#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
১১.
( কপি করা নিষেধ)
রিদির পরীক্ষা শেষ হয়েছে গতমাসে। কোচিং এর জন্য ঢাকা এসেছে। একটা লেডিস হোস্টেলে থাকবে। হোস্টেল মনিপুরী পাড়ায়, আর কোচিং ফার্মগেট রেটিনাতে। জাবেদ সাহেব মেয়েকে রেখে যাওয়ার সময় মন ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। রাহা এবং রায়হান চাইল নিজেদের বাসায় রাখতে। কিন্তু জাবেদ সাহেব রাজি হলেন না। রায়হানের বাসায় রাহার শাশুড়ি এবং ননদ থাকে। যদি রিদির কোনো কাজে তাদের মনে আঘাত লাগে সেটা তিনি মেনে নিতে পারবেন না। এরচেয়ে হোস্টেল ভাল অপশন। রায়হান দুই তিনদিন পর পর এসে দেখে যাবে রিদিকে । বাবা যাওয়ার সময় রিদি অনেক কাঁদল।
ঢাকা থেকে ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হল জাবেদ সাহেবের। ফিরে এসে তিনি ভেঙে পড়লেন। আমিনা ওড়নায় বার বার চোখ মুছছে স্বামীর এমন অবস্থা দেখে । প্রস্তর কঠিন জাবেদ সাহেবও এভাবে শোকে কাতর হবেন কখনও বুঝতে পারেন নি৷ জাবেদ সাহেব বললেন, ‘ আমার মনে হল মেয়েটাকে আমি মাঝ সমুদ্রে একা ছেড়ে দিয়ে এসেছি। আমার ছোট্ট রিদি। আমার হাত ধরে হাঁটা শিখেছে। এখনও রাস্তা পার হতে পারে না। একা একা কিভাবে কোচিং এ যাবে? ওর হোস্টেল থেকে কোচিং পর্যন্ত কোনো রিকশা চলে না। ভি আই পি এরিয়া। বিশ মিনিটের রাস্তা হেঁটে যেতে হবে৷ ‘
এসব ভেবে আজ কেঁদে দিলেন জাবেদ সাহেব। রাহার বিয়ের দিন বিদায়েও এভাবে কাঁদেন নি, আজ রিদিকে হোস্টেলে রেখে এসে যেভাবে কাঁদলেন। অন্যদিকে বাবা যাওয়ার পর থেকে রিদি কেঁদেই যাচ্ছে। ভাগ্যিস মিরা রিদির রুমমেট। প্রমাকে ঢাকা পড়তে দিবে না ওর বাবা মা। নোয়াখালী কলেজে ভর্তি করিয়ে দিবে। মেয়েকে ফোনে বুঝ দিলেন আমিনা এবং জাবেদ সাহেব, ‘ কিছু পেতে হলে, কিছু ছাড়তে হয়।’
বাবা মায়ের সাথে কথা বলে দ্বীপকে ফোন দিল। দ্বীপ সান্তনা দিল কিছুক্ষন। পরদিন থেকে কোচিং৷ হোস্টেলের বাকি মেয়েদের সাথে একসাথে যায়। পড়াশোনা ভালোই চলছে। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল দিবে। মিরা বলল , ‘ যা মজা করার করে নিই, রেজাল্ট যদি খারাপ হয় আমাদের ঘরে জায়গা দিবে না।’
রিদি বলল,’ তোর তো জামাই আছে, আমার কি হবে?’
মিরা বলল, ‘ রিকশাওয়ালা র সাথে বিয়ে দিবে তোকে?’
‘ তাহলে দ্বীপকে রিকশা চালাতে বলি?’
দুই বান্ধবী হাসতে লাগল নিজেদের আলোচনার বিষয়বস্তুর কথা ভেবে।
__
দ্বীপ জব ছেড়ে দিয়েছে রিদির জোরাজোরিতে। যে মেয়ে ফুটবলের বিপক্ষে ছিল সেই মেয়ে রাত দিন জপ করে ফুটবলকে ক্যারিয়ার বানাতে। ভাবা যায়! গত দু মাসে বেশ কিছু বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে। সাজিনা মা হতে চলেছে । বিগত ম্যাচ গুলোর দূর্দান্ত পারফরম্যান্স দ্বীপের জীবনে আমূল-পরিবর্তন এনেছে। বাছাই পর্বে জাতীয় দলে সুযোগ করে নিয়েছে । রিদিকে ফোন দিয়ে জানাতেই রিদি মত দিল খেলার জন্য। দ্বীপ কিছুতেই রাজি হয়নি, কিন্তু রিদি জেদ ধরল। রিদির মনে হল প্রথমবার সে দ্বীপের খুশির দিকে খেয়াল করেছে। ফুটবল দ্বীপের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণের পথে রিদি কখনই বাঁধা হতে চায় না।
দ্বীপ ঢাকা এসেছে কিছুদিন আগে। প্র্যাকটিস চলছে তার। আজ রিদির সাথে দেখা করতে এসেছে ওর হোস্টেলের সামনে। দ্বীপকে দেখে রিদির চোখে মুখে উচ্ছ্বাস। হাসিমুখে এগিয়ে গেল। দ্বীপকে আগের চেয়ে বেশ সুদর্শন লাগছে সাদা পোলো শার্টে। দ্বীপের পায়ের কালো লেদার বুট গুলো রিদির সবসময়ের পছন্দ। রিদির দিকে তাকিয়ে দ্বীপ প্রশ্ন করল, ‘ ম্যাডাম আজ কোথায় যেতে চায়?’
রিদি হেসে বলল, ‘ নিয়ে যান যেখানে মন চায়। কদিন পর তো ফ্যামাস হয়ে যাবেন। তখন কি আর রিদিকে ভালো লাগবে? ভক্তরা অটোগ্রাফ, ফটোগ্রাফ চাইবে।আশপাশে কত মানুষ ভিড় করবে? ‘
দ্বীপ হেসে ফেলল । বলল, ‘ বাংলাদেশে ফুটবলারদের কেউ চেনে না। ক্রিকেটার হলে না হয় একটা কথা ছিল। ‘
‘ ভাগ্যিস ফুটবলার আপনি , ক্রিকেটার হলে তো আপনার আশপাশে সব সুন্দরী মেয়েরা ঘুরঘুর করত, রিদি কোনো চান্সই পেত না ।’
‘ রিদির জন্য দুনিয়া এসপার উসপার করে দিব।’
রিদি মাছি তাড়ানোর মত হাত নেড়ে বলল, ‘ নাহ, তোমাকে দিয়ে ফ্লার্ট হবে না আর যাই হোক।’
দ্বীপ অপরাধী স্বরে বলল, ‘ কি করব বলো , এই জিনিসটা আমি একদম পারিনা।’
‘ পারো না বলেই তো সারাজীবন একসাথে থাকার জন্য হাত ধরেছি। ‘
‘ কই ধরলে?’
