#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
১৭.
( কপি করা নিষেধ)
চারপাশ টা ঘুরে ঘুরে দেখছে রিদি। দ্বীপ নারকেল পাতার শলা দিয়ে বিছানা, সোফা সব ঝাড়ছে, ঘর ঝাড়ু দিচ্ছে। রিদি হাতে একটা ম্যাংগো বার নিয়ে খাচ্ছে, দেখছে আর দ্বীপের পেছনে ঘুরছে। দ্বীপের উত্তরার ফ্ল্যাটে উঠেছে ওরা আজ। জার্নি করে এসে দুজনই ক্লান্ত। বাইরে থেকে দুপুরের খাবার নিয়ে এসেছে৷ ঘরদোর পরিষ্কার করে দ্বীপ মেঝেতেই শুয়ে পড়েছে ক্লান্ত হয়ে। রিদি ম্যাংগো বার টা খেয়ে দ্বীপের হাতের উপর শুয়ে পড়েছে। দ্বীপ চোখ বুজে মুচকি হেসে বলে,
‘ এতক্ষন সব কাজ একা করলাম, কিছুই ধরতে দিলাম না তোমাকে যাতে গায়ে নোংরা না লাগে। এখন আমার গায়ের উপর শুয়ে সেই তো নোংরা করলে নিজেকে। লাভ টা কি হলো?’
রিদি খিলখিলিয়ে হেসে বলে, ‘ তোমার গায়ে কি সুন্দর স্মেল! আমি লোভ সামলাতে পারিনি।’
দ্বীপ নাক কুচকে বলে, ‘ ছিহ! ঘামের গন্ধ।’
‘ আমার এটাই ভাল্লাগে।’
‘ আমাকে হঠাৎ এত ভালো লাগার কারণ?’
‘ তোমাকে তো সবসময়ই ভালো লাগে।’
‘ কোনো উদ্দেশ্য নেই বলছ?’
‘ আছে তবে অল্প।’
‘ কি উদ্দেশ্য? ‘
‘ আকাশ দেখেছ? একসাথে বৃষ্টিতে ভিজতে চাই?’
‘ তোমার গলার ব্যাথা যে ভুলে গিয়েছ?’
‘ শুধু আজই’
দ্বীপ রিদির কপালে আলতো অধর ছুঁয়ে বলল, ‘ আচ্ছা। মনে থাকে যেন। কিন্তু আজ বৃষ্টির হওয়ার সম্ভাবনা কম। যত গর্জে, তত বর্ষে না। খেলতে খেলতে আকাশ নিয়ে এতটুকু অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। যাই হোক আসল কথা শোনো, আমাদের কিছু ব্যক্তিগত পছন্দ – অপছন্দ শেয়ার করি। এতে দুজনেরই সুবিধা। আমি টান টান বিছানা পছন্দ করি, এক সপ্তাহের বেশি চাদর বিছানায় থাকা পছন্দ করিনা। সব কাপড় ইস্ত্রী করে পরি। বাসায় পরার কাপড়ও। এলোমেলো থাকাতে আমার শুচিবায়ু আছে। ডাল ছাড়া ভাত খেতে পারিনা। ‘
রিদি ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে ঢোক গিলল। এ কেমন অভ্যাস। দ্বীপ চোখ খুলে বলল, ‘ কি হলো?’
রিদি মুখ টা ফ্যাকাসে করে বলল, ‘ আমি বিছানার চাদর ধুতে পারব কিন্তু ওটার পানি নিংড়াতে পারব না একা। তুমি কি একটু সাহায্য করবে? আর ইস্ত্রী আব্বু কোনোদিন ও করতে দেয় নি। তুমি কি একটু শিখিয়ে দিবে? আমার কারেন্টে ফোবিয়া আছে। ডাল রান্না করতে পারি। ওটা নিয়ে সমস্যা নেই। ‘
দ্বীপ উঠে বসল। রিদির দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে বলে,
‘ রিধিমা… তুমি কেন এসব করবে?’
‘ তো কে করবে?’
‘ তোমার বরের বুয়া রাখার সামর্থ্য আছে রিদি। আমি এমনি তোমাকে জানিয়ে রাখলাম। তোমার পছন্দ অপছন্দ ও জেনে নেব। শুধু আমার টা বলে দিচ্ছি তার মানে এই নয় যে টিপিকাল হাসবেন্ড এর মতো হুকুম দিচ্ছি। বোকা মেয়ে। বিছানার চাদর জীবনে ধুয়েছ তুমি? ওটা ভেজালে তোমার চেয়ে ওজন বেশি হবে।’
রিদির মুখে বালব জ্বলে উঠল। সে নিজের পছন্দ জাহির করতে করতে বলল,
‘ আমি ভেলপুরি ভালবাসি, আমি বিরিয়ানি ভালবাসি, একটা করে ফুল নিয়ে আসবে প্রতিদিন, আর মাঝে মাঝে ঘুরতে নেবে। এই টুকুই।’
‘ বিনিময়ে কী পাব?’
‘ ঘরদোর গোছানো। ‘
দুজনই হেসে উঠল। দ্বীপ তাকিয়ে রিদিকে দেখছে। ওভারসাইজ একটা টিশার্ট পরনে, পায়জামা টা এমন যে আরও দুজন ঢুকতে পারবে। দু হাত ভর্তি মেহেদী আর লাল লাল কাচের চুড়ি। টি শার্ট আর পায়জামার সাথে কাচের চুড়ি পরে ঘুরতে জীবনে প্রথম কাউকে দেখছে দ্বীপ। প্রশ্ন করল রিদিকে,
‘ এই সাজে চুড়ি পরার লজিক টা কী মিসেস দ্বীপ?’
