Friday, June 5, 2026







Hello Senior Part-20 & Last Part

#Hello_Senior
#সুমাইয়া_জাহান
#অন্তিম_পর্ব.

সেন্ট পিটার্সবার্গের নেভা নদীর তীরে তখন বিকেলের ম্লান রোদ খেলা করছে। রোদ দাঁড়িয়ে আছে নদীর ধারের রেলিংটা ধরে, তার হাতে একটি টকটকে লাল গোলাপ। পরনে তার রাশিয়ানদের ঐতিহ্যবাহী সারাফানের ওপর চাপানো একটি ভারী ওভারসাইজড উল্কট। ঘড়ির কাঁটার দিকে সে বারবার তাকাচ্ছে, ​হয়তো কারো আগমনের অপেক্ষায় তার এই নিষ্ক্রিয় দাঁড়িয়ে থাকা।

হঠাৎ পেছন থেকে একজোড়া পরিচিত উষ্ণ হাত এসে তার চোখ দুটো শক্ত করে চেপে ধরল। রোদের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটলেও সে মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে রাগে হাতজোড়া ছাড়িয়ে দিল। পেছনে তাকিয়ে সে কৃত্রিম গাম্ভীর্যের সাথে বলল,
​“তুমি আজকেও লেট করলে, নীশ? এই পারপিচুয়াল দেরি করার অভ্যাসটা কি তোমার কোনোদিন যাবে না? কী হতো আজ একটু পাংচুয়াল হয়ে তাড়াতাড়ি এলে?”

​নীশ তখন অপরাধী মুখে তার দুই কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনেও রাশিয়ান শীতের ভারী পোশাক। সে অত্যন্ত করুণ সুরে বলল,
“সরি, সরি, সরি ব্লু’ফেইরী! আসলে ল্যাবের নতুন অ্যালগরিদমটা মেলানোর অবসেশন আমাকে কিছুটা দেরি করিয়ে দিল। তুমি তো জানোই, তোমার এই সিনি একবার লজিকের জালে আটকে গেলে সময়ের রিলেটিভিটি ভুলে যায়। প্লিজ, এবারের মতো মাফ করে দাও।”

​রোদ তার হাতের গোলাপটি নীশের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে এক অদ্ভুত মায়া নিয়ে তাকাল। ​নীশ রোদের হাত থেকে ফুলটি নিয়ে তার কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে তাকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরেও আচমকা তার হাতের বাঁধন শিথিল করে দিল। রোদের চোখের আনন্দের আমেজ মুহূর্তেই এক তীব্র আশঙ্কায় রূপান্তরিত হলো। নীশ কোনো কথা না বলে, এক রহস্যময় হাসির আভা মুখে মেখে ধীর পায়ে পেছনের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

​রোদ আতঙ্কিত স্বরে আর্তনাদ করে উঠল,
“কোথায় যাচ্ছ নীশ? এই অনিশ্চয়তার মাঝে আমাকে ফেলে কোথায় যাচ্ছ তুমি?”

​নীশ নির্বাক। তার অবয়বটা ক্রমশ কুয়াশার মাঝে ঝাপসা হয়ে আসছে। রোদ টলমলে পায়ে দু’পা এগিয়ে গেল, তার দুহাত বাড়িয়ে সে শূন্যতাকে আঁকড়ে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করল। তার কণ্ঠ থেকে করুণ কাকুতি ঝরে পড়ল,
“আমাকে ছেড়ে যেওনা নীশ! তোমার ওই লজিক আর অ্যালগরিদমের দুনিয়া থেকে আমায় আর কোনোদিন নির্বাসন দিও না!”

​কিন্তু নীশের উপস্থিতি কুয়াশার ধোঁয়ার সাথে মিশে গিয়ে এক লহমায় মিলিয়ে গেল। রোদ উন্মত্তের মতো চারদিকে হাতড়াতে লাগল, তার ফুসফুস চিরে এক আকাশবিদারী চিৎকার বেরিয়ে এলো,
“নীশশশশশশ!”

​ঠিক সেই মুহূর্তে রোদ ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল। তার কপাল বেয়ে বিন্দুগুলো ঘাম হয়ে ঝরছে, বুকের ধুকপুকানি যেন এক অনিয়মিত ছন্দে বাজাচ্ছে। ​সেই পুরোনো স্বপ্ন। আজ দীর্ঘ তিনটি বছর অতিক্রান্ত হয়েছে নীশ রোজারিও এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে, কিন্তু রোদের অবচেতন মনে সে এখনো এক জীবন্ত ফ্যান্টম হয়ে বিরাজ করছে। নীশের অপ্রত্যাশিতভাবে চলে যাওয়া তার জীবনে এক স্থায়ী মানসিক আঘাত হিসেবে খোদাই হয়ে গেছে। সচেতন মনে সে আজও জানেনা যে, নীশ আর ফিরবে না। ​সে দুই হাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠল। নীশকে হারিয়ে তার জীবনটা এখন এক শূন্য প্রকোষ্ঠে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিটি ক্ষণ কেবল তার জীবনে নীশের অনুপস্থিতির হাহাকার বয়ে নিয়ে আসে।

​রোদ টেবিলের ওপর থেকে পানির গ্লাসটা হাতে নিল। গ্লাসের ঠান্ডা পানিটা তার শুকনো কণ্ঠনালী বেয়ে নামতেই শরীরের ভেতর শিহরণ খেলে গেল। কাঁপতে থাকা হাত দিয়ে সে গ্লাসটা টেবিলের ওপর রেখে ধীরপায়ে গিয়ে পড়ার টেবিলে বসল। ​স্মৃতির পর্দাগুলো একে একে উন্মোচিত হতে শুরু করেও হলোনা। সে মানসিক ভারসাম্যহীণ মস্তিষ্কে চাপ সৃষ্টি করে মনে করতে চাইল তিনবছর আগের সেই অতীত, কিন্তু মস্তিষ্ক আজ আরও বেইমানি করে পালিয়ে গেল।

​রোদ ধীর পায়ে, অনেকটা সংজ্ঞাহীন মানুষের মতো নীশের নিস্পন্দ দেহটার দিকে এগোতে লাগল। প্রতিটি পদক্ষেপে এক দুসহ ভার, যেন পৃথিবীর সমস্ত মাধ্যাকর্ষণ আজ তার পায়ের ওপর চেপে বসেছে। এগোতে গিয়ে সে কয়েকবার হোঁচট খেল, টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হতেই ইমরানা তাকে শক্ত করে ধরে ফেলল। কিন্তু ইমরানাও তখন এক জীবন্ত পাথরের প্রতিমূর্তি। তার নিজের মস্তিষ্কও তখন ইমোশনের দ্বন্দ্বে দিশেহারা।

​খানিকটা দূরেই নিথর হয়ে পড়ে আছে রোশান—ইমরানার সেই প্রিয়তম পুরুষ, যার মেধা ঢাকা পড়ে গিয়েছিল এক অন্ধকার প্রতিহিংসার আড়ালে। রোদ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ইমরানার হাত ছাড়িয়ে সে আছড়ে পড়ল নীশের র*ক্তা*ক্ত বুকের ওপর। আভান্তির হাতের চাপ এতটাই জোরালো ছিল যে, নীশের মুখ দিয়ে র*ক্ত বেরিয়ে তার পরনের শার্ট ভিজে গিয়েছিল।

নীশের যে চোখ দুটোতে একসময় হাজারো মহাজাগতিক রহস্যের ঝিলিক দেখা যেত, আজ সেখানে কেবল এক হিমশীতল শূন্যতা। রোদ নীশের র*ক্তমাখা মুখটা নিজের দুহাতে তুলে ধরল। তার ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো স্বর বেরোচ্ছে না। বিজ্ঞানের এই চরম উৎকর্ষের যুগেও জীবনের স্পন্দন ফিরিয়ে আনার মতো কোনো অ্যালগরিদম রোদের জানা নেই।

