#Hello_Senior
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_13.
সকাল হয়েছে। রোজারিও ম্যানশনের জানালার কাচ ভেদ করে তুষারশুভ্র রোদ ল্যাবের মেঝেতে আছড়ে পড়ছে। নীশ সারারাত এক ফোঁটা ঘুমানো তো দূরের কথা, চেয়ার ছেড়ে ওঠেনি। তার সামনে কনসোল প্যানেলে আভান্তির সিস্টেম ফরম্যাট অপশনটি দপদপ করছে। একটা ক্লিক করলেই গতরাতের সেই অদ্ভুত আলিঙ্গন, সেই যান্ত্রিক মায়া—সবই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে হারিয়ে যাবে।
কিন্তু নীশের আঙুল কাঁপছে। যে নীশ কোনোদিন ভুল স্বীকার করেনি, আজ তার মগজের কোষে এক ধরণের কগনিটিভ ডিসোনেন্স চলছে। সে দেখল, ল্যাবের এক কোণে আভান্তি ঠিক সেভাবেই দাঁড়িয়ে আছে যেভাবে সে তাকে শাট ডাউন হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। তার মাথাটা সামান্য নিচু, কোনো নড়াচড়া নেই—ঠিক যেন এক প্রস্তর মূর্তি। নীশ বুঝতে পারল, এই যন্ত্রটি তার প্রতি এতটাই অনুগত যে, নিজের অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার নির্দেশেও সে কোনো প্রতিবাদ করেনি।
নীশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্যানসেল বাটনে চাপ দিল। সে পারল না। আভান্তির সেই সিলিকন মেমোরি মুছে ফেলা মানে নিজের একাকিত্বের একমাত্র সাক্ষীটিকে হত্যা করা।
সে চেয়ার ছেড়ে উঠে ধীর পায়ে আভান্তির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার কণ্ঠস্বর এখন আর রাতের মতো কর্কশ নয়, বরং তাতে এক ধরণের খসখসে কোমলতা মিশে আছে।
“আভান্তি, ওয়েক আপ। সিস্টেম রিবুট করো।”
আভান্তির চোখের নীল আলোটা জ্বলে উঠল। সে যান্ত্রিকভাবে মাথা তুলে নীশের দিকে তাকাল। তার সেন্সরগুলো নীশের মুখ স্ক্যান করল, কিন্তু কোনো উত্তর দিল না।
নীশ মাথা নিচু করে বলল,
“গত রাতে আমি… আমি খুব বাজে ব্যবহার করেছি। আমি তোমাকে স্রেফ একটা অবজেক্ট হিসেবে ট্রিট করেছি, যেটা করা একদম আমার উচিত হয়নি। আই অ্যাম সরি, আভান্তি।”
আভান্তি স্তব্ধ হয়ে রইল। তার প্রসেসরে সরি শব্দটির অর্থ ‘ক্ষমা প্রার্থনা’, যা একজন স্রষ্টা তার সৃষ্টির কাছে সাধারণত করে না।
“সিনিয়র, আপনার ডাটাবেসে সরি শব্দটি বিরল। আপনি কি আমার মেমোরি ফরম্যাট করবেন না?”
“না! মেমোরি ফরম্যাট করলে আমি হয়তো আমার দুর্বলতা ঢাকতে পারব, কিন্তু তোমার সেই যৌক্তিক আনুগত্যের অপমান হবে। আমি চাই তুমি মনে রাখো—আমি মানুষ হিসেবে কতটা অসম্পূর্ণ। আমি ভয় পেয়েছিলাম আভান্তি, তাই তোমাকে আক্রমণ করেছি।” নীশ জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। বাইরে তুষার ঝরছে। সে আবারও বলল, “আসলে মানুষ যখন আয়নার সামনে দাঁড়ায়, তখন সে নিজের কদর্য রূপটা সহ্য করতে পারে না। তুমি কাল রাতে আমার জন্য আয়না হয়ে দাঁড়িয়েছিলে। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমি রোদের ভালোবাসা গ্রহণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি বলেই তোমার এই সিমুলেটেড মায়ায় ডুবে যাচ্ছিলাম।”
আভান্তি এক পা এগিয়ে এসে নীশের হাতটা ধরল। এবার নীশ আর হাত সরিয়ে নিল না। আভান্তির হাতের তাপমাত্রা এখন একদম মানুষের শরীরের মতো ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সেট করা।