রিদি সব কটা দাঁত দেখিয়ে বলল, ‘ আমার ইচ্ছে বিয়ের পর আমি প্রতিদিন কাঁচের চুড়ি পরব যতদিন শখ থাকে।’
দ্বীপ হেসে বলল,’ কপাল গুনে একটা বউ পেয়েছি যার সবকিছুই স্পেশাল। শখ ও স্পেশাল ।’
___
দুপুরের খাবার খেয়ে রিদি বিছানায় মাথা রাখতেই ঘুমিয়ে পড়ল। আজ সত্যি বৃষ্টি হয় নি। কিন্তু শীতল বাতাস চারদিকে। সেই বাতাসেই ঘুম এসে গিয়েছিল। ঘুম থেকে যখন উঠল তখন দেখতে পেল পাশে দ্বীপ নেই। চোখ ডলতে ডলতে দ্বীপকে খুঁজতে থাকল। খুঁজে পেল রান্নাঘরে৷ সসেজ ভাজা করছে। রিদি সিংকের পাশে টাইলসের উপর বসে পড়ল। দ্বীপ মৃদু হেসে রিদিকে স্বাগত জানাল। রিদির ফোন বেজে উঠল। হাসিখুশি মেয়েটা আকস্মাৎ বিবর্ণ করল মুখটা। দ্বীপ ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করল,
‘ কে ফোন দিচ্ছে?’
রিদি চিন্তিত। দ্বীপের কথাও তার কানে ঢুকছে না । দ্বীপ একটু জোরে ডাকতেই ধ্যান ফিরে পেয়ে বলল,
‘ তোমাকে একটা কথা জানানো ভীষণ প্রয়োজন। ‘
শেষ সসেজটা ফ্রাই প্যান থেকে তুলে প্লেটে নিয়ে রান্না ঘর থেকে বের হয়ে ডাইনিং এ আসল। রিদিকে ইশারা করল আসার জন্য। চেয়ার টেনে রিদিকে বসতে বলে প্লেট এগিয়ে দিয়ে বলল,
‘ খেতে খেতে বলো কী সমস্যা?’
রিদি দম ফেলে বলল, ‘ আমার এক ক্লাসফেলো আছে, নাম নিয়াজ। আমাকে সম্ভবত পছন্দ করে। কিন্তু আমি ওকে পছন্দ করিনা। বাড়ি যাওয়ার পর থেকে অস্থির হয়ে গিয়েছে। বন্ধু হিসেবে ঠিক আছে। সবাইকে যেমন চোখে দেখি তাকেও একই চোখে দেখি। অন্যদের মতো পড়ায়, কুইজে, প্রেজেন্টেশনে সাহায্য করে, ইদানীং লক্ষ্য করলাম ও নিজেকে বন্ধুর চেয়ে বেশি কিছু ভাবতে শুরু করেছে, রাগ হচ্ছে আমার। ক্লাসের সবাই আমাকে ফোন দিচ্ছে ওর ফোন কেন রিসিভ করছিনা তাই। ব্যাপারটা বিরক্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে রীতিমতো। ওর আকার ইঙ্গিতে আমি সঠিক বুঝি ও আমাকে পছন্দ করে। ‘
দ্বীপ খেতে খেতে মাথা নেড়ে প্রশ্ন করল, ‘ ও কি তোমার একজনের সাথে সম্পর্ক আছে এটা জানে?’
‘ জানে। কিন্তু সে ভাবে আমি হাওয়ার সাথে সম্পর্ক করি। বিশ্বাস করে না। ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকে যোগাযোগ রাখো নি তুমি তাই ও বিশ্বাস করতে পারে না যে আমি কোনো ছেলেকে পাত্তা দিই। ওর কাছে ব্যাপারটা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে আমি একমাত্র ওকে আর পিয়াস কে বন্ধু ভাবি। পিয়াসের তো গার্লফ্রেন্ড আছে। সুতরাং ও নিজেকে সেইফ অপশন ভাবে। এছাড়া আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে তোমার কথা তো আমি নিজ থেকেই লুকিয়েছি।’
দ্বীপ ভাবুক গলায় বলল, ‘ আর অল্প কিছুমাস লুকিয়ে রাখো, এখন জানালে ও যদি হাইপার হয়ে যায় বিপদ। আমার নেক্সট উইক ম্যাচ আছে। দেশে থাকব না। কোনো ঝামেলা হলে আমি তোমাকে প্রোটেক্ট করতে পারব না। তাই কৌশলে এড়িয়ে যাও। ঘুরে এসেই ব্যবস্থা করছি। ‘
রিদি মাথা নাড়ল। দ্বীপ হঠাৎ বলল, ‘ ম্যাচ ক্যান্সেল করে দিই কি বলো? আগে তোমার সমস্যা টা সমাধান করি?’
‘ না না প্লিজ এটা করো না। এতে আমি অপরাধবোধে ভুগব। নিজেকে দোষী মনে হচ্ছে। কেন যে ওর সাথে কথা বলতে গেলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে চলতে গেলে কত ফ্রেন্ড হয়। এখন এরা যদি নিজেদের কে বন্ধুর চেয়ে বেশি ভাবে তখন দোষটা কার? পুরুষ মানুষের চরিত্রে দোষ আছে। সব পুরুষ না কিছু পুরুষ। ‘
দ্বীপ হাসছে। দুজনের খাওয়া শেষ। দ্বীপ বলল, ‘ বাদ দাও। প্রয়োজন আমি আসা পর্যন্ত রাহা বা রায়হান ভাইকে নিয়ে যেও ইউনিভার্সিটি।’
‘ আচ্ছা।’
‘ ঘুরতে যাবে?’