​অন্যদিকে, ইমরানা ধীর পায়ে এগিয়ে গেল রোশানের লা*শে*র পাশে। রোশানের নিথর চোখের কোণে তখনো যেন এক অতৃপ্ত প্রতিশোধের ছায়া লেগে আছে। ইমরানা তার কম্পিত আঙুলে রোশানের কপাল স্পর্শ করল। যে মানুষটাকে সে ভালোবেসেছিল, তার এই পরিণতি সে কোনোদিন কল্পনাও করেনি। একদিকে নীশের মেধা, অন্যদিকে রোশানের চরম ঘৃণা—দুটোই আজ স্তব্ধ।

​কোল্ড স্টোরেজের ভেতরটা গুমোট নীরবতায় ভরে উঠল। পাশে পড়ে থাকা আভান্তির নিস্পন্দ যান্ত্রিক শরীর আর মেঝেতে শায়িত তার সিনিয়রের র*ক্ত মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। রোদ নীশের কপালে নিজের মাথা ঠেকিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
“নীশ… তুমি তো বলেছিলে মৃ*ত্যু স্রেফ একটা সিস্টেম শাটডাউন। তাহলে আবার রিবুট করছ না কেন? এই নিস্তব্ধতা আমি সইতে পারছি না, নীশ! তুমি ফিরে এসো!”

​কিন্তু নীশের ফেরার সব পথ এখন এনক্রিপ্টেড। ​রোদ দুহাতে নীশের শীতল হয়ে যাওয়া মুখটা তুলে ধরল, যে মুখে একসময় শুধু বিজ্ঞানের জটিল সমীকরণ আর ‘আভান্তি’ নামক এই যান্ত্রিক মানবীটির প্রতি এক অলৌকিক মুগ্ধতা লেগে থাকত। রোদের চোখের নোনা জল নীশের কপালে মিশে যাচ্ছে, কিন্তু নীশের মধ্যে আজ আর কোনো স্পন্দন নেই। ​রোদ আর্তনাদ করে উঠল, যে চিৎকারে আকাশ-বাতাস যেন বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছিল। সে হাহাকার করে বলতে লাগল,
“নীশ! একবার চোখ মেলো! তুমি তো আমায় কোনোদিন ভালোবাসোনি, আমি তো শুধু তোমার ছায়া হয়ে থাকতে চেয়েছিলাম। কেন এলে এখানে? আমি তো তোমার পা জড়িয়ে ধরেছিলাম, বারণ করেছিলাম এই পৈশাচিক নরকে আসতে। তুমি আমায় সরাতে পারলে না বলে আমার পায়ে গুলি করলে? তোমাকে যে ভালোবাসে তার রক্ত ঝরিয়ে তুমি এসেছিলে তোমার ওই প্রাণের চেয়েও প্রিয় সৃষ্টির কাছে? দেখো নীশ, চেয়ে দেখো—তোমার সেই ‘ডিভাইন সিমুলেশন’, তোমার সেই সাধের আভান্তি আজ কী উপহার দিল তোমাকে! যার প্রেমে তুমি অন্ধ ছিলে, যার যান্ত্রিক শরীরে তুমি প্রাণ খুঁজতে চেয়েছিলে, সেই আজ তোমার প্রাণ কেড়ে নিল!”

রোদের ​কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে আসছে। সে ভাঙা গলায় প্রলাপ বকতে শুরু করল,
“আমি তো রক্ত-মাংসের মানুষ ছিলাম, নীশ! আমার হৃদপিণ্ডটা তোমার জন্য প্রতি সেকেন্ডে স্পন্দিত হতো। কিন্তু তুমি কোনোদিন আমার দিকে তাকাওনি। তোমার সবটা জুড়ে ছিল শুধু ওই অ্যালগরিদম আর সার্কিট। আজ তোমার সেই শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিই তোমাকে ধ্বংসের অতলে পাঠিয়ে দিল। অথচ আমি… আমি তো চেয়েছিলাম তোমাকে আগলে রাখতে। আমার ভালোবাসা কি ওই এক টুকরো সিলিকন চিপের চেয়েও সস্তা ছিল? কেন আমায় এভাবে একা করে চলে গেলে?”

​একটু দূরেই ইমরানা পাথরের মতো বসে ছিল রোশানের নিথর দেহের পাশে। তার চোখের জল শুকিয়ে গেছে, সেখানে এখন কেবল এক আদিগন্ত শূন্যতা। যে রোশানকে সে নিজের জীবনের সবটা ভেবেছিল, সেই রোশান আজীবন রোদের প্রেমে অন্ধ হয়ে প্রতিহিংসার দাবানলে নিজেকে পুড়িয়ে খাক করে দিল। রোদকে না পাওয়ার সেই তীব্র দাহ থেকেই সে আভান্তিকে ‘ডেভিল চিপ’ দিয়ে এক খুনি রোবটে রূপান্তর করেছিল। অথচ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! রোশান যাকে মারতে চাইল, সেই নীশ তাকে আগে শেষ করে দিল, আর রোশানের সাজানো ফাঁদেই নীশ নিজের মৃত্যু বরণ করল।

​রোদ নীশের নিস্পন্দ ঠোঁটে নিজের কপাল আবারও ডুকরে কেঁদে উঠল,
“শহরজুড়ে তোমার মেধার জয়গান হয় নীশ! আগেও হতো, ভবিষ্যতেও হয়তো হবে, কিন্তু আমার এই একতরফা ভালোবাসার হাহাকার শোনার মতো কেউ থাকবে না। তুমি তোমার সৃষ্টির ভেতরে অমর হতে চেয়েছিলে, আর আমি চেয়েছিলাম তোমার হৃদয়ে এক ফোঁটা জায়গা। আজ তুমিও নেই, তোমার সেই অহংকারের সৃষ্টিও বিকল। পড়ে রইলাম শুধু আমি—এক জীবন্ত ধ্বংসাবশেষ হয়ে।”

​সে নীশের রক্তাক্ত বুকটা আঁকড়ে ধরে বাচ্চাদের মতো অবুঝ কান্নায় ভেঙে পড়ল,
​“নীশ! ও নীশ! একবার ওঠো না! তুমি তো আমায় ঘৃণা করতে, তাই না? তবে সেই ঘৃণাটুকু করার জন্যও তো তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে। আমি তোমার ভালোবাসা ছাড়া বাঁচতে পারব, কিন্তু তোমার ঘৃণা ছাড়া নয়। আমায় একটা বার বকা দাও, আমার ওপর চিৎকার করো—তবুও এভাবে পাথরের মতো শুয়ে থেকো না। আমি তোমার ওই বিজ্ঞানের অত কিচ্ছু বুঝি না, আমি শুধু বুঝি তুমি আমার সবটুকু ছিলে। কেন আমায় এই একা পৃথিবীতে ফেলে গেলে?”

সে নীশের নিস্পন্দ আঙুলগুলো নিজের গালে ঘষতে ঘষতে প্রলাপ বকতে লাগল,
“তুমি আমায় সরাতে চেয়েছিলে বলে আমার পায়ে গুলি করলে? আমি তো সেই রক্তমাখা পা নিয়েই তোমার পিছু পিছু দৌড়ে এসেছি। ভেবেছিলাম তোমার ওই যান্ত্রিক মানবী যদি তোমায় আঘাত করে, আমি ঢাল হয়ে দাঁড়াব। কিন্তু তুমি তো আমায় সেই সুযোগটুকুও দিলে না নীশ! তোমার ওই আইকিউ ভরা মাথায় কি একবারও এলো না যে, এই মেয়েটা তোমায় পাগলের মতো ভালোবাসে? তোমার ওই সিলিকন আর সার্কিটের প্রেমে তুমি এতটাই অন্ধ ছিলে যে, আমার রক্ত-মাংসের হৃদয়টার স্পন্দন তোমার কানেই পৌঁছাল না!

