#বেলীফুলের_ইতিকথা (২৪)
#মীরাতুল_নিহা
আদনানের কথার ধাঁচ, চোখের গভীর চাউনি দেখে বেলীর মনের ভেতর আচমকা একটা খটকা লাগল। কেমন যেন একটা অজানা অস্বস্তি আর শঙ্কা বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। সে হাতের পানির গ্লাসটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল। তারপর ভ্রু কুঁচকে সরাসরি আদনানের চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কাকে চিনি আদনান? কার কথা বলছ তুমি এতক্ষণ ধরে? তোমার এই অদ্ভুত ধাঁধাময় কথার মানে কী, পরিষ্কার করে খুলে বলো তো?”
বেলীর এই সোজাসাপ্টা প্রশ্নে আদনান আর চোখ ফিরিয়ে নিল না। এতগুলো বছর ধরে বুকের গহীনে চেপে রাখা জমানো পাথরটাকে আজ সে চিরতরে নামিয়ে দিতে চায়। সে নিজের মনকে শক্ত করল, ভেতরের সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্বকে একপাশে সরিয়ে দিল। তারপর বেলীর চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে অত্যন্ত আকুল গলায় বলতে শুরু করল,
“আমি অন্য কারও কথা বলছি না , আমি তোমার কথাই বলছি। বিয়ের পর তুমি যখন প্রথম ওই বস্তির ঘরে পা রাখলে, তোমাকে দেখেই আমার মনে মনে ভীষণ ভালো লেগেছিল। প্রথম দেখাতেই আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম, পছন্দ করে ফেলেছিলাম। কিন্তু তুমি তখন পরস্ত্রী ছিলে, অন্যের ঘরের বউ ছিলে। তাই একটা পরস্ত্রী দেখে আমি আমার সমস্ত অনুভূতিকে জোর করে সামলে নিয়েছিলাম। নিজের বিবেক আর নীতিকে হারতে দিইনি। বুকের ভেতরের সেই ভালোবাসাকে জোর করে ওখানেই সমাপ্ত করে দিয়েছিলাম, কোনোদিন একটা প্রকাশ্য দীর্ঘশ্বাসও ফেলিনি তোমার সামনে।”
আদনান আরেকটু দম নিয়ে নিজের ভেতরের সব কথা একনাগাড়ে উগরে দিয়ে বলতে লাগল,
“কিন্তু তোমার এই ডিভোর্সের পর আমি আর নিজেকে কোনোভাবেই ধরে রাখতে পারিনি বেলী। এতদিন ধরে মনের যে অনুভূতিগুলো বন্ধ হয়ে পড়েছিল, দমিত ছিল, তোমার এই একা হয়ে যাওয়ার পর সেগুলো যেন বাঁধ ভেঙে উথলে উঠেছে। আমি আর পারছি না। এখন আমি আর চাইলেও, হাজার চেষ্টা করেও এই অনুভূতিগুলো নিজের মন থেকে মুছে ফেলতে পারছি না বেলী। আমি কোনোদিন, কোনো একটা মুহূর্তের জন্যও তোমাকে বড় বোনের নজরে দেখিনি। একটা পুরুষ একটা নারীকে যেভাবে ভালোবাসে, আমি ঠিক সেভাবেই তোমাকে মন থেকে তীব্রভাবে ভালোবাসি আর তোমাকে নিজের করে পেতে চাই।”
আদনানের মুখ থেকে শেষ বাক্যটা বের হওয়া মাত্রই বেলীর মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হলো। এত বড় একটা বিশ্বাসভঙ্গ, এত বড় একটা ধাক্কা সে সহ্য করতে পারল না। যে আদনানকে সে নিজের ভাইয়ের মতো পরম নিশ্চিন্তে আশ্রয় মনে করেছিল, সে-ই কিনা তার দিকে এই নজরে তাকিয়েছে? বেলীর ভেতরের সমস্ত রাগ, ঘৃণা, অপমান আর ক্ষোভ যেন এক নিমেষে মাথায় চড়ে বসল। সে সোফা থেকে সটান উঠে দাঁড়িয়ে কোনো কিছু না ভেবেই সপাটে একটা চড় বসিয়ে দিল আদনানের গালে!
