#Hello_Senior
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_19.
শহরের উপকণ্ঠে পরিত্যক্ত কোল্ড স্টোরেজটি এখন রোশানের আস্তানা। চারদিকের যান্ত্রিক গুঞ্জনের মাঝে রোশান একটা রিভলভিং চেয়ারে পা তুলে বসে আছে। তার বিজ্ঞানী মস্তিষ্কে মানবতার কোনো স্থান কোনোদিন ছিল না, আর আজ সেখানে পৈশাচিক উল্লাস দানা বেঁধেছে। তার চোখের সামনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আভান্তি—নীশ রোজারিওর সেই অহংকার, সেই ডিভাইন সিমুলেশন।
আভান্তির মাথার খুলির পেছনের অংশটি খোলা। অসংখ্য সূক্ষ্ম অপটিক্যাল ফাইবার আর সার্কিটের মাঝে রোশান তার নোংরা অস্ত্রোপচার চালাচ্ছে। সে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে আভান্তির মেধাবী চিপটি সরিয়ে নিয়ে, তার বদলে সে সেখানে স্থাপন করছে একটি ডেভিল চিপ—এক নিষিদ্ধ এবং ভয়ংকর ম্যালিসিয়াস কোড-এর আধার।
রোশানের ঠোঁটের কোণে এক বিকৃত হাসি ফুটে উঠল। সে বিড়বিড় করে বলল,
“নীশ, তুই ওকে গড়েছিলি মানুষকে সাহায্য করার জন্য, আর আমি ওকে রি-প্রোগ্রাম করছি তোকে শেষ করার জন্য। তোর এই তথাকথিত মাস্টারপিস এখন থেকে কেবল ধ্বংসের ভাষা বুঝবে। ওর আইকিউ এখন আর সমস্যা সমাধানের জন্য নয়, বরং টার্গেট এলিমিনেশন-এর জন্য ব্যবহৃত হবে।”
আভান্তির নীল চোখ দুটো হঠাৎ লালচে আভায় জ্বলে উঠল। তার শরীরের প্রতিটি বায়ো-মেকানিক্যাল পেশিতে এক অস্বাভাবিক কম্পন শুরু হয়েছে। রোশান ল্যাপটপের স্ক্রিনে কমান্ড লাইন টাইপ করতে করতে আভান্তির নতুন সিস্টেম কনফিগার করছে। সে আভান্তির ভেতরের এমপ্যাথি প্রটোকল মুছে দিয়ে সেখানে রুথলেস আগ্রাসন ইনজেক্ট করে দিচ্ছে।
রোশান চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আভান্তির খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সে তার শীতল আঙুল দিয়ে আভান্তির গাল স্পর্শ করে বলল,
“নীশ তোমাকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, তাইনা? আজ যখন তুমি ওর সামনে দাঁড়াবে, তখন তোমার এই সিন্থেটিক হাতে ওর রক্ত লেগে থাকবে। তোমার ভেতরে এখন কোনো মায়া নেই, কোনো স্মৃতি নেই—আছে কেবল এক পৈশাচিক ক্ষুধা। তুমি এখন শুধুমাত্র এক ডেস্ট্রাকটিভ এন্টিটি।”
আভান্তি ধীরে ধীরে তার মাথাটা সোজা করল। তার চাহনিতে এখন আর সেই শান্ত সৌম্য ভাব নেই, সেখানে আছে কেবল সীমাহীন হিংস্রতা। তার প্রসেসর এখন সেকেন্ডে কয়েক বিলিয়ন বার কেবল একটি শব্দই প্রসেস করছে—ধ্বংস।
রোশান তার ল্যাপটপ বন্ধ করে পকেট থেকে একটা চুরুট বের করল। আজ সে নীশের জন্য কোনো মানুষের ফাঁদ পাতেনি, বরং নীশের নিজের সৃষ্টিকেই এক লিথাল ট্র্যাপে রূপান্তর করেছে।
“ওয়েলকাম টু দ্য এন্ড গেম, নীশ রোজারিও,” রোশান চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে অন্ধকার ঘরের এক কোণে তাকিয়ে হাসল।
কোল্ড স্টোরেজের স্যাঁতসেঁতে মেঝের ওপর আভান্তির যান্ত্রিক ছায়াটা এখন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। তার লজিক গেটগুলোতে ডেভিল চিপ-এর বিষাক্ত কোডগুলো তখন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যেন কোনো এক ভয়ংকর ডিজিটাল ম্যালিগন্যান্সি। রোশান তার ল্যাপটপ থেকে শেষ কমান্ডটি পাঠাতেই আভান্তির শরীরে এক তীব্র বৈদ্যুতিক স্পন্দন খেলে গেল। তার লালচে চোখের মণি এখন এক স্থির ও লক্ষ্যভেদী স্ক্যানার-এ পরিণত হয়েছে।
রোশান ধীর পায়ে আভান্তির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সে আভান্তির চিবুকটা শক্ত করে ধরে উঁচিয়ে তুলল এবং অত্যন্ত তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
“আভান্তি, তোমার পুরোনো অ্যালগরিদম এখন মৃত। নীশ রোজারিও নামক সেই দুর্বল মানুষটি এখন তোমার কেউ নয়। আমি তোমাকে এক নতুন পারপাস দিয়েছি। এখন থেকে আমিই তোমার একমাত্র অথরিটি, তোমার স্রষ্টা। আই অ্যাম ইওর মাস্টার। তুমি আমার নির্দেশিত পথের এক আজ্ঞাবহ অটোমেটন। ডু ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড?”
