Thursday, June 4, 2026







হৃদিতে রিদি পর্ব-১৩

#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
১৩.
( কপি করা নিষেধ)

বর্তমান প্রেক্ষাপট,

দেশের কোনো এক প্রান্তে প্রলয়ঙ্কারী ঝড় হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। ঢাকার আকাশ মেঘলা। কেমন সন্ধ্যা সন্ধ্যা ভাব। ঝড় হবে। বারান্দার কাপড় গুলো দড়ি থেকে টেনে ভেতরে ঢুকাচ্ছে রিদি। ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে নাম টা পরিচিত। রিসিভ করতে ও পাশ থেকে প্রশ্ন করল, ‘ এমন কিছু করো না যার জন্য আল্লাহ নারাজ হবেন। তোমাকে আমি এমন শিক্ষা দিই নি। ‘

বাকি কথা শোনার প্রয়োজন বোধ করে নি রিদি। ফোন কেটে দিল। রিদির মনের অবস্থা তো কেউ জানতে চায় নি। সবাই জ্ঞান দিবে। বর্ষাকাল রিদির বেশ অপছন্দ। মানুষ বর্ষায় রোমান্টিক হয়, আর রিদির মনে হয় আকাশ থেকে বৃষ্টির বদলে বিষাদ ঝরে পড়ছে। অথচ একটা সময় এই বর্ষাই ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় ঋতু।

এই বর্ষায় ঢাকার অলিগলিতে হাত ধরে হেঁটেছে দুজন। এই বর্ষায় ব্যস্ততম রাস্তায় মুখে মাস্ক পরে বুকের বাম পাশে আগলে রাখত রিদিকে। কিছুদিন আগেই রাহা রিদিকে প্রশ্ন করল, ‘ সম্পর্কে ভাঙতে সময় লাগে না, গড়তে সময় লাগে। ‘

চুয়াল্লিশ তম বিসিএস পরীক্ষার ভাইভা দিয়ে বাসায় এসে দেখতে পেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু নিয়াজ একটা ছবি পাঠিয়েছে ফোনে । ছবিটা দেখে সন্দেহ হলেও মনকে রিদি বুঝিয়েছে শত বার, সহস্র বার বুঝিয়েছে, ‘ আমি যাকে জানি সে আমার, ওরা যাকে দেখেছে সে অন্য কারো।’

সেদিন ও বৃষ্টি হয়েছিল। রিদির ভাইভার মত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় না গিয়ে রেস্টুরেন্টে কেন? দেশে এসেছে এই সংবাদ ও কি রিদির কাছ থেকে গোপন রাখতে হলো। সময় এভাবে ছুটে যায় কি করে?
___

২০ জানুয়ারি, ২০১৭

ঋতু বদলে গেল, এক বর্ষা পেরিয়ে আরেক বর্ষা এলো। রিদি মাকে বলে আজ ছাদে এসেছে ভিজতে৷ আমিনাও বারণ করেনি। বাসায় রিদির ফুফু বেড়াতে এসেছে। সেই ফুফুর একটাই মেয়ে আছে। মেয়েটার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে। স্বভাব চরিত্র ভাল কিন্তু বিয়ে টিকল না। বয়সে রিদির বড়। নাম সীমা। দুজন মিলে বৃষ্টিতে ভিজছে। কিছুক্ষন ভিজে দুজন সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসল।

সীমা নিজ থেকেই বলল, ‘ রিদি এখন বাসা থেকে বিয়ের জন্য চাপ দিলে রাজি হোস না। আমাদের পরিবারে ট্রেডিশন মেয়েদের বিয়ে দেয়া নয়, নিজেদের বংশীয় রীতি বজায় রাখা। এই যে আজ আম্মা আর নানী এসেছে তোদের বাসায়। কারণ কি জানিস? তোর বিয়ের ব্যবস্থা করা। দেখবি রাতের মধ্যে দুটো বায়োডাটা বের করবে। নানীর ইন্ধনে আমার জীবন টা ছারখার হয়ে গেল। তুই একই ভুল করিস না। মেয়েদের নিজের অবস্থান শক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। আমার পড়াশোনা টা ও বন্ধ। এসবের জন্য কে দায়ী বল? আমার কপাল? না আম্মা এসবের দায়ভার নিবে, না নানী। উলটা আমাকে বলে আমার পোড়া কপাল। নিজেদের ভুল চোখে দেখেনা।’

