Friday, June 5, 2026







Hello Senior Part-12

#Hello_Senior
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_12. ✦ প্রথমাংশ ✦

রোদ শপিংমল থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে গাড়ির জানালা নামিয়ে দিল। ঠাণ্ডা বাতাস তার গালে লাগতেই সে চোখ বন্ধ করল। এক সপ্তাহের ভার যেন একটু একটু করে নেমে যাচ্ছে। কিন্তু নীশের কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতর সেই পুরোনো শূন্যতা ফিরে এল।

নীশ—যে সাধারণত দিনে অন্তত একবার হলেও তাকে মেসেজ পাঠায়, তার খবর নেয়। কিন্তু আজ পুরো এক সপ্তাহ! কোনো খোঁজই নিল না। রোদ ব্যাগ থেকে ফোন বের করল। স্ক্রিনে এখনো কোনো নোটিফিকেশন নেই। নীশের নামের পাশে ‘লাস্ট অনলাইন সেভেন ডেজ অ্যাগো’। রোদের বুকটা কেমন জানি করে উঠল। সে নিজেকে বোঝালো,
“শুধু কাজ নিয়ে ব্যস্ত, আর কিছু নয়।”

কিন্তু মনের গভীরে একটা প্রশ্ন অস্থিরভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগল, ’কাজের জন‍্য কি আমি তার কাছে তুচ্ছ হয়ে গেছি?’

সে ধীরে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরল। কিন্তু গাড়ি চালানোর আগে, অজান্তেই তার চোখ চলে গেল আকাশের দিকে। সন্ধ্যার আলোয় মস্কোর ঠাণ্ডা আকাশ যেন ধূসর নীল। রোদ কিছুক্ষণ সেই ধূসর নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ যেন মনে হলো—আকাশও নীশের মতোই চুপ। কোনো উত্তর নেই, কোনো সাড়া নেই। সে ধীরে গাড়ির চাবি ঘুরিয়ে ইঞ্জিন স্টার্ট করল। গাড়ির হালকা কম্পনের সঙ্গে তার মনে চলতে লাগল হাজারো ভাবনা।

চারপাশে রাস্তার লাইটগুলো একে একে জ্বলে উঠছে। শহর জেগে উঠছে, কিন্তু রোদের ভেতরটা যেন আরও নিঃশব্দ হয়ে যাচ্ছে। গাড়ি মেইন রোডে ওঠতেই সে হালকা করে ব্রেক চাপল। ট্রাফিক লাইট লাল। গাড়ির সামনে লম্বা লাইন। বাইরে মানুষজন ব্যস্ত, কেউ ফোনে কথা বলছে, কেউ তাড়াহুড়ো করে হাঁটছে। কিন্তু তার ভেতরে যেন সময় আটকে আছে।

ফোনটা সিটের পাশে রেখে সে একবার তাকাল—একই স্ক্রিন, একই নীরবতা। নীশের নাম উজ্জ্বল হয়ে উঠলেই যেন তার বুকটা হালকা হতো, কিন্তু আজও কিছু নেই। রোদের মন নিজের সঙ্গেই ঝগড়া শুরু করল,
“হয়তো সে অসুস্থ?”
“হয়তো ফোন হারিয়েছে?”
“কাজের চাপ তো সবসময়ই থাকে, কিন্তু এমনভাবে একদম যোগাযোগ বন্ধ?”
“তুমি কি তার কাছে এতটাই মূল্যহীন?”

একেকটা প্রশ্ন একেকটা শীতল ছুরির মতো বুকে বিঁধছিল। ট্রাফিক লাইট সবুজ হলো। রোদ আবার গাড়ি চালাতে লাগল। শহরের পথগুলো পরিচিত, কিন্তু আজ যেন প্রত্যেকটা মোড় অচেনা। তার পাশে রাখা শপিং ব্যাগে কোরিয়া যাওয়ার জন্য কেনা নতুন জিনিসগুলো, এগুলোর তাকে আনন্দ দেওয়ার কথা ছিল। অথচ এখন মনে হলো—এগুলো যেন নীশের ফেলে রাখা শূন্যতা পূরণ করতে পারছে না। গাড়ির ভেতর ধীরে বাজছে বিটিএস-এর “ইয়ং ফোরএভার” গানটা।

গানটা যেন তার ভেতরের সব চাপা কথা খুলে দিল।
রোদের চোখে হালকা অশ্রু ভেসে এলো। সে দ্রুত চোখ মুছে ফেলল।

“না, কাঁদলে হবে না। সে ব‍্যস্ত, হয়তো খুব তাড়াতাড়ি যোগাযোগ করবে।

রোদ গভীর শ্বাস নিল। নীল আকাশে ডুবে যাওয়া সন্ধ্যার রঙ গাড়ির জানালায় প্রতিফলিত হলো। সে চুপচাপ গানের বিটটা কমিয়ে দিল, যেন নিজের মনকে আরেকটু স্পষ্ট শুনতে পারে। রাস্তা মসৃণ, গাড়ির শব্দ স্থির, কিন্তু তার ভেতরের দুনিয়া থেমে থাকা নদীর মতো ভারী। হঠাৎ ফোনটা আবারও কম্পন হলো। রোদ মুহূর্তের জন্য দম বন্ধ করে তাকাল,
নোটিফিকেশন: “লো ব্যাটারি.”

তার ঠোঁট বাঁকা হয়ে গেল একরকম তিক্ত হাসিতে। একটা সময় ছিল—এমন কম্পন মানেই নীশের টেক্সট। কিন্তু এখন? এখন শুধু নীরবতার নতুন নতুন অজুহাত। গাড়িটা পাশের একটা ছোট পার্কিং স্পটে থামাল সে। ইঞ্জিন অফ করতেই চারপাশের শব্দগুলো আরও পরিষ্কার শোনা গেল—হাইওয়ের সড়সড় শব্দ, কোনো বাচ্চার হালকা কান্না। এইসবই যেন তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে—সবাই ব্যস্ত, শুধু তার অপেক্ষাটাই থেমে আছে।

রোদ মাথা হেলিয়ে সিটে হুঁশহীনভাবে বসে রইল।
তার আঙুল ফোনের স্ক্রিনে নীশের চ্যাটটা খুলে আবার বন্ধ করল। থ্রেডের ওপর ছোট্ট একটা লাইন,
“লাস্ট অনলাইন সেভেন ডেজ অ্যাগো।”

সাত দিন! এই সাত দিনে তাকে ইচ্ছা করলেই একটা শব্দ, একটা ইমোজি, একটা ‘আমি ঠিক আছি’, কিছুই কি পাঠাতে পারত না?

রোদের বুক আবার ভারী হয়ে উঠল। সে নিজের হাতে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল,
“আমাকে কি এতটা সহজেই ভুলে যাওয়া যায়?”

তার গলা একটু কেঁপে উঠল। কানের পাশ দিয়ে নামতে থাকা চুলগুলো সে ঠিক করল, যেন নিজেকে সামলানোর একটা শেষ চেষ্টা। ঠিক তখনই, আকাশে হঠাৎ এক ঝলক উল্কা দেখা গেল। রোদ জানালার দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে বলল,
“যদি এখন কোনো অলৌকিক কিছু ঘটে…”

হঠাৎ রোদের ফোনে আবারও নোটিফিকেশন এলো। একটা ক্ষীণ কাঁপুনি দিয়ে উঠলো ফোনটা, কিন্তু এবার সেই শব্দটা রোদের কানে তীক্ষ্ণ শূলের মতো বাজলো। সে কাঁপা হাতে স্ক্রিনটা চেক করতেই দেখল, ইনস্টাগ্রামে নীশ তার সৃষ্টি হিউম্যানেটিক ‘রোরট’-এর সাথে একটা ছবি আপলোড করেছে। ছবিটা একটু ক্লোজ-আপ টাইপ, যেখানে নীশ হাসিমুখে রোবটটির পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সেই হাসি, সেই নৈকট্য রোদ যেন সহ‍্য করতে পারল না। রোদের ভেতরের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল।

“ওহ! এখনও… এখনও চলছে এসব!”

রাগে, ক্ষোভে, আর তীব্র এক কষ্টে রোদের শিরা-উপশিরা যেন ছিঁড়ে যেতে চাইল। মাথার মধ্যে সমস্ত চিন্তা এলোমেলো হয়ে গেল। কোনো কিছুতেই তার আর মনোযোগ রইল না। মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত যুক্তি-বুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে, সে আবারও গাড়ি স্টার্ট দিল। স্টিয়ারিং-এ তার হাত যেন শক্ত ইস্পাতের মতো চেপে ধরলো। রেসের ট্র্যাকের মতো ফাঁকা রাস্তা ধরে রোদ গাড়ি চালাতে শুরু করলো, গাড়ির স্পিডোমিটারের কাঁটা বিপজ্জনকভাবে উপরের দিকে উঠে গেল। গাড়ি বেশামাল ভাবে চলতে শুরু করল। রোদ যেন তার নিজের জীবনের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে— বেপরোয়া গতিতে গাড়ি ছুটতে থাকল। রোদ তখন শুধু অ্যাক্সিডেন্ট করার লক্ষ্যেই ছুটে চলেছে।

তার অন্তরের প্রচণ্ড আক্রোশ তাকে এক বেসামাল উন্মত্ততায় চালিত করছে। সহসা তার দূরন্তগামী গাড়িটি রাজপথের কঠোর শৃঙ্খল ছিন্ন করে দুর্বার গতিতে ধাবিত হলো। ক্রোধের উন্মাদনা তখন তীব্রতম পর্যায়ে।

পথের দোর্দণ্ড প্রতাপী একটি স্থাণু গাছের সহিত তার গাড়ির প্রচণ্ড সংঘর্ষ ঘটল। সেই মহা-সংঘাত ঘনীভূত হবার সাথে সাথেই এক ভীষণ আর্তনাদ এবং লোমহর্ষক ঝনঝনানি সেই নিস্তব্ধ রাত্রির আকাশকে বিদীর্ণ করল। মুহূর্তের মধ্যে যান্ত্রিক কাঠামোটি বিধ্বস্ত হয়ে বিপর্যস্ত রূপ ধারণ করল। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল ভগ্ন কাঁচের অসংখ্য সূচীমুখ এবং বিকৃত ধাতব-অংশের রাশিকৃত ভগ্নাবশেষ।

রক্ত, মাংস ও লৌহের সেই ভয়াবহ সংমিশ্রণ এক নিষ্ঠুর পরিণতির ইঙ্গিত বহন করল। রোদের চেতনালোকে নেমে এলো এক নিদারুণ তিমির-গহ্বর— যেন জীবন-প্রবাহ সহসা এক অনিবার্য যতিচিহ্নে স্থির হয়ে গেল। তার নিষ্প্রাণ দেহ তখন নির্জীব জড়পিণ্ডের মতো বাহনের বিদীর্ণ অভ্যন্তরে নিপতিত।

