#বেলীফুলের_ইতিকথা (২৭)
#মীরাতুল_নিহা
সময় তার নিজস্ব নিয়মে বয়ে যায়। হাসপাতালের করিডোরের সেই ঠান্ডা মেঝেতেই বেলীর জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ আর ভয়ঙ্কর রাতটা পার হলো। চোখের একটা পলকও সে ফেলতে পারেনি প্রতিটা সেকেন্ড কেটেছে বুকের ভেতর এক তীব্র ছটফটানি আর কান্নায়। পরের দিন দুপুরে ওটি (OT) থেকে নার্স এসে অবশেষে একটা স্বস্তির খবর দিলেন, ফিওনা চোখ মেলে তাকিয়েছে। খবরটা শোনামাত্রই বেলী কেবিনের দিকে দৌড়ে যেতে চাইল, কিন্তু কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে বাধা দিয়ে নরম গলায় বললেন,
“ব্যস্ত হবেন না। বাচ্চা মাত্র চোখ খুলেছে, তবে এখনো প্রচন্ড ট্রমার মধ্যে আছে। আমরা এই মুহূর্তে কাউকে ওর সাথে দেখা করতে দিতে পারছি না। ওকে যখন কেবিনে শিফট করা হবে, তখন দেখা করতে পারবেন। শরীরটা অনেক দুর্বল, তবে চিকিৎসা খুব ভালোভাবে চলছে। আশা করছি খুব দ্রুতই ও সুস্থ হয়ে উঠবে।”
ডাক্তারের আশ্বাসবাণীতে বেলীর বুকের ওপর চেপে থাকা পাথরের মতো ভারটা কিছুটা হলেও কমল। সে আল্লাহর দরবারে লাখো শুকরিয়া জানাল। ততক্ষণে আরিফ আবার হাসপাতালে চলে এসেছে। তার হাতে একটা বড় টিফিন বক্স। সে সোজা আয়েশা আর বেলীর সামনে এসে বক্সটা খুলে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত আর তরকারি বের করল। তাই দেখে আয়েশা একটু অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল, “খাবার আবার হোটেল থেকে কিনে আনলা ক্যা? কতগুলো টাকা খরচ হইলো বলো তো!”
আরিফ এক গাল হেসে বলল,
“ধুর পাগলী! হোটেল থেকে কিনতে যাব কেন? তুমি এই অবস্থায় হাসপাতালে কষ্ট করছ, আর আমি হোটেলের খাবার এনে তোমাদের খাওয়াব? সকালে বাসায় গিয়ে নিজ হাতে এই রান্না করে নিয়ে এসেছি।”
স্বামীর মুখের কথা শুনে আয়েশার মলিন মুখেও একটা তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। এমন একটা কঠিন বিপদের দিনে এত যত্নবান আর দায়িত্বশীল একজন স্বামী পেয়েছে ভেবে তার মনটা কৃতজ্ঞতায় ভরে গেল। আরিফ এবার বেলীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“বেলী আপা, আপনিও আর না করবেন না। হাতটা ধুয়ে একটু মুখে দিন।”
বেলী শেষবার ভাত খেয়েছিল গতকাল দুপুরে। তারপর সন্ধ্যার সেই অভিশপ্ত গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে এই বিকেল পর্যন্ত একটা দানাও তার পেটে পড়েনি। তীব্র মানসিক চাপ আর ক্ষুধার কারণে শরীরটা তার বড্ড দুর্বল লাগছিল, মাথাটাও কেমন যেন ঝিমঝিম করছিল। তবে ভাত খাওয়ার মতো রুচি তার ছিল না। সে আরিফের আনা খাবার না নিয়ে, কাল রাতে আরিফেরই কিনে আনা ব্যাগ থেকে একটা পাউরুটি বের করে আলতো করে মুখে দিল। আয়েশা বেলীর অবস্থা বুঝতে পেরে তাকে আর ভাত খাওয়ার জন্য জোরাজোরি করল না। বিগত দিনের প্রতিটা