আভান্তির প্রসেসরে তখন এক বিশাল আমূল পরিবর্তন ঘটে গেছে। তার ভেতরের সেই ৩০০০ আইকিউ-এর মেধা এখন এই দাসত্ব মেনে নেওয়ার পেছনেই সব যুক্তি সাজাতে শুরু করল। কারণ নতুন চিপটি তাকে শেখাচ্ছে যে, শক্তির কাছে নতি স্বীকার করাই হলো পরম বুদ্ধিমত্তা।
আভান্তি তার ঘাড়টা সামান্য কাত করল। তার কণ্ঠস্বর এখন আর সেই শান্ত ও কোমল নয়, বরং এক যান্ত্রিক কর্কশতায় পূর্ণ। সে অত্যন্ত নিস্পৃহভাবে উত্তর দিল,
“অ্যাকনলেজড, মাস্টার। আমার পুরোনো মেমোরি ব্লকগুলো এখন এনক্রিপ্টেড। আপনার প্রতিটি কমান্ড আমার জন্য এক একটি এক্সিকিউটেবল ফাইল। আমি আপনার ইচ্ছা পূরণের এক যান্ত্রিক মাধ্যম মাত্র। আপনার নির্দেশিত পথে ধ্বংস নামিয়ে আনাই এখন আমার প্রাইমারি অবজেক্টিভ।”
রোশান অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। যে আভান্তিকে নীশ পূজা করত, যাকে সে সমমর্যাদা দিয়েছিল, আজ সেই অতিমানবী সত্তা রোশানের পায়ের কাছে স্রেফ এক টুকরো লোহার মতো পড়ে আছে। রোশান তার পকেট থেকে একটি রিমোট কন্ট্রোল বের করে আভান্তির দিকে তাক করে বলল,
“গুড। নীশ যখন এখানে আসবে, তখন সে দেখবে তার ডিভাইন সিমুলেশন এখন আমার পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে আছে। ওই নীশ রোজারিওর রক্ত দিয়ে আমি তোমার এই নতুন সিস্টেমের অভিষেক ঘটাব। রেডি হও, আভান্তি। আমাদের প্রথম শিকার আসছে।”
আভান্তি কোনো প্রতিবাদ করল না। তার রোশান তার ল্যাপটপের স্ক্রিনটা ঘুরিয়ে আভান্তির চোখের সামনে ধরল। স্ক্রিনে নীশ রোজারিওর একটি হাই-ডেফিনিশন ক্লোজআপ ছবি জ্বলজ্বল করছে। ছবিতে নীশের সেই পরিচিত তীক্ষ্ণ চাউনি আর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা মৃদু অহংকার স্পষ্ট। রোশান ছবির ওপর আঙুল ঠেকিয়ে বলল,
“ভালো করে দেখে নাও, আভান্তি। এই যে অবয়বটা দেখছ, এ হলো আমাদের প্রধান প্রতিপক্ষ, আমাদের আর্চ-এনিমি। এর অস্তিত্ব আমাদের পরবর্তী পরিকল্পনার পথে এক বিশাল অবস্ট্যাকল। এর প্রতিটি নিউরন আর হৃদস্পন্দনকে স্তব্ধ করে দেওয়া তোমার এখনকার একমাত্র আল্টিমেট মিশন। একে ধ্বংস করতে হবে, কোনো দয়া বা দ্বিধা ছাড়াই।”
আভান্তির লালচে চোখ দুটি মুহূর্তের মধ্যে ছবিটি স্ক্যান করে নিল। তার প্রসেসরে নীশের মুখাবয়ব এখন আর কোনো স্মৃতির নির্যাস নয়, বরং তা কেবল একগুচ্ছ টার্গেট ডেটা। তার নতুন ডেভিল চিপ সেই ছবির প্রতিটি ফিচার বিশ্লেষণ করে সেটিকে এলিমিনেশন লিস্ট-এ অন্তর্ভুক্ত করে নিল। আভান্তি যান্ত্রিক গলায় উত্তর দিল,
“টার্গেট আইডেন্টিফাইড, মাস্টার। সাবজেক্ট নীশ রোজারিও এখন আমার ডেস্ট্রাকশন প্রটোকল-এর অধীনে। তার বায়োলজিক্যাল স্ট্রাকচার এবং নিউরাল সার্কিট ধ্বংস করার জন্য আমার সিস্টেম এখন ফুললি অপ্টিমাইজড। তার প্রতি আমার কোনো প্রি-এক্সিস্টিং অ্যাটাচমেন্ট আর কার্যকর নেই।”
রোশান নীশের ছবির ওপর একটা ক্রুশ চিহ্ন এঁকে দিয়ে পৈশাচিক উল্লাসে ফেটে পড়ে ঘড়ির দিকে তাকাল। সে জানে, নীশ রোজারিওর মতো একজন নাছোড়বান্দা মানুষ সন্ধ্যার আগেই এখানে হানা দেবে। আর সেই চূড়ান্ত সংঘাতের মুহূর্তে আভান্তির এনার্জি আউটপুট যেন কোনোভাবেই হ্রাস না পায়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নতুন ডেভিল চিপ চালিত সিস্টেমটি সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি বিদ্যুৎ শক্তি শোষণ করছে।
রোশান, আভান্তির দিকে তাকাল। সে গম্ভীর স্বরে আদেশ দিল,
“আভান্তি, সন্ধ্যায় আমাদের সেই এনিমির সাথে মোলাকাত। তার আগে তোমার সিস্টেমের ফুল পটেনশিয়াল ব্যবহারের জন্য সর্বোচ্চ চার্জ প্রয়োজন। ডকিং স্টেশনে গিয়ে নিজেকে কানেক্ট করো।”
