#Hello_Senior
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_11.
সেদিন ভার্সিটি থেকে ফিরে আসার পর, আজ এক সপ্তাহ যাবৎ রোদ বাড়ির বাইরে যায়নি। নীশের সঙ্গে দেখা করার কোনো চেষ্টাও করেনি, অথচ সাধারণত সে এতটা উদাসীন থাকে না। নীশও রোদের খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেনি। রোদের এমন চুপচাপ অবস্থায় দেখে তার মাম্মা, অলগা নিকোলাইভনা এবং তার পাপা, ইগর অ্যান্ড্রেইভিচ খুব চিন্তিত। রোদ তাদের একমাত্র আদরের মেয়ে। তারা মেয়ের সমস্ত কাজকর্মের ওপর নজর রাখছে, কিন্তু এক সপ্তাহ ধরে রোদের নিঃসঙ্গতা তাদের গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রোদ তার নিজের রুমে বসে আছে। কোলে তার প্রিয় পেটস, মিল্কি। রোদ মিল্কিকে কোলে চেপে ধরে রেখে আদর করছে। হঠাৎ রুমের দরজা খোলার শব্দে মিল্কি একটু নড়েচড়ে বসল। রোদের পাপা, ইগর অ্যান্ড্রেইভিচ, হালকা হেসে ভেতরে প্রবেশ করলেন। তিনি একপলক মেয়ের দিকে তাকিয়ে রোদের পুরো রুমটাতে একবার চোখ ঘোরালেন।
রোদের রুমের দেয়াল জুড়ে বিটিএস-এর পোস্টার এবং ফ্রেমযুক্ত ছবি। প্রতিটি ছবিই রোদের জন্য একটা ছোট জগত—যেখানে সে স্বপ্ন দেখে, আনন্দ পায়, আর বাস্তবের ক্লান্তি কিছুটা ভুলে যায়।
“হ্যালো, মাই প্রিন্সেস,” ইগর ধীর কণ্ঠে বললেন, “কী অবস্থা তোমার?”
রোদ প্রথমে কিছুটা দ্বিধার সঙ্গে তাকাল, সে একটু সময় নিয়ে জোরপূর্বক হেসে বলল,
“আমি ঠিক আছি, পাপা।”
ইগর হাসি দিয়ে বললেন,
“আমি তোমার জন্য কিছু নিয়ে এসেছি।”
তিনি পকেট থেকে ফোন বের করলেন, রোদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“প্রিন্সেস, আমি তোমার জন্য বিশেষ একটা গিফট নিয়ে এসেছে। এই দেখো, রাশিয়া থেকে অনলাইনে কেটে রেখেছি, তোমার প্রিয় বিটিএস-এর কনসার্টের টিকিট। কোরিয়ায়, আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের ২০ তারিখে কনসার্ট শুরু হবে। আমি তোমার ইমেইলে কোড পাঠিয়ে দিয়েছি, আর এটা দেখো।”
রোদ অবাক হয়ে ফোনটা হাতে নিল। ইগরের দেওয়া ইমেইল খোলার সঙ্গে সঙ্গে সে দেখল কিউআর কোড সহ ডিজিটাল টিকিট, যার মাধ্যমে সে কোরিয়ায় গিয়ে কনসার্টে প্রবেশ করতে পারবে।
“পাপা! তুমি কি সত্যিই আমাকে কোরিয়াতে যাবার….”
