Thursday, June 4, 2026







হৃদিতে রিদি পর্ব-১৬

#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
#দ্বীপ_রিদির_বিয়ে
১৬.

রিদির ফোনে একটার পর একটা মেসেজ আসা শুরু হয়েছে। পার্লার থেকে বের হয়ে কমিউনিটি সেন্টার অবধি আসতে আসতে মেসেজ গুলো চেক করল৷ দুজন মানুষের মেসেজ এসেছে। একজনের টা ইগ্নোর করে অন্যজনের টা পড়তে পড়তে মুচকি মুচকি হাসছে।

দ্বীপ দুই পরিবারের সাথে একসাথে মসজিদে যোহরের নামাজ আদায় করেছে। অস্থির হয়ে বার বার প্রশ্ন করছে মেসেজে , ‘ কত দূর হলো, কখন আসবে, আর কতক্ষন অপেক্ষা করতে হবে এসব।’
সেন্টারে ঢোকার আগেও দ্বীপ মাস্ক পরে ঢুকেছে শুনে রিদি হেসে ফেলল। প্রমা এবং মিরাও এসেছে। ওদের খুশি ধরে কে? বান্ধবীর এতদিনের সম্পর্কের পরিণতি স্বচক্ষে দেখছে, এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মত না।

দ্বীপের মুখ বেশ গম্ভীর। কেউ কেউ বলছে বিয়ের দিন বরকে সুন্দর লাগা উচিত নয়, নজর লাগে। আর কেউ কেউ বলছে বর বিখ্যাত ব্যক্তি, চাইলে আরও সুন্দরী বিয়ে করতে পারত, অনেকের মন্তব্য খাবার ভালো হয় নি আবার অনেকের ধারণা এই বিয়েটা সম্পর্কের বিয়ে। সব মিলিয়ে বিয়ে বাড়িতে আত্মীয় স্বজনরা অপ্রয়োজনীয় কথার ঝুলি নিয়ে বসেছে।

প্রথমে রিদিকে বিয়ে পড়ালেন কাজী সাহেব। রিদির মামা পাশে ছিলেন। তিনি সাহস দিতেই রিদি অবলীলায় আলহামদুলিল্লাহ বলে ফেলল। সে বুঝতেও পারে নি তার দিক থেকে কবুল বলা হয়ে গিয়েছে। কাজী সাহেব চলে যাওয়ার পর রাহাকে বলল,

‘ আপু আমি কবুল বলিনি তো?’
‘ আলহামদুলিল্লাহ বলেছিস তো?’
‘ দুটো এক না, কাজী সাহেবকে ডাকো, কবুল বলব। কান্না করব। আমি তো বুঝিও নি বিয়ে এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে।’

আমিনা মেয়েকে ধমকে বলল, ‘ কি বেহায়া দেখছো। আস্তে কথা বল। আত্মীয় স্বজনরা শুনলে কি বলবে?’

মায়ের ধমক খেয়ে রিদি চুপসে গেল৷ এখনও কি বকবে? এখন তার বিয়ে হয়েছে না?

__

কাজী সাহেব দ্বীপকে যা যা বললেন দ্বীপ মুখে মুখে সবই বলল। এখন সকলের অপেক্ষা দ্বীপের মুখ থেকে কবুল শোনার। দ্বীপ চুপ করে আছে। জাবেদ সাহেব এবং মিজান সাহেব দ্বীপের পাশে বসলেন। দুজনই টের পাচ্ছেন দ্বীপের বিচলিত অবস্থা। নিজেকে ধাতস্থ করে দ্বীপ কবুল বলে ফেলল। সবাই কোলাকুলি করছে। শুভেচ্ছা জানাচ্ছে, মিষ্টি মুখ করাচ্ছে। দ্বীপ চুপ করে বসে আছে এক পাশে। খাবারের আগে রিদিকে আনা হল।

দ্বীপের পাশে বসানো হল। রিদির মাথা ঘোমটায় ঢাকা। ভাই বোনেরা সবাই অনুরোধ করল ঘোমটা তুলতে৷ সংকোচ নিয়ে দ্বীপ ঘোমটা তুলল। রিদির মুখ দেখে মাশা আল্লাহ উচ্চারণ করল। আরেকটা শব্দ উচ্চারণ করল যা রিদি ছাড়া কেউ শোনেনি। ‘ আমার বউ’। তা শুনেই রিদি চোখ তুলে দ্বীপের দিকে তড়াক করে তাকাল। শুভদৃষ্টি হল ঠিকই কিন্তু দ্বীপ আবেগ ধরে রাখতে পারে নি আজ। কিছুক্ষন রিদির দিকে তাকিয়ে থেকে, ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। আচমকা সেন্টার জুড়ে থাকা কোলাহল থেমে গেল। বর স্টেজ ছেড়ে উঠে গিয়েছে। বড়রা বুঝতে না পেরে সামনে এগিয়ে এল। রায়হান ইশারা দিল শান্ত থাকতে। রিদন এবং রায়হান দুজনই ওয়াশরুমের দিকে গিয়ে দেখে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে দ্বীপ। কাঁদছে। রিদনকে আটকে দিল রায়হান,

‘ যেয়ো না, কাঁদতে দাও৷ ওদের এই প্রাপ্তির পেছনে দুজনের কষ্ট গুলো আড়াল করা। কেঁদে হালকা হোক।’

রায়হান আর রিদন দ্বীপকে একা ছেড়ে দিয়ে হলে এসে সবাইকে বলল যে দ্বীপের শরীর খারাপ লাগাতে ওয়াশরুমে গিয়েছিল। গত কয়েক রাত ঘুম হয়নি তাই। এদিকে রিদি স্টেজে বসে দুশ্চিন্তা করছে। প্রায় মিনিট দশেকের মাথায় দ্বীপ ফ্রেশ হয়ে এসে রিদির পাশে বসল। মেকি হেসে ভাইবোনদের বলল, ‘ সরি আমার শরীর টা হঠাৎ করেই খারাপ হয়ে গিয়েছিল।’

