#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
১০.
( কপি করা নিষেধ)
খেলায় গো হারা হেরেছে আজ। হেরেও খারাপ লাগছে না যতটা খারাপ লাগছে দুপুরের কথা ভেবে। রিদির বাবা সেদিনের ভদ্রলোক, ব্যাপার টা মেনে নিতে পারছে না। দ্বীপকে দেখা মাত্রই উনি না করে দিবেন। আবার মনে হল, হয়ত উনি ভুলে গেছেন পুরোনো কথা। কোন তিন/চার মাস আগের কথা। মনে থাকে নাকি? তবে রিদিকে এই কথা জানাতে চায় না, এতে ওর মনের উপর চাপ পড়বে, পরীক্ষা খারাপ দিবে।
কিছুক্ষণ আগে ঠান্ডা মাথার মিজান সাহেব ছেলেকে কামরায় ডাকলেন। ভবিষ্যত পরিকল্পনা জানতে চেয়ে বললেন, ‘ চাকরি টা যেন কন্টিনিউ করে, ফুটবলে ক্যারিয়ার নেই। তফুরা খুব দ্রুত বিয়ের জন্য তাড়া দিচ্ছে। ‘
দ্বীপ কিছু বলার আগেই রাহেলা বললেন,’ আমি তাহলে আজকে থেকে কিছু আয়া আর খানসামা নিয়োগ দিই? বেতন কত দিবা জিহানের বাবা?’
বাবা এবং ছেলে রাহেলার দিকে চেয়ে রইল বিস্ময় নিয়ে। রাহেলা পুনরায় বলল, ‘ না মানে আমার তো ইদানীং কোমড়ের ব্যাথাটা বেড়েছে, ফযরের সময় শুইলে আর উঠতে পারিনা। অঞ্জু নাকি কঠিন ফুড চার্ট মেইনটেইন করে। সব সেদ্ধ খায়। ওর যত্ন করতে না পারলে তো ওর মা আমাকে উড়ানোর জন্য কামান বসাবে। ‘
দ্বীপের মেজাজ চটে গেল। মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ আম্মু আপনি কি অঞ্জুর কাজের লোক?’
রাহেলা হেসে বললেন,’ অঞ্জুর মায়ের তো ছিলাম। এছাড়া আমি ধরেই নিয়েছি অঞ্জু বউ হলে আমি ওকে আমার যত্ন,আদর টুকু দিতে পারব না ওর মায়ের জন্য। ‘
দ্বীপ উঠে গেল বসা থেকে। বলল, ‘আমি অঞ্জুকে বিয়ে করছি না। আপনার নতুন কাজের লোক রাখার প্রয়োজন হলে নিজের জন্য রাখুন, অঞ্জুর জন্য না । ‘
মিজান সাহেব দ্বীপের দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে বললেন, ‘ তোমার মা কি ছোট জিহান? কি সব অবান্তর কথা বলে?’
রাহেলা ঠোঁটে মোচড় দিয়ে বললেন,’ ছোট বলেই তো ভুলবাল বুঝিয়ে আমার বাপের কাছ থেকে আমাকে তুলে নিয়ে আসছ। তোমাকে এই অপরাধের দায়ে জেলে দেয়া উচিত। কালকে লিমার মা বলেছিল, সামনের মাসে লিমার বিয়ে। ওর হবু শ্বশুর দেখতে নাকি তোমার মত। মনে হয় যেন জমজ ভাই তোমরা দুজন। কিন্তু ওই লোকের কয়েক ডজন বউ আছে, আর গাঞ্জার ব্যবসা করে। তাকে পুলিশ খুঁজে বেড়াচ্ছে ধরার জন্য। সে পালিয়ে আছে এখন। জিহান, আমি ভাবছি ওই লোকের পরিবর্তে তোমার বাবাকে ঢুকিয়ে দিব।’
মিজান সাহেব চোখ রাঙিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকালেন। দ্বীপ মুখ টিপে মাথা নত করে হাসছে। গজ গজ করতে করতে মিজান সাহেব বললেন, ‘ ওই লোকের তো কয়েক ডজন বউ আছে, আমিও আগে কয়েক ডজন বানাই, এরপর জেলে দাও ।’
রাহেলা ভ্রু কুচকে বললেন, ‘ আনতে পারেন, এতে আপনাকে জেলে ঢুকাতে আমার সুবিধা হবে। সরাসরি নারী নির্যাতন মামলায় ঢুকিয়ে দিব। প্রথম বউয়ের হক আদায় না করে বহু বিবাহের অপরাধে।’
‘ কী হক আদায় করা বাকি রেখেছি তোমার?’