‘ কোথায়?’
‘ দিয়া বাড়ি চলো। ভালো লাগবে।’
রিদি লাফাতে লাফাতে তৈরি হতে চলে গেল। দ্বীপ চিন্তা থেকে ধ্যান সরিয়ে এনে সময়টা উপভোগ করতে চাইল।
শপিং, ঘুরাঘুরি আর আনন্দে সপ্তাহ কেটে গেল দুজনের। দ্বীপের চলে যাওয়ার সময় হল। এয়ারপোর্ট থেকে দ্বীপকে বিদায় দিয়ে রাহার বাসায় থেকে গেল। মন খারাপ হল খুব। গত এক সপ্তাহে রিদি স্বাধীন ভাবে অনেক ঘুরেছে। প্রতিদিন সকালে বেরিয়ে যেত, রাতে বাসায় ঢুকত। মাঝে মাঝে দ্বীপ বাসায় এসে বলত,
‘ মাস্ক পরে ঘোরা যে কি যন্ত্রণার উফ। আগেই ভালো ছিলাম। কেউ চিনত না।’
___
ঈদের ছুটি, বিয়ে, ঘোরাঘুরি থেকে ফিরে আজই প্রথম দিন, ক্যাম্পাসে এসেছে রিদি। ক্যাম্পাসে পৌঁছেই রিদি অদ্ভুত ঘটনার সম্মুখীন হল। মুক্তমঞ্চের সামনে গোলাপ দিয়ে সাজিয়ে তার নাম লেখা । চারদিকে বেলুন৷ বন্ধুরা সব তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। এর কারণটা রিদি এখনও জানে না। হাতে একটা ফুলের বুকে নিয়ে নিয়াজ সামনে এসে দাঁড়াল। রিদি ভাবছে আজ তো তার জন্মদিন নয় বা কোনো পরীক্ষা ও হয় নি যে সে সর্বোচ্চ নম্বর পাবে। তবে কিসের শুভেচ্ছা? নিয়াজ হাঁটু গেড়ে তাকে প্রেম নিবেদন করল সকলের সামনে। এহেন মূহুর্তে রিদি রাগ সংযত করার চেষ্টা করছে। চোখ বুজে পাশ কাটিয়ে মুক্ত মঞ্চ থেকে সোজা রাস্তায় পা বাড়াল। পেছনে বান্ধবীরা ডাকছে। নুসরাত রিদিকে আটকে দিয়ে বলল,
‘ রিদি নিয়াজ গত এক সপ্তাহ ধরে পরিকল্পনা করছে । তোকে ফোন দিলে তো তুই ফোনই ধরিস না। ‘
‘ আমি বাড়ি গেলে খুব একটা ফোন কাছে রাখিনা। আব্বু অপছন্দ করেন।’
‘ আচ্ছা বাদ দে, এখন গিয়ে ওর সাথে কথা বল। এভাবে সবার সামনে অপমান করেছিস কাজ টা তো ঠিক হয়নি। গিয়ে সরি বল। ‘
রিদি রেগে বলল, ‘ কি কারণে? আমি কি একবারও বলেছি আমি ওকে পছন্দ করি? ওর এপ্রোচ আমার ভালো লাগে নি।’
রিদি প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে নুসরাতকে উপেক্ষা করে চলে আসল। রাগ হচ্ছে দ্বীপের উপর। দ্বীপ কেন বারণ করল বিয়ের কথা সবাইকে না জানাতে?
হাঁটতে হাঁটতে দ্বীপকে ফোন দেয়ার চেষ্টা করল। যতবার ফোন দিচ্ছে নট রিচেবল পাচ্ছে। পাওয়া টা স্বাভাবিক। রাগ সামলে রিদি সেদিন কোনো রকম ক্লাস করে বেরিয়ে গেল। হলেও গেল না। সোজা ক্যাম্পাস ছেড়ে রাহার বাসায় চলে আসল। এসেই রাহার উপর চড়াও হল। রাহা তো প্রথমে বুঝতে পারেনি। পরে যখন রাহাকে খুলে বলল রাহা চিন্তায় পড়ে গেল। বোনকে বুঝিয়ে বলল, বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুত্ব সবসময় সুন্দর হয় না। কখনো কখনো স্বার্থ লুকায়িত থাকে।
দ্বীপ খেলার মাঝে অবসর পেতেই রিদিকে কল দিল। রিদি দ্বীপের উপর রাগ ঝেড়ে চেঁচামেচি শুরু করে দিল। কাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে সবাইকে বলে দিবে সে বিবাহিত। দ্বীপ বাঁধা দিয়ে বলল,
‘ রাগ বোকারা করে। তোমার বয়সটাই এখন সুন্দর সুন্দর প্রপোজ পাওয়ার। ভাগ্যের দোষে আমার কবলে পড়ে বিয়ে হয়ে গেল। কি করার আছে বল। এত দিন যেহেতু চেপে রেখেছ ব্যাপারটা, এখনও কাউকে কিছু বলার প্রয়োজন নেই। তুমি স্টুডেন্ট ভালো। ফলাফল ভালো করছ। এখন যদি সবাই জেনে যায় তুমি আমার স্ত্রী তখন একটা ইফেক্ট পড়বে। অনেকে এক্সট্রা সুযোগ নিতে চাইবে। কিছু ক্ষেত্রে স্যারদের কাছে প্রাধান্য পাবে। তখন বন্ধুরা ভাববে পক্ষপাতিত্ব হচ্ছে। অনেক ঝামেলা হবে, বুঝতে পেরেছ? ‘
