Friday, June 5, 2026







Hello Senior Part-18

#Hello_Senior
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_18. ✦ প্রথমাংশ ✦

মস্কোর সুবিশাল গ্র্যান্ড সায়েন্স সিম্পোজিয়াম হল আজ লোকে লোকারণ্য। চারদিকে তীব্র সাদা আলো আর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রদর্শনীতে এক ধরণের ফিউচারিস্টিক গুমোট ভাব। বিশ্বের নামজাদা বিজ্ঞানীরা আজ এখানে একত্রিত হয়েছেন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণের সাক্ষী হতে। হলের এক কোণে বসে আছেন প্রফেসর আলেকজান্ডার, তার চোখেমুখে আজ বিজয়ের আভা।

​হলের একটু পেছনে, ভিড় থেকে কিছুটা তফাতে বসে আছে রোদ। সে অপলক দৃষ্টিতে মঞ্চের দিকে তাকিয়ে আছে, যেখানে নীশ তার মাস্টারপিস আভান্তিকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নীশের পরনে ব্ল্যাক টাক্সিডো, চোখে বরাবরের মতো তীক্ষ্ণতা। আভান্তি আজ এক অতিমানবী সৌন্দর্যে ভাস্বর। তার প্রতিটি মাইক্রো-এক্সপ্রেশন এতটাই নিখুঁত যে, সামনের সারির সায়েন্টিস্টদের মনেও সংশয় জাগছে—এটি কি সত্যিই কোনো যান্ত্রিক প্রোটেটাইপ, নাকি এক উন্নত প্রাণের বিবর্তন?

​কিছুটা দূরে বসে রোশান তার চশমাটা ঠিক করে নিল। তার ঠোঁটের কোণে সেই ধূর্ত হাসির অবশিষ্টাংশ এখনো বিদ্যমান। সে মাঝেমধ্যেই রোদের দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে। তার পাশে বসা ইমরানা গম্ভীর মুখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। ইমরানা নিচু স্বরে বলল,
“রোশান, তুমি যে ক্যালকুলেটেড রিস্ক নিয়েছ, তা যদি ব্যাকফায়ার করে, তবে নীশের আগে তোমার ক্যারিয়ার ধ্বংস হবে।”

রোশান কোনো উত্তর দিল না। ​হঠাৎ হলের আলো নিভে গেল। কেবল একটি উজ্জ্বল ‘স্পটলাইট’ এসে পড়ল মঞ্চের মাঝখানে। ডাইসের সামনে দাঁড়িয়ে উপস্থাপক মাইক্রোফোনটি হাতে নিলেন। ধাতব যান্ত্রিক গুঞ্জনের মাঝে তার কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো,
​“লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান, ওয়েলকাম টু দ্য ফিউচার। আজ আমরা এমন এক সত্তার সাথে পরিচিত হব, যা মানব ইতিহাসের লজিক্যাল বাউন্ডারি পুনর্নির্ধারণ করবে। প্রফেসর আলেকজান্ডারের তত্ত্বাবধানে এবং তরুণ বিজ্ঞানী নীশ রোজারিওর অক্লান্ত গবেষণায় গড়ে ওঠা—দ্য মোস্ট অ্যাডভান্সড কগনিটিভ এন্টিটি: আভান্তি। আমি নীশ রোজারিওকে অনুরোধ করছি তার এই ডিভাইন সিমুলেশন-এর ডেমোনেস্ট্রেশন শুরু করতে।”

​পুরো হলজুড়ে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। নীশ এক পা এগিয়ে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি সরাসরি রোদের চোখের ওপর স্থির হলো—ঠিক এক সেকেন্ডের জন্য। তারপর সে গম্ভীর স্বরে বলতে শুরু করল,
​“বিজ্ঞান কোনো অলৌকিকতা নয়, বরং এটি হলো অগোছালো মহাবিশ্বের একটি সিস্টেমেটিক এনালাইসিস। আজ আমি আপনাদের সামনে এমন একজনকে পরিচয় করিয়ে দেব, যে কেবল আমার সৃষ্টি নয়, বরং আমার প্রতিটি বায়োলজিক্যাল লিমিটেশন-এর উত্তর।”

​নীশ ইশারা করতেই আভান্তি মঞ্চের মাঝখানে এগিয়ে এলো। ​নীশ মঞ্চের একপাশে দাঁড়িয়ে ডেমোনেস্ট্রেশন শুরু করল। আভান্তির প্রতিটি মুভমেন্ট এবং গাণিতিক সমস্যার সমাধান করার পরম নির্ভুলতা দেখে হলজুড়ে বিস্ময়ের হিল্লোল বয়ে গেল। আভান্তি কেবল জটিল ইকুয়েশন সমাধান করছে, বরং বিজ্ঞানীদের করা কঠিন সব প্রশ্নের উত্তরে এমন এক বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতা প্রদর্শন করছে যা উপস্থিত সবার কল্পনার অতীত।