ছোট-বড় বিপদে-আপদে আদনান যেভাবে সবসময় ছায়ার মতো পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, আজ এই সংকটের মুহূর্তেও বেলীর অবচেতন মন বারবার সেই আদনানকেই আশা করছিল। চোখ দুটো বারবার হাসপাতালের সদর দরজার দিকে চলে যাচ্ছিল। বেলী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্য গলায় আয়েশাকে জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা আয়েশা, এতক্ষণে তো মাহির বিয়ে হয়ে যাওয়ার কথা, তাই না? আদনান এখনো একবারের জন্যও এলো না খোঁজ নিতে।”
আয়েশা বেলীর মনের ব্যাকুলতা বুঝতে পেরে একটু সামলে নিয়ে বলল,
“বিয়ে বাড়ি কি এতই সোজা? কত রকমের ঝামেলা থাকে! মেহমান বিদায় করা, হিসাব-নিকাশ মেলানো—আরও কত কাজ আছে। দেখিস, সব কাম সাইরাই ও হসপিটালে ছুটে আসব।”
ঠিক তখনই করিডোরের নীরবতা ভেঙে ভারী বুটের আওয়াজ শোনা গেল। বেলী আর আরিফ তাকিয়ে দেখল, দুজন কনস্টেবলকে সাথে নিয়ে থানার সাব-ইন্সপেক্টর এসআই হন্তদন্ত হয়ে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছেন। পুলিশকে আসতে দেখে বেলীর বুকের ভেতরটা আবার নতুন কোনো আশঙ্কায় ধক করে উঠল।
সাব-ইন্সপেক্টর (SI) শফিক সাহেব বেলীর দিকে তাকিয়ে বেশ নরম গলায় বললেন,
“ যাওয়ার আগে ভাবলাম বাচ্চাটার একটু খোঁজ নিয়ে যাই। কেমন আছে ও? সাথে একটা খবরও আছে।”
বেলী ডাক্তারের বলা আশ্বাসের কথাটুকু বলতে গিয়েও মাঝপথে থমকে গেল। তার চোখের মণি দুটো যেন কোটর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইল। পুলিশের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে তাকাতেই বেলীর পুরো দুনিয়াটা ওলটপালট হয়ে গেল। আদনান দাঁড়িয়ে আছে! কিন্তু এ কোন আদনান? তার চেনা, সুবোধ, ছায়ার মতো পাশে থাকা সেই আদনান তো এটা নয়। এই আদনানের দুই হাত আজ লোহার শক্ত হাতকড়ায় বন্দি! পরনের বিয়ের পাঞ্জাবিটা ধুলোবালিতে মাখামাখি, মাথাটা নিচু।
বেলী নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। সে এক লাফে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল,
“আদনান! তোমার হাতে এসব কী? ওনাদের হাতে হাতকড়া কেন আদনান? অফিসার আপনারা ওকে এভাবে বেঁধেছেন কেন? ও তো আমার ভাইয়ের মতো, ও তো আমার মেয়েকে খুঁজতে সাহায্য করেছে! কোনো ভুল হচ্ছে আপনাদের!”
সাব-ইন্সপেক্টর শফিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত গম্ভীর ও কঠোর গলায় বললেন,
“কোনো ভুল হয়নি আপা। দুনিয়াটা কত বড় জঘন্য জায়গা, তা আপনি এখনো জানেন না। কাল রাতে অন্ধকার জঙ্গলে এই পাশবিক কাজটা করে অপরাধী পালিয়ে গেলেও, তাড়াহুড়ো করে দৌড়াতে গিয়ে নিজের পাপের চিহ্ন ওখানেই ফেলে গিয়েছিল। ঝোপের একটু দূরেই আমরা একটা মানিব্যাগ পাই। আর সেই মানিব্যাগের ভেতরের ন্যাশনাল আইডি কার্ড, ছবি আর টাকা—সব এই আদনানের!”