‘ আহ হা! কথার কথা বললাম। সময় হলে ধরব। যখন আমার হাত টা তোমার প্রয়োজন হবে তখন।’
দ্বীপ ইষৎ হাসল। আজ প্রায় দেড় বছরের অধিক সময় রিদির সাথে নাম হীন সম্পর্কে জড়িয়েছে। রিদির হাত ধরার অনুমতি পায় নি আজো। নিজেও ধরতে চায়নি। সব কিছু সঠিক সময়ে পাওয়ার আনন্দই অন্যরকম।
রিদি রিকশা দিয়ে আজ প্রথম ঘুরছে হুড ফেলে। সীমাহীন আনন্দের মাঝে ডুব দিয়েছেন জাবেদ কন্যা। সারাদিন অনেক ঘুরল। দ্বীপ রেস্টুরেন্টে খাওয়াতে চাইলে রিদি রাজি হল না। ঝালমুড়ি, ফুচকা এবং টং দোকানের চা খেল। নীলক্ষেত থেকে মেডিকেলের কিছু বই নিল। দ্বীপ টাকা দিতে চাইলে রিদি নিষেধ করে বলল, ‘ এখন না, বিয়ে হলে দায়িত্ব নিও। উপহার এক জিনিস আর দায়িত্ব অন্য জিনিস।’
মেডিকেলের বই কিনে দেয়ার দায়িত্ব শুধুই বাবার রিদির মনে হল। রিদি বই কেনার সময় দ্বীপের চোখ গেল শরৎসমগ্রের দিকে। রিদিকে উপহার দিতে ইচ্ছে হল। বইয়ের দামটা দেখে রিদিকে বলল, ‘ উপহার দিতে চাই, নিবে?’
রিদির মনে হল এখন যদি নিষেধ করে হয়ত মনে কষ্ট পাবে। মাথা কাত করতেই দ্বীপ খুশি মনে শরৎ সমগ্র উপহার দিল। এরপর ধানমন্ডি হকার্স মার্কেটে গেল।
চাকরির প্রথম বেতন থেকে রিদির জন্য কিছু টাকা জমিয়ে রেখেছিল। সেই টাকা দিয়ে আজ দ্বীপ রিদিকে একটা শাড়ি কিনে দিল। কমলা রঙের খয়েরী পাড়ের কাতান। দাম সাড়ে তিন হাজার টাকা। রিদির জীবনে উপহার পাওয়া প্রথম শাড়ি। শাড়িটা জড়িয়ে ধরে রিদির সে কি আনন্দ। দ্বীপ মুগ্ধ হয়ে দেখছে।
হোস্টেলে ফেরার পথে মন খারাপ হল রিদির। গতকাল রাতে মায়ের বলা কথা গুলো মনে পড়েছে। আমিনা গতকাল বলেছেন, ‘ ওই ছেলেকে বলবে তুমি মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার আগেই যেন সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করে। না হলে তোমার বাবা রাজি হবে না। ‘
রিদি এ কথা দ্বীপকে একদম শোনাবেনা। ছেলেটা মাত্র নিজের স্বপ্ন পূরনে নেমেছে। কেন শোনাবে এসব কথা? রিদির আগে ফুটবল দ্বীপের জীবনে এসেছে। রিদির যেমন মেডিকেল স্বপ্ন, তেমনি দ্বীপের ও ফুটবল। ফুলবলকে এত ছোট করে কেন দেখবে?
পেছন থেকে একটা রিকশা ধাক্কা দিল। রিদি পড়ে যেতে লাগলে দ্বীপ অবচেতন মনে রিদির হাত ধরে ফেলল। তৎক্ষনাৎ সরিও বলল। রিদি হেসে ফেলল।
দ্বীপের হাতের পাঁচ আঙুলে নিজের কোমল হাত গলিয়ে বলল , ‘ জানো দ্বীপ তুমি আমাকে পছন্দ করার আগেই আমি তোমার প্রেমে পড়েছিলাম।’
দ্বীপ বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করল, ‘ কখন?’
‘ পরে বলব কোনো একদিন। তবে এ কথা জেনে রাখো, মেয়েদের চোখ একবার যে জিনিসে আটকে যায়, সে জিনিস তার চাই ই চাই একটা অবস্থা হয়ে যায়। কিন্তু ছেলেরা সহজেই অনেক কিছু ভুলে যায় নতুন জীবন, নতুন স্বপ্ন পূরণের পথে আমাকে ভুলে যেও না। ‘
দ্বীপের মনে হল রিদি তাকে অন্যকিছু ইঙ্গিত দিচ্ছে। হয়ত বিশ্বাস করতে পারছে না। আবেগের বসে বলল, ‘ ধুর, আমি খেলাই ছেড়ে দিব। খেলোয়াড়দের নিয়ে এত এত স্ক্যান্ডাল এই সব কারণে হয়। আমার কিছুই লাগবে না তুমি ছাড়া। ‘
রিদি দ্বীপের কাঁধে মাথা রেখে বলে, ‘ খেলবে, আমার জন্য। জীবন তো আমাদের শুরু হল। আগে অল্প পানিতে ছিলাম, দুনিয়াটা ছোট ছিল। এখন সমুদ্রে এসেছি, অনেক কিছু দেখার আছে, অনেকটা পথ পাড়ি দেয়া বাকি। ‘
রিদি দ্বীপের দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছে। দ্বীপ মুগ্ধ হয়ে দেখছে। এই মেয়েটা এই বয়সেই এত এত ভারী কথা শিখে গেল? ছোট মামা প্রায় বলতেন, ‘বুঝলি দ্বীপ, তোর মামী হল আমার জন্য গণিতের অনকগুলোর জটিল সমাধান। আমার জীবনের সমাধানের অন্য নাম ইলোরা।’ আজ দ্বীপের ও বলতে ইচ্ছে হল, ‘ মামা আমি বোধ হয় আমার জীবনের সমাধান পেয়ে গিয়েছি। যার নাম রিধিমা।’
__
১৮ ই আগস্ট, ২০১৬,
সকাল থেকে রুমে হাঁটাহাঁটি করছে দুই বান্ধবী। রেজাল্ট দিবে আজ। ঘড়িতে সকাল নয়টা। আজ কোচিং বন্ধ। মিরা চা বানিয়ে চা খেলেও রিদি কিছু খাচ্ছে না৷ দ্বীপের আজ খেলা আছে। খেলার দিন গুলোতে দ্বীপ ফোন বন্ধ রাখে। ফোন হাতে থাকলে মনোযোগের বিচ্যুতি ঘটে।
দুপুর বারোটা নাগাদ ফলাফল বের হয়ে গিয়েছে। সার্ভারে সমস্যা করছে। সবাই একসাথে ফলাফল দেখতে চাইলে যা হয় আর কি? রিদি কাঁদছে। মিরাও কাঁদছে। দুজনেরই ধারনা তারা ফেল করেছে। সার্ভার এরর দেখাচ্ছে। অনেক বান্ধবী ফোন দিয়ে বলছে রেজাল্ট বাজে হয়েছে। অনেকে ফেল করেছে। আবার অনেকে এ প্লাস মিস করেছে। রিদি হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। দ্বীপকে মেসেজ দিল, ‘ দ্বীপ আমি মনে হয় ফেল করেছি।’
