#লাভ_আফটার_ম্যারেজ
#আনাহিতা_তুলি
#সূচনা_পর্ব
ভার্সিটি থেকে জরুরি তলবে বাড়িতে আসার পর গল্প যখন জানতে পারে—সেই জরুরি বিষয়টি হচ্ছে আগামীকাল তাকে পাত্র পক্ষ দেখতে আসবে” তখন থেকেই সে বাড়িতে হুলস্থুল শুরু করে দেয়। তার মাথা ভো ভো করছে। পাত্র পক্ষ আসবে মানে? সে সবে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে। কেমিস্ট্রির মতো একটা বিদঘুটে সাবজেক্টে অনু পরমাণুর হিসেব মিলাতেই তার জীবনের অর্ধেক আনন্দ শেষ। সেখানে বিয়ের মতো একটা ব্যাপার ঘটিয়ে সে জীবনের অবশিষ্ট সুখ টুকু বিলাতে চায় না। তাও আবার চেনা নেই জানা নেই কাউকে বিয়ে করা যায় নাকি! সে কিছুতেই পাত্র পক্ষের সামনে যাবে না। কাল সকালেই সে ঢাকার ট্রেনে উঠে যাবে।
নিলুফার বেগম মেয়ের এমন হুলুস্থুল কান্ড দেখে কাজ ফেলে এগিয়ে আসলেন। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন,
‘এমন করছিস কেন মা? আমরা কি তর খারাপ চাই? আর চেনা জানার কথা বলছিস; সেটা তো বিয়ের পর আস্তে ধীরে একে অপরকে চিনে নিবি। আমিও তো তর বাবাকে বিয়ের আগে চিনতাম না। কিন্তু বিয়ের পর কি আমাদের বনে নি! নিজেই তো সবকিছু দেখছিস।’
গল্প বিরক্ত হলো। বললো,
‘তুমি তোমাদের সেই নব্বইয়ের দশকের বিয়ের উদাহরণ দিচ্ছো কেন আম্মু? এখন যুগ পাল্টেছে। এভাবে চেনা জানা ছাড়াই কাউকে দুম করে বিয়ে করা যায় নাকি! ’
নিলুফার মেয়েকে বুঝানোর মতো করে বললেন,
‘মানছি যুগ পাল্টেছে। এখনকার ছেলেমেয়ে গুলো বেশির ভাগই প্রেম-ভালোবাসা করে বিয়ে করে। কিন্তু একটা কথা জানিস কি; বিয়ের আগেই যে ভালোবাসা টা হয় সেটা বেশিরভাগই ঘুন কাঠের মতো হয়। সামান্য একটু সুযোগেই সম্পর্কে ঘুনে ধরে। কিন্তু বিয়ের পর ভালোবাসায় আল্লাহর রহমত থাকে। এ্যাই তুই কি আবার কাউকে পছন্দ করিস নাকি? করলে এখনই বল।’
‘এমন কিছুই না আম্মু। আমার বিশেষ কাউকে পছন্দ নেই। কিন্তু হুট করে এমন বিয়ের বিষয় টা আমি নিতে পারছি না।’
মেয়ের উত্তরে নিলুফার খুশি হলেন। গদগদ কন্ঠে বললেন,
‘তাহলে আর নাকচ করিস না। তর মামা বলেছে ছেলের পরিবার দারুণ অমায়িক। তার বন্ধু কিনা। আর ছেলেটাও কি সুন্দর দেখতে; একেবারে হুমায়ুন আহমেদ এর শুভ্রর মতো। ওহ্ তোকে তো বলা হয়নি ছেলের নামও শুভ্র। পেশায় আর্কিটেক্ট। আমি ছবিতে দেখেছি কি সুন্দর দেখতে একেবারে রাজপুত্র! ছেলের সম্পর্কে সব খবরাখবর নেওয়া হয়েছে; তাতে তর বাবারও খুব পছন্দ হয়েছে।’
গল্প অবাক হলো;
‘তোমরা একেবারে ছেলের সম্পর্কে খুঁজ খবরও নিয়ে ফেলেছো! বাহ্! আমাকে না জানিয়েই এতোটা এগিয়েছো তোমরা! ’
কল্প এতোক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে মা আর বোনের বাকবিতন্ডা শুনছিলো নির্বিকার হয়ে। এবার মুখ খুললো,
‘এ্যাই তোকে আমি একটা সিভি পাঠিয়ে বলেছিলাম না দেখতে! তখন তো দেখিসনি। এখন বলছিস তোকে জানানো হয়নি? ’
গল্প বিরক্ত হয়ে বললো,
‘দূর আপা! তুই তো দুদিন পরপরই এর-তার সিভি পাঠাস। আমি কিকরে জানব এটা সিরিয়াস!’
