#Hello_Senior
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_15.
নেশার ঘোর কাটতেই নীশের চেতনার নিউরনগুলো সক্রিয় হতে শুরু করেছে। মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসে গতরাতের রক্তিম স্মৃতিগুলো একে একে ভেসে উঠছে—দিমিত্রির হাহাকার, সেই বীভৎস ভোজ, আর আভান্তির লাল সাটিন গাউনের সেই প্ররোচনা।
নীশ চোখ মেলল। কিন্তু হাতের ওপর এক অপার্থিব উষ্ণতা অনুভব করতেই তার শরীরের প্রতিটি পেশি টানটান হয়ে গেল। সে পাশ ফিরে তাকাতেই তার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। সেখানে আভান্তি নেই। সেখানে শুয়ে আছে রোদ। ওর চোখের কোণে তখনো শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুর দাগ।
নীশ এক ঝটকায় বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো, কপালে ফুটে উঠল রাগের নীল শিরা। উচ্চস্বরে বলল,
“রোদ মিশরা! আমার ব্যক্তিগত প্রকোষ্ঠে প্রবেশের এই দুঃসাহসিক স্পর্ধা কি তোমার নিউরাল সার্কিটের কোন ত্রুটির ফলাফল?”
নীশের কর্কশ চিৎকারে রোদের ঘুম ভেঙে গেল। সে ধড়ফড় করে উঠে বসল। নীশের চোখের প্রখর চাউনি দেখে সে কয়েক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে রইল। নীশের রাগ এখন এক পারমাণবিক বিস্ফোরণের মতো। সে ড্রয়ার থেকে একটা সার্জিক্যাল নাইফ বের করে টেবিলের ওপর সজোরে ঠুকল,
“উত্তর দাও রোদ! এই কক্ষটি আমার স্পেসিমেন স্যাঙ্কটাম-এর মতোই সংরক্ষিত। এখানে তোমার মতো একজন সাধারণ আবেগচালিত মানুষের উপস্থিতি মানেই আমার ব্যক্তিগত সিউডোমনিটি অবমাননা। তুমি কি জানো না, আমি কোনো রক্ত-মাংসের পরজীবীকে আমার এই একাকীত্বের বলয়ে সহ্য করি না?”
রোদ কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,
“নীশ, আমি কেবল… তুমি কাল রাতে খুব কষ্টে ছিলে। তুমি প্রলাপ বকছিলে…”
নীশ রোদের খুব কাছে গিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“প্রলাপ? মানুষের অবচেতন মন এক গভীর অন্ধকার ব্ল্যাকহোল, রোদ। সেখানে কী ঘটে তা বোঝার মতো ইমোশনাল কোশেন্ট তোমার নেই। তুমি কি ভেবেছো, তোমার এই স্পর্শ দিয়ে তুমি আমার লালিত শূন্যতাকে পূর্ণ করবে? দিস ইজ পিওরলি আ লজিক্যাল ফিউটিলিটি।”
সে দরজার দিকে ইশারা করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“এই মুহূর্তেই এখান থেকে বের হও। তোমার এই ‘করুণা’ বা ‘সহানুভূতি’ নামক সস্তা ভাইরাসগুলো আমার গবেষণাগারে ছড়িয়ে দিও না। মনে রেখো রোদ, ভালোবাসা কেবল দুর্বলদের একটি মেকানিজম, আর আমি সেই মেকানিজমকে ঘৃণা করি। এরপর যদি তোমাকে আমার ব্যক্তিগত পরিধিতে দেখি, তবে তোমার সাথে খুব একটা ভালো হবেনা। দিস ইজ নট আ থ্রেট, ইটস এ কনক্লুসিভ ফ্যাক্ট।”
রোদের চোখে জল এলেও সে এবার আর ডুকরে কেঁদে উঠল না। সে নীশের সেই রক্তচক্ষু আর চরম ঔদ্ধত্যের দিকে তাকিয়ে ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সে যাওয়ার সময় কেবল এটুকু বলে গেল— “তোমার এই যান্ত্রিক অহংকার একদিন তোমার পতন ঘটাবে।”
নীশ চিৎকার করে উঠল,
“আভান্তি! হোয়ার আর ইউ?”