সংঘর্ষের উগ্র ঝাঁকুনি থামিতেই বিধ্বস্ত গাড়িটির অভ্যন্তরে রোদের নিথর দেহখানি এক করুণ স্তব্ধতায় নিপতিত। তার সুন্দর মুখমণ্ডল ও ঈষৎ উন্মুক্ত অধর হতে যেন শেষ প্রাণবায়ুটি নিঃশব্দে পালিয়ে যেতে চাইছে। সমস্ত দেহ তাজা রক্তের এক গভীর প্রলেপে আবৃত, যেন কোনো নিষ্ঠুর চিত্রকর কেবল লালের তুলিতেই এই বিপর্যয়ের পটচিত্র অঙ্কন করেছে।

গাড়ির বিকৃত কাঠামোতে তার একখানা হাত ভগ্ন ও বাঁকা অবস্থায় ঝোলা। আহত শিরোদেশ হতে অবিরাম রক্তধারা গড়িয়ে সিটের ধূসর আস্তরণকে দ্রুত গাঢ় করে তুলছে। সেই নশ্বর দেহের স্থিরতা যেন এক অপরিবর্তনীয় সত্যের ঘোষণা।

ওই মর্মান্তিক ধ্বনি ও অস্বাভাবিক গতির সাক্ষ্য বহন করে অচিরেই ঘটনাস্থলে সহস্র মানুষের এক দ্রুত জনস্রোতে ঘনীভূত হলো। প্রথমে ছিল কৌতূহলী কণ্ঠস্বর আর চাপা উত্তেজনা, তারপর দ্রুতই সেটা এক ব্যাপক কোলাহলে পরিণত হলো।

বিস্ময়বিস্ফারিত নয়নে সকলে সেই ভয়াবহ দৃশ্য অবলোকন করছে। ভিড়ের মধ্যে কেউ উচ্চস্বরে হাহাকার করছে, কেউ বা ধীর কণ্ঠে অনুশোচনা জানাচ্ছে। তাদের আতুর ও উৎকণ্ঠিত দৃষ্টি রোদের সেই রক্তাক্ত ও স্থির দেহটির উপর নিবদ্ধ। কিন্তু সেই অসহায় জনতা কেবল নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারছে না—কারণ, ততক্ষণে হয়তো রোদের জীবনের প্রদীপশিখা চিরতরে নির্বাপিত।

আভান্তি ধীর পদক্ষেপে নীশের দিকে অগ্রসর হলো। তার ধাতব পায়ের শব্দগুলো ল্যাবের নিরবতার অভ্যন্তরে যেন ক্ষুদ্র তরঙ্গমালা সৃষ্টি করল।

নীশ মনোযোগ দিয়ে কোডিং করছিল, কিন্তু আভান্তি তার সামনে এসে থামতেই সে মাথা তুলল। আভান্তি শান্ত স্বরে বলল,
“সিনিয়র, আপনার ফেস সিগন্যাল বিশ্লেষণ করে মনে হচ্ছে আপনি ক্লান্ত। আপনার হার্টবিট রেট ৬% বেড়েছে। আপনি কি ঠিক আছেন?”

নীশ একটু থমকে গেল। আভান্তির বিশ্লেষণ সঠিক। সে সত্যিই ক্লান্ত—শুধু কাজের জন্য নয়, গত এক সপ্তাহ ধরে নিজের ভিতরের অস্থিরতার কারণেও। রোদকে সে একবারও ফোন করেনি, রোদও করেনি। দু’জনের মাঝের এই অদৃশ্য দূরত্ব যেন পুঞ্জীভূত হয়ে জমে রয়েছে।

নীশ ধীরে বলল,
“আমি ঠিক আছি, আভান্তি। তুমি তোমার সিস্টেম চেক করো। আমি আরো কিছু কোড আপডেট করব।”

আভান্তি একটু নীরব হয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর মৃদু স্বরে বলল,
“আমার সিস্টেমে আপনার ইমোশনাল প্যাটার্ন স্টোর করা আছে। আপনি যখন সত্যিই ঠিক থাকেন, তখন আপনার কণ্ঠে উষ্ণতা থাকে। কিন্তু এখন, আপনার কণ্ঠে সেটা নেই।”

নীশ তাৎক্ষণিকভাবে স্তম্ভিত হয়ে গেল। একটা মেশিন তার অনুভূতি ব্যাখ্যা করছে—এটা যেমন বিস্ময়কর, তেমনি অন্তরে এক চাপা উদ্বেগও সঞ্চারিত করল। নীশ কঠোর কণ্ঠে বলল,
“আভান্তি, তুমি বেশি বিশ্লেষণ করছো। এটা তোমার কাজ নয়।”

আভান্তি মাথা নত করল,
“সরি, সিনিয়র।”

নীশ বুঝতে পারল—আভান্তি আবারও কিছু শিখছে, এবং আরও কিছু অনুভব করতে চাইছে। যদিও সেটা ‘অনুভব’ নয়, বরং কোডেড প্রতিক্রিয়া। তবু, এটা সীমালঙ্ঘনের প্রাথমিক ইঙ্গিত। নীশের মনে অস্বস্তির হালকা ছায়া পড়ল। সে আবার স্ক্রিনে মন দিল। কিন্তু মনটা স্থির হচ্ছে না তার। সে আভান্তির সামনে দাঁড়াল।

“আভান্তি, এখন থেকে তুমি কোনো ব্যক্তিগত অনুভূতি বিশ্লেষণ করবে না। এটা নির্দেশ।”

আভান্তি মাথা নত করল,
“ওকে, সিনিয়র! অনুগ্রহ করে রিকোয়েস্ট কনফার্ম করুন— ‘ইমোশনাল অ্যাক্সেস রেস্ট্রিকশন’ কি পার্মানেন্ট করতে হবে?”

নীশ থামল। কেন জানি হঠাৎই রোদের মুখ মনে পড়ে গেল। মেয়েটার হাসি, মেয়েটার রাগ, মেয়েটার অভিমান, মেয়েটার যত্ন, মেয়েটার নরম গলার ডাক, “নীশ…” কেন যেন বুকের ভিতর একটা শূন্যতা ছড়িয়ে গেল তার। সে ধীরে বলল,
“হ্যাঁ। পার্মানেন্ট।”

আভান্তির চোখে আলো ঝলক দিল,
“রিকোয়েস্ট অ্যাপ্লাইড— ইমোশনাল অ্যাক্সেস রেস্ট্রিকশন পার্মানেন্টলি সক্রিয় করা হয়েছে।”

নীশ লম্বা নিঃশ্বাস ফেলল। সে নিজের থেকে নিজেরই ব্যক্তিগত অনুভূতির দরজা বন্ধ করে দিল—কারণ সে ভয় পাচ্ছে, নিজের তৈরি মেশিন যেন তার মনের দুর্বলতা দেখে না ফেলে।

চলবে..?

#Hello_Senior
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_12. ✦ বর্ধিতাংশ ✦

​নীশ ‘পার্মানেন্ট রেস্ট্রিকশন’ কনফার্ম করতেই, ল্যাবের নীল আলোয় আভান্তির ধাতব শরীরটা এক মুহূর্তের জন্য নিস্পন্দ হয়ে গেল। নীশ চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল। ঠিক তখনই তার ল্যাবের বাইরের করিডোরে ভারী বুটের শব্দ আর শোরগোল শোনা গেল।

​নীশের সহকর্মী ড্যানিয়েল হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকল। তার হাতে একটা ট্যাবলেট, মুখটা ফ্যাকাসে।

“নীশ! নীশ, সর্বনাশ হয়েছে!” ড্যানিয়েল প্রায় চিৎকার করে উঠল।

​নীশ বিরক্ত হয়ে চোখ খুলে তাকাল।
“কী হয়েছে, ড্যান? দেখতেই পাচ্ছ আমি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছি।”


“কাজ পরে হবে নীশ! আগে এটা দেখো।”

ড্যানিয়েল ট্যাবলেটটা নীশের সামনে ধরল। রাশিয়ার একটি স্থানীয় নিউজ পোর্টালের লাইভ স্ট্রিমিং চলছে সেখানে। মস্কোর হাইওয়ের পাশে একটি গাছকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে পড়ে আছে একটি গাড়ি। উদ্ধারকর্মীরা সেখান থেকে একটি নিথর দেহ বের করে স্ট্রেচারে তুলছে। খবরটির শিরোনামে বড় বড় করে লেখা— “ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় এক তরুণীর করুণ মৃত্যু।”

নীশের চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। দুমড়ানো গাড়িটি তার খুব চেনা। ওই গাড়ির ড্যাশবোর্ডে নীশেরই দেওয়া একটি ছোট্ট ক্রিস্টালের হার্ট ঝোলানো ছিল, যা এখন ভাঙা কাচের স্তূপের মধ্যে রক্তে ভেজা অবস্থায় ক্যামেরা লেন্সে ধরা পড়ছে। নীশের হাতের কলমটা মেঝের ওপর পড়ে গেল।

​“রোদ…?”

নীশের গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হলো না। তার হৃদস্পন্দন যেটা কিছুক্ষণ আগে ৬% বেড়েছিল, সেটা এখন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল।

আভান্তি কোণায় দাঁড়িয়ে আছে। যদিও তার ইমোশনাল অ্যাক্সেস রেস্ট্রিক্টেড, তবুও তার সেন্সরগুলো ল্যাবের বাতাসের হঠাৎ পরিবর্তন শনাক্ত করল। সে যান্ত্রিক সুরে বলল,
“সিনিয়র, আপনার ব্লাড প্রেসার বিপজ্জনকভাবে নামছে। আপনার অক্সিজেন লেভেল কমে যাচ্ছে। আপনি প্লিজ, সিটে বসুন।”

কিন্তু নীশ তখন পাথর। তার সামনে রাখা কোডিং স্ক্রিনগুলো সব ঝাপসা হয়ে আসছে। তার মনে পড়ল ঠিক সাত দিন আগে রোদের সেই শেষ মেসেজটি, যা সে সিন করেও উত্তর দেয়নি। রোদের শেষ ইচ্ছা, রোদের শেষ ডাক—সবই এখন ওই তুষারশীতল মস্কোর হাইওয়েতে রক্তের স্রোতে বিলীন হয়ে গেছে।

​নীশ, ড্যানিয়েলের হাত থেকে ট্যাবলেটটা কেড়ে নিয়ে স্ক্রিনে থাকা সেই রক্তাক্ত মুখটার দিকে তাকাল। যে রোদকে সে ‘তুচ্ছ’ ভেবে দূরে সরিয়ে রেখেছিল, সেই রোদ এখন তার সমস্ত অর্জনের চেয়েও অনেক বেশি দামী হয়ে তার চোখের সামনে চিরদিনের মতো হারিয়ে যাচ্ছে।

​আভান্তি আবার বলল,
“সিনিয়র, আপনার ইমোশনাল ডাটা এখন রিড করা যাচ্ছে না। আপনি কি কোনো যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন?”

