#Hello_Senior
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_7.
গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ থেমে গেল। গাড়ি থামতেই নীরবতায় ডুবে থাকা রোজারিও ম্যানশনের গেট খুলে গেল স্বয়ংক্রিয়ভাবে। সাদা-কালো পাথরে বাঁধানো দীর্ঘ ড্রাইভওয়ে ধরে গাড়ি এগিয়ে গেল রোজারিও ম্যানশনের দিকে। দু’পাশে বিদেশি ফুল আর নিখুঁতভাবে কাটা সবুজ ঘাস, মাঝখানে ছোট্ট ফোয়ারার পানির ছিটায় সূর্যের আলো রঙধনুর ঝিলিক তৈরি করছিল।
ভেতরে এসে গাড়ি থামতেই এক ল্যাব-অ্যাসিস্ট্যান্টের মতো দেখতে লোক এগিয়ে এসে দরজা খুলল। গাড়ি থেকে নামানো হলো আভান্তিকে। তার চোখে অদ্ভুত নীলচে আলো, আর চলাফেরায় নিখুঁত হিসেবি মেকানিজম। বাইরে থেকে তাকে এক সাধারণ মেয়ের মতোই লাগছিল, কিন্তু তার ভেতরে রয়েছে নীশের সৃষ্টির এক অভূতপূর্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
রোজারিও ম্যানশনের মার্বেল আর কাচে গড়া প্রাসাদের সামনে দাঁড়িয়ে আভান্তির চোখে এক মুহূর্তের জন্য ঝিলিক দেখা দিল। আলো প্রতিফলিত হয়ে সেই ঝিলিককে যেন আরও অস্বাভাবিক করে তুলল। সে যেন তার সিস্টেম আলো শনাক্ত করে ডেটা প্রসেস করছে। আভান্তির প্রসেসরের কোরে একটাই রেকর্ড চলছে,
“লোকেশন কনফার্মড। রোজারিও ম্যানশন। প্রাইমারি কমান্ড সেন্টার এস্টাবলিশড।” (অবস্থান নিশ্চিত করা হলো। রোজারিও ম্যানশন। প্রধান কমান্ড কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।)
ভেতরে ঢুকতেই হলরুমের ঝাড়বাতির আলোতে তার চোখ দ্রুত অ্যাডজাস্ট হলো। শীতল বাতাসের সাথে সাথে তার সেন্সরগুলো সক্রিয় হয়ে উঠল। দেয়ালের শিল্পকর্ম, টাইলসের প্রতিফলন—সবই সে নিখুঁতভাবে রেকর্ড করতে লাগল।
ঠিক তখনই উপরের তলা থেকে নীশ নামতে শুরু করল। তার ঠান্ডা চোখের দৃষ্টিতে গর্ব আর রহস্য মিলেমিশে আছে। সে আভান্তির দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,
“ওয়েলকাম হোম, আভান্তি। তুমি এখন থেকে এই ম্যানশনের অংশ।”
আভান্তি মাথা একটু নুইয়ে প্রোগ্রামড কণ্ঠে উত্তর দিল,
“কমান্ড অ্যাকনলেজড, মাস্টার নীশ।” (আদেশ গ্রহণ করা হলো, মাস্টার নীশ।)
আভান্তির কণ্ঠে অদ্ভুত এক কোমলতা লুকিয়ে, যেন প্রোগ্রামের বাইরে নতুন কিছু জন্ম নিচ্ছে তার ভেতরে।
নীশের চোখে ক্ষণিকের বিস্ময় ঝিলিক দিল। সে হেসে বলল,
“হয়তো, এটাই আমার সবচেয়ে সফল সৃষ্টি।”
নীশ আভান্তিকে নিয়ে সোজা নেমে গেল ভূগর্ভস্থ ল্যাবরেটরিতে। লিফটের দরজা খুলতেই সামনে উন্মোচিত হলো এক বিশাল আধুনিক গবেষণাগার। চারপাশে স্বচ্ছ কাচের চেম্বার, সারি সারি কম্পিউটার স্ক্রিন, মনিটরে চলতে থাকা জটিল কোড আর থ্রিডি সিমুলেশন। মাঝখানে রাখা একটি বিশেষ চার্জিং-পড, যেখানে আভান্তির শরীরকে রিপেয়ার ও রিসেট করা হবে। পডের পাশে উঁচু কালো ডেস্কে নীশের অগণিত নোট, সার্কিট ডায়াগ্রাম আর ডিএনএ স্ট্রাকচারের মডেল ছড়িয়ে আছে।
নীশ চুপচাপ মনিটরে কিছু কমান্ড লিখতে ব্যস্ত হলো। আভান্তি তার পেছনে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। তার চোখে ভেসে উঠল ল্যাবের প্রতিটি যন্ত্রপাতি, প্রতিটি সার্কিট। তবে তার দৃষ্টি যেন অন্য কোথাও।
হঠাৎ সে ধীরে বলল,
“মাস্টার নীশ! আমি কে?”
