#লাভ_আফটার_ম্যারেজ
#আনাহিতা_তুলি
#পর্ব_৩১
শুভ্রদের বাড়িতে একটা উৎসব উৎসব আমেজে তৈরি হয়েছে গল্পর প্যাগনেন্সির নিউজ শুনার পর থেকেই। শাহিনুজ্জামান খবরটা শুনার পরপরই এতো এতো মিষ্টি এনেছে যে সবাই হতবাক হয়ে কিছুক্ষণ উনার দিকে অপলক তাকিয়ে ছিলো। শাহিনুজ্জামান অবশ্য সবার ওমন দৃষ্টিপাত পাত্তা না দিয়ে বলেছে,
‘আমার প্রথম নাতি বা নাতনি আসতে চলেছে তার আগমনের খুশিতে আমি সবাইকে মিষ্টিমুখ করাব। এটা এতো আশ্চর্য হয়ে দেখার কিছু নেই।’
একটু থেমেই কিছু একটা মনে পড়ার ভঙ্গিতে উনি আবারও বলে উঠে,
‘ও হ্যাঁ! আমি আমার দাদাভাইয়ের জন্য একটা দোলনা ওর্ডার করেছি। বুঝলে জাহান দোলনা টা ভীষণই ক্লাসিক ডিজাইনের –কালকের মধ্যেই চলে আসবে।’
প্রথম টা মানা গেলেও শ্বশুর মশাইয়ের শেষের কথাটা শুনে গল্পর চোয়াল ঝুলে পড়লো। জাহানারাও বিস্ময় নিয়ে বলল,
‘আপনি এখনি দোলনা ওর্ডার করে ফেলেছেন! আপনার নাতি বা নাতনি যেই আসুক তার আসতে কিন্তু এখনো ডের দেরি।’
শাহিনুজ্জামান গা ছাড়া ভাব নিয়ে বললো,
‘হোক! আমি আমাদের থেকে সমস্ত তৈয়ারি আগে আগেই সেরে রাখব জাহান। তুমি বুঝতে পারছ না জাহান –আমি কতটা এক্সাইটেড। আমাদের বাড়িতে কতদিন পর একটা ছোট্ট বাচ্চা আসতে চলেছে সে হাসবে, কাঁদবে সারাবাড়ি খিলখিল করে মাতিয়ে রাখবে; তার জন্য তো এতটুকু করতেই হয়।’
গল্প ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসি খেলা করে গেলো। শাহিনুজ্জামানের জন্য এক গ্লাস সরবত করে তার সামনে দিতেই তিনি অসন্তুষ্টি নিয়ে বলল,
‘গল্প মা, তোমাকে এই সময় এসব কাজ করতে কে বলেছে! এখন তুমি পুরোপুরি রেস্টে থাকবে নাহলে শরীর খারাপ করবে তো মা।’
গল্প হেসে প্রতিত্তোর করলো,
‘এসব সাধারণ কাজ-কর্ম করা নরমাল বাবা। তাছাড়া আমরা ডক্টরের সঙ্গে কথাও বলেছি তিনি বলেছেন এসব হালকা-পাতলা কাজ করাই যায় শুধু ভারী কাজ যেনো না করা হয়।’
শাহিনুজ্জামান তবুও মাথা নেড়ে বলল,
‘তারপরও মা রিস্ক নেওয়া উচিত নয়। তুমি সাবধানে থাকো আর জাহান গল্প মামনিকে তুমি একদম কিচেনে এ্যালাও করবে না বলে দিলাম!’
জাহানারা অভিযোগের স্বরে বললো,
‘আর বলবেন না ওকে এতো করে মানা করি তারপরও সে কিচেনে চলে আসবে; আমাকে হাতে হাতে হেল্প করতে।’
শাহিনুজ্জামান কিছু বলতে যাবে তার আগেই দেখে শুভ্র সিঁড়ি দিয়ে নামছে। ছেলেকে এই অসময়ে বাড়িতে দেখে তিনি ভ্রু কুচকে ফেললেন। কারন তিনি যতদূর জানেন তার বড় ছেলেটি কাজের প্রতি দারুণ সিনসিয়ার; আর সেই অনুযায়ী এই সময় তো তার বাড়িতে থাকার কথা নায়!
শাহিনুজ্জামান আগ্রহী হয়ে জানতে চাইলেন,
‘কি ব্যাপার শুভ্র! তুমি এই সময়ে বাড়িতে? এই সময়টাতে তো তুমি অফিসে থাকো তাই না!’
শুভ্র বাবার পাশের সোফায় বসতে বসতে বলল,
‘আজ অফিসে যাইনি। অফিসের কিছু দরকারি কাজ যা ছিলো তা বাসায় বসেই করে ফেলেছি।’
‘কোনো সমস্যা থাকলে বলতে পারো?’
শুভ্র আড়চোখে গল্পর দিকে তাকাল সে কি করে বলবে যে তার মূল সমস্যা হলো –তার বউ আর অনাগত বাচ্চা ছেড়ে একমুহূর্তের জন্যও বাহিরে যেতে মন চাইছিল না। কিন্তু মহারানীর কি আর সেই খেয়াল আছে! সেই কখন নিচে নেমেছে কিন্তু এখনো ঘরে যাওয়ার নাম নেই।
‘কি হলো চুপ করে আছো কেনো?’
বাবার কথায় শুভ্রর সম্বিত ফিরল। বলল,
‘না, না। কোনো প্রবলেম নেই এমনিতেই মন চাইছিল তাই যায় নি। তাছাড়া তুমি এখানে শাওন কি অফিসে নাকি?’
শাহিনুজ্জামান রুষ্ট গলায় বলল,
‘আর শাওন! ওই বাদড় টা রোজ অনিয়ম করে অফিসে যায় তারউপর সুযোগ পেলেই অফিস থেকে হাওয়া হয়ে যায়।’
শুভ্র অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
‘হাওয়া হয়ে যায় মানে? অফিস করে না ঠিকঠাক?’