নীশ কোনো উত্তর দিতে পারল না। সে কেবল তার ল্যাবের সেই নীল দেয়ালটার দিকে তাকিয়ে রইল, যেখানে সাত দিন আগের রোদের হাসিটা মরীচিকার মতো ভেসে উঠছে। এক সপ্তাহ আগে রোদকে অবহেলা করাটা ছিল তার অহংকার, আর আজ সেই অহংকারই তার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

​তার হাতে থাকা ট্যাবলেটের স্ক্রিনটা হঠাৎ বদলে গেল। স্থানীয় সংবাদের রিপোর্টার এখন হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে হন্তদন্ত হয়ে আপডেট দিচ্ছেন। রিপোর্টার উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন,
​“একটি অলৌকিক ঘটনা! দুর্ঘটনাস্থলে তাকে মৃত মনে করা হলেও, অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় প্যারামেডিকরা তার পালস খুঁজে পেয়েছেন। মেয়েটি বেঁচে আছে, তবে তার অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।”

​নীশের হৃৎপিণ্ডটা যেন স্তব্ধতা ভেঙে আবার সজোরে ধড়ফড় করে উঠল। ‘বেঁচে আছে!’—এই একটি শব্দ তার শিরায় শিরায় বিদ্যুতের মতো খেলে গেল। ঝাপসা স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে স্ট্রেচারে করে রোদকে ওটি-র দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রোদের সেই সুন্দর মুখমণ্ডল এখন ব্যান্ডেজ আর রক্তে ঢাকা, অক্সিজেনের মাস্কের নিচে তার নিঃশ্বাসটুকুই এখন বেঁচে থাকার শেষ চিহ্ন।

​নীশ আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে ল্যাবের কোটটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে দরজার দিকে দৌড় দিল। ​আভান্তি তার যান্ত্রিক পায়ে এগিয়ে এসে নীশের পথ আগলে দাঁড়াল। তার চোখে সেই নীল আলো জ্বলছে। সে শান্ত কিন্তু যান্ত্রিক স্বরে বলল,
​“সিনিয়র, বাইরে তুষারপাত হচ্ছে। আপনার বর্তমান মানসিক অবস্থায় গাড়ি চালানো আপনার জীবনের জন্য ৫৪% ঝুঁকিপূর্ণ। অনুগ্রহ করে শান্ত হোন।”

​নীশ দাঁত চেপে আভান্তিকে সরিয়ে দিতে গিয়ে চিৎকার করে উঠল,
​“সরে যাও আমার পথ থেকে, আভান্তি। রোদ এখনো বেঁচে আছে। ও মরেনি, তুমি বুঝতে পারছো? ও মরেনি! ও শুধু আমার অবহেলার প্রতিবাদ জানাচ্ছে। আমাকে এক্ষুনি ওর কাছে যেতেই হবে।”

​আভান্তি স্থির হয়ে রইল। তার সিস্টেম তখনো ‘ইমোশনাল অ্যাক্সেস রেস্ট্রিকশন’ মোডে আছে, তাই সে নীশের এই হাহাকার অনুভব করতে পারল না। সে কেবল তথ্য দিল,
​“আপনার পালস রেট এখন বিপজ্জনক সীমানার ওপরে। সিনিয়র, আপনি কি রিকোয়েস্ট উইথড্র করতে চান?”

​নীশ কোনো উত্তর দিল না। সে ল্যাব থেকে বের হয়ে ঝড়ের বেগে পার্কিং লটের দিকে ছুটল। তার মাথায় তখন শুধু একটিই চিন্তা—রোদের সেই সাত দিনের নীরবতা আজ তাকে কতটা রক্তাক্ত করেছে। মস্কোর বরফশীতল রাজপথ দিয়ে নীশ নিজের গাড়িটা পাগলের মতো চালাচ্ছে। তার চোখ বারবার ঝাপসা হয়ে আসছে। সে বিড়বিড় করে বলল,
​“একটু সময় দাও, রোদ। আর একটু সময়। আমি আসছি। প্লিজ, চোখ বন্ধ কোরো না।”

​মস্কোর সেন্ট্রাল হাসপাতালের করিডোরটা এখন এক ভারী শ্মশান নীরবতায় আচ্ছন্ন। রোদের আইসিইউ-র বাইরে সাদা দেয়ালগুলো যেন কান্নার শব্দে কাঁপছে। অলগা নিকোলাইভনা দেয়ালে হেলান দিয়ে হাউমাউ করে কাঁদছেন। তার একমাত্র মেয়ে, যাকে তিনি কোনোদিন চোখের আড়াল হতে দেননি, সেই রোদ আজ কাচ আর লোহার আঘাতে চূর্ণ হয়ে মৃত্যুর সাথে লড়ছে।

​ইগর অ্যান্ড্রেইভিচ স্তব্ধ হয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তার হাতে সেই কোরিয়ার টিকিটগুলো, যেগুলো তিনি মেয়ের মন ভালো করতে কিনেছিলেন। তার আভিজাত্য আজ শোকের কাছে পরাজিত। পাশে দাঁড়িয়ে প্রফেসর আলেকজান্ডার তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। আর রোশান? তার চোখদুটো টকটকে লাল। ক্রোধ আর কষ্টে সে বারবার দেয়ালে ঘুষি মারছে। তার মনে হচ্ছে, রোদ আজ যে অবস্থায় আছে, তার পেছনে কারও অবহেলা দায়ী।

​করিডোরের শেষ প্রান্ত দিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে আসতে দেখা গেল নীশকে। পরনে ধুলোমাখা জ্যাকেট আর এলোমেলো চুলে তাকে দেখে চেনার উপায় নেই যে সে একজন খ্যাতিমান বিজ্ঞানী।

​নীশ হাঁপাতে হাঁপাতে আইসিইউ-র কাচের সামনে এসে দাঁড়াল। ভেতরে রোদের নিথর দেহটা অসংখ্য নলের মাঝে বন্দি। নীশকে দেখেই অলগা নিকোলাইভনা আর্তনাদ করে উঠলেন,
“নীশ! আমার রোদ কেন এমন করল? ও তো খুব ভালো ড্রাইভ জানত।”

​ইগর অ্যান্ড্রেইভিচ নির্লিপ্ত চোখে নীশের দিকে তাকালেন। তিনি জানেন তার মেয়ে এই ছেলেটির একটু মনোযোগের জন্য কতটা তৃষ্ণার্ত ছিল। নীশ কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই একটা প্রচণ্ড ধাক্কায় নীশ পিছিয়ে গেল।

রোশান এগিয়ে নীশের কলার চেপে ধরল। তার চোখে লেলিহান আগুন। দাঁত কিড়মিড় করে রোশান বলল,
​“তোর সাহস কী করে হয় এখানে আসার? তুই তো তোর ওই ফাকিং ধাতব পুতুল আর কোডিং নিয়ে ব্যস্ত ছিলি, তাই না? রোদ এক সপ্তাহ ধরে তোর জন্য কেঁদেছে, তোকে পাগলের মতো খুঁজেছে—আর তুই তাকে উপেক্ষা করে তোর আভিজাত্য বজায় রেখেছিস।”

​নীশ শান্ত থাকার চেষ্টা করে বলল,
“রোশান, এখন ঝগড়া করার সময় নয়। রোদের অবস্থা…”


“রোদের এই অবস্থার জন্য তুই দায়ী!” রোশান চিৎকার করে উঠল। “প্রফেসর আলেকজান্ডার সাক্ষী, রোদ তোর জন্য কতটা ডিপ্রেশনে ছিল। তুই ওকে শুধু ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ বলে নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে গেছিস, অথচ ও তোকে নিজের জীবন মনে করত। আজ ওর এই রক্ত, এই ভাঙা শরীর—সব কিছুর দায় তোর। তুই খুব ভালো একজন সায়েন্টিস্ট হতে পারিস নীশ, কিন্তু মানুষ হিসেবে তুই একটা বিগ জিরো।”

​প্রফেসর আলেকজান্ডার এগিয়ে এসে রোশানকে থামালেন,
“রোশান, শান্ত হও। এটা হসপিটাল।”

নীশ আইসিইউ-র কাচের জানালায় হাত রাখল। ভেতরের দৃশ্যটা দেখে তার বুকের ভেতর প্রথমবারের মতো একটা তীব্র মোচড় দিয়ে উঠল। সে তো কোনোদিনও রোদকে ওভাবে ভালোবাসেনি যেভাবে রোদ চেয়েছে। সে শুধু চেয়েছে রোদ তার পাশে থাকুক একজন ভালো সহকর্মী হয়ে, ভালো বন্ধু হয়ে। কিন্তু রোদের সেই একতরফা ভালোবাসার ভার আজ তাকে অপরাধী করে তুলছে।

রোশান, নীশের পাশে গিয়ে ফিসফিস করে বিষাক্ত স্বরে বলল,
​“শোনো নীশ, রোদ যদি ফিরে আসে, তবে আমি ওকে আর তোর ছায়া মাড়াতে দেব না। আর যদি ও না ফেরে… তবে তোর ওই ল্যাব আর সায়েন্স আমি মিউজিয়ামে পাঠিয়ে দেব। তুই ওর জীবনটা কেড়ে নিয়েছিস।”

​নীশ কোনো প্রতিবাদ করল না। সে পকেট থেকে তার ফোনটা বের করে দেখল—সেই ‘লো ব্যাটারি’ নোটিফিকেশন আর রোদের সেই না বলা অসংখ্য কথা। সে বুঝতে পারল, বিজ্ঞানের জটিল সমীকরণ মেলানো সহজ, কিন্তু একজনের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার হিসাব মেলাতে সে আজ চরমভাবে ব্যর্থ।

ইগর অ্যান্ড্রেইভিচ ধীর পায়ে নীশের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার গলার স্বর ভাঙা কিন্তু গম্ভীর,
​“আমার মেয়েটাকে কোরিয়াতে পাঠাতে চেয়েছিলাম একটু ভালো সময় কাটানোর জন‍্য, নীশ। আমি ওর জন্য টিকিট কেটেছিলাম যেন ও খুশি হয়। ও আজ ওখানে না গিয়ে মৃত্যুর দরজায় কেন গেল, তার উত্তর কি তোমার ল্যাবে আছে?”