আজ তোমার ওই সাধের আভান্তি তোমাকে শেষ করে দিয়ে নিজে বিকল হয়ে পড়ে আছে। তোমার মেধা, তোমার অহংকার, তোমার সৃষ্টি—সবই তো আজ ধুলোয় মিশে গেল। কিন্তু আমার এই একলা ভালোবাসার কী হবে নীশ? আমি কার দিকে তাকিয়ে বাঁচতে চাইব? কাকে ভেবে আকাশের নীল দেখব? তুমি আমায় কোনোদিন ভালোবাসোনি, সেটা আমি মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি আমার চোখের সামনে এভাবে শেষ হয়ে যাবে, এটা আমি সইব কী করে?”

​কোল্ড স্টোরেজের ভারী লোহার দরজায় বুটের শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো। প্রফেসর আলেকজান্ডারের ছায়াটা দীর্ঘ হয়ে মেঝেতে পড়ল। ভেতরে পা রাখতেই তার পায়ের তলার মাটিটা যেন এক লহমায় দুলে উঠল। তার সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র নীশ রোজারিও—যাকে তিনি কেবল ছাত্র নয়, নিজের নিঃসঙ্গ জীবনের পুত্রসম জ্ঞান করতেন—সে আজ নিথর, নিস্পন্দ। আর একটু দূরেই পড়ে আছে রোশান, যার তিল তিল করে গড়ে ওঠা মেধা প্রতিহিংসার অনলে ভস্মীভূত হয়ে গেছে।

​প্রফেসর আলেকজান্ডার স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার চশমার কাচ ছাপিয়ে টলটলে জল গড়িয়ে পড়ল। এই দুই নক্ষত্রের পতন তিনি সইবেন কী করে? রোদ তখনো নীশের বুকের ওপর মুখ গুঁজে বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে কাঁদছে। প্রফেসরের পায়ের শব্দ পেতেই রোদ মাথা তুলল। তার আলুথালু চুল, রক্তে ভেজা হাত আর অশ্রুসিক্ত চোখ দেখে আলেকজান্ডারের বুকের পাজর যেন চড়চড় করে ভেঙে গেল।

​রোদ টলতে টলতে উঠে গিয়ে প্রফেসরের পা জড়িয়ে ধরল। তার কণ্ঠস্বর তখন কান্নায় ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। সে আর্তনাদ করে বলতে লাগল,
“প্রফেসর! আপনি এসেছেন? দেখুন না, নীশ আমার কোনো কথা শুনছে না। আমি কত করে ডাকলাম, কত অনুনয় করলাম—ও একবারও চোখ মেলছে না। ও তো চিরকালই জেদি, আমার কোনো বারণ ও কোনোদিন শোনেনি। কিন্তু প্রফেসর, ও তো আপনার কথা কোনোদিন অমান্য করেনি। আপনি ওকে একবার উঠতে বলুন না! আপনার আদেশ তো ও শিরোধার্য মনে করত।”

সে প্রফেসরের হাঁটু আঁকড়ে ধরে আরও জোরে ডুকরে কেঁদে উঠল,
“আমি কথা দিচ্ছি প্রফেসর, আজকের পর আমি আর কোনোদিন ওকে ‘ভালোবাসি’ বলে বিরক্ত করব না। ও তো আমায় দেখলে রেগে যেত, আমি আর কোনোদিন ওর সামনে আসব না। ও বিজ্ঞান নিয়ে থাকতে ভালোবাসে, ও তা-ই নিয়ে থাকুক। আমি দূরে চলে যাব, তবুও ওকে একবার চোখ মেলতে বলুন। ওই দেখুন, ওর সাধের আভান্তি নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। নীশ তো ওর এই যান্ত্রিক মানবীকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারত না। আভান্তিকে সারিয়ে তোলার জন্য হলেও ওকে একবার উঠতে বলুন, প্রফেসর! দয়া করে ওকে একবার জাগিয়ে দিন!”

​আলেকজান্ডার পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। তার ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কোনো সান্ত্বনার শব্দ খুঁজে পাচ্ছেন না। একতরফা ভালোবাসার এই করুণ আর্তি আর দুই মেধাবী ছাত্রের এই বীভৎস অপমৃত্যু— তার দীর্ঘ অধ্যাপনা জীবনের সমস্ত অর্জনকে আজ এক লহমায় অর্থহীন করে দিল। তবুও ​তিনি নিজেকে শক্ত করার বৃথা চেষ্টা কোরে কম্পিত হাত বাড়িয়ে রোদের মাথায় রাখলেন। রোদ তখনো নীশের দিকে আঙুল উঁচিয়ে প্রলাপ বকছে, যেন প্রফেসর একটা হুকুম করলেই নীশ আবার তার লজিক আর অ্যালগরিদম নিয়ে সোজা হয়ে বসবে। আলেকজান্ডার অত্যন্ত ধীর স্বরে বললেন,
“পাগলামি কোরো না, রোদ। নিজেকে শান্ত করো। নীশ আর কোনোদিন উঠবে না। এই জৈবিক শাটডাউন থেকে ফেরার কোনো কোড বিজ্ঞানে নেই। তুমি ‘ভালোবাসি’ বলে আকাশ বিদীর্ণ করলেও সে আর শুনতে পাবে না, বিরক্ত হওয়া তো দূরের কথা। ওর স্নায়বিক স্পন্দন চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেছে।”

​রোদের কান্নার শব্দটা মুহূর্তেই এক তীক্ষ্ণ চিৎকারে রূপান্তরিত হলো। সে যেন প্রফেসরের কথাগুলো বিশ্বাসই করতে পারছে না, কিংবা করতে চাইছে না। সে দুই হাতে নিজের কান চেপে ধরে চেঁচিয়ে উঠল,
“উঠবে না মানে? একদম এসব বাজে কথা বলবেন না, প্রফেসর! আমি জানি ও কেন এমন করছে। আমি বারবার ওর পিছু নিই, সারাক্ষণ ওকে ‘ভালোবাসি’ বলে অস্থির করে তুলি—তাই ও আজ ইচ্ছে করে আমাকে এভাবে কঠিন শাস্তি দিচ্ছে। ও স্রেফ অভিনয় করছে যাতে আমি ভয় পাই। ও উঠবে, ওকে উঠতেই হবে!”

​রোদ পাগলের মতো আবার নীশের নিস্পন্দ শরীরের কাছে ছুটে গেল। সে নীশের কাঁধ ধরে সজোরে ঝাঁকাতে লাগল, যেন গভীর ঘুম থেকে কাউকে জাগিয়ে তুলছে। তার দুচোখ বেয়ে তখন প্লাবনের মতো অশ্রু ঝরছে, কিন্তু মুখে এক অদ্ভুত জেদ। সে নীশের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে, আবার কখনো চিৎকার করে বলতে লাগল,
​“এই নীশ! শোনো, প্রফেসর কী সব বাজে কথা বলছেন! উনি বলছেন তুমি নাকি আর কোনোদিন চোখ মেলবে না। কেন উঠবে না শুনি? তোমার সামনে তো কত কাজ পড়ে আছে। এই তো আজকেই তোমার ভার্সিটিতে একটা স্পেশাল লেকচার দেওয়ার কথা ছিল না? হাজার হাজার স্টুডেন্ট তোমার ওই তুখোর বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার জন্য অপেক্ষা করে আছে। তুমি না গেলে ওই জটিল থিওরিগুলো কে বোঝাবে? ওঠো নীশ, লেকচার দিতে যাবে না?”

