#প্রেমচিত্র
লেখিকা:#ইশা_আহমেদ
#পর্ব_৮
ভদ্রলোক আমতা আমতা করতে লাগলো। তুশি ধমক দিয়ে বললো,
-“এই পুরো কাহিনী বলুন আব্বু আপনায় পেলো কোথায়?”
ভদ্রলোক ধমক খেয়ে গড়গড় করে সব বললো। শামসুল সাহেবের সাথে তেহজিবের দেখা হয়েছিলো গতকাল সন্ধ্যায়। শামসুল সাহেব সাধারণত ছাদে উঠেন না। গতকাল সিগারেট খেতে উঠেছিলেন। বাড়িতে বউ-ছেলে মেয়ে থাকলেও সিগারেট খান না তিনি। গতকাল কাজ থাকায় একটাও খেতে পারেননি। এজন্যই ছাদে উঠেছিলেন। তেহজিব জামা কাপড় তুলতে ছাদে আসলে শামসুল সাহেব তাকে ডেকে নিলেন। টুকটাক কথা বলে তুশিকে পড়াতে বললেন, যদিও বা তেহজিব রাজি ছিলো না। অনেক অনুরোধ করার পর রাজি হয়েছে। তুশি সব শুনে কিছু বলল না। তেহজিব চলে গেলো। তুশি মায়ের কাছে গেলো।
-“আমি টিউটর রাখতে বলেছি?”
তাহেরা খাতুন বসে সিরিয়াল দেখছিলেন ছোট জায়ের সাথে। মেয়ের রূক্ষ কন্ঠ শুনলেও পাত্তা দিলেন না। তুশি বিরক্ত হলো। তার মা কখনোই কোনো কথা ঠিক মতো শুনতে চায় না।
তুশি কিয়ৎ চিৎকার করে বলল,“মা?”
“কি হয়েছে কি? জ্বালাস কেনো?”
-“টিচার রেখেছো কেনো?”
-“পড়াশোনা ঠিক মতো করানোর জন্য। সামনে এইচএসসি ভালো রেজাল্ট লাগবে তাই। যা এখান থেকে।”
তুশি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাকিয়ে, তুক্ষর মেজাজ নিয়ে চলে আসলো নিজের রুমে। অসহ্য রকম বিরক্ত হচ্ছে সে। চাঁদনী আপার সাথে সময় কাটাতে আসলো তুশি, সেখানেও হতাশ হয়ে ফিরতে হলো! চাঁদনী আপা ঘুমিয়ে আছেন। তুশি ক্ষীপ্র মেজাজে ছাদে উঠলো। রাগ কমানো দরকার! গাছ গুলোয় অনেক দিন পানি দেওয়া হয় না, ছাদেও ওঠা হয় না। গাছগুলোতে পানি দিয়ে, দোলনাতে বসলো তুশি।
তেহজিব সদ্য গোসল করে বের হয়েছে বোধ হয়। পরনে ট্রাউজার শুধু। তুশিকে খেয়াল করেনি। তুশি চোখ তুলে তাকালো না। তেহজিব তুশিকে দেখে, এক প্রকার দৌড়ে চলে গেলো। আজকে তুশির কোনো রিয়াকশন না দেখে তেহজিব একটু চিন্তিত হলো। তুশি অন্যমনস্ক হয়ে কি যেনো ভেবে যাচ্ছে। তেহজিব গায়ে শার্ট জড়িয়ে বাইরে আসলো।
-“আপনি এখানে, এই সময়?”
-“এমনি”
-“মন ভালো নেই?”
