#প্রেমচিত্র[১]
লেখিকা:ইশা আহমেদ
তুশি যখন প্রথম প্রেমে পরলো, তখন তার বয়স সবে মাত্র সতেরো! এক বখাটে, বাউণ্ডুলে, বেপরোয়া স্বভাবের পুরুষের প্রেমে পরলো তুশি। লোকটা তুশির থেকে সর্বোচ্চ গেলে বছর দশেকের বড়। গাল ভর্তি দাঁড়ি, বড় বড় এলোমেলো চুল, চোখে রোদচশমা; ব্যাস! এটুকুতেই তুশি কুপোকাত। এমন অগোছালো, বেপরোয়া লোকের প্রেমে পড়েছে জানলে, লোকে তুশিকে পাগল বলবে। এতে অবশ্য তুশির কোনো সমস্যা নেই। তুশির সমস্যা অন্য জায়গাতে। লোকটা তুশিকে অকারণেই ইগনোর করে। এখন অব্দি তুশি সে কারণ উদ্ধার করতে পারি নি, ভবিষ্যৎেও পারবে কি না তা নিয়ে তুশির বেশ সন্দেহ। তুশি যখন কলেজ পথে যায় তখন মোড়ের চায়ের দোকানে আড্ডায় মশগুল থাকে বখাটে ছেলেটা। তুশি আঁড়চোখে তাকিয়ে দেখে। ছেলেটা ফিরে তাকায় না কখনো।
তুশির বড্ড ইচ্ছে করে চোখে চোখ রেখে, কলার চেপে বলতে—‘এই যে মিস্টার পার্থ শেখ, আপনার সমস্যাটা কি? আমার দিকে একটু তাকালে কি আপনার খুব বেশি ক্ষতি হয়?’
তুশি জানে এটুকু বলার সাহস তার নেই। বলতেও পারবে না। মনে মনে কত কিছু বলি আমরা সব কি আর মুখে প্রকাশ করতে পারি?
তুশি আর ভাবে না। প্রচন্ড গরমে অতিষ্ঠ হয়ে কলেজ ব্যাগ কাঁধে চেপে কলেজ থেকে ফিরছে তুশি। সূর্য তখন মাথার উপর, কপট তেজ দেখিয়ে চলেছে! ফুটপাত দিয়ে হেঁটে আসছে, সাদা হিজাবটা ঘামে ভিজে জুবুথুবু। চিৎকার,চেঁচামেচির আওয়াজ শুনে চমকে উঠলো তুশি, চলন্ত পা জোড়া থেমে গেলো। ঘাড় কাত করে তাকাতেই হতভম্ব হলো পার্থকে দেখে। ছেলেটা প্রচন্ড রেগে আছে, যা তার মুখের আদলে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। পার্থ তার সম্মুখে দাঁড়ানো ছেলেটাকে ধমকাচ্ছে। হঠাৎই পাশ ফিরলো, চোখে চোখ পরলো। তুশি হকচকিয়ে উঠলো। চোখ ঘুরিয়ে সোজা হাঁটা ধরেছে মেয়েটা। পেছন থেকে চিৎকার, চেঁচামেচির আওয়াজ পেলো না আর। দ্রুত পায়ে বাড়ির সামনে এসে হাঁপ ছাড়ে বাঁচলো মেয়েটা। পার্থ নামক লোকটাকে দেখলেই তুশির হার্টবিট মিস হয়!
-“তুশিপু এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেনো এভাবে স্টাচুর মতো?”