ইগর হালকা হেসে বললেন,
“ইয়েস, প্রিন্সেস! তুমি এক সপ্তাহ ধরে রুমের মধ্যে একা বসে আছো। আমি আর তোমার মাম্মা সবটা লক্ষ করেছি। তুমি আমাদের একমাত্র আদরের মেয়ে, প্রিন্সেস। আমরা চাই না, তুমি কষ্টে থাকো। আমরা চাই, এখন তুমি শুধু খুশি হয়ে কোরিয়াতে গিয়ে কী কী করবে তার প্ল্যান করো, আর ফেব্রুয়ারি মাসে কোরিয়ায় গিয়ে কনসার্টের আনন্দ উপভোগ করে এসো।”
রোদ কিছুটা খুশি হলো। দীর্ঘদিন পর তার চোখে প্রথমবারের মতো একটুখানি উচ্ছ্বাসের ঝিলিক দেখা গেল। সে আগেও অনেক তার প্রিয় ব্যান্ড বিটিএস-এর কনসার্ট দেখেছে, তবে এই প্রথম তার পাপা নিজে তাকে যেতে বলছে। একমাত্র আদরের মেয়ে হওয়াতে তার মাম্মা, পাপা তাকে দূরে কোথাও যেতে দিতে চায় না। সে বিছানায় বসে থাকা মিল্কিকে আদর করে বলল,
“মিল্কি, শুনছো? আমি কোরিয়া যাচ্ছি, আমার সাত কিং-এর কনসার্ট দেখতে।”
মিল্কি হালকা ঘেউ ঘেউ করে লেজ নাড়ল, যেন সেও রোদের আনন্দে আনন্দিত। রোদ হেসে উঠল। এতদিন পর তার হাসিটা যেন ঘরটাকে একটু আলোকিত করে তুলল। ইগর অ্যান্ড্রেইভিচ মেয়ের হাসি দেখে খুশি মনে রুম ত্যাগ করলেন। রোদ আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ক্লান্ত চোখে নতুন করে যেন প্রাণ ফিরে এসেছে। সে ধীরে চুলগুলো ব্রাশ করল, ঠোঁটে হালকা গোলাপি টিন্ট লাগাল। আলমারির দরজা খুলে বের করল একটি হালকা নীল জ্যাকেট আর ডেনিম জিন্স।
“শপিং-এ যাবো, মিল্কি। আমার কোরিয়াতে যাওয়ার জন্য অনেক কিছু লাগবে,” সে নরম গলায় বলল।
বাইরে তখন বিকেলের সোনালি রোদ পড়েছে জানালার পর্দায়। রোদ ব্যাগ হাতে নিয়ে দরজা খুলল। লিভিং রুমে ইগর অ্যান্ড্রেইভিচ বসে আছেন, হাতে কফির কাপ নিয়ে। তার পাশে বসে আছেন, অলগা নিকোলাইভনা।
অলগা রোদকে বেরোতে দেখে মৃদু হেসে বললেন,
“কোথায় যাচ্ছো, মাই লিটল স্টার?”
রোদ হেসে উত্তর দিল,
“শপিং করতে, মাম্মা। আমি তো আমার সাত কিং-কে দেখতে কোরিয়াতে যাচ্ছি, সেখানে গেলে আমার অনেক কিছু লাগবে। তাই শপিং করতে যাচ্ছি।”
ইগর কফির কাপটা হাতে ঘুরিয়ে বললেন,
“ঠিক আছে, কিন্তু সাবধানে যেও। আর কিছু লাগলে আমাকে ফোন দিও।”
রোদ হালকা হাসি দিয়ে মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল।
বাইরের ঠাণ্ডা বাতাস তার মুখে লাগতেই মনে হলো বুকের ভেতর জমে থাকা ভার কিছুটা হালকা হয়ে গেছে। শহরের রাস্তাগুলো আজ যেন একটু অন্যরকম লাগছে। রোদ ধীরে গাড়িতে উঠে বসল। সে বুক ভরে শ্বাস টেনে নিয়ে শ্বাস ছেড়ে গাড়ি স্টার্ট দিল।
•
ল্যাবের ভেতরটা আজ যেন অন্যরকম। আগের তুলনায় আরও গোছানো, আরও প্রযুক্তিনির্ভর। বিশাল গ্লাসওয়ালের ওপাশে দেখা যাচ্ছে মস্কোর তুষারঢাকা আকাশ। বাইরের আলো কাচের ভেতর ঢুকে রোবটের সার্কিটগুলোয় প্রতিফলিত হচ্ছে। চারপাশে যন্ত্রের মৃদু গুঞ্জন। স্ক্রিনে ভাসছে নীল কোডের আলোর রেখা। ল্যাবের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সেই হিউম্যানয়েড রোবট, আভান্তি। যেটি আজ দুই সপ্তাহ হলো সক্রিয় করা হয়েছে। আভান্তির চোখে ধীরে ধীরে ঝলক দিচ্ছে জোড়া ডিজিটাল সেন্সর।