রিদি দুঃখ ভারাক্রান্ত গলায় বলল, ‘ লাভ ম্যারেজ করলে ভাল থাকতে সীমাপু।’

সীমা মৃদু হেসে বলল, ‘ পাগলী। রাহা আপু ভাল আছে বলে কি সবাই ভাল থাকবে নাকি? রাহা আপু কেন ভাল আছে জানিস? কারণ আপুর নিজে অবস্থান অনেক শক্ত। চাইলেই একটা চাকরি পাবে, ভাইয়ার উপর নির্ভরশীল না। উনাদের দুজনের নিজেদের প্রতি শ্রদ্ধা আছে। আমার প্রাক্তনের অনেক টাকা ছিল ঠিকই আমার প্রতি সম্মান ছিল না। তবুও আমি সংসারটা করতে চেয়েছিলাম আম্মু দিল না। কাবিনের টাকা গুলো নিয়ে কী করেছে তাও জানিনা। এখন আর এসবে মাথা ঘামাই নারে। তোর ভাল চাই বলে তোকে সামান্য জ্ঞান দিলাম।’

রিদি বোনকে জড়িয়ে ধরল। সীমা আপু পড়াশোনা কম করলেও তার কথা শুনতে রিদির বেশ লাগে।

রাতে বাসায় রিদির বিয়ের কথা উঠছে। পাত্র দেখা শুরু হয়েছে। রিদির দাদী ও ফুফু বেশ কিছু বায়োডাটা দেখাচ্ছে। জাবেদ সাহেব বললেন নেক্সট টাইম আরেকবার মেডিকেল পরীক্ষা দিতে। এখনই মেয়ের বিয়ের কথা ভাবছেন না। এতে যে রিদির মন কতটা প্রসন্ন হল তা কেবল রিদিই জানে। কিন্তু পরের বার নাম্বার কাটা যাবে মেডিকেল এক্সামে। এসব জেনেও বিয়ে আটকানোর জন্য রিদি পুনরায় পড়া শুরু করেছে। মাঝে মাঝে ফোন হাতে ফেলে দ্বীপকে মেসেজ দেয়। আমিনা চোখে চোখে রাখেন মেয়েকে। খাওয়া,নামাজ এবং ঘুম এই তিন কাজের জন্য বিরতি পায় রিদি। এছাড়া দিনের বাকি সময়টা পড়ার জন্য ব্যয় করে৷ রিদির ভাবতে অবাক লাগে গত একবছরে সে একবারও দ্বীপের গলা শোনে নি। প্রমা এবং মিরার সাথেও যোগাযোগ নেই। দুজনেরই বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছে। ঢাকাতে থাকে স্বামী সহ। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে মিরা। প্রমা নোয়াখালীতেই পড়ে। কত পরিবর্তন এলো গত এক বছরে!

__

৬ অক্টোবর, ২০১৭

দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও খেলছে দ্বীপ। কখনো খেলা ভালো হচ্ছে তো কখনও খারাপ। মাঝে মাঝে প্র্যাকটিসে গেলে ক্লান্ত লাগে। চোখ বুজলে মনে পড়ে প্রিয় নারীর কান্নাভেজা চোখ। এবার দেশে ফিরে কারোর কথা শুনবে না। বিয়ে না দিলে তুলে নিয়ে আসবে৷ চারদিকে কত কত ফ্যানডম, এরপরও কি রিদির বাবা রাজি হবে না?