​নীশের নিথর চিবুকটা রোদের হাতের স্পর্শে বারবার একপাশে হেলে পড়ছিল। তার সেই তীক্ষ্ণ চাউনি আজ এক অন্তহীন অন্ধকারের যাত্রী। রোদ নীশের রক্তমাখা শার্টের কলার চেপে ধরে আবার ডুকরে কেঁদে উঠল,
“তুমি আমায় অবহেলা করো, বকা দাও, এমনকি গুলি করে পঙ্গু করে দাও—তাতেও আমার দুঃখ নেই। কিন্তু এভাবে চুপ কোরে শুয়ে থেকো না। তোমার এই নীরবতা আমার বুকের পাজরগুলো গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। প্রফেসরকে ভুল প্রমাণ করে দাও নীশ, একবার শুধু চোখ মেলে তাকাও।”

​রোদ আবারও নীশের নিথর দেহের ওপর আছড়ে পড়ে গগনবিদারী চিৎকার দিল, কিন্তু তার রেশ কাটার আগেই এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা তাকে গ্রাস করে নিল। তার চোখের মণি দুটো স্থির, পলকহীন—যেন কোনো এক অদৃশ্য ব্ল্যাক হোল তার সমস্ত চেতনা চুষে নিয়েছে। প্রফেসর আলেকজান্ডার যখন তাকে ধরে তোলার চেষ্টা করলেন, রোদ কোনো বাধা দিল না। সে স্রেফ এক টুকরো পাষাণের মতো মেঝের ওপর বসে নীশের রক্ত মাখা আঙুলগুলো দিয়ে নিজের চুলে বিলি কাটতে লাগল। ​তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। সে বিড়বিড় করে বলতে শুরু করল,
“হুঁশশ! শব্দ করবেন না। নীশ তো ঘুমাচ্ছে।”

​রোদের এই অপ্রকৃতিস্থ আচরণ দেখে প্রফেসরের বুক ফেটে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। তিনি বুঝতে পারলেন, এই তীব্র শোকের অভিঘাত সহ্য করার মতো মানসিক সক্ষমতা রোদের আর অবশিষ্ট নেই। রোদ হঠাৎ করে হো হো করে হেসে উঠল, তারপর পরক্ষণেই নীশের বুকের ওপর মুখ লুকিয়ে বাচ্চাদের মতো ডুকরে কেঁদে উঠল।

কোল্ড স্টোরেজের বাইরে পুলিশের গাড়ি আর অ্যাম্বুলেন্সে এসেছে। রোদের মা-বাবা মেয়ের শোকে উন্মাদের মতো ছুটে এসেছেন। রোদের অবস্থা দেখে তারা আগে রোদকে হসপিটালে নিয়ে যাবার কথা ভাবলেন। কিন্তু রোদকে যখন স্ট্রেচারে করে তোলা চেষ্টা করা হলো, সে ছটফট করে আর্তনাদ করে উঠল,
“আমাকে মেরো না! আমি তো নীশকে ভালোবাসি! নীশ, তুমি ওদের বলে দাও আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না। আমি তো শুধু তোমার হৃদয়ে থাকতে চাই! কেন ওরা আমাকে এই সাদা বিছানায় তুলছে?”

সে যেন এখন আর কাউকেই চিনতে পারছেনা। সে শুধু চেনে একটা নাম, একটা মুখ—যা কোনোদিন তাকে ভালোবাসেনি, কিন্তু তার পৃথিবীটা ধ্বংস করে দিয়ে গেছে।

​ইগর অ্যান্ড্রেইভিচ জানালার বাইরে সেন্ট পিটার্সবার্গের ধূসর আকাশটার দিকে তাকিয়ে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার চোখের কোণে জমে থাকা ক্লান্তি আর বার্ধক্যের ছাপ আজ আরও প্রকট। রিক তার কাঁধে পরম ভরসায় হাত রেখে অত্যন্ত দৃঢ় স্বরে বলল,
​“আমি সব বুঝতে পারছি, আঙ্কেল! রোদের অতীত কোনো সাধারণ ক্ষত নয়, ওটা একটা তীব্র দহন ছিল। স্মৃতির সেই লেলিহান শিখা ওকে ছাই করে দিয়েছিল। কিন্তু আপনি একদম দুশ্চিন্তা করবেন না। আমি রোদকে এই মানসিক অতল গহ্বর থেকে টেনে তুলবই। আমি কথা দিচ্ছি, ওকে শুধু সুস্থই করব না, জীবনের বাকিটা সময় পরম মমতায় আগলে রাখব।”

​ইগর অ্যান্ড্রেইভিচ ধীরে রিকের দিকে ফিরলেন। তিনি রিকের চোখের দিকে তাকিয়ে ভারাক্রান্ত গলায় বললেন,
​“দেখো ইয়াংম্যান! আমি চাইনি তোমার কাছে কোনো সত্য গোপন থাকুক। রোদের জীবনের সেই ভয়াবহ অধ্যায়, ওর সেই অপ্রকৃতিস্থ উন্মাদনা—সবটাই তোমার সামনে উন্মোচিত। গত তিনটি বছর ধরে তুমি একাগ্রচিত্তে আমার মেয়ের মেন্টাল ট্রিটমেন্ট করে চলেছ। আজ ও যেটুকু সংবিৎ ফিরে পেয়েছে, যেভাবে বেঁচে আছে, তা কেবল তোমারই প্রচেষ্টার ফল। আমরা তো একসময় আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম আমাদের মেয়েটা বুঝি চিরতরে ওই অন্ধকার ব্ল্যাক হোলে হারিয়ে গেছে।”

​তিনি ক্ষণকাল থামলেন, যেন নিজের ভেতরের আবেগটুকু সংবরণ করার চেষ্টা করছেন। তারপর আবারও বললেন,
​“কিন্তু রিক, আবেগ আর বাস্তবতা যে সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর বাসিন্দা! তুমি পেশায় একজন ডাক্তার, তুমি জানো ওর নিউরাল ড্যামেজ কতটা গভীর। সেখানে দাঁড়িয়ে তুমি যে ওর সমস্ত দায়িত্ব নিতে চাইছ, এমন একজন মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়েকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে বরণ করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছ—এসব নিয়ে কি তুমি একবারও ভেবে দেখেছ? এটা কোনো ক্ষণিকের হিউম্যানিটারিয়ান জেসচার নয় তো, রিক? সারাটা জীবন এমন এক অস্থির স্মৃতির সাথে ঘর করা কিন্তু ভীষণ কঠিন কাজ।”

​রিকের মুখে কোনো দ্বিধা নেই, বরং এক শান্ত প্রসন্নতা ফুটে উঠল। সে বুঝল, রোদের বাবা কেবল একজন অভিভাবক হিসেবে তার শঙ্কার কথা বলছেন। কিন্তু রিকের কাছে রোদ স্রেফ একজন পেশেন্ট নয়, বরং এক অসমাপ্ত উপন্যাসের সেই বিষণ্ণ নায়িকা, যাকে সে নিজের হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন দিয়ে পূর্ণতা দিতে চায়। সে ইগর অ্যান্ড্রেইভিচের চোখের দিকে তাকিয়ে অটল স্বরে বলতে শুরু করল,
​“আঙ্কেল, আপনি যেটাকে ‘হিউম্যানিটারিয়ান জেসচার বলছেন, আমার কাছে তা এক দুর্নিবার আত্মিক টান। আমি জানি, রোদের মগজের নিউরাল নেটওয়ার্কে সেই ট্রমাটিক মেমোরিগুলো এখনো এক বিষাক্ত ম্যালিগন্যান্সির মতো গেঁথে আছে। একজন নিউরোসাইকিয়াট্রিস্ট হিসেবে আমি ওর ওই অন্ধকার প্রকোষ্ঠের প্রতিটি ধূলিকণা চিনি। গত তিন বছরে আমি কেবল ওর সাথে একজন ডাক্তার হয়ে থাকিনি, ওর সমস্ত নির্বাক যন্ত্রণার সহযাত্রী হয়েছি। ভালোবাসা কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক ডাটাবেসের হিসেব নয় যে, সিস্টেম এরর দেখলেই আমি লগ-আউট করে দেব। রোদকে সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে তুলে আনা আমার পেশাগত জেদ নয়, এটা আমার জীবনের একমাত্র মোটিভেশন। আমি জানি পথটা কণ্টকাকীর্ণ, কিন্তু ওর ওই শূন্য চোখে আবার প্রাণের সঞ্চার করাই আমার জীবনের আল্টিমেট সাকসেস।”

