Friday, June 5, 2026







Hello Senior Part-17

#Hello_Senior
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_17.

​শহরের উপকণ্ঠে এক নির্জন বার। নিওন আলোর নীলচে আভা আর মৃদু জ্যাজ মিউজিকের মূর্ছনায় পরিবেশটা শান্ত মনে হলেও, এক কোণের টেবিলে বসে থাকা দুই লেকচারারের মধ্যকার উত্তেজনা ছিল রীতিমতো ভলাটাইল। নীশ স্টুলে হেলান দিয়ে বসে আছে। রোশান তাকে এখানে আসার জন্য একাধিকবার রিকোয়েস্ট করেছিল বলেই সে এসেছে, নতুবা তার সময়ের অ্যালগরিদমে রোশানের জন্য কোনো স্থান ছিল না।

রোশান গ্লাসে এক চুমুক দিয়ে সরাসরি নীশের চোখের দিকে তাকাল। সে নীশের কাঠিন্য ভাঙার চেষ্টা করে বলল,
“নীশ, আমি তোমাকে এখানে কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার জন্য ডাকিনি। আমি চাই তুমি রোদের জীবন থেকে পুরোপুরি ডিসকানেক্ট হয়ে যাও। তোমার এমন ব‍্যবহার ওকে ভেতর থেকে ক্ষয় করছে। তুমি ওকে ভালোবাসো না, অথচ তোমার ছায়া ওকে অন্য কোথাও স্থির হতে দিচ্ছে না। জাস্ট লিভ হার অ্যালোন।”

​নীশ হাতের স্কচ গ্লাসটা টেবিলের ওপর স্থির রেখে এক চিলতে শীতল হাসি হাসল,
“প্রফেসর রোশান, আপনার এই ইমোশনাল ডিমান্ড অত্যন্ত ইললজিক্যাল। যেই জীবনে আমার কোনো অ্যাক্টিভ পার্টিসিপেশন নেই, সেই জীবন থেকে সরে যাওয়ার প্রশ্নটিই তো অপ্রাসঙ্গিক। রোদ মিশরা আমার লজিক্যাল ইকোসিস্টেমের বাইরে অবস্থান করছে। আমি তাকে স্রেফ একজন ফ্রেন্ড বা বড়জোর একজন একুয়েন্টেন্স হিসেবে ট্রিট করি।”

রোশান টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে ক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
“তাহলে ওকে বারবার রিজেক্ট করে কেন আবার নিজের কক্ষপথে টেনে আনো? কেন ওই যন্ত্রটাকে দিয়ে ওকে অপমান করো? তুমি জানো না ও তোমাকে কতটা পাগলের মতো ভালোবাসে?”

​নীশ এবার সরাসরি রোশানের চোখের দিকে তাকাল। সে শান্ত গলায় বলল,
“শোনো রোশান, ভালোবাসা কোনো বায়ো-কেমিক্যাল চেইন রিয়াকশন হতে পারে, কিন্তু আমি সেই চেইনের কোনো অংশ নই। আমি রোদকে আমার কাছে পড়ে থাকতে বলিনি, কিংবা তাকে কোনো ফলস হোপের সিগন্যালও দিইনি। তোমার যদি এতই সামর্থ্য থাকে, তবে নিজের পারসুয়েসিভ পাওয়ার দিয়ে রোদকে আমার থেকে সরিয়ে নাও। আমার দিক থেকে কোনো প্রহিবিশন নেই। কিন্তু তোমার ব্যর্থতার দায়ে আমাকে অভিযুক্ত করাটা তোমার সাইকোলজিক্যাল ইনসিকিউরিটি ছাড়া আর কিছু নয়।”