স্পেনের আকাশ সুন্দর। এই সুন্দর আকাশ দেখতে রাস্তায় বেরিয়েছে দ্বীপ। মনে হল, তার কি কখনো সাধ্য হবে রিদিকে নিয়ে স্পেনের আকাশ দেখার! বাসায় ফোন দিয়ে সবার সাথে কথা বলেছে। সাজিনার ছেলে হয়েছে। কি মায়া লাগে দেখতে। দ্বীপ এখনও আদর করার সুযোগ পায় নি বাচ্চাটাকে। মিজান সাহেব জানালেন সখিনা বানু ভীষণ অসুস্থ। জিহানের নাম জপ করে সবচেয়ে বেশি। জিহানের বউ দেখতে চান।

রিদি ঢাকা এসেছে দ্বিতীয় বার মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা দিতে। এবারের পরীক্ষা গতবারের তুলনায় ভালো হয়েছে। কিন্তু আশা নেই রিদির। হোস্টেল ছেড়ে দিয়েছিল গত বছর। রাহার সাথে আজ হোস্টেলে এসেছে আবার। হোস্টেলে এক বান্ধবী থাকে নাম সাবিহা। সাবিহা জাহাঙ্গীরনগর এর শিক্ষার্থী। ওর কাছ থেকে সাজেশন নেয়ার জন্য এসেছে আবার। সাজেশন নিয়ে বাসায় ফেরার পথে রাহা প্রশ্ন করল, ‘ দ্বীপ ভাইয়ার সাথে কথা হয় তোর?’

রিদি দু পাশে মাথা নাড়ে। রাহা পুনরায় প্রশ্ন করল, ‘ মেসেজে হয়?’

রিদি ক্ষীণস্বরে বলল, ‘ মাঝে মাঝে দেশে থাকলে।’

রাহা ভ্রু কুচকে ফেলল, ‘ দেশে থাকলে মানে? উনি বিদেশ যায় নাকি?’

রিদি শুকনো ঢোক গিলল। রাহা চেপে ধরল। উপায়ন্তর না দেখে বলেই দিল ফুটবল খেলার কথা। রাহা স্তব্ধ হয়ে গেল। এই ক্যারিয়ার দিয়ে দ্বীপ রিদিকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবে? এ তো অবিশ্বাস্য কথাবার্তা! রিদিকে বলল, ‘ আব্বু জীবনেও মানবে না রে রিদি। এসব খেলা কয়দিনের? এটা কোনো প্রফেশন হলো?’

রিদি ইষৎ হেসে বলল, ‘ আপু আব্বু এমনিতেও মানবে না আম্মু বলেছে। কারণ দ্বীপ পড়াশোনায় ভাল না। সরকারি চাকরি সে কোনো দিন ও পেত না। এরচেয়ে উত্তম নিজের স্বপ্ন পূরণ করুক। আমি তার জীবনে না থাকলেও স্বপ্ন থাকবে। ‘

রাহা ছোট্ট বোনটার মাঝে আসা পরিপক্কতা দেখছে। ঢাকা এসে দ্বীপকে মেসেজ দেয়ার সুযোগ পেয়েছে। মেসেজ চালাচালি হয় কিন্তু দুজনের মাঝেই অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সময় মিলে না। দ্বীপ দেশে থাকলে রাহা দুজনের দেখা করিয়ে দিত। সেই সুযোগটাও মিস হয়ে গেল। দুদিন পর রিদি জাহাঙ্গীরনগর এর পরীক্ষাও দিয়েছে। সেকেন্ড টাইমারের কপাল আসলেও খারাপ। এই যে দ্বিতীয় বার ও রিদির মেডিকেলে হলো না।

৮ নভেম্বর, ২০১৭

রিদির জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়ে গিয়েছে। সি ইউনিটে হয়েছে । আমিনা জাহাঙ্গীরনগর ব্যক্তিগত ভাবে পছন্দ করেন না। কত মানুষের কাছে কত কথা শুনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে। রায়হান এবং রাহা ভর্তি করিয়ে দিতে চাইলো। জাবেদ সাহেব মেয়েকে প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে পড়াতে চাইলে রিদি নিষেধ করে দেয়। সে প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে বাবার এত টাকা নষ্ট করে পড়তে চায় না। সবশেষে জাবেদ সাহেবের অনুমতি পেয়ে ভর্তি হয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অন্যতম সুন্দর বিশ্ববিদ্যালয়ে। এবারের লড়াইটা রিদির একার লড়াই৷ বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কেমন যাচ্ছে রিদির এই প্রশ্ন মনে জাগে না আপনাদের?