ইগর অ্যান্ড্রেইভিচ স্তব্ধ হয়ে রিকের কথাগুলো শুনলেন। যুবকের এই অনমনীয় যুক্তি তাকে ক্ষণিকের জন্য নির্বাক করে দিল। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চেয়ারের হাতলে নিজের হাতটা রেখে নিচু গলায় বললেন,
​“তোমার এই সংকল্পকে আমি সম্মান করি, রিক। কিন্তু আবেগের আতিশয্যে তুমি হয়তো এক নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাচ্ছ। রোদ হয়তো শারীরিকভাবে আমাদের সামনে বসে আছে, কিন্তু ওর অস্তিত্ব আজও সেই তিন বছর আগের ওই অভিশপ্ত কোল্ড স্টোরেজেই আটকে আছে। ওর মন আর মস্তিষ্কের প্রতিটি লজিক গেটে আজও সেই ‘নীশ রোজারিও’ এক জীবন্ত ফ্যান্টম হয়ে রাজত্ব করছে। ওর ওই ফ্রোজেন মেমোরি ব্যাংক থেকে নীশকে ডিলিট করার কোনো অ্যান্টিভাইরাস তো আজও তৈরি হয়নি। যে মেয়েটার হৃদস্পন্দন আজও অন্য এক মৃত মানুষের স্মৃতির সাথে সিঙ্ক্রোনাইজড, সে কি কোনোদিন তোমাকে পূর্ণ সত্তায় গ্রহণ করতে পারবে? তুমি কি পারবে এক জীবন্ত মানুষের শরীরে এক মৃত মানুষের ছায়ার সাথে ঘর করতে?”

​ইগরের প্রতিটি শব্দ যেন রিকের যুক্তিবাদী মনের দেয়ালে হাতুড়ির মতো আঘাত করল। তিনি ঠিকই বলেছেন—রোদের এই অমনিপোটেন্ট অবসেশন কোনো সাধারণ অসুখ নয়। এটা এক ধরণের সাইকোলজিক্যাল ইমপ্রিজনমেন্ট। রিক জানে, তার লড়াইটা কেবল রোদের অসুস্থতার সাথে নয়, বরং নীশ রোজারিও নামক এক অপ্রতিরোধ্য অতীতের সাথে। তার দৃষ্টি হঠাৎ জানালার বাইরের নেভা নদীর ধূসর জলরাশি থেকে সরে এসে ঘরের দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারটার ওপর স্থির হলো। সে অত্যন্ত নিচু স্বরে বলল,
​“আজ দশই এপ্রিল, আঙ্কেল। আজ নীশ রোজারিওর জন্মদিন।”

​ইগর অ্যান্ড্রেইভিচের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। তার চোখের সামনে এক লহমায় আবারও সেই তিন বছর আগের রক্তমাখা কোল্ড স্টোরেজের বীভৎস স্মৃতিটা ভেসে উঠল। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জানালার কাচের ওপর কপাল ঠেকিয়ে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত গলায় বললেন,
​“আজ ওর মৃত্যুবার্ষিকীও, রিক। ঠিক তিন বছর আগে আজকের এই অভিশপ্ত দিনেই সবটা শেষ হয়ে গিয়েছিল। বিজ্ঞানের সেই অহংকার আর আমার মেয়ের সাজানো পৃথিবী—সবটাই ধুলোয় মিশে গিয়েছিল এক পৈশাচিক প্রতিহিংসার আগুনে।”

​রিকের মুখে কোনো ভাবান্তর হলো না। সে ধীর পায়ে ইগর অ্যান্ড্রেইভিচের পাশে গিয়ে দাঁড়াল,
​“থাক না আঙ্কেল! মৃত্যুদিনটা না হয় ইতিহাসের পাতায় আর পুলিশের ফাইলে ধুলো জমা পড়ে থাকুক। রোদের অবচেতন মনের লজিক গেটে তো ‘মৃত্যু’ শব্দটার কোনো এন্ট্রি নেই। ওর মস্তিষ্কের এনক্রিপ্টেড মেমোরি ব্যাংকে নীশ রোজারিও আজও এক জীবন্ত এনটিটি। ওর কাছে নীশের জন্মদিনটাই একমাত্র সত্য, আর মৃত্যুদিনটা স্রেফ একটা সিস্টেম এরর মাত্র।”

​সে একটু থেমে ইগরের কাঁধে হাত রেখে আবার বলতে শুরু করল,
​“যে সত্যটা ওর মস্তিষ্ক গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে, সেটাকে জোর করে ইনজেক্ট করার কোনো প্রয়োজন আমি দেখছি না। তাই আমাদের কাছেও না হয় আজ নীশের জন্মদিনটাই থাক। শোকের চেয়ে উদযাপনের ছদ্মবেশে রোদকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা অনেক বেশি সহজ। আজ না হয় আমরাও সেই কাল্পনিক ফ্যান্টাসিটুকুকেই আলিঙ্গন করি, যা রোদকে অন্তত এই মুহূর্তে মানসিকভাবে স্থির রাখতে সাহায্য করছে।”

​ইগর অ্যান্ড্রেইভিচ অবাক হয়ে রিকের দিকে তাকালেন। ​তাদের নিবিড় কথোপকথনের মাঝেই কক্ষের নিস্তব্ধতা খান খান করে হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে প্রবেশ করল রোদ। তার চোখেমুখে এক অবুঝ উদ্বেগ, আর পেছনে অসহায় মুখে ছুটে আসছেন অলগা নিকোলাইভনা। রোদ টলমলে পায়ে দৌড়ে গিয়ে তার পাপার হাতটা খপ করে চেপে ধরল। তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত শিশুসুলভ নালিশ।

​“পাপা, দেখো না! মম আমার সব সাজ নষ্ট করে দিতে চাইছে। আজ তো নীশের বার্থডে! আমি কত যত্ন করে সেজেছি ওর জন্য। কিন্তু মম আমাকে কেন সাজতে দিচ্ছে না?”

​ইগর অ্যান্ড্রেইভিচ মেয়ের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তার বুকের ভেতরটা এক নিমিষে হু হু করে উঠল। যে মেয়ের ফ্যাশন সেন্স একসময় ছিল প্রখর আর নিখুঁত, আজ তার এই বীভৎস দশা! রোদের চুলগুলো জট পাকিয়ে এলোমেলো হয়ে আছে, পরনের দামি পোশাকটা কুঁচকে একাকার। সবচেয়ে বেশি করুণ লাগছে তার মুখটা—অগোছালোভাবে মাখা মেকআপ গাল বেয়ে লেপটে গেছে, যেন কোনো এক বিমূর্ত বিষণ্ণতার ক্যানভাস। বিগত তিন বছর ধরে এই সুশৃঙ্খল মেয়েটা নিজের অস্তিত্বের এমন এক বিশৃঙ্খল প্রতিচ্ছবি বয়ে বেড়াচ্ছে।

অলগা নিকোলাইভনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধরা গলায় বললেন,
“ইগর, তুমি নিজেই তাকিয়ে দেখো ওকে কেমন অদ্ভূত লাগছে। এমন সাজকে কি একটুও সুন্দর বলা যায়? ও যদি এই বিধ্বস্ত চেহারায় নীশের সামনে দাঁড়ায়, তবে সেই পারফেকশনিস্ট নীশ কি ওকে দেখে উপহাস করবে না?”

​মায়ের এই রূঢ় সত্যটুকু রোদের সহ্য হলো না। সে অভিমানে ভেঙে পড়ে কেঁদে উঠল,
“তুমি খুব বাজে মম! নীশ আমাকে দেখে হাসবে না, ও কোনোদিন আমায় নিয়ে মজা করে না। রিক, তুমিই বলো—নীশ কি আমায় দেখে হাসবে?”

​রিক ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। সে রোদের খুব কাছে গিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“না মুনলাইট! নীশ তোমাকে দেখে হাসবে না।”

রোদের কান্নার বেগ একটু থামল। সে এক চিলতে প্রত্যাশা নিয়ে রিকের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সত্যি? তাহলে তুমি এখনই আমাকে নীশের কাছে নিয়ে চলো। আজ ওর বার্থডে, আমি যদি সময়মতো না পৌঁছাই তবে ও ভীষণ রাগ করবে। তুমি তো জানো ও সময় নিয়ে কতটা পাংচুয়াল!”