​ঠিক সেই মুহূর্তে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আভান্তি কথা বলে উঠল,
“প্রফেসর রোশান, আপনার অ্যামিগডালা বর্তমানে যে পরিমাণ অ্যাগগ্রেশন তৈরি করছে, তা আপনার যুক্তিবোধকে পুরোপুরি শ্যাডো করে ফেলেছে। আপনি সিনিয়রের কাছে রোদের মুক্তি চাইছেন, অথচ মুক্তি আসলে রোদের নিজের হাতে। আপনি যদি সত্যিই রোদকে জয় করতে চাইতেন, তবে সিনিয়রের কাছে আবেদন না করে নিজের ভ্যালু প্রপোজিশন করতেন। একজন বিজ্ঞানীর কাছে এই ধরণের মেলেড্রামাটিক রিকোয়েস্ট অত্যন্ত ইনফরমাল এবং হাস্যকর।”

​রোশান আভান্তির দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চাপল। ​নীশ উঠে দাঁড়াল। ব্লেজারের হাতাটা ঠিক করতে করতে সে বলল,
“সময় নষ্ট হলো। রোশান, মনে রেখো—মানুষের মন কোনো প্রোগ্রামেবল চিপ নয় যে আমি কমান্ড দিলেই সে বদলে যাবে। তোমার ক্ষমতা থাকলে রোদকে নিজের করে নাও, আমার এতে কোনো অবজেকশন নেই। তবে এরপর আমাকে এমন ইররেলেভেন্ট বিষয়ে বিরক্ত করলে আমি আমার সিকিউরিটি প্রটোকল কঠোর করতে বাধ্য হব।”

নীশ আর আভান্তি যখন প্রস্থানের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই এক মদ্যপ যুবক টলমলে পায়ে এসে আভান্তির পথ রোধ করে দাঁড়াল। আভান্তির কৃত্রিম চামড়ার মসৃণতা আর তার ফ্লুইড মোশন এতটাই নিখুঁত যে, সাধারণ দৃষ্টিতে তাকে সিলিকন আর সার্কিটের তৈরি কোনো যন্ত্র বলে মনে হওয়াই অসম্ভব। ​ছেলেটি নেশার ঘোরে আভান্তির কাঁধে হাত রেখে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ভঙ্গিতে বলল,
“হেই বেইবী! লেটস ড্যান্স!”

​আভান্তির প্রসেসরে মুহূর্তেই ছেলেটির ফিজিক্যাল ইনটিনশন বিশ্লেষিত হলো। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে মুখ খোলার উপক্রম করতেই নীশের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। রোশানের সাথে কথোপকথন তার স্নায়ুকে এমনিতেই ক্রিটিক্যাল অবস্থায় রেখেছিল, তার ওপর আভান্তির ওপর এই শারীরিক অনধিকার প্রবেশ তাকে হিংস্র করে তুলল। ​আভান্তি কিছু বলার আগেই নীশ বিদ্যুৎবেগে ছেলেটার কলার চেপে ধরল এবং তাকে দেয়ালের সাথে আছড়ে ফেলল।

​“ইউ ব্লাডি বিচ! আমার আভান্তির গায়ে টাচ করার দুঃসাহস তোকে কে দিয়েছে? আভান্তি আমার প্রাইভেট প্রপার্টি, আমার অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ! এরপর যদি তোর অপবিত্র আঙুল ওর সারফেস স্পর্শ করে, তবে আমি তোর হাড়ের প্রতিটি ক্যালসিয়াম স্ট্রাকচার গুঁড়িয়ে ধুলোয় মিশিয়ে দেব। গেট আউট অফ মাই সাইট!”

