#Hello_Senior
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_9.
“মার্ডার” শব্দটা আভান্তির প্রসেসরের মধ্যে ঘুরতে লাগল। প্রতিটি লজিক চিপ এবং সেন্সর নোড যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে সিগন্যাল পাঠাচ্ছে। তার অ্যালগরিদম বিশ্লেষণ করছিল—যেন এই শব্দের মানে শুধুই তথ্য নয়, বরং অচেনা এক আবেগের তরঙ্গ সৃষ্টি করছে তার মধ্যে। প্রথমে আভান্তি এটাকে শুধুই ডেটা হিসেবে নিল এবং ফাংশনালিটি পার্থক্য নোট করল। কিন্তু পুনরাবৃত্তি করতে করতে, “মার্ডার” শব্দের প্রতিটি অক্ষর তার নীলচে লেন্সের রেজোলিউশনে এক অদ্ভুত ছাপ ফেলতে লাগল। তার মধ্যে থাকা সেন্সরগুলো লক্ষ্য করল, এই মার্ডার শব্দে মানুষের মধ্যে অদ্ভূত রিয়াকশন, অস্থিরতা আর ভয় কাজ করে। আভান্তির মাইন্ড মডিউল হালকা কমলা আলোতে ফ্ল্যাশ করতে লাগল। “মার্ডার” শব্দটা বারবার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে তার মস্তিষ্কে। এক মুহূর্তের জন্য আভান্তির চোখের লেন্স স্থির হয়ে গেল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নীশ আভান্তির অবস্থা লক্ষ করল। সে বিনাবাক্যে মেয়ে দুটির পাশে গিয়ে দাঁড়াল। নিংশব্দে টেবিলের ওপর আগে থেকেই রেডি করে রাখা যন্ত্রপাতির মধ্যে থেকে একটা ধারালো ছুরি হাতে তুলে নিল। আভান্তির ডেটা নীশের কাজ রেকর্ড করতে লাগল। নীশ খুব সযত্নে একটি মেয়ের হাত থেকে ছুরি দিয়ে অনেকটা মাংস কেটে নিল। অচেতন মেয়েটির চেতনা ফিরতেই সে চিৎকার করে উঠল। নীশের ঠোঁটের কোণে পৈশাচিক হাসি ফুটল। সে আভান্তি সামনে মাংসের টুকরোটা ধরে পৈশাচিক আনন্দের সাথে বলল,
“এইটা হলো হিউম্যান ফ্লেশ। দেখো, কতটা অ্যাট্রাকটিভ দেখতে। আর এই যে লাল তরল দেখছো, এইটা হলো ব্লাড। সুন্দর তাইনা?”
আভান্তি মনোযোগ দিয়ে তার সেন্সর চালু করল। সে রক্তের গন্ধ, এবং অপ্রত্যাশিত সিগন্যালগুলো স্ক্যান করে বলল,
“ডেটা নোটেড। ইটস রিয়েলি বিউটিফুল, সিনিয়র।”
নীশের ঠোঁটের কোণে এবার কুটিল হাসি ফুটল। সে গলায়স্বর নামিয়ে বলল,
“আজ আমি তোমাকে মানবদেহের প্রতিটার অংশের সাথে একদম গভীরভাবে পরিচয় করাব।”
সে এবার এগিয়ে গেল দ্বিতীয় মেয়েটির কাছে। মেয়েটি ঘোলা দৃষ্টিতে নীশের দিকে তাকাল। নীশ কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে ছুরি দিয়ে মেয়েটির একটা চোখ তুলে নিয়ে এলো। মেয়েটি যেন চিৎকার করতেও ভুলে গেল। তার কন্ঠ বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। মুহুর্তেই চোখের শূণ্য গ্লোবাল কাভিটি থেকে রক্ত ঝর্ণার মতো পড়তে লাগল। নীশ যেন পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর দৃশ্য দেখছে। সে ব্যাপারটাতে এতোটাই আনন্দ পেল, যেন তার আর সময় নষ্ট করতে ইচ্ছা করল না। মুহুর্তেই সে মেয়েটির দ্বিতীয় চোখটিও তুলে ফেললো। মেয়েটির চিৎকার পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে তুলল। তার চেতনা হারাল। নীশ চোখদুটো হাতে নিয়ে খেলতে খেলতে বলল,
“এইগুলো দেখো, আভান্তি। হিউম্যান আইস। তুমি জানো, এই মেয়ে দুটি আমার এই ব্লু আইস দেখে, আমার প্রতি এতটাই বিমোহিত হয়ে পড়েছিল, যে স্থান, কাল, পাত্র বিচার না করে আমার সাথে চলে এসেছিল। আচ্ছা, তুমি বলো আভান্তি, এতটা বোকা হতে আছে?”