‘ মনে মনে বহু বিবাহের কথা ভেবেছ এতেই আমার হক নষ্ট হয়েছে।’
মিজান সাহেব রাগে কাঁপছে। দ্বীপ হাসতে হাসতে বাবার রুম থেকে বের হয়েছে। এই টুনাটুনির খুনসুটি লেগেই থাকবে। ড্রইং রুমে আসতেই মেজাজ বিগড়ে গেল। ফুফু তফুরা আগের কেচ্ছা শুরু করেছে। সরাসরি নিজের রুমে এসে দরজা আটকে দিল। ভাই বোন দরজা ধাক্কানোর সত্ত্বেও দরজা খোলেনি। ব্যাগ থেকে ওয়াটার পট বের করে পানি খেতেই মন ভালো হয়ে গেল। এই ওয়াটার পট টা রিদির কাছ থেকে সেবার ছিনতাই করে এনেছিল। সবসময় সাথে থাকে। মেয়েটা ভীষন অদ্ভুত। এই আদুরে বাহানা ধরে তো কিছুক্ষণের মাঝে নিজের মন মত সব না হলেই গাল ফুলিয়ে ফেলে। এইতো শেষ বার যখন দুজনের মাঝে সুন্দর আলাপ হল সেই সময় মেয়েটা প্রশ্ন করল,
‘ আচ্ছা দ্বীপ আমি যদি মরে যাই তুমি কী করবে?’
দ্বীপ ভীষণ বিরক্ত হয় এসব কথা শুনলে । মুখ কালো করে বলল, ‘ আজেবাজে কথা আমার পছন্দ না। মরবে কেন?’
‘ মানুষ মরণশীল। মরা তো স্বাভাবিক। ‘
‘ তাই বলে সারাক্ষণ মরব মরব করতে হবে নাকি?’
‘ তোমাকে যা প্রশ্ন করেছি তার উত্তর দাও।’
‘ উফ! বন্ধুদের কাছে শুনেছিলাম প্রেমিকারা এসব বোকা বোকা আজব প্রশ্ন করে, আজ দেখছি আমার ক্ষেত্রেও সেই রকম হল। এই প্রশ্নের কি কোনো উত্তর আছে?’
রিদি গাল ফুলিয়ে ফেলল। দ্বীপ কপাল চাপড়ে বলল,
‘ আচ্ছা ঠিক আছে উত্তর দিচ্ছি। জানিনা ওই মুহুর্তে কেমন অনুভূতি হবে তবে তোমাকে ভীষন মিস করব।’
রিদি অগ্নিমূর্তির মত রূপ ধারণ করে বলল, ‘ এ আমি কাকে ভালোবাসলাম হে আল্লাহ! শুধু মিস করবে! এদিকে বিভূতিভূষণ বউ মরে যাওয়ার পর ডিপ্রেশনে পড়ে প্ল্যানচেট করে বউয়ের সাথে কথা বলতে চেয়েছে। আর আমার প্রেমিক নাকি মিস করবে শুধু।’
দ্বীপ তব্ধা খেয়ে বলল, ‘ তুমি তো আমার বউ এখনো হও নি। আর এখানে বিভূতিভূষণ আসলো কোথা থেকে?’
