরিক নির্যাতন চালাতো, পশুর মত খাঁচায় বন্দী রেখে পার্টিতে প্রদর্শনীর আয়োজন করতো। নিজেরা ধ*র্ষণ করতো, মর্জিমত অন্যদের দিয়েও করাতো।”

মমর মুখটা এক লহমায় পাংশুটে বর্ন ধারণ করলো। সে আবারো তাকালো হাওয়াইয়ের দিকে। মেয়েটার ঠোঁটে এখনো হাসি ফুটে আছে। উৎসুক দৃষ্টিতে বইয়ের ছবিগুলো দেখছে সে।

“কি নির্মম! আমি দুঃখিত, হাওয়াই।”

“তুমি কেন দুঃখ পাচ্ছো? আমার জন্যে?” মমর দিকে ফিরে বিভ্রান্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করলো হাওয়াই। পরক্ষনেই মিষ্টি হেসে বললো,
“না, না, দুঃখ পেয় না। আমার মালিক অন্যদের তুলনায় ভালোই ছিল। বেশ বড় একটা খাঁচা ছিল আমার। দাঁড়ানো যেত, লম্বা হয়ে শোয়াও যেত। খুশি হলে আমাকে ভালো ভালো খাবারও দিত! অন্য কাউকে আমার সাথে কিছু করতে দিত না। কাউকে ছুঁতে দিত না। নিজেও তেমন কিছু করতে পারত না। বয়স্ক ছিল তো, তাই। শুধু মাঝে মাঝে খুব মারতো। তবে পরে অবশ্য ঔষধও দিত!”

বাকরুদ্ধ হয়ে গেল মম। রূপের মনোযোগ কোনদিকে বোঝা গেল না। শেলফে রাখা কিছু বই উল্টে পাল্টে দেখছে সে। কিন্তু চেরীর চেহারায় ফুটে উঠেছে স্পষ্ট রাগের অভিব্যক্তি।
ঠিক কতটা নির্দয়তার পর কেউ এতটাই ভেঙে পড়ে, যে অত্যাচার আর আশ্রয়ের সীমারেখাটাই মুছে যায়? খাঁচাটা বড় ছিল বলে মেয়েটা সেটাকেই স্বাধীনতা ভেবে বসেছে। যে লোকটা তাকে রোজ অপমান করতো, লাঞ্ছিত করতো, অন্যদের দূরে রাখায়, তাকেই নিজের রক্ষক হিসেবে চিনেছে। তাকে রক্তাক্ত করতো তো কি হয়েছে? পরবর্তীতে ক্ষতে লাগানো সামান্য মলমটুকুই তার সকল মন খারাপের উপশম ছিল। এ এক অদ্ভুত মানসিক গোলকধাঁধা, যেখানে নিজের বন্দীত্বকে স্বাভাবিক ভাবতে শুরু করেছিল হাওয়াই। শরীরটা মুক্তি পেলেও, নিজের ভ্রান্তি থেকে এখনো বেরিয়ে আসতে পারেনি সে।

“তোমরা কি শুধু কমিকই পড়ো? আর কোন বই পড়ো না?”

কথা ঘুরানোর চেষ্টা করছে মম। সেটা কাজে দিল। হাওয়াই তাকে আরেকটা বই দেখিয়ে বললো,

“পড়ি তো! এইযে এই বইটা পড়ছি। খুব ভালো বই!”

“কি নাম বইটার?”

“প্রেমের নীলচে রাত!”

অদ্ভুত নাম ও বিচিত্র প্রচ্ছদ দেখে মম বুঝতে পারলো এটা কোন ফ্যান্টাসি ক্যাটাগরির বই হবে। আজকালকার কিশোরীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় এসব বই। বইটা হাতে নিয়ে গাল লাল হয়ে এলো মমর। রঙিন প্রচ্ছদটাই বলে দিচ্ছে ভেতরে কি লেখা থাকতে পারে। মমর গোলাপী আভা ছড়িয়ে পড়া মুখটার দিকে তাকিয়ে হাওয়াই খুশি হয়ে চেরীকে বললো,

“আমি ওকে নিয়ে যাই? ওকে আমার ভীষন কিউট লাগছে! একদম কুকুরের বাচ্চার মত! আমি ওকে আমার সাথে রাখবো, খাওয়াবো, গোসল করাবো, ওর সাথে খেলবো! প্লীজ!”

আগেরবার বুঝতে না পারলেও, এবারে হাওয়াইয়ের কথা বুঝতে পেরে গোল গোল বিস্ময়পূর্ণ চোখে তাকালো মম। বলে কি! তাকে কুকুরের বাচ্চার মত পালবে মানে? মমর অবিশ্বাস্য ও আতঙ্কিত দৃষ্টি দেখে ঠোঁট বাঁকা করে হাসলো চেরী।

“হাওয়াই! ও মানুষ। ওকে তুমি কুকুরের বাচ্চার মত নিজের সাথে রেখে পালতে পারবে না। আমি তোমাকে সত্যিকারের একটা কুকুরের বাচ্চা এনে দেব।”

চেরীর কথায় কিছুটা মনক্ষুন্ন হলো হাওয়াই। কিন্তু নীরবে মেনে নিয়ে অন্যদিকে লাফাতে লাফাতে চলে গেল সে।

“তুমি নাকি পাখির বোন?”

নিজের পছন্দের একটা বই বেছে নিয়ে এসে মমর পাশে দাঁড়িয়েছে রূপ।

“পাখি আমাদের খুব পছন্দের ছিল। কিন্তু এখন তো ওর সময়ই হয়না হোস্টেলে আসার।”

ঠোঁট উল্টে অভিযোগ করলো রূপ। কিন্তু সেকেন্ড খানেক পরই তড়িৎ গতিতে উৎসাহী হয়ে উঠল সে। চাপা উত্তেজনার সাথে জিজ্ঞেস করলো,

“তুমি তো ওর বোন! তুমি গল্প পড়তে পারো?”

“হ্যাঁ?”