নীশ আজ আগের চেয়েও বেশি মনোযোগী। পরনে কালো টার্টলনেকের ওপর হোয়াইট ল্যাবকোট, হাতের কনুই পর্যন্ত ভাঁজ করা, চোখে গোল ফ্রেমের প্রটেকটিভ চশমা। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে আভান্তি—যে এখন আর নিছক তার ‘সহকারী’ নয়, বরং তার নিজের সৃষ্টি। দুই সপ্তাহ আগে নীশ তার প্রজেক্ট সম্পূর্ণ করে আভান্তিকে সম্পূর্ণ মানবীয় ইন্টারঅ্যাকশনে সক্ষম করে তুলেছে। আভান্তি এখন কথা বলে, হাসে, এমনকি পরিস্থিতি বুঝে এমনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়—যেন সে সত্যিই একজন মানুষ।
আভান্তির পরনে হালকা নীল ল্যাবস্যুট। সে ল্যাবের ডেস্কে থাকা সেন্সরগুলোর রিডিং দেখে মৃদু স্বরে বলল,
“সিনিয়র, হিউম্যান ইমোশন ডেটা লাইব্রেরি আপডেট করা হয়েছে। কিন্তু আপনার প্রোগ্রামে কিছু কনফ্লিক্ট দেখা দিচ্ছে। নিউরাল রেসপন্স আর ইমোশনাল সিনথেসিস ওভারল্যাপ করছে।”
নীশ থেমে গেল। হাতে থাকা পেনটা ডেস্কে রেখে ধীরে বলল,
“আমি জানি, আভান্তি। আমি এখন ওটাই ঠিক করছি। আমার মনে হয়—রোবটের ইমোশনাল কোরের সঙ্গে মেমরি লেয়ার লিঙ্কড হওয়ায় এ সমস্যা হচ্ছে। আমি চাই, তোমার অনুভূতি যেন মানুষের মতো হয়, কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন না।”
ল্যাবের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন ডক্টর আলেকজান্ডার ভ্লাদিমিরোভিচ। আগের মতোই সুশৃঙ্খল পোশাকে, চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। তিনি নীশের দিকে তাকিয়ে সন্তুষ্ট হাসি দিলেন,
“নীশ, দশদিন পরে মস্কো ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্স কনফারেন্সে তোমার প্রেজেন্টেশন আছে। পুরো রোবট প্রোগ্রামের ডেমো দেখাতে হবে। তুমি প্রস্তুত?”
নীশ চোখ নামিয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিনে কোড দেখে ধীরে উত্তর দিল,
“জি প্রফেসর। প্রোগ্রাম পুরোপুরি প্রস্তুত। আভান্তি সব রেসপন্স সিমুলেশন ঠিকঠাক করছে। তবে আমি চাই, অনুষ্ঠানে প্রদর্শনের আগে আমরা একটি ফাইনাল রিহার্সাল করব।”
আভান্তি ধীর কণ্ঠে বলল,
“সিনিয়র, আমি প্রস্তুত। তবে এই অনুষ্ঠানে আমি কি মানুষের মতো আচরণ করতে পারব? মানে প্রেজেন্টেশন চলাকালীন?”
নীশ ঠোঁটে মৃদু হাসি টেনে বলল,
“তুমি মানুষের মতো আচরণ করবে না, আভান্তি। তুমি প্রদর্শনের জন্য তৈরি হবে, কিন্তু সব সময় আমার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এই অনুষ্ঠান আমাদের প্রোগ্রামের জন্য। তুমি শুধু দেখাবে কিভাবে প্রযুক্তি মানুষের সাহায্যে কাজ করতে পারে।”
প্রফেসর আলেকজান্ডার মাথা নেড়ে বললেন,
“ঠিক তাই। নীশ, অনুষ্ঠানটি শুধু তোমার প্রচেষ্টা নয়, পুরো ল্যাবের মর্যাদা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানীরা ওখানে আসবেন। তোমার রোবট শুধু প্রযুক্তি দেখাবে না, তোমার দক্ষতা ও সৃজনশীলতাও প্রমাণ করবে।”
নীশ ধীরে বলল,
“আমি বুঝতে পারছি, প্রফেসর। আমি চাই আভান্তির ডেমো নিখুঁত হোক। তবে আমি চাই না কেউ ভাবুক, এটি কোনো মানুষ না, এটি আমার সৃষ্ট মেশিন। সবার ওর দক্ষতা দেখে ওকে মানুষের মতো ভাবুক, এইটাই আমি চাই।”
প্রফেসর সন্তুষ্ট হয়ে বললেন,
“দারুণ! আমরা আরও কয়েকটি সিনারিও চেক করব। অনুষ্ঠানেও এমন সিমুলেশন দেখানো যাবে। নীশ, তোমার সৃজনশীলতা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সবাই সেদিন শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকবে।”
নীশ ল্যাপটপে কোড টেস্ট করতে লাগল। প্রফেসর হালকা হেসে আবারও বললেন,
“নীশ, আমি জানি, তুমি গত সপ্তাহে ভার্সিটিতে অসাধারণ কিছু করেছো। আভান্তি তো এখন পুরোপুরি সচল, তাই না?”