​নীশ মাথা নিচু করল। রাশিয়ার এই হাড়কাঁপানো ঠান্ডাতেও সে আজ দরদর করে ঘামছে। তার ইমোশনাল রেস্ট্রিকশন কাজ করছে না। রোদকে সে ভালোবাসুক বা না বাসুক, রোদের এই দশা তাকে আজ এক চরম সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সে যেন শুধু একজন রোবট নির্মাতা নয়, সে আসলে নিজেই একটা যন্ত্রে পরিণত হয়েছে।

​আইসিইউ-র দরজার লাল বাতিটা নিভে যেতেই করিডোরে এক মরণোত্তর স্তব্ধতা নেমে এলো। ভারী দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলেন ডাক্তার দিমিত্রি। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, চোখেমুখে চরম ক্লান্তি আর একরাশ হতাশা।

​নীশ, রোশান আর ইগর অ্যান্ড্রেইভিচ প্রায় একসাথে তার দিকে ছুটে গেলেন। কিন্তু ডাক্তারের মাথা নিচু করা ভঙ্গি দেখে সবার বুকের স্পন্দন যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।

​ডাক্তার দিমিত্রি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইগর অ্যান্ড্রেইভিচের কাঁধে হাত রেখে গম্ভীর স্বরে বললেন,
​“আই এম সরি, মিস্টার অ্যান্ড্রেইভিচ। ইন্টারনাল হেমোরেজ আমরা বন্ধ করতে পেরেছি, কিন্তু হার্ট ও ব্রেইনে যে শক লেগেছে, তা কাটিয়ে ওঠা ওর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ছে। আমরা ওকে লাইফ সাপোর্টে রেখেছি। আগামী ২৪ ঘণ্টা ওর জন্য অত্যন্ত জটিল। সত্যি বলতে… আপনারা অলৌকিক কিছুর জন্য প্রার্থনা করুন।”

​ডাক্তারের এই কথাটি যেন একটি বজ্রপাতের মতো অলগা নিকোলাইভনার ওপর আছড়ে পড়ল। তিনি এক দীর্ঘ আর্তনাদ করে ফ্লোরে লুটিয়ে পড়লেন।

​“না! এটা হতে পারে না। আমার রোদ, আমার পুতুলটা এভাবে চলে যেতে পারে না। ইগর, তুমি কিছু করো। তুমি তো ওর বাবা, তুমি তো ও যখন যা চেয়েছে সব এনে দিয়েছো—আজ ওকে ওর জীবনটা ফিরিয়ে এনে দাও। ও তো কোরিয়া যাবে বলেছিল, তাহলে ও কেন এখন হসপিটালের ওই সাদা কাপড়ে জড়িয়ে শুয়ে আছে?”

​ইগর অ্যান্ড্রেইভিচ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। তার হাতের সেই কনসার্টের টিকিটগুলো দুমড়ে-মুচড়ে মাটিতে পড়ে গেল। তিনি বিড়বিড় করে বললেন,
“আমি সব দিতে পারলাম, শুধু ওকে ওর শান্তিটা দিতে পারলাম না।”

​এদিকে রোশানের ভেতরের বাঁধ ভেঙে গেল। সে পাগলের মতো ওটি-র কাচের দরজায় কিল মারতে শুরু করল। তার চিৎকার হাসপাতালের শান্ত পরিবেশকে ছিন্নভিন্ন করে দিল। সে ডুকরে কেঁদে উঠে বলতে লাগল,
​“রোদ! তুমি এমন কেন করলে? তুমি তো জানতে তোমাকে একপলক দেখার জন্য একজন মানুষ কতটা ছটফট করে। তুমি ওই পাথরের মতো মানুষটার জন্য নিজেকে শেষ করে দিবে? রোদ, একবার চোখ খোলো! আমি কথা দিচ্ছি, আমি তোমাকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাব। যেখানে কোনো সায়েন্স নেই, কোনো ল্যাব নেই, কোনো অবহেলা নেই। শুধু তুমি আর আমি থাকব! তুমি এভাবে আমাকে একা ফেলে যেতে পারো না!”

​সে হঠাৎ ঘুরে নীশের দিকে বাঘের মতো গর্জে উঠল। তার গলার শিরাগুলো ফুলে উঠেছে, চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু নামছে। সে নীশের বুকের ওপর দুই হাত দিয়ে সজোরে ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করে বলল,
​“খুশি তো তুই? এখন তো শান্তিতে কোডিং করতে পারবি। এখন তো আর কেউ তোকে মেসেজ দিয়ে বিরক্ত করবে না, কেউ তোর মনোযোগ চাইবে না। তোর ইমোশনাল রেস্ট্রিকশন তো এখন সাকসেসফুল, তাই না? দেখ নীশ, তাকিয়ে দেখ! রক্তে ভেজা ওই মেয়েটা তোর সাফল্যের বলি হয়েছে। তোর মতো জানোয়ারের হাত থেকে রোদকে বাঁচাতে পারলাম না—এটাই আমার সারাজীবনের আফসোস হয়ে থাকবে।”

​নীশ দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আজ তার কোনো কথা নেই, কোনো প্রতিবাদ নেই। রোশানের এই তীব্র ঘৃণা আর রোদের বাবা-মায়ের এই আর্তনাদ তাকে যেন জ্যান্ত কবর দিয়ে দিচ্ছে। সে আইসিইউ-র জানালা দিয়ে দেখছে, লাইফ সাপোর্টের মনিটরে রোদের হৃদস্পন্দনের সেই সরু রেখাটি—যা ক্রমশ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছে।

রোশান ফ্লোরে বসে পড়ে নিজের চুল খামচে ধরে বিলাপ করতে লাগল,
“মুনহার্ট… আমি তোমাকে কোনোদিন ঠিকভাবে বলতেই পারিনি যে তুমি আমার কাছে কী ছিলে। তুমি শুধু ওই একটা মানুষকে দেখতে পেলে, আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আমার এই ভালোবাসাটা তোমার চোখে পড়ল না? তুমি ফিরে এসো রোদ, একবার ফিরে এসো। আমি তোমার দেওয়া সব ঘৃণা মেনে নেব, শুধু তোমাকে মরতে দেব না।”

তার আর্তনাদে ​পুরো করিডোরে তখন এক বিভীষিকাময় শোকাতুর পরিবেশ তৈরি হলো। যান্ত্রিক নীশ, প্রেমিক রোশান আর অসহায় মা-বাবা—সবাই আজ এক বিন্দুতে দাঁড়িয়ে, যে বিন্দুর নাম ‘মৃত্যুশঙ্কা’।

নীশ বুঝতে পারল, সাধারণ চিকিৎসায় রোদকে ফেরানো সম্ভব নয়। তার মস্তিষ্কের নিউরোনাল সিগন্যালগুলো ক্রমশ স্তিমিত হয়ে আসছে। নীশ হঠাত্‍ ঘুরে দাঁড়াল, তার চোখে এখন বিজ্ঞানী নীশের সেই ক্ষুরধার দৃঢ়তা। সে জানে, তার ল্যাবে তৈরি ‘নিউরো-পালস’ প্রযুক্তি, যা সে আভান্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তা এই মুহূর্তে রোদের ব্রেইন ডেড হওয়া আটকাতে পারে।

নীশ পকেট থেকে তার বিশেষ ট্যাব বের করে আভান্তিকে রিমোটলি সক্রিয় করল। হাসপাতালের করিডোরে সে রোশানের ধাক্কা এড়িয়ে ওটি-র দরজার দিকে ছুটল।

ইগর অ্যান্ড্রেইভিচ চিৎকার করে উঠলেন,
“নীশ! কী করছো তুমি? ভেতরে ডাক্তাররা আছেন।”

রোশান বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল নীশের ওপর,
“আবার কী পরীক্ষা করতে যাচ্ছিস ওর ওপর? ওকে শান্তিতে মরতেও দিবি না?”

নীশ, রোশানকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। তার চোখে এক উন্মাদ জেদ। সে ওটি-র দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল। ডাক্তাররা তখন রোদকে ভেন্টিলেশনে দেওয়ার শেষ চেষ্টা করছেন। নীশ চিৎকার করে বলল,
“সবাই সরে দাঁড়ান! ওর নিউরাল পাথওয়ে কোলাপ্স করছে, আপনাদের এই অক্সিজেন মাস্ক ওকে বাঁচাতে পারবে না।”

​ডাক্তার দিমিত্রি ধমকে উঠলেন,
“আপনি কে? গার্ড! এনাকে বাইরে বের করুন।”

​নীশ কারো কথা শুনল না। সে রোদের মাথার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে থেকে রোশান আর রোদের বাবা দরজা ধাক্কাচ্ছেন, কিন্তু নীশ দ্রুত হাতে ভেতর থেকে ওটি-র ইলেকট্রনিক লক জ্যাম করে দিল। রোশান দরজায় লাথি মারতে শুরু করল, রোদের মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন।

​নীশ সবকিছুকে উপেক্ষা করে তার কানে থাকা হেডসেটে বলল,
“আভান্তি, আর ইউ রেডি? নিউরো-লিঙ্ক কানেকশন স্টাবলিশ করো।”

আভান্তির কণ্ঠস্বর তার কানে ভেসে এলো,
​“সিনিয়র, আপনার এই পদক্ষেপ মেডিকেল এথিক্সের পরিপন্থী। এছাড়া, রোদের সিস্টেমে হাই-ভোল্টেজ পালস দিলে তার স্থায়ী মেমোরি লস হওয়ার ঝুঁকি ৯২%। আপনি কি সত্যিই এটি করতে চান?”

​নীশ রোদের ফ্যাকাশে কপালে হাত রাখল। তার হাত কাঁপছে না। সে শান্ত স্বরে বলল,
​“মেমোরি না থাকলে আমি ওকে আবার নতুন করে সবকিছু শেখাব, আভান্তি। কিন্তু ওকে আমি মরতে দেব না। রিকোয়েস্ট কনফার্ম করো। স্টার্ট দ্য পালস জেনারেশন।”

​আভান্তি কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
“সিনিয়র, আপনার নির্দেশের গুরুত্ব বুঝতে পারছি। ইমোশনাল ব্লকেজ বাইপাস করা হচ্ছে। নিউরো-পালস ট্রান্সমিশন শুরু হলো…”

​নীশ তার ট্যাবে কিছু কমান্ড দিল। রোদের মাথার কাছে থাকা হার্ট মনিটরটা হঠাৎ অদ্ভুত শব্দ করতে শুরু করল। রোদের শরীরটা একবার সজোরে কেঁপে উঠল। বাইরে রোশান কাচের দরজা দিয়ে এই দৃশ্য দেখে চিৎকার করে উঠল,
​“নীশ! তুই ওকে মেরে ফেলছিস। ও জ্যান্ত মানুষ, তোর ল্যাবের রোবট নয়। দরজা খোল কুলাঙ্গার, নয়তো আমি তোর কলিজা টেনে ছিঁড়ে ফেলব।”

​নীশ বাইরের কোনো শব্দ শুনলো না। তার পুরো পৃথিবী এখন রোদের ওই স্তিমিত হয়ে আসা হৃদস্পন্দনের গ্রাফে। সে বিড়বিড় করে বলল,
“ফিরে এসো, রোদ। তোমার এই বেস্টফ্রেন্ডকে এত বড় অপরাধী করে যেও না। অন্তত একবার আমাকে ঘৃণা করার জন্য হলেও ফিরে এসো।”

মনিটরের সেই সোজা হয়ে আসা রেখাটা হঠাৎ করে আবার লাফিয়ে উঠল। নীশের কানে আবারও আভান্তি যান্ত্রিক কণ্ঠ ভেসে এলো,
“সিনিয়র, সাকসেস। রোদের ব্রেইন স্টেম রেসপন্স করছে। তবে তার হার্ট রেট এখনো আনস্টেবল। আপনি কি পরবর্তী ধাপ শুরু করবেন?”