“পারফেক্ট!”
মমর হ্যাঁ এর শেষে থাকা প্রশ্নবোধক সুরটা উপেক্ষা করে গেল রূপ। হাতের ভাঁজে হাত গলিয়ে ওকে শক্ত করে চেপে ধরে সে ঘোষণা করলো,

“তাহলে এখন থেকে তুমি আমাদের হোস্টেলে থাকবে। পাখির মত গল্প শুনিয়ে আমাদের মন ভালো করবে এখন থেকে পাখির বোন, মম!”

***

প্রকৃতির নিয়ম মেনে সন্ধ্যা নেমেছে। দিনের আলো ম্লান হয়ে মিশে গেছে পশ্চিমাকাশে। চারদিক এখন ঘন আঁধারে ঢাকা।
সবেমাত্র শ্রেয়ার সাথে ডিনার সেরে এসে নিজের রুমে ঢুকেছে মম। দুপুরের আগেই লাইব্রেরি থেকে ফিরে এসেছে সে। হাওয়াই তো তাকে ছাড়তেই চাইছিল না! বহু কষ্টে ওকে বুঝিয়ে বিদায় নিয়েছে মম। কথা দিয়েছে অবশ্যই ওর সাথে আবার দেখা হবে।
বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো মম। খুব ক্লান্ত লাগছে এখন। তবে মেয়েগুলোর সঙ্গ পেয়ে দিনটা আজ ভালোই কেটেছে।

কিছুক্ষন চোখ বুজে শুয়ে থাকার পর একটা শব্দ ভেসে আসে মমর কানে। প্রথমে সেটাকে আমলে নেয় না সে। কিন্তু কয়েক মিনিট পর যখন আবার শব্দটা শুনতে পায়, তখন কৌতূহলী হয়ে ওঠে সে। শব্দটা আসছে জানালার দিক থেকে। কাঁচের জানালায় ঠুকঠুক শব্দ করছে কেউ। পর্দা টেনে রাখায় দেখা যাচ্ছে না কিছু। মম ধীর পায়ে বিছানা ছেড়ে নেমে আসে। জানালার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে,

“কে?”

“আমি মোমো!”

মুহূর্তের গলার স্বর শুনে চমকে ওঠে সে। জানালার পর্দাটা টেনে সরিয়ে দেয় দুপাশে। ঠিক খোলা জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে মুহূর্ত। এ বাড়ির কোন জানালাতেই গ্রিল নেই। খোলা থাকলে এই বিশাল জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকে আসা কোন ব্যাপার না। কিন্তু তবুও বাইরে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা।

“আপনি এখানে?”

“তোমার টানে এসেছি।”

মমর অবাক হয়ে করা প্রশ্নের উত্তরে বলে মুহূর্ত। সে সত্যি বললেও, মম সেটাকে মজা ভেবে হেসে উড়িয়ে দেয়। জানালার ফ্রেমে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে জিজ্ঞেস করে,

“আজকে হঠাৎ আমার টান অনুভব হলো? এখানে আসার পর থেকে তো আপনাকে আর দেখিনি। এতদিন কোথায় ছিলেন?”

“ছিলাম এখানেই। কাজ ছিল। তুমি কি আমাকে মিস করেছো মোমো?”

“আমি আপনাকে মিস করতে যাবো কেন? দেখিনি তাই জিজ্ঞেস করলাম। আমি যে এখানে আছি আপনি কি করে জানলেন?”

মোমোটা তাকে মিস করেনি শুনে মুখের হাসিটা মিলিয়ে যায় মুহূর্তের। জানালার ফ্রেমে বসে সে জানায়,

“তোমার রেকর্ড থেকে বের করেছি। স্বর্গভূমিতে কে কখন আসে, যায়, কোথায় থাকে, সবকিছুর রেকর্ড রাখা হয়।”

“ওহ্।”

“কেমন কাটলো এ কদিন স্বর্গভূমিতে?”

“খারাপ না, আবার খুব বেশি ভালোও না। বোর হচ্ছিলাম বাড়িতে বসে। আজ অবশ্য দিনটা ভালোই কেটেছে। লাইব্রেরিতে গিয়েছিলাম। ওখানে আপনাদের কয়েকটা মেয়ের সাথে পরিচয় হয়েছে।”

“ওরা প্রায়ই যায় লাইব্রেরিতে। ওখানে কিসব প্রেমের বই, কার্টুনের বই জড়ো করে রাখা, সেগুলো পছন্দ ওদের।”

“আপনি যান ওখানে? বই পড়েন?”

“নাহ্। মেয়েরা যেখানে যায়, সেখান থেকে আমরা দূরেই থাকি। তাছাড়া আমার বই পড়ায় আগ্রহ নেই। আমি সময় পেলে কোরিয়ান ড্রামা দেখি।”

“কোরিয়ান ড্রামা?! সত্যি?”

অবিশ্বাসের সাথে তাকায় মম। এত বড় জলহস্তীর আকারের একটা ছেলে কিনা কোরিয়ান ড্রামা দেখে! মমর বিস্ময়ের বিপরীতে মাথা দুলিয়ে হ্যাঁ বোঝায় মুহূর্ত। মম কেন তার দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে বুঝতে পারে না সে। মমকে বিশ্বাস করাতে সে দু হাতের, দু আঙ্গুল দিয়ে বুকের বা পাশে হার্ট শেপ বানিয়ে ঠোঁটজোড়া উল্টে বলে,

“জাগিয়া!!!”
(প্রিয়তমা!!!)

মম কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর হাসতে শুরু করে। গা দুলিয়ে হাসে মেয়েটা। মুহূর্তকে দেখতে ভীষণ হাস্যকর লাগছে তার। চাইলেও হাসি আটকাতে পারছে না সে। মুহূর্ত অবশ্য তাতে কিছু মনে করে না। বরং মোমোটাকে হাসাতে পেরে ভালোই লাগে তার। সে ড্রামাতে দেখেছে, মেয়েদের হাসাতে পারলে তারা তাড়াতাড়ি পটে যায়!

জানালার বাইরে মাটিতে একটা ব্যাগ রেখেছিল মুহূর্ত। মমর হাসি শেষ হলে সেখান থেকে একটা কাগজের প্যাকেট বের করে সে মমর হাতে দিয়ে বলে,

“দেখো, তোমার জন্যে আমি কি এনেছি!”