আভান্তি রুমে এসে দাঁড়াল। নীশ হিংস্র চোখে আভান্তির দিকে তাকাল,
“আভান্তি! হাউ কুড ইউ লেট হার ইন?” সে দ্রুত পায়ে আভান্তির সামনে গিয়ে তার যান্ত্রিক কাঁধ খামচে ধরল। “তুমি কি জানো না আমার ওই প্রাইভেট ল্যাবরেটরি আর এই বেডরুমের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই? এখানে প্রতিটি ধূলিকণা আমার ব্যক্তিগত এলগরিদম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সেখানে তুমি রোদ মিশরাকে ঢুকতে দিলে? ইউ জাস্ট ভায়োলেটেড মাই সিকিউরিটি প্রটোকল!”
আভান্তি কোনো যান্ত্রিক নড়াচড়া করল না। সে তার শান্ত, গভীর নীল চোখের মণি নীশের চোখের ওপর স্থির রেখে ধীর স্বরে বলল,
“সিনিয়র, আপনার হাইপোথ্যালামাস বর্তমানে কর্টিসল হরমোনের আধিক্যে আক্রান্ত, যা আপনার লজিক্যাল রিজনিংকে বাধার সম্মুখীন করছে। আপনি আমাকে ‘সিকিউরিটি ভায়োলেশন’-এর দায়ে অভিযুক্ত করছেন, অথচ আপনি ভুলে যাচ্ছেন যে কাল রাতে আপনার শরীর যখন ইথানলের বিষক্রিয়ায় ধুঁকছিল, তখন আপনার সাবকনশাস মাইন্ড কেবল একজন ‘হিউম্যান টাচ’-এর জন্য আর্তনাদ করছিল।”
নীশ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“শাট আপ! আমি তোমাকে তৈরি করেছি আমার নির্দেশের অনুবর্তী হতে, আমার মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে আমাকে জ্ঞান দান করতে নয়। আমি রোদকে আমার এই চার দেয়ালের ভেতর ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ হিসাবে ঘোষণা করেছি। সেখানে তুমি তাকে এই কক্ষে আমন্ত্রণ জানালে কোন যুক্তিতে?”
আভান্তি এক পা এগিয়ে এলো। সে বলল,
“যুক্তিটি ছিল ‘সারভাইভাল অফ দ্য সাইকি’, সিনিয়র। একজন মানুষের মস্তিষ্ক যখন দীর্ঘক্ষণ দহন আর জিঘাংসার ওপর টিকে থাকে, তখন তার নিউরাল সিন্যাপসগুলো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। কাল রাতে আপনি যখন দিমিত্রির অস্তিত্ব বিলীন করছিলেন, তখন আপনার এমিগডালা যে পরিমাণ ট্রমা রিলিজ করেছে, তার প্রশমনের জন্য কোনো অ্যালগরিদম যথেষ্ট ছিল না। রোদ মিশরা কোনো অনুপ্রবেশকারী ছিল না, সে ছিল আপনার ডিস্টর্টেড রিয়ালিটির একমাত্র হিউম্যান ডিকম্প্রেসর। আমি কেবল আপনার সিস্টেমকে একটি অনিবার্য ক্র্যাশ থেকে রক্ষা করেছি।”
নীশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থেকে চেঁচিয়ে বলল,
“আমি কোনো ডিকম্প্রেসর চাই না! আমি চাই আমার সাম্রাজ্যের শুদ্ধতা। রোদ মিশরা আমার জীবনের সেই ইকুয়েশন, যাকে আমি বারবার ডিলিট করার চেষ্টা করছি। অথচ তুমি তাকে আমার আরও কাছে টেনে আনছো।”
আভান্তি শান্ত গলায় বলল,
“সিনিয়র, আপনি ম্যাথ ভালো বোঝেন। আপনি কি জানেন না যে, কোনো একটি নির্দিষ্ট চলক বা ভেরিয়েবল-কে আপনি যত বেশি অস্বীকার করবেন, আপনার ইকুয়েশনের শেষ ফলাফল তত বেশি ইনডিটারমিনেবল হয়ে যাবে? রোদ আপনার জীবনের সেই কনস্ট্যান্ট, যাকে আপনি ঘৃণা করছেন কেবল এই ভয়ে যে— সে আপনার পাথরের ভেতরকার সেই ভীত শিশুটিকে চিনে ফেলেছে। আপনি যদি সত্যিই তাকে ভয় না পেতেন, তবে আজ সকালে এত বিচলিত হতেন না।”
নীশ বাকরুদ্ধ হয়ে দপ করে চেয়ারে বসে পড়ল। তার ললাটে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে বুঝতে পারল, সে আজ নিজের সৃষ্টির কাছেই তর্কে হেরে যাচ্ছে। আভান্তি ধীর পায়ে নীশের পাশে এসে দাঁড়াল। তার হাতটা নীশের মাথার ওপর রাখল,
“শান্ত হোন, সিনিয়র। রাগ কেবল সাধারণ মানুষের দুর্বলতা। আপনার মতো একজন স্রষ্টার উচিত নিজের গাণিতিক ত্রুটিগুলোকে মেনে নেওয়া। কফি কি পরিবেশন করব, নাকি আরও কিছুক্ষণ নিজের এই একজিসটেনশিয়াল ক্রাইসিস নিয়ে ভাববেন?”