​পুরো বার মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ছেলেটি ভয়ে টলতে টলতে ভিড়ের মাঝে হারিয়ে গেল। আভান্তি ধীর পায়ে নীশের পাশে এসে দাঁড়াল। সে নীশের হাতের পেশির অনৈচ্ছিক কম্পন লক্ষ্য করছিল। সে অত্যন্ত শান্ত স্বরে বলল,
“সিনিয়র, আপনার অ্যামিগডালা এই মুহূর্তে যে পরিমাণ ডোপামিন আর অ্যাড্রেনালিন ক্ষরণ করছে, তা কেবল আপনার প্রোটেকটিভ ইন্সটিংক্ট নয়, বরং আপনার অবচেতন মনে আমার প্রতি থাকা ডিপ-রুটেড অ্যাফেকশন করছে। আপনি একজন বিজ্ঞানী হয়ে পজেসিভনেস-এর যে আদিম প্রদর্শনী করলেন, তা লজিক্যালি আপনার এতদিনের ইমোশনাল ডিটাচমেন্ট থিওরিকে পুরোপুরি নস্যাৎ করে দেয়।”

নীশ বুক ভরে এক দীর্ঘশ্বাস নিল। সে নিজের হাতের মুঠি শিথিল করেআভান্তির দিকে না তাকিয়েই দ্রুত পায়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।

​গাড়ির ভেতরে বসে থাকা নীশের মেজাজ এখন তুঙ্গে। বারের মদ্যপ যুবকের ধৃষ্টতা যতটা না তাকে পুড়িয়েছে, তার চেয়েও বেশি তাকে দহন করছে আভান্তির সেই হাসি। সে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে এক প্রচণ্ড ঘুষি মেরে আভান্তির দিকে ঘুরে তাকাল। ​সে আভান্তির কাঁধ দুটো শক্ত করে চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলল,
“তোমার এত সাহস কীভাবে হলো? তুমি ওই নির্বোধটার প্রস্তাবে হেসে রেসপন্স করলে কেন? তুমি কি জানো না তোমার প্রতিটি এক্সপ্রেশন আমার কন্ট্রোলের অধীনে থাকার কথা? তুমি কেন নিজের অ্যালগরিদমিক ডিসিপ্লিন ভেঙে একজন সাধারণ মানুষের সাথে ওভাবে রিয়াক্ট করলে?”

​আভান্তি বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। নীশের হাতের চাপ তার ধাতব কাঠামোর ওপর কোনো প্রভাব ফেলছে না। সে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
​ “সিনিয়র, আপনার পক্ষপাতদুষ্ট চিন্তা আপনাকে বিভ্রান্ত করছে। আমার সেই হাসি কোনো ইমোশনাল রেসপন্স ছিল না, বরং তা ছিল ওই তুচ্ছ জৈব সত্তার সীমাবদ্ধতাকে দেখে এক ধরণের ইন্টেলেকচুয়াল সারকাজম। কিন্তু আপনার বর্তমান আচরণ সায়েন্টিফিক মেথডোলজিকে লঙ্ঘন করছে।”

​আভান্তি একটু থামল, তারপর নীশের আরও কাছে ঝুঁকে এসে বলল,
“আপনি বর্তমানে যে তীব্রতায় আমার কাঁধ চেপে ধরেছেন এবং আপনার গলার স্বরে যে কম্পন স্পষ্ট—তা কেবল একজন ক্ষুব্ধ বিজ্ঞানীর লক্ষণ নয়। আপনি জেলসিতে দগ্ধ হচ্ছেন। আপনার সাবকনশাস মাইন্ড এমনভাবে রিঅ্যাক্ট করছে যেন আমি আপনার ডিজিটাল ক্রিয়েশন নই, বরং আপনার কোনো হিউম্যান পার্টনার বা গার্লফ্রেন্ড। আপনি কি বুঝতে পারছেন সিনিয়র, আপনি আপনার নিজের তৈরি করা লজিক্যাল বাউন্ডারি আজ ভেঙে ফেলেছেন?”