মম প্যাকেটটা খুলে দেখে, ভেতরে নানা ধরনের ছোট ছোট বেরি জাতীয় ফল। স্ট্রবেরী, ব্লুবেরি, রাসবেরি, ব্ল্যাকবেরি সহ আরো নাম না জানা কয়েক রকমের ফল রয়েছে সেখানে। তাজা ফলের গন্ধ নাকে এসে ঠেকলো তার।

“আরে বাহ্! ফ্রেশ ফ্রুট! থ্যাঙ্ক ইউ!”

খুশিমনে একটা ব্লুবেরি তুলে মুখে পুরে নেয় মম। সেটা দেখে সন্তুষ্ট হয় মুহূর্ত। রেস্ট্রিকটেড জোন থেকে ফেরার সময় মমর জন্যে খুঁজে খুঁজে এনেছে সে এগুলো।

“আরেকটা জিনিস আছে!”

ব্যাগ থেকে একটা কাঁচের জার বের করে এবার মমর হাতে দেয় সে। জারের মুখটা চটের দড়ি দিয়ে বাঁধা। আর ভেতরে রয়েছে অনেকগুলো ছোট বড়, বিভিন্ন আকৃতির, নানা রঙের শামুক-ঝিনুক ও শৈবাল। জারটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে মম জিজ্ঞেস করলো,

“এটা তো খুব সুন্দর! কোথায় পেলেন?”

“শামুক, ঝিনুকগুলো সমুদ্রের বালিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। দেখতে ভালো লাগছিল, তাই জারে ভরে নিয়ে এলাম।”

“এখানে সমুদ্র সৈকত আছে?”

মমর অবাক হয়ে করা প্রশ্নে কিঞ্চিৎ ভাঁজ পরে মুহূর্তের কপালে।

“আছে তো। বেশ কয়েকটা। এটা দ্বীপপুঞ্জ না!”

পূর্ব চীন সাগরে অবস্থিত বেশ কয়েকটি দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত স্বর্গভূমি। সমুদ্র সৈকত, বালুকাবেলা, পাহাড়, জঙ্গল সবই আছে এখানে।

“আমি কখনো সমুদ্র সৈকত দেখিনি।”

“কেন দেখোনি? তোমাদের দেশে না সমুদ্র সৈকত আছে?”

“আছে। কিন্তু আমরা তো ঢাকায় থাকতাম। কখনো কক্সবাজারে যাওয়ার সুযোগই হয়নি।”

“ওহ্।” মাথা নাড়ে মুহূর্ত।
“এখন তো তুমি এখানে থাকো। আমি তোমাকে নিয়ে যাবো সমুদ্র দেখতে। তুমি যাবে আমার সাথে?”

“সত্যি নিয়ে যাবেন? আমি যাবো!”

খুশিতে লাফিয়ে উঠলো মম। মুহূর্ত প্রশস্ত হাসে মেয়েটার উৎসাহ দেখে।

“ঠিকাছে, নিয়ে যাবো। কখন যাবে?”

মম একটু ভাবলো। পাখিকে জিজ্ঞেস করে দেখতে হবে। না বলে যাওয়া, ঠিক হবে না। সেটা ভেবে মম উৎসাহ দমিয়ে বললো,

“দেখি, আমি জানাবো তোমাকে।”

***

চলবে…

#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন

#পর্ব_১১

“আই ডোন্ট লাইক ইউ!”

কিঞ্চিৎ কুঞ্চিত ভ্রু জোড়া ও সরু চোখে অসন্তুষ্টি নিয়ে তাকিয়ে বলে উঠলো মম। তবে তাতে ভাবান্তর দেখা গেল না টেবিলের ওপর প্রান্তে বসে থাকা ব্যক্তিটির মাঝে।

মমর নতুন ল্যাপটপে গন্ডগোল দেখা দিয়েছে। এ কদিনেই গেম খেলে ল্যাপটপের বারোটা বাজিয়ে ফেলেছে মম। এসব ল্যাপটপ তো আর গেমিংয়ের জন্যে নয়। নিজের প্রচন্ড আগ্রহ দমাতে না পেরে, পছন্দমত গেম ডাউনলোড করতে গিয়েই হ্যাং হয়ে গেছে ল্যাপটপ। সেই সাথে কিসব ভাইরাসও ঢুকে পড়েছে। পড়াশুনা লাটে তুলে বিগত দিন পাঁচেক ধরে রাতদিন গেম নিয়ে পড়ে ছিল মম। মুহূর্তকেও তেমন একটা পাত্তা দেয়নি সে এ কদিন। সমুদ্র দেখতে যাবে বলেও এই ল্যাপটপের চক্করে যায়নি। মুহূর্ত অবশ্য আজ সকালে পণ করে এসেছিল, ল্যাপটপটা যেভাবেই হোক ভাঙবে আজ! কিভাবে ভাঙলে মোমো তার উপর রাগ করবে না, সারারাত বসে বসে সেই ফন্দি এঁটেছে সে। তবে সেই বুদ্ধি প্রয়োগের আর প্রয়োজন পড়েনি। আপনাআপনিই নষ্ট হয়ে পড়ে ছিল ল্যাপটপ কাল রাত থেকে।

সকালে কাচুমাচু করতে করতে ল্যাপটপ সমেত পাখির অফিসে এসেছে মম। ল্যাপটপ ও বোন দুজনের অবস্থা দেখে প্রথমেই একপ্রস্থ ঝেরেছে পাখি মমকে। তারপর ডেকে এনেছে ঘোস্টকে। অবশ্য ডাকার প্রয়োজন পড়েনি, ঘোস্ট এমনিতেই এসেছিল পাখির অফিসে একটা কাজে। সামনে পরায় হাত দিয়েছে মমর ল্যাপটপে। ব্যস! যে কথাটা মম চেপে গিয়েছিল, সেটাও ফাঁস করে দেয় সে। মম পাখির সামনে ভান ধরেছিল যেন ল্যাপটপ নষ্ট কীকরে হলো, সে জানেই না। কিন্তু ঘোস্ট ল্যাপটপে হাত দিয়েই হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছে। মমর কান টেনে আরেক প্রস্থ বকা দিয়েছে পাখি এরপর তাকে।