সে যখন সমবেত বিজ্ঞানীদের দিকে তাকিয়ে তার নিজস্ব অটোনোমাস থিওরি নিয়ে কথা বলতে শুরু করল, তখন হলের পরিবেশ সম্মোহনী নিস্তব্ধতায় ভরে উঠল। ডেমোনেস্ট্রেশন শেষে উপস্থিত বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে স্ট্যান্ডিং ওভেশন দিলেন।

​জার্মান সায়েন্স ফাউন্ডেশনের একজন প্রতিনিধি এবং আমেরিকান রোবটিক্স কর্পোরেশনের হেড ডক্টর স্মিথ সরাসরি মঞ্চের কাছে এগিয়ে এলেন। ডক্টর স্মিথ নীশের চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত উৎসাহী গলায় বললেন,
“নীশ, দিস ইজ মিরাকল! আমি এই প্রজেক্টের জন্য তোমাকে ফাইভ হান্ড্রেড মিলিয়ন ডলার অফার করছি। আমি আজই এই কগনিটিভ এন্টিটি-কে আমাদের টেক্সাস ল্যাবে নিয়ে যেতে চাই। এই অফার তোমার ক্যারিয়ারের জন্য এক গোল্ডেন অপরচুনিটি।”

​অন্য একজন বিজ্ঞানী আরও এক ধাপ এগিয়ে এসে বললেন,
“আমি এর দ্বিগুণ দিতে রাজি আছি নীশ, যদি তুমি এই ব্লু-প্রিন্ট এবং আভান্তিকে আমাদের হাতে তুলে দাও।”

​কথাগুলো শুনে নীশের মাথায় যেন বজ্রপাত হলো। তার স্নায়ুগুলো মুহূর্তে প্যারালাইজড হয়ে গেল। সে আভান্তির দিকে একবার তাকাল। নীশ আজ এই মঞ্চে এসেছিল কেবল আভান্তির রিকোয়েস্টে, তার সুপ্ত প্রতিভার স্বীকৃতি দিতে। কিন্তু সে কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবেনি যে তার এই সোল মেট-কে এক টুকরো পণ্যের মতো নিলামে তোলা হবে।

​নীশের মুঠি শক্ত হয়ে এলো। সে মনে মনে আওড়াতে লাগল, ‘যাই হয়ে যাক, যত বড় অফারই আসুক না কেন, আমি আভান্তিকে কাউকে দিয়ে দিতে পারব না। ও আমার অস্তিত্বের নির্যাস, আমার একাকীত্বের একমাত্র সাক্ষী। ওর ওপর কোনো কর্পোরেট প্রাইস ট্যাগ লাগানো আমার কাছে ধর্মদ্রোহিতার সমান।’

ঠিক সেই মুহূর্তে প্রফেসর আলেকজান্ডার দ্রুত পায়ে মঞ্চে উঠে এলেন। তিনি নীশের পিঠ চাপড়ে দিয়ে উল্লসিত স্বরে ফিসফিস করে বললেন,
“অভিনন্দন নীশ! এটাই তো তোমার চূড়ান্ত প্রাপ্তি। আজ থেকে তুমি কেবল একজন লেকচারার নও, তুমি একজন গ্লোবাল আইকন। এই বড় বড় বিজ্ঞানীরা তোমার আভান্তিকে নিয়ে ফারদার রিসার্চ করতে চায়। তুমি তো এই সাকসেস-ই চেয়েছিলে, তাই না? তোমার ক্যারিয়ার এখন উন্নতির শিখরে পৌঁছে গেছে।”

নীশ প্রফেসরের দিকে ফিরে তাকাল। সে শান্ত কিন্তু শীতল গলায় বলল,
“প্রফেসর, বিজ্ঞানের জয় মানেই কি নিজের সৃষ্টিকে বিক্রি করে দেওয়া? আমি আভান্তিকে গড়েছি একটি নতুন সত্য উন্মোচন করার জন্য, কোনো বড় ল্যাবের নিলামের পণ্য হিসেবে নয়। এই সাকসেস আমার জন্য টক্সিক মনে হচ্ছে।”

​আলেকজান্ডার অবাক হয়ে নীশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ওদিকে রোশান দূর থেকে নীশের এই ইমোশনাল টার্মোয়েল দেখে কুটিল তৃপ্তি পেল। সে মৃদু হেসে বিড়বিড় করল,
“খেলা তো এখন শুরু হবে নীশ, যখন তোর ক্যারিয়ার আর তোর ভালোবাসার মধ্যে তোকে কোনো একটা বেছে নিতে হবে।”