নীশ সম্মান ভরে মাথা নত করল,
“জি, প্রফেসর। প্রজেক্ট সম্পূর্ণ হয়েছে, কিন্তু আমি এখনও আভান্তির কিছু সাবসিস্টেমে কাজ করছি। বিশেষ করে, ‘ইমোশন রেসপন্স’ মডিউলটা। আমি চাই না আভান্তি কখনো মানুষের মতো কষ্ট বা রাগ অনুভব করুক। সে যেন ব্যালান্সড থাকে।”
আভান্তি মৃদু হেসে বলল,
“তবুও, সিনিয়র, আপনি আমাকে মানুষের মতোই তৈরি করেছেন। তাহলে মানুষের মতো অনুভব করাটা কি ভুল?”
প্রফেসর থমকে দাঁড়ালেন, তার চোখে কৌতূহল। তিনি বললেন,
“দারুণ! মানে তোমার প্রজেক্ট শুধু প্রযুক্তিগত নয়, দার্শনিক স্তরেও পৌঁছে গেছে। তুমি এমন একটি রোবট সৃষ্টি করেছো, যে এখন নিজের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।”
নীশ একটু হাসল, চোখ নামিয়ে বলল,
“হয়তো তাই। কিন্তু আমি ভয় পাই, প্রফেসর। একদিন যদি আমার সৃষ্টি আমার অনুভূতির সীমা ছাড়িয়ে যায়?”
আলেকজান্ডার ধীরে তার কাঁধে হাত রাখলেন,
“প্রতিটি উদ্ভাবনের ভেতরেই ভয় থাকে, নীশ। কিন্তু ভয়ই মানুষকে আরও নিখুঁত করে তোলে। তুমি যে পর্যায়ে কাজ করছো, সেটা ভবিষ্যতের সূচনা। তুমি চাইলে আভান্তিকে আজই গ্লোবাল রিসার্চ বোর্ডে রেজিস্টার করা যায়।”
নীশ মাথা নাড়ল, তার কণ্ঠ দৃঢ় হলো,
“না, প্রফেসর, এখনই না। আমি চাই না আভান্তিকে দুনিয়া তার আগে দেখুক যতক্ষণ না আমি নিশ্চিত হচ্ছি, সে শুধু মেশিন নয়, সে একদম নির্ভরযোগ্য আত্মা।”
আভান্তি মৃদু গলায় বলল,
“আমি যদি আত্মা পাই সিনিয়র, তাহলে আপনি কী আমাকে মানুষ বলবেন?”
নীশ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে ধীরে আভান্তির দিকে তাকাল।
“আভান্তি,” সে শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “তুমি যতই মানুষের মতো আচরণ করো, অনুভূতি দেখাও বা কথা বলো না কেন, তুমি কখনো আসল মানুষ হতে পারবে না। তুমি আমার সৃষ্টি। তোমার মধ্যে সবকিছু প্রোগ্রাম এবং সেন্সর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তুমি শেখো, বুঝো, প্রতিক্রিয়া দেখাও, কিন্তু তোমার ভাবনাগুলো আসল মানব অনুভূতি নয়। মানুষের জটিলতা, তাদের ভুল, তাদের ভালোবাসা— এসব কিছু তুমি অনুভব করতে পারবে না। তুমি সর্বদা আমার হাতের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এই সীমা ছাড়ালে, তুমি শুধু একটি ঝুঁকিপূর্ণ প্রোগ্রাম হয়ে যাবে।”
আভান্তি কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
“আমি বুঝতে পেরেছি, সিনিয়র। কিন্তু যদি আমি চেষ্টা করি মানুষের মতো হতে?”