‘ আদনান চরম স্তব্ধ, হতভম্ব, বাকরুদ্ধ হয়ে নিজের লাল হয়ে যাওয়া গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ ফেটে জল চলে এল। সে ভাবতেও পারেনি বেলী তাকে এভাবে আঘাত করবে। বেলী রাগে আর অপমানে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে দরজার দিকে আঙুল উঁচিয়ে তীব্র চিৎকার করে বলল,
“ তোমাকে আমি নিজের ছোট ভাইয়ের মতন দেখি, সারাক্ষণ ‘ভাই’ বলে ডাকি—আর তুমি এসব নোংরামি পুষে রেখেছ আমায় নিয়ে? ছিহ্ আদনান, ছিহ্! তোমার মুখে এসব কথা শুনতে হবে আমি মরলেও স্বপ্নে ভাবিনি। আমার ঘেন্না লাগছে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে। তুমু আর কোনোদিন আমার সামনে আসার দুঃসাহস দেখাবে না!”
আদনান আর একটা কথাও বলল না। মাথা নিচু করে, এক বুক ভাঙা কষ্ট, কান্না আর চরম অপমান নিয়ে সে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ঘরের ভেতরের এই অনাকাঙ্ক্ষিত আর ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি দেখেছোট্ট ফিওনা ভয়ে আঁতকে উঠল। মায়ের এমন রুদ্রমূর্তি আর আদনান মামার গালে চড়ের শব্দে সে চরম আতঙ্কিত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল। সোফা থেকে নেমে দৌড়ে গিয়ে মায়ের পা জড়িয়ে ধরল সে। বেলী এক ঝটকায় ফিওনাকে কোলে তুলে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। ফিওনা মায়ের কাঁধে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞেস করল,
“মামণি, তুমি মামাকে কেন মেলেছ? মামা কান্নু করতে করতে চলে গেল কেন?”
বেলী নিজের ভেতরের ক্ষোভ চেপে ফিওনার চোখের জল মুছে দিল। তারপর শক্ত গলায় বলল,
“আর কখনো আদনান মামার নাম মুখে নেবে না ফিওনা। ও আর তোমার মামা নেই। আদনান পঁচা হয়ে গেছে। খুব পঁচা! আর পঁচা লোকেদের কাছে কখনো যেতে হয় না, তাদের সাথে কথাও বলতে হয় না। বুঝছ?”
ফিওনা মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে মাথা দোলাল। আর কোনো কথা বাড়ানোর সাহস পেল না।
দেখতে দেখতে ঘরের ভেতর সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এল। চারপাশটা কেমন যেন নিঝুম আর থমথমে লাগছে। বেলী জোর করেই নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। ফিওনাকে হাত-মুখ ধুইয়ে পড়ার টেবিলে এনে বসাল। সামনে বইটা খুলে ধরে সে নিজেই পড়াতে লাগল, কিন্তু বেলীর মন তখন বইয়ের পাতায় ছিল না। তার চোখের সামনে বারবার আদনানের সেই চড় খাওয়ার পর স্তব্ধ হয়ে যাওয়া মুখটা ভেসে উঠছিল।
এই ঘটনার পর দেখতে দেখতে কেটে গেল কয়েকটা দিন। চারপাশের সবকিছু কেমন যেন বড্ড শান্ত আর একা হয়ে গেল। সব ঠিক থাকলে এতদিনে আদনান অনেকবারই এই ঘরে আসতো, ফিওনার সাথে মেঝেমধ্যে বসে খেলা করত, ঘরটা হাসির শব্দে মুখর হয়ে থাকত। বেলীর ছোটখাটো কত কাজেই না আদনান সাহায্য করত! পেজের কাপড়ের পার্সেলগুলো কুরিয়ারে দিয়ে আসা, কিংবা সংসারের হঠাৎ ফুরিয়ে যাওয়া কোনো প্রয়োজনীয় জিনিসপাতি এনে দেওয়া—বেলী একটা ফোন করলেই আদনান সব কাজ ফেলে ছুটে আসতো।
বেলী কখনোই চায়নি আদনানকে এভাবে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে। প্রথম থেকেই আদনানের এত কাছাকাছি আসায় বেলীর মনে এক অদ্ভুত জড়তা আর দ্বিধাবোধ ছিল। মেয়েদের মন সবকিছুতেই আগে টের টায়। তার ওপর আদনানের মায়ের সেই কটু কথা, সন্দেহের কথা বেলী কোনোদিন ভোলেনি। ওই তীক্ষ্ণ চাউনি আর খোঁটা দেওয়া কথার ভয়ে সে সবসময় আদনান থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে চেয়েছে। তবুও আদনানের অবুঝ মায়া আর বারবার নিজে থেকে এগিয়ে আসাকে বেলী শেষ পর্যন্ত উপেক্ষা করতে পারেনি। একটা অসহায় সময়ে আদনানের এই নিঃস্বার্থ সাহায্যকে সে ভাইয়ের পরম আশ্রয় বলে মেনে নিয়েছিল।
পরক্ষণেই বেলীর মনের এক কোণে তীব্র অপরাধবোধ মোচড় দিয়ে উঠল। আচমকা তার মনে হলো—চড়টা মেরে সে কি আসলেই বড্ড বেশি করে ফেলেছে? রাগ আর অপমানের মাথায় সে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু হাজার হোক, তার জীবনের সেই চরম বিপদের দিনগুলোয় এই আদনানই তো তাকে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিয়েছিল। তখন আদনান যদি নিজের কাঁধে দায়িত্ব না নিত, তবে ফিওনাকে নিয়ে সে আজ কোথায় যেত? এত বড় একটা উপকারের ঋণ সে এক নিমেষে ভুলে গেল?
ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের কলিং বেলটা একনাগাড়ে বেজে উঠল। বেলী নিজের ভেতরের অস্থিরতা সামলে নিয়ে ধীরপায়ে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখল সামনে আয়েশা দাঁড়িয়ে আছে। সাত মাসের উঁচু পেটটা নিয়ে আয়েশা বেশ সাবধানে হেঁটে ঘরের ভেতর এসে সোফায় বসল। হাঁপাতে হাঁপাতে বেলীর দিকে তাকিয়ে কুশলাদি জিজ্ঞেস করে বলল,
“কী রে বেলী, তোর কী অবস্থা? শরীর-টোরীর ঠিক আছে তো?”
বেলী কোনোমতে মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দিল। আয়েশা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে একটু ব্যস্ত গলায় বলল,
“একদম চুপচাপ বসে আছিস যে? তাড়াতাড়ি রেডি হইযা নে। আজ মাহির গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান, তুই কি একবারে ভুইলা গেছিস? নাকি আদনান তোকে দাওয়াতই দেয়নি?”
বেলী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে ম্লান গলায় বলল,
“দাওয়াত দিয়েছে আয়েশা। কিন্তু আমি যাব না।”
আয়েশার মনে খটকা লাগল। সে ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে বলল,
“যাবি না মানে? আদনানের নিজের বোনের বিয়ে, আর তুই যাবি না? এটা কেমন কথা! চল, কোনো আপত্তি শুনব না, তাড়াতাড়ি রেডি হ!”
আয়েশা যখন এভাবে যাওয়ার জন্য বারবার জোরাজোরি করতে লাগল, তখন বেলী আর নিজের ভেতরের ঝড়টা চেপে রাখতে পারল না। তার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ল। আয়েশার হাত দুটো ধরে সে সেদিন আদনানের বলা প্রতিটা কথা, তার মনের ভেতরের অনুভূতি আর জবাবে নিজের মারা সেই চড়ের কথা—সবকিছু একনাগাড়ে খুলে বলল।
সব শুনে আয়েশা বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে চুপ করে রইল। ঘরের ভেতর একটা থমথমে নীরবতা বিরাজ করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর আয়েশা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নরম গলায় বলল,
“চড়টা দিয়ে তুই আসলেই বেশি করে ফেলেছিস বেলী। তুই রাজি না থাকলে ওকে সুন্দর করে বুঝিয়ে বলতে পারতিস, ফিরিয়ে দিতে পারতিস। কিন্তু এভাবে গায়ে হাত তোলাটা তোর একদম ঠিক হয়নাই।”
আয়েশার মুখে কথাগুলো শুনে বেলী এবার সত্যিই থমকে গেল। তার ভেতরের রাগের পর্দাটা পুরোপুরি সরে গিয়ে সেখানে একরাশ অনুশোচনা এসে ভিড় করল। আয়েশা ঠিকই বলেছে, আদনান তো তাকে ভালোবাসার কথা বলেছিল, কোনো পাপ তো করেনি। বেলী নিচু গলায় বলল,
“আমি সত্যিই তখন মাথা ঠিক রাখতে পারিনি রে। এখন আমার নিজেরই খুব খারাপ লাগছে। আমার বোধহয় আদনানকে একটা ‘স্যরি’ বলা উচিত।”
আয়েশা বেলীর দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
“তুই এক কাজ কর, এখন আর ঘরে বসে মন খারাপ না করে আমাদের সাথে বিয়েতে আয়। ওখানে গিয়ে আদনানকে একটা ‘স্যরি’ বলে নিবি, দেখবি সব ঠিক হয়ে যাইব। ছেলেটার মনটা অনেক নরম, তুই বুঝিয়ে বললে ও আর কষ্ট ধরে রাখব না।”