কল্প মুখ হাসি হাসি করে বললো,
‘ ঠিক হয়েছে। আমার কথা সিরিয়াসলি নিলে তো এটা হতো না। তর মতামত জেনে আমি আগেই বাবাকে কিছু বলতে পারতাম। কিন্তু তুই নিরব ছিলি বিধায় বাবা এটাকে তর লাজুকতা ধরেছে। বিয়ের বিষয় গুলোতে তো মেয়েদের অনেক লজ্জা তাই।’
গল্প গাল ফুলিয়ে বসে রইলো। সে কিছু বলেনি মানে তার পরিবার সেটা লজ্জা ধরে নিলো! এখন তার নিজের চুল ছিড়তে ইচ্ছে করছে। কেনো সে আগেই আপার দেয়া সিভিটা দেখলো না; তাহলে তো সে আগেই এই বিয়ে নাকচ করতে পারতো। কল্প বোনের পাশে বসে এবার আশ্বস্ত ভঙ্গিতে বললো,
‘ আচ্ছা এখন এটা নিয়ে এতো প্যানিক নিস না। তর পছন্দ না হলে বিয়ে ক্যানসেল। দেখতে আসলেই কি আর বিয়ে হয় নাকি! আর ছেলেটা কিন্তু সত্যিই ভালো। বড় মামার বন্ধুর ছেলে। তুই তো জানিসই বড় মামা তোকে কতো ভালোবাসে; সে কি তার আদুরে ভাগ্নির জন্য যেন তেন কাউকে আনবে নাকি! ’
কল্প থামে। পরপর কিছু একটা ভেবে নিজের সেলফোন এর গ্যালারি থেকে একটা ছবি বের করে। গল্পের হাতে ফোনটা ধরিয়ে দিয়ে বলে,
‘তখন তো দেখিস নি; এখন দেখে নে ছেলের ছবি। আম্মুর কথাটা কিন্তু মিথ্যা না; শুভ্র ছেলেটা কিন্তু আসলেই হুমায়ুন আহমেদ এর শুভ্রর মতোই দেখতে। রিজেক্ট করার আগে ভালো করে একবার দেখে নে। পাত্র হিসেবে সুপাত্রই বলা যায় অনায়াসে।’
কথাগুলো বলেই কল্প দরজা ভিরিয়ে চলে যায়। বোনকে একটু স্পেস দেওয়া দরকার।
গল্প দেখবে না দেখবে না করেও কি মনে করে যেনো ফোনের স্কিনে তাকাল। ওমনি তার দৃষ্টি আটকালো। মা আর বোনের বর্ননা টা খুব একটা মিথ্যে নয়। ছেলেটি দেখতে সুন্দর সেকথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। একে দেখেই তার উঠে, ছেলেদের এতো রূপ থাকতে নেই। রূপ, সৌন্দর্য এগুলো হচ্ছে মেয়েদের জন্য। কিন্তু এই শুভ্র নামের ছেলেটির ক্ষেত্রে যেন তা উল্টো হলো।আচ্ছা এতো সুন্দর একটি ছেলে তার উপর নাকি আবার নামকরা আর্কিটেক্ট; তার কি কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই নাকি! ভার্সিটিতে তো সে দেখে; একটু সুন্দর দেখতে ছেলেগুলোর প্রায়ই প্লে-বয় টাইপের হয়। এর আবার এমন কোনো রেকর্ড নেই তো? নাকি এখন বাবা মার সামনে গুড বয়ের ইমেজ রাখতে অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ এ মেয়ে দেখতে আসছে!