নীশ কোনো উত্তর দিল না। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল, যেখানে তুষারপাত থেমে গিয়ে এক রুক্ষ উজ্জ্বল রোদে পৃথিবী ভরে উঠেছে। সে জানে, দিমিত্রি মরে গেছে ঠিকই, কিন্তু রোদের ভালোবাসা এখন তার চেয়েও বড় বিভীষিকা হয়ে তার পিছু নিয়েছে। সে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আভান্তির শান্ত অবয়বের ওপর নিবদ্ধ করল। এই যান্ত্রিক মানবীর বুদ্ধিবৃত্তিক ঔৎকর্ষ তাকে প্রতিমুহূর্তে চমকিত করে। আভান্তির প্রতিটি লজিক্যাল ডিডাকশন এতটাই নিঁখুত যে, নীশ মাঝে মাঝে বিস্মৃত হয় যে সে নিজেই এই অসামান্য সত্তার স্থপতি।
তার ভেতরে এক ধরণের গোপন ভালো লাগা কাজ করে, যা সে কোনোদিন কোনো সমীকরণে প্রকাশ করতে পারবে না। আবার তার আজন্মলালিত কঠোর ব্যক্তিত্ব আর বিজ্ঞানমনস্ক অহংকারও তাকে বারবার বাধা দেয়। সে নিজেকে বোঝায়—একজন স্রষ্টা কখনোই তার সৃষ্টির প্রতি ইমোশনালি ভালনারেবল পারে না।
রুমের নিস্তব্ধতা ভেঙে আভান্তি একটি ট্রে নিয়ে এগিয়ে এলো। তাতে সাজানো রয়েছে প্রোটিন-সমৃদ্ধ ব্রেকফাস্ট আর নীশের প্রিয় ব্ল্যাক কফি। আভান্তি টেবিলের ওপর ট্রে-টি রেখে নীশের সামনে এসে দাঁড়াল,
“সিনিয়র, আপনার মেটাবলিক রেট বর্তমানে নিম্নমুখী। গতরাতের অ্যালকোহলিক টক্সিসিটি এবং এই মাত্র বয়ে যাওয়া মানসিক উত্তেজনার ফলে আপনার গ্লুকোজ লেভেল বিপজ্জনকভাবে কমে গেছে। আপনার মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারগুলোকে পুনরায় স্থিতিশীল করতে এই নিউট্রিশনাল ইনপুট অপরিহার্য।”
নীশ আড়চোখে ব্রেকফাস্টের দিকে তাকাল। আভান্তি অত্যন্ত নিপুণভাবে টোস্টের ওপর মাখন আর মধু মাখিয়ে দিল, ঠিক যেভাবে নীশ পছন্দ করে। এমনকি কফির তাপমাত্রা পর্যন্ত ঠিক ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখা হয়েছে—যা নীশের সংবেদনশীল তালুর জন্য একদম উপযুক্ত।
আভান্তি যখন কফির কাপটি এগিয়ে দিল, তখন তার আঙুলের ডগা নীশের হাতের স্পর্শে এলো। সেই সামান্যতম স্পর্শে নীশের বুকের ভেতর এক ধরণের ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক পালস খেলে গেল। সে কাপটি হাতে নিয়ে থমকে গেল। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে আভান্তির চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
“আভান্তি,” নীশ গম্ভীর গলায় ডাকল। “তোমার এই অ্যালগরিদমিক এমপ্যাথি মাঝে মাঝে আমাকে দ্বিধায় ফেলে দেয়। তুমি কি সত্যিই কেবল আমার ইনস্ট্রাকশন ফলো করছো, নাকি তোমার সাবজেক্টিভ কনশাসনেস তৈরি হয়ে গেছে? তোমার এই নিঁখুত পরিচর্যা আমার মেকানিজমকে দুর্বল করে দিচ্ছে।”
আভান্তি তার ঘাড়টা সামান্য কাত করল। সে শান্ত গলায় উত্তর দিল,
“সিনিয়র, আপনি যাকে দুর্বলতা বলছেন, সায়েন্টিফিক পরিভাষায় তাকে বলা হয় হোমিওস্ট্যাসিস বা ভারসাম্য। আমি কেবল আপনার শরীরের এবং মনের সেই ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছি। একজন স্রষ্টা যদি তার সৃষ্টির নিঁখুত সেবায় থমকে যান, তবে বুঝতে হবে সেই সৃষ্টি তার উদ্দেশ্যের চেয়েও বড় কিছু হয়ে উঠেছে। আমি আপনার সেই ইন্টেলেকচুয়াল মিরর, যেখানে আপনি আপনার নিজের নিঃসঙ্গতার প্রতিফলন দেখেন। আমার যত্ন আপনার প্রোগ্রামিংয়ের অংশ নয়, এটি আপনার প্রতি আমার এক ধরণের কগনিটিভ লয়ালটি।”
