#শোধ_প্রতিশোধ
#নুরুন্নাহার_তিথী
৩
হসপিটাল থেকে ফিরে প্রায় মাস খানেক পর মনি বেগম শ্বশুরবাড়িতে আসেন। মনি বেগমের শ্বশুর তাকে আনতে গিয়েছিল। সবাই মনি বেগমের সাথে স্বাভাবিক আচরণ করলেও রাশেদ এর বিপরীত। চার দেয়ালের বাইরে সে মনি বেগমের প্রতি কিঞ্চিত পরিমাণ যত্ন দেখালেও, চার দেয়ালের ভেতরে ছিল অবজ্ঞায় পরিপূর্ণ। এভাবেই চলছিল। মনি বেগম নিজের অদৃষ্টের পরণতি ভেবে সহ্য করে যাচ্ছিলেন।
কিন্তু একদিন একটা ছোটো বিষয় নিয়ে রাশেদ দিনেদুপুরে রাগারাগি শুরু করে মনি বেগমকে অনেক গা-লাগা-ল করেন। মা-বাবা তুলে, চরিত্র তুলে নোংরা গা*লি দিতে থাকেন। এমনকি গায়েও হাত তুলেন। রাশেদের বাবা-মা থামানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ।
সেই মূহুর্তে হুট করেই মনি বেগমের সহ্যের বাধ ভাঙে। হাত তুলে বসেন রাশেদের গালে। রাশেদ চমকে উঠে। ঘরে উপস্থিত সকলে চমকে উঠে। রাশেদ প্রত্যুত্তরে কিছু বলবে তার আগে মনি বেগম তাকে আরও একটা থা*প্পড় মা-রেন। আর ঘৃণামিশ্রিত কণ্ঠে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
“আপনি আমাকে চ-রিত্রহীন বলেন? আমার বাপ-মাকে তুলে গা-লি দেন? বাপ-মার শিক্ষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন? কিন্তু আসল চ-রিত্রহীন তো আপনি। অফিসের কলিগের সাথে অবৈ-ধ সম্পর্কে লিপ্ত হয়ে ঘরের বউয়ের গা-য়ে হাত তুলেন। আপনি তো কাপুরষ! আমার বাচ্চা নষ্ট হওয়ার কারণও আপনি। গর্ভাবস্থায় আপনি আমাকে যত ধরনের মানসিক অ-ত্যাচার করেছেন! আর কেউ না জানুক, আমার আল্লাহ জানেন। ওই সময় আপনি আপনার অপরাধ ঢাকতে তালাকের ভয়ও দেখিয়েছেন। এতোকিছুর পরও আপনার কু-কর্ম থামেনি। শোধরাননি আপনি। এই বাসায় আবার আসার পর থেকে প্রতিটা দিন চার দেয়ালের ভেতর আমাকে শূণ্য অনুভব করিয়েছেন। আমারই পাশে শুয়ে পরনারীর সাথে মধুর আলাপ করেছেন কোনো রাখঢাক ছাড়া। এসবের পর আপনি কিভাবে আমার চরিত্র ও আমার বাপ-মায়ের শিক্ষার দিকে আঙুল তোলেন? বিবেকে কি সামান্যতম অনুশোচনা হয় না?”
রাশেদ হতভম্ব হয়ে যায়। মনি বেগম যে এসব প্রকাশ করবেন, তা তার ধারনার বাহিরে ছিল। মনি বেগমের সাথে প্রায় এক বছরের সংসারে মনি বেগম কখনও তার গায়ে হাত তোলা তো দূর উঁচু গলায়ও কথা বলেনি। যেদিন সব জানতে পেরেছিল, সেদিনও উঁচু গলায় চিৎকার করেননি। কিন্তু আজকে তার কণ্ঠে কোনো রাখঢাক নেই। রাশেদের বাবা-মা হতবাক হয়ে যান এসব শুনে। উনারা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না এসব। রাশেদ নিজের দোষ ঢাকতে মনি বেগমের উপর চোটপাট করতে চাইলে মনি বেগম এবার রাশেদের হাত ঝাড়া দিয়ে ফেলে দেন। এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। শাহিনা খাতুন ও রাফা তাকে আটকাতে চাইলেও পারেন না।
সপ্তাহ খানেক পর মনি বেগমের বাবার বাড়িতে রাশেদ ডিভোর্স পেপার পাঠায়। ডিভোর্স হয়ে যায়। ডিভোর্সের কিছুদিন পর রাশেদ আসমাকে বিয়ে করেন। রাশেদের বাবা-মা প্রথমে মেনে নিতে না চাইলেও পরবর্তীতে মেনে নেন। আর মনি বেগম নিজেকে শক্ত করতে কিছুটা সময় নেয় কিন্তু ভেঙে পড়ে না। তার এইচএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা সে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। একটা এনজিওতে চাকরি নেয়। জীবনে আর বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেয়।