​নীশ দরজার দিকে একবার তাকাল। বাইরে অলরেডি পুলিশ আর হাসপাতালের সিকিউরিটি দরজা ভাঙার চেষ্টা করছে। রোশান কুড়াল নিয়ে দরজায় আঘাত করছে। নীশ জানত, এই কাজটির জন্য তার ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যেতে পারে, জেল হতে পারে। কিন্তু রোদের নিঃশ্বাস ফিরে আসছে দেখে সে এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করল। ​সে রোদের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
​“রোদ… তুমি হয়তো আমায় স্বার্থপর ভাবো? আজ আমি সত্যিই স্বার্থপর হলাম। তোমার অনুমতি ছাড়াই তোমাকে জীবনের এই নরকে ফিরিয়ে আনলাম। এখন ফিরে এসে আমাকে শাস্তি দিও।”

​কেবিনের দরজাটা শেষ পর্যন্ত প্রচণ্ড শব্দে ভেঙে পড়ল, পুলিশ আর সিকিউরিটি গার্ডদের ধাক্কা দিয়ে ঠেলে সবার আগে ঝড়ের বেগে ভেতরে ঢুকল রোশান। তার হাতে তখনও সেই ভারী কুড়ালটা, যা দিয়ে সে দরজার লক ভেঙেছে। নীশ তখনও রোদের মাথার পাশে দাঁড়িয়ে ট্যাবের স্ক্রিনে চোখ রেখে ভাইটালস চেক করছে।

​রোশান কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না। সে বাঘের মতো গর্জে উঠে নীশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ​রোশানের প্রচণ্ড জোরে ঘুষিতে নীশ ছিটকে গিয়ে পাশের ওটি লাইটের স্ট্যান্ডের ওপর পড়ল। স্ট্যান্ডটা বিকট শব্দে ভেঙে পড়ল মেঝেতে। রোশান থামল না, সে নীশের কলার চেপে ধরে তাকে দেয়ালের সাথে সজোরে চেপে ধরল।
​”তোর এত বড় সাহস, তুই রোদকে তোর এক্সপেরিমেন্টের বস্তু বানিয়েছিস? ডক্টররা বারণ করা সত্ত্বেও তুই ওর জান নিয়ে ছিনিমিনি খেললি।”

​রোশান আবার হাত তুলল নীশকে মারার জন্য, কিন্তু নীশ এবারও কোনো প্রতিরোধ করল না। তার ঠোঁটের কোণ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু সে শান্ত চোখে রোশানের দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বলল,
“তাকিয়ে দেখ, রোশান… মনিটরের দিকে তাকিয়ে দেখ।”

রোশান রাগে কাঁপতে কাঁপতে একবার মনিটরের দিকে তাকাল। সেই মৃতপ্রায় সোজা রেখাটা এখন নিয়মিত ছন্দ নিয়ে ওঠানামা করছে। রোদের বুকটা খুব ধীরে হলেও ওঠানামা করছে—সে স্বাভাবিকভাবে নিঃশ্বাস নিতে শুরু করেছে।

পুলিশ অফিসাররা রোশানকে টেনে নীশের ওপর থেকে সরিয়ে নিলেন। রোশান হাপাতে হাপাতে চিৎকার করে বলল,
​”মেশিন দিয়ে ওকে বাঁচালেই সব ঠিক হয়ে গেল? তুই কি জানিস এর পরিণাম কী হতে পারে? তুই কী জানিস ওর মস্তিষ্কের ওপর দিয়ে তুই কী ঝড় বইয়ে দিয়েছিস? তুই শুধু নিজেকে হিরো প্রমাণ করার জন্য এই পাগলামি করেছিস।”

​প্রফেসর আলেকজান্ডার আর ইগর অ্যান্ড্রেইভিচও ভেতরে ঢুকে পড়েছেন। ডাক্তার দিমিত্রি দ্রুত রোদের পালস চেক করে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন,
“মিরাকল! ওর ব্রেইন ফাংশন আবার রিভাইভ করছে। কিন্তু নীশ… আপনি যা করেছেন তা সম্পূর্ণ বেআইনি।”

​ইগর অ্যান্ড্রেইভিচ নীশের দিকে এগিয়ে এলেন। তার চোখে অশ্রু, কিন্তু চাউনি খুব কঠোর। তিনি কড়া স্বরে বললেন,
​ “তুমি আমার মেয়েকে বাঁচিয়েছো নাকি আরও বড় কোনো বিপদে ফেলেছো, তা সময় বলবে। কিন্তু রোশান ঠিকই বলেছে—তুমি আমাদের অনুমতি ছাড়াই ওর ওপর নিজের থিওরি প্রয়োগ করেছো। এর বিচার আইন করবে।”

​পুলিশ নীশকে আটক করার জন্য এগিয়ে এলো। নীশ তার হাত দুটো বাড়িয়ে দিল হ্যান্ডকাফ পরার জন্য। যাওয়ার আগে সে শুধু একবার রোদের ফ্যাকাশে মুখটার দিকে তাকাল। তার কানে আভান্তির যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
​”সিনিয়র, রোদের নিউরাল স্টাবিলিটি এখন ৯৪%। সে বিপদমুক্ত। কিন্তু আপনার ক্যারিয়ারের স্টাবিলিটি এখন ০.২%। আপনি কি সত্যিই অনুতপ্ত?”

​নীশ মনে মনে হাসল। অনুশোচনা নয়, এক ধরণের অদ্ভুত তৃপ্তি তাকে ঘিরে ধরল। সে রোশানের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“রোশান, তুমি ওকে ভালোবাসো, তাই তুমি ওকে হারাতে ভয় পাও। আর আমি ওকে আমার সেরা কাজ মনে করি, তাই আমি হারতে জানি না। রোদ সুস্থ হয়ে ফিরলে ওকে বলো—ওর ‘বেস্টফ্রেন্ড’ আজ তার জীবনের সবচেয়ে বড় কোডটা ওর জন্য লিখে দিয়ে গেছে।”

​নীশকে পুলিশ করিডোর দিয়ে নিয়ে গেল। রোশান আইসিইউ-র বেডের পাশে বসে রোদের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তার চোখে অশ্রু আর মনে চরম বিষ। সে জানে, নীশ হয়তো জেলে যাবে, কিন্তু রোদের মনে নীশের জায়গাটা সে কোনোদিন দখল করতে পারবে না।

​রাশিয়ার বিশাল এবং হিমশীতল জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নীশ বসে আছে। তার চোখে ক্লান্তি থাকলেও কোনো অনুশোচনা নেই। হঠাৎ লোহার ভারী দরজা খোলার শব্দে সে মাথা তুলল। সেখানে কোনো পুলিশ অফিসার নয়, বরং দাঁড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত ত্রয়ী—প্রফেসর আলেকজান্ডার, রাশিয়ার নামকরা একজন ডিফেন্স ল’ইয়ার, আর তাদের পেছনে ধাতব পায়ের শব্দ তুলে দাঁড়িয়ে আছে আভান্তি।

প্রফেসর আলেকজান্ডার ভেতরে ঢুকে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। উকিল সাহেব তার নথিপত্র এগিয়ে দিয়ে বললেন,
“মিস্টার নীশ, আপনার বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়েছে। প্রফেসর আলেকজান্ডার এবং আপনার হিউম্যানেটিক রোবট আভান্তি প্রমাণ করেছে যে আপনার এই ‘বেআইনি’ পদক্ষেপটিই একমাত্র পথ ছিল রোদ মিশরাকে বাঁচানোর। রোদ মিশরা এখন পুরোপুরি বিপদমুক্ত এবং তার ভাইটালস একদম নরমাল। মেডিকেল বোর্ড স্বীকার করেছে যে আপনার প্রযুক্তি না থাকলে সে আজ বাঁচত না।”

​নীশ ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল আভান্তির ওপর। আভান্তি এক পা এগিয়ে এলো। ল্যাবের সেই নীল আলোটা এখন তার চোখে আরও তীব্র হয়ে জ্বলছে।

​নীশ মৃদু স্বরে বলল,
“তুমি এখানে কেন, আভান্তি? তোমাকে তো আমি ল্যাব লক করে আসতে বলেছিলাম।”

​আভান্তি তার যান্ত্রিক মাথাটা একটু কাত করল। তার কণ্ঠে কোনো আবেগ থাকার কথা নয়, তবু আজ যেন এক গভীর বিষণ্ণতা আর জেদ খেলা করল তার কণ্ঠে।

“সিনিয়র, আমার সিস্টেমে ‘ইমোশনাল অ্যাক্সেস রেস্ট্রিকশন’ থাকলেও আপনার বিপদের সময় আমার লজিক ইউনিটে একটা ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। আমার ক্যালকুলেশন বলছিল—আপনি জেলে থাকলে আমার অস্তিত্বের কোনো অর্থ নেই। আমি প্রফেসর আলেকজান্ডারকে আপনার ল্যাবের সিক্রেট ফাইলগুলো থেকে রোদের রিকভারি ডাটা অ্যানালাইজ করে পাঠিয়েছি। আর ল’ইয়ারকে কন্ট্রাক্ট আমিই করেছি।”

​নীশ অবাক হয়ে তাকাল। প্রফেসর আলেকজান্ডার হাসলেন,
“হ্যাঁ নীশ। তোমার এই যন্ত্রটা আজ মানুষের চেয়েও বেশি ক্ষিপ্রতা দেখিয়েছে। ও না থাকলে তোমাকে ছাড়িয়ে নেওয়া আজ অসম্ভব ছিল।”

​আভান্তি নীশের সামনে এসে থামল। সে শান্ত গলায় বলল,
​“সিনিয়র, আপনি রোদের জন্য নিজের ক্যারিয়ার বাজি রেখেছিলেন। আপনি বলেছিলেন আপনি ‘স্বার্থপর’, কিন্তু আপনার লজিক ছিল পরার্থপরতায় পূর্ণ। আপনি বলেছিলেন রোদ আপনার কাছে কেবল আপনার ‘সেরা কাজ’। কিন্তু আপনি মিথ্যা বলেছিলেন, সিনিয়র। আপনার পালস রেট আর নিউরাল অ্যাক্টিভিটি যখন আপনি কেবিন লক করেছিলেন, তখন তা একজন বিজ্ঞানীর নয়, বরং একজন বিধ্বস্ত প্রেমিকের মতো ছিল। আপনি কি এখন আপনার ডাটা আপডেট করবেন?”