রায়হান সবাইকে ছবি তুলতে ব্যস্ত করে দিল। সখিনা বানু, আম্বিয়া বেগম বান্ধবী হয়েছে। দ্বীপ সরাসরি রিদির দিকে আর একটি বারও তাকায় নি। হাতের ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে। রিদি একটু কাত হয়ে বলল, ‘ তুমি আমার দিকে তাকাচ্ছ না কেন? আমাকে দেখতে কি বাজে লাগছে? ‘

দ্বীপ ফোনের দিকে তাকিয়েই বলল,’ দেখছি তো।’

রিদি খানিকটা অভিমান নিয়েই বলল, ‘ হ্যাঁ দেখছেন তো, কিন্তু আপনার ফোন। ভাল, ফোনের দিকেই তাকিয়ে থাকুন, বিয়ে তো ফোনের সাথেই হয়েছে।’

দ্বীপ ফোনটা রিদির সামনে এগিয়ে দিল। রিদি ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে তারই ছবি দেখছে দ্বীপ। কিছুক্ষণ আগে তোলা। লজ্জা পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে ফেলল। দ্বীপ হেসে বলল, ‘ সরাসরি তোমার চোখের দিকে তাকানোর ক্ষমতা আপাতত নেই । আমি সম্ভবত নিজেকে সামলাতে ব্যর্থ হব । ‘

প্রমা এবং মিরা সামনে আসতেই দ্বীপ দুজনকে বলল, ‘ আমি তোমাদের দুজনের প্রতি কৃতজ্ঞ। তোমরা না থাকলে রিদি কখনো আমার হত না।’

রিদির ফোনে ক্রমাগত কল আসছে। রিদিকে বার বার কাটতে দেখে দ্বীপ প্রশ্ন করল, ‘ কোনো সমস্যা?’

রিদি ঘাবড়ে গিয়ে মাথা নেড়ে জানাল কোনো সমস্যা নেই।

___

যাওয়ার সময় জাবেদ সাহেব যখন রিদিকে দ্বীপের হাতে তুলে দিচ্ছেন তখন সামান্য কিছু কথা বললেন, ‘ তোমার উপর ভরসা করলাম, নিরাশ করো না। ‘

রিদিকে বুকে জড়িয়ে বললেন, ‘ তোমাকে শেষ অবধি আমি পড়াব যতদিন বেঁচে আছি। নিজের জন্য একটা স্থান করে নিবে এই আমার অনুরোধ। বাবার সাহায্য প্রয়োজন হলে বাবাকেও বলার প্রয়োজন নেই। একাউন্ট থেকে টাকা তুলে নেবে। নিজের উপর কারো অত্যাচার সহ্য করবে না। প্রতিবাদ তোমার অস্ত্র। ভালো থাকো, সুখী হও। ‘

জাবেদ সাহেব দুজনকে বুকে জড়িয়ে দোয়া করে সামনে থেকে সরে গেলেন। মেয়ের বিদায় মেনে নিতে পারবেন না তিনি।

বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে দ্বীপদের বাসায় আসতে আসতে প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। দ্বীপ গাড়িতে রিদির একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় পুরে অন্য হাতে ফোনে কথা বলছিল। এই গাড়িতে রাহেলা এবং রিদিকেই প্রথম বসিয়েছে। রিদন সামনে বসেছে ড্রাইভারের সাথে। ঘাড় ঘুরিয়ে এমন দৃশ্য দেখে মনে মনে ভাবল, ‘ আহ! ভাইয়া- ভাবী দুজনকে কত মানিয়েছে। কি শান্ত প্রেম। আর আমার টা হলে এতক্ষনে গাড়িতে ধুম মাচালে গানের সাথে নাচ লাগিয়ে দিত। ‘ পরক্ষনেই ভাবল নাচ গানের জন্য হলেও এবার বিয়েটা করে নিতে হবে। কটা দিন গেলে বাসায় এই কথা উঠানো জরুরি। আর কত কোলবালিশ জড়িয়ে ঘুমাবে? আজ বিয়েতে আসতে পারেনি বলে প্রমি মন খারাপ করেছে। দ্বীপ বলেছিল প্রমিকে আসতে বলার কথা রিদন নিজ থেকেই বারণ করছে। কখন বেফাঁস কিছু মুখ দিয়ে বের করে ফেলবে তখন বিপদ হবে।

বাসায় ফিরে সবার মাঝে জম্পেশ আড্ডা জমে উঠেছে। দ্বীপের কোনো ফুফুই এই বিয়েতে উপস্থিত ছিল না। রাহেলা ফোন দিয়ে বলার পরও তারা আসে নি। অন্যদিকে মিজান সাহেব জেদ ধরেছে এদের সাথে সম্পর্কই আর রাখবেনা। সারাজীবন খেটেছে এদের জন্য অথচ তার আনন্দের সময়ও এরা নিজেদের স্বার্থ খুঁজে বেড়াচ্ছে।

রিদিকে ড্রইং রুমে বসানো হলো। ভেতরে রিদন অন্য ভাইবোনদের নিয়ে কামরা সাজাতে ব্যস্ত। রাহেলা রিদিকে মিষ্টি মুখ করাচ্ছে। রিদির পাশে এসে সখিনা বানু বসলেন। এখনও চোখে ঝাপসা দেখেন। কানে হিয়ারিং এইড থাকে সবসময়। রিদিকে বললেন, ‘ তুমি কি আমার নাত বউ?’