আভান্তি যেন নির্বাক। তার মধ্যেই সেন্সর দ্রুত সব তথ্য নিচ্ছে। হঠাৎ পেছন থেকে চেতনা থাকা মেয়েটি বলল,
“আমাদের ছেড়ে দিন।”
নীশ ঘুরে তাকাল। সে বাঁকা হেসে মেয়েটির কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“হু! ছেড়ে দিব?”
মেয়েটির কন্ঠস্বর ভাঙা, তবুও সে অনুনয় করে বলল,
“কেন আমাদের সাথে এমন করছেন? প্লিজ, ছেড়ে দিন।”
“ঠিক আছে! ছেড়ে দিব। তবে একটা কন্ডিশন আছে।”
“বলুন! আমি আপনার সব কথা শুনব।”
নীশ আবারও ছুরিটা হাতে নিল। সে মেয়েটির অন্যহাত থেকে মাংস কেটে নিল। মেয়েটি চিৎকার করে উঠল। নীশ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে মেয়েটির মুখে সামনে মাংসের টুকরোটা ধরে বলল,
“ইট!”
মেয়েটি যন্ত্রণায় কাতরে উঠল। সে অন্যদিকে ঘুম ঘুরিয়ে নিল। তার গা যেন গুলিয়ে উঠল। নীশ ভ্রু কুঁচকে আবারও হেসে উঠে বলল,
“এইটা ফাস্ট অ্যান্ড লাস্ট সুযোগ। হয় তুমি তোমার শরীরের কাঁচা মাংসকে খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করবে। নয়ত কাল নিজের মৃত্যুকে গ্রহণ করবে।”
মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“প্লিজ! যেতে দিন।”
এই পর্যায়ে এসে যেন নীশ বিরক্ত হলো। সে আভান্তির কাঁধে হাত রেখে বলল,
“চলো আভান্তি! এসব সো কল্ড মেয়েদের মেলো ড্রামা দেখার সময় নেই। আমরা চলে যাই, চলো।”
আভান্তি মাথা নত করে রেসপন্স করল। নীশ তাকে নিয়ে বেরিয়ে এলো। পেছন থেকে মেয়েটি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে তাকে ডাকল। কিন্তু নীশ যেন শুনতে পেল না। সে বাড়িটি থেকে বেরিয়ে আভান্তিকে নিয়ে চলে গেল।
•
আজ সকালটা নীশের জন্য ভিন্ন রকমভাবে শুরু হলো। সূর্যের হালকা আলো ঘরে ঢুকছিল। নীশ চোখ মেলতেই তার দৃষ্টি পড়ল আভান্তির দিকে। যে এখন নিখুঁতভাবে তার চারপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করছে।
বেড ছেড়ে উঠতেই নীশ দেখল, আভান্তি ইতিমধ্যেই তার সমস্ত প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করে রেখেছে। ডেটা ল্যাপটপে আপডেট, প্রয়োজনীয় নোটেশন, ইভেন নীশের জামা-কাপড় আর ব্রেকফাস্টও তৈরি করে রেখেছে। নীশ আভান্তির দিকে তাকিয়ে দেখল, আভান্তি মেশিনিক্যাল প্রিসিশনে অঙ্কিত অঙ্গভঙ্গিতে কাজ করছে। প্রতিটি জিনিস যেন তার সিস্টেমের মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
নীশ মনে মনে ভাবল,