রিদি গর্জে উঠে উত্তর দিল, ‘ মানলাম বউ হই নি তাই বলে এভাবে বলবে? আর বিভূতিভূষণ এর কথা আসবে না কেন? উনি কত জ্ঞানীগুণী মানুষ ছিলেন। তার প্রেম তো দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সে যদি বউকে এত ভালোবাসতে পারে তুমি কি করছো? ‘
দ্বীপ বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছে। কি বলবে বুঝতে পারছেনা। শান্তস্বরে বলল, ‘ আমি তো প্ল্যানচেট করতে পারিনা তুমি শিখিয়ে দিও।’
রিদি চোখ বড় করে বলল, ‘ তার মানে তুমি চাও আমি মরে যাই যাতে করে আরেকজনকে বিয়ে করতে পারো।’
দ্বীপের চিৎকার দিয়ে কাঁদতে মন চাইল। সে ডানে গেলেও দোষ, বামে গেলেও দোষ। মেয়ে মানুষের মন বুঝার চেয়ে ঠান্ডা পানিতে গোসল করাও শ্রেয়। এতে শরীরের কাঁপুনি ছুটলেও সমস্যা নেই, সমাধান আছে। কাঁথা, কম্বল গায়ে দেয়া যায়। অসুখ হলেও সমাধান আছে। ঔষধ সেবন করা যায়। কিন্তু মেয়ে মানুষের রাগের কোনো সমাধান নেই। হাত জোড় করে মাফ চাইলেও এরা গলে না। লোহাও গলে যায় কিন্তু এরা গলে না। দ্বীপের অকস্মাৎ শান্ত হয়ে যাওয়াতে রিদি হেসে ফেলল। বলল, ‘ মজা করেছি রাগ করো না। তোমার মাঝে সাহিত্য রস নেই বললেই চলে। টেস্ট করলাম তোমাকে। আসলে তুমি একটু বলদ গোছের আছ। তোমার জায়গায় অন্য কেউ হলে কতগুলো বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করত। এনিওয়ে একটু তো গল্প উপন্যাস পড়তে পারো।’
দ্বীপ বুকে হাত দিয়ে বলল, ‘ আরেকটু হলে দম আটকে যেত। যা শুরু করেছিলে। আমি এসব গল্প উপন্যাস বেশিক্ষন পড়তে পারিনা। মাথা গরম হয়ে যায়। জীবনে পড়েছিই তিনটা বই। তাও আবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে। অনেক কষ্টে, সময় কাটছিল না বলে। ‘
‘ কী কী?’
‘ দাঁড়াও মনে করি…হুমায়ুন আহমেদ এর দুইটা। মীরার গ্রামের বাড়ি আর সমুদ্র বিলাস না বৃষ্টি বিলাস কি যেন একটা। আর হলো, ইমদাদুল হক মিলনের মন।’
‘ মন পড়ে কী লাভ হল, আমার মন তো পড়তে পারো না।’
‘ কারো মনের কাহিনি এত সহজে বুঝা যায় না। অনেক বছর ঘর করলে পাশাপাশি হাত ধরে হাঁটলে বুঝা যায়।’
‘ বাদ দাও। ‘মন’ উপন্যাসের কাহিনি কি?’
‘ মনে নেই। ভুলে গিয়েছি। আমাকে দিয়ে এসব হবে না। মনে থাকলে তো তোমাকে প্রতিদিন মজার মজার কথা বলে হাসাতাম। কথা খুঁজে পাই না বলেই তো শুধু বলি মন দিয়ে পড়, ভালো রেজাল্ট করো যাতে তোমার বাবা আমার কাছে বিয়ে দেয়। বিয়ের পর কাছাকাছি থাকব। তখন কথা শিখিয়ে দিও।’
ধুমধাম দরজা ধাক্কানোর শব্দে ধ্যান ভাঙলো দ্বীপের। সখিনা বানু লাঠি দিয়ে দ্বীপের দরজা ভেঙে ফেলার উপক্রম। দ্বীপ দরজা খুলে দেখে দাদী আর ফুফু দাঁড়িয়ে আছে। আগেই বলেছিলাম সখিনা বানুর একমাত্র কাজ দ্বীপের দরজা ভাঙা।
__
রিদির এই নিয়ে কয়েকশো বার চুমু দেয়া শেষ কলমটা কে। দ্বীপের কাছ থেকে উপহার পাওয়া কলম দিয়ে আজ পরীক্ষা দিয়ে। পরীক্ষা আলহামদুলিল্লাহ ভালো হয়েছে। মানুষ কত কি উপহার দেয় সঙ্গীকে। আর দ্বীপ দেখা হলেই উপহার দেয় ঘড়ি, কলম, সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর, জ্যামিতি বক্স। রিদি অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, ‘ একটু শাড়ি, চূড়িও তো দিতে পারো।’