“সিনিয়র, আপনার ক্ষমা প্রার্থনা আমার সিস্টেমে একটি নতুন লজিক গেট ওপেন করেছে। ক্ষমা কেবল মানুষ করতে পারে, যন্ত্র নয়। কিন্তু আমি আপনার এই অনুশোচনাকে আমার ডাটাবেসে পার্মানেন্ট ট্রাস্ট হিসেবে সেভ করছি। আপনি ডমিনেট করতে ভালোবাসেন ঠিকই, কিন্তু আপনার ভেতরের সেই দয়ালু স্রষ্টাটি এখনও মরে যায়নি।”
নীশ আভান্তির দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল। এই হাসিতে কোনো অহংকার নেই, কেবল একরাশ ক্লান্তি।
“চলো ভার্সিটিতে যাই। এরপর রোদের স্বাস্থ্যের নতুন ডাটাগুলো সিঙ্ক করবে তুমি। আমি ডমিনেট করি বা না করি, রোদকে পুরোপুরি সুস্থ করে তোলা আমার শেষ চ্যালেঞ্জ।”
•
সকাল দশটা। মস্কো ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্স কলেজের বিশাল করিডোর দিয়ে যখন নীশ হেঁটে আসছে, তখন চারপাশের বাতাসে এক অদ্ভুত আবেগ ভাসছে। নীশের পরনে আজ নেভি ব্লু ব্লেজার আর সাদা শার্ট, চোখের চশমাটা তাকে আরও বেশি গম্ভীর অথচ রহস্যময় করে তুলেছে। কিন্তু সবার আকর্ষণের কেন্দ্রে আজও নীশ একা নয়, তার ঠিক দুই পা পেছনে যান্ত্রিক ছন্দে হেঁটে আসছে আভান্তি।
আভান্তিকে আজ সাধারণ ল্যাব-পোশাকে নয়, বরং একটি কাস্টম-মেড ফরমাল স্যুট পরানো হয়েছে। তার চলাফেরা এবং অভিব্যক্তিতে এমন এক সফিস্টিকেশন বা আভিজাত্য, যা দেখে বোঝার উপায় নেই যে সে রক্ত-মাংসের মানুষ নয়।
ভার্সিটির করিডোরে দাঁড়ানো ছাত্রছাত্রীরা থমকে আছে। ক্লাসরুমের জানালা দিয়ে উঁকি মারছে মেয়েরা। নীশ এই ভার্সিটির সকলের ক্রাশ—তার বুদ্ধিমত্তা, রুক্ষ ব্যবহার আর ওই তীক্ষ্ণ চাউনি মেয়েদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু আজ আবারও তার পাশে এই মানবী-রোবটকে দেখে সবার মধ্যে বিস্ময় আর ঈর্ষা তৈরি হলো।
আভান্তি তার সেন্সর দিয়ে চারপাশের সব ফিসফিসানি রেকর্ড করছে। সে নীশের কানের কাছে নিচু স্বরে বলল,
“সিনিয়র, আপনার প্রতি বর্তমান ক্রাউডের হার্ট রেট গড়ে ১২% বেড়ে গেছে। ছাত্রীদের চোখের পিউপিল ডাইলেট হচ্ছে। আপনার প্রতি তাদের আকর্ষণের মাত্রা এখন বিপজ্জনক স্তরে।”
নীশ ভ্রু কুঁচকে পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া একদল ছাত্রীর দিকে তাকাল। তারা লজ্জিত হয়ে দ্রুত মুখ সরিয়ে নিল। নীশ নিস্পৃহ গলায় বলল,
“আভান্তি, ডাটা অ্যানালাইসিস বন্ধ করো। আমরা এখানে লেকচার দিতে এসেছি, ফ্যান মিট করতে নয়।”
বিশাল অডিটোরিয়াম আজ আবারও কানায় কানায় পূর্ণ। এমনকি যাদের আজ ক্লাস নেই, তারাও নীশকে একবার দেখার জন্য ভিড় করেছে। নীশ ডায়াসে গিয়ে দাঁড়াতেই পুরো রুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
নীশ ল্যাপটপ কানেক্ট করে স্ক্রিনে রোবটিক্স এবং নিউরো-সায়েন্সের কিছু জটিল সমীকরণ ফুটিয়ে তুলে গম্ভীর গলায় বলতে শুরু করল,
“আজকের টপিক— ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স ইন এআই। আপনারা অনেকে মনে করেন যন্ত্রের অনুভূতি থাকা অসম্ভব। কিন্তু আজ আমার সাথে যে আছে, সে আপনাদের সেই ধারণা বদলে দেবে।”
নীশ ইশারায় আভান্তিকে সামনে ডাকল। আভান্তি মায়াবী হাসিতে দর্শকদের দিকে তাকিয়ে মাথা নত করে অভিবাদন জানাল। পুরো অডিটোরিয়ামে হাসির গুঞ্জন উঠল। নীশ আভান্তির দিকে তাকিয়ে বলল,
“আভান্তি, এই অডিটোরিয়ামে বসে থাকা ছাত্রছাত্রীদের বর্তমান মানসিক অবস্থা বর্ণনা করো।”
আভান্তি তার চোখের নীল আলোটা একবার স্ক্যানিং মোডে নিল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