‘ও করবে নিজ দায়িত্বে কাজ! তাহলে তো হলোই! ধরে বেঁধে যতটুকু করানো যায় আরকি। এইযে আমি অফিস থেকে ব্রেক নিয়ে বাসায় আসলাম; এখন অফিসে গিয়ে দেখব তোমার গুনধর ভাই গায়ে হাওয়া লাগাতে বাহিরে বের হয়ে পড়েছে।’
শুভ্র হেসে ফেললো। বাবাকে শান্ত করতে বলল,
‘চিন্তা করো না কাজ করতে করতেই অভ্যাস হয়ে যাবে।’
শুভ্র এবার উঠে দাঁড়িয়ে গল্পকে উদ্দেশ্য করে বলল,
‘তাহিয়াত এক মগ কফি নিয়ে আসো তো; মাথা ধরেছে।’
কথাট বলেই শুভ্র গল্পকে চোখের ইশারায় দ্রুত ঘরে যেতে বলল। গল্প নিমিষেই বুঝে গেলো কফি শুধু বাহানা আসল উদ্দেশ্য তাকে ঘরে নেওয়া।
_______________________________
‘আপনি কি অতিরিক্ত করেছেন না এখন শুভ্র! আমি কি আপনার জন্য এখন একটু জোরে শ্বাসও ফেলতে পারবো না?’
গল্প যতটা তীক্ষ্ণ গলায় কথাটা বলল শুভ্র ঠিক ততটাই নমনীয় গলায় বললো,
‘শ্বাস কেনো নিতে পারবে না! অবশ্যই নিবে কিন্তু তোমার এক্সপ্রেশন দেখে তো আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম পেইন হচ্ছে কিনা –তাই আরকি!’
গল্প আগের থেকেও হতভম্ব গলায় বললো,
‘কি অদ্ভুত! আমার ডেলিভারি ডেইট এখনো পনেরো দিন বাকি আর আপনি কিনা এখনই পেইনের কথা বলছেন! পেইন হলে কি আমি লুকিয়ে রাখব নাকি? আপনি প্লিজ এবার একটু নরমাল হোন মশাই।’
গল্প কাতর চোখে তাকাল শুভ্রর দিকে। কিন্তু শুভ্র সেসব পাত্তা না দিয়ে বলল,
‘ওকে,ওকে। আমি আর এমন করব না এবার তুমি রিল্যাক্স হও। এই সময়ে এমন রেগে যাওয়া বেবি এবং তোমার দুজনের জন্যই ক্ষতিকর।’
“আমি আর এমন করব না” এই কথাটা শুভ্রর মুখ থেকে গল্প কম হলেও হাজারবার শুনে নিয়েছে। কিন্তু ফলাফল যা ছিল তাই হয়। গল্পর পেট টা এখন ফুলেফেঁপে ঢোল হয়ে আছে কেননা তাদের বেবিটা আর কিছুদিনের মধ্যেই পৃথিবীতে আগমন করতে চলেছে। কিন্তু গল্পর প্যাগনেন্সির সময় যত বাড়তে থাকে শুভ্রর পাগলামোও ততই বাড়তে শুরু করে। এই কিছুক্ষণ আগেই গল্প বেড থেকে উঠার সময় মুখ দিয়ে শুধু “উফফ” আওয়াজ টা নির্গত করেছিল –আর তাতেই মশাইয়ের টেনশনের পারদমিটার তরতর করে বেড়ে যায়। কাজ ফেলে সোফা থেকে লাফ দিয়ে উঠে অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করে,
‘তোমার কি পেইন হচ্ছে? ডক্টরের কাছে যাই চলো।’
শুভ্রর এমনসব বেহুদা দুশ্চিন্তায় গল্প তখন পাগলপ্রায়। এই লোক এমন কেনো? সে কি বাচ্চা যে নিজের পেইন হলে কাউকে কিছু বলবে না! আর এটা কি না বলার মতো বিষয় হলো? গত নয় মাসে ইমতিয়াজ রহমান আর নিলুফার তাদের মেয়েকে নিজেদের বাড়িতে নিতে তিন তিন বার এসেছে। কিন্তু জেদী শুভ্রর কাছে পরাজয় স্বীকার করে তারা সেভাবেই ফিরে গেছেন। তার এক কথা এই অবস্থায় বউকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে সে মরন যন্ত্রণা ভোগ করতে পারবে না; গল্প এই অবস্থায় গেলে টেনশনে নাকি সে পাগল হয়ে যাবে।
শুভ্রর ফোনে তখন অফিস থেকে আরাফ কল করে। সে ফোন নিয়ে বারান্দায় চলে যায়। গল্প না চাইতেও সেদিকে মনোযোগ দেয়।
‘শুভ্র কই তুই বেটা?’
‘বাসায়, কেনো?’
আরাফ যেনো হতভম্ব হতেও ভুলে গেলো। বিস্ময় নিয়ে বললো,
‘বাসায় মানে? তুই এখনো বাসায় কি করিস? আজ যে মি.সিনহার সঙ্গে একটা ইম্পর্ট্যান্ট মিটিং আছে মনে নেই তর!’
শুভ্র স্বাভাবিক ভাবেই বলল,
‘মনে আছে। কিন্তু আজ আমি আসতে পারছি না দোস্ত তরা হ্যান্ডেল করে নে। আজ তাহিয়াত কে নিয়ে ডক্টরের কাছে যেতে হবে একটা এ্যাপোয়েন্টমেন আছে।’
আরাফ জোর গলায় বললো,
‘আর এদিকে মি. সিনহা তর সাথে মিটিংয়ে আলাপ না করে মোটেই ঢিল ফাইনাল করবে না। তুই বুঝতে পারছিস আমাদের কোম্পানি কতটা লস খাবে!’