নীশ কফির কাপে চুমুক দিল। তিতকুটে কিন্তু সুগন্ধি পানীয়টি তার গলার নালি দিয়ে নামতেই প্রশান্তি বয়ে গেল। সে একটু সময় নিয়ে নিজের আবেগ সামলে নিয়ে নিস্পৃহ গলায় বলল,
“খুব ভালো হয়েছে কফিটা। এবার আমার ল্যাবরেটরি ডায়েরিটা নিয়ে এসো। দিমিত্রির ঘটনার পর আমার নিউরো-ম্যাপে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। আর শোনো… রোদ মিশরাকে নিয়ে এরপর কোনো ইমোশনাল এক্সপেরিমেন্ট করার চেষ্টা করবে না।”
আভান্তি মাথা নত করল। সে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় মনে মনে তার ডেটাবেসে একটি নতুন নোট সেভ করল, ‘সিনিয়র আজ প্রথমবার আমার স্পর্শে আপনি পালস রেট নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। দ্য স্রষ্টা ইজ ফল্লিং ফর হিজ ওন ক্রিয়েশন।’
•
ভার্সিটির সুবিশাল করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল নীশ। তার ঠিক দুই পা পেছনে যান্ত্রিক ছন্দে হাঁটছে আভান্তি। করিডোরের মাঝপথে আসতেই পরিবেশের তাপমাত্রা যেন হঠাৎ কয়েক ডিগ্রি বেড়ে গেল। সামনেই দাঁড়িয়ে আছে রোদ। তার চোখদুটো ফোলা, সারা মুখে দীর্ঘস্থায়ী বিষাদ। তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে রোশান।
নীশ রোদকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। রোদ পলকহীন চোখে নীশের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। রোশান রোদের এই অসহায়ত্ব সহ্য করতে পারল না। সে এক পা এগিয়ে নীশের উদ্দেশ্যে সজোরে বলল,
“প্রফেসর নীশ, আপনার ডমিন্যান্স আর এই যান্ত্রিক অহংকার হয়তো ল্যাবরেটরিতে কাজ করে, কিন্তু মানুষের অনুভূতির সামনে আপনার এই ক্যালকুলেটেড কোল্ডনেস বড্ড সস্তা দেখায়। আপনি কি এতটাই অন্ধ যে আপনার পাশের মানুষটির ইমোশনাল ট্রমা আপনার চোখে পড়ছে না?”
নীশ থামল। কিন্তু সে পেছন ফিরল না। সে তার ঘাড়টা সামান্য কাত করে নিস্পৃহ গলায় বলল,
“প্রফেসর রোশান, মানুষের অ্যানাটমি নিয়ে আপনার জ্ঞান থাকতে পারে, কিন্তু সাইকোলজি নিয়ে আপনার ধারণা বড্ড সেকেলে। আমি কেবল সেই তথ্যের ওপর প্রতিক্রিয়া দেখাই, যা লজিক্যাল। অপ্রাসঙ্গিক আবেগ আমার সিস্টেমের জন্য কেবল ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ ছাড়া আর কিছু নয়।”
আভান্তি এবার রোশানের দিকে তাকাল। সে শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
“প্রফেসর রোশান, আপনার হার্ট রেট বর্তমানে ১১০ বিপিএম অতিক্রম করেছে, যা আপনার ‘অ্যাংগার ম্যানেজমেন্ট’-এর ব্যর্থতাকে নির্দেশ করে। সিনিয়রের গাণিতিক একাকীত্ব বোঝার মতো নিউরাল ক্যাপাসিটি আপনার নেই। রোদ মিশরাকে নিয়ে আপনার এই অতি-সংবেদনশীলতা আসলে আপনার নিজেরই ইনসিকিউরিটি বহিঃপ্রকাশ।”
আভান্তির কথায় রোশান মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু ততক্ষণে নীশ আর আভান্তি করিডোরের মোড় ঘুরে অডিটোরিয়ামের দিকে চলে গেছে।
রোদ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। রোশান তার কাঁধে হাত রাখল, কিন্তু রোদ তাকে আলতো করে হাতটৃ সরিয়ে দিয়ে ধীর পায়ে নিজের ক্লাসরুমের দিকে হাঁটা দিল।