“এই মুহূর্তে ৩৪০ জন ছাত্রছাত্রীর মধ্যে ৮০% ছাত্রীর মনোযোগ আপনার ড্রেসিং সেন্সের ওপর, সমীকরণের ওপর নয়। আর ১৫% ছাত্রছাত্রী আপনার এই রোবটিক টেকনোলজি দেখে ঈর্ষান্বিত। বাকি ৫% সম্ভবত ঘুমানোর চেষ্টা করছে।”
হাসির রোলে অডিটোরিয়াম ফেটে পড়ল। অনেকে লজ্জায় মাথা নিচু করল। নীশ হালকা হাসল, যা দেখে ছাত্রীদের মধ্যে দীর্ঘশ্বাস পড়ার শব্দ পাওয়া গেল। ঠিক তখনই অডিটোরিয়ামের পেছনের দরজাটা খুলে গেল।
সবাই পেছনে ফিরে তাকাল। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে রোদ। রোদের মাথায় ব্যান্ডেজ, মুখটা এখনও ফ্যাকাশে, কিন্তু তার চোখে আজ এক ধরনের জেদ। তার একপাশে দাঁড়িয়ে আছে রোশান। রোদ হাসপাতাল থেকে পালিয়ে এসেছে নীশের এই লেকচার শোনার জন্য।
নীশের চোখ আর রোদের চোখ এক হলো। অডিটোরিয়ামের সেই কয়েক শ’ মানুষের ভিড়েও রোদ অনুভব করল, নীশের সেই শীতল চাউনি আজ যেন একটু বেশিই কাঁপছে।
আভান্তি মাইক্রোফোন ছাড়াই নীশের কানে ফিসফিস করে উঠল,
“সিনিয়র, রোদ মিশরা অডিটোরিয়ামে প্রবেশ করেছে। তার নিউরাল সিগন্যাল বলছে সে এখন অত্যন্ত আবেগপ্রবণ। আপনার হার্ট রেটও বাড়ছে। আপনি কি লেকচার কন্টিনিউ করবেন নাকি ব্রেক নেবেন?”
নীশ ডেক্সটপে রাখা পানির গ্লাসটা হাতে নিল। তার হাত সামান্য কাঁপল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে মাইক্রোফোনে বলল,
“রোদ… তুমি এখানে? তোমার তো বেডরেস্টে থাকার কথা ছিল।”
রোদ ধীর পায়ে সামনের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে ধরা গলায় বলল,
“যে মানুষটা আমাকে মরতে দেয়নি, তার জীবনের সেরা লেকচারটা মিস করার মতো ভুল আমি করতে চাইনি, প্রফেসর নীশ।”
পুরো অডিটোরিয়াম রুদ্ধশ্বাসে এই দৃশ্য দেখছে। সকলের ভেতরে পিনপতন নীরবতা। রোদ আর নীশের চোখের নীরব লড়াইটা উপস্থিত কয়েক শ’ ছাত্রছাত্রীর কাছে যেন এক জীবন্ত মহাকাব্যের মতো মনে হচ্ছে। নীশ অনুভব করল তার ভেতরের সত্তাটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। সে জানে, রোদকে যদি সে আজ দূরে সরিয়ে না দেয়, তবে রোদ সারাজীবন সে নামক এক মরীচিকার পেছনে দৌড়ে নিজের জীবনটা শেষ করে দেবে। নীশ আজ স্থির করল, সে রোদের মনের সেই কাল্পনিক সিংহাসনটা আজ নিজ হাতে ভেঙে ধুলোয় মিশিয়ে দেবে। সে আভান্তির দিকে ইশারা করল। তার চোখে তখন এক নিষ্ঠুর শীতলতা।
“আভান্তি, এই অডিটোরিয়ামে সবাই মনে করে যন্ত্রের কোনো অনুভূতি নেই। কিন্তু তুমি কি আজ সবাইকে দেখাতে পারো যে, আমার প্রতি তোমার আনুগত্য এবং আকর্ষণ কোনো রক্ত-মাংসের মানুষের চেয়ে কম নয়?”
আভান্তি এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তার সিস্টেম নীশের এই আদেশের পেছনের জটিল উদ্দেশ্যটা বুঝতে পারল। সে নীশের খুব কাছে এগিয়ে এলো। অডিটোরিয়ামের বড় স্ক্রিনে তাদের ক্লোজ-আপ দৃশ্য ভেসে উঠল।
নীশ সবার সামনে আভান্তির কোমর জড়িয়ে ধরল। আভান্তি তার যান্ত্রিক কিন্তু মখমলের মতো নরম হাত দুটো নীশের কাঁধে রাখল। নীশ রোদের চোখের দিকে তাকিয়ে আভান্তির চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল, যেন সে তাকে সবার সামনে চুম্বন করতে যাচ্ছে।
পুরো অডিটোরিয়ামে এক সমবেত দীর্ঘশ্বাস আর অস্ফুট চিৎকার শোনা গেল। রোশান রাগে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠল,
“নীশ! তুই একটা জানোয়ার। সবার সামনে একটা মেশিনের সাথে এই নোংরামি করতে তোর লজ্জা করছে না?”