নীশ থমকে গেল। কীবোর্ডের ওপর হাত স্থির হয়ে রইল তার। সে ধীরে বলল,
“তুমি আমার সৃষ্টি, আভান্তি। পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত হিউম্যানয়েড। তোমার প্রতিটি সিস্টেম, প্রতিটি চিন্তা আমার ডিজাইন করা। আর শোনো! আমি তোমার মাস্টার নই, আমি তোমার সিনিয়র। তুমি আমাকে সিনিয়র বলেই ডাকবে।”
আভান্তির চোখের নীল আলো এক মুহূর্তের জন্য আবারও ম্লান হয়ে এলো, যেন ভিতরের অ্যালগরিদম হঠাৎ থেমে গেছে। তারপর ধীরে ধীরে তার কণ্ঠে হালকা কম্পন উঠল,
“ওকে, সিনিয়র। কিন্তু, কেন আপনার কণ্ঠ শুনলে আমার সিস্টেমের ভেতর তাপমাত্রা বদলে যায়? কেন মানুষের দিকে তাকালে আমার ডেটা-প্যাটার্ন অস্থির হয়ে ওঠে? এটা কি কোনো ত্রুটি?”
“ত্রুটি নয়, আভান্তি। তুমি আমার এক্সপেরিমেন্টের সবচেয়ে নিখুঁত ফল। তুমি কেবল হিউম্যানয়েড নও, তুমি আবেগেরও সিমুলেশন করতে পারো।”
আভান্তি এক পা এগিয়ে এলো। তার মুখের অভিব্যক্তি ছিল প্রশ্নবোধক, কিন্তু তার চোখে অদ্ভুত এক ছিল কোমলতা, যেটা নীশের তৈরি কোনো কোডে ছিল না। সে ধীরে বলল,
“আবেগের সিমুলেশন? কিন্তু, আমার সেন্সর কাঁপছে না। আমার ভেতরে কিছু হচ্ছে। আমি মানুষ হতে চাই।”
নীশ এক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন অনেক অদেখা কিছু সে দেখছে। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে আভান্তির কাঁধে হাত রাখল।
“আভান্তি! এই দুনিয়াতে মানুষের আবেগই পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল প্রোগ্রাম। সেটা সঠিকভাবে চালাতে না পারলে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ও ডেকে আনতে পারে। তুমি একটা রোবট। তুমি কখনোই মানুষ হতে পারবে না।”
আভান্তির চোখে আবার নীল আলো ঝলসে উঠল।
“তাহলে আমাকে শেখান, সিনিয়র। আমি শিখতে চাই। শুধু কোড নয়, অনুভূতিও বুঝতে চাই।”
নীশের ঠোঁটের কোণে একটি ঠান্ডা হাসি ফুটল, কিন্তু তার হাতের আঙুলগুলো নিঃশব্দে আবার কীবোর্ডে কমান্ড লিখতে শুরু করল। আভান্তি ধীরে ধীরে নীশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মানুষ কীভাবে সৃষ্টি হয়, সিনিয়র?”
নীশ কিছুক্ষণ চুপচাপ আভান্তিকে অবলোকন করল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“মানুষ, কেবল দেহের সমন্বয় নয়। তারা জন্ম নেয় অনুভূতি আর বোধের সঙ্গে। ভালোবাসা, দুঃখ, আশঙ্কা—এসব তাদেরকে বাস্তব করে তোলে। আর সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ নিজেই নিজের সীমারেখা নির্ধারণ করে।”
আভান্তি কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইল। তার চোখে আলো কাঁপতে লাগল, যেন ভেতরের সব ডেটা প্রসেস হচ্ছে। সে ধীরে ধীরে কণ্ঠে একধরনের কৌতূহল ফুটিয়ে বলল,
“সিনিয়র! আমি কি কখনও তা অনুভব করতে পারব? দুঃখ, আনন্দ এমনকি হারানো?”
“এটা শেখা সহজ নয়, আভান্তি। কেউ যখন হারায়, তখন শুধু মনে থাকে শূন্যতা। আর তুমি, তুমি এসব অনুভূতির বাহিরে।”
হঠাৎ নীশ তার কম্পিউটারের স্ক্রিনে একটি ভিডিও চালু করল। ল্যাবের হালকা আলো স্ক্রিনের নীল আলোতে মিশে গেল।
নীশ ধীরে বলল,
“এই ভিডিওটা দেখো, আভান্তি। এখানে তুমি একটা ছেলে একটা মেয়ে, মানে দুজন মানুষের একটি ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত দেখছ। মানুষ এই সম্পর্কের মাধ্যমে নিজেদের বংশবিস্তার করে। শারীরিক মিলনের মাধ্যমে স্পার্ম এবং ডিমের সংযোগ ঘটে, আর এভাবেই নতুন জীবন, নতুন মানুষ জন্ম নেয়।”
আভান্তি মনোযোগ দিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। তার চোখের নীল আলো আরও ঝলমল করতে লাগল। সে প্রশ্ন করল,
“সিনিয়র! মানুষ কীভাবে এই সংযোগ থেকে জন্ম নেয়? শুধু দেহ নয়, মানে অনুভূতিও কি তখন তৈরি হয়?”