দ্বীপের কথায় রিদি শান্ত হলো। রিদির মনে হলো সে একটু বেশি প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ফেলেছে যা উচিত হয় নি। দ্বীপ বরাবর বুঝিয়ে বলল,
‘ শান্ত থাকা জ্ঞানীর লক্ষন। তোমার রাগ উঠলে আমার উপর ঝাড়বে। বাইরের মানুষ যেন টের না পায়। আমি চাইনা কেউ আমার রিদিকে বদমেজাজি বলুক।’
সেদিনের পর থেকে রিদিকে খুব শান্ত পেয়েছে সবাই। সহজে রাগ করত না। রাগ উঠলে সামলে নিত। নিয়াজকে উপেক্ষা করত। নিয়াজ ও দূরত্ব নিয়ে থাকত। রিদি রাগ উঠলে দ্বীপকে ফোন দিয়ে রাগ ঝাড়ত। প্রায় একমাস পর দ্বীপ ফিরল। রিদি বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস যোগে যাতায়াত করে। বছরের যে সময়টা দ্বীপ ঢাকার বাইরে কিংবা দেশের বাইরে থাকে তখন রিদি রাহার বাসায় থাকে।
দ্বীপ যখন দেশে থাকে তখন বিভিন্ন ধরনের নতুন রেসিপি করে দ্বীপকে খাওয়ায় আর দ্বীপ হেসে রিভিউ দেয়,
‘ খুব দারুন।’
বাস্তবে খেতে জঘন্য। ধীরে ধীরে দ্বীপ রিদিকে রান্না শেখানো শুরু করে। রাহেলা তার তিন সন্তানকে রান্না শেখাতে কার্পন্য বোধ করেনি।
২০২০ সালের মার্চ থেকে শুরু হয় করোনা মহামারী। সারাদেশ লকডাউনের মুখোমুখি হল। আটকে পড়ে মানুষজন যে যার যার জায়গায়। মৃত্যুহার বাড়তে থাকে। আয় রোজগার বন্ধ হয়ে যায় সবার। ধীরে ধীরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, আদালত, শপিংমল সব বন্ধ হতে শুরু করে। আর খেলা তো সেখানে বিলাসিতা। এই প্রথমবারের মত দ্বীপ ধাক্কা খেল ব্যাংক এমাউন্ট নিয়ে। রিদির অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছে। দ্বীপ ঘরে বসে থাকে। টিভি, ল্যাপটপ আর কত ভালো লাগবে? দুজন মিলে দিন কাটাচ্ছে আর অপেক্ষার প্রহর গুনছে কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
আশপাশে বন্ধুদের মাঝে অনেকের করোনা হচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে। কেউ কাউকে ছুঁতেও রাজি নয়। মা, সন্তান চেনে না। সন্তান পিতা চেনে না। ভাই-বোন মরে গেলে লাশ নিতে আসে না পরিবারের কেউ। এ কেমন আজাব নাজিল হল বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে! নোয়াখালী থেকে খবর এলো সখিনা বানু ভীষণ অসুস্থ। শ্বাসকষ্ট বেড়ে গিয়েছে। তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে নেয়া হচ্ছে। এদিকে দ্বীপ যেতে চেয়েছে মিজান সাহেব স্পষ্ট বারণ করেছেন যেন বাসা থেকে বের না হয়। রাহা এবং রায়হান নোয়াখালী গিয়ে আটকে গিয়েছে। রিদি আর দ্বীপ ঢাকাতে একা। রিদন ফোনে জানাল সে দাদীকে নিয়ে চট্টগ্রাম যাচ্ছে।
দ্বীপ মন মরা হয়ে বসে আছে বারান্দায়। রিদি কফি এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘ আমার আর ভাল লাগছে না। এই ক্রান্তি কবে কাটিয়ে উঠব? ‘
দ্বীপ মেকি হাসি টেনে বলল, ‘ ইনশাআল্লাহ খুব তাড়াতাড়ি। ‘
রিদি জানে দ্বীপ নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। সখিনা বানু নাতি বলতে অজ্ঞান ছিলেন। আজ সেই নাতি তার দূর্দিনে কাছে নেই এর থেকে কষ্টের আর কি হতে পারে?
পরদিন সকালে রিদি বলল, ‘ চলো দ্বীপ আমরা যাই। কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। হয়ত প্রথমে সবাই রাগ করবে পরে আর কিছু বলবেনা। পি পি ই তো বাসায় আছেই। ‘
কারণ জানা নেই তবে দ্বীপ এই প্রথম বার রিদির এমন কথায় সাড়া দিয়ে বলল, ‘ ব্যাগ গোছাও। বের হব। স্যানিটাইজার নিও সাথে।’
দুজনই বাসা থেকে বের হবে ঠিক সেই মুহুর্তে রিদনের কল আসল। দ্বীপ রিসিভ করতেই রিদনের সিক্ত গলা, ‘ ভাই দাদী আর নেই?’