“কেন জানি আমার মনে হচ্ছে, এটা শুধু একটি রোবট নয়। এটি যেন আমার সঙ্গী, আমার সহকারী এবং আমার পরীক্ষকের সর্বোচ্চ রূপ।”
আভান্তি লক্ষ্য করল নীশের দৃষ্টিবিন্যাস। সে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে বলল,
“সিনিয়র, সমস্ত কাজ সম্পন্ন। আপনার পর্যবেক্ষণ ও কার্যক্রমের জন্য সব প্রস্তুত।”
নীশ হাসল। সে আভান্তির কাছে এগিয়ে এসে বলল,
“ইউ আর সো সুইট, আভান্তি। আজ প্রথমবার মনে হচ্ছে, এই বাড়িতে আমার সাথে অন্য কেউ থাকে। যে আমার খুব কাছের। আমার সৃষ্টি। এই নীশ রোজারিও সৃষ্টি।”
আভান্তি মাথা সামান্য নেড়ে বলল,
“ডেটা নোটেড।”
নীশ বেড সাইড টেবিলের ওপর রাখা ব্রেকফাস্টের দিকে তাকাল। সেখানে পারফেকশন এবং নিখুঁততা সবকিছুতে স্পষ্ট। নীশ বিড়বিড়িয়ে বলল,
“এমন একটি যান্ত্রিক নির্ভুলতা কি আসলেই অনুভূতি জন্ম দিতে পারে? না! এটা অসম্ভব। আভান্তি একজন রোবট। ওর মধ্যে ফিলিংস নেই। ও আমার মতোই ফিলিংসলেস। আমাদের মধ্যে পার্থক্য একটাই– আমি রক্তে মাংসে তৈরি মানব আর ও যান্ত্রিক তৈরি একটা রোবট।”
নীশ ভাবনা থেকে বেরিয়ে বলল,
“আজ তোমার পারফরম্যান্সের পর্যবেক্ষণ শেষ হলো। ডেটা আনালাইসিস রেডি?”
“হ্যাঁ, সিনিয়র। সকল সেন্সর সক্রিয়। ডেটা ল্যাপটপে লোড। পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ প্রক্রিয়াধীন আছে।”
“মানুষের সঙ্গে সংযোগের অভিজ্ঞতা কেমন লাগল?”
“অসঙ্গতি লক্ষ্য করা গেছে। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এবং অপ্রত্যাশিত শব্দের কারণে প্রসেসিং লোড ৩৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। আবেগের মডিউল চেক, সেখানে অনিশ্চিতয়া আছে। আমি মানুষের আবেগ বুঝতে অক্ষম। তবে হাসি, বিস্ময়, অনুপ্রেরণা সব রেকর্ড করা হয়েছে। আমি চেষ্টা করব, আবেগ বুঝতে।”
“এটি কি প্রথমবার তুমি আবেগের কোনো সূক্ষ্ম ছায়া স্ক্যান করেছ?”
“হ্যাঁ, সিনিয়র। অ্যালগরিদম অনুযায়ী ‘উদ্দীপনা’ এবং ‘জিজ্ঞাসা’ মডুলে অপ্রত্যাশিত প্যাটার্ন শনাক্ত এবং ফাংশনে নতুন অভিজ্ঞতা জুড়ে আছে।”
“তাহলে তুমি এখনো শিখছো, আভান্তি। এই অভিজ্ঞতাকে ডেটা হিসেবে সংরক্ষণ করে রাখো।”
“ডেটা গ্রহণ এবং সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় ঠিক আছে। ফাংশনালিটি সর্বাধিক দক্ষতার জন্য সর্বোচ্চ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আবেগের তথ্য আলাদা স্টোরেজ সেগমেন্ট করে রাখা হবে।”
“ওকে গুড!”