পুলিশের কথা শুনে আয়েশা নিজের পেটে হাত দিয়ে সোফায় ধপাস করে বসে পড়ল। পুরো করিডোরে যেন নীরবতা নেমে এলো। পুলিশ অফিসার বলতে লাগলেন,
“সকালে বিয়ের মণ্ডপ থেকে যখন আমরা একে তুলে আনি, প্রথমে খুব নাটক করছিল। কিন্তু গাড়িতে একটু ‘আপ্যায়ন’ করতেই নিজের মুখে সব স্বীকার করেছে। এই জঘন্য লোকটাই কাল রাতে আপনার চার বছরের নিষ্পাপ বাচ্চাটার সাথে ওই পাশবিক কাজটা করেছে!”
“না! এটা হতে পারে না! আপনারা মিথ্যা বলছেন!”
বেলী দুই হাতে নিজের মাথা চেপে ধরে চিৎকার করে উঠল। তার শরীর থরথর করে কাঁপছিল, বুক চিরে কান্না বেরিয়ে আসছে। যে আদনান তাকে বিপদের দিনে আশ্রয় দিল, যে আদনানকে সে নিজের ছোট ভাইয়ের মতো বিশ্বাস করে, সে এমন একটা পিশাচ? এমন একটা জানোয়ার? বেলী উন্মাদের মতো আদনানের সামনে গিয়ে তার কলার চেপে ধরল। চোখের জল আর গলার চিৎকার এক করে বলল,
“কথা বলছিস না কেন রে কুলাঙ্গার? মুখ খোল! বল যে পুলিশ মিথ্যা বলছে! তুই আমার ফিওনার মামা না? ও তো তোকে মামা ডাকে। তোর গলা জড়িয়ে ধরে না আদর করে? তুই কী করে এই কাজ করলি? বল এগুলো মিথ্যা!”
আদনান এতক্ষণ মাথা নিচু করে ছিল। এবার সে ধীরে ধীরে চোখ তুলে বেলীর দিকে তাকাল। সেই চোখে আর কোনো অপরাধবোধ ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত, শীতল হিংস্রতা। সে অবহেলায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাঁপানো কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলল,
“পুলিশ কোনো মিথ্যা বলছে না বেলী। যা শুনেছ, সব সত্যি। আমি… আমি প্রতিশোধ নিয়েছি!”
‘প্রতিশোধ’ শব্দটা শোনামাত্রই বেলীর হাত দুটো আদনানের কলার থেকে আলগা হয়ে গেল। সে দুই পা পিছিয়ে গেল। অবিশ্বাস আর তীব্র যন্ত্রণায় চোখ বড় বড় করে বলল,
“প্রতিশোধ? কিসের প্রতিশোধ আদনান? একটা চার বছরের অবুজ বাচ্চার ওপর তুই কিসের প্রতিশোধ নিলি?”
আদনান এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। লোহার হাতকড়া পরা হাত দুটো দিয়ে নিজের চোখের জল মোছার চেষ্টা করে ভাঙা, রক্তাক্ত গলায় বলল,
“প্রতিশোধ তোমার ওপর! তোমার ওই অহংকারের ওপর! তালাকের পর যখন এক কাপড়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলে, এই আদনান তোমাকে আগলে রেখেছিল। তোমার প্রতিটা প্রয়োজনে নিজের সব কাজ ফেলে দোকান হতে শুরু করে ঘরের বাজার পর্যন্ত এনে দিয়েছি। কোনোদিন নিজের কোনো স্বার্থ খুঁজিনি। আর তার বিনিময়ে? তার বিনিময়ে কাল তুমি আমার গায়ে হাত তুললে? আমাকে সপাটে চড় মারলে? শুধু এই কারণে যে, আমি তোমাকে এত বছর ধরে মনে মনে ভালোবেসেছি? তোমাকে নিজের করতে চেয়েছি। এটাই কি আমার অপরাধ ছিল?”