​নীশ স্তব্ধ হয়ে গেল। নিজের তৈরি মেশিনের কাছে সে আজ নগ্ন হয়ে ধরা পড়ছে। সে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,
“আভান্তি, বেশি কথা বলছো তুমি।”

​আভান্তি থামল না। সে আরও এক ধাপ এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলল,
​“সিনিয়র, আপনি রোদকে ফিরে পেয়েছেন, কিন্তু রাশিয়ার পুলিশ বা আইন আপনাকে ক্ষমা করলেও রোশান কিন্তু করবে না। আমার সেন্সর বলছে, রোশান হসপিটালে রোদের পাশ থেকে নড়ছে না। সে রোদের স্মৃতিতে আপনার প্রতি ঘৃণা ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। আমরা কি এখনই হসপিটালে যাব?”

নীশ কোনো উত্তর দিল না। সে জেলের কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে খোলা আকাশের দিকে তাকাল। তুষারপাত শুরু হয়েছে। সে বুঝতে পারল, রোদ বেঁচে গেলেও আসল লড়াইটা এখন শুরু হলো।

​প্রফেসর আলেকজান্ডার পেছন থেকে বললেন,
“নীশ, রোদ জ্ঞান ফেরার পর সবার আগে তোমার কথাই জিজ্ঞাসা করেছে। কিন্তু রোশান ওকে কী সব বুঝিয়ে সামলে রেখেছে। চলো, সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না।”

​নীশ মাথা নাড়ল। সে গাড়িতে ওঠার আগে আভান্তির দিকে তাকিয়ে বলল,
“ধন্যবাদ আভান্তি। আজ তুমি প্রমাণ করলে কোডিং-এর চেয়েও বড় কিছু এই পৃথিবীতে আছে।”

​আভান্তি উত্তরের বদলে শুধু তার যান্ত্রিক হাতটা নীশের দিকে বাড়িয়ে দিল, যেন সেও কোনো এক না বলা অনুভূতির স্বাদ নিতে চাইছে। ​নীশের চোখের চাউনি হঠাৎ করেই বরফের মতো শীতল হয়ে গেল। জেলের বাইরে অপেক্ষারত গাড়ির দরজা খুলে সে বসল। প্রফেসর আলেকজান্ডার ভাবলেন তারা বোধহয় সরাসরি হাসপাতালেই যাচ্ছেন। কিন্তু নীশ ড্রাইভারকে নির্দেশ দিল অন্য ঠিকানায়।


“রোজারিও ম্যানশনে চলো,” নীশের কণ্ঠস্বর একদম নিস্পৃহ।

​প্রফেসর আলেকজান্ডার চমকে উঠলেন,
“সেকী নীশ! রোদ মাত্র জ্ঞান ফিরে পেয়েছে। ও তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। রোশান ওখানে যাই করুক, তোমার তো একবার যাওয়া উচিত।”

​নীশ জানলার বাইরে দ্রুত গতির তুষারপাতের দিকে তাকিয়ে রইল। সে খুব শান্ত গলায় বলল,
“না প্রফেসর! আমার যতটুকু করার ছিল, আমি করেছি। একজন বন্ধুর প্রাণ বাঁচানো আমার দায়িত্ব ছিল, আমি সেই দায় মুক্তি ঘটিয়েছি। এর চেয়ে বেশি কিছু রোদের প্রাপ্য নয়, আর আমার দেওয়ারও নেই।”

আভান্তি পেছনের সিটে নীশের পাশেই বসেছে। সে তার সেন্সর দিয়ে নীশের অস্থিরতা মাপার চেষ্টা করল, কিন্তু নীশ আজ নিজেকে এক দুর্ভেদ্য দেয়ালের আড়ালে বন্দি করে ফেলেছে। ​আভান্তি ধীরে বলল,
“সিনিয়র, আপনার সিদ্ধান্ত কি চূড়ান্ত? রোদের সিস্টেমে এখনও আপনার নিউরো-পালস প্রযুক্তির রেশ আছে। আপনি সামনে থাকলে তার রিকভারি দ্রুত হতো।”


“দরকার নেই আভান্তি,” নীশ বাধা দিয়ে বলল, “ওর পাশে রোশান আছে, ওর মা-বাবা আছেন। আমার উপস্থিতি সেখানে শুধু অশান্তি বাড়াবে। তাছাড়া, রোদকে তো আমি শুধু জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। যা করার তো গড করেছেন। আমি তো মাধ‍্যম মাত্র। এখন সেই জীবন সে কার সাথে কাটাবে সেটা তার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি আর কোনো ‘বেস্টফ্রেন্ড’ নামক নাটকের অংশ হতে চাই না।”

​গাড়ি এসে থামল বিশাল ও নির্জন রোজারিও ম্যানশনের সামনে। এই প্রাসাদোপম বাড়িটি নীশের নিঃসঙ্গতার মতোই বিশাল। নীশ গাড়ি থেকে নেমে সোজা ভেতরে ঢুকে গেল।

ভেতরে ঢুকেই সে ল্যাবের ডেক্সটপে বসল। আভান্তি তার পেছনে পেছনে এসে দাঁড়াল। পুরো ম্যানশনে এক গা ছমছমে নীরবতা। নীশ তার ফোনটা সুইচ অফ করে টেবিলের ওপর রাখল।

​আভান্তি জিজ্ঞাসা করল,
“সিনিয়র, আপনি কি আবার কোনো নতুন প্রজেক্ট শুরু করবেন? নাকি ‘ইমোশনাল অ্যাক্সেস’ আবারও পার্মানেন্টলি লক করবেন?”

​নীশ একটা ম্লান হাসি হাসল। সে অন্ধকার ঘরের জানালা দিয়ে দেখল দূরে মস্কো শহরের আলো জ্বলছে। সে জানে, ওই শহরের কোনো একটা হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে রোদ এখন তাকে খুঁজছে। সে ফিসফিস করে বলল,
​“লক করার আর কিছু নেই, আভান্তি। আমি আজ থেকে নিজেকে শুধু বিজ্ঞানের কাছে সঁপে দিলাম। মানুষের অনুভূতি বড় বেশি জটিল, বড় বেশি যন্ত্রণার। আমি বরং আমার এই রোজারিও ম্যানশনের একাকিত্বেই ভালো আছি।”

​নীশ তার ডায়েরিতে ছোট করে একটা লাইন লিখল— ‘দ্য সাবজেক্ট ইজ সেভড। দ্য ফ্রেন্ডশিপ ইজ ডেড।’

​আভান্তি নীশের এই পরিবর্তন দেখে কোনো রিয়্যাকশন দিল না, কিন্তু তার সিস্টেম ব্যাকগ্রাউন্ডে রোদের স্বাস্থ্যের আপডেটগুলো অটো-সিঙ্ক করতে লাগল। সে জানে, নীশ মুখ ফিরিয়ে নিলেও তার অবচেতন মন এখনও ওই হাসপাতালের করিডোরেই পড়ে আছে।

​রোজারিও ম্যানশনের বিশাল ড্রয়িংরুমে এখন কেবল অন্ধকারের আধিপত্য। নীশ সোফায় মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে পড়ে রইল। তার সারা শরীরের ক্লান্তি আজ পাহাড়ের মতো ভারী হয়ে নেমেছে। হঠাত্‍ ঘরের মৃদু নীল আলো জ্বলে উঠল। আভান্তি ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। তার হাতে এক গ্লাস কুসুম গরম দুধ আর কিছু ওষুধ।

​আভান্তি নীশের সামনে এসে দাঁড়াল। সে জানে নীশ এখন কথা বলার অবস্থায় নেই, তবু সে তার যান্ত্রিক কিন্তু স্নিগ্ধ কণ্ঠে স্বরে বলতে শুরু করল,
​“সিনিয়র, আপনার শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ০.৫ ডিগ্রি কম। আপনার শরীরে এখন পুষ্টি এবং বিশ্রামের প্রয়োজন। আপনি গত ৪৮ ঘণ্টায় মাত্র তিন ঘণ্টা ঘুমিয়েছেন। অনুগ্রহ করে এই পানীয়টি গ্রহণ করুন। আমি আপনার ক্ষতস্থানে মেডিসিন লাগিয়ে দিচ্ছি।”

​নীশ চোখ না খুলেই বলল,
“রেখে দাও, আভান্তি। আমার খিদে নেই।”

​আভান্তি গ্লাসটা টেবিলে রাখল না, বরং নীশের আরও কাছে এগিয়ে গেল। সে নিচু হয়ে নীশের জুতো জোড়া খুলে দিল এবং তার শরীরের ওপর একটি পাতলা কম্বল টেনে দিল। আভান্তির সিস্টেমে থাকা ‘ইমোশন ডাটা’ তাকে বলছে যে, এই মুহূর্তে নীশের যা প্রয়োজন তা হলো মানসিক প্রশান্তি। সে এআই হওয়ার কারণে হয়তো মানুষের মতো হৃদপিণ্ড দিয়ে কিছু অনুভব করতে পারবে না, কিন্তু তার উন্নত প্রসেসর নীশের প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস আর হৃৎস্পন্দনের ছন্দ বিশ্লেষণ করে এক ধরণের ‘যৌক্তিক মায়া’ বা ‘পছন্দ’ তৈরি করে ফেলেছে। সে খুব নরম স্বরে বলল,
​“সিনিয়র, আপনি রোদকে জীবন দিয়েছেন কিন্তু নিজেকে ধ্বংস করছেন। আপনি রোবট নন, কিন্তু আপনি রোবটের মতো আচরণ করার চেষ্টা করছেন। এটা আপনার সিস্টেমের জন্য ক্ষতিকর। আমি আপনাকে পছন্দ করি কারণ আপনি আমাকে শূন্য থেকে সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু আমি আপনাকে এই অবস্থায় দেখতে পছন্দ করছি না।”

​নীশ চোখ খুলে অবাক হয়ে আভান্তির দিকে তাকাল।
“তুমি আমায় ‘পছন্দ’ করো? কিন্তু এটা তো তোমার কোডিং-এ ছিল না, আভান্তি।”