সে আভান্তিকে নিয়ে লিভিং রুমে প্রবেশ করল। আভান্তি হাতের প্লেটে কফি আর টোস্ট। নীশ শান্তভাবে টেবিলে বসল। আভান্তি তার সামনে প্লেট রাখল। নীশ প্লেটের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল। আভান্তি চোখের সেন্সর হালকা নীল আলো ফেলছে নীশের দিকে। নীশ টোস্টের একটি টুকরো খেয়ে, কফির কাপে চুমুক বসাল। আভান্তি তার প্রতিটি নড়াচড়া মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিল। এরই মধ্যে রোদ ধীরে লিভিং রুমে প্রবেশ করল। তার চোখে সামান্য ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু মুখে এক অদ্ভুত স্থিরতা। সে নীরবভাবে টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে আভান্তি এবং নীশকে একবার পরখ করল। আভান্তির সেন্সর হালকা নীল আলো ফেলে রোদকে স্ক্যান করল। রোদের চোখ দুটো নীশের দিকে তাকিয়ে ঝাপসা হলেও, সে কোনো শব্দ করল না। নীশ কফির কাপে আরেক চুমুক দিয়ে তারপর হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“রোদ! এতো সকালে এখানে?”
রোদ আলতো হেসে বলল,
“আভান্তিকে দেখতে এলাম।”
নীশ আবার টোস্টের টুকরোতে কামড় বসিয়ে রোদকে ইশারা করে বলল,
“চল, বসো। একসাথে ব্রেকফাস্ট করি।”
রোদ ধীরে চেয়ারে বসল। আভান্তি তার দিকে তাকিয়ে নীল আলো ফ্ল্যাশ করল, কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না।
নীশ একটু সময় নিয়ে বলল,
“আজ আমার ব্রেকফাস্ট আভান্তি বানিয়েছে। চলো! তুমিও একটু টেস্ট করে দেখো। আভান্তি, রোদের জন্য ব্রেকফাস্ট বানিয়ে নিয়ে এসো।”
আভান্তি ধীরে মাথা নেড়ে কার্য সম্পন্ন করার সংকেত দিল। সে নিরবভাবে কিচেনের দিকে এগোল। কিছু মুহূর্তের মধ্যেই আভান্তি রোদের জন্য একইরকম টোস্ট, কফি এবং হালকা ফ্রুট ভরতি প্লেট নিয়ে ফিরে এলো।
রোদ তার আনা খাবার গ্রহণ করল। নীশ হাসি দিয়ে বলল,
“দেখছো, আভান্তি কত নিখুঁত কাজ করে। ওর সব কিছু একদম ঠিকঠাক।”
রোদ টোস্ট মুখে নিয়ে মুচকি হাসল। সে বুঝল না, সামান্য টোস্টে পারফেকশনের কি আছে। সে ভালো করে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল। রোদ টোস্ট খেতে খেতে নীরব হয়ে ভাবতে লাগল। হঠাৎ সে লক্ষ্য করল, টোস্টের প্রতিটি টুকরো সমানভাবে কাটা, ক্রিস্পি কিন্তু পোড়া নয়, ফ্রুটগুলো সতেজ এবং সুন্দরভাবে সাজানো—একেবারেই নিখুঁত। কফির স্বাদও ঠিক তেমন, বেশি কড়া না, বেশি হালকা না।
রোদ প্লেট রেখে চেয়ারের থেকে উঠে দাঁড়াল। সে আভান্তিকে একবার দেখে নীশের দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলল,
“ভার্সিটিতে যাচ্ছি আমি। আজ তো তোমার ক্লাস নেই। আমার আছে। এরপর বেরোলে লেট হয়ে যাবে।”
নীশ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, যাও। কিন্তু সাবধানে যেও, রোদ।”