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নতুন কিছু বন্ধু হয়েছে। প্রথম বর্ষে যেমন পুরো একটা গরুর পাল একসাথে ঘুরে তেমন। এরপর আস্তে আস্তে কোথায় ছুটে যায় এসব গরু ঘোড়ার পাল। মানুষ নিঃস্ব। বরাবরই একা। একাকিত্বের মাঝে আনন্দ খুঁজে বের করে। দ্বীপের সাথে রিদির যোগাযোগ হয়। আগের মত হয় না। রিদির মনে হয় দ্বীপের মাঝে পরিবর্তন এসেছে। আসাটাই স্বাভাবিক চারদিকে ফুটবল প্লেয়ার জিহানের নাম ডাক। বাংলাদেশ এক দূর্দান্ত খেলোয়াড় পেয়েছে যার পায়ে জাদু আছে। খেলার মাঠে নামলে বলকে সে বল না ভেবে ডিফেন্ডারের মাথা ভেবে লাথি দেয় সম্ভবত। রিদি দেখে দ্বীপের খেলা, যদিও ফুটবলের আগা মাথা বুঝে না তবুও দেখে। আনন্দ পায়। দ্বীপ দেশ বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে খেলে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে কথা হয় তখন দ্বীপ প্র্যাক্টিসে থাকে নতুবা ক্লাবে অথবা দিন রাতের তফাৎ। রিদি ভীষণ অবাক হয় দ্বীপ দেশে এসেছে এই খবর সে দ্বীপের কাছ থেকে পায় না। ফেসবুক, টিভি চ্যানেল বা বন্ধুদের কাছে পায়। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির প্রায় চার মাস পার হয়েছে দ্বীপ একটি বারও উচ্চারণ করেনি রিদির সাথে দেখা হওয়ার ব্যাপারটা। গত সপ্তাহে রিদি নিজ থেকে বলেছিল দেখা করবে। দ্বীপ বলেছে তার ইন্টারভিউ আছে। সময় নেই। সেদিন প্রীতিলতা হলের ছাদে বৃষ্টিতে ভিজে কেঁদে কেঁদে বলেছিল আল্লাহকে, ‘ কেন আমার দ্বীপের মাঝে এত পরিবর্তন এলো! আমাকে এভাবে ভুলে না গেলেও তো পারত? আমাদের একটা ছোট্ট ঘর হয়েও কেন হলো না দ্বীপ।’

__

১০ মার্চ, ২০১৮

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কিছু মাস পর রিদিকে আমিনা নোয়াখালী আসতে বলল। নোয়াখালী পৌঁছেই জানতে পারল পাত্র পক্ষ আসবে কাল তাকে দেখতে। আজ রিদির এই কথা শুনে কোনো কষ্ট হয় নি। হাসি বের হল নিজের অজান্তে। রাত যখন গভীর তখন দ্বীপের নাম্বারটা ডায়াল করল। রিং হল। রিসিভ হতেই ও পাশ থেকে দ্বীপ প্রশ্ন করল, ‘ বলো , হঠাৎ এত রাতে?’

রিদি হেসে বলল, ‘ এমনি তোমার খোঁজ নিতে ফোন দিলাম।’

‘ ভালো আছি। রিদি মাত্র স্টেডিয়াম থেকে এসেছি একটু ঘুমাই। আগামীকাল কথা বলব।’

‘ আমাকে কাল দেখতে আসবে।’

‘ দেখতে আসলেই তো আর বিয়ে হবে না। আসুক।’

রিদির আর কথা বাড়াতে ইচ্ছে হলো না। ফোন রেখে দিলো। ফোনের ঘড়ি আর ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে দেখল আজ মার্চ এর দশ তারিখ। মনে হল এইতো সেদিন ২০১৮ সাল শুরু হল। আর আজ তিনটি মাস অতিক্রম হলো এই সালের। সম্পর্কের তিনবছর শেষ হয়ে চার বছর চলছে। কত পরিবর্তন দ্বীপের মাঝে!