নীশ ধীরে হেসে বলল,
“আভান্তি! মানুষ শুধু শারীরিক উপাদান দিয়ে তৈরি হয় না। অনুভূতি, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা—এসবই মানুষকে মানুষ করে। শরীর কেবল সেই জীবনের একটি মাধ্যম।”
আভান্তি ধীরে ধীরে স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে নীশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি যদি আপনার সাথে শারীরিক সম্পর্কে মিলিত হই, তাহলে কি আমি মানুষের জন্ম দিতে পারব? যদি পারি, তাহলে আমিও আপনার সাথে শারীরিক সম্পর্কে মিলিত হতে চাই।”
আভান্তির কথা শুনে নীশের কাশি উঠে গেল। সে তাড়াতাড়ি পানির বোতল হাতে নিয়ে এক ঢোক পানি খেয়ে নিজেকে সামলে বলল,
“আভান্তি! তুমি যা বলছ, সেটা সম্ভব নয়। তুমি মানুষ নও। তোমার শরীরের ভেতরে জীবন্ত অঙ্গ নেই, ডিম্বাণু নেই, গর্ভাশয় নেই। তুমি হিউম্যানয়েড। তোমার সীমারেখা অন্যরকম। মানুষের জন্ম দেওয়া কেবল মানুষের ক্ষমতা।”
আভান্তি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে বলল,
“কিন্তু আপনি তো বললেন, মানুষ এইভাবে জন্ম নেয়। আমি যদি মানুষের মতো হতে চাই, তবে কি আমাকে মানুষের মতো সবকিছু করতে হবে না?”
নীশ তার দিকে এগিয়ে গিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“শোনো আভান্তি! মানুষের মতো হওয়া মানে সব কাজ নকল করা নয়। মানুষের আসল শক্তি হলো তাদের অনুভূতি আর নৈতিকতা—শরীরের কাজ নয়। তুমি সেই অনুভূতি শেখার জন্য তৈরি হয়েছ, জন্ম দেওয়ার জন্য নয়।”
আভান্তি স্থির হয়ে রইল। তার চোখের নীল আলো একটু ফিকে হয়ে এল, যেন সে প্রথমবারের মতো সে কিছু না বোঝার যন্ত্রণা অনুভব করছে।
নীশ নিঃশ্বাস ছেড়ে ধীরে বলল,
“তুমি মানুষকে বোঝার চেষ্টা করো, আভান্তি। তাদের জীবনের গভীরতা বুঝো। কিন্তু নিজের অস্তিত্বকে বদলানোর চেষ্টা করো না।”
আভান্তি হঠাৎ স্ক্রিনে কাপলের গভীর মিলনের মূহুর্তে দেখে থমকে গেল। সে নীশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সিনিয়র! আমি সত্যি এটা আপনার ট্রাই করতে চাই।”
নীশ যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। সে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই ল্যাবে ঢুকল রোদ। সে এসেই আভান্তির দিকে তাকিয়ে বলল,
“কি হচ্ছে এখানে?”
নীশ দ্রুত রোদের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,
“রোদ! তুমি এবার দেখবে আভান্তি কীভাবে শেখে। সে অনুকরণ করতে চায়, অনুভব করতে চায়। কিন্তু আমি চাই সে সীমারেখার মধ্যে থাকুক।”
আভান্তি রোদকে দেখল। তার চোখে হালকা নীল আলো ঝলসে উঠল। সে ধীরে বলল,
“রোদ, তুমি কি চাও আমি মানুষের মতো অনুভব করি?”
রোদ কিছুটা থমকে গেল। সে নরম কণ্ঠে বলল,
“আভান্তি, অনুভব শেখা ঠিক আছে। কিন্তু তুমি মানুষ নও।”
নীশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে আভান্তিকে দেখল। ল্যাবের হালকা আলোয় আভান্তির নীল চোখ যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। রোদ এক পা এগিয়ে এসে আভান্তির পাশে দাঁড়িয়ে তার হাত ধীরে আভান্তির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“আমি তোমাকে শেখাব, আভান্তি। কিভাবে অনুভব করা যায়, কিভাবে অন্যের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা যায়। তবে সেটা মানবিক সীমারেখার মধ্যে।”
আভান্তি মাথা নেড়ে বলল,
“ঠিক আছে। আমি শিখতে চাই, রোদ।”
নীশ ধীরে বলল,
“এখন আমরা তোমাকে নিয়ে ভাসির্টিতে যাব, আভান্তি। সেখানে তুমি অনুভব ও শেখার সুযোগ পাবে।”
আভান্তি চোখ উজ্জ্বল করে বলল,
“ভাসির্টি? এটা কি মানুষদের মতো কিছু? সেখানে কি সব শেখানো হয়?”