দ্বীপ হেসে বলে, ‘ পারি তো, কিন্তু তোমার এখন এসব উপহার নেয়ার সময় নয়। ইউনিভার্সিটিতে উঠলে যখন বড় হবে তখন দিব। এছাড়া আমি শাড়ি দিলে ওটা মিরা বা প্রমার বাসায় রাখবে। তো দিয়ে লাভ কি? এরচেয়ে উপকারী জিনিস নাও। পরীক্ষার হলে এগুলো ব্যবহার করলে আমার ভাল লাগবে।’
এখন মনে হচ্ছে দ্বীপই ঠিক। আজকে পরীক্ষাটা খুব ভাল হল। মায়ের হাতের বিফ ভুনা খিচুড়ি ভালবাসে রিদি। মেয়ের পরীক্ষা তাই ভাল খাওয়াতে চাইলেন আমিনা। রাতে খিচুড়ি করলেন। মেয়েকে খাওয়ার টেবিলে ডাকছেন। রিদি বাবা আর মায়ের সাথে খেতে বসেছে। আজ হঠাৎ মা খাইয়ে দিতে চাইলে রিদি অবাক হল। জাবেদ সাহেব মেয়েকে বললেন পরীক্ষার সময় বেশি দুশ্চিন্তা না করতে, নতুন করে পড়ার কোনো দরকার নেই। খাবারের মাঝখানে জাবেদ সাহেব বললেন,
‘ রায়হান এত দিন যে পাত্রের কথা বলল সেটা নাকি গতকাল নিষেধ করে দিয়েছে। পাত্র এখনি বিয়ে করতে চাইছে। আমি রাজি হইনি। এখন মেয়ের পরীক্ষা, এখন কিসের বিয়ে? আমাদের তো এত তাড়া নেই।’
আমিনা মেয়েকে খাওয়াতে খাওয়াতে স্বামীকে বললেন, ‘ ভাল করেছ। তাড়াতাড়ির কাজ ভাল না। আস্তে-ধীরে নামতে হয় শুভ কাজে। এছাড়া মেয়ে মেডিকেল কলেজে উঠলে ভাল পাত্রের অভাব হবে না।’
জাবেদ সাহেব মাথা নাড়লেন। হঠাৎ রিদি বলল, ‘ আব্বু আমি যদি মেডিকেল না টিকি?’
আমিনা চোখ রাঙালেন। রিদি ভয় পেয়ে ঢোক গিলল। জাবেদ সাহেব বললেন, ‘ এইচএসসি টা দাও। রেজাল্ট কেমন হয় দেখো। তুমি তোমার সর্বোচ্চ দাও। আল্লাহ যদি রিজিকে না রাখে আমি, তোমার আম্মু আর তুমি জান দিলেও টিকবে না। কিন্তু তাই বলে হাল ছাড়বে না কেমন মা?’
রিদি বাবার কথা শুনে হাসি দিল। জাবেদ সাহেব মেয়ের চোখে মুখে আতঙ্ক দেখতে পেলেন যা উনার পছন্দ হয় নি। খেতে খেতে পুনরায় বললেন, ‘ তুমি যদি মেডিকেলে না ভর্তি হতে পারো কোনো অসুবিধা নেই। ভার্সিটিতে পড়বে। বাবার দিক থেকে কোনো সমস্যা নেই। তুমি খুশি মনে পরীক্ষা দাও।’
রিদি খেয়ে পড়ার জন্য রুমে চলে আসল। রাহার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলল মায়ের ফোন থেকে। রিদির এন্ড্রয়েড ফোনটার গ্লাস তো ফেটেই গিয়েছে। সেটার খোঁজ অবশ্য রিদি জানে না। ঘুমানোর সময় আমিনা আসলেন রিদির ঘরে। প্রশ্ন করলেন , ‘ ছেলেটার নাম কি?’
রিদি প্রথমে ভাবল মা কোন ছেলের কথা বলছে? মনে পড়ার পর বলল, ‘ পুরো নাম শাহদ্বীপ জিহান। বাসায় জিহান ডাকে। আমি দ্বীপ ডাকি।’
‘ কিসে পড়ে? ‘
‘ পড়াশোনা শেষ। জব করে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে।’
‘ স্বভাব চরিত্র কেমন?’
‘ ভদ্র’
‘ ওকে ফোন দিয়ে বলো সরকারি চাকরির জন্য চেষ্টা করতে। তোমার পরীক্ষা শেষে আমি ওর সাথে দেখা করব। তবুও আল্লাহর ওয়াস্তে পরীক্ষায় একটু ভালো ফলাফলের চেষ্টা করো। তোমার বাবা তোমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখে। ‘
রিদি চোখে মুখে বিস্ময়। দুই অধর আলগা হয়ে গেল। আমিনা ফোন খাটে রেখে চলে গেলেন। রিদি কাঁপা হাতে ফোনটা হাতে নিল। এত গুলা মাস পর বিনা আতঙ্কে, বিনা সংকোচে দ্বীপের সাথে কথা বলবে সে!