রিদি উপর নিচ মাথা নাড়ল। সখিনা বানু সবাইকে বলল, ‘ এই বউডা সুন্দর আছে। আগের বউ ডা ভালা না দেখতে। ‘

ড্রইং রুমে বাজ পড়ল। আগের বউ মানে? এই মহিলা কি বলে? সাজিনা দাদীকে বলল, ‘ এই দাদী কি বলো এসব। আগের বউ মানে?’

সখিনা বানু কি আর সাজিনার কথা কানে তোলে? রিদিকে আপন মনে বলা শুরু করেছে, ‘বিষ খাইয়া মইরা গেছে আগের বউডা।’

সেই সময় রিদন ড্রইং রুমে এসে দাদীর কথা শুনল। প্রথমে বিচলিত হলেও পরে পুরোটা শুনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল, ‘ ভাবী কিছু মনে কইরেন না। আমার ফুফাতো বোন ভাইয়ার প্রেমে মানসিক রোগী হয়ে গিয়েছে তবে এখনও বিষ খায় নি। খেলে তো আমরা বেঁচে যেতাম। দাদী তাকেই বউ বলছে। ‘

রিদির হাসি পেলেও নিজেকে সামনে নিলো। তবে রিদি অবাক হল এই মেয়ের কথা সে আজ পর্যন্ত কখনো দ্বীপের মুখে শুনে নি , কিন্তু কেন?

সখিনা বানু রিদনকে ধমক দিলেন তার কথার মাঝে বাম হাত ঢোকানোর জন্য। তিনি পুনরায় বলতে লাগলেন,
‘ আমার জিহান ভাই ওই বউরে সোহাগ করত না। হের লাইগা ওই বউ ভাইগগা গেছে। তুমি কইলাম জামাইয়ের কোল থেইকা নামবা না। বউ হইল সোহাগ করনের জিনিস। বউ ভাইগগা যাইব ক্যা? আর হুনো নাত বউ, আমার নাতী যেমনে খাইতে চায় অমনে খাইতে দিবা। আমারে তোমার দাদা শ্বশুর কইতো যে জামাই বউরে বেশি আদর করে সে কামড়াইয়া …’

মিজান সাহেব এবং মাহফুজ সাহেব বাইরে থেকে মাত্র এই রুমে এসেছিলেন, মায়ের কথা শুনে না বসেই চলে গেলেন। রিদন দাদীকে এক চোট বকে বলল, ‘ এই বুড়ি তোমার জামাই তোমারে কামড়াইছে না খামছাইছে ওইটা ঢাক ঢোল পিডাইয়া কওন লাগব? শরমের মাথা খাইছ নি পাগল বুড়ি?’

দ্বীপ এতক্ষন চুপ করে সব শুনছিল। তবে ফোনে মনোযোগ থাকাতে লক্ষ্য করে নি৷ আপাতত অশালীন কথা কানে আসাতে সাজিনাকে বলল, ‘ দাদীকে রুমে নিয়ে যা। ‘

সখিনা বানুর থামার নাম নেই। দ্বীপকে বলল, ‘ ভাই আগে দুই রাকাত নামাজ পইড়া নিও। রহমত পাইবা। এরপর বউরে ধরবা।’

দ্বীপ শান্ত স্বরে দাদীকে বলল, ‘ দাদী তুমি চুপ থাকতে পারো না।’

রিদন রান্নাঘর থেকে রাহেলাকে ধরে নিয়ে এসেছে । রান্নাঘরে কাজ করছিল রাহেলা এবং ওর জা। দুজনই ছুটে আসল। তখন সখিনা বানু ছেলের বউদের বলল, ‘ ও বউরা জামাই বউয়ের রুমে দুধ আর মিষ্টি দিও। জিহান বউয়ের মুখে মিষ্টি খাওয়ায় এরপর বউরে…’

দ্বীপ চিৎকার দিয়ে রিদনকে ডেকে বলল, ‘ রিদন দাদীকে তুলে নিয়ে রুমে রেখে আয়। যা মুখে আসছে তাই শুরু করেছে।’

এই প্রথম দ্বীপকে কেউ লজ্জায় চিৎকার দিতে দেখল। রিদন সখিনা বানুকে কোলে তুলে নিল। সখিনা বানু চিল্লাচিল্লি করে বলে, ‘ আরেহ হতচ্ছাড়া আমারে কোলে নিতাছোস ক্যা। বাসর তো ওগো দুজনের। তোর শরম নাই রিদইন্না। নামা আমারে। আমারে কেউ বাঁচাও। আমারে তুইলা নিয়া যায়! বেশরম কোনহানকার, বুড়ি বেডিরে কোলে নিছোস ।’

রিদন রুমে রেখে আসল সখিনা বানুকে। মা, চাচীকে বলল তাকে ব্যস্ত রাখতে। মাহফুজ সাহেবের স্ত্রী তাকে ভুলিয়ে অন্য কাজে ব্যস্ত করলেন। রিদন আসার আগে দাদীকে বলল, ‘ পুরা আটার বস্তা, কেমনে যে দাদা এইডারে সামলাইছে আল্লাহ জানে।’

__

মাহফুজ সাহেব এবং মিজান সাহেব দুই ভাইয়ের মাঝে তর্কযুদ্ধ চলছে, হাসপাতালে যাওয়া নিয়ে। অঞ্জনা সুইসাইড এটেম্প করেছে দ্বীপের বিয়ে হয়ে গিয়েছে শুনে। মিজান সাহেব ছোট ভাইয়ের উপর রাগ করে বললেন,

‘ ছোট বেলা থেকেই এক কথা এই মেয়ের মাথায় ঢুকানোর জন্য তোরা দায়ী। আমার পরিবারের পক্ষ থেকে কিংবা জিহান কখনোই কোনো প্রশ্রয় দেয় নি। আর আমি তফুরার সাহসের তারিফ করি। কত বড় নেমকহারাম হলে বলে আমার নামে কেইস করবে? করুক কেইস। আমি কিছুতেই যাব না। ‘