এমন হলে গল্প সেটা মানতেই পারবে না। সে নিজেও কখনো এসব প্রেম ভালোবাসায় জড়ায়নি। তার কারন বিয়ের পর বরকে নির্ভেজাল ভালোবাসবে বলে। এখন তার ফিউচার হাসব্যান্ড থেকেও তো সে এইটুকু প্রত্যাশা রাখতেই পারে; যে তার বরের প্রথম এবং শেষ ভালোবাসা সে-ই হবে।
এসব হাবিজাবি চিন্তায় তার মাথা ধরে যাচ্ছে এখন। মামা আর বাবা পছন্দ করেছে মানে এই বিয়ে আগানোর সম্ভাবনা সর্বোচ্চ। আর তাদের মুখের উপর কিছু বলার সাহস গল্পর অন্তত নেই। মামা নিশ্চয়ই তার জন্য প্লে-বয় টাইপ ছেলে নিয়ে আসবে না; এই বিশ্বাস তার আছে। কিন্তু তারপরও একটা কিন্তু থেকেই যায়; ছেলেটা ভালো হবে তো; তার ফ্যামিলি ভালো হবে তো! এসব চিন্তা মাথায় নিয়েই সে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই সারাদিনের জার্নির ক্লান্তিতে তার চোখে ঘুম এসে হানা দেয়।
____________
গল্পদের বাসায় আজ সকাল থেকেই হুলুস্থুল কান্ড। গল্পর বাবা ইমতিয়াজ রহমান সকাল সকাল এতো এতো বাজার করে এনেছে। নিলুফার আর কল্প সব এক হাতে সামলাচ্ছে। কল্প বিভিন্ন ধরনের নাস্তা রেডি করছে। নিলুফার দুপুরের খাবারের নানান পদ রান্না করছে; তার হাতে হাতে সাহায্য করছে তাদের বাড়ির হ্যাল্পিং হ্যান্ড বিনু। নিলুফার তরকারি নাড়তে নাড়তে কল্প কে বললেন,
‘কল্প মা এবার গিয়ে তর বোনকে ঘুম থেকে উঠা। মেহমানদের আসার সময় হয়ে এলো; আর মেয়ে এখনো ঘুমাচ্ছে। আর শুন গল্পকে একটা সুন্দর দেখতে শাড়ি পড়িয়ে দিস তো।’
কল্প মায়ের কথামতো মাথা নাড়িয়ে দ্রুত পায়ে যায় গল্পর রুমে। দেখে মহারানী এখনো আয়েশ করে ঘুমোচ্ছে।
‘এ্যাই গল্প উঠ। কতো বেলা হয়েছে সেই খেয়াল আছে? উঠ বোন তাড়াতাড়ি উঠ।’
গল্প চোখ বন্ধ রেখেই ঘুম ঘুম গলায় বললো,
‘উফফ আপা ঘুমাতে দে তো। রোজ সকালে ভার্সিটির ক্লাসের জন্য ঘুমাতে পারি না ঠিক করে। এখন ঘুমাতে দে।’
কল্প বোনের কথা শুনে হেসে ফেলে। এই মেয়ে নির্ঘাত ভুলে গেছে যে; আজ তাকে দেখতে পাত্র পক্ষ আসছে।
‘একটু পরেই পাত্র পক্ষ এসে যাবে। আর তুই এখনো ঘুমাচ্ছিস নিশ্চিন্তে। তাড়াতাড়ি উঠ এবার; নাহলে বাবা রাগারাগি করবে। ’
বাবার রাগারাগি আর পাত্র পক্ষের কথা শুনেই গল্পর ঘুম হাওয়া। একলাফে উঠে বসলো। কল্পর দিকে চেয়ে অসহায় চোখে বললো,
‘এ্যাই আপা পাত্র পক্ষ সত্যিই আসছে নাকি রে? আমার তো কেমন জানি নার্ভাস লাগছে এবার। ওদের আসাটা ক্যানসেল করা যায় না?’
কল্প হেসে ফেললো,
‘ওরা অলরেডি ময়মনসিংহ সদরে প্রবেশ করে ফেলেছে। আর তুই বলছিস ওদের আসা ক্যানসেল করা যায় কিনা!’