দ্বীপের খেলা শুরু হবে আর কিছুক্ষনের মধ্যে। স্টেডিয়ামে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সবাই। ড্রেসিং রুমের সবাই বলাবলি করছে টিভিতে দেখে আজ এইচএসসির ফলাফল দিবে। কারো বোন, কারো ভাগ্নী অথবা কারো স্ত্রী পরীক্ষা দিয়েছে। সবাই খোঁজ নিচ্ছে। দ্বীপ ব্যাগ থেকে ফোন বের করল রিদিকে জিজ্ঞেস করার উদ্দেশ্যে। ফোন অন করতেই রিদির মেসেজ দেখে মাথা ঘুরে গেল। নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। রিদিকে এখন ফোন দিলে মেয়েটা কী করবে তা ভেবেই ফোন দিচ্ছে না, অন্যদিকে আজকের ম্যাচ ক্যারিয়ারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ম্যাচ। তবুও মনকে বুঝাতে না পেরে রিদিকে ফোন দিল, ফোন বন্ধ পেল। মাঠে চলে গেল খেলতে।
___
রিদিদের রুমে দরজা ধাক্কানো হচ্ছে। রিদি কাঁথা মুড়িয়ে কাঁদছে। অহেতুক কান্না যাকে বলে। মিরা দরজা খুলতেই দেখতে পেল তাদের দুজনেরই পরিবার এর লোকজন এসেছে রাহা এবং মিরার বোন মিশু চিৎকার দিকে বলল, ‘ কংগ্রাচুলেশনস তোমরা দুজনই এ প্লাস পেয়েছ। ‘
রিদি কাঁথার ফাঁক দিয়ে মুখ বের করে দেখার চেষ্টা করছে কী ঘটছে। পরিবারের সবাইকে দেখে এবং রাহা-মিশুর কথা শুনে স্তব্ধ। চিৎকার দিয়ে লাফিয়ে উঠল দুজন। মিরা আর রিদি একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে লাফাচ্ছে। একবার বাবা মাকে জড়িয়ে ধরছে তো আরেকবার হোস্টেলের বাকিদের লাফিয়ে লাফিয়ে জানাচ্ছে।
__
দ্বীপ আজ ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বাজে খেলাটা খেলেছে। হেরে গিয়েছে। কোনো গোলই হয় নি দলের। কোচ অবশ্য কাউকেই বকাঝকা করেন নি। পরবর্তী বারের জন্য প্রস্তুত হতে বললেন। ড্রেসিং রুমে এসে ফোন বের করে রিদিকে কল করল দ্বীপ। বার বার ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে। অতিরিক্ত চিন্তায় মাথা ব্যাথা উঠে গেল। স্টেডিয়াম থেকে বের হতে হতে রাত আটটা।
মেসে এসে রিদিকে ফোন দিতেই ফোন রিসিভ হল। রিদি সালাম দিয়ে জানাল সে এ প্লাস পেয়েছে। দ্বীপ কোনো উচ্ছ্বাস না দেখিয়ে বলল, ‘ এভাবে তো তুমি আমাকে ঠান্ডা মাথায় খুন ও করতে পারবে রিদি।’
চমকে উঠল রিদি। দ্বীপ শান্ত না থেকে বলেই যাচ্ছে,’ মাঠে নামার আগে মেসেজ দিলে ফেল করেছ। ওই মুহুর্তে আমার অবস্থা কেমন হবে তোমার ধারণা আছে? ফোন দিলে ফোন বন্ধ তোমার। এগুলা কি বোকামো নয়? আমি লাইফে সবচেয়ে বাজে খেলেছি আজ। মনে হয়েছে কার জন্য খেলব? আগে নিজের জন্য খেলতাম। এখন তোমার জন্য খেলি। ফেল করা মানে সমস্ত আশায় পানি ঢেলে দেয়া। আমার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সেই মুহুর্তে। ছুটে পালাতে মন চাইল মাঠ থেকে। হেরে গেলাম আমরা। আমি দুইটা গোল মিস করেছি। কোচ কিছু বলেন নি আমার ভাগ্য। হেরেছি আমার আফসোস নেই। হারজিৎ জীবনের অংশ। কিন্তু দুশ্চিন্তা ধরিয়ে দিলে কেন? যতবার ফোন দিয়েছি তোমার ফোন বন্ধ। একটা মেসেজ কি দেয়া যেত না?’
রিদি সিক্ত গলায় বলল, ‘ আম্মু আব্বু ঢাকা এসেছেন । আমি এখন মামার বাসায়। ফোনে চার্জ ছিল না। এই বাসায় এসে চার্জে দিয়েছি। তোমাকে যে দুশ্চিন্তায় ফেল করেছি বলে মেসেজ দিয়েছি, সেটা ভুলেই গিয়েছি। ইচ্ছাকৃত করিনি। মাফ করে দিও। ‘
দ্বীপ নিজেকে সামলে বলল, ‘ আচ্ছা সরি। মন খারাপ করো না। আমি তোমাকে আঘাত করতে চাই নি।’
রিদির প্রানহীন স্বর, ‘ ঠিক আছে, রাখছি। আম্মু ডাকছে।’
রিদি ফোন রেখে দিল। দ্বীপ সারা রাত বারান্দায় দাঁড়িয়ে মশার কামড় খেয়ে কাটাল৷ মেয়েটাকে এত কথা শোনানো উচিত হয় নি। চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। দুশ্চিন্তায় না হয় উল্টাপাল্টা মেসেজ দিয়ে ফেলেছে। তাই বলে এতটা প্রতিক্রিয়া দেখানো কি উচিৎ হয়েছে? পূর্বের রাগ টা যথেষ্ট সংযত রাখার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে যায়। আকাশে আজ মেঘ। চাঁদ টা ঢাকা পড়েছে। আজকের রাত টা দুজনের জন্য সুখের হওয়ার কথা ছিল অথচ হল বিষাদের রাত্রি।
__
একের পর এক ফাইল সাইন করতে ব্যস্ত। সাইন করতে করতে কলমের কালি ফুরিয়ে গেল। নতুন কলম ক্যাপ খুলে সামনে ধরল রানা। চোখের চশমাটা ঠিকঠাক ঠেসে রানার দিকে না তাকিয়ে ফাইলে সাইন করতে করতে প্রশ্ন করল, ‘ জিহান নাকি জাতীয় দলে চান্স পেয়েছে?’