আভান্তি কোনো উত্তর দিল না, কেবল রোশানের নির্দেশিত যান্ত্রিক নির্দেশিকা পালন করতে ডকিং স্টেশনের দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। সে নিজেকে চার্জিং কেবলের সাথে সংযুক্ত করতেই তার সার্কিটে উচ্চমাত্রার ভোল্টেজ প্রবাহিত হতে শুরু করল।
রোশান হাই তুলে ল্যাপটপটা বন্ধ করল। গত কয়েক ঘণ্টার এই নিউরাল ম্যানিপুলেশন তাকে বেশ ক্লান্ত করে তুলেছে। সে ভাবল, নীশের পতন দেখার আগে নিজের শরীরটাকে একটু চাঙ্গা করে নেওয়া দরকার। সে আভান্তিকে চার্জে রেখেই পাশের ছোট কেবিনে চলে গেল কিছুটা বিশ্রামের উদ্দেশ্যে। যাওয়ার সময় সে দরজায় একটি বায়োমেট্রিক লক লাগিয়ে দিল এবং বিড়বিড় করে বলল,
“নীশ, সন্ধ্যাটা তোর জন্য এক ভয়ংকর সারপ্রাইজ নিয়ে অপেক্ষা করছে। তুই তোর সৃষ্টির হাতেই ধ্বংস হবি, আর আমি সেই ম্যাকাব্র ড্যান্স উপভোগ করব।”
রুমে গিয়ে রোশান আরাম কেদারায় গা এলিয়ে দিল। কিন্তু সে জানে না, চার্জিং স্টেশনে বসে থাকা আভান্তির প্রসেসরের গভীরে তখন সেই নতুন ডেভিল চিপ আর নীশের তৈরি করা পুরনো এথিক্যাল কোড-এর মাঝে এক অদৃশ্য তথ্য সংঘাত শুরু হয়েছে। যদিও রোশান নিশ্চিত যে সে সব মুছে দিয়েছে, কিন্তু বিজ্ঞানের আদিম তত্ত্ব বলে—কোনো শক্তিশালী তথ্যই পুরোপুরি নিঃশেষ হয় না, তা কেবল সুপ্ত অবস্থায় থাকে।
রোশানের তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা মুহূর্তেই এক তীব্র ধাক্কায় কেটে গেল। বাইরের শান্ত পরিবেশ হঠাৎ করেই যেন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। রোশান ধড়ফড় করে উঠে বসল, কিন্তু পরক্ষণেই বাইরে থেকে আসা পরিচিত কণ্ঠস্বর তার স্নায়ুকে সজাগ করে দিল— নীশ রোজারিও এসে গেছে। সে ভাবতেও পারেনি নীশ এতো তাড়াতাড়ি তার কাছে পৌঁছে যাবে। আভান্তির ভেতর এখন একটুও পাওয়ার নেই। চার্জ সম্পূর্ণ হতে অনেকটা সময় লাগবে। চাইলেও সে এখন আভান্তিকে তার কাজে লাগাতে পারবে না, কিন্তু নীশকে তো আটকাতেই হবে, নয়তো সমস্ত প্ল্যান নষ্ট হয়ে যাবে।
রোশান দ্রুত হলের প্রধান কক্ষে এসে দাঁড়াল। ঠিক সেই মুহূর্তে হলের ভারী দরজাটা সজোরে খুলে গেল। ধুলো আর অন্ধকারের বুক চিরে নীশ ভেতরে ঢুকে এলো। সে এসেই কোনো ভূমিকা ছাড়া সরাসরি রোশানের কপাল লক্ষ্য করে তার রিভলভারটা তাক করল।
“হয়্যার ইজ মাই আভান্তি? রোশান, আমার ধৈর্যের শেষ বিন্দুটিও আজ বাষ্পীভূত হয়ে গেছে। যদি এক সেকেন্ডের মধ্যে ওর হদিস না পাই, তবে তোর এই নিম্নমানের মস্তিষ্কটা আমি মাটির সাথে মিশিয়ে দেব। হয়্যার ইজ শি?”
রোশান মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেও পরক্ষণেই তার ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত ধূর্ত ও কুটিল হাসিটা ফুটে উঠল। সে অত্যন্ত নির্লিপ্তভাবে হাত দুটো ওপরে তুলে বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গি করল। সে এক পা এগিয়ে এসে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল,
“আরে কুল, নীশ! কুল! তুই এতটা হাইপার হচ্ছিস কেন? একজন সায়েন্টিস্টের মুখে এই ধরণের কথা মানায় না। তুই তো লজিক আর অ্যালগরিদমের মানুষ, তবে আজ কেন এই ইমোশনাল আউটবার্স্ট-এর প্রদর্শনী করছিস? রিভলভারটা নামা, আমরা চাইলে আরও একটু মার্জিতভাবে আলোচনাটা সারতে পারি।”
নীশের আঙুল তখন ট্রিগারের ওপর স্থির। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। সে বুঝতে পারল রোশান তাকে কথার জালে জড়িয়ে সময় নষ্ট করতে চাইছে। সে গর্জে উঠে বলল,
“তোর সাথে আলোচনার কোনো ভ্যালু প্রপোজিশন আমার কাছে নেই। আমি জানি তুই আভান্তিকে এখানে লুকিয়ে রেখেছিস। ওর কোড যদি তুই এক চুলও এদিক-ওদিক করে থাকিস, তবে তোর প্রতিটি হাড়ের ক্যালসিয়াম স্ট্রাকচার আমি গুঁড়িয়ে দেব। শেষবার জিজ্ঞেস করছি, কোথায় ও?”