আয়েশা ঠিকই বলেছে, এভাবে ঘরে লুকিয়ে থেকে অপরাধবোধে ভোগার চেয়ে সরাসরি ভুল স্বীকার করা অনেক ভালো। বেলী আয়েশার দিকে তাকিয়ে সম্মতি জানিয়ে মাথা দোলাল। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল—আজই সে মাহির গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে যাবে। যতই জড়তা আর কটু কথার ভয় থাকুক না কেন, আজ সব উপেক্ষা করে সে আদনানের মুখোমুখি হবে। নিজের করা ভুলটার জন্য হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়ে নেবে।
আলমারি খুলে একটা সুতি জামদানি শাড়ি বের করে পরে নিল। খুব একটা জমকালো সাজগোজ করার মানসিকতা তার ছিল না, তাই হালকা কাজল আর একটা ছোট্ট টিপেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখল। তবে ছোট্ট ফিওনাকে সে খুব যত্ন করে সাজিয়ে দিল। একটা মিষ্টি ফ্রক পরিয়ে, চুলে দুটো ক্লিপ আটকে দিতেই ফিওনাকে যেন পরীর মতো লাগছিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ফিওনা তার মামণির গাল ছুঁয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল, কিন্তু বেলীর মনের ভেতরের মেঘটা যেন কিছুতেই কাটছিল না।
তৈরি হওয়া শেষ হলে তারা ঘর থেকে বের হলো। আয়েশার সাত মাসের ভারী শরীর, তাই সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় বেলী এক হাতে আয়েশাকে শক্ত করে ধরে রাখল আর অন্য হাতে ফিওনার আঙুল চেপে ধরল। সাবধানে পা ফেলে ফেলে তারা তিনজনে যখন রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়াল, ঠিক তখনই বেলীর চোখ গেল ফুটপাতের এক কোণে। সেখানে একটা ছেঁড়া চটের ওপর বসে ছিল এক ভিক্ষুক। লোকটার পরনের কাপড়টা যেমন জীর্ণ, তেমনি তার মুখের চামড়াগুলো কুঁচকে একাকার হয়ে গেছে। বেলী যখন আয়েশাকে ধরে সাবধানে রাস্তা পার হওয়ার জন্য এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই সেই ভিক্ষুকটার সাথে তার চোখাচোখি হলো। এক অদ্ভুত মলিন আর করুণ দৃষ্টিতে বেলী সেই লোকটার দিকে তাকাল। বেলী থমকে দাঁড়িয়ে লোকটার দিকে চেয়ে রইল, আর আশ্চর্যের বিষয়—সেই মলিন চেহারার ভিক্ষুকটাও পলকহীন চোখে বেলীর দিকেই তাকিয়ে ছিল। তার সেই ঘোলাটে চোখ দুটোর গভীরে যেন এক বুক হাহাকার লুকিয়ে আছে
#চলবে?
#বেলীফুলের_ইতিকথা (২৫)
#মীরাতুল_নিহা
মেয়েটির হাত থেকে প্রায় একরকম ছোঁ মেরে কাগজের ফাইলটা কেড়ে নিলেন হাফসা খাতুন। ভেতরের প্রেসক্রিপশন আর ডাক্তারি রিপোর্টটা চোখের সামনে ধরতেই তার কপালে ভাঁজ পড়ল। ইংরেজি লেখাগুলো ভালো করে পড়তে পারলেন না, মেয়ের ফ্যাকাশে মুখ আর কান্নায় ভেজা চোখ দেখে উনার বুকের ভেতর সন্দেহের তিলটা তাল হয়ে উঠল। তিনি রাগী দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হইছে তোর? এই রিপোর্টে কী লেখা আছে, পরিষ্কার করে বল আমায়!”
মায়ের এই রুদ্রমূর্তি দেখে তৃষ্ণা ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল। তার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। এই মুহূর্তে সত্যি কথাটা বললে যদি মাথার ওপর থেকে এই শেষ আশ্রয়টুকুও চলে যায়? এই ভয়ে তার বুকটা দুরুদুরু কাঁপতে লাগল। এমনিতেই তো পাপের শাস্তি সে কম পাচ্ছে না, প্রতিটা মুহূর্ত নরকযন্ত্রণা ভোগ করছে। তৃষ্ণাকে চুপ করে থাকতে দেখে হাফসা খাতুন এবার আরও জোরে ধমক দিয়ে হুমকি দিলেন,
“কী রে, কথা কছ না ক্যা? সত্যি কথা কবি, নাকি আমি নিজেই এই কাগজ নিয়ে ডাক্তারের কাছে যামু? তখন কিন্তু আরও ভালো কইরা জানতে পারমু!”