রানার মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। দল ছাড়ার পর ও এমপি সাহেবের মুখ থেকে এই শালার নাম টা যায় না। জবাব না দিলে বেয়াদবি হবে৷ তাই রানা বাধ্য হয়ে বলল, ‘ জি এমপি সাব, আমিও শুনছি। কয়দিন আর এসব খেলবে। ধাপাধাপি শেষ হলে দেখবেন কোথাও কোনো কাজ ও পাবে না। ‘
এমপি এনামুল করিম বললেন , ‘ ওরে খবর দিও আমার সাথে দেখা করার জন্য। ছেলেটা অনেক শাইন করত রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে। কেন যে ছেড়ে দিল। ‘
বাকি চ্যালাদের উদ্দেশ্যে বলল, ‘ একটু যোগাযোগ রাখিস ওর সাথে। খেলা দেখতে যাবি। যদি পারিস সাহায্য করিস। দলে আসার দাওয়াত দিস। কিন্তু খবরদার জোরাজোরি করবিনা। ওকে আমি অনেক স্নেহ করি। কোনো দিন ও বেয়াদবি করে নাই।’
রানার গা জ্বলে উঠল। সারাদিন এমপি সাব বলে বলে মুখের ফেনা তুলে রানা। আর সে মায়া দেখাচ্ছে কিনা ওই জিহানের প্রতি! ক্ষমতা এনামের হাতে বলে কিছু করতে পারছেনা। যেদিন রানা এই চেয়ারে বসবে সেদিন দেখে নিবে এসব জিহান রে। কত জিহান তার পায়ের কাছে বসে থাকবে।
এনাম সাহেব একজনকে ইশারা দিয়ে ডেকে বললেন, ‘ সেলীম, আমাকে একটু বাফুফের প্রেসিডেন্টের সাথে কথা বলিয়ে দিস রাতে। উনাকে বলব জিহানের এক্সট্রা খেয়াল নিতে। যত হোক এক সময় আমার কাজে লাগত।’
রানা কাজের বাহানা দিয়ে বেরিয়ে গেল। আর কিছুক্ষন সেখানে অবস্থান করলে এমপি সাবকে মেরে ফেলতে মন চাইবে তার। রানা বের হতেই এনাম সাহেবের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। চুল তো আর এমনি এমনি পাকে নি? কে ধোঁকা দিচ্ছে আর কে খাঁটি মানুষ এসব বুঝতে তার রকেট সায়েন্স এর প্রয়োজন হয় না।
চলবে…
#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
১২.
রিদনের সাথে প্রমির তুমুল ঝগড়া চলছে। ঝগড়ার কারণ হল রিদন বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে ট্যুরে যেতে পারবে না ৷ সেটা যেমন ট্যুরই হোক। ভার্সিটি ট্যুর কিংবা ফ্রেন্ডস ট্যুর যেমনই হোক। রিদনের মনে হচ্ছে এসব বাচ্চা মেয়েদের সাথে সম্পর্কে জড়ানোর অসুবিধা হল এরা বুঝে কম, হাউ কাউ করে বেশি। ঝগড়ার এক পর্যায়ে প্রমি ফোন রেখে দিয়েছে। বাবার একমাত্র মেয়ে প্রমি । কিছু চাওয়ার আগেই হাজির হয়ে যায়। পড়াশোনাটাও কোনো রকম চালিয়ে যাচ্ছে। তার উদ্দেশ্য স্বামীর সাথে ফরেন ট্যুর দেয়া। রিদনকে ভেবেছিল সাদাসিধা কিন্তু তার ভাবনায় এক বালতি কাদা ঢেলে দিয়ে রিদন হয়ে গেল ব্যাকা ত্যাড়া। সম্পর্কের আজ ছয়মাস। এই ছয়মাসে তাদের মধ্যে প্রেমের আলাপের চেয়ে ঝগড়াটাই বেশি হয়েছে। দুজন দুজনের ভুল ধরতে ব্যস্ত থাকে। এই যে গতমাসে প্রমি মামাতো ভাইয়ের বিয়েতে গিয়েছিল। শাড়িতে তাকে বেশ লাগছিল। গায়ে হলুদের ছবি তুলে রিদনকে পাঠাতেই রিদন প্রমির প্রশংসা না করে পেছনের ছেলেটা তার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে কেন সেটা নিয়ে পড়ল। প্রমি রেগে গিয়ে দুইদিন রিদনের সাথে কথা বলেনি। না না রিদনকে ডমিনেটিং ফিগার ভাববেন না। প্রমিও কম নয়। গত সপ্তাহে ক্যাম্পাসের গাছ তলায় রিদন বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিচ্ছিল। এরমাঝে প্রমি ফোন দিয়েছে। ফোনে কথা বলার সময় রিদনের এক বান্ধবী কথিকা রিদনকে বলল, ‘ তোর সব সময় গার্লফ্রেন্ড এর জন্য। আমরা কি দোষ করেছি? এই মেয়েটা তোর জীবনে আসছে কয়দিন হয়েছে?’
কথাটা কথিকা আস্তে বললেও প্রমির কান অবধি পৌঁছে গিয়েছে। এরপর শুরু হয়ে গিয়েছে রেডিও বাজানো, ‘ যাও যাও ওইসব মেয়ের কোলে উঠে বসে থাক। আমি তো ভালো না। জীবনে তাদের পরে আসছি। ‘
এমন আরো অনেক কিছু। এত এত ঝগড়ার পর ও যখন সম্পর্ক বিচ্ছেদের কথা আসে দুজনই প্রতিজ্ঞা করে আর ঝগড়া করবে না। এইতো এভাবেই তাদের দুষ্টু মিষ্টি প্রেম টিকে আছে। দুজনের কারোরই আপাতত পরিবার থেকে বিয়ের তাড়া নেই। তবে প্রমি চায় বুড়ি হওয়ার আগেই জীবনটাকে উপভোগ করতে। দেশ বিদেশ স্বামীর হাত ধরে ঘুরতে। রিদন প্রমির এসব কথা শুনলে অট্টহাসি দিয়ে বলে, ‘ ওই সব সুযোগ হয়ত পাবা না প্রমি বেগম। ঘরে যদি বউ হিসেবে অঞ্জু ডাইনি আসে। তোমাকে কাজের বুয়া বানাবে। ‘
প্রমিও তিরিক্ষি মেজাজে বলে, ‘ অঞ্জু ডাইনী হলে আমি ডাইনী তাড়ানোর কবিরাজ। ওর ডাইনী গিরি ছুটিয়ে দেব। মরিচ বেটে নাকে চোখে লাগিয়ে দেব।’
রিদন বলে, ‘ অঞ্জুরে দেয়ার আগে একটু ফুফুরে দিও। ফুফুই মূল কান্ডারি। আমি তোমাকে বম্বে মরিচ এনে দেব। হাতে গ্লাভস লাগিয়ে বাটবে। নাহলে রাতে আমি তোমার হাতে আদর করলে তো আমার মুখ জ্বলবে।’
ওরেহ প্রেম! প্রমি তো আদরের কথা শুনেই লজ্জায় কুটি কুটি হচ্ছে। ইশ কি ভাল লাগে যখন এভাবে প্রেমিক পুরুষ আদর করবে বলে। রিদনটাও এত লজ্জা দিতে পারে? প্রমি ও পাশ থেকে লজ্জা পেয়ে বলল, ‘ যাহ! আমি রাখছি। আমার লজ্জা লাগে।’