শুভ্র একইভাবে অনড় গলায় বললো,
‘লস কেনো খাবে আমি নিজে উনার সাথে কথা বলবো। তরা টেনশন নিস না।’
‘তুই এই কথা বলছিস শুভ্র, তুই! তর মনে হয় তুই আজ মিটিংয়ে এ্যাটেন্ড না পরবর্তী সময়ে মি. সিনহার সাথে কথা বললে উনি মেনে যাবে? সিনহা কিন্তু মানবে না শুভ্র তোকে আগে থেকেই বলে দিচ্ছি।’
শুভ্র এবার খানিকটা চিন্তিত হয়ে বলল,
‘কিন্তু এছাড়াই বা আমি কি করব বল! তাহিয়াতকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়াটাও তো খুব ইম্পর্ট্যান্ট….! ’
গল্প আর কিছু শুনল না চুপচাপ এসে বিছানায় বসে পড়লো। তার রীতিমতো এখন রাগ হচ্ছে শুভ্রর উপর। শুভ্র ঘরে আসলো মিনিট খানিক পরই এসেই সে তাকে তাড়া দিয়ে বলল,
‘তাহিয়াত রেডি হও ডক্টরের কাছে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে তো। তাড়াতাড়ি রেডি হও।’
গল্প একচুলও নিজের জায়গা থেকে নড়ল না। যেনো সে শুভ্রর কোনো কথাই শুনতে পায় নি। শুভ্র গল্পর কোনো ভ্রুক্ষেপ না দেখে আবারও বলল,
‘কি বলছি তাহিয়াত –রেডি হও। এখনো বসে কেনো!’
গল্প এবার শুভ্রর দিকে সূচালো দৃষ্টিতে তাকাল। এবং ভীষণ ঠান্ডা স্বরে বলল,
‘আমি কোনো ডাক্তারের কাছে যাবো না। আপনার যাওয়ার হলে আপনি যান।’
শুভ্র হতভম্ব হয়ে গল্পর কথা শুনে গেলো। বলল,
‘কিহ! তুমি ডাক্তারের কাছে যাবে না মানে? কি বলছ ভেবে বলছ! তোমার এখন রেগুলার চেকআপ কতোটা ইম্পর্ট্যান্ট আশা করি সেটা জানো তুমি।’
গল্প এবার শুভ্রর উপর চওড়া হলো,
‘না, না আমি কিছুই জানি না। সব তো আপনি নিজেই জেনে বসে আছেন। আর তারজন্যই তো আজকাল বাসা থেকে বের হয়ে অফিসের ছায়া অব্ধি মারাচ্ছেন না! লাস্ট ছয়দিন ধরে অফিসে যাচ্ছেন না আর আজ একটা মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট মিটিং তাও আপনি যাচ্ছেন না। এক্সকিউজ হিসেবে আমার নাম জাহির করছেন। কেনো আপনি ছাড়া কি দুনিয়াতে আর কেউ বাবা হয়নি? তারা কি আপনার মতো দুনিয়াবি সমস্ত কাজকর্ম ফেলে বউয়ের পিছনে পড়ে থাকে?’
শুভ্র অবাক হয়ে বলল,
‘তুমি এভাবে কেনো কথা বলছ তাহিয়াত? আর আমি বাসায় বসেও অফিসের কাজ ভালোভাবেই কমপ্লিট করছি। আর রইলো বাকি মিটিংয়ের কথা। ওটা আমি পরে ম্যানেজ করে নিবো নিজের কোম্পানিকে লসের সম্মুখীন আমি হতে দিব না।’
গল্প একরোখা গলায় বলল,
‘কোনো পরে টরে না। আজ এক্ষুনি আপনি অফিসে যাবেন। শুভ্র আমি চাই না আপনার এতোদিনের শ্রম, চেষ্টা এতো কষ্ট সব বৃথা যাক শুধুমাত্র আমার কারনে।’
‘মোটেও তোমার কারণে আমার কাজে কোনো প্রকার ইফেক্ট পরছে না। আর না এসব ব্যাপারে তোমাকে এতো মাথা ঘামাতে হবে। এখন যাও ঝটপট তৈরি হও।’
শেষের দিকে শুভ্রর গলাটা বেশ ভরাট গম্ভীর শুনাল। গল্প এতে প্রভাবিত হলো না বরং জেদি গলায় বলল,
‘আপনি যদি আজ অফিসে না যান তবে আমিও কোথাও যাবো না আর না আমি কোনো ডক্টর দেখাব আর কোনোদিন। এবং আমি আজ এক্ষুনি আমার আব্বুকে ফোন দিয়ে বলব সে যেনো আজই আমাকে এখান থেকে ময়মনসিংহ নিয়ে যায়।’
শুভ্র যেনো আঁতকে উঠা গলায় বলল,
‘হোয়াট! পাগল তুমি? এই টাইমে তোমার জন্য জার্নি করা কতটা রিক্স আদৌও জানো সেটা! আর তুমি ভাবলে কি করে আমি তোমাকে এই সময় আমার থেকে দূরে পাঠিয়ে নিজে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় বসে থাকব!’