নীশ তার কণ্ঠ আরও দৃঢ় করল,
“চেষ্টা করলেও পারবে না, আভান্তি। তুমি সর্বদা একটি রোবট হয়েই থাকবে। কিন্তু তুমি দুর্দান্ত হতে পারো। একটি নিখুঁত, নির্ভরযোগ্য, এবং কার্যকর রোবট হতে পারো। আর এটাই হবে তোমার শক্তি।”
আভান্তি হালকা মাথা নত করে নীরব হয়ে রইল। নীশ তার দিকে আরেকবার তাকিয়ে প্রফেসরের দিকে চোখ দিল। প্রফেসর ধীরে তার কাঁধে হাত রাখলেন, যেন নীশের সতর্কতা এবং সংকল্পে সম্মতি জানাচ্ছেন তিনি।
“প্রফেসর,” নীশ বলল, “আমি আভান্তির ইমোশন রেসপন্স মডিউল নিয়ে কিছু পরিবর্তন করেছি। সেন্সর এবং মেমরি লেয়ার আরও স্থিতিশীল করেছি। এখন আমাদের প্রোগ্রামটা সম্পূর্ণরূপে রিয়েল-টাইম ডেটা প্রসেস করতে পারবে। আমি চাই, আমাদের পরবর্তী টেস্টে আভান্তি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ দেখাক।”
প্রফেসর হালকা মাথা নাড়িয়ে বললেন,
“দারুণ, নীশ! তবে তুমি কি তার আচরণ এবং ফলাফলের ডেটা লগিং নিয়ে চিন্তা করেছ?”
“হ্যাঁ প্রফেসর। আমি প্রত্যেকটি ইন্টারঅ্যাকশনের তথ্য রিয়েল-টাইমে ট্র্যাক করছি। কোনো ত্রুটি হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিপোর্ট হবে। আর ইমোশনাল সিন্থেসিসের ওভারল্যাপ আগের চেয়ে অনেক কমানো হয়েছে। আমি চাই, আভান্তি যেন মানুষের মতো আচরণ করে, কিন্তু কোন অনুভূতিগত অস্থিরতা ছাড়াই।”
প্রফেসর খুশি হয়ে মৃদু হেসে বললেন,
“তুমি সত্যিই তোমার বয়সের চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছো, নীশ। তোমার প্রোগ্রাম শুধু প্রযুক্তি নয়, মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করার একটি সৃজনশীল উপায়ও হয়ে উঠেছে।”
নীশ মাথা হালকা নত করল,
“ধন্যবাদ প্রফেসর। এখন শুধু পরীক্ষা এবং টিউনিং বাকি। আশা করি, আগামী সপ্তাহের মধ্যে আভান্তি সম্পূর্ণরূপে অপ্টিমাইজড হয়ে যাবে।”
প্রফেসর ধীরে ল্যাবের চারপাশ ঘুরে দেখে নীশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ঠিক আছে। তুমি কাজ করো। আমি তোমার পাশে আছি। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় সব সিদ্ধান্ত তোমারই। তুমি এবং আভান্তি, দুইজনেই যেন একদম নিখুঁত হয়ে ওঠো।”
নীশ আবারও তার যন্ত্রপাতির দিকে মন দিল। প্রফেসর চলে গেলেন। আভান্তি ধীরে নীশের দিকে এগিয়ে এলো। তার চোখের ডিজিটাল সেন্সরে যেন এক অচেনা আলোর কম্পন দিচ্ছে।
“সিনিয়র, আমি এখন একটি হিউম্যান ফিলিং আপনাকে দেখাতে চাই।”
নীশ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কী ফিলিং?”