পরদিন পাত্রপক্ষ আসে নি। পাত্রের পরিবারের কোনো সমস্যা ছিল। অন্যদিন আসতে চাইলে জাবেদ সাহেব বারণ করে দেন। যাদের সময় জ্ঞান নেই তাদের কাছে মেয়ে দিতে রাজি নন তিনি। রিদিও রাহার সাথে ঢাকা ফিরে এসেছে। ক্যাম্পাসে ফিরে রিদি দ্বীপকে পুনরায় কল করল পাত্র পক্ষ না আসার খবর জানাতে। কিন্তু ব্যস্ত পেল। রিদির অধর কোণে নিজের উপর করুণার হাসি ফুটল।

খ্যাত নামা ব্যক্তিত্ব শাহদ্বীপ জিহানের রিদিকে আর মনে ধরে না। রিদিও নিজের আত্মসম্মান বিকিয়ে ফোন দেয় না। কেন দিবে? কার জন্য দিবে? এই মানুষ টা এতটা স্বার্থপর হয়ে গেল কি করে? মানুষ বুঝি এভাবে পালটায়? কই রিদি তো পালটায় নি? সারাজীবন দু চোখে মেডিকেল নিয়ে স্বপ্ন দেখা মেয়ে মেডিকেল এর স্বপ্ন ছেড়ে দিয়েছে। প্রাইভেট মেডিকেলে ভর্তি হয় নি যদি বাবা দ্বীপের সাথে নিজের ডাক্তার মেয়ের বিয়ে দিতে না চায় এই কারণে। এত সুন্দর যত্নে গড়া ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে কি পেল রিদি? আর কাঁদবে না। আজই শেষ কান্না। জীবন মাঝে মাঝে মানুষকে ঠকিয়ে দেয়। রিদিকে যেভাবে ঠকালো সেই ভাবে। দ্বীপের উপেক্ষা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে সে আর সম্পর্কে থাকতে চায় না হয়তো।

একের পর এক পাত্র দেখা চলছে। রিদি প্রায় ভাবে দ্বীপ হয়ত হঠাৎ করে এসে চমকে দিবে। হয়ত ফোনে কল দিয়ে আগের মত বলবে, ‘ রিদি আমার তুমি ছাড়া যাওয়ার জায়গা নেই।’

না, এই কথাটা বলার মতো মানুষটার ফোনকল আর সেভাবে আসে না। ফোন করে কিছু স্পেশাল দিনে। দুই ঈদ, জন্মদিন কিংবা ফ্রি থাকলে। রিদিও বিরক্ত করে না। রিদির মাঝে মাঝে মনে হয় দ্বীপ একদিন হঠাৎ ফোন দিয়ে বলবে রিদি আমার পক্ষে এই সম্পর্ক এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। রিদি মাঝে মাঝে ভেবে অবাক হয় দ্বীপকে সে কেন এত বিশ্বাস করে? দ্বীপ যখন ফোনে কথা বলে রিদি সব ভুলে যায়। এমন না যে দ্বীপের মাঝে মেয়ে পটানোর মতো দক্ষ জ্ঞান আছে। কিন্তু দ্বীপের সহজ সরল স্বভাবটাই রিদির বিশ্বাস আটকে রাখে। মাস পার হলো রকেটের গতিতে।

মানুষ বলে, ” যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ। ” আসলেই খারাপ। কত বান্ধবীর নতুন সম্পর্ক গড়তে দেখে, ব্রেক আপ হতে দেখে। অভিনব কায়দায় প্রপোজ দেখে। মুক্ত মঞ্চে দাঁড়িয়ে কত প্রেমিক জাহাঙ্গীর নগর কে সাক্ষী রেখে ভালবাসাময় জীবনে প্রবেশ করে। আচ্ছা! এদের সম্পর্ক কদিন টিকে? এরা কি নিজেদের জীবনসঙ্গী হতে পারে? পারে বোধ হয়। ওইতো গত মাসে সুরভি আপু আর নাঈম ভাইয়ার বিয়ে হল। কি সুন্দর সম্পর্ক তাদের। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকে। এখন বিয়ে করেছে। দুজনেরই বিসিএস হয়েছে। দেখতে বেশ ভালো লাগে। সফল জুটি। হয়ত দ্বীপ এবং রিদির সম্পর্ক আগের মত থাকলে তাদের লোকে সফল জুটি বলত। গত ছয় মাস দ্বীপের সাথে যোগাযোগ নেই। দ্বীপ এখন কেমন আছে? ওর কি রিদিকে দেখতে ইচ্ছে হয় না? রিদির কেন ইচ্ছে হয়?
___