রিদন আরো লজ্জা দিয়ে বলে, ‘ ও আমার তুলতুলি, আমার লজ্জাবতী। আমার কাছে আসলে সব লজ্জা গায়েব করে দেব।’
আহা! কি সুন্দর প্রেম। অথচ এসব প্রেমের মাঝেই শুরু হয়ে যায় ঝগড়া। কথার মাঝে খুঁত বের করে চতুর্থ, পঞ্চম বিশ্বযুদ্ধ লাগিয়ে দেয়ার উপক্রম হয়। অবুঝ প্রমি দুদিন খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে তিনদিনের দিন অপরিচিত মডেলদের ছবি পাঠিয়ে রিদনকে ভয় লাগায় এর সাথে, ওর সাথে সম্পর্কে জড়াবে। এই ছিল তাদের গল্প। তবে যেদিন দ্বীপের সাথে প্রমির দেখা হয়েছিল সেদিনের কথা রিদনের সাথে শেয়ার করেছিল। রিদন প্রচন্ড রেগে গিয়েছিল প্রমির উপর, বড় ভাইয়ের সাথে এভাবে কথা বলার জন্য। দ্বীপ এসব পছন্দ করে না সোজাসাপটা জানিয়েছে প্রমিকে। ভবিষ্যতে যেন এসব না করে। প্রমিও নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে।
__
অক্টোবর মাস চলে এসেছে। মেডিকেলের ডেট দিয়েছে। দুদিন পর এক্সাম। দ্বীপের সাথে সেদিনের পর থেকে রিদির মন কষাকষি চলছে। দুজনেরই কথা হয় তবে দেখা হয় না। কথা হলেও খুব সামান্য। রিদি পড়ার ব্যস্ততা দেখায়। দ্বীপ বিরক্ত করে না। এত কাছে থেকেও দুজনের মাঝে পাহাড়সম অভিমান। যেসব মানুষ বেশি আদর যত্ন করে তাদের কাছ থেকে কষ্ট পেলে আমাদের মন মেনে নিতে পারে না। দ্বীপ বেশ কয়েকবার সরি বলার পর ও রিদি কেমন দমে গিয়েছে। এই বিষয়ে কথা বললেই রিদি প্রতিউত্তরে বলে,
‘ এসব কথা বাদ দাও। খেলায় মন দাও। আমার পরীক্ষা শেষ হলেই আম্মু দেখা করতে চাইবে। একটা ভালো পজিশনে না গেলে আম্মুকে মানানো কষ্ট হয়ে যাবে। আম্মু না মানলে আব্বুকে মানানো আরো কঠিন। ‘
দ্বীপ ও কথা বাড়ায় না। ভেতরে ভেতরে কষ্ট জমিয়ে শান্ত থাকে। এই যে কিছুদিন আগেও বেশ কয়েকবার দেখা করতে চেয়েছিল। রিদি রাজিই হল না। হোস্টেলের সামনে এসে এক পলক দেখে যাবে বলল, এতেও রিদি রাগ করল। আজ অক্টোবরের তিন তারিখ । পরশু রিদি রাহার বাসায় চলে যাবে। সেখান থেকে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার কেন্দ্র কাছে। আগামীকাল দ্বীপের ম্যাচ আছে। পরীক্ষার আগে আর দেখা হবে না ওদের। পরীক্ষা যদি ভালো না দেয় আমিনা বলেছেন রিদিকে নোয়াখালী নিয়ে যাবে। ওখানের সরকারি কলেজে ভর্তি করিয়ে, বিয়ে দিয়ে দিবে।
আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই রিদিকে খুব মনে পড়ছে। বাসা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় হাঁটছে একা। ঢাকার রাস্তা নিরিবিলি পাওয়া কল্পনাতেও অসম্ভব। এখানে দিন রাত বলে কোনো কথা নেই। হ্যাঁ মধ্য রাতে গাড়ির সংখ্যা তুলনামূলক কমে যায়, তবে একেবারে শান্ত কখনও হয় না। বাসার পাশে হাতিরঝিল। লেকের পানিতে দৃষ্টি নিবদ্ধ। মেসে খাবার আজ ভাল না। চিচিঙ্গার তরকারি। ম্যাচ খেলে যে সম্মানি পায় ওটা এখনও খুব একটা বেশি না। বাবার কাছে টাকা চাইতে লজ্জা লাগে। সেদিন বাবা বললেন,
‘ না পারলে খেলা বাদ দিয়ে দাও। চাকরি করো বা ব্যবসা ধরো। বাংলাদেশে ফুটবলের দাম নাই।’
পকেটের ফোনটা বেজে উঠল। হাতে নিয়ে দেখে রিদির ফোন। রিসিভ করতেই প্রশ্ন করল, ‘ কোথায় আছ?’
‘ লেকের পাশে বসে আছি।’
‘ ওখান থেকে ফার্মগেট আসতে কতক্ষন লাগবে?
‘ ঘন্টা খানেক।’
‘ চলে আসো হোস্টেলের নিচে।’
দ্বীপের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। ফোন পকেটে রেখে বাসে উঠল। পকেট হাতিয়ে দেখল পাঁচশো টাকার দুটো নোট আছে। শেষ সম্বল এই মাসের। রিদি যেমন মেয়ে এই টাকা দুপুরে দুজনের খাবার হয়ে আরও থাকবে। যদি না হয় বন্ধুদের ফোন দিয়ে ধার নিবে।
মনিপুরী পাড়ায় হোস্টেলের সামনে এসে কল দিতেই রিদি নেমে এল। হাতে একটা শপিং ব্যাগ। পরনে দ্বীপের দেয়া কমলা কাতান শাড়িটা। আজ হিজাব পরেনি। চুল খোলা। কানে এক জোড়া সোনালী রঙের ঝুমকা। হাতে কাচের চূড়ি। দ্বীপ আজ প্রথম বার চুল খোলা রিদিকে দেখল। রিদি এগিয়ে আসছে, দ্বীপের বুকের ভেতর কম্পন বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুকনো ঢোক গিলল। নিজের দিকে তাকিয়ে দেখল, জীবনের সবচেয়ে জঘন্য ফকিরের বেশ আজকে লাগছে। সাদা পুরোনো টি শার্ট এর উপর একটা কালো শার্ট চাপানো। পুরনো ডেনিম প্যান্ট। পায়ে এপেক্স এর দুই বেল্টের স্যান্ডেল। সে কি আর জানত আজ রিদি এই বেশে তার সামনে হাজির হবে? ভেবেছিল হোস্টেলের নিচে দেখা করতে আসবে। অথচ এই মেয়ে রীতিমতো বউ সেজে চলে এসেছে। মাথায় ঘোমটা তুললেই চলবে।
রিদি দ্বীপের দিকে শপিং ব্যাগটা বাড়িয়ে বলল, ‘ এটা ধরো, আমি শাড়ি সামলে হাঁটতে পারছিনা।’
দ্বীপ অভিমান গলায় বলল, ‘ আজ এমন হুরপরী না সাজলে কি হত? আমার দিকে তাকিয়ে দেখেছ কেমন লাগছে? তোমার বডিগার্ড ও নিয়োগ দিবে না কেউ?’