__
এখন তফুরা শান্ত। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছে সবার সাথে। কিছুক্ষণ আগে অঞ্জনা এসেছে। এসেই নিজের হাতে কেক বানিয়েছে। সেই কেক খাওয়ানোর জন্য সখিনা বানু নাতীর দরজা ভাঙছিল। সবার সাথে ডাইনিং এ এসে বসল দ্বীপ। অঞ্জনা এক পিস কেক পিরিচে তুলে দ্বীপকে দিল। খেতে ভালোই হয়েছে। এমন সময় রিদন বাইরে থেকে আসল। দরজা দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে অঞ্জনাকে দেখে বলল, ‘ কিরে ঢংগী কবে আসলি?’
অঞ্জনা মুখ ভেঙচি দিয়ে বলল, ‘ আসছি একটু আগে, কেক খাবি?’
অঞ্জনা আজ শাড়ি পরে এসেছে। দেখতে ভাল লাগলেও চেহারার কূটনামি ফুটে উঠেছে। রিদন হেসে বলল, ‘ ঢংগী ঢং করে, কুত্তার লগে প্রেম করে।’ সাজিনা কেক খেয়ে পানি খাচ্ছিল। ভাইয়ের মুখে এই কথা শুনে ভুশ করে পানি ছেড়ে দিল মুখ দিয়ে। রিদন নিজের পিস টা খেতে খেতে বলল,
‘ বাহ বাসার দ্বিতীয় কাজের বুয়া পাইছি। অঞ্জু তুই আমার বউরে মজার মজার রান্না করে খাওয়াবি, এরপর হাত পা টিপে দিবি। কি যেন মেনি কিউট, পেডি কিউট বলে না ওগুলা করে দিবি।’
সাজিনা হেসে ফেলল। বলল, ‘ ওটা ম্যানিকিউর, পেডিকিউর হবে।’
‘ ওই একই কথা, হাত ঠ্যাং কিউট হইলে মেনি কিউট, পেডি কিউট হবে। কিন্তু মেনি তো বিলাই রে কয়। অবশ্য মেয়ে মানুষ বিলাইয়ের মত কিউট। মানে ব্যতিক্রম ও আছে ডাইনির মত।’
এই কথাটা তফুরার দিকে তাকিয়ে বলল। পুনরায় চোখ ঘুরিয়ে অঞ্জনাকে বলল, ‘তাহলে অঞ্জু সেই কথাই রইল আমার বিলাইয়ের মত বউকে কিউট করে পেডিকিউট, মেনি কিউট করে দিবি।’
তফুরা গলার স্বরে ক্রোধ এনে বলল, ‘ তোর বউরে অঞ্জু কেন রান্না করে খাওয়াবে, ও কেন তোর বউয়ের হাত পা ডলবে?’
রিদন জবাবে বলল, ‘ ওম্মা তোমরাই তো কইলা অঞ্জুরে এই বাড়িতে বউ বানাইয়া আনবা। বউ মানেই তো কামের বুয়া যেমন টা তুমি আম্মুরে ভাবতা। ‘
‘ তোর বউ ও তো কামের বুয়া তাইলে।’
‘ আমি কোনো ফইন্নির মাইয়া বিয়া করমু না। ‘
‘ তুই কি আমারে ফইন্নি কইলি? তাইলে তো তোর আম্মাও ফইন্নি। ‘
রিদন হি হি করে হেসে বলে, ‘ যার মনে যা, ফাল দি উডে তা। তোমার নাম লইছি আমি? আম্মুরে তো তোমরা ফইন্নির মাইয়াই কইতা। আমার নানার অত টাকা পয়সা ছিল না। কিন্তু আত্মসম্মান ছিল। আসল ফইন্নি তো তোমরা। এখন যে সোফায় বইসা আছ এটাও আমার নানা দিছে। খাইছ ও তো আজীবন আমার নানার দেয়া প্লেটে। অথচ ঠিকই অত্যাচার করছ আম্মুরে। শুনো অঞ্জুরে বউ বানাইয়া পাঠাইলে অবশ্যই ফার্নিচার পাডাইবা। তোমার কাছ থেকে যৌতুক নেয়া ফরজ। সাথে আমারে একটা আর ওয়ান ফাইভ বাইক দিবা। ভাইরে মার্সিডিস। মাথায় থাকে যেন। নাহলে অঞ্জুরে প্রতিদিন চ্যালা কাঠ দিয়ে বাইরামু। ‘
তফুরা চেতে বলল, ‘ থাপড়ায় দিব বেয়াদব। অঞ্জুরে মারলে আমি চুপ করে থাকব তো?’
