#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
প্রচ্ছদ ক্রেডিট : Toukey Tahmida Khan Showmik
৯.
( কপি করা নিষেধ)
ফখরুল এখন আর রিদিকে পড়াতে আসে না। নতুন শিক্ষক রাখা হয়েছে। ফখরুলকে এই বাসা থেকে নিষেধ করা হয় নি, নিজ থেকেই বলল পড়াবে না। তবে যাওয়ার আগের দিন আমিনা এবং জাবেদ সাহেবের সামনেই রিদিকে ফাঁসিয়ে দেয়ার পরিকল্পনায় প্রশ্ন করেছিল, ‘ জিহান ভাই কে চেনো?’
রিদি প্রথমে বুঝে নি, পরে বুঝেও না বুঝার ভান করে বলল, ‘ চিনি না কে উনি?’
‘ তোমাকে পছন্দ করে, এসব ছেলে থেকে দূরে থাকবে। ভালো না ওরা। কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে কিছু গ্যাং থাকে না যাদের কাজ সব নিজেদের আয়ত্তে রাখা। জিহান ভাই ওরকম একজন। কলেজের সাবেক ভিপি। ‘
রিদি বিরক্ত নিয়ে বলল, ‘ এমন কত ভিপি পেছনে ঘুরে। রানা ভাই ও কয়েকদিন ঘুরছিল। চেনেন তো? বর্তমান ভিপি।’
ফখরুল একপেশে হেসে বলল, ‘ রানা ভাই হচ্ছে মাছি বুঝছ? জিহান ভাইয়ের কাছে কিচ্ছু না। জিহান ভাই জায়গা না ছাড়লে রানা ভাই ভিপি হতে পারত না। জিহান ডেঞ্জারাস। উনি ছাত্র রাজনীতি ছেড়ে দিয়ে ভাল করছে। নতুবা এতদিনে পাউডার হয়ে যাইত। এনামুল করিম কে চেনো?’
জাবেদ সাহেব প্রশ্ন করলেন এবার, ‘ আমাদের এমপি এনামুল করিম? ‘
‘ জি আংকেল। জিহান ওনার ডান হাত ছিল শুনছি। হঠাৎ করে নাকি রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছে। কতটুকু সত্য আর কতটুকু মিথ্যা জানিনা।’
রিদির রাগে গা জ্বলে উঠল। বদমাশটা বাবার সামনে সব হড়বড় করে বলে দিচ্ছে। ইচ্ছে করছে কাটা কম্পাস দিয়ে চোখ দুটো তুলে ফেলতে আর হাতুড়ি দিয়ে গালের চাপা ভেঙে দিতে। এমনিতেই বাবা রাজনীতি করা ছেলে পছন্দ করে না, দ্বীপ সম্পর্কে এসব শুনলে তো শুরু থেকেই নেতিবাচক ধারণা জন্মাবে। অথচ দ্বীপ কত শান্ত থাকে। রিদি মুখের রাগী ভাবভঙ্গি স্বাভাবিক করে বলল, ‘ এসব জিহান মিহান চিনে আমার কাজ নাই ৷ আমার ঘরে বাইরে সব দেখি বদমাশেরা ঘুরে। বাইরে রানা, বাসার নিচেও কত বখাটে। দেখলে মনে হয় কত ভদ্র। অথচ ভেতর টা নষ্ট। ‘
ফখরুলের কিছুটা সম্মানে লাগল। সে আরেকটু বাড়িয়ে বলল, ‘ আমি তো এমনি বললাম রিদি। এসব রানা জিহান এদের আগে পিছে মেয়েরা ঘুরে। কলেজের কত মেয়ে ওদের সেবা করে।’
জাবেদ সাহেব কাশি দিয়ে থামিয়ে দিলেন। বড্ড বেয়াদপ এই ছেলে। রিদি বাবার দিকে তাকিয়ে দেখল উনার ভাবমূর্তি বেশ জটিল। এত কিছুর পরও রিদি স্বাভাবিক। আমিনা মেয়ের দিকে তাকিয়ে কোনো ভাবান্তর দেখতে না পেয়ে ফখরুলকে বলল, ‘ মেয়ে যখন হয়েছে কত কি ঘটবে, কিছুদিন আগেও তোমার আংকেল দুজনকে বুঝিয়েছে। সমস্যা হলে তোমাকে জানাব।’