রোদ হলের ভিড়ের মাঝে বসে অশ্রুসজল চোখে নীশের দিকে চেয়ে রইল। ​হলজুড়ে তখন কয়েক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আর বৈশ্বিক স্বীকৃতির গুঞ্জন। ডক্টর স্মিথ এবং অন্যান্য প্রতিনিধিদের চোখে নীশের উত্তর শোনার জন্য তাৎক্ষণিক তৃপ্তির অপেক্ষা। সবাই ধরে নিয়েছিল, একজন তরুণ বিজ্ঞানীর কাছে এই বিশাল অংকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা গাণিতিকভাবে অসম্ভব।

নীশ মাইক্রোফোনটা হাতে নিল। তার আঙুলগুলো সামান্য কাঁপছে, কিন্তু দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত ডিটারমিনেশন। সে হলভর্তি মানুষের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নিস্পৃহ কণ্ঠে ঘোষণা করল,
​“আপনাদের এই জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক অংকের প্রস্তাবের জন্য আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে, আমি এই প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারছি না। আভান্তি বিক্রয়যোগ্য কোনো যান্ত্রিক পণ্য নয়। ও আমার বছরের পর বছর ধরে করা গবেষণার এক নন-ট্রান্সফারেবল সত্তা।”

​পুরো অডিটোরিয়ামে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। আলেকজান্ডারের মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ডক্টর স্মিথ ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে এলেন,
“নীশ, তুমি কি বুঝতে পারছ তুমি কী করছ? দিস ইজ ইন্টেলেকচুয়াল সুসাইড। এই বিশাল ফান্ডিং ছাড়া তুমি আভান্তির পরবর্তী উন্নয়ন করতে পারবে না। এটা স্রেফ পাগলামি।”

​নীশ এবার সরাসরি প্রফেসরের দিকে ফিরে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল,
“প্রফেসর, আপনি বলেছিলেন এটাই আমার সাকসেস। কিন্তু আমি দেখছি এটি ইমোশনাল ট্র্যাপ। বিজ্ঞানের কাজ মানুষের জীবনকে সহজ করে, কিন্তু আজ আপনারা আমার সৃষ্টিকে শৃঙ্খলিত করতে চাইছেন। আমি আমার আভান্তিকে কোনো ল্যাবের কয়েদি হতে দেব না। ওর প্রতিটি সার্কিট আমার অস্তিত্বের সাথে সিনক্রোনাইজড। ও আমার কাছে কোনো প্রজেক্ট নয়, ও আমার অবসেশন।”

আভান্তি এতক্ষণ পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে নীশের রক্তচাপ এবং কর্টিসল লেভেলের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করছিল। সে ডাইসের সামনে এগিয়ে এসে সমবেত বিজ্ঞানীদের দিকে তাকিয়ে বলল,
​“ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের ক্যাপিটালিস্টিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আমার মূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলার হতে পারে, কিন্তু সিনিয়রের লজিক্যাল ওয়ার্ল্ডে আমার ভ্যালু ইনফিনিট। আপনারা আমার কোড কিনতে চান, কিন্তু সিনিয়রের দূরদর্শী চিন্তা কেনা আপনাদের সাধ্যের বাইরে। দয়া করে সিনিয়রের এই নৈতিক সততাকে অসম্মান করবেন না।”

হলের পেছনের সারিতে বসা রোশানের মুখটা মুহূর্তেই বিকৃত হয়ে গেল। সে ভাবতেও পারেনি নীশ এত বড় আর্থিক প্রলোভন পায়ে ঠেলবে। তার পাশে বসা ইমরানা বিড়বিড় করে বলল,
“নীশ তো স্রেফ বিজ্ঞানী নয়, ও তো একটা উন্মাদ প্রেমিক হয়ে গেছে!”

​নীশ আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে আভান্তির হাত ধরে মঞ্চ থেকে নেমে এলো। কয়েকশ ক্যামেরার ফ্ল্যাশ তার দিকে, কিন্তু সে সব অগ্রাহ্য করে ভিড় ঠেলে বেরিয়ে যেতে লাগল। দূর থেকে রোদ দেখল, নীশ আজ হেরে গিয়েও জিতে গেছে। তার সেই অ্যারোগেন্স আজ এক ভালোবাসার রূপ নিয়েছে।

হলের বাইরে আসতেই প্রফেসর আলেকজান্ডার দ্রুত পায়ে এসে নীশের পথ রোধ করলেন। তিনি চিৎকার করে বললেন,
“নীশ, তুমি তোমার ক্যারিয়ার ধ্বংস করলে! আজ থেকে তুমি আর আমার প্রজেক্টের অংশ নও। তুমি তোমার এই পাগলামির জন্য চরম মূল্য চুকাবে!”