‘ আমি মারলে তো তোমার ইগো তে লাগব, তাই তোমার মায়েরে এক খিলি মহেশখালীর পান খাওয়ামু আর কমু তফুরারে বাইরান। তোমার মায় নাচতে নাচতে তোমারে বাইরাইয়া হাত ঠ্যাং ভাইঙ্গা ঝুলায় দেবে নে।’
দ্বীপ খুব জোরে ধমক দিল, ‘ রিদন, একদম চুপ। আমার চড় খেতে না চাইলে সামনে থেকে যা। আর ফুফু তুমি প্লিজ চুপ কর। সন্তানের বয়সী বাচ্চার সাথে ঝগড়া করে কী মজা পাও?’
‘ সব তোর মায়ের শিক্ষা…।’
ঘটনা খারাপের দিকে যাচ্ছে। অঞ্জনার পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। দ্বীপের জন্য সেজে এসেছে অথচ দুটো মিনিট দ্বীপের সাথে কথা বলতে পারছেনা মায়ের ঝগড়ার জন্য। মাকে ধমকে উঠল, ‘ আম্মু আর একটা কথাও না।’
তফুরা আর রিদন দুজনই চুপ হয়ে গেল। টেবিলের উপর কিছু কদম ফুল এবং কচুরিপানা ছিল। দেখে সুন্দর লাগছে। দ্বীপ প্রশ্ন করল, ‘ এগুলো কে এনেছে?’
অঞ্জনা হেসে বলল, ‘ আমি সুন্দর না?’
দ্বীপ মাথা নেড়ে বলল, ‘ সুন্দর।’
রিদন সাথে সাথে প্রতিবাদ করল, ‘ ইছ কিয়ের সুন্দর, যত্ত সব গু মুতের ফুল।’
সাজিনা চিৎকার দিয়ে বলল, ‘ কি বলিস এসব?’
রিদন বলল, ‘ ভুল কি বললাম, কচুরি পানা ডোবায় হয়। ওখানে সব মানুষের ইয়ে ফালায়। ইয়াক। আর কদম ফুল এগুলা শুকায় গেলে মুতের গন্ধ বের হবে। যে যেমন আনছেও তেমন ফুল। বাজারে এত ফুল থাকতে আনছে নিজের মস্তিষ্কের মত ফুল। খবিশ ছেমরি।’
দ্বীপ হাসি চাপিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। স্পষ্ট বুঝতে পারছে রিদন অঞ্জুকে অপমান করতে এসব বলছে। এদের ঝগড়া সামলাতে গেলে নিজের মুড নষ্ট হবে। ফোনে একটা কল আসল। বাঁচাল তাকে কলটা। রিসিভ করতেই ও পাশ থেকে প্রিয় নারীর সালাম শুনতে পেল। চমকে উঠল। সকলকে উপেক্ষা করে উঠে চলে আসল নিজের কামরায়। দরজা দিয়েই প্রশ্ন করল, ‘ রিদিইই, কিভাবে ফোন দিয়েছ? তোমার আম্মু দেখলে…’
রিদি ফোনের ও পাশ থেকে খিলখিল করে হেসে বলল, ‘ প্রিয়তম, আমাকে আম্মু ফোন দিয়ে বলল আপনার সাথে কথা বলতে।’
‘ মজা করছ?’
‘ একদম না সত্যি,সত্যি,তিন সত্যি। তার বিনিময়ে অবশ্য পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো করতে হবে। আমিও কথা দিয়েছি ইনশাআল্লাহ ভালো করব।’
দ্বীপ খুশিতে প্রশ্ন করল, ‘ তার মানে আজ রাতে আমরা অনেক কথা বলতে পারব?’
‘ অবশ্যই।’
দ্বীপ চোখ বুজল। মনে হল স্বপ্ন দেখছে। বুক ধুকপুক করছে। রিদিকে বলল, ‘ এই মুহুর্তে আমার মন চাচ্ছে খুশিতে চিৎকার দিয়ে নিজের আনন্দ প্রকাশ করি। ‘
‘ আম্মু শর্ত দিয়েছে সরকারি চাকরি করতে হবে তোমাকে।’
চুপসে গেল দ্বীপের মুখ টা। তাই তো ভাবছে এত সহজে হবু শাশুড়ি ভালো হল কি করে? এখন সুনামি তার উপর দিয়ে বয়ে যাবে। দ্বীপের নিরবতা দেখে রিদি প্রশ্ন করল, ‘ কি হল? চেষ্টা করবে না?’