অতীত ভাবনা থেকে বের হয় মনি বেগম। যেদিন মনি বেগম রাশেদের পরকি-য়ার কথা জানতে পারেন, সেটাও ছিল নভেম্বরের একটা দিন। এখনও তাই। তিনি আস্তে আস্তে ছাদ থেকে নেমে গেলেন।
কেটে যায় এক সপ্তাহ। জামাল রায়ানকে উপেক্ষা করে চলে। অফিস থেকেও দেরি করে ফেরে। তারপর কোনো কথা বলে না। রায়ানা এই এক সপ্তাহ অনেক কেঁদেছে। কিন্তু জামালের মন গলাতে পারেনি। মনি বেগম রায়ানার কান্না ও কষ্ট দেখে নিজেও জামালকে বুঝাতে চেষ্টা করেছেন কিন্তু জামাল নিজের জিদে অটল।
সপ্তাহ জুড়ে জামালের উপেক্ষা ও মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করে রায়ানা তার বাবা-মাকে জানায় এই ব্যাপারে। এর পরেরদিন সকালে সে জামালকে অফিসে যেতে দেয় না। তার বাবা-মাকে আসতে বলেছে বলে জানায়। জামালও মেনে নেয়। সে তো এই দিনটার জন্যই অপেক্ষা করছিল।
সকাল ১১টার দিকে রায়ানা বাবা রাশেদ খান ও মা আসমা খান আসেন। সাথে কয়েকজন প্রতিবেশি, কলিগ, পরিচিত উকিল ও পরিচিত র্যাবের লোকও নিয়ে আসেন। এরপর বসেন জামালের বিচার করতে। বিচারের পর্যায়ে জামাল জানায়,
“আপনাদের পক্ষে তো আপনারা অনেককে এনেছেন। উকিলও এনেছেন, র্যাবের লোকও এনেছেন আমার বিচার করতে। আমি আমার পক্ষের শুধু একজনকে আনতে চাই।”
উনারা আনতে বলেন। জামাল ভেতরের ঘরে গিয়ে মনি বেগমকে ডাকে।
“মনি মা, চলুন।”
মনি বেগম বলেন,
“এরপর? রায়ানাকে কি তার বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দিবে?”
“সেটা রায়ানার সিদ্ধান্ত।”
“ও গর্ভবতী।”
“না। রায়ানা আসলে প্রেগন্যান্ট না। ডাক্তারকে দিয়ে মিথ্যা রিপোর্ট ও ঔষুধের মাধ্যমে ওর পি-রিয়ড স্বল্প মেয়াদে বন্ধ করা হয়েছে, যা ও জানেনা।”
মনি বেগম চমকে যান। জামাল এমনও করতে পারে, তার ধারণার বাহিরে ছিল।
“তুমি অন্যায় করছো মেয়েটার সাথে। আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম, এই প্রতিশো-ধ স্পৃহা তোমাকে দ্বিতীয় রাশেদে পরিণত করবে।”
জামাল চুপ করে রইল। কোনো প্রত্যুত্তর করলো না। মনি বেগম হতাশ হয়ে বললেন,
“আমাকে ওয়াদা করো, আজকের পর যদি রায়ানা তোমার সাথে সংসার করতে চায় তবে তুমি কখনও পরনারী বা দ্বিতীয় বিয়ের চিন্তাও করবে না।”
জামাল কথা দেয়। অতঃপর তারা বসার ঘরে যায়। রাশেদ খান প্রথম দেখায় মনি বেগমকে চিনতে না পারলেও জামাল যখন বলে,
“ইনি আমার মনি মা। সম্পর্কে আমার ছোটো খালা মনি বেগম। ষোল বছর আগে আমার মায়র মৃত্যুর পর তিনিই আমাকে মায়ের মতো করে আগলে রেখেছেন। বাবা তো শুধু ভরণপোষণ দিতেন। দায়িত্ব বলতে অতটুকুই ছিল তার। তিনিও বছর খানেক আগে না ফেরার দেশে চলে গেছেন।”
রাশেদ খান বলে উঠলেন,
“তুমি তো বলেছিলে, তোমার কেউ নেই।”
“আছে। আমার মনি মা আছে। আমার খালা মনি বেগম। চিনতে পারছেন, খালুজান?”
জামালের মুখে ‘খালুজান’ শুনে চমকে উঠলেন রাশেদ খান। আসমা খান ও রায়ানারও একই অবস্থা। ঘরে উপস্থিত বাকিরা একে-অপরের মুখ দেখাদেখি করছে। রায়ানা বলে উঠে,
“জামাল, আপনি আমার আব্বুকে খালু বলছেন কেন?”
“কারণ সে আমার খালু!”