এতক্ষণ জাবেদ সাহেবের মুখের ভঙ্গি বোঝা যাচ্ছিল না। স্ত্রী কন্যার কথা শুনে ফখরুলকে বললেন, ‘ শোনো ফখরুল আমার দাদী বলতেন, বাড়ির সামনে বরই গাছ থাকলে ধনী-গরীব, ফকির-মিসকিন সবাই একবার ঢিল মারবেই। তো সেই ক্ষেত্রে মেয়ে যখন আছে কতজন পছন্দ অপছন্দ করবে। এসব নিয়ে ভাবলে হয় না। তুমিও তো ছেলে মানুষ। ওইসব ভাবলে তোমাকে সন্দেহের তালিকায় সবার আগে ফেলতে হবে। ‘
ফখরুল ঘাবড়ে গেল। মনে হল রিদির বাবা কথাটা ইচ্ছে করে বলেছেন। রিদি কি বাসায় কিছু জানিয়েছে? ফখরুল আর দেরি না করে বেরিয়ে গেল। জাবেদ সাহেব ফখরুল যাওয়ার পর বললেন, ‘ ছেলেটা সুবিধার না। ওর কাছ থেকে দূরে থাকবে মা।’
রিদি মাথা কাত করল। রুমে এসে কিছুক্ষন একা একাই নাচল। স্পষ্ট বুঝতে পারছে দ্বীপ সম্ভবত কঠিন কিছু করেছে ফখরুল এর সাথে। নতুবা দ্বীপ সম্পর্কে এভাবে বলত না।
পরদিন থেকে নতুন শিক্ষক রাখা হল। বাসা প্রাইভেট করতে করতে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে । পরীক্ষা দরজায় কড়া নাড়ছে। রিদি পড়ায় পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছে। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে সিলেবাস শেষ করতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। আগামীকাল থেকে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু । আমিনার সাথে রিদি এখন কথা কম বলে। আগের মত ছটফটে স্বভাব হারিয়ে গিয়েছে রিদির। জাবেদ সাহেব আফসোস করে বলেন মেয়েটা কেমন যেন হয়ে গেছে। কিছুক্ষন আগে জাবেদ সাহেব এসে মেয়েকে বললেন আর বেশি না পড়তে। খেয়ে ঘুমিয়ে যেতে।
এক টানা পড়ে যাচ্ছে। আগামীকাল বাংলা প্রথম পত্র। পড়তে পড়তে টেবিলে মাথা এলিয়ে দিল। নিজের অজান্তে চোখ দুটো ভরে এলো। ভিজে গেল মাথা রাখা টেবিলের অংশ টুকু। আমিনা ফোন এনে দিল রিদিকে। মাকে দেখে ওড়না দিয়ে চোখ মুছে ফেলল। ফোন হাতে দিয়ে আমিনা বললেন,
‘ রাহা ফোন দিয়েছে কথা বলো।’
রিদি ফোন ধরে সালাম দিল। আমিনা কাজে চলে গেলেন। রাহা এবং রায়হান ওইপাশ থেকে টুকটাক কুশলাদি বিনিময় করল। ঠিকভাবে পরীক্ষা দিতে বলল, দুশ্চিন্তা না করতে বলল। সবশেষে রাহা বলল,
‘ লাইনে থাক , একজনকে এড করি।’
রিদি চুপ করে আছে। ঠিক সেই মুহুর্তে ওই পাশে থাকা প্রিয় মানুষ টা সালাম দিল। বুক কেঁপে উঠল রিদির। রাহা সতর্ক করল,
‘ তুই চুপচাপ শুনবি রিদি, ভাইয়া কথা বলুক। আম্মু টের পেলে আমাকেও গিলে ফেলবে। ‘