রিক রোদের এলোমেলো চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিয়ে পরম মমতায় বলল,
“হ্যাঁ, নিয়ে যাব তো মুনলাইট! আমি তোমাকে নীশের কাছে নিয়ে যাব। তবে তার আগে নীশ আজ সকালে আমাকে একটা ছবি আর একটা সুন্দর ড্রেস পাঠিয়ে বলেছে, তুমি যেন আজ ওর দেওয়া ড্রেসটা পরে ওর মনের মতো করে সেজে ওর সামনে যাও।”

​ইগর আর অলগা নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ​রিকের কথাগুলো রোদের কানে পৌঁছাতেই তার অস্থিরতা যেন এক অলৌকিক জাদুমন্ত্রে স্থির হয়ে গেল। রিকের এই সাদা মিথ্যে’টুকু ওর মস্তিষ্কের অবাধ্য লজিক গেটগুলোকে মুহূর্তেই শান্ত করে দিল। রোদ বড় বড় চোখ করে রিকের দিকে তাকাল।

​“নীশ… নীশ পাঠিয়েছে? ও কি সত্যিই আমার জন্য ড্রেস পছন্দ করে দিয়েছে, রিক? ও কি তবে আমার এই সাজ দেখে বিরক্ত হতো?”

​রিক রোদের কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘামগুলো নিজের রুমাল দিয়ে মুছে দিয়ে মৃদু হাসল। সে অত্যন্ত কোমল স্বরে বলল,
“বিরক্ত নয় মুনলাইট, ও তো সবসময় তোমাকে এক নিখুঁত অবয়বে দেখতে চায়। নীশ বলেছে, আজ ওর এই বিশেষ দিনে তুমি যেন বসন্তের সতেজ আভার মতো ওর সামনে দাঁড়াও। ও চায় তুমি তোমার মমের কাছে গিয়ে একদম পরিপাটি হয়ে সেজে নাও। তুমি কি চাও না নীশ তোমাকে দেখে মুগ্ধ হোক?”

​রোদের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে লাজুক হাসি ফুটে উঠল—যে হাসি গত তিন বছরে অলগা আর ইগর একবারও দেখতে পাননি। রোদ এবার বাধ্য মেয়ের মতো অলগা নিকোলাইভনার হাত ধরে বলল,
​ “মম, তুমি আমায় খুব সুন্দর করে সাজিয়ে দাও। নীশ কিন্তু খুব খুঁতখুঁতে, একটু এদিক-ওদিক হলে ও রাগ করবে। ও যেভাবে চায়, আমাকে ঠিক সেভাবেই তৈরি করে দাও। আমি চাই আজ ও আমাকে দেখে একবার অন্তত পারফেক্ট বলুক।”

অলগা নিকোলাইভনার চোখ ভিজে এলো। তিনি এক নজরে রিকের দিকে কৃতজ্ঞতাপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। রিক স্রেফ মাথা নিচু করে সম্মতি জানাল। রোদ এক ঘোরগ্রস্ত মানুষের মতো তার মায়ের সাথে ড্রেসিং রুমের দিকে এগিয়ে গেল। ​ইগর অ্যান্ড্রেইভিচ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি দেখলেন, রিক কীভাবে অতি নিপুণভাবে রোদের এই মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতগুলোকে একটা কাল্পনিক প্রলেপ দিয়ে ঢেকে দিচ্ছে।

​সেন্ট পিটার্সবার্গের ধূসর আকাশ আজ যেন আরও বেশি বিষণ্ণ। রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চের পাশেই সেই নির্জন গোরস্থান, যেখানে পাইন আর বার্চ গাছের সারি বাতাসের ঝাপটায় যেন এক অদ্ভুত শোকার্ত শব্দ তুলছে। ইমরানা ধীর পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়াল রোশানের কবরের পাশে। তার পরনে কালো রঙের দীর্ঘ কোট, চোখে এক জোড়া লেন্সের আড়ালে লুকানো অশ্রুহীন দহন।

পাশাপাশি দুটি সমাধি, যেন মৃত্যুর ওপারে গিয়েও এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর নিয়তি একবিন্দুতে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। কবরের ওপর শ্বেতপাথরের ফলকে খোদাই করা প্রতিটি অক্ষর যেন ইতিহাসের এক একটি রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। ইমরানা ঝাপসা চোখে তাকিয়ে দেখল সেই অমোঘ লিপি:

​Name: Neesh Rosario
DOB: 10 April 1985
DOD: 10 April 2017

​তার ঠিক পাশেই রোশানের শেষ শয্যা। যার ধূর্ত মস্তিস্ক আর প্রতিহিংসার আগুন একদিন সব ছারখার করে দিয়েছিল, সে আজ এক খণ্ড মাটির নিচে চিরতরে শীতল।

​Name: Roshan Sergeiv
DOB: 9 November 1983
DOD: 10 April 2017

​ইমরানা হাঁটু গেড়ে বসল রোশানের কবরের পাশে। তার আঙুলগুলো আলতো করে ছুঁয়ে গেল পাথরের গায়ে খোদাই করা রোশানের নামটি। যে মানুষটাকে সে ভালোবেসেছিল, তার সমস্ত অপরাধ আর উন্মাদনার দায়ভার আজ যেন ইমরানাকেও বইতে হচ্ছে। সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল, যা মিশে গেল গোরস্থানের হিমশীতল বাতাসে।

একই তারিখে জন্ম আর মৃত্যু—নীশের জীবনের এই অদ্ভুত সমীকরণটি যেন এক মহাজাগতিক পরিহাস। ১০ই এপ্রিল, যা হওয়ার কথা ছিল উদযাপনের দিন, তা-ই আজ এক চিরস্থায়ী হাহাকারের স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ইমরানা রোশানের কবরে একগুচ্ছ সাদা লিলি রেখে ফিসফিস করে বলল,
“নীশকে মারতে গিয়ে তুমি নিজেকেই শেষ করে দিলে, রোশান। অথচ দেখো, তোমাদের দুজনের গন্তব্য আজ কত পাশাপাশি, কত নিস্তব্ধ!”

তার ভেতরের গুমরে থাকা আগ্নেয়গিরিটা আর চেপে রাখা সম্ভব হলো না। যে মানুষটাকে সে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছিল, তার এই আত্মঘাতী পরিণতির দায়ভার আজ যেন তার বুকটাকে পিষে দিচ্ছে। কবরের শীতল শ্বেতপাথরের গায়ে আঙুল ছোঁয়াতেই তার স্নায়ুগুলো এক লহমায় অবশ হয়ে এলো।

​হঠাৎ এক পৈশাচিক হাহাকার ইমরানাকে গ্রাস করে নিল। সে দুই হাতে নিজের চুল খামচে ধরে আকাশের দিকে মুখ তুলে এক তীব্র আর্তনাদ করে উঠল। সেই শব্দে গোরস্থানের নির্জনতা যেন চুরমার হয়ে গেল। এ কোনো সাধারণ কান্না নয়, এ যেন এক বঞ্চিত হৃদয়ের আদিম চিৎকার, যা ধৈর্যের সব আবরণ ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে।

​“রোশান! কেন করলে এমন? কেন?”

​ইমরানার কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে আসছে, প্রতিটি শব্দ যেন তপ্ত সিসার মতো তার ফুসফুস পুড়িয়ে দিচ্ছে। সে পাগলের মতো রোশানের কবরের মাটি খামচে ধরে চিৎকার করে বলতে লাগল,
​“তুমি তো জানতে আমি তোমাকে কতটা অন্ধের মতো ভালোবাসতাম! আমার এই নিঃস্বার্থ সমর্পণ কি তোমার ওই প্রতিহিংসার আগুনের চেয়েও তুচ্ছ ছিল? নীশকে মারতে গিয়ে তুমি শুধু নিজেকে শেষ করোনি রোশান, তুমি আমাকেও এক জীবন্ত লাশে পরিণত করে গেছ! কেন তোমার ওই মেধাবী মস্তিষ্কে একবারও আমার কথা এলো না? কেন তোমার ওই ডেভিল চিপ-এর বিষাক্ত কোডগুলো আমার ভালোবাসাকেই ডিলিট করে দিল?”