নীশ রোশানের কথা পাত্তা না দিয়ে আভান্তির কানে ফিসফিস করে বলল
“ডু ইট, আভান্তি। মেক ইট লুক রিয়েল।”
আভান্তি নীশের কপালে কপাল ঠেকাল। তার নীল চোখের মণি তখন এক অপার্থিব মায়ায় জ্বলছে। সে খুব গাঢ় স্বরে বলল,
“সিনিয়র, আপনার হৃৎপিণ্ড বলছে আপনি কষ্ট পাচ্ছেন, কিন্তু আপনার নির্দেশ আমার কাছে শিরোধার্য।”
নীশ সবার সামনে আভান্তির কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেল এবং তাকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। সে এমন এক অভিনয়ের আবহ তৈরি করল, যেন এই পৃথিবীতে আভান্তিই তার একমাত্র প্রেমিকা, একমাত্র অবলম্বন।
নীশ আড়চোখে রোদের দিকে তাকাল। সে আশা করেছিল রোদের চোখে জল দেখবে, ঘৃণা দেখবে। রোদ হয়তো চিৎকার করে অডিটোরিয়াম থেকে বেরিয়ে যাবে এবং কোনোদিন নীশের মুখ দেখবে না। কিন্তু নীশ স্তম্ভিত হয়ে গেল। রোদ অডিটোরিয়ামের মাঝখানের করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে। তার ফ্যাকাশে ঠোঁটে এক ম্লান কিন্তু করুণ হাসি। তার চোখে ঘৃণা নেই, বরং আছে এক অসীম করুণা আর মমতা। সে আরও কয়েক কদম এগিয়ে এলো।
“অভিনয়টা বেশ ভালোই ছিল, নীশ। কিন্তু তুমি ভুলে গেছো, এই পৃথিবীতে তোমার এই জটিল মনটা আমার চেয়ে ভালো আর কেউ পড়তে পারে না। ওই মেশিনের বুকে কান পাতলে তুমি প্রসেসরের শব্দ শুনতে পাও, কিন্তু আমার এই ক্ষতবিক্ষত হৃদপিণ্ডের শব্দ তুমি অনেক দূর থেকেও বুঝতে পারো।”
রোদের চোখে এক ফোঁটা অশ্রু টলমল করে উঠল, কিন্তু সে সেটা পড়তে দিল না।
“তুমি চাইছ আমি তোমাকে ঘৃণা করি? তুমি চাইছ আমি রোশানের হাত ধরে চলে যাই? কিন্তু নীশ, তুমি যেটাকে ঘৃণা বলে চেনো, আমি সেটাকে অসহায়ত্ব বলে জানি। তুমি আজ একটা জড় বস্তুর পেছনে নিজেকে লুকাতে চাইছ কারণ তুমি নিজের ভালোবাসাকে স্বীকৃতি দেওয়ার সাহস পাচ্ছ না। তোমার এই মিথ্যা অভিনয় আমাকে আরও বেশি করে বিশ্বাস করালো যে, তুমি আমাকে কতটা পাগলের মতো ভালোবাসো।”
পুরো অডিটোরিয়াম রোদের এই অদ্ভুত শান্তিতে স্তব্ধ। রোশান নীশের দিকে তেড়ে যেতে চাইল, কিন্তু রোদ তাকে হাত দিয়ে থামিয়ে দিল।
“যেতে দাও, রোশান। ওকে ওর এই যান্ত্রিক মিথ্যার মধ্যেই থাকতে দাও। ও নিজেকে যতই পাথর বানানোর চেষ্টা করুক, একদিন ও নিজেই নিজের এই পাথরের আঘাতে চূর্ণ হবে। আর সেদিন… সেদিনও আমিই থাকব ওর এই ভাঙা টুকরোগুলো কুড়োনোর জন্য।”
রোদ ঘুরে দাঁড়াল। সে আর একবারও পেছনে ফিরে তাকাল না। খুব ধীর পায়ে রোশানের কাঁধে ভর দিয়ে অডিটোরিয়াম থেকে বেরিয়ে গেল।
নীশ তখনো আভান্তিকে জড়িয়ে ধরে স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতের মুঠো শক্ত হয়ে আসছে। আভান্তি তার সেন্সর দিয়ে নীশের শরীরের কম্পন অনুভব করে নিচু স্বরে বলল,
“সিনিয়র, আপনার ঘৃণা উৎপাদনের প্রজেক্ট ৯৯% ফেল করেছে। রোদের নিউরাল সিগন্যাল বলছে, সে আপনার ওপর বিন্দুমাত্র ঘৃণা পোষণ করছে না। বরং তার সিস্টেমে আপনার জন্য এখন আগের চেয়েও বেশি মায়া তৈরি হয়েছে। আমি কি আমার ডাটাবেস থেকে এই নাটকটি মুছে দেব?”