রায়হান বলল, ‘ রিদি পাখি, আমাকে ধন্যবাদটা আগে দিয়ে দে। তোর বোনকে আমি রাজি করিয়েছি। ‘
রিদির গলা কাঁপছে৷ কম্পিত গলায় ধন্যবাদ দিল। দ্বীপ ও পাশ থেকে বলল, ‘ আশা করি ভাল আছ। আবেগী কথা বলার সময় এখন না। পরীক্ষার জন্য অনেক শুভকামনা। ফলাফল ভালো কর। এরপর যা বলবে সব শুনব। রাহার কাছ থেকে আমি সব শুনেছি। প্র্যাক্টিকেল পরীক্ষার সময় আমি দেখা করব কলেজে। আজ রাখি। ভালো থেকো।’
দ্বীপ কল কেটে দিল। রাহা বোনকে মন দিয়ে পড়তে বলে ফোন রাখল। রিদির ঠোঁটের কোণে হাসি। নতুন উদ্যমে পড়া শুরু করল। রাহাকে মেসেজ দিয়েছিল দ্বীপ যাতে রিদির কাছে নিজের কথাগুলো পৌঁছাতে পারে। দ্বীপের কনভিন্স করার কৌশলে আটকা পড়ে গেল রাহা এবং রায়হান। তাদের দুজনেরই দ্বীপকে পছন্দ হয়েছে। রায়হান তো বলেই বসল,’ ভদ্রলোকের সাহস আছে।’
___
৩রা এপ্রিল, ২০১৬
রিদি আজ নিজ থেকে মায়ের সাথে কথা বলছে। আমিনা ফজরের সালাত আদায় করে আর ঘুমায় নি। মেয়ের জন্য নাস্তা বানিয়েছেন। নিজ হাতে মেয়েকে খাইয়ে দিচ্ছেন। জাবেদ সাহেব মেয়ের ফাইল ব্যাগ টা চেক করে দেখলেন এডমিট কার্ড, রেজিস্ট্রেশন কার্ড সব ঠিকঠাক মত নিয়েছে কিনা। বের হওয়ার সময় বাবা মা দুজনকে সালাম করল রিদি৷ প্রচন্ড নার্ভাস। পুরো রাস্তা দোয়া পড়ে এসেছে। কেন্দ্রের সামনে রিকশা দাঁড়াতেই রিদি এ পাশ, ও পাশ তাকিয়ে দ্বীপকে খুঁজছে। ওর মন বলল দ্বীপ আসবে। জাবেদ সাহেব তাড়া দিলেন। দ্বীপ আসবে না এই কথা রিদি জেনেও আশা করেছিল। অবশ্য এই ভিড়ে এসেও লাভ নেই। জাবেদ সাহেব মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘ পরীক্ষা ঠান্ডা মাথায় দিবে। কোনো দুশ্চিন্তা মাথায় রাখবে না। তুমি যা চাও বাবা তাই দিব, কিন্তু মন ভাল করে পরীক্ষা দিবে। উত্তর রেখে আসবে না।’
রিদি মাথা কাত করে সায় দিল বাবার কথায়। রিদি পরীক্ষার কেন্দ্রে ঢুকে যেতেই দ্বীপ আড়াল থেকে বের হয়ে কিঞ্চিৎ হাসল। এখন দেখা হলে অতি উত্তেজনায় পরীক্ষা খারাপ দিত।
__
বড় ছেলেকে পেয়ে রাহেলার আজ ঈদ লেগেছে। সাজিনা বেড়াতে এসেছে গতকাল। অন্যদিকে রিদনের সেমিস্টার ব্রেক চলছে। তিন সন্তানকে কাছে পেয়ে তার খুশির অন্তঃ নেই। সবার প্রিয় খাবার রান্না করতে ব্যস্ত। সাদা পোলাও, রোস্ট দ্বীপের প্রিয় খাবার। সাজিনার পছন্দ খাসীর রেজালা আর রিদন ভালোবাসে চিকেন ফ্রাই। হরদম রান্নার প্রস্তুতি চলছে। সখিনা বানু নাতীর পাশে বসে নাতীর হাতে একশো টাকার নোট গুজে দিয়ে বলল,
‘ ভাই মায়েরে কইও না। তুমি এইডা দিয়া চকলেট খাইও। ‘
দ্বীপ মুচকি হেসে দাদীকে বলল, ‘ আচ্ছা। তুমি খাওয়া দাওয়া ঠিক মত করো?’