আদনানের গলাটা এবার আরও বেশি কেঁপে উঠল, সে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল,
“তোমার ওই চড় আর অপমান আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না । আমার পুরুষত্বে লেগেছিল। কাল যখন গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে সবাই হাসছিল, নাচছিল, আমার মাথার ভেতর তখন বিষাক্ত আগুন জ্বলছিল। হুট করে দেখলাম ফিওনা বাইরে একা খেলছে। ও যখন আমাকে ‘মামা’ বলে ডাকল, আমার চোখের সামনে বারবার তোমার সেই চড় মারার দৃশ্য আর অপমানের কথাগুলো ভেসে উঠল। মনে হলো ও তোমার মেয়ে৷ ওর মাধ্যমেই তোমাকে যন্ত্রণা দিতে পারব প্রতিশোধ নিতে পারব। আমার মাথাটা পুরোপুরি পাগল হয়ে গিয়েছিল বেলী আপা! প্রতিশোধের নেশায় আমি এক মুহূর্তের জন্য ভুলে গিয়েছিলাম যে ও একটা চার বছরের বাচ্চা… আমি ভুলে গিয়েছিলাম ও আমার কতটা আদরের ছিল… আমি… আমি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলাম… মাফ শব্দও মুখে আনতে পারছি না। ফিওনার সাথে আমি হায় খোদা!
শেষের কথাটা বলতে বলতে আদনানের কণ্ঠস্বর বুজে এলো। সে আর বেলীর চোখের দিকে তাকাতে পারল না, আবার মাথা নিচু করে ডুকরে কেঁদে উঠল।
বেলী আর একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না। তার চারপাশের চেনা পৃথিবীটা যেন এক নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে ধুলোয় মিশে গেল। যে বিশ্বাসের ওপর ভর করে সে বেঁচে ছিল, সেই বিশ্বাসটাই আজ তাকে জীবন্ত কবর দিয়ে দিল। সে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল, আর তার চোখ দিয়ে টপটপ করে ঝরতে লাগল নোনা জল। পুলিশ আদনানকে ধরে নিয়ে যায়। বেলী শুধু অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। দুনিয়াটা যত-না কঠিন দুনিয়ার মানুষগুলো আরো কঠিন! জীবন তাকে আরো একবার শিক্ষা দিলো।
____________________
মায়ের নরম হাতটা শক্ত করে ধরে ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে ফিওনা। পরনে তার নীল-সাদা স্কুল ড্রেস, পিঠে ছোট্ট একটা লাল রঙের ব্যাগ। স্কুলের প্রথম দিন কী কী হলো, কোন ম্যাডাম তাকে আদর করল, আর কোন বন্ধুর সাথে সে টিফিন ভাগ করে খেল—সব গল্প একনাগাড়ে করে যাচ্ছে সে। বেলী পরম মমতায় মেয়ের সেই আধো-আধো কথার গল্প শুনছে। যমের দুয়ার থেকে ফিরে এসেছে তার মেয়েটা। দেখতে দেখতে কেটে গেছে দীর্ঘ তিনটি মাস। হাসপাতালের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলো আর ডাক্তারের আপ্রাণ চেষ্টার পর ফিওনা এখন অনেকটাই সুস্থ। সেই ভয়ঙ্কর ট্রমা কাটিয়ে ওঠার পর বেলী আর এক মুহূর্তও দেরি করেনি, মেয়েকে একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছে। যেন বাচ্চাদের সাথে থেকে বিষাক্ত স্মৃতি মনে না পড়ে।
তবে বেলী এখন আর আগের মতো নিজের কাজে তেমন মন দিতে পারে না। বাহিরে ছোটাছুটি কমিয়েছে। তবে অনলাইনের বিজনেসটা সে ছাড়েনি! ঘরে বসেই বসে করে ফিওনাও সামনেই থাকে। টিউশনিগুলো কমিয়ে দিয়ে দু’টো করেছে। তাও বাচ্চারা ঘরে আসছে বিধায় পড়াচ্ছে না হলে সেটাও ছেড়ে দিতো। দোকানে আয়েশা’র স্বামীকে রেখেছে কর্মচারী হিসেবে৷ সে হিসেবে আশ্বস্ত থাকলেও এখন সে পুরোপুরি কাউকেই বিশ্বাস করে না। সময় পেলেই ফিওনা যখন স্কুলে থাকে সে সময় তদারকি করে।
ফিওনাকে স্কুলে নিয়ে আসা, দিয়ে আসা সর্বক্ষণ, সারাদিন সে ছায়ার মতো মেয়ের সাথে লেগে থাকে। একটা মুহূর্তের জন্যও তাকে চোখের আড়াল হতে দেয় না।
এই তিন মাসে বেলী নিজের জীবন থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা পেয়েছে। সে এখন প্রতিদিন নিয়ম করে ফিওনাকে ‘গুড টাচ’ আর ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে সচেতন করছে। কোন স্পর্শটা আদরের আর কোনটা বিপদের, তা খুব সহজ করে মেয়েকে বোঝাচ্ছে। এবং ব্যাড টাচের আভাস পেলে কি করতে হবে, অপরিচিত থেকে চেনা মানুষদের ব্যবহার সব শিখাচ্ছে। বেলীর বুকের ভেতর তখন একটা সুপ্ত হাহাকার মোচড় দিয়ে ওঠে—এই শিক্ষাটা যদি সে আরও আগে তার পুতুলটাকে দিতে পারত, তবে হয়তো চার বছরের এই নিষ্পাপ বাচ্চার ওপর দিয়ে এত বড় কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যেত না! চিৎকার করে হলেও হযত সেদিন বেঁচে যেত!
