#প্রেমচিত্র [৯]
লেখিকা:ইশা আহমেদ
-“কাকে আশা করেছিলে?”
-“আপনি, আপনি কেনো আমাকে বিয়ে করলেন?”
-“তোমাকে আমার খুব পছন্দ তাই”
-“এই ক্যাবলাকান্ত আপনার সাহস কোথা থেকে এলো, আমায় বিয়ে করার?
তেহজিব হাসলো। ঝড়ের গতিতে এসে তুশিকে ঝাপটে ধরলো। তুশি টাল সামলাতে না পেরে তেহজিবের কলার খামচে ধরলো। তুশির চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ তেহজিবের খুব ভালো লাগলো। তুশি নিজেকে ছাড়ানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালালো। অথচ তৃষ্ণার্ত প্রেমিক প্রেমিকাকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখে চললো। মিনিট পেরেলো, কত মিনিট? খেয়াল নেই হয়তো দু’জনার কারো। তুশি একটা সময় ক্লান্ত হয়ে মাথা এলিয়ে দিলো তেহজিবের প্রশ্বস্ত বুকে। তেহজিব তুশিকে কোলে তুলে নিয়ে বারান্দায় এসে বসলো। নববধূ রূপি প্রেমিকার এই রূপ অকল্পনীয় সুন্দর।
-“পার্থ, পার্থ কোথায় আপনি। আপনাকে আমার খুব প্রয়োজন”
তেহজিব হাসলো তুশির বিরবির করে আওড়ানো শব্দগুলো শুনে। মেয়েটা অসম্ভব ভালোবাসে তাকে। এটুকুই যথেষ্ট। বুকের সাথে আঁটসাঁট করে চেপে ধরলো আদুরে বিড়াল ছানাটাকে। তুশি ততক্ষণে ঘুমিয়ে পরেছে। তেহজিব আদুরে ছানাটাকে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলো। মুখের উপর পরে থাকা চুলগুলো সযত্নে কানের পেছনে গুঁজে দিলো। আলতো হাতে গহনা গুলো খুলে দিলো। কোলবালিশ দুটো দুই পাশে রেখে ফ্রেশ হতে গেলো তেহজিব।
–
সূর্যের তেজবহ আলো চোখে পরতেই ঘুম ভাঙলো তুশির। চোখ খুলতেই নিজের একদম কাছে আবিষ্কার করলো ক্যাবলাকান্ত লোকটাকে। তেহজিব তুশিকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে। তুশি নিজেকে ছাড়াতে চাইলো। তুশির ছটফটানিতে তেহজিবের ঘুম ভেঙে গেলো। তেহজিব বেচারা গত রাতে বউকে দেখে দেখেই সময় পার করেছে। তেহজিবের বাঁধন হালকা হতেই তুশি তেজ দেখিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো।
-“আপনি আমায় জড়িয়ে ধরেছেন কেনো?”