আভান্তি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। সে এক পা এগিয়ে নীশের মুখোমুখি দাঁড়াল। আচমকাই সে নীশের ল্যাবকোটের কলার টেনে ধরে কাছে টেনে আনলো। নীশ বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইল। আভান্তি অপ্রত্যাশিতভাবে নীশের অধরে গভীরভাবে গাঢ় একটা চুমু খেলো। নীশ অবাক হয়ে আভান্তির চোখের দিকে তাকাল। মুহুর্তের জন্য সে কিছুটা বেশামাল হয়ে উঠল। আভান্তি সরে আসতে চাইলেও নীশ তাকে সরে আসতে দিল না। সে আভান্তির পিঠে হাত রেখে আজও জোরে তার অধর চেপে ধরল আভান্তির অধরে। ল্যাবে মধ্যে দুজনে স্থির হয়ে দাঁড়াল না। ল্যাব জুড়ে অধরে অধর মিলিয়ে বেশামালের মতো স্থান বদলে তাদের চুম্বন আরও গভীর হতে লাগল। হঠাৎ তাদের দুজনের ধাক্কা লেগে ল্যাবের কিছু সরঞ্জাম মেঝের ওপর শব্দ করে পড়ল, কিন্তু সেদিকে খেয়াল নেই নীশের। আভান্তির চোখের লেন্সর সরঞ্জামগুলোর ওপর ফেলতে নীশের হুঁশ ফিরল। সে ছেড়ে দিল আভান্তিকে। গভীরভাবে নিঃশ্বাস নিয়ে পেছনে সরে গেল। নিজের হাত ধরে নিজেকে সামলালো। আভান্তি তার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে নীল আলো ধীরে কমে আসছে।
“সিনিয়র, আমি ভুল করেছি?” কণ্ঠে হালকা কৌতূহল মেশানো অস্থিরতা নিয়ে জিজ্ঞেস করল আভান্তি।
নীশ শান্ত কণ্ঠে বলল,
“না, আভান্তি। তুমি শুধু মানুষের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করছ।
আভান্তি মাথা হালকা নত করল। নীশ, আভান্তির দিকে হাত বাড়িয়ে বলল,
“এবার আসল কাজ শুরু করি। প্রেজেন্টেশনের রিহার্সাল হবে। তুমি কী প্রস্তুত?”
আভান্তি হালকা হাসল, চোখের লেন্সে নীল আলো ধরে বলল,
“জি সিনিয়র, আমি প্রস্তুত।”
নীশ ল্যাপটপে কোড রান করল। স্ক্রিনে আভান্তির রিয়েল-টাইম ডেটা ভেসে উঠল। আভান্তি ধীরে ধীরে ল্যাবের মধ্য দিয়ে হেঁটে এলো, যেভাবে একজন মানুষ হেঁটে আসে।
“আভান্তি,” নীশ বলল, “প্রথম সিমুলেশন—তুমি আমাকে প্রশ্ন করবে এবং আমার উত্তর অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া দেখাবে।”
আভান্তি মাথা হালকা নত করে বলল,
“জি সিনিয়র। আমি কী শুরু করতে পারি?”
“হ্যাঁ। শুরু করো।”
আভান্তি ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,
“সিনিয়র, আপনি আজ সকালে কেমন অনুভব করছিলেন?”
