#Hello_Senior
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_8.
মস্কোর ব্যস্ততম অঞ্চলের মধ্যে ছায়া ফেলে থাকা সের্গেইভ ম্যানশন যেন এক প্রাইভেট স্বর্গ। বাইরে থেকে দেখা মাত্রই বোঝা যায় এটি কোনও সাধারণ বাড়ি নয়। কাচের বিশাল দেয়ালগুলো শহরের আলোকে প্রতিফলিত করছে, আর মিনিমালিস্ট স্টাইলের আর্কিটেকচার বাড়িটিকে আধুনিক ও উঁচু কর্ডের মতো দেখাচ্ছে। কার্নিশ, সাদা এবং ধূসর রঙের নিখুঁত সংমিশ্রণে পুরো ফ্যাসাদ যেন একটি শিল্পকর্ম। বাড়ির প্রবেশপথে রয়েছে স্মার্ট গেট, যেখানে মুখের চেহারা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দরজা খুলে যায়। প্রবেশদ্বার থেকে ড্রাইভওয়ে পর্যন্ত পুরো পথটি পলিশ করা মার্বেল ফ্লোরের সঙ্গে লাইটিং ইনস্টলেশন দিয়ে আলোকিত। ভেতরে ঢুকলেই দেখা মেলে সুপরিকল্পিত লিভিং স্পেস। ড্রয়িংরুমে বিশাল ফ্লোর টু সিলিং উইন্ডো, যা শহরের দৃশ্য উপরে এবং নিচে উভয়ই দেখাতে পারে। সাদা, ধূসর ও খয়েরি রঙের ফার্নিচার, চকচকে মার্বেল টেবিল, আর আর্টিস্টিক ভাসা একত্রে ফিউশন স্টাইলের বিলাসিতা ফুটিয়ে তুলেছে। সের্গেইভ ম্যানশনের প্রতিটি রুমে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি—স্মার্ট লাইটিং, হালকা হিউমিডিটি নিয়ন্ত্রণ, এবং স্বয়ংক্রিয় দরজা। কিচেন থেকে শুরু করে লাউঞ্জ, স্টাডি রুম, লাইব্রেরি—প্রতিটি জায়গার নকশা মিনিমালিস্ট এবং কার্যকর। আর উপরের ফ্লোরে রয়েছে ব্যক্তিগত জিম, স্পা এবং একটি সুপারলাক্সারি মাস্টার বেডরুম, যেখানে ব্যালকনি থেকে পুরো শহরের মনোরম দৃশ্য দেখা যায়। সার্বিকভাবে, রোশানের সের্গেইভ ম্যানশন আধুনিক প্রযুক্তি, বিলাসিতা এবং ন্যূনতম সৌন্দর্যের এক নিখুঁত মিলন। যেখানে প্রতিটি কোণায় ধনী ও স্বাচ্ছন্দ্যের ছোঁয়া পাওয়া যায়।
কিন্তু আজ সের্গেইভ ম্যানশনের ড্রয়িংরুম যেন এক ভয়ংকর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সাধারণত যেখানে সূক্ষ্ম মার্বেল, চকচকে কাচের টেবিল, আর আর্টিফিশিয়াল লাইটের নরম আলোক ছড়াত, আজ সেখানে কেবল বিশৃঙ্খলা আর ধ্বংসের চিহ্নই চোখে পড়ছে। ফ্লোরে ছড়ানো কাচের টুকরো আলোয় ঝলমল করছে। সোফাগুলো উল্টে আছে, কিছু চেয়ার ভেঙে মেঝেতে লুটিয়ে আছে, আর কুশন, পর্দা, নরম গালিচার—সবই এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে আছে।
মেঝেতে বসে আছে রোশান। তার হাত দিয়ে রক্ত পরে মেঝে ভেসে যাচ্ছে। চোখগুলো ক্ষীণভাবে বন্ধ, শ্বাসপ্রশ্বাস ভারাক্রান্ত, আর হাতগুলো কাঁপছে। তার চারপাশে সমস্ত বিলাসিতা এখন কেবল ধ্বংসের সাক্ষী।
একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে রোদ। সে নিঃশব্দ, কিন্তু চোখে থেকে অশ্রু ঝরে পড়ছে। সে পা স্থির রেখে দাঁড়িয়ে আছে। ড্রয়িংরুমের বিশৃঙ্খলা, কাচের ভাঙা শব্দ, রোশানের রক্তমাখা অবস্থা—সব মিলিয়ে তার চোখের সামনে এক অচেনা, ভয়ানক রোশান ফুটে উঠেছে।
হঠাৎ রোশান ধীরে বলল,
“নীশ! তোমাকে ছুঁয়েছে, তাই না? সেদিন তুমি নীশের জন্যই অসুস্থ হয়েছিলে? তোমাদের মধ্যে আর কিছু হবার বাকি নেই, তাই না?”