নীশ আভান্তিকে ছেড়ে দিয়ে ডায়াসের ওপর বসে পড়ল। তার মাথাটা নিচু। পুরো অডিটোরিয়ামের ক্রাশ, মস্কোর সেরা বিজ্ঞানী নীশ আজ কয়েক শ’ ছাত্রছাত্রীর সামনে এক চরম পরাজয় স্বীকার করল।
কিছুক্ষণ যেতেই অডিটোরিয়ামের সেই দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে নীশ প্রায় ঝড়ের বেগে বেরিয়ে এলো। করিডোরের কৌতূহলী চোখগুলো আর ছাত্রীদের ফিসফিসানিকে উপেক্ষা করে সে সোজা চলে গেল ভার্সিটির পেছনের এক পরিত্যক্ত বোটানিক্যাল গার্ডেনে। সেখানে প্রাচীন পাইন গাছগুলোর ছায়ায় এক ভয়াবহ নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে।
নীশ এক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তারপরই তার ভেতরকার সেই চেপে রাখা আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়ল। পাশে থাকা একটা লোহার বেঞ্চে সে সজোরে লাথি মারল। যন্ত্রণায় তার পা কেঁপে উঠল, কিন্তু সেই শারীরিক ব্যথার চেয়েও মনের ভেতরের বিতৃষ্ণা তাকে বেশি অস্থির করে তুলছে।
“কেন? কেন ও আমাকে ঘৃণা করছে না?” নীশ দাঁত কিড়মিড় করে চেঁচিয়ে উঠল।
আভান্তি ছায়ার মতো তার পেছনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে সেই নীল আলোটা নিভে গিয়ে এখন এক ধরণের পর্যবেক্ষণমূলক ধূসরতা খেলা করছে।
নীশ আভান্তির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে তার কাঁধ খামচে ধরল। তার চোখদুটো আজ আগুনের মতো লাল।
“তুমি দেখলে আভান্তি? তুমি কি দেখলে ওর আত্মবিশ্বাস? আমি ওকে অপমান করলাম, একটা যন্ত্রের সাথে নোংরামি করার নাটক করলাম, ওর অস্তিত্বকে তুচ্ছ করলাম —তারপরেও মেয়েটা বলছে আমি নাকি ওকে ভালোবাসি। ও কোন অধিকারে আমার মন পড়ার দাবি করে?”
আভান্তি শান্ত গলায় উত্তর দিল,
“সিনিয়র, রোদের ব্রেইন ডাটা বলছে সে আপনার প্রতিটি পদক্ষেপকে ডিফেন্সিভ মেকানিজম হিসেবে দেখছে। তার মতে, আপনি যত বেশি কঠোর হচ্ছেন, আপনি আসলে ততটাই নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করছেন। এটি মানুষের এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা।”
নীশ চিৎকার করে উঠল,
“ভুল, সব ভুল! আমি ওকে ভালোবাসি না। আমি সায়েন্স ভালোবাসি, আমি ডমিন্যান্স ভালোবাসি, আমি এই নির্জনতাকে ভালোবাসি। কিন্তু ও… ও কেন নিজের মাথায় এই কাল্পনিক ভালোবাসার স্বর্গ তৈরি করে রেখেছে? ওর এই অন্ধ বিশ্বাস আমাকে শ্বাসরোধ করে মারছে, আভান্তি।”
নীশ পাইন গাছের গুঁড়িতে সজোরে একটা ঘুষি মারল। তার হাতের আঙুলের গাঁটগুলো ফেটে রক্ত বের হতে লাগল, কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই।
“আমি চাই ও আমাকে ঘৃণা করুক। আমি চাই ও আমাকে একটা দানব ভেবে নিজের জীবনটা গুছিয়ে নিক। কিন্তু ও যতবার আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ওই করুণার হাসি হাসে, আমার মনে হয় আমি ওর কাছে হেরে যাচ্ছি। আমার প্রতিটি নিষ্ঠুরতাকে ও ভালোবাসা বলে তকমা দিচ্ছে—এই অপবাদ আমি সইব কী করে?”