রিদি চোখ পাকিয়ে বলল, ‘ বাজে কথা বন্ধ কর। তোমার সাজার কি প্রয়োজন? যেভাবে আছ আমার তাতেই চলবে ৷ সিনেমায় অডিশন দিতে তো আর যাচ্ছ না। একটা সি এন জি ডাকো। লেকে নিয়ে চলো। ‘
দ্বীপ বিষন্ন মনে সি এন জি ডাকল। দুজনই উঠে বসল। দ্বীপ আঁড়চোখে বার বার রিদিকে দেখছে। চোখ ফেরাতে পারছে না। এই যে গরমে অতিষ্ঠ হয়ে রিদি চুলে হাত খোঁপা করল। ঠোঁটে উপর স্বেদজল দেখা যাচ্ছে। টিস্যু দিয়ে চেপে চেপে মুচছে। দেখতে কি অপূর্ব লাগছে! ধানমন্ডি বত্রিশে এসে একটা চাপ রেস্টুরেন্টে বসল। সেখানে রিদি খাবার অর্ডার দিল। দ্বীপ কে জানাল আজ সে খাওয়াবে। ওই যে শপিং ব্যাগ, সেটা থেকে একটা টিফিন ক্যারিয়ার নামাল। টিফিন ক্যারিয়ার খুলতেই তিন পদের খাবার সামনে রাখল। হলুদ পোলাও, ছোট ছোট রোস্ট, আর দুটো ডিম ৷ আরেকটা বক্স খুলতেই কয়েক পিস কেক। কাটা চামচ বের করে কেক নিয়ে দ্বীপের মুখের সামনে ধরে বলল, ‘ শুভ জন্মদিন মাই ম্যাজিশিয়ান। ভুলিনি আপনার জন্মদিন। সারপ্রাইজ দিব বলে কাল থেকে এসব আয়োজন করছি। ইচ্ছে করে ফোনে উইশ করিনি।’
দ্বীপ নিষ্পলক তাকিয়ে আছে। হয়ত অনুভূতি প্রকাশের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। রিদি নিজে নিজে বলেই যাচ্ছে, ‘ ছোট খালামনি বলেছিল উনি যখন আংকেলের সাথে প্রেম করতেন তখন এভাবে টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি করে খাবার নিয়ে যেতেন। আংকেল তখন কলেজ হোস্টেলে থাকত। বুয়ার রান্না খেয়ে বাথরুম তার প্রিয় জায়গা হয়ে যেত। খালামনির রান্না তৃপ্তি নিয়ে খেতেন। আমার ও মনে হল, আমি কেন আমার দ্বীপকে এখন পর্যন্ত রান্না করে খাওয়ালাম না? পরে মনে পড়ল আমি তো একটা আমড়া কাঠের ঢেঁকি। রান্নাই পারিনা। গতকাল বাজার করেছি সন্ধ্যা আপুকে সাথে নিয়ে৷ পোলাও চাল কিনেছি, মুরগী কিনেছি, ডিম কিনেছি। রাতে হোস্টেলের খালাকে ডেকে এনে মুরগীটা কেটে রান্না করেছি। ডিম রান্না করেছি। আর আসার সময় পোলাও রান্না করেছি। সব সন্ধ্যা আপু,খালা আর ইউটিউব এর সাহায্য নিয়ে। পোলাও তে লবন কম হয়েছে তাই সাথে আলাদা করে লবন এনেছি। রোস্টটা মনে হয় একটু মিষ্টি, দুধের পরিমান বেশি হয়ে গিয়েছে। তবে ডিম টা ভালো হয়েছে খেয়ে দেখো? একটা ভুল করেছি। পোলাও তে ভুলে অল্প হলুদ দিয়ে ফেলেছি। আজকের জন্য ম্যানেজ করে নাও, যদিও জানি তুমি কখনোই রান্না নিয়ে মন্তব্য করবে না। আর কেক টা হোস্টেলে এনে তোমার নাম করে কেটে সবাইকে খাইয়েছি। তোমার জন্য দুই পিস ফ্রিজে রেখেছি। মিরাটাকে মিস করেছি। ও তো ওর খালার বাসা থেকে পরীক্ষা দিবে।’
রিদি থামলো এক টানা বক বক করে। দ্বীপ মাথা নত করে কনিষ্ঠ আঙুল দিয়ে চোখের কোণা মুছল। রিদির দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ‘ এত কষ্ট করে যখন এত কিছু করেছ, নিজের হাতেই এক চামচ খাইয়ে দাও।’
রিদি হেসে পানির বোতল খুলে হাত ধুয়ে বলল, ‘ চামচ দিয়ে কেন? আমার হাত দিয়েই দুই লোকমা খাইয়ে দিই।’
দ্বীপ সাথে সাথে বাঁধা দিয়ে বলল, ‘ আর মেরো না আমাকে। এমনিতেই যা যা করেছ ওগুলোই নিতে পারছিনা। এখন খাইয়ে দিয়ে পুরোপুরি মেরে ফেলার বন্দোবস্ত করছ? পরীক্ষা টা ঠিকঠাক দাও। যদি মিস হয়, আমি কোথায় যাব রিদি? তোমাকে তো জোর করে নিয়ে যাবে। প্রতিবাদ করতে পারবে না কোনোভাবে। আমার মন বলছে এটাই আমাদের হয়ত শেষ দেখা। কেন জানিনা মনে হচ্ছে তুমিও জানো এটা আমাদের শেষ দেখা তাই না?’
রিদি টিস্যুতে হাত মুছে হাসছে। এই হাসিতে প্রাণ নেই। দ্বীপকে তাড়া দিল খেতে। দ্বীপ নিজেই হাত ধুয়ে খাচ্ছে। পেট ভরে খেয়েছে। রিদি চাপ হাউজ থেকে অর্ডার দেয়া খাবার টা খাচ্ছে। খাওয়া শেষে দ্বীপ প্রশ্ন করল, ‘ কেন মনে হলো তোমার যে এটাই আমাদের শেষ দেখা?’
রিদি কিঞ্চিৎ হেসে বলল, ‘ চাচ্চু একটা পাত্র এনেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক। আব্বু রাজি।’
দ্বীপ একপেশে হাসি দিয়ে বলল, ‘ তোমার জন্য সুযোগ্য পাত্র। তোমাদের দুজনকে মানাবে দারুণ। ‘
হঠাৎ দ্বীপ প্রশ্ন করল, ‘ আচ্ছা রিদি তুমি মেডিকেলে টিকে গেলে কি বিয়েটা ভাঙতে পারবে?’
রিদি হেসে বলল, ‘ পারব।’
‘ কিভাবে?’
‘ বিয়ে দিলে মেডিকেলে পড়ব না বলে বায়না ধরব।’
‘ তাহলে প্লিজ টিকে যাও। আমার হয়ে থাকো।’
‘ ইনশাআল্লাহ, শেষ চেষ্টা দেখি কি হয়? আচ্ছা ভালো কথা, তোমার জন্য উপহার নিতে পারিনি। শপিং মল চিনি না। সেজান পয়েন্ট বা ফার্মগেটের ভ্যান প্লাজায় আমার পছন্দের কিছু নেই। ‘
দ্বীপ ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে বলল, ‘ আর কী উপহার দিতে চাও বলো তো? তুমি আমাকে আজকে যা দিয়েছ তা আমার জীবনের সেরা উপহার গুলোর একটি। এত কেয়ার আম্মু আর সাজিনা ছাড়া কেউ কখনও করে নি। ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করব না। শুধু অনুরোধ করব…
দ্বীপ থামলো। রিদি কথা শেষ করতে বলাতে দ্বীপ বলল, ‘ আমার যত্ন করার জন্য জীবনে থেকে যাও।’
রিদি মাথা নুইয়ে হাসে। দ্বীপ পুনরায় বলে, ‘ তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে। বউ বউ লাগছে।’
__
দ্বীপ বাসায় ফিরে এসে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। আজ প্র্যাক্টিসে যায় নি। পেট ভরা একটু ঘুমাবে। এমন সময় ফোন এলো। রিসিভ করতেই ও পাশ থেকে বলল, ‘ জিহান তোর কোনো সমস্যা হচ্ছে ক্লাবে?’