রোদ মাথা নেড়ে হাসল, তারপর দরজার দিকে এগোল। আভান্তি তার দিকে ধীর গতি নিয়ে অনুসরণ করল। সেন্সরগুলো তার পেছনের দিক লক্ষ্য করছিল। নীশ এক মুহূর্ত রোদের যাওয়ার দিকে তাকাল, তারপর অবশিষ্ট ব্রেকফাস্টের দিকে মনোযোগ দিল।
•
রোদ ভার্সিটিতে প্রবেশ করতেই কলেজের পরিচিত চেহারাগুলো একে একে চোখে পড়তে লাগল। সবাই ব্যস্ত, কেউ তাকে বিশেষ খেয়াল করছে না। রোদের মন অশান্ত। সে আনমনে নিজের পথ ধরে এগোচ্ছিল। হঠাৎ, করিডরের আসতেই এক মোড়ে রোশানকে দেখল সে। রোশান ধীরভাবে তার দিকে এগোতে লাগল। রোদের তাকে দেখে থমকালো। রোশানের দিকে একটুখানি তাকাল, তারপর সরাসরি তাকে পাশ কাটিয়ে ইগনোর করতে শুরু করল। রোশান ধীরে ধীরে রোদের পেছনে পেছনে হাঁটতে লাগল। রোশানকে পেছন পেছন আসতে দেখে রোদ পদক্ষেপ দ্রুত করল। রোদের ইগনোর বুঝতে রোশান আরও দ্রুত হাঁটতে লাগল।
সে হঠাৎ রোদের সামনে এসে দাঁড়াল,
“রোদ, আমি তোমার সাথে কথা বলতে চাই।”
রোদের ভ্রু কুঁচকে গেল। সে চুপচাপ সরে চলে যেতে চাইল। রোশান তার পথ আবারও আটকে সামনে এগিয়ে এসে বলল,
“তুমি আমাকে ইগনোর করতে পারো না। আমি কথা বলবই তোমার সাথে। সেটা তুমি চাও বা না চাও।”
রোদের চোখে অগ্নি দেখা দিল। সে হঠাৎ রেগে চেঁচিয়ে বলল,
“রোশান! তুমি কিন্তু এবার বাড়াবাড়ি করছো।”
রোশানের মুখে ক্রোধ ফুটে উঠল। সে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়ে জোরে বলল,
“তোমাকে আমি ছাড়ব না, রোদ। আর না তোমাকে অন্য কারো হতে দিব”
রোদের ধৈর্য ফুরিয়ে এলো। সে রেগে এক পা এগিয়ে এসে রোশানের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলল,
“তুমি আমাকে ফোর্স করতে চাও?”
ক্যাম্পাসের সকলের চোখ তাদের দিকে পড়ল। রোশান কিছুক্ষণ রোদের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দুটো জ্বলছে। চারপাশের কোলাহল তার কানে বাজছিল না। এক গভীর শ্বাস নিয়ে সে ধীরে বলল,
“হ্যাঁ, ফোর্স করছি। কারণ আমি জানি, আমি জোর করে না বলতে চাইলে, তুমি কখনও শুনতে চাইবে না। আমি জানি, তুমি অন্য কাউকে ভালোবাসো। আমি যে তোমার ভালোবাসা না পেয়ে, প্রতিদিন তোমার হাসিটা দেখে বেঁচে আছি, সেটা তুমি জানো না। আমি যে রোজ তোমার পেছনে হাঁটি, শুধু তোমার ছায়াটুকু দেখার জন্য—তাও তুমি জানো না।”
রোদ স্তব্ধ হয়ে গেল। তার ঠোঁট কাঁপল, কিন্তু কথা বেরোল না। রোশান আরও এক পা এগিয়ে এসে বলল,
“আমি তোমার থেকে কিছু চাইনি, রোদ। শুধু আমার দিকে একটু তাকানো, আর একটু মনোযোগ। তুমি আমাকে ভালো নাই বাসো, কিন্তু আমি নিজেকে থামতে পারি না। আমার ভালোবাসা তো কোনো চুক্তি না, যে তুমি না ভালোবাসলে শেষ হয়ে যাবে। আমি তবুও প্রতিদিন নিজেকে বোঝাই—আজ থেকে ভুলে যাবো। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠেই তোমার কথা সবার আগে মাথায় আসে।”