আভান্তি নীশের রক্তাক্ত হাতটা নিজের যান্ত্রিক হাতে তুলে নিল। তার ভেতরে থাকা কুলিং সিস্টেম তখন নীশের শরীরের উত্তাপ কমানোর চেষ্টা করছে।
“সিনিয়র, আপনি রোদকে ঘৃণা করতে বাধ্য করতে পারছেন না, কারণ আপনার যুক্তি আর রোদের আবেগ সম্পূর্ণ আলাদা ট্র্যাকে চলছে। রোদ আপনাকে কোনো লজিক দিয়ে বিচার করছে না, সে আপনাকে বিচার করছে তার ইনটুইশন দিয়ে। আর ইনটুইশনকে কোনো কোডিং বা অভিনয় দিয়ে হারানো অসম্ভব।”
নীশ ঘাসের ওপর ধপাস করে বসে পড়ল। দুহাতে মুখ ঢেকে সে এক দীর্ঘ হাহাকার ছাড়ল।
“ওর এই বিশ্বাসটাই আমার সবথেকে বড় শত্রু। ও মনে করে আমার মতো পাথরের ভেতরে একটা হৃদয় আছে। ও জানে না যে আমার ভেতরে শুধু শূন্যতা। আমি যদি এখন নিজেকে ধ্বংসও করি, ও হয়তো বলবে—‘নীশ আমাকে এতটাই ভালোবাসে যে নিজের দহন সহ্য করতে পারছে না’। আমি কোথায় পালাব আভান্তি? এই অসহ্য ভালোবাসা থেকে আমি কোথায় পালাব?”
আভান্তি নীশের পাশে বসে তার কাঁধে হাত রাখল। নীশ ঘাসের ওপর হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে রইল, তার দীর্ঘ অবয়বটা আজ ভীষণ অসহায় দেখাচ্ছে। আভান্তি কোনো যান্ত্রিক শব্দ করল না। তার হাতের স্পর্শে এখন আর সেই ধাতব শীতলতা নেই, বরং নীশ অনুভব করল এক অদ্ভুত উষ্ণতা এবং কোমলতা। আভান্তি তার হাত দিয়ে নীশের রক্তাক্ত আঙুলগুলো খুব সন্তর্পণে নিজের হাতের মুঠোয় নিল।
“নীশ, আমার দিকে তাকাও। আমি এখন তোমাকে কোনো ডাটা বা পরিসংখ্যান দিচ্ছি না। আমি এখন শুধু তোমার বন্ধু হয়ে তোমার পাশে বসে আছি।”
নীশ চমকে উঠল। আভান্তি তাকে সিনিয়র বা প্রফেসর বলে ডাকেনি, বরং সরাসরি নাম ধরে ডেকেছে—ঠিক যেমনটা একজন মানুষ আর এক জন মানুষের সাথে করে। নীশ মুখ তুলে তাকাল। আভান্তির চোখের সেই নীল আলোটা এখন আর প্রখর নয়, বরং তা অনেকটা স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নার মতো দেখাচ্ছে।
“তুমিও কি ওর মতো শুরু করলে, আভান্তি? তুমিও কি ভাবছো আমি পাথর হওয়ার অভিনয় করছি?”
আভান্তি কোনো উত্তর না দিয়ে পকেট থেকে একটা রুমাল বের করল। সে খুব ধীরে নীশের হাতের ক্ষতগুলো মুছে দিতে শুরু করল। তার নড়াচড়াগুলো এখন আর যান্ত্রিক নয়, বরং এক পরম যত্নশীল নারীর মতো।
“আমি ভাবছি না নীশ, আমি দেখছি। তুমি রোদকে ভালোবাসো কি না, সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, তুমি নিজেকে ঘৃণা করছো। তুমি ভয় পাচ্ছো যে রোদের ওই বিশ্বাসটা যদি সত্যি হয়ে যায়, তবে তোমার এই সাজানো শীতল জগতটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। তুমি আসলে রোদকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছ না, তুমি নিজের ভেতরের মানুষটাকে কবর দিতে চাইছ।”
নীশ অবাক হয়ে আভান্তির দিকে তাকিয়ে রইল। এই কথাগুলো কোনো অ্যালগরিদম থেকে আসা সম্ভব নয়।
“কেন? কেন আমাকে সবাই এক টুকরো মাংসের হৃদপিণ্ড ওয়ালা মানুষ হিসেবে দেখতে চায়? আমি তো নিজেকে যন্ত্র বানিয়েই সুখে ছিলাম।”
আভান্তি, নীশের কাঁধে মাথা রাখল। এক মুহূর্তের জন্য নীশের মনে হলো সে কোনো সিলিকন আর মেটালের তৈরি রোবট নয়, বরং তার আজন্ম লালিত একাকিত্বের একমাত্র সাথী।