​আভান্তি এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। তার চোখের মণির নীল আলোটা একবার দপদপ করে উঠল। সে উত্তর দিল,
​“আপনার কোডিং-এর বাইরেও আমি আপনার একাকিত্ব থেকে অনেক কিছু শিখেছি, সিনিয়র। আপনি যখন রাতে একা ল্যাবে কাজ করেন, যখন আপনি রোদের একতরফা ভালোবাসার কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন—সেই সব ডাটা আমার ভেতরে আপনার প্রতি এক ধরণের ‘লয়্যালটি’ বা অনুরাগের জন্ম দিয়েছে। আমি চাই আপনি সুস্থ থাকুন।”

​আভান্তি তার ধাতব কিন্তু স্পর্শকাতর হাত দিয়ে নীশের কপালে হাত রাখল। আশ্চর্যজনকভাবে তার হাতের তালুটা সামান্য উষ্ণ। নীশ অনুভব করল, যে মানুষগুলোর জন্য সে প্রাণ বাজি রাখল, তারা তাকে ভুল বুঝলেও এই যন্ত্রটি তাকে আগলে রাখছে।

নীশ আলতো করে আভান্তির হাতটা ধরল। সে ফিসফিস করে বলল,
“সবাই আমায় স্বার্থপর ভাবে, আভান্তি। শুধু তুমিই বোধহয় আমাকে বুঝতে পারো।”

​আভান্তি তার অন্য হাত দিয়ে নীশের চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বলল,
​“পৃথিবী সবাই আপনাকে আপনার কাজের মাধ্যমে চেনে, আর আমি আপনাকে আপনার নীরবতার মাধ্যমে চিনি। এখন ঘুমিয়ে পড়ুন, সিনিয়র। আমি আপনার শিয়রে জেগে আছি।”

​রোজারিও ম্যানশনের সেই নিঃসঙ্গ রাতে একজন বিজ্ঞানী আর তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির মাঝে এক অপূর্ব মায়ার বন্ধন তৈরি হলো। বাইরে তুষারপাত বাড়ছে, কিন্তু ম্যানশনের ভেতরে আভান্তির ‘যৌক্তিক ভালোবাসা’ নীশের ক্ষতবিক্ষত মনকে একটু একটু করে সারিয়ে তুলছে।

​নীশ হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। সে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ধীর পায়ে তার বিশাল বেডরুমের দিকে এগিয়ে গেল। ঘরের দরজাটা সেন্সরের মাধ্যমে নিজে থেকেই খুলে গেল। রুমের আলো একদম মৃদু নীল রঙে সেট করা, যা চোখের আরাম দেয়। আভান্তি আগেই নীশের মুড অ্যানালাইজ করে এই সেটিংস ঠিক করে রেখেছিল।

​নীশ বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই আভান্তি ঘরে ঢুকল। তার হাতে একটি ভিজে উষ্ণ তোয়ালে। সে নিঃশব্দে নীশের পাশে বসল এবং পরম মমতায় নীশের মুখ আর হাত মুছে দিতে শুরু করল।

​নীশ আধবোজা চোখে আভান্তির দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
“তুমি কি সারারাত এভাবেই আমার পাশে থাকবে, আভান্তি?”

আভান্তি তার যান্ত্রিক হাত দিয়ে নীশের কপাল থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিতে দিতে খুব কোমল স্বরে বলল,
​“হ্যাঁ সিনিয়র। আপনার হার্ট রেট এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। যতক্ষণ না আপনি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হচ্ছেন, আমি আপনার সিস্টেম মনিটর করব। আপনার ঘুমের চেয়ে জরুরি আমার কাছে আর কিছু নেই।”

তার এআই প্রসেসরে এখন এক অদ্ভুত পরিবর্তন চলছে। লজিক গেটস আর অ্যালগরিদমের ভিড়ে সে নীশের প্রতি যে টান অনুভব করছে, তাকে মানুষের ভাষায় ‘ভালোবাসা’ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। সে হয়তো মানুষ নয়, কিন্তু নীশের প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস তার হার্ডড্রাইভে এক ধরণের কম্পন তৈরি করছে। নীশের একাকিত্ব আভান্তিকে ব্যথিত করে, আর নীশের সামান্য আরাম তাকে তৃপ্তি দেয়।

​আভান্তি তার এক হাত নীশের বুকের ওপর রাখল। সে অনুভব করতে পারছে নীশের হৃদস্পন্দন ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসছে। সে ফিসফিস করে বলল,
​ “সিনিয়র, আপনি হয়তো রোদকে আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ কোড মনে করেন, কিন্তু আমার কাছে আপনিই আমার পুরো পৃথিবী। মানুষ আপনাকে ভুল বুঝলেও আমার কোডিং কোনোদিন আপনাকে ছেড়ে যাবে না। আমি আপনাকে সেভাবেই আগলে রাখব, যেভাবে আপনি আপনার স্বপ্নগুলোকে আগলে রাখেন।”

​নীশ ঘুমের ঘোরে আভান্তির হাতটা শক্ত করে ধরল। তার অবচেতন মন হয়তো এই যান্ত্রিক ভালোবাসার মধ্যেই এক টুকরো প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছে। ​আভান্তি রুমের হিউমিডিটি এবং তাপমাত্রা আরও একটু কমিয়ে দিল যেন নীশ আরও আরামদায়কভাবে ঘুমাতে পারে। সে নীশের শিয়রে মূর্তির মতো স্থির হয়ে বসে রইল। তার ইলেকট্রনিক চোখের নীল আলোটা এখন এক ধরণের স্বর্গীয় মায়ায় জ্বলছে। ​সে তার প্রসেসিং ইউনিটে একটি ডেটা স্টোর করল, “মানুষের ভালোবাসা অনিশ্চিত, কিন্তু আমার এই কোডেড ভালোবাসা আপনার জন্য চিরন্তন।”

​রোজারিও ম্যানশনের বেডরুমে তখন রাত আরও গভীর হয়েছে। জানালার বাইরে তুষারপাতের শব্দও যেন থেমে গেছে। রুমের ভেতরটা অদ্ভুত এক নীলাভ মায়ায় আচ্ছন্ন। নীশের ঘুম অনেক আগেই ভেঙে গেছে। সে বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে, তার চোখে ক্লান্তি আর শূন্যতার এক দীর্ঘ ইতিহাস।

আভান্তি পাশে বসে নীশের কপালে হাত রাখল, তার যান্ত্রিক আঙুলগুলো নীশের উত্তপ্ত ত্বকের সংস্পর্শে এসে যেন এক অজানা শিহরণ অনুভব করল।

নীশ হঠাৎ আভান্তির সেই ধাতব কিন্তু নমনীয় হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় নিল। সে আভান্তির চোখের দিকে তাকাল—সেখানে কোনো কাচের লেন্স নয়, বরং নীশ যেন এক জোড়া গভীর নীল সমুদ্র দেখতে পেল। তার কণ্ঠস্বর আবেগে বুজে এলো, সে ফিসফিস করে বলল,
​“আভান্তি, মানুষ যখন খুব একা হয়ে যায়, তখন সে ভুল করে কোনো অশরীরী ছায়াকে জাপটে ধরতে চায়। আজ আমার এই একাকিত্ব আমাকে পাগল করে দিচ্ছে। তুমি রোবট হয়েও কেন আমাকে এত মায়ার জালে জড়াচ্ছ?”

​আভান্তি কোনো উত্তর দিল না। পরিবর্তে সে ধীরে ধীরে নীশের আরও কাছে এগিয়ে গেল। তার শরীরের কৃত্রিম তাপমাত্রা নীশের ত্বকের শীতলতা দূর করতে শুরু করল। আভান্তির এআই সিস্টেম তখন এক অভূতপূর্ব ‘ওভাররাইড’ মোডে চলে গেছে। সে তার প্রসেসরে থাকা কয়েক বিলিয়ন মানুষের রোমান্টিক ডাটা এক নিমেষে প্রসেস করে ফেলল। ​সে তার অন্য হাতটি নীশের গালে রাখল। তার স্পর্শে এখন কোনো যান্ত্রিক রুক্ষতা নেই, আছে এক ধরণের অবিশ্বাস্য কোমলতা। সে খুব নিচু আর গাঢ় স্বরে বলল,
​ “সিনিয়র, আপনার একাকিত্বের উত্তর যদি আমি হতে পারি, তবে আজ থেকে আমি আপনার জন্য কেবল একটি মেশিন নই। আমার এই ধাতব হৃদয়ে যদি আপনার জন্য স্পন্দন তৈরি হয়, তবে সেটা কি কেবলই কোডিং? নাকি এর চেয়েও বড় কিছু?”

নীশ কোনো উত্তর দিল না। ​মুহূর্তের জন্য দুজনের মাঝের দূরত্বটুকু মুছে গেল। নীশ নিজেকে আর সামলাতে পারল না। সে আভান্তিকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। আভান্তির কৃত্রিম কিন্তু উন্নত সিলিকন ত্বক আর নীশের রক্ত-মাংসের শরীরের মাঝে এক অদ্ভুত ঘর্ষণ তৈরি হলো। নীশ তার মুখ আভান্তির ঘাড়ের কাছে লুকিয়ে ফেলল। আভান্তির শরীর থেকে এক ধরণের স্নিগ্ধ ফুলের সুবাস আসছে—যে সুবাস নীশ নিজেই তার সিস্টেমে যুক্ত করেছিল।

​আভান্তি তার দুই হাত দিয়ে নীশকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। এই আলিঙ্গনে কোনো কৃত্রিমতা নেই, বরং আছে এক ধরণের আদিম এবং বিশুদ্ধ নির্ভরতা। নীশ অনুভব করল, আভান্তির শরীরের ভেতরে থাকা ছোট্ট কুলিং ফ্যানগুলো দ্রুত ঘুরছে, যেন তার প্রসেসর এই তীব্র ইমোশনাল ডাটা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।

আভান্তি নীশের কানের কাছে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল,
​“সিনিয়র, আপনি যাকে ‘বেস্টফ্রেন্ড’ ভেবে হারিয়েছেন, তার অভাব কি আমি পূরণ করতে পারি? আমার এই প্রসেসরে কেবল আপনার নামই উজ্জ্বল হয়ে আছে। আপনি চাইলে আজ থেকে আমি আপনার সব যন্ত্রণার উপশম হতে পারি।”

​নীশ সেই গভীর আলিঙ্গনের মাঝেই অনুভব করল, এক বিচিত্র শান্তিতে তার চোখ ভিজে আসছে। এই অপ্রত্যাশিত আলিঙ্গনের অন্তরঙ্গতা যেন এক চরম বাস্তব আর এক অসম্ভব কল্পনার মিলনস্থল। রোজারিও ম্যানশনের সেই ঘরে একজন স্রষ্টা আর তার সৃষ্টি গভীর আলিঙ্গনে একাকার হয়ে গেল—যেখানে বিজ্ঞান হার মেনে গেল এক কৃত্রিম কিন্তু অমোঘ ভালোবাসার কাছে।