২৫ নভেম্বর, ২০১৮

রিদির প্রথম বর্ষের পরীক্ষা শেষ হয়েছে। গ্রীষ্মের ছুটিতে সব চাচাতো, ফুফাতো ভাই বোনেরা ওদের বাসায় এসেছে। আমিনা ফোন দিয়ে আসতে বলাতে রিদি না করতে পারে নি। একটা সময় মায়ের আঁচল ছেড়ে কোথাও না যাওয়া মেয়েটা এখন ঢাকা থেকে নোয়াখালি একা একা আসা যাওয়া করে। পৃথিবীর সব কিছুই নিজেই নিয়মে চলছে। পরিবর্তন শুধু রিদির জীবনে এসেছে। সীমা আপুর আবার বিয়ে হয়েছে। জাবেদ সাহেব এর এক বন্ধুর ছেলে, ডিভোর্সি তার সাথেই হয়েছে। বর্তমান স্বামী খুব ভাল। আপু এবার আর গতবারের মতো ভুল করেন নি। সংসারের ঝুট-ঝামেলা, সুখ-শান্তিতে মা এবং নানীর স্থান রাখেন নি। নিজের মতো করে গুছিয়ে নিয়েছে। সীমা আপু ও আজ এসেছে। অনেক দিন পর হৈ হুল্লোড় রিদিদের বাসায়। রাহার দুই বাচ্চা ঘুরে ঘুরে মামা খালাদের আগে পিছে ছুটছে। দুপুরে খাওয়ার পর ছেলেরা সব খেলা দেখতে বসেছে। আজ বাংলাদেশ এবং ইন্ডিয়ার ম্যাচ আছে। টিভির স্ক্রিনে একে একে প্লেয়ারদের দেখাচ্ছে। রিদির চোখ আটকে গেল পরিচিত মানুষ টার উপর। আজ সে খেলা দেখবেই। টিভির স্ক্রিনে রিদি এখন আর তাকায় না । হলে টিভি আছে। অনেকেই দ্বীপের জন্য খেলা দেখে। ন্যাশনাল ক্রাশে পরিণত হয়েছে। অবশ্য এটা নতুন সব খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রেই হয়। তখনই মনে পড়ল, কই বাকি রা তো এমন বদলে যায় না। দেশে বিদেশে যেদিকেই তাকানো যায় খেলোয়াড়দের তো বউ প্রতারণা বা ভালোবাসার মানুষকে ঠকানোর গল্প কম। তাহলে রিদির সাথেই কেনো এমনটা হলো!

আজ রিদি নব্বই মিনিটের সম্পূর্ণ খেলা পূর্ণ মনোযোগে দেখেছে। ডিফেন্ডারদের ঠেকিয়ে কিভাবে গোল করতে হয় তা দেখেছে। গো হেরে যাওয়া খেলায় প্রান ফিরিয়ে আনা দেখেছে। সেই সাথে দেখেছে চিরপরিচিত মানুষটাকে। খেলা ড্র হয়েছে। ওই যে টিভি স্ক্রিনে বাংলাদেশের জার্সি গায়ে ছেলেটাকে দেখা যাচ্ছে। শেষ সময়ে তার গোলেই ড্র হলো। দলের অন্যরা তাকে মাথায় তুলে নিলো। কত আনন্দ তার।