তুশি জবাব দিলো না। অদ্ভুত চোখে তাকালো শুধু। তেহজিব পাশ কাটিয়ে চলে আসলো নিজের রুমে। জানালার ফাঁক দিয়ে তুশিকে নজরে রাখছে। তুশি পনেরো, বিশ মিনিট একা বসে চলে গেলো। তেহজিব ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত রাখলো। মেয়েটার উদাসীনতা আর মানা যাচ্ছে না। এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হলেই বিয়েটা সেরে ফেলবে। পার্থ শেখ, যেটা তেহজিবের আসল পরিচয় না। পার্থ নামটা রেখেছিলো তেহজিবের নানা ভাই। তেহজিব হওয়ার বছর দুই পরেই তিনি মারা যান। পরে নামটা সবাই ভুলে গেলেও তেহজিবের এই এলাকাতে নামটা কাজে লেগেছিলো।
তেহজিব সারোয়ার, দেশের নামকরা রাজনীতিবিদ তুরাগ সারোয়ারের ছোট ছেলে। বাবা, মায়ের অবাধ্য, উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলে। ছোট বেলা থেকেই আদরে আদরে একরোখা হয়ে গিয়েছিলো। মা নীলিমা শেখ ছেলেকে শত চেষ্টা করেও ঠিক করতে পারছিলেন না। চার বছর আগের ঘটনা, সদ্য মাস্টার্স শেষ করা তেহজিব একা কাটাতো, দিনের বেশির ভাগ সময় বাইরে। সেদিন রাত প্রায় একটার সময় তেহজিব বাড়িতে ফিরতেই তুরাগ সারোয়ার ঝামেলা করলেন, বললেন বাড়ি থেকেও বের হয়ে যাও। তেহজিবও রেগে বাড়িতে থেকে বের হয়ে গেলো। চলে আসলো ঢাকার এক ছোট্ট এলাকায়, যেখানে কেউ তাকে চিনে না, জানেও না।
তেহজিব নিজের নাম পরিবর্তন করে, পার্থ শেখ রাখলো। পাড়ার সবাই তেহজিবকে পার্থ নামেই চিনতে শুরু করলো। তেহজিবের নিজের পরিচয়টা ক্রমেই হারিয়ে গেলো। কারো সাথে যোগাযোগ রাখেনি তেহজিব। নিজেকে এক নতুন পরিচয় দিয়ে এখানেই থেকে গেলো।
বছর খানিক যেতেই তেহজিব প্রেমে পরলো, তাও কি না একজন দশম শ্রেনী পড়ুয়া কিশোরীর? তেহজিব নিজেকে সময় দিলো, বুঝানোর চেষ্টা করলেও মন আটকে পরে রইলো কিশোরীর দারপ্রান্তে।
বছর দুই পরে তুরাগ সারোয়ার ফোন করলেন। তেহজিব তখন পাড়ার দোকানে আড্ডায় মশগুল। তেহজিব নতুন সিম ব্যবহার করে। অপরিচিত নাম্বার দেখেও তুললো।
-“কোথায় আছো?”
-“ফোন করেছো কেনো?”
-“তুমি কি ভাবো, আমি জানি না তুমি কোথায়?”
-“জানো?”
-“শুরু থেকেই জানি”
তেহজিব অতিরিক্ত কথা বলা পছন্দ করে না বিধায় ছোট করে বলল,“ওহ্”
-“সেসব কথা বাদ দাও, যা বলতে ফোন করেছি। টাকা লাগছে না? টাকা কোথা থেকে পাচ্ছো?”
-“ব্যবসা থেকে আসছে”
-“তোমার ক্রেডিট কার্ড নিয়ে যাও?”
-“নাহ প্রয়োজন নেই”
এটুকু কথাই হয়েছিলো। এরপর থেকে আর তুরাগ সারোয়ার ফোন করেননি। তেহজিবও কখনো চেষ্টা করেনি। যখন তুশি ধরা পরলো, তখন ওর বিবেকে কাজ করলো। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে উঠে পরে লাগলো। বন মানুষের রূপ ঝেড়ে নিজেকে ভার্সিটি লাইফের তেহজিবে পরিনত করলো। চাকরির ইন্টারভিউ দিলো কয়েকটা। বাবার পরিচয় নিয়ে নয়, নিজ পরিচয়ে। এক্সপেরিয়েন্স না থাকায় অনেকগুলো চাকরি থেকে রিজেক্ট হলো। এরপর স্বল্প বেতনে এক কোম্পানিতে চাকরি করে, এখন মোটা অংকের সেলারিতে ভালো কোম্পানিতে চাকরি করছে।
