#প্রেমচিত্র[শেষ পর্ব]
লেখিকা:ইশা আহমেদ
সন্ধ্যের কিছুক্ষণ আগে তুশির ঘুম ভাঙলো। নিজেকে আবিষ্কার করলো অপরিচিত জায়গায়। কিছুক্ষণ বাদেই মনে পরলো। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ফ্রেশ হয়ে নিলো। তেহজিব তখন রুমে নেই। তেহজিব রুমে আসলো কিছুক্ষণ পরই। তুশিকে দেখে হাতে থাকা শপিং ব্যাগটা বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
-“তুশি এটা একটু পরে নাও”
-“কি আছে এর ভেতরে?”
-“খুলে দেখো, আমি বাইরে অপেক্ষা করছি। পরে আসো প্লিজ”
তেহজিব অনুনয় করে বললো। তুশি কিছু বলল না। তেহজিব বের হয়ে গেলো। শপিং ব্যাগটা খুলতেই মেরুন রঙের সুন্দর একটা শাড়ি বের হলো, সাথে মেচিং অর্নামেন্টস। তুশি পরলো। তবে সাজলো না। পার্থকে খুব মনে পরছে, পদে পদে মনে পরছে। তেহজিব দরজা নক করে বলল,
-“হয়েছে?”
-“হু”
-“বাইরে আসো”
তুশি বের হলো। তেহজিব পেছন থেকে চোখ বেঁধে দিলো। তুশি বিরক্ত হলো। তেহজিব তুশিকে নিয়ে সমুদ্রের পারে আসলো। তুশির চোখের কাপর সরালো। তুশি কিংকর্তব্যবিমুখ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামনের দৃশ্যটা অপার্থিব সুন্দর। এক দেখায় যে কেউ মুগ্ধ হবে। সমুদ্রের পার জু্ড়ে ফেইরি লাইটগুলো ঝলমল করছে। বালুর উপর শামুক দিয়ে বাকানো পথ তৈরি করা হয়েছে। পথের দু’পাশে রঙিন মোমবাতি দিয়ে সাজানো হয়েছে। তেহজিব তুশির হাতটা শক্ত করে এগোতে লাগলো। সমুদ্রের কিনারা ঘেঁষে দাঁড়ালো। তেহজিব তুশিকে একদম সামনে এনে দাঁড় করালো। চোখে চোখ রাখলো।
-“বোকাফুল”
-“হু?”
তুশি চমকালো। বোকাফুল! ‘বোকাফুল’—নামে তো একজনই তাকে সম্মোধন করে। পার্থ! বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকালো তেহজিবের পানে। তেহজিবের চোখ দুটো অবিকল পার্থর মতো লাগছে। মনির রঙটা পরিবর্তন হলো কীভাবে? এক দেখায় মনে হচ্ছে বন মানুষটা চুল দাঁড়ি কাটলে ঠিক এমনই লাগবে। তেহজিব তুশির হাত জোড়া মুঠোবন্দি করলো। তুশি চমকালো তেহজিব স্পর্শ পেয়ে।
-“বোকাফুল, আমি…..আমি…পার্থ”
তুশির মাথায় আকাশ ভেঙে পরলো। হতবিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সামনে থাকা সুদর্শন পুরুষের মুখ পানে। পুরুষটা অপরাধীর ন্যায় মাথা নুইয়ে আছে। তুশি ঠোঁট ভেঙে কান্না পেলো। যেই মানুষটার অপেক্ষায় একটা বছর ছটফট করে কাটিয়েছে সেই মানুষটা না কি তার আশেপাশে ছিলো? তুশি মেনে নেওয়া সম্ভব হলো না। প্রিয় পুরুষের প্রতরনা সইতে পারলো না মেয়েটা। হাত ছাড়িয়ে নিলো। তুশি এক দুঃসাহসিক কাজ করে বসলো। তেহজিবকে থাপ্পড় মেরে বসলো। মেয়েটার চোখ মুখ জ্বলছে। গাল ভিজিয়ে দিচ্ছে অশ্রুগুলো। তেহজিব তাকালো না, সাহস নেই তার।
-“কেনো করলেন পার্থ? ওহ্ না না পার্থ নয়, মিস্টার তেহজিব সারোয়ার কেনো করলেন? আমার অনুভূতি নিয়ে কেনো খেললেন?”