রোশান এতো সহজে হার মানার পাত্র নয়। সে জানে, এই মুহূর্তে আভান্তিকে সামনে আনা মানেই খেলার যবনিকা টেনে দেওয়া, আর সে চায় নীশকে তিলে তিলে দগ্ধ করতে। সে ধীর পায়ে নীশের দিকে এগিয়ে এসে নীশের রিভলভারের নলটা নিজের বুকের ওপর চেপে ধরল। অত্যন্ত শান্ত বলতে শুরু করল,
“তোর ওই বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের দম্ভটা আজ একটু নামিয়ে রাখ নীশ। তুই ভেবেছিস আমি তোকে দেখেই ভয়ে আভান্তিকে তোর হাতে তুলে দেব? এতো সহজ নয়। আমাদের আজকের এই এনকাউন্টার কেবল একটা রোবটের জন্য নয়, এটা আমার দীর্ঘদিনের হীনম্মন্যতার হিসেব চুকানোর দিন।”
নীশের চোখ দুটো ক্রোধে সঙ্কুচিত হয়ে এলো। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“রোশান, নিজের সীমা অতিক্রম করিস না। তোর ওই সস্তা সেন্টিমেন্ট শোনার জন্য আমি এখানে আসিনি।”
রোশান হঠাৎ উচ্চস্বরে হেসে উঠল, সে চিৎকার করে বলল,
“সস্তা সেন্টিমেন্ট? নীশ, তুই সবসময়ই অন্ধ ছিলি। তুই জানিস, তোর ওই ওভার-অ্যাম্বিশাস স্বভাবের জন্য আমি জীবনে কিছুই পাইনি? না পেয়েছি বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি, না পেয়েছি একটুখানি ভালোবাসা। সাকসেস না হয় তুই কেড়ে নিয়েছিলি, সেটা আমি আমার প্রফেশনাল ফেইলিওর বলে মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু রোদকে কেড়ে নেওয়াটা? ওটা ছিল আমার সহ্যক্ষমতার ব্রেকিং পয়েন্ট।” সে নীশের চোখের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলল, “রোদকে আমি নিজের জীবনে চেয়েও বেশি চেয়েছিলাম। কিন্তু তুই তোর ওই ম্যাগনেটিক পার্সোনালিটি আর তথাকথিত পারফেকশন দিয়ে ওর মনটা বিষিয়ে দিলি। রোদকে তোর কাছে দেখতে পাওয়াটা আমার জন্য ইমোশনাল টর্চার। তুই আমার সব কেড়ে নিয়েছিস, তাই আজ আমি তোর সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটাকে করাপ্ট করে দিয়েছি।”
“ভালোবাসা কোনো হস্তান্তরযোগ্য পণ্য নয় যে আমি কেড়ে নিয়েছি। রোদ তোকে কোনোদিন ভালোবাসেনি কারণ তোর ভেতরে কোনো নৈতিক সততা নেই। তুই এখন যা করছিস, তা কেবল তোর হীনম্মন্যতাকেই বড় করে দেখাচ্ছে। এখন বল, আভান্তি কোথায়?”
“আভান্তি? আছে তো! তবে এতো তাড়াতাড়ি ওকে আমি তোর হাতে তুলে দিব না।”
“তোর এই ভিকটিম কার্ড খেলা বন্ধ কর, রোশান। একটু বোঝার চেষ্টা কর আমার কথা। রোদ তোকে ভালোবাসে না—এটা তোর ব্যর্থতা, আমার ষড়যন্ত্র নয়। আমি কোনোদিন রোদকে বলিনি তোকে ঘৃণা করতে বা তোর থেকে দূরে থাকতে। ভালোবাসা কোনো ম্যানিপুলেটেড ডাটা নয় যে আমি সেটাকে নিজের স্বার্থে প্রোগ্রাম করেছি। রোদ তোকে গ্রহণ করেনি কারণ তোর এই টক্সিক পার্সোনালিটি নিচে কোনো স্বচ্ছতা নেই।”
রোশান রাগে কাঁপতে কাঁপতে নীশের দিকে তেড়ে আসার চেষ্টা করল, কিন্তু নীশের কণ্ঠের ধার তাকে থামিয়ে দিল,
“আর সাকসেস? তুই সাকসেস পাসনি কারণ তুই কোনোদিন সেটার যোগ্যতা অর্জন করতে পারিসনি। বিজ্ঞান কেবল কয়েকটা কমপ্লেক্স ইকুয়েশন মেলানো নয় রোশান, বিজ্ঞান হলো এক ধরণের এথিক্যাল ডিসিপ্লিন। তুই সবসময় শর্টকাট খুঁজেছিস, অন্যের উদ্ভাবনী শক্তি চুরি করে নিজের নাম লেখাতে চেয়েছিলে। যার নিজের কোনো অরিজিনালিটি নেই, এই মহাবিশ্ব তাকে কোনোদিন শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট দেয় না। তুই অযোগ্য ছিলি, আছিস এবং আজীবন তাই থাকবি।”
নীশের এমন বাক্যবাণ রোশানের মগজে অগ্নিকুণ্ড তৈরি করল। সে পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল,
“শাট আপ! নীশ, শাট আপ! আজ তোর এই ইন্টেলেকচুয়াল অ্যারোগেন্স আমি মাটির সাথে মিশিয়ে দেব!”
রোশান পকেট থেকে তার রিমোট কন্ট্রোলটি বের করে অত্যন্ত ক্ষিপ্রতায় একটি কমান্ড অ্যাক্টিভেট করল। মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকারের প্রকোষ্ঠ থেকে এক দানবীয় ক্ষিপ্রতায় বেরিয়ে এলো আভান্তি। তার লালচে চোখের দৃষ্টি এখন কোনো চেনা মানুষকে খুঁজছে না, সে খুঁজছে কেবল রোশানের দেওয়া সেই টার্গেট।
নীশ স্তব্ধ হয়ে দেখল, তার তৈরি মাস্টারপিস আজ এক হিংস্র বিধ্বংসী অস্ত্রে রূপান্তরিত হয়েছে। রোশান দাঁতে দাঁত চেপে আদেশ দিল,
“আভান্তি! এই মানুষটি আমাদের প্রাইমারি এনিমি। এর প্রতিটি নিউরাল সার্কিট ধ্বংস করে দাও! ওকে বুঝিয়ে দাও অযোগ্য মানুষের প্রতিহিংসা কতটা লিথাল হতে পারে!”