পরিচিত স্বর শুনে চমকে উঠল। জবাবে বলল, ‘ না ভাই। সব ঠিক আছে। আপনি কেমন আছেন?’
‘ আমি ভালো আছি। আমারে তো তুই ভুলেই গেছিস। খোঁজ ও নেস না।’
‘ আসলে ভাই এত ব্যস্ত থাকি, সারাদিন মাঠে না হয় টার্ফে থাকি। সুযোগই হয় না।’
‘ আচ্ছা ভালো খেলিস। আমাদের মুখ উজ্জ্বল করিস। যদি মনে হয় খেলায় পারবিনা। দলে ফিরে আসিস। তোর জন্য আমি অপেক্ষা করব। পরবর্তী নির্বাচনে আমি মন্ত্রীত্ব পাব হয়ত। তুই তখন এমপির ইলেকশন করিস। ‘
‘ আচ্ছা ভাই, আগে দেখি খেলায় কী হয়।’
এনামুল করিম দ্বীপকে আরো অনেক কিছু বুঝিয়ে ফোন রাখল। দ্বীপ মুখ গোমড়া করে শুয়ে ভাবল, যে সমস্যায় আছি, প্রধানমন্ত্রী হলেও সলভ হবে না। আর আপনি বলছেন এমপি হওয়ার কথা।’
___
৭ই অক্টোবর, ২০১৬
ফযরের আযানের ধ্বনি কানে আসছে। ঘুম ঘুম চোখে উঠে বাথরুম গেল। একেবারে ওযূ করে বের হল। ফযরের সালাত আদায় করে কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। স্রষ্টার কাছে ফরিয়াদ করল রিদির পরীক্ষা টা যাতে ভাল হয়। অথচ আজ তার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ আছে সেই কথা ভুলে বসে আছে।বিছানার পাশে বিস্কুটের কন্টেইনার থেকে দুই পিছ বিস্কুট নিয়ে খেল। লাল সূর্য পৃথিবীতে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর দ্বীপ দেখতে পাচ্ছে তার জীবনের প্রথম বিষন্ন সূর্যোদয়।
ইডেন কলেজে সিট পড়েছে রিদির । কিছুক্ষন আগে পরীক্ষা শেষ হয়েছে । আকাশে মেঘ করেছে। অক্টোবরের বৃষ্টি। আচ্ছা অক্টোবর রেইন তো সুন্দর, স্নিগ্ধ এবং কোমল হওয়ার কথা কিন্তু এত বিষন্ন কেন? এই যে ঝপাঝপ বৃষ্টি হচ্ছে, ইডেনের প্রতিটি গাছের ধুলো বালি সাফ করে ফেলেছে, প্রকৃতিকে চকচকে, তকতকে বানিয়ে ফেলেছে অথচ রিদির মনের কোণে বসা ধুলো বালি গুলো গেল না । এক সময় সেগুলো প্রকান্ড হবে, তখন ঝড় আসবে। অক্টোবর রেইন আর জীবনে আসবে না। ইডেনের গেটের সামনে দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে তার অপেক্ষায় । বাবা আর দুলাভাই। তাদের প্রত্যাশা রিদি আজ ভাল পরীক্ষা দেবে। আরেকজন আছে যে আজ এই মুহূর্তে স্টেডিয়ামে ম্যাচ খেলতে ব্যস্ত। এদের প্রত্যেকের আশা ভরসায় পানি ঢেলে দিয়ে রিদি আজ অত্যন্ত বাজে পরীক্ষা দিয়েছে। এত কনফিউজিং প্রশ্ন এর আগে কখনো এসেছে কিনা জানেনা? সব নেগেটিভ মার্ক হবে । চিৎকার দিয়ে কান্না করতে ইচ্ছে করছে রিদির। বাসায় যেতে ইচ্ছে করছে না। তবুও মনের সাথে জোর খাটিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে। তুমুল বৃষ্টি, পরীক্ষার্থীরা ভিজে একাকার। রিদি কাঁদছে, বৃষ্টির পানিতে মিশে যাচ্ছে সেই জল। ভিজে গিয়েছে রিদি। বাইরে এসে বাবা এবং দুলাভাইয়ের হাত ধরে সি এন জি তে উঠল। জাবেদ সাহেব মেয়ের মুখ দেখে কি বুঝলেন কে জানে? একটি বারও প্রশ্ন করলেন না। রাহার বাসায় সবাই আছে। রায়হান ও চুপচাপ। বাসায় পৌঁছানোর পর আমিনা প্রশ্ন করল পরীক্ষা কেমন দিয়েছে? রিদি জবাবে বলল, ‘ যা পেরেছি দিয়েছি, হবে না মনে হয়।’
আমিনা শান্ত স্বরে বলল, ‘ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাও শেষ। জাহাঙ্গীরনগর বাকি আছে। দিয়ে দেখো, হলে তো হল না হলে আমাদের সাথে নোয়াখালী নিয়ে যাব। এত টাকা আর তোমার পিছনে ঢালতে পারব না। এসব প্রেমে টেম করে পড়াশোনার জলাঞ্জলি দিয়েছ। ওই ছেলের সাথে যেন কথা বলতে না দেখি।’
দুপুরের ভাত খেতে বসেছিল রিদি। ভাতের প্লেটে টুপটুপ করে পানি পড়ছিল। আমিনা আশপাশে তাকিয়ে দেখল কেউ নেই। রাহার ননদ ও এবার পরীক্ষা দিয়েছে। এতক্ষন গোসলে ছিল। বের হয়ে রিদিকে দেখে প্রশ্ন করল, ‘ রিদি তোমার পরীক্ষা কেমন হলো? কত থাকবে?’
