#অবহেলার_দিনগুলির
#পর্ব_৩
#ইলোরা_ফারদিন
“আমি আর রিতা এ বাসায় শিফট হতে চাচ্ছি সুমনা। তোমাকে আর বাচ্চাদের নতুন বাসা ভাড়া নিয়ে দিব।” মাথা নিচু করে বলল জহির
জহিরের কথায় অট্টস্বরে হেসে উঠলো সুমনা। তারপর বলল,” এই একটা জিনিসই তো চেয়েছিলাম জহির, এটাও দিতে পারলে না? আচ্ছা আমাদের যে এতো বছরের সংসার ছিল, সামান্যতম সম্মান কি নেই আমাদের সংসারটির প্রতি? ভুলে গিয়েছ যখন শূন্য পকেটে ছিলে, তখন একটু একটু করে আমি এই সংসার গুছিয়েছিলাম। নিজের শখ আহ্লাস বিসর্জন দিয়ে আমি ব্যংকে টাকা রাখতাম এই বাসাটা বানানোর জন্য। আজ তুমি আমাকে আমাদের সন্তানদেরকে আশ্রয়হীন করতে চাচ্ছ? আমাদের মাথার উপরের ছাদ কেড়ে নিতে চাচ্ছ? রিতার ভালোবাসায় এতোটাই পাগল হয়েছো যে নিজের সন্তানদের মুখটাও চোখের সামনে আসে না? ওরা তো তোমারি অংশ জহির।”
নিজের মাথা নিচু করল জহিল। কিছু বলার নেই তার। সত্যি সুমনা বা বাচ্চাদের প্রতি সে কোনো টান অনুভব করে না। সে এখন শুধুমাত্র রিতার। তবু আমতা আমতা করে বলল,” আমি তো বলেছি তোমাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব আমার। এতো কাহিনী করার কি আছে। আর এ বাসাটা যেহেতু আমার, আমি কেন বাহিরে ভাড়া বাসায় থাকব।”
” ভরণপোষণের দায়িত্ব সত্যি নিয়েছো? কিন্তু এই ছয় মাসে এক টাকাও তো সংসারে দাও নি। একবারও কি মনে হয় নি যে সুমনা তো গৃহিণী। ও কিভাবে সংসার চালাচ্ছে। একটি বারও খোজ নেও নি। ছয় মাস ধরে নিজের বাচ্চাগুলোর মুখটা দেখারও প্রয়োজন বোধ করো নি। তুমি কু স্বামীর পাশাপাশি কু পিতাও জহির।
যাই হোক। আমাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব তোমাকে নিতে হবে না। আর না বাসা ভাড়া লাগবে আমাদের। কারণ তোমার প্রিয় দ্বিতীয় স্ত্রী বিষয়টি মেনে নিবে না। সে আবার তোমাকে আত্মহ*ত্যার হুমকি দিবে। তাই দরকার নেই। আমাদের টা আমরা বুঝে নিব। চা টা শেষ করও। এরপর আর কোনোদিন আমার হাতের চা খেতে পারবে না।”
জহিরও আর কিছু না বলে চা টা খেল। কিন্তু সোফা থেকে দাড়াতে যাবে তার আগের মাথাটা চক্কর দিল তার। তারপর চোখের সামনে সব অন্ধকার।
জহির যখন চোখ খুললো তখন সে বিছানায় শোয় তার সামনে বসে আছে সুমনা। হাতে সেলাইন লাগানো।
জহিরকে চোখ খুলতে দেখেই সুমনা বলল, ” মাথা ঘুরে পরে গিয়েছিলে। ডাক্তার এসেছিল। বলেছে স্ট্রেসের কারণে হয়েছে। তাই সেলাইন দিয়েছে।
আর তোমার ২য় স্ত্রী বার বার ফোন দিচ্ছে। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যাও।”
সুমনার কথা শুনে জহির তড়িঘড়ি করে তার ফোন হাতে নিল, দেখলো রিতার ৩০০+ মিসড কল। তা দেখে তাড়াতাড়ি সে দৌড়ে বের হয়ে গেল সে।
জহিরের যাওয়ার পথে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিল সুমনা। তার কাজ শেষ। এখন সময় এই সম্পর্ক থেকে মুক্তি পাওয়ার।
______________
আজ প্রায় এক মাস হলো জহির রিতা কে নিয়ে জহিরের বাসায় এসেছে। সুমনা পরের দিনই বাচ্চাদের নিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল। সুমনা আর যোগাযোগ করে নি। এদিকে জহিরও যোগাযোগের চেষ্টা করে নি। হুটহাট বাচ্চাদের কথা মনে পরলেও রিতা থেকে পাওয়া সুখের কাছে তা নগন্য। এসব কথা ভাবতে ভাবতে ফেসবুক স্ক্রল করছিল জহির। কিন্তু হুট করে তার চোখ আটকালো দশ মিনিট আগে পোস্ট করা একটি পোস্টের দিকে। পোস্টটি করেছে সুমনারি এক ফ্রেন্ড যে একটি বড় মাল্টিন্যাশনাল কম্পানিতে। ছবিটি একটি অফিস ট্যুরের, রাঙামাটিতে। কিন্তু সেখানে সুমনা আর বাচ্চাদের দেখে চমকে গেল জহির। আরেকটি ছবিতে সুমনা তার ছেলে কলিগদের সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। সব চেয়ে বড় কথা সুমনাকে তাতের নীল শাড়িতে বেশ সুন্দর লাগছে। জহিরের কেন জানি বিষয়টা সহ্য হচ্ছে না। তাই সে সাথে সাথেই কল দিল সুমনাকে।
জহির কল দিতেই সুমনা রিসিভ করলো। জিজ্ঞেস করলো,
” হ্যা, বলো। এতোদিন পর কি মনে করে?”