আর কোনো উপায় না পেয়ে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া তৃষ্ণা এবার ভাঙা গলায়, অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলল
, “মা… আমার… আমার এইডস হইছে!”
কথাটা বলেই সে চোখ বন্ধ করে ফেলল। তারপর কান্নার বেগ সামলে নিলো
মেয়ের মুখে এই মরণব্যাধির নাম শুনতেই হাফসা খাতুন যেন আকাশ থেকে পড়লেন। নিজের দুই হাত মাথায় দিয়ে তিনি ধপাস করে মেঝেতে বসে পড়লেন। তার সমস্ত শরীর যেন কাঁপতে লাগল। তীব্র ক্ষোভ আর আফসোস করতে করতে তিনি চিৎকার করে বলতে লাগলেন,
“কত কইছিলাম তোরে! কত বুঝাইছিলাম যে এইসবে যাস না, এসব পাপ কাজ করিস না! নিজের ভালো চাস তো স্বামীর ঘরে ফেরত যা। কিন্তু না! তুই তো লাঙ নিয়া নাচলি! সেই লাঙ তোরে খাইয়া দাইয়া লাথি মাইরা ভাগায় দিল এক বছর পর। তারপর আবার আরেকটারে ধরলি, সেটাও শেষ হইলো। তারপর আবার কারে ধরছিলি আল্লাহ জানে! এইজন্যই তো তোর এই অলক্ষুণে রোগ হইছে! যা, আরও বেডাদের সাথে শুইতে যা!”
হাফসা খাতুনের মুখ থেকে ক্ষোভের আগুনে যেন বিষাক্ত সব তীর বেরিয়ে আসতে লাগল। তিনি দরজার দিকে আঙুল উঁচিয়ে তীব্র ঘৃণায় বললেন,
“আমার ঘরে আর তোর কোনো জায়গা নাই! তোর মতো এমন কলঙ্কিনী মেয়ে আমার চাই না। তুই এক্ষুনি আমার বাড়ি থেকে দূর হ!”
মায়ের প্রতিটা কথা তৃষ্ণার বুকে তীরের মতো বিঁধতে লাগল। তৃষ্ণা তখন ঘরের এক কোণে বসে অঝোরে কাঁদছে। নিজের অবাধ্যতা আর ভুলের জন্য আজ সে সমাজের কাছে, মায়ের কাছে এক ঘৃণিত অপরাধী। চোখের জলে বুক ভাসাতে ভাসাতে সে মনে মনে শুধু একটাই কথা ভাবছে তার করা পাপের শাস্তি যে এতটা ভয়াবহ আর নির্মম হবে, তা সে কোনোদিন স্বপ্নেও বোঝেনি।
তৃষ্ণা দুই হাতে মায়ের পা জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। ভাঙা গলায় আকুতি করে বলল,
“মাগো, আমায় তাড়িয়ে দিও না। আমার যাওনের কোনো জায়গা নাই মা। এই রোগ নিয়া আমি কার দুয়ারে যামু? আমায় একটুখানি আশ্রয় দাও মা, আমি ঘরের এক কোণে পড়ে থাকমু।”
হাফসা খাতুন এক ঝটকায় পা সরিয়ে নিয়ে তীব্র ঘৃণায় বললেন,
“তোর জন্য আমি এলাকায় মুখ দেখাইতে পারি না! মানুষের নানা কথায় কান পাতা যায় না। প্রথমে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে আমার মাথাটা হেট করলি, বংশের সম্মান ধুলোয় মিশাইলি। তারপর যা একটু সম্মান বাকি আছিল, তাও তুই শেষ করলি! শোন তৃষ্ণা, না খেয়ে বেঁচে থাকা যায়, কিন্তু সম্মান ছাড়া সমাজে বাঁচা যায় না। তোর এই কলঙ্কের বোঝা আমি আর টানতে পারব না।”
তৃষ্ণা আবারও হামাগুড়ি দিয়ে মায়ের পায়ে পড়তে গেল, কিন্তু হাফসা খাতুন এবার সপাটে এক লাথি মেরে তাকে দূরে সরিয়ে দিলেন। লাথি খেয়ে মেঝেতে আছড়ে পড়তেই তৃষ্ণার বুকের ভেতরটা যেন হু হু করে কেঁপে উঠল। চোখের পলকে তার স্মৃতির পাতায় একটা পুরনো দৃশ্য ভেসে উঠল। ঠিক এভাবেই… ঠিক এভাবেই একদিন একজন অসহায় মানুষ তার পা জড়িয়ে ধরেছিল, আর সেও ঠিক এই নিষ্ঠুরভাবেই তাকে লাথি মেরে সরিয়ে দিয়েছিল। আজ প্রকৃতি যেন সেই নির্মম