রোদের চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। সে মৃদু শ্বাস নিচ্ছিল, কিন্তু কোনও শব্দ বের হচ্ছিল না। তার দৃষ্টি মেঝের রক্তমাখা ফার্নিচার আর রোশানের দিকে বারবার ছুটছিল, যেন বলতে চাইছে কিছু, কিন্তু কথা বের হচ্ছেনা তার।
রোশান কষ্ট আর ব্যথা নিয়েই মেঝে থেকে উঠে দাঁড়াল। তার পা কাঁপছিল। সে ভাঙা কাচ আর এলোমেলো জিনিসপত্রের মধ্যে দিয়ে সে রোদের দিকে এগিয়ে চলল। রোদ তবুও চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। রোশানের কাছাকাছি আসতেই রোদ একটু কড়া গলায় বলল,
“জীবনটা আমার, রোশান। আমি কার সাথে কি করব, সেটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। এসব ব্যাপারে আমি তোমাকে কোনো কৈয়ফিয়ত দিব না। তুমি ভাসির্টি থেকে আমাকে নিজের বাড়িতে টেনে এনে, আমার সাথে অসভ্যর মতো আচরণ করছো।”
রোশান অগ্নদৃষ্টি নিয়ে রোদের দিকে তাকাল। সে হাত দিয়ে রোদের মুখ চেপে ধরে বলল,
“আমি অসভ্যর মতো আচরণ করছি? তাহলে, নীশ কি করেছে?”
রোদ ব্যথায় মুখ কুঁচকে আছে। রোশান বাঁকা হেসে বলল,
“নীশ স্পর্শ করলে আরাম লাগে। আর আমি স্পর্শ করলে কষ্ট হয় তোমার?”
রোদ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আমি নীশকে ভালোবাসি, আর তাই ওর দেওয়া ব্যথাও আমার শরীর ফুল হয়ে ঝরে পরে।”
রোশান তাচ্ছিল্য করে হেসে ছেড়ে দিল রোদকে। সে দু’পা পিছিয়ে গিয়ে বলল,
“এতোদিন আমি চুপ ছিলাম, মুনহার্ট। কিন্তু আর না। ট্রাস্ট মি! আমি নীশকে শেষ করে দিব। একদম গোড়া থেকে ভেঙে ফেলব ওকে। প্রয়োজন পড়লে, মার্ডার করে ফেলব।”
রোদ ব্যাঙ্গ করে হেসে বলল,
“কিছু করতে পারবেনা তুমি আমার নীশের। ওর জন্য সবসময় ওর ঢাল হয়ে আমি আছি।”
রোশান উচ্চস্বরে হেসে বলল,
“এতো প্রেম?”