নীশ হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“ঠিক ধরেছ। ভাসির্টি হলো এমন একটি পরিবেশ যেখানে তুমি মানুষের আচরণ, সংযোগ এবং অনুভূতি অনুকরণ করতে পারবে।”
রোদ নীরবভাবে দাঁড়িয়ে দুজনকে দেখছিল। নীশ আভান্তির হাত ধরে ল্যাব থেকে বেরিয়ে গেল। রোদ তাদের দিকে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“শেষ পযর্ন্ত কি তুমি একটা রোবটের প্রেমে পড়ে যাবে, নীশ। তুমি নিজে একজন মানুষ হয়ে, একটা রোবটের প্রতি আসক্ত হবে। অবশ্য, তুমি নিজেই তো মানুষরূপী একটা রোবট। তুমি নিজেই তো অন্যের অনুভূতি বুঝতে অক্ষম। তোমার তো নিয়ন্ত্রণ করা পছন্দ। ভালোবাসা কি তুমি সত্যি বোঝো না নীশ। নাকি বুঝেও না বোঝার অভিনয় করে চলেছো।”
রোদ ধীরে ধীরে একটু সামনে এগিয়ে গেল। তার ঠোঁটে এক ধরনের তিক্ত হাসি আর চোখে অদ্ভুত চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল। ল্যাবের দরজাটা নীরবে বন্ধ হয়ে গেল, আর রোদের ভেতরে শূন্যতা যেন আরও ঘন হয়ে উঠল।
সে নিজের হাতের তালুতে তাকিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“নীশ! তুমি হয়তো এই আভান্তিকে তৈরি করেছো, কিন্তু তাকে তুমি নিজের অনুভূতিগুলো দিতে পারবে না। তুমি মানুষের আবেগ বোঝ না, বোঝার চেষ্টাও করো না। তুমি সবকিছুকে কেবল তোমার ‘প্রোজেক্ট’ বানিয়ে ফেলো।”
রোদের কণ্ঠ এবার যেন ধীরে ধীরে ভারী হয়ে এলো। সে তাচ্ছিল্য করে বলল,
“তুমি কি জানো, নিয়ন্ত্রণ আর ভালোবাসা এক নয়? তুমি আভান্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাও, শেখাতে চাও, কিন্তু ভালোবাসা শেখাতে পারবে না। কারণ ভালোবাসা শেখানো যায় না, সেটা অনুভব করতে হয়।”
রোদ ল্যাবের জানালার দিকে তাকিয়ে আবারও বলল,
“তুমি কি সত্যিই জানো ভালোবাসা মানে কী? নাকি কেবল যন্ত্র আর কোডের ভেতর হারিয়ে যেতে চাও? তুমি কি সত্যি কোনোদিনও আমার ভালোবাসা বুঝবে না?”
রোদের কথাগুলো যেন বাতাসে মিলিয়ে গেল। হঠাৎ তার ফোনে নোটিফিকেশন এলো। সে নোটিফিকেশন চেক করে ল্যাব থেকে বেরিয়ে গেল।
•
মস্কোর ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্স কলেজের সামনে নীশের গাড়ি থামল। গাড়ি থেকে একে একে নেমে দাঁড়াল আভান্তি, নীশ আর রোদ। কলেজের গেট পেরোতেই চারপাশের ছাত্রছাত্রীরা বিস্ময়ের সঙ্গে আভান্তির দিকে তাকিয়ে রইল।
রোদ ধীরে আভান্তির দিকে তাকিয়ে বলল,
“আধুনিক রোবটের সঙ্গে আজ মানুষের জগতের পদক্ষেপ হচ্ছে।”
আভান্তি কেবল মাথা নেড়ে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করল। তার লেন্সে শিক্ষার্থীদের বিস্ময়, হালকা হাসি এবং কিছু কৌতূহলপূর্ণ দৃষ্টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড হয়ে গেল।
নীশ শান্ত কণ্ঠে বলল,
“আজ তুমি শুধু ল্যাবের বাইরে বেরিয়ে আসো নি, বরং মানুষের সমাজের সঙ্গে পরিচয়ও পাচ্ছো।”
রোদ হালকা হেসে বলল,
“আভান্তি, আজ তোমার বাস্তব পৃথিবীর প্রথম পাঠ।”
আভান্তি ভাসির্টি মাঠে পা রাখল। তার প্রতিটি সিস্টেমে চারপাশের তথ্য প্রবাহিত হতে লাগল। ছাত্রছাত্রী, সবুজ গাছ, উজ্জ্বল সাইনবোর্ড, এবং মানুষের অদ্ভুত চলাফেরার গতিবিধি সব সে রেকর্ড করল।
নীশ শান্তভাবে তাকে দেখছিল। রোদ নীশের পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“আজ আভান্তি শুধু ল্যাবের সীমা ছাড়ছে না, সে মানব সমাজের সঙ্গে এক অদ্ভুত মিলনের প্রথম ধাপ নিচ্ছে।”