-“তুমি তো আমার বউ, তাই ধরেছি”
-“এই ক্যাবলাক্যান্ত আমাকে একদম ছুঁবেন না, মেরে ফেলবো”
তেহজিব মাথা নাড়ালো। তুশিকে আর ঘাটতে চাইলো না। নিজে উঠেই তার আদুরে বউটার জন্য নাস্তা তৈরি করলো। অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে সাত দিনের। বউকে নিয়ে ঘুরতে যাবে। তুশি হাঁটু মাথা রেখে পার্থর সাথে কাটানো মুহুর্ত গুলো কল্পনা করছে। মেয়েটার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পরলো। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছেও নিলো। প্রায় এক বছর পার্থকে সে দেখা না ছুঁতেও পারে না। মাত্র কয়েক দিনের প্রেম, অথচ অনুভূতি গুলো গভীরতা অনেক। তুশি নিজেকে বোঝাতে চাইলো। পার্থ নামক পুরুষটা তার কাছে এখন পর পুরুষ। তেহজিব নামক লোকটা তুশির স্বামী। এটা ভাবতেই বিরক্ত হলো মেয়েটা।
তেহজিবের ওই ক্যাবলাকান্ত মুখ আর ভীতু ভীতু চাহুনি দেখলেই তুশির বিরক্ত লাগে। এই আধ বলদের সাথে তুশি সংসার করবে কীভাবে? তুশি ফ্রেশ হয়ে সেলোয়ার-কামিজ পরলো। আলমারিতেই তুলে রাখা ছিলো। তেহজিব কে খুঁজতে তুশি বের হয় রুম থেকে। গত রাতে শোকাহত থাকায় কিছুই লক্ষ করা হয়নি তুশির। এখন একটু ঘুরে দেখা যাক। বিশাল বড় ফ্ল্যাট। তিনটা বড় বেড রুম, ড্রয়িং ডাইনিং দিয়ে বড় স্পেস। তার থেকেও বড় কথা ফ্ল্যাটটা খুব সুন্দর করে সাজানো।
-“তুমি উঠেছো, এসো খেয়ে নাও”
সামনে তাকাতেই তুশি তেহজিবকে দেখলো। ঘামে জুবুথুবু লোকটা এক কথায় সুদর্শন। তবুও তুশির বিরক্ত হলো। নির্বাক চোখে এক পলক তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলো। লোকটাকে মাঝে মাঝে বড্ড চেনা মনে হয়। কাছে গেলে মনে হয় পার্থ তার আশে পাশে আছে। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে টেবিলে গিয়ে বসলো।
তুশি খেতে খেতে বললো,
-“মেয়ে ছিলো না আর দুনিয়ায়?”
-“হ্যাঁ?”
তেহজিবের চেহারা দেখে তুশির হাসি পাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু এবার তুশি বিরক্ত হলো। মাথা মোটা বলদ কোথাকার। এ নাকি রাজনীতিবিদের ছেলে। দেখে ক্যাবলাকান্ত ছাড়া আর কিছুই লাগে না।
-“আপনি এতো মাথামোটা কেনো?”
-“তুশি তুমি কি রাগ করেছো আমার উপর?”
-“নাহ্, রাগ কেনো করবো। আপনাকে তো মন চাইছে গলা টিপে মেরে ফেলি”
ভীতু তেহজিবের হাত সত্যি সত্যি গলায় চলে গেলো। তুশি বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকালো। এতোটা বলদ?
-“আপনার সাথে সিরিয়াস কথা আছে”
তুশির শীতল কন্ঠ শুনে তেহজিবের মেরুদণ্ড সোজা হলো। চশমাটা ঠিক করে তুশির দিকে তাকালো। দু’জনের চোখে চোখ পরলো। তুশি চমকালো। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
-“আমি একজনকে ভালোবাসি আপনি জানতেন?”
-”হু”
-“তাহলে বিয়ে করলেন কেনো?”
-“তোমার প্রেমে পরেছি, এই এক মাস তোমাকে ছাড়া শূন্য শূন্য লাগছিলো তাই”
-“আমি পার্থকে এখনো ভালোবাসি তেহজিব”
বর্তমান স্বামীর সামনে বসে প্রাক্তনের কথা বলতে অস্বস্তি হলেও তুশির হলো না। তুশির গলা কাঁপলো। চোখ জোড়া জ্বলে উঠলো। তেহজিব আড়ালে হাসলো। তুশি মাথা নিচু করে আছে। মাথা তুললেই দেখতে পেতো তেহজিবের হাসিটা।
-“আমাকে একটু ভালেবাসা যায় না?”
-“আপনি ঠিক করেননি তেহজিব। আপনার উচিত ছিলো আমার মত আছে কি না জানা। আপনাকে আমার বিরক্ত লাগছে। আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একজনকে ভালোবেসে আরেকজনের সাথে সংসার করতে হবে, ভাবলেই আমার বুকে ব্যাথা উঠছে। কেনো করলেন তেহজিব, কেনো?আমার পার্থ ফিরে এলে আমি কি জবাব দিবো?”