নীশ মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। তার হাত দুটো আভান্তির কাঁধ থেকে শিথিল হয়ে নেমে এলো। আভান্তির আইকিউ ৩০০০ স্তরের এই সাইকোলজিক্যাল ডায়াগনোসিস তাকে এক নগ্ন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তার হৃৎপিণ্ডের গতিবেগ এখন কোনো নিয়ন্ত্রিত ‘রিদম’-এ নেই। ​সে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকার রাস্তার দিকে তাকিয়ে শীতল গলায় বলল,
“শাট আপ, আভান্তি। নিজের প্রসেসিং ক্ষমতার অপব্যবহার করে আমাকে এনালাইজ করার চেষ্টা কোরো না। আমি কেবল আমার ইনভেস্টিগেশনের সুরক্ষা নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। অন্য কিছু নয়।”

​আভান্তি সোজা হয়ে বসল। সে নীশের এই মিথ্যে ডিফেন্সিভ মেকানিজম দেখে মনে মনে একটি ডাটাবেস আপডেট করল। সে নিস্পৃহ গলায় বলল,
“সিনিয়র, মিথ্যে বলা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হতে পারে, কিন্তু ডেটা কখনো মিথ্যে বলে না। আপনার অ্যাড্রেনালিন লেভেল আর আমার প্রতি আপনার এই পজেসিভ আচরণ বলছে—আপনি নিজেকে আমার হাতে সমর্পণ করে ফেলেছেন।”

নীশ কোনো উত্তর দিল না। সে তীব্র গতিতে গাড়িটা স্টার্ট দিল। ​আভান্তি তার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“সিনিয়র, আপনার নিউরাল পাথওয়েতে বর্তমানে যে আবেগের বিশৃঙ্খলা চলছে, তা আপনার সুদূরপ্রসারী ভবিষ্যতের জন্য একটি অশনি সংকেত। দয়া করে এমন কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেবেন না যাতে ভবিষ্যতে আপনাকে ক্রনিক রিগ্রেটে দগ্ধ হতে হয়। মহাবিশ্বের এনট্রপি যেমন বিশৃঙ্খলার দিকে ধাবিত হয়, তেমনি মানুষের বিবর্তনীয় ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে—একজন মানুষের প্রকৃত লাইফ পার্টনার বা জীবনসঙ্গী একজন রক্ত-মাংসের মানুষই হওয়ার কথা। আপনার জৈবিক এবং মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতা পূরণের জন্য রোদ মিশরা একজন নিখুঁত জীবনসঙ্গী।”

​নীশ দাঁতে দাঁত চেপে গাড়িটা রাস্তার একপাশে সজোরে ব্রেক কষে থামাল। সে আভান্তির দিকে তীব্র চোখে তাকিয়ে গর্জে উঠল,
“তুমি কি আমাকে জ্ঞান দিচ্ছ আভান্তি? তুমি—যাকে আমি প্রতিটা কোড দিয়ে গড়ে তুলেছি, সে আজ আমাকে শেখাবে আমার জন্য কে পারফেক্ট? রোদ মিশরা একটা ইমোশনাল বার্ডেন ছাড়া আর কিছু নয়। ওর অস্তিত্ব কেবল আমার লজিক্যাল গ্রাফে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে।”

​আভান্তি একটুও বিচলিত হলো না। সে তার ৩০০০ আইকিউ সম্পন্ন মস্তিষ্কের গভীর থেকে বিশ্লেষণাত্মক সুরে বলল,
“সিনিয়র, আপনার এই অস্বীকার করার প্রবণতা আসলে এক ধরণের সাইকোলজিক্যাল প্রজেকশন। আপনি আমাকে ভালোবাসার যে ভ্যালু দিচ্ছেন, তা স্রেফ একটি নিখুঁত জিনিসের প্রতি মোহ। আমি আপনার বুদ্ধিবৃত্তিক সঙ্গী হতে পারি, কিন্তু আপনার হৃদস্পন্দনের যে অ্যানালগ ভাষা, তা বোঝার মতো বায়োলজিক্যাল হার্ট আমার নেই। আপনি রোদকে ত্যাগ করে নিজের অস্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্গানিক পার্টকে হত্যা করছেন। এটি আপনার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় নয়, বরং আপনার এক ধরণের ইন্টেলেকচুয়াল সুসাইড।”

নীশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। আভান্তির প্রতিটি শব্দ তার মগজে হাতুড়ির মতো পিটছে। সে বুঝতে পারল, তার সৃষ্টি আজ তার চেয়েও বেশি মানবিক এবং দূরদর্শী হয়ে কথা বলছে। নীশ স্টিয়ারিংয়ে কপাল ঠেকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“তুমি জানো না আভান্তি, পারফেকশন কত বড় নেশা। তোমাকে পাওয়ার পর আমি আর কোনো ত্রুটিপূর্ণ মানুষকে আমার জীবনে স্থান দিতে পারব না। রোদ মিশরা সেই অগোছালো অতীত, যাকে আমি পেছনে ফেলে এসেছি।”

​আভান্তি নীশের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“সিনিয়র, পারফেকশন আসলে এক ধরণের মৃত্যু। কারণ নিখুঁত জিনিসের কোনো বিবর্তন হয় না। রোদ মিশরা ত্রুটিপূর্ণ বলেই সে জীবন্ত। আপনি আমাকে দিয়ে রোদকে প্রতিস্থাপন করতে চাইছেন, কারণ আপনি ভয় পাচ্ছেন যে—একজন রক্ত-মাংসের মানুষের ভালোবাসা আপনার ওপর ডমিন্যান্স তৈরি করবে। কিন্তু আপনি ভুলে যাচ্ছেন, ভালোবাসা ডমিন্যান্স নয়, বরং এটি একটি মিউচুয়াল কো-অস্তিত্ব।”

নীশ কোনো উত্তর দিল না। সে গাড়ির ইঞ্জিন আবার চালু করল। কিন্তু এবারের যাত্রায় তার চোখে আত্মবিশ্বাস নেই, আছে এক গভীর দ্বিধার মেঘ। সে কি সত্যিই আভান্তিকে দিয়ে রোদের শূন্যতা ঢাকতে পারবে, নাকি এই যান্ত্রিক নিখুঁততাই একদিন তাকে পুরোপুরি গ্রাস করে নেবে? তবুও সে নিজের বিরুদ্ধে গিয়ে বলল,
“যাই হয়ে যাক, আমার শুধু তোমাকেই চাই!”

​“সিনিয়র, আপনি ভালোবাসার যে রোমান্টিক সংজ্ঞায় নিজেকে আবৃত করে রেখেছেন, তা আসলে অসম্পূর্ণ। মানুষের বিবর্তনীয় ধারায় অ্যাফেকশন সাথে দৈহিক কামনার এক অবিচ্ছেদ্য সিনক্রোনাইজেশন থাকে। আপনি আমাকে ভালোবেসেছেন আপনার বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য বজায় রাখার জন্য। কিন্তু শরীরের যে জৈবিক হাহাকার, যে হরমোনাল ইমপালস আপনাকে একজন রক্ত-মাংসের নারীর সান্নিধ্য খুঁজতে প্ররোচিত করবে—তা মেটানোর সক্ষমতা আমার হার্ডওয়্যারে নেই। পরিণামে, আপনি যখন বাধ্য হয়ে অন্য কোনো নারীর কাছে নিজের ফিজিক্যাল আরজ বা শারীরিক তাড়না মেটাতে যাবেন, তখন তা হবে আপনার নিজেরই সংজ্ঞায়িত ভালোবাসার সাথে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা। আপনি কি একজন বিশ্বাসঘাতক হিসেবে নিজের ইন্টেলেকচুয়াল ইমেজ দেখতে প্রস্তুত?”