আজ মিজান সাহেবকে এভাবে কথা বলতে দেখে পরিবারের বাকিরা ভীতসন্ত্রস্ত । এবার মাহফুজ রাহেলাকে অনুরোধ করে বলল, ‘ ভাবী আপনি চলেন, ভাইয়া না গেলে নাই। আমাদের তো একটা সমাজ আছে বলেন।’

রাহেলা রাজি হয়ে যাবে কিন্তু তার আগেই মিজান সাহেব ধমকে বললেন, ‘ কিসের সমাজ! ওরে যখন তোর বোনেরা অত্যাচার করত তখন সমাজ কি প্রতিবাদ করছে? তোর বউরে অত্যাচার করলে বুঝতে পারি কেমন মানসিক যন্ত্রণায় ছিলাম আমি। আম্মাকে দিন রাত কানের মধ্যে হাবিজাবি কথা দিত। ফলশ্রুতিতে আমার ঘরে অশান্তি। আমার পরিবার থেকে কেউ যাবে না। ‘

দ্বীপ প্রশ্ন করল, ‘ কিছু কি খেয়েছে নাকি গলায় দড়ি দিয়েছে?’

আচানক রিদন অট্টহাসি দিয়ে ফেলল। আর ওকে থামানোর সাধ্য ও কারো নেই। বলল, ‘ ভাই, খবিশটা বাথরুম ক্লিনজার মানে হারপিক খাইছে। দাদীর কথা ফলে গেছে। কষ্ট কইরা বাথরুম ক্লিনজার না খাইয়া এক চামচ বর্জ্য কমোড থেকে তুইলা নিয়াই খাইত। অথবা আমারে ফোন দিয়ে বললে আমি আমাদের শান এর মুত এক বোতল নিয়া খাওয়ায় দিতাম।’

মিজান সাহেব আর মাহফুজ চোখ পাকিয়ে রিদনের দিকে তাকিয়ে আছে। এদিকে দ্বীপ ধমকে বলল, ‘ ফাইযলামি সব জায়গায় মানায় না। ‘

মিজান সাহেব বেশ কিছুক্ষন পর রাজি হলেন তবে রাহেলাকে নেবেন না। দ্বীপকে ও যেতে বারণ করেছেন। দ্বীপের মন টানছে না বাবাকে এই পরিস্থিতিতে একা ছাড়তে। তফুরা ফুফু যদি সত্যি ঝামেলা করে। রিদির কাছে অনুমতি চাইতে গেলে রিদি সায় দিল। রিদন নিজ থেকেই বলল সে যাবে।

যাওয়ার সময় দ্বীপ মুখে মাস্ক পরে নিল। গাড়িতে রিদন বলল, ‘ ভাই আমার মনে হচ্ছে তফুরা বেগম ঝামেলা করবে। যদি কেইস খেয়ে যাও…? মনে রেখো ভাবী তোমার জন্য বাসায় অপেক্ষা করছে। এই খবিশ মেয়েটার জন্য তোমার আসা উচিত হয়নি। ‘

দ্বীপ চিন্তিত স্বরে বলল, ‘ আব্বুকে একা ছাড়লে ফুফু যে কী করত আমাকে বের করে আনার জন্য সেটা ভেবেই আমি অসুস্থ বোধ করছি। আমি না গেলে ঝামেলা আরও বাড়বে বৈ কমবে না। এনিওয়ে, তুই আগে উপরে যেয়ে দেখবি সব ঠিক কিনা এরপর আমি যাব। ‘

হঠাৎ রিদন খেয়াল করল তাদের গাড়ির পেছনে বেশ কিছু বাইক। এই বাইক গুলো হাসপাতাল পর্যন্ত এসেছে। কিছুক্ষণ পর বুঝল এগুলো ওদের নিরাপত্তার জন্য এসেছে। রিদন প্রথমে উপরে গিয়ে দেখে পুলিশ কেবিনের সামনে। তফুরা রিদনকে দেখে চিৎকার দিয়ে উঠল। রিদন সিঁড়ি দিয়ে ভৌ দৌঁড় দিয়ে নিচে নামল। এদিকে ওর পেছনে পুলিশ ছুটছে। নিচে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘ ডাইনী টা পুলিশ নিয়ে এসেছে সত্যি সত্যি। ‘

মিজান সাহেব কিড়মিড়িয়ে ভাইয়ের দিকে তাকালেন। মাহফুজ ঢোক গিলে বলল, ‘ আমি কি আর জানতাম?’
দ্বীপ একটু আড়ালে এসে এমপি সাহেবকে ফোন দিল। সব খুলে বলতেই এমপি সাহেব শর্তের বিনিময়ে উপকার করবেন জানালেন। দ্বীপ খানিকটা ঘাবড়ে গেল। আবার রাজনীতি করতে বলবে নাতো? দ্বীপকে অবাক করে দিয়ে তিনি বললেন, ‘ নেক্সট ম্যাচে কে জিতবে, কে হারবে জানি না। তবে তুই দুইটা গোল করবি কথা দে।’

দ্বীপ হেসে ফেলল। মানুষটা যেমনই হোক দ্বীপের প্রতি তার স্নেহ দ্বীপকে বরাবর মুগ্ধ করে। তফুরা বাড়াবাড়ি করার সুযোগ তেমন পায় নি। এই মহিলা এত খারাপ যে নিজের ভাইয়ের পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা করতে পিছ পা হত না যদি না এমপি পুরো ব্যাপারটা সামলে নিতেন। পুলিশ ও ঝামেলা করে নি।