গল্প হতাশ নিশ্বাস ফেলল। কল্প তাকে তাড়া দিয়ে বললো,
‘এখন জলদি ফ্রেশ হয়ে আয়। তোকে রেডি করাতে হবে। আম্মু বলেছে শাড়ি পড়তে।’
একেই তো সে নার্ভাস। তারউপর আবার শাড়ি! সে তীব্র অনীহা নিয়ে বললো,
‘আমি এসব সাজগোজ করতে পারবো না আপা। দেখতে হলে এমনেই দেখবে।’
‘আচ্ছা সাজতে হবে না। কিন্তু শাড়িটা পড়তেই হবে।নাহলে তর জন্য আমিও আম্মুর কাছে বকা খাবো।’
গল্প না করলেও কল্প তা শুনেনি। সুন্দর দেখতে একটা পেঁয়াজো কালার শাড়ি পড়িয়ে দিয়েছে। সাজগোছ বলতে চোখে হালকা কাজল আর ঠোঁটে একটু লিপগ্লস দিয়েছে; তাও কল্প জোরাজুরি করে দিয়ে দেয়। এতোটুকুতেই গল্পকে দারুণ লাগছে। কল্প বোনকে দাঁড় করিয়ে ভালোভাবে দেখে বলে,
‘ মাশাআল্লাহ। কি সুন্দর লাগছে তোকে। শুন ওই ছেলে প্রিন্স হলে আমার বোনও প্রিন্সেস। কোনোদিক থেকেই কম না। হুহ্।’
গল্প বিরক্ত হয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই নিচ থেকে গাড়ির হর্নের আওয়াজ আসে। কল্প দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে উুকি দিয়ে আবার ঘরে এসে তাড়া দেখিয়ে বলে,
‘ওরা এসে গেছে গল্প। তুই থাক আমি নিচে যাচ্ছি।’
কথাটা বলেই কল্প দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। গল্পর এতোক্ষণ সবকিছু বিরক্ত লাগলেও; এখন পাত্র আসার কথা শুনে তার মারাত্মক নার্ভাস লাগছে। গলা শুকিয়ে আসছে। নার্ভাসনেসে নাক আর কপালও কিছুটা ঘামছে। লাইফে এতোটা নার্ভাস সে কখনোই ফিল করেনি; এমনকি ভাইবা বোর্ডের টিচারদের সামনেও না ।এই মুহুর্তে তার মনে হচ্ছে লাইফের সবচেয়ে বড়ো পরীক্ষা বোধহয় এটাই; পাত্র পক্ষের সামনে যাওয়ার পরীক্ষা!
চলবে
#লাভ_আফটার_ম্যারেজ
#আনাহিতা_তুলি
#পর্ব_৩
‘অসম্ভম আম্মু! তোমরা কি পাগল হয়ে গেছো? কীভাবে তোমরা মাত্র একদিনের পরিচয়েই বিয়ে পাকা করে ফেলতে পারো? তাও আবার বলছ কিনা সামনেের এই শুক্রবার আকদ! ইটস রিডিকিউলাস।’
নিলুফার মেয়ের এমন হম্বিতম্বি দেখে বললেন,
‘ও গল্প মা, তুই এমন মাথা গরম করছিস কেনো? ছেলেটা আর তার পরিবার কতো ভালো দেখেছিস।
তোকে একমুহূর্তেই কেমন আপন আপন করে নিয়েছিল। আর একদিনের পরিচয় বলছিস কেন! শুভ্রর বাবার সাথে ভাইজানের কতোদিনের পরিচয়; তারা একে-অপরের কতো ভালো বন্ধু! আচ্ছা খুলে বল তো তর আসল সমস্যা টা কোথায়?’
গল্প আবারও বিরক্ত হলো,
‘আমার ওয়ান এন্ড অনলি সমস্যা আমি এখন বিয়ে
করবো না। চেনা নেই জানা নেই একদিনের আলাপেই হুট করে বিয়ে করা যায় নাকি? তাছাড়া সামনে আমার এক্সাম আছে আম্মু। এখন বিয়ে-টিয়ের ঝামেলায় জড়াতে চাই না।’
নিলুফার মেয়েকে টেনে তার পাশে বসালেন। বললেন,
‘ জানাশোনার কথা বলছিস; তর বড়ো মামার চেনা জানার উপর কি তর ভরসা নেই?’
