#অবহেলার_দিনগুলি
#পর্ব_২
#ইলোরা_ফারদিন
জহির বেশ আনন্দেই আছে। থাইল্যান্ডে দুই সপ্তাহ হানিমুন করে আজ ফিরলো। সে এখন নতুন করে জীবনটাকে উপভোগ করছে। রিতার বেড পারফরম্যান্সও অসাধারণ। সুমনার মাঝে এই জিনিসটা ছিল না। একদম মরা মাছ। নিজের জীবনের এতোগুলো বছর সে সুমনার মতো একটা বোরিং মরা মাছের সাথে কাটিয়েছে ভেবেই বিরক্তিতে মুখ কুচকালো জহির। একটু পরেই চোখ যখন রিতার উপর পরলো মনটা মুহুর্তের মাঝে ভালো হয়ে গেল। পৃথিবীতে এখন সে নিজেকে শ্রেষ্ঠ সুখী মানুষ মনে করে। চারদিকে শুধু সুখ আর সুখ। আর সেই সুখের মূল রহস্য রিতা।
এদিকে নতুন বিয়ের পর একটি বারের জন্যও সে সুমনাকে কল দেয় নি। বাচ্চাদের খোজ নেয় নি। এমনকি সে সুমনাকে সংসার খরচের টাকাটাও দেয় নি। এই যে বাজার খরচ, বাচ্চাদের স্কুল টিউশনির ফি এসব সুমনা কিভাবে দিবে একটা বারের জন্যও সে ভাবে নি। সে ব্যস্ত তার দ্বিতীয় স্ত্রী নিয়ে। লোকে বলে না পুরুষ তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে বেশি যত্নে রাখে, দ্বিতীয় স্ত্রীই পুরুষের আসল শখের নারী, কথাটি যেন জহির নিজেই প্রমাণ করে দিল। নাহলে যেই সুমনা তার শূণ্য পকেটে তার পাশে ছিল, পকেট ভরতেই সেই সুমনাকে সে ছুড়ে ফেলে দিল। এইজন্যই হয়তোবা আজকাল মেয়েরা বিয়ে করার জন্য প্রতিষ্ঠিত পুরুষ খোজে। কারণ জানে ছেলেরা প্রতিষ্ঠিত হবার পর প্রথম স্ত্রীকে আর নিজের যোগ্য মনে করে না। অবশ্য যারা আসল পুরুষ তারা এমন না, তারা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে স্ত্রীকে আরও মাথায় তুলে রাখে।
___________
“এভাবেই ওই প্রতারকটাকে ছেড়ে দিচ্ছিস সুমনা?” আহত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো রোমানা
বোনের কথায় উম্মাদের মতো হেসে উঠলো সুমনা। হাসতে হাসতে বলল,” আমি ঠান্ডা মাথায় কাজ করতে পছন্দ করি আপা। সেজন্য যদি আমার একটা বছর সময়ও যায়, সমস্যা নেই। কিন্তু কাজটা যেন নিখুঁত হয়।
আমি যেখানে নিজের রক্তের বাপকেই ছাড় দিই নি, সেখানে জহির কে?