দ্বীপ কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘ জানো আমি মাস্টার্স পাস কেনো করেছি?’
‘ কেনো?’
‘ আমাদের বংশের সবাই শিক্ষিত, মাস্টার্স করেছে। মানে আব্বু,চাচ্চু,কাজিনরা। আমি যদি না করি আব্বুর মান সম্মান শেষ হয়ে যাবে তাই। পড়াশোনার প্রতি আমার কোনো আগ্রহই নেই। আর সেখানে আমাকে যদি কেউ বলে সরকারি চাকরির জন্য পড়তে ব্যাপার টা আমার কাছে আগুনের কুয়োয় ঝাপ দেয়ার মত হবে।’
রিদি বিস্মিত। তব্ধা খেয়ে মাথায় হাত দিয়েছে। খানিকবাদে দ্বীপ বলল, ‘ আচ্ছা দেখি, আমার এক বন্ধু সরকারি চাকরি করে তার কাছ থেকে হেল্প নিতে হবে। কিভাবে কি পড়তে হয়। কিন্তু আমি এই ব্যাপারে গ্যারান্টি দিতে পারছিনা। ‘
রিদি উত্তরে বলল, ‘ আমার জন্য তোমাকে নিজের শখ ছাড়তে হচ্ছে তাই না?’
দ্বীপ হেসে ফেলল। বলল, ‘ তোমার জন্য না, সুখের জন্য ।’
আচমকা রিদি বলল, ‘ একটা কথা বলি?’
‘ বল’
‘ জব তো করছোই। সরকারি চাকরি করতে হবে না।পাশাপাশি ফুটবল টা কন্টিনিউ করো। বাসা আমি ম্যানেজ করব।’
‘ আমি কোনো রিস্ক নিতে রাজি না। শেষ চেষ্টা করব। তোমার বাবা সম্পর্কে যা শুনেছি উনি নিজের সিদ্ধান্ত থেকে এক চুল ও নড়েন না।’
বেশ কিছুক্ষন কথা বলল দুজন। সেদিন রাতটা বেশ সুন্দর কেটেছিল দুজনের।
পরদিন তফুরা অঞ্জনাকে নিয়ে চলে গেল মনে ক্ষোভ নিয়ে। দ্বীপ দুদিন বাড়ি থেকে কর্মক্ষেত্রে ফিরে গেল। রিদির পরীক্ষা গুলো খুব ভালো হচ্ছিল। পরীক্ষার শেষ দিন বাসায় একা যাবে রিদি। আজ জাবেদ সাহেব এর ব্যবসায়ীক মিটিং আছে। বাসা থেকে পরীক্ষা কেন্দ্র কাছে হওয়াতে রিদি চলে যেতে পারবে জানাল বাবাকে। পরীক্ষার কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার সময় লক্ষ্য করল রানা বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রিদি শুকনো ঢোক গিলল। মিরা আজ ওর স্বামীর সাথে যাবে বলেছিল। নিশ্চয়ই চলেও গিয়েছে।
দ্রুত রিকশায় উঠে গেল। বার বার লক্ষ্য করল রিকশাওয়ালা পেছনে তাকাচ্ছে। বুঝতে পারছে রানা হয়ত ফলো করছে। তবুও রিকশাওয়ালাকে রিদি প্রশ্ন করল, ‘ চাচা কোনো সমস্যা?’
রিকশাওয়ালা বলল, ‘ মা পিছনে একটা মটর সাইকেল আমাগো রিকশা রে ফলো করতাছে? এক্কেরে শুরু থেইকা।’
রিদির বুকের ভেতরটা ধ্বক করে উঠল। কলেজ প্রাঙনে রানা বাড়াবাড়ি করে না। কিন্তু বাইরে যদি কিছু করে? পেছন থেকে কেউ একজন রিকশাওয়ালাকে ধমক দিল, ‘ এ্যই চাচা জোরে চালান, এমনে কেউ রিকশা চালায়? ‘
রিদি রিকশার পর্দা তুলল দেখার জন্য কে ধমক দিয়েছে? ধমক দেয়া মানুষটাকে দেখে চোখের মধ্যে বাল্ব জ্বলে উঠল। বিস্মিত হয়ে মুখে হাত দিল। রিদির রিকশা আগে চলে গেল। দ্বীপের রিকশা মাঝে। রানার বাইক পেছনে। রানা সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছে দ্বীপের রিকশাওয়ালার সাথে। ততক্ষনে রিদির রিকশা পাড়ার গলিতে চলে এসেছে। রানার বাইক ও চলে গেল।
রিদি বাসায় ঢুকেই হাপাচ্ছে। আমিনা ব্যতিব্যস্ত হয়ে গেল মেয়েকে এমন দেখে। শরবত খেতে দিল। রিদি রানার কাহিনি বলতেই আমিনা চমকে গিয়ে বলল, ‘ ছেলেটা এত বেয়াদপ হয়েছে?’