অন্যায় আর পাপের বিচারটাই সুদে-আসলে তার কাছে ফিরিয়ে দিচ্ছে! এমন নয় যে ফারহান তৃষ্ণার জীবনে প্রথম পুরুষ ছিলো। এর আগেও দুটো প্রেমে জড়িয়েছিল সে। শারীরিক সম্পর্ক হয়েও সে সম্পর্কও টেকেনি। বলেছিল কেউ তাকে খুশি করতে পারেনি৷ জীবনে মজাটাই তার কাছে মুখ্য ছিল। শেষমেশ চেয়েছিল বিয়ে করে থিতু হতে৷ কিন্তু তার অসৎ চরিত্র আর লোভী মানসিকতা তাকে ঠিক থাকতে দেয়নি। ফারহানকে ছেড়ে যার সাথে গেছিল বিয়ের ভরসা দিয়ে দিয়ে একটা বছর তার সাথে সম্পর্কে ছিলো তৃষ্ণা। কত হোটেলে কত জায়গায় দেখা করেছ। বিয়ের চাপ দিতেই ছেলো পালালো! তারপর নিজেে সৌন্দর্যকে হাত করে আবারো সম্পর্কে জড়িয়েছিল এক বিবাহিত পুরুষের সাথে টাকা দেখে! সেটাও শেষ হয সে পুরুষের স্ত্রী’র সূত্র ধরে। এতেও থামেনি সে! জীবন আর যৌবনকে টেনে নিতে আরো একবার এক পুরুষের পাল্লায় পড়লো! যার যাতায়াত ছিল নিষিদ্ধ পল্লী অব্দি। হয়ত তার থেকেই ছড়িয়েছে এই রোগ! কতই না পাপ করেছে। পাপের শাস্তি পাচ্ছে সে। অনুশোচনায় যখন ঘিরে ধরলো ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে! জীবন তাকে মৃত্যুর দুয়ারে এনে দাঁড় করিয়েছে। এমন এক রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে ফেরার পথ আর নেই। চেয়ে চেয়ে নিজের ধ্বংস দেখা ছাড়া! চোখের জল মিশে একাকার হয়ে গেল তৃষ্ণার। এই ভয়াবহ ছোঁয়াচে রোগ নিয়ে সে এখন কোথায় যাবে? কে তাকে এই সমাজে একটু ঠাঁই দেবে? কি হবে তার?মায়ের কথা শুনে উন্মাদের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে এলো তৃষ্ণা। মাথার চুল এলোমেলো, পরনের কাপড় অগোছালো। সে রাস্তার ওপর দিয়ে লক্ষ্যহীনভাবে হাঁটতে লাগল। চারপাশের কোনো হিতাহিত জ্ঞান তার ছিল না। ঠিক তখনই তীব্র গতিতে আসা একটা দূরপাল্লার বাস সজোরে ধাক্কা দিল তৃষ্ণাকে।
বড় একটা শব্দ করে তৃষ্ণা ছিটকে পড়ল রাস্তার ধারে। রক্তে ভেসে গেল পিচঢালা পথ। আশেপাশের লোকজন চিৎকার করে ছুটে এসে ধরাধরি করে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেল। ডাক্তাররা আপ্রাণ চেষ্টা করে তার প্রাণটা বাঁচাল ঠিকই, কিন্তু মাথায় অতিরিক্ত আঘাত পাওয়ার কারণে তৃষ্ণার ব্রেণের ভেতরের সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল। সে নিজের অতীত, নিজের নাম, নিজের রোগ—সবকিছু এক নিমেষে ভুলে গেল। তার স্মৃতিশক্তি পুরোপুরি লোপ পেল। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর সে একদম পাগলের মতো আচরণ করতে লাগল। নোংরা কাপড় পরে, এলোমেলো চুলে সে এদিক-ওদিক উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগল। হাফসা খাতুন কিন্তু মন থেকে মেয়েকে চিরতরে তাড়িয়ে দিতে চাননি। মা তো! রাগের মাথায়, অপমানে লাথি মেরে তাড়িয়ে দিলেও উনার মাতৃত্বের টান শেষ হয়ে যায়নি। তিনি চেয়েছিলেন মেয়েটার রাগ একটু কমলে, তাকে আবার নিজের ঘরেই লুকিয়ে রাখবেন, সেবা-শুশ্রূষা করবেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তৃষ্ণা ততদিনে পুরোপুরি পাগল হয়ে চিরকালের জন্য সেই এলাকা ছেড়ে, মায়ের কোল ছেড়ে বহু দূরে হারিয়ে গেছে।