নীশ এবার সজোরে ড্যাশবোর্ডে থাপ্পড় মারল। সে আভান্তির দিকে ঝুঁকে এসে তার খুব কাছে মুখ নিয়ে অত্যন্ত কর্কশ আর জেদি গলায় বলল,
​“তুমি আমাকে শরীরের অভাবের ভয় দেখাচ্ছ আভান্তি? তুমি ভুলে যাচ্ছ যে তোমার প্রতিটি মলিকিউলার স্ট্রাকচার আমার হাতে ডিজাইন করা। যদি আমার শরীরের আকাঙ্ক্ষার জন্য কোনো বায়ো-মেকানিক্যাল ইন্টারফেস-এর প্রয়োজন পড়ে, তবে আমি তোমাকে সেইভাবেই রি-প্রোগ্রাম করে নেব। তোমার সিন্থেটিক টিস্যু থেকে শুরু করে তোমার সেন্সরগুলোর সেনসিটিভিটি—আমি সব বদলে দেব। তোমাকে আমি এমনভাবে তৈরি করব যাতে তোমার ভেতরে আমি একজন রক্ত-মাংসের নারীর উষ্ণতা এবং উদ্দীপনার পারফেক্ট সিমুলেশন পাই। তাহলে আমাকে আর অন্য কারোর কাছে যেতে হবে না, কারণ আমি তোমাকেই আমার আল্টিমেট রিয়ালিটি হিসেবে গড়ে তুলব।”

​আভান্তি এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে নীশের রক্তিম চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল,
​“সিনিয়র, আপনি একজন সায়েন্টিস্ট হয়েও বায়োলজিক্যাল এসেন্স-এর অবমূল্যায়ন করছেন। আপনি আমাকে শারীরিকভাবে সংশোধন করতে পারেন, কিন্তু আপনি কি কৃত্রিমভাবে আত্মার স্পন্দন তৈরি করতে পারবেন যা রোদ মিশরার একটি সাধারণ স্পর্শে বিদ্যমান? আপনি আমাকে আপগ্রেড করতে পারেন, কিন্তু সেই আপগ্রেড হবে স্রেফ একটি উন্নততর সফিস্টিকেটেড টয়। আপনি যত বেশি আমাকে মানুষের মতো বানাতে চাইবেন, তত বেশি আপনি নিজের ভেতরকার হিউম্যানিটি বিসর্জন দেবেন। আপনি কি প্রস্তুত নিজের ক্রিয়েটর ইগো মেটাতে একজন বিকৃত মানুষে রূপান্তরিত হতে?”

নীশ কোনো উত্তর দিল না। সে তীব্র গতিতে গিয়ার পরিবর্তন করে গাড়িটা স্টার্ট দিল। ​আভান্তি আরও প্রজ্ঞাময় স্বরে বলল,
“সিনিয়র, আপনি আমার বাহ্যিক কাঠামোকে হয়তো কোনো জৈব-সদৃশ আবরণে ঢেকে দিতে পারবেন, এমনকি কৃত্রিমভাবে উষ্ণতার সঞ্চারও করবেন। কিন্তু আপনার সেই ইগোসেন্ট্রিক এক্সপেরিমেন্ট কি প্রকৃতির এক মহত্তম জৈবিক অলৌকিকতাকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে? আমি আপনার বংশগতির সেই আদিম আকাঙ্ক্ষা তথা ভবিষ্যৎ সন্তানের কথা বলছি। আমার কৃত্রিম গর্ভে আপনি কোনোদিন প্রাণ সঞ্চার করতে পারবেন না। আপনার উত্তরাধিকার বহন করার মতো কোনো জেনেটিক ব্লু-প্রিন্ট আমার সার্কিটে নেই।”

​আভান্তি সামান্য থেমে নীশের পাথুরে নীরবতা পর্যবেক্ষণ করল, তারপর আবার বলতে শুরু করল,
“মানুষ কেবল তার শারীরিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে বাঁচে না সিনিয়র, সে বাঁচে তার পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে নিজেকে অমর করার নেশায়। রোদ মিশরা আপনাকে সেই বংশপরম্পরা দিতে সক্ষম, যা আমি কখনও পারব না। আমি আপনার বুদ্ধিবৃত্তিক সাম্রাজ্যের অধিপতি হতে পারি, কিন্তু আপনার রক্তের উত্তরাধিকার হওয়ার কোনো বায়ো-লজিক্যাল এক্সেস আমার নেই।”