দ্বীপ থমকে গেল। রিদি দ্বীপের দিকে তাকাতেই লক্ষ্য করল দ্বীপের চোখ জোড়া চিক চিক করছে জলে। দ্বীপের কান থেকে ফোন নিয়ে যা শোনার তা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। রিদি যেতে চাইলেও আর দ্বীপ রাজি হল না। রিদন জানিয়েছে এখন নোয়াখালী যাওয়া মানেই বিপদ। ঢাকা থেকেও ভাইরাস বহন করে নিয়ে যেতে পারে। মিজান সাহেব অসুস্থ। সন্দেহ করা হচ্ছে সখিনা বানু করোনা ইফেক্টেড ছিলেন। সখিনা বানুর দাফনকাজ সম্পন্ন হল দ্বীপের অনুপস্থিতে। ব্যাংকের এমাউন্ট ধীরে ধীরে কমছে। দ্বীপ গাড়িটা কিছুদিন আগে বিক্রি করেছিল নতুন গাড়ি কিনবে ভেবে। সেই টাকাটা ব্যাংকে আছে। এখন মনে হচ্ছে বিক্রি করে ভালোই করেছে। কবে পৃথিবী স্বাভাবিক হবে তার কোনো গ্যারান্টি নেই।
এপ্রিল, ২০২১
এক বছর অতিক্রান্ত হল। গত বছর অক্টোবর থেকে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছিল, একুশ সালের ফেব্রুয়ারী থেকে পুনরায় শুরু হলো মহামারি। দুই দুইটা ঈদ কাটিয়েছে বন্দি অবস্থায়।
দ্বীপ বাজার থেকে এসেই ওয়াশরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিলো। জিনিস গুলো স্যানিটাইজ করে নিলো। দুজন মিলে রান্না করে দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। রিদি ঘুমাচ্ছে। আচমকা দ্বীপের মনে হলো তার জ্বর এসেছে। শরীরে দাঁড়ানোর কোনো শক্তি নেই। রিদিকে না জাগিয়ে অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়াল। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজেকে দেখল। নাক দিয়ে পানি পড়ছে। টিস্যু দিয়ে নাক চেপে ফোন হাতে নিল। মাথা ব্যাথা বাড়ছে। আশ্চর্য! এত তাড়াতাড়ি কিভাবে রোগ ছড়ালো! লক্ষন গুলো সার্চ দিয়ে দেখে বুঝতে পারল প্রতিটি লক্ষনই করোনার। খবরে দেখাচ্ছে প্রতিদিনই করোনা পজিটিভ রোগী ভর্তি হচ্ছে এবং ২০/৩০ জন মারা যাচ্ছে। এর কোনো প্রতিকার নেই। সাধারণ ভাইরাসের জ্বর, কাশি হলে যেসব ঔষধ সাজেস্ট করে সেগুলো দিয়েই আপাতত টেস্টিং চলছে হাসপাতাল গুলোতে। ভ্যাক্সিন দেয়া হচ্ছে অল্প স্বল্প। এবারের উপসর্গের সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে শ্বাসকষ্ট। ফুসফুসে আক্রমন করছে ভাইরাস। নিশ্চিত প্রতিকার কারো জানা নেই।
দ্বীপ নিজেকে শক্ত রেখে রিদির থেকে দূরত্ব বজায় রেখে ডাকল। রিদি হকচকিয়ে উঠে গেল। উঠে হাসিমুখে প্রশ্ন করল,
‘ কী হয়েছে? কখন উঠলে?’
রিদি কাছে আসতে চাইলেই হাত দিয়ে থামিয়ে বলল, ‘ ওখানে দাঁড়াও, আগাবে না। ‘
রিদি চমকে উঠল, ‘ কেন?’
‘ তুমি আজ থেকে আলাদা থাকো। আর যদি পসিবল হয় মামার বাসায় চলে যাও।’
‘ কেন?’
‘ যা বলছি তাই করো। এত প্রশ্ন করো না।’
রিদি এগিয়ে এসে দ্বীপকে ধরবে তার আগেই দ্বীপ চিৎকার দিয়ে বলল, ‘ রিদি কীপ ডিস্টেন্স। নিষেধ করেছি। আগাবে না।’
রিদি চমকে গেল। ভয়ে কেঁপে উঠল। বিয়ের প্রায় দেড় বছর অতিক্রম হলো দ্বীপ এমন ব্যবহার কখনও করে নি। অথচ আজ করছে। রিদির চোখ দিয়ে তরতরিয়ে পানি পড়ছে। প্রশ্ন করল, ‘ এমন করছ কেন? কী করেছি আমি?’