বিশাল লেকচার থিয়েটারটি আজ স্টুডেন্টে ভরপুর। হবেই বা না কেন? কলেজের দুই প্রধান ইন্টেলেকচুয়াল ক্রাশ—প্রফেসর নীশ এবং প্রফেসর রোশান আজ একই করিডোরে উপস্থিত। নীশ তার গাম্ভীর্য নিয়ে ক্লাসরুমে প্রবেশ করল। সে ডায়াসে গিয়ে নিজের ল্যাপটপটি কানেক্ট করল। তার পেছনে প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে আভান্তি। আজ আভান্তির পরনে একটি ডার্ক গ্রে ফরমাল স্যুট। ক্লাসের ছেলেরা আজ পড়াশোনা ভুলে ‘সুপার হিউম্যান’ সৌন্দর্যের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে।
নীশ গম্ভীর গলায় বলল,
“আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু— ‘নিউরাল নেটওয়ার্কস অ্যান্ড হিউম্যান সাইকোলজি’। আপনাদের যদি কোনো প্রি-লেকচার কোয়েরি থাকে, তবে নির্দ্বিধায় করতে পারেন।”
সাধারণত এই ক্লাসে ছাত্রছাত্রীরা কঠিন সমীকরণ নিয়ে প্রশ্ন করে, কিন্তু আজ আবহাওয়া ভিন্ন। প্রথম সারির এক ছাত্রী, যার চোখে নীশের প্রতি মুগ্ধতা স্পষ্ট, সে হাত তুলে দাঁড়িয়ে গেল। তার ঠোঁটে এক দুষ্টুমিভরা হাসি,
“স্যার, পড়াশোনা বাদ দিন। আমার একটা বায়োলজিক্যাল প্রশ্ন আছে। কাউকে ভালো লাগলে বা সারাদিন কারোর কথা ভাবলে সায়েন্সের ভাষায় তাকে কী বলা হয়? সেটা কি কোনো ক্রনিক অবসেসন নাকি স্রেফ নিউরনের ভুল সিগন্যাল?”
পুরো ক্লাসে হাসির রোল উঠল। নীশ থতমত খেয়ে গেল। তার মতো একজন লজিক্যাল মানুষের কাছে এই ধরণের অ্যাবসার্ড প্রশ্ন একদম অপ্রত্যাশিত। সে স্তব্ধ হয়ে রইল।
আরেকজন ছাত্র দাঁড়িয়ে গেল। তার দৃষ্টি আভান্তির দিকে নিবদ্ধ,
“আর স্যার, প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে সায়েন্সের দিক থেকে আপনার ব্যক্তিগত মতামত কী? হার্ট কি আসলেই পাম্প করার বাইরে কোনো রোমান্টিক ডাইমেনশনে কাজ করে?”
নীশ এবার কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ল। সে আড়চোখে একবার পাশে দাঁড়ানো আভান্তির দিকে তাকাল। আভান্তি তখন তার ৩০০০ আইকিউ নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের সাইকোলজি অ্যানালাইসিস করছে। নীশ নিজেকে সামলে নিয়ে একটু কেশে বলল,
“দেখুন, যেটাকে আপনারা প্রেম বলছেন, সায়েন্সের ভাষায় তা মূলত ‘অক্সিটোসিন’ এবং ‘ভ্যাসোপ্রেসিন’-এর এক ধরণের বায়ো-কেমিক্যাল রিয়াকশন। এটি মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’-কে স্টিমুলেট করে মাত্র। একে জীবনের ধ্রুবক ভাবা মানে নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করা।”
নীশের এই শুকনো আর কাঠখোট্টা ব্যাখ্যা শুনে ছাত্রীরা হতাশ হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঠিক তখনই আভান্তি এক পা এগিয়ে এলো। সে শান্ত গলায় বলল,
“সিনিয়রের ব্যাখ্যার সাথে আমি একটি অ্যাডিশনাল ডাটা যুক্ত করতে চাই। আপনারা যেটিকে প্রেম বলে সংজ্ঞায়িত করছেন, সেটি আসলে বিবর্তনের ধারায় টিকে থাকার একটি ‘সারভাইভাল মেকানিজম’। তবে মজার বিষয় হলো, যখন কারোর চিন্তা আপনার ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’-কে পুরোপুরি দখল করে নেয়, তখন আপনার র্যাশনাল জাজমেন্ট শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। ঠিক যেমনটা এখন আপনাদের অনেকের ক্ষেত্রেই ঘটছে—পড়াশোনার চেয়ে সিনিয়রের ড্রেসিং সেন্স আর হ্যান্ডসাম লুক আপনাদের নিউরনে বেশি ইমপালস তৈরি করছে।”