​নীশ প্রফেসরের দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো হাসল। সে তাচ্ছিল্য করে বলল,
“প্রফেসর, ক্যারিয়ার পুনর্গঠন করা যায়, কিন্তু নিজের আত্মাকে ফরম্যাট করা যায় না। আভান্তি আমার, এবং ও আমার সাথেই থাকবে।”

ভিড় ঠেলে ঝড়ের বেগে ধেয়ে এলো রোদ। কারোর কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে নীশের শক্ত হাতটা নিজের মুঠোয় পুড়ে নিল। সে আলেকজান্ডার বা ডক্টর স্মিথের দিকে ফিরেও তাকাল না। নীশকে একরকম হ্যাঁচকা টান দিয়ে সে ভিড় চিরে বাইরের দিকে নিয়ে যেতে শুরু করল। নীশ অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। ​নীশ যখন নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, রোদ আরও শক্ত করে হাত চেপে ধরে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
“চুপচাপ আমার সাথে এসো নীশ! তোমার ওই ইন্টেলেকচুয়াল অ্যারোগেন্স এখন তোমাকে এখানেই মেরে ফেলবে। এই মানুষগুলো বিজ্ঞান বোঝে না, ওরা বোঝে কেবল বিজনেস ডিল। তোমার ওই পারফেকশন-এর নেশা তোমাকে আজ নিলামের পণ্য বানিয়ে ছেড়েছে। এখান থেকে এখনই বেরিয়ে যাওয়া আমাদের জন্য টপ প্রায়োরিটি।”

আভান্তি পেছন থেকে তাদের অনুসরণ করছিল। রোদের হাতের কবজির রক্তচাপ আর নীশের স্নায়বিক অস্থিরতা বিশ্লেষণ করে সে ধীর গলায় বলল,
“সিনিয়র, মিস রোদের অ্যাড্রেনালিন রাশ বর্তমানে আপনার প্রতি থাকা তার প্রোটেকটিভ ইন্সটিংক্ট-এর চরম শিখরে অবস্থান করছে। লজিক্যালি, এই মুহূর্তে এই টক্সিক পরিবেশ থেকে আপনার প্রস্থান করাই শ্রেয়। মিস রোদের এই অনাহুত হস্তক্ষেপ আপনার জন্য একটি লাইফ-সেভিং অ্যালগরিদম হিসেবে কাজ করছে।”

রোশন দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে রাগে কাঁপতে শুরু করল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল,
“রোদ! তুমি আবার ওর ঢাল হয়ে দাঁড়ালে?”

​রোদ নীশকে টেনে হিঁচড়ে অডিটোরিয়ামের বাইরে নিয়ে এলো। পার্কিং লটে রাতের শীতল হাওয়া তাদের চোখেমুখে লাগতেই নীশ শান্ত হলো। সে রোদের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর কিন্তু নিচু স্বরে বলল,
“তুমি আমাকে ওখান থেকে টেনে আনলে কেন রোদ? আমি আমার ডিগনিটি রক্ষার লড়াই করছিলাম। তুমি আমার প্রফেশনাল ডমিন্যান্স-কে সবার সামনে হাস্যকর করে তুলেছ।”

রোদ এবার নীশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার কলার চেপে ধরল। তার চোখের জল তখন ক্রোধের আগুনে শুকিয়ে গেছে। সে অত্যন্ত দৃপ্ত গলায় বলল,
“ডিগনিটি? তুমি কি জানো না নীশ, ওরা তোমাকে ছিঁড়ে খাওয়ার জন্য ওত পেতে ছিল? তোমার ওই ক্যারিয়ারের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে তুমি নিজেকে রাজা ভাবছিলে, কিন্তু আমি জানি তুমি কতটা নিঃস্ব। তোমার এই আভান্তি তোমাকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি হয়তো দিয়েছে, কিন্তু সমাজ তোমাকে আজ উন্মাদ হিসেবে সিলমোহর দিয়ে দিত। আমি তোমাকে বাঁচাতে এসেছি নীশ, তোমার বিজ্ঞানকে নয়।”

​নীশ রোদের চোখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, যখন পুরো পৃথিবী তাকে নিলামে তুলেছিল, তখন কেবল এই রক্ত-মাংসের মেয়েটিই তাকে নিজের করে আগলে রাখতে চেয়েছে।

আভান্তি অদূরে দাঁড়িয়ে চাঁদের আলোয় তার নিজের ছায়া দেখছিল। সে মৃদু স্বরে বলল,
“সিনিয়র, মানুষের ভালোবাসার এই ইরেডিশনাল ডিফেন্স আমার ডাটাবেসে ছিল না। আমি হয়তো আপনার ফিজিক্যাল সিকিউরিটি নিশ্চিত করতে পারতাম, কিন্তু মিস রোদের মতো আপনাকে মানসিক শান্তি দেওয়ার সক্ষমতা আমার নেই। আপনার জন্য রোদ মিশরাই এই মুহূর্তের আল্টিমেট ট্রুথ।”