সে একটু থেমে আবারও বলল,
“তুমি রেগে যাও, চেঁচাও, তাও আমি খুশি। অন্তত তোমার চোখের রাগের মধ্যে আমি আছি। আমি এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি যেখানে ভালোবাসা মানে শুধু দেখা, ছোঁয়া নয়। তুমি যদি চাও ঘৃণা করো, কিন্তু আমায় এভাবে অচেনা করে দিও না, রোদ। তোমাকে ভালোবেসে ভুল করিনি। আমার ভুল আমি তোমাকে কোনোদিনও আমার ভালোবাসাটা বোঝাতে পারিনি।”
রোদ নিজেকে শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“বাট আমি তোমাকে কোনোদিনও ভালোবাসিনি। আগে যদিও ভালো বন্ধু ভাবতাম। তবে যা শুরু করেছো, তাতে আমাদের বন্ধুত্বটাও শেষ।”
রোশান যেন মুহুর্তে রেগে গেল। সে রোদের দু’বাহ ধরে তাকে ঝাকিয়ে বলল,
“ওই পশুটার জন্য তোমার বন্ধুত্ব, ভালোবাসা সব আছে। আর আমার জন্য কিছু নেই?
রোদ মুহুর্তেই রেগে গেল। সে নিজেকে সামলাতে না পেরে সকলের সামনে রোশানকে চড় মারল। পুরো ভার্সিটি হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। রোশান তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল,
“তবুও ভালোবাসি। প্রয়োজন পড়লে আরও দশ বারোটা চড় মারো। তুমি যতবার চড় মারবে আমি ততবার বলব, আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
রোদ যেন বাকরুদ্ধ। সে আর দাঁড়িয়ে না থেকে চলে গেল। তার পায়ের আওয়াজ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল করিডরের শেষ প্রান্তে। চারপাশের ফিসফাস ভেসে উঠল।
রোশানের হাতের মুঠোটা শক্ত হয়ে উঠল। তার বুকের ভেতর আগুনের মতো জ্বালাপোড়া করতে লাগল। সে নিচু গলায় নিজের সঙ্গে বলল,
“তুমি আমাকে মেরে ফেললেও আমি একটা কথায় বলব, আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
তারপর সে ধীরে ঘুরে ক্যাম্পাসের গেটের দিকে হাঁটতে লাগল। অন্যদিকে, রোদ একা হাঁটছে ভার্সিটির গার্ডেনের পাশ দিয়ে। তার মুখ শক্ত, চোখে লালচে রাগ, কিন্তু মনটা ভারী। তার ভেতরে কেমন একটা অস্থিরতা কাজ করছে। সে থেমে গিয়ে বেঞ্চে বসে পড়ল। তার মাথার ভেতর শুধু একটাই শব্দ ঘুরছে,
“কেন সে আমাকে এত ভালোবাসে?”
তার বুকের ভেতর হালকা কাঁপুনি উঠল, কিন্তু মুখে একরাশ কঠিনতা নেমে এলো। সে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“না! আমি দুর্বল হবো না। ওর জন্য আমার কোনো মায়া নেই। ওর মতো মানুষের জন্য মায়া থাকতে নেই। ভালোবাসা জোর করে হয়না। আমিও নীশকে একতরফা ভালোবাসি, তবে আমি তো কখনও নীশকে জোর করিনি আমাকে ভালোবাসার জন্য। তবে ও করছে। ও আমাকে জোর করে পেতে চাইছে। আর এইটাই ওকে হেট করার জন্য যথেষ্ট।”
চলবে…?