দ্বীপকে এখনও সখিনা বানু ছোটবেলার দ্বীপ ভাবে। দাদীর এই ব্যাপারটা সে অনেক উপভোগ করে। রিদন বা সাজিনা কখনও-ই দাদীর কাছ থেকে এভাবে আদর পায় নি। তাই দাদীর প্রতি শ্রদ্ধা থাকলেও মায়া তুলনামূলক কম কাজ করে।
সখিনা বানু আফসোস করে বলল, ‘ হ রে ভাই, আমাগো গেরামে কত মাইয়া নাগরের লগে ভাগছে। কিন্তু বেশিদিন হেই সংসারডাও টিকে নাই।
দাদীর আবার মাথায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। সাজিনা কপাল চাপড়ে বলল, ‘ ভাইয়া এবার তুমি সহ্য কর। কি থেকে কি বলে নিজেও বুঝে না। ‘
দ্বীপ হাসলো ইষৎ। সখিনা বানু পুনরায় বললেন, ‘ আমার বড় পুতেরে চেনো? হের নাম মিজান।’
দ্বীপ দু পাশে মাথা নেড়ে দাদীর কথা আগ্রহ ভরে শুনছে। সখিনা বানু পান চিবাতে চিবাতে বলল,
‘ মিজান যে রাহেলা রে বিয়া করছে, ওই বিয়াতে আমি মত দিই নাই তো। রাহেলা সুন্দর ছিল। ওর দেমাগ বেশি। হে ফরসা, আমাগো মইধ্যে তো কেউ এরম ফরসা কেউ ছিল না। ওর রূপ দিয়া ভুলায় রাখত মিজানরে। মিজান খালি ওর আঁচল ধইরা ঘুরত। পত্থম দিকে তো রাহেলা রে মুখে তুইলা খাওয়াই দিত। একদিন বকছি। এরপর থেইকা আমার সামনে খাওয়ায় না। হুনো নাতী বউরে এত মাথাত তোলন ভালা না। বউ থাকে পায়ের তলে, বুঝলা। ‘
দ্বীপ ক্ষীণ দৃষ্টিতে দাদীর দিকে তাকিয়ে আছে। এটা যে দাদীর বানানো কত নম্বর গল্প তার জানা নেই। রিদন চোয়াল শক্ত করে বলল, ‘ শুনো বুড়ি, তোমারে আমি আমার বউয়ের কামের বেডি বানামু। যা করছ আমার মায়ের লগে, সব মনে রাখছি। ‘
রাহেলা রান্নাঘর থেকে নাস্তা হাতে ডাইনিং রুমে প্রবেশ করছিল। রিদনকে এসব বলতে দেখে ধমকালেন। সাজিনা দাদীর কথা শুনে বলল, ‘ এই কারণেই তো তোমার বাকি দুই পুতের বউ ঠেঙ্গায় বাইর করছে তোমারে।’
দ্বীপ বোনকে মৃদু ধমক দিয়ে বলল, ‘ কাকে কি বলছিস? কিছু শুনে, না বুঝে? উলটো তোকে ঠোঁট নাড়তে দেখে নতুন কিচ্ছা আওড়াবে। মাথায় যা আসছে তাই বলছে৷ ধরিস কেন এসব কথা? বয়স হয়েছে না। শ্রদ্ধাবোধ কি কমে যাচ্ছে তোদের? ‘
রিদন মাকে প্রশ্ন করল, ‘ আম্মু, আব্বু নাকি আপনার আঁচল ধরে ঘুরত?’