এক সময় এই ছেলেটা প্রাইভেটে, কলেজে, হোস্টেলের সামনে রিদির জন্য দাঁড়িয়ে থাকত। অথচ এখন এই ছেলেটাই রিদিকে ভুলেই গিয়েছে। যেন তার অস্তিত্বই নেই। টিভিতে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে তাকে দেখা যায়। কিছুক্ষণ আগে রিদির বাবা এবং চাচা উপস্থিত হয়েছে সবার মাঝে। খেলার আপডেট নিচ্ছে বাকিদের থেকে । তখন রিদির কাজিন বলল, ‘ জেঠু গত দুই ম্যাচ ভাল খেলেনি কিন্তু আজকে দূর্দান্ত খেলেছে জিহান। ‘

রিদির বাবা বলল, ‘ এই ছেলেটা দূর্দান্ত খেলে। আমি প্রায় দেখি।’

রিদির চাচা বলল, ‘ এই ছেলেটা রানাদের পার্টি করত। এনামুল করিমের দলের। দেখেন রেফারেন্সে জাতীয় দলে চান্স পাইছে হয়ত। এরম পাইলে রানা আরও ভালো কিছু করত।’

জাবেদ সাহেব ভ্রু কুচকে ফেললেন। স্বাভাবিক স্বরেই বললেন, ‘ তা তো জানি। রেফারেন্স তো থাকবেই । তবে খেলে দারুন। কিন্তু রাজনীতি করে ব্যাপারটাই ভাল লাগে না। আমি বুঝিনা এদের রাজনীতিতে আসার কি প্রয়োজন। খেলোয়াড়দের রাজনীতিতে আসা খুব বাজে একটা ব্যাপার। এরা গাছের ও খাবে, তলার ও কুড়াবে। খেলে এত টাকা ইনকাম করে তবুও রাজনীতি লাগবে। সব জায়গায় দূর্নীতি।’

বাবা চাচার কথা শুনে রিদি নিজের রুমে চলে আসল। একবার বলতে ইচ্ছে হলো, ‘ আমার দ্বীপ এমন না। ও রাজনীতি করে না। অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছে। ভদ্র ছেলে।’

পরক্ষনে মনে হলো, ‘ আমি জানি না জিহান কেমন, আমি যাকে চিনতাম সে এমন না। এখন যাকে দেখছি সে আমার না।’

রিদির মনে প্রশ্ন জাগল, দ্বীপ কি রাজনীতিতে ফিরেছে? কিন্তু তাকে যে কথা দিয়েছিল ফিরবেনা।সত্যি মানুষের স্বভাব, চরিত্র এবং আচরণ পরিবর্তনশীল। একসময় দ্বীপই বলত সে কখনও রাজনীতিতে ফিরবে না অথচ সে নাকি রাজনীতিতে ফিরেছে রিদি জানেই না। জিহানের জীবনে রিদির অপছন্দের রাজনীতি আছে ঠিকই কিন্তু রিদি নেই।

___

রায়হানকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে। পায়চারি করছে ঘর জুড়ে। রাহা নোয়াখালী গিয়েছে। ঢাকার বাসায় সে একা। বার বার ফোন করেও কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে লাইনে পাচ্ছেনা। রাগ হওয়াও স্বাভাবিক, থাকে দেশের বাইরে। অনেক সময় তাকে পাওয়া যায় না। আজকে যেমন পাওয়া যাচ্ছে না।

শেষমেষ ফোন আছাড় দিবে ঠিক তখনই ফোন আসলো। রায়হান ধমকে বলল, ‘ তোমাকে ফোন দিলে ফোনে পাওয়া যায় না কেন মিয়া? সারাটা দিন ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমি আর আটকাতে পারব না। ছোট চাচা বার বার গ্যাঞ্জাম লাগাচ্ছে। সম্ভবত এবার আব্বুকে রাজি করিয়েই ফেলবে। ‘

ও পাশের উত্তর শুনে মন প্রসন্ন হলো রায়হানের। কি ছিল সেই উত্তর! রাহা এবং রিদির ছোট চাচাকে রায়হানের একেবারেই পছন্দ নয়। এই লোক স্বার্থের জন্য সব করতে পারে।

চলবে…

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