‘তাহলে আপনি অফিসে যান আর ঠান্ডা মাথায় মিটিং জয়েন করুন। আমি মা’র সাথে আজ ডাক্তারের কাছে যাবো।’
শুভ্র কিছু বলতে চাইলে গল্প তাকে হাত উঁচিয়ে থামিয়ে অনড়ভাবে বলল,
‘এন্ড আমি কোনো অবজেকশন শুনতে চাই না। নাহলে আপনি ভালো করেই জানেন আমি কি করতে পারি।’
শুভ্র কোনোপ্রকার দ্বিমত করার সুযোগ পেলোই না গল্প তাকে একপ্রকার জোর করে অফিসের জন্য পাঠিয়েছে। গল্প জানে এই কোম্পানির জন্য শুভ্রকে ঠিক কি পরিমাণ পরিশ্রম এবং মেধা কাটাতে হয়েছে আর সেখানে গল্প কখনোই চাইবে না যে তার কোম্পানি লসের সম্মুখীন হোক। বিশেষ করে বিষয়টা যদি তাকে কেন্দ্র করে হয় তবে গল্প সেটা মানতেই পারবে না।
শুভ্র যাওয়ার আগে গল্পকে কমপক্ষে শ’বার বলে গেছে নিজের খেয়াল রাখতে সেই সাথে তার মা’কেও বলেছে। এমনকি যাওয়ার সময় সে ড্রাইভারকেও বলেছে গাড়ি যেনো খুব সাবধানে চালায়।
শুভ্র যাওয়ার আধঘন্টার মধ্যেই জাহানারা গল্পকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলো। ডক্টর সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানায় সব রিপোর্টই নরমাল; বেবি এবং তার মা উভয়ই একদম ফিট কোনোপ্রকার কমপ্লিকেশন নেই। জাহানারা এবং গল্প উভয়ই স্বস্তির শ্বাস ফেললো। জাহানারা চেম্বার থেকে বের হয়েই গল্পকে খুশি খুশি গলায় বলল,
‘এবার পাগল টাকে ফোন করে জানা তার বউ এবং বাচ্চা দুজনেই ঠিকঠাক। তুই যখন টেস্ট করার জন্য ভিতরে গিয়েছিলি তখন আমাকে কম করে হলেও দশবার কল দিয়ে ফেলেছে এতটুকু সময়ের মধ্যে।’
গল্প হেসে ফেললো। বলল,
‘তোমার পাগল ছেলে এখন মিটিংয়ে আছে কল করলেও রিসিভ করবে না। আর সময় পেলে সে নিজেই কল করবে।’
জাহানারা গল্পকে হাত ধরে সাবধানে নিয়ে গাড়িতে তুললেন। তাদের গাড়িটা কিছুদূর যেতেই গাড়ি টা নিজ থেকেই থেমে যায়। জাহানারা চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
‘কি হয়েছে আসাদ গাড়ি থামালে কেনো?’
ড্রাইভার গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলল,
‘বোধ হয় কোনো সমস্যা হয়েছে ম্যাডাম আমি দেখছি।’
ড্রাইভার গাড়ির সামনের বনেটটা খুলে ইঞ্জিন টা চেক করতেই বুঝে গেলো বেশ ভালোই সমস্যা হয়েছে। সে দ্রুত জাহানারার কাছে এসে জানালা দিয়ে জানাল,
‘ম্যাডাম ইঞ্জিনে মনে হইতাসে সমস্যা হইছে, ম্যাকানিক লাগবো ভালা।’
জাহানারা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
‘তাহলে তো বেশ ভালোই সময় লাগবে। এতোক্ষণ কি এখানে বসে থাকতে হবে নাকি!’
গল্প জাহানারার কথা শেষ হতেই রেশ টেনে বলল,
‘মা এতোক্ষণ বসে থাকার চেয়ে চলো রিক্সা করে চলে যাই। কতোদিন রিক্সায় করে ঘুরি না।’
‘শুভ্র জানলে অনেক রেগে যাবে মা।’
গল্প ঝটপট বলল,
‘উনাকে না জানালেই তো হলো। চলো না মা যাই প্লিজ…!’
জাহানারা গল্পর জোড়াজুড়িতে হার মানতে বাধ্য হলো। তারা গাড়ি থেকে নেমে একটা রিক্সা নিলো আর ড্রাইভারকেও বলল শুভ্রকে যেনো এ ব্যাপারে কিছুই না জানায় সে।
গল্প এতোদিন পর রিক্সায় চড়তে পেরে তার মন ফুরফুরে হয়ে গেলো। শুভ্রটা তার প্যাগনেনন্সির পর থেকে একবারও রিক্সায় উঠতে দেয়নি তার ভাষ্যমতে রিক্সার ঝাঁকুনি তার জন্য নাকি ক্ষতিকর হবে। এটা কোনো কথা? গল্পর কনসিভ করার পর থেকে শুভ্র তার ছোট ছোট বিষয় গুলোতেও এতোটা পজেসিভ হয়েছে যে গল্প তার অতি কেয়ারে অতিষ্ঠ প্রায়।
এতোক্ষণ সবকিছু ঠিক থাকলেও শেষ মুহুর্তে কোথ থেকে জানি বেপরোয়া গতিতে একটা বাইক এসে তাদের ছোট্ট রিক্সার সাথে বেশ জোরেসোরে একটা ধাক্কা খেলো। গল্প আর জাহানারা দুজনের কেউই টাল সামলাতে না পেরে চলন্ত রিক্সা থেকে ছিটকে পড়ল। রিক্সাটা প্রায় আধ কাত অবস্থায় পড়ে রইলো সম্ভবত চালকও বেশ ব্যাথা পেলেন।
জাহানারা মোটামুটি ভালোই ব্যাথা পেয়েছে তার পা এবং হাঁটুর চামড়া ছিলে গেছে।
রাস্তায় লুটিয়ে পড়ার কয়েক সেকেন্ড পরই তার হুশ আসতেই তার মাথায় প্রথমে গল্পর কথা এলো। জাহানারা পাশ ফিরতেই মুখে হাত দিয়ে এক প্রকার আঁতকে উঠল। গল্প একটা ইটের টুকরোর ওপর পড়েছে আর তার চারপাশটা লাল রঙে রঞ্জিত হয়ে আছে যেটার স্রোত ক্রমশ বহমান হচ্ছে। জাহানারা একমুহূর্তের জন্য হতবুদ্ধি হয়ে গেলো। তিনি নিজের ব্যাথা ভুলে দ্রুত গল্পর কাছে গেলেন তার মাথাটা নিজের কোলে নিতেই লক্ষ্য করলেন –মাথা ফেটে গলগল করে রক্ত ছুঁইয়ে পড়ছে। তিনি ব্যাকুল ভাবে ডাকতে শুরু করলেন,
‘গল্প… এই গল্প! মা শুনতে পারছিস আমার কথা? চোখ খুল মা চোখ খুল। কিছু হবে না মা আছে তো সাথে।’
গল্প চোখ খুলল অনেক কষ্টে ঠোঁট নাড়িয়ে আধো আধো বলার চেষ্টা করে অস্পষ্ট ভাবে,
‘মা…. আ…আমার বেবিটা বা….’