” তুমি আমার অনুমতি ছাড়া কোন সাহসে রাঙামাটি গিয়েছ সুমনা? যেয়ে আবার পর পুরুষদের সাথে ঢলাঢলি করছো?” রাগান্বিত স্বরে বলল জহির
” অনুমতি নেয়ার মতো সম্পর্কটা কি আছে আমাদের জহির? আর তুমিও তো অফিসিয়াল ট্যুরে যেতে, কতবার আমার পারমিশন নিয়েছো? অবশ্য সেগুলো অফিসিয়াল ট্যুর কম, তোমার প্রি ওয়েডিং হানিমুন ছিল। যাগ গে, যা বলার তাড়াতাড়ি বলো। আমি ব্যস্ত আছি।”
” তুমি জব করছো? আমাকে জানিয়েছো? তোমাদের যা লাগবে আমাকে বললেই তো হতো।”
” তাই নাকি? আচ্ছা বলো তো জহির, এই সাত মাসে আমাদের ভরণপোষণের জন্য কত টাকা দিয়েছো। এই যে আমাকে আর আমাদের সন্তানদের বাসা থেকে বের করে দিলে, একবার খোজ নিয়েছিলে যে কোথায় যেয়ে আশ্রয় নিয়েছি? নাকি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি। নাও নি তো। তাহলে এখন কোন মুখে জিজ্ঞেস করছো যে আমি কেনো চাকরি করছি। তুমি কি চেয়েছিলে তোমার আশায় আমরা না খেয়ে মরব? ”
সুমনার প্রশ্নের জবাব নেই জহিরের কাছে। চুপ করে থাকলো সে।
এদিকে জহিরকে চুপ থাকতে দেখে সুমনা আবার বলল,” শুনো, কাল তোমার বাসায় আইনি নোটিশ যাবে। আমাদের ডিভোর্সের। বাচ্চাদের ভরণপোষণের জন্য আমি এককালীন ১৫ লক্ষ টাকা আর আমার কাবিনের পাচ লক্ষ টাকা রেডি রেখো। যদি ঝামেলা করতে চাও তাহলে মামলা কোর্টে উঠবে। তখন তোমার আর রিতার মান সম্মান থাকবে কিনা ভেবো।”
সুমনার কথায় গা জ্বলে উঠলো জহিরের। সুমনার মতো মেয়ে নাকি তাকে ডিভোর্স দিবে। তাচ্ছিল্য হেসে বলল,” তুমি না বলেছিলে আমাকে সারাজীবন স্বামী হিসেবে চাও, তাহলে এখন ডিভোর্সের এতো তাড়া কেনো? নতুন কাউকে পেয়েছো বুঝি।”
” ভুল ছিলাম আমি। তোমার মতো কাপুরুষ প্রতারকের জন্য নিজের জীবন নষ্ট করা বোকামি। আর কি করেছো আমার জন্য তুমি যে আমি সারাজীবন তোমার জন্য অপেক্ষায় থাকবে। আমার সাথে প্রতারণা করেছে, আমার বিশ্বাস ভেঙেছ, সন্তানদের অবহেলা করেছে, আমাদের আশ্রয় কেড়ে নিয়েছো। এখন কোন মুখে এসব কথা বলো? লজ্জা করে না? সে যাই হোক, আমি ব্যস্ত। বাকি কথা উকিলকে সাথে নিয়ে হবে।” বলেই ফোনটা রেখে দিল সুমনা।
অন্যদিকে জহির অবাক হলো। কেন জানি তার বুকটা ভাড় লাগছে। কই আগে যখন সে নিজে সুমনাকে তালাক দিতে চেয়েছিল, তখন তো এরকম লাগে নি। তাহলে এখন কেন???
চলবে…