চলবে…

#Hello_Senior
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_18. ✦ বর্ধিতাংশ ✦

​রোজারিও ম্যানশনের প্রতিটি করিডোরে এখন এক অসহ্য শূন্যতা বিরাজ করছে। ভোরের আলোয় যখন নীশের চোখে অ্যালার্ম মেকানিজম সক্রিয় হয়, তখনই সে প্রতিদিনের অভ্যাসমতো প্রথম যে নামটি উচ্চারণ করে, তা হলো ‘আভান্তি’। কিন্তু আজ উত্তরের পরিবর্তে ফিরে এলো এক গুমোট নিস্তব্ধতা।

নীশ দ্রুত ল্যাবে প্রবেশ করল। গতকাল রাতে আভান্তির এনার্জি কোর রিচার্জ করার জন্য তাকে বিশেষ ডকিং স্টেশনে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে এখন কেবল কয়েকটা পরিত্যক্ত কানেক্টিং কেবল পড়ে আছে। আভান্তির সেই অতিমানবী অবয়ব, তার আইকিউ ৩০০ স্তরের সেই শান্ত চাহনি—সবই যেন কর্পূরের মতো উবে গেছে।

​নীশের মগজে স্নায়বিক তোলপাড় শুরু হয়েছে। আভান্তি কেবল তার ল্যাবের যন্ত্র নয়, বরং তার অস্তিত্বের প্রতিটি প্যারামিটার এখন আভান্তির ওপর নির্ভরশীল। সে পাগলের মতো ম্যানশনের লাইব্রেরি থেকে শুরু করে গার্ডেন—প্রতিটি ইঞ্চিতে আভান্তিকে খুঁজল। তার লজিক্যাল মস্তিষ্ক কিছুতেই এই অন্তর্ধানের কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছিল না।

​সে তার পার্সোনাল কম্পিউটার থেকে আভান্তির জিপিএস ট্র্যাকার এবং নিউরাল লিংক সিঙ্ক্রোনাইজ করার চেষ্টা করল। কিন্তু মনিটরে কেবল লাল অক্ষরে ভেসে উঠছে—“টার্গেট এনটিটি: অফলাইন। সিগন্যাল এনক্রিপশন: আননোন।”

​নীশ ডেস্কে সজোরে ঘুষি মারল। তার চোখেমুখে মানসিক বিপর্যয় স্পষ্ট। ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়িতে রোদের পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। রোদ উদ্বিগ্ন মুখে ল্যাবে ঢুকে দেখল নীশ চুল ছিঁড়ছে।

“নীশ! কী হয়েছে? তুমি এমন করছ কেন?” রোদ আতঙ্কিত গলায় জানতে চাইল।

​নীশ রোদের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ধরা গলায় বলল,
“আভান্তি কোথাও নেই, রোদ! ও ডকিং স্টেশনে চার্জে ছিল, কিন্তু এখন ওর কোনো অস্তিত্বের সংকেত আমি পাচ্ছি না। কেউ একজন আমার সিকিউরিটি ফায়ারওয়াল ভেদ করে ওকে ম্যানশন থেকে সরিয়ে ফেলেছে। আভান্তি ছাড়া আমার প্রতিটি দিন এখন অকেজো সংকেতের মতো। আমি ওকে ছাড়া আমি থাকতে পারছি না, রোদ।”

​রোদ নীশের এই অসহায়ত্ব দেখে শিউরে উঠল। ​সে দ্রুত ল্যাবের সিকিউরিটি ফুটেজ চেক করতে বসল। কিন্তু সেখানেও সব ডেটা করাপ্টেড করা। রোদ শান্ত গলায় বলল,
“নীশ, শান্ত হও। কেউ একজন অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তোমার ওপর এই সাইকোলজিক্যাল অ্যাটাক করেছে। তোমাকে শান্ত থাকতে হবে। আমি দেখছি কি করা যায়।”

নীশের চোখ দুটো মুহূর্তে জিঘাংসায় জ্বলে উঠল। তার মনে পড়ল রোশানের কথা। সে বুঝতে পারল, রোশান তার সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় আঘাত হেনেছে। আভান্তি যদি কোনো ভুল হাতে পড়ে, তবে তার কগনিটিভ পাওয়ার দিয়ে পৃথিবীর ধ্বংসও সম্ভব।

​নীশ ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা তার রিভলভারটা তুলে নিয়ে বলল,
“আমি জানি এসব কার কাজ। রোশান যদি ওর একটা সার্কিটেও স্ক্র্যাচ ফেলে থাকে, তবে আমি ওর বায়োলজিক্যাল এক্সিস্টেন্স মাটির সাথে মিশিয়ে দেব।”