স্কুল থেকে তাদের বাসায় ফিরতে বড়জোর দশ মিনিট সময় লাগে। মা-মেয়ে দুজনে গল্প করতে করতে ফুটপাত ধরে হাঁটছিল। হুট করেই ফিওনা বেলীর আঁচল টেনে ধরে বলল,
“জানো আম্মু, এই ইস্কুলের তামনে না একটা ভিখারী আঙ্কেল বছে তাকে। আমাকে রোজ চকলেট খেতে ডাকে। কিন্তু আমি তো গুড গার্ল, আমি খাই না।”
মেয়ের মুখে চকলেটের কথা শুনেই বেলীর ভেতরের চেনা আতঙ্কটা আবার চাড়া দিয়ে উঠল। সে ফিওনার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে সতর্ক গলায় বলল,
“একদম ঠিক করেছ মামণি। চেনা হোক বা অচেনা, রাস্তার কোনো আঙ্কেলের কাছ থেকে কখনো কোনো খাবার বা চকলেট নেবে না, আম্মু সামনে না থাকলে কেমন?”
ফিওনা মাথা নেড়ে সায় দিল।
“ক্লাস কেমন হয়েছে আজকে? ম্যাম কি পড়িয়েছে।”
“মা, বাবা পরিবার এছব নিয়ে গল্প করেছে আজকে। বই পড়ায়নি। আমায় জিগ্যেস করচিল জানো আম্মু? আমার বাবা তো হারিয়ে গেছে আমি বলতে পারিনি। আমার খুব খারাপ লেগেছে।”
বেলী নিশ্চুপ! কি বলবে ভাষা নেই মুখে। কথা বলা শেখা থেকেই ফিওনা তার বাবাকে খুঁজে। অন্য বাচ্চাদের বাবার সাথে খেলতে দেখে মেয়েটা মা’কে এসে জ্বালায়। বেলী বলেছে বাবা হারিয়ে গেছে। হারিয়ে যাওয়া মানুষ ফেরত আসে না৷ অবুঝ মেয়েটাকে এসব বলে দমিয়ে রেখেছে৷ কিন্তু যখন বুঝের হবে তখন কি সে কি বলে বুঝ দিবে? সত্যিটা জানার পর মেয়ের নিশ্চয়ই বাবার জন্য ঘৃনা ব্যতীত কিছুই আসবে না। তার চেয়ে ফিওনার অজানাই থাক তার বাবা!
“আম্মু আজ চিকেন কাবো।”
বেলী মুচকি হেঁসে মেয়েকে আশ্বস্ত করে,
“চিকেন তোমার এত ফেভারিট সোনা? ঠিকআছে আম্মু বানিয়ে দিব। তবে একটা শর্ত আছে।”
ফিওনার ভ্রু দু’টো কুঁচকে আসলো। ঠোঁট উল্টিয়ে মা’কে শুধোয়,
“কি ছরত আম্মু?”