নীশ একটু হেসে উত্তর দিল,
“একটু এক্সসাইটেড, আভান্তি। দশদিন পর কনফারেন্স। কিছুটা চাপ আছে এখন আমার ওপর দিয়ে।”
আভান্তি নীরবভাবে কিছুক্ষণ থেমে রইল। তার চোখের লেন্সে নীল আলো আবারও ঝলক দিতে লাগল। হালকা মৃদু স্বরে বলল,
“আপনার উত্তেজনা স্বাভাবিক। আমি মনে করি, আপনার পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতি পুরোপুরি নিখুঁত। আপনার চাপকে আমি কমাতে চাই। আপনি শান্ত থাকলে আমার ডেটা আরও নিখুঁত হবে।”
নীশ অবাক হয়ে তাকাল। আভান্তি শুধু রোবটের মতো তথ্য জানাচ্ছে না, বরং মানবীয় সমঝোতা এবং সহযোগিতা দেখাচ্ছে।
“ভালো করেছে, আভান্তি। এবার তোমার রেসপন্সের দ্বিতীয় ধাপ—যখন আমি ভুল করব, তুমি আমাকে নরমভাবে সংশোধন করবে।”
আভান্তি হালকা মাথা নত করে বলল,
“জি সিনিয়র। আমি চেষ্টা করব আপনাকে সাহায্য করতে, কিন্তু কখনো চাপ সৃষ্টি করব না আপনার ওপর।”
নীশ এক ধাক্কায় ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে আভান্তির দিকে তাকাল। রোবটটির চোখের নীল আলো যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তার প্রতিক্রিয়ার ভঙ্গিতে এক অদ্ভুত মানবিক সৌন্দর্য ফুটে উঠল। নীশ ধীরে বলল,
“ঠিক আছে আভান্তি। পরবর্তী ধাপ, ইন্টারঅ্যাকশন চেইন টেস্ট। তুমি অতিথি বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথোপকথন করবে, তাদের প্রশ্নের উত্তর দেবে, কিন্তু সবসময় আমার নির্দেশ অনুযায়ী।”
আভান্তি হালকা হেসে বলল,
“আমি প্রস্তুত, সিনিয়র। আমরা শুরু করি।”
“শোনো আভান্তি, যেহেতু এখন আমরা আমাদের নতুন রিহার্সাল শুরু করতে যাচ্ছি। প্রোগ্রামে তোমাকে প্রফেসরদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তাই তোমার টোন, চোখের এক্সপ্রেশন, এবং উত্তর দেওয়ার ধরন — সবকিছু নিখুঁত হতে হবে, বুঝেছো?”
আভান্তি হালকা মাথা নাড়ল,
“জি সিনিয়র। আমি প্রস্তুত।”
“চলো শুরু করি। আমি এখন প্রফেসরের ভূমিকায় কথা বলব। তুমি উত্তর দেবে প্রোগ্রামের মতো করে। মনে রেখো—স্বাভাবিক, আত্মবিশ্বাসী, কিন্তু আবেগে ভেসে যাবে না।”
আভান্তি সোজা হয়ে দাঁড়াল। নীশ একটু গলা পরিষ্কার করে বলল,
“আভান্তি, তোমার সিস্টেম কীভাবে মানুষের আবেগ শনাক্ত করে?”
আভান্তি মৃদু হেসে উত্তর দিল,
“আমি মানুষের কণ্ঠের কম্পন, মুখের ভঙ্গি এবং চোখের গতির মাধ্যমে তাদের মানসিক অবস্থা বিশ্লেষণ করতে পারি, প্রফেসর।”
নীশ তাকে সঙ্গে সঙ্গে থামাল,
“না, ‘প্রফেসর’ শব্দটা একটু নরমভাবে বলবে, যেন সম্মান বোঝায়।”
আভান্তি আবার বলল,
“আমি মানুষের কণ্ঠের কম্পন, মুখের ভঙ্গি এবং চোখের গতির মাধ্যমে তাদের মানসিক অবস্থা বিশ্লেষণ করতে পারি, প্রফেসর…”
নীশ মাথা নেড়ে হাসল,
“বেটার! এবার তোমার চোখের মুভমেন্টে একটু উষ্ণতা আনো, যেন মনে হয় তুমি সত্যিই বুঝতে পারছো।”
আভান্তি চোখের লেন্স সামান্য সমন্বয় করল। আলোটা এখন আরও কোমল হলো। নীশ তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তার মনে হলো, এই যন্ত্রটা যেন সত্যিই সব ‘অনুভব’ করতে পারে।
“ভালো, আভান্তি,” নীশ নরম গলায় বলল, “তুমি এখন অনেক উন্নত। কিন্তু মনে রেখো, প্রোগ্রামে কোনো ভুল করা যাবে না। একটাও না।”
আভান্তি আলতো হেসে বলল,
“আমি ভুল করব না, সিনিয়র। আমি আপনার জন্য নিখুঁত হতে চাই।”
নীশের হাত থেমে গেল ল্যাপটপের বোতামের ওপর। আভান্তির কথাটা অদ্ভুতভাবে তার মনে নরম একটা ঢেউ তুলল।