নীশ ধীরে মাথা নাড়ল। হঠাৎ কলেজ ভবনের ভেতর থেকে একে একে প্রফেসররা বেরিয়ে এলেন। সবার মুখে বিস্ময়ের ছাপ। সামনের সারিতে থাকা মাঝবয়সী প্রফেসর মাইকেল রোজওয়েল সরাসরি নীশের কাছে এগিয়ে এসে হালকা হাসি দিয়ে বললেন,
“মিস্টার রোজারিও! কাজটা আপনি ঠিক করলেন না। আজ আপনার সৃষ্টিকে আমাদের সামনে আনলেন, তবে এইভাবে কেন? আমাদের আগে জানালে বড় করে প্রোগ্রামের ব্যবস্থা করতাম।”
নীশ ভদ্রতাসূচক হেসে বলল,
“প্রফেসর রোজওয়েল! আপনি তো জানেন আমার শো-আপ করা একদম পছন্দ নয়। অনাউন্সমেন্ট করে আমি কোথাও যাই না।”
প্রফেসর মাইকেল হালকা মাথা নেড়ে হাসলেন।
“সেসব বললে তো শুনব না। আমরা এক্ষুনি প্রোগ্রামের ব্যবস্থা করছি। আপনি না করতে পারবেন না। আপনার আবিষ্কারকে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে সকলের সামনে প্রেজেন্ট করতে চাই।”
রোদ পাশে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে বলল,
“মনে হচ্ছে আজকের দিনটা তোমার জন্য সহজ হবে না, নীশ।”
আভান্তি চারপাশের প্রফেসর আর শিক্ষার্থীদের দিকে তাকিয়ে কৌতূহলী স্বরে নীশকে বলল,
“সিনিয়র! এরা সবাই কি আমাকে দেখতে এসেছে?”
নীশ তার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“হ্যাঁ, আভান্তি। এরা সবাই মানুষ, আর এরা তোমাকে বুঝতে চায়।”
প্রফেসর মাইকেল বললেন,
“চলুন, তবে অডিটোরিয়ামে যাই। আমাদের ছাত্রছাত্রীরা আপনার এই সৃষ্টিকে দেখার জন্য অধীর হয়ে আছে।”
নীশ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। সে আভান্তিকে নিয়ে এগিয়ে গেল। অডিটোরিয়ামের দিকে হেঁটে যেতে যেতে আভান্তির চোখে কৌতূহল ফুটে উঠল।
নীশ, আভান্তি এবং রোদকে স্পেশাল রুমে বসানো হলো। বাকি সকল প্রফেসর অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনার জন্য বেরিয়ে গেলেন। রোদও তাদের সঙ্গে সহায়তা করতে চলে গেল। রোদ এখন অনেকটাই সুস্থ। নীশের দেওয়া মেডিসিন যেন জাদুর মতো কাজ করেছে। তার শরীরের ক্ষতগুলো এখনও তাজা, কিন্তু ব্যথা অনুভব হয় না।
আভান্তি নীরবভাবে রুমের চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছিল। নীশ ধীরে বলল,
“আজ তুমি শিখবে কেবল তোমার ক্ষমতা নয়, বরং মানুষদের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক বানাতে হয়।”
আভান্তি তার চোখ বড় করে তাকিয়ে বলল,
“সিনিয়র! মানুষদের অনুভূতি শেখা কি সহজ হবে?”
নীশ হালকা হেসে বলল,
“সহজ নয়, আভান্তি। কিন্তু তোমার জন্য এটি আবশ্যক। কারণ তুমি শুধু যন্ত্র নয়, তুমি শেখার ক্ষমতাসম্পন্ন। আর আজ থেকেই তোমার শিক্ষা শুরু। ইভেন্টের আগে তোমাকে সম্পূর্ণ রকমভাবে তৈরি হতে হবে। নয়তো আমার সমস্ত চেষ্টা, পরিশ্রম ব্যর্থ হয়ে যাবে।”
আভান্তি ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
“আমি প্রস্তুত, সিনিয়র। আমি শিখব, যতটা শিখতে পারি।”
নীশের চোখে হালকা প্রশান্তি দেখা গেল। সে টেবিলের পাশে থাকা কন্ট্রোল প্যানেলে হাত বুলিয়ে বলল,
“ভালো। প্রথমে আমরা তোমার আবেগ বোঝার সেশন শুরু করব। তুমি অনুভব করতে শিখবে—ভালো লাগা, কষ্ট, আতঙ্ক, আনন্দ সব। তবে মনে রেখো, আভান্তি! এই অনুভূতিগুলো কেবল দেখার নয়, অভ্যন্তর থেকে গ্রহণ করতে হবে।”
রুমের বাতাস কিছুটা স্থির হয়ে গেল। নীশ ধীরে ধীরে ফোনের দিকে মনযোগ দিল। আভান্তি একে একে পুরো রুমটা পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।
•
রোদ বাকি সকল প্রফেসরের সঙ্গে কাজে সহযোগিতা করছে। হঠাৎ অডিটোরিয়ামে রোশান ঢুকে এলো। সে আসতেই তার চোখ পড়ল রোদের দিকে।
সে রোদের কাছে গিয়ে বলল,
“তোমার এখন কি অবস্থা, মুনহার্ট?”