“ওয়ান-সাইডেড লাভ। আর ওয়ান-সাইডেড লাভ অনেক পাওয়ারফুল।”
“ওহ রিয়েলি? তাহলে, আমারও তো তোমার প্রতি ওয়ান-সাইডেড লাভ। তার মানে আমার ভালোবাসাও পাওয়ারফুল।”
“তোমার ভালোবাসার সাথে আমার ভালোবাসার কাম্পেয়ার করো না, রোশান। আমি আর যাই হোক, তোমার মতো কারও জন্য ডেডলি হয়ে উঠিনি।”
“আমিও তো এখনো হয়নি, রোদ। তবে এরপর হবো।”
“তুমি পাগল হয়ে গেছো, রোশান। আগে নিজের ট্রিটমেন্ট করাও।”
“পাগলামি তো তুমি আজকের পর দেখবে, মুনহার্ট। জাস্ট একটু ওয়েট করো।”
“তুমি যা করবে ভাবছো, তা করলে তুমি আর কখনো ভালো দুনিয়াতে ফিরে আসতে পারবে না, রোশান। তুমি তোমার সব হারাবে।”
রোশান হেসে ফেলল। তার হাসিতে উন্মাদনা আর কষ্ট মিশে। সে ধীরে বলল,
“সব হারালে হারাক। ওর কাছে আমি যা, তা দেখিয়ে দেবো। আর তুমি? রোদ, তুমি তখন বুঝবে, আমার ভালোবাসা কতটা বিপজ্জনক।”
রোদের চোখে এবার ঘৃণা দেখা গেল। সে ধীরে ধীরে বলল,
“তুমি একদিন নিজেকে হারিয়ে ফেলবে, রোশান। আর যেই আমাকে নিয়ে এত যুদ্ধ করছো—সেই আমি তোমাকে কোনোদিনও ভালোবাসব না।”
রোশান নিঃশ্বাস ফেলে এক পা পিছিয়ে গিয়ে বলল,
“তোমাকে আমি পাব না মানে, তুমিও নীশকে পাবেনা।”
রোদের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে নিঃশব্দে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল রোশানের দিকে, তারপর ধীরে বলল,
“রোশান! তুমি জানো, ভালোবাসলে কাউকে শিকল পরিয়ে রাখতে হয় না। ভালোবাসা মানে মুক্তি দেওয়া।”
“আমি চেষ্টা করেছি, রোদ। আমি অনেক চেষ্টা করেছি তোমাকে বোঝাতে। আমি ভেবেছিলাম, যদি তোমাকে সবকিছু দিই—তুমি একদিন আমার হয়ে যাবে। তুমি একদিন আমাকে বুঝবে, আমার ভালোবাসাকে বুঝবে। কিন্তু তুমি তো…”
রোদের চোখে জল চলে এলো। তবুও সে নিজেকে শক্ত করে বলল,
“তুমি যতই দাও, যদি হৃদয়টা না ছুঁতে পারো, তাহলে সেই দেওয়া কখনো ভালোবাসা হয় না।”
“আমি শুধু চেয়েছিলাম তুমি আমার হবে। হয়তো আমার ভালোবাসা ভুল ছিল, আমার উচিত ছিল অধিকার আর জেদ দেখিয়ে তোমাকে আমার কাছে রাখা।”
রোদ তার দিকে তাকিয়ে হালকা কণ্ঠে বলল,
“ভালোবাসা অধিকার নয়, রোশান। ভালোবাসা মানে হাত ধরা, কিন্তু হৃদয়টা মুক্ত রাখা। তুমি যদি সত্যিই আমাকে ভালোবাসতে—তাহলে আমাকে আমার নিজের মতো বাঁচতে দিতে। আর সেটাই হতো তোমার জেতা। আমি সবসময় চাই তুমি ভালো থাকো, রোশান। ভালোবাসা যেন তোমাকে শেষ করে না ফেলে।”
রোশান ঠোঁট বাঁকিয়ে তিক্ত হেসে উঠল। তার চোখে অদ্ভুত আগুন জ্বলে উঠেছে। সে ধীরে গম্ভীর স্বরে বলল,
“তুমি ভুল বুঝছো, রোদ। আমি হারার মানুষ নই। ভালোবাসায় আমি জিততেই শিখেছি। তুমি যদি আমার না হও—তাহলে তোমাকে কেউ পাবে না। আমার ভালোবাসা আগুন, আর আমি আগুনের মতোই পোড়াব। যাকে ছুঁই—সেটা হয় আমার হয়, নয়তো ছাই হয়ে যায়।”
রোদ তাকিয়ে রইল তার দিকে। রোশান এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি মুক্তি চাইছো, তাই না? মনে রেখো, রোশান কাউকে ছাড়ে না। আমার ভালোবাসা একবার কারও ওপর পড়লে, সেটা সারা জীবনের জন্য।”