তুশি বেমালুম ভুলতে বসেছিলো সে বাড়ি নয় রাস্তাতে। টিনটিনের কথায় স্তম্ভির ফিরলো মেয়েটার। বখাটে ছেলেটা ইদানীং তুশিকে বড্ড জ্বালাচ্ছে, দূরে থেকেও কীভাবে জ্বালিয়ে মারছে। তুশি আপাতত বখাটে ছেলেটাকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললো। টিনটিন মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। তুশি টিনটিনের গাল টেনে দিয়ে বলল,
-“কলেজ থেকে হেঁটে এসেছি রে টিনটিন, খুব কষ্ট হয়ে গিয়েছে রে। এই রোদ্দুরে হেঁটে আসা দুষ্কর”
তুশি টিনটিনকে কোলে তুলল। টিনটিনের বয়স মাত্র পাঁচ, তবুও ভীষণ পাকা। টিনটিনের মাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
-“কাকি আমি টিনটিনকে নিয়ে গেলাম। তুমি পরে নিয়ে এসো”
‘নীলাচল’—তিনতলা বাড়িটির নাম! এমন অদ্ভুত নাম রাখার কারণ তুশির দাদি। তিনি বয়সকালে স্বামীর সাথে বান্দরবানে ঘুরতে গিয়েছিলেন। নীলাচল জায়গাটা তার খুবই পছন্দ হয়েছিলো, সেখান থেকে বাড়ির নামকরণ করা হয় ‘নীলাচল’। বাড়িটা বেশ পুরোনো আমলের হলেও তুশির বাপ-চাচা বাড়িটির এতোটাই যত্ন করেন, প্রথম দেখাতে কেউ বুঝতেই পারবে না বাড়িটা পুরোনো আমলের। তুশির অবশ্য নীলাচল নামটা পছন্দ নয়। তার মতে, বাড়িটার নাম নীলাচল না দিয়ে অশান্তির কারখানা দেওয়া উচিত ছিলো। চিৎকার, চেঁচামেচি নিত্যদিনের সঙ্গী। বাড়িতে মুরব্বি বলতে তুশির দাদি। তার দাপট আছে বাড়িতে।
বাড়িতে প্রবেশ করতেই তুশির কানে ভেসে এলো মায়ের কর্কশ গলায় আওয়াজ। তুশি পাত্তা দিলো না, এসব নিত্য দিনের কাজ। প্রতিদিন এমন চলে তাদের নীলাচল নামক অশান্তির কারখানায়! তুশি টিনটিন মেয়েটাকে নিয়ে নিজের রুমে আসলো। কাঁধের ব্যাগটা এক হাতে রেখে টিনটিনকে বিছানায় বসালো। টিনটিনকে বসিয়ে হিজাবের পিন খুললো। ঢিলেঢালা জামা নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো ফ্রেশ হতে। মিনিট দশেক পর তুশি বের হলো। ততক্ষণে টিনটিন হাওয়া, রুমে নেই। তুশি ব্যস্ত পায়ে বারান্দায় ছুটলো। খালি বারান্দা দেখে, সোজা রুম থেকে বের হয়ে গেলো।
মেঝো আপার রুমের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় টিনটিনের গলার আওয়াজ পেলো। পা থেমে গেলো। দরজায় নক করলো, চাঁদনী ভেতর থেকে বলল—‘দরজা খোলা’। তুশি ভেতরে প্রবেশ করে দেখলো এক আশ্চর্য ঘটনা। টিনটিন মিমির সাথে বসে খেলছে। মিমি, মেয়েটা ছোট চাচার বড় মেয়ে। এবার ক্লাস সিক্সে পড়ে। টিনটিনের সাথে তার মিল হয় না কখনোই। আর আজ মেয়েটা টিনটিনকে নিয়ে খেলছে! এ ও ভাবা যায়? চাঁদনী আপা তুশিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলেন,
-“কি রে তুশি, এভাবে ওদের হা করে গিলছিস কেনো?”
তুশি বিছানায় বসতে বসতে বলল,
-“মেঝো আপা তুমিই বলো? সূর্য আজ কোন দিকে উঠেছে! মিমি সাহেবা আজ টিনটিনের সাথে খেলছে। এই দৃশ্য ও দেখা যায়?”