দ্বীপ রিদির দিকে তাকিয়ে অসহায় চোখে বলল,
‘ রিদি আমি মনে হয় করোনা ইফেক্টেড । প্লিজ দূরে থাকো। চলে যাও তুমি। ‘
রিদি নিষ্প্রাণ চাহনী তাকিয়ে আছে। ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। দ্বীপ আগের জায়গায় স্থির। ওর মনে হচ্ছে নড়লেই বুঝি করোনা ছড়াবে? হুশ ফিরতেই রিদি উঠে দাঁড়ায়। ছুটে গিয়ে দ্বীপকে জড়িয়ে ধরে। দ্বীপ চিৎকার দিচ্ছে। রিদি দ্বীপের মুখ চেপে ধরল। দ্বীপের গায়ের জ্বরের তাপে রিদি যা বুঝার বুঝে গিয়েছে।
কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘ আস্তে, মানুষ শুনবে। আশেপাশের লোকজন শুনলে নিস্তার নেই।তুমি এখনও টেস্ট করোনি। আন্দাজে অনেক কিছুই বলা যায়। যদি হয়েও যায় তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই। তবুও চেঁচিয়ো না।’
রিদির হাত মুখ থেকে সরিয়ে দ্বীপ বলল, ‘ আমার সমস্যা আছে। আমি চাই না তোমার কিছু হোক। পুরো জীবনটা বাকি তোমার ।’
‘ কারো কিছুই হবে না। আগামীকাল ফোন দিব বাসায় এসে টেস্ট করার জন্য। দেখা যাক কী হয়।’
পরদিন বাসায় এসে টেস্ট করে দেখে দ্বীপের পজিটিভ, রিদির নেগেটিভ। দ্বীপ কিছুতেই রিদিকে নিজের কাছে রাখবেনা। বাসায় জানিয়ে দিয়েছে সব। জাবেদ সাহেবকে জানানোর পর জাবেদ সাহেব বললেন,
‘ রিদি যদি বাঁচে তোমার সাথে বাঁচবে, মরলে তোমার সাথেই মরবে। এখানে ওর আসার প্রয়োজন নেই।’
জাবেদ সাহেবের এই এক কথায় রিদি মনে সাহস বেড়ে গেল। মিজান সাহেব বললেন তফুরাকে ফোন দিয়ে বলতে যেন প্রতিদিন ডেলিভারি ম্যান দিয়ে রান্না করে পাঠায়। দ্বীপ রাজি হয় নি। এরপর মাহফুজ সাহেবকে মিজান সাহেব নিজেই ফোন দিয়ে বললেন, ‘ একটু দেখে আসতে। ওদের কিছু প্রয়োজন কিনা?’
মাহফুজ নাকোচ করে দিল। দ্বীপ হেসে বাবাকে বলল,
‘ আব্বু দুশ্চিন্তা বাদ দেন। হায়াৎ থাকলে এমনিতেই বাঁচব। কেউ রেধে খাওয়ালে এমন কিছু মেডিসিন পাব না যে শোয়া থেকে উঠে বসে যাব। আমি আর রিদি মিলেমিশে কিছু একটা করে নেব। দিন চলে যাবে। ‘
বোনের অসুস্থতার কথা শুনে রাহা এবং রায়হান নোয়াখালী থেকে এম্বুল্যান্স ভাড়া করে চলে এসেছে। প্রতিদিন খাবার নিয়ে আসে দুজন। বাচ্চাদের নোয়াখালী রেখে এসেছে। একুশ দিন পর দ্বীপ সুস্থ হলেও রিদি অসুস্থ হয়ে গেল। রিদিকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়েছিল। বাঁচা মরার সংগ্রামে বেয়াল্লিশ দিন যুদ্ধ করে যখন দুজন বাসায় ফিরল দ্বীপ তখন রিদিকে বলেছিল, ‘ আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা ফিরে এসেছি ঠিকই কিন্তু আমি মানুষ চিনেছি অনেক।’
রিদি জানে দ্বীপ কার কথা বলছে। দ্বীপের তফুরা ফুফু ঢাকাতে শিফট হয়েছে গত এক বছর আগে। করোনা হওয়ার আগে তার স্বামীর অপারেশন হয়। দ্বীপ ছুটে গিয়েছিল মা বাবার অনুরোধে। একদিনে অঞ্জনার স্বামীর সাথে ডিভোর্স হয়েছে,অন্যদিকে তফুরার স্বামী হাসপাতালে। মানসিকভাবে ওদের পরিবার ভেঙে পড়েছিল৷মিজান সাহেব আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করতে চান নি। দ্বীপের ফুফার এই বিপদে তার ভাইয়েরাও পাশে ছিল না। অথচ দ্বীপ খেলা বাদ দিয়ে ফুফুর পাশে হাসপাতালে পড়ে ছিল। রিদি প্রতিদিন খাবার নিয়ে যেত। সেই ফুফু একদিনও দ্বীপের অসুস্থতায় খবর নেয় নি যদি ওদের দেখতে আসতে হয়। চাচা মাহফুজ তো এমন ভান করল চেনেই না দ্বীপকে। বিপদে মানুষ চেনা যায়।
__
২০২২, মার্চ মাস।
স্নাতক শেষ বর্ষে রিদি। ধীরে ধীরে সব কিছু স্বাভাবিক হয়েছে। দ্বীপ নতুন বিজনেস শুরু করেছে। রিদন বিজনেস দেখে। বিজনেস অফিস চট্টগ্রাম। রিদির পরীক্ষা শেষ হলে রিদিকে নিয়ে চট্টগ্রাম শিফট হবে। খেলা আবার শুরু হয়েছে। দ্বীপ প্র্যাকটিস থেকে ফিরে ভাত খেতে বসেছে। এমন সময় রাহেলা ফোন দিল৷ দুজনের সাথেই কথা হল। কথা শেষে দ্বীপ লক্ষ্য করল রিদির মন খারাপ।
দ্বীপ প্রশ্ন করতেই বলল, ‘ কাল ডাক্তার কাছে নিয়ে যাবে আমাকে?’
দ্বীপ প্রশ্ন করল ভ্রু কুচকে, ‘ কি কারণে?’
‘ আমার সমস্যা কোথায় জানতে চাই?
‘ কি নিয়ে সমস্যা?’