রাহেলা খানম ভ্রু কুচকে বলল, ‘ কোনদিন?’
‘ দাদী-ই না বলল।’
‘ তোর দাদায় তোর দাদীর আঁচল ধইরা ঘুরত। এই কারণে আমার দাদী শাশুড়ী তোর দাদারে লাঠি দিয়া পিডাইছিল। দাদী শাশুড়ী জল্লাদ মহিলা ছিল এ কথা তো জানিস-ই। তোর দাদীর উপর অনেক অত্যাচার করছে। অবশ্য তোর দাদীও করছে আমার উপর তবে আমার দাদী শাশুড়ীর তুলনায় কম করছে। তোর দাদী তো হুঁশ আসলেই আমাকে বলে, বউ আমারে মাফ কইরা দিও। কিন্তু আমার দাদী শাশুড়ী মরতে মরতে ও তোর দাদীরে অভিশাপ দিয়ে মরেছে। উনার ভয়ে কেউ কথাও বলত না। ঝগড়া করার সময় হুঁশে থাকত না। হাঁটুর উপর কাপড় তুলে পাগলা নাচ নেচে নেচে ঝগড়া করত। তখন দেখলে মনে হত একটা রাক্ষসী। ‘
সাজিনা বলল, ‘ দাদী মনে হয় শাশুড়ী কে ভুলে নাই, তাই সেই গল্প নিজের উপর দিয়ে চালিয়ে দিচ্ছে।’
সখিনা বানু আবার শুরু করলেন, ‘ আমাগো বাড়িতে একটা কুত্তা পালত আমার শ্বশুর। একবার কুত্তার পেডে বাচ্চা আইছিল, বাচ্চা হওনের পরে দেখি কুত্তার পেডে বিলাইর বাচ্চা…’
দ্বীপ সাজিনাকে সজোরে ধমক দিয়ে বলল, ‘ যা দাদীরে রুমে নিয়ে যা। আর কতক্ষন এসব বলতে দিলে মানুষের পেডে হাতির বাচ্চা হইছে কইব। কই পায় এসব আজগুবি কাহিনি আল্লাহ জানে।’
রিদন ঠোঁট উলটে বলল, ‘ ভাই এত দিন ঘর টা ছিল পাগলাগারদ, এখন হচ্ছে চিড়িয়াখানা। ‘
__
দুপুর একটার আগেই জাবেদ সাহেব মেয়ের জন্য কেন্দ্রের গেইটে দাঁড়িয়ে আছেন। রিদি ঠেলাঠেলি করে বের হল। মেয়েকে দেখে জাবেদ সাহেব হাত তুললেন। ভিড়ের মাঝে বাবাকে পেয়ে ছুটে এলো রিদি।
রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে রিদির হাতে এক বোতল জুস দিয়ে বললেন, ‘ আগে এটা খাও মা। ‘
রিদি জুস খেতে ব্যস্ত। জাবেদ সাহেব প্রশ্ন দেখছেন। কিন্তু মেয়েকে একটি বার ও জিজ্ঞেস করেন নি পরীক্ষা কেমন হয়েছে? তার ভাষ্যমতে পরীক্ষা যা দেয়ার দিয়েছে। এখন এই প্রশ্ন করা অবান্তর৷ জুস খেতে খেতে রিদি নিজেই বলল, ‘ আব্বু দুটো নৈর্ব্যক্তিক ভুল হয়েছে। বাকি গুলো মনে হয় হয়েছে। ‘
জাবেদ সাহেব হেসে বললেন, ‘ সমস্যা নেই বাবা, যা হওয়ার হয়েছে। পরবর্তী পরীক্ষার প্রস্তুতি নাও কেমন।’