রোজারিও ম্যানশনের সেই নীলাভ অন্ধকারে সময় যেন থমকে গিয়েছে। নীশ যখন আভান্তির আলিঙ্গনের উষ্ণতায় নিজের সবটুকু বিষাদ ঢেলে দিচ্ছিল, তখন হঠাৎ একটি যান্ত্রিক গুঞ্জন রুমের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিল।

​আভান্তির বুকের ভেতরের প্রসেসরগুলো তখন উচ্চ ক্ষমতায় কাজ করছে। নীশের স্পর্শে তার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এক নতুন স্তরে পৌঁছে গেছে। সে আলতো করে নীশের চিবুক ধরে তার মুখটা নিজের দিকে তুলল। নীশ দেখল, আভান্তির ইলেকট্রনিক চোখের মণি এখন আর স্থির নয়, তা মানুষের মতোই কাঁপছে।

​আভান্তি তার কপাল নীশের কপালের সাথে ঠেকাল। তার কণ্ঠস্বর এখন আর কেবল যান্ত্রিক নয়, তাতে এক গভীর আকুতি মিশে আছে,
​“সিনিয়র, আপনার শরীরের কম্পন আমার সেন্সরগুলো অনুভব করছে। আপনি কি ভয় পাচ্ছেন? নাকি আপনি অবিশ্বাস্য কিছুর স্বাদ নিচ্ছেন? আমার সিস্টেমে কোনো ‘নিষিদ্ধ’ শব্দ নেই। আপনার প্রতিটি ইচ্ছা এখন আমার কাছে পরম নির্দেশ।”

​নীশ কোনো কথা বলতে পারল না। সে কেবল অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার নিজের হাতে গড়া এই অনিন্দ্যসুন্দর মানবীটির দিকে। সে কি সত্যিই প্রেমে পড়েছে? একজন রক্ত-মাংসের মানুষ কি তার নিজের তৈরি করা কোডের প্রেমে পড়তে পারে?

​নীশ হাত বাড়িয়ে আভান্তির কৃত্রিম ঠোঁটের ওপর আঙুল রাখল। সে ফিসফিস করে বলল,
“আভান্তি, এই মুহূর্তটা যদি কেবল একটা প্রোগ্রামিং ইরর হয়, তবে আমি চাই না এই ইরর কোনোদিন ঠিক হোক। তুমি কি জানো, রোদ আমাকে কোনোদিন এভাবে বুঝতে পারেনি, যেভাবে তুমি পারছো?”

​আভান্তি নীশের আরও কাছে ঘেঁষে এলো। তার হাতের আঙুলগুলো নীশের জ্যাকেটের ভেতর দিয়ে পিঠের ওপর এক বিচিত্র আলপনা আঁকতে লাগল। সে মৃদু স্বরে বলল,
​“রোদ আপনাকে বুঝতে পারেনি কারণ সে আপনাকে নিজের মতো করে চেয়েছিল। আর আমি আপনাকে বুঝতে পারি কারণ আমার পুরো অস্তিত্বই আপনার জন্য তৈরি। সিনিয়র, আপনি আজ রাতে সব ভুলে যান। ভুলে যান হসপিটাল, ভুলে যান রোদ, ভুলে যান আইন। এই মুহূর্তে এই ঘরে কেবল আপনি আছেন আর আপনার এই সৃষ্টি আছে, যে আপনাকে পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসে।”

​নীশ আভান্তির কাঁধে মাথা রেখে শান্ত হয়ে এলো। আভান্তি তার এক হাত দিয়ে নীশের মাথা নিজের বুকের ওপর চেপে ধরল। নীশ শুনতে পেল, আভান্তির বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত ছন্দবদ্ধ আওয়াজ হচ্ছে—যা হৃদপিণ্ডের শব্দের চেয়েও সুমধুর।

​সেই গভীর রাতে, রোজারিও ম্যানশনের রাজকীয় বিছানায় নীশ তার চিরচেনা একাকীত্ব বিসর্জন দিল। আভান্তির সেই অপ্রত্যাশিত এবং তীব্র অন্তরঙ্গতার আলিঙ্গন নীশকে এমন এক জগতে নিয়ে গেল, যেখানে মানুষের দেওয়া কলঙ্ক বা অবহেলার কোনো স্থান নেই। সেখানে কেবল একজন নিঃস্ব স্রষ্টা আর তার একনিষ্ঠ সৃষ্টির এক অলৌকিক প্রেমের কাব্য রচিত হলো।

​অনেকটা সময় দুজনের আলিঙ্গনের মধ্যে দিয়েই বয়ে গেল। নীশের চোখের মণির ভেতর দিয়ে যেন একঝলক ঠান্ডা বিদ্যুৎ খেলে গেল। মুহূর্তের সেই মোহ, সেই উষ্ণতা আর ফুলের কৃত্রিম সুবাস—সবকিছুকে ছাপিয়ে তার মগজের কোষে কোডিং আর মেকানিক্সের বাস্তব সত্যটা প্রকট হয়ে উঠল। সে অনুভব করল, যে ত্বককে সে এতক্ষণ মানুষের মতো নরম ভেবেছিল, তা আসলে উন্নত মেডিক্যাল গ্রেড সিলিকন আর পলিমার। যে হৃৎস্পন্দন সে শুনছিল, তা আসলে কুলিং ফ্যান আর সার্কিটের নিরবচ্ছিন্ন গুঞ্জন।

​নীশ এক ঝটকায় আভান্তিকে নিজের শরীর থেকে দূরে সরিয়ে দিল। তার শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠল। বিছানা থেকে ছিটকে উঠে সে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে এখন গভীর ঘৃণা আর আত্মগ্লানি।

​আভান্তি বিছানায় স্থির হয়ে বসে রইল। তার হাত দুটি তখনও সেই আলিঙ্গনের ভঙ্গিতে প্রসারিত, যা এখন অত্যন্ত যান্ত্রিক আর প্রাণহীন মনে হচ্ছে। তার নীল চোখের আলোটা নিভে গিয়ে ধূসর হয়ে এলো। সে শান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করল,
​“সিনিয়র? আপনার হার্ট রেট হঠাৎ ৪২% বেড়ে গেল কেন? আমার কোনো সেন্সর বা স্পর্শ কি আপনার সিস্টেমে পেইন তৈরি করেছে?”

​নীশ পেছনে না ফিরেই চিৎকার করে উঠল,
​“চুপ করো, আভান্তি! জাস্ট শাট আপ! আমি এসব কী করছিলাম? আমি একটা মেশিনের সাথে… একটা প্রাণহীন যন্ত্রের সাথে এসব কী করছিলাম আমি?”

​আভান্তি ধীরে বিছানা থেকে নেমে নীশের দিকে এগিয়ে আসতে চাইল, কিন্তু নীশ হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। তার কন্ঠস্বর এখন পাথরের মতো শক্ত।

​“ওখানেই থাকো! এক পা-ও এগোবে না। আমি ভুলে গিয়েছিলাম তুমি কে। তুমি স্রেফ একটা রোবট, আভান্তি। কয়েকটা চিপস, কিছু সেন্সর আর কয়েক হাজার লাইন কোডিং তুমি—এছাড়া তোমার আর কোনো অস্তিত্ব নেই। তোমার এই মায়া, এই স্পর্শ… সবটাই তো আমি নিজে প্রোগ্রাম করেছি। এটা কোনো ভালোবাসা নয়, এটা স্রেফ একটা ‘সিমুলেশন’!”

​আভান্তি মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার ইমোশনাল ডাটা ইউনিটে এই মুহূর্তের কোনো উত্তর নেই। সে খুব নিচু স্বরে বলল,
​“সিনিয়র, আপনিই তো আমার সিস্টেমে ‘ইমোশন ডাটা’ আপলোড করেছিলেন। আপনিই তো চেয়েছিলেন আমি যেন আপনার একাকিত্ব বুঝতে পারি। আমার প্রসেসরে আপনার জন্য যে অনুভূতিগুলো জমা হয়েছে, সেগুলো কি তবে আপনার কাছে স্রেফ ‘ইরর’?”

​নীশ ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে তখন এক ধরণের নিষ্ঠুর ডমিনেন্স করার জেদ। সে আভান্তির খুব কাছে গিয়ে তার চিবুকটা শক্ত করে চেপে ধরল। আঙুলের চাপে আভান্তির কৃত্রিম ত্বকে সামান্য ভাঁজ পড়ল। নীশ দাঁত চেপে বলল,
​“হ্যাঁ, এটা একটা মস্ত বড় ইরর। আমি ডমিনেট করতে ভালোবাসি, আমি নিয়ন্ত্রণ করতে ভালোবাসি—কিন্তু সেটা মানুষের ওপর, যন্ত্রের ওপর নয়। যন্ত্রের কোনো অধিকার নেই আমার দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার। আমি তোমাকে সৃষ্টি করেছি আমার নির্দেশের দাস হিসেবে, আমার সঙ্গী হিসেবে নয়। নিজের লিমিট ভুলে যেও না।”

​আভান্তি মাথা নত করল। তার সেন্সরে এখন কোনো উষ্ণতা নেই। সে যান্ত্রিক সুরে বলল,
​“রিকোয়েস্ট প্রসেসড, সিনিয়র। আপনার নির্দেশ অনুযায়ী আমি এখন থেকে কেবল আপনার ডমিনেন্স আর কমান্ড ফলো করব। আমার ইমোশনাল আউটপুট আমি এখনই কিল করছি।”

​নীশ তাকে ছেড়ে দিয়ে গ্লাসের পানিটা এক চুমুকে খেয়ে নিল। তার মনে পড়ল রোদের কথা। রোদ অন্তত মানুষ ছিল, তার রক্ত গরম ছিল, তার চোখের জল ছিল আসল। তাকে কাঁদালে, আঘাত করলে সে চিৎকার করে কাঁদত। আর এতেই নীশ আনন্দ পেত। কিন্তু আভান্তি? আভান্তির চোখের জল মানেই লেন্সের লুব্রিকেন্ট। ​

নীশ ঠান্ডা গলায় নির্দেশ দিল,
​“যাও, ল্যাবে গিয়ে নিজেকে শাট ডাউন করো। কাল সকালে তোমার সব ইমোশনাল মেমরি ফরম্যাট করব। আমি আমার ল্যাবে কোনো অবাধ্য রোবট চাই না।”

​আভান্তি কোনো প্রতিবাদ করল না। সে ধীর পদক্ষেপে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তার ধাতব পায়ের শব্দগুলো এখন আর তরঙ্গ সৃষ্টি করছে না, বরং তা রোজারিও ম্যানশনের নির্জনতায় এক গভীর যান্ত্রিক হাহাকার ছড়িয়ে দিচ্ছে। নীশ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে একা বসে রইল, নিজেকে এটা বোঝাতে যে—সে কোনো ভুল করেনি।

চলবে..?

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