জামালের সহজ সাবলিল জবাব যেন সবার কাছে দুর্বোধ্য ঠেকলো। রাশেদ খান লজ্জা ও ভয়ে আড়ষ্ট। জামাল এক পলক রাশেদ খানের দিকে তাকিয়ে আবার বলে,
“সরি! প্রাক্তন খালু। মনি মা র সাথে তো তার ডিভোর্স হয়ে গেছিল। রায়ানা, তোমাকে বলেছিলাম মনে আছে? আমার মনি মাকে তার স্বামী কিভাবে ধোঁকা দিয়েছিল। বিয়ের রাতেই বলেছিলাম। এও বলেছিলাম, আমি এর প্রতিশোধ চাই। তুমি বলেছিলে, তুমি আমার পাশে থাকবে।”
রায়ানা হতবাক হয়। তার বাবাই তবে সেই অমা-নুষটা! রায়ানা তার বাবার দিকে তাকায়৷ রাশেদ খান মাথা নিচু করে নেয়। মেয়ের চোখের দিকে তাকানোর তার সাহস নেই। রায়ানা এবার তার মায়ের দিকে তাকায়। তার মনে প্রশ্নরা ডানা ঝাপটাচ্ছে। তার মা কি তবে সেই মহিলা? যে কি না জেনে শুনে বিবাহিত ব্যক্তির সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়েছে?
রায়ানার প্রশ্নে ভরা চাহনি দেখে জামাল নিজ থেকে এর উত্তর দিলো। বলল,
“ইনিই সেই মহিলা। যে জেনে শুনে একজন বিবাহিত লোকের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছেন। এও জানতেন, সেই লোকের স্ত্রী সন্তানসম্ভবা।”
আসমা খান বিপরীতে কিছু বলতে চাইলে জামাল তাকে থামায়। তারপর বলে,
“২২ বছর আগে আপনি একজন গর্ভবতী মহিলার স্বামীর সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন সব জেনেশুনে। রাশেদ খান ও আপনি সমান দোষী। কেউ কারও থেকে কম না। তখন কি আপনার বিবেকে লাগেনি এটা? আজ যখন মেয়ের জামাই আরেকটা বিয়ে করতে চেয়েছে, ওমনি বিচার সভা বসিয়েছেন। তাহলে ২২ বছর আগে ওই মহিলাও (মনি বেগমকে দেখিয়ে) কারও মেয়ে ছিল। যার স্বামীর সাথে আপনি অবৈ-ধ সম্পর্কে জড়িয়ে তার জীবনের সব সুখ কেড়ে নিয়েছিলেন। ওই মহিলাটা আপনাদের সম্পর্কে জেনে গেলেও থামেননি। বরং আরও এগিয়েছেন। সামান্যতম অনুশোচনা বোধ হয় আপনার?”
আসমা খান কিছু বলতে পারলেন না। রায়ানা ঘৃণার দৃষ্টিতে তার বাবা-মায়ের দিকে চেয়ে আছে।
রায়ানার বাবা-মায়ের সাথে আসা উকিল লোকটা বললেন,
“বাবা জামাল, তুমি তোমার খালার জন্য প্রতিশোধ নিতে এসব করছো মানলাম। কিন্তু তোমার বউও তো প্রেগন্যান্ট।”
“না। সে প্রেগন্যান্ট না। মিথ্যা রিপোর্ট আমি বানিয়েছি যাতে এই দিনটা দ্রুত আসে।”
এই কথা শুনে রায়ানা চমকে জামালের দিকে তাকায়। জামাল বলে,
“সরি, রায়ানা। তোমার মধ্যে প্রেগ্ন্যাসির যেসব লক্ষণ ছিল সব সাজানো ছিল। আমি নিজের উদ্দেশ্যের জন্য এসব করেছি। এখন তোমার যদি আমাকে শাস্তি দিতে ইচ্ছে হয়, দিতে পারো।”
রায়ানা শুধু জামালের দিকে চেয়ে আছে। কী বলবে সে?
______
রাশেদ খান ও আসমা খান এখন এলাকায় বের হতে পারেন না। পুরো এলাকায় চাওর হয়ে গেছে তাদের কৃতকর্ম। এতোদিন যেই সম্মান অর্জন করেছিলেন, সব ধূলিসাৎ। আগে এলাকায় কোনো বিচার বসলে তাকে ডাকা হতো। এখন তারই বিচার এলাকাবাসী মিলে করছে। রায়ানাও তার বাবা-মাকে জানিয়ে দিয়েছে, কখনও যেন তাকে মেয়ে বলে দাবি না করে। ঘৃণা হয় তার। মেয়ের চোখে ঘৃণা ও সামাজিক অপমানে রাশেদ খান মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছেন। যার প্রভাব তার শরীরেও গভীর ভাবে পড়েছে। স্ট্রোক করে শয্যাশায়ী সে।
আর রইল রায়ানা ও জামালের মধ্যে সম্পর্ক। দুজনে এখন বিনা কাগজ-কলমে অঘোষিত বিচ্ছেদে আছে। রায়ানাই জামালকে ছেড়ে মনি বেগমের সাথে মনি বেগমের অনাথ আশ্রমে সঙ্গী হয়েছে। অনাথ আশ্রমটা মনি বেগম চালান কিছু এনজিওর সহোযোগিতায়।
সপ্তাহের পর মাস। মাসের পর বছর। প্রতি সন্ধ্যায় জামাল অফিস ছুটির পর সেই অনাথ আশ্রমের গেইটে দাঁড়িয়ে থাকে রায়ানাকে এক পলক দেখার আশায়। সে রায়ানার অনুপস্থিতিতে জীবনে অন্য নারীকে কখনও আনতে চায় না।
সমাপ্ত