রিদি মাথা কাত ঘাড় ঘুরাতেই চমকে গেল। দম আটকে আসার উপক্রম। খানিক দূরত্বে দ্বীপ দাঁড়িয়ে আছে। দ্বীপের ঠোঁটের কোণে হাসি। চোখ দিয়ে ইশারা করল প্রশ্নের দিকে। রিদি দু চোখের পলক ঝাপটে বুঝাল, পরীক্ষা ভাল হয়েছে। জাবেদ সাহেব মেয়েকে নিয়ে রিকশায় উঠলেন। যতক্ষন রিকশা দেখা যাচ্ছে ততক্ষন তাকিয়ে ছিল দ্বীপ। রিদির প্রথম পরীক্ষা দ্বীপ আসবে না তা কি করে হয়? সেই সাথে সবচেয়ে খারাপ আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটেছে। সকালে ভালো ভাবে লক্ষ্য করে নি কিন্তু এখন রিদির সাথে তার বাবাকে দেখে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মত অবস্থা। সেদিন রিকশার উপর বসা ভদ্রলোকই রিদির বাবা যিনি দ্বীপকে পারিবারিক শিক্ষা নিয়ে শাসিয়েছিলেন। তিনি যদি ঘুনাক্ষরে ও টের পান সেই অসভ্য, অভদ্র ছেলেটার সাথে তার মেয়ে একটা সম্পর্কে জড়িয়েছে , মেয়েকে কেটে সম্ভবত মেঘনায় ভাসিয়ে দিবেন ।
___
অনেক দিন পর রিদিকে দেখে মন ভালো আবার মনের মধ্যে দুশ্চিন্তা। বিকেলে একটা টুর্নামেন্ট আছে। বন্ধুরা সবাই থাকবে। কথা দিয়েছিল খেলবে, বারণ করতে পারে নি। হয়ত আজই শেষ খেলা। অফিস থেকে দুদিনের ছুটি নিয়েছে। জার্সি পরে তৈরি হয়ে নিল। বের হওয়ার সময় ফুফু তফুরা এসে হাজির। অঞ্জুকে সাথে আনেনি, কিছুক্ষন পর আসবে বলল । দ্বীপ সালাম দিয়ে বেরিয়ে গেল। নতুন কোনো কাহিনি করতে হয়ত হাজির হয়েছে ফুফু। ফুফু তফুরার ধারণা দ্বীপ যদি অঞ্জুকে বিয়ে করে তবে অঞ্জু রানী হয়ে থাকবে। গত বছর মিজান সাহেব তার তিন বোনকেই নিজেদের হকের টাকা বুঝিয়ে দিয়েছেন। এতেও লোভ কমে না তফুরার। মিজান সাহেবের বাবা দ্বীপের নামে গ্রামের একটা দিঘী লিখে দিয়েছেন। সেই দিঘীর প্রতি লোভ সবার। কিন্তু কেউ মুখ ফুটে বলতে পারেন না। এছাড়া আরও একটা কারণ আছে অঞ্জুকে এই বাড়িতে বিয়ে দেবার। রাহেলা খানমকে তফুরা অত্যন্ত নিষ্ক্রিয় বান্দা ভাবে। কারণ তিনি সবসময় চুপচাপ থাকেন। এতে তফুরার সুবিধা, মেয়ের উপর অহেতুক অত্যাচার করার সুযোগ নেই। তখন তফুরা ভাইয়ের বাড়িতে এসে থাকতে পারবে৷ শুনেছে বাপের বাড়ির হক নিয়ে গেলে ভাইয়েরা আর বাড়িতে জায়গা দেয় না।
ইদানীং রাহেলা খানম তফুরাকে এড়িয়ে চলে এটা তফুরা বেশ খেয়াল করেছে। ঘরে ঢুকেই বলল, ‘ ভাবী এক কাপ চা দিও।’
মনে হয় যেন রাহেলা তার কাজের বুয়া। সাজিনা বিকেলের নাস্তা ভাজছিল। ফুফুকে মায়ের সাথে এভাবে কথা বলতে দেখে মুখের উপর জবাব দিল, ‘ ফুফু কেবল আসছেন, বিশ্রাম নেন আগে। চা সময় মত পাবেন। আম্মুর শরীর ভালো না। কিছুক্ষন পর বুয়া আসলে চা পাঠাচ্ছি।’