‘বড়ো মামাকে আমি চোখ বন্ধ করে ভরসা করি আম্মু। সেটা তুমিও জানো। কিন্তু এই বিয়ে বিষয়টাতেই আমার আপত্তি আছে এখন। আর শুনো অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে বিয়ে হলে পাত্র আর পাত্রি দুজনেই সাধু থাকে। কারন কেউই কাউকে জানে না ঠিকঠাক।’
‘অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে এর প্রবলেম হলে; তর কাউকে পছন্দ থাকলে বল। আমরা তার সাথেই তর বিয়ে দিবো।’
গল্প বিরক্ত গলায় বললো,
‘অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে প্রবলেম মানে আমার অন্য কাউকে পছন্দ থাকবে বিষয়টা এমন না আম্মু। আমি পড়াশোনা টা কমপ্লিট করে তারপর বিয়ে করতে চাইছি।’
নিলুফার এবার একটু রয়েসয়ে বসলেন। বললো,
‘বিয়ের পরেও তো পড়াশোনা হয়। কল্পকে তো মেডিকেলে পড়ার সময়ই বিয়ে দিয়েছিলাম। সে কি এখন পড়াশোনা করে ডাক্তার হয়নি? কতো বড়ো ডাক্তার তর আপা দেখেছিস! তুইও পারবি।’
গল্প যারপরনাই অবাক হয়ে বললো,
‘আম্মু আপুকে কিন্তু সাজিদ ভাইয়া নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছিল। তাছাড়া ভাইয়া কতো সাপোর্টিভ দেখেছ; তাই আপা নিজের পড়াশোনা টা কন্টিনিউ করে ডক্টর হতে পেরেছে। আমার বেলায় তো এমন নাও হতে পারে।’
মেয়েকে বুঝাতে বুঝাতে নিলুফার এবার ক্লান্ত। তবুও এই মেয়ে বুঝ মানছে না। ছেলে এবং ছেলের পরিবার ভালো না হলে কি আর তারা এই বিয়ের কথাবার্তা আগাতো নাকি? কিন্তু এই কথাটাই সে তার মেয়েকে বুঝাতে পারছে না। তাছাড়া শুভ্র এবং তার বাবা-মা; সকলের ব্যবহারের অমায়িকতা তাদের হৃদয় ছুঁয়েছে। কি মিষ্টি ব্যবহার। নিলুফার অল্প কথাতেই মানুষ চিনার মহিলা; তার চুলের পাক তো আর এমনি এমনি ধরেনি। তিনি বিছানা থেকে উঠে বললেন,
‘আমার আর এই বিষয় নিয়ে তোমার সাথে কিছু বলার নেই মা। এবার যা বলার তুমি তোমার বাবাকে বলো। কারন কথা তোমার বাবাই পাকা করেছে। আমাকে বলেছে তোমাকে জানাতে, জানালাম। এখন আর এসব কিছু আমি জানি না।’
গল্প বিস্ময় নিয়ে বললো,
‘আম্মু তুমি জানো আব্বুর সামনে এসব বলতে পারবো না। আব্বুর কথার উপর কথা বলতে পারি না সেটা তুমি জানো, তবে! ’
‘তাহলে আর কি! ভাবো কি করবে। তবে একটা কথা মনে রেখো তোমার বাবা-মা কিন্তু তোমাদের দুবোন কে সবসময়ই সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আর এবারও তাই। ভরসা করেই দেখো না একবার। ইনশাআল্লাহ ঠকবে না।’
কথাগুলো বলেই নিলুফার গল্পর ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। তার মাথায় আসছে না গল্পর এতো অনীহা কেন এই বিয়ে বিষয় টা নিয়ে। আজকালকার ছেলেমেয়ে গুলো কিছু হয় বিয়ে পাগল; আর কিছু হয় বিয়ে বিরোধী। ভালো সম্বন্ধো কি রোজ রোজ আসে নাকি! তার হয়েছে যত জ্বালা। এদিকে মেয়ের এককথা; আর ওদিকে স্বামীর আরকে কথা। দুজনকেই তার সামলানো লাগে। কি এক যন্ত্রণা!!