গল্প তার পুরো কথাটা শেষ করতে পারল না পুরোপুরি নেতিয়ে পরল। ততক্ষণে রাস্তার আশেপাশের মানুষজন চলে এসেছে কেউ কেউ গাড়ি ঠিক করছে হসপিটালে নেওয়ার জন্য। আবার কেউ কেউ ভীষণ আফসোস করছে ওমন একটা প্যাগনেন্ট মহিলার এমন মর্মান্তিক অবস্থার জন্য।
গল্পকে বেশ কয়েকজন ধরে একটা গড়িতে তুলে দিলো হসপিটালের উদ্দেশ্যে।ততক্ষণে পুরো পিচঢালা রাস্তায় র ক্তের সমাহার!!
#চলবে
#লাভ_আফটার_ম্যারেজ
#আনাহিতা_তুলি
#পর্ব_৩২
শুভ্র তখন হসপিটালের এক করিডর থেকে দৌড়ে আরেক করিডরে যাচ্ছে রিসেশনের মহিলাটিকে হাঁপাতে হাঁপাতে অস্থির কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
‘একটু আগে একজন পেশেন্ট এসেছে প্রেগন্যান্ট নাম “তাহিয়াত আহমেদ গল্প” ওর কেবিন কোন ফ্লোরে?’
রিসিপশনের মহিলাটি কম্পিউটারে দেখে বলল,
‘ও আচ্ছা আপনি সেই পেশেন্টর বাড়ির লোক বুঝি; কি হয় আপনার?’
শুভ্র তড়িৎ গতিতে বলে,
‘ওয়াইফ হয় আমার, ওয়াইফ। ওর সাথে আরেকজন বয়স্কা মহিলাও ছিলো আমার মা।’
‘আপনার মা আপাতত ঠিক আছে কিন্তু আপনার ওয়াইফের অপারেশন চলছে ফিফথ ফ্লোরে –উনার সিচুয়েশন ক্রিটিকাল।’
শুভ্রর দুনিয়া দুলে উঠলো। এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না দৌড়ে গেলো ফিফথ ফ্লোরে। অপারেশন থিয়েটারের সামনে জাহানারা তখন একটা বেঞ্চের চেয়ারে বসে চোখের পানি ফেলছে। শুভ্র দৌড়ে মায়ের সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ে। জাহানারা ছেলেকে দেখে অপরাধবোধে মূর্ছা গেলেন। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
‘বাবা আমি…আমি আমার কথা রাখতে পারিনি তোমার স্ত্রী এবং সন্তান কারও হেফাজত করতে পারিনি। আমি তোমাকে কোন মুখে কি বলব কিছুই বুঝতে পারছি না।’
জাহানারা চোখের পানি ফেলতে ফেলতে হাহুতাশ করে গেলেন। শুভ্র মায়ের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে চুমু খেলো তারপর তার মাথাটা উনার কোলে রেখে বলল,
‘ইটস এ্যা এক্সিডেন্ট আম্মু। নিজেকে ব্লেইম করা বন্ধ কর। যেটা হওয়ার ছিলো তা হতোই যদি তোমার জায়গায় আমিও থাকতাম তবুও হয়তো হতো! এখন বলো তুমি ঠিক আছো?’
জাহানারা মাথা হ্যাঁ বোধক মাথা দুলাল। কিন্তু পরপরই ফুঁপিয়ে উঠলো,
‘কিন্তু….গল্প মা ঠিক নেই বাবা। এক্সিডেন্টের পরপরই ও জ্ঞান হারিয়েছে আর… আর অনেক র…র ক্ত ’
জাহানারা তার কান্নার দমকে পুরো কথাটা শেষ করতে পারলেন না। তখনই করিডরে দু’জোড়া বুটের দপদপ শব্দ ভেসে আসে; শুভ্র মাথা তুলে তাকাতেই দেখে শাহিনুজ্জামান দ্রুত পায়ে এদিকেই আসছে; তার পিছনে আবার শাওন ও আছে। শাহিনুজ্জামান হাঁপাতে হাঁপাতে বলতে লাগলেন,
‘কিভাবে হয়েছে এসব জাহান? এতো বড়ো একটা এক্সিডেন্ট কিভাবে হলো?’
জাহানারা নত মুখে সবটা বলতেই শাহিনুজ্জামান ও শাওন হতবাক হয়ে চেয়ে রইলো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে শাহিনুজ্জামান রাশভারী গলায় বলল,
‘কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না তোমরা কি গাড়ি ঠিক হওয়া পর্যন্ত একটু অপেক্ষা করতে পারছিলে না? রিক্সায় কেনো উঠতে গেলে!’
‘বাবা এখন কি এসব কথা বলা খুব জরুরি? আমরা তো পরেও এটা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলতে পারব। তাছাড়া যা হয়ে গেছে সেটা তো আর ফেরানো সম্ভব না। এখন দোয়া কর ভাবি আর বাচ্চা দুজনেই যেনো সুস্থ থাকে।’
শাহিনুজ্জামান থেমে গেলেন শাওনের কথা শুনে। শুভ্র অস্থির চিত্তে অপারেশন থিয়েটারের সামনে পায়চারী করছে। আজ বোধ হয় ঘড়ির কাটাও তার জায়গা থেকে নড়ছে না। তাদের অপেক্ষায় অবসান ঘটিয়ে প্রায় দেড় ঘন্টা পর ওটি থেকে একজন নার্স বেড়িয়ে এলো। তার কোলে সাদা তোয়ালে তে জড়ানো একটা ছোট্ট পুতুল –শুভ্র স্তব্ধ নয়নে সেদিকে তাকিয়ে রইলো। বাচ্চা টা থেকে থেকেই অল্প-বিস্তর কান্না করছে। শুভ্র দ্রুত পায়ে সেদিকে এগিয়ে যেতেই নার্সটি মিষ্টি হেসে বলল,
‘কংগ্রাচুলেশনস স্যার, আপনার মেয়ে হয়েছে।’
শুভ্র কাঁপা কাঁপা হাতে সাদা তোয়ালে তে মোড়ানো পুতুলের মতো দেখতে তারই অংশকে প্রথমবার কোলে নিলো। এবং পরপরই অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘আমার ওয়াইফ? সে…সে কেমন আছে? ঠিক আছে তো?’