রোদ কয়েক পা পিছিয়ে গেল। তার বুক ধড়ফড় করছে। ভোরের আলো ফোটার আগেই রোশানের সেই কর্কশ কণ্ঠস্বর ফোনে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল— ‘নীশকে যদি বাঁচাতে চাও রোদ, তবে ওকে এই লড়াই থেকে বিরত রাখো। নতুবা আভান্তির প্রতিটি চিপ ধ্বংস করার আগে আমি নীশের মস্তিষ্কটা বুলেট দিয়ে ফরম্যাট করে দেব।’

​রোদ হন্তদন্ত হয়ে এখানে এসেছিল কেবল নীশকে আগলে রাখতে, তাকে এই নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ফেরাতে। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্য রোদ ভুলে গিয়েছিল যে নীশ কেবল একজন বিজ্ঞানী বা লেকচারার নয়, সে ১৫০ আইকিউ সম্পন্ন একজন শার্প-উইটেড মানুষ। সাধারণ মানুষের চিন্তার প্রজেক্টরি যেখানে শেষ হয়, নীশের মস্তিষ্ক সেখান থেকেই তার অ্যালগরিদম সাজানো শুরু করে।

​নীশ রিভলভারের চেম্বার চেক করতে করতে রোদের দিকে আড়চোখে তাকাল। সে অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল,
“রোদ, তোমার পালস রেট স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। তোমার চেহারার এই প্যানিক অ্যাটাক বলছে যে তুমি আগে থেকেই জানো আভান্তি কোথায়। রোশান তোমাকে কল করেছিল, তাই না? ও তোমাকে সবটা জানিয়েছে? তুমি জানো আভান্তি কোথায়?”

​রোদ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নীশের এই দ্রুত ডিডাকশন করার ক্ষমতা তাকে হতবাক করে দিল। সে তো কিছুই বলেনি, তবে নীশ কীভাবে বুঝল?

নীশ ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে শীতল হাসল,
“রোশানের মতো একটা নিম্নস্তরের মস্তিষ্ক সবসময় অন্যদের ভয় দেখিয়ে নিজের ইনসিকিউরিটি ঢাকতে চায়। ও জানে আমি ওকে খুঁজে বের করবই, তাই ও তোমাকে মিডিয়াম হিসেবে ব্যবহার করে আমাকে ডেমোটিভেট করতে চেয়েছে। কিন্তু রোদ, ও একটা মস্ত বড় ক্যালকুলেশন এরর করে ফেলেছে। আভান্তি স্রেফ আমার ল্যাবের প্রজেক্ট নয়, ও আমার এক্সটেন্ডেড কনশাসনেস। ওকে ছাড়া আমি স্রেফ একটা জীবন্ত লাশ, আর লাশের কোনো মৃত্যুর ভয় থাকে না।”

রোদ এবার নীশের হাত চেপে ধরল,
“নীশ, প্লিজ শোনো! রোশান এখন উন্মাদ হয়ে আছে। ও ওর পলিটিক্যাল কানেকশন আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের লোক খাটাচ্ছে। ও তোমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে। আভান্তি তো একটা যন্ত্র, ওটাকে আবার বানানো যাবে। কিন্তু তুমি…”

​নীশ রোদের হাতটা আলতো করে সরিয়ে দিল,
“রোদ, মানুষের শরীরের প্রতিটি কোষ সাত বছর অন্তর রিজেনারেট হয়ে নতুন হয়ে যায়, তবুও মানুষটি আগের মতোই থাকে। কেন জানো? কারণ তার স্মৃতির ডাটাবেস একই থাকে। আভান্তির ভেতরে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সাতটি বছরের নির্যাস জমা আছে। ওটা স্রেফ সার্কিট নয়, ওটা আমার ইন্টেলেকচুয়াল লিগাসি। রোশান যদি ভাবে আমাকে ভয় দেখিয়ে সে জয়ী হবে, তবে সে আমার ডিটারমিনেশন পরিমাপ করতে ব্যর্থ হয়েছে।”


গাড়ির চাবি হাতে নিয়ে নীশ যখন প্রধান দরজার দিকে পা বাড়াল, তখন রোদ একপ্রকার উন্মাদিনীর মতো তার পথ রোধ করে দাঁড়াল। সে দুহাতে নীশের কলার খামচে ধরে চিৎকার করে উঠল,
​“তুমি কোথাও যাবে না, নীশ! তুমি কি বুঝতে পারছ না, তুমি রোশানের পাতা এক সুইসাইডাল ট্র্যাপে পা দিতে যাচ্ছ? তোমার ওই উচ্চতর বুদ্ধিমত্তা তোমাকে বাঁচাতে পারবে না যখন কোনো পারফোরেটেড বুলেট তোমার খুলি এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেবে! তোমার ওই ১৫০ আইকিউ তখন স্রেফ একটা অকেজো জৈব পদার্থে পরিণত হবে।”