___________________
‘তাহলে ওই কথাই রইলো। আগামী শুক্রবার আমরা তবে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছি! আপনি একদম চিন্তা করবেন না ভাইসাব; গল্প মা আমার বাড়িতে মেয়ে হয়েই আসবে।’
শাহিনুজ্জামান আরও কিছু কথাবার্তা বলে কল কাটলো। এতোক্ষণ তিনি ইমতিয়াজ রহমানের সাথে কথা বলছিলেন। তাদের কথা হলো.. ছেলে-মেয়ে যখন দু’পক্ষই পছন্দ করেছে তবে দেরি না করে এখন আপাতত আকদ টা করিয়ে রাখবেন। গল্পর সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার পর তাকে উঠিয়ে নিয়ে আসা হবে। এমন কথাই আপাতত হয়েছে। আকদ করিয়ে রাখার মূল উদ্দেশ্য হলো- ছেলে- মেয়ে জেনো একে অপরকে একটু ভালোভাবে জানার সুযোগ পায়। সম্পর্ক টা যেনো একটু একটু করে সহজ হয়ে উঠে। তাছাড়া ভালো কাজ যত তাড়াতাড়ি করা যায় ততই ভালো।
জাহানারা ডাইনিং সাজাতে সাজাতে এতোক্ষণ স্বামীর কথোপকথন গুলো মন দিয়ে শুনছিলেন। এবার তিনি এগিয়ে এসে বললেন,
‘শুনোন, আচ্ছা আকদের সময় এতো আগে নিয়ে শুভ্রর কোনো দ্বিমত নেই তো? পরে আবার বেঁকে বসবে না তো?’
‘আমি কি তোমার ছেলের মতামত না নিয়েই আকদের ডেইট ঠিক করেছি! তাই মনে হয় তোমার!’
‘ও এতো দ্রুতই সম্মতি দিয়ে দিল! কিন্তু পাত্রী দেখতে যাওয়ার সময় তো নিজেই রাজি ছিল না। আর এখন সোজা আকদে রাজি হয়ে গেলো?’
শাহিনুজ্জামান কিছু বলার আগেই শুভ্রর নিরেট গলার আওয়াজ আসল। সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে জবাব দিলো,
‘কেনো আম্মু, তোমার ছেলে বিয়ে তে রাজি হয়েছে তুমি কি খুশি হওনি?’
জাহানারা ছেলের কথা শুনে অপ্রস্তুত হেসে বলল,
‘এ কেমন কথা শুভ্র! সন্তানের বিয়েতে মা খুশি হবে না-তো কে হবে! আমি অবশ্যই খুশি। এটা বলার কারন; তুই তো দুদিন আগেও বিয়ের জন্য রাজি ছিলি না। মেয়ে দেখতেই জবরদস্তি করে নিয়ে গেলাম। তাই।’
শুভ্র হাসলো। ডাইনিং টেবিলের চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললো,
‘ভেবে দেখলাম বিয়ে খুবই উত্তম কাজ। এই বিষয়ে বেশি লেইট না করাই ভালো। তাই আকদে দ্রুতই সম্মতি দিলাম।’
জাহানারা ছেলের এমন ভোল পল্টানো দেখে বিস্মিত হলো ভিষণ। যে ছেলে দুদিন আগেও বিয়ের জন্য নাকচ করছিল; একপ্রকার জোর করেই মেয়ে দেখাতে নিয়ে গেলো। সে কিনা এখন বলছে বিয়ে করা উত্তম কাজ। বিষয় টা আসলেই বিস্ময়কর তার কছে। পরপরই ভাবলেন গল্পর মতো ওমন একটা মিষ্টি মেয়েকে দেখেই হয়তো ছেলের মন গলেছে। তার ভাবনার মধ্যেই শুভ্র হাঁক ছাড়ল,
‘আম্মু তোমার চিন্তা ভাবনা পরে করো। এখন খাবার দাও ক্ষুধা পেয়েছে।’
‘দিচ্ছি দিচ্ছি।’
জাহানারা শুভ্রর প্লেটে খাবার দিতে দিতে বললেন,
‘শাওনের সাথে তর কথা হয়েছে? কি বলেছে আসতে পারবে আকদে?’
‘কথা হয়েছে আম্মু। কিন্তু তার এক্সাম নেক্সট উইকে। সো, আকদে থাকার সম্ভাবনা একেবারেই নেই।’
জাহানারার মুখ আধার হলো। শাওন তার ছোট ছেলে। পড়াশোনা করতে কানাডা থাকে। সেই কবে গেছে ছেলেটা; আর এখন কিনা ভাইয়ের বিয়েতেও থাকতে পারবে না। ভাবতেই তার মনটা খারাপ হয়ে এলো। শুভ্র মায়ের অভিলাষ বুঝল,
‘মন খারাপ করো না তো আম্মু। এখন শুধু আকদই হচ্ছে। কিন্তু বিয়ের অনুষ্ঠানে ঠিকই প্রেজেন্ট থাকবে বলেছে আমায়। তাছাড়া ওর দেশে আসার ডেইট শুনে তবেই আমি আমার বউ উঠিয়ে আনার ডেইট ঠিক করব। এবার একটু হাসো তো; হাসো না একটু প্রিটি লেইডি!’