এই পর্যায়ে নার্সের চেহারা থেকে হাসি উবে গেলো। কোনোমতে বললো,
‘ভিতর থেকে ডক্টর আসছে আপনি ভালো হয় উনার থেকেই জানুন।’
ততক্ষণে শুভ্রর হৃদপিণ্ডটা বোধ হয় গলার কাছে এসে ঠেকলো। নার্স এমন করে তাকে কেনো বলল? গল্প কি ভালো নেই তবে? তার আর কিছু ভাবার আগেই ডক্টর ওটি থেকে বের হয়ে আসল। শুভ্র দ্রুত বেগে সেদিকে ছুটলো। ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘ডক্টর.. আমার ওয়াইফ? সে কেমন আছে? ঠিক আছে তো?’
ডক্টর কোনো ভনিতা না করেই বলল,
‘মি. আহমেদ আপনার ওয়াইফ এর কন্ডিশন ভিষণ ক্রিটিকাল। প্রেগন্যান্সির এই অবস্থায় এমন একটা এক্সিডেন্ট তারউপর উনার মাথায়ও বেশ ভালোই আঘাত পেয়েছে। তাছাড়া উনার এতো বেশি পরিমাণ ব্লাড লস হয়েছে যে উনার অবস্থা সত্যিই আশঙ্কাজনক। আমরা আমাদের বেস্ট ট্রাই করবো কিন্তু এই মুহূর্তে উনার আরও এক ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন। উনার ব্লাডগ্রুপ এ-বি নেগেটিভ যেটা খুবই রেয়ার আমাদের কাছে একটাই ছিলো যেটা উনাকে দেওয়া হয়েছে; কিন্তু উনার আরও ব্লাডের প্রয়োজন যা আমাদের কাছে আপাতত নেই। প্লিজ আগে ব্লাডের এরেঞ্জ করুন।’
শুভ্র যেনো শূন্যে ভাসতে থাকলো সে নিজের হুঁশ খুইয়ে ওখানেই তার মেয়েকে কোলে ধরে রাখা অবস্থাতেই হাঁটু মুড়ে নিচে ধপাস করে লুটিয়ে পড়লো। সামনে থাকা ডাক্তারও আকস্মিক ঘটনায় দারুণ চমকে উঠলেন তিনি শুভ্রর কোলে থাকা বাচ্চাটিকে আগে আগলে নিলেন। জাহানারা দৌড়ে নাতিকে কোলে নিলেন। শাওন তার ভাইয়ের পাশে বসে বলতে লাগলো,
‘ভাইয়া তুই ঠিক আছিস? নিজেকে সামলা প্লিজ!’
ততক্ষণে জাহানারাও ছেলের পাশে বসলেন আর সদ্য জন্মানো ছোট্ট প্রাণ টিকে দিলেন শাহিনুজ্জামানের কোলে। শুভ্র হুট করেই মা’কে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে ফেললো। জাহানারা ভীষণ অবাক হলেন কেননা শুভ্রর বুঝ হওয়ার পর থেকে তিনি তাকে এভাবে কখনো কান্না করতে দেখেনি। শুভ্র কান্না জড়ানো গলায় বলতে লাগলো,
‘আম্মু….আম্মু ডক্টর এটা কি বলল! তাহিয়াত এতোটা ক্রিটিকাল সিচুয়েশনে কিকরে পৌঁছাল আম্মু? ওকে ছাড়া তো তোমার ছেলের সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায় আম্মু। আমি এখন কি করব আম্মু? আমার তো সবকিছুই শূন্য লাগছে এখন –মনে হচ্ছে কেউ আমার শ্বাসনালী চেপে ধরেছে।’
জাহানারা ছেলের এমন কান্না দেখে নিজেও আরেক দফা কেঁদে উঠলেন। পরে নিজেকে শান্ত করে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
‘একদম চিন্তা করো না বাবা। ডাক্তার তো বলেছে তারা ট্রাই করছে। এখন তুমি শুধু দোয়া করো। ইনশাআল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে।’
তাদের কথার মধ্যে শাওন এবার চিন্তিত গলায় বলল,
‘ভাইয়া ভাবির তো ব্লাড প্রয়োজন, ডক্টর তো তাই বলে গেলো। আমাদের জানাশোনার মধ্যে তো কারও এ-বি নেগেটিভ ব্লাড আছে বলে আমার মনে পড়ছে না। আচ্ছা দাঁড়া আমি দেখছি।’
শুভ্রর এবার টনক নড়ল। চট করে উঠে দাঁড়িয়ে গেলো। ঠিক তখুনি দেখা গেলো হন্তদন্ত হয়ে আরাফ, ফাহিম আর কেয়া আসছে। তারা এসে সবকিছু শুনে পুরো হতভম্ব হয়ে গেলো। তাদের মধ্যে ফাহিম হঠাৎই বলে উঠলো,
‘শুভ্র! ব্লাডের এরেঞ্জ হয়ে গেছে; আরে আমাদের সাব্বিরের তো এ-বি নেগেটিভ ব্লাডগ্রুপ। মনে নেই তর?’