অন্যদিকে, ঘোস্ট পাঁচ মিনিট ঘোড়ার স্পিডে ল্যাপটপের কিবোর্ডে হাত চালিয়ে, সেটাকে চার্জে দিয়ে ফেলে রেখেছে একপাশে। স্ক্রিনের উপর এখন আপনাআপনি ভেসে উঠছে কিসব কোড। পাখি গেছে উপরে। মানে উপরতলায় থাকা ডিরেক্টর দেনিজের অফিসে। ঘোস্ট ও মম আপাতত একা বসে আছে অফিসকক্ষে। মম তির্যক দৃষ্টিতে একটু পর পর তাকালেও, ঘোস্ট ব্যস্ত নিজের ফোনে। সে ব্যতীত যে অন্য কেউ আছে রুমে, সেটা তার হাবভাবে বোঝা অসম্ভব!

অবশেষে, টিকতে না পেরে, রুমের গুমোট নীরবতা ভেঙে মম কর্কশ গলায় বলে উঠলো,

“শুনেছেন? আমি বলেছি, আমার আপনাকে পছন্দ হয়নি। একটুও না।”

প্রথমবার পাত্তা না দিলেও, এবার ঘোস্ট নিস্পৃহ গলায় বললো,

“তো?”

“তো মানে? আমি আপনার শ্যালিকা। আমার আপনাকে পছন্দ না হওয়াটা, আপনার জন্যে মোটেও সুবিধাজনক হবে না, বলে দিলাম!”

ঘোস্টের চোখজোড়া এখনো ফোনের স্ক্রিনে স্থির হয়ে আছে। মমর কথা নিঃসন্দেহে কানে গেলেও, বিন্দুমাত্র প্রতিক্রিয়া দেখানোর প্রয়োজন বোধ করলো না সে।

ঘোস্টের কাছ থেকে কোন প্রতিক্রিয়া না পেয়ে মম চোখমুখ কুচকে আবার বলে উঠলো,

“জিজ্ঞেস করবেন না, কেন পছন্দ হয়নি?”

“আমার জানার আগ্রহ নেই।”

“কেন? অবশ্যই আপনার জানা উচিত। আগ্রহ নেই কেন?”

“কারণ তুমি অপ্রয়োজনীয়। তোমার আমাকে পছন্দ হওয়া না হওয়া সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক।”

লোকটার আস্পর্ধা দেখে অবাক হয়ে গেল মম! মুখটা হা হয়ে গেল তার। কত বড় সাহস! বলে কিনা সে অপ্রয়োজনীয়! তার পছন্দ অপ্রাসঙ্গিক! তেঁতে উঠে ঝাঁঝালো গলায় সে বললো,

“এই জন্যেই! এই জন্যেই আপনাকে আমার একদম পছন্দ হয়নি! আস্ত একটা ভূত আপনি! এভাবে কেউ বলে?”

“যেটা সত্যি, তাই বলেছি।”

“এভাবে মুখের উপর সত্যি কথা বলতে নেই।”

এই প্রথম ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে মমর দিকে তাকালো ঘোস্ট। তার শীতল চোখের চাহনিতে একটু ঘাবড়ে গেল মম। তবে সেটা প্রকাশ না করে সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে মম আবারো বললো,

“আর আমার পছন্দ অপছন্দ মোটেও অপ্রাসঙ্গিক নয়। আপনি জানেন না বোধহয়, আপু আমাকে অনেক ভালোবাসে। আপনার নামে বিচার দিলে, দিনেদুপুরে আপনাকে তারা দেখিয়ে দেবে!”

মমর কথায় আগের মতই নির্লিপ্ত, নিস্পৃহ রইলো ঘোস্ট।

“তাই?”

“হুম,”

“কি বিচার দেবে?”

“বলবো…বলবো যে…..বলবো…..” আমতা আমতা করতে লাগলো মম।

“একটু টাইম দিন। ভেবে বলছি যে কি বলবো।”

ঘোস্ট ফোনটা টেবিলের উপর রেখে কিছুটা সামনের দিকে ঝুঁকে বসে। মমর দিকে গম্ভীরমুখে তাকিয়ে সে বলে,

“বলতে পারো যে, আমি খুব রুড। তোমাকে পাত্তা দেই না, তোমার সাথে ভালো করে কথা বলি না, তোমাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করি। সাথে এটাও যোগ করতে পারো যে, তোমাকে পাখির সাথে দেখলে আমি বিরক্ত হই। ইচ্ছে করে, সোজা মাঝ সমুদ্রে নিয়ে তিনবার চুবিয়ে আনি।”

“হ্যাঁ! এটাই বলবো!”

মাথা উপরে নীচে দুলিয়ে সম্মতি জানালো মম। কিন্তু পরক্ষণেই শেষ দুই লাইন তার মগজে বিস্ফোরণ ঘটালো। আবারো চোখমুখ কুচকে সে তাকালো ঘোস্টের দিকে। হতভম্ব হয়ে সে জিজ্ঞেস করলো,

“এক মিনিট! আপনি আমাকে দেখলে বিরক্ত হন? আমাকে মাঝ সমুদ্রে নিয়ে চুবাতে চান? তাও তিনবার?!”

আর কোন উত্তর দেবার প্রয়োজন বোধ করলো না ঘোস্ট। ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে, চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে, সে পুনরায় নিজের কাজে মনোযোগ দিল। কিন্তু মম থামলো না। রিনরিনে গলায় সে অভিযোগের খাতা খুলে বসলো।

“কিন্তু কেন? আমি কি করেছি? আপনার কোন পাকা ধানে মই দিয়েছি আমি? উল্টো আপনার কারণে আজকে আপু আমাকে কি বকাটাই না দিলো! একটু গেমই তো খেলেছি। ল্যাপটপটাই ভালো না। নইলে কি আর দু দিনেই নষ্ট হয়!”