ছেলের এমন আহ্লাদী কথায় জাহানারা সত্যিই হেসে ফেললেন। শুভ্র মায়ের হাসি দেখে নিজেও হেসে ফেললো। শাহিনুজ্জামান মা-ছেলের এমন খুশামোদ দেখে তিনিও মাথা নিচু করে নিঃশব্দে হাসলেন।
___________________
গল্প সারা ঘরজুড়ে পায়চারি করছে। একটু আগেই তার বাবা তার সাথে এই বিয়ের বিষয়ে আলোচনা করতে এসেছিলো। আলোচনা বলতে, মেয়ের এই বিষয়ে কোন কথা আছে কিনা তাই জানতে চেয়েছিল। কিন্তু হায়! গল্প বরাবরের ন্যায় এবারও বাবার সামনে নিজের কথা গুলো বলতে চেয়েও তা পারেনি। কোনো এক অজানা কারনে সে তার বাবাকে বেশ ভয় পায়। ইমতিয়াজ রহমান সাবেক জেনারেল আর্মি অফিসার। যার কারনেই সম্ভবত তিনি বেশ ডিসিপ্লিন ও কাঠখোট্টা স্বভাবের। আর এই গম্ভীর কাঠখোট্টা স্বভাবের জন্যই হয়তো তার পরিবার তাকে একটু বেশিই সমীহ করে চলে। ইমতিয়াজ মেয়ের কোনো মতবিরোধ না পেয়ে খুশিমনে ঘর থেকে বের হয়ে যান।
আগামী শুক্রবারে আকদ মনে হতেই গল্পর মাথা ভো ভো করছে। কয়েকমাস বাদেই তার সেমিস্টার ফাইনাল। আর এখন কিনা তার বিয়ের তোড়জোড় চলছে! ব্যাপারটা তার মনকে উদ্বেগ করে তুলছে। সেলফোনটা হাতে নিয়ে শুভ্রর নাম্বারটা একবার দেখল। শুভ্রর নাম্বার টা তাকে কল্প পাঠিয়েছে। যদিও শুভ্রর নাম্বার থেকে এখন পর্যন্ত তার ফোনে কোনো কল আসিনি। তবে তাকে এখন কলটা করতে হবে। দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে; মেয়েলি ইগো সরিয়ে সে শুভ্রর নাম্বারে ডায়াল করলো। কয়েক সেকেন্ড মধ্যেই কল রিসিভও হলো।
গল্প ফোন কানে নিয়ে চুপচাপ বসে রইলো। এবার কি বলবে সে নিজেই কথা পাচ্ছে না। তবে ওপাশ থেকে শুভ্রর গলার আওয়াজ এলো,
‘মিস তাহিয়াত আপনি কি শুধু নিশ্বাসের শব্দই শুনাবেন? নাকি গলার আওয়াজও শুনাবেন? অবশ্য আমি দুটোই শুনতে পারি; যদি আপনি শুনাতে চান!’
গল্প অবাক হলো ভিষণ। মনে প্রশ্ন এলো, শুভ্র বুঝলো কি করে যে এটা তারই কল ছিল! তবে লোকটা তো বেশ ভালোই ফ্ল্যার্টিং করতে পারে। কেমন করে বলছে! সে এবার গলা ঝেড়ে বলল,
‘আমার আপনার সাথে কিছু দরকারি কথা ছিল।’
‘বলুন শুনছি।’
গল্পর ভীষন অস্বস্তি হচ্ছে কথা গুলো বলতে। কিন্তু এই কথা গুলো বলা প্রয়োজন। খানিকক্ষণ ইতস্তত করে ধরা গলায় বললো,
‘আমাদের বিয়ের তারিখ সামনের শুক্রবারে ঠিক করা হয়েছে। তা নিয়েই বলার ছিল।’
শুভ্র ফোন কানে নিয়ে বারান্দায় আসলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে নিরেট গলার বলল,
‘বিয়ের বিষয়ে! শুনছি বলুন। কোনো সমস্যা?’
গল্প এবার আর সময় নেয়নি। জলদিই বলল,
‘আপনার কি মনে হচ্ছে না; আমরা বিয়ের সিদ্ধান্ত টা খুব তাড়াতাড়িই নিয়ে নিচ্ছি? আমাদের কি আরেকটু সময় নিয়ে ভাবা উচিত ছিল না?’