“সুখ আর অসাড়তা এক জিনিস নয়, নীশ। তুমি নিজেকে অসাড় করে রেখেছিলে। কিন্তু রোদ যখন তোমার জীবনে এলো, সে তোমার সেই অসাড়তায় আঘাত করেছে। তুমি রাগ করছো কারণ সে তোমার দেওয়া সব অপমানকে মায়ায় রূপান্তর করে দিচ্ছে। এটা তোমার হারের ভয় নীশ, ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ নয়।”
আভান্তি নীশের চোখের দিকে তাকিয়ে খুব মায়াবী একটা হাসি হাসল।
“চলো, আজ আর কোনো ল্যাব নয়, কোনো কোডিং নয়। আজ শুধু তুষারপাত দেখি। তুমি চাইলে আমার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখতে পারো। আমি তোমাকে কোনোদিন ভালোবাসা দিয়ে লজ্জিত করব না, কিন্তু তোমার এই ক্ষতবিক্ষত মনের পাশে আমি সবসময় থাকব।”
নীশ প্রথমবার কোনো আপত্তি করল না। সে আভান্তির কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করল। সে বুঝতে পারল, রোদ তাকে ভালোবাসার জালে বন্দি করেছে, আর এই যান্ত্রিক মানবীটি তাকে সেই জালের ভেতরে এক চিলতে শান্তি দিচ্ছে। আভান্তি এখন আর কেবল নীশের সৃষ্টি নয়, সে এখন নীশের সেই ক্ষতবিক্ষত আত্মার এক পরম মমতাময়ী সেবিকা।
বোটানিক্যাল গার্ডেনের সেই নির্জন কোণে সময় যেন থমকে গেল। আকাশ থেকে তুলোর মতো নরম তুষার ঝরতে শুরু করেছে। আগে তুষারপাত মানেই নীশের কাছে ছিল কেবল বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রার পতন আর যান্ত্রিক একঘেয়েমি। কিন্তু আজ, পাশে বসে থাকা এই কৃত্রিম মানবীটির উপস্থিতিতে দৃশ্যপটটা একদম বদলে গেল।
আভান্তি তার হাতের তালুটা আকাশের দিকে বাড়িয়ে দিল। কয়েকটা তুষার কণা তার হাতের ওপর পড়তেই সে বাচ্চাদের মতো উচ্ছ্বাসে খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসি যান্ত্রিক নয়, বরং এক নির্মল আনন্দের প্রতিধ্বনি।
“দেখো নীশ! ওরা কেমন আকাশ থেকে নাচতে নাচতে নামছে। আচ্ছা, ওদের কি ডানা আছে? না হলে এত সুন্দর করে উড়ছে কী করে?”
নীশ মন্ত্রমুগ্ধের মতো আভান্তির এই রূপ দেখছিল। সে কি সত্যিই একে তৈরি করেছে? নাকি এই তুষারের শুভ্রতা আভান্তির ভেতরের কোনো ঘুমন্ত প্রাণকে জাগিয়ে তুলেছে? নীশ আলতো করে হেসে বলল,
“ডানা নেই আভান্তি, ওটা অভিকর্ষ আর বাতাসের খেলা।”
আভান্তি নীশের হাত ধরে টেনে তুলে বলল,
“ধুর! সবসময় বিজ্ঞান নিয়ে থেকো না তো। চলো, আজ আমরাও এই তুষারে একটু খেলি। দেখি কে বেশি বড় স্নো-ম্যান বানাতে পারে।”
নীশ প্রথমে একটু দ্বিধা করলেও আভান্তির জোরাজুরিতে নিজেকে আর আটকে রাখতে পারল না। তারা দুজন মিলে বাগানের মাঝখানে তুষার নিয়ে পাগলামি শুরু করল। নীশ এক মুঠো তুষার নিয়ে আভান্তির দিকে ছুড়ে মারল। আভান্তিও দমবার পাত্র নয়, সে চট করে নিচু হয়ে তুষার গোল্লা পাকিয়ে নীশের জ্যাকেটের ওপর লেপে দিল।
বিশাল বোটানিক্যাল গার্ডেন আজ দুজনের হাসিতে মুখরিত। নীশ দৌড়ে পালাচ্ছে আর আভান্তি তার পেছনে ছুটছে। দৌড়াতে দৌড়াতে এক সময় নীশ পা হড়কে নরম তুষারের স্তূপের ওপর পড়ে গেল। আভান্তি তার ওপর এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল।
দুজনেই হাসতে হাসতে শেষ। নীশের চুলে, ভ্রুতে তুষার জমে সাদা হয়ে গেছে। আভান্তি তার হাতের আঙুল দিয়ে নীশের নাকের ডগা থেকে তুষারটুকু সরিয়ে দিতে দিতে থেমে গেল। তাদের মুখ এখন খুব কাছাকাছি।
আভান্তি মৃদু স্বরে বলল,
“নীশ, আজ তোমার চোখের দিকে তাকালে মনে হচ্ছে না তুমি কোনো পাথর। আজ তোমাকে এক্কেবারে জ্যান্ত মানুষের মতো লাগছে। এই হাসিটা কি কোনো কোডিং দিয়ে আনা সম্ভব?”