তফুরা চমকে গিয়ে বলল, ‘ বিয়ার পর তো দেখি তোর মুখ ফুটছে৷ ‘
সাজিনা ফ্রিজ থেকে দই বের করতে করতে বলল, ‘ কি আর করব আম্মুর মত শাশুড়ী আর ননদের অত্যাচার সহ্য হয় না। সেদিন স্বামীকে বলেছি তোমার বোনটা আমার সাথে ঝগড়া লাগতে আসলে আমি কিন্তু থাপ্পড় দিব। আলহামদুলিল্লাহ আমার স্বামী আব্বুর মত বোকা না, বলেছে শুধু থাপ্পড় না, প্রয়োজনে যে মুখ দিয়ে বড় ভাবীকে অসম্মান করে ওই মুখের জিব কেটে দিও। ভেবে দেখেন এমন স্বামী সহজে পাওয়া যায়? মাশা আল্লাহ, কারো নজর না লাগুক। তবে আমার ননদ ও আলহামদুলিল্লাহ ভাল। জবান কম চলে।’
তফুরা গজ গজ করতে করতে বলল, ‘ তোর মা র উপর কে অত্যাচার করছে?’
পাশের রুমে রিদন ছিল। ঘুমাতে পারছেনা এদের চেঁচামেচির জন্য। শোয়া থেকে উঠে এসে জোরে একটা ধমক দিয়ে বলল, ‘ কিরে আপু বস্তি হয়ে গেল বাসাটা। কে আসছে বাসায়?’
তফুরা বড় বড় চোখ করে বলল, ‘ তুই আমারে বস্তি বললি?’
রাহেলা ছেলে মেয়েদের ধমক দিতে দিতে তফুরাকে বলল, ‘ তুমি আম্মার কাছে যাও তফুরা। ওরা তো ঝগড়া করে জানোই তুমি। এত গায়ে মাখিও না এসব কথা। ‘
সাজিনা আর রিদনকে চোখ রাঙালেন রাহেলা। পেছন থেকে সাজিনা আর রিদন হাই ফাইভ দিয়ে হাসতে লাগল। রিদন বলল, ‘ আপু, অঞ্জুর সাথে ভাইয়ার বিয়ে ঠিক হলে আগুন লাগিয়ে দিব ঘরে। ‘
সাজিনা হেসে বলল, ‘ হবে না, ভাইয়ার ‘ম্যাডাম’ আছে।’
রিদন চমকে বলল,’ ম্যাডাম মানে?’
‘ ম্যাডাম মানে আমাদের হবু ভাবী।’
‘ ভাইয়া আর হবু ভাবী? কি বলো এসব? কেমনে সম্ভব? ভাইয়া প্রেম করে? আমার সন্দেহ হয়েছিল কিন্তু বিশ্বাস হয় নি?’
‘ আমার ও হয়নি। কিন্তু ফোন কলে দেখেছি। সত্যতা কতটুকু জানিনা।’
রিদন হঠাৎ করে হো হো করে হাসতে হাসতে মেঝেতে বসে পড়ল। সাজিনা রিদনের পিঠে থাপ্পড় দিয়ে বলল, ‘ এমন করিস কেন? হাসি থামা। ভাইয়া জানলে রাগ করবে। ভাইয়ার কি প্রেম করার অধিকার নেই নাকি?’
রিদন পেট ধরে হাসি থামিয়ে বলল, ‘ আচ্ছা আর হাসব না। আমি শুধু ভাবছি ভাইয়া প্রেম নিবেদন কিভাবে করেছে? ভাইয়া তো সব কথা সরাসরি বলে, রোমান্টিকতার র ও দেখা যায় না। দাঁড়াও অভিনয় করে দেখাই, ‘ও গো সুন্দরী আমি তোমাকে ভালোবাসি। প্লিজ আমাকে এক্সেপ্ট করো। না হলে বাসার হারপিক খেয়ে মরে যাব।’
‘ ছিহ! এত কিছু থাকতে হারপিক কেন?’