‘ আম্মু আজকেও বলেছে বেবির কথা। যদিও জোর দেন নি। এমনি বলেছে যে শরীর স্বাস্থ্য থাকতে বেবি হয়ে গেলে পরে আর কষ্ট নেই। কিন্তু আমার তো…’
দ্বীপ রিদিকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘ আপসেট হওয়ার প্রয়োজন নেই। সমস্যা আমার। আমি হয়ত তোমাকে ঠিকভাবে আদর যত্ন করিনা। এছাড়া আম্মুরা অনেক কিছু বলে কানে নিও না। তুমি আরেকটু বড় হও। অনেক সময় আছে হাতে।’
দ্বীপের কথায় কিঞ্চিৎ হাসলেও মন পড়ে আছে অন্য জায়গায়। যেভাবে হোক একবার ডাক্তারের সাথে আলোচনা করা প্রয়োজন। বিয়ের প্রায় তিন বছর হতে যাচ্ছে এখনও বেবি না হওয়ার কারণ অস্পষ্ট। যতবার ডাক্তারের কথা বলে দ্বীপ এড়িয়ে যায়। নাকি দ্বীপের বেবির প্রতি অনীহা? রিদির মনে হাজারো প্রশ্নের ভাবনা।
__
ডিসেম্বরের শীতের তীব্রতা এই আছে, আবার এই নেই। ফাইনাল পরীক্ষা শেষ রিদির। পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে বন্ধুরা ঘাসের উপর বসে আড্ডা দিচ্ছে। নিয়াজ কোথা থেকে এসে রিদির পাশে বসল৷ রিদি উঠে যেতে চাইলে খপ করে হাত ধরে ফেলল। রিদি রেগে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
‘ হাত ধরলি কেন? তোর কি আমাকে বাজে মেয়ে মনে হয় যে যখন তখন অনুমতি ছাড়া হাত ধরলে আমি খুশিতে গদগদ হয়ে যাব?’
সবাই চমকে উঠল রিদির আচরনে। নিয়াজ লজ্জা পেয়ে সরি বলল। রিদিকে অনুরোধ করল বসতে। রাগ সংযত করে রিদি বসল। নিয়াজ শান্ত স্বরে বলল,
‘ আমি যে তোকে ঠিক কতটা পছন্দ করি তুই জানিস। ভালবাসা জোর করে হয় না আমি জানি। তোকে জোর করব না। তবে আমার একটা প্রশ্ন মনে থেকে যাবে, আমাকে তুই এক্সেপ্ট না করার কারণ কি আমার গায়ের রঙ নাকি আমি গরীব ঘরের ছেলে তাই?’
রিদি কিছু বলবে ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল। ফোন দিয়েছে দ্বীপ। পরীক্ষা কেমন হয়েছে? কোথায় আছে এসব জিজ্ঞেস করছে? স্বল্প পরিসরে উত্তর দিয়ে চুপ করে বসে আছে। ফোন রেখে নিয়াজের মুখোমুখি হয়ে বসল। বলল,
‘ তোর বাবা মা, গায়ের রঙ কোনো কিছুতেই আমার সমস্যা নেই। কিন্তু আমি তোকে কখনও বন্ধু ব্যতীত অন্য কিছু ভাবিনি।’
‘ ভাব, ভাবতে তো সমস্যা নেই।’
হঠাৎ অপরিচিত পুরুষালি গলা শোনা গেল, ‘ অবশ্যই সমস্যা আছে। এমন কিছু হলে সেটা কবীরা গুনাহ হবে। ‘
সবাই ঘাড় ঘুরাতেই দেখল অপরিচিত গলার পুরুষটি মাথার ক্যাপ আর মুখের মাস্ক খুলে রিদির পাশে বসে এক পাশ থেকে ওকে জড়িয়ে ধরে বলল,
‘ আমার স্ত্রী রিধিমা । আমাদের বিয়ের বয়স তিন বছর।’
আশপাশের বেশ কিছু ছেলে মেয়ে ছুটে এসেছে। রিদির ফ্রেন্ডরা একসাথে কতগুলো বিস্ময় নিবে বুঝতে পারছে না। একে তো বান্ধবী বিবাহিত তারা জানে না। অন্যদিকে রিদির বর বাংলাদেশ ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেন শাহদ্বীপ জিহান। নিয়াজ রিদির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। সরি বলে উঠে চলে গেল। রিদি বন্ধুদের সাথে বেশ কিছুক্ষন বসে বটতলা গিয়ে ভাত ভর্তা খেয়ে বাসার উদ্দেশ্য রওয়ানা হল। রিদি আজ ভীষণ খুশি। দ্বীপের সারপ্রাইজ ওর পছন্দ হয়েছে।
ইশ জীবন কত সুন্দর। প্রতিটি মানুষ এমন জীবনই চায়। রিদির ফলাফল বের হয়েছে। চুয়াল্লিশ তম বিসিএস এর প্রিলিতে হয়ে গিয়েছে। কিছুমাস পর রিটেনেও হয়েছে৷ এত সুখের মাঝে হঠাৎ হানা দিল দুঃখ পাখি। রিদি ডাক্তারের কাছে গিয়ে শুনল ওর সমস্যা আছে। চকলেট সিস্ট ধরা পড়েছে৷ সিস্টের আকার বেশ বড়৷ সেদিন রাতে বাসায় এসে অনেক কাঁদল। আগে যদি বাচ্চা থাকত জরায়ু ফেলে দেয়া যেত অপারেশন করে। কিন্তু এখন ডাক্তার এই রিস্ক নিতে চাচ্ছেন না। অন্তত একটা বাচ্চা হওয়া তো ভীষণ জরুরি।