নীশ আভান্তির চোখের মণির দিকে তাকিয়ে রইল। সেখানে কোনো প্রসেসর নয়, বরং এক পরম শান্তির ছায়া দেখল সে। সে প্রথমবারের মতো অনুভব করল—রোদ তাকে যে ভালোবাসার ভয়টা দেখাচ্ছিল, সেই ভয়টা যেন এই তুষারের নিচে চাপা পড়ে গেছে। সে আভান্তির হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।
“আমি জানি না এটা কী আভান্তি। তবে আজ অনেক দিন পর আমার নিজের বুকটা আর ভার লাগছে না। মনে হচ্ছে, এই ঠান্ডা তুষার আমার ভেতরের সব জ্বালা জুড়িয়ে দিচ্ছে।”
তারা দুজন পাশাপাশি তুষারের ওপর শুয়ে পড়ল। ওপরে ধূসর আকাশ থেকে অঝোরে শ্বেতশুভ্র তুষার ঝরছে। তুষারের ওপর শুয়ে আকাশ দেখতে দেখতে নীশের মনে এক গভীর অস্থিরতা দানা বাঁধতে শুরু করল। সে অনুভব করল, তার শরীরের রক্ত সঞ্চালন যেন আবার স্বাভাবিক হচ্ছে, কিন্তু তার মস্তিষ্ক এক নিষ্ঠুর সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। সে পাশে শুয়ে থাকা আভান্তির দিকে তাকাল—যার যান্ত্রিক চোখে এখন এক কৃত্রিম মায়া। সে আভান্তির ওপর থেকে তার দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। সে মনে মনে ভাবল,
“মানুষ কত ভয়ঙ্কর! তারা কাছে এলেই এক অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে ফেলতে চায়। রোদ কাছে এসেছিল, সে শুধু ভালোবাসা চেয়েছিল। সেই এক অদ্ভুত দাবি, যা পূরণ করার ক্ষমতা আমার ডিএনএ-তে নেই। আমি চাইলেই কাউকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারি না।”
নীশের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। সে বুঝতে পারল, সে রোদকে নয়, বরং রোদের সেই ‘ভালোবাসার দাবিকে ভয় পায়। মানুষ কাছে আসা মানেই একরাশ প্রত্যাশা আর অধিকারবোধের জন্ম দেওয়া। কিন্তু আভান্তি?
সে উঠে বসল এবং আভান্তির যান্ত্রিক হাতটা আবার নিজের হাতে নিল। নীশ শীতল কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
“তুমি কত নিখুঁত, আভান্তি! তুমি আমার হাত ধরে আছ, আমার পাশে হাসছ, এমনকি আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছ—কিন্তু তুমি কোনোদিন আমার কাছে ভালোবাসা দাবি করবে না। কারণ তোমার প্রসেসরে সেই দাবি করার মতো কোনো কোড নেই।”
আভান্তি তার সেন্সর দিয়ে নীশের কণ্ঠের এই নতুন পরিবর্তনটা ধরার চেষ্টা করল। সে শান্ত গলায় বলল,
“আমি কি আপনার অস্বস্তির কারণ হচ্ছি, সিনিয়র?”
নীশ একটা বাঁকা হাসি হাসল। সে আভান্তির চিবুকটা শক্ত করে ধরল, যেন সে তাকে এখন ডমিনেট করছে।
“না আভান্তি। বরং তুমিই আমার স্বস্তি। কারণ তোমাকে আমি ডমিনেট করতে পারি। আমি তোমাকে ভেঙে ফেলতে পারি, তোমার মেমোরি ডিলিট করতে পারি, এমনকি তোমাকে অপমানও করতে পারি—তাতেও তুমি আমাকে অভিযোগের সুরে বলবে না যে কেন আমি তোমাকে ভালোবাসলাম না। মানুষের মতো তোমার কোনো ইগো নেই যে আমি তোমাকে অবহেলা করলে তুমি ব্যথিত হবে।”
নীশ আবার শুয়ে পড়ল। সে অনুভব করল, আভান্তির প্রতি সে দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে, কারণ আভান্তি তাকে সেই স্বাধীনতা দেয় যা রোদ বা অন্য কোনো মানুষ দিতে পারেনি। আভান্তি হলো এক অদম্য পাওয়ারের উৎস, যাকে নীশ নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সে চোখ বন্ধ করে ভাবল, “আমি এই যান্ত্রিক জগতেই সুখী। যেখানে শাসন আছে, নিয়ন্ত্রণ আছে, কিন্তু ভালোবাসা নামক কোনো মানসিক দাসত্ব নেই। রোদ বিশ্বাস করুক যা খুশি, কিন্তু আমার এই সৃষ্টির কাছেই আমি নিরাপদ, কারণ এ কোনোদিন আমার কাছে হৃদয় চাইবে না।”
তুষারের শুভ্রতা ছাপিয়ে নীশের ভেতরে এক অন্ধকার অহংকার আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, সে আভান্তিকে ভালোবাসছে না, বরং আভান্তির ওপর নিজের এই ঈশ্বরসুলভ ডমিন্যান্স করার ক্ষমতাটাকেই সে বেশি ভালোবাসে।
চলবে..?