চাঁদনী আপা শব্দ করে হাসলো, তুশি হাসলো নিঃশব্দে। মিমি চোখ ছোটো ছোটো করে তাকালো। টিনটিন তখনও খেলছে। তুশিদের কথার মাঝে ভাঁটা পরলো, বসার ঘর থেকে ভেসে আসছে তুমুল ঝগড়ার শব্দ। চাঁদনী আপা হন্তদন্ত হয়ে ছুট লাগালো সেদিকে। তুশির বুঝে উঠতে বেশ সময় লাগলো। তুশিও মিনিট দুই পেরোতে ছুটলো বসার ঘরে। আজও ছোট চাচির সাথে ঝগড়া হইছে তুশির মায়ের। বড় চাচি রান্নায় ব্যস্ত, এদিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। এগুলো নৃত্য দিনের রুটিন বলা চলে। তুশির বাবা শামসুল মির্জা, সালাউদ্দিন মির্জা আর সৈয়দ মির্জা তিন ভাই মিলে দোতলার পুরোটা জুড়ে থাকছে।
ছোট চাচির আবার ভীষণ রাগ, মায়ের ও কম না। বড় চাচি রাহেলা খানম ভীষণ শান্ত ধাঁচের মানুষ। তিনি অবশ্য এসবে নেই।
তিনি রান্না বান্না করেন, অবসর সময়টুকু কুরআন শরীফ পরে কাটান। তুশির মা তাহেরা খাতুন মোটামুটি মেজাজের মানুষ। তিনি আর ছোট চাচি সাবিনা মিলে বাকি কাজ গুলো করেন। এই নিয়েই নিত্য দিনের ঝগড়া। যদিও দিন শেষে মায়ের আর ছোট চাচির খুব ভাব। সব ঝগড়া মিটমাট হয় ছাদের ছোট চৌকিতে। তুশিদের ছাদে ছোট্ট একটা চৌকি আছে। বিকাল হলে সেখানে বসে মাছের বাজার তুশির মতে।
আজ ঝামেলাটা হয়েছে ছোট চাচিকে নিয়ে। ছোট চাচি ঘর মুছতে গিয়ে পানি ফেলে রেখেছে। সেখানেই আরেকটু হলে তাহেরা পা পিছলে পরে যেতেন। এই নিয়েই চেঁচামেচি শুরু করেছেন তিনি। ছোট চাচিও কম কিসে তিনিও পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়ায় মেতে উঠেছেন। চাঁদনী আপা বহু কষ্টে ঝগড়া থামালো। দু’জনকে নিজেদের রুমে পাঠিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাচলো।
–
সেদিন সন্ধ্যায় তুশি যখন কোচিং থেকে ফিরছিলো, মাঝরাস্তায় বৃষ্টি নামে। তুশি বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে টং দোকানের ছাউনিতে আশ্রয় নেই। সেখানেই উপস্থিত ছিলো পার্থ। তুশি অবশ্য ভেতরে তাকিয়ে দেখেনি, এক কোণায় জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। অস্বস্তিতে মেয়েটা গুটিয়ে আছে। তুশি পার্থকে না দেখলেও পার্থ ঠিকই তুশিকে খেয়াল করেছিলো। আধঘন্টা কাটতেও বৃষ্টি থামেনি। তার মাঝে কারেন্ট চলে গিয়েছে। এর ভেতর তুশির মাঝে আতঙ্ক আরো বাড়ে। তুশি ঠিক করে বসলো এই বৃষ্টির মাঝেই হাঁটা ধরবে। ছাউনি থেকে বের হবে তখনই পেছন থেকে চেনা পরিচিত সেই গুরু গম্ভীর গলা কানে আসতেই চলন্ত পা জোড়া থেমে গেলো। থমকানো চোখে তাকিয়ে রইলো।
-“এই মেয়ে এই ছাতাটা নিয়ে যাও।”
ছয় শব্দে উচ্চারণ করা কথাটা বোধ হয় তুশির কানে না বুকে লেগেছে। বুকে ধিমধিম শব্দ এই বুঝি পার্থ শুনে ফেলল। অন্ধকারের মাঝে মোমবাতির আলোতে ঝাপসা চোখে তুশি দেখতে পেলো একজোড়া শীতল গম্ভীর চোখ! তুশিকে এমন অদ্ভুত আচরণ খেয়াল করলো পার্থ। আবারও আগের ন্যায় শুধাল,
-“নাও?”
তুশি কাঁপা কাঁপা হাতে ছাতাটা নিলো। ঢুলুমুলু পায়ে ওই বর্ষায় বের হলো মেয়েটা। চোখে মুখে তখনও বিষ্ময়! নিজের সাথে কি হলো এই মাত্র এটুকু বোধগম্য হতে তার বেশ কিছুটা সময় লাগলো। তুশি ধীর পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। বৃষ্টির তেজ বাড়ছে। আলগা হাতে মাথার ছাতাটা ধরা! মাঝে মাঝে মৃদু হাওয়ায় দুলে উঠছে। বৃষ্টির ঝাপটা তুশির হিজাবের কণা ভিজিয়ে দিচ্ছে। মিনিট দশ পেরোতেই তুশি বাড়ি পৌঁছালো। তুশি মেয়েটা জানতেও পারলো না, বৃষ্টিতে ভিজে তার পিছু পিছু কেউ একজন বাড়ি অব্দি আসলো। চাঁদনী আপা দরজা খুলে তুশিকে দেখে বলে,
-“আর বলিস না বাড়িতে ঝগড়া লেগেছে। ছোট চাচি দাদির কাছে গিয়ে বিচার দিয়েছে, কেঁদে কেঁদে।”
#চলবে