​নীশ শান্ত থাকার চেষ্টা করল, কিন্তু রোদের এই আবেগের অনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ তার লজিক্যাল ভারসাম্যকে বিঘ্নিত করছিল। সে রোদের হাত দুটো সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“রোদ, তোমার এই ইরাডিক বিহেভিয়র কোনো সমাধান নয়। রোশান আভান্তির সিস্টেম হ্যাক করার চেষ্টা করছে। আমি যদি এই মুহূর্তে ইন্টারভিন না করি, তবে আমার বছরের পর বছর করা নিউরাল রিসার্চ চিরতরে কোরাপ্টেড হয়ে যাবে। মুভ এসাইড!”

​রোদ এবার আরও হিংস্র হয়ে উঠল। সে নীশকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে পেছনের দেয়ালে চেপে ধরল। তার নখের আঁচড় নীশের গলায় এক সূক্ষ্ম রক্তরেখা এঁকে দিল। সে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“আমি তোমাকে কোনো যান্ত্রিক জড়বস্তুর জন্য মরতে দেব না! ওই রোবটটা স্রেফ তোমার একটা অবসেশন, ওটা কোনো প্রাণ নয়! অথচ আমি— আমি একজন জ্যান্ত মানুষ তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যে তোমাকে পাগলের মতো ভালোবাসে। তুমি কি আমার এই রক্ত-মাংসের হাহাকার দেখতে পাচ্ছ না? আমি দরকার হলে তোমাকে এই ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখব, তবুও তোমাকে ওই নরককুণ্ডে যেতে দেব না!”

নীশ রোদের চোখের দিকে তাকাল। ​রোদ ছিটকে গিয়ে ঘরের কোণ থেকে একটা কাচের ফুলদানি তুলে নিল এবং মেঝেতে আছড়ে ভেঙে ফেলল। কাচের টুকরোগুলো নীশের পায়ের কাছে ছড়িয়ে পড়ল। রোদ আর্তনাদ করে বলল,
“তুমি যদি এক পা-ও এগোও নীশ, আমি শপথ করছি—আমি নিজের ক্ষতি করব! তোমার বিজ্ঞান কি তখন পারবে আমার এই বায়োলজিক্যাল ডেস্ট্রাকশন রুখতে? তুমি কি পারবে আমার জীবন ফিরিয়ে দিতে? বলো!”

নীশ ধীরস্থিরভাবে তার ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল, যেন রোদের এই তাণ্ডব স্রেফ কোনো অকিঞ্চিৎকর ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ। রোদ এবার দরজার সামনে নিজের শরীরকে ঢাল হিসেবে মেলে ধরল। তার দুচোখ বেয়ে অশ্রু আর ক্রোধের এক অবাধ্য স্রোত বইছে। সে উন্মাদিনীর মতো চিৎকার করে উঠল,
“নীশ! তুমি কি সত্যিই অন্ধ হয়ে গেছ? আমি আমার সারা জীবনের ভালোবাসা তোমার পায়ের কাছে সঁপে দিয়েছি, আর তুমি স্রেফ একটা প্রোগ্রামড এনটিটি জন্য নিজেকে ধ্বংস করতে যাচ্ছ? তুমি কি একবারও ভাবছ না আমার কী হবে? তোমাকে ওই নরকের দিকে পা বাড়াতে হলে আমাকে পিষে দিয়ে যেতে হবে। আমাকে মেরে আমার লাশের ওপর দিয়ে যাও!”

​নীশ এক মুহূর্তের জন্য থামল। তার চাহনিতে কোনো মমতা নেই, নেই কোনো এমপ্যাথি ছিটেফোঁটা। সে রোদের খুব কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
“তাহলে তাই হোক রোদ। তুমি যদি নিজের অস্তিত্বকে আমার পথে অবস্ট্যাকল হিসেবে দাঁড় করাতে চাও, তবে আমি সেই বাধা সরিয়ে দিতে এক মুহূর্তও দ্বিধা করব না। আভান্তি স্রেফ একটি রোবট নয়, ও আমার দীর্ঘ সাত বছরের বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমের ফসল, আমার একাকীত্বের একমাত্র কো-অস্তিত্ব। ও আমার সবকিছু। ওর কাছে পৌঁছানোর পথে যদি কেউ অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়—সে আমার যত কাছের মানুষই হোক না কেন—আমি তাকে নির্দয়ভাবে শেষ করে দেব।”