শুভ্র এবার একটু গম্ভীর হলো,
‘মিস তাহিয়াত আপনার কি বিয়েটা নিয়ে অন্য কোনো সমস্যা আছে? অ্যাই মিন অন্য কাউকে লাইক করেন বা ভালোবাসেন এমন টাইপ কিছু? ’
গল্প তাড়াহুড়ো করে বলল,
‘আরে না না। আমার ওমন কোনো বিষয় নেই। আব্বু যে রাগী, যদি তার কানে এসব কথা যায় তবে আমি শ্যা ষ। এই ভয়েই কাউকে আর ভালো লাগেনি।’
শুভ্র যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। তার ঠোঁটে ভাঁজে হাসির রেখা খেলে গেলো; যা গল্পর অজানা।
‘তাহলে আপনার এক্সাক্ট প্রবলেম টা কি? অ্যাই মিন কোন বিষয় টা আপনাকে এতো ওয়ারিড করছে?’
গল্প ইতিউতি করে উড়নার কোন আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে বলে,
‘যেহেতু আমাদের অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ; তাই বলছিলাম… আমাদের কি নিজেদের মধ্যে বোঝাপোড়ার জন্য আরেকটু টাইম নেওয়া উচিত ছিল না?’
শুভ্র বুঝল গল্পর বিয়ে নিয়ে একটা চাপা ভয় কাজ করছে। তবে সে সেসবে না গিয়ে একটু অন্য রকম গলায় বললো,
‘মিস তাহিয়াত, বোঝাপোড়ার জন্য সবচেয়ে ভালো ওয়ে কি জানেন?’
গল্প উৎসুক গলায় জানতে চাইল,
‘কি? বলেন!’
শুভ্র কোমল গলায় বললো,
‘অ্যাই থিঙ্ক, নিজেদের মধ্যে ভালো আন্ডারস্ট্যান্ডিং বা একে-অপরকে জানার সবচেয়ে বেস্ট ওয়ে-ই হচ্ছে ম্যারেজ। তো, আসুন প্রথমে নাহয় বিয়েটা সেরে নেই। ওসব বোঝাপোড়া বা একে-অপরকে জানার জন্য তো গোটা একটা জীবন পড়েই আছে।’
গল্প বিস্ময় নিয়ে শুভ্রর কথা গুলো শুনে গেলো। ভদ্রলোক কতো সহজেই তাকে বিয়ের জন্য এপ্রোচ করার ট্রাই করছে। গল্প তা ভালোই বুঝতে পারলো। তার এসব চিন্তা ভাবনার মধ্যেই আবারও শুভ্রর গলা ভেসে আসলো,
‘তাছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখলাম সিঙ্গেল লাইফ নিয়ে আপনার দুঃখের কোনো কমতি নেই। সেই দুঃখ কমানোর জন্য হলেও তো আপনার বিয়েটা দ্রুতই সারা উচিত। ’
গল্প বিস্ময়ে হতবিহ্বল হয়ে বলল,
‘আপনি লুকিয়ে আমার আইডি স্টক করেছেন?’
‘আইডি পাবলিক করা থাকলে তো যেকেউই স্টক করতে পারবে। যাইহোক; আমি কিন্তু আপনার এই সিঙ্গেল লাইফের দুঃখ টা কমাতে হেল্প করতে পারি। কারও দুঃখ আবার আমার সহ্য হয় না!’
শুভ্র আর কিছু বলার আগেই গল্প রাগে-লজ্জায় ফোন কাটলো। সে তো এগুলো ফান ফ্যাক্ট হিসেবে শেয়ার করতো। শুভ্র সেটা বুঝেও যে তার মজা নিলো এটা গল্প বেশ ভালোই বুঝতে পারছে। তবে লোকটার সঙ্গে কথা বলে গল্পর মন্দ লাগেনি। শুভ্রর কথার টোন টা তার ভালোই লেগেছে। কিন্তু বিয়েটা যে হওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চিত সেটা সে ভালোই বুঝতে পারলো। শুভ্রর শেষ কথা মনে হতেই তার গাল গুলো গরম হয়ে যাচ্ছে। তবে সেটা রাগে নাকি লজ্জায় তা বুঝা গেলো না।
#চলবে