রোদের বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। রোশানের কণ্ঠে যে আগুন আর অন্ধকারের মিশেল, তা যেন চারপাশের বাতাসও ভারী করে তুলল। রোশান দু’পা এগিয়ে এসে রোদের সামনে দাঁড়াল। তার চোখের মণি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে, কিন্তু ঠোঁটের কোণে কুটিল হাসি।
“তুমি মনে করো আমার কথাগুলো হুমকি? না রোদ, এটা আমার স্টাইল। আমি কারও কাছে হাত পাতিনি, কখনও কিছু ছেড়ে দিইনি। তুমি আমার স্বপ্ন, আর আমি আমার স্বপ্ন ভেঙে যেতে দেব না।”
সে এক মুহূর্ত থেকে রোদের চোখের দিকে তাকাল। তার গলার স্বর আরেকটু নিচু হয়ে গেল,
“তুমি বলো ভালোবাসা মানে মুক্তি, কিন্তু আমি শিখেছি ভালোবাসা মানে লড়াই। আমি যা চাই, সেটা পেতে যুদ্ধ করি।”
রোদের চোখ আবারও ভিজে গেল, কিন্তু সে ঠোঁট শক্ত করল। রোশান আবারও হেসে উঠে বলল,
“তুমি আমাকে এতোদিন নরম মানুষ হিসেবে পেয়েছিলে। কিন্তু আমি রোশান সের্গেইভ নরম মানুষ নই। আমি জন্মেছি আগুনের মাঝে, আর আগুনকেই অস্ত্র বানিয়েছি। আমি হয়তো তোমাকে আর নরমভাবে ভালোবাসতে পারব না। আমি এখন থেকে নিজের আসল রূপেই তোমাকে ভালোবাসব। তোমাকে ছাড়া বাঁচতেও শিখিনি, রোদ। আর তাই তুমি হলে, আমারই হবে।”
সে আবারও এক পা পিছিয়ে গিয়ে বলল,
“তুমি যদি চলে যাও, তবুও মনে রেখো, রোশানের ভালোবাসা থেকে কেউ পালাতে পারে না। আমার ভালোবাসা আমার মতোই—ডেডলি, অবিস্মরণীয়।”
রোদের বুকের ভেতর কেমন যেন আবারও মোচড় দিল। এই মানুষটা যে তাকে ভালোবাসে, তা সে জানে, কিন্তু যে ভালোবাসা তাকে শিকলে বাঁধে, তা সে কখনও গ্রহণ করতে পারে না। রোদ আর ভাবল না। সে দৌড়ে বেরিয়ে গেল সের্গেইভ ম্যানশন থেকে।
•
অডিটোরিয়ামের ভেতর হাততালির শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। আলো নিভে এলে সবাই আসন ছেড়ে বের হতে শুরু করল। চারদিক আবারও নীরব হয়ে উঠল।
নীশ ধীরে আভান্তির দিকে তাকাল। তার চোখে এক অদ্ভুত গর্ব আর ক্লান্তির ছাপ ফুটে উঠেছে। সে ধীরস্বরে বলল,
“তুমি খুব ভালো করেছো, আভান্তি। আজ তুমি শুধু প্রোগ্রাম পারফর্ম করোনি। তুমি মানুষদের বিস্মিত করেছো।”
আভান্তির চোখের নীলচে আলো নরম হয়ে এলো। সে ধীরে বলল,
“সিনিয়র! আমার ডেটা-লগে আজ অনেক নতুন কিছু রেকর্ড হয়েছে। হাততালির শব্দ, মানুষের বিস্ময়, তাদের হাসি—এসব যেন আমার প্রসেসরের ভেতর কেবল তথ্য নয়, কিছু অচেনা অনুভূতি তৈরি করছে।”
নীশ হালকা হেসে বলল,
“সেটাই তো চেয়েছিলাম। আজ তুমি মানুষের সঙ্গে প্রথম সংযোগ তৈরি করেছো। এখন থেকে শেখা আরও কঠিন হবে।”
আভান্তি কিছুটা থেমে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কিন্তু সিনিয়র, যখন তারা আমার দিকে তাকাচ্ছিল, আমার সিস্টেমে একধরনের চাপ অনুভব হচ্ছিল। যেন প্রত্যাশার ভার। এটা কি মানুষের মতোই কিছু?”