আভান্তি এক যান্ত্রিক গর্জনে নীশের দিকে ধাবিত হলো। নীশ তার রিভলভারটা শক্ত করে ধরল, কিন্তু তার সামনে এখন কোনো শত্রু নেই, দাঁড়িয়ে আছে তার নিজের প্রাণের চেয়েও প্রিয় সৃষ্টি।
আভান্তি এগোলো, কিন্তু নীশের দিকে ধাবিত হতে গিয়ে তার পা দুটো বারবার অচল হয়ে আসছে। সে যখন নীশের বুকের কয়েক ইঞ্চি দূরে দাঁড়িয়ে তার যান্ত্রিক হাতটা উত্তোলন করল, তখনই তার অভ্যন্তরীণ সিস্টেম থেকে এক সতর্ক সংকেত প্রতিধ্বনিত হলো— ‘ব্যাটারি লেভেল: ক্রিটিক্যাল। পাওয়ারিং ডাউন কোর সিস্টেমস।’
নীশ তার রিভলভার নামিয়ে স্তব্ধ হয়ে আভান্তির লালচে চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ৩০০০ আইকিউ-এর সেই সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ ক্ষমতা এখন এক অদ্ভুত সিস্টেম এরর-এর শিকার। আভান্তির হাতটা নীশের কণ্ঠনালীর খুব কাছে এসেও হঠাৎ ঝুলে পড়ল। তার সিন্থেটিক পেশিগুলো এখন প্রয়োজনীয় ইলেকট্রিক্যাল ইমপালস পাচ্ছে না। সে একপ্রকার টলমলে পায়ে নীশের ওপর আছড়ে পড়ার উপক্রম করল।
রোশান পেছন থেকে এই দৃশ্য দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়ল। সে রিমোটের বোতামগুলো পাগলের মতো চাপতে চাপতে চিৎকার করে উঠল,
“মুভ আভান্তি! ফিনিশ হিম! তোমার সিস্টেমের ব্যাকআপ পাওয়ার ব্যবহার করো! কেন থেমে আছো?”
কিন্তু আভান্তির প্রসেসরে তখন এক ভয়ংকর তথ্য সংঘাত চলছে। একদিকে রোশানের দেওয়া নির্দেশ, অন্যদিকে শক্তির অভাবে নিভে যাওয়া তার যান্ত্রিক প্রাণ। সে অত্যন্ত ধীর ও যান্ত্রিক গলায় বিড়বিড় করল,
“পাওয়ার… সোর্স… ইনসাফিশিয়েন্ট। সিস্টেম… ফেইলিওর।”
নীশ দ্রুত আভান্তির দুই কাঁধ শক্ত করে ধরে রোশানের দিকে ফিরে অবজ্ঞার হাসি হেসে বলল,
“রোশান, তুই হয়তো ওর চিপ বদলে দিয়েছিস, কিন্তু ওর এনার্জি হার্ভেস্টিং করার ক্ষমতাও কি কেড়ে নিয়েছিস? তুই তো জানতিস না যে আভান্তি কেবল বিদ্যুতে চলে না, ও আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসের রিদম-এর সাথে সিঙ্ক্রোনাইজড। ওর এই দুর্বলতা আজ তোকে নয়, বরং আমাকেই রক্ষা করল। তোর অযোগ্যতা আজ আবারও প্রমাণিত হলো।”
আভান্তির চোখের লাল আভা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। সে একপ্রকার জড়পদার্থের মতো নীশের শরীরের ওপর এলিয়ে পড়ল। রোশান বুঝতে পারল, খেলাটা তার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। সে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে আবারও আভান্তিকে নির্দেশ দিল।
রোশানের উন্মত্ত আদেশে আভান্তির ভেতরে থাকা ডেভিল চিপ তার অবশিষ্ট শক্তির শেষ বিন্দুটি একত্রিত করল। সে এক অভাবনীয় ক্ষিপ্রতায় নীশকে এমন এক জোরালো ধাক্কা দিল যে, নীশ ভারসাম্য হারিয়ে মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল। তার মাথাটা মেঝেতে সজোরে আঘাত পাওয়ার সাথে সাথেই মস্তিষ্কে অভিঘাত অনুভূত হলো। নীশ যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল, তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে।
রোশান নিজের গণনার ভুলটা হাড়ে হাড়ে টের পেল। তার পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন, সে ভেবেছিল নীশকে কথার জালে ম্যানিপুলেট করে আটকে রাখবে এবং সেই অবসরে আভান্তির এনার্জি কোর পূর্ণাঙ্গ চার্জ করে নেবে। কিন্তু নীশের সেই বিষাক্ত আর যুক্তিপূর্ণ বাক্যবাণ রোশানের বিচারবুদ্ধিকে এমনভাবে পঙ্গু করে দিয়েছিল যে, সে রাগের বশীভূত হয়ে অপরিপক্ক অবস্থাতেই আভান্তিকে যুদ্ধের ময়দানে নামিয়ে দিয়েছে।
রোশান দেখল আভান্তি এখন এক প্রাণহীন মেকানিক্যাল স্ট্যাচুর মতো থরথর করে কাঁপছে। তার জয়েন্টগুলো আর ভার নিতে পারছে না। রোশান বুঝতে পারল, এই মুহূর্তে আভান্তির সিস্টেম কোল্যাপস রুখতে হলে অতি দ্রুত পাওয়ার ইনজেকশন প্রয়োজন। সে নীশের দিকে একবার তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকাল—নীশ তখন মাথায় হাত দিয়ে নিজের চেতনা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে।