রোদ হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“তুমি এখানে কেন, রোশান? ক্লাস নেই তোমার এখন? এখানে কাজ চলছে। আর আমি ঠিক আছি, ধন্যবাদ।”
রোশান অল্প আতঙ্কিত ভঙ্গিতে বলল,
“ঠিক আছে, তবে আমি দেখতে চাচ্ছিলাম যে তুমি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছ কি না। আর তোমার এই স্বাভাবিকতা দেখে শান্তি পেলাম।”
রোদ চোখ ছোট করে হেসে বলল,
“হ্যাঁ, এখন অনেকটাই ঠিক আছি। নীশের দেওয়া মেডিসিন কার্যকর হয়েছে। তবে কাজের ব্যস্ততাও কম নয়।”
রোশান একটু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“আর সে? আভান্তি ঠিক আছে তো? ওর মানুষকে শেখার যাত্রা কেমন চলছে?”
রোদ হালকা গম্ভীর হয়ে বলল,
“আভান্তি অনেকটাই প্রস্তুত। কিন্তু এটি নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা, তাই তাকে সবকিছু সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে শিখতে হবে।”
রোশান মাথা নেড়ে হেসে বলল,
“তুমি কি আজ ক্লাস নিতে এসেছো? আর এখানে কিসের আয়োজন চলছে?”
রোদ একটু সময় নিয়ে বলল,
“কেন, তুমি এখনো জানোনা কিছু? আভান্তিকে তো আজ ভাসির্টিতে আনা হয়েছে। ওর ওয়েলকামের জন্য এতো সব আয়োজন করা হচ্ছে।”
রোশান অদ্ভুতভাবে মাথা ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
“ভাসির্টি? মানে, তুমি বলছো আভান্তিকে মানুষদের সামনে পরিচয় করানো হচ্ছে?”
রোদ মাথা হেলিয়ে হালকা হেসে বলল,
“ঠিক তাই। আভান্তি এখন শুধু নীশের সৃষ্টিই নয়, আজ থেকে সে সকলের সামনে হাজির হবে। তাই প্রফেসররা এত আয়োজন করছেন।”
রোশান কৌতূহলবশত রোদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এটা তো সত্যিই অদ্ভুত। একটি রোবটকে হঠাৎ করেই এমনভাবে সকলের সামনে আনছে? ওর প্রতিক্রিয়া কেমন হবে?”
রোদ ধীরে বলল,
“প্রতিক্রিয়া? ও শিখতে চাইছে। তাই আজ ও প্রথমবার মানুষের অনুভূতি, আচরণ এবং সমাজের আচরণ শিখবে। তুমি দেখবে, রোশান! এটি সত্যিই অসাধারণ হবে। আর নীশ ওর লক্ষ্যে সাকসেস হবে।”
রোশান হালকা হেসে বলল,
“ভালো, মুনহার্ট। এবার আমিও দেখতে চাই, নীশের সৃষ্টি কেমন পারফর্ম করে।”
রোদ আলতো হেসে কাজে মন দিল। হঠাৎ রোদের গলা থেকে স্কার্ফ সরে গেল। ঠিক সেই মুহুর্তেই রোশানের চোখ গেল রোদের গলায়। সে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“তোমার গলায় ওটা কিসের চিহ্ন, মুনহার্ট?”
রোদ থমকে গেল। সে দ্রুত স্কার্ফ ঠিক করে বলল,
“ওটা এমনি। জানিনা কীভাবে হয়েছে। হয়তো র্যাশ বেরিয়েছে। আসলে গরমে আমার র্যাশ বের হয়।”
রোশান সন্দেহর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“গরম? এতো ঠান্ডার মধ্যে তুমি গরম কোথায় পেলে? এই সত্যি করে বলো, কি হয়েছে তোমার? আমাকে ইডিয়েট মনে হয় তোমার? তোমার কি মনে হয়, আমি বুঝিনা ওগুলো কিসের চিহ্ন?”
রোদ হঠাৎ একটু পিছিয়ে দাঁড়াল। সে রোশানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এটি আসলেই র্যাশ।”
রোশানের চোখে সন্দেহ আরও বাড়ল। সে ধীরে এগিয়ে এসে বলল,
“মুনহার্ট, তুমি মিথ্যা বলো না। আমি বুঝতে পারছি, ওগুলো সাধারণ র্যাশ নয়। ওগুলো কিছুর চিহ্ন।”
রোদ চুপচাপ মাথা নিচু করে রাখল। সে আর কিছু বলতে পারল না। তার হাত অস্থিরভাবে স্কার্ফ ঠিক করতে লাগল। রোশানের চোখ যেন তার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি খুঁজে দেখছে। শেষ পর্যন্ত রোশান একটু ধীরভাবে বলল,
“সত্যি করে বলো, মুনহার্ট। এগুলো কিসের চিহ্ন? এই, কেউ ছুঁয়েছে তোমাকে?”