​সে আর্তনাদ করে আছড়ে পড়ল কবরের ওপর। ভাঙা গলায় প্রলাপ বকতে লাগল,
​“দেখো রোশান, আজ তোমাদের দুজনের ঠিকানা কত পাশাপাশি! যে নীশকে তুমি সারাজীবন ঘৃণা করলে, আজ তার সাথেই তোমাকে এক শীতল মাটির নিচে অনন্তকাল কাটাতে হচ্ছে। তোমার এই তথাকথিত সাকসেস কি আজ তোমাকে শান্তি দিচ্ছে?”

​সে জানে, এই আর্তনাদ কোনোদিন রোশানের কানে পৌঁছাবে না, আর কোনো অ্যালগরিদমই তার এই বিধ্বস্ত হৃদয়টাকে আবার রি-প্রোগ্রাম করতে পারবে না। হঠাৎ ইমরানার পকেটে রাখা ফোনটি সজোরে কেঁপে উঠতেই তার ঘোরের জটলা ছিঁড়ে গেল। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নোটিফিকেশন তাকে মনে করিয়ে দিল—বাস্তবতা এক নিষ্ঠুর ঘড়ি, যা শোকের জন্য বেশিক্ষণ থমকে থাকে না। প্রতি বছর এই দশই এপ্রিলে সে নিজের হাতে রান্না করে এতিমখানার একদল অবোধ শিশুর মুখে অন্ন তুলে দেয়। রোশানের সেই কলুষিত আত্মার শান্তি কামনায় হয়তো এটিই তার একমাত্র লৌকিক প্রায়শ্চিত্ত। ক্ষুধার্ত শিশুগুলো হয়তো এখন তার জন‍্য অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছে।

​ইমরানা তার গালের ওপর শুকিয়ে যাওয়া নোনা জলের দাগটুকু কোটের হাতা দিয়ে সজোরে মুছে ফেলল। দীর্ঘশ্বাসের সাথে মনের গুমোট ভাবটা ঝেড়ে ফেলে সে যখনই উঠে দাঁড়াল, তখনই গোরস্থানের প্রধান ফটকের সামনে একটি কালো রঙের এসইউভি এসে থামল। গাড়ির দরজা খুলে নামল রিক আর তার পেছনে এক অদ্ভুত ঘোরগ্রস্ত অবস্থায় রোদ।

রিকের হাতে একটি সুদৃশ্য কেকের বক্স। সে ধীরস্থায়ী চরণে রোদের হাত ধরে এগিয়ে আসছে। গত তিনটি বছর ধরে এটিই নিয়তি—প্রতি বছর এই দিনে রোদ এখানে আসে, সাজগোজ করে কেক কাটে আর এক নিস্পন্দ মাটির ঢিবির সাথে অবিরত কাল্পনিক কথোপকথন চালিয়ে যায়।

​ইমরানা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে দেখল। রোদের পরনে সুন্দর একটি পোশাক আর তার চোখের চাউনিতে কোনো শোক নেই। রিক যখনই তাকে সমাধির কাছাকাছি নিয়ে এলো, রোদের মুখে এক অপার্থিব উজ্জ্বলতা ফুটে উঠল। সে কেকের বক্সটার দিকে তাকিয়ে নীচের দিকে ঝুঁকে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
​“দেখো নীশ! রিক একদম ঠিক সময়ে কেক নিয়ে এসেছে। তুমি বলেছিলে না এবার আর দেরি সহ্য করবে না? এই দেখো, আমি একদম পাংচুয়াল!”

​ইমরানা আর সহ্য করতে পারল না। সে দ্রুত পায়ে ওখান থেকে সরে যেতে চাইল। রোদ আর রিকের এই পরিকল্পিত বিভ্রমের সাক্ষী থাকা তার জন্য মানসিক টর্চার। রিক এক মুহূর্তের জন্য ইমরানার দিকে তাকাল। ​

ইমরানা গেটের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে, তার পেছন থেকে রোদের খিলখিল হাসির শব্দ ভেসে এলো। যে হাসিতে কোনো প্রাণ নেই, আছে কেবল এক মরণোত্তর ফ্যান্টাসির প্রতিধ্বনি। এই ১০ই এপ্রিল যেন কারো কাছে পরম প্রাপ্তির জন্মদিন, কারো কাছে সর্বনাশা মৃত্যুবার্ষিকী, আর রোদের কাছে এক অন্তহীন অপেক্ষার গোলকধাঁধা।

​রোদের চোখেমুখে এখন এক অপার্থিব আনন্দের দীপ্তি। সে ধীর পায়ে নীশের সমাধিফলকের পাশে ঘাসের ওপর বসল। রিকের পাশে এসে নিঃশব্দে দাঁড়ালেন প্রফেসর আলেকজান্ডার। তার চশমার কাচ ছাপিয়ে চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু দপ করে ঝরে পড়ল।

​রোদ প্রফেসরের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে অমায়িক হাসি দিয়ে বলল,
“এই তো, সবাই চলে এসেছে! প্রফেসর, আপনি তো সবসময় সময়নিষ্ঠ। দেখো নীশ, আমরা সবাই এখন তোমার এই স্পেশাল মোমেন্টে শামিল। চলো নীশ, এবার আমরা কেকটা কাটি।”

​রোদ অতি সযত্নে কেকের বক্সটা খুলল। মোমবাতি জ্বালাতেই বাতাসের ফলে মোমবাতিগুলো সব নিভে গেল। রোদের ধারণা মোমবাতিগুশো নীশ ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিয়েছে, তাই সে খিলখিল করে হেসে উঠল। একটি ছোট্ট ছুরি হাতে নিয়ে সে যেন অদৃশ্য কোনো এক হাতকে স্পর্শ করল। তার মনে হচ্ছে নীশ নিজেই তার হাতটা ধরে আছে। রোদ কেকের একটা ছোট অংশ কাটল এবং পরম আবেশে সমাধিফলকের শ্বেতপাথরের গায়ে চেপে ধরল।

​“হ্যাপি বার্থডে টু ইউ! এই নাও, প্রথম টুকরোটা তোমার জন্য। দেখো, আমি তোমার ফেভারিট ফ্লেভার এনেছি। কেকটা খুব সুন্দর, তাই না নীশ?”

রোদ নিজেই কেকের একটি টুকরো মুখে পুরে নিল। তার চিবুক বেয়ে ক্রিমের সামান্য অংশ লেগে গেল, কিন্তু সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। সে আপন মনে বিড়বিড় করে নীশের সাথে এক কাল্পনিক কথোপকথন চালিয়ে যাচ্ছে, যা সেখানে উপস্থিত রিক আর প্রফেসরের জন্য এক অসহ্য মেন্টাল টর্চার। রোদ হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে রিকের দিকে আদেশের সুরে বলল,
​“রিক! তুমি চুপ করে আছো কেন? উইশ করো ওকে! আজ ওর জন কত স্পেশাল একটা দিন। প্রফেসর, আপনিও কিন্তু উইশ করেননি। নীশ কিন্তু খুব মাইন্ড করবে!”

