#অবহেলার_দিনগুলি
#পর্ব_১
#ইলোরা_ফারদিন
“সুমনা, প্রতিদিনের এসব ঝগড়া ভালো লাগছে না। আমরা বরং আলাদা হয়ে যাই। আমার নিজেরও আর এই সংসারের প্রতি আর তেমন টান নেই। এমনকি তোমার প্রতিও না। তোমার কাবিনের টাকা পেয়ে যাবে। আর বাচ্চাদের ভরণপোষণের টাকাও আমি পাঠিয়ে দিব। আমি শুধু মুক্তি চাই এই সম্পর্কটি থেকে। দমবন্ধ লাগে এই সংসারে।” অফিস থেকে ফিরেই জহির কথাগুলো বলল
” রিতাকে কি বিয়ে করেছো নাকি করবে?” ম্নান হেসে জিজ্ঞেস করল সুমনা
” বিয়ে করি নি। কিন্তু পরের মাসেই করব।” নির্বিকার ভাবে উত্তর দিল জহির
” তাহলে তো ভালোই। যাই হোক, তোমার আর তোমার হবু স্ত্রীর জন্য শুভকামনা। কিন্তু জানোতো জহির, আমার জীবনের প্রথম আর একমাত্র পুরুষ তুমি। বিয়ের আগে নিজেই নিজেকে কথা দিয়েছিলাম যে তুমি ব্যতীত আমার জীবনে অন্য কোনো পুরুষ আসবে না। তাই আমি তোমাকে ডিভোর্স দিতে পারব না।
মনে করো না যে তোমাকে আমি ২য় বিয়েতে বাধা দিব। একদমি না। আমি তোমাকে জোর করে আটকে রাখতে চাই না। যে পাখি আগেই নিজের নীড় ছেড়ে উড়ে গিয়েছে, তাকে আবার জোর করব কি করে। কিন্তু তুমি আমার সন্তানদের পিতা। আমি চাই না তারা তাদের বাবা থেকে আলাদা হোক।
যেহেতু এই বাসাটা আমার হাতে সাজানো। এই সংসারটা আমার হাতে গড়া, এখানে আমার সন্তানদের বেড়ে ওঠা, তাই অনুরোধ করব তুমি তোমার নতুন স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা বাসায় থেকো। আর আমাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়ার দরকার নেই। এখানে আসারও দরকার নেই। সন্তানদের দেখতে মন চাইলে এসো, বাধা দিব না। তোমার জীবনে আমি কখনোই বাধা হয়ে দাড়াবো না। তুমি নিজের মতো ভালো থেকে নিজের নতুন ভালোবাসার মানুষটির কাছে। কিন্তু আমার কাছে ডিভোর্সের আশা করো না। এটা আমি তোমাকে দিতে পারব না।” বলেই সুমনা গেস্ট রূমে চলে গেল।
আজকাল সে আর নিজের বেড রুমে ঘুমোয় না। জহিরও বাসায় খুব একটা থাকে না। তার রাত কাটে প্রেমিকা রিতার বাসায়। মাঝে মাঝে যখন আসে, জহির একাই বেড রুমে ঘুমোয়।
সুমনার কথায় তব্দা খেল জহির। বারো বছরের সংসার তাদের। কত ভালো খারাপ পরিস্থিতি এক সাথে পার করেছে, তার হিসেব নেই। দুটো সন্তানও আছে তাদের। ভালোবাসার কমতি ছিল না। কিন্তু তিন বছর আগে কিভাবে যেন তার অফিসের জুনিয়র কলিগ রিতার মায়ায় আটকে গেল। প্রথমে নিজেকে আটকানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু পারে নি। রিতার মোহে সে এমন ভাবে ফেসে গেল, সুমনাকে আর ভালো লাগতো না। সুমনার সব কিছুই বিরক্তিকর মনে হতো।
প্রথম প্রথম জহির আর রিতা অন্য সব সিনিয়র জুনিয়র কলিগের মতোই ছিল। ধীরে ধীরে তাদের মাঝে বন্ধুত্বের সৃষ্টি হয়। তারপর রিতার বিভিন্ন সমস্যায় জহির ওকে মানসিক সাপোর্ট দিত। অন্যদিকে রিতাও জহিরকে মানসিক সাপোর্ট দিত। সুমনা সংসার বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত থাকায়, জহির রিতার দিকে আরো ঝুকে পরে। এরপর দুজনের মাঝে একটি কম্ফোর্ট জোন তৈরি হয়, মানসিক নির্ভরতা তৈরি হয়। বিষয়টা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে রিতার সাথে কথা না বললে জহিরের দম বন্ধ লাগতো। মানসিক নির্ভরতার জায়গা থেকে তারা আরও কাছাকাছি আসে। এরপর নিজেদের সীমা ভুলে ইন্টিমেট হয়। কিন্তু এসবে একবারো মনে পরে নি তার স্ত্রীর কথা যে কিনা নিজের সব টুকু দিয়ে তার সংসার সামলাচ্ছে, তার সন্তানদের লালন পালন করছে। এই সংসার গোছাতে গিয়েই তো সুমনা নিজের স্বপ্ন, নিজের রূপ, ক্যারিয়ার সব বিসর্জন দিয়েছিল। জহির যখন অন্য নারীর বিছানায় আনন্দ করছিল, সে সময় সুমনা নিজের বাচ্চাদের হোম ওয়ার্ক করাতে-স্বামীর পছন্দের রান্না করতে ব্যাস্ত ছিল।