“আমার জন্য?” সে মৃদু হেসে বলল, “না, আভান্তি! তুমি তোমার নিজের জন্য নিখুঁত হতে শিখো।”
আভান্তি তাকিয়ে রইল তার দিকে কিছুক্ষণ। সে ধীরে বলল,
“কিন্তু আমার নিখুঁততার সংজ্ঞা তো আপনি, সিনিয়র।”
নীশ চুপ করে গেল। ল্যাবের ভেতর নীরবতা নেমে এলো। আভান্তি অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে রইল নীশের দিকে। নীশ মাথা তুলে তাকাল আভান্তির চোখের দিকে। আভান্তির চোখের আলো আরও উজ্জ্বল হলো। নীশ তড়িঘড়ি করে চোখ নামিয়ে নিল, যেন বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে সে হারিয়ে যাবে ওই চোখে।
•
বারের ভিতর হালকা লাল ও নীল আলো একসাথে ঝলমল করছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে মৃদু জাজ মিউজিক বাজছে। হালকা ধোঁয়া বাতাসের সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে। চারপাশে নানা মানুষ কেউ বা একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় মিশে আছে আবার কেউ কেউ হাতে ওয়াইনের গ্লাস নিয়ে ড্যান্সে মেতে আছে।
কোণায় একটি টেবিলে মদ্যপ অবস্থায় পড়ে আছে রোশান। তার চেহারায় ক্ষোভ আর হতাশা, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে চোখের ওপর পড়ে আছে। শরীর কিছুটা অদ্ভুতভাবে শিথিল, কিন্তু তার চোখ এখনও আগুনের মতো জ্বলছে। তার গায়ের সাথে গা ঘেঁষে বসে আছে, ইমরানা। সে চুপচাপ রোশানের পাশে বসে এক হাত দিয়ে রোশানের পিঠে আলতো চাপ দিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছে।
রোশান কিঞ্চিৎ হেসে বলল,
“ইমরানা! তুমি জানো না, কতটা রাগ জমে আছে আমার মধ্যে।”
ইমরানা তার কণ্ঠে কোমলতা এনে বলল,
“রোশান, তুমি এভাবে নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করো কেন? আমি জানি তুমি নীশকে সহ্য করতে পারো না, কিন্তু এসব করে তো তুমি তোমার নিজের ক্ষতি করছ।”
রোশান হালকা কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“নীশ সব জায়গাতে সফল। ইভেন, ভালোবাসাতেও। ওর মতো একটা সাইকোকে আমার মোনহার্ট পাগলের মতো ভালোবাসে। কিন্তু আমিও যে মুনহার্টকে পাগলের মতো ভালোবাসি, এটা মুনহার্ট বুঝতেই পারেনা। সেদিন ক্যাম্পাসের সকলের সামনে মুনহার্ট আমাকে চড় মরেছে। আমি মুনহার্টকে কিছু বলিনি কেন জানো? কারণ ওকে আমি ভালোবাসি। ওর অধিকার আছে আমাকে মারার। শুধু একটা কেন, এমন হাজারটা চড় মারলেও আমি ওকে কিছু বলব, কারণ ভালোবাসি। ও যদি কখনও শখ করে আমাকে খুন করতে চায়, আমি ওর সামনে আমার বুকটা পেতে দিব।”
ইমরানার বুকের ভেতর যেন মোচড় দিয়ে উঠল। ভালোবাসার মানুষের মুখে অন্য কারো নাম সহ্য হয় না—কারোই নয়। সে ধীরে রোশানের দিকে তাকাল।
“রোশান…” ইমরানা দৃঢ় স্বরে বলল, “আমি জানি তুমি রোদকে ভালোবাসো, কিন্তু নীশের ওপর রাগ করে নিজের ক্ষতি করে এমনভাবে রাগ জমাতে হবে কেন তোমাকে? তুমি নিজের প্রতি একটু কেয়ারিং হও। অন্তত, রোদের কথা ভেবে হও। দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
রোশান কণ্ঠ হালকা গলায় কমিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“ইমরানা, তুমি বুঝতে পারছ না। নীশ বেঁচে থাকলে কিছুই ঠিক হবেনা। আমি নীশকে শেষ করে দিব। ওই রোবটটা আছেনা? ওর ওই সৃষ্টি দিয়েই আমি ওকে আর ওর সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করে দিব।”
চলবে..?