ছয়টা মাস তেহজিব কীভাবে কাটিয়েছে, তা শুধু ওই জানে। তুশিকে এক নজর দেখার আশায় কত সন্ধ্যে যে এলাকায় এসেছে। তবুও তুশির খোঁজ মেলেনি। মাঝে মাঝে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে যদি দেখা পেতো ওই আরকি। মাঝে বাড়িতেও ফিরেছিলো। নীলিমা শেখ তো আসতেই দিবেন না ছেলেকে। তেহজিব জোর করেই এখানে বাসা নিয়েছে।
তেহজিব ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো। এতো পেশার। এখন একটু বোকাফুলকে জড়িয়ে ধরতে পারলে মন্দ হতো নাহ্। মেয়েটা আদুরে বিড়াল ছানা একদম।
–
তুশির জন্য বড় বাড়ি থেকে বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করতে না করতেই রাজনীতিবিদ তুরাগ সারোয়ারের বাড়ি থেকে সম্বন্ধ এসেছে। রাজনীতিবিদ শুনেই তুশির মা এক কথায় না করেছেন। কিন্তু শামসুল সাহেব রাজি হলেন। তুশি বিয়ের ব্যাপারে জানার পর দু’দিন ঘর বন্দি হয়ে ছিলো। শামসুল
সাহেব তবুও নিজের সিদ্ধান্তে অটল। তুশিকে দেখতে আসলো এক শুক্রবারে। তুশি তখন পাথরের ন্যায় নির্বাক হয়ে পুতুলের মতো বসে রইলো। চাঁদনী আপা নিজ দায়িত্বে তুশিকে সুন্দর করে সাজালো। তুশি কাঁদলো না, একদম পাথর হয়ে রইলো।
তুশিকে দেখতে এলো দু’জন মানুষ। তুরাগ সারোয়ার এবং তার স্ত্রী নীলিমা শেখ। শামসুল সাহেব এ নিয়ে প্রশ্ন করলেন না। তুরাগ সারোয়ার আগেই তাদের জানিয়েছিলেন। তার ছেলে ব্যক্তিগত জীবন শো করতে চায় না মিডিয়ার সামনে। নিজেকেও এ জন্য সব সময় আলাদা রাখে। ঠিক করা হলো শুক্রবারেই বিয়ে হবে। তেহজিব সারোয়ার চায় ঘরোয়া ভাবেই বিয়েটা করতে। শামসুল সাহেবও রাজি। এলাকার মসজিদে বিয়ে হবে। ছেলে পক্ষ থেকে উপস্থিত থাকবেন শুধু তুরাগ সারোয়ার, নীলিমা শেখ আর তাদের বড় ছেলে।
তুশির মতামত নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলো না কেউ। শুক্রবার ঘরোয়া ভাবেই তুশিকে সাজানো হলো। সাদা শাড়িতে আবৃত্ত তুশিকে অসম্ভব সুন্দর লাগছিলো। তেহজিব সারোয়ারের যেনো দুনিয়া থমকে গেলো। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তার বঁধুর দিকে তাকিয়ে রইলো। তার বঁধু। তেহজিব বাড়ি ছেড়েছে এক মাস আগে। সামনের আবাসিক এলাকায় বড় ফ্ল্যাট কিনেছে। সেখানেই থাকছে। নববধূকে নিয়ে সেখানেই উঠবে। বিয়ের সময় তুশি বরের নাম অব্দি শুনলো না। নির্জীব হয়ে কবুল বলল।
তুশির সাথে ওর বরের দেখা হলো বাসর রাতে। তুশি তখন হাঁটুতে মুখ গুঁজে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মেয়েটার মাথায় হিজাব নেই, থাকার কথাও না। তুশির খুব কাঁদতে মন চাইলো।
-“আপনি কেনো আসলেন না পার্থ? আজ তো আমার সুখের দিন হওয়া উচিত ছিলো। আমার প্রেমচিত্রটা আপনি থাকলে একদম সুখী সুখী হতো। অথচ আপনি নেই, আপনার অস্তিত্ব ও নেই। যা আছে, সেগুলো শুধুই স্মৃতি। আমি এখন অন্য জনের অর্ধাঙ্গীনি, অথচ কথা ছিলো আপনার বঁধু হয়ে আপনার রঙে রাঙাবো নিজেকে”
-“কাঁদছো?”
তুশি পরিচিত কন্ঠ পেয়ে চোখ তুলে তাকালো। সামনে ক্যাবলাকান্ত তেহজিবকে দেখে কিংকর্তব্যবিমুখ হয়ে বরে রইলো। হতবাক হওয়া কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
-“আপনি?”
#চলবে