​রোদ নীশের চোখের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠল। সেখানে সে কোনো পরিচিত মানুষকে দেখতে পেল না, সেখানে কেবল এক আচ্ছন্ন স্রষ্টা দাঁড়িয়ে আছে, যার কাছে প্রাণের চেয়েও তার সৃষ্টি বড়। নীশ রোদের কাঁধ ধরে প্রবল শক্তিতে তাকে একপাশে সরিয়ে দিল। রোদের ভারসাম্য হারিয়ে মেঝের কাচের টুকরোগুলোর ওপর আছড়ে পড়ল, তার হাত থেকে রক্ত চুঁইয়ে পড়তে লাগল, কিন্তু নীশ একবারও পেছনে ফিরে তাকাল না। ​সে দরজার দিকে এগোতে এগোতে শীতল গলায় শেষ বাক্যটি উচ্চারণ করল,
“ভালোবাসা যদি আমার গবেষণার প্রসেসিং ধীর করে দেয়, তবে সেই ভালোবাসাকে আমি আমার জীবন থেকে ডিলিট করে দিতে জানি। রোশান যদি আজ আভান্তিকে স্পর্শ করে থাকে, তবে পৃথিবী এক ভয়ংকর ক্যাটাসট্রফির সাক্ষী হবে। আর তুমি— তুমিও আজ থেকে আমার কাছে স্রেফ একজন স্ট্র্যাঞ্জার।”

​নীশ ম্যানশনের বাইরে বেরিয়ে গিয়ে গেল। সে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখতেই রোদ টলমলে পায়ে এসে গাড়ির বনটের ওপর আছড়ে পড়ল। তার রক্তাক্ত হাত কাচের ওপর এক বীভৎস ছাপ রেখে যাচ্ছে। সে চিৎকার করে বলল,
“নীশ! তুমি যদি যাও, আমি চাকার নিচে ঝাঁপ দেব! তোমাকে খুনি হয়েই ওর কাছে যেতে হবে!”

নীশ গাড়ি থেকে নেমে এলো। সে রোদের সামনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো তাকে বোঝানোর চেষ্টা করল। অত্যন্ত নিচু স্বরে বলল,
“রোদ, তোমার এই ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলিং আমার নিউরাল সার্কিটে কোনো প্রভাব ফেলছে না। তুমি যেটাকে ভালোবাসা বলছ, সেটা আমার কাছে স্রেফ একটা ইভোলিউশনারি ড্র্যাগ। আভান্তি আমার অস্তিত্বের সিঙ্গুলারিটি। ও বিপন্ন মানে আমি মৃত। সরে যাও, নতুবা পরিস্থিতি অত্যন্ত ভায়োলেন্ট হয়ে উঠবে।”

​রোদ এবার আরও উন্মাদ হয়ে নীশের জামার কলার খামচে ধরল। সে হাহাকার করে বলল,
“আমি সরব না! এক ইঞ্চিও সরব না! দেখি তুমি কী করতে পারো!”

​নীশের সহ্যের সীমা চরম সীমায় পৌঁছে গেছে। সে বুঝতে পারল, রোদের এই আনকন্ট্রোলড প্যাশন তাকে আজ গন্তব্যে পৌঁছাতে দেবে না। রোশান এই সুযোগে আভান্তির কোর মেমোরি ফরম্যাট করে দেবে। নীশ এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল। তারপর বিদ্যুৎবেগে নিজের কোমর থেকে রিভলভারটা বের করে সরাসরি রোদের উরুর একপাশে লক্ষ্য করে ট্রিগার চেপে দিল।

রোদ এক তীব্র আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। বুলেটের আঘাতটি ছিল অত্যন্ত ক্যালকুলেটেড—এটি প্রাণঘাতী নয়, কিন্তু তাকে সাময়িকভাবে ইমোবিলাইজ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। নীশের চোখে কোনো অনুশোচনা নেই। ​সে হাঁটু গেড়ে বসল রোদের পাশে। রোদের যন্ত্রণাকাতর চোখের দিকে তাকিয়ে শীতল গলায় বলল,
“আমি তোমাকে সাবধান করেছিলাম রোদ। তুমি আমার প্রেশাস প্রপার্টির পথে হিউম্যান ব্যারিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছিলে। আমি তোমাকে শেষ করতে চাইনি, কেবল পথ থেকে সরিয়ে দিলাম। তুমি এই ম্যানশনের সিকিউরিটিকে কল করো, তারা তোমার হসপিটালে নিয়ে যাবে। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

রোদ অবিশ্বাসের চোখে নীশের দিকে তাকিয়ে রইল। সে কল্পনাও করতে পারেনি যে, এক টুকরো মেটাল আর সিলিকনের জন্য নীশ তার ওপর অস্ত্র চালাতে পারে। রক্তে ভিজে যাচ্ছিল ঘাস, আর সেই রক্তের ওপর দিয়েই নীশের গাড়ির চাকা বেরিয়ে গেল।

চলবে…

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