“হ্যাঁ, দোষ তো ঐ ল্যাপটপেরই! তবে সে কি আর জানত, যে কেমন ধড়িবাজ মেয়ের হাতে পড়েছে? জানলে, নিশ্চয়ই নিজেকে আপডেট করে নিত।”

কেবিনে ঢুকে মমর উদ্দেশ্যে বললো পাখি। কথাটা গায়ে লাগলো মমর। আড়চোখে সে তাকালো ঘোস্টের দিকে। এই লোকটার সামনে তাকে এভাবে পচানোটা কি খুব জরুরি?

“আমাকে তুমি ধড়িবাজ বললে আপু! আমি ধড়িবাজ?”

“ধড়িবাজ মানে কি সুকন্যা?”

পাশ থেকে ঘোস্টের আওয়াজ পেয়ে তার দিকে আড়চোখে তাকালো পাখি। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ঘোস্ট। মমর আর সহ্য হলো না। সে লাফ দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে নাকী সুরে বললো,

“রাখো তুমি তোমার ল্যাপটপ। চাইনা আমার!”

বলেই হনহন করে বেরিয়ে গেল সে পাখির কেবিন থেকে।

***

(অজ্ঞাত স্থান)

সূর্যের প্রথম কিরন পেয়ে অগ্নিশিখার মত জ্বলে উঠেছে মন্দিরের সোনালী চূড়াটা। দূর থেকে দৃশ্যমান পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত মন্দিরটি স্থির দাঁড়িয়ে আছে স্ব মহিমায়। সরু পাথরের ধাপগুলো বেয়ে উঠে আসতে হয় ধূসর পাথর ও কাঠ দিয়ে নির্মিত বর্ষ পুরানো এই মন্দিরটিতে। বাতাসে নেই কোন কোলাহল। শুধু ধীর গতিতে আলোড়ন তুলছে ছাদ থেকে শূন্যে ঝুলতে থাকা ভারী ঘন্টাগুলো। মন্দিরের ভেতরে ও বাইরে জ্বলা মিষ্টি গন্ধযুক্ত ধূপ মোহাচ্ছন করে রেখেছে পরিবেশ।

মন্দিরের সামনে খোলা আঙ্গিনার একপাশে মাথা তুলে শাখা প্রশাখা মেলে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল বটবৃক্ষ। পাথর ও মাটি দিয়ে বাঁধাই করা বৃক্ষটির চারপাশ। সেই শক্ত পাথরে ফাটল ধরিয়ে কয়েক জায়গা থেকে বেরিয়ে এসেছে বটের জেদী শেকড় বাকর। অসংখ্য ছোট ছোট ঘণ্টা ও লাল কাপড় বাঁধা বৃক্ষটির শাখা প্রশাখায়। স্থানীয়দের বিশ্বাস এই বৃক্ষে রয়েছে শতবর্ষী দেবতার বাস। দেবতার অর্চনা মন থেকে করলে পূরণ হয় আশা।

ঠিক সেই বৃক্ষের সম্মুখে গেরুয়া বর্ণের বস্ত্র শরীরে জড়িয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছেন একজন ধর্মগুরু। বয়স চল্লিশের কোঠায় হলেও, নিয়মিত শরীরচর্চা, যোগ নিদ্রা এবং পরিমিত খাদ্যাভ্যাসের কারণে তার ছাপ পড়েনি চেহারায়। চোখজোড়া মুদে স্থির হয়ে আছেন উনি। এমনকি শ্বাস প্রশ্বাসের মৃদু কম্পনটুকুও অনুপস্থিত। শুধুমাত্র ধীর লয়ে ঘুরছে তার হাতে থাকা পদ্মবীজের জপমালাটা। বুদ্ধের নাম জপ করতে করতে বৃদ্ধাঙ্গুলির মৃদু ধাক্কায় গুনছেন উনি পুঁতিগুলো।

তার সম্মুখে, পাথরের তৈরি শক্ত মেঝের আঙিনায় দাঁড়িয়ে আছে বেশ কিছু যুবক। পরনে তাদের লাল রঙের লম্বা আলখাল্লা। মাথায় টেনে রেখেছে হুডি, যার দরুন চেহারা অর্ধেক ঢাকা পড়েছে ছায়াতে। সারিবদ্ধভাবে শান্ত, স্থির, অবিচল হয়ে দাড়িয়ে আছে তারা। অপেক্ষা করছে গুরুর পরবর্তী নির্দেশনার।

জপ শেষে হাতের মৃদু নড়াচড়াও বন্ধ হয়ে যায় ধর্মগুরুর। চোখজোড়া বন্ধ রেখেই শীতল কণ্ঠে উনি বলে ওঠেন,

“শয়তান হলো ছায়া। যা বাস করে মায়ায়। মায়া আমাদের টেনে নিয়ে যেতে চায় অন্ধকারে। মায়ার বুভুক্ষু সেজে শয়তানের সৈনিকরা আমাদের ধোঁকায় ফেলে।”

কথাগুলো মিলিয়ে যাওয়ার পরও বাতাসে রয়ে যায় তাদের রেশ। বহুদূর ছড়িয়ে পড়ে সেটা। মন্ত্রের মত ছড়িয়ে পড়ে সেখানে দাঁড়ানো যুবকদের শিরা উপশিরায়। চোখ মেলে তাকান গুরু। তার মলিন, উদাস দৃষ্টি সামনে দাঁড়ানো যুবকদের উত্তপ্ত হৃদয়কে দেয় শীতলতা। গুরু আছেন তো! চিন্তা কিসের? হৃদয়কে ভয়মুক্ত করার পথ উনিই দেখাবেন।

“অশুভ শক্তিকে পরাস্ত করতে নিজের হৃদয়কে করতে হবে শুদ্ধ। যেখানে কোন মলিনতার ঠাঁই হবে না। থাকবে শুধু সত্যের বাস। তবেই না বিতাড়িত হবে অন্ধকার।”

জ্বলজ্বল করে ওঠে দিকভ্রান্ত যুবকদের চোখগুলো। নিজেদের ভেতরে সত্যের আলোকে জাগ্রত করতে প্রস্তুত তারা। প্রস্তুত সত্যের পথে নিজেদের বিলীন করতে। লড়তে প্রস্তুত, প্রস্তুত মরতে কিংবা মারতে!