দ্বীপ রিদিকে আশ্বস্ত করল ইতালি থেকে এসে এই ব্যাপারে কথা বলবে। এর মাঝে রিদি ঔষধ সেবন করুক।
পরদিন দ্বীপ ইতালির পথে পাড়ি দিবে। রিদিকে সান্ত্বনা দিয়ে রাহার কাছে রেখে গেল। ইতালি যাওয়ার পর দুজনের যোগাযোগ কমে গেল দ্বীপের ব্যস্ততায়। রিদি উদাস থাকতে শুরু করল৷ দ্বীপ দু মাস পর ফিরে এলো। ফিরে আসার পর দ্বীপ লক্ষ্য করল রিদির আচরনে পরিবর্তন। কেমন যেন গোমড়া ভাব। দ্বীপ কাছে গেলেই দূরে সরে যায়। হয়ত বেবি নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ। দ্বীপ নিজ থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে। নিজেও ভীষণ একাকিত্বে ভুগছে।
অন্যদিকে রিদির মনে হচ্ছে তাদের দুজনের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। দ্বীপ রিদিকে আগের মত সময় দিচ্ছে না। কার সাথে যেন ফোনে কথা বলে বেশ সময় ধরে। বাসা থেকে বের হয়ে যায় ফোন আসলেই। রাতে দ্বীপ ঘুমানোর পর ওর আঙুলের ছাপ দিয়ে ফোন লক খুলে কল লিস্ট চেক করতে গিয়ে দেখল, ‘ ফারহিন ‘ নামে এক মেয়ের সাথে অনেক কথা হয়। ভিডিও কলেও কথা হয় ৷ চ্যাট লিস্টে একটা মেসেজ আছে,
‘ আপনি চাইলেও ভুলতে পারবেন না আমাকে । আমি নিজের সেরাটা দিব। ভালোবাসার জায়গায় নো কম্প্রোমাইজ।’
‘ ভরসা করতে পারি তোমাকে?’
‘ হান্ড্রেড পারসেন্ট।’
ফোনটা আগের জায়গায় রেখে দিল রিদি। শরীরের কম্পন টের পাচ্ছে। বুকের ভেতর তোলপাড়। নিজেকে সামলাতে পারছে না। দ্বীপ আর অন্য মেয়ে? কি করে সম্ভব! তাই বুঝি দ্বীপের আচরণে এত পরিবর্তন। মেঝেতে শুয়ে ছিল সারা রাত। দ্বীপ সকালে ঘুম থেকে উঠে রিদিকে মেঝেতে দেখে অবাক হল। নিজেও রিদির পাশে শুয়ে পড়ল। রিদির কোমড় জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রাখল। ঘুম ঘুম গলায় বলল, ‘ নিচে কেন?’
রিদি নিশ্চুপ। দ্বীপ পুনরায় বলল, ‘ আমার এই মুহুর্তে তোমাকে লাগবে রিদি। প্লিজ ‘না’ করো না আজ।’
রিদির ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি। ঘরের বউ ও ঠিক রাখবে, বাইরের প্রেমিকাকেও ভরসা করবে। কি পেশাদার প্রেমিক তার দ্বীপ! ইচ্ছে করল প্রশ্ন করতে ফারহিনের ব্যাপারে, কিন্তু নিজেকে দমিয়ে ফেলে বলল,
‘ বেশ তো, আমি তো তোমার জন্যই আছি।’
রিদি কাঁদছে। দ্বীপের আজ সেই খেয়াল নেই ৷ রিদিতে মত্ত আজ। এই দ্বীপের সাথে আগের দ্বীপের কোনো মিল নেই৷ দ্বীপের আজকের আদরে রিদি যত্ন খুঁজে পায় নি। কেমন যেন উগ্র আচরণ। এই প্রথম রিদি অনিচ্ছা প্রকাশ করল নিজেদের সুখের মিলনে। দ্বীপ যখন রিদিকে ছেড়ে উঠে গেল রিদি তখন অন্য চিন্তায় মগ্ন।
দ্বীপ ওয়াশরুম থেকে উঠে দেখল রিদি উবু হয়ে মেঝেতে বসে আছে। ভ্রু কুচকে দ্বীপ প্রশ্ন করল, ‘ কি হলো, বসে আছ কেন? ফ্রেশ হয়ে নাও। নাকি আমি সাহায্য করব? ‘
রিদি কথা না বলে বাধ্য বাচ্চার মত উঠে পা বাড়াল ওয়াশরুমের দিকে। নিরবে কাঁদল ঝর্ণার পানির নিচে দাঁড়িয়ে। এরচেয়ে তিক্ত অনুভূতি বোধ হয় আর একটি ও নেই পৃথিবীতে? ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে দেখতে পেল দ্বীপ নাস্তা রেডি করে টেবিল সাজিয়েছে। দুজনই খেল ৷ দশটার দিকে দ্বীপের কল এসেছে। ফারহিন কল করেছেন। দ্বীপ বেরিয়ে গেল তড়িঘড়ি করে। রিদি ডাইনিং টেবিলে বসে আছে আর ভাবছে, ‘ কেন এত এত অসুখেও মরলাম না?’
ব্যাগ গুছিয়ে এই অবস্থায় বেরিয়ে গিয়েছিল সেদিন। দ্বীপকে ফোনে জানিয়েছিল, নোয়াখালী যাচ্ছে৷ ব্রেক প্রয়োজন। আর ফিরে নি।
চলবে…