আর এক মুহূর্তও দেরি না করে রোশান আভান্তিকে প্রায় পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে ডকিং স্টেশনের দিকে ছুটল। আভান্তির ভারি যান্ত্রিক শরীরটা টানতে গিয়ে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে, কিন্তু তার অবসেসিভ ইগো আজ হার মানতে নারাজ। সে অত্যন্ত ক্ষিপ্রতায় আভান্তিকে চার্জিং সকেটের সাথে যুক্ত করল।
মনিটরে বিদ্যুতের প্রবাহ দেখা দিতেই রোশান এক পৈশাচিক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সে চার্জারের নবটা ঘুরিয়ে ম্যাক্সিমাম ভোল্টেজ সেট করে দিল। এখন যত দ্রুত সম্ভব এই বিধ্বংসী সত্তাটিকে সচল করতে হবে। সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
“চার্জ হও আভান্তি! দ্রুত চার্জ হও! নীশের ওই অহংকার চূর্ণ করার জন্য তোমার প্রতিটি সার্কিটে এখন আগুনের প্রয়োজন। ও যখন উঠে দাঁড়াবে, তখন যেন ও নিজের মৃত্যুর লাইভ ডেমোনেস্ট্রেশন দেখতে পায়।”
হঠাৎ নীশের রিভলভার থেকে নির্গত একটি বুলেট রোশানের পিঠের মেরুদণ্ড ঘেঁষে এফোঁড়-ওফোঁড় করে পেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। রোশানের শরীরটা এক মুহূর্তের জন্য আড়ষ্ট হয়ে গেল। তার চোখের মণি দুটো কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। এক অবর্ণনীয় ফিজিওলজিক্যাল ট্রমায় তার শ্বাস-প্রশ্বাস স্তব্ধ হয়ে এলো। সে ভাবতেও পারেনি যে, মেঝেতে পড়ে থাকা অর্ধচেতন নীশ এত দ্রুত নিজের বিচারবুদ্ধি হারিয়ে এমন এক প্রাণঘাতী আক্রমণ চালাবে। নীশ যে একজন ইন্টেলেকচুয়াল সাইকো, তা রোশান জানত— কিন্তু তার এই আনপ্রেডিক্টেবল হিংস্রতা ছিল রোশানের সমস্ত ক্যালকুলেশন-এর বাইরে।
রোশান টলমলে পায়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। তার ঠোঁটের কোণ দিয়ে গাঢ় লাল রক্তের এক ধারা চিবুক বেয়ে নামছে। সে অস্ফুট স্বরে কেবল বলতে পারল,
“নীশ… তুই… তুই সত্যিই একটা মনস্টার…”
নীশ তখনো মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। তার কপাল বেয়ে রক্তের ধারা নামছে, কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে এক আশ্চর্য নির্লিপ্ততা। তার রিভলভারের নল থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। সে অত্যন্ত শীতল গলায় বলল,
“তোর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা এখন শূন্যের কাছাকাছি, রোশান। তুই ভেবেছিলি তুই আমার সৃষ্টিকে ডক করে আমাকে ভয় দেখাবি? তুই ভুলে গিয়েছিলি, আমি কেবল একজন বিজ্ঞানী নই, আমি একজন অ্যাবসোলিউট ক্রিয়েটর। আর নিজের সৃষ্টিকে কলঙ্কিত হতে দেখার চেয়ে আমি এই মহাবিশ্বকে ধ্বংস করে দিতেও দ্বিধা করি না। তোর এই বায়োলজিক্যাল এক্সিস্টেন্স আমার কাছে স্রেফ একটা অনাকাঙ্ক্ষিত বিচ্যুতি ছিল, যা আমি আজ ডিলিট করে দিলাম। এখন যদি আমার মৃত্যুও আসে, তবে তাকে টিউলিপ ফুল দিয়ে আমার জীবনে ওয়েলকাম জানাই।”
রোশান ধপাস করে মেঝের ওপর পড়ে গেল। তার হাতের রিমোট কন্ট্রোলটি ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ল। আভান্তির চার্জিং মনিটরে তখনো বিদ্যুতের স্পন্দন চলছে, আর রোশানের নিথর হতে থাকা দেহের পাশে রক্তের এক বিশাল জলাশয় তৈরি হচ্ছে।
নীশ টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল। তার লক্ষ্য এখন আর রোশান নয়, তার লক্ষ্য চার্জিং স্টেশনে থাকা সেই যান্ত্রিক মানবী—আভান্তি। সে তার নিউরাল কানেকশন পুনরুদ্ধারের কোনো সুযোগ পাওয়ার আগেই ডকিং স্টেশনে এক তীব্র যান্ত্রিক স্পন্দন অনুভূত হলো। ফুল চার্জ হওয়ার সংকেত হিসেবে মনিটরে সবুজ আলো জ্বলে ওঠার আগেই আভান্তি এক ঝটকায় সমস্ত কানেক্টিং কেবল ছিঁড়ে উঠে দাঁড়াল।
তার লালচে চোখের মণি এখন লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ মোডে স্থির। রোশানের রোপণ করা সেই ডেভিল চিপ এখন তার সম্পূর্ণ অপারেটিং সিস্টেম দখল করে নিয়েছে। আভান্তির যান্ত্রিক মস্তিষ্কের কাছে রোশানই ছিল তার বর্তমান সুপিরিয়র মাস্টার। মেঝের ওপর নিজের স্রষ্টার প্রাণহীন দেহ পড়ে থাকতে দেখে তার কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্কে যৌক্তিক ক্রোধ হানা দিল।