নিজের শিষ্যের দিকে তাকান ধর্মগুরু। স্ফীত হেসে ইশারা করেন। গুরুর ইশারা পেয়ে এগিয়ে যায় সেই শিষ্য যুবকদের দিকে। হাতে একটা জলের পাত্র। তবে এ পাত্রে জল নেই, আছে অমৃত! সেই অমৃত যা আত্মাকে শুদ্ধিকরণের পথে নিয়ে যায়। একে একে প্রতিটি যুবককে পান করানো হয় সে অমৃত। তৃপ্ত দৃষ্টিতে মালা জপতে জপতে দেখেন গুরু। অমৃত পানের পর ঝিমুনি আসে। শরীর দূর্বল হয়ে পরে। হাত পা কাঁপতে শুরু করে। তবে যুবকরা ভীত হয় না। এটাই তো পথ। ধর্মগুরু বলেছেন, বিভ্রান্তির দেয়াল ভেদ করে চেতনা যখন নামে সত্যের সন্ধানে, তখন পার্থিব শরীর দূর্বল হয়ে পরবে। চোখের সামনে নানা রঙের মেলা বসবে। অতীত ও ভবিষ্যৎ গুলিয়ে যাবে। দৃষ্টিভ্রম নয়, এটাই সত্যের মূর্ত রূপ!

যুবকদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয় মন্দিরের পেছন দিকটায়। সেখানেই দীক্ষা নেবে তারা। গুরু তাদের যাওয়ার পথে তাকিয়ে থাকেন সন্তুষ্টি নিয়ে। এরপর ধীর পায়ে হেঁটে কাঠের কারুকাজ খচিত বিশাল দরজাটা দিয়ে প্রবেশ করেন মন্দিরের ভেতরে। দুপাশে বিশাল স্তম্ভের উপর খোদাই করা বিভিন্ন প্রতীক। মেঝেটা মসৃণ পাথরের। সামনের বিশাল খোলা হলরুমের শেষ প্রান্তে শোভা পাচ্ছে বুদ্ধের বিশাল মূর্তি। মূর্তির সামনে উঁচু টেবিলের উপর সাজিয়ে রাখা হয়েছে সদ্য ফোঁটা পদ্ম, ধূপবাতি, প্রদীপ, কয়েক ধরনের ফল ও একটি পানির পাত্র।

মূর্তিটির সামনে শক্ত, অনমনীয় পাথরের মেঝেতে নতমস্তকে হাঁটু গেড়ে বসে আছে এক লোক। একধ্যানে বিড়বিড় করে বলছে সে কিছু। ধর্মগুরু এগিয়ে এসে লোকটির পাশে দাঁড়ান। তার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে কিছু একটা ভাবেন হয়ত। মিনিটখানেক পর একহাত রাখেন লোকটির কাঁধে। মৃদু স্বরে ডাকেন তাকে,

“চোখ খোলো বৎস। তুমি বুদ্ধের ছায়ায় আছো। এখানে কোন অন্ধকার তোমার পিছু করতে পারবে না। তুমি সত্যের সৈনিক। পরাজিতের ভঙ্গিমা কেন তোমার?”

মাথা তুলে এবার তাকালেন লোকটা। চোখজোড়া তার লাল হয়ে আছে। মনে হয়, অনেকদিন ঘুম হয়নি তার। চুলগুলো উস্কো খুস্কো। আধোয়া জামাকাপড়ে মলিনতার ছাপ স্পষ্ট। ঠোঁটজোড়া কাপছে লোকটার।

“আমি পারিনি! ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছি আমি মহাথেরো। আমাকে….আমাকে ক্ষমা করুন।”

“ওঠো।”

লোকটির অপরাধবোধ নিয়ে বলা কথার প্রেক্ষিতে স্ফীত হেসে উঠলেন গুরু। হাত বাড়িয়ে টেনে তুললেন লোকটিকে। শান্ত, অবিচল কণ্ঠে শুধালেন,

“কে বলেছে তুমি ব্যর্থ? এ তো কেবলই লড়াইয়ের শুরু। এখনো অনেক পথ পাড়ি দেওয়া বাকি। অশুভ শক্তির তেজ যতই বারুক না কেন, সত্যের সামনে তা ঠিক ধূলিসাৎ হবে।”

গুরুর কথায় আশা ফিরে পেলেন লোকটা। ছোট্ট বাচ্চার মত নতুন আশায় জ্বলজ্বল করে উঠলো তার চোখ।

“আপনি আমার উপর অসন্তুষ্ট নন?”

“নাহ্। কখনোই না। তোমার হৃদয় যতক্ষণ সত্যের আলোয় আলোকিত, আমি সর্বদা তোমার পাশে থাকবো।”

গুরুর আশ্বাসে যেন নতুন প্রাণ পেল লোকটা। এক অদ্ভুত জ্যোতি ছড়িয়ে পড়লো তার চেহারায়। কৃতজ্ঞতায় চোখজোড়া ছলছল করে উঠলো লোকটার। গুরুর হাতটা নিজের দু হাতের মুঠোয় চেপে ধরে সেটা মাথায় ঠেকিয়ে রাখলো সে কিছুক্ষন। গুরু অন্য হাতটা লোকটার মাথায় রাখলেন। নিঃশব্দে বোঝালেন তার আশীর্বাদ আছে, থাকবে অন্ধকারে সত্যের শক্তি হয়ে।

“সময় এসে গেছে। নতুন বছর শুরু হতে চলেছে। পূর্বের সমস্ত মলিনতাকে নাশ করার, এটাই উপযুক্ত সময়।”

গুরুর ধীর স্থির কন্ঠ কর্নগোচর হতেই মাথা তুলে তাকালো লোকটা। মাথা নেড়ে প্রচন্ড সম্মতিতে লোকটা আওড়ালো,

“আপনি ঠিক বলেছেন মহাথেরো। এটাই সময়!”