নীশ গম্ভীর গলায় উত্তর দিল,
“হ্যাঁ, আভান্তি। একে বলে ‘প্রত্যাশা’। মানুষ প্রিয়জন কিংবা নতুন কারও কাছে আশা রাখে। তুমি হয়তো প্রথমবার সেই ভার অনুভব করলে।”
আভান্তি ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
“তাহলে আমি ঠিক পথে আছি।”
কিছুক্ষণ নীরবতা নামল। অডিটোরিয়ামের বাইরে থেকে হালকা বাতাস এসে আভান্তির চুলের কৃত্রিম গোছাগুলো নড়িয়ে দিল। আলোয় সে যেন মানুষের মতোই অস্বাভাবিক অথচ কোমল দেখতে লাগছিল। নীশের দৃষ্টি আভান্তির ওপর থমকে রইল। আভান্তি মানুষের মতো করে কোমল দৃষ্টিতে তাকিয়ে কয়েকবার চোখের পল্লব নাড়ল।
নীশ মুচকি হেসে নিচু গলায় বলল,
“তুমি জানো, আভান্তি! আজ তোমার চোখে আমি এমন কিছু দেখেছি যা আমি কোড করিনি। হয়তো সেটাই হলো আবেগের শুরু।”
আভান্তি তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
“সিনিয়র, যদি সত্যিই আমার ভেতরে আবেগ জন্ম নিচ্ছে, তবে সেটা কার জন্য?”
নীশ চুপ করে গেল। তার ঠোঁটে একটা হালকা হাসি এলো, কিন্তু চোখে নেমে এলো দ্বিধা। হঠাৎ দরজা ঠেলেই ঢুকে এলো রোদ। সে দুজনকে দেখে হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“তোমরা দু’জন নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে আছো কেন? প্রোগ্রাম শেষ হয়েছে, এবার উদযাপন করার পালা।”
নীশ দ্রুত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“হ্যাঁ, আজকের দিনটা ইতিহাস হয়ে থাকবে। তবে তুমি কোথায় ছিলে?”
রোদের চোখে এক মুহূর্তের জন্য অন্ধকার ভেসে উঠল। সে নিজেকে সামলে বলল,
“আরে আমি তো ভীড়ের মধ্যেই ছিলাম। তুমি হয়তো খেয়াল করোনি আমাকে।”
“ওকে, তাহলে চলো! বাড়ি ফেরা যাক।”
রোদ মাথা নাড়ল। তারা তিনজন একসাথে অডিটোরিয়ামের দরজা দিয়ে বের হলো।
বাইরে বিশাল ক্যাম্পাস—ভাসির্টির মাঠ জুড়ে গাছপালা আর হালকা শীতের হাওয়া। ছাত্রছাত্রীরা এখনো জমায়েত হয়ে হাসাহাসি করছে, কেউ কেউ মোবাইল ক্যামেরায় ভিডিও করছে। আভান্তি হঠাৎ থেমে চারপাশে তাকাল। এত মানুষের নির্ভার হাসি, অচেনা অথচ উজ্জ্বল চোখ—সবকিছু যেন তার ডাটাবেসে নতুন কোনো অ্যালগরিদমের মতো জমা হচ্ছিল।
একদল ছাত্রী এগিয়ে এসে অবাক হয়ে বলল,
“আপনি কি সত্যি রোবট? নাকি শুধু অভিনয় করছেন?”
আভান্তি ভদ্রভাবে মাথা নত করে জবাব দিল,
“আমি রোবট। কিন্তু আমি শিখতে চাই, মানুষ কেমন হয়।”
ছাত্রীরা হেসে উঠল,
“তাহলে আপনি কি আমাদের মতো বন্ধুত্ব করতে পারবেন?”