অঞ্জনা দ্বীপের সাথে দেখা করতে চাইলে রিদন বাঁধা দিল। নার্স বলল, ‘ পেশেন্ট শুধু জিহান নামে কারো সাথে দেখা করতে চাইছেন। ‘

দ্বীপের মাথায় ক্যাপ, মুখে মাস্ক। যার কারণে এখন পর্যন্ত কেউ জানেনা এর আড়ালে কে আছে? রিদন নার্সের সাথে রেগে গিয়ে বললেন,

‘ আপনার পেশেন্ট কে মরতে বলেন। এরম নষ্ট মাইন্ডের মেয়ের মরে যাওয়া উচিত। আমার ভাই একা যাবে না ওই হতচ্ছাড়ির রুমে। গেলে আমিও যাব। এনিওয়ে আপনাদের হাসপাতালে দেখি পরকিয়া সাপোর্ট করছেন? এই মেয়ে পাগল হয়ে আমার ভাইয়ের জন্য মরতে বসলে দোষ কি আমার ভাইয়ের? উলটা ওর সাত জন্মের ভাগ্য আমার ভাবী ঝাটা হাতে আসে নাই ওরে মারতে। এই হাসপাতালের নামে পুলিশ কেইস করব আমি।’

তফুরা চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে। এদিকে দ্বীপ এবং রিদন কেবিনে আসল অঞ্জনার সাথে দেখা করতে। অঞ্জনা জেগেই ছিল। দ্বীপকে প্রশ্ন করল, ‘ তোমার ওয়াইফ কোথায় জিহান ভাই? ‘

রিদন আগ বাড়িয়ে উত্তর দিল,’ বাসায়, বাসর ঘরে। ভাই এর জন্য দুধ মিষ্টি নিয়ে বসে আছে। তুই মরতে গেলি কেন? নতুবা এতক্ষণে ভাই মিষ্টি খেয়েও ফেলত। বেদ্দপ মাইয়া, আমার ভাবীটা একা বসে আছে। ভালো কথা কোন কোম্পানির হারপিক খাইছিস যে মরলিনা? আমি ওগো বিরুদ্ধে কেইস করমু দুই নাম্বার জিনিস কেন বিক্রি এর জন্য।’

দ্বীপ দাঁত খিঁচে ভাইকে বলল, ‘ তুই সুস্থ আছিস? পাগলের প্রলাপ বকছিস কেন?’

রিদন ঢোক গিলে বলল, ‘ সরি ভাই।’

অঞ্জনার মাঝে কোনো অপরাধ বোধ নেই। জিহানকে ফের বলল, ‘ জিহান ভাই আজ তোমার ঘরে আমি বউ হয়ে থাকতাম, কিন্তু এমনটা কেন হলো না?’

জিহান মাস্কটা খুলে উত্তর দিল, ‘ এমনটা কখনও সম্ভব হত না। আর কেউ জোর করলে আমাকে খুঁজে পেত না। রিদি ছাড়া আমি কাউকেই গ্রহন করব না। তুমি এত বুদ্ধিমান একটা মেয়ে হয়ে এমন বাজে কাজ করেছ যে তোমার বাবা মায়ের মুখ দেখানোর জায়গা রাখো নি। একদম ঠিক করো নি। এখনো সময় আছে। জীবনটাকে গুছিয়ে নাও।’

‘ আমার জীবন তো তুমি ছিলে।’

রিদন খেঁকিয়ে উঠে বলল, ‘ হ কেউ শাহরুখ খানকে বিয়ে করব বলে চিল্লায় মরতে বসলে শাহরুখ খান তো ছুইটা আইসা তারে বিয়া করব গৌরিরে রাইখা তাই না? সেলিব্রিটিদের নিয়ে স্বপ্ন দেখা ভাল কিন্তু বাড়াবাড়ি অন্যায়।’

অঞ্জনা হেসে বলল, ‘ জিহান ভাই সেলিব্রিটি হওয়ার আগে থেকেই আমি তাকে চাইতাম।’

‘ ভাই সেলিব্রিটি হইছে ভাবীর জন্য, তোর কোনো ক্রেডিট নাই। এ্যই তুই এরম ফর ফর কইরা কেমনে কথা কইতাছোস, নাকি মা মেয়ে মিলে নাটক করছোস যাতে আমাদেরকে ফাঁসাতে পারোস। তোরা চৌদ্দগুষ্টি নাটক বাজ। ভাই চলো।’

দ্বীপ রিদনকে পুনরায় ধমক দিয়ে চুপ থাকতে বলল। অঞ্জনাকে অনুরোধের গলায় বলল, ‘ অঞ্জনা, যা করেছো তা যেন শেষবার হয় । নতুন কিছু করো না। জীবন সুন্দর। সাজিয়ে নাও। আসছি। আল্লাহ হাফেজ।’
__

সবাই বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা। দ্বীপ ভীষন ক্লান্ত হয়ে গা এলিয়ে দিলো সোফায়। সাজিনা এক গ্লাস শরবত করে আনল। দ্বীপকে বলল, ‘ ভাইয়া ভাবী তো অপেক্ষা করছে। ‘

দ্বীপ শরবত টুকু গিলে প্রশ্ন করল, ‘ তোরা খেয়েছিস?’

‘ ভাবী তোমাকে ছাড়া খেতে চায় নি, আম্মু জোর করে খাইয়ে দিয়েছে।’

এর মাঝে রাহেলা ছেলেকে ডেকে নিয়ে বললেন অঞ্জনার ব্যাপারে রিদিকে জানাতে। সম্পর্কে কোনো রাখঢাক না রাখতে। মায়ের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনল। মনে মনে ভাবল, পৃথিবীর সব মায়েরা যদি এমন হত!