এরপর কিছু একটা মনে পরতেই নিজের কোর্ট, শার্ট ও প্যান্টের পকেট হাতড়াতে লাগলো সে। কিছু একটা খুঁজছে সে। কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি পেতে সময় লাগলোনা। একটা ভাঁজ করা বাদামি রঙের কাগজ। সেটা হাতে নিয়ে প্রশস্ত হাসলো লোকটা। চোখজোড়া চিকচিক করে উঠলো শকুনের ন্যায়। কাগজটা দুহাতে গুরুর দিকে বাড়িয়ে দিল লোকটা। ঠিক যেন প্রভুকে অর্পণ করে কোন ভোগ প্রসাদ!

কাগজটা হাতে নিয়ে ভাঁজ খুললেন গুরু। পরতের পর পরত ভাঁজ খুলে মেলে ধরতেই দৃষ্টিগোচর হলো একটা ম্যাপ। কয়েকটি দ্বীপ নিয়ে গড়ে ওঠা একখন্ড অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ডের নকশা।

“এবার আর কোন ভুল নয়। আতশবাজি ফুটবে, আলো জ্বলবে। নতুন বছর শুরু হবে, সকল অশুভ শক্তির বিনাশের মধ্য দিয়ে।”

***

(স্বর্গভূমি: হাইব্রিডার্স জোন)

“অপেক্ষা করো। আমি আসছি।”

চেরীর রুমের দরজায় দাঁড় করিয়ে রেখে গেছে সে মমকে। বাড়ি ফেরার পথে চেরীর সাথে দেখা হয় মমর। তারপর তাকে ধরে নিয়ে এসেছে চেরী তাদের হোস্টেলে। যতটা ইতস্তত মম করছিল, সেরকম কিছুই চোখে পরেনি তার। হাইব্রিডার্স জোন শুরুর গেটটা একদমই সাধারণ একটা উঁচু লোহার গেট বৈ কিছুনা। অবশ্য গেটটার দুদিকেই পাহারারত আছে HFT এর গার্ডরা। HCO এর কোন অফিসারকে সেখানে দেখেনি মম। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চেরী বলে, স্বর্গভূমির মূল ফটকে যেই কড়া নিরাপত্তা, সেটা ভেদ করে এদিকে কারো আসার সম্ভাবনা নেই। এখানে শুধু পাহারা বসানো হয়েছে যেন ভেতরে কর্মরত মানুষরা অনুমতি ছাড়া আসতে না পারে, তাই।

“এই!!! খবরদার ভেতরে ঢুকবে না।”

কৌতূহলী মম দরজার চৌকাঠে পা রেখে এক কদম ভেতরে আসতে নিতেই, ভেতরের রুম থেকে চড়া গলায় সাবধান করে দেয় তাকে চেরী। ঘাবড়ে গিয়ে দু কদম পিছিয়ে আসে মম।

হোস্টেল বলা হলেও, মমর কাছে এই সুবিশাল আধুনিক স্থাপনাকে কোন লাক্সারি ফাইভ স্টার হোটেল ছাড়া অন্য কিছু মনে হচ্ছেনা। পুরো লবিটা আলোকিত হয়ে আছে সাদা ও সোনালী আলোতে। দরজায় দাড়িয়ে যতটুকু দৃষ্টি যায়, মম উকি দিয়ে দেখলো। সুবিশাল না হলেও, মোটামুটি বড়সড় একটা লিভিং রুম সামনে। নীচে মোটা কার্পেট বিছানো, লাল রঙের নরম গদির সোফা সাজানো একপাশে। ঠিক তার সামনের দেয়াল জুড়ে শোভা পাচ্ছে একটা কালো স্ক্রিনের টিভি। অন্যপাশে কিছুটা উঁচু স্তম্ভের উপর একটা লম্বা কাউন্টার ও পেছনে সাজানো কিছু কেবিনেট। দেখে মনে হচ্ছে হয়ত ওপেন কিচেন। তার পাশেই একটা দরজা। সম্ভবত বেডরুম ওটা। সেখানেই গেছে চেরী।

“চলো এবার।”

কিছুক্ষণপর হাতে কয়েকটা শপিং ব্যাগ নিয়ে ফিরে এলো চেরী। দরজাটা বন্ধ করে আগে আগে হাটা শুরু করলো সে। চলতে চলতে মমর উদ্দেশ্যে বললো,

“শোনো মেয়ে, আমরা নিজেদের জায়গা ও জিনিসপত্র নিয়ে খুব পজেসিভ। কখনো ভুলেও অনুমতি ছাড়া কোন হাইব্রিডার্সের এরিয়াতে প্রবেশ করবে না। কোন জিনিস ছোঁবে না। এরকম করা মানে সোজাসুজি সেই হাইব্রিডার্সকে চ্যালেঞ্জ করা।”

অস্বস্তিতে পরে গেল মম। কিছুটা সংকোচের সাথে সে জিজ্ঞেস করলো,

“আমি তো নিজ থেকে তোমাদের হোস্টেলে আসিনি। তুমিই তো নিয়ে এসেছো। তাহলে এখন?”

“হোস্টেল কমন এরিয়া। এইযে করিডোর, নিচতলার কিচেন, ডাইনিং, লবী, হলরুম এসবও কমন এরিয়া। কিন্তু রুমগুলো আমাদের নিজেদের জোন। যদিও একই ভবনে এত সংকীর্ণ জায়গায় থাকা আমাদের পছন্দ না। কিন্তু আপাতত এভাবেই চলছে।”

“ওহ্।”

বলার মত আর কিছু খুঁজে পেল না মম। চুপচাপ চেরীকে অনুসরণ করে হোস্টেলের লবিতে পৌঁছালো তারা। বড় এক হলরুম এটা। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বেশ কিছু সোফা, চেয়ার, টুল ও টেবিল। আপাতত সেখানে জায়গায় জায়গায় বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। হাইব্রিডার্স মেয়েরা এটা ওটা নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা, পর্যালোচনা ও কারাকারীতে ব্যস্ত। দেখে ছোট খাট একটা যুদ্ধক্ষেত্র মনে হচ্ছে জায়গাটা।

কোন শব্দ করেনি মম। কিন্তু তার উপস্থিতি টের পেল সবাই। নিজ নিজ জায়গায় থেমে মমর দিকে বাঁকা চোখে তাকালো সবাই একযোগে। মুহূর্তেই পুরো ঘরজুড়ে নেমে এলো নীরবতা।

“মম!!! এসে গেছো তুমি!”