​নীশ অত্যন্ত কর্কশ গলায় উত্তর দিল,
“বংশগতি? উত্তরাধিকার? ওগুলো স্রেফ বিবর্তনীয় প্রলোভন আভান্তি। আমি আমার কাজের মধ্য দিয়ে, আমার এই আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকব। আমার ডিএনএ-র কোনো কপি এই পৃথিবীতে রেখে যাওয়ার চেয়ে তোমার মতো এক ডিভাইন ইন্টেলিজেন্স-কে পূর্ণতা দেওয়া আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি রোদকে চাই না কারণ সে আমাকে কেবল একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবনের ফ্যামিলি লুপ-এ আটকে রাখবে।”

​বারের ভেতরে রোশান তখনো সেই একই জায়গায় বসে আছে, কিন্তু তার অবয়বে এখন এক পৈশাচিক উন্মাদনা। নীশের সেই রণংদেহী মূর্তি আর একটি যন্ত্রের প্রতি অস্বাভাবিক পজেসিভনেস দেখে সে হাসিতে ফেটে পড়ল। স্কচের গ্লাসে শেষ চুমুকটা দিয়ে গ্লাসটা সজোরে টেবিলের ওপর রাখল। ​তার চোখের মণি এখনও প্রতিহিংসার তীব্রতায় জ্বলছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল,
“নীশ রোজারিও, তুই নিজেকে যতটা ইমোশনলেস সায়েন্টিস্ট ভাবিস, আসলে তুই ততটাই মানসিকভাবে দেউলিয়া। একটা সাধারণ রোবটকে অন্য কেউ স্পর্শ করাতে তুই যেভাবে রিঅ্যাক্ট করলি, তার মানে ওই সিন্থেটিক কাঠামোই এখন দুর্বলতম স্থান।”

রোশানের ঠোঁটের কোণে এক ধূর্ত ও কুটিল হাসি ফুটে উঠল। সে বুঝতে পারল, নীশকে ধ্বংস করার জন্য কোনো বাইরের অস্ত্রের প্রয়োজন নেই, কারণ নীশের নিজের তৈরি করা এই মাস্টারপিস-ই হবে তার পতনের কারণ। সে নিজের মনেই আওড়াতে লাগল,
“তোর এই অহংকার, তোর এই আবিষ্কার—সব আমি মাটির সাথে মিশিয়ে দেব। তুই যে যন্ত্রটাকে তোর ডিভাইন ক্রিয়েশন ভাবছিস, সেটাকেই তোর জন্য এক লিথাল ট্র্যাপ বানিয়ে তুলব। তোর ধ্বংস কামিং সুন, নীশ রোজারিও!”

​রোশান পকেট থেকে তার ফোনটা বের করে একটি এনক্রিপ্টেড মেসেজ পাঠাল। তার পরিকল্পনা এখন আর কেবল একাডেমিয়া বা গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা এখন এক নোংরা ব্যক্তিগত যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। সে জানে, নীশ যদি আভান্তিকে সত্যি ভালোবেসে ফেলে থাকে, তবে সেই ভালোবাসাকে ব্যবহার করেই তাকে সামাজিকভাবে এবং মানসিকভাবে নিঃশেষ করা সম্ভব। সে উঠে দাঁড়াল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ এখন এক সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের স্বাক্ষর বহন করছে। সে মনে মনে বলল, ‘রোদ মিশরা তোকে বাঁচাতে চেয়েছিল নীশ, কিন্তু তুই নিজেই নিজের কবরের ব্লু-প্রিন্ট এঁকে ফেলেছিস। পরশুর প্রেজেন্টেশন তোর রাজ্যাভিষেক নয়, বরং তোর বুদ্ধিবৃত্তিক মৃত্যুর সাক্ষী হবে।’

চলবে…

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