-“বোকাফুল একটু শান্ত হও বু্ঝিয়ে বলি আমি?”
-“কি বোঝাবেন আমায়? দিনের পর দিন কষ্ট পেয়েছি। আমার পার্থ কোথায় আছে, কি করছে, ঠিক আছে কি না এসব চিন্তা করেই আমার দিন কাটতো। এই আপনার কষ্ট হয়নি? চোখের সামনে নিজের ভালোবাসাকে কষ্ট পেতে দেখে?”
তুশি প্রচন্ড উত্তেজিত হয়ে পরেছে। তেহজিব সামলাতে চাইলো। ঝাপটে ধরলো তুশিকে। তুশি পাগলের মতো চড়, থাপ্পড় মারছে তেহজিবকে। তেহজিবের সহ্য হচ্ছে না তুশির ঘৃণা। কেনো করলো? তুশিকে তখনই বিয়ে করা উচিত ছিলো। তুশিকে অনেক চেষ্টা করেও বোঝাতে পারলো না। তুশি ছুটে কটেজে চলে গেলো। তেহজিব হাঁটু ভেঙে বসে পরলো। তেহজিব কটেজে ফিরলো আধা ঘন্টা পরে। তুশি তখন হাঁটুতে মুখ গুঁজে কাঁদছে।
-“বোকাফুল!”
তেহজিবের আকুলতা মেশানো কন্ঠস্বরও তুশির মন গলাতে পারেনি। তুশি পাথরের মতো চুপ করে বসে রইলো। তেহজিব অনেক বার ক্ষমা চাইলো তুশির মন তবুও গললো না। এতো সহজে গলবে বলেও মনে হয় না। তেহজিব তুশির পায়ের কাছে বসে পরলো। লোকটাকে উদভ্রান্তের ন্যায় লাগছে। তুশি ফিরেও তাকালো না। তাকানোর ইচ্ছে নেই। এই মানুষটার জন্য তুশি একটা বছর গুমড়ে মরেছে অথচ এই লোক?
সেদিন রাতেই তুশি কড়া ভাষায় জানালো পরদিনই ফিরে যাবে। তেহজিব চাইলেও আটকাতে পারলো না। পরদিন সকাল সকাল তুশিকে নিয়ে ঢাকায় ফিরলো তেহজিব। তুশি ঢাকাতে এসেই এয়ারপোর্ট থেকে একাই সিএনজি করে নিজের বাড়িতে আসলো। তেহজিবের শত বাঁধাও তাকে আটকাতে পারেনি। তুশি বাড়িতে এসে সোজা নিজের রুমে ঢুকেছে। চাঁদনী আপাও এ বাড়িতে রয়েছে।
তুশি বাড়ি ফেরার কিছুক্ষণ পরই তেহজিব এসেছে ওকে ফিরিয়ে নিতে। তিশি সোজাসাপ্টা বলেছে ও ফিরবে না। তেহজিব ঘন্টা খানেক বসে থাকলেও তুশি ঘর থেকে বের হয়নি। এরপর না পেরে চলে গিয়েছে। তুশির মা তো সেই থেকে বকে চলেছে। জামাইয়ের সাথে কেউ এমন ব্যবহার করে আরো কত কি! দুপুরে খাবার টেবিলে বসে তুশি সোজাসাপ্টা শামসুল সাহেবকে প্রশ্ন করে বসলো,
-“তুমি কি জানতে তেহজিবই পার্থ?”
শামসুল সাহেব নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললেন,“না জানার কি আছে?”