নিজেদের কামরায় প্রবেশ করল দ্বীপ । বাড়ির বাকিরা শুয়ে পড়েছে। চারদিকে ফুলের মিষ্টি সুবাস। এই বিয়েতে নিজেদের পরিবারের লোকজন ছাড়া কাউকেই দাওয়াত দেন নি মিজান সাহেব । বাসায় সবাইকে খুব শক্তপোক্ত ভাবে বলেছে এই ছবি যেন কোথাও না দেয়া হয়। অন্যদিকে রিদিকে গায়ে হলুদের রাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের জানাতে নিষেধ করেছে দ্বীপ। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে খ্যাতির বিড়ম্বনা স্বীকার হবে তা রিদি সামলাতে পারবে না, পড়াশোনায় প্রভাব পড়বে।

কামরায় ঢুকে দেখল রিদি শানের সাথে গল্প করছে খাটের এক কোণায় বসে ৷ সাজিনা এসে শানকে নিয়ে গেল। রিদি দ্বীপকে দেখে উঠে দাঁড়াল। দুজনের মাঝে এক রাশ সংকোচ। রিদিকে বসতে বলে দ্বীপ নিজেও বসল বেতের সোফায় । টুকটাক প্রশ্ন করছে শরীর কেমন, কি দিয়ে খেয়েছে এসব; রিদি মাথা ঝেঁকে উত্তর দিচ্ছে। রিদির সংকোচ দেখে দ্বীপ প্রশ্ন করল, ‘ তুমি ঠিক আছ?’

রিদি মাথা নেড়ে জানায় ঠিক আছে। দুজনই বিব্রতবোধ করছে। কোথায় থেকে শুরু করবে, কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না। গত পাঁচ বছরে অসংখ্য বার দেখা হলেও একই কামরায় এই প্রথম। দ্বীপ উঠে দাঁড়াতে রিদিও উঠে দাঁড়াল। দ্বীপ এক পা আগাতেই রিদি এক পা পিছিয়ে গেল। দ্বীপ লজ্জা পেয়ে বলল,

‘ আশ্চর্য! রিধিমা , এমন যদি সংকোচ করো আমি স্বাভাবিক হব কি করে? তোমার আচরণে আমি বিচলিত বোধ করছি। পেছালে কেন? ‘

রিদি লজ্জা পেয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ আমি নার্ভাস।’
‘ কেন?’
‘ দাদী সন্ধ্যায় যা যা বলল?’

দ্বীপের হাসি পেয়ে গেল। সেই কথাগুলো মনে রেখে রিদি এই আচরণ করছে? দ্বীপ আরও কিছুটা আগাল। রিদি ঘেমে গিয়েছে। পেছাতে পেছাতে জানালার সাথে লেগে গেল। দ্বীপ থেমে গিয়ে ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে বলল, ‘ আজ ২০১৯ এর আগস্টের আট তারিখ, আমাদের শুরু হয়েছিল ২০১৫ এর জানুয়ারির বিশ তারিখ। পাঁচ বছর সংগ্রাম করেছি আজকের দিনটার জন্য। এখনও দূরে থাকবে?’

রিদি মাথা নুয়ে রেখেছে। দ্বীপ শান্ত স্বরে বলল, ‘ কিচ্ছু করব না, শুধু একবার তোমাকে জড়িয়ে বুকে চেপে ধরব। বিশ্বাস করতে দাও যে তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছ আমার হয়ে।’

রিদি ভীত চাহনীতে তাকাল। দ্বীপ হেসে বলল, ‘ সত্যি।’

আশ্বস্ত হয়ে রিদি খানিকটা আগাতেই দ্বীপ নিজ থেকে টেনে বুকে নিলো। রিদির কানে স্পষ্ট দ্বীপের হৃদস্পন্দন বাজছে।

দ্বীপ ধীর গলায় বলল, ‘ তোমাকে অঞ্জনা সম্পর্কে সব প্রশ্নের উত্তর কাল দিই? আজ রাতটা পৃথিবীর অন্য কিছু নিয়ে আমি ভাবতে চাই না। ‘

​দ্বীপের বুকের ভেতর কাল বৈশাখী ঝড় উঠেছে, ছটফট করছে রিদির অন্তকলন ও। রিদির কান যখন দ্বীপের হৃদস্পন্দন গুণতে ব্যস্ত, দ্বীপের মাঝে তখন নিজেকে সংযত রাখার লড়াই চলছে। এই প্রথমবার নিজের প্রিয় রমনীকে হালাল উপায়ে আলিঙ্গন করার যে অনুভূতি তা কথায় প্রকাশ করা দুঃসাধ্য। পাঁচ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর লড়াইয়ের পর আজকের এই মুহূর্ত দুজনের জন্য সুখকর প্রাপ্তি। সময়কে কি থামিয়ে দেয়া যায় না? যদি সাধ্য থাকতো তবে সোনার কাঠি , রূপোর কাঠি ছুঁয়ে দ্বীপ সময় থামিয়ে দিত। আটকে রাখত জাদু পিঞ্জরায়।

​দ্বীপ রিদির মাথায় আলতো করে নিজের চিবুক ঠেকাল। রিদির চুল থেকে ভেসে আসা মেয়েলি সুবাসটা ওকে এক লহমায় মাতাল করে দিল। রিদির পিঠে রাখা নিজের হাতটা আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে রিদিকে নিজের সাথে মেশালো, ফিসফিসিয়ে বলল,

​’ কত রাত এই একটা মুহূর্তের কথা ভেবে পার করেছি সেই কথা কি মিসেস দ্বীপ জানে ?’