শুভ্রর যেনো হাঠাৎ করেই ওই কথার খেয়াল আসলো। ফাহিম ফোন বের করতে করতে বলল,
‘এক মিনিট, আমি এখনই ওকে ফোন করে সব জানাচ্ছি।’
সবাই তখন এক মুহুর্তের জন্য স্বস্তির শ্বাস ফেললো। কিন্তু অস্থিরতা কমল না কারোরই। সবাই নিরব হয়ে এলো মুহুর্তেই।
__________________________
শুভ্র একটা সময় হসপিটালে আসতেই চাইত না তার অন্যতম একটা কারন ছিলো হসপিটালের ভিতর থাকা বিদঘুটে ফিনাইলের গন্ধ। কিন্তু গত তিন ধরে সে একাধারে এই হসপিটালে কাটাচ্ছে; চাতক পাখির মতো একবার গল্পর কেবিনে তো একবার ডাক্তারের কেবিনে ছুটছে। ছুটছে সেই নারীটির জন্য –যে তার ঘুম হারাম করে দিয়ে নিজে নিশ্চিন্তে হুঁশ খুইয়ে চোখ বন্ধ করে আইসিউতে শুয়ে আছে। শুভ্রর এই প্রথম গল্পকে নিষ্ঠুর মনে হলো বড্ড নিষ্ঠুর যে কিনা তার কথা কিংবা তাদের মেয়ের কথা একটুও ভাবছে না। নিজেকে বড্ড এলোমেলো লাগছে তার কাছে বড্ড অসহায়! এতোটা অসহায় তার দীর্ঘ সাতাশ বছরের জীবনে কখনো মনে হয়নি। গত তিনদিন ধরে সে পানি ছাড়া কিছুই খেতে পারে নি; হুট করেই যেনো তার জীবনের সমস্ত ব্যাস্ততা তাকে ছাড়িয়ে গেছে যার সমাপ্তি টা হয়েছে এই আইসিইউর কেবিনের সামনে। এখনো সে দাঁড়িয়ে আছে আইসিইউর দরজার বাহিরে –তার মরুভূমির ন্যায় চাতক চোখ গুলো দরজার কাচ গলিয়ে নিবদ্ধ ভিতরে থাকা বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি দ্বারা বেষ্টিত তারই অর্ধাঙ্গিনীর দিকে। সে এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা নিরন্তর তার চোখের তৃষ্ণা মিটায় যেনো সে শত জনমের তৃষ্ণার্থ!
হঠাৎ কাঁধে কারও হাতের অস্তিত্ব টের পেতেই তার ধ্যান ভাঙ্গে। পিছনে ঘুরতেই দেখে ইমতিয়াজ রহমান দাঁড়িয়ে আছে। মেয়ের এমতাবস্থায় এক্সিডেন্টের খবর শুনে তারা সেদিনই ঢাকা আসে। মেয়ের এমন ক্রিটিকাল সিচুয়েশন দেখে উনারা হতভম্ব হতেও যেনো ভুলে গেছিল। যে মেয়ের গায়ে একটা ফুলের টোকাও লাগতে দেননি সেই মেয়ের এমন করুন অবস্থা দেখে তাদের দুনিয়া দুলে উঠেছিলো।
‘বাবা…আপনি বলতে পারেন ও কখন নিজের চোখ খুলবে? আর কতো আমাদের ধৈর্য্যর পরীক্ষা নিবে? সে কি এভাবে এতোদিন ধরে শুয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত অনুভব করছে না? সবশেষে ও কি এটা বুঝতে পারছে না যে তাকে আমার আর আমার মেয়ের ঠিক কতটা প্রয়োজন!’
শুভ্র কম্পনরত গলায় কথা গুলো বলে একটু থামে। তারপর আবারও কেমন জানি অবুঝ গলায় অভিযোগ ঝারল,
‘বাবা আপনার মেয়ের কি একটুও মায়া হচ্ছে না আমাদের প্রতি! আমার কথা নাহয় বাদই দিলাম কিন্তু আমার মেয়েটা? বাবা আমার মেয়েটা জন্মের এতো ঘন্টা পরও তার মা’র আদরটুকুও পেলো না আর না পেলো ভালো করে বাবার আদরটুকুও! আমি যখনই ওই অবুঝ বাচ্চাটার সামনে যাই আমার…আমার নিজেকে ভীষণ হেল্পলেস লাগে; ভীষণ অপরাধবোধও হয় যে এটা ভেবে –আমি তার মা’র ঠিকঠাক খেয়াল রাখতে পারিনি! ওই বাচ্চাটা যখন খিদের চোটে কান্না করে তখন…তখন আমার মনে হয় কেউ যেনো আমার কলিজা ছিড়ে নিচ্ছে; বাবা হিসেবে তখন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট মনে হয়। বাবা… আপনি একটু আপনার মেয়েকে বলুন না এবার যেনো অন্তত চোখ টা খুলে। আমি আর পারছি না আমার…আমার নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে আজকাল।’
শেষ মুহুর্তে শুভ্র দু’হাতে মুখ ডেকে একপ্রকার ঝরঝর করে কেঁদে উঠলো। ইমতিয়াজ রহমান কথা বলার খেই হারালেন। একদিকে যেমন তার বুক ভার হয়ে এলো; ঠিক তেমনি ভাবে তার বুকে কোথায় যেন একটা প্রশান্তির অনুভবও হলো সম্ভবত তার মেয়ের প্রতি স্বামীর এমন নিখাদ ভালোবাসা নিজ চোখে দেখাই ছিলো হয়তো তার প্রধান কারণ। তার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।তিনি তা এড়িয়ে শুভ্রর কাঁধে ভরসার হাত রেখে আস্বস্ত করলেন,
‘শান্ত হও বাবা, শান্ত হও। ধৈর্য ধরো সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। জানো তো আল্লাহ কতো দয়ালু উনার দয়া থেকে কে-ই বা কখন বঞ্চিত হয়েছে! ধরে নাও এটা আল্লাহ তায়ালার তার বান্দার জন্য একটা পরীক্ষা।’
ইমতিয়াজ রহমান একটু দম নিয়ে বললেন,
‘গত তিন দিন পানি ছাড়া তো তুমি কিছুই খাচ্ছো না এবার তো তুমি অসুস্থ হয়ে পড়বে। এখন চলো কিছু খাবে আর আমি কোনো না শুনব না।’
শুভ্রর কোনো বারন ইমতিয়াজ শুনল না। তিনদিন পর সে দুই লোকমা ভাত খেয়েছে তাও অনেক কষ্টে সেটা গিলতে পেরেছে। এর বেশি সে তখন আর কিছুই খেতে পারেনি।