জহিরের পরিবর্তনগুলো অবশ্য সুমনার চোখে আগেই পরেছিল। কম ঝগড়া হয় নি এসব নিয়ে। রাতের পর রাত সুমনা কান্না করতো। কিন্তু তার এসব বিরক্ত লাগতো। তার কাছে তার মানসিক শান্তির জায়গা ছিল রিতা। ধীরে ধীরে রিতার সাথে সম্পর্ক গভীর হতে লাগলো। তারপর শুরু হলো বিদেশ ভ্রমণ। বাসায় যে বউ বাচ্চা আছে নিমিষেই ভুলে গেল সে। রিতার চিকন ফিগার, সুন্দর চেহারা, মন ভুলানো কথা সব কিছুতে যেন পাকাপাকিভাবে আটকে গেল জহির। সুমনাকে আর নিজের যোগ্য মনে হতো না। সুমনা অনেক চেষ্টা করেছে জহিরকে ফিরিয়ে আনার। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। জহিরের চোখে সুখ মানেই রিতা। রিতাকে ছাড়া তার ইদানীং নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। কেমন যেন আদুরে বাচ্চা মেয়ে একটা। আর নিজের ঘর-সংসার-স্ত্রী-সন্তানকে আজাব মনে হতো। তাইতো ধীরে ধীরে বাসায় আসাও কমিয়ে দিল।
জহির চলে গিয়েছে। সুমনা জানে জহিরের ঠিকানা এখন রিতা। রিতা যখন শুনবে সুমনা ডিভোর্স দিতে চায় না, নির্ঘাত অভিমান করবে। জহিরও আদর করে, দামি গিফট দিয়ে সেই অভিমান ভাঙাবে। কিন্তু সুমনা এও জানে জহির তার কথা ফেরাবে না। রিতা অবশ্য আত্মহত্যার নাটকও করতে পারে। কিন্তু জহির তাকে কোনো না কোনো ভাবে মানিয়ে নিবেই।
জহির আর রিতার বিয়ে হয়েছিল পারিবারিক ভাবেই। জহির ছোট্ট একটি চাকরি করত। বেতন কম। অভাবের সংসার। সেই অভাবের সংসারটাকেই আপন করে নিল সুমনা। তারপর ধীরে ধীরে জহিরের বেতন বাড়লো। পরিবর্তন হলো অবস্থানে। দুটি সন্তান আসলো কোলজুড়ে। কত পরিকল্পনা তাদের এই দুই সন্তানকে নিয়ে। কিন্তু ধীরে ধীরে সুমনা লক্ষ্য করলো জহির পরিবর্তন হচ্ছে। আগে যে মানুষটা অফিস করে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতো, সে আজকাল দেরি করছে। মাঝে মাঝে বাহির থেকে রাতের খাবার খেয়ে আসছে। যেই মানুষটা আগে বাচ্চাদের মুখ না দেখে ঘুমোতে পারতো না, সেই মানুষ টা এখন দিব্বি এক সপ্তাহ বাচ্চাদের মুখ না দেখেই কাটিয়ে দেয়। তারপর ধীরে ধীরে অফিসিয়াল ট্যুরের নামে শুরু হলো জহিরের বাহিরে রাত কাটানো। এক সপ্তাজ দুই সপ্তাহ গায়েব থাকতো সে। এমনকি সুমনা আর জহিরের মাঝে স্বাভাবিক স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কটাও ছিল না। বাসায় এসে জহির হয় ঘুমিয়ে পরতো, আর নাহয় ফোনে ব্যস্ত থাকতো।
একদিন সুমনা সুযোগ বুঝে জহিরের ফোন হাতে নেয়। এরপর ভালোভাবেই বুঝে যায় তাদের সম্পর্কের মাঝে তৃতীয় ব্যক্তি এসেছে।
এমনকি রিতা জহিরের কাছে সুমনা আর জহিরের দাম্পত্য জীবনেরও জবাব দিহিতা চেত। একটি ম্যাসেজ এমন ছিল যেখানে রিতা লিখেছে,” তুমি কি আজ সুমনার সাথে শা*রীরিক সম্পর্ক করেছে? শুনো জহির, তুমি যদি ওকে স্পর্শ করো আমি কিন্তু সুই*সাইড করব। আমি তোমাকে কারো সাথে সহ্য করতে পারি না জহির, তুমি জানো। তুমি পুরোটাই আমার।”
” না জান, আমি ওকে স্পর্শ করি নি। বিশ্বাস না হলে ভিডিও কল দিই। আমি পুরোটাই তোমার। কথা দিচ্ছি।”
জহির আর রিতার ম্যাসেজ গুলো পরে সুমনার গা গুলিয়ে এসেছিল। এই মানুষটার সাথে তার বারোটা বছরের সংসার। কি করে পারলো এভাবে প্রতারণা করতে। তাদের সম্পর্ক কি এতোটাই ভঙ্গুর যে তাদের দাম্পত্য জীবনে আরেক নারী নাক গোলাচ্ছে। এরপর এই বিষয় নিয়ে জহির আর সুমনা নিয়মিত ঝগড়া হতো। সুমনা কত জহিরের পা ধরে কেদেছে তার হিসেব নেই। নিজের সংসার বাচাতে অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। শেষে সুমনা একেবারেই নিরব হয়ে যায়, অপেক্ষায় থাকে জহির শেষ পর্যন্ত কাকে বেছে নিবে।
সুমনা আকাশের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য হেসে বলে,” আমি যেদিন থেকে চুপ হয়েছি জহির, সেদিন থেকেই তোমার নাম ধ্বংসের খাতায় লিখা হয়ে গিয়েছে। অপেক্ষা শুধু সময়ের। আমাকে অবলা ভেবে বড্ড বেশি ভুল করে ফেলেছো।
চলবে…