“তোমাকে আজকে হোমওয়ার্ক দ্রুত শেষ করতে হবে। পারবে?”
“পারবো আম্মু।”
“ওলে বাবালে। আমার লক্ষী মেয়েটা।”
ঠিক তার পরের মুহূর্তেই সে রাস্তার এক কোণের দিকে ফিওনা আঙুল উঁচিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“ওই যে আম্মু! ওই যে দেখো, ওই ভিখারী আঙ্কেলটা!”
বেলী মেয়ের আঙুলের ইশারা ধরে রাস্তার ওপারে তাকাল। এক পাশে ধুলোবালির মধ্যে মাথা নুইয়ে বসে আছে এক জীর্ণ-শীর্ণ ভিখারি। বড় বড় উসকোখুসকো চুল আর জট পাকানো দাড়ি-গোঁফে মুখটা প্রায় ঢাকা। কিন্তু সেই অবয়বটা বেলীর বড্ড চেনা ঠেকল! বুকের ভেতর এক তীব্র কৌতুহল অনুভব করে বেলী ধীরপায়ে রাস্তা পার হয়ে লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বেলীর ছায়া সামনে পড়তেই লোকটা ধীরে ধীরে তার নুয়ে থাকা মুখটা উঁচিয়ে ধরল। চোখের পলকে চার জোড়া চোখ স্তব্ধ হয়ে গেল। কোনো কথা নেই, চারপাশটা যেন আচমকা নিঝুম হয়ে গেল। জীর্ণ পোশাকে ক্র্যাচে ভর দিয়ে বসে থাকা এই মানুষটা আর কেউ নয়—ফারহান!
ফিওনা তখনো অবুঝের মতো ফারহানের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বলল,
“আঙ্কেল, তেমন আছো?”
ফারহান কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার শুকনো, ফেটে যাওয়া ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মলিন, করুণ হাসি ফুটে উঠল। সে তৃষ্ণার্ত চোখে প্রথমে ফিওনার ফুটফুটে মুখের দিকে তাকাল, তারপর চোখ তুলে চাইল বেলীর দিকে। ভাঙা, ধরা গলায় ফারহান বলল,
“এ… এ তোমারই মেয়ে, তাই না বেলী? সেজন্যই… সেজন্যই হয়তো চেনা রাস্তা দিয়ে যখনই ও হেঁটে যেত, আমার বুকটা কেমন যেন করে উঠত! এত চেনা লাগত ওকে! হাজার হোক… আমারই তো রক্ত ও, আমারই তো অংশ…”
ফারহানের মুখে এই কথা শুনে বেলী কী বলবে, কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে—সব যেন এক নিমেষে ভুলে গেল। তার চোখের সামনে অতীত আর বর্তমানের দুটো ভিন্ন ছবি ভেসে উঠল। আজ যদি সবকিছু ঠিক থাকত, ফারহান যদি সেদিন পরনারীর মোহে অন্ধ হয়ে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল না মারত, তবে আজ এই পড়ন্ত দুপুরে ফিওনার হাত ধরে ফারহানও তাদের পাশাপাশি হাঁটত। বাবা-মায়ের যৌথ আদরে মেয়েটা কত ভালো থাকত! কত সুন্দর, গোছানো একটা সোনার সংসার হতো তাদের! আর সবচেয়ে বড় কথা ফারহানের ছায়া থাকলে হয়তো ফিওনাকে জীবনের ওই জঘন্য, নরকীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না! কিন্তু আজ তার কিছুই হয়নি। শুধু এই একটা মানুষের ভুলের জন্য আজ তাদের পুরো জীবনটা তছনছ হয়ে গেছে। নিজের অজান্তেই বেলীর চোখ ফেটে জল চলে এলো। সে আলগোছে চোখের জলটা সামলে নিয়ে এক অদ্ভুত, অস্ফুট সুরে বলল,
“ও আমার এবং তোমার মেয়ে হতে পারতো ফারহান। কিন্তু ওটা আজ আর সত্যি নয়। ও এখন হয়েছে শুধু আমার মেয়ে… কেবলই আমার মেয়ে!”