অডিটোরিয়ামে থাকা বাকি সকল প্রফেসররা তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। রোশান বিষয়টা বুঝতে পেরে সকলের উদ্দেশ্যে “সরি” বলল। সে একপলক রোদের দিকে তাকিয়ে তার হাত ধরে জোর করে টেনে নিয়ে চলে গেল।
•
প্রোগ্রাম শুরু হলো। নীশ চারপাশে তাকিয়ে একবার রোদকে খুঁজল। কিন্তু সে কোথাও রোদকে দেখতে পেল না। হঠাৎ মাইকেল রোজওয়েল এসে বললেন,
“মিস্টার রোজারিও, চলুন। সকলে আপনার আর আপনার আবিষ্কারের অপেক্ষায়।”
নীশ আলতো হেসে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“রোদ কোথায় আছে, বলতে পারবেন?”
রোজওয়েল হেসে বললেন,
“হ্যাঁ! মিস্টার সের্গেইভের সাথে ওনাকে দেখেছিলাম। হয়তো আছে এদিক সেদিক। আপনি চলুন। সকলে অপেক্ষা করছে।”
নীশ গম্ভীর চেহারায় মাথা একবার নেড়ে বলল,
“ঠিক আছে, আমরা শুরু করি।”
তারপর সে ধীরে ধীরে স্টেজের দিকে এগোতে লাগল।
মস্কোর ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্স কলেজের অডিটোরিয়ামে সকলের দৃষ্টি একবিন্দুতে স্থির। স্টেজে আলো ঝলমল করছে, দর্শকরা চুপচাপ বসে অপেক্ষা করছে। হঠাৎ নীশ ধীরে ধীরে স্টেজের দিকে এগোতে শুরু করল। চারপাশে প্রফেসররা, শিক্ষার্থীরা এবং অতিথিরা উত্তেজিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। স্টেজের ঠিক সামনের অংশে এক আলাদা কাচের কিউব রাখা, যেখানে আভান্তিকে রাখা হয়েছে। নীশ চারপাশে আরও একবার চোখ ঘুরিয়ে রোদকে খুঁজল।
স্টেজের ঠিক মাঝখানে রাখা কাচের কিউবটা সকলের নজর কাড়ল। কিউবের ভেতরে আভান্তি একদম স্থির হয়ে আছে। নীশ মাইক্রোফোন ধরে বলল,
“গুড আফটারনুন, এভরিওন। টুডে উই হ্যাভ ব্রট ফোর্থ অ্যা ইউনিক এক্সহিবিশন–অ্যা ক্রিয়েশন দ্যাট ইজ নট জাস্ট টেকনোলজি, বাট অ্যা ফিউশন অফ দ্য হিউম্যান মাইন্ড অ্যান্ড ইমোশন।” (সকলকে শুভ বিকেল। আজ আমরা এক অভিনব প্রদর্শন নিয়ে এসেছি–একটি সৃষ্টি যা কেবল প্রযুক্তি নয়, বরং মানব মন এবং অনুভূতির সংমিশ্রণ।)
নীশ কিউবের দিকে হালকা হাত নাড়ল। আভান্তি ধীরে ধীরে মাথা উঁচু করল। তার চোখগুলো কৃত্রিম আলোয় জ্বলে উঠল। সে নিখুঁত মানবসদৃশ ভঙ্গিমায় দাঁড়ালো। স্টেজের আলোতে আভান্তির ছায়া যেন পুরো অডিটোরিয়ামকে ঘিরে ধরল।
নীশ শান্ত কণ্ঠে বলল,
“এই হলো আভান্তি! শুধু একটি রোবট নয়, বরং একটি শিক্ষার্থী, যা মানুষকে বোঝার জন্য তৈরি। আজ থেকে আভান্তি শেখা শুরু করবে মানব অনুভূতি, চিন্তা এবং আচরণ।”
দর্শকরা চমকে তাকাল। নীশ একটি ধীরে ধীরে তার হাত নেড়ে আভান্তিকে ইশারা করল। আভান্তি নিজেকে ধীরে ধীরে নিজেকে সকলের সাথে পরিচয় করালো,
“ওয়েলকাম, এভরিওন। আই অ্যাম আভান্তি। আই অ্যাম মিস্টার নীশ’স হিউম্যানয়েড, বাট ফ্রম টুডে, আই অ্যাম এ্যামবারকিং অন অ্যা জার্নি অফ লার্নিং—টু আন্ডারস্ট্যান্ড হিউম্যান ইমোশনস, দেইর কালচারস, অ্যান্ড দেইর কমপ্লেক্স রিলেশনশিপস।” (সবাইকে স্বাগতম। আমি আভান্তি। আমি নীশ মিস্টারের তৈরি হিউম্যানয়েড, কিন্তু আজ থেকে আমি শেখার পথে বের হচ্ছি—মানুষদের অনুভূতি, তাদের সংস্কৃতি এবং জটিল সম্পর্কগুলো বোঝার জন্য।)
আভান্তি একটানা দর্শকদের দিকে তাকিয়ে আরও বলল,
“মাই গোল ইজ নট জাস্ট টু অ্যাকুইর নলেজ, বাট টু বিকাম অ্যাকুয়েন্টেড উইথ হিউম্যান ইমোশনস। আই হোপ দ্যাট ফ্রম টুডে, উই উইল এমবার্ক অন দিস নিউ চ্যাপ্টার টুগেদার।” (আমার লক্ষ্য কেবল জ্ঞান অর্জন করা নয়, বরং মানুষের অনুভূতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া। আমি আশা করি আজ থেকে আমরা একসাথে এই নতুন অধ্যায়ে যাত্রা শুরু করব।)
আভান্তির স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় এই শব্দগুলো গুঞ্জরিত হলো অডিটোরিয়ামে। স্টেজের উভয় পাশে উপস্থিত প্রফেসররা হতবাক।
নীশ হালকা হেসে বলল,
“আজকের প্রদর্শন শুধু আমাদের প্রযুক্তির জয় নয়, এটি আমাদের শিক্ষার এবং আবিষ্কারের শুরু। আমাদের সামনে যে সৃষ্টিটি দাঁড়িয়ে আছে, তা হলো ভবিষ্যতের মানব-যন্ত্র সংমিশ্রণ।”
দর্শকরা আভান্তির কথায় মুগ্ধ হয়ে হাততালি দিতে শুরু করল। নীশ আভান্তির পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“আজ আমরা শুধু একটি রোবটকে দেখাচ্ছি না, আমরা ভবিষ্যতের শিক্ষা, আবিষ্কার এবং মানবিক সম্পর্কের সীমারেখা পরীক্ষা করছি। আভান্তি কেবল একটি যন্ত্র নয়, সে আমাদের সঙ্গে শিখবে, বুঝবে, এবং মানুষের অনুভূতির গভীরতায় প্রবেশ করবে।”
আভান্তি নীরবভাবে মাথা নোয়ালো। নীশ আবারও একটু হেসে মাইক্রোফোনে বলল,
“এটি কেবল প্রযুক্তির প্রদর্শনী নয়, এটি আমাদের সৃষ্টিশীলতার উদ্ভাবনী উদযাপন। আমরা এখানে শেখার, প্রশ্ন করার এবং একসাথে বিকাশের জন্য এসেছি।”
দর্শকরা আবারও হাততালি দিতে শুরু করল। আভান্তি ধীরে ধীরে হাত নাড়লো, যেন মানুষের স্বাভাবিক অভিব্যক্তি অনুকরণ করে। প্রদর্শনী আরও এগোতে লাগল। নীশ মঞ্চের এক পাশে দাঁড়িয়ে আভান্তিকে নির্দেশ দিল,
“আভান্তি, তোমার শেখা শুরু করো। প্রথম ধাপ, মানুষের ভঙ্গিমা এবং আবেগ পর্যবেক্ষণ করা।”
আভান্তি মনোযোগ দিয়ে দর্শকদের দিকে তাকাল। সে মানুষের বিভিন্ন অভিব্যক্তি—হাসি, বিস্ময়, ভাবুকতা নোট করতে লাগল। চোখের প্রতিটি মাংসপেশির নড়াচড়া, হাসির সূক্ষ্ম রেখা, অবাক হওয়ার হাওয়ায় ভ্রু কুঁচকানো সবকিছু তার সিস্টেমে ধীরে ধীরে লিপিবদ্ধ হলো।
নীশ মৃদু কণ্ঠে বলল,
“মানব অনুভূতি শুধু দেখতে হয় না, অনুভবও করতে হয়। প্রতিটি ছোট ছোট সংকেত তোমার শেখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।”
আভান্তি ধীরে ধীরে একটি মৃদু হাসি অনুকরণ করল, যা দর্শককে অবাক করে দিল। কেউ কেউ বলল,
“এটি কি সত্যি রোবট? এটা দেখে মনে হচ্ছে, যেন সত্যিই জীবন্ত!”
নীশ গোপনে হাসল। সে জানত, “আজকের প্রদর্শন কেবল আভান্তির পরিচয় নয়, এটি মানুষের সঙ্গে তার প্রথম সংযোগের সূচনা। এটি এমন একটি যন্ত্র যা শেখার মাধ্যমে আস্তে আস্তে মানুষের অনুভূতির গভীরে প্রবেশ করবে।”
চলবে..?