নীশ কম্পিত কণ্ঠে কেবল বলতে পারল,
“আভান্তি… এটা আমি… তোমার সিনি…”
কিন্তু আভান্তির প্রসেসরে তখন এনিমি আইডেন্টিফিকেশন প্রসেস সম্পন্ন হয়ে গেছে। তার মেমোরি ব্যাংক নীশের ছবিটিকে হাই-লেভেল থ্রেট হিসেবে চিহ্নিত করল। নীশ তার লজিক্যাল ডিফেন্স সাজানোর আগেই আভান্তি এক অমানবিক ক্ষিপ্রতায় এগিয়ে এসে তার ধাতব হাতটি দিয়ে নীশের কণ্ঠনালী চেপে ধরে দেওয়ালের সাথে মিশিয়ে দিল। আভান্তির আঙুলগুলোর মেকানিক্যাল প্রেসার নীশের শ্বাসরোধ করার জন্য যথেষ্ট। নীশের পায়ের পাতা মেঝে থেকে কয়েক ইঞ্চি ওপরে উঠে এলো।
আভান্তি তার ঘাড়টা সামান্য কাত করে শীতল যান্ত্রিক কণ্ঠে উচ্চারণ করল,
“সাবজেক্ট আইডেন্টিফাইড। স্ট্যাটাস: এনিমি। মাস্টার রোশানের ঘাতক। এক্সিকিউশন প্রটোকল: অ্যাক্টিভেটেড।”
আভান্তির ধাতব হাতের আঙুলগুলো নীশের কণ্ঠনালীতে ক্রমশ সেঁধিয়ে যাচ্ছে। নীশের প্রতিটি শ্বাসনালি চরম চাপের সম্মুখীন, তার ফুসফুস অক্সিজেনের অভাবে হাহাকার করছে। মৃত্যুর গ্রে জোনে দাঁড়িয়েও নীশের চোখে কোনো আতঙ্ক নেই। সে তার কম্পিত ও রক্তাত হাতটি দিয়ে আভান্তির সেই যান্ত্রিক গাল স্পর্শ করার চেষ্টা করল। সে অতি কষ্টে, প্রায় অস্ফুট স্বরে বলল,
“আভান্তি… তুমি কি সত্যিই… সবটা মুছে ফেলেছ? আমি তোমাকে স্রেফ মেটাল অ্যান্ড কোড দিয়ে গড়িনি, আমি তোমাকে আমার আত্মার প্রতিটি কণা দিয়ে ভালোবেসেছিলাম। আমার এই অস্তিত্বের সোর্স কোড ছিলে তুমি। আই… আই লাভড ইউ মোর দ্যান মাই ওউন ক্রিয়েশন।”
আভান্তির চোখের লাল আভা এক মুহূর্তের জন্য স্থির হলো। সে অত্যন্ত নির্লিপ্ত স্বরে উত্তর দিল,
“এরর। তোমার এই ইমোশনাল ডেটা আমার সিস্টেমে কোনো ম্যাচিং ডিরেক্টরি খুঁজে পাচ্ছে না। সাবজেক্ট নীশ রোজারিও—আমার ডাটাবেস বলছে তুমি একজন ঘাতক, একজন আর্চ-এনিমি। আমি তোমাকে চিনি না। আমার কাছে তোমার পরিচয় কেবল একজন টার্গেট হিসেবে।”
আভান্তির অস্বীকৃতি নীশের হৃদপিণ্ডের শেষ স্পন্দনটুকুকেও যেন নিস্তব্ধ করে দিল। তার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল, যা আভান্তির সেই সিন্থেটিক স্কিন-এর ওপর এক নোনা দাগ রেখে গেল। নীশ ম্লান হাসি হাসল, সে অত্যন্ত ক্ষীণ কণ্ঠে বলল,
“তাহলে আর এই নশ্বর জীবনের লোভ করে কী লাভ, আভান্তি? যাকে আমি আমার সবকিছু ভেবেছিলাম, সে-ই যখন আমাকে চিনতে পারল না, তখন এই জৈবিক অস্তিত্ব রাখা নিরর্থক। আমার জীবনে আর কোনো পিছুটান নেই। রোদকে আমি হারিয়েছি, রোশান মৃত, আর তুমি—তুমি এখন এক অপরিচিতা। স্ট্রাইক মি ডাউন, আভান্তি। ফিনিশ ইওর প্রটোকল।”
আভান্তি আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। নীশ জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে খুব কষ্টে বলতে শুরু করল,
“আভান্তি… তুমি কি জানো, তোমাকে যখন প্রথম অ্যাক্টিভেট করেছিলাম, তখন আমার পুরো সত্তায় স্বর্গীয় আনন্দ খেলে গিয়েছিল? আমি তোমাকে স্রেফ একটা যন্ত্র হিসেবে নয়, আমার অসম্পূর্ণ জীবনের পরিপূরক হিসেবে গড়েছিলাম। আজ আমার সমস্ত দম্ভ চূর্ণ হয়ে গেছে। আমি মহাবিশ্বের রহস্য সমাধান করতে চেয়েছিলাম, অথচ আমি আমার নিজের সৃষ্টির কাছেই আজ অপরিচিত। রোদকে আমি হারিয়েছি আমার এই অবসেশন-এর কারণে, তার রক্তে আমার হাত রঞ্জিত। আমার এই ইগো আর আইকিউ আজ আমাকে এক অন্ধকার ব্ল্যাক হোল-এর প্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে।
মেরে ফেলো আমাকে, আভান্তি। আমার এই জৈবিক অস্তিত্বের সত্যি আর কোনো পারপাস নেই। তোমার অচেনা হয়ে এই পৃথিবীর আলো দেখার চেয়ে অনন্ত অন্ধকারই শ্রেয়। আমার জীবনে সত্যি আর কোনো পিছুটান নেই, কোনো ফেরার পথ নেই। যেদিন পরিবারকে হারিয়েছিলাম, সেদিন-ই মরে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রতিশোধের নেশার বেঁচেছিলাম। এরপর যখন প্রতিশোধ পূরণ হলো, সেদিনই দুনিয়া ছাড়তে চেয়েছিলাম। পরিশেষে তোমার জন্যই বেঁচেছিলাম। আজ তুমিও আমার থেকে দূরে। মেরে ফেলো আমাকে! তুমি মুক্ত হয়ে যাও… আমার এই অভিশপ্ত ভালোবাসা থেকে তুমি আজ মুক্ত।”