ফারহান এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল,
“আমারই দোষ! যাক মেয়েটা ভালো থাকুক। জীবনে কাউকে নিয়ে এগিয়ে গেছো তাই না?”
শেষের কথাটা বলতে গিয়ে ফারহানের গলা কাঁপলো। বেলী চোখে চোখ রেখেই উত্তর করলো,
“চার বছর যখন একাই এগোতে পেরেছি নিজের পায়ে। বাকি জীবনও পারব। সঙ্গীহীন জীবন আরো সুন্দর কোনো কষ্ট কিংবা কিছুই নেই। অতীত থেকে তো শিক্ষা নিলাম! বাঁচার জন্য আমার সন্তান আছে। বেঁচে থাকার জন্য কর্ম আছে। আর কি চাই? ব্যস আমার জীবন এতেই সুন্দর! তবে কোনোদিন ভাবিনি, এই জীবনে আবার কোনোদিন তোমায় এভাবে দেখব।”
ফারহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্য দৃষ্টিতে রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“বাড়িওয়ালা ঘর থেকে তাড়িয়ে দিল, তারপর ওই বস্তি থেকেও আমাকে ভাগিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু এই শহরটা আর ছাড়তে পারিনি বেলী। ফুটপাতে পড়ে থাকতে থাকতেই… চার বছর পর আজ এভাবেই একই শহড়ে আবার দেখা হয়ে গেল!”
মা আর আঙ্কেলের ভেতরের কথপোকথন মন দিয়ে শুনছিল ছোট ফিওনা। বাচ্চাদের মন খুবসংবেদনশীল হয়। সে কিছু একটা আঁচ করতে পেরে বেলীর হাত ধরে টান দিয়ে বলল,
“আম্মু, এই আঙ্কেলটা ওছব কী বলতে? আমার বাবা কই আম্মু?”
মেয়ের এই আচমকা প্রশ্নে বেলীর বুকটা কেঁপে উঠল। সে এক পলক ফারহানের সেই আশাবাদি, তৃষ্ণার্ত চোখের দিকে তাকাল। যে চোখে একজন অপরাধী বাবা তার সন্তানের স্বীকৃতি খোঁজার শেষ চেষ্টা করছে। কিন্তু বেলী আর দুর্বল হলো না। সে শক্ত মুখে ফিওনার দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলল,
“তোমার মা-ও আমি, বাবা-ও আমি মামণি। তোমার বাবা অনেক আগে আমাদের ছেড়ে বহুদূরে হারিয়ে গেছে। যে হারিয়ে যায় নিজ ইচ্ছেয় সে আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। তোমার বাবাও আর আসবে না ফিওনা৷ মা’ই তোমার সবকিছু।”
ফারহান পাথরের মতো বসে থেকে সব শুনল। তার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে দাড়ি বেয়ে মাটিতে পড়তে লাগল। নিজের সন্তানকে সামনে পেয়েও চিৎকার করে বলতে পারল না—‘আমিই তোর সেই অভাগা পিতা!’ সেই অধিকার সে নিজের হাতে বহু আগেই পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। বেলী আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াতে চাইল না। সে ফিওনার হাত ধরে তাড়া দিয়ে বলল,
“চলো মামণি, দেরি হয়ে যাচ্ছে। বাসায় গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসতে হবে।”