​রিদি নিঃশব্দ। মাথা আনত। দ্বীপের শার্টের সামনের অংশ নিজের মুঠোয় আরও শক্ত করে চেপে ধরল। ওর নীরবতাই দ্বীপের সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিচ্ছে। মুখ লুকাল দ্বীপের শার্টের দুটো বোতাম খোলা উন্মুক্ত বুকে। ধীরে ধীরে লজ্জার সেই আড়ষ্টতা কেটে গিয়ে এখন দুজনের মাঝে এক অদ্ভুত ভালোলাগা তৈরি হয়েছে ।

​দ্বীপ রিদিকে আলতো করে নিজের বুক থেকে একটু সরিয়ে আনল। জড়িয়ে ধরল রিদির কোমড়। রিদি বাধ্য হয়ে চোখ তুলে তাকাল। দ্বীপের চোখের গভীর, তীব্র চাহনি রিদির ভেতরটা ওলটপালট করে দিচ্ছে।

রিদির লজ্জা, সংকোচ দ্বীপ স্পষ্ট টের পাচ্ছে। ​দ্বীপ নিজের এক হাত বাড়িয়ে রিদির কপালে জমে থাকা ঘাম আলতো করে মুছে দিল। দ্বীপের আঙুলের উষ্ণ ছোঁয়া রিদির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে কাঁপন ধরিয়ে দিল। দ্বীপ হাসল, সেই পরিচিত মনকাড়া হাসি। দ্বীপের তপ্ত নিঃশ্বাস রিদির ঘাড়ে ছুঁয়ে যেতেই রিদি চোখ দুটো বুজে ফেলল। ঠোঁট জোড়া রিদির কানের কাছে নামিয়ে এনে ক্ষীণ স্বরে গভীর অনুরাগে দ্বীপ বলল,

​’আজকের এই রাতটা শুধু আমাদের, রিদি। কোনো অতীত নেই, কোনো প্রশ্ন নেই। শুধু তুমি আর আমি।’

​জানালার বাইরে রাতের আকাশটা তখন হয়তো লজ্জা পেয়ে আরও কিছুটা গাঢ় হয়েছিল রিদির সাথে।

___

ভোরের রোদের তেজ আজ কম। ফযরের নামাজ পড়ে শুয়েছে দুজন। রিদির মাথা দ্বীপের ডান হাতের উপর। বেঘোরে ঘুমাচ্ছে এই মেয়ে। রিদির ঘুম দেখে মনে হচ্ছে কত শত রাত নির্ঘুম ছিল এই মেয়ে! আজ নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। আঙুল দিয়ে কপাল স্পর্শ করল রিদির। যাচাই করে দেখল রিদির চেতনা আছে কিনা? যখন বুঝতে পারল ঘুমাচ্ছে তখনই রিদির ললাটে গুণে গুণে দশবার অধর ছোঁয়াল। জানালা গলিয়ে ভোরের আলোর প্রবেশ ঘটছে। সেই আলোতে রিদির মুখটা স্পষ্ট। ভারী পর্দা সরানো হয় নি এখনো। তাতে কি দ্বীপ বুঝতে পারছে রিদির হাস্যোজ্জ্বল মুখাবয়ব। ঘুমন্ত রিদির অধরে অধর মিলানোর লোভ সামলাতে পারল না। রাতে মেক আপ তুলে মুখটা সুন্দর ভাবে পরিষ্কার করেছে। লিপস্টিক তুলে ঠোঁট লিপ ওয়েল দিয়েছিল। এই পুষ্ট অধর তাকে টানছে। অধর ছোঁয়াবে ঠিক সেই মুহুর্তে রিদি বলে উঠল,

‘ এভাবে ঘুমের মাঝে আদর করলে আদরের মর্ম কি বুঝা যায়?’

দ্বীপ মাথা সরিয়ে লজ্জা পেয়ে হেসে ফেলল। রিদি চোখ খুলে বলল, ‘ ঘুম গাঢ় হলেও আপনার শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ আমি চিনি বাবু মশাই। আপনি আমায় ছুঁবেন আর আমি টের পাব না এ হতেই পারে না।’

দ্বীপ ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল, ‘ সরি। ঘুম আসছিল না। কি করব ভেবে পাচ্ছিলাম না তাই…।’

‘ তাই কী?’

‘ আমলকী টেস্ট করছি।’

‘ আমলকী কী?’

‘ দাদী বলেছে বউ হচ্ছে আমলকী, প্রথমে তিতা পরে মিডা। ‘

রিদি লাজে রাঙা হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ কী করতে চাচ্ছেন আপনি?’

‘ না খেলে বুঝব কি করে, তিতা না মিডা?’

রিদি দ্বীপের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ মনে মনে এই চলে আপনার?’
দ্বীপ হেসে বলল, ‘ কিছুই চলে না। তুমি ঘুমাও তো, আমি তোমাকে দেখি।’

‘ আপনি ঘুমাবেন না?’

‘ ঈদের নামাজ মিস হবে এখন ঘুমালে।’

রিদি চোখ বুজে দ্বীপকে বলল, ‘ এই নিন চোখ বুজলাম, যা করতে চেয়েছিলেন তা করে নিন। আমি কিছুই মনে করব না।’

দ্বীপের কোনো সাড়া না পেয়ে রিদি চোখ মেলে তাকাল। প্রশ্ন করল, ‘ কি হলো?’