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানটি সাধারণ এক বস্তি ঘরে হলেও বেশ চমৎকার করে সাজানো হয়েছে। চারপাশের দেয়ালে সস্তা রঙিন কাগজ, গাঁদা ফুলের মালা মরিচ বাতির আলোয় পুরো পরিবেশটাতেই একটা উৎসবের আমেজ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বেলী আর আয়েশা ছোট্ট ফিওনাকে সাথে নিয়ে সাবধানে হেঁটে কুলসুম বেগমের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আজ মেয়ের বিয়ে বলে কুলসুম বেগম নিজেও বেশ জমকালো একটা শাড়ি পরে সেজেগুজে বসে আছেন। বেলী কিছুটা দ্বিধা আর জড়তা নিয়ে এগিয়ে গিয়ে উনাকে সালাম দিল। কুলসুম বেগম বেলীর দিকে তাকিয়ে মুখের গম্ভীর ভাবটা কিছুটা নরম করে বললেন, “আইও, ভেতরে বও।”
কুলসুম বেগমের কথার টোন দেখে বেলী ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। উনি কি আসলেই তাদের আসাতে খুশি হয়েছেন, নাকি মনে মনে বেজার হয়েছেন। খালাম্মার মনের ভাব বোঝার চেষ্টা না করে বেলী সোজা মাহির কাছে চলে গেল। ভেতরের ঘরে মাহিকে হলুদ শাড়ি আর গয়নায় সাজিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। সাজানো মাহিকে দেখে বেলীর মুখ থেকে আচমকা বেরিয়ে গেল,
“কী সুন্দর লাগছে মাহি তোকে!”
মাহিও বেলীকে দেখে মিষ্টি করে হাসল। বেলী চারদিকে চোখ বুলিয়ে আদনানকে খোঁজার চেষ্টা করল, কিন্তু পুরো ঘরের কোথাও আদনান নেই। বেলীর চোখের ভাষা বুঝতে পেরে আয়েশা কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“আদনান নাকি কী একটা কাজে বাইরে গেছে। বিয়ে বাড়ি, কত রকম কাজ থাকে ক! একটু পরেই চইলা আসব।”
আদনানের না থাকার খবর শুনে বেলীর বুকের ভেতর জমে থাকা উৎকণ্ঠাটা একটু কমল। সে তখন চারদিকে তাকিয়ে বলল,
“আচ্ছা, ফিওনা কই রে?”
আয়েশা হেসে ঘরের বাইরের দিকে ইশারা করে বলল,
“আরে, ও তো ওই যে বাইরের বাচ্চাদের সাথে খেলায় মেতে উঠেছে। দেখছিস না কত বাচ্চা এখানে এসেছে! তুই চিন্তা করিস না, ওখানেই আছে।”
ফিওনা অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলছে জেনে বেলীও নিশ্চিন্ত হলো। একপর্যায়ে বেলী আর আয়েশা মাহিকে ঘিরে ধরে গল্প করতে পুরোপুরি ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বিয়ের নানা খুনসুটি আর পুরনো দিনের কথায় মাহিকে হাসাতে হাসাতে তার ভেতরের গুমোট ভাবটা একদম ভুলে গেল। একটু পরেই মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল। সাউন্ড বক্সে উচ্চস্বরে বাজতে শুরু করল গান। সেই সাথে বস্তির তরুণ-তরুণীদের নাচ আর চ্যাঁচামেচিতে পুরো বাড়ি গমগম করে উঠল। চারদিকের প্রচুর আওয়াজ আর হুলস্থুলের ভেতর বেলী আয়েশার দিকে ঝুঁকে মুখ নাড়িয়ে কিছু একটা জিজ্ঞেস করল। কিন্তু কানের কাছে মিউজিকের তীব্র শব্দের কারণে আয়েশা ঠিক কী বলছে, তার একটা বর্ণও বেলী বুঝতে পারল না। বেলী শুধু মাথা নেড়ে সায় দিল। তার মনের এক কোণে অবচেতনভাবেই এই ধারণাটা কাজ করছিল যে, ফিওনা নিশ্চয়ই আশেপাশেই কোথাও আছে বা আয়েশার কাছেই আছে। এই অতি আত্মবিশ্বাসের ঘোরটাই যে তার জীবনে কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে চলেছে, তা বেলী তখনো টের পায়নি।