______________________________
তখন মধ্যরাত সারাদিনের ধকল আর দুশ্চিন্তায় সবাই তখন ঘুমে ঢলে পড়ছিল। হসপিটালে তখন শাওন, জাহানারা আর নিলুফার ছিলো। তারা সবাই বাহিরে বসে ছিলো অজানা এক উদ্বেগ আর চাপা আতঙ্ক নিয়ে। কেননা আজ সন্ধ্যায় গল্পর শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যা হঠাৎ করেই বেড়ে যায় এই নিয়ে সবার মধ্যেই তখন থেকে নিরব এক আতঙ্ক বয়ে চলছে। এখন অবশ্য তার অবস্থা কিছু টা স্ট্যাবল।
পুরো হসপিটাল যখন রাতের নিস্তব্ধতায় ঢাকা পড়েছে তখনই এক কেবিন থেকে কারও চাপা কান্নার মৃদু মৃদু আওয়াজ আসছিলো।
শুভ্র এমনেতে ফরজ নামাজ পড়লেও জীবনে কখনও তাহাজ্জুদের নামাজ পড়া হয়ে উঠেনি। এটাই বোধ হয় তার সাতাশ বছরের জীবনে প্রথম মধ্যরাতে তাহাজ্জুদের সেজদা ছিলো। যে কিনা করুন ভাবে আল্লাহ তায়ালার কাছে একনিষ্ঠা ভাবে প্রার্থনা করে যাচ্ছিল। আর তার এই প্রর্থনায় ছিলো চোখের নোনা জলের বারিধারা। নিস্তব্ধ কেবিনে তার করা দোয়া গুলো বড্ড করুন শুনাল –‘ইয়া মাবুদ আপনি তো সেই পরম দয়ালু যার দয়ার শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। আমি জানি, আমি আপনার উত্তম বান্দাদের মধ্যে কেউ নই আপনি অবশ্যই আমার আমলের হিসাব নিবেন। কিন্তু… আপনি আমাকে এভাবে শাস্তি দিয়েন না। যে নারীকে আমার জীবনে পাঠিয়েছেন অর্ধাঙ্গিনী করে এক বিশাল নিয়ামত হিসেবে –তাকে এভাবে আমার থেকে কেড়ে নিয়েন না মাবুদ। যাকে আমার জীবনে পাঠিয়ে আমার জীবন ফুলে ফুলে সজ্জিত করেছেন তাকে কেড়ে নিয়ে আমাকে কাঁটার আঘাতে জর্জরিত করবেন না মাবুদ।’
শুভ্র তার মোনাজাতে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লো। এটাই তার জীবনের প্রথম সেই মোনাজাত ছিলো যেখানে সে প্রথমবারের মতো এতো অশ্রুর বারিধারা জড়িয়েছে। একটা সময় সে সেজদায় লুটিয়ে পড়লো কান্নার তোপে। মধ্যরাতে তার সেই কান্নার আওয়াজ টুকু তখন বড্ড করুন শুনাল।
ফজরের নামাজের পর জাহানারা শুভ্রর মেয়েকে নিয়ে কেবিনে প্রবেশ করলো। সেখানে ডুকতেই দেখে শুভ্র জানালার বাহিরে দৃষ্টি গলিয়ে উদাস চোখে তাকিয়ে আছে। কারও পায়ের আওয়াজ শুনে সে পিছনে ঘুরতেই মা’কে দেখতে পেলো যার কোলে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে তারই একটা অংশ তার মেয়ে।
‘শুভ্র! বাবা তুমি কি তোমার সন্তানকে আর একবারও কোলে নিবে না? সে তার মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এখন কি তুমি তাকে বাবার স্নেহ থেকেও বঞ্চিত করবে? গল্প যখন জ্ঞান ফিরে জানতে পারবে যে তুমি তোমাদের সন্তানকে সেই আদর স্নেহ থেকে বঞ্চিত করেছো যেটার সে হকদার ছিলো; তখন তাকে কি জবাব দিবে!’
শুভ্রর চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। কাঁপা হাতে নিজের মেয়েকে দ্বিতীয়বারের মতো কোলে নিলো। বুকের সাথে মিশিয়ে চুমুতে চুমুতে তার ছোট্ট শরীরটা ভরিয়ে দিলো। অতঃপর ভীষণ কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
‘বাবা অনেক সরি প্রিন্সেস! অনেক সরি। বাবা তোমার আগমনে নিজের খুশি জাহির করতে পারছে না; তোমাকে প্রাণ খুলে আদরে আদরে ভরিয়ে দিতে পারছে না। কিভাবে করবে মা! তুমি হয়তো জানো না যে তোমার বাবা তোমার মায়ের সাথে কিছু সময় কথা না বলতে পারলেই কেমন ছটফট করে। আর সেখানে তো তোমার বাবা গত বাহাত্তর ঘন্টা ধরে তার সাথে কোনো প্রকার কথা বলতে পারছে আর না সে তাকে এক মুহুর্তের জন্য ছুঁতে পারছে। ক্যান ইউ ইমাজিন প্রিন্সেস –যার সাথে আমি কিছু সময়ই কথা না বলে থাকতে পারি না সেখানে লাস্ট সেভেন্টি টু আওয়ারস তার নিশ্বাসের গতিও আমি শুনতে পাচ্ছি না।’
শুভ্র থামে তার চোখ ঝাপসা গলা ধরে আসছে। সাদা তোয়ালে তে মোড়ানো তুলোর মতো নরম ছোট্ট পুতুলটার কপালে স্নেহ ভরে চুমু খেলো।
‘প্রিন্সেস আমার মা, তোমার বাবার জন্য একটা ফেভার করবে? তুমি কি তোমার আম্মুকে একটু ডাক দিবে মা! তুমি তো কথা বলতে পারবে না কিন্তু কান্না করতে পারবে আর সেটাই হবে তোমার তরফ থেকে তোমার মায়ের জন্য প্রথম ডাক। সন্তানের কান্না তো আর কোনো মা উপেক্ষা করতে পারে না তাই না মা! এই প্রথম হয়তো কোনো বাবা তার সন্তানকে কান্না করতে আবদার করছে মা। তুমি কি রাগ করেছো বাবার এই অন্যায় আবদারের প্রতি? কি করবো বলো? যখন তোমার মায়ের প্রসঙ্গ আসে তখন তোমার বাবা যে খুব… খুব হেল্পলেস হয়ে পড়ে মা! তার জন্য বাবা আবারও সরি, হু!’
#চলবে