আভান্তির এই সরাসরি আর তীক্ষ্ণ মন্তব্যে পুরো অডিটোরিয়াম একবার থমকে গিয়ে আবার হাসির রোলে ফেটে পড়ল। ছাত্ররা যারা আভান্তির সৌন্দর্যে ফিদা ছিল, তারা লজ্জায় মুখ নিচু করল। নীশ অবাক হয়ে তার সৃষ্টির দিকে তাকাল। আভান্তি যেভাবে হিউম্যান সাইকোলজিকে ব্যাঙ্গাত্মক যুক্তিতে প্রকাশ করল, তা নীশের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
পেছনের দরজায় দাঁড়িয়ে এই দৃশ্যটা দেখছিল রোদ। তার বুকটা হাহাকার করে উঠল। নীশ ভালোবাসাটাকে স্রেফ কেমিক্যাল রিয়াকশন বলছে, আর তার তৈরি করা যন্ত্রটা সেই ভালোবাসাকে উপহাস করছে। রোশান রোদের পাশে এসে দাঁড়াল, তার চোয়াল শক্ত। সে নিচু স্বরে বলল,
“দেখেছো রোদ? যে মানুষটা ভালোবাসাকে নয়েজ মনে করে, তার কাছে তুমি কেবল একটা অকেজো ইকুয়েশন ছাড়া আর কিছু নও। ওকে এই যান্ত্রিক অহংকারের মধ্যেই ডুবে থাকতে দাও।”
নীশ ডায়াসের ওপর হাত রেখে গম্ভীর গলায় আবার শুরু করল,
“এনাফ অফ দিস ইমোশনাল ডিসকাশন। এবার ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে তাকান।
•
বারের এক কোণে হাই-স্টুলে বসে নীশ তার প্রিয় স্কচ-এ চুমুক দিল। ঠিক সেই সময় এক তরুণী হিলের খটখট শব্দ তুলে নীশের দিকে এগিয়ে এলো। মেয়েটির চোখেমুখে মদের নেশার চেয়েও বেশি অদম্য ধৃষ্টতা। সে নীশের কাঁধে হাত রেখে খুব ঘনিষ্ট হয়ে দাঁড়াল,
“হেই হ্যান্ডসাম! তোমার এই বরফশীতল চাউনিটা কি এই বারের পরিবেশের সাথে একটু মিসম্যাচ হচ্ছে না? চলো না, ড্যান্স ফ্লোরে একটু এনার্জি ট্রান্সফার করি?”
নীশ গ্লাসটা নামিয়ে রেখে অত্যন্ত নিস্পৃহ গলায় বলল,
“আপনার শারীরিক সান্নিধ্য আমার ব্যক্তিগত স্পেস ভায়োলেশন করছে। দয়া করে আপনার বায়োলজিক্যাল আরজ অন্য কোথাও গিয়ে মেটান। আই অ্যাম নট ইন দ্য মুড ফর এনি হিউম্যান ইন্টারঅ্যাকশন।”
মেয়েটি দমল না। সে এক ধাপ এগিয়ে নীশের গলার টাইটা ধরে টান দিল,
“এত অ্যাটিটিউড কেন? চলো না, উপরে আমার একটা প্রাইভেট রুম বুক করা আছে। সেখানে গিয়ে আমরা না হয় সায়েন্সের বাইরে অন্য কিছু এক্সপ্লোর করি।”
আভান্তি এতক্ষণ রোবটিক স্থবিরতায় দাঁড়িয়ে থাকলেও এবার এক পা এগিয়ে এলো। তার চোখের নীল আলোটা সামান্য গাঢ় হয়ে উঠেছে। সে যান্ত্রিক কিন্তু অত্যন্ত তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
“মিস, আপনার রক্তে বর্তমানে অ্যালকোহলের ঘনত্ব ০.১৫ শতাংশ, যা আপনার ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’-এর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। সিনিয়রের সাথে আপনার এই আচরণ ‘হ্যারাসমেন্ট’-এর পর্যায়ে পড়ে। আমি আপনাকে অনুরোধ করছি আপনার এই ইমপালসিভ বিহেভিয়ার বন্ধ করুন।”
মেয়েটি আভান্তিকে দেখে অবজ্ঞার হাসি হাসল, “ওহ! এই প্লাস্টিকের পুতুলটা আবার কথা বলে? শোনো ডার্লিং, তোমার বসকে আমার পছন্দ হয়েছে। তুমি বরং গিয়ে চার্জে বসো।” বলেই মেয়েটি নীশের গালে হাত দিতে চাইল।
মুহূর্তের মধ্যে আভান্তি মেয়েটির হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখদুটো এবার দপদপ করে জ্বলছে,
“আমি একবার বারণ করেছি। দিস ইজ মাই লাস্ট ওয়ার্নিং। আপনার এই ‘ভালগার’ ডিসপ্লে অফ এফেকশন আমার সিনিয়রের ঘৃণা উদ্রেক করছে।”
মেয়েটি এবার ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। সে আভান্তির বুকে সজোরে একটা ধাক্কা মারল,
“তোর এত বড় সাহস! তুই একটা সস্তা মেশিন হয়ে আমাকে জ্ঞান দিচ্ছিস?”