তোমার মনে আছে আপা, আব্বা যখন পরকীয়ায় জড়ালো তখন আমি ক্লাস ফাইভের ছাত্রী। যেই আব্বার চোখের মণি ছিলাম আমরা দুই বোন। সেই আব্বাই একদিন হুট করেই অচেনা হয়ে গেল। বাসাতে আসতো না, কথায় কথায় আম্মার গায়ে হাত তুলতো। আরও কত কি। ক্লাস সেভেনে থাকতে একদিন লোক মুখে জানতে পারলাম আব্বা নাকি পাশের গ্রামের শিউলি নামের আঠারো বছরের একটি মেয়েকে বিয়ে করবে।
২য় বিয়ে না করতেই আব্বা যেখানে আমাদের এতো অবহেলা করতো, ২য় বিয়ের করার পরে যে আমাদের দিকে ফিরেও তাকাবে না সে আমার ঢের জানা ছিল। তাই আমি আর মা মিলে আব্বার সাথে কি করেছিলাম মনে আছে না? আব্বা সারা জীবনের জন্য তার হাটার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল। তাই তো আর দ্বিতীয় বিয়ে করা হয় নি তার। কারণ কোনো মেয়েই তার স্ত্রী হয়ে গু মুত পরিষ্কার করতে রাজি ছিল না।
এরপর আম্মা আব্বার ব্যবসা নিজের হাতে নিয়ে নিল। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আব্বাকে দুনিয়াতেই নরক যন্ত্রণা সহ্য করিয়েছিলাম আমি আর আম্মা। তুমি তো তখন তোমার স্বামীর বাসায়। ভেবেছো সেদিন যদি আমি আর আম্মা আব্বার এই অবস্থা না করতাম তাহলে আব্বা ২য় বিয়ে করতেন। ব্যবসা বাড়ি সব যেত তার ২য় স্ত্রীর হাতে। তোমার সংসার ভাঙতো। আর আমি আম্মা রাস্তায় রাস্তায় আশ্রয়ের খোজে ঘুরে বেড়াতাম।
তবে আম্মা কিন্তু আব্বাকে ফেলে দেয় নি। সম্পত্তি ব্যবসা সব নিজ দায়িত্বে নিয়েছিলেন ঠিকি, কিন্তু আব্বার সেবাও করেছেন। তার গু মুত নিজে পরিষ্কার করেছেন। তার কথা ছিল সে আব্বার স্ত্রী হয়ে এ বাসায় এসেছেন, আব্বার স্ত্রী হয়েই মৃত্যুকে বরণ করবেন। আর আব্বার পাশে দ্বিতীয় নারীর অস্তিত্ব সে থাকতে দিবেন না।”
” তাহলে তুইও কি আবার জহিরের সাথে সংসার করতে চাস?” অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল রোমানা
” মাথা খারাপ নাকি? আমি আম্মার মতো এতো দয়ালু না। প্রতারকের আমার জীবনে জায়গা নেই। আমি একজন সুপুরুষের সাথে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন ডিজার্ভ করি। কিন্তু তার আগে জহিরকে ধবংস করব। এমন ভাবে ধ্বংস করব যেন সে তার মৃত্যু কামনা করে। আমার এতো বছরের সংসারকে সে খু*ন করেছে, আমার আত্মাটাকে খু*ন করেছে, আমার সন্তানদের শৈশব টাকে খু*ন করেছে। এতোগুলো খু*নের খুনিকে এমনি কি করে ছেড়ে দিই বলো তো আপা? ”
” আর রিতা? ওকে এমনি এমনি ছেড়ে দিনি?”
” আগে জহিরের শাস্তি টা দিই।পরের টা পরে দেখা যাবে!”
____________
বুয়ার হাতের রান্না খেতে ভালো লাগে জহিরের কিন্তু জহির বাধ্য হয় খায়। রিতার রান্না বান্না করতে কষ্ট হয়। তাই তো বাসায় তিন তিনটে কাজের মেয়ে রেখে দিয়েছে। যাতে রিতার বিন্দু মাত্র কষ্ট করতে না হয়। কিন্তু এই জহির যখন সুমনার সাথে সংসারে ছিল তখন বাসার সব কাজ সুমনা একা হাতে করতো। শুরুর দিকে অভাবের সংসার, তখন কাজের মেয়ে রাখা স্বপ্নের মতো।কিন্তু যখন জহিরের বেতন বাড়লো সুমনা অবশ্য কয়েকবার বলেছিল কাজের মেয়ের কথা। কিন্তু জহির না করে দেয়। সে নাকি সুমনার হাতের রান্না ছাড়া খেতে পারে না। কাজের মেয়েরা ভালো করে কাপড় ধুতে পারে না। আর আজ সেই জহিরই তার ২য় স্ত্রীর জন্য বেশি বেতনে তিনটে বুয়া রেখেছে।সুমনার সংসারে সুমনাই সব সেক্রিফাইস করতো, এডজাস্ট করে চলতো। কিন্তু রিতার সাথে সংসারে জহির সেক্রিফাইস করে, এডজাস্ট করে চলে।
বিয়ের ছয় মাস চলছে জহির আর রিতার। এই ছয় মাসে রিতাকে মাথায় করে রেখেছে জহির। কিন্তু ভুলে গিয়েছে তার প্রথম স্ত্রী আর সন্তানদের কথা।
অন্তরঙ্গ মুহুর্ত কাটিয়ে বিছানায় উদাম গায়ে শুয়ে আছে জহির। আর তার উন্মুক্ত বুকে মাথা দিয়ে রেখেছে রিতা। হুট করেই রিতা বলল,” আমরা কতদিন ভাড়া বাসায় থাকব জহির?”