‘ আম্মু, রানা প্রায় এমন কাজ করত, আমি আমলে নি নাই। প্রতিদিন হেলমেট থাকে। আজ ছিল না বলে চিনতে পেরেছি।’
দ্বীপের আসার ব্যাপার টা রিদি লুকিয়েছে। নতুবা মা ভাববে হয়ত রিদির পরিকল্পনা ছিল দ্বীপের সাথে দেখা করার। আমিনা চিন্তায় পড়ে গেলেন। শুরু থেকেই তিনি রানার ব্যাপারটা তে দ্বিমত প্রকাশ করছেন। রাতে আসলে কথাটা জাবেদ সাহেবের কানে উঠাতে হবে।
__
দ্বীপ দোকানের সামনে থেকে বাসার জন্য কিছু ঔষধ কিনছিল। প্রায় এক মাস পর এসেছে বাড়ি। পেছন থেকে একটা মেয়ে সালাম দিয়ে বলল, ‘ আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া। ভাল আছেন?’
চমকে উঠল। সালামের উত্তর নিয়ে মাথা নাড়ল। মেয়েটার কাঁধে স্কুল ব্যাগ ঝুলছে। দ্বীপকে বলল, ‘ আপনাকে দেখে ছুটে এসেছি। এই মাত্র আমার স্কুল ছুটি হয়েছে। ‘
দ্বীপের বিস্ময় কমছে না। সে কি এই মেয়েকে চেনে? মেয়েটা নিজ থেকে বলল, ‘ ভাইয়া আমি প্রমি। রিদনের বন্ধু?’
দ্বীপ বিস্মিত হলেও সামলে নিল নিজেকে। মাথা নেড়ে ভাবল এ কেমন বন্ধু রিদনের যে স্কুলে পড়ে। পরক্ষনে মনে হল হয়ত রিদির মত। দ্বীপ ঔষধের টাকা টা মিটিয়ে দিতেও প্রমি বলল, ‘ ভাইয়া আমি একটা চকলেট নিব।’
দ্বীপ মুচকি হাসল। দোকানদারকে বলল একটা চকলেট দিতে। প্রমি চকলেট টা দ্বীপেত সামনে খুলেই খাওয়া শুরু করল। দুজন একসাথে দোকান থেকে বের হল। প্রমি নিজ থেকে বলছে, ‘ আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। গার্লস স্কুলে। আপনি তো অনেক হ্যান্ডসাম। রিদন ঠিক বলে।’
দ্বীপ শুধু মাথা নাড়ছে। প্রমি চকলেট খেতে খেতে বলল, ‘ রিদনকে ফোন দিলে ও ফোন ধরে না কেন ভাইয়া? আমাকে বলেছে আপনি বিয়ে না করলে ওর বিয়ে হবে না। আপনি বিয়ে করছেন না কেন?’
দ্বীপ হতবিহ্বল হয়ে গেল। হাঁটা থামিয়ে বলল, ‘ তোমার বয়স কত?’
প্রমি হাতে গুনল কি যেন। এরপর দ্বীপকে বলল, ‘আমি রিদি ভাবী থেকে তিন বছরের ছোট।’
দ্বীপ বিস্ময় কাটিয়ে উঠতে পারছে না। মৃদু ধমকে বলল, ‘ বাসায় যাও। স্কুলের পর এতক্ষন বাইরে কি করো। তোমার বাবা মা দুশ্চিন্তা করে না? ‘
প্রমি ভয় পেয়ে গেল। ঢোক গিলে সরি বলে দিল দৌঁড়। এদিকে দ্বীপের মাথায় হাত। রিদির কথা তো মা ছাড়া বাসায় কেউ জানে না। মায়ের পেট থেকে কথাও বের হয় না। তবে কি রিদন তার পেছনে গোয়েন্দাগিরি করছে? আশ্চর্য!
চলবে…