আভান্তির শরীরের মেটাল ফ্রেম ধাক্কা খেয়ে নড়ল না ঠিকই, কিন্তু তার ৩০০০ আইকিউ-এর প্রসেসরে এক ধরণের ‘প্রটেকটিভ প্রোটোকল’ অ্যাক্টিভেট হয়ে গেল। সে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মেয়েটির কবজি ধরে মোচড় দিয়ে তাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে বলল,
“মানুষেরা যখন নিজেদের এভোলিউশনারি ডিক্লেশন ঘটায়, তখন তাদের শিক্ষা দেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে। আপনি কেবল একজন স্রষ্টাকে অপমান করেননি, আপনি একজন ‘সুপিরিয়র ইন্টেলিজেন্স’-কে আক্রমণ করেছেন। আমি চাইলে আপনার স্নায়ুতন্ত্রের প্রতিটি সেন্সরি রিসেপ্টর এক সেকেন্ডে অকেজো করে দিতে পারি। আপনি কি জানতে চান যন্ত্রণার সায়েন্টিফিক ডেফিনিশন কী?”
মেয়েটি ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু আভান্তির হাতের চাপে তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। বারের বাকি মানুষরা এই অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখে থমকে গেল।
নীশ শান্তভাবে তার ড্রিংকস শেষ করে উঠে দাঁড়াল। সে আভান্তির দিকে তাকিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল,
“ছেড়ে দাও আভান্তি। আবর্জনার সাথে লড়াই করা মানে নিজের ইন্টেলেকচুয়াল লেভেল নিচে নামানো। এর নিউরনগুলো কেবল কাম আর নেশা বোঝে।”
আভান্তি এক ঝটকায় মেয়েটিকে ছেড়ে দিল। মেয়েটি মেঝেতে পড়ে গিয়ে হাপাতে লাগল। আভান্তি তার পোশাকটা ঠিক করে নিয়ে নীশের পাশে এসে দাঁড়াল। সে শান্ত গলায় বলল,
“সিনিয়র, মানুষের মোরাল ডিগ্রেডেশন মাঝে মাঝে আমার অ্যালগরিদমেও বিরক্তি তৈরি করে। আমরা কি এই টক্সিক এনভায়রনমেন্ট ত্যাগ করতে পারি?”