তুশির রাগ হলো। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,“তুমি আমায় বলোনি কেনো? আর কেনোই বা প্রথমে না মেনে পরে বিয়ে দিয়েছো?”
-“ছেলেটা নিজের যোগ্যতা প্রমান করতে পেরেছে এ জন্য”
-“তোমার আমাকে জানানো উচিত ছিলো”
কথাটা বলেই তুশি না খেয়ে হনহন করে চলে গেলো। তাহেরা খাতিন নিজেও জানতেন না তেহজিবই পার্থ। তুশিকে অনেকবার ডাকলেও তুশি আর ফিরে এলো না।
-“তুমি ওকে কেনো জানাওনি? আমার মেয়েটা একটা বছর কত কষ্ট করেছে নিজের চোখে দেখেছি আমি”
-“তেহজিব ভালো ছেলে”
স্বামীর নির্লিপ্ততায় বিরক্ত হয়ে তাহেরা খাতুনও উঠে পরলেন। তুশি রুমে এসেই বিছানায় হাত পা মেলে শুয়ে পরেছে। তুশি কোনো মতেই তেহজিবের করা কাজটা মেনে নিতে পারছে না। তেহজিবকে দেখতেও পারছে না। এতোক্ষণে হাজারটা কল করা হয়ে গিয়েছে। তুশি কল রিসিভ করেনি। করবেও না। ফোন সাইলেন্ট করে রেখে দিয়েছে।
একমাস তেহজিব তুশির দেখা পেলো না। তুশি ফোনও রিসিভ করেনি। বহুবার তেহজিব শ্বশুর বাড়ির দোরগোড়ায় এসেছে বউকে এক পলক দেখতে, অথচ তুশি নিজের সিদ্ধান্তে অটল। তুশির আজ একটু মন ভালো। এ জন্যই রুমের দরজা খুলে ছাদের দিকে পা বাড়ালো। ছাদে আসতেই দেখলো তার গাছ গুলোর অবস্থা শোচনীয়। পানি দিলো গাছগুলো। অতঃপর ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়ালো। বাড়ির কিছুটা দূরে তেহজিবকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তুশি চমকালো। তেহজিব এই সময়ে দাঁড়িয়ে আছে কেনো এখানে। তুশি মুখ ঘুরিয়ে নিলো।
তেহজিবের অবস্থা করুন। আগের ন্যায় বড়বড় চুল, মুখ ভর্তি দাঁড়িতে বন মানুষ লাগছে।
তুশি দাঁড়ালো না। নিচে নেমে গেলো। তেহজিব তা দেখে হতাশ হলো। তবুও সেখানে আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। তুশি নিজের রুমে এসে জানালা দিয়ে লুকিয়ে দেখছিলো তেহজিবকে। তেহজিব যেতেই বিছানায় ধপাস করে শুয়ে পরলো। বেটাকে জব্দ না করা অব্দি ধরা দিচ্ছে না এই তুশি।
আরো একমাস ঘরে বন্দি হয়েই কাটালো তুশি। তুশি একাই বের হলো কিছু কেনাকাটার জন্য। মাঝে কিন্তু শামসুল সাহেব তুশিকে ফিরে যেতে বলেছেন, তুশি সোজা নিষেধ করেছে।
তুশি যখনই এলাকা থেকে বের হলো রিকশা নিয়ে ঠিক তখনই একটা গাড়ি এসে রিকশা আটকে ধরলো। তেহজিব বেরোতেই তুশি বিরক্ত মুখে তাকালো।
-“তুশি নেমে এলো”
-“কি সমস্যা আপনার বলুন তো। বিরক্ত করছেন কেনো?”