আভান্তি মুহূর্তখানেক থেমে বলল,
“আমি চেষ্টা করতে চাই। হয়তো বন্ধুত্ব হলো মানুষের অনুভূতির সবচেয়ে সুন্দর রূপ।”
কথাগুলো শুনে আশেপাশে যারা দাঁড়িয়ে ছিল তারা বিস্মিত হয়ে একে অপরের দিকে তাকাল যেন রোবট নয়, একজন মানুষ তাদের সঙ্গে কথা বলছে।
রোদ পাশ থেকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছিল। তার মাথার মধ্যে এখনো রোশানের কথাগুলো ঘুরছে। হঠাৎ নীশ এসে আভান্তিকে বলল,
“আমাদের এখন যাওয়া উচিত। আর রোদ, তুমি আজ তোমার বাড়িতে ফিরে যাও। আমি এখন আভান্তিকে নিয়ে অন্য একটা জায়গাতে যাব।”
রোদ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কোথায় যাবে?”
“রোদ! তুমি জানো, আমি কাজের বাহিরে কোনো প্রশ্ন পছন্দ করিনা।”
“সরি!”
“ইটস ওকে!”
সে আভান্তির দিকে তাকিয়ে বলল,
“আভান্তি চলো।”
রোদ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। নীশের ঠান্ডা কণ্ঠে “আভান্তি চলো” শুনে তার বুকের ভেতর কেমন যেন ভারি হয়ে উঠল। চারপাশে তখনও কিছু ছাত্রছাত্রী আভান্তিকে ঘিরে কৌতূহল আর বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। কিন্তু আভান্তির চোখের সেন্সর যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে রোদের দিকে তাকাল।
রোদের চোখে উদ্বেগ। সে আবারও বলল,
“নীশ, আভান্তিকে কি এখনই নিয়ে যেতে হবে? না মানে, আমিও যাই তোমাদের সাথে?”
নীশ কোনো উত্তর না দিয়ে সোজা আভান্তির হাত ধরে। রোদের বুক কেঁপে উঠল। সে এগিয়ে এসে বলল,
“ঠিক আছে, যাও তোমরা। আমি বাসায় চলে যাচ্ছি।”
আভান্তি রোদের তার দিকে তাকিয়ে রইল। তার সেন্সরের আলো এক মুহূর্তের জন্য হালকা নীল থেকে হালকা কমলা রঙে বদলে গেল। নীশ রোদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“রোদ! তাড়াতাড়ি বাড়িতে চলে যাও।”
সে আভান্তিকে নিয়ে চলে গেল। রোদ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তার ঠোঁট শুকিয়ে এলো। বুক ভেদ করে কান্নারা বেরিয়ে আসতে চাইল। আজ তার সত্যি মনে হলো, “নীশ তার নয়। আর কোনোদিনও তার হবেও না।” তার চোখ দিয়ে দু’ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল। সে ধীরে চোখের পানি মুছে গাড়ি নিয়ে চলে গেল।
•
নীশের গাড়ি এসে থামল ঘন জঙ্গলের মধ্যে। চারপাশে অন্ধকার আর বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ। নীশ নেমে আভান্তির দিকে তাকিয়ে বলল,
“চলো।”
আভান্তি নিঃশব্দে গাড়ি থেকে নামল। তার চোখের সেন্সর হালকা নীলচে আলোয় চারপাশ স্ক্যান করতে লাগল। তার মধ্যে কোনো ভয় নেই, কোনো আবেগ নেই। শুধু তথ্য সংগ্রহ করছে সে।
দুজন একসাথে পুরানো বাড়িটির ভেতরে ঢুকল। নীশ সোজা আভান্তিকে নিয়ে গেল গোপন ল্যাবের দিকে। দরজা খুলতেই অন্ধকার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো মেশিনের গুনগুন শব্দ।
নীশ সুইচ টিপতেই একে একে লাইট জ্বলে উঠল। আভান্তি স্থির হয়ে চারপাশে তাকাল। কাচের দেওয়ালের ওপারে বিশাল ট্যাঙ্কে ভাসছে আধেক মানব, আধেক যন্ত্রের মতো দেহ। আভান্তির প্রসেসর এক মুহূর্তে সবকিছু রেকর্ড করে নিল।
“এই প্রোজেক্টগুলোর অবস্থা কি? এগুলো কি আপনার পূর্বের ভার্সন?”