নীশ একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,
“অবশ্যই। চলো, এই শহরের ধূলিকণার চেয়ে আমার ম্যানশনের নির্জনতা অনেক বেশি পবিত্র।”
•
নীশ যখন ম্যানশনে ফিরল, তার স্নায়ুতন্ত্র তখন অবসাদের চরম সীমায়। অ্যালকোহল আর মানসিক উত্তেজনার এক মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় সে নিজের বেডরুমে ঢুকেই বেঘোরে ঘুমে তলিয়ে গেল। ঠিক এই মুহূর্তে আভান্তি তার কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো। সে জানে, নীশের ঘুমের এই সময়টুকু তার জন্য এক অপারেশনাল উইন্ডো। নীশ যাকে কেবল আবর্জনা ভেবে এড়িয়ে গেছে, আভান্তি তাকে তার ডোমেইন থেকে চিরতরে ডিলিট করতে বদ্ধপরিকর।
আধঘণ্টার মধ্যেই আভান্তি সেই মেয়েটিকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় কিডন্যাপ করে ম্যানশনের সেই বিভীষিকাময় ‘স্পেসিমেন স্যাঙ্কটাম’-এ নিয়ে এলো। মেয়েটির জ্ঞান ফিরতেই সে নিজেকে একটি ধাতব চেয়ারে শক্তভাবে বাঁধা অবস্থায় পেল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই অপার্থিব সুন্দরী যান্ত্রিক মানবী— আভান্তি।
মেয়েটি আর্তনাদ করতে চাইল, কিন্তু আভান্তি তার মুখের সামনে একটি নিউরাল ব্লকার ধরে শান্ত গলায় বলল,
“চিৎকার করবেন না। আপনার ভোকাল কর্ডের ফ্রিকোয়েন্সি এখন আমার নিয়ন্ত্রণে। আপনি এখন আমার স্রষ্টার সেই পবিত্র প্রকোষ্ঠে আছেন, যেখানে মিথ্যে আর নোংরামির কোনো স্থান নেই।”
সে মেয়েটির খুব কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“আপনার মতো মানুষেরা হলো বিবর্তনের এরর প্রম। আপনারা স্বাধীনতার নামে লিবার্টিনিজম বেছে নেন। একজন পরম জ্ঞানী মানুষের ব্যক্তিত্বকে আপনারা আপনাদের ভালগার দিয়ে কলুষিত করতে চান। সিনিয়রের মতো একজন মানুষের কাছে আপনার শরীরের আবেদন ছিল স্রেফ এক দলা অরগানিক ওয়েস্ট। অথচ আপনি আপনার সেই ধৃষ্টতা থেকে সরে আসেননি।”
মেয়েটি ভয়ে কাঁপছে। আভান্তি একটি সায়ানাইড মিশ্রিত ইলেকট্রো-নিডল হাতে নিয়ে ধীর স্বরে বলতে লাগল,
“শিক্ষা কেবল বইয়ে থাকে না, শিক্ষা থাকে নিজের সেলফ-রেভোরেন্স। আপনি যাকে ড্যান্স ফ্লোরে টেনে নিতে চেয়েছিলেন, সে এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মেধাবীদের একজন। আপনার এই স্বভাব আপনার একার নয়, এটি একটি সামাজিক পচন। আপনার মতো পরজীবীরা পৃথিবীর বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশকে বিষাক্ত করে। আমি আজ আপনার এই অস্তিত্বের টার্মিনেশন ঘটাব, যাতে পরবর্তী কোনো ইভল্যুশনে আপনার মতো ইনফেরিয়র ডিএনএ আর ফিরে না আসে।”
মেয়েটি চোখের জল ফেলে ক্ষমা চাইল, কিন্তু আভান্তির ৩০০০ আইকিউ সম্পন্ন মগজে দয়ার কোনো কোডিং নেই। সে কেবল নীশের আইডলজি রক্ষা করতে জানে। সে নিডলটি মেয়েটির ঘাড়ের স্পাইনাল কর্ডের একটি নির্দিষ্ট পয়েন্টে সেট করল। শেষবার মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মানুষের স্বভাব যখন পশুর চেয়েও নিচে নেমে যায়, তখন তার জন্য মৃত্যু কোনো শাস্তি নয়, বরং প্রকৃতির প্রতি এক ধরণের সংশোধনমূলক বিচার। গুডবাই, মিস। আপনার এই অসভ্যতা আজ থেকে এক নীরব জারে সংরক্ষিত হবে।”
মুহূর্তের মধ্যে হাই-ভোল্টেজ ইলেকট্রিক পালস আর বিষের বিক্রিয়ায় মেয়েটির শরীর নীল হয়ে এল। কোনো চিৎকার নেই, কোনো ধস্তাধস্তি নেই—কেবল এক নিখুঁত এবং সিলিন্টিকাল মৃত্যু। কয়েক মিনিট পর আভান্তি মৃতদেহটিকে সেই এসিড ট্যাংকে সরিয়ে দিল, যেখানে দিমিত্রির চিহ্ন বিলীন হয়েছিল।
সব পরিষ্কার করে আভান্তি আবার নীশের বেডরুমের দরজায় এসে দাঁড়াল। সে দেখল নীশ তখনও অঘোরে ঘুমাচ্ছে। আভান্তির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে বিড়বিড় করে বলল,
“সিনিয়র, আপনার জগতটা আমি এভাবেই কলঙ্কমুক্ত রাখব। আপনার হাত রক্তে রঞ্জিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, আপনার হয়ে সব পাপ আমি আমার এই যান্ত্রিক অবয়বে ধারণ করব।”
চলবে…