-“তুশি প্লিজ একটা বার চলো”
তেহজিবের অনুরোধেও তুশির মন গললো না। তুশি বারবার ফিরিয়ে দিলো। তেহজিব আগে ভাগেই রিকশার ভাড়া মিটিয়ে নিলো। এরপর হুট করে তুশিকে কোলে তুলে নিলো। তুশি হতভম্ব হয়ে স্থির হয়ে তেহজিবের বুকেই পরে রইলো। রিয়াক্ট করতে ভুলে গিয়েছে মেয়েটা।
তেহজিব গাড়িতে বসিয়ে অজানা উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পরলো। তুশির স্তম্ভিত ফিরতেই চেঁচিয়ে বলল,,,
-“আপনি আমায় তুলে আনলেন কেনো?”
-“নিজের বউকেই তো এনেছি তাতেও দোষ?”
তুশি উত্তর দিলো না। তুশিকে নিয়ে তেহজিব শহর থেকে কিছুটা দূরে এসেছে। তুশি চুপ করে মুখ ঘুরিয়ে বসে আছে। হাইওয়ের পাশে গাড়ি থামিয়ে তুশিকে জোর করে বের করলো।
-“কি চাইছেন কি আপনি?”
-“আমি তোমাকে চাইছি“
-“এতোদিন মনে ছিলো না?”
-“ছিলোতো। তাই তো পরীক্ষা হতে না হতেই নিজের করে নিলাম।”
-“আপনার ঢং এর কথা রাখুন। বাড়ি ফিরবো দিয়ে আসুন”
তেহজিব অনেক বার বোঝানোর চেষ্টা করলেও তুশি বুঝলো না। তেহজিব শেষে হার মেনে বাড়ি ফিরিয়ে দিয়ে গেলো। তুশির মনটা এখন নরম হয়েছে। আগে তো তেহজিব কল করলেও ফোন তুলতো না। এখন তোলে,কিন্তু কথা বলে না। সাড়ে দশটার দিকে তেহজিব ফোন করে বলল জানালায় আসতে। তুশি না চাইতেও গেলো।
তেহজিবকে দেখে থমকে গেলো। মাথায় হাতে ব্যান্ডেজ। ওভাবেই যতদ্রুত পারে নিচে নামলো। তুশিকে ছুটে আসতে দেখে তেহজিব একটু অনাকই হলো। তুশি তেহজিবের সামনে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
-“কি অবস্থা করেছেন নিজের। কীভাবে হলো এই অবস্থা? ”
-“সকালে ছোটখাটো এক্সিডেন্ট হয়েছে। তুশি চিন্তা করো না। বেশি কিছু হয়নি”
তুশি মাঝ রাস্তাতেই স্বামীর বুকে ঝাপিয়ে পরে বেশ কিছুক্ষণ কাঁদলো। সেদিন রাতেই তুশি তেহজিবের কাছে ফিরে গেলো। মা জেনে খুশিই হলো। মা কি চায় তার মেয়ের সংসার ভাঙুক?
তুশির দিন ভালো ভাবেই চলছিলো। তেহজিবের সেবা, দুষ্টুমি সব মিলিয়ে তুশির দিন দারুন কাটছে। তেহজিবের ছুটি শেষ হতেই তেহজিব অফিসে যাওয়া শুরু করলো। এখন সে সম্পূর্ণ সুস্থ।
একদিন অফিস থেকে তেহজিব তাড়াতাড়িই ফিরলো। তুশিকে তাড়াহুড়ো করে শাড়ি পরতে বললো। তুশি হালকা আকাশী রঙের শাড়িতে নিজেকে সজ্জিত করলো। আর চুল? একদমই ছাড়া যাবে নাহ্। হিজাবই বাঁধতে হলো। তেহজিব পরলো অফ হোয়াইট একটা শার্ট।
দু’জন বেরোলো ঘুরতে। আজ বাইকে বের হয়েছে। তেহজিব তুশিকে শহরের আনাচে কানাচে ঘুরিয়ে আনলো। মেয়েটা ভীষণ খুশি। তুশি আনন্দে তেহজিবকে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা এলিয়ে দিলো।
তুশির রঙিন প্রেমচিত্রের সমাপ্তি বুঝি এখানেই? হয়তো!
#সমাপ্ত