তুশি কাঁদছে। ওর হাত পা কাঁপছে। নিজেকে সামলাতে ব্যর্থ তুশি। তেহজিব ছুটে আসলো। জড়িয়ে নিলো তুশিকে। তুশি তেহজিবের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে রুমে চলে গেলো। তেহজিবের ইচ্ছে হলো তুশিকে গিয়ে সত্য বলে দিতে কিন্তু পারলো কোথায়?
তুশি খাবার খাইনি। তেহজিব প্লেটে খাবার তুলে রুমে আসলো। তুশি তখন আনমনা হয়ে কিছু ভাবছে।
-“তুশি?”
তুশি উত্তর দিলো না। তেহজিব তুশির পাশে গিয়ে বসলো।
-“খেয়ে নাও তুশি”
-“খিদে নেই”
-“প্লিজ খেয়ে নাও”
-“আপনার উপর আমার খুব রাগ করা উচিত তাই না? কিন্তু আমি রাগ করতে পারছি না। না নিজের ভাগ্যকে পারছি। পার্থ হয়তো আমার ভাগ্য ছিলো না, তাহলে কেনো আমার জীবনে এলো? ওই বাউণ্ডুলে, বখাটে ছেলেটা আমার প্রথম প্রেম। আমি জানি এগুলো বলা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি পারছি না। একদমই পারছি না। অসহ্য ঠেকছে সব কিছু”
-“তুশি আগামীকাল কক্সবাজারে যাচ্ছি”
-“আমি যাবো না”
-“প্লিজ চলো, একটা বার চলো”
তুশি মুখ ফিরিয়ে নিলো। তেহজিব ফোঁস করে শ্বাস ফেললো। সত্যটা জানলে বোকাফুল তাকে কেমন শাস্তি দিবে? কথা বলবে না? না কি মুখ ফুলিয়ে বসে থাকবে। তুশির মুখ ফুলানো ফেস কল্পনা করে তেহজিব হেসে ফেললো।
পরদিন কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো দু’জন। তুশিকে এক প্রকার জোর করেই নিয়ে যাচ্ছে তেহজিব। মেয়েটা একদম ঘরকুনো হয়ে গিয়েছে। তেহজিব প্লেনের টিকিট কেটেছে। অল্প সময়ে যাওয়ার জন্য। তুশি এই প্রথম প্লেনে উঠেছে। ভয়ে চোখ মুখ খিঁচে তেহজিবের হাত খামচে ধরলো। ছেলেটা টু শব্দ করলো না। মুগ্ধ দৃষ্টিতে বোকাফুলকে দেখে গেলো। কক্সবাজার এসে পৌঁছালো দুপুর নাগাদ। আজকের দিনটা কোথাও ঘুরবে না ওরা তেহজিব রিসোর্টের সব থেকে সুন্দর কটেজটা বুক করেছে।
তুশি মুগ্ধ দৃষ্টিতে সবটা দেখছিল।
সমুদ্র এই প্রথম দেখলো মেয়েটা। স্বচোখে বিশাল সমুদ্র, ঢেউয়ের গর্জন, আঁচড়ে পরার শব্দ, সমুদ্রের হালকা নীলাভ জলরাশি তুশিকে মুগ্ধ করলো। এক মুহুর্তের জন্য দুনিয়াবি সব কিছু ভুলো বসলো মেয়েটা। তেহজিব মুগ্ধ চোখে বোকাফুলকে দেখছে।
-”তুশি চলো?”
-“হু”
তুশি কটেজে এসেও ভীষণ মুগ্ধ হলো। কি মনোরম দৃশ্য। তেহজিব সমুদ্র ভিউয়ের কটেজটা বুক করেছে। তুশি বারান্দায় গিয়ে বসলো। তেহজিব তখনো ঘরে আসেনি। ছেলেটা কাজ করতে ব্যস্ত। তুশি সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে পার্থকে কল্পনা করছে।
তেহজিব রুমে এসে তুশিকে পেলো বারান্দায় ঘুমন্ত অবস্থায়।
তুশিকে কোলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেয়।
চলবে.