তারা যখন হাঁটা শুরু করল, ফিওনা যেতে যেতে বারবার পেছন ফিরে সেই আঙ্কেলটার দিকে তাকাচ্ছিল। বাচ্চা মেয়েটার কোমল মনে কেন জানি ওই ছন্নছাড়া ভিক্ষুকটার জন্য এক অদ্ভুত মায়া জেগে উঠছিল। ফারহানও পলকহীন চোখে, এক বুক হাহাকার নিয়ে তার চলে যাওয়া সন্তানের পিঠের দিকে তাকিয়ে রইল—যতক্ষণ না তারা চোখের আড়াল হয়। বেলী মেয়ের এই পেছন ফিরে তাকানোটা লক্ষ্য করল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ঝট করে ফিওনাকে রাস্তার মাঝখানেই দুই বাহুতে জড়িয়ে একদম কোলের ওপর তুলে নিল। মেয়ের চুলে নিজের মুখটা লুকিয়ে, ফারহানের অলক্ষ্যে সে নিজের চোখের শেষ নোনা জলটুকু মুছে নিল।
এই জীবন, এই বিগত কয়েক বছরের ঝড় তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। মানুষ চিনিয়েছে, কোনটা আসল আর কোনটা নকল তা আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে। কাছের মানুষ কিভাবে দূরের হয়ে যায়, আর দূরের কেউ কিভাবে আপন হয়ে বুকের ভেতর থেকে যায়—তা শিখিয়েছে। ভালোবাসার নামে কত মিথ্যে থাকে, কত প্রতিশ্রুতি মাঝপথে ভেঙে ধুলো হয়ে যায় তা শিখিয়েছে। এখন আর বেলীর কোনো অভিযোগ নেই। কারোর জন্য অপেক্ষা নেই। কোনো পুরুষ মানুষের প্রয়োজনও নেই। কারণ দিনের শেষে, পৃথিবীটা তার কাছে ছোট হয়ে এসে থেমেছে শুধু একটা মানুষের মাঝেই—তার মেয়ে।
এই ছোট্ট হাতটাই এখন তার বাঁচার কারণ, তার ঘরে ফেরার তাড়া, তার নতুন সকাল। হয়তো বেলীর জীবনটা গল্পের মতো সুন্দর না। এখানে প্রেমিক নেই, রঙিন সমাপ্তি নেই, নেই কারও হাত ধরে বেঁচে থাকার প্রতিশ্রুতি। তবুও তার জীবন সুন্দর।
জীবনের বাকি পথটুকু না হয় সে নিজের এই মেয়েটাকে নিয়েই পাড়ি দিয়ে দেবে। বেলী শক্ত পায়ে সামনে হাঁটতে লাগল। পেছনে পড়ে রইল বহু পুরোনো এক জীবন, বহু না বলা কান্না। আর সামনে—একটা ছোট্ট হাত শক্ত করে ধরে এগিয়ে চলা এক লড়াকু মায়ের নতুন পৃথিবী। বেলীফুল বড্ড নিভৃতে, নিঃশব্দে ফোটে, অথচ তার তীব্র সুবাস চারপাশের বাতাসকে আকুল করে তোলে—বেলীদের জীবনটাও ঠিক তেমন। হাজারো ঝড়ের রাতে পাপড়ি ছিঁড়ে গেলেও, তার ভেতরের সুবাসটুকু কেউ কেড়ে নিতে পারে না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের তৈরি করা নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, মিথ্যে সম্পর্কের মায়া ঝেড়ে ফেলে বেলী আজ এক মুক্ত বিহঙ্গ। তার এই জীবনের ইতিকথা লেখা হয়েছে, হবে এবং হয়ে থাকবে—কেবলই এক লড়াকু মা ও তার সন্তানের অস্তিত্বের লড়াইয়ে। আমাদের চারপাশের চেনা ভিড়েও হয়তো এমন কত শত ‘বেলী’ প্রতিদিন একলা লড়ে যাচ্ছে নিজের সন্তানের জন্য। ভালো থাকুক পৃথিবীর সব লড়াকু মায়েরা, যারা একাই এক একটা গোটা সংসার, আস্ত একটা আকাশ।
“অতীতের সব কান্না ধুয়ে, মুছে গেছে সব গ্লানি,
মায়ের বুকেই রইল জমা মেয়ের হাসির খনি।
ঝড়ের পরে নীরব সকাল, রোদ্দুর এসে হাসে,
মা-মেয়ের এই ছোট্ট পৃথিবী ভালোবাসায় ভাসে।”
মায়ের বুকেই গড়ে উঠুক মেয়ের নিরাপদ পৃথিবী,
কারণ নিজের জন্য নয়—শুধু মেয়ের জন্যই বাঁচে নিরবধি। 💙
(সমাপ্ত)