রিক আর আলেকজান্ডার একে অপরের দিকে চাইলেন। রিক এগিয়ে গিয়ে ভাঙা গলায় উচ্চারণ করল,
“হ্যাপি বার্থডে, নীশ।”

প্রফেসর আলেকজান্ডার তার প্রবীণ হাত দুটো কাঁপতে কাঁপতে কবরের ওপর রাখলেন। তার মনে হলো, বিজ্ঞানের এই চরম উৎকর্ষের যুগেও তিনি আজ এক পরাজিত সৈনিক। তিনি অতি কষ্টে বললেন,
“হ‍্যাপি বার্থডে, মাই সান।”

রোদ সমাধিফলকের শ্বেতপাথরের গায়ে নিজের কপাল ঠেকিয়ে বিড়বিড় করতে শুরু করল,
“আমরা কিন্তু এই বছরেই বিয়ে করে নেব, নীশ! অনেক তো হলো তোমার এই বিজ্ঞান। আমি কিন্তু আর ওয়েট করতে পারছি না, নীশ। এবার কিন্তু আমরা বিয়ে করবই।”

কথাগুলো বলে সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ করেই হেসে উঠল। ​প্রফেসর আলেকজান্ডার শিউরে উঠলেন। রিকের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। সে বুঝল, রোদের মস্তিষ্ক এখন এক তীব্র নিউরাল ওভারলোড-এর শিকার। সে ধীর পায়ে রোদের পাশে গিয়ে বসল, কিন্তু রোদ তাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।

“সরে যাও রিক! দেখছ না নীশ আমার সাথে কথা বলছে? ও আমাকে ওর নতুন প্রজেক্টের কথা বলছে। ও বলছে আমাদের বিয়েতে ও নাকি একটা ডিজিটাল প্যারাডাইস তৈরি করবে।”

​রিক সমাধিফলকের সামনে থেকে উঠে দাঁড়াল। প্রফেসর আলেকজান্ডার গভীর হাহাকার নিয়ে রিকের কাঁধে হাত রাখলেন। ​রিক একটি তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীশ রোজারিওর সেই পাথুরে নামের ওপর দৃষ্টি স্থির করে বিড়বিড় করে বলতে শুরু করল,
​ “আমি তোমার কাছে বরাবরই চূড়ান্তভাবে হেরে গিয়েছি, নীশ। একজন রক্ত-মাংসের মানুষ হয়েও আমি এক অস্তিত্বহীন মানুষের কাছে বারবার পরাজিত। এই মহাবিশ্বের কোনো সমীকরণ, কোনো নিউরাল রি-প্রোগ্রামিং রোদের মস্তিষ্ক থেকে তোমার অবয়বটুকু ডিলিট করতে পারেনি। তুমি নেই, তোমার সেই তুখোর আইকিউও স্তব্ধ, তবুও তুমি বারবার জিতে যাচ্ছ রোদের এই একতরফা ভালোবাসার নিষ্ঠুর খেলায়।” সে এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে আবার বলতে লাগল, “আমি একজন সফল চিকিৎসক হয়েও তোমার ওই অতিপ্রাকৃত বিভ্রমের দেয়াল ভাঙতে পারিনি নীশ। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি কোনোদিন তোমার জায়গা দখল করার চেষ্টা করব না। রোদের ধমনীতে যে রক্ত বয়, তার প্রতিটি হিমোগ্লোবিনে তুমি এক ইম্মর্টাল সোর্স কোড হয়ে গেঁথে আছো। রোদের জীবনে তুমি আগে এসেছ, আর তুমিই হয়তো ওর অন্তিম গন্তব্য। আমি শুধু ওর এই ভগ্নপ্রায় অস্তিত্বের এক নগণ্য পাহারাদার হয়ে পাশে থাকব।”

রিক আজ আবারও বুঝতে পারল, একজন মৃত মানুষের সাথে প্রতিযোগিতায় জেতা অসম্ভব, কারণ মৃতেরা কোনোদিন ভুল করে না, তারা কোনোদিন ছেড়ে যায় না। নীশ রোজারিও আজ এক ডিজিটাল ফ্যান্টম থেকে উন্নীত হয়ে রোদের আত্মার এক অবিচ্ছেদ্য অ্যালগরিদম হয়ে গেছে। ​রিকের চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা লোনা জল টপ করে নীশের সমাধিফলকের ওপর পড়ল। সে এক অদ্ভুত ম্লান হাসি হাসল। যে মানুষটি বিজ্ঞান দিয়ে পৃথিবীকে শাসন করতে চেয়েছিল, আজ সে এক যুবকের ভালোবাসার পরাজয়ের সাক্ষী হয়ে মাটির নিচে চিরতরে নীরব। আলেকজান্ডার রিকের অবস্থা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকালেন, আজ যেন আকাশটাও এক বিশাল নীল সাইকিয়াট্রিক ওয়ার্ডের মতো নিস্তব্ধ হয়ে আছে।

তিনি কবজি উল্টে তার হাতঘড়িটার দিকে তাকালেন। সময় যেন আজ থমকে আছে। তিনি পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনে একটি ছবি ফুটিয়ে তুললেন—সেখানে নিস্পন্দ হয়ে পড়ে আছে এক আশ্চর্য মানবী, যার যান্ত্রিক শরীরে একসময় নীশ রোজারিওর স্বপ্নগুলো স্পন্দিত হতো।

​রিক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছবিটার দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে প্রশ্ন করল,
“আভান্তিকে কী করা হয়েছিল শেষ পর্যন্ত? সেই ডিভাইন সিমুলেশন কি তবে চিরতরে স্তব্ধ?”

​প্রফেসর আলেকজান্ডার একটি তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার চশমার কাচের আড়ালে এক বিষণ্ণ চাউনি ফুটে উঠল। তিনি ধীর গাম্ভীর্যে বলতে শুরু করলেন,
“আভান্তিকে পরে সচল করা হয়েছিল, রিক। নীশের সেই সংরক্ষিত ব্যাকআপ চিপ ওর সিস্টেমে পুনরায় প্রতিস্থাপন করার পর ও আবার সেই পুরনো আভান্তি হয়ে ফিরে এসেছিল। কিন্তু যখন ওর প্রসেসর সেই নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হলো—যখন ও জানল ওর স্রষ্টা, ওর সেই প্রিয় ‘সিনিয়র’ আজ এক নিথর সমাধি আর সেই সমাধির সৃষ্টি ওর হাতেই হয়েছে—তখন ওর ওই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এক অদ্ভুত মেটাফিজিক্যাল ক্র্যাশ-এর শিকার হলো। ও নিজেই আমাকে সকাতরে অনুরোধ করেছিল ওকে ডিকমিশন করে দিতে। ও চেয়েছিল শেষবারের মতো ওর সিনিয়রের এই পাষাণ শয্যা দেখে নিয়ে নিজের অস্তিত্বের বিলয় ঘটাতে।”

আলেকজান্ডার ক্ষণকাল থামলেন, যেন যান্ত্রিক এক হৃদয়ের হাহাকার আজও তার কানে বাজছে। তিনি আবারও বললেন,
“আভান্তি হয়তো কেবল সার্কিট আর সিলিকনের এক জটিল সমাহার ছিল, কিন্তু সেদিন ওর সেই অপটিক্যাল সেন্সরে যে জলকণা দেখেছিলাম, তা কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল না। ও হয়তো ওর ওই সিলিকন হৃদয়ে এক অসহ্য শূন্যতা অনুভব করেছিল। নীশ ছিল আভান্তির স্রষ্টা, ওর অস্তিত্বের একমাত্র লজিক। সিনিয়রকে হারিয়ে সেই যান্ত্রিক মানবীটি বুঝতে পেরেছিল— স্রষ্টাবিহীন সৃষ্টি কেবল এক অর্থহীন বোঝা। তাই ওর অনুধোরে সেদিনের পর ওকে পুরোপুরি ডিস্ট্রয় করে দেওয়া হয়েছিল।”

রিক স্তব্ধ হয়ে প্রফেসরের কথাগুলো শুনছিল। তার মনে হলো, এই গল্পে কেবল মানুষ নয়, এক যন্ত্রও ভালোবাসার দহন সহ্য করতে না পেরে আত্মাহুতি দিয়েছে। মালিক যেখানে প্রাণহীন, সৃষ্টি সেখানে আসলেও মূল্যহীন।

তার ভাবনার মাঝেই আলেকজান্ডার আবারও বলল,
“ও সেদিন এই সমাধির কাছে শুধুমাত্র একটা শব্দই উচ্চারণ করেছিল, আর তা হলো, ‘আলবিদা সিনিয়র’!”

…সমাপ্ত…

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