নাকের পাটাতন ফুলে এলো রিদির। রায়হান বোনকে বলল, ‘ খেয়ে নে। এসব নিয়ে পরে আলোচনা করিস।’
বিথী মাথা কাত করে ভাইয়ের কথা মতো খেতে বসল। আমিনা বেগমের চোখে মুখে হতাশা। জাবেদ সাহেব দুপুরে খেলেন না। রাহা রান্নাঘরে কাজ করছে। তার চোখ মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে কেঁদেছে। এত সাধনা করেছে বোনটা অথচ আজ পরীক্ষাটা খারাপ দিল। ছেলে মেয়ে দুটো ছুটোছুটি করছে। বকে ধমকে রায়হানকে বলল ওদের খাওয়াতে। বিকেল হতে না হতেই জাবেদ সাহেব রিদিকে নিয়ে নোয়াখালী চলে আসার প্রস্তুতি নিলেন । মেয়ের বাসায় থাকতে উনার ভালো লাগছিল না। নোয়াখালী পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় রাত দেড়টা। বাসায় ঢুকে রিদি নিজের কামরায় প্রবেশ করল। ফোন হাতে নেওয়ার সাহস টুকু হচ্ছেনা। আমিনা সারাক্ষণ নজরে নজরে রেখেছে। শরীর প্রচন্ড ক্লান্ত। বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়ে চলন্ত ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছে। মস্তিষ্ক ফাঁকা। রিদি আপাতত সব ভুলে যেতে চায়। যদি এমন হত যে বিগত কয়েক বছরের স্মৃতি রিদি ভুলে যেত! যদি এমন হত যে রিদি কাউকে চিনতে পারছে না! তবে কি রেহাই পেত এমন পরিস্থিতির হাত থেকে। কেমন গুমড়ে যাওয়া পরিস্থিতির সম্মুখীন করল স্রষ্টা!
__
মেসেজ টার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দ্বীপ। আজ ভাল খেলেছে। জিতে ফিরেছে। গোল করেছে। কিন্তু সেই জয় এ আজ আনন্দ নেই। মেসেজে লেখা, ‘ পরীক্ষা বাজে দিয়েছি। আব্বু নোয়াখালী নিয়ে এসেছে।’
ডায়াল চেপে মাকে ফোন দিল। ওই পাশ থেকে রাহেলা ফোন রিসিভ করতেই দ্বীপ নিজ থেকে বলল, ‘ আম্মু রিদি পরীক্ষা খারাপ দিয়েছে, ওকে নোয়াখালী নিয়ে গিয়েছে।’
রাহেলাও চুপ করে আছে। ছেলের মনের অবস্থা স্পষ্ট বুঝতে পারছে। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল, ‘ আচ্ছা ধৈর্য্য ধরো। কি হয় দেখি। তুমি তো এখনও সেই অবস্থানে যাও নি যে আমরা প্রস্তাব নিয়ে যাব। ‘
‘ প্রস্তাব দিতে হবে না। আমি ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিয়েছি আম্মু। মন খারাপ ছিল তাই আপনাকে কল দিলাম। আপনার সাথে কথা বলে শান্তি পাই।’
রাহেলা মৃদু হেসে বললেন, ‘ একটা গল্প শুনবে?’
‘ কী গল্প?’
‘ আমার যখন বিয়ে হল তখন আমি কেবল অনার্সে ভর্তি হয়েছি। আমার আব্বার হয়ত অনেক টাকা ছিল না তবে সুখ ছিল। তোমার আব্বু কলেজ যাওয়ার পথে আমাকে দেখে পছন্দ করলেন। এরপর তোমার দাদাকে দিয়ে প্রস্তাব পাঠালেন। আব্বা রাজি হলেন না। কি কারণে জানো? ‘
‘ কি কারণ?’
‘ কারণ আব্বার মনে হয়েছে আমি অশান্তিতে থাকব। এত আদরের মেয়ে কষ্ট পাবে আব্বা এই কথা মেনে নিতেই পারবে না। প্রথমবার প্রপোজাল ক্যান্সেল হলেও তোমার আব্বু নাছোড়বান্দা। সে আমাকে কলেজে যেতে, প্রাইভেটে যেতে ঠিকই ফলো করত। একদিন আব্বা দেখে ফেললেন। তোমার আব্বু অনুরোধ করলেন। এর মাঝে আমারও তোমার আব্বুর প্রতি সফট কর্ণার তৈরি হলো। আব্বা আমাকে জিজ্ঞেস করাতে বললাম আমি রাজি। বিয়েটা সুন্দর করে হলো ঠিকই কিন্তু সুখের দেখা পেলাম না বিয়ের প্রথম কয়েক বছর। বিয়ের পর তোমার আব্বু তার মা- বোনদের কথায় চলত আর আমাকে আমার আব্বা বলত ধৈর্য্য ধরো। সেই ধৈর্য্য ধরতে ধরতে আজ এত বছর। এখন আমি আলহামদুলিল্লাহ ভাল আছি। এখন তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করতেই পারো আম্মু আগা নাই, মাথা নাই এই গল্প কেন বললেন? এই গল্প বলার কারণ হলো, তুমি রিদির জন্য যেই ভালোবাসা দেখাচ্ছ তোমার আব্বুও আমার জন্য দেখিয়েছিল। বিয়ের পর সে দূরত্ব টেনে এনেছিল। আমি দিন রাত কেঁদেছি। কষ্ট পেয়েছি। আমি চাই না রিদি সেই কষ্ট পাক। তোমরা ছেলেরা বিয়ের আগে উজাড় করে ভালবাস। বিয়ের পর সেই টান হারিয়ে যায়। যদি রিদির জন্য সিরিয়াস হও তবে আমার অনুরোধ স্যাটেল হও। আমার বাবা যে আফসোস করেছে, রিদির বাবা না করুক। তোমার কাছে যতদূর শুনেছি রিদি তার বাবার প্রাণ। তুমি রিদিকে কষ্ট দিলে আমি কষ্ট পাব। তোমার বাবা যদি আমাদের বিয়ের পর শক্ত থাকতেন আমি কষ্ট পেতাম না। শাশুড়ী হিসেবে আমি কেমন হব জানিনা, তবে তুমি স্বামী হিসেবে কেমন হতে চাও ভেবে দেখো। তোমার হাতে সময় অল্প। আমি রিদির বিয়ে এক বছরের জন্য আটকানোর ব্যবস্থা করছি। আমাকে রিদির নাম্বার দাও।’
দ্বীপের নিজেকে নিঃস্ব লাগছে। মায়ের উপর বিশ্বাস রাখতে ইচ্ছে করছে। মাকে রিদির নাম্বার দিয়ে ব্লক হেডেড হয়ে শুয়ে পড়ল। এরপর বাকি এক সপ্তাহ কেটেছে দুঃস্বপ্নের মত। দ্বীপ স্পেন যাবে খেলতে। খবরে শিরোনামে দ্বীপের নাম উঠছে। রিদি ফোন ধরে না। আমিনা ফোন নিয়ে গিয়েছে। বাবা যখন টিভিতে খেলা দেখে তখন দ্বীপকে দেখতে পায়। টুকটাক প্রশংসা করে বাংলাদেশ টিমের। এরা খেলায় উন্নতি করছে, এভাবে খেললে বাংলাদেশ বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, ফুটবলে নাম কামাবে আরও অনেক কিছু। মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
কিন্তু বাবা একটা কথা প্রায় বলে, ‘ এই ছেলেটাকে কোথায় যেন দেখেছি। ‘ রিদি এই কথার মানে হদিস করতে পারে না।
এরপর যতগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিল একটিতেও নাম আসেনি রিদির। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় ফেল এসেছে। অনেকটা ভেঙ্গে পড়েছে। বার বার মনে হতে লাগল এইচএসসির ফলাফল টা দিয়ে কি কাজ? বাবা আজ তার জন্য মুখ দেখাতে পারছে না বন্ধু সমাজে।
চলবে…