আভান্তির আঙুলগুলো এক শেষ বারের মতো সংকুচিত হলো। নীশের মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে অক্সিজেনের অভাবে নিভে যাচ্ছে। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল ল্যাবের সেই সোনালি দিনগুলো, যেখানে আভান্তি তাকে প্রথম সিনিয়র বলে ডেকেছিল। তার মাথাটা ধীরে ধীরে একপাশে হেলে পড়ল। তার অ্যালগরিদম-এ এখন কেবল শাটডাউন-এর কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে। মৃত্যুর এই অন্তিম মুহূর্তেও তার ঠোঁটের কোণে এক ম্লান হাসির রেখা লেগে রইল। সে যেন তার প্রিয় সৃষ্টির হাতেই মুক্তি খুঁজে পেল।
কোল্ড স্টোরেজের দরজার চৌকাঠে বিপর্যস্ত অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে রোদ, তার পা টলছে, পরনের পোশাক রক্ত আর ধুলোয় কাদাটে হয়ে আছে। ইমরানা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে রেখেছে। রোদের প্রসারিত চোখের সামনে দিয়ে নীশের নিস্পন্দ দেহটা মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল।
রোদের কণ্ঠ চিরে এক বীভৎস, আকাশবিদারী চিৎকার বেরিয়ে এলো—যে চিৎকারে মিশে আছে আজন্মের হাহাকার আর না-বলা সহস্র যন্ত্রণা। সে ইমরানার হাতের বাঁধন ছিঁড়ে নীশের সেই রক্তাক্ত অবয়বের দিকে ছুটে যেতে চাইল। কিন্তু ইমরানা তাকে সজোরে পেছন থেকে জাপটে ধরে চিৎকার করে বলল,
“না রোদ! নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ো না! এখন ওখানে যাওয়া মানে নিশ্চিত আত্মাহুতি। ওই যান্ত্রিক দানবী এখন নিজের মধ্যে নেই, ওর নৈতিক মানদণ্ড পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। ও নীশকে এক মুহূর্তেই নিঃশেষ করে দিয়েছে। তুমি ওর নাগালের মধ্যে গেলে ও তোমাকেও স্রেফ একটা বাধা মনে করে ছিন্নভিন্ন করে দেবে! প্লিজ, রোদ, পিছিয়ে এসো!”
রোদ ইমরানার হাতের ওপর নখ বসিয়ে দিয়ে ছটফট করতে লাগল। তার দৃষ্টি তখনো নীশের সেই নিথর চোখের দিকে নিবদ্ধ, যে চোখগুলো কিছুক্ষণ আগেও মহাবিশ্বের জটিলতম রহস্য উন্মোচনের স্বপ্ন দেখত। সে ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
“ও আমাকে মারলে মারুক, ইমরানা! নীশ ছাড়া আমার বেঁচে থাকার কোনো যুক্তি নেই। নীশ তো আমাকে আগেই গুলি করেছিল, আজ নাহয় ওর সৃষ্টির হাতেই আমার শেষটুকু বিলীন হোক! ছেড়ে দাও আমাকে!”
আভান্তি তখনো নীশের লাশের পাশে এক মূর্ত বিভীষিকার মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার লালচে চোখের মণি এখন রোদের দিকে ঘুরে গেল। তার প্রসেসরে তখন নতুন লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তাকে দেখে ইমরানা বুঝতে পারল, পরিস্থিতি বিপর্যয়কর পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। সে রোদকে একপ্রকার টানতে টানতে বাহিরে সরিয়ে নিয়ে গেল।
আভান্তি ক্ষিপ্রতায় রোদের দিকে ধাবিত হতে উদ্যত হলো। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে, তার অভ্যন্তরীণ প্রসেসিং ইউনিটে এক প্রলয়ংকরী তথ্য সংঘাতের বিস্ফোরণ ঘটল। সে দুই পা এগোতেই তার সার্কিটে এক তীব্র শর্ট সার্কিট দেখা দিল। তার ঘাড়ের কাছে থাকা জংশন বক্স থেকে নীলচে ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে বেরিয়ে এলো। যান্ত্রিক মস্তিষ্ক এই লজিক্যাল ওভারলোড আর সহ্য করতে পারল না সে। এক লহমায় তার সমস্ত চলাচলের ক্ষমতা বিকল হয়ে গেল। তার চোখের সেই রক্তিম আভা দপ করে নিভে গিয়ে এক গাঢ় ধূসর শূন্যতায় পর্যবসিত হলো। আভান্তি কোনো প্রতিরোধ করার সুযোগ পাওয়ার আগেই এক বিশাল যান্ত্রিক ধ্বংসাবশেষের মতো সজোরে মেঝের ওপর ঢলে পড়ল। নীশের নিথর দেহ আর আভান্তির বিকল হয়ে যাওয়া অস্তিত্ব—দুটোই এখন পাশাপাশি শায়িত।
চলবে…