” আর একটা বছর কষ্ট করো জান। ফ্লাট বুকিং দিয়ে দিয়েছি।”
” কিন্তু আমি নতুন ফ্লাটে থাকতে চাই না। আমি তো এখনকার বাসাটাতেই থাকতে চাই,যেখানে তোমার প্রথম বউ থাকছে।”
রিতার কথায় জহিরের হুট করেই সুমনা আর বাচ্চাদের কথা মনে পরলো। এই ছয়টা মাস সে একবারো তাদের খোজ নেয় নি। এমনকি ওরাও ফোন দেয় নি। বুকটা কেমন জানি করে উঠলো। সুমনা তো গৃহিণী। এই ছয় মাস কি করে সংসার চালিছে সে! মনটা মুহুর্তের মাঝে আনচান করে উঠলো তার।
জহিরকে চুপ থাকতে দেখে রিতা আবার বলে উঠল,” কি হলো চুপ করে আছো কেন? আমি ও বাসাতেই থাকব ব্যাস! এর বাহিরে আর কিছু বলতে চাই না।”
” রিতা বোঝার চেষ্টা করো। ও বাসাটা সুমনার হাতে গড়া। বাচ্চাদের স্মৃতি ওখানে। কি করে ওদের বের করে দিব? ওরা কোথায় যাবে? ”
” ওদের নতুন বাসা ভাড়া করে দেও।”
” এটা সম্ভব নয় রিতা। একটু বুঝদারের মতো কথা বলো! ওই বাসার প্রতিটা কোণা সুমনার হাতে গড়া। ও শুধু ওই বাসাটা আমার কাছে চেয়েছে। বাচ্চাদের আশ্রয়টা চেয়েছে।আর সবচেয়ে বড় কথা আমি তো তোমার কাছে আছি। ওদের ছেড়ে তোমার কাছে এসেছি। ওই সামান্য বাড়ি দিয়ে কি করবে। ওটা থাক না ওদের কাছে। আমি বনানীতে তোমার জন্য নতুন ফ্লাট কিনছি।”
এবার ক্ষেপে উঠলো রিতা। চোখ ভর্তি পানি এনে কাদতে কাদতে বলল,” ওটা সুমনার বাসা না এখন। ওটা আমার বাসা। ওখানেই আমি আমার সংসার গড়ব। তুমি যদি ওদেরকে ও বাসা থেকে বের না করো তাহলে আমি নিজেকে শেষে করে দিব জহির।” বলেই ফলের ঝুড়ি থেকে চাকু হাতে নিল।
রিতার এরূপ আচরণে ভরকে গেল জহির। বাধ্য হয়ে বলল,” ঠান্ডা হও জান৷ তুমি যা চাবে তাই হবে। তবু নিজের ক্ষতি করো না। তোমার কিছু হলে আমি বাচবো না জান।”
জহিরের কথায় খুশি হলো রিতা। সাথে সাথে হাতের ছুড়িটা ফেলে জড়িয়ে ধরলো জহির কে। তারপর বলল,” তোমাকে অনেক ভালোবাসি জহির। তুমি আমার সব।”
জহিরও রিতাকে বুকে আরও চেপে বলল,” আমিও তোমাকে ভালোবাসি জান।”
চলবে…