দ্বীপ হেসে বলল, ‘ এখন না। এখন দিলে ওটার রেশ কেটে যাবে। এমন সময় কাজটা করতে হবে যার রেশ অনেক দিন থাকে।’

__

ঈদের সালাত পড়ে এসে সবাই গরু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল। রিদির বাবার বাসায় আজ দ্বীপের পরিবারের সবার দাওয়াত। জাবেদ সাহেব এর মনে উচ্ছ্বাস। দুই জামাইকে একসাথে দেখে তার ভালো লাগছে। সমাজে তার সম্মান বেড়েছে। আমিনা বেগমকে পাড়ার সবাই জিজ্ঞেস করে মেয়ের জামাইদের খবর৷
খাওয়ার টেবিলে দুই পরিবার বসেছে। দ্বীপ রিদিকে নিয়ে দুদিন পর ঢাকা ফিরতে চাচ্ছে। জাবেদ সাহেব এর কাছ থেকে অনুমতি চেয়ে বলল,

‘ আংকেল রিদি আপনি অনুমতি দিলে এখন আমার ফ্ল্যাট টাতেই উঠুক। পরে দুজন দেখে একটা বড় বাসা নিব।’

জাবেদ সাহেব হেসে বললেন, ‘ তোমাদের যেভাবে খুশি সংসার সাজাও৷ ভালো থাকো দুজন। এই চাওয়া আমাদের। তবে আমি বেশ অখুশি হলাম তুমি আমাকে আংকেল ডাকাতে। বাবা ডাকবে নতুবা আব্বু। শুনতে ভালো লাগে।’

দ্বীপ লজ্জা পেয়ে মাথা ঝাঁকাল। রাতটা রিদি বাবার বাসায় থাকতে চেয়েছে। দ্বীপ ও আর বারণ করে নি।
যাওয়ার আগে দ্বীপ আর রিদি রুমে কথা বলছিল। রিদির চাচাতো বোন আমের আচার এনে দিল দ্বীপকে। দেখতে বেশ লোভনীয় লাগছিল। দ্বীপ আচার টা মুখে দিয়েই রিদির সাথে কথা বলছিল। কথা বলতে বলতে দ্বীপের চোখ বড় হয়ে গেল। রিদি প্রশ্ন করল,

‘ কি হয়েছে? ‘

মুহূর্তেই দ্বীপের চোখ গুলো লাল লাল হয়ে গিয়েছে। বসা থেকে উঠে টেবিলের উপর থেকে টিস্যু নিয়ে মুখ থেকে আচার বের করে ফেলল। ঠোঁট গোল করে মুখ দিয়ে শ্বাস ছেড়ে রিদিকে প্রশ্ন করল,

‘ তোমাদের বাসায় আচারে কি কাঁচা বম্বে মরিচ দেয়? ‘

রিদি চামচ দিয়ে পিরিচের আচার ঘেটে বুঝতে পারল কাজিনদের কাজ এটা। দ্বীপ এক গ্লাস পানি গিলে বলল,

‘ নতুন বউ রাতে কাছে থাকবে না ভেবে বুক জ্বলছিল দুঃখে। আর এখন মুখ জ্বালিয়ে দিল তোমার বোনেরা। অদ্ভুত কষ্ট। ‘

রিদি ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, ‘ সরি, আমি ওদের দেখে নিব।’

দ্বীপ রুম থেকে বেরিয়ে গেল। কোনো রকম সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। রিদি জানালার দিকে তাকিয়ে দ্বীপের চলে যাওয়া দেখছিল। রাগ হচ্ছে কাজিনদের উপর। এগুলো কোন ধরনের দুষ্টুমি। দ্বীপের গাড়িটা চলে গেল সাঁই সাঁই করে। রিদি রুম থেকে বের হয়ে আচমকা চিৎকার দিয়ে উঠল,

‘ কোন ধরনের অসভ্যতামী এগুলো। তোরা ওর আচারে মরিচ দিয়েছিস কেন? রাগ করে কথা শেষ না হতেই চলে গেল।’

বড়রা রেগে গেল মেয়েগুলোর উপর। রিদি রুমের দরজা খুব জোরে লাগিয়ে গাল ফুলিয়ে বসে আছে। বাইরে থেকে রায়হান দরজা ধাক্কা দিয়ে ডাকছে। দরজা খোলার নাম ই নেই। বেশ কিছুক্ষন পর পুনরায় ধাক্কা দিলে রিদি শরীর ঝেড়ে শোয়া থেকে উঠে দরজা খুলে চিৎকার দিয়ে বলল,

‘ কি সমস্যা তোমাদের…?’

দ্বীপ দু কানে আঙুল দিয়ে চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে আছে রিদির দিকে। রিদি গলে শান্ত হয়ে গেল।

রায়হান হেসে বলে, ‘ আরো জোরে চিল্লা। তোর বরের কান ফাটিয়ে দে।’

দ্বীপ প্রশ্ন করল, ‘ তুমি বাসায় এভাবে চিৎকার দাও?’

রিদি আমতা আমতা করে বলল, ‘ না মানে দি না তো, আজই দিলাম।’

দ্বীপ গম্ভীর স্বরে বলল, ‘ কথা আছে তোমার সাথে আমার। ভেতরে আসো।’

রিদি দ্বীপকে নিয়ে রুমে ঢুকতেই দ্বীপ ঝাপটে ধরে অধরে আক্রমন করল। আচমকা এমন একটা ঝড়ের মতো মুহূর্ত আসবে, রিদি তা ভাবতেই পারেনি। ওর পুরো শরীর কেঁপে উঠল, চোখের পাতা বুজে এলো।
​ঠিক কয়েক সেকেন্ড পরেই দ্বীপ আলতো করে ওকে ছেড়ে দিল। রিদির ঠোঁটে তখনো সেই উষ্ণতার ছোঁয়া লেগে আছে, বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। দ্বীপ ওর খুব কাছে ঝুঁকে, চোখে চোখ রেখে ফিসফিসিয়ে বলল,

‘ একদম অভদ্রের মতো চিৎকার দিবে না, দ্বীপকে কাছে ডেকে ভালবেসে বলবে ইউ নিড এফেকশন। ‘

দ্বীপ চলে গেল রিদিকে হতভম্ব অবস্থায় রেখে। ফোনে মেসেজ আসল রিদির,

‘ বলেছিলাম না এমন সময় চমকে দেব যাতে রেশ না কাটে।’

চলবে…

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