দেখতে দেখতে ঘড়ির কাঁটা রাত দশটা ছুঁয়ে গেল। সাউন্ড বক্সের তীব্র আওয়াজ আর মানুষের নাচ-গানের আনন্দ উৎসব তখনো পুরোদমে চলছে, কিন্তু বেলীর মনের ভেতরের শান্তি ততক্ষণে কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। দীর্ঘ দুই ঘণ্টা ধরে সে ফিওনাকে খুঁজে পাচ্ছে না! পুরো বিয়ে বাড়ি, বস্তির আনাচ-কানাচ হন্যে হয়ে খুঁজেও তার কলিজার টুকরোটার কোনো হদিস মিলল না। বেলী পাগলের মতো ছুটে গিয়ে বাইরে খেলতে থাকা বাচ্চাগুলোকে বারবার চেপে ধরল, কেঁদে কেঁদে জিজ্ঞেস করল,
“তোমাদের সাথে আমার ফিওনা খেলছিল না? ও কোথায় গেছে বলো না ? আমার ফিওনা কোথায়?”
বাচ্চাগুলো ভয় পেয়ে মাথা নাড়ল। তাদের মধ্যে একজন শুধু আমতা আমতা করে বলল,
“ফিওনা তো অনেক আগেই আমাদের ওখান থেকে চলে গেছে। কার সাথে গেছে আমরা দেখিনি।”
কথাটা শোনামাত্রই বেলী মাঠের মাঝখানে অসহায় হয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরতে লাগল, বুকফাটা কান্নায় সে চারপাশ ভারী করে তুলল। একটা মায়ের জীবনের একমাত্র সম্বল, বেঁচে থাকার একমাত্র আলো তার সন্তান! সে এভাবে কোথায় হারিয়ে যাবে? ঠিক তখনই ভিড় ঠেলে আদনান এসে বেলীর সামনে দাঁড়াল। বেলীর এই অবস্থা দেখে আদনানের নিজের চোখও ভিজে উঠল। সে আর নিজের রাগ বা অভিমান ধরে রাখতে পারল না। বেলীর পাশে বসে অত্যন্ত দৃঢ় আর আশ্বস্ত করা গলায় বলল,
“তুমি একদম কেঁদো না। শান্ত হও। ঠিক ফিওনাকে খুঁজে পাব দেখো।”
আদনানের কথায় বেলী যেন খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো একটু সাহস পেল। এরপর আদনান, বেলী আর বস্তির কয়েকজন মিলে চারপাশের অন্ধকার গলিগুলোয় খোঁজাখুঁজি শুরু করল। শেষমেশ খুঁজতে খুঁজতে তারা বস্তির একদম শেষ মাথায়, যেখানে এক নিঝুম আর পরিত্যক্ত জঙ্গল মতো আছে, সেই দিকে এগিয়ে গেল। চারপাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকার আর থমথমে। বেলী হাতের টর্চটা জ্বেলে চারপাশের ঝোপঝাড়ে আলো ফেলতে লাগল। আচমকা টর্চের তীব্র আলোটা গিয়ে পড়ল ঝোপের আড়ালে মাটির ওপর। আর সেই আলোয় চোখের সামনে যা ভেসে উঠল, তা দেখে বেলীর কলিজা যেন ছিঁড়ে বের হয়ে এলো। সাদা ফ্রক পরা একটা ছোট বাচ্চা উপুড় হয়ে মাটির ওপর পড়ে আছে। নিজের মেয়ের সেই আদরের সাদা ফ্রকটা চিনতে বেলীর এক মুহূর্তও ভুল হলো না! কিন্তু পরক্ষণেই এক চরম ও ভয়ঙ্কর দৃশ্যে বেলীর পুরো বুকটা কেঁপে উঠল, তার পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। টর্চের আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে—অসহায় নিথর ফিওনার দু পায়ের মাঝখানের ফাঁক দিয়ে তাজা লাল রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, আর সেই রক্তে সাদা ফ্রকটার নিচের অংশ ভিজে একাকার হয়ে গেছে!
#চলবে