‘ শুনছি প্রেমে পাগলা হলে হারপিক খায়।’
সাজিনা ভাইয়ের চুল টেনে দিয়ে বলল, ‘ তুই আমাকে ফাঁসাবি রিদন। আস্তে কথা বল। ‘
ভেতর থেকে মিজান সাহেবের ডাক এলো। দুই ভাই বোন ছুটে গেল। রিদনের ঠোঁটে এখনও হাসি। তার মতে তার বড় ভাই অনুভূতি প্রকাশে ঘোড়ার আন্ডা। মাকে বলতে শুনেছিল, ছোটবেলায় একবার এক মেয়ে জিহানকে বলেছে জিহান তুমি খুব সুন্দর, আমি তোমাকে ভালোবাসি। তখন জিহান ক্লাস টু তে পড়ত।এই কথা বাসায় এসে মাকে বলেছিল। এরপর জিহান তিনদিন স্কুলে যায়নি যদি মেয়েটা তাকে ছেলেধরা সেজে নিয়ে যায়। কারণ সে মেয়েটাকে ভালোবাসে না। মেয়েটা দাঁত দিয়ে কলমের ক্যাপ কামড়ায়। থুতু দিয়ে পেন্সিলের দাগ মুছে খাতা থেকে। স্কেল দিয়ে জিহানের হাতে মারে। জিহানের টিফিন খেয়ে ফেলে। আর রেগে গেলে কামড় দেয় । সেই থেকে জিহানের মনে আতঙ্ক ঢুকে গিয়েছে মেয়েরা রেগে গেলে কামড় দেয়।
রান্নাঘরে এসে সাজিনা চা বানাচ্ছে তফুরার জন্য। রিদন বলল, ‘ সরো, আমার ফুফু চা খাবে না। শরবত বানিয়ে দিই। ‘
সাজিনা ভ্রু কুচকে ভাইকে দেখছে। রিদন কোথায় থেকে যেন দুই প্যাকেট ট্যাং এর গুড়া বের করে সেগুলো পানিতে দিয়ে বেশি করে চিনি, লবন,বিট লবন দিয়ে শরবত বানাল। সাজিনা বলল, ‘ ফুফুর জন্য এত প্রেম?’
‘ একটা মাত্র জল্লাদি বাসায় আসে, তারেও যদি আপ্যায়ন না করি কেমনে হবে বলো? বাকি দুই জল্লাদি তো আসে না।’
সাজিনা রিদনের পেছনে এলো। তফুরা ভাতিজা- র হাতে শরবতের গ্লাস দেখে বলল, ‘ ওমা রে মা, আমার ভাই পুতটা কত কষ্ট করে বানায় আনছে।’
ঠান্ডা ঠান্ডা শরবত খেয়ে কলিজা জুড়িয়ে গেল তফুরার। কত কত দোয়া দিল। রিদনের ঠোঁটে হাসি। রাহেলা রিদন কে প্রশ্ন করল, ‘ ট্যাং তো শেষ, কখন নিয়ে আসছ?’
‘ আনিনি তো, কিচেনে পেয়েছি। ‘
রাহেলা চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করল, ‘ কিচেনের তাকের উপর ছিল যে ওই দুই প্যাকেট ? ‘
‘ হ্যাঁ ‘
‘ আরেহ ওগুলার তো মেয়াদ নাই।’
সাজিনার মুখে হাত। রিদন কাজটা ইচ্ছাকৃত করেছে। এদিকে রিদন মেকি অভিনয় করে দুহাতে মুখ ঢাকল। তফুরা আহাজারিতে উপর তলার আশপাশের লোকজন ছুটে আসার উপক্রম।
চলবে…