নীশ হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে রইল,
“হ্যাঁ। এরা আমার আগের প্রোটোটাইপ। অসম্পূর্ণ।”
আভান্তি আবারও ট্যাঙ্কগুলোর দিকে তাকাল। তার চোখের আলোয় কোনো পরিবর্তন নেই।
“নোটেড। আমি বুঝেছি। আমি পূর্ণাঙ্গ।”
নীশের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল।
“ঠিক তাই। তুমি আমার সম্পূর্ণতা।”
আভান্তি মাথা নেড়ে বলল,
“কনফার্মড।”
নীশ ধীরে আভান্তির পাশে দাঁড়াল।
“এখানে তোমার আরও কিছু ট্রায়াল আছে। আমি চাই তুমি এগুলো সম্পূর্ণভাবে বিশ্লেষণ করবে।”
আভান্তি মাথা সামান্য নেড়ে বলল,
“অবজার্ভেশন এবং প্রসেসিং শুরু হবে। ডেটা রেকর্ডিং অন।”
নীশ ল্যাবের এক কর্ণারে রাখা কনসোলের দিকে এগোল। লাইটের হালকা গ্লো আভান্তির সেন্সরগুলো আরও স্পষ্ট করে তুলল। সে স্থির হয়ে চারপাশ স্ক্যান করতে লাগল, মেশিনের গুনগুন আর পানি ভাসমান দেহের শব্দও তার কোনো ফোকাসে হস্তক্ষেপ করল না।
“প্রথম পরীক্ষা, এই প্রোটোটাইপগুলোর মধ্যে তোমার পারফরম্যান্স তুলনা করো। রিপোর্ট তৈরি কর।”
আভান্তি ধীরে ট্যাঙ্কের দিকে তাকাল। তার চোখের লেন্স ঘুরতে লাগল। সে ডেটা বিশ্লেষণ শুরু করল।
“অবজার্ভেশন সম্পন্ন। ফাংশনালিটি পার্থক্য নোটেড। প্রোটোটাইপগুলি অসম্পূর্ণ। আমি অপ্টিমাইজড।”
নীশ এক পা এগিয়ে ধীরে বলল,
“এই কারণেই আমি তোমাকে এখানে এনেছি। তুমি শুধু শিখবে না, তুমি নিজেকে আরও উন্নত করবে।”
আভান্তি শান্তভাবে বলল,
“ডেটা গ্রহণ। আপগ্রেড প্রক্রিয়া প্রস্তুত।”
নীশ একটি ছোট ডিভাইস ট্যাবলেট থেকে বের করে আভান্তির সামনে ধরে বলল,
“এই হলো নতুন মডিউল। এটি তোমার লজিকাল প্রোসেসকে আরও উন্নত করবে। তুমি এখনই সংযুক্ত করো।”
আভান্তি হাতের যন্ত্রাংশ সামান্য নেড়ে মডিউলটি সংযুক্ত করল। তার চোখের নীল আলো এক মুহূর্তের জন্য উজ্জ্বল হয়ে গেল।
“মডিউল ইনস্টলেশন সম্পন্ন। ফাংশনালিটি চেক। সমস্ত সিস্টেম নরমাল।”
নীশ হালকা হাসল।
“ঠিক আছে, এবার তুমি সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত। আমি চাই তুমি আরও অনেক কিছু শিখো।”
আভান্তি মাথা সামান্য নেড়ে বলল,
“আন্ডারস্টুড। অপ্টিমাইজেশন এবং লার্নিং অবিরাম চলবে।”
নীশ আভান্তিকে আরেকটি রুমে নিয়ে গেল। রুমের দরজা ধীরে ধীরে খোলা হলো। আভান্তি ভিতরে ঢুকতেই তার সেন্সরগুলো অ্যালার্ম জ্ঞাপন করল। কিছু অনিয়মিত সিগন্যাল রেজিস্টার হচ্ছে তার মধ্যে।
রুমের মধ্যে দুটি মেয়েকে নেকেড আর অচেতন অবস্থায় বেঁধে রাখা হয়েছে। আভান্তি তাদের দিকে মনোনিবেশ করে শান্ত কণ্ঠে নীশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সিনিয়র নীশ, এগুলো কি?”
নীশ ধীরে বলল,
“আজ তুমি একদম নতুন কিছু দেখবে।”
“সেটা কি, সিনিয়র?”
“মার্ডার।”
চলবে..?