নিস্তব্ধতা চিরে ভেসে এলো হাওয়াইয়ের উচ্ছ্বসিত কন্ঠস্বর। ভিড়ের মাঝখান থেকে লাফিয়ে এগিয়ে এলো সে। হাতে একটা লাল কাগজের ফুল ধরে আছে সে। সেটা মমর চোখের সামনে নাচিয়ে হাওয়াই বললো,

“দেখো, আমি এগুলো বানিয়েছি, সুন্দর লাগছে না?”

“এই মানুষের মেয়েটা কি করছে এখানে?”

মম হাওয়াইকে কোন উত্তর দিতে পারার আগেই ভীড় থেকে জিজ্ঞেস করে উঠলো একটা তীক্ষ্ম কন্ঠস্বর। কণ্ঠের মালিককে খুঁজে পেতে সেকেন্ড খানেক সময় লাগলো মমর। লম্বা দুটো কালো বেণী হাঁটু ছুঁয়েছে মেয়েটার। মাথায় একটা ফ্যাশন ক্যাপ পরে আছে। কানে ঝুলছে দুটো বড় বড় ইয়ার লুপ। একটা টিউব টপের সাথে ব্যাগি প্যান্ট পরনে তার। দেখতে চেরীর মতই লম্বা চওড়া হলেও, মেয়েটার চোখদুটো প্রখর। ধূসর বর্ণের চোখজোড়া তীক্ষ্ম। তাতে কোথাও মায়া নেই। আছে শুধুই নির্লিপ্ততা।

“রিলাক্স, লাভলী। ও পাখির বোন। সেদিন আমাকে বাঁচিয়েছিল, বলেছিলাম না?”

এগিয়ে গিয়ে হাতের ব্যাগগুলো একটা টেবিলের পাশে রাখলো চেরী। তবে রুমটা এখনো নিস্তব্ধ হয়ে আছে। সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ মমর দিকে। হাওয়াই লাভলীর আওয়াজে পিছিয়ে গেছে কিছুটা। উৎসাহে ভাটা পড়েছে তার। লাভলী এখনো তির্যক দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছে মমকে।

“বুঝলাম। কিন্তু এখানে কি করছে মেয়েটা?”

“হাওয়াই দেখা করতে চাইছিল ওর সাথে। ভাবলাম নিয়ে আসি। নিউ ইয়ারের প্রিপারেশনে হেল্প করে দেবে কিছুটা।”

মম যখন অস্বস্তিতে হাসফাস করছে আর ভাবছে দৌড়ে পালাবে, ঠিক তখনই লাভলী মাথা সামান্য নেড়ে অন্যদিকে ঘুরে গেল। আর সেই সাথেই রুমটায় আবার আগের মত হট্টগোল শুরু হয়ে গেল। মমর দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছে সবাই। হাওয়াইও প্রশস্ত হেসে আবার এগিয়ে এলো মমর দিকে। হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল ওকে ভেতরে নিজেদের মাঝে।

নিউ ইয়ার নিয়ে ওদের ভেতরে উৎসাহের কমতি নেই। কেউ কাগজের লণ্ঠন বানাচ্ছে, তো কেউ চেষ্টা করছে কিছু প্রতিকৃতি বানানোর। রূপ আবার বানাচ্ছে লাল রঙের খাম। এগুলো নাকি গিফটের সাথে দিতে হয়। একজন আবার কেকের ব্যাটার মিক্স করছে বিশাল এক স্টিলের বোলে।

প্রথম প্রথম অস্বস্তি বোধ করলেও, কিছুটা সময় যেতেই ওদের সাথে হাসি ঠাট্টায় মিলে গেল মম। হাতে হাতে হাওয়াইয়ের সাথে কাগজের লণ্ঠন বানাতে শুরু করলো সে। এর মধ্যেই একটা মেয়ে হাতে আস্ত একটা টার্কি হতে নিয়ে প্রবেশ করলো রুমে। প্রায় বিশ কেজি ওজনের বিশাল এক মৃত টার্কির এক ঠ্যাং ধরে ঝুলিয়ে, সেটা নিয়ে দাড়িয়ে আছে মেয়েটা। চেহারা বিরক্তিতে কুচকে আছে তার। পশম ছাড়িয়ে পরিষ্কার করে শুকিয়ে নেওয়া হয়েছে টার্কিটা। সেটার দিকে বিভ্রান্তি নিয়ে তাকিয়ে রূপ জিজ্ঞেস করলো,

“মিঠাই, কিছু বলবে?”

“এই মরা টার্কিটাকে বিয়ে করবো কিভাবে?”

মেয়েটার প্রশ্ন আরো একবার রুমে নেমে এলো পিনপতন নীরবতা।

“বিয়ে? এই মরা টার্কিকে?”

বিভ্রান্তি বাড়লো সবার। রূপ ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করলো,

“কেন? এটাকে বিয়ে করতে যাবে তুমি কোন দুঃখে?”

“রেসিপিতে বলছে, ম্যারি ইট ফর থার্টি মিনিটস।”

“হ্যাঁ?”

মেয়েটার কথা রূপ কিছুই বুঝলো না। তবে চেরী যা বোঝার বুঝে গেছে। সে বিভ্রান্তির সুতো ছিঁড়ে বলে উঠলো,

“ম্যারিনেট ফর থার্টি মিনিটস বলেছে!”

চেরীর কোথায় মেয়েটা অন্য হতে মাথা চুলকে জিজ্ঞেস করলো,

“ম্যারিনেট কি?”

“ভালো করে ওরে মরিচের গুঁড়া দিয়ে ডলা দাও!”

বিয়ে করার চেয়ে, পুরুষ টার্কিটাকে মরিচের গুঁড়া দিয়ে ডলা দেবার আইডিয়াটা বেশি পছন্দ হলো মিঠাইয়ের। খুশিমনে সে মাথা দুলিয়ে চলে গেল টার্কিটা নিয়ে। লবিতে মেয়েদের হট্টগোল চলতে থাকলো। আর ওদের মাঝে সেই খুশির ছোট্ট একটা অংশ হয়ে জুড়ে গেল মম।

***

চলবে…

